বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
২ মাঘ ১৪৩২

মাদারীপুরে সরিষা চাষে বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত
মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৯:৫৭

মাদারীপুরে ২০২৫-২৬ ইং অর্থবছরে সরিষা চাষে বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ী, মাদারীপুর এর উপ-পরিচালক রহিমা খাতুন জানিয়েছেন, জেলায় এবার ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকরা সরিষার আবাদ করেছেন এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় গতবারের তুলনায় এবার ৬ শত ৮৭ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ বেশি হওয়ার পাশাপাশি ফসলও অপেক্ষাকৃতভাবে ভালো হয়েছে, সরিষা গাছগুলো হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে।

সরেজমিনে মাদারীপুর সদর, কালকিনি, ডাসার, শিবচর ও রাজৈর উপজেলার কৃষিজমি পরিদর্শন করে দেখা গেছে বিস্তীর্ণ জমিতে শুধু সরিষা আর সরিষার আবাদ করেছেন কৃষকরা। মাদারীপুর সদর উপজেলায় ৫ হাজার ২ শত ৭৬ হেক্টর, কালকিনি-ডাসার উপজেলায় ৫ হাজার ৪ শত ৩৬ হেক্টর, রাজৈর উপজেলায় ২ হাজার ৬ শত ৯৮ হেক্টর ও শিবচর উপজেলায় ৪ হাজার ১ শত ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। যে দিকে চোখ যায় চারিদিকে শুধু চকচকে হলুদ দৃশ্যের সমারোহ ও সরিষা ফুলের গন্ধে মধু আহরণকারী মৌমাছি ও ভ্রমরের গুঞ্জন। বর্তমানে বেশীরভাগ সরিষা গাছে দানা ধরতে শুরু করেছে। কোনো কোনো জায়গায় আগামী ১৫/২০ দিনের মধ্যে সেগুলো পেকে কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করবে। ক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহ, ফসল মাড়াই ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজ সারার জন্য

কৃষক পরিবারগুলোর নারী-পুরুষ সবার মধ্যে এজন্য বাড়তি আগাম প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গেছে। তাদের চোখে-মুখে হাসি, স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।


নওগাঁয় শীত ও কুয়াশার মধ্যেও ইরি বোরো ধান রোপণ শুরু

সারের কৃত্রিম সংকটে কৃষকদের পকেট কাটছে ব্যবসায়িরা
নওগাঁয় প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে চলছে ইরি বোরো রোপণ | ছবি : দৈনিক বাংলা।
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

নওগাঁয় শুরু হয়েছে ইরি-বোরো রোপন। প্রচণ্ড কুয়াশা ও ঠাণ্ডায় নষ্ট হচ্ছে বীজতলা। শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। ঠাণ্ডায় জমিতে চারা রোপণে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া রাসায়নিক সারের কৃত্রিম সংকটে কৌশলে কৃষকদের পকেট কাটছে ব্যবসায়িরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে ইরিবোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা থেকে প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা কৃষি বিভাগের।

শস্য ভাণ্ডার খ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁয় প্রচন্ড শীত ও কুয়াশাকে উপেক্ষা করে চলছে ইরি-বোরো রোপণ। জেলার বিভিন্ন মাঠে মাঠে জমি প্রস্তুত ও রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষক। কাটারিভোগ, জিরাশাইল, ব্রিআর-২৮, সুফলতা ও হাইব্রিড জাতের ধানের চারা রোপন করা হচ্ছে। এ বছর প্রচণ্ড কুয়াশা ও ঠাণ্ডায় বোরো আবাদে জমিতে চারা রোপণে প্রায় ১৫ দিন দেরি হয়েছে। আবার শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকরা জানান- কৃষি কার্ড দিয়ে ডিলারের কাছে সরকারি মূল্যে স্বল্প সার পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। যেখানে একই সময়ে জমিতে সার দিতে হবে, সেখানে কয়েক ধাপে ডিলারের কাছ থেকে সার কিনতে হবে। যা দিতে কোনো কাজেই আসবে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়িদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে।

এবছর কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় চাষাবাদে বেড়েছে খরচ। প্রান্তিক কৃষকরা ধারদেনা করে আবাদের পর ফসল ঘরে উঠার আগেই স্বল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য হোন। তবে মৌসুমের শুরুতে অন্তত ১২শ টাকা মন দাম পেলে লাভবান হবেন তারা।

নওগাঁ সদর উপজেলার হারিয়াগাছী গ্রামের কৃষক হাফেজ মোহসিন আলী বলেন- ইরিবোরো রোপণ থেকে শুরু করে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত বিঘাতে খরচ পড়ে অন্তত ১৬-১৮ হাজার টাকা। ১২ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতোমধ্যে ২ বিঘা রোপণ করা হয়েছে। কৃষি কার্ড দিয়ে ৩ বস্তা সার পেয়েছি। এ মৌসুমে ডিএপি, পটাস ও ইউরিয়া সারের প্রয়োজন অন্তত ২৫ বস্তা। সংকটের অজুহাতে ডিএপি সার বাজার থেকে বস্তাপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়েছে। সারসহ অন্যান্য উপকরণ মিলে বিঘাতে খরচ বেড়েছে অন্তত ১ হাজার টাকা করে।

দুবলহাটি গ্রামের কৃষক এমদাদুল হক দুলাল বলেন, ৩ বিঘাতে ধানের চারা রোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সার পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজার থেকে সার কিনায় আমার ৩ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়েছে। আমরা কৃষকরা সবসময় অসহায়। ফসল ফলাতে খরচ পড়ছে বেশি। আবার বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সার সিন্ডিকেট রুখতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা।

জমুনি গ্রামের কৃষক জালাল হোসেন বলেন- আমাদের এলাক কিছুটা নিচু হওয়ায় আগেই ধান লাগানো শুরু হয়। বছরে একটিমাত্র ফসল। বিঘাতে ৩০-৩৫ মন ফলন হয়। মৌসুমের শুরুতে ১ হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়। অনেকেই ধারদেনা করে আবাদ করতে হয়। তবে শুরুতে ১২শ টাকা মণ দাম হলে সুবিধা হয়।

মান্দা উপজেলার বাঁকাপুর গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন- অতিররিক্ত শীত ও কুয়াশায় চারা হলুদ হয়ে গেছে। কিছু চারা নষ্ট হয়েছে। প্রচণ্ড শীতের কারণে জমিতে চারা রোপণ করতে ১৫ দিনের মতো দেরি হয়েছে। আবার শ্রমিক সংকট থাকায় বিঘাতে ৩০০ টাকা বেশি মজুরি দিয়ে চারা রোপণ করতে হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে মজুরি দিতে আসছেন শ্রমিক জহুরুল হক। তিনি বলেন- গত ১৫ দিন থেকে ৫ জন সদর উপজেলার দুবলহাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ধান লাগানোর কাজ করা হচ্ছে। প্রতি বিঘায় মজুরি নেওয়া হয় ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। তবে প্রন্ডচ শীত ও কুয়াশায় জমিতে নামতে বেলা হয়ে যাচ্ছে। দেরিতে কাজ শুরু হওয়ায় আয়ও কম হচ্ছে।

নওগাঁ সদর উপজেলার বাইপাস এলাকার রাসায়নিক সার ডিলার মেসার্স মজুমদার এন্ড ব্রাদার্স এর ম্যানেজার মনি মজুমদার বলেন- সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা হয়। পটাস ও ইউরিয়া সারের কোন সংকট নেই। তবে বেশকিছু দিন থেকে ডিএপি সারের সংকট রয়েছে। চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন- জেলায় ১০ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে বীজতলা রোপণ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৩০ হেক্টর বেশি অর্জিত হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকুলে না থাকায় বীজতলা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও চারা রোপণে কোনো প্রভাব পড়বে না। এছাড়া কৃষকদের আবহাওয়া বুঝে চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন- চলতি মৌসুমে রাসায়নিক সারের কোন ধরনের সংকট নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণে সারের সরবরাহ রয়েছে। কোন ধরণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয় তার জন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।


সরিষা চাষে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন নরসিংদীর কৃষকরা

এবার উফশী জাতের ৭ হাজার ২৫৮ ও স্থানীয় জাতের ১৭৭ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নরসিংদী প্রতিনিধি

নরসিংদী জেলার সর্বত্র বিভিন্ন গ্রামের মাঠে সরিষা খেতের হলুদ রংঙের ফুল প্রকৃতি প্রেমীকদের মুগ্ধ করেছে। নরসিংদী জেলার কৃষকরা এবার সরিষা চাষে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন।

জেলার ৬টি উপজেলার গ্রাম এলাকায় বর্তমানে হলুদের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায় সেদিকে সবুজের মাঠজুড়ে হলুদ রঙের সরিষার ফুলের হাসি। কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় নরসিংদীতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সরিষার চাষ। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবার অধিক ফলনের আশা করছেন কৃষকরা।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরিষার চাষে খরচ ও পরিশ্রম দুটোই কম হওয়ায় অনেক কৃষক এই ফসল চাষে ঝুঁকেছেন। সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে।

সরিষা বেলে, দো-আঁশ মাটিতে ভালো হয়। সরিষা চাষে প্রচুর রোদ, কম তাপমাত্রা ও জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ও মাটিতে রসের অভাব হলে বীজের আকার ছোট হয় ও বীজে তেলের পরিমাণ কমে যায়। এ জন্য বাংলাদেশে রবি মৌসুমেই সরিষার চাষ করা হয়ে থাকে।

সূত্রটি আরো জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলায় ৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। তম্মধ্যে উফশী জাতের ৭ হাজার ২৫৮ এবং স্থানীয় জাতের ১৭৭ হেক্টর জমি রয়েছে। যা লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় সরিষার চাষ করা হয়।

নরসিংদী জেলার সব উপজেলায় কমবেশি সরিষা উৎপাদন হয়। তবে জেলার নরসিংদী সদর ও রায়পুরা এই দুই উপজেলায় অন্য চারটি উপজেলার চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি জমিতে সরিষা উৎপাদন হয়।

উপজেলা ওয়ারী হিসেবে নরসিংদী সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৪৬ হেক্টর, পলাশে ১৪৫ হেক্টর, শিবপুরে ২৭০ হেক্টর, মনোহরদীতে ৫৪৮ হেক্টর, বেলাবতে ৪০৯ হেক্টর ও রায়পুরায় ২ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের সমারোহ। ফুলে ফুলে ভরে গেছে সরিষার খেত।

শিবপুর উপজেলার ভুরভুরিয়া গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা জানান, আমন ধান কাটার পর জমি কয়েক মাসের জন্য পরিত্যক্ত থাকে ওই জমিতে অতিরিক্ত ফসল হিসাবে সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। ইতোমধ্যে কোনো কোনো খেতে সরিষার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আবার কোথাও ফুল ফুটেছে।

সদর উপজেলার রসূলপুর গ্রামের সরিষা চাষি কাউসার মিয়া জানান, এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ হয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ফলন পাওয়া যায় ৫ থেকে ৭ মণ। প্রতিমণ সরিষার মূল্য ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা।

রায়পুরা উপজেলার ডৌকারচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের চাষি আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, এবার প্রায় ১০০ শতাংশ জমিতে উফশী জাতের সরিষা চাষ করেছি, তবে এ বছর ঘন কুয়াশার কারনে ফলন বেশী ভাল হয়নি। এছাড়া সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার কারনেই এমন অবস্থা হয়েছে। একই গ্রামের সরিষা চাষি মো: ইব্রাহিম সরকার বলেন, আমি বাপ-দাদার আমল থেকে সরিষার চাষ করে আসছি। এ বছর তিনি ২৪ গন্ডা জমিতে সরিষার চাষ করেছেন। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। তিনি জানান, সরিষার তেল খুবই উপকারী-আমি এবং আমার পরিবারের লোকেরা সরিষার তেল ব্যবহার করি। সরিষার তেল মাথায় দিলে চুল পাকেনা। চুল সব সময় কালো থাকে। কিন্তু আমরা সোয়াবিন তেল খেয়ে শরীর নষ্ট করে ফেলেছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. সালাহ উদ্দিন টিপু জানান, সরিষা চাষে কৃষকরা যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তা অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি কৃষি ক্ষেত্রে সরকারের আরও একটি সাফল্য। দেশি জাতের সরিষার ৬০ থেকে ৭০ দিনে এবং উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা উঠতে সময় লাগে ৭৫ থেকে ৮০ দিন।

তিনি আরও বলেন, সরিষার আবাদ বৃদ্ধি হলে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং তেলের আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে।


জয়পুরহাটে শীতকালীন সবজির চারা কোটি টাকায় বিক্রির আশা

* নার্সারিতে চারা চাষে লাভবান হচ্ছেন উদ্যোক্তারা * রবি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
জয়পুরহাট প্রতিনিধি

জয়পুরহাটে নার্সারিতে শীতকালীন চারা চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন কৃষি উদ্যোক্তারা। এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় জেলার চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন জেলাতে।

উদ্যোক্তারা জানান, সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে মানসম্পন্ন সবজি চারা উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনই নার্সারি বাড়লে বেকারত্ব দূর করতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এদিকে এ বিষয়ে বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।

নার্সারি মালিকরা জানান, জেলায় শতাধিক নার্সারি রয়েছে। এই মৌসুমে প্রতিটি নার্সারি ১ থেকে ৪ লাখ টাকা লাভবান হবে। সেই হিসেবে জেলায় এ মৌসুমে কোটি টাকার বেশি চারা বিক্রির তারা আশা করছেন।

জানা যায়, ধান ও আলু চাষে অন্যতম জেলা জয়পুরহাট। তবে অন্যান্য সবজি চাষে পিছিয়ে নেই এই জেলা। এজেলায় চলতি রবি মৌসুমে ৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন বিভিন্ন শাক-সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি উদ্যোক্তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নার্সারিতে গাছের চারার পরিচর্যা করছেন শ্রমিকরা। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নার্সারিতে চাষ করেছেন বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজসহ শীতকালীন বিভিন্ন সবজির চারা। প্রকারভেদে বিভিন্ন চারা প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ১ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন তারা। জেলাজুড়ে প্রায় শতাধিক এমন নার্সারি গড়ে উঠেছে।

এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় স্থানীয়দের পাশাপাশি কিনে নিয়ে যাচ্ছে অন্য জেলা থেকে আসা কৃষকরা। সারা বছরই এ ব্যবসা চললেও শীত মৌসুমে তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কৃষি বিভাগের সহযোগিতার দাবি কৃষি উদ্যোক্তাদের।

সদর উপজেলার গণকবাড়ি এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা খিতিশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘আমি ১৯৭২ সাল থেকে নার্সারিতে চারার ব্যবসা করে আসছি। এবার পেঁয়াজের চারা ১০০ পিস ৫০ টাকা, বাঁধাকপির চারা ১০০ পিস ১০০ টাকা, ফুলকপি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, টমেটো ২০০ টাকা, মরিচ ৩০০ টাকায় বিক্রি করছি। এতে ভালো লাভ হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালীন চারা বেশি বিক্রি হয়।’

একই এলাকার আরেক কৃষি উদ্যোক্তা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, ‘আমার নার্সারিতে বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, মরিচ, লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ ১০ ধরনের চারা রয়েছে। প্রকারভেদে প্রতি পিস চারা ১ টাকা থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। এই চারা জয়পুরহাটসহ অন্যান্য জেলা থেকেও কৃষকরা এসে কিনে নিয়ে যায়। বছরের অন্য সময়টাতে কম বেচাকেনা হয়। তবে শীতকালে বেশি কেনাবেচা হয়। শীত মৌসুমে আমার নার্সারিতে ৩ লাখ টাকার মতো লাভের আশা করছি।’

সদর উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ বলেন, ‘চারার ব্যবসা অনেক লাভজনক। দূর-দূরান্ত থেকে কৃষকরা কিনে যায়। জয়পুরহাটে প্রায় শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে। আমার এখানে কয়েকজন কাজও করে। তবে কৃষি বিভাগ থেকে যদি কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাওয়া যেত তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো। আমরা নার্সারিটা সম্প্রসারণ করতে পারতাম।’

সদর উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বেশ কয়েকটি সবজির চারার নার্সারি গড়ে উঠেছে। এখানে অনেক ভালো চারা পাওয়া যায়। আমরা এখান থেকে চারা কিনে জমিতে চাষ করি। এবার ২০ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ ও ১৫ শতাংশ জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছি।’

নওগাঁ ধামুরহাট থেকে এসেছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘বেগুন ও বাঁধাকপির চারা কেনার জন্য এসেছিলাম। ৫০০ চারা কিনলাম। এখানকার চারার মান অনেক ভালো। ফলন ভালো হয়।’

সদর উপজেলার হেলকুন্ডা গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে ২০০ পিস টমেটো চারা কিনে নিয়ে গেছিলাম। আবার কাঁচামরিচের ১০০ পিস চারা কিনলাম।’

জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এ.কে.এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় এবার ৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। চাহিদা থাকায় এখানকার কৃষি উদ্যোক্তরা নার্সারিতে চারা উৎপাদন করে ভালো আয় করছেন। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে যাতে চারা উৎপাদন করতে পারে, গোড়া পচা রোগ যাতে না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’


গোয়ালন্দে টমেটোর বাম্পার ফলন, ভালো দামে কৃষকের মুখে হাসি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
রাজবাড়ী প্রতিনিধি

রাজবাড়ী জেলায় পদ্মার তীরে বন্যা পরবর্তিতে জেগে ওঠা চরে চাষ করা হয়েছে উন্নত জাতের টমেটো। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম চাষ করা এই টমেটোর এবার বাম্পার ফলন ফলেছে। দামও ভালো পাওয়ায় লাল সবুজ টমেটো হাসি ফুটিয়েছে কৃষকের মুখে। ক্ষেতে উৎপাদিত এই টমেটো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও সঠিক দিক নির্দেশনায় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে টমেটোর ভালো ফলন হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের টমেটো বিউটি প্লাস বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকার মত। হাইব্রিড জাতের টমেটো যেমন বিউটি প্লাস আবাদ করে কৃষকের প্রতি বিঘায় টমেটোর ফলন পাচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ মন করে। এছাড়াও বাজারে টমেটোর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভালো দামও পাচ্ছে কৃষকেরা।

কৃষক শুকুর আলি জানান, এবার মাচা পদ্ধতিতে হাইব্রিড বিউটি প্লাস টমেটো চাষ করেছি ফলন ভালো হয়েছে আর বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি। প্রতি কেজি টমেটো বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। এবার আমি আধুনিক পদ্ধতিতে পাঁচ বিঘা জমিতে হাইব্রিড টমেটো আবাদ করেছি। হাইব্রিড টমেটো আবাদে খরচ কম লাভ বেশি।

আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এ বছরে ৭ বিঘা জমিতে হাইব্রিটি বিউটি প্লাস আগাম জাতের টমেটো আবাদ করেছি এবং ভালো ফলনও হয়েছে। স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে টমেটোর ফলন হচ্ছে প্রায় ১ শত থেকে ১২০ মন করে। দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা অনেক লাভবান হচ্ছে। ক্ষেতের৷ খরচ বাদ দিয়ে এবার অনেক টাকা লাভ হবে আশা করা যাচ্ছে।

গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়াজানি গ্রামের চাষি সোবান শেখ বলেন, ‘এ বছর টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়াও আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করা হয়েছে। আমরা ভালো দাম পেয়ে খুশি।’

গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, চলতি বছরে এই উপজেলায় ২১৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের টমেটো আবাদ হয়েছে এছাড়াও টমেটোর ফলনও ভালো হয়েছে, বাজারে দামও বেশি পাচ্ছে কৃষককেরা।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সেক্স ফরোমোন ফাঁদ দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন, টমেটোর বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই, উন্নত জাত সম্পর্কে ধারণা ও সুষম মাত্রায় সার, কীটনাশক ব্যাবহারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে কৃষক লাভের মুখ দেখছেন। এতে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছেন কৃষকরা।


মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন খোকনের

বছরে ৩০ লাখ টাকা আয়ের আশা
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সদর উত্তর ইউনিয়েনের গাঁয়ের সরু মেঠোপথ ধরে কদমতলী গ্রামে ঢুকলেই দেখা মেলে লতানো সবুজে ঢাকা বিশাল এক বাগান। লাউয়ের মাচাজুড়ে ঝুলে আছে ডজন ডজন ফল। ভোরের আলোয় ঝিলমিল করা শিশিরবিন্দুর মতোই ঝলমল করে ওঠে এই বাগান। আর সেই বাগানেই বাস খোকন মিয়ার।

১৫ বছর আগেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। সংসার টানতে হিমশিম খেতে হতো। মৌসুমি ফসল চাষ করতেন। তবে তার ভরসা ছিল না কোনো নিশ্চয়তা। সিদ্ধান্ত নিলেন লাউ চাষ করবেন মাচা পদ্ধতিতে। শুরুর প্রথম বছরেই মিলল সাফল্য। সেই সাফল্যকে আঁকড়ে ধরে তিনি আজ একজন স্বাবলম্বী কৃষক।

দিন শুরু হয় তার ভোরেই। হাত ভর্তি ঘাম শরীরে সূর্যের উত্তাপ আর মনোযোগের সাথে একের পর এক লাউয়ের পরিচর্যা। তার পাশে সমানতালে কাজ করেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। শুধু লাউ নয় চাষ হচ্ছে জীবনযুদ্ধ জয়ের গল্পও।

বর্তমানে তিন বিঘা জমিতে লাউ চাষ করছেন তিনি। এই ফসলই তার আয়ের প্রধান উৎস। খোকন জানান, বছরে এখান থেকেই সব খরচ বাদে আয় হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, তিনি আরও ১০ বিঘা জমি প্রস্তুত করছেন। তার আত্মবিশ্বাস একই পদ্ধতিতে পুরো বছরই চাষ করলে আয় হবে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।

পাইকারি বিক্রি নয় লাউ তুলে নিজেই বাজারে নিয়ে যান খোকন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে তার দোকানে। ক্রেতারা বলেন, টাটকা আর সুস্বাদু খোকন মিয়ার লাউ। লাউ গাছ প্রকৃতির কাছে একটু বেশিই সহজ-সরল। রোগ কম কীটপতঙ্গও তেমন আক্রমণ করে না। ফলে খরচও হয় কম। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা জানান, উপজেলায় প্রতি বছর বাড়ছে লাউয়ের বাণিজ্যিক আবাদ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা বলেন, খোকনের লাউ বাগানে তারা নিয়মিত পরামর্শ দেন। উন্নত বীজ ও সার দিয়ে চাষাবাদে সহায়তাও করেছে কৃষি বিভাগ। তিনি আরও জানান, এবার উপজেলায় ১২০ একর জমিতে লাউয়ের আবাদ হচ্ছে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২ কোটি টাকার উপর।


ভেড়ামারায় তুলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে

*বীজ বপনের ৬ মাস পর সংগ্রহ করা যায় তুলা *এ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪৭ হেক্টর জমি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৪৭ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করা হয়েছে। এ অঞ্চলে দিন দিন তুলা চাষ অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তুলা গাছে ব্যাপক ফলন দেখে বোঝা যাচ্ছে খরচের তুলনায় এবার কৃষকের কয়েকগুণ বেশি মুনাফা হবে। বেশ কয়েক বছর ধরে কম খরচে বেশি মুনাফার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে তুলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে বলে জানা গেছে।

ভেড়ামারা কটন ইউনিট কর্মকর্তা মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, হোয়াইট হোল্ড-১, হোয়াইট গোল্ড-২, রুপালী-১, ডিএম-৪, সিবি-১ হাইব্রিড ও বিটি কটন, উফশী জাতের তুলা চাষ করা হয়েছে। উচ্চফলনশীল তুলার এ জাতগুলো প্রতি বিঘায় ১৬-২০ মণ হারে ফলন হয়।

এ উপজেলায় চলতি বছরে ১৪৭ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রদর্শনী ও কৃষকের নিজ অর্থায়নে চাষ করা হয়েছে। ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পাওয়ায় আগামীতে চাষির সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় কৃষকরা। তুলা গ্রীষ্মকালীন ফসল। মে মাসের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে জুনের প্রথমাংশ পর্যন্ত জমিতে তুলা বীজবপন করতে হয়। বীজ বপনের ৬ মাস পর তুলা সংগ্রহ করা যায়। তুলা চাষ ছড়িয়ে দিতে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন প্রকল্প কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে সরকার।

ভেড়ামারা উপজেলায় কম পুঁজিতে নামমাত্র শ্রমে ও সরকারি সহযোগিতায় তুলা চাষের পরিমাণ ও চাষির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাদের উৎপাদিত তুলা সরাসরি তুলা উন্নয়ন বোর্ড ন্যায্য দামে কিনে নেয়। ফলে কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় তুলাতে অধিক লাভবান হচ্ছেন। সরকারি সহায়তায় কৃষকরা সিবি-১২ এবং হাইব্রিড প্রজাতির রুপালি-১ জাতের তুলার চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হওয়াতে এ বছর কৃষকের আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তবে কিছু কিছু খেতে এসিট, জেসিট, আমেরিকান বোলওয়ার্ম, স্পটেট বোলওয়ার্ম ও আঁচা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছিল। এতে তুলা চাষিরা কীটনাশকের বদলে ফেরোম্যান ফাঁদ ও পার্চিং পদ্ধতিতে বেশ উপকার পেয়েছেন। কৃষকেরা গত বছর বীজ তুলার দাম পেয়েছিল মণ প্রতি ৪ হাজার টাকা, প্রতি কেজি ১শত টাকা। কৃষকদের তুলা চাষে সরকার বিনামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রদান করে থাকেন। এর মধ্যে তুলা প্রদর্শনীসহ প্রণোদনাও দিয়ে আসছে।

হাসান আলি নামে একজন কৃষক জানান, বর্তমানে তুলা চাষ করে তিনি লাভবান হচ্ছেন। তিনি তার ৪ বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে তুলা চাষ করেছেন। তার আশা এ বছর তিনি ভালো মুনাফা পাবেন। তুলা চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ালে অনেক অনুর্বর, নিস্ফলা বা অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ করে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব।

মসলেম উদ্দিন জানান, নিস্ফলা জমিতে তুলা চাষ করায় একদিকে যেমন জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকরা বেশ টাকা পাচ্ছেন, তাদের পরিবারে আসছে স্বচ্ছলতা। তাই অনেকে ধান ও গমসহ বিভিন্ন আবাদ ছেড়ে তুলা চাষে আগ্রহী হয়েছেন।

তুলা চাষিরা জানান, রুপালী-১, হোয়াইট গোল্ড-১, হোয়াইট গোল্ড-২, ইস্পাহানি শুভ্র-৩, লালতীর ডিএম-৪, সিবি-১, উফশী, বিটি তুলা জাতের তুলা প্রতি বিঘাতে বীজসহ উৎপাদন হয় ১৫ মণ থেকে ২০ মণ করে। যার বর্তমান বাজার মূল্য কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। এমন অনুর্বর জমিতে অন্য কোনো ফসলে এই লাভ পাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আবার একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন শাক-সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ করেও বাড়তি আয় করা যায় বলে অনেক চাষি তুলা চাষের দিকে মনোনিবেশ করছেন। স্বল্পপুঁজি ও স্বল্প পরিশ্রমে তুলা চাষে অনায়াসে লাখপতি বনে যাওয়া যায় বলে অনেক কৃষকের সাথে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন।

তুলা চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভেড়ামারা উপজেলার কৃষকরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন, এমনটাই কৃষি সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।


দৌলতপুরে ফুলকপি চাষ করে কৃষকের বাজিমাত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

শীতকালীন সবজি বাঁধাকপি ও ফুলকপি, সবজি খ্যাত কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুরের বেশ কয়েকটি এলাকায় এ সবজির চাষ করছেন কৃষকরা। প্রাকৃতিকভাবে মাটি উর্বর হওয়ায় বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষে সফলতা পেয়েছেন এ উপজেলার চাষিরা।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব কপি চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে কপি বিক্রি করে লাভ হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি বিঘা কপি চাষ করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘা জমির কপি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে বাঁধাকপি ও ফুলকপির চাহিদা বেশি হওয়ায় বাজারে দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। তাই লাভও বেশি।

উপজেলার গরুড়া গ্রামের বাসিন্দা মহি উদ্দিন বলেন, ‘শীতে আগাম জাতের ৭ বিঘা জমিতে বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষ করেছেন তিনি। এর মধ্যে ২ বিঘা জমির কপি বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার। আরও ৫ বিঘা কপি বিক্রির উপযোগী হয়নি।’

এ কৃষক আরও বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘাতে লাভ হবে ৫০ হাজার টাকা।’

আমিরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘৭ বিঘা জমিতে বাঁধাকপি এবং ফুলকপি চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল বিঘাপ্রতি ৩০ হাজার টাকা। বিক্রি করেছি সাড়ে ৩ বিঘা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এখনো সাড়ে ৩ বিঘা কপি আছে, বাজার দর ভালো, ভালো দামের আশা করেন তিনি।’ একই এলাকার কৃষক সামিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে তামাক চাষ করতাম, কপি অনেক লাভজনক আবাদ ‘২ বিঘা কপি লাগিয়েছি। ১ বিঘা বিক্রি করেছিলাম ৮০ হাজার টাকায়। আড়ায় থেকে ৩ মাসের আবাদ শীতের মৌসুমে ভালো হয়।’

এদিকে উপজেলার ধর্মদহ গ্রামের ওবাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ৩ বিঘা ফুলকপি লাগিয়েছি, তাতে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে বিঘা প্রতি ৩৫ হাজার টাকা লাভ হবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, ‘এ বছর দৌলতপুরে শীতকালীন কপির চাষের লক্ষ মাত্রা ৩৪২ হেক্টর জমিতে তা পূরণ হয়েছে ২৬০ হেক্টর জমি। চাষিদের শীতকালীন কপি চাষে উদ্বুদ্ধকরণ, পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানান কৃষি বিভাগ।

প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে দৌলতপুরে সবজি চাষ তাতে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে কৃষকরা বলে জানান এই কর্মকর্তা।


বস্তায় আদা চাষে স্বপ্ন বুনছেন ভালুকার আক্তার হোসেন

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ভালুকা (ময়মনসিংহ)

ময়মনসিংহের ভালুকায় কৃষি খেতে যুক্ত হয়েছে নতুন উদ্ভাবনী ধারা। হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও আওলাতলী এলাকার প্রবাস ফেরত কৃষক মো. আক্তার হোসেন বস্তায় আদা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। প্রচলিত কৃষিপদ্ধতি বদলে বস্তায় আদা চাষের মাধ্যমে তিনি যেমন অভাবনীয় সফলতার মুখ দেখেছেন, তেমনি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও।

দেশে ফিরে ব্যবসার পাশাপাশি নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই আক্তারের এ উদ্যোগ। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে প্রথমবারের মতো তিনি শুরু করেন বস্তায় আদা চাষ। চলতি মৌসুমে ৪০ শতক জমিতে মোট ৫ হাজার ৫০০ বস্তায় আদা লাগিয়েছেন তিনি। প্রতিটি বস্তায় খরচ পড়েছে মাত্র ৩৪-৩৫ টাকা। বাজারদর কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা হলে প্রতি বস্তায় গড়ে ১ কেজি আদা পেলেই সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।

পদ্ধতিটির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী কৃষি কর্মকর্তারাও। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বস্তায় চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়, পানি জমে পচনের ঝুঁকিও নেই। ফলে জমির চেয়ে এ পদ্ধতি বেশি নিরাপদ ও লাভজনক।’

এরই মধ্যে বস্তায় আদা চাষ ভালুকায় নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আক্তারের সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক কৃষক নিজ বাড়ির ফাঁকা জায়গা কিংবা অল্প জমি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুসরাত জামান জানান, ‘চলতি বছর ভালুকা উপজেলায় মোট ৮৪ হাজার বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা- জায়গা কম লাগে, খরচ কম, রোগবালাইও কম। ঘরোয়া পরিবেশেও সহজে চাষ করা যায়। তিনি আরও জানান, যারা বস্তায় আদা চাষে আগ্রহী, তাদের জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’


জয়পুরহাটের কৃষকের নতুন আশা পানিফল

৬ হাজার টাকা ব্যয় করে আয় ৬০ হাজার
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
জয়পুরহাট প্রতিনিধি

জয়পুরহাট জেলার গ্রামীণ এলাকাগুলোর পতিত জলাভূমি ও আমন মৌসুমে ডুবে থাকা নিচু জমিতে এখন ব্যতিক্রম এক চাষাবাদ চলছে। ডুবে থাকা এসব জমিতে চাষ হচ্ছে পুষ্টিগুণে ভরপুর প্রাকৃতিক ফল ‘পানিফল’।

জেলার গতনশহর, পারইল, মীর্জাপুর, ধরঞ্জিসহ আশপাশের এলাকায় এ ফল চাষ হচ্ছে। জলাশয়ে ভাসমান সবুজ পাতার নিচে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে বাদামি কিংবা কালচে বর্ণের এই ফল। খরচ কম, ফলন ভালো, বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। সব মিলিয়ে পানিফল এখন জয়পুরহাটের কৃষকের নতুন আশার নাম।

মাত্র তিন মাস সময়কালের এই ফল চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এখানকার কৃষকরা। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। কৃষকরা জানিয়েছেন, নিচু জমিতে আমন মৌসুমে পানি জমে থাকায় তারা এ বিকল্প চাষ বেছে নিয়েছেন। বিঘাপ্রতি মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা খরচ করে ৪৫ থেকে ৫০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা।

গতনশহর গ্রামের চাষি বাবুল হোসেন বলেন, ‘এবার প্রায় ২ বিঘা জমিতে পানিফলের চাষ করেছি। আগে এই জমিগুলো জলাবদ্ধ অবস্থায় ফাঁকা পড়ে থাকত। এখন পানিফলের চাষ করে প্রতিদিন বাজারে ৫০-৬০ কেজি বিক্রি করছি। প্রতি কেজির পাইকারি দাম ২৫-৩০ টাকা, খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এটি চাষে তেমন সার-কীটনাশক লাগে না, শুধু জলাশয় ও যত্ন থাকলেই ফলন ভালো হয়।’

পানিফল চাষে শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারী উদ্যোক্তাও এগিয়ে আসছেন। রোকসানা বেগম বলেন, ‘সকালবেলা পুকুরে নেমে ফল তুলি, বিকেলে বাজারে বিক্রি করি। এতে সংসারের খরচ কিছুটা হলেও চালাতে পারছি।’

স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান জানান, ‘আমার আবাদযোগ্য জমি না থাকলেও এখান থেকে পাইকারি কিনে খুচরা বিক্রি করি। তাতে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা লাভ করি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এ কে এম সাদিকুল ইসলাম জানান, ‘জয়পুরহাট জেলায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে পানিফলের চাষ করা হয়েছে। এখনো সীমিত পরিসরে হলেও এর সম্ভাবনা বিশাল। আমরা সরকারি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছি। চাষিদের সময়মতো পরামর্শ দিচ্ছি।’

পানিফল শুধু চাষিদের জীবিকা নয়, একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আল মামুন জানান, ‘পানিফল শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে, টক্সিন দূর করে, হজম শক্তি বাড়ায়। এতে রয়েছে- ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, এন্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন- সি ও বি-১২ ও আয়রন। যা হাড় ও রক্তে পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায় এবং পেটের গ্যাস-অম্বল দূর করে।


আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত তাহিরপুরের কৃষক

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

অধিক লাভের আশায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে তাহিরপুর উপজেলার কৃষকদের মধ্যে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ও অনিয়মিত বৃষ্টির প্রভাব পড়লেও থেমে নেই কৃষকদের শীতকালীন সবজি চাষ। উপজেলার উঁচু জমিতে নানা জাতের সবজির চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। সরজমিন দেখা গেছে, কেউ জমি তৈরি করছেন, কেউ চারা রোপণে ব্যস্ত, কেউবা আগাছা পরিষ্কার ও কীটনাশক স্প্রে করছেন। এক কথায়, আগাম বাজার ধরার আশায় এখন মাঠে মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাহিরপুর কৃষকরা। এ অঞ্চলের কৃষকরা মুলা, শিম, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, পালংশাক, করলা, লাউ, কাঁচামরিচ, ঢেঁড়স ও গাজরসহ নানা জাতের সবজি চাষ করছেন। শুধু পরিবারের প্রয়োজন মেটানো নয় বাণিজ্যিকভাবে এসব সবজি চাষ হচ্ছে। আগাম মৌসুমে সবজি বাজারে তুলতে পারলে বিভিন্ন অঞ্চলে তা পাঠানো হবে বলে জানান কৃষকরা।

জানা গেছে, আগাম ফসলের চাহিদা ও দাম দুই-ই বেশি থাকে। ফলে মুনাফাও বেশি হয়। উঁচু জমি পানি না জমায় ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো সবজি চাষের জন্য উপযুক্ত। অল্প সময়ে কম খরচে অধিক লাভ পাওয়ায় এসব ফসলে ঝুঁকছেন তারা।

বাদাঘাট ইউনিয়নে এলাকার রকমতপুর গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, প্রতি বছরই আমরা আগাম শিম ও অন্যান্য সবজি চাষ করি। এবারও এক বিঘা জমিতে শিম চাষ করছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে।

বিন্না কুলি গ্রামের সোহেল বলেন, আগাম চাষে লাভ বেশি হয়। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন সম্ভব। এখন আমরা জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করছি ফলে সবজির গুণগত মান ভালো, চাহিদাও বেশি।

উত্তর বড় দল ইউনিয়নের বারওয়াল গ্রামের শিম চাষি জয়নাল জানান, এখন বাজারে শিম বিক্রি করছি পাইকারি প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। এ দামটা আগাম মৌসুমেই পাওয়া যায়। চরাঞ্চল বোরচর এলাকার কৃষকরাও জানান, শীতের আগে সবজি তোলা গেলে বাজারে দাম থাকে ভালো, তাই সবাই এখন ব্যস্ত আগাম ফসল তুলতে।

কৃষক রহিম বলেন, বাজার ধরতে আমরা এবার আগেভাগেই ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর চারা রোপণ করেছি। প্রায় সাড়ে এক একর জমিতে ১৫-১৮ হাজার চারা রোপণ করা হবে। প্রতিটি চারার খরচ আট থেকে দশ টাকা। তিন মাসের মধ্যে বিক্রি হবে প্রতি কপি ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায়। আশা করছি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় হবে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, গত বছর উপজেলায় প্রায় ১,৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন সবজি চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৪৫ হেক্টরে পৌঁছেছে। জমিতে আগাম রবি ১৯/২০ জাতের সবজি চাষ সম্পন্ন হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পর থেকেই কৃষকরা আগাম শীতকালীন বিভিন্ন সবজির আবাদ শুরু করেছেন। এখন বাজারে এসব সবজি উঠছে এবং কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। আগাম চাষে কিছুটা ঝুঁকি থাকে, তবে আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, সুষম সার ব্যবহারে ও কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।


খিরা চাষে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ৪শত হেক্টর জমিতে খিরার আবাদ হয়। এ উপজেলার উত্তর এলাকায় খিরার জন্য বেশ সমৃদ্ধ। এছাড়াও অন্যান্য ইউনিয়নে কম বেশি খিরার আবাদ হয়ে থাকে। এখানকার উৎপাদিত খিরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা কিনে নিয়ে যায়। মূলত ঢাকা, চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনপ্রিয় এখানকার খিরা। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, অসময়ে বৃষ্টির কারণে অনেক নিচু জমি প্লাবিত হওয়ায় খিরার ফলন এ বছর কিছুটা কম হবে।

তিন মাসের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। স্বল্প সময়ে অধিক ফলনে আর্থিকভাবে কৃষক হয় লাভবান। তবে বর্তমানে খিরা উৎপাদনে বীজ ও সারের দাম বাড়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে কৃষক। তবে দিনদিন বাড়ছে খিরার আবাদ। উপজেলার অন্যতম পাইকারী খিরার বাজার দাউদকান্দি সদরের পুরাতন ফেরীঘাটে অবস্থিত। খিরার মৌসুমে বাজারটি সন্ধ্যার পর জমজমাট হয়ে ওঠে। কৃষক, আড়তদার আর পাইকারদের পদচারণায় বাজারটি হয়ে উঠে সরগরম।

সরেজমিনে দেখা যায়, জমিতে কৃষকরা পার করছেন ব্যস্ত সময়। কেউ মাটি নরম করছেন কেউ মনোযোগী গাছের পরিচর্যায়। কৃষক মো. সোলায়মান কয়েক বছর ধরে সফলভাবে খিরা চাষ করছেন। এবছরও তিনি সাত কানি জমিতে খিরা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত বছরের মতো এবারও ভালো ফলনের আশা করছি। আগের বছরের চেয়ে এবার বেশি খিরা তুলতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

উপজেলার উত্তর ইউনিয়েনের শাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত বাড়ছে উৎপাদন খরচ। ফলে কমছে লাভের হার। যদিও নানা সমস্যা আছে, তবু তিনি মনে করেন সঠিক পরিচর্যা করলে খিরা চাষে লাভবান হবে। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিন পর ফসল ওঠা শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা বলেন, প্রতিবছর দাউদকান্দির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে খিরা চাষ হয়ে থাকে। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কারণে দাউদকান্দির উত্তরাঞ্চলের অনেক জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। ফলে এবার কিছুটা কম চাষাবাদ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


শেকড় প্রযুক্তি: নগরায়ণের চাপে নতুন আশার আলো

*ছাদবাগানে স্বল্প খরচে দ্বিগুণ ফলন *নতুন চাষ প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে কৃষিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
যশোর প্রতিনিধি

কাঠ ও কংক্রিট দিয়ে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে ২২টি বেড। প্রতিটি বেড ৪ ইঞ্চি পরিমাণ মাটি দিয়ে ভরাট করা। তাতে লাগানো হয়েছে লাউ, শিম, কুমড়া, বরবটি, বাঁধাকপি, পেঁপে, কাঁচামরিচসহ ২২ ধরনের সবজি। শুধু সবজি নয়, এই চার ইঞ্চি বেডেই রোপণ করা হয়েছে পেয়ারা, জলপাইসহ নানা ফলদ গাছ। এগুলো থেকে সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ফল সংগ্রহ করা হচ্ছে নিয়মিত। যা পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বাজারে।

বলছিলাম যশোর সদর উপজেলার হামিদপুরের বাসিন্দা কৃষিবিদ ইবাদ আলীর ছাদবাগানের কথা। তিনি নিজের ছাদে গবেষণার মাধ্যমে চাষ করে সফলতা পেয়েছেন।

নাম দিয়েছেন ‘শেকড় প্রযুক্তি। তার এ সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতোমধ্যে আশপাশসহ সারাদেশে এ প্রযুক্তিতে প্রায় এক হাজার ছাদবাগান গড়ে উঠেছে। এই শেকড় প্রযুক্তিতে শুধু ছাদে নয়, জলাবদ্ধ এলাকা ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ করেও লাভবান হওয়া সম্ভব বলে দাবি প্রায় চার বছরের গবেষণায় সফল হওয়া এই কৃষিবিদের।

কৃষিবিদ ইবাদ আলী পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি শুধু গবেষক নন, বরং একজন স্বপ্নবুননকারী। স্থানীয় সরকার বিভাগের চাকরির ব্যস্ততা সামলে তিনি ছাদে, মাটিতে, আর বইয়ের পাতায় এক নতুন কৃষি দর্শন গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি তিনি শেকড় প্রযুক্তি নিয়ে একটি বইও লিখেছেন, যাতে ছাদকৃষি করতে ইচ্ছুক মানুষ সহজেই তার পদ্ধতি শিখে নিতে পারে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইবাদ আলীর বাড়ির ছাদ যেন দিগন্তজোড়া সবজি খেতে পরিণত হয়েছে। মাচায় ঝুলছে লাউ, বরবটি ও কুমড়া। বাঁধাকপির পাতা বাঁধতে শুরু করেছে। ফলন হয়েছে কাঁচামরিচের। নিজের উদ্ভাবিত শেকড় প্রযুক্তিতে ২২ ধরনের সবজি ও ফল চাষ করেছেন তিনি।

কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, গাছের শেকড়ই ফসলের প্রাণ। শেকড় বুঝতে পারলেই গাছকে বোঝা যায়। এই বিশ্বাস থেকেই এসেছে ‘শেকড় প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে গাছের শেকড়ের গঠন ও বিন্যাস অনুযায়ী মাটি, পানি, বায়ু, আলো ও খাবারের (সার) সঠিক ব্যবহার হয়। গাছ মাটির অগভীর অঞ্চল থেকে খাবার গ্রহণ করে। গাছ সাধারণত সমবায় পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করে। কিছু গাছের শেকড় মাটির অগভীর অঞ্চল থেকে মূল রোমের মাধ্যমে খাবার নেয়। সাধারণত মূল রোমের সংখ্যা উৎপাদনের সমানুপাতিক। মূল রোমের সংখ্যা যত বেশি হবে, ফসল উৎপাদন তত বেড়ে যাবে। মূল রোমের সংখ্যা বৃদ্ধি করার উপায় হলো পাশে স্পেস বা জায়গা বাড়ানো এবং পরিমিত খাবার, পানি সরবরাহ।

শেকড় প্রযুক্তির মূল কথা হলো- সবজি বীজ বা চারা বেডে রোপণ করতে হবে। ফলের চারা চ্যানেল সিস্টেমে রোপণ করতে হবে। ড্রামে বা টবে রোপণ করা যাবে না। সবজির জন্য মাটির গভীরতা ৪ ইঞ্চি হতে হবে (৬ ফুট বাই ৩ ফুট মাটির গভীরতা ৪ ইঞ্চি) এবং ফলের জন্য মাটির গভীরতা ১০ ইঞ্চি। ফলের টবের ব্যাস কমপক্ষে ৩ ফুট। ফর্মুলা অনুযায়ী মাটিতে সব ধরনের খাদ্যপ্রাণ মেশাতে হবে। পরিমিত সেচ নিয়মিত দিতে হবে। ফলের গাছে চ্যানেল আকারে রোপণ করতে হবে। যে গাছের শেকড়ের জন্য যতটুকু মাটি প্রয়োজন, সেই পরিমাণ মাটি ব্যবহার করতে হবে। একটুও কম বা বেশি নয়। এই পদ্ধতিতে প্রতি বর্গফুট জায়গায় ১২ কেজি মাটি লাগে।

তিনি বলেন, ১৮ বর্গফুটের বেডে ৩ দশমিক ৫ বস্তা মাটি লাগে। যার ওজন ১৫৪ কেজি। একটি সাধারণ ড্রামের মাটির সমান। একই মাটি ব্যবহার করে ছাদে ১০ গুণ বেশি ফসল ফলানো সম্ভব। বেডগুলো সুন্দর করে সাজাতে পারলেই ছাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। হাঁটার জন্য অনেক ফাঁকা জায়গা থাকে। পুষ্টির প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে সবজি ও মসলা থেকে, যা ড্রামে বা টবে চাষ করা সম্ভব নয়। ড্রাম বা টব পদ্ধতিতে খরচ বেশি। সে অনুযায়ী উৎপাদন কম। শেকড় প্রযুক্তিতে ফল বা সবজি রোপণ করলে ফলন দ্বিগুণ হয়।

কৃষিবিদ ইবাদ আলী বলেন, গতানুগতিক ছাদ কৃষিতে লাভ কম, খরচ বেশি। আমার উদ্ভাবিত শেকড় প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী খরচে কম জায়গায় বেশি উৎপাদন হচ্ছে।

ইবাদ আলীর শেকর প্রযুক্তি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাদবাগান করা প্রতিবেশী খায়রুল ইসলাম বলেন, শেকড় প্রযুক্তিতে আমিও ছাদবাগান করেছি। পাশাপাশি টবেও সবজি লাগিয়েছিলাম। তবে ইবাদ আলী ভাইয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে তুলনামূলক ভালো ফলন পেয়েছি।

ইবাদ আলীর স্ত্রী পাপিয়া সুলতানা বলেন, শেকড় পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবেও ছাদবাগান করা সম্ভব। এতে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, ইবাদ আলী শেকড় প্রযুক্তিতে পরিকল্পিতভাবে বাড়ির ছাদে সবজি চাষ করেছেন। তার নতুন চাষ প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে কৃষিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। যদি তার শেকড় প্রযুক্তি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরেও মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর সবজি উৎপাদন করতে পারবে।

মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ভবদহের মতো জলাবদ্ধ এলাকাতেও ভাসমান শেডে এই পদ্ধতিতে চাষ সম্ভব। যে দেশ প্রতিদিন মাটি হারাচ্ছে নদী ও নগরায়ণের চাপে, সেখানে ইবাদ আলীর শেকড় প্রযুক্তি যেন এক নতুন আশার আলো।


banner close