শীতের শেষ প্রান্তে ঘন কুয়াশা, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা আর মাঝে মাঝে মিষ্টি রোদ-সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে বোরো চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কৃষকরা। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চলছে বোরো আবাদের কর্মযজ্ঞ। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই লাঙল–কাস্তে হাতে ফসলের মাঠে নেমে পড়ছেন তারা।
গত মৌসুমে ধানের ভালো দাম পাওয়া এবং বাজারে সার, তেলসহ কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় চলতি মৌসুমে বোরো চাষে কৃষকদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে বোরো চাষ হবে।
সাতকানিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় মোট ৭ হাজার ৩শ ৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৩শ ৮৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি জমিতে চারা রোপণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
হাইব্রিড ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ প্রণোদনা হিসেবে বিনামূল্যে পাঁচ হাজার কৃষককে উন্নত জাতের হাইব্রিড বীজ ও সার সরবরাহ করেছে।
সরেজমিনে উপজেলার ছদাহার ৩ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, পিচঢালা সড়কের পাশের জমিতে সবুজ ধানের কচি চারার গালিচা। এক পাশে সারিবদ্ধভাবে ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষি শ্রমিকরা। কোথাও গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ চলছে, কোথাও ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। আবার কোথাও বীজতলা থেকে চারা তোলা হচ্ছে রোপণের জন্য।
চারা তোলা ও রোপণের ব্যস্ততায় কৃষকদের গায়ে শীতের পরশ যেন লাগছে না। মাঠের পর মাঠে নিরবচ্ছিন্ন শ্রম আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে একটাই লক্ষ্য—ঘরে তুলতে হবে বোরো ধান।
ছদাহার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, “এবার ২৫ কানি জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। প্রতি কানি জমিতে চাষ শেষ করতে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো আছে। উন্নত মানের বীজ, সার ও কীটনাশক সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হলে খরচ আরও বেড়ে যাবে।”
তিনি জানান, প্রতিদিন ১০–১২ জন কৃষি শ্রমিক মাঠে কাজ করছেন। প্রচণ্ড শীতের কারণে সকাল বেলায় শ্রমিকরা কাজে নামতে দেরি করছেন। উপজেলায় শ্রমিক সংকট থাকায় অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, বাজালিয়া বড়দুয়ারা গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, “প্রায় এক একর জমিতে বোরো চাষ করছি। প্রতি কানি জমিতে চাষ শেষ করতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, “গত আমন মৌসুমে সাতকানিয়ায় ১১ হাজার ৮শ ৭৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি, মোট ৩৭ হাজার ৮শ ৫৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়।
তিনি বলেন, “চলতি মৌসুমে হাইব্রিড ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল এই জাতের ধানে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রায় ৬ মেট্রিক টন এবং জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন।
তিনি আরও জানান, বাজারে ইউরিয়া, ফসফেট, টিএসপি, পটাশসহ সব ধরনের সার ও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। ফলে বোরো মৌসুমে কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর এলাকায় বরই চাষ করে গত ১৭ বছর ধরে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আজাদুর রহমান। কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত তার বাগানের বরই এখন স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক যুবক এখন বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
আজাদুর রহমান কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের শ্রীসূর্য নয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মো. আব্দুল জব্বারের ছেলে। মাস্টার্স পাস করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে তার বাগানে থাই আপেল কুল, বাউকুল, জাম্বুকুল ও ঢাকা-৯০, টক মিষ্টি কুল, জাতের বরই চাষ হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা বাগানের প্রতিটি গাছ ফলভারে নুয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-৯০ জাতের বরইয়ে গাছগুলো ছেয়ে আছে। ফলের ভার সামলাতে প্রতিটি গাছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পুরো বাগানটি জাল দিয়ে ঘেরা। প্রতিদিন বরই সংগ্রহ ও বিক্রির কাজে মুসলিমসহ ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
আজাদুর রহমান জানান, ‘প্রতি বছর বরই ও ফুলগাছের চারায় প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি আয় করছেন ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল জাতের বরই চাষ করে তিনি বেশি লাভবান হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল প্রতি কেজি ১০০ টাকা এবং বাউকুল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন তার বাগান থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি বরই সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ৮ একর জমিতে বরই চাষ করতে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছি। বাগানে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই আছে। বরই চাষে অল্প সময়েই লাভবান হওয়া যায়। বরই বিক্রির পাশাপাশি কলম চারা তৈরি করি। বিভিন্ন ফল ও ফুলের চারাও বিক্রি করছি।’
বরই বাগান দেখতে আসা মৌলভীবাজার সদর থেকে আগত মামুন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে আসছেন। আমরাও ১০ কেজি বরই নিয়েছি। বরইগুলো খুবই সুস্বাদু। আজাদুর রহমান ভাই এই বাগান করে স্বাবলম্বী হয়েছেন, যা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
বরই কিনতে আসা স্থানীয় শিক্ষার্থী নাজমিন বলেন, ‘শমশেরনগর বিমান ঘাঁটি এলাকার বরই খুবই মজাদার। তাই অনেক দূর থেকে বরই কিনতে এসেছি। ৫শত টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫ কেজি বরই নিয়েছি।’
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষিবিদ জয়েন্ত কুমার রায় জানান, ‘চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে বরই আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় বরইয়ের ফলন ভালো হয়েছে। শমশেরনগরে আজাদুর রহমানের বাগানের বরই খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। তার বাগান দেখে অনেক বেকার যুবক বরই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কৃষকরা নিজেরাই ভালো জাত নির্বাচন করে রোপণ করছেন, ফলে ফলনও ভালো হচ্ছে। বরই চাষে আজাদুর রহমানের এই সাফল্য এখন শুধু একটি বাগানের গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে কমলগঞ্জের কৃষি সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এদিকে, অষ্টেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল বরই চাষ করে ভাগ্য বদল হয়েছে প্রবাসী আব্দুস সালামের। তার বাড়িও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। প্রবাসী আব্দুস সালাম সম্প্রতি বলেন, ইউটিউব দেখে উৎসাহিত হয়ে মেহেরপুর জেলা থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ১৬০টি চারা কুড়িয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আনেন। পরে ১০টি চারা মারা যায়, তারপর ১৫০টি ছাড়া নিয়ে তার বাড়ির পাশে পরিত্যাক্ত ২৫ শতাংশ জমিতে এই অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল কুল বরই চাষ শুরু গ্রহণ করেন। প্রায় ৮ মাসের মাথায় সবকটি গাছেই বরই আসতে শুরু করে। তার বরই চাষে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। আর এখন প্রতি সপ্তাহে অনলাইনে বড়ই বিক্রয় করেন ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার। দিন যতই যাচ্ছে ততই তার বরইয়ের চাহিদা বাড়ছে। তার এই বরই বাগান দেখে আগ্রহী হচ্ছে উপজেলার অনেক ছাত্র ছাত্রী, যুবক ও কৃষকরা।
জানা যায়, উপজেলার কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের কুমড়াকাফন গ্রামের কৃষক আব্দুল খালিকের ছেলে আব্দুস সালাম, জীবিকার তাগিদে ভাগ্য বদলের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে গিয়েছিলেন বিদেশ। বিদেশ যাওয়ার পর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন কাজ করতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে যান। প্রায় তিন বছর পর বাংলাদেশ রিয়াদ এম্বেসির মাধ্যমে খালি হাতে দেশে ফিরে আসেন আব্দুস সালাম।
স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে যশোরের কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন বিলে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে সেচপাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করে বোরো ধানের চাষ হয়ে আসছে। চলতি মৌসুমে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রধান নদ-নদী ও খাল পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে হঠাৎ করে সেচ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে উপজেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বরুনার বিলসহ প্রায় অর্ধশত বিলে বোরো আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য শহরে মাইকিং করা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সেচপাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথচ অনেক বিলে এখনো এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে জমি প্রস্তুত করতে না পারায় শত শত কৃষক চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। জানা গেছে, এ উপজেলার বর্ষার অতিরিক্ত পানি বুড়িভদ্রা, হরিহর ও আপারভদ্রা নদী হয়ে হরি নদীতে নিষ্কাশিত হয়। দীর্ঘদিন পলি জমে নদী ও খালের নাব্যতা কমে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক ও ঘের মালিকদের যৌথ অর্থায়নে এতদিন সেচপাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করে বছরে একমাত্র ফসল হিসেবে বোরো আবাদ করা হতো।
সরকার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে হরি নদীসহ প্রধান নদ-নদী ও খালের প্রায় ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। গত ২৬ অক্টোবর এ প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করা হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছর ৩০ পৌষের মধ্যে পানি নিষ্কাশনের শর্তে জমি ঘের মালিকদের কাছে লিজ দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী এবারও ঘের মালিকরা সেচ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে হঠাৎ করে সেচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখনো অর্ধশতাধিক বিলে পানি রয়ে গেছে।
পশ্চিম সারুটিয়ার বরুনার বিলের ঘের মালিক মেজবাহ উদ্দীন মিল্টন জানান, তার প্রায় ৪০০ বিঘা জমির দুটি মাছের ঘেরে ২৫–২৬টি মেশিন দিয়ে পানি নিষ্কাশন চলছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পানি সরানো সম্ভব ছিল। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ঘেরের কিছু ব্যক্তি বুডুলি খালের বাঁধ কেটে দেওয়ায় পুনরায় ঘের তলিয়ে যায়। পরে বাঁধ মেরামত করে আবার সেচ শুরু হলেও ৩০ পৌষের সাত দিন আগে সেচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে এখনো ঘেরে এক থেকে দেড় ফুট পানি থাকায় শতাধিক কৃষক বোরো আবাদ করতে পারছেন না।
উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চলতি মৌসুমে কেশবপুরে ১৪ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টরে হাইব্রিড ও ৮ হাজার ৪২৫ হেক্টরে উফশী জাতের ধান চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। পানি কম থাকায় এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু সেচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তিনি আরও দুই থেকে তিন দিন সেচ কার্যক্রম চালু রাখার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি বিভাগের উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানান।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় তরমুজ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে চাষিরা। এ উপজেলায় চলতি বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি চাষিরা। চলতি বছর তরমুজ চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলানো যাবে বলে জানিয়েছে তারা। উন্নত যোগাযোগের কারণে ন্যায্যমূল্যে তরমুজ বিক্রি করছেন বলে জানান চাষিরা।
পাহাড়ি ঢলে জমিগুলোয় পলি পড়ার কারণে এ বছর জাদুকাটা নদীর তীরসহ ছোট-বড় কয়েকটি হাওরে তরমুজের চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়ে চাষিদের চোখেমুখে যেন নতুন স্বপ্ন ফুটে উঠছে। জাদুকাটা নদীর পূর্ব তীরসহ হাওরজুড়ে চোখ জুড়ানো সবুজ ঘাসের বুকে এ যেন আল্লাহ নিজের হাতে গড়ে সাজিয়ে রেখেছে।
তরমুজ চাষি বিন্না কুলি গ্রামের মোহাম্মদ মিয়া জানান, এবার ১০ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। প্রতি কিয়ার জমিতে তরমুজ চাষে ব্যয় হয়েছে ৮-১০ হাজার টাকা, আর প্রতি কিয়ারে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে পাচ্ছি ২৫-৩০ হাজার টাকা। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা জমিতেই ট্রাক নিয়ে আমাদের কাছ থেকে তরমুজ কিনে নেওয়ায় আমাদের আর খরচ করে বাজারে যেতে হয় না। এ পর্যন্ত ১ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছি। এ বছর আশা করি ৩ লাখ টাকার বেশি তরমুজ বিক্রি করতে পারব।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়- উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ঢালারপাড়, লামাশ্র, জঙ্গালহাটি, বিন্নাকুলি, মোদেরগাঁও, ছড়ারপাড় ও করিমপুর এলাকাকে ঘিরে জাঙ্গাল ও বুরবুরিয়া হাওরে ২৪০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ করেছে।
দেশে বিভিন্ন জেলার তরমুজ চাষিদের বাজারজাতের পূর্বেই তাহিরপুরের তরমুজ চাষিরা সফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। গত ১০ জানুয়ারি থেকে জাম্বু, ওরিয়ন, বাংলালিংক ও ড্রাগন জাতীয় বিদেশি তরমুজ বাজারে ছেড়েছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে তরমুজ রোপণ ও ফলনের সময় টিএসপি, এমওপি, সুপার জিপসাম সার ফলনের পর জিংক মনো, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করে ছিলেন। সময়মতো হাইব্রিড জাতীয় বীজ পাওয়ায় পূর্বের চেয়ে ফলন বেশি হয়েছে।
তরমুজ চাষি মাহরাম গ্রামের শাহ আলম বলেন, ‘এ বছর ৮ কিয়ার জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এ বছর কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ পাওয়ায় ও তরমুজে তেমন কোনো রোগবালাই না থাকায় এবং ভালো ফলন হওয়ায় খরচ বাদেও আমার প্রচুর টাকা লাভ হবে।’
তাহিরপুর উপসহকারী কৃষি অফিসার মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ‘কৃষকরা সময়মতো নানা জাতীয় হাইব্রিড বীজ পাওয়ায়, প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা না থাকায় এ বছর তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, তাহিরপুর বিস্তীর্ণ এলাকাসহ অন্যান্যা এলাকায় আগাম জাতের এই তরমুজ চাষকে জনপ্রিয় করা গেলে একদিকে যেমন ফলের চাহিদা পূরণ হবে অন্যদিকে এখান বিপুলসংখ্যক কৃষি পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
নওগাঁয় শুরু হয়েছে ইরি-বোরো রোপন। প্রচণ্ড কুয়াশা ও ঠাণ্ডায় নষ্ট হচ্ছে বীজতলা। শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। ঠাণ্ডায় জমিতে চারা রোপণে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া রাসায়নিক সারের কৃত্রিম সংকটে কৌশলে কৃষকদের পকেট কাটছে ব্যবসায়িরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে ইরিবোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা থেকে প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা কৃষি বিভাগের।
শস্য ভাণ্ডার খ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁয় প্রচন্ড শীত ও কুয়াশাকে উপেক্ষা করে চলছে ইরি-বোরো রোপণ। জেলার বিভিন্ন মাঠে মাঠে জমি প্রস্তুত ও রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষক। কাটারিভোগ, জিরাশাইল, ব্রিআর-২৮, সুফলতা ও হাইব্রিড জাতের ধানের চারা রোপন করা হচ্ছে। এ বছর প্রচণ্ড কুয়াশা ও ঠাণ্ডায় বোরো আবাদে জমিতে চারা রোপণে প্রায় ১৫ দিন দেরি হয়েছে। আবার শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকরা জানান- কৃষি কার্ড দিয়ে ডিলারের কাছে সরকারি মূল্যে স্বল্প সার পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। যেখানে একই সময়ে জমিতে সার দিতে হবে, সেখানে কয়েক ধাপে ডিলারের কাছ থেকে সার কিনতে হবে। যা দিতে কোনো কাজেই আসবে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়িদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে।
এবছর কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় চাষাবাদে বেড়েছে খরচ। প্রান্তিক কৃষকরা ধারদেনা করে আবাদের পর ফসল ঘরে উঠার আগেই স্বল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য হোন। তবে মৌসুমের শুরুতে অন্তত ১২শ টাকা মন দাম পেলে লাভবান হবেন তারা।
নওগাঁ সদর উপজেলার হারিয়াগাছী গ্রামের কৃষক হাফেজ মোহসিন আলী বলেন- ইরিবোরো রোপণ থেকে শুরু করে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত বিঘাতে খরচ পড়ে অন্তত ১৬-১৮ হাজার টাকা। ১২ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতোমধ্যে ২ বিঘা রোপণ করা হয়েছে। কৃষি কার্ড দিয়ে ৩ বস্তা সার পেয়েছি। এ মৌসুমে ডিএপি, পটাস ও ইউরিয়া সারের প্রয়োজন অন্তত ২৫ বস্তা। সংকটের অজুহাতে ডিএপি সার বাজার থেকে বস্তাপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়েছে। সারসহ অন্যান্য উপকরণ মিলে বিঘাতে খরচ বেড়েছে অন্তত ১ হাজার টাকা করে।
দুবলহাটি গ্রামের কৃষক এমদাদুল হক দুলাল বলেন, ৩ বিঘাতে ধানের চারা রোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সার পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজার থেকে সার কিনায় আমার ৩ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়েছে। আমরা কৃষকরা সবসময় অসহায়। ফসল ফলাতে খরচ পড়ছে বেশি। আবার বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সার সিন্ডিকেট রুখতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা।
জমুনি গ্রামের কৃষক জালাল হোসেন বলেন- আমাদের এলাক কিছুটা নিচু হওয়ায় আগেই ধান লাগানো শুরু হয়। বছরে একটিমাত্র ফসল। বিঘাতে ৩০-৩৫ মন ফলন হয়। মৌসুমের শুরুতে ১ হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়। অনেকেই ধারদেনা করে আবাদ করতে হয়। তবে শুরুতে ১২শ টাকা মণ দাম হলে সুবিধা হয়।
মান্দা উপজেলার বাঁকাপুর গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন- অতিররিক্ত শীত ও কুয়াশায় চারা হলুদ হয়ে গেছে। কিছু চারা নষ্ট হয়েছে। প্রচণ্ড শীতের কারণে জমিতে চারা রোপণ করতে ১৫ দিনের মতো দেরি হয়েছে। আবার শ্রমিক সংকট থাকায় বিঘাতে ৩০০ টাকা বেশি মজুরি দিয়ে চারা রোপণ করতে হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে মজুরি দিতে আসছেন শ্রমিক জহুরুল হক। তিনি বলেন- গত ১৫ দিন থেকে ৫ জন সদর উপজেলার দুবলহাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ধান লাগানোর কাজ করা হচ্ছে। প্রতি বিঘায় মজুরি নেওয়া হয় ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা। তবে প্রন্ডচ শীত ও কুয়াশায় জমিতে নামতে বেলা হয়ে যাচ্ছে। দেরিতে কাজ শুরু হওয়ায় আয়ও কম হচ্ছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার বাইপাস এলাকার রাসায়নিক সার ডিলার মেসার্স মজুমদার এন্ড ব্রাদার্স এর ম্যানেজার মনি মজুমদার বলেন- সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা হয়। পটাস ও ইউরিয়া সারের কোন সংকট নেই। তবে বেশকিছু দিন থেকে ডিএপি সারের সংকট রয়েছে। চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন- জেলায় ১০ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে বীজতলা রোপণ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৩০ হেক্টর বেশি অর্জিত হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকুলে না থাকায় বীজতলা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও চারা রোপণে কোনো প্রভাব পড়বে না। এছাড়া কৃষকদের আবহাওয়া বুঝে চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন- চলতি মৌসুমে রাসায়নিক সারের কোন ধরনের সংকট নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণে সারের সরবরাহ রয়েছে। কোন ধরণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয় তার জন্য নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
মাদারীপুরে ২০২৫-২৬ ইং অর্থবছরে সরিষা চাষে বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ী, মাদারীপুর এর উপ-পরিচালক রহিমা খাতুন জানিয়েছেন, জেলায় এবার ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকরা সরিষার আবাদ করেছেন এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় গতবারের তুলনায় এবার ৬ শত ৮৭ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ বেশি হওয়ার পাশাপাশি ফসলও অপেক্ষাকৃতভাবে ভালো হয়েছে, সরিষা গাছগুলো হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে।
সরেজমিনে মাদারীপুর সদর, কালকিনি, ডাসার, শিবচর ও রাজৈর উপজেলার কৃষিজমি পরিদর্শন করে দেখা গেছে বিস্তীর্ণ জমিতে শুধু সরিষা আর সরিষার আবাদ করেছেন কৃষকরা। মাদারীপুর সদর উপজেলায় ৫ হাজার ২ শত ৭৬ হেক্টর, কালকিনি-ডাসার উপজেলায় ৫ হাজার ৪ শত ৩৬ হেক্টর, রাজৈর উপজেলায় ২ হাজার ৬ শত ৯৮ হেক্টর ও শিবচর উপজেলায় ৪ হাজার ১ শত ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। যে দিকে চোখ যায় চারিদিকে শুধু চকচকে হলুদ দৃশ্যের সমারোহ ও সরিষা ফুলের গন্ধে মধু আহরণকারী মৌমাছি ও ভ্রমরের গুঞ্জন। বর্তমানে বেশীরভাগ সরিষা গাছে দানা ধরতে শুরু করেছে। কোনো কোনো জায়গায় আগামী ১৫/২০ দিনের মধ্যে সেগুলো পেকে কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করবে। ক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহ, ফসল মাড়াই ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক কাজ সারার জন্য
কৃষক পরিবারগুলোর নারী-পুরুষ সবার মধ্যে এজন্য বাড়তি আগাম প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গেছে। তাদের চোখে-মুখে হাসি, স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
নরসিংদী জেলার সর্বত্র বিভিন্ন গ্রামের মাঠে সরিষা খেতের হলুদ রংঙের ফুল প্রকৃতি প্রেমীকদের মুগ্ধ করেছে। নরসিংদী জেলার কৃষকরা এবার সরিষা চাষে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন।
জেলার ৬টি উপজেলার গ্রাম এলাকায় বর্তমানে হলুদের সমারোহ। যেদিকে চোখ যায় সেদিকে সবুজের মাঠজুড়ে হলুদ রঙের সরিষার ফুলের হাসি। কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় নরসিংদীতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সরিষার চাষ। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবার অধিক ফলনের আশা করছেন কৃষকরা।
নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরিষার চাষে খরচ ও পরিশ্রম দুটোই কম হওয়ায় অনেক কৃষক এই ফসল চাষে ঝুঁকেছেন। সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে।
সরিষা বেলে, দো-আঁশ মাটিতে ভালো হয়। সরিষা চাষে প্রচুর রোদ, কম তাপমাত্রা ও জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ও মাটিতে রসের অভাব হলে বীজের আকার ছোট হয় ও বীজে তেলের পরিমাণ কমে যায়। এ জন্য বাংলাদেশে রবি মৌসুমেই সরিষার চাষ করা হয়ে থাকে।
সূত্রটি আরো জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলায় ৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। তম্মধ্যে উফশী জাতের ৭ হাজার ২৫৮ এবং স্থানীয় জাতের ১৭৭ হেক্টর জমি রয়েছে। যা লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে নরসিংদী জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় সরিষার চাষ করা হয়।
নরসিংদী জেলার সব উপজেলায় কমবেশি সরিষা উৎপাদন হয়। তবে জেলার নরসিংদী সদর ও রায়পুরা এই দুই উপজেলায় অন্য চারটি উপজেলার চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি জমিতে সরিষা উৎপাদন হয়।
উপজেলা ওয়ারী হিসেবে নরসিংদী সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৪৬ হেক্টর, পলাশে ১৪৫ হেক্টর, শিবপুরে ২৭০ হেক্টর, মনোহরদীতে ৫৪৮ হেক্টর, বেলাবতে ৪০৯ হেক্টর ও রায়পুরায় ২ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের সমারোহ। ফুলে ফুলে ভরে গেছে সরিষার খেত।
শিবপুর উপজেলার ভুরভুরিয়া গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা জানান, আমন ধান কাটার পর জমি কয়েক মাসের জন্য পরিত্যক্ত থাকে ওই জমিতে অতিরিক্ত ফসল হিসাবে সরিষা চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। ইতোমধ্যে কোনো কোনো খেতে সরিষার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আবার কোথাও ফুল ফুটেছে।
সদর উপজেলার রসূলপুর গ্রামের সরিষা চাষি কাউসার মিয়া জানান, এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষে খরচ হয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ফলন পাওয়া যায় ৫ থেকে ৭ মণ। প্রতিমণ সরিষার মূল্য ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
রায়পুরা উপজেলার ডৌকারচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের চাষি আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, এবার প্রায় ১০০ শতাংশ জমিতে উফশী জাতের সরিষা চাষ করেছি, তবে এ বছর ঘন কুয়াশার কারনে ফলন বেশী ভাল হয়নি। এছাড়া সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার কারনেই এমন অবস্থা হয়েছে। একই গ্রামের সরিষা চাষি মো: ইব্রাহিম সরকার বলেন, আমি বাপ-দাদার আমল থেকে সরিষার চাষ করে আসছি। এ বছর তিনি ২৪ গন্ডা জমিতে সরিষার চাষ করেছেন। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। তিনি জানান, সরিষার তেল খুবই উপকারী-আমি এবং আমার পরিবারের লোকেরা সরিষার তেল ব্যবহার করি। সরিষার তেল মাথায় দিলে চুল পাকেনা। চুল সব সময় কালো থাকে। কিন্তু আমরা সোয়াবিন তেল খেয়ে শরীর নষ্ট করে ফেলেছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. সালাহ উদ্দিন টিপু জানান, সরিষা চাষে কৃষকরা যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তা অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি কৃষি ক্ষেত্রে সরকারের আরও একটি সাফল্য। দেশি জাতের সরিষার ৬০ থেকে ৭০ দিনে এবং উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা উঠতে সময় লাগে ৭৫ থেকে ৮০ দিন।
তিনি আরও বলেন, সরিষার আবাদ বৃদ্ধি হলে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং তেলের আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে।
জয়পুরহাটে নার্সারিতে শীতকালীন চারা চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছেন কৃষি উদ্যোক্তারা। এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় জেলার চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন জেলাতে।
উদ্যোক্তারা জানান, সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে মানসম্পন্ন সবজি চারা উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনই নার্সারি বাড়লে বেকারত্ব দূর করতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এদিকে এ বিষয়ে বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।
নার্সারি মালিকরা জানান, জেলায় শতাধিক নার্সারি রয়েছে। এই মৌসুমে প্রতিটি নার্সারি ১ থেকে ৪ লাখ টাকা লাভবান হবে। সেই হিসেবে জেলায় এ মৌসুমে কোটি টাকার বেশি চারা বিক্রির তারা আশা করছেন।
জানা যায়, ধান ও আলু চাষে অন্যতম জেলা জয়পুরহাট। তবে অন্যান্য সবজি চাষে পিছিয়ে নেই এই জেলা। এজেলায় চলতি রবি মৌসুমে ৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন বিভিন্ন শাক-সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি উদ্যোক্তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নার্সারিতে গাছের চারার পরিচর্যা করছেন শ্রমিকরা। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নার্সারিতে চাষ করেছেন বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজসহ শীতকালীন বিভিন্ন সবজির চারা। প্রকারভেদে বিভিন্ন চারা প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ১ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন তারা। জেলাজুড়ে প্রায় শতাধিক এমন নার্সারি গড়ে উঠেছে।
এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় স্থানীয়দের পাশাপাশি কিনে নিয়ে যাচ্ছে অন্য জেলা থেকে আসা কৃষকরা। সারা বছরই এ ব্যবসা চললেও শীত মৌসুমে তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কৃষি বিভাগের সহযোগিতার দাবি কৃষি উদ্যোক্তাদের।
সদর উপজেলার গণকবাড়ি এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা খিতিশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘আমি ১৯৭২ সাল থেকে নার্সারিতে চারার ব্যবসা করে আসছি। এবার পেঁয়াজের চারা ১০০ পিস ৫০ টাকা, বাঁধাকপির চারা ১০০ পিস ১০০ টাকা, ফুলকপি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, টমেটো ২০০ টাকা, মরিচ ৩০০ টাকায় বিক্রি করছি। এতে ভালো লাভ হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালীন চারা বেশি বিক্রি হয়।’
একই এলাকার আরেক কৃষি উদ্যোক্তা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, ‘আমার নার্সারিতে বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, মরিচ, লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ ১০ ধরনের চারা রয়েছে। প্রকারভেদে প্রতি পিস চারা ১ টাকা থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। এই চারা জয়পুরহাটসহ অন্যান্য জেলা থেকেও কৃষকরা এসে কিনে নিয়ে যায়। বছরের অন্য সময়টাতে কম বেচাকেনা হয়। তবে শীতকালে বেশি কেনাবেচা হয়। শীত মৌসুমে আমার নার্সারিতে ৩ লাখ টাকার মতো লাভের আশা করছি।’
সদর উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের আব্দুল হামিদ বলেন, ‘চারার ব্যবসা অনেক লাভজনক। দূর-দূরান্ত থেকে কৃষকরা কিনে যায়। জয়পুরহাটে প্রায় শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে। আমার এখানে কয়েকজন কাজও করে। তবে কৃষি বিভাগ থেকে যদি কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাওয়া যেত তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো। আমরা নার্সারিটা সম্প্রসারণ করতে পারতাম।’
সদর উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বেশ কয়েকটি সবজির চারার নার্সারি গড়ে উঠেছে। এখানে অনেক ভালো চারা পাওয়া যায়। আমরা এখান থেকে চারা কিনে জমিতে চাষ করি। এবার ২০ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ ও ১৫ শতাংশ জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছি।’
নওগাঁ ধামুরহাট থেকে এসেছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘বেগুন ও বাঁধাকপির চারা কেনার জন্য এসেছিলাম। ৫০০ চারা কিনলাম। এখানকার চারার মান অনেক ভালো। ফলন ভালো হয়।’
সদর উপজেলার হেলকুন্ডা গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে ২০০ পিস টমেটো চারা কিনে নিয়ে গেছিলাম। আবার কাঁচামরিচের ১০০ পিস চারা কিনলাম।’
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ এ.কে.এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় এবার ৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। চাহিদা থাকায় এখানকার কৃষি উদ্যোক্তরা নার্সারিতে চারা উৎপাদন করে ভালো আয় করছেন। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে যাতে চারা উৎপাদন করতে পারে, গোড়া পচা রোগ যাতে না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
রাজবাড়ী জেলায় পদ্মার তীরে বন্যা পরবর্তিতে জেগে ওঠা চরে চাষ করা হয়েছে উন্নত জাতের টমেটো। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম চাষ করা এই টমেটোর এবার বাম্পার ফলন ফলেছে। দামও ভালো পাওয়ায় লাল সবুজ টমেটো হাসি ফুটিয়েছে কৃষকের মুখে। ক্ষেতে উৎপাদিত এই টমেটো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার চরাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও সঠিক দিক নির্দেশনায় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে টমেটোর ভালো ফলন হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের টমেটো বিউটি প্লাস বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকার মত। হাইব্রিড জাতের টমেটো যেমন বিউটি প্লাস আবাদ করে কৃষকের প্রতি বিঘায় টমেটোর ফলন পাচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ মন করে। এছাড়াও বাজারে টমেটোর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভালো দামও পাচ্ছে কৃষকেরা।
কৃষক শুকুর আলি জানান, এবার মাচা পদ্ধতিতে হাইব্রিড বিউটি প্লাস টমেটো চাষ করেছি ফলন ভালো হয়েছে আর বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি। প্রতি কেজি টমেটো বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। এবার আমি আধুনিক পদ্ধতিতে পাঁচ বিঘা জমিতে হাইব্রিড টমেটো আবাদ করেছি। হাইব্রিড টমেটো আবাদে খরচ কম লাভ বেশি।
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এ বছরে ৭ বিঘা জমিতে হাইব্রিটি বিউটি প্লাস আগাম জাতের টমেটো আবাদ করেছি এবং ভালো ফলনও হয়েছে। স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে টমেটোর ফলন হচ্ছে প্রায় ১ শত থেকে ১২০ মন করে। দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকেরা অনেক লাভবান হচ্ছে। ক্ষেতের৷ খরচ বাদ দিয়ে এবার অনেক টাকা লাভ হবে আশা করা যাচ্ছে।
গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওয়াজানি গ্রামের চাষি সোবান শেখ বলেন, ‘এ বছর টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়াও আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করা হয়েছে। আমরা ভালো দাম পেয়ে খুশি।’
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, চলতি বছরে এই উপজেলায় ২১৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের টমেটো আবাদ হয়েছে এছাড়াও টমেটোর ফলনও ভালো হয়েছে, বাজারে দামও বেশি পাচ্ছে কৃষককেরা।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সেক্স ফরোমোন ফাঁদ দ্বারা ক্ষতিকর পোকা দমন, টমেটোর বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই, উন্নত জাত সম্পর্কে ধারণা ও সুষম মাত্রায় সার, কীটনাশক ব্যাবহারে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে কৃষক লাভের মুখ দেখছেন। এতে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছেন কৃষকরা।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সদর উত্তর ইউনিয়েনের গাঁয়ের সরু মেঠোপথ ধরে কদমতলী গ্রামে ঢুকলেই দেখা মেলে লতানো সবুজে ঢাকা বিশাল এক বাগান। লাউয়ের মাচাজুড়ে ঝুলে আছে ডজন ডজন ফল। ভোরের আলোয় ঝিলমিল করা শিশিরবিন্দুর মতোই ঝলমল করে ওঠে এই বাগান। আর সেই বাগানেই বাস খোকন মিয়ার।
১৫ বছর আগেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। সংসার টানতে হিমশিম খেতে হতো। মৌসুমি ফসল চাষ করতেন। তবে তার ভরসা ছিল না কোনো নিশ্চয়তা। সিদ্ধান্ত নিলেন লাউ চাষ করবেন মাচা পদ্ধতিতে। শুরুর প্রথম বছরেই মিলল সাফল্য। সেই সাফল্যকে আঁকড়ে ধরে তিনি আজ একজন স্বাবলম্বী কৃষক।
দিন শুরু হয় তার ভোরেই। হাত ভর্তি ঘাম শরীরে সূর্যের উত্তাপ আর মনোযোগের সাথে একের পর এক লাউয়ের পরিচর্যা। তার পাশে সমানতালে কাজ করেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। শুধু লাউ নয় চাষ হচ্ছে জীবনযুদ্ধ জয়ের গল্পও।
বর্তমানে তিন বিঘা জমিতে লাউ চাষ করছেন তিনি। এই ফসলই তার আয়ের প্রধান উৎস। খোকন জানান, বছরে এখান থেকেই সব খরচ বাদে আয় হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, তিনি আরও ১০ বিঘা জমি প্রস্তুত করছেন। তার আত্মবিশ্বাস একই পদ্ধতিতে পুরো বছরই চাষ করলে আয় হবে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
পাইকারি বিক্রি নয় লাউ তুলে নিজেই বাজারে নিয়ে যান খোকন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে তার দোকানে। ক্রেতারা বলেন, টাটকা আর সুস্বাদু খোকন মিয়ার লাউ। লাউ গাছ প্রকৃতির কাছে একটু বেশিই সহজ-সরল। রোগ কম কীটপতঙ্গও তেমন আক্রমণ করে না। ফলে খরচও হয় কম। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা জানান, উপজেলায় প্রতি বছর বাড়ছে লাউয়ের বাণিজ্যিক আবাদ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুলতানা বলেন, খোকনের লাউ বাগানে তারা নিয়মিত পরামর্শ দেন। উন্নত বীজ ও সার দিয়ে চাষাবাদে সহায়তাও করেছে কৃষি বিভাগ। তিনি আরও জানান, এবার উপজেলায় ১২০ একর জমিতে লাউয়ের আবাদ হচ্ছে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২ কোটি টাকার উপর।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৪৭ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করা হয়েছে। এ অঞ্চলে দিন দিন তুলা চাষ অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তুলা গাছে ব্যাপক ফলন দেখে বোঝা যাচ্ছে খরচের তুলনায় এবার কৃষকের কয়েকগুণ বেশি মুনাফা হবে। বেশ কয়েক বছর ধরে কম খরচে বেশি মুনাফার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে তুলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে বলে জানা গেছে।
ভেড়ামারা কটন ইউনিট কর্মকর্তা মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, হোয়াইট হোল্ড-১, হোয়াইট গোল্ড-২, রুপালী-১, ডিএম-৪, সিবি-১ হাইব্রিড ও বিটি কটন, উফশী জাতের তুলা চাষ করা হয়েছে। উচ্চফলনশীল তুলার এ জাতগুলো প্রতি বিঘায় ১৬-২০ মণ হারে ফলন হয়।
এ উপজেলায় চলতি বছরে ১৪৭ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রদর্শনী ও কৃষকের নিজ অর্থায়নে চাষ করা হয়েছে। ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পাওয়ায় আগামীতে চাষির সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় কৃষকরা। তুলা গ্রীষ্মকালীন ফসল। মে মাসের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে জুনের প্রথমাংশ পর্যন্ত জমিতে তুলা বীজবপন করতে হয়। বীজ বপনের ৬ মাস পর তুলা সংগ্রহ করা যায়। তুলা চাষ ছড়িয়ে দিতে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন প্রকল্প কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে সরকার।
ভেড়ামারা উপজেলায় কম পুঁজিতে নামমাত্র শ্রমে ও সরকারি সহযোগিতায় তুলা চাষের পরিমাণ ও চাষির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাদের উৎপাদিত তুলা সরাসরি তুলা উন্নয়ন বোর্ড ন্যায্য দামে কিনে নেয়। ফলে কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় তুলাতে অধিক লাভবান হচ্ছেন। সরকারি সহায়তায় কৃষকরা সিবি-১২ এবং হাইব্রিড প্রজাতির রুপালি-১ জাতের তুলার চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হওয়াতে এ বছর কৃষকের আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তবে কিছু কিছু খেতে এসিট, জেসিট, আমেরিকান বোলওয়ার্ম, স্পটেট বোলওয়ার্ম ও আঁচা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছিল। এতে তুলা চাষিরা কীটনাশকের বদলে ফেরোম্যান ফাঁদ ও পার্চিং পদ্ধতিতে বেশ উপকার পেয়েছেন। কৃষকেরা গত বছর বীজ তুলার দাম পেয়েছিল মণ প্রতি ৪ হাজার টাকা, প্রতি কেজি ১শত টাকা। কৃষকদের তুলা চাষে সরকার বিনামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রদান করে থাকেন। এর মধ্যে তুলা প্রদর্শনীসহ প্রণোদনাও দিয়ে আসছে।
হাসান আলি নামে একজন কৃষক জানান, বর্তমানে তুলা চাষ করে তিনি লাভবান হচ্ছেন। তিনি তার ৪ বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে তুলা চাষ করেছেন। তার আশা এ বছর তিনি ভালো মুনাফা পাবেন। তুলা চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ালে অনেক অনুর্বর, নিস্ফলা বা অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ করে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব।
মসলেম উদ্দিন জানান, নিস্ফলা জমিতে তুলা চাষ করায় একদিকে যেমন জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকরা বেশ টাকা পাচ্ছেন, তাদের পরিবারে আসছে স্বচ্ছলতা। তাই অনেকে ধান ও গমসহ বিভিন্ন আবাদ ছেড়ে তুলা চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
তুলা চাষিরা জানান, রুপালী-১, হোয়াইট গোল্ড-১, হোয়াইট গোল্ড-২, ইস্পাহানি শুভ্র-৩, লালতীর ডিএম-৪, সিবি-১, উফশী, বিটি তুলা জাতের তুলা প্রতি বিঘাতে বীজসহ উৎপাদন হয় ১৫ মণ থেকে ২০ মণ করে। যার বর্তমান বাজার মূল্য কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। এমন অনুর্বর জমিতে অন্য কোনো ফসলে এই লাভ পাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আবার একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন শাক-সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ করেও বাড়তি আয় করা যায় বলে অনেক চাষি তুলা চাষের দিকে মনোনিবেশ করছেন। স্বল্পপুঁজি ও স্বল্প পরিশ্রমে তুলা চাষে অনায়াসে লাখপতি বনে যাওয়া যায় বলে অনেক কৃষকের সাথে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন।
তুলা চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভেড়ামারা উপজেলার কৃষকরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন, এমনটাই কৃষি সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
শীতকালীন সবজি বাঁধাকপি ও ফুলকপি, সবজি খ্যাত কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুরের বেশ কয়েকটি এলাকায় এ সবজির চাষ করছেন কৃষকরা। প্রাকৃতিকভাবে মাটি উর্বর হওয়ায় বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষে সফলতা পেয়েছেন এ উপজেলার চাষিরা।
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব কপি চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে প্রতি বিঘা জমিতে কপি বিক্রি করে লাভ হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি বিঘা কপি চাষ করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘা জমির কপি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে বাঁধাকপি ও ফুলকপির চাহিদা বেশি হওয়ায় বাজারে দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। তাই লাভও বেশি।
উপজেলার গরুড়া গ্রামের বাসিন্দা মহি উদ্দিন বলেন, ‘শীতে আগাম জাতের ৭ বিঘা জমিতে বাঁধাকপি ও ফুলকপি চাষ করেছেন তিনি। এর মধ্যে ২ বিঘা জমির কপি বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার। আরও ৫ বিঘা কপি বিক্রির উপযোগী হয়নি।’
এ কৃষক আরও বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘাতে লাভ হবে ৫০ হাজার টাকা।’
আমিরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘৭ বিঘা জমিতে বাঁধাকপি এবং ফুলকপি চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল বিঘাপ্রতি ৩০ হাজার টাকা। বিক্রি করেছি সাড়ে ৩ বিঘা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এখনো সাড়ে ৩ বিঘা কপি আছে, বাজার দর ভালো, ভালো দামের আশা করেন তিনি।’ একই এলাকার কৃষক সামিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে তামাক চাষ করতাম, কপি অনেক লাভজনক আবাদ ‘২ বিঘা কপি লাগিয়েছি। ১ বিঘা বিক্রি করেছিলাম ৮০ হাজার টাকায়। আড়ায় থেকে ৩ মাসের আবাদ শীতের মৌসুমে ভালো হয়।’
এদিকে উপজেলার ধর্মদহ গ্রামের ওবাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ৩ বিঘা ফুলকপি লাগিয়েছি, তাতে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারে বিক্রি করলে বিঘা প্রতি ৩৫ হাজার টাকা লাভ হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, ‘এ বছর দৌলতপুরে শীতকালীন কপির চাষের লক্ষ মাত্রা ৩৪২ হেক্টর জমিতে তা পূরণ হয়েছে ২৬০ হেক্টর জমি। চাষিদের শীতকালীন কপি চাষে উদ্বুদ্ধকরণ, পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানান কৃষি বিভাগ।
প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে দৌলতপুরে সবজি চাষ তাতে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে কৃষকরা বলে জানান এই কর্মকর্তা।
ময়মনসিংহের ভালুকায় কৃষি খেতে যুক্ত হয়েছে নতুন উদ্ভাবনী ধারা। হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও আওলাতলী এলাকার প্রবাস ফেরত কৃষক মো. আক্তার হোসেন বস্তায় আদা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। প্রচলিত কৃষিপদ্ধতি বদলে বস্তায় আদা চাষের মাধ্যমে তিনি যেমন অভাবনীয় সফলতার মুখ দেখেছেন, তেমনি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও।
দেশে ফিরে ব্যবসার পাশাপাশি নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই আক্তারের এ উদ্যোগ। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে প্রথমবারের মতো তিনি শুরু করেন বস্তায় আদা চাষ। চলতি মৌসুমে ৪০ শতক জমিতে মোট ৫ হাজার ৫০০ বস্তায় আদা লাগিয়েছেন তিনি। প্রতিটি বস্তায় খরচ পড়েছে মাত্র ৩৪-৩৫ টাকা। বাজারদর কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা হলে প্রতি বস্তায় গড়ে ১ কেজি আদা পেলেই সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
পদ্ধতিটির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী কৃষি কর্মকর্তারাও। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বস্তায় চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়, পানি জমে পচনের ঝুঁকিও নেই। ফলে জমির চেয়ে এ পদ্ধতি বেশি নিরাপদ ও লাভজনক।’
এরই মধ্যে বস্তায় আদা চাষ ভালুকায় নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আক্তারের সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক কৃষক নিজ বাড়ির ফাঁকা জায়গা কিংবা অল্প জমি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুসরাত জামান জানান, ‘চলতি বছর ভালুকা উপজেলায় মোট ৮৪ হাজার বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা- জায়গা কম লাগে, খরচ কম, রোগবালাইও কম। ঘরোয়া পরিবেশেও সহজে চাষ করা যায়। তিনি আরও জানান, যারা বস্তায় আদা চাষে আগ্রহী, তাদের জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’