কৃষি খাতের উন্নয়ন, বাজার শৃঙ্খল কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি-যেকোনো আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে কৃষক, তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিরাপত্তা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘কৃষি ইকোসিস্টেম বা পরিবেশের সর্বোচ্চ প্রসার/উন্নয়ন: ব্লকচেইনের মাধ্যমে সংযোজন, অর্থায়ন এবং সহজীকরণ/গতিশীলকরণ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, আধুনিক কৃষি ব্যবসার চেইনে বা স্তরে জড়িত বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী ও স্টেকহোল্ডারদের সমস্যা নিয়ে যেভাবে কথা হয়, মূল উৎপাদক কৃষকের সমস্যা নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না।
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির যত অগ্রগতিই হোক না কেন, মানুষের খাদ্যগ্রহণের জৈবিক অনিবার্যতার কারণে কৃষির ওপর আমাদের নির্ভর করতেই হবে। আমাদের দেশের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ সমাজে কৃষি পেশাকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে অবহেলার চোখে দেখা হয়। কৃষি ও কৃষকের এই স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত মূল্য না দিলে কোনো আলোচনাই পূর্ণাঙ্গ হবে না।’
কৃষিবান্ধব সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তনসহ কৃষকদের সহায়তায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কারণ আমাদের দেশ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) টিকিয়ে রাখার জন্য কৃষিই সবচেয়ে কৌশলগত খাত।
তিনি কৃষি খাতের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলেন, প্রযুক্তির সুবিধা যেন কৃষক পর্যন্ত পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন, বাজারের নিরাপত্তা, ন্যায্য মুনাফা এবং পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতারিত না হন, সে ব্যবস্থা কাঠামোগতভাবে নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। বিশ্বব্যাপী কৃষি খাতে ভর্তুকিনির্ভরতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি এ খাতের স্থায়ী ও লাভজনক সমাধানের ওপর জোর দেন।
সেমিনারে বক্তারা কৃষি খাতে স্বচ্ছতা, অর্থায়ন এবং আধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির সংযোগ ঘটিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জিয়াওকুন শি, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার এবং ইনোভেটেক প্যানেল-১ (বাজার সংযোগ) প্রকল্প পরিচালক মিস ক্রিস্টিনা ওলসেন।
এছাড়াও সেমিনারে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শাইফুর রহমান মজুমদার, জেনারেল ম্যানেজার শাহজাহান শেখ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) কান্ট্রি হাব ম্যানেজার আলী এম. খান, ব্যাংক এশিয়ার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হাসান মোল্লা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় চলতি মৌসুমে ব্যাপক হারে সিম চাষ করছেন কৃষকরা। বিশেষ করে ৬নং মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নে সিমের আবাদ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনুকূল আবহাওয়া, ভালো ফলনের সম্ভাবনা এবং বাজারে সিমের চাহিদা থাকায় এ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় কৃষকরা। ফলন ও বাজারদর ভালো থাকলে এ মৌসুমে সিম চাষ করে ভালো লাভের আশা করছেন তারা।
বোদা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির আঙিনা, জমির আইল ও পতিত জমিতে বাঁশের মাচা তৈরি করে সিমের আবাদ করা হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে চাষ করা যায় এবং ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হওয়ায় দিন দিন এ ফসলের চাষ বাড়ছে। অনেক কৃষক অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় সিম চাষে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সিম চাষে বীজ, বাঁশ, মাচা তৈরি, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়। তবে ফলন ভালো হলে এসব খরচ সহজেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। বর্তমানে অনেক জমিতে গাছে ফুল ও সিম আসতে শুরু করেছে। ফলে ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশায় কৃষকদের মধ্যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
তবে কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদনের সময় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে গেলে তাদের কাঙ্ক্ষিত লাভ নাও হতে পারে। তাই সিমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সহযোগিতা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে রোগবালাই দমন, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শও চান কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বোদা উপজেলায় মোট প্রায় ৫৫ হেক্টর জমিতে সিমের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬নং মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে সিমের আবাদ করা হয়েছে। বোদা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে মাড়েয়া ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি সিমের চাষ হচ্ছে।
বোদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহমেদ রাশেদ উন নবী জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় সিমের চাষ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হয়েছে। এর মধ্যে মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে সিম চাষ করা হয়েছে, যা উপজেলার ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। সঠিক পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করা হলে কৃষকরা সিম চাষ থেকে ভালো ফলন ও আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন।
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কাচিয়াতল মৌজায় গোমতী নদীর চরে উঁচু-নিচু ও দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জমিতে মুলা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কৃষক তোতা মিয়া ও তার ছেলে আবদুল্লাহ। কম খরচে ভালো ফলন ও লাভ হওয়ায় হাসি ফুটেছে তাদের মুখে। তাদের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও চরাঞ্চলের পতিত জমিতে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
শুধু দুর্গাপুর নয়, সদর উপজেলার আমড়াতলী, পাঁচথুবী এবং বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের গোমতীর বিস্তীর্ণ চর ও নদীর বেড়িবাঁধের উভয় পাশে এবার মুলাসহ বিভিন্ন সবজির চাষ হয়েছে। গত বছর মুলা চাষ করে অনেকে লোকসানে পড়লেও এবার ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তোতা মিয়ার বাড়ির পশ্চিম ও উত্তর পাশে গোমতী নদীর চরের উর্বর জমিতে সারি সারি সবজি চাষ হয়েছে। কোথাও মুলার বিশাল ক্ষেত, আবার কোথাও মাচায় ঝুলছে লম্বা লাউ। মাঠজুড়ে দেখা যায় কচি ও পরিপক্ব লাউয়ের পাশাপাশি বেগুন, শসা, করলা, চালকুমড়া, ঝিঙে ও লালশাকের চাষ।
তোতা মিয়া ও তার ছেলেরা শ্রমিক দিয়ে জমি থেকে মুলা উত্তোলন করে পুকুরে ধুয়ে ট্রাকে করে কুমিল্লা শহর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পাঠাচ্ছেন।
জমি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা জাহাঙ্গীর জানান, প্রায় দুই একর বা ১৮০ শতক জমিতে মুলা চাষে মোট খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। প্রথম দফায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার মুলা বিক্রি হয়েছে। জমি থেকেই পাইকাররা মুলা কিনে নিচ্ছেন। নিজেদের গাড়িতে করে পাইকারি বাজারে নিলে প্রতি কেজি প্রায় ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আরও প্রায় দুই লাখ টাকার মুলা বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তারা।
কৃষক আবদুল্লাহ জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে মুলা বাজারজাত শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকার মুলা বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কুমিল্লা শহর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় মুলা পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, গত শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে জমিতে মুলার বীজ বপন করা হয়। প্রায় দুই মাস পরিচর্যার পর ব্যাপক ফলন পাওয়া গেছে। মুলার পাশাপাশি বেগুন, করলা, টমেটো, লাউ, শসা, চালকুমড়া, ঝিঙে ও লালশাক চাষেও তারা সফলতা পেয়েছেন। ধান ও ঢেঁড়স চাষেও এলাকায় তাদের সুনাম রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ও জসিম উদ্দিন বলেন, প্রায় দুই একর জমি বছরের অধিকাংশ সময় পরিত্যক্ত পড়ে থাকত। এবার তোতা মিয়া ও তার ছেলেরা নিজেদের উদ্যোগে সেই জমিতে মুলাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তাদের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, পাশের শিমুলখাড়া ও ষোলনল এলাকাতেও কয়েকজন কৃষক একইভাবে চরাঞ্চলের জমিতে লালশাক, ঢেঁড়স ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে লাভবান হয়েছেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল কাদের বলেন, কম খরচে উচ্চফলনশীল জাতের মুলা চাষে ভালো লাভ করা সম্ভব। বীজ বপনের ৫-৭ দিনের মধ্যে চারা গজায়। প্রায় ৪২-৪৫ দিনের মধ্যে মুলার সাদা অংশ ও পাতা পরিপক্ব হতে শুরু করে এবং ৬০-৭০ দিনের মধ্যে তা বাজারজাত করা যায়। বাজারে চাহিদা ও ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ জাতের মুলা চাষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের উঠান বৈঠক ও মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করাই কৃষি বিভাগের লক্ষ্য।
কৃষক আবদুল্লাহ জানান, জমিতে জৈব সারের পাশাপাশি সামান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়েছে। কীটনাশক ও বালাইনাশক তেমন ব্যবহার করতে হয়নি। ফলে উৎপাদিত মুলা নিরাপদ হওয়ায় বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে।
মাত্র দুই মাসে পরিত্যক্ত চরজমিতে কম খরচে ভালো ফলন ও আয় পাওয়ায় খুশি তোতা মিয়া, তার ছেলে আবদুল্লাহ ও জাহাঙ্গীরসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের সাফল্য এখন গোমতীর চরাঞ্চলের অন্য কৃষকদেরও নতুন করে উৎসাহিত করছে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কৃষকের মাঝে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা চত্বরে এক অনুষ্ঠানে জেলার ২০ জন কৃষকের হাতে এ মেশিন তুলে দেওয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রের সভাপতিত্বে ও সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তারের সঞ্চালনায় বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, ‘প্রকৃত পেঁয়াজ চাষিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সরকার এয়ার ফ্লো মেশিন দিচ্ছে। প্রতিটি মেশিনের দাম ২১ হাজার টাকা ও ঘর নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে ৭ হাজার টাকা। একটি মেশিনের আওতায় ২০-২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে হলে অবশ্যই পেঁয়াজ ভালো মতো শুকিয়ে রাখতে হবে।’
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় আগাম জাতের ফুলকপি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ভালো ফলন ও বাজারের আশানুরূপ দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবজি পরিচর্যায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আগাম জাতের ফুলকপির ব্যাপক আবাদ লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো: নয় নম্বর সাতৌর ইউনিয়ন:প্রাণনগর, দোলুয়া ও ২৫ মাইল এলাকা। আট নম্বর ভোগনগর ইউনিয়ন:*ল ভাবুকী ও বরতলী গ্রাম। নিজপাড়া ইউনিয়নেরবিভিন্ন ব্লকের ফসলি জমি।
বর্তমানে কৃষকেরা তাঁদের ক্ষেতে নিয়মিত সেচ প্রদান, সুষম সার প্রয়োগ এবং আগাছা পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঠে চাষ হওয়া প্রধান জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে: রত্না বা রত্নাশা ৪৫ দিনী জাত,হোয়াইট মার্বেল, নিন্জা দোলুয়া এলাকার কৃষক রহিম উদ্দিন ক্ষেতের বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক উল্লেখ করে জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যেই এই ফুলকপি বাজারজাত করা সম্ভব হবে এবং ভালো দাম পাওয়ার আশা করা যাচ্ছে।
২৫ মাইল এলাকার কৃষক আব্দুল জব্বার চার বিঘা জমিতে বাড়তি পরিশ্রম ও খরচ করে আগাম ফুলকপি চাষ করেছেন। সাধারণ সময়ের তুলনায় আগে বাজারে সবজি তুলতে পারলে অধিক লাভ পাওয়া যায় এই উদ্দেশ্যে স্থানীয় কৃষকেরা আগাম চাষে ঝুঁকেছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বীরগঞ্জে ফুলকপি চাষের মোট লক্ষ্যমাত্রা ৫৯৩ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ১৭০ হেক্টর জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ সম্পন্ন হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এই আবাদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৯২ হেক্টর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম জানান, মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সার ও সেচ প্রয়োগ এবং বালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে মাঠের সার্বিক অবস্থা সন্তোষজনক রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ফলন ভালো হলে কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন এবং ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আগাম সবজি চাষের পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে।
দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মৎস্য খাতে উৎপাদনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমান্বয়ে শ্লথ হয়ে আসছে। সরকারি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলেও প্রবৃদ্ধির সূচক নেমে এসেছে গত পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে। বাণিজ্যিক চাষভিত্তিক মৎস্য উৎপাদনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা, উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ও নদী-হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এক গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছিল ৪৬ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬২ শতাংশ। পরবর্তীতে উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার টন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার টনে উন্নীত হয় এবং প্রবৃদ্ধির হার পৌঁছে যথাক্রমে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও ৩ দশমিক ২৮ শতাংশে। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট উৎপাদন ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫১ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছালেও উৎপাদন বৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমে যথাক্রমে ২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে আসে। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে, অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ের বাণিজ্যিক চাষের মাধ্যমে মোট উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও সামুদ্রিক উৎস থেকে আহরণ হ্রাস পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের অবক্ষয় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মৎস্য খাতে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে মাছ ও জলজ খাবারের মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৮ কোটি ৮২ লাখ টনে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক উৎসের চেয়ে কৃত্রিম মৎস্যচাষ বা অ্যাকুয়াকালচারের অংশ ছিল ১০ কোটি ৩৩ লাখ টন। সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের খাদ্য হিসেবে মাছ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মৎস্যচাষ বা কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত মাছই এখন মানুষের খাবারের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এটিকে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রূপান্তর হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা মাছের সিংহভাগই এখন সরাসরি খামারের চাষ থেকে আসছে। বর্তমানে বিশ্বে মাথাপিছু বার্ষিক মাছ খাওয়ার পরিমাণ ২০ দশমিক ৭ কেজিতে উন্নীত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এই খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্বজুড়েই অপরিকল্পিত চাষের কারণে পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক মাছের চারণভূমি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখছে আধুনিক বাণিজ্যিক খামারব্যবস্থা। বিশেষ করে ময়মনসিংহ জেলা এককভাবে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ মাছ সরবরাহ করে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই জেলায় চার লাখ ১৮ হাজার ৬৪৫ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মাছের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানিনির্ভর কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম, পোনা, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শ্রমের বাড়তি খরচের কারণে প্রান্তিক চাষিদের মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত স্বয়ংক্রিয় এয়ারেটরের মাধ্যমে পানিতে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল জি-থ্রি রুইয়ের মতো আধুনিক জাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে অনেক অঞ্চলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক চাষের সম্প্রসারণ ঘটলেও দেশের প্রাকৃতিক উন্মুক্ত জলাশয় ও হাওরাঞ্চলের দেশীয় মাছের প্রজাতি এখন মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত। দেশের দ্বিতীয় রামসার আন্তর্জাতিক বিশ্ব ঐতিহ্য সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে বিগত দুই দশকে প্রায় অর্ধেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন ও মৎস্য বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালে হাওরটিতে যেখানে ১৪১ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি ছিল, তা ২০১৫ সালে কমে ১৩৪টিতে, ২০২২ সালে ৯৩টিতে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে মাত্র ৭৬টি প্রজাতিতে নেমে এসেছে। চিতল, নানীদ, মহাশোল ও বাঘআইড়ের মতো ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছ এখন হাওরে বিলুপ্তপ্রায়।
প্রাকৃতিক অভয়াশ্রমগুলোতে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ সর্বনাশা চায়না দুয়ারি ও কিরণমালা ফাঁদের অবাধ ব্যবহার, বিষ প্রয়োগ, জেনারেটরের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে পোনা নিধন, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ, ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও কয়লা পরিবহনের মাধ্যমে পানি দূষণ এবং অতিরিক্ত পলি জমার কারণে নদী ও বিলের গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় জলজ প্রতিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ছে। বাস্তুসংস্থানের এই বিপর্যয়ের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরে বিগত এক দশকে পরিযায়ী ও দেশি পাখির বিচরণ প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে গেছে; যেখানে শীত মৌসুমে লাখ লাখ পাখি আসত, সেখানে ২০২৫ সালের জরিপে পাখির সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র সাড়ে ২২ হাজারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও রপ্তানি আয় টেকসই করতে হলে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর গতানুগতিক কৌশলে সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে প্রজনন নিশ্চিত করতে মূল বিলগুলোকে স্থায়ী মৎস্য অভয়ারণ্য ঘোষণা, প্রাকৃতিক নদী ও খালের নিয়মিত ড্রেজিং, হাওরের জলজ বন পুনরুদ্ধার, দেশীয় মাছের পোনা ছাড়ার জন্য বিল নার্সারি স্থাপন এবং গভীর সমুদ্রে আধুনিক অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে মাছের খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি চাষি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একটি টেকসই বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মৎস্য খাত চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
দুই পাশে দিগন্তজোড়া সবুজ ধানক্ষেত, আর মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে সরু পিচঢালা পথ। মেঠো পথের ধারে বসে থাকা তরুণ-তরুণী, বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ানো পর্যটক কিংবা দূরে নীল আকাশের নিচে আবছা পাহাড়ের সারি। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে এটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো দ্বীপরাষ্ট্রের নির্জন উপত্যকা। তবে ছবিজুড়ে থাকা এই অনবদ্য নান্দনিক ক্যানভাস দেখতে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরোতে হয় না; দেশের ভেতরেই খাগড়াছড়ি সদরের কাছে রূপ নিয়েছে এক টুকরো ‘নিউজিল্যান্ড’।
খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে মাত্র এক কিলোমিটারেরও কম দূরে পানখাইয়া পাড়া ও আপার পেরাছড়া গ্রামকে ছুঁয়ে আছে এই জনপদ। পাহাড়ের পাদদেশে এমন উন্মুক্ত ও বিস্তৃত সমতল শস্যক্ষেত্র পুরো খাগড়াছড়িতে বিরল। যার পাশেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু আলুটিলা পাহাড়। উঁচু পাহাড় আর সমতলের বিস্তৃত সবুজ শস্যক্ষেতের এই চমৎকার ভারসাম্যটিই নিউজিল্যান্ড পাড়া বা মাঠকে দিয়েছে অনন্য এক সৌন্দর্য। প্রকৃতির এই অনন্য রূপ দেখেই স্থানীয়রা ভালোবেসে এলাকাটির নাম দিয়েছেন ‘নিউজিল্যান্ড’ এবং দুই পাড়াকে সংযোগকারী সড়কটির নাম দিয়েছেন ‘নিউজিল্যান্ড সড়ক’।
জেলা শহর বা শাপলা চত্বর থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটেই ইজিবাইক (টমটম) কিংবা সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়ে পৌঁছে যাওয়া যায় এই সুমেধ্য উপত্যকায়। যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় বিকেল গড়ালেই বদলে যায় এখানকার দৃশ্যপট। সূর্যাস্তের নরম আলোয় পাহাড়ের ছায়া নেমে আসে ধানি জমিতে। মেঠো পথের সীমানাপ্রাচীরে কিংবা ঘাসের ওপর বসে দর্শনার্থীরা উপভোগ করেন শান্ত প্রকৃতির রূপ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় নিয়মিত জমে ওঠে বিকেলের প্রাণবন্ত আড্ডা। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানভীর আহমেদ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় আর সমতল শস্যক্ষেতের এমন নিখুঁত ও নান্দনিক মেলবন্ধন খুব বিরল। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এই ভূখণ্ডটি শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং পাহাড় ও সমতলের সহাবস্থানের এক অনন্য রূপক।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক ফারুক ইকবাল যোগ করেন, ‘নামের কৌতূহল থেকেই মূলত আসা, তবে এখানকার শান্ত পরিবেশ ও সৌন্দর্য সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়। নগর জীবনের ক্লান্তি দূর করতে পথের ধারে বসে উন্মুক্ত হাওয়ায় সময় কাটানোর অনুভূতি অসাধারণ।’
প্রকৃতির শান্ত রূপ উপভোগের পাশাপাশি পর্যটকদের বিকেলের আড্ডায় নতুন মাত্রা যোগ করছে স্থানীয় খাবারের পশরা। রাস্তার পাশে এবং আশেপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু স্থায়ী রেস্তোরাঁ ও ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। এর মধ্যে বিশেষ নজর কাড়ছে এক দম্পতি পরিচালিত ‘নিউজিল্যান্ড ক্যাফে’, যেখানে মিলছে সাশ্রয়ী দামের দেশি-বিদেশি খাবার। অন্যান্য রেস্তোরাঁগুলোতে ১১০ টাকায় চিকেন মোমো, ৮০ টাকায় চিকেন মুংডি, ৭০ টাকায় গরম চটপটি আর ৬০ থেকে ১২০ টাকায় সাধারণ ও দই ফুচকার স্বাদ নেওয়া যায়। সাথে কফি, লেমন জুস কিংবা ফ্রেশ ফ্রুটস মাখাতো রয়েছেই। পর্যটকদের এই নিয়মিত আগমনে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সুমন জানান, আগে এই পথে মানুষের যাতায়াত ছিল সীমিত, কিন্তু ‘নিউজিল্যান্ড পাড়া’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর থেকে স্থানীয় অনেকের জীবিকার নতুন পথ তৈরি হয়েছে। কৃষিভিত্তিক নীরব জনপদ থেকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের এই দৃশ্যপট যেমন খাগড়াছড়ির স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছে, তেমনি প্রকৃতির এক টুকরো সতেজতা ও শান্ত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের মনে।
শেরপুর জেলাজুড়ে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করেছেন কৃষকরা। বন্যায় জেলার কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও, আমনই এখন তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র অবলম্বন। তাই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন তারা। স্বপ্ন দেখছেন আমনের ভালো ফলনের মাধ্যমে অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার।
জেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, কৃষকরা চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করতে কেউ ট্রাক্টর আবার কেউ পাওয়ার টিলার দিয়ে হাল চাষ করছেন। কেউবা বীজতলা থেকে আমনের চারা তুলে তা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার অনেকেই পরিজন নিয়ে একযোগে চারা রোপণ করছেন। তাদের পরিশ্রমে চোখে মুখে নতুন দিনের স্বপ্ন স্পষ্ট।
শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, জেলায় চলতি মৌসুমে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। ইতোমধ্যেই কেউ কেউ আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করেছেন। আগামী সপ্তাহ নাগাদ সারা জেলার কৃষকগণ রোপা আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করবেন।
অপরদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফরহাদ হোসেন জানান, উপজেলায় রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৬২ হেক্টর। সম্প্রতি কৃষকরা আমনের চারা রোপণ শুরু করেছেন।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চারা রোপণ বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পুরোদমে চারা রোপণ শুরু হয়ে যাবে। যদিও চলতি মাসের শেষের দিক পর্যন্ত কৃষকরা জমি প্রস্তুত করছেন।
সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের কৃষক রহমত মিয়া জানান, বন্যায় তার প্রায় দুই বিঘা জমির আউশ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমনই তার শেষ ভরসা। তিনি বলেন, "বন্যায় অনেক ক্ষতি হইছে বাজান। পোলাপান নিয়া না খাইয়া মরা লাগবো। অহন আল্লাহ ভরসা কইরা আমন লাগাইতাছি। যদি আমনডার ফলন ভালো হয় তয় হয়তো বাইচা যামু। একই কথা জানান নকলা উপজেলার কৃষক আব্দুল জব্বার। তিনি বলেন, "সরকারি সহায়তা পাইলে এবং ধানের ভালো দাম পাইলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারমু।
জেলার অন্যান্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বন্যার কারণে কিছুটা দেরি হলেও আমন আবাদের এখনও সময় আছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "আশা করি, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে কৃষকরা আমনের ভালো ফলন ঘরে তুলতে পারবেন।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদী-নালা, খাল-বিল এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। আর এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন পাট চাষিরা। পানি আসায় বিলের যত্রতত্র এখন দেখা যাচ্ছে পাট জাগ দেওয়া এবং পাটের আঁশ ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাট চাষিরা। পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া ও সিরাজগঞ্জের তারাশ উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর তুলে ধরা হলো;
তেতুলিয়া (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি জানান : পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায় সোনালী আঁশের বাম্পার ফলন হয়েছে। অতীতের সকল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রেকর্ড মাত্রা আবাদ। বাজারে ন্যায্য মূল্য পেয়ে হাসি ফুটেছে। প্রান্তিক কৃষকের মুখে পাট ফলন চাষ বেশি হয়েছে।
জলের অভাবে পাট জাগ দিতে প্রথমে সমস্যায় পড়েন পাট চাষিরা। পাট জাগ আঁশ ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত পাট চাষি কৃষক এখন শেষ পয্যায়ে। বাজার দর বেশি উৎপাদন ভালো হওয়ায় আগামীতে এ অঞ্চলে পাট চাষ আরো অনেক বাড়বে বলে কৃষি অফিসার শাবরিনা আফরিন এ প্রতিবেদকে জানান। কৃষি অফিস সূত্র জানায়, ৮শত ৫০ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্জন হয়েছে ৯শত হেক্টর। এছাড়াও চলতি মৌসুমে চাষিকে বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়। জমিতে হাল চাষ বীজ নিরানি সার বিষ কিটনাশক প্রয়োগ পাট কাটা ও ধোয়া শুকানোসহ অর্থ ব্যয় হয়েছে ২১/২২ হাজার টাকা। প্রতি বিঘাতে পাট আবাদ ১৬ থেকে ১৮ মন। প্রতি মন ভালো পাটের বাজার মূলো প্রকার বেদে ৪ হাজার ৫ শত টাকা থেক টাকা ধরে পর্যন্ত বাজারে কেনা বেচা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তিরনই হাট ইউপির খয়খাট পাড়া গ্রামের কৃষক সামসুদ্দন ( ৫০) দেড় বিঘা ইউপি সদস্য জব্বার (৪০) ৫০ শতক আমিরুল একর জমিতে পাট আবাদ করেছে। এখন পাটের দাম শুনে খুশি এবং তেতুলিয়া সদর ইউনিয়নের রনচন্ডি গ্রামের কৃষক আব্দুল (৪০) জানান, কৃষি অফিস থেকে প্রান্তিক তৃণমুল চাষিদের সুযোগ সুবিধা কখনও পায়নি। তিরনই হাট ডেমগছ গ্রামে বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন, একই গ্রামের রফিকুল ইসলাম জানান, ৩০ শতক পাট চাষ করেন। তিনি আশা করেন ন্যায্যমূল্যে পাবেন।
এদিকে, তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ)প্রতিনিধি জানান : নতুন পানির আগমনের সাথেই চলনবিল অঞ্চলের নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের কৃষকদের মাঝে শুরু হয়েছে পাট জাগ দেওয়া এবং সোনালী আঁশ ছড়ানোর উৎসবমুখর ব্যস্ততা।
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চলনবিলের নদী-নালা, খাল-বিল এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। এই সময়টার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় পাট চাষিরা। পানি আসায় বিলের যত্রতত্র এখন দেখা যাচ্ছে পাট জাগ দেওয়ার দৃশ্য।
ঘুরে দেখা গেছে, পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও পাট ধোয়ার কাজে হাত বাড়িয়েছেন। কেউ খেত থেকে পাট কেটে আঁটি বাঁধছেন, কেউ সেই আঁটি পানিতে জাগ দিচ্ছেন, আবার কেউ পানির মধ্যে বসেই পরম যত্নে পাট থেকে সোনালী আঁশ ছাড়াচ্ছেন। এরপর সেই আঁশ ধুয়ে বাঁশের আড়া বা রাস্তার পাশে রোদে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
স্থানীয় এক পাট চাষি জানান, এ বছর পাটের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলাম। আল্লাহর রহমতে সময়মতো বিলের নতুন পানি চলে আসায় এখন আর সমস্যা নেই। দিনরাত এক করে আমরা পাট ধোয়ার কাজ করছি।
কৃষকরা জানান, বিলের নতুন ও পরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দেওয়ার কারণে এবার আঁশের রঙ খুব সুন্দর ও উজ্জ্বল হচ্ছে। বাজারে এই উজ্জ্বল ও মানসম্মত পাটের (সোনালী আঁশ) চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। ফলে এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তারা।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, চলতি মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকরা যদি পাটের সঠিক মূল্য পান, তবে গত কয়েক মাসের হাড়ভাঙা খাটুনি সার্থক হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে আবার চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবে বলে মনে করছেন।
খুলনা জেলার কৃষিতে ডুমুরিয়ায় গ্রীষ্মকালীন ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন কোম্পানির তরমুজ চাষ যুক্ত হয়েছে। যা একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল। অল্প সময়ে ফসল তোলা যায়, উৎপাদন খরচ কম এবং উচ্চ ফলনশীল সংকর জাতের কারণে জেলার কৃষকদের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ৩শ ১৫ একর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে বরবটি, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, করলা, লতিকচু, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হলেও, এই জেলায় কৃষি অফিসের সহযোগিতায় এ অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে দেখা গেছে, ডুমুরিয়া সদর উপজেলার শোভনা, খর্নিয়া, সাহস, শরাফপুর ইউনিয়নের চাদগড় সুন্দর মহল, কালিকাপুর গ্রামের রেজাউন তার ৩৩ শতাংশ জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে 'স্মার্ট বয়' নামক হাইব্রিড তরমুজ চাষ করেছেন। চারা রোপণের ৬০-৬৫ দিনের মধ্যেই তার জমিতে ফসল চলে আসে। এ অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণের জন্য নগদ অর্থ পেয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমি ৩ বছর আগে সৌদি আরব থেকে এসে গ্রামে বাণিজ্যিক কৃষি কাজ শুরু করি। আমি টমেটো, মরিচ, বেগুন ও এগপ্ল্যান্ট-এর মতো উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদন করে আসছি। কিন্তু এই প্রথম আমি কৃষি অফিসের পরামর্শে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করেছি।"
আমি এগুলো বাজারে পাইকারিভাবে প্রতি কেজি ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করেছি। আমি ৩৩শতাংশ জমি থেকে ২লক্ষ, টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। কৃষক রেজাউল বলেছেন যে, আমার সমস্ত খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রায় ১লক্ষ ৫০ হাজার টাকা আয় হয়েছে,” তিনি বলেন “পরের বার আমি এই গ্রীষ্মকালীন তরমুজ বড় আকারে চাষ করার ইচ্ছা রাখি”, তিনি আরও যোগ করেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল হুদা বলেন, "জলবায়ু-সহনশীল ও গ্রীষ্মকালীন উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই ধরনের প্রদর্শনী কার্যক্রম কৃষকদের আয় বাড়াতে এবং কৃষিকে আরও লাভজনক করে তুলবে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন কৃষকদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তরমুজ চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন যে, এটি ভবিষ্যতে বৃহত্তর পরিসরে এই ফসলের চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।"
ইউনাইটেড সীড কোম্পানি লিমিটেডের মার্কেটিং সেলস অফিসার পলাশ মল্লিক বলেন, "কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে খুলনা জেলায় ডুমুরিয়া উপজেলার একটি তরমুজ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে উন্নত জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কৃষকরা প্রত্যাশিত ফলন পাচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।"
সাধারণত আঙুর চাষের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিদেশের বিস্তীর্ণ বাগান কিংবা দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল। তবে সেই প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছেন নাটোরের এক কৃষিপ্রেমী শিক্ষক। শখের বসে শুরু করা আঙুর চাষই এখন তাঁর সাফল্যের নতুন গল্প। ইউটিউব দেখে শেখা সেই উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক বাগানে।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষিপ্রেমী শিক্ষক আব্দুল আজিজ ছাত্রজীবন থেকেই কৃষির প্রতি আগ্রহী। এর আগে তিনি পটল, ড্রাগন ফল, আপেল কুল ও ভারতীয় কুল চাষে সাফল্য পেয়েছেন। এবার নতুন স্বপ্ন দেখছেন আঙুর চাষ নিয়ে।
মাত্র নয় মাস আগে বাড়ির পাশের প্রায় এক বিঘা পতিত জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আঙুরের চারা রোপণ করেন তিনি। ইউটিউব থেকে চাষাবাদের কৌশল শিখে ধীরে ধীরে গাছের পরিচর্যা শুরু করেন। শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধৈর্য, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন।
বর্তমানে তাঁর বাগানে পাঁচ জাতের আঙুরের চাষ হচ্ছে। বাইকোনুর, সামার রয়্যাল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুরে ভরে উঠেছে পুরো বাগান। প্রতিটি গাছেই ঝুলছে থোকায় থোকায় ফল।
আব্দুল আজিজ জানান, প্রথমদিকে শখের বসে বাড়ির আঙিনায় মাত্র চারটি বাইকোনুর জাতের চারা রোপণ করেছিলেন। সঠিক পরিচর্যার ফলে একটি গাছ থেকেই ৭ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত আঙুর উৎপাদন হয়। সেই সাফল্যই তাঁকে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে উৎসাহিত করে।
তিনি বলেন, “শুরুতে এটি ছিল শুধুই একটি শখ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে আমাদের দেশেও সফলভাবে আঙুর চাষ সম্ভব। বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকলে এবার প্রায় ৯ লাখ টাকার আঙুর বিক্রির আশা করছি।”
শিক্ষক আজিজের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিনই তাঁর বাগানে ভিড় করছেন স্থানীয় কৃষক ও উৎসুক মানুষজন। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন এবং আঙুরের চারা সংগ্রহ করছেন।
স্থানীয়দের মতে, এভাবে আঙুর চাষের বিস্তার ঘটলে একসময় নাটোরের চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বাগান পরিদর্শনে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, “ভিডিওতে আঙুর চাষ দেখেছি, কিন্তু এখানে এসে এত আঙুর ফলতে দেখে ভালো লাগছে। আমরাও বাড়িতে আঙুর চাষের কথা ভাবছি।”
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে বাইকোনুর ও ডিক্সন জাতের আঙুরের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান বলেন, “গত বছরও সিংড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষে সাফল্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাইকোনুর, সামার রয়্যাল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতের আঙুরের ফলন ছিল আশাব্যঞ্জক। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের মাটিতেও যে সফলভাবে আঙুর উৎপাদন সম্ভব, তার একটি উদাহরণ বাহাদুরপুর গ্রামের শিক্ষক আব্দুল আজিজ। তাঁর এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।”
শুধু শখ নয়, ইচ্ছাশক্তি, পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। শিক্ষক আব্দুল আজিজের আঙুর বাগান সেই বাস্তবতারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর হাত ধরে সিংড়ায় তৈরি হচ্ছে আঙুর চাষের নতুন সম্ভাবনা, যা ভবিষ্যতে দেশের ফল উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
১৮০ বিঘা জমিতে ফল নেই একটিও হাইব্রিড ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করে কোটি টাকার ক্ষতির মূখে পড়েছেন পঞ্চগড়ের কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ।
ব্যাংকের ঋণ, দোকানে সার-কীটনাশক বাকিতে নিয়ে মানুষের ৬০ একর জমি চুক্তি নিয়ে হাইব্রিড জাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছিলেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার লাঙ্গল গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন। সঠিক পরিচর্যায় কুমড়ো গাছে ঢেকে যায় পুরো ক্ষেত। আসতে শুরু করে ফুল, কিন্তু ফল আসে না। মৌসূমে শেষের দিকে হলেও দেখা নেই কোন ফলের। ইতোমধ্যে সব মিলিয়ে তিনি খরচ করেছেন ৩৮-৪০ লাখ টাকা। বীজ কোম্পানীর কথামত ফলন হলে এসব জমি থেকে তিনি বর্তমান বাজারে প্রায় দেড় কোটি টাকার মিষ্টি কুমড়া বিক্রয় করতে পারতেন।
জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগে কৃষক সাজ্জাদ হোসেন জানান, পঞ্চগড় জেলার বোদার উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের সর্দারপাড়া ও পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাগুড়া ইউনিয়নের নলেহা গ্রামে বিভিন্ন লোকের কাছে ৬০ বিঘা জমি একর প্রতি ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে নিয়ে আলু চাষ করেন। কিন্তু আলুতে লোকসান হওয়ার পর সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষের সিদ্ধান্ত নেন।
বোদা বাজারের সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রমহান রাসেলের পরামর্শে আলমগীর সীড কোম্পানীর ‘ব্যাংকক সুইট-২’ জাতের মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করে জমিতে লাগান। কোম্পানী থেকে নিশ্চয়তা দিয়ে তাকে বলা হয়েছিল এই বীজের মান খুবই ভাল এবং প্রতি একরে ১৯-২০ মেট্রিক টন ফলন আসবে। তাদের কথামত নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে গাছের চেহারা অনেক ভাল হলেও তিন মাসেও কোন ফল আসেনি। ইতোমধ্যে এই জমিতে তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছেন। ভবিষ্যতে ফল আসারও কোন সম্ভাবনা দেখছেননা।
জমির মালিক সর্দারপাড়া গ্রামের কাব্য ভূষন বর্মন জানান, আমরা ছয় ভাই মিলে সাজ্জাদ ভাইকে ৬০ বিঘা জমি দিয়েছি। আলু করে তিনি অনেক টাকা লোকসান করেছেন। সেই জমিতে তিনি মিষ্টি কুমড়া করেছিলেন। জমিতে গাছ ভর্তি হলেও কোন ফল আসেনি। এটা বীজের সমস্যা । আমাদের জমির পাশে অন্য লোক মিষ্টি কুমড়া করেছে। তাদের জমি মিষ্টি কুমড়া দিয়ে ভর্তি। সাজ্জাদ ভাই আলু করে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন মিষ্টি কুমড়া বিক্রয় করে বাকি টাকা দিবেন। কিন্তু মিষ্টি কুমড়ার ফল না আসায় আমরাও আমাদের টাকা নিয়ে চিন্তিত আছি।
সার-বীজ কীটনাশক ব্যবসায়ী আরিফুল রহমান রাসেল জানান, আলমগীর সীডস কোম্পানি আমাকে জানিয়েছে তাদের বীজ ভালো হবে। একরে ১৯-২০ টন ফলন হবে। গত ২৬ জানুয়ারি কোম্পানিকে নগদ টাকা দিয়ে ১০ কেজি ৬শ গ্রাম বীজ নিয়ে আমি সাজ্জাদ ভাইকে দেই। কোম্পানির নির্দেশনা মেনে সব করি। কিন্তু জমিতে প্রচুর গাছ থাকলেও মিষ্টি কুমড়া একটিও হয়নি। আমি কোম্পানীকে বলেছিলাম আপনাদের বীজ নিয়ে সাজ্জাদ ভাইর প্রচুর টাকা ক্ষতি হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু এখন তারা নানাভাবে টালবাহানা করছে।
কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভাই আমি পথে বসেছি। আমি এখন কি করব। আলমগীর সীড কোম্পানী আমাকে রাস্তায় নামিয়েছে। ঋণ আর ধারদেনা করে, জমির মালিকের টাকা আর হাল আল মজুরীর টাকা বাকি রেখে প্রায় ৪০ টাকা খরচ করেছি। এত টাকা আমি কিভাবে পরিশোধ করব। আমি আলমগীর সীড কোম্পানীর কাছে ক্ষতিপুরণ চাই। তারা আমাকে ক্ষতিপুরণ না দিলে আমি আদালতে যাব।
জেলা বীজ ও প্রত্যয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ শামীম বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার একটি অভিযোগ দিয়েছেন। যার অনুলিপি আমরা পেয়েছি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ আমরা সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাই। তিনি আসলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এ নিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাপানের বিখ্যাত ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু। তিন বছর ধরে পরীক্ষামূলক ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাষ শুরু হলেও চলতি মৌসুমে এ আলুর আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে। কৃষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ায় এটি এখন সম্ভাবনাময় একটি ‘সুপারফুড’ ফসল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নবীনগর উপজেলার নাটঘর, নবীনগর পশ্চিম, সাতমোড়া, বড়িকান্দি ও বীরগাঁও ইউনিয়নের ২০ জন কৃষক ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু উৎপাদন করছেন। চলতি মৌসুমে এ জাতের আবাদ আরও তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাধারণ কৃষকদের ভাষ্যমতে, প্রতি শতকে তিন মণেরও বেশি উৎপাদন মিলছে, যা স্থানীয় জাতের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশি। আলুর আকারও বেশ বড় ও আকর্ষণীয়।
সিদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়ার পর এ আলুর ভেতরে দৃষ্টিনন্দন হলুদাভ রং দেখা যায়, যা ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। স্বাদেও রয়েছে আলাদা মিষ্টতা ও নরম ভাব। কম পানিতে ধীরে ধীরে সিদ্ধ করলে এর স্বাদ আরও ভালো হয়। আবার সিদ্ধ বা পোড়ানো আলু কিছু সময় ফ্রিজে রেখে খেলে মিষ্টতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা।
পুষ্টিবিদদের মতে, মিষ্টি আলু খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ওকিনাওয়া মিষ্টি আলুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত পরিমাণে এটি খেতে পারেন। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা ভিটামিন ‘এ’ চোখের দৃষ্টিশক্তির জন্যও উপকারী। স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট থাকায় এটি ধীরে ধীরে শক্তি জোগায় এবং দ্রুত ক্ষুধা লাগতে দেয় না।
বড়িকান্দি ইউনিয়নের বড়িকান্দি গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘গত বছর কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জাতের মিষ্টি আলু সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসাইনের মাধ্যমে কৃষি অফিস থেকে ভাইন সংগ্রহ করি। পরে প্রথমবারের মতো ২০ শতক জমিতে আবাদ করে প্রায় ৬৫ মণ আলু পেয়েছি।’
নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের দড়িলাপাং গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, ‘এই আলুর স্বাদ ও চাহিদা দুইটাই ভালো। বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে তিন বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু আবাদ করছি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২০ মণের মতো ফলন আসে। স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন হওয়ায় এটি আমাদের জন্য লাভজনক। তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলুর প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলন ও বাজারচাহিদা ভালো থাকায় আগামীতে এর আবাদ আরও বাড়বে। উদ্যোক্তা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর জন্য ভাইন উৎপাদনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমে ১০০ বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, ‘দেশে এখনো মিষ্টি আলু সংরক্ষণের জন্য আধুনিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। গোল আলুর মতো সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও মিষ্টি আলুভিত্তিক এগ্রো-প্রসেসিং শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও দীর্ঘ সময় বাজারে এ পুষ্টিকর খাদ্য সহজলভ্যভাবে কিনতে পারবেন।