কৃষির কথা মাথায় রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানায় আগামী ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, ‘যদিও বিদ্যুতের উৎপাদনে আমাদের ক্ষতি হবে, তার পরও দেশের কৃষির কথা চিন্তা করে আমরা ১ মে থেকে ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এলাকার ঘরে ঘরে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের ওপর বক্তব্যে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চাপ কমে যাওয়ার ফলে এখন যেসব বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংযোগ আছে, সেখানে সরবরাহ কমে গেছে। সে জন্য আমরা এখন শুধু উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিল্পকারখানাগুলোকে যতখানি পারছি গ্যাস সরবরাহ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলনের জন্য কোনো রকম অনুসন্ধান করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা বাপেক্সকে শক্তিশালী করে অনুসন্ধানী কাজ শুরু করেছি। যদি এই অনুসন্ধানে সফল হই, আশা করি যেসব গ্যাস সংযোগ দেওয়া আছে, সেসব জায়গায় চাপ বৃদ্ধি করতে পারব।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আসলে কোনো রকম জ্বালানি অনুসন্ধান হয়নি। বাপেক্সকে শক্তিশালী করাও হয়নি। তবে সুখবরও আছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ১১ কিলোমিটার এলাকায় ৯টি স্থানে ২৭টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৩৩৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এই মাসের ১৯ তারিখ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসফিল্ডে নতুন গভীর কূপ অনুসন্ধানে খনন শুরু হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীর কূপটি খননে প্রায় সাত মাস সময় লাগবে। এটি দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
রুমিন ফারহানা বলেন, গ্যাসের অভাবে আশুগঞ্জ সার কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি দ্রুত সার কারখানাটিতে গ্যাস দিয়ে সেটি চালুর দাবি জানান। জবাবে মন্ত্রী আশুগঞ্জ সার কারখানায় ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শেরপুরের নকলা উপজেলার পেকুয়া বিলের এক সময়ের ‘অভিশাপ’ হিসেবে পরিচিত জলজ উদ্ভিদ ‘ঝাই’ এখন স্থানীয় শতাধিক পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। শ্যাওলাজাতীয় এই ভাসমান উদ্ভিদ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিলপাড়ের তিনটি গ্রামের কয়েকশ মানুষ। কোনো খরচ ছাড়া বিল থেকে প্রকৃতিপ্রদত্ত এই ঝাই সংগ্রহ করে বিক্রি করে তারা এখন স্বাবলম্বী। আধুনিক মৎস্য চাষে ফিডের বিকল্প ও সাশ্রয়ী প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে স্থানীয় মাছচাষিদের কাছে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়দের কাছে এটি নেওড়া ঘাস, পানি তরুলতা, পাইনসে ঘাস বা জলঢাকনা নামেও পরিচিত। একসময় ২১৯ একর আয়তনের বিশাল পেকুয়া বিলে এই ঝাইয়ের তীব্র আধিক্যের কারণে জেলেরা মাছ ধরতে পারতেন না। জাল ফেললেই ঝাই আটকে যেত, ফলে মাছের প্রজনন ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হতো। তবে সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে এই ঝাই বিলপাড়ের গণপদ্দি, জালালপুর ও গজারিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত শ্রমিকরা নৌকা নিয়ে বিলের গভীরে গিয়ে এই ঝাই সংগ্রহ করেন। পরে ডাঙায় এনে পানি ঝরিয়ে ভ্যানে করে পৌঁছে দেওয়া হয় বিভিন্ন মৎস্য খামারে। ব্যবসায়ীরা জানান, এক ভ্যান ঝাইয়ের ওজন প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ হয়, যা আকার ও দূরত্বভেদে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং ও তেলাপিয়া মাছের প্রিয় খাবার হিসেবে এটি অত্যন্ত কার্যকর। ফিডের দাম চড়া হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যচাষিরা খরচ কমাতে এই প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ঝুঁকছেন।
বিলে ঝাই সংগ্রহকারী আব্দুর রফিক ও মুত্তালেব জানান, একসময় বিলে জাল নামাতে পারতেন না বলে অভাব-অনটনে দিন কাটত। পরে দেখলেন মাছচাষিরা পুকুরে ঝাই দিচ্ছেন। সেই থেকে তারা বিল থেকে ঝাই সংগ্রহ শুরু করেন। গত ছয়-সাত বছর ধরে এই ঝাই বিক্রি করেই তাদের সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলছে। মাছচাষি মনির হোসেন বলেন, ‘দুই ভ্যান ঝাই দিয়ে আমার চারটি বড় পুকুরের ১০ দিনের খাবারের চাহিদা মেটে। এতে বাজার থেকে কেনা কৃত্রিম ফিডের পেছনে হাজার হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। তা ছাড়া এই ঘাস খেয়ে বড় হওয়া মাছের গায়ের রঙ ও স্বাদও ভালো থাকে।’
নকলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে ঝাই বেশ পুষ্টিকর। এটি ব্যবহারের ফলে মৎস্য চাষিদের উৎপাদন খরচ যেমন কমছে, তেমনি স্থানীয় বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বিল পরিষ্কার হচ্ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই প্রাকৃতিক সম্পদকে আরও বৃহৎ পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাটোরের সিংড়া চলনবিল এলাকায় বোরো ধান কাটা উৎসবের উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে চলনবিল এলাকায় ধান কাটা উৎসব উদ্বোধন করেন নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত, সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিঠুন কুন্ডু, উপজেলা প্রকৌশলী খলিলুর রহমান, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন প্রমুখ।
এবারও বোরো ধানের বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার চাষিরা। তবে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছে তারা। আকাশে ঘনকালো মেঘ দেখলেই চাষিদের কপালে পড়ছে চিন্তার ভাজ। ধান কেটে মাড়াই করে ঘরে না তোলা পর্যন্ত তাদের দুশ্চিন্তা শেষ হচ্ছে না।
জীবননগর উপজেলার ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে শুধু ধান আর ধান। ধানের শীষগুলো এখন সোনালি বর্ণ ধারন করা শুরু করেছে। সোনালি ধানের শীষে যেন দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। আর মাত্র ৭-১০ দিন পর থেকে পুরোদমে ধান কাটার কাজ শুরু হবে।
ধানের ফলন ভালো হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান সঠিক সময়ে ঘরে তোলা নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় আছে চাষিরা।
ধান চাষি শাহাবুদ্দীন বলেন, ডিজেল সংকটের কারনে ধানে সেচ দিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবুও আল্লাহ রহমতে ধানে খুব ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু ঝড়বৃষ্টি নিয়ে খুব টেনশনে আছি। আকাশে মেঘ দেখা দিলেই দুশ্চিন্তা বাড়ছে। ধান ঘরে না তোলা পর্যন্ত এই চিন্তা শেষ হচ্ছে না।
ছাত্তার আলী নামের আরেক চাষি বলেন, ২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। পাম্পে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে তেল নিয়ে সেচ দিচ্ছি। আর ১ সপ্তাহে পরে ধান কাটার উপযুক্ত হবে। এখন বৈশাখ মাস ঝড়বৃষ্টির সময়। এজন্য ফসল বাড়ি নিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত আছি।
লিটন হোসেন নামের আরেক ধান চাষি বলেন, সপ্তাহ খানিক পর থেকে মাঠে পুরোদমে ধান কাটার কাজ শুরু হবে। একসাথে ধান কাটার কাজ শুরু হলে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে। আবার আবহাওয়াও ভালো যাচ্ছে না।সবকিছু মিলিয়ে ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এরকম অনেক চাষি বৈরী আবহাওয়া জন্য ধান নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, জীবননগর উপজেলায় এবছর ৭ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এবার ধানের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক ফসল ঘরে তুলবেন চাষিরা। ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে কর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার সংবাদসহ কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়া ও সহযোগিতা করার জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় আগাম জাতের বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের কারণে কৃষকদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি ফুটেছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শশীদল, মালাপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়া সদর ও চান্দলা ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি মাঠে ইতোমধ্যে আগাম জাতের ধানকাটা শুরু হয়েছে। কৃষকেরা ধানকাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা কয়েকদিনের রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার কারণে ধান দ্রুত শুকানো সম্ভব হচ্ছে। এতে ধান ঝাড়াই-বাছাই ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সহজ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ব্রাহ্মণপাড়ায় বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে। তবে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
সদর ইউনিয়নের কৃষক মোহন মিয়া বলেন, ‘এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধান কাটতেও সুবিধা হচ্ছে। ভালো দাম পেলে আমরা লাভবান হব।’
সিদলাই ইউনিয়নের কৃষক মান্নান বলেন, ‘আগাম জাতের ধান কাটতে পেরে আমরা খুশি। আবহাওয়া এমনই ভালো থাকলে ধান শুকানোতেও কোনো সমস্যা হবে না।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন জানান, ‘এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা নিয়মিত প্রদান করা হচ্ছে।’
কৃষি বিভাগের মতে, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
নওগাঁর রানীনগরে চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ধানে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা ঝলসানো (বিএলবি) রোগ। এ রোগের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করেও তেমন কাজ হচ্ছে না। এতে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন পাঁচ–ছয় মণ কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে এমন পরিস্থিতিতেও মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তেমন দেখা মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রানীনগর উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জিরাশাইল, কাটারিভোগ, ব্রি-৯০ সহ বিভিন্ন জাতের ধান রোপণ করা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে ধানে তেমন কোনো রোগবালাই ছিল না। তবে শিষ বের হওয়ার সময় ধানগাছের পাতার আগা থেকে শুকিয়ে ধীরে ধীরে পুরো গাছে ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন আগাছানাশক ছিটিয়ে গাছ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রোগের প্রভাব বাড়তে থাকলেও কৃষকদের পরামর্শ দিতে মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের ব্লক সুপারভাইজারদের দেখা যায় না বলে অভিযোগ তাদের।
উপজেলার ভাটকৈ গ্রামের কৃষক সোনামদ্দীন জানান, তিনি এবার আট বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন। এর মধ্যে হঠাৎ করে আড়াই থেকে তিন বিঘা জমির ধান পাতামরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
মালশন গ্রামের কৃষক ওয়াজকরুনি জানান, তিনি এবার প্রায় ৩২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ বিঘা জমির ধানের পাতা শুকিয়ে গেছে। তার ভাই আব্দুল বাকির প্রায় ২৫ বিঘা জমির ধান একই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ধান রক্ষা করতে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। মাঠে কোনো ব্লক সুপারভাইজার বা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ পাচ্ছি না। ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো ফল হচ্ছে না।’
জলকৈ গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন জানান, তিনি এবার প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন। এর মধ্যে কমবেশি প্রায় সব জমির ধান পাতামরা রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এটি বিএলবি রোগ বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তার আশঙ্কা, এ রোগের কারণে বিঘাপ্রতি পাঁচ–ছয় মণ ধান কম ফলন হতে পারে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রানীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছি। ধান রোপণের পর গাছ ভালো থাকলেও অনাবৃষ্টি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়-বৃষ্টির কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা ঝলসানো (বিএলবি) রোগের বিস্তার ঘটেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে, তাই এতে খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
বগুড়ার নন্দীগ্রামে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তবে কৃষি অফিস তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেল ৩টার পর থেকে নন্দীগ্রাম উপজেলাজুড়ে আকাশে মেঘ জমতে থাকে। বিকেল পৌনে ৫টা থেকে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়।
নন্দীগ্রাম উপজেলার হাটলাল গ্রামের কৃষক আফছার আলী বলেন, আমাদের এলাকায় ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এখন বোরো ধানের ফসলি জমিতে ধানের শীষ বের হচ্ছে। এমন অবস্থায় যে পরিমাণে শিলাবৃষ্টি হলো, এতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজীউল হক বলেন, বোরো ধান পাকার অনেক দিন বাকি। এই ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে এক বিশাল কৃষি সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেছে। উপজেলার গোমড়া, হলদিগ্রাম ও সন্ধাকুড়া অঞ্চলে মাইলের পর মাইল এলাকাজুড়ে এখন দেখা যায় সবুজের সমারোহ। পাহাড়ের ঢালু আর উর্বর মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে কাঁকরোল, ঝিঙা, ধুনদল, চালকুমড়া ও বেগুনসহ নান শাক-সবজি। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন পুরোপুরি কৃষিনির্ভর হয়ে পড়েছে, ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মাঠের পরিচর্যায়। সন্ধাকুড়া ও গোমড়া, হলদিগ্রাম এলাকার প্রতিটি পরিবারই মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে সফলতার মুখ দেখছেন। কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের গোমড়া, সন্ধাকুড়া ও হলদিগ্রামের প্রায় শতভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষিপণ্য চাষ করে আমরা বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভবান। তবে আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অনেক সময় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে খামার গড়ার পর হঠাৎ ঝড়, অতিবৃষ্টি বা বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে গেলে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। সেই মুহূর্তে সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করত, তবে আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম।’
পাহাড়ি এলাকার এই কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নিরলস কাজ করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে ফলনও হচ্ছে অভাবনীয়।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন জানান, গারো পাহাড়-সংলগ্ন এই অঞ্চলটি কৃষির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কৃষকদের ফলন বৃদ্ধিতে আমি নিজে এবং আমার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে পরামর্শ ও তথ্য প্রদান করছি। সরকারি বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আমরা সর্বদা কৃষকদের পাশে আছি।
বর্তমানে এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চলটি দেশের প্রধান কৃষি হাবে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গারো পাহাড়ের এই কৃষি বিপ্লব কেবল ঝিনাইগাতী নয়, বরং গোটা শেরপুর জেলার সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গোমরা গ্রাম। একসময় যে মাটিকে কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জিং মনে করা হতো, আজ সেখানেই এক অভাবনীয় কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক মো. আনোয়ার হোসেন। মরুভূমির ফল ‘সাম্মাম’ থেকে শুরু করে শত শত সফেদা, লিচু ও বিভিন্ন জাতের সবজির বাণিজ্যিক চাষে তার এই সাফল্য এখন পুরো জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের এই যাত্রার শুরুটা ছিল অনেকটা কৌতূহল আর সাহসের মিশেলে। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো নিজের পৈতৃক জমিতে ইউটিউব দেখে প্রথমবারের মতো চাষ শুরু করেন মরুর ফল সাম্মাম। প্রথমবারেই আশাতীত সাফল্য পাওয়ায় তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। বর্তমানে তার বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে সফেদা, পেয়ারা ও লেবু। এ ছাড়া বিস্তৃত এলাকাজুড়ে চাষ হচ্ছে কাঁকরোল, কলা ও প্রচুর পরিমাণ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন সজনে ডাটা। তার এই বাগান এখন এলাকার জন্য একটি সবজি ও ফলের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আনোয়ার হোসেনের নিষ্ঠা নজর কেড়েছে সবার। তিনি তার বাগানে কোনো ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন না। এর পরিবর্তে তিনি পরিবেশবান্ধব ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদ’ ব্যবহার করে ক্ষতিকারক মাছি পোকা দমন করছেন। আনোয়ার বলেন, ‘বাণিজ্যিক লাভের চেয়েও আমার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের কাছে বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল পৌঁছে দেওয়া। আমি চাই কৃষকরা যেন সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক ও জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হয়। সরকারিভাবে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই গারো পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।’
শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আনোয়ারের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয় বলে অভিহিত করেছেন। ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন জানান, আনোয়ার প্রমাণ করেছেন আধুনিক কৃষিতে মেধা ও শ্রম দিলে পাহাড়ের মাটিতেও সোনা ফলানো সম্ভব। তার চাষাবাদ দেখে স্থানীয় অনেক বেকার যুবক এখন কৃষির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন এবং কৃষি বিভাগ থেকে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল আমীন এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘আনোয়ার হোসেন এক চমকপ্রদ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। গারো পাহাড়ের পতিত জমিতে তার এই সফলতা কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে এবং তার মতো সৃজনশীল কৃষকদের যাবতীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’ আনোয়ারের এই কৃষি বিপ্লব শুধু শেরপুর নয়, বরং সারাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
পাবনার ভাঙ্গুড়াতে ইরি-বোরো জমির আগাছা অপসারণে ব্যস্ত চাষিরা। উপজেলার সব মাঠেই এমন চিত্র চোখে পড়ছে। নারী-পুরুষ শ্রমিকরা সমানতালে ধানক্ষেতে জন্মানো আগাছা পরিস্কারের কাজ করছেন। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় সবুজ ধান গাছে মাঠে মাঠে ছেয়ে গেছে।
উপজেলার বড়পুকুরিয়া মাঠে ওই এলাকার কৃষক নুরইসলাম হোসেন কয়েকজন নারী-পুরুষ শ্রমিকসহ নিজেও তার ধানের জমি থেকে আগাছা পরিস্কার করছেন। কৃষক নুর ইসলাম বলেন, চলতি বছর সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে ইরির আবাদ করেছি। ধানগাছও বেশ ভালো হয়েছে। ধানের জমিতে ছোট ছোট আগাছা জন্মেছে। সেগুলো তুলে ফেলছি। একই সঙ্গে ধান গাছের গোড়ার মাটি একটু আলগা করে দিচ্ছি। এতে ধানের গাছগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা খানমরিচ ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষক শাহিদুল বলেন, প্রতিবছরই আমি ৩০ বিঘা জমিতে ইরি চাষ করি। এবছরও করেছি। আমার জমির ধানের গাছগুলো খুব ভালো হয়েছে। তবে গাছের গোড়ায় ছোট ছোট বিভিন্ন ধরনের আগাছা জন্মেছে। কয়েক দিন যাবৎ শ্রমিক দ্বারা আগাছাগুলো অপসারণ করে নিচ্ছি। সীমান্ত এলাকা উপজেলার দুধবাড়িয়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক হাফিজুর রহমান একই উক্তি প্রকাশ করেন।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন জাহান বলেন, উপজেলায় চলতি বছর প্রায় ৭০৫০ হাজার হে. জমিতে ইরি-বোরো চাষ করেছেন কৃষকেরা। আগাছা পরিস্কারের সাথে সাথে ধান গাছের গোড়ার মাটিও নাড়াচারা হয় এতে ধান গাছ মাটি থেকে অক্সিজেন আরো সহজেই পাবে তাতে গাছ দ্রুত বাড়বে বলেও জানান তিনি।
বাগেরহাটের শরনখোলা উপজেলার দক্ষিণ বাদাল গ্রামে কুল চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে কয়েকটি পরিবার। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এসব কুল বাগান তাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
দক্ষিণ বাদাল গ্রামের কৃষক সরোয়ার হাওলাদার (৫০) জানান, তার বাগানে মোট ৬৯২টি কুল গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বড় সুন্দরী ৭৬টি, আপেল কুল ৮টি এবং বাকিগুলো বাউকুল জাতের। এ বছর তিনি কুল বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় করেছেন। স্থানীয় বাজারে তিনি প্রতি কেজি কুল ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
সরোয়ার হাওলাদার বলেন, তার তিন ছেলে, সহধর্মিণী এবং তিনি নিজে মিলে বাগানের পরিচর্যা করেন। পরিবারের সদস্যদের শ্রমে খরচ কমে এবং গাছের যত্নও ভালোভাবে করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় তাফালবাড়ি বাজারে কুল বিক্রির পাশাপাশি জেলার বাইরে মঠবাড়িয়ার সাফা, তুষখালী, মাছুয়া ও মঠবাড়িয়া বাজারে বেশি কুল বিক্রি হয়। বাইরে বিক্রি করতে কিছু অতিরিক্ত খরচ হলেও সেখানে লাভ তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়।
স্থানীয়রা জানান, দক্ষিণ বাদাল এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৭ থেকে ৮টি পরিবার বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষ করছেন। সঠিক পরিচর্যা ও ভালো বাজার পাওয়ায় এই চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকার মাটি ও আবহাওয়া কুল চাষের জন্য উপযোগী। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচর্যা থাকলে কুল চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক একটি সম্ভাবনাময় ফসল হতে পারে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খাল ও ক্যানেল নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও পানির অভাবে তা এখন প্রায় নামসর্বস্ব প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় অবকাঠামো থাকলেও সেচ ক্যানেলে পানি পৌঁছাচ্ছে না। ফলে উপজেলার হাজার হাজার কৃষক এখন বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর হয়ে বাড়তি খরচে চাষাবাদ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরেজমিনে গঙ্গাচড়ার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা নদীর বুকজুড়ে এখন বালুর স্তূপ। বর্ষা মৌসুমে যেখানে পানিপ্রবাহ কয়েক লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে কয়েক হাজার কিউসেকে। অনেক সময় প্রবাহ আরও কমে যাওয়ায় সেচ ক্যানেলে পানি সরবরাহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিস্তা ব্যারেজ থেকে পরিচালিত সেচ প্রকল্পের প্রধান ও শাখা খালগুলো রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় বিস্তৃত। এর একটি বড় অংশ গঙ্গাচড়া উপজেলাজুড়ে রয়েছে। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খাল সম্প্রসারণ ও সংস্কারের কাজ চললেও মূল উৎস নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকরা এর সুফল পাচ্ছেন না।
গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল এলাকার কৃষক নূরুল হুদা বলেন, তিস্তার পানি পেলে বিঘা প্রতি সেচ খরচ হতো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এখন শ্যালো মেশিন দিয়ে ডিজেল পুড়িয়ে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্যানেল তৈরি হয়েছে, গেট হয়েছে, সবকিছুই আছে। কিন্তু পানি নেই। প্রতি বছর ক্যানেল কাটে, সংস্কার করে কিন্তু আমরা কোনোদিন ঠিকমতো পানি পাই না।
আরেক কৃষক এসোব আলী বলেন, তিস্তা ক্যানেলে পানি পেয়ে চাষাবাদ করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু এখন বিকল্প সেচে দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। এতে লাভের বদলে ক্ষতির মুখে পড়ছি।
তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির (বাপা) সভাপতি ফরিদুল ইসলাম ফরিদ বলেন, উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পের ক্যানেলগুলোতে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন বলেন, বর্তমানে বোরো মৌসুম চলছে। বোরো ধান চাষের জন্য নিয়মিত সেচ পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেচ ক্যানেলে পানি না থাকায় আমরা আমাদের চাষাবাদ পরিকল্পনা অনুযায়ী সেচ দিতে পারছি না। এতে আমাদের খরচ বাড়ছে এবং ফসলের ফলন অনিশ্চিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় সেচ ক্যানেলে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে কৃষকরা বলছেন, তিস্তার পানি না এলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ক্যানেল তাদের কোনো কাজে আসছে না। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে উত্তরের কৃষি ব্যবস্থা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
গতবারের চেয়ে এ বছরে ১ হাজার হেক্টর জমিতে গম চাষ বেশি হচ্ছে পঞ্চগড় সদর উপজেলায়। গত মৌসুমে গম চাষ হয়েছে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এ বছরে তা বেড়ে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হচ্ছে। গম চাষিরা জানান, মাঠে বোরো আবাদে প্রচুর পানি থাকায় গম আবাদে অসুবিধা হয়। এজন্য গম চাষ কম হয়। এবার আলুর চাষ কিছুটা কম হওয়ায় চলতি মৌসুমে গম চাষের জমির পরিমাণ বেড়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার গ্রামের কৃষক সজীব আহম্মেদ, বাবু, হাসান, আতোয়ার, উপজেলার মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ধানের জমির মাঝে গম আবাদে অসুবিধা হয়। তাই উঁচু জমিতে প্রতি বছরই আমরা গম আবাদ করি।
সেচসহ অন্য উৎপাদন খরচ কম, তুলনামূলক রোগবালাইও কম এবং গম তুলে সরাসরি অন্য যেকোনো ফসল চাষ করা যায়। ফলে গম আবাদে তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুন্নবী জানান, মাটি বেলে ও দো-আঁশ হওয়ায় গম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। অন্য ফসলের তুলনায় গম চাষে খরচ কম ও দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকদের গম চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি মৌসুমে গম চাষ সফল করতে মাঠ পর্যায়ে সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের নাম মদন। একসময় সাধারণ কৃষিপ্রধান গ্রাম হিসেবে পরিচিত হলেও এখন অনেকেই এটিকে চেনেন ‘পাটবীজ গ্রাম’ হিসেবে। উদ্যোক্তা আবু হানিফের হাত ধরে এখানে তৈরি হয়েছে শত শত নতুন উদ্যোক্তা। পাটবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন কৃষকেরা, তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। আগে কাজের খোঁজে বাইরে যেতে হলেও এখন গ্রামেই মিলছে নিয়মিত আয়।
একসময় এই গ্রামে পাট চাষ হলেও মানসম্মত বীজের অভাবে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতেন না। রোগবালাই ও কম উৎপাদনে হতাশ ছিলেন অনেকে। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। পাটবীজকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে পুরো এলাকা। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা আবু হানিফ।
গবেষণালব্ধ বীজ নিয়ে কাজ শুরু করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন সফল বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা। তার উৎপাদিত এইচসি-৯৫ জাতের বীজ ব্যবহার করে কৃষকেরা বিঘাপ্রতি পাচ্ছেন প্রায় ১৬ মণ পর্যন্ত পাট। যেখানে প্রচলিত আমদানিকৃত ভারতীয় জাতের বীজে ফলন হয় ১০ থেকে ১২ মণ।
আবু হানিফ জানান, শৈশব থেকেই তিনি পূর্বপুরুষদের কৃষিকাজ দেখে বড় হয়েছেন। তাদের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পাটের আবাদ হতো। কিন্তু রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেই পাটের অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেত। প্রত্যাশিত ফলনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক উৎপাদন পেতেন তারা।
পড়াশোনা শেষ করে কৃষিকাজেই মনোযোগ দেন আবু হানিফ। পাটের ফলন বাড়ানোর উপায় খুঁজতে তিনি যোগাযোগ করেন পাট গবেষকদের সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পাটবীজ উৎপাদনের যাত্রা। প্রথম বছরে উৎপাদিত বীজের অর্ধেক নিজের কাছে রেখে বাকিটা স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দ্রুত আস্থা তৈরি হয়। পরে অন্য কৃষকেরাও তার বীজ ব্যবহার শুরু করেন।
আবু হানিফ বলেন, ‘সরকার প্রতি বছর চার হাজার টনের বেশি পাটবীজ আমদানি করে। দেশের বড় একটি অংশ এখনও আমদানিনির্ভর। এইচসি-৯৫ জাতটি যদি সরকারি উদ্যোগে সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে।’
মদন গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সুকায়েত বলেন, আগে বীজ আনতে বা বিক্রি করতে দূরে যেতে হতো। এখন পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে বীজ কিনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘কেনাফ পাটের বীজ চাষ ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক। এতে সেচ, সার ও শ্রমিক কম লাগে, বাজারেও ভালো চাহিদা রয়েছে।’
একই গ্রামের কৃষক ওমর সিদ্দিক বলেন, কেনাফ পাটের বীজের বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় উৎপাদনের পর বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। পাশাপাশি পাট চাষে জমির উর্বরতাও বাড়ে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য উপকার বয়ে আনে।
তিনি জানান, আবু হানিফের পরামর্শে প্রথমে ৫০ শতাংশ জমিতে পাট আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলন ও লাভ দেখে এবার তিনি ছয় একর জমিতে পাট চাষ করেছেন। আবু হানিফের সফলতা দেখে এলাকায় দুই থেকে আড়াইশ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আবু হানিফের খামারে নিয়মিত কাজ করেন মো. রতন মিয়া। তিনি বলেন, ‘আগে কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো। এখন কেনাফ পাটবীজ চাষের কারণে গ্রামেই কর্মসংস্থান হয়েছে।’
পাশের খয়রত গ্রামের কৃষক শাহ আলম জানান, কেনাফ পাটের নিচের অংশ ভালো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, ফলে কৃষকেরা বাড়তি সুবিধাও পান।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, কিশোরগঞ্জের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, আবু হানিফের উৎপাদিত বীজের গুণগত মান ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা তার কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করছেন। তার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আবু হানিফের গ্রামটিকে এখন অনেকে পাটবীজ গ্রাম হিসেবে চেনে। তার হাত ধরে দুই শতাধিক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। কিশোরগঞ্জকে যদি পাটবীজ উৎপাদনের হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি সারাদেশে বিশেষ পরিচিতি পাবে।’