ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে শীত মৌসুমে মাঠজুড়ে নানা ধরনের শাক-সবজির সমারোহ দেখা যায়। বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ ও কুমড়ার সঙ্গে এবার নতুন করে কৃষক ও ভোক্তাদের নজর কেড়েছে বিদেশি সবজি স্কোয়াশ। দেখতে শসার মতো হলেও আকারে বড় এই সবজিটি পুষ্টিগুণ, স্বাদ ও লাভজনক উৎপাদনের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্কোয়াশ একটি উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ও দ্রুত ফলনশীল সবজি। এক বিঘা জমিতে স্কোয়াশ চাষে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা, আর বাজারজাত করে লাভ হতে পারে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় দিন দিন এই সবজির চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি মৌসুমে নবীনগর উপজেলায় প্রায় ২ হেক্টর জমিতে স্কোয়াশের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বড়িকান্দি ইউনিয়নের নুরজাহানপুর ব্লকের ধরাভাঙ্গা গ্রামের কৃষক কুদ্দুস মিয়া স্কোয়াশ চাষে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
কুদ্দুস মিয়া জানান, বীজ বপনের মাত্র ৪০ দিনের মধ্যেই তিনি প্রথম দফায় স্কোয়াশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন, স্কোয়াশ চাষে খরচ কম, রোগবালাইও তুলনামূলকভাবে কম। অল্প সময়েই ফলন পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি স্কোয়াশ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তার এই সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও স্কোয়াশ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
এ বিষয়ে বড়িকান্দি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসাইন বলেন, সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে স্কোয়াশে ভালো ফলন পাওয়া যায়। মাঠ পর্যায়ে আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।
অন্যদিকে নবীনগর পৌরসভার আলমনগর গ্রামের মুর্শেদা বেগম প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে স্কোয়াশ চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, কম সময়ে ফলন পাওয়া যায় বলে আমি আশাবাদী। এতে পরিবারের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, স্কোয়াশ একটি দ্রুত ফলনশীল ও উচ্চমূল্যের সবজি। নবীনগরের মাটি ও আবহাওয়া এ ফসল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। জমির আইল, বসতবাড়ির আশপাশ কিংবা পতিত জায়গায় স্কোয়াশ চাষ করেও কৃষকরা সহজেই অতিরিক্ত আয় করতে পারেন। স্কোয়াশ চাষে এ ধরনের সাফল্য নবীনগরের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ভুট্টা চাষ করে অনেক কৃষকের ভাগ্য বদলে গেছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
একসময় এই অঞ্চলের কৃষিকাজ শুধু ইরি-বোরো ধান, আমন ধান এবং কিছু চিরাচরিত শাকসবজির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে ভুট্টা চাষ করে কৃষকরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করছেন।
ভুট্টা চাষের এই সাফল্য কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং এটি এখন তাদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি মৌসুমে জীবননগর উপজেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ আশা করছে, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভুট্টার বাম্পার ফলন হবে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জীবননগর উপজেলায় ৫ হাজার ৩১৯ হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষ করা হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, ভুট্টা চাষে খরচ বাদে প্রতি বিঘা জমিতে ২৫-৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। বছরে দুবার ভুট্টা চাষ করা যায়। নভেম্বর-ডিসেম্বর এবং মে-জুন ভুট্টা চাষের জন্য উপযুক্ত সময়। শীতকালে ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা এই সময়ে বেশি চাষাবাদ করেন।
তারা আরও জানান, একই জমিতে ধান চাষ করে গড়ে ২৫-৩০ মণ ফলন পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ভুট্টা চাষ করে ৪০-৪৫ মণ ফলন পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা। এই কারণেই কৃষকরা ধানের চাষ কমিয়ে ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন। গত বছর ভুট্টার ভালো দাম পাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাতের ভুট্টা চাষে আগ্রহী হয়েছেন। জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া গ্রামের ভুট্টা চাষি আবদার হোসেন জানান, ২০ বছর আগে তিনি প্রথম এই এলাকায় ভুট্টা চাষ শুরু করেন। প্রথম বছর এক বিঘা জমিতে ৩ হাজার টাকা খরচ করে উৎপাদিত ভুট্টা প্রায় ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এতে লাভ বেশি হওয়ায় তিনি পরের বছর জমির পরিমাণ আরও বাড়ান। এ বছর তিনি ৪ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন এবং আশা করছেন উৎপাদিত ভুট্টা প্রায় ২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, কার্তিকের শেষে জমি ভালোভাবে তৈরি করে সার প্রয়োগের মাধ্যমে ভুট্টা চাষের উপযোগী করা হয়। বীজ বপনের ১০-১৫ দিনের মধ্যে চারা গজায় এবং ৬ মাসের মধ্যে ভুট্টা সংগ্রহ করা যায়। প্রতি বিঘা জমিতে ৪০-৪৫ মণ ভুট্টা উৎপাদিত হয়। জমি তৈরি থেকে ভুট্টা সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং উৎপাদিত ভুট্টা ৪৫-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়।
একতারপুর গ্রামের ভুট্টা চাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, ভুট্টা চাষে লাভ বেশি ও নিরাপদ। প্রতি বিঘা জমিতে ২০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং ভুট্টা ভালো হলে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। দেশি জাতের তুলনায় হাইব্রিড ভুট্টায় সার, কীটনাশক ও সেচের খরচ কম, তাই কৃষকরা হাইব্রিড ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহী। ভুট্টা গাছ ও মাড়াইয়ের পর অবশিষ্ট অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
খয়েরহুদা গ্রামের কৃষক ইউনুস আলী জানান, অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি গত বছর ভুট্টা চাষ করে ভালো দাম পাওয়ায় এ বছর তিনি ভুট্টার চাষ বাড়িয়েছেন। ভুট্টার দাম ভালো থাকলে এ বছরও লাভবান হবেন বলে তিনি আশা করছেন।
উথলী গ্রামের ভুট্টা চাষি সামাদুল হক জানান, গত বছর ৩ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এ বছর তিনি সাড়ে ৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন এবং বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে বাম্পার ফলনের আশা করছেন।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেনের মতে, ভুট্টা এই উপজেলার প্রধান অর্থকরী ফসল। এই উপজেলার মাটি ভুট্টা চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত এবং কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ায় এখানে রেকর্ড পরিমাণ ভুট্টা চাষ হয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করা যায়। তবে কৃষকরা যদি ভুট্টা সংরক্ষণ করতে পারতেন, তাহলে তারা আরও বেশি লাভবান হতেন। কৃষি বিভাগ থেকে আধুনিক জাতের ও উচ্চ ফলনশীল ভুট্টার চাষ বাড়ানোর জন্য কৃষকদের প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভুট্টার চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।
উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে খেসারি (কলাই) চাষ করা হয়েছে। কম খরচে ভালো ফলনের সম্ভাবনায় এ ডাল ফসলে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ধানসাগর, খোন্তাকাটা, রায়েন্দা ও সাউথখালী ইউনিয়নে খেসারির আবাদ বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
চালরায়েন্দা গ্রামের কৃষক জাকির জমাদ্দার বলেন, খেসারি চাষে খরচ ও যত্ন তুলনামূলক কম লাগে। ফলন ভালো হলে লাভের আশা করছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার জানান, খেসারি মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ডাল হিসেবে পরিচিত। কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে চাষে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফলন হলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বাজারে সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দিন দিন বাড়ছে সরিষার আবাদ। এদিকে, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বিনা চাষে করা সরিষার আবাদে লাভবান হওয়ায় দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। বিনা চাষ পদ্ধতিতে স্বল্প খরচে ও অল্প সময়ের ব্যবধানে ভালো ফলন পাওয়ায় ঝুঁকছেন বলে তথ্যসূত্রে উলেখ করা হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত;
সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান : দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় দিন দিন বাড়ছে সরিষার আবাদ। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন না থাকায় কৃষকদের প্রত্যাশা—এবার হবে বাম্পার ফলন। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ বছর সাতকানিয়ায় ২শ ৭৪ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় ৯ হেক্টর বেশি।
পশ্চিম বাজালিয়ার ১ নম্বর ওয়ার্ডে সরেজমিনে দেখা যায়—চারদিক জুড়ে হলুদের সমারোহ। আমন ধান আগাম ঘরে ওঠায় পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা সরিষা আবাদ করেছেন। ফলে একই জমিতে আমন–সরিষা–বোরো—তিন দফা ফসল ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম বাজালিয়ার কৃষক নারায়ণ বলেন, “সরিষা চাষে রোপণ থেকে বাড়তি খরচ নেই, সেচও লাগে না। শুধু সার দিলেই চলে। কৃষি অফিস উন্নত বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করেছে—লাভ নিশ্চিত।” তিনি জানান, সরিষার গাছ জ্বালানি হিসেবেও কাজে আসে, আর সরিষা ওঠার পর একই জমিতে বোরো ধান রোপণ করায় সারের খরচও কমে।
একই এলাকার চাষি কাঞ্চন দে বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১২ শতক জমিতে সরিষা চাষ করেছি। সরকার থেকে ২৫ কেজি সার ও ১ কেজি উন্নত বীজ পেয়েছি। ফলন ভালো—কয়েক দিনের মধ্যেই ঘরে তুলব।’
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মনিরুজ্জামান জানান, চলতি মৌসুমে বারী সরিষা–১৮, বারী সরিষা–২০, বিনা সরিষা–৯ ও ১১—এই জাতগুলো চাষ হয়েছে। প্রণোদনা হিসেবে ৩শ ৭০ জন কৃষককে উন্নত বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সরিষা খেতে মৌমাছি আসে—মধু চাষ করলে কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়বে। আমরা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি।’
কম খরচ, ভালো ফলন ও বহুমুখী সুবিধায় সাতকানিয়ায় সরিষা এখন কৃষকের লাভের ফসল। প্রতি বছরই বাড়ছে আবাদ—হলুদ মাঠের এই সাফল্যই জানান দিচ্ছে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার গল্প।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান : জ্বালানি ও শ্রম সংকটের এই সময়ে বিনা চাষে সরিষা চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন বগুড়ার সারিয়াকান্দির প্রান্তিক
কৃষকেরা। স্বল্প খরচে ও অল্প সময়ের ব্যবধানে ভালো ফলন পাওয়ায় এই পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ উপজেলায় ৩ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এ বছর সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। যার বিপরীতে ৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে উৎপন্ন হয়েছে। গত বছর উপজেলায় হেক্টর প্রতি ১.৬ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হয়েছিল।
কৃষি বিভাগ আরও জানান, ধান কাটার পর জমি চাষ না করেই অবশিষ্ট আর্দ্রতার ওপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে উন্নত জাতের সরিষা বীজ। এতে জমি প্রস্তুতির খরচ কমেছে, সেচের প্রয়োজন হয়নি বললেই চলে। ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
উপজেলার নারচী ইউনিয়নের টিওর পাড়া গ্রামের কৃষক জুল্লু মিয়া (৫৫) বলেন, গত বছর ৩ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করে ১৮ মণ সরিষা পেয়েছিলেন। যা বাজারে ভালো দামে বিক্রি করে বেশ লাভবান হয়েছিলেন। এ বছরও ৪ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন তিনি। আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো ফলন হয়েছে। সরিষাগুলো পরিপক্ব হওয়া শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সরিষা জমি থেকে উত্তোলন করা শুরু করবেন। উপজেলার সর্ব দক্ষিণের ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামের কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যাংকার এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ জমিতে একই পদ্ধতিতে সরিষার আবাদ করেছিল। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী গত কয়েকবছর ধরেই কৃষকরা বিনা চাষে সরিষার আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। সরিষা থেকে একদিকে যেমন তৈল এবং খৈল পাওয়া যায়, অপরদিকে শুঁকনো উদ্ভিদ কৃষকরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন। যা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর খাবারসহ বিভিন্ন কাজেই ব্যবহার হয়।
শ্যামনগর কৃষকরা আমন ধানের চারা রোপণ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় প্রতিটি উপজেলায় কৃষকরা জমি প্রস্তুত, বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন এবং মূল জমিতে রোপণের কাজ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে । শ্যামনগর উপজেলা কৃষি ফসলের জন্য উর্বর ও মাটি ভেজা হওয়ায়। চাষিদের ফসল ফলানো সহজ।
উপজেলার কৃষকরাই বর্তমানে আমন ধানের চারা রোপণের কাজে ব্যস্ত। মাটি উর্বর ও নদীবিধৌত অঞ্চল হওয়ায় এই জেলাগুলো ধান চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
জমি তৈরি ও চারা রোপণ পদ্ধতি: আমন ধান রোপণের আগে কৃষকরা কয়েকটি ধাপে জমি প্রস্তুত করেন। কৃষকরা প্রথমে লাঙল বা ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করে আগাছা পরিষ্কার করা হয়। এর পর সমানভাবে সার (যেমন ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি) প্রয়োগ করা হয়।
পরে কাদা তৈরি করে মাটি সমান করা হয়, যাতে পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। বীজতলায় গজানো ২৫ থেকে ৩৫ দিন বয়সের চারাগুলো সারিবদ্ধভাবে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। এতে ফসলের পরিচর্যা, আগাছা দমন এবং কীটনাশক প্রয়োগের সুবিধা হয়।
উর্বর মাটিতে অন্যান্য কৃষি ফসল: ময়মনসিংহ বিভাগের মাটি শুধু আমন ধান নয়, আরও অনেক ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। এখানকার উর্বর মাটিতে যে প্রধান ফসলগুলো চাষ হয়।
যেসব ফসলগুলো চাষ হয়, উল্লেখ্য : আমনের পাশাপাশি বোরো ধানও এই অঞ্চলের প্রধান ফসল। পাট: এটি এখানকার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল।
আখ চাষেও এই অঞ্চলের বিশেষ সুনাম আছে। ভুট্টা এটিও বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। বিভিন্ন ধরনের সবজি আলু, বেগুন, টমেটো, লাউ, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা ইত্যাদি সবজির ব্যাপক চাষ হয়। ডাল ও তেলবীজ: মসুর, সরিষা, তিল ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাষ করা হয়। এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় চলতি মৌসুমে বিষমুক্ত ও নিরাপদ বেগুনের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো ফলন ও বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় খুশি স্থানীয় কৃষকরা।
এতে একদিকে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে বেগুন চাষে আগ্রহ বাড়ছে নতুন কৃষকদের মধ্যেও।
বুড়িচং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকরা বর্তমানে বেগুন ক্ষেতের পরিচর্যা ও সংগ্রহ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সরেজমিনে বাকশিমুল,ষোলনল ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে ধানি জমির ফাকে ফাকে সবুজ বেগুন ক্ষেত। স্থানীয় কৃষক কবির হোসেন,দেলোয়ার হোসেন ও মিনহাজুল ইসলাম জানান, ১২ মাসি বেগুন চাষে ভালো লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকরা জানান ৬০ শতক জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে ইতোমধ্যে ৯০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছেন।
সামনে আরও বিক্রির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তারা টমেটো চাষও করেছেন, যা বেগুন বিক্রি শেষ হলে বাজারজাত করা হবে।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বুড়িচং উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫হেক্টর বেশি। ভাঙর, বিটি বেগুন ও বারি বেগুন-৫ জাতের চাষ বেশি হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ, নেট ও ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ সরবরাহ করা হয়েছে।
বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিসেস আফরিনা আক্তার জানান, নিরাপদ ও বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদনে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়। কৃষকেরা পরিমিত মাত্রায় অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার এবং ফেরোমন ফাঁদের মাধ্যমে পোকা দমন করায় ফলন ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে পাইকারিতে কেজিপ্রতি ৬০-৭০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বেগুন।
বাকশিমুল ইউনিয়নের কৃষক মিনহাজ, কবির ও দেলোয়ার জানান, আগে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বেশি হতো। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে কম খরচে ভালো ফলন পেয়েছেন। ফলে লাভও বেশি হচ্ছে।
ষোলনল ইউনিয়নের কৃষক রুহুল বলেন, আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে দুই বিঘা জমিতে ভাঙর জাতের বেগুন চাষ করে তিনি ভালো ফলন পেয়েছেন,তবে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন সুযোগ সুবিধা পাইনি, সুযোগ সুবিধা পেলে নতুন নতুন চাষির আগ্রহ বাড়বে।এবিষয়ে শরিফ জানান বেগুন চাষ এখন সখের চাষে রুপান্তর হবে।
বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদন সম্ভব হয়েছে এবং বাজারেও ভালো দাম মিলছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রতিবেশী কৃষকদের সফলতা দেখে আগামী মৌসুমে আরও অনেকে বেগুন চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও জানান, নিরাপদ সবজির চাহিদা বাড়ায় ভবিষ্যতে বুড়িচং উপজেলায় বেগুন চাষের পরিধি আরও বাড়বে এবং কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।
কম খরচ, কম পরিশ্রমে বেশি ফলন এবং বাজারদর ভালো থাকায় বাদাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে তাহিরপুরে কৃষকদের। ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে বাদামের চাষ। উৎপাদিত বাদাম উন্নতমানের হওয়ায় দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা আছে বলে দাবি কৃষকদের।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারদর কম হওয়ায় কয়েক বছর ধরে বোরো ধান চাষে লোকসান গুনছেন তারা। অপরদিকে কম খরচ আর কম পরিশ্রমে বেশি ফলন হয় বাদামে। এমনকি বাজারদরও অনেক ভালো। তাই বাদাম বিক্রি করে অনেক মুনাফার কারণে আগ্রহ বাড়ছে তাদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬ টিতেই জমি বেলে-দোআঁশ মাটির হওয়ায় বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। চলতি বছর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের গ্রাম বড় খলা দক্ষিণ কুল রসুলপুর লুভার হাওর চিকসা গুটিলা মাহরাম বিনাকুলি ইউসুফ পুর কলাগাঁ লাকমা
এলাকায় ১হাজার ৪শত ৫০হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। প্রতি বছরই কৃষকেরা বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কৃষি অফিস বাদাম চাষে কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শসহ সহযোগিতা করে যাচ্ছে। দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া জানান, প্রতি কিয়ার বাদাম আবাদে যেখানে তাদের খরচ হয় ৫ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা সেখানে ৭ থেকে ৮ মণ ফলন হয়। আর প্রতি কিয়ার বাদাম বিক্রি হয় ২৪ থেকে ২৭ হাজার টাকা। তাছাড়া বাদাম গাছ গরুর সুষম খাদ্য ও রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই কম খরচে বেশি মুনাফা পাওয়ায় তারা লাভজনক ফসল বাদাম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
বালিজুরি ইউনিয়নের বড়খলা গ্রামের কৃষক ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি ৩ কিয়ার জমিতে বাদাম চাষ করেছি। প্রতি কিয়ার জমিতে ৩০০ কেজি বাদাম পাব আশা করছি ।
ধানের চেয়ে বাদামের দাম দ্বিগুণের বেশি থাকায় বাদাম চাষ করি। বাদাম চাষে খরচ কম হওয়ায় অনেক কৃষক চাষ করছেন।
বাদঘাট ইউনিয়নের বিন্নাকুলি গ্রামের দ্বীন ইসলাম বলেন, দুটি শিশু নিয়ে বাদাম চাষে ব্যস্ত সময় পার করছে।
তাহিরপুর উপ-সহকারী কৃষি অফিসার ফয়সাল আহমেদ বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার বাদাম চাষ বেশি হয়েছে। খরচ কম, দাম বেশি, তাই বাদাম একটি লাভজনক ফসল। কৃষকদের জমিতে গিয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, বাদাম চাষে তুলনামূলক খরচ কম হওয়ায় তাহিরপুরে দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকেরা।
এ বছর উপজেলায় ১৪৫০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। বাদাম চাষের উৎপাদন বৃদ্ধি, ভালো ফলনের জন্য উন্নত বীজ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কৃষি অফিস স্থানীয় কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শসহ সহযোগিতা করছে।
পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে আজ এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় কর্তৃক আয়োজিত প্রযুক্তি গ্রাম ‘ঘাটিয়ার পাড়া’-তে কৃষি যন্ত্রপাতির প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ণ কার্যক্রম সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আধুনিক রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করে স্থানীয় কৃষক মো. আফিজউদ্দীনের জমিতে ব্রি ধান১০২-এর চারা রোপণ করা হয়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের ফলে অল্প সময়ে, সমান দূরত্বে ও নির্ভুলভাবে রোপণ সম্ভব হচ্ছে, যা শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড়-এর প্রধান ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষকদের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতেই ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তিনি আরও জানান, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে স্বল্প বয়সী চারা ব্যবহার করে কম শ্রম ও কম খরচে দ্রুততম সময়ে সঠিক উপায়ে চারা রোপণ করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমে আসে, অন্যদিকে সারি থেকে সারি ও চারা থেকে চারার নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় থাকায় চারার সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়, যা ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কমিয়ে আনে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এলএসটিডি প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিফা তানজিম। তিনি বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় ঘাটিয়ার পাড়া গ্রামকে একটি আদর্শ প্রযুক্তি গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, মাঠ পর্যায়ে প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ণ এবং গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ সময় তিনি কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন এবং মাঠ পর্যায়ে যন্ত্রটির কার্যকারিতা তদারকি করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে ব্যবহৃত চারাগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল ব্রি বীজ বপণ যন্ত্রের মাধ্যমে। ওই দিন বিপুলসংখ্যক ট্রেতে সফলভাবে বীজ বপণ করা হয়, যা আধুনিক নার্সারি ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তব ও কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, যান্ত্রিকভাবে চারা রোপণের ফলে তাদের দীর্ঘদিনের শ্রমিক সংকট অনেকটাই নিরসন হবে এবং সময় সাশ্রয় করে অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ হ্রাস পাওয়ার ব্যাপারেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করায় কৃষকরা এলএসটিডি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করেন এবং প্রকল্প পরিচালকসহ ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড়-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের মাঠভিত্তিক কার্যক্রম শুধু ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতেই সহায়ক নয়, বরং স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
পেঁয়াজ দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান মসলা হলেও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩.৪ থেকে ৩.৭৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হলেও ব্যবহৃত বীজের প্রায় ৮৭ শতাংশই আমদানি করতে হয় প্রতিবেশী দেশ থেকে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার দেশীয়ভাবে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) কৃষি ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় প্রথমবারের মতো পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে উপজেলার কামাল্লা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের প্রগতিশীল কৃষক ফাহিম মিয়া তার ২৫ শতাংশ জমিতে ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত উন্নত জাতের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মুরাদনগরে এই প্রথম পরিকল্পিতভাবে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে এমন চাষাবাদ শুরু হয়েছে। কৃষি অফিসের কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তায় কৃষক ফাহিম মিয়া প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে এই চাষ সম্পন্ন করেছেন। প্রতি শতাংশ জমিতে গড়ে ১ কেজি বীজ উৎপাদন সম্ভব হলে মোট ২৫ কেজি পেঁয়াজ বীজ পাওয়া যেতে পারে। বাজারে বীজের মানভেদে যার মূল্য প্রতি কেজি ৫ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কৃষক ফাহিম মিয়া জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের অনুপ্রেরণায় তিনি প্রথমবারের মতো পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে এগিয়ে এসেছেন। ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এই চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খাঁন পাপ্পু বলেন, “আমরা কৃষককে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেছি। প্রকল্পটি সফল হলে মুরাদনগরে পেঁয়াজ বীজের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দেশের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে।”
এই উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মাঝেও ইতোমধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুরাদনগর উপজেলায় পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক কৃষি খাতে পরিণত হবে।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চরখিজিরপুর টেক্সঘর এলাকায় কর্ণফুলী নদীর চরে আগাম তরমুজ চাষ করে সাফল্যের নজির গড়তে চলেছেন উদ্যোক্তা মো. ফারুক সুজন। ১০ একর অনাবাদি জমিতে রেড ড্রাগন ও লাকি ড্রাগন জাতের তরমুজ চাষ করে মৌসুম শুরুর আগেই ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো লাভের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
বিস্তীর্ণ চরজুড়ে এখন সবুজের উচ্ছ্বাস। যতদূর চোখ যায়, সবুজ লতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ ছোট-বড় আকারের তরমুজ। বালুমাটি ভেদ করে গজিয়ে ওঠা চারাগুলো মাত্র দুই মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফলে ভরে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে, যেন মাটির ভেতর সারি সারি তরমুজ সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শাহানুর ইসলাম জানান, বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর ব্লকের ১০ একর অনাবাদি জমিতে এক উদ্যমী কৃষক আগাম জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে তরমুজ সরবরাহ করতে পারলে তিনি ভালো দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ দেখে আশপাশের কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে তরমুজ চাষের সফলতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে গত অক্টোবর মাসে আগাম তরমুজ চাষে উদ্যোগ নেন মো. ফারুক সুজন। প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি এ চাষ শুরু করেন। সাধারণত বীজ বপনের তিন মাস পর তরমুজ সংগ্রহ করা গেলেও এবার মাত্র দুই মাস ১০ দিনের মধ্যেই তরমুজ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন এই উদ্যোক্তা কৃষক। উৎপাদিত তরমুজ চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজার, টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হবে। রমজানের শেষ পর্যন্ত তরমুজ বিক্রি চলবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মাঠজুড়ে সারি সারি তরমুজ চাষের দৃশ্য এখন এলাকার মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। নিয়মিত ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক এই খেতে কাজ করছেন। আগাম তরমুজ চাষে সাফল্যের মাধ্যমে চরাঞ্চলের পড়ে থাকা অনাবাদি জমি কাজে লাগানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
জ্বালানি ও শ্রম সংকটের এই সময়ে বিনা চাষে সরিষা চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন বগুড়ার সারিয়াকান্দির প্রান্তিক কৃষকেরা। স্বল্প খরচে ও অল্প সময়ের ব্যবধানে ভালো ফলন পাওয়ায় এই পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে দিন দিন।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ উপজেলায় ৩ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এ বছর সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। যার বিপরীতে ৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে উৎপন্ন হয়েছে। গত বছর উপজেলায় হেক্টর প্রতি ১.৬ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হয়েছিল।
কৃষি বিভাগ আরও জানান, ধান কাটার পর জমি চাষ না করেই অবশিষ্ট আর্দ্রতার ওপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে উন্নত জাতের সরিষা বীজ। এতে জমি প্রস্তুতির খরচ কমেছে, সেচের প্রয়োজন হয়নি বললেই চলে। ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
উপজেলার নারচী ইউনিয়নের টিওর পাড়া গ্রামের কৃষক জুল্লু মিয়া (৫৫) বলেন, গত বছর ৩ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করে ১৮ মণ সরিষা পেয়েছিলেন। যা বাজারে ভালো দামে বিক্রি করে বেশ লাভবান হয়েছিলেন। এ বছরও ৪ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন তিনি। আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো ফলন হয়েছে। সরিষাগুলো পরিপক্ব হওয়া শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সরিষা জমি থেকে উত্তোলন করা শুরু করবেন। উপজেলার সর্ব দক্ষিণের ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামের কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যাংকার এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ জমিতে একই পদ্ধতিতে সরিষার আবাদ করেছিল। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী গত কয়েকবছর ধরেই কৃষকরা বিনা চাষে সরিষার আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন। সরিষা থেকে একদিকে যেমন তৈল এবং খৈল পাওয়া যায়, অপরদিকে শুঁকনো উদ্ভিদ কৃষকরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন। যা মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর খাবারসহ বিভিন্ন কাজেই ব্যবহার হয়।
সক্ষমতা যাচাই না করেই এক দিনের মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য এক দিন বয়সি মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। একইসঙ্গে বাজারে গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট তৈরির ঝুঁকি বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পোল্ট্রি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মুরগির সংখ্যা ছিল ২৬৮৩.৯৩ লাখ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬০.৭০ লাখে। একই সময়ে হাঁসসহ মোট পোল্ট্রির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪০৬৬.৫২ লাখ। এই বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করছে ধারাবাহিক ও সময়মতো এক দিন বয়সি বাচ্চা সরবরাহের ওপর।
সরকার বলছে, দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে স্বনির্ভর করতে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোই এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য। তবে, বাস্তবতায় সেই সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি বলে দাবি করছেন খামারিরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি বন্ধ করা হলে বাজারে তীব্র বাচ্চা সংকট তৈরি হবে।
খসড়া নীতিমালায় এক দিন বয়সি বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে কোটি কোটি বাচ্চার বাজার চলে যাবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা কোম্পানির কাছ থেকে নির্ধারিত দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন, যা কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করবে।
নীতিমালার খসড়া অনুযায়ী, এক দিন বয়সী কমার্শিয়াল মুরগির বাচ্চা আমদানির অনুমতি থাকবে না। তবে, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (জিপি) স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সংকট দেখা দিলে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ প্যারেন্ট স্টক (পিএস) আমদানির অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
তবে, নীতিমালায় ব্যবহৃত ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ শব্দবন্ধটি নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ। খাত-সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, কোন পরিস্থিতিকে ‘প্রয়োজনীয়’ ধরা হবে, সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং কত দিনের মধ্যে অনুমোদন মিলবে— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সংকটকালে প্রশাসনিক লালফিতার দৌরাত্ম্যে সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে এক দিন বয়সি বাচ্চা উৎপাদন মূলত হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। জিপি ও পিএস ফার্মের সংখ্যাও সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানে কোনো রোগ সংক্রমণ বা উৎপাদন ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস না থাকায় পুরো সরবরাহব্যবস্থা হঠাৎ অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মাঝারি আকারের এক খামারি বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা না পেলে পুরো ব্যাচ লোকসানে পড়ে যায়। তখন আমদানির সুযোগ থাকলে অন্তত উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হলে ছোট ও মাঝারি খামারিদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ছিল ১১৯১.২৪ কোটি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৪০.৬৫ কোটিতে। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উৎপাদন ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় উৎপাদন ব্যাহত হলে ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জিপি স্টক আমদানি করে সেগুলো বড় হতে সময় লাগে। এরপর ডিম উৎপাদন, সেখান থেকে পিএস এবং পরে বাণিজ্যিক বাচ্চা উৎপাদন— এই পুরো চক্র সম্পন্ন হতে কয়েক মাস থেকে এক বছরের বেশি সময় প্রয়োজন হয়। ফলে হঠাৎ কোনো রোগ প্রাদুর্ভাব বা উৎপাদন ব্যাঘাত ঘটলে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এক দিনের বাচ্চা বা হ্যাচিং ডিম আমদানির বিকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, ‘খসড়া নীতিমালায় এক দিন বয়সি বাচ্চা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে কোটি কোটি বাচ্চার বাজার চলে যাবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা কোম্পানির কাছ থেকে নির্ধারিত দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন, যা কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন খসড়া নীতিমালায় ক্ষুদ্র খামারিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নেই। নতুন খামার স্থাপন ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় কোম্পানির প্রভাব থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ডিম ও মুরগির বাজারদর অস্থির থাকবে এবং ভোক্তারা স্বস্তি পাবেন না।’
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) যুগ্ম মহাসচিব কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, ‘পোল্ট্রি শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় ভিত্তি। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ যুক্ত। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি নিষিদ্ধ করা হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।’
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এক দিন বয়সি মুরগির বাচ্চা আমদানি বন্ধ করা হলে সংকটকালে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। আমদানি নিষিদ্ধের আগে বিকল্প ব্যবস্থা, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাঠামো রয়েছে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন ও পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, ‘দেশে এক দিন বয়সি পোল্ট্রি বাচ্চার দৈনিক একটি স্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে। আমদানি বন্ধের আগে দেখতে হবে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে এই চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করার সক্ষমতা আছে কি না এবং খামারিরা ন্যায্য দামে নিয়মিত বাচ্চা পাচ্ছেন কি না। বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণনে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া আইন করে আমদানি নিষিদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই সব পক্ষের মতামত নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত’।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর এলাকায় বরই চাষ করে গত ১৭ বছর ধরে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আজাদুর রহমান। কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত তার বাগানের বরই এখন স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক যুবক এখন বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
আজাদুর রহমান কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের শ্রীসূর্য নয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মো. আব্দুল জব্বারের ছেলে। মাস্টার্স পাস করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে তার বাগানে থাই আপেল কুল, বাউকুল, জাম্বুকুল ও ঢাকা-৯০, টক মিষ্টি কুল, জাতের বরই চাষ হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা বাগানের প্রতিটি গাছ ফলভারে নুয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-৯০ জাতের বরইয়ে গাছগুলো ছেয়ে আছে। ফলের ভার সামলাতে প্রতিটি গাছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পুরো বাগানটি জাল দিয়ে ঘেরা। প্রতিদিন বরই সংগ্রহ ও বিক্রির কাজে মুসলিমসহ ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
আজাদুর রহমান জানান, ‘প্রতি বছর বরই ও ফুলগাছের চারায় প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি আয় করছেন ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল জাতের বরই চাষ করে তিনি বেশি লাভবান হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল প্রতি কেজি ১০০ টাকা এবং বাউকুল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন তার বাগান থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি বরই সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ৮ একর জমিতে বরই চাষ করতে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছি। বাগানে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই আছে। বরই চাষে অল্প সময়েই লাভবান হওয়া যায়। বরই বিক্রির পাশাপাশি কলম চারা তৈরি করি। বিভিন্ন ফল ও ফুলের চারাও বিক্রি করছি।’
বরই বাগান দেখতে আসা মৌলভীবাজার সদর থেকে আগত মামুন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে আসছেন। আমরাও ১০ কেজি বরই নিয়েছি। বরইগুলো খুবই সুস্বাদু। আজাদুর রহমান ভাই এই বাগান করে স্বাবলম্বী হয়েছেন, যা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
বরই কিনতে আসা স্থানীয় শিক্ষার্থী নাজমিন বলেন, ‘শমশেরনগর বিমান ঘাঁটি এলাকার বরই খুবই মজাদার। তাই অনেক দূর থেকে বরই কিনতে এসেছি। ৫শত টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫ কেজি বরই নিয়েছি।’
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষিবিদ জয়েন্ত কুমার রায় জানান, ‘চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে বরই আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় বরইয়ের ফলন ভালো হয়েছে। শমশেরনগরে আজাদুর রহমানের বাগানের বরই খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। তার বাগান দেখে অনেক বেকার যুবক বরই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কৃষকরা নিজেরাই ভালো জাত নির্বাচন করে রোপণ করছেন, ফলে ফলনও ভালো হচ্ছে। বরই চাষে আজাদুর রহমানের এই সাফল্য এখন শুধু একটি বাগানের গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে কমলগঞ্জের কৃষি সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এদিকে, অষ্টেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল বরই চাষ করে ভাগ্য বদল হয়েছে প্রবাসী আব্দুস সালামের। তার বাড়িও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। প্রবাসী আব্দুস সালাম সম্প্রতি বলেন, ইউটিউব দেখে উৎসাহিত হয়ে মেহেরপুর জেলা থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ১৬০টি চারা কুড়িয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আনেন। পরে ১০টি চারা মারা যায়, তারপর ১৫০টি ছাড়া নিয়ে তার বাড়ির পাশে পরিত্যাক্ত ২৫ শতাংশ জমিতে এই অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল কুল বরই চাষ শুরু গ্রহণ করেন। প্রায় ৮ মাসের মাথায় সবকটি গাছেই বরই আসতে শুরু করে। তার বরই চাষে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। আর এখন প্রতি সপ্তাহে অনলাইনে বড়ই বিক্রয় করেন ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার। দিন যতই যাচ্ছে ততই তার বরইয়ের চাহিদা বাড়ছে। তার এই বরই বাগান দেখে আগ্রহী হচ্ছে উপজেলার অনেক ছাত্র ছাত্রী, যুবক ও কৃষকরা।
জানা যায়, উপজেলার কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের কুমড়াকাফন গ্রামের কৃষক আব্দুল খালিকের ছেলে আব্দুস সালাম, জীবিকার তাগিদে ভাগ্য বদলের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে গিয়েছিলেন বিদেশ। বিদেশ যাওয়ার পর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন কাজ করতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে যান। প্রায় তিন বছর পর বাংলাদেশ রিয়াদ এম্বেসির মাধ্যমে খালি হাতে দেশে ফিরে আসেন আব্দুস সালাম।