সাধারণত আঙুর চাষের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিদেশের বিস্তীর্ণ বাগান কিংবা দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল। তবে সেই প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছেন নাটোরের এক কৃষিপ্রেমী শিক্ষক। শখের বসে শুরু করা আঙুর চাষই এখন তাঁর সাফল্যের নতুন গল্প। ইউটিউব দেখে শেখা সেই উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক বাগানে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষিপ্রেমী শিক্ষক আব্দুল আজিজ ছাত্রজীবন থেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহী। এর আগে তিনি পটল, ড্রাগন ফল, আপেল কুল ও ভারতীয় কুল চাষে সাফল্য পেয়েছেন। এবার নতুন স্বপ্ন দেখছেন আঙুর চাষ নিয়ে।
মাত্র নয় মাস আগে বাড়ির পাশের প্রায় এক বিঘা পতিত জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আঙুরের চারা রোপণ করেন তিনি। ইউটিউব থেকে চাষাবাদের কৌশল শিখে ধীরে ধীরে গাছের পরিচর্যা শুরু করেন। শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধৈর্য, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন।
বর্তমানে তাঁর বাগানে পাঁচ জাতের আঙুরের চাষ হচ্ছে। বাইকোনুর, সামার রয়্যাল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুরে ভরে উঠেছে পুরো বাগান। প্রতিটি গাছেই ঝুলছে থোকায় থোকায় ফল।
আব্দুল আজিজ জানান, প্রথমদিকে শখের বসে বাড়ির আঙিনায় মাত্র চারটি বাইকোনুর জাতের চারা রোপণ করেছিলেন। সঠিক পরিচর্যার ফলে একটি গাছ থেকেই ৭ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত আঙুর উৎপাদন হয়। সেই সাফল্যই তাঁকে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে উৎসাহিত করে।
তিনি বলেন, “শুরুতে এটি ছিল শুধুই একটি শখ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে আমাদের দেশেও সফলভাবে আঙুর চাষ সম্ভব। বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকলে এবার প্রায় ৯ লাখ টাকার আঙুর বিক্রির আশা করছি।”
শিক্ষক আজিজের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিনই তাঁর বাগানে ভিড় করছেন স্থানীয় কৃষক ও উৎসুক মানুষজন। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন এবং আঙুরের চারা সংগ্রহ করছেন।
স্থানীয়দের মতে, এভাবে আঙুর চাষের বিস্তার ঘটলে একসময় নাটোরের চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বাগান পরিদর্শনে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, “ভিডিওতে আঙুর চাষ দেখেছি, কিন্তু এখানে এসে এত আঙুর ফলতে দেখে ভালো লাগছে। আমরাও বাড়িতে আঙুর চাষের কথা ভাবছি।”
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে বাইকোনুর ও ডিক্সন জাতের আঙুরের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান বলেন, “গত বছরও সিংড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষে সাফল্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাইকোনুর, সামার রয়্যাল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুরের ফলন ছিল আশাব্যঞ্জক। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের মাটিতেও যে সফলভাবে আঙুর উৎপাদন সম্ভব, তার একটি উদাহরণ বাহাদুরপুর গ্রামের শিক্ষক আব্দুল আজিজ। তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।”
শুধু শখ নয়, ইচ্ছাশক্তি, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। শিক্ষক আব্দুল আজিজের আঙুর বাগান সেই বাস্তবতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর হাত ধরে সিংড়ায় তৈরি হচ্ছে আঙুর চাষের নতুন সম্ভাবনা, যা ভবিষ্যতে দেশের ফল উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
১৮০ বিঘা জমিতে ফল নেই একটিও হাইব্রিড ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করে কোটি টাকার ক্ষতির মূখে পড়েছেন পঞ্চগড়ের কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ।
ব্যাংকের ঋণ, দোকানে সার-কীটনাশক বাকিতে নিয়ে মানুষের ৬০ একর জমি চুক্তি নিয়ে হাইব্রিড জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছিলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার লাঙ্গল গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন। সঠিক পরিচর্যায় কুমড়ো গাছে ঢেকে যায় পুরো ক্ষেত। আসতে শুরু করে ফুল, কিন্তু ফল আসে না। মৌসূমে শেষের দিকে হলেও দেখা নেই কোন ফলের। ইতোমধ্যে সব মিলিয়ে তিনি খরচ করেছেন ৩৮-৪০ লাখ টাকা। বীজ কোম্পানীর কথামত ফলন হলে এসব জমি থেকে তিনি বর্তমান বাজারে প্রায় দেড় কোটি টাকার মিষ্টি কুমড়া বিক্রয় করতে পারতেন।
জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগে কৃষক সাজ্জাদ হোসেন জানান, পঞ্চগড় জেলার বোদার উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের সর্দারপাড়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের নলেহা গ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছে ৬০ বিঘা জমি একর প্রতি ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়ে আলু চাষ করেন। কিন্তু আলুতে লোকসান হওয়ার পর সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
বোদা বাজারের সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রমহান রাসেলের পরামর্শে আলমগীর সীড কোম্পানীর ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করে জমিতে লাগান। কোম্পানী থেকে নিশ্চয়তা দিয়ে তাকে বলা হয়েছিল এই বীজের মান খুবই ভাল এবং প্রতি একরে ১৯-২০ মেট্রিক টন ফলন আসবে। তাদের কথামত নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে গাছের চেহারা অনেক ভাল হলেও তিন মাসেও কোন ফল আসেনি। ইতোমধ্যে এই জমিতে তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছেন। ভবিষ্যতে ফল আসারও কোন সম্ভাবনা দেখছেননা।
জমির মালিক সর্দারপাড়া গ্রামের কাব্য ভূষন বর্মন জানান, আমরা ছয় ভাই মিলে সাজ্জাদ ভাইকে ৬০ বিঘা জমি দিয়েছি। আলু করে তিনি অনেক টাকা লোকসান করেছেন। সেই জমিতে তিনি মিষ্টি কুমড়া করেছিলেন। জমিতে গাছ ভর্তি হলেও কোন ফল আসেনি। এটা বীজের সমস্যা । আমাদের জমির পাশে অন্য লোক মিষ্টি কুমড়া করেছে। তাদের জমি মিষ্টি কুমড়া দিয়ে ভর্তি। সাজ্জাদ ভাই আলু করে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন মিষ্টি কুমড়া বিক্রয় করে বাকি টাকা দিবেন। কিন্তু মিষ্টি কুমড়ার ফল না আসায় আমরাও আমাদের টাকা নিয়ে চিন্তিত আছি।
সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রহমান রাসেল জানান, আলমগীর সীডস কোম্পানি আমাকে জানিয়েছে তাদের বীজ ভালো হবে। একরে ১৯-২০ টন ফলন হবে। গত ২৬ জানুয়ারি কোম্পানিকে নগদ টাকা দিয়ে ১০ কেজি ৬শ গ্রাম বীজ নিয়ে আমি সাজ্জাদ ভাইকে দেই। কোম্পানির নির্দেশনা মেনে সব করি। কিন্তু জমিতে প্রচুর গাছ থাকলেও মিষ্টি কুমড়া একটিও হয়নি। আমি কোম্পানীকে বলেছিলাম আপনাদের বীজ নিয়ে সাজ্জাদ ভাইর প্রচুর টাকা ক্ষতি হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু এখন তারা নানাভাবে টালবাহানা করছে।
কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভাই আমি পথে বসেছি। আমি এখন কি করব। আলমগীর সীড কোম্পানী আমাকে রাস্তায় নামিয়েছে। ঋণ আর ধারদেনা করে, জমির মালিকের টাকা আর হাল আল মজুরীর টাকা বাকি রেখে প্রায় ৪০ টাকা খরচ করেছি। এত টাকা আমি কিভাবে পরিশোধ করব। আমি আলমগীর সীড কোম্পানীর কাছে ক্ষতিপুরণ চাই। তারা আমাকে ক্ষতিপুরণ না দিলে আমি আদালতে যাব।
জেলা বীজ ও প্রত্যয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ শামীম বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার একটি অভিযোগ দিয়েছেন। যার অনুলিপি আমরা পেয়েছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ আমরা সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাই। তিনি আসলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাপানের বিখ্যাত ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু। তিন বছর ধরে পরীক্ষামূলক ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাষ শুরু হলেও চলতি মৌসুমে এ আলুর আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে। কৃষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ায় এটি এখন সম্ভাবনাময় একটি ‘সুপারফুড’ ফসল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নবীনগর উপজেলার নাটঘর, নবীনগর পশ্চিম, সাতমোড়া, বড়িকান্দি ও বীরগাঁও ইউনিয়নের ২০ জন কৃষক ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু উৎপাদন করছেন। চলতি মৌসুমে এ জাতের আবাদ আরও তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাধারণ কৃষকদের ভাষ্যমতে, প্রতি শতকে তিন মণেরও বেশি উৎপাদন মিলছে, যা স্থানীয় জাতের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশি। আলুর আকারও বেশ বড় ও আকর্ষণীয়।
সিদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়ার পর এ আলুর ভেতরে দৃষ্টিনন্দন হলুদাভ রং দেখা যায়, যা ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। স্বাদেও রয়েছে আলাদা মিষ্টতা ও নরম ভাব। কম পানিতে ধীরে ধীরে সিদ্ধ করলে এর স্বাদ আরও ভালো হয়। আবার সিদ্ধ বা পোড়ানো আলু কিছু সময় ফ্রিজে রেখে খেলে মিষ্টতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা।
পুষ্টিবিদদের মতে, মিষ্টি আলু খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ওকিনাওয়া মিষ্টি আলুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত পরিমাণে এটি খেতে পারেন। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা ভিটামিন ‘এ’ চোখের দৃষ্টিশক্তির জন্যও উপকারী। স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট থাকায় এটি ধীরে ধীরে শক্তি জোগায় এবং দ্রুত ক্ষুধা লাগতে দেয় না।
বড়িকান্দি ইউনিয়নের বড়িকান্দি গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘গত বছর কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জাতের মিষ্টি আলু সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসাইনের মাধ্যমে কৃষি অফিস থেকে ভাইন সংগ্রহ করি। পরে প্রথমবারের মতো ২০ শতক জমিতে আবাদ করে প্রায় ৬৫ মণ আলু পেয়েছি।’
নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের দড়িলাপাং গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, ‘এই আলুর স্বাদ ও চাহিদা দুইটাই ভালো। বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে তিন বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু আবাদ করছি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২০ মণের মতো ফলন আসে। স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন হওয়ায় এটি আমাদের জন্য লাভজনক। তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলুর প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলন ও বাজারচাহিদা ভালো থাকায় আগামীতে এর আবাদ আরও বাড়বে। উদ্যোক্তা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর জন্য ভাইন উৎপাদনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমে ১০০ বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, ‘দেশে এখনো মিষ্টি আলু সংরক্ষণের জন্য আধুনিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। গোল আলুর মতো সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও মিষ্টি আলুভিত্তিক এগ্রো-প্রসেসিং শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও দীর্ঘ সময় বাজারে এ পুষ্টিকর খাদ্য সহজলভ্যভাবে কিনতে পারবেন।
কুমিল্লার মাঠে মাঠে এখন আলুর পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে মিষ্টি কুমড়া। জেলার বুড়িচং, চান্দিনা, দেবিদ্বার ও দাউদকান্দি উপজেলায় আলুর ‘সাথী ফসল’ হিসেবে মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক আবাদ হয়েছে। বাড়তি সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপাদিত এই বিষমুক্ত সবজি চাষ করে এবার সাফল্যের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা।
স্বল্প খরচে অধিক লাভ: কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে আলুর জমিতেই কোনো বাড়তি চাষাবাদ ছাড়াই কুমড়ার বীজ বপন করা হয়। খুব কম পরিচর্যায় মাত্র ৬০-৬৫ দিনের মধ্যেই এই ফসল বাজারজাত করা সম্ভব। এ বছর প্রতি হেক্টর জমিতে কুমড়া আবাদে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা। বিপরীতে, উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে কৃষকরা আয় করছেন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসেই বিঘা প্রতি কয়েকগুণ মুনাফা অর্জন সম্ভব হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি ও চাহিদা: দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির বাজার নিমসারসহ কংসনগর, চান্দিনা ও দাউদকান্দির হাটগুলোতে এখন মিষ্টি কুমড়ার ধুম। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই কুমড়া ট্রাকযোগে চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে কাঁচা কুমড়া প্রতি কেজি ১০-১৫ টাকা এবং পাকা কুমড়া ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া আকারভেদে প্রতি ‘লট’ বা ‘চুকতা’ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়।
চাষিদের অভিজ্ঞতা: বুড়িচংয়ের নিমসার বাজারের চাষি শাহিন ও সেলিম বলেন, ‘১ একর জমিতে কুমড়া চাষ করেছি। আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের কারণে এবার কিছু গাছ মারা গেছে, তাই ফলন গতবারের চেয়ে কিছুটা কম। তবে বর্তমানে প্রতি পিস কুমড়া ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি করতে পারছি।’
ব্যবসায়ী জয়নাল বলেন, ‘কুমিল্লার মিষ্টি কুমড়ার মান ভালো হওয়ায় বাইরের জেলাগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা এখান থেকে প্রতিদিন শত শত কুমড়া বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছি।’
কৃষি বিভাগের বক্তব্য: বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর উপজেলায় প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের কারণে আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হলেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কয়েক হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক সুরুজ মণ্ডল একই জমিতে ড্রাগন ফল ও আঙুর চাষ করে সৃষ্টি করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। সীমিত আবাদি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি নিচে ড্রাগন এবং উপরে ‘মাচা সিস্টেমে’ আঙুর চাষ করছেন, যা ইতোমধ্যে এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছে।
সুরুজ মণ্ডল জানান, বর্তমানে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় তিনি বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে এই যুগপৎ চাষ শুরু করেন। এতে একই জমি থেকে দ্বিগুণ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তার বাগানে এখন আঙুর সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি আঙুর পাওয়ার আশা করছেন তিনি। বর্তমানে ড্রাগন ফলের মৌসুম না থাকায় জমিটি ফাঁকা না রেখে সাথী ফসল হিসেবে আঙুর চাষ করছেন।
দুই বিঘা জমিতে এই ব্যতিক্রমী চাষাবাদ করছেন সুরুজ মণ্ডল। শিক্ষকতার পাশাপাশি অবসর সময়েই তিনি বাগানের দেখভাল করেন। বর্তমানে তার মোট প্রায় ২০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সুরুজ মণ্ডলের এই উদ্যোগ অন্য কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিকল্পিত চাষাবাদ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে চলতি বোরো মৌসুমে মাঠজুড়ে সোনালি ধানের বাম্পার ফলন দেখা গেলেও উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং টানা ভারী বৃষ্টিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সেচ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি মজুরির কারণে লাভের হিসাব মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের ধান নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর ও বিলাঞ্চলে আবাদ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। এ অঞ্চলে আগাম জাতের ধানের মধ্যে জিরাশাইল, ব্রি-২৮, ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯৬ বেশি চাষ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, বিগত কয়েক বছরে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেশি হওয়ায় কৃষকদের ব্রি-২৮ আবাদে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছিল। তুলনামূলকভাবে ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৯৬ রোগবালাই সহনশীল হওয়ায় এসব জাতের আবাদ বেড়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর হাওর ও ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের জাফরপুর বিলে পুরোদমে ধান কাটার কাজ চলছে। তবে অনেক কৃষকই আশঙ্কা করছেন, বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকার ধান ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, সরকারি ভাবে এবার নবীনগরে মোট ১ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ ধান সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। ইতোমধ্যে কৃষকের তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ বছর সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ধানের দাম ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি এড়াতে ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ওয়ারুক গ্রামের কৃষক আব্দুল বাতেন বলেন,উৎপাদন খরচ যে হারে বেড়েছে, বাজারে সেই তুলনায় ধানের দাম না পেলে কৃষকের টিকে থাকা দায় হবে। ধান কাটতে এখন একজন শ্রমিককে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। কনিকাড়া গ্রামের কৃষক আমির হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর ধানের বাজারদর অনেক কম। সরকার ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ নির্ধারণ করলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ খুবই কম হবে।
নবীপুর গ্রামের কৃষক জালাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা কৃষক গায়ের ঘাম মাটিতে ফেলে ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভ করতে পারি না।
বাম্পার ফলনের আনন্দের মাঝেও তাই উৎপাদন খরচ, কম বাজারদর এবং প্রাকৃতিক ঝুঁকি নিয়ে নবীনগরের কৃষকদের মুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
এক সময় শুধু পারিবারিক চাহিদা পূরণে বসতবাড়ির আঙিনায় লাউয়ের চারা লাগানো হতো। লাউ গাছের লতাপাতা ছোট মাচায়, গাছের ডালে অথবা ঘরের চালে উঠিয়ে দেওয়া হতো। এখন লাউয়ের ব্যাপক চাহিদা, উৎপাদন খরচ কম ও সময় কম লাগার কারণে বাণিজ্যিকভাবে লাউয়ের চাষ শুরু হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে কৃষি জমিতে মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ করে সাফল্য পাচ্ছেন চাষিরা। লাউ চাষে রাসায়নিক সার ও শ্রমিক খরচ অনেক কম। বাজারে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। মাটি থেকে ৫ ফুট উঁচু করে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি করা হয় মাচা। এটি তার ও সুতালি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়। একবার মাচা তৈরি করলে সেখানে ৩-৪ বছর লাউসহ অন্যান্য সবজি চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে এই উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারা মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষে ঝুঁকছেন বেশি।
জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা কৌশিক রহমান দেড় বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লাউ চাষ করেছেন। লাউ চাষে গত বছর অতি বৃষ্টির কারণে লোকসান হলেও এবার সফলতার স্বপ্ন দেখছেন। সরেজমিনে তার লাউয়ের ক্ষেতে গিয়ে দেখা গেছে মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে লাউ। লাউ কার্টুনে ভর্তি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রতি কার্টুনে ৩০টি লাউ ভর্তি করা হচ্ছে। এখন প্রতিদিন ৩ কার্টুন করে লাউ বাজারজাত করছেন। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা কৌশিক রহমান জানিয়েছেন, দেড় বিঘা জমিতে মাচা তৈরি করতে মোট ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। লাউ গাছের গোড়ায় মাত্র ৫ হাজার টাকার সার দেওয়া হয়েছে। ময়না জাতের এই লাউ গাছে মাত্র ৫২ দিন পর থেকে ফলন ধরা শুরু হয়। এখন প্রতিদিন ৩ কার্টুন লাউ ঢাকাতে পাঠানো হয়। কয়েকদিন পর থেকে লাউয়ের ফলন আরও বাড়বে। সব খরচ-খরচা বাদ দিয়ে কার্টুন প্রতি এখন ১ হাজার টাকা থাকে। ঢাকা থেকে মোবাইল ফোনে টাকা পাঠিয়ে দেয়।
তিনিও আরও জানিয়েছেন, এভাবে ১ মাস ধরে লাউ বাজারজাত করতে পারব। তারপর আবার লাউয়ের নতুন চারা লাগানো হবে। এমন বাজার থাকলে মাসে ১ লাখ টাকা আয় হবে। বাজার ভালো হলে এর চেয়েও বেশি আয় করা যাবে। অনেক ফসল চাষ করেছি তার মধ্যে এটি একটি লাভজনক চাষ। কৌশিক রহমানের মতো এখানকার অনেক চাষি লাউ চাষ করে সফল হয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন।
জীবননগর কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, জীবননগরে অনেক জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে মাচা পদ্ধতিতে লাউ চাষ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারা এই চাষে ঝুঁকছেন বেশি। কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে লাউয়ের বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়েছে। লাউয়ের নতুন জাত, লাউ গাছের পরিচর্যা ও মাচা তৈরির পদ্ধতির বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে বোরো ধানসহ গ্রীষ্মকালীন সবজি, তরমুজ, ভুট্টা, মুগ ও তিলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বোরো ক্ষেতে জলাবদ্ধতার সুযোগে কৃষি শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি বাড়িয়েছে। মজুরি হিসেবে শ্রমের দাম হাকাচ্ছেন ১,৩০০ টাকা। যা দেড় মণ নতুন বোরো ধানের মূল্যের সমান।
এপ্রিলে খুলনার আকাশে হঠাৎ বৃষ্টি। মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনেও তা থেমে থাকেনি। অতিবৃষ্টির পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে বিপাকে পড়েছে জেলার রূপসা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও পাইকগাছা উপজেলার প্রায় তিন হাজার কৃষক। ধান গোলায় ওঠানোর আগেই অতিবৃষ্টি লোকসানের মুখে দাঁড় করিয়েছে খুলনার প্রান্তিক কৃষকদের।
রোবো ধান কৃষকের গোলায় ওঠার মুহূর্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে। এপ্রিল এবং মে মাসের প্রথমার্ধের বৃষ্টিতে খুলনার চাষির বোরো ধান ও শীতকালীন শাক-সবজির ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টিতে খুলনা জেলার ৮৭৩ হেক্টর জমির ধান ও সবজি ক্ষেত ডুবেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে- রূপসা, দাকোপ, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া। বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ। মৌসুমের শুরুতে বীজতলা, রোপণ ও এপ্রিল-মে’তে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বাড়ে। ধান কাটা মৌসুমে দৈনিক একজন কৃষি শ্রমিকের মজুরি ছিল ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। জেলার রূপসা, ডুমুরিয়া ও তেরখাদায় ১,২০০ থেকে ১,৩০০ টাকা দিয়ে দৈনিক সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শ্রমঘণ্টা কিনতে হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। নয় বছরের মধ্যে এপ্রিলে এবারে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। গেল মাসে জেলায় গড়ে ৩৩ দশমিক ৭০ মিলিমিটার, ১ মে ১৯ মিলিমিটার, ৩ মে ১০ মিলিমিটার, ৪ মে ৪ মিলিমিটার ও ৫ মে ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
জেলায় এবারের বোরো মৌসুমে ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। ৬৫ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়। সবচেয়ে বেশি আবাদি এলাকা ডুমুরিয়া ও পাইকগাছা উপজেলা।
এ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ গতবারের চেয়ে দু’টাকা করে বেড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের মহূর্তে সারের সংকট দেখা দেয়। তারপরও জেলায় হেক্টর প্রতি ৪ দশমিক ৭৪ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের কথা তুলে ধরেন কৃষি সম্প্রসারণের অতিরিক্ত উপপরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস।
এ কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকরা হীরা-১, হীরা-২, হীরা-১৯, সুবর্ণ-৩, ছক্কা ও সিনজেনটা-১২০৩ জাতের হাইব্রিড বোরো বীজ রোপণ করে।’
এ দপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে বোরো ছাড়াও গ্রীষ্মকালীন সবজি, তরমুজ, ভুট্টা, মুগ ও তিলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মে মাসের প্রথম দু’দিনে অতিবৃষ্টিতে ধান ক্ষেতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
ডুমুরিয়ার শিংয়ের বিল, সাহাপুর ও মধুগ্রাম, রূপসা উপজেলার বিল জাবুসায়, দাকোপ, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় ৭৭০ হেক্টর জমির বোরো ক্ষেত বৃষ্টিতে ভিজেছে।
রূপসা উপজেলার বাগামারা গ্রামের কৃষক খোরশেদ আলম, মো. ওমর আলী শেখ ও আলেমান শেখর অতিবৃষ্টিতে বিল জাবুসায় বোরো ক্ষেত তলিয়ে যায়।
ইলাইপুর গ্রামের কৃষক মো. ইব্রহিম হোসেন বলেন, ‘এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’
মৌলভীবাজারে জ্বালানি সংকটে তীব্র প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। জ্বালানি সংকটে আউশ ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সাথে বোরো মৌসুমে ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পরেছেন কৃষকরা।
আউশ ধানের বীজতলা থেকে শুরু করে জমি ভাঙা, হাল চাষ একই সাথে বোরোধান কাটার জন্য যেসব মেশিন ব্যবহার হয় সব ডিজেল চালিত থাকায় এই সমস্যায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের।
জানা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে জ্বালানি তেল কম পাওয়া যাচ্ছে। শহরের পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রি হলেও ছোট ছোট দোকানে তেল বিক্রি একেবারেই বন্ধ রয়েছে। এতে করে চলতি মৌসুমে আগাম বৃষ্টি হলেও কৃষকেরা আউশ ধানের বীজতলা ও জমি ভাঙাতে পারছেন না। কারণ, ডিজেল চালিত কৃষি যন্ত্র থাকায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। একই সমস্যা বোরোধানেও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় বোরোধান কাটার সময় হলেও ধান কাটার হারভেস্টর মেশিন, মাড়াইয়ের মেশিন এবং পরিবহনের যানবাহন ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানির অভাবে কৃষকরা সময়মতো ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
আউশ ধান চাষীরা জানান, এ বছর চৈত্র মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আউশের বীজতলা তৈরি করার সঠিক সময় একই সাথে জমি চাষের জন্য প্রথমে ভাঙাতে হয়। তবে ডিজেল সংকট হওয়ার কারণে ট্রাক্টর চালাতে পারছেন না মালিকরা।
বোরো চাষিরা জানান, বৈশাখের শুরু থেকেই হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। হাওরে একসাথেই ধান কাটা হয়। তবে ধান কাটার জন্য তেল সংকটে হারভেস্টর মেশিন, মাড়াইয়ের মেশিন এবং পরিবহনের যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় আউশধান চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর। আর বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে আউশ ধান আবাদের জন্য ৫৪ হাজার কৃষককে সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। হাওরে পুরাদস্তুর বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে।
রাজনগর উপজেলার হারভেস্টর মেশিনের মালিক জুবের আহমদ বলেন, এই সময়ে আমার মেশিন হাওরে ধান কাটার কথা। তবে তেল সংকটে এখনো হাওরে যেতে পারিনি। একটা মেশিন চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮০-১০০ লিটার তেলের প্রয়োজন। এই তেল কই থেকে পাব।
রাজনগর উপজেলার আলমাস মিয়া নামে এক কৃষক বলেন, আমি কাউয়াদিঘী হাওরে বোরোধান চাষ করছি। আমার ধান পেকে এসেছে। ধান কাটার জন্য মানুষ পাচ্ছি না। আবার তেল সংকটে মেশিন এখনো আসেনি। পরিবহনের জন্য গাড়ি সংকট। সবমিলিয়ে মহা বিপদে পড়ে গেছি ধান নিয়ে।
মিজান আহমেদ নামে এক কৃষক বলেন, আমরা আউশধানের বীজ তলা করার জন্য কোথাও ট্রাক্টর পাচ্ছি না। যাদের আছে, সবার সাথে যোগাযোগ করেছি। সবাই বলছে, তাদের তেল নেই।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জ্বালানি সংকটের সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলছি পাম্প মালিকদের সঙ্গে। এখন বোরোধান কাটার সময়, হাওরে পুরোদমে ধান কাটা চলছে। একই সাথে আউশধানের বীজতলা তৈরি করার সঠিক সময়।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে চৈত্র মাসের টানা তাপদহ ও হপার পোকার আক্রমণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আমের গুটি ঝরে পড়ছে। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ উপজেলার আমচাষীরা। আমের গুটি ঝরে যাওয়ার কারণে উৎপাদন অনেক কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। আম চাষিরা জানিয়েছেন, বাগানে নিয়মিত পানি সেচ ও নিয়মিত স্প্রে করেও আমের গুটি ঝরে পড়া ঠেকানো যাচ্ছে না।
জীবননগর উপজেলায় ফসলের মাঠে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে অনেক আমের বাগান। তাছাড়া বসত বাড়ির আঙ্গিনায়, পুকুরপাড়ে, রাস্তার পাশে, জমির আইলসহ ফাঁকা জায়গায় বিভিন্ন জাতের আম গাছ রয়েছে। প্রথমে আম গাছের মুকুল দেখে আমের বাম্পার ফলনের আশা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু দেখা যায় কিছু দিন পরই আমের গুটিগুলো ঝরে পড়তে শুরু করেছে। প্রচন্ড গরম ও বৃষ্টির অভাবে আমের গোড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে হালকা বাতাস হলেই ঝরে পড়ছে আমের গুটি। অনেক টাকা খরচ করে এবং সারাবছর বাগান পরিচর্যা করেও ফলন কমে যাওয়ায় আম চাষিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের আমচাষী আকবার আলী জানায়, আমার ১০ বিঘা জমিতে দু'টি আমের বাগান রয়েছে। এবার গাছে প্রচুর মুকুল এসেছিলো। কালবৈশাখী ঝড়ে অনেক গুটি ঝরে পড়েছে। এখন গরম আবহাওয়া ও হপার পোকার আক্রমণে প্রতিদিন অনেক আম ঝরে পড়ছে। পানি সেচ ও নিয়মিত স্প্রে করেও তেমন কাজ হচ্ছে না।
লাবু মল্লিক নামের আরেক আম চাষি বলেন, এবার আম ঝরে পড়ার পরিমাণ বেশি। গাছের ডালে হাত দিলেই আম ঝরে যাচ্ছে। তীব্র তাপে এমন টা ঘটছে। তবে আশাকরি বৃষ্টি হলে এই সমস্যা কেটে যাবে।
আম ব্যবসায়ী সুবারেক আলী বলেন, ৫ জন আম চাষির নিকট থেকে চুক্তিভিত্তিক ২০ বিঘা আমের বাগান কিনেছি। কিন্তু এই আবহাওয়ায় আমগুলো গাছে দাঁড়াচ্ছে না। প্রতিদিন সকালে বাগানে গিয়ে দেখি আমের গুটি ঝরে গাছের নিচে পড়ে আছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসায় অনেক লোকসান হবে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, জীবননগর উপজেলায় আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, বোম্বাই, কাঠিমন, মল্লিকাসহ অনেক জাতের আম গাছ রয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে আম্রপালি জাতের চাষ বেশি হয়। এই বছর মোট ৬১২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আমের চাষ হয়েছে। সাধারণত তীব্র তাপ ও হপার পোকার আক্রমণে আমের গুটি ঝরে পড়ে। আমের গুটি ধরে রাখার জন্য চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষির কথা মাথায় রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানায় আগামী ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, ‘যদিও বিদ্যুতের উৎপাদনে আমাদের ক্ষতি হবে, তার পরও দেশের কৃষির কথা চিন্তা করে আমরা ১ মে থেকে ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এলাকার ঘরে ঘরে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের ওপর বক্তব্যে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চাপ কমে যাওয়ার ফলে এখন যেসব বাড়িঘর ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংযোগ আছে, সেখানে সরবরাহ কমে গেছে। সে জন্য আমরা এখন শুধু উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিল্পকারখানাগুলোকে যতখানি পারছি গ্যাস সরবরাহ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলনের জন্য কোনো রকম অনুসন্ধান করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা বাপেক্সকে শক্তিশালী করে অনুসন্ধানী কাজ শুরু করেছি। যদি এই অনুসন্ধানে সফল হই, আশা করি যেসব গ্যাস সংযোগ দেওয়া আছে, সেসব জায়গায় চাপ বৃদ্ধি করতে পারব।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আসলে কোনো রকম জ্বালানি অনুসন্ধান হয়নি। বাপেক্সকে শক্তিশালী করাও হয়নি। তবে সুখবরও আছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ১১ কিলোমিটার এলাকায় ৯টি স্থানে ২৭টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক গড়ে ৩৩৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এই মাসের ১৯ তারিখ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসফিল্ডে নতুন গভীর কূপ অনুসন্ধানে খনন শুরু হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীর কূপটি খননে প্রায় সাত মাস সময় লাগবে। এটি দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
রুমিন ফারহানা বলেন, গ্যাসের অভাবে আশুগঞ্জ সার কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি দ্রুত সার কারখানাটিতে গ্যাস দিয়ে সেটি চালুর দাবি জানান। জবাবে মন্ত্রী আশুগঞ্জ সার কারখানায় ১ মে থেকে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জৈবিক উপায়ে নিরাপদ চুইঝাল চাষে প্রথমেই তপন কুমার বর্দ্ধনের অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি শুধু চুইঝালই নয় নিজের বাড়ির পালনে গড়ে তুলেছেন রকমারি নানা বৃক্ষলতা ও দুর্লভ প্রজাতির উদ্যান। নিজেকে ঠাঁই করেছেন একজন বৃক্ষ প্রেমিকের তালিকায়। অর্জন করেছে খ্যাতি যশ। এইবারই প্রথম তিনি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় চুইঝাল চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টার থেকে প্রযুক্তি নিয়ে চুইঝাল চাষ করা কৃষকের নাম তপন কুমার বর্দ্ধন (৪৫)। তিনি ধনবাড়ি উপজেলার খোপাখালী ইউনিয়নের হাজরাবাড়ি গ্রামে। তার বাবার নাম বীরেন্দ্রচন্দ্র বর্দ্ধন।
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, কৃষক তাপস কুমার বর্দ্ধন পূর্বে কখনো চুইঝাল চাষ করেননি। এই অঞ্চলে চুইঝাল একটি নতুন ও অপরিচিত মসলা ফসল হওয়ায় এ বিষয়ে কৃষকের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের’ সহায়তায় তিনি ১০ শতাংশ জমিতে চুইঝাল চাষ শুরু করেন।
প্রকল্প থেকে তাকে উন্নতমানের চারা, জৈব ও রাসায়নিক সার, বালাইনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হয়, ফলে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যয় তার বহন করতে হয়নি। বর্তমানে গাছগুলো সুস্থভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এখনো বাণিজ্যিকভাবে ফসল সংগ্রহ শুরু হয়নি।
সূত্রটি আরও জানায়, কৃষক প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে এবং আধুনিক চাষাবাদ কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদদের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ের তদারকির ফলে তিনি সফলভাবে চাষ পরিচালনা করে যাচ্ছে।
চুইঝাল চাষের দ্বিতীয় বছরে এসে কৃষক তপন কুমার কাটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে প্রায় ৪০০ চারা বিক্রি করেছেন। প্রতি চারা ৫০ টাকা দামে বিক্রি করে প্রায় ২০ হাজার টাকা পেয়েছে বলে জানান কৃষক।
কৃষক তপন কুমার বর্দ্ধন (৪৫) জানান, তিনি এর আগে চুইঝাল চাষ করেননি। হর্টিকালচার সেন্টারের এক প্রকল্পের আওতায় ১০ শতাংশ জমিতে দুই বছর এ চাষ করে শুরু করে। ফলন শুরু হয়েছে। চারাও বিক্রি করে যাচ্ছে। এতে তার ফসলের বৈচিত্র্য বেড়েছে, নতুন ফসলের জাতও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তার মতে, এ ফসল চাষে তার ফসলের বৈচিত্র্য বেড়েছে। নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। সামনে আরও চাষ বৃদ্ধির কথা জানান এ কৃষক। চুইঝাল চাষ তার কাছে ভালো লাগে। সকাল-বিকাল বাগানে ঘুরতে তার খুব ভালো লাগে বলে জানান।
আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নে চুইঝাল একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় মসলা ফসল হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করে যাচ্ছে। তাপস কুমার বর্দ্ধন এই ফসল চাষের মাধ্যমে নিজেকে একজন অগ্রগামী ও উদ্ভাবনী কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে যাচ্ছে বলে হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্ভিদতত্ত্ববিদ জানান।
তার বাগানের গাছগুলো বর্তমানে আশ্রয় গাছে দৃঢ়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসল সংগ্রহ শুরু না হলেও চারা বিক্রির মাধ্যমে ইতোমধ্যে আয় শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক, সৌখিন বাগানি এবং আশপাশের নার্সারিগুলো তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছে এবং নতুন করে চারার অর্ডার দিচ্ছে। এতে এলাকায় নতুন ফসল চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কৃষক আশাবাদী।
প্রকল্পের সহায়তায় এবং ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের নিবিড় তত্ত্বাবধান, সময়োপযোগী পরামর্শ এবং দক্ষ ফার্ম লেবারের সহায়তায় এই নতুন ফসলটি টাঙ্গাইলে সফলভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রাসেল পারভেজ তমাল জানান, চুইঝাল ফসলটি এ অঞ্চলে পূর্বে চাষ হতো না—এই প্রকল্পের মাধ্যমে তা সফলভাবে সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে, যা মসলা উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হচ্ছে। এর ফলে চুইঝালের বাণিজ্যিক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।চারা উৎপাদন একটি লাভজনক খাতে পরিণত হবে। কৃষকের আয় বহুমুখী হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে একটি নতুন মসলা ভ্যালু চেইন তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
চলতি মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন উপজেলা শরনখোলায় ধানের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উপজেলায় মোট ৬৫৩৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে এবং অধিকাংশ জমিতে ধান কাটাও শুরু হয়েছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে ধানের দাম প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক চাষি জানান, সার, বীজ, শ্রমিক মজুরি ও সেচ খরচ বাড়ায় ধানের দাম কম থাকলে তারা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
চালিতাবুনিয়া গ্রামের চাষি রুবেল খাঁন জানান, তিনি ২২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় মোট খরচ হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘এখন যদি প্রতি মণ ধানের দাম ১০০০ টাকা করেও পাই, তাহলে খরচ উঠিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারবো।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় ধানের ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। আমরা কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। সরকারিভাবে মনপ্রতি ১৪৪০ টাকা দরে ধান ক্রয় করা হবে। পাশাপাশি আমরা খাদ্য বিভাগের মাধ্যমেও ধান ক্রয়ের চিন্তা করছি। এতে করে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতে পারবেন।’
তিনি আরও জানান, কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে কৃষকরা দ্রুত সরকারি উদ্যোগে ধান ক্রয় ও বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে তারা ন্যায্য মূল্য পেয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।