দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেছেন, ‘যত সংকটই বিশ্ববাজারে থাকুক না কেন, আমাদের রপ্তানির ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে, আমরা এগিয়ে যাব। যত চ্যালেঞ্জই আসুক, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’
দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে পণ্য রপ্তানিতে চমকের পর চমক দেখিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। নভেম্বরের পর ডিসেম্বরেও পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। আগামী দিনগুলো কেমন যাবে?
চার-পাঁচ মাস আগে আমি বলেছিলাম, আমাদের অবস্থান অনেক শক্ত। আমরা বায়ারদের না বলার মতো একটা অবস্থা তৈরি করতে পেরেছিলাম। সেটা আমাদের জন্য প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি ওলট-পালট করে দিল। যার কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিল। সেল কমে গেল বায়ারদের, অর্ডার কমে গেল। এই পরিস্থিতিতে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দিকে আমাদের রপ্তানি গ্রোথ (প্রবৃদ্ধি) ভালো ছিল। প্রথম মাসে (জুলাই) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৬ শতাংশ। দ্বিতীয় মাসে ২৫ শতাংশ পজেটিভ গ্রোথ ছিল। কিন্তু তৃতীয় মাসে এসে এটা সাড়ে ৭ শতাংশ নেগেটিভ গ্রোথ হয়। চতুর্থ মাসেও প্রায় নেগেটিভ। তবে আশার কথা হচ্ছে, পঞ্চম মাসে (নভেম্বর) এসে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে আরও ভালো হয়েছে।
গত ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকেই এসেছিল ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। শতাংশ হিসাবে মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশই এসেছিল পোশাক খাত থেকে। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ২৭ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এই ছয় মাসে মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি এসেছে পোশাক থেকে।
বিস্ময়কর হলো এই কঠিন বিশ্ব পরিস্থিতিতে শেষ দুই মাসে, অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর দুই মাসেই ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। নভেম্বর মাসে এসেছে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। আর ডিসেম্বরে এসেছে আরও বেশি ৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে এর আগে কখনোই কোনো একক মাসে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসেনি। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নানা বাধাবিপত্তি ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিদায়ী ২০২২ সালে রপ্তানি ভালো হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। নভেম্বর মাসে আমাদের রপ্তানি আয়ে রেকর্ড হয়। ডিসেম্বর মাসে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়। গত বছর (২০২২ সাল) তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ৪৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যেটা আগের বছর ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি বেড়েছে এক বছরে। এর কারণ আমরা করোনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেক কাজ করেছি; বিভিন্ন বাজারে গিয়েছি। আমাদের বড় বাজারগুলোতে গিয়েছি। এমার্জিং মার্কেটেও গিয়েছি।
রপ্তানি ধরে রাখতে পেরেছি, এর বড় কারণ হচ্ছে আমাদের কাঁচামালের দাম কিন্তু বেড়ে গেছে। তুলা, কাপড়, কেমিক্যাল সবকিছুর দাম বেড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেইট কস্ট বা কনটেইনার কস্ট কিন্তু অনেক বেড়েছে। ফলে আমাদের গার্মেন্টে ইউনিট প্রাইস অনেক বেড়েছে। পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছ। এ ছাড়া ভ্যালু অ্যাডেড অনেক প্রোডাক্টের অর্ডার নিতে পেরেছি। বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে পেরেছি। ফলে বাংলাদেশ এখন দামি পণ্যের অর্ডারও পাচ্ছে। আগে বাংলাদেশে ১৫ ডলারের জ্যাকেট হতো। এখন বায়াররা আমাদের এখানে ৩০-৪০ ডলারের জ্যাকেট অর্ডার করছে। আমরা নতুন মার্কেটগুলোতে ঢুকতে পেরেছি; বেশি দামি পণ্য রপ্তানি করতে পেরেছি। আবার পণ্যের দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে রপ্তানি বেড়েছে। তবে বর্তমান অস্থির বিশ্ববাজারে রপ্তানির এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে কি না- তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।
এরকম একটা পরিস্থিতিতে গত নভেম্বের আমরা বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামের একটা সুন্দর অনুষ্ঠান ঢাকায় করেছি। একইসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের দ্বিবার্ষিক যে সম্মেলন, যেটা আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছি। এই দুই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের যে সক্ষমতা সেটা বায়ারদেরকে দেখানো হয়েছে।
আমরা সব সময় গর্বের সঙ্গে বলি বাংলাদেশ অনলি দ্য সেফেস্ট সোর্স অব ইনকাম। জাতিসংঘের ট্রেড সেন্টার থেকে এক মাসে এটা ঘোষণা দিয়েছে। তাদের প্রকাশনা থেকে প্রকাশও করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিতে সেফেস্ট সোর্স ইনকাম, গ্রিন ইন্ডাস্ট্রির কারণে। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং বায়াররাও জানে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিকল্প আর কোনো দেশ নেই। এই পরিস্থিতিতে আমরা খুব আশাবাদী। যদিও এখন বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকাল, আমাদের অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে আমাদের পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। জানি না আগামী দিনগুলো কেমন যাবে।
ডলার সংকটের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায় এলসি খোলার সুযোগ চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিলেন। কেন এ সুবিধা চেয়েছিলেন?
ডলারসংকটের কারণে বিকেএমইএ দুই-আড়াই মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমরা নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পক্ষ থেকে এই দাবি জানিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। আমরা অপেক্ষা করছি, সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাবে। ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকে ডলারসংকট পড়লে বাকিটা টাকায় বিল পরিশোধ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমরা আবেদন করেছি। এই অনুরোধ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়, স্বল্প সময়ের জন্য যতদিন ডলারসংকট থাকবে ততদিন টাকায় ঋণপত্র খোলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানিয়েছিল কোনো ব্যাংক ব্যাক টু ব্যাক এলসি পরিশোধের দায় মেটাতে বিলম্ব করলে এডি লাইসেন্স বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তখন ব্যাংক ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ ব্যাংকগুলো আগের ব্যাক টু ব্যাকের দায় পরিশোধ করতে বলছে। ব্যাংকের কাছে ডলারসংকট, আবার ঋণপত্রও খুলতে হবে। ফলে এর জন্য আমাদের আবেদন ছিল ডলারের পরিবর্তে টাকায় ঋণপত্র খোলার জন্য।
ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধে ডলারের চাহিদা মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের রপ্তানি খাত। নিট সেক্টরের শতকরা ৮০ শতাংশ কাঁচামাল দেশীয় পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সুতরাং বর্তমান ডলারসংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে ঋণপত্র খোলা এবং এর মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় ঋণপত্র খোলা হলে এ-সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে। ঋণপত্র ক্রয় এবং মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে, ডলার কনভার্সনের নীতিগত প্রক্রিয়ার কারণে আমাদের ডলার প্রতি ৭-৮ টাকার পার্থক্যের ফলে বিশাল অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে এসব বিষয় বিবেচনা করে ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধের সুযোগ দিলে এ সংকটের সময় আমাদের খুব সুবিধা হতো। রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারতাম আমরা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের সুবিধা আছে কী?
অবশ্যই আছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ৫টা কারেন্সি অ্যাকসেপ্টেবল। ডলার, ইউরো, পাউন্ড, চায়না ইউয়ান-এগুলো গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের ভেতরে ব্যাংক টু ব্যাক যে এলসি করছি, সেটা কেন বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায় করতে পারব না, সমস্যা কোথায়? আমি বুঝতে পারি না। এখন এক লাখ টাকা রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক করতে হয় ৭৫ হাজার ডলারে। এটা যদি টাকায় করি, তাহলে ডলারের সংকট, ব্যাংকগুলোকে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে, সেই কেনার ঝামেলা থেকে ব্যাংকগুলো মুক্ত থাকবে। দুই নম্বর হলো- এই কেনাবেচার মধ্যে দামের পার্থক্য, যেমন আমার এক্সপোর্টের ডলার ব্যাংক ১০০ টাকা দিচ্ছে। আবার আমি যখন কোনো পেমেন্ট করি তখন ১০৫ বা ১০৬ টাকায় কিনে দিচ্ছে। এই পার্থক্যের কারণে আমার বড় লোকসান হচ্ছে। এই ক্ষতিটাও কিন্তু তখন হবে না। তখন সুন্দরভাবে ব্যাক টু ব্যাকের দায় শোধ করতে পারব। আমরা নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশই লোকালি এলসি করি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান, বিকেএমইএর ৭০ শতাংশ ফ্যাক্টরি আছে, যাদের কোনো বন্ড লাইসেন্স নেই। তার মানে এই কোম্পানিগুলো ১০০ শতাংশই লোকালি করে। তাহলে তাদের এ সুবিধা দিতে অসুবিধা কোথায়? হ্যাঁ, একটা অসুবিধার কথা হয়তো বলবে, আমরা যাদের কাছ থেকে আনছি, তারা হয়তো বলবে, আপনারা যদি আমাকে বাংলা টাকা দেন, তাহলে আমাকে তো বিদেশ থেকে কাঁচামাল (র ম্যাটেরিয়াল) আনতে হবে ডলার দিয়ে। সেটা আমি পাব কোথায়?
আমাকে তো এখন ৭৫ হাজার ডলার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু তার তখন হয়তো কিনতে হবে টোটাল ৩০ হাজার ডলার। স্পিনিং মিল, যারা আমার কাছে সুতা বিক্রি করছে, তিনি হয়তো এক লাখ ডলারের বিপরীতে ৪৫ বা ৫০ হাজার ডলারে সুতা দিচ্ছে। তো উনাকে হয়তো এই সুতার বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডলারের কটন ইমপোর্ট করতে হচ্ছে। তাহলে তাকে এই কটন আনতে সর্বোচ্চ ২০ বা ২৫ ডলার কিনে পেমেন্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি তো টাইম পাবেন। কিন্তু আমাকে যদি টোটালটা কিনতে হয়, তাহলে এক লাখ ডলারের বিপরীতে একবারে ৭৫ হাজার ডলার কিনতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো পারছে না, এটাও তো বুঝতে হবে। এখন কেমন পরিস্থিতি? আমার যে শিপমেন্টগুলো গিয়েছে, সেগুলোর পেমেন্ট বায়াররা দিচ্ছে না। যেমন আমার ব্যাংকের একটা ডকুমেন্টে দুই মাস আগে পেমেন্ট পাওয়ার কথা, আরও ১০-১৫ দিন আগে ইতালির কাস্টমার তার ব্যাংকের মাধ্যমে আমার ব্যাংকে মেসেজ পাঠিয়েছে, ৪-৫ মাস পরে দিতে চায়। এটা এক নম্বর যে, যেসব মাল গিয়েছে সেগুলোর পয়সা আমরা পাচ্ছি না। দুই নম্বর হচ্ছে, প্রচুর মাল আমাদের প্রত্যেকের ঘরে রেডি আছে, মাল শিপমেন্টে নিচ্ছে না। তিন নম্বর হচ্ছে- সামনে যে শিপমেন্ট যাওয়ার কথা, এগুলোর শিডিউল তারা পাঁচ থেকে ছয় মাস পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে একটা সংকটের মধ্যে আমরা আছি। শিপমেন্ট যাচ্ছে কিন্তু পয়সা পাচ্ছি না। আবার শিপমেন্ট যাচ্ছে না। ফলে আমার দায় কিন্তু সময় মতো পরিশোধ করতে পারছি না। সারা বিশ্বেই কিন্তু এরকম একটা অ্যাবনর্মাল সিচুয়েশন চলছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একটা সার্কুলার আমাদের জন্য কিন্তু ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আসছে। ব্যাংকগুলো এই সার্কুলার পাওয়ার পর বলছে যে, আগের ব্যাংক টু ব্যাংক পাওনা পরিশোধ করেন।
কিন্তু এখন তো রপ্তানির বিপরীতে ডলারের দাম বেশি পাচ্ছেন। এক বছর আগে প্রতি ডলারের বিপরীতে পেতেন ৮৫ টাকা। এখন পাচ্ছেন ১০০ টাকার বেশি। এতে আমাদের কী ধরনের সুবিধা হচ্ছে?
হ্যাঁ, স্বীকার করছি যে ডলারের দাম বেশি পাচ্ছি। কিন্তু এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। ব্যাক টু ব্যাক এলসির পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে আমাকে ১০৫-১০৬ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে। আমাকে যদি প্রতি মাসে ১০ লাখ ডলার ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করতে হয়, এই যে ৫ টাকা বা ৬ টাকার ডিফারেন্স, এর ফলে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই প্রো-অ্যাকটিভলি আমাদের সাহায্য করে। সে জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ইদানীং দুই-তিনটা ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত। যেমন- অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স আমাদের রপ্তানির ডলারের যে মূল্য তা ৯৯ টাকা নির্ধারণ করেছিল, সেটা গত সপ্তাহে ১০০ টাকা করেছে। আবার রেমিট্যান্সেরটা আগে ১০৮ টাকা করেছিল, সেটা এখন ১০৭ টাকা করেছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমার প্রশ্ন ডলার কেন ৭ টাকা পার্থক্য হলো? কী কারণে? এটা তো অন্যায়। রীতিমতো রপ্তানিকারকদের ডলারের টাকা লুণ্ঠন করে ব্যাংকগুলো বড়লোক হচ্ছে এখানে। লাভবান হচ্ছে ব্যাংকগুলো। এটা হতে দেয়া উচিত না।
বাংলাদেশ ব্যাংকই হবে একমাত্র ডলারের রেট নির্ধারণ করার অথোরিটি। কারণ, ওই ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন যদি করে তাহলে ফারুক হাসান বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট হিসেবে, আমি বিকেএমইএর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বলতে পারি, আমাদের ডলারের রেট হবে ১১০ টাকা। তাহলে কি এটা বাংলাদেশ ব্যাংক মেনে নেবে? সে জন্য আমরা মনে করি, এটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজার মনিটরিং করবে, কী রেট হওয়া উচিত তা করবে। সেটা টাইম টু টাইম চেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, বাফেদা সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা যেতে পারে। এই ক্রাইসিস মুহূর্তে আমি মনে করি একটা সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তগুলো হওয়া উচিত। যার যার মতো করে সিদ্ধান্ত দেবে, আর চাপিয়ে দেবে তা হবে না।
ব্যাংকাররা তো মনে করছেন, আমাদের হাত-পা তো বাঁধা। ব্যাংকের মাধ্যমেই এক্সপোর্ট করতে হবে। ডলার ব্যাংকের মাধ্যমেই আনতে হবে। এ ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। যেহেতু পা-হাত বেঁধে ফেলেছি, যা দেব তাই খেতে হবে, এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। ডলার তো কিনতে হচ্ছে যদি এলসি করতে হয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আপনি তো ডলারে এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট করেন। কিন্তু আমার ডলারটা আসতে তো দেরি হচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে আমি যেটা এক্সপোর্ট করি সেটা ব্যাংকে দিচ্ছি। ব্যাংক প্রথমে ডলারটাকে বাংলা টাকায় নিচ্ছে। এরপর এই টাকা থেকে ডলার কিনে আবার ব্যাক টু ব্যাক পরিশোধ করছে। ফলে আমার এখানে লস হচ্ছে।
কোনো অবস্থাতেই ডলারের ক্রয় এবং বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই অবস্থায় এক টাকার বেশি ডিফারেন্স হওয়া উচিত না। অতীতে ৬০ পয়সা ছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ীরা ও দেশের ১৭ কোটি মানুষ। এতে লাভবান ব্যাংকাররা। আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে কেন ব্যাংকাররা লাভবান হবেন। এটা হওয়া উচিত না।
এই সংকটের সময়ে একটা ইতিবাচক দিক লক্ষ্ করা যাচ্ছে। চীন, ভিয়েতনাম, এমনকি মিয়ানমার থেকেও অনেক অর্ডার বাংলাদেশে আসছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমাদের প্রতি বায়ারদের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পজেটিভ। বাংলাদেশের ব্যাপারে নেগেটিভ কোনো কিছু নেই। তবে একটা ব্যাপারে তাদের নেগেটিভ দিক দেখি, সেটা হলো-একটা টি-শার্ট তারা চায়না থেকে কিনছে ২ ডলারে। কিন্তু যেই বাংলাদেশে আসে আমাকে বলা হয় এক ডলার বা ৮০ সেন্ট। কেন কম, এটার কোনো উত্তর নেই। দুই নম্বর দিক হচ্ছে- কমপ্লায়েন্স এবং সেফটির যতরকম ক্রাইটেরিয়া আছে, সব ফুলফিল করতে হচ্ছে। যত টাকা ইনভেস্ট লাগে করতে হচ্ছে। কোনো রকমের ছাড় দিচ্ছে না। যখনই প্রাইসের কথা আসে, তখনই বলে তোমরা সোর্সিং টিমের সঙ্গে কথা বল। আমরা হচ্ছি কমপ্লায়েন্স টিম। আমাদের সঙ্গে প্রাইস নিয়ে কোনো কথা নেই।
সোর্সিং টিমের সঙ্গে কথা বলি, তখন বলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এখানে প্রাইস নিয়ে তোমাদের দরকষাকষি করার সুযোগ নেই। মানে এই ধরনের ডবল স্ট্যান্ডার্ড আমরা বায়ারদের মধ্যে লক্ষ করেছি।
কিছুদিন আগে আপনারা এবং বিজিএমইএ নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর কম দামে পোশাক বিক্রি করবেন না। সেই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
সেই জায়গাতে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। একটার পর একটা বিভিন্ন ঝামেলার কারণে হয়ে ওঠেনি। বিজিএমইএ-বিকেএমইএ জয়েন্টলি একটা কমিটি করা হয়েছে। তারা কাজ করছে। আমরা মিনিমাম একটা প্রাইস বেঁধে দেব। এর নিচে কেউ সেল করতে পারবে না। যদি করে তাহলে তাকে ইউডি দেয়া হবে। এই ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশার কথা বলতে পারি, গত নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টসহ ফুল বোর্ড ঢাকাতে এসেছিলেন। বিভিন্ন বায়ার ও প্রতিনিধি এসেছিলেন। তাদের মনোভাব পজিটিভ ছিল। তারা বুঝতে পেরেছে যে, বাংলাদেশ একটা সেফ সোর্স কান্ট্রি। তারা বাংলাদেশ মার্কেট শেয়ার বাড়াতে চায়। অর্থাৎ এখানে যা ছিল সেটা থেকে তারা বেশি নিতে চায়। এগুলো যা হচ্ছে তা সবই পজিটিভ। আমরা মনে করি, আগামী দিনে এটা ভালো কিছু হবে।
বিদ্যুতের পর গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে কী ধরনের সমস্যা হবে আপনাদের?
আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। একদিকে বায়াররা আমাদের পোশাকের ন্যায্য দাম দিচ্ছে না; অন্যদিকে আমাদের খরচ বেড়ে গেল। উভয়সংকটে পড়লাম আমরা। গত পাঁচ মাসে আমরা প্রত্যেকেই ক্যাপাসিটি বাড়ানোর দিকে ছিলাম। হঠাৎ যখন গ্যাসসংকট হলো। আমরা থমকে গিয়েছিলাম। এখন দাম বাড়ানো হলো। এই মুহূর্তে বিশ্বমন্দার চ্যালেঞ্জের চেয়ে আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লোকাল সমস্যা। প্রথমত, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস ও এনবিআরের সমস্যা।
আমরা সরকারের কাছ থেকে পলিসিগত এই সাপোর্টগুলো যদি ঠিকমতো পাই, তাহলে বিশ্বমন্দার মধ্যেও এগিয়ে যাব। দেখেন, বাংলাদেশের ডেনিম সারা বিশ্বকে বিট করে আমেরিকার মার্কেটে এক নম্বর চাহিদায় রয়েছে। টোটাল এক্সপোর্ট বিশ্বের দ্বিতীয়তম স্থানে রয়েছি আমরা। আমেরিকার মার্কেটে সাড়ে ১৬ শতাংশ ডিউটি দিয়েও এগিয়ে যাচ্ছি। তার মানে হচ্ছে, যত সংকটই বিশ্ববাজারে থাকুক আমরা এগিয়ে যাব।
অতীতে আমরা সাপোর্ট পেয়েছি। তার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী, ব্যাংক, এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সবাই পলিসিগত সাপোর্ট দিয়েছেন বলে আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। কিন্তু পলিসির মধ্যে মাঝে মাঝে যখন ঘুণে ধরে বা সমস্যা তৈরি হয় সেটা সময়মতো অ্যাডজাস্ট হয় না। তখনই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অর্থমন্ত্রণালয়সহ সবাই যদি সহযোগিতা করে, যেমন এসএস কোড নিয়ে জটিলতা বা আদার্স কিছু বিষয় নিয়ে জটিলতা, সেগুলো না থাকলে এগিয়ে যাব।
তাহলে কী বলতে পারি যে, এই সংকটের সময়ে রপ্তানি বাড়বে; পোশাক রপ্তানির ওপর ভর করেই কী ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ?
দেখেন, আমরা কিন্তু বাধাবিপত্তি চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই এই জায়গায় এসেছি। পোশাক রপ্তানি নিয়ে গেছি ৪৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বিশ্বে এ পর্যন্ত যত সংকট তৈরি হয়েছে, বিশ্বমন্দা বা আর যাই হোক- সব কিছু মোকাবিলা করেই কিন্তু আমরা এগিয়ে চলেছি। ১৯৯৫ সালে প্রথমে আসল চাইল্ড লেবার ইস্যু, সেটা মোকাবিলা করেই আমরা এগিয়ে গিয়েছি। ২০০৫ সালে কোটামুক্ত বিশ্বে সবাই বলেছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ বলেছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টর আর থাকবে না। আমরা পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম যে, না, বাংলাদেশে এর পরও থাকবে এবং আমাদের কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
এরপর একটা বড় অর্থমন্দা গেল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। এর পরও কিন্তু আমাদের গ্রোথ আরও ভালোভাবে এগিয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা, রানা প্লাজা ইনসিডেন্ট, তার আগে তাজরিন ইনসিডেন্ট। এত বড় ঘটনার পরও দেশ কিন্তু এগিয়েছে। এর পরে আমরা বলেছিলাম, এই দুই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্পের জন্য হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট এবং তাই হয়েছে। আমার মনে আছে, ২০১৫ সালে তোফায়েল ভাইয়ের (সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ) নেতৃত্বে ওয়াশিংটনে কনগ্রেসম্যানদের সঙ্গে বসলাম। তারা শুরুতেই খুব আশ্চর্য হয়েছিল যে, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাংলাদেশের অ্যাপারেল সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে, এটা তাদের কাছে মিরাকল ছিল।
বাংলাদেশ সব সময় এ ধরনের মিরাকল করার জন্যই প্রস্তুত থাকে। বাংলাদেশের সাহসী উদ্যোক্তারা সব সময় এগিয়ে যায়। আমাদের সব সময়ই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। যত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে তত শক্তি নিয়ে আমরা পরাহত করার চেষ্টা করি। তার ফলে আমরা রানা প্লাজার পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আজকে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ডে হাইয়েস্ট গ্রিন ফ্যাক্টরির দেশ, প্লাটিনাম লিড সার্টিফাইড বাংলাদেশ, সেফেস্ট সোর্সেস কান্ট্রি বাংলাদেশ। এগুলো অ্যাচিভমেন্ট। আমরা গর্বের সঙ্গে বাইরে বলতে পারছি। সুতরাং এই ধরনের যত চ্যালেঞ্জই আসুক, আমরা এগিয়ে যাব।
পোশাকশিল্পে নতুন প্রজন্মের যারা যুক্ত হয়েছেন তারা কেমন করছেন। বিশেষ করে আপনাদের সন্তানরা কেমন করছেন?
প্রত্যেকটা সংকটকালে কিছু সমস্যা হয়। সেটা যদি যথাযথভাবে ফেস করতে কেউ ব্যর্থ হয়, তাদের হারিয়ে যেতে হয়। হারিয়ে যাওয়ার পরে যারা থাকে, তাদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের যারা এখন ইনভলভ হয়েছে বা হচ্ছে, তাদের নিয়ে আমরা আশাবাদী। টেকনোলজি যেভাবে সংযুক্ত হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমাদের সেকেন্ড জেনারেশন আরও ভালো হবে। এই সেক্টরকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের কোয়ালিটি, স্কিল, লেখাপড়া আমাদের চেয়ে উন্নত। তারা বাইরে থেকে আধুনিক বিষয়গুলো দেখে আসছে, বাইরে লেখাপড়া করছে।
আর বাংলাদেশে অ্যাপারেল সেক্টর থাকবে, থাকতে হবে। কারণ চায়না, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া-এর সবাই কিন্তু বিপদে আছে। আমেরিকার সঙ্গে চীনের একটা বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। তো এর বেনিফিট তো কোথাও না কোথাও যাবে? তাহলে কোথায় যাবে? সেফেস্ট সোর্সিং কান্ট্রি তো বাংলাদেশ। বাংলাদেশেই আসবে। আমাদের রপ্তানি বাড়তেই থাকবে।
আরেকটা সুখবর হচ্ছে, দেড় শ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের দেশ ভারতেও কিন্তু আমাদের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে পাশের দেশটিতে আমাদের মোট রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরেও সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। আমরা কিন্তু সেখানে ঢুকে গেছি। আমাদের বাজার কিন্তু আস্তে আস্তে বাড়ছে। এ জন্যই আমরা খুব আশাবাদী।
তীব্র গ্যাসের সংকট ও মূল্যস্ফীতিসহ ছয় সমস্যায় পড়েছে দেশের রেস্তেরাঁ খাত। চলমান এসব সংকট নিরসনে সরকারে কাছে দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। এ ছাড়া শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় দিয়ে হুমকিধামকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা বন্ধসহ রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা সুপরিকল্পনা ঘোষণার দাবি জানান এখাতের মালিকরা। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনের সভাপতি ওসমান গনি, মহাসচিব ইমরান হাসানসহ অন্যরা ছিলেন এ সময়।
ইমরান হাসান বলেন, ‘দেশে এখন লুটেরা, সাম্রাজ্যবাদীরা এখন এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা করছে। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ গ্যাস পাচ্ছে না। যারা কিনছে, তারা ১,৩০০ টাকার সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করেছে।
এ অবস্থায় পেট্রোবাংলা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে রয়েছে। এ ছাড়া সরকারের কোনো উপদেষ্টা এ নিয়ে কথা বলছে না, কোনো কার্যক্রম নেই। শুধু ভোক্তা অধিদপ্তর লোক দেখানো কিছু জরিমানা করছে। তাতে আরও হিতে বিপরীত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই বিল্পবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। বিগত দিনের অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম থেকে মুক্তি মিলবে বলেই প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিগত দিনের প্রতিবন্ধকতা দিন দিন বাড়ছে।
এ ছাড়া বর্তমান বাজারে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে। এসব কারণে দেশের রেস্তোরাঁ সেক্টর আজ এক গভীর সংকটময় সময় অতিক্রম করছে।’
ইমরান বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়। তবে এ খাতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হতো। সেটা কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করার মাধ্যমে। যারা বর্তমানে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হলে গ্রাহক হারাচ্ছে রেস্তোরাঁ মালিকরা এবং লোকসান বেড়েই চলেছে।’
পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে আমরা মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যে দিশেহারা হয়ে গেছি। বাজারে কখনো তেলের সংকট, ডাল, চাল পেঁয়াজের সংকট লেগে রয়েছে। অন্যদিকে এ সরকারের সময় কিছু কর্মচারী ও বহিরাগত ব্যক্তি শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় দিয়ে হুমকি-ধামকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে। এসব দাবিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে। আসলে একটি করপোরেট গোষ্ঠী ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবহার করে রেস্তোরাঁ খাত দখলের ষড়যন্ত্র করছে।’
তিনি আরও বলেন, এসব নামে-বেনামে চাঁদাবাজি ও হুমকি বন্ধ না হলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে এ সময় কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে সর্বপ্রথম জ্বালানি সংকট নিরসন, রেস্তোরাঁ ব্যবসা করপোরেট দখলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা পর্যায়ে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বর্তমান ও আগামী সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহারে রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা সুপরিকল্পনা ঘোষণা প্রদান করার কথা বলেন, রেস্তেরাঁ মালিকরা।
তারা বলেন, এই সেক্টরে কর্মরত ৩০ লাখ কর্মকর্তা- কর্মচারী এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ জড়িত। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লোক খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে রেস্তোরাঁর উপর নির্ভর করবে। রেস্তোরাঁ সেক্টরে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এই সেক্টর, সুতরাং রেস্তোরাঁ সেক্টরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। আর যদি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হয়, অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ না করা হয় এবং গ্যাস সংকটসহ সব সম্যসা সমাধান না হলে ব্যবসা বন্ধ করে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবে।
দেশের বাজারে মোবাইল ফোনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও সহজতর করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মোবাইল ফোন আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর শুল্ক আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আজ মঙ্গলবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানানো হয়।
শুল্ক হ্রাসের এই সিদ্ধান্তের ফলে সরাসরি আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের দাম যেমন কমবে, তেমনি দেশীয় মোবাইল ফোন সংযোজনকারী শিল্পকেও বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ফোনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য মোবাইল তৈরির যন্ত্রাংশ ও উপকরণ আমদানিতেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে যারা ফোন সংযোজন করেন, তাদের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নেওয়া এই পদক্ষেপটি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হওয়ার ফলে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরণের স্বস্তি আসবে। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ৩০ হাজার টাকার অধিক মূল্যের প্রতিটি স্মার্টফোনের দাম প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশে সংযোজিত বা প্রস্তুতকৃত ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের প্রতিটি ফোনের দামও গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পাবে। সরকারের প্রত্যাশা, এই বিশাল শুল্ক ছাড়ের ফলে বাজারে সব ধরণের মোবাইল ফোনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্মার্টফোন কেনা আরও সহজসাধ্য করে তুলবে। মূলত সাশ্রয়ী মূল্যে প্রযুক্তি পণ্য পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এবং আমদানিকারকদের আর্থিক চাপ কমাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে এলপিজি আমদানিকে ‘শিল্প কাঁচামাল’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই স্বীকৃতির ফলে আমদানিকারকরা এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন বা প্রায় ৯ মাস মেয়াদে বাকিতে মূল্য পরিশোধের বিশেষ সুবিধা পাবেন। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত এলপিজি আমদানির জটিল প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ সময় সাপেক্ষে এই বাড়তি ঋণ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এলপিজি সাধারণত বড় জাহাজে বাল্ক আকারে আমদানি করা হয় এবং পরবর্তীতে তা দেশে এনে বিশাল স্টোরেজ ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন সাইজের সিলিন্ডারে ভরে বাজারজাত করার পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ এবং চূড়ান্ত বিতরণে বেশি সময় লাগার কারণে আমদানিকারকদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লোতে নেতিবাচক চাপ তৈরি হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই গত ২৯ ডিসেম্বর শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে যে ২৭০ দিনের বাকিতে পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, এলপিজি আমদানিকারকদেরও এখন একই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হলো। এর ফলে স্থানীয় বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে আমদানিকারকরা কেবল সরবরাহকারীর কাছ থেকেই নয়, বরং চাইলে বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও ক্রেতা ঋণ বা ‘বায়ার্স ক্রেডিট’ গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি, দেশীয় ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বিল ডিসকাউন্টিং সুবিধাও পাওয়া যাবে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা এবং ঋণ সংক্রান্ত সকল সতর্কতামূলক নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, এই নীতিগত সহায়তার ফলে জ্বালানি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে এবং আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে। মূলত সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দেশে এলপিজি অটোগ্যাসের চরম সংকটের কারণে অধিকাংশ গ্যাস স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে এলপিজি চালিত প্রায় দেড় লাখ যানবাহনের মালিক ও চালকরা জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এক জরুরি দাবি উত্থাপন করেছে। তারা জানিয়েছে, দেশে প্রতি মাসে ব্যবহৃত মোট ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির অন্তত ১০ শতাংশ বা ১৫ হাজার মেট্রিক টন যেন বাধ্যতামূলকভাবে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোতে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। অন্যথায় পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী এই বিকল্প জ্বালানি শিল্পটি অচিরেই সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে মালিক পক্ষ অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে গ্যাস সংগ্রহের জন্য চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। এর ফলে যাত্রীসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক যানবাহন রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি অবিলম্বে এই শিল্পকে রক্ষা করা না যায়, তবে বিপুল সংখ্যক যানবাহনের মালিক এলপিজি কিট খুলে অন্য জ্বালানিতে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। এটি কেবল পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে না, বরং কয়েক হাজার স্টেশন মালিক ও কর্মচারী সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বেন। এই সংকট নিরসনে তারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়াকে অবিলম্বে স্বাভাবিক ও পর্যাপ্ত করা এবং যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া। এছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার ও অটোগ্যাস স্টেশনের সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে যারা অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রি করছে, সেই অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়মিত তদারকি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার ওপর তারা বিশেষ জোর দিয়েছেন।
বর্তমানে আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি যারা নতুন করে এলপিজি আমদানি করতে আগ্রহী, তাদের আবেদন দ্রুত অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, অটোগ্যাস স্টেশন মালিকদের এই কঠিন সময়ে নীতিগত সুরক্ষা ও বিশেষ সহায়তা প্রদান করা না হলে এই বিশাল বিনিয়োগটি মুখ থুবড়ে পড়বে। মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতেই তারা এই কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও বিইআরসি এই যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে কী ধরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
শীতের তীব্রতা কমায়, সরকারি ছুটির দিনে মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বেড়েছে। শীতের দাপট কম থাকায় সকাল থেকে বেড়েছে ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা। ব্যবসা ও লোকসংখ্যা মেলার দোকানিরা আশার আলো দেখছেন। তাদের মুখে ফুটেছে সফলতার হাসি। ব্যবসায়িরা বলছেন, দিন বাড়ার সাথে সাথে ক্রেতা দর্শনার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে বেচাকেনাও বাড়ছে।
নরসিংদির শিবপুর থেকে মেলায় এসেছেন আবু হানিফ মিয়া। তিনি বলেন, বাণিজ্যমেলার প্রথম দিনই আসার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ব্যস্ততা, ঘন কুয়াশা আর শীতের কারণে আসা হয়নি। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সরকারি ছুটির দিন, সকালে আকাশে সূর্যের দেখা পেয়েছি। তাই সপরিবারে মেলায় চলে এসেছি।
নারগিস সুলতানা নামে এক দর্শনার্থী জানান, আজ সূর্য উঠায় মেলায় আসলাম। রোদের আলোতে মেলাটা যেন ঝলমল করছে। এমন পরিবেশে মেলায় এসে খুবই ভালো লাগছে। দেখতেছি, পছন্দ হলে দিনভর কেনাকাটা করব।
টানা তিন দিন পর সূর্য্যরে দেখা মিলেছে। রৌদ্দ মেঘের লুকচুরি খেলা চলছে। তাপও কিছুটা বেড়েছে। শীতও কমেছে। বাণিজ্যমেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের তেমন উপস্থিতি না থাকলেও চতুর্থ দিন সকাল থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থী আসতে শুরু করেছেন। ঘুরে দেখছেন মেলা প্রাঙ্গণ। গত ৩ জানুয়ারী ঢাকার পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফসি) শুরু হয়েছে বাণিজ্য মেলার ৩০তম আসর। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সকাল ১০টায় গেট খোলার পরপরই মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। তারা জানান, প্রথম দিকে শুধু স্টল ঘুরে দেখার জন্য আসা, কেনাকাটা শুরু হবে মাঝামাঝি সময় থেকে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণা। তবে মেলা জমে উঠতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েকদিন। এখনও অনেক স্টলে সাজসজ্জার কাজ চলছে।
মেলায় প্রবেশ টিকিট ইজারাদার 'ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের, হেড অফ অপারেশন বলেন, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারনে ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় না আসলেও শনিবার থেকে লোকসমাগম বৃদ্ধি পাচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কারণে এবার ক্রেতা দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মেলার আয়োজক সংস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বানিজ্য মন্ত্রনালয় মেলাকে প্রানবন্ত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্ব্বোচ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবারে পরিবেশ অনুকূলে থাকায় কেনা-বেচার ধুম পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন মেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সাত শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একাধিক ভ্রাম্যমান আদালত রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গেট ইজারাদারের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে।
আমিরা বিডি ডট কমের ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম জানান, শৈত্য প্রবাহের দাপটে এ কদিন মেলায় মানুষজনের উপস্থিতি তুলনামূলক খুবই কম ছিলো। আজ আকাশে সূর্যের হাসির সঙ্গে বাণিজ্য মেলাও যেন হেসে উঠেছে। সকাল থেকেই ক্রেতা দর্শনার্থীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্য করছি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস আদালত, স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় মেলা আজকে অনেকটা সরব।
মেলার ইজারাদার ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ডিরেক্টর মারুফুল আলম বলেন, এমনিতেও মেলায় প্রথম দিকে ক্রেতা দর্শনার্থী কিছুটা কম থাকে। তার মধ্যে প্রথম থেকেই ঘন কুয়াাশা আর শৈত্যপ্রবাহের কারণে জনসমাগম তুলনামূলক কমই ছিলো। আজ হঠাৎ তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। ফলে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বিকেল যত ঘনিয়ে আসবে ক্রেতা দর্শনার্থী আরও বাড়বে বলে আশা করছি। বেলা ৩ টা পর্যন্ত ৩০ হাজার ৫৪৪ জন দর্শনার্থী টিকিট কেটে মেলায় প্রবেশ করেছে। আশা করছি আজ এর সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে।
দেশের নান্দনিক, রুচিসম্মত ও ফ্যাশনেবল বরান্ড হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়তার দিক থেকে প্রথম সারিতে রয়েছে টুয়েলভ ক্লথিং লিমিটেড। এই সেপ্টেম্বরে ক্রেতাদের জন্য নানা ডিজাইনের পোষাকের পাশাপাশি দূর্দান্ত অফারে সাজানো হয়েছে টুয়েলভের প্রতিটি আউটলেট। অনলাইনেও ক্রেতারা উপভোগ করতে পারবেন দারুণ এসব অফার।
এছাড়া, নিজেদের লয়্যাল কার্ডধারী ক্রেতাদের জন্যও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের আয়োজন করে থাকে টুয়েলভ। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা সবসময় বিবেচনা করে নিজেদের কালেকশন সমৃদ্ধ করেছে টুয়েলভ কতৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় এই জেঁকে বসা তীব্র শীতের মাঝেই ”মাঘ মাসে বাঘা ছাড়” নামে নতুন ক্যাম্পেইন চালু করেছে টুয়েলভ। স্টক সীমিত থাকায় এই অফার চলবে খুবই অল্প দিনের জন্য। যেখানে শীতের সকল পণ্যের ওপর থাকছে ৫০% পর্যন্ত মূল্য ছাড়। টুয়েলভের সকল আউটলেটের পাশাপাশি অনলাইনেও অর্ডারের মাধ্যমে ক্রেতারা এই অফার উপভোগ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে টুয়েলভের কতৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, টুয়েলভ ক্রেতাদের নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে একটি বিশাল পরিবার তৈরি করেছে। সেই পরিবারের সদস্যদের মাঝে এই শীতে আনন্দের উপলক্ষ এবং ফ্যাশন সচেতনতা তৈরি করার জন্যই এ আয়োজন।
দেশের ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ২০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) কেনা এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। এ ক্ষেত্রে কাট-অফ হারও ১২২ টাকা ৩০ পয়সা ছিল বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ১৪টি ব্যাংক থেকে ২২ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
সর্বশেষ ক্রয়ের ফলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭৫ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গতকাল বৃহস্পতিবার ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ২০৬ মিলিয়ন (২০ কোটি ৬০ লাখ) মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ দশমিক ৩০ টাকা। কাট-অফ হারও ১২২ দশমিক ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়ু।’
এর ফলে, নতুন বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসে মোট ক্রয় দাঁড়াল ৬১৭ মিলিয়ন বা ৬১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ও জার্মান সরকারের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার জিআইজেড কর্তৃক প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ২১.৭৭ মিলিয়ন ইউরোর অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলো হলো: পলিসি এ্যাডভাইজারি ফর প্রমোটিং এনার্জি ইফিসিয়েন্সি অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি (পিএপি) ২, স্ট্রেনদেনিং আরবান ইন্টিগ্রেশন ক্যাপাসিটিস অব ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পার্সনস অ্যান্ড সাপোর্টিং হোস্ট কমিউনিটিস (ইন্টিগ্রেট), প্রফেশনাল এডুকেশন ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সেফটি (পিআরইসিআইএসই), গ্রিন রুম এয়ার-কন্ডিশনিং (জিআরএসিই) এবং ডিজিটাল স্কিলস টু সাকসিড ইন এশিয়া (ডিএস২এস)।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং জার্মান সরকারের পক্ষে জিআইজেড ঢাকা অফিসের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেনরিখ-জুর্গেন শিলিং অনুদান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ইআরডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পিএপি ২ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৯ সালের ৩১ জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। এ প্রকল্পের অনুকূলে জার্মান সরকার ৯ মিলিয়ন ইউরো অনুদান বরাদ্দ করেছে। সামাজিকভাবে ন্যায্য এবং পরিবেশগতভাবে সুষম জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ-সংক্রান্ত পরিস্থিতির উন্নতিসাধন করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
ইন্টিগ্রেট প্রকল্পটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটির অনুকূলে জার্মান সরকার ৪.৮০ মিলিয়ন ইউরো অনুদান বরাদ্দ করেছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ ঐসব এলাকায় বসবাসরত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীকরণ।
পিআরইসিআইএসই প্রকল্পটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩০ জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটির অনুকূলে জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে ৭ মিলিয়ন ইউরো অনুদান হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে। যা বাংলাদেশে টিভিইটি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হবে।
জিআরএসিই প্রকল্পটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৮ সালের ৩১ জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। এ প্রকল্পের অনুকূলে জার্মান সরকার ০.৮ মিলিয়ন ইউরো অনুদান বরাদ্দ করেছে। এটি একটি গ্লোবাল প্রকল্প। জাতীয় নীতিমালার অংশ হিসেবে জলবায়ু বান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী রুম এয়ার কন্ডিশনিং (গ্রিন এসি) এর প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
ডিএস২এস প্রকল্পটির অনুকূলে জার্মান সরকার প্রকল্প মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধিসহ অতিরিক্ত ০.১৭৫২১২ মিলিয়ন ইউরো অনুদান বরাদ্দ করেছে। মূল প্রকল্পটি ০.৩৮২৫২৬ মিলিয়ন ইউরো অনুদান সহায়তায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এটি একটি আঞ্চলিক প্রকল্প। নৈতিকতাভিত্তিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানের মাধ্যমে এশিয়া অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান শ্রম-বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
জার্মান সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে। ১৯৭২ সাল থেকে জার্মান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার মোট প্রতিশ্রুতি প্রায় ৪.০০ বিলিয়ন ইউরো। বর্তমানে জিআইজেড বাংলাদেশে ১৮টি প্রকল্পে ১০০.৭২ মিলিয়ন ইউরো অনুদান সহায়তা প্রদান করছে।
দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবশালী বাণিজ্যিক জোট মারকোসুর বাজারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে উরুগুয়ে ‘গেটওয়ে’ বা প্রধান প্রবেশদ্বার হতে পারে বলে মনে করে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশে নিযুক্ত উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি বিজিএমইএ পরিদর্শনে এলে এ ব্যাপারে অভিমত প্রকাশ করেন বিজিএমইএ নেতারা।
বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম এবং পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে উরুগুয়ের অনারারি কনসাল মোস্তফা কামরুস সোবহান।
সভায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনার শুরুতে বিজিএমইএ-এর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে উরুগুয়েতে পোশাক রপ্তানি বাড়াতে সহযোগিতা কামনা করেন।
বিজিএমইএ-এর সিনিয়র সহসভাপতি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও লাতিন আমেরিকার বাজারে সেভাবে প্রবেশ করতে পারেনি এবং বাংলাদেশে সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
বিজিএমইএ পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে উরুগুয়ে মারকোসুর অঞ্চল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান গেটওয়ে বা প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।
উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি উরুগুয়ের বিশ্বমানের ‘ট্রেসেবিলিটি’ যুক্ত উল বাংলাদেশে রপ্তানির প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশে উরুগুয়ের অনারারি কনসাল মোস্তফা কামরুস সোবহান বলেন, উরুগুয়ের মেরিনো উলের রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ট্রেসেবিলিটি সনদ, এবং বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারীরা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
বিজিএমইএ পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, বাংলাদেশ উরুগুয়ে থেকে উল আমদানির মাধ্যমে পণ্যে বৈচিত্র্য এনে লাতিন আমেরিকার বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
সভায় বিজিএমইএ’র পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী উরুগুয়েতে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন।
রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি জানান, উরুগুয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিজিএমইএ এই প্রতিনিধি দলের অংশ হতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বিজিএমইএ নেতারা ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দেন। পরে উভয়পক্ষ একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নতুন করে সমন্বয় এবং ডিলারদের ওপর প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধের দাবিতে দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। আজ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের খুচরা ও পাইকারি বাজারে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। ব্যবসায়ী সমিতির এই আকস্মিক কর্মসূচির ফলে রান্নার গ্যাস নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। অনেক এলাকায় সিলিন্ডার পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে, আর কোথাও পাওয়া গেলেও বিক্রেতারা সাধারণ দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দাবি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই অচলাবস্থা বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে মূলত দুই দফা দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত এলপিজির বর্তমান মূল্য পুনরায় বিচার-বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মতভাবে সমন্বয় করা এবং দ্বিতীয়ত, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর চালানো জরিমানা ও হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করা। এর আগে বুধবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা পার হওয়ার পর গতকাল বুধবার রাত থেকেই দেশের সকল পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় সমিতি। একই সঙ্গে সকল কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে নতুন করে এলপিজি উত্তোলনও স্থগিত রাখা হয়েছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেলিম খান জানিয়েছেন যে, আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিইআরসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে যদি তাঁদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়, তবেই কেবল ধর্মঘট প্রত্যাহার করে পুনরায় বিক্রি শুরু করা হবে; অন্যথায় এই কঠোর কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তিনি দাবি করেন যে, বর্তমান নির্ধারিত দামে ব্যবসা পরিচালনা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং প্রশাসনের কড়াকড়ি তাঁদের ব্যবসায়িক অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এদিকে, সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা এবং ছোট-বড় রেস্তোরাঁ মালিকরা রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন। গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকারি তদারকি না থাকায় এবং ব্যবসায়ীদের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। অনেকেই খালি সিলিন্ডার নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং সবাই দ্রুত এই সংকট নিরসনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। আজকের বিকেলের বৈঠকের ফলাফলের দিকেই এখন পুরো দেশের নজর রয়েছে।
প্রায় সাড়ে সাত বছর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক জাহাজ ভুট্টার চালান পৌঁছেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় সদরঘাটের কনফিডেন্স সিমেন্ট ঘাটে ভুট্টার চালানটির খালাস শুরু হয়।
চালানটিতে ২০২৫-২৬ ফসল মৌসুমে নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ও মিনেসোটায় উৎপাদিত ৫৭ হাজার ৮৫৫ টন হলুদ ভুট্টা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ভ্যাংকুভার বন্দর থেকে জাহাজে পাঠানো হয়েছে। ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পশুখাদ্য প্রস্তুতকারকদের প্রাণী পুষ্টির একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের ভুট্টা ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে এই সরবরাহ।
দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা আমদানি উপলক্ষে কনফিডেন্স সিমেন্ট ঘাটে ‘দ্য রিটার্ন অব ইউএস কর্ন টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্ট উপস্থিত ছিলেন।
এ উপলক্ষে ঘাটে আয়োজিত ‘দ্য রিটার্ন অব ইউএস কর্ন টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্ট সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের তিনটি প্রধান পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান-নাহার অ্যাগ্রো গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ এবং নারিশ পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট।
এরিন কোভার্ট অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এখানে এসে আমি খুব খুশি। ঐতিহাসিক দিন আজ। বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে কাজ করে চলেছি। এটা ভুট্টার প্রথম শিপমেন্ট। ২০২৫-২৬ ফসল মৌসুমে এসব ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। দীর্ঘ ৮ বছর পর আবার ভুট্টা এলো বাংলাদেশে। প্রতি বছর ২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ভুট্টা আসবে। ভুট্টার মান ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব ভুট্টা রপ্তানি করেছে দেশটির অন্যতম প্রধান শস্য রপ্তানিকারক কোম্পানি ইউনাইটেড গ্রেইন করপোরেশন (ইউজিসি)।
বাংলাদেশের পশুখাদ্য উৎপাদনকারী তিন কোম্পানি নাহার অ্যাগ্রো গ্রুপ (১০ হাজার টন), প্যারাগন গ্রুপ (১৯ হাজার টন) এবং নারিশ পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড (২৯ হাজার টন) ভুট্টা আমদানি করেছে।
এমভি বেলটোকিও নামের একটি জাহাজে করে এসব ভুট্টা ৩১ ডিসেম্বর কুতুবদিয়ায় পৌঁছায়। সেখান থেকে ছোট আকারের (লাইটার) জাহাজে করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াপাড়ার বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা হয় এসব ভুট্টা।
বুধবারের অনুষ্ঠানে যে লাইটার থেকে ভুট্টার চালান খালাস উদ্বোধন করা হয়, সেখানে আড়াই হাজার টনের মতো ভুট্টা আছে।
অনুষ্ঠানে নাহার অ্যাগ্রোর এমডি রাকিবুর রহমান টুটুল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনে আমরা ভুট্টার চাহিদা মেটাতে পারব। বাংলাদেশে চাহিদার ৩০ শতাংশ আমাদের দেশীয় ভুট্টার মাধ্যমে পূরণ হয়। বাকিটা আমদানি করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে আমেরিকা থেকে কিনতে হয়। আনতে সময় লাগে ৪৫ দিন। বাংলাদেশের মানুষ দ্রুত পেতে চায় বলে আগে ভারত, ব্রাজিল থেকে আনা হতো। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের লোডিং পয়েন্টে হেল্প করেছে, যেন দেরি না হয়। এই চালান জাহাজে আসতে ৪৬ দিন লেগেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দাম প্রায় কাছাকাছি। ব্রাজিল থেকে আনলে প্রায় একই দাম। যেহেতু সম্পর্ক এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ১০-১৫ দিন বেশি সময় লাগলেও আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনব। প্রতি টনের দাম পড়েছে ২৪৬ ডলার।’
করদাতাদের ভোগান্তি কমাতে অনলাইনে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভ্যাট রিফান্ড বা ভ্যাট ফেরতের সুবিধা চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে ভ্যাটের পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য করদাতাদের আর সশরীরে অফিসে যেতে হবে না।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) এনবিআর-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করদাতাদের ভ্যাট রিফান্ড প্রাপ্তিতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এনবিআর অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আবেদন প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান (e-VAT) পদ্ধতিতে একটি নতুন ‘রিফান্ড মডিউল’ যুক্ত করা হয়েছে। এই সিস্টেমটি অর্থ বিভাগের (iBAS++) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের BEFTN (Bangladesh Electronic Fund Transfer Network) নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে করদাতার পাওনা টাকা সরাসরি তার নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় করদাতা তার মাসিক ভ্যাট রিটার্নের মাধ্যমেই অনলাইনের রিফান্ড বা টাকা ফেরতের আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট আবেদনটি যাচাই-বাছাই করার পর অনুমোদিত অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করদাতার ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে ম্যানুয়াল প্রসেসে রিফান্ড দেওয়ার জন্য যে পদ্ধতিটা আছে হুবহু সেটাকে ফলো করেই আমরা এটাকে ইলেকট্রনিক সিস্টেমে নিয়ে গেছি। আমরা ইলেকট্রনিক সিস্টেমটা চালু করে দেই, এরপর আমরা দেখব। যদি প্রসেসটা আরও সহজ করা লাগে আমরা আইন সংশোধন করব।
বর্তমানে কী পরিমাণ অর্থ ভ্যাট ও আয়করে রিফান্ডের জন্য বাকি রয়েছে- এমন প্রশ্নে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এটি সাকুল্যে ৪ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। তবে ভ্যাটে কম, এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো রকমের কোনো ভোগান্তিতে জড়িত না থাকে, তাহলে কেবলমাত্র আমার কালেকশন কমে যাবে সেজন্য আমি রিফান্ড দেবো না- এমন না। আমরা এটাকে কমপ্লিটলি স্বচ্ছ করতে চাই যে এখানে কেউ কোনো রকমের কোনো অনিয়মের আশ্রয় নেয়নি। কারণ দেখেন, ট্যাক্সপেয়ারের এটা ন্যায্য পাওনা। ট্যাক্সপেয়ার ব্যাংক থেকে চড়া হারে ঋণ নিয়ে এই টাকাটা আমাকে দিয়েছে। দীর্ঘদিন সরকারের কাছে পড়ে আছে। আমি তাকে কোনো সুদও দিচ্ছি না। আবার তাকে যদি এই রিফান্ড নেওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, এটা কিন্তু আমি মনে করি যে তাহলে আমরা আমাদের ট্যাক্সপেয়ারদের প্রতি আমরা ন্যায্য আচরণ করছি না।
অর্থবছরে এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকা আয় করলে এমন চার হাজার কোটি টাকা দেওয়া অসুবিধা হবে না বলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান।
উদ্বোধনী দিনেই তিনি ঢাকার তিনটি ভ্যাট কমিশনারেটের তিনজন করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ৪৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ফেরত দেন। অনুষ্ঠানে করদাতাদের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
এনবিআর জানায়, এই মডিউল চালুর ফলে রিফান্ড প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দ্রুত হবে। আবেদন করা থেকে টাকা পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘরে বসেই সম্পন্ন করা যাবে। এ বিষয়ে কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর আশা করছে, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে করদাতারা এনবিআর-কে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেছেন, আইপিও রুলস যুগোপযোগী হওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ভালো নতুন কোম্পানি নিয়ে আসার সুযোগ ও সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করছি ভালো ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিএসইসি ভবনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) এর নবনির্বাচিত নির্বাহী কমিটির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, বিএমবিএ এর অন্যতম দায়িত্ব হলো ইস্যু ম্যানেজমেন্ট, আন্ডাররাইটিং ও পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট।
বিএসইসি ও বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলস্বরূপ সম্প্রতি আইপিও রুলস গেজেটে প্রকাশিত হয়ে কার্যকর হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিএমবিএ ও এর সদস্য ইস্যু ম্যানেজাররা ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার কাজ করবেন। এক্ষেত্রে বিএসইসি বরাবরই ইতিবাচক মনোভাব রাখে এবং পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিতে বিএসইসি সব রকমের সহায়তা করবে।
তিনি পুঁজিবাজারে ক্যাপিটাল ফরমেশন, পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট ও করপোরেট অ্যাডভাইজরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংকসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মার্চেন্ট ব্যাংকসমূহের সক্ষমতা, দক্ষতা ও নৈতিকতার উন্নয়ন হলে বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্ট সবাইকে পুঁজিবাজারের প্রতি আরও আকৃষ্ট ও আগ্রহী করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সভায় বক্তব্য রাখেন বিএসইসির কমিশনার মু. মোহসিন চৌধুরী, বিএসইসির কমিশনার মো. আলী আকবর, বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ, বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন এবং বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, প্রতিটি মার্চেন্ট ব্যাংক এবং মার্চেন্ট ব্যাংকসমূহের সংগঠনের তথ্যবহুল ওয়েবপেজ ও ওয়েবপোর্টাল থাকা প্রয়োজন। প্রকৃত তথ্য সংবলিত এসব ওয়েবপেজ ও ওয়েবপোর্টাল বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের পুঁজিবাজারে সচেতনতা সৃষ্টি করে তাদের আরও উপযোগী করবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমবিএ এর সভাপতি ইফতেখার আলম, সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার, সহ-সভাপতি মো. মনিরুল হক, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ রাশেদ হুসাইন, সদস্য গাজী মোহাম্মদ তারেক, সদস্য সুমন কুমার কুন্ডু, সদস্য মো. সোহেল হক।