এই মুহূর্তে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য না বাড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই মিলনায়তনে শনিবার সংগঠনটির এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বৈশ্বিক অন্তরীণ পরিস্থিতিতে চরম অসময় যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সময় এটা নয়। যে চেষ্টা হচ্ছে, সেটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার শামিল। সময় থাকতে সরকারকে তা বুঝতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়লে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে জনজীবনের ওপর। এটা চলতে থাকলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার দায়ভার তখন সরকারকে নিতে হবে।’
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘এরপরও যদি দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটি ব্যবসায়ীদের ওপর না চাপিয়ে বিদ্যুৎ খাতের তহবিল থেকে ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করা হোক।’ তিনি বলেন, ‘এই দুঃসময়ে পাইকারি পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বহুমাত্রিক মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়ে এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হবে দেশে। ফলে কৃষি শিল্প সেবা এবং সার্বিকভাবে সাধারণের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি করবে। সর্বোপরি অর্থনৈতিক উন্নয়নের চলমান ধারা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে।’
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দেশ এখন স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নিয়ে কাজ করছে সরকার। এই উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ এবং এসডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের সর্বাগ্রে ভূমিকা রাখতে হবে।’
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘এসডিজি ৭ অনুযায়ী ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ এবং জনগণের জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সবার জন্য সুলভ উন্নত নিরবিচ্ছিন্ন এবং টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বার্ক) আইনের বিধান অনুযায়ী স্বচ্ছতা, মানসম্মত দক্ষতা ও জবাবদিহিতা সহকারে সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং এই খাতে সর্বত্র অদক্ষতা, যথেচ্ছ অনিয়ম, অস্বচ্ছতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং আইনের বিপরীতে পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থায় সমগ্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না করে এ খাতে বিরাজমান অব্যবস্থাপনার অহেতুক দায়ভার জাতীয় অর্থনীতি এবং জনগণের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের সকল ক্ষেত্রে সংক্রমিত করা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।’
তবে করোনার সংকট ময় পরিস্থিতি প্রশমিত হলে এবং ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি বন্ধ হওয়ার পর দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ব্যবসায়ীদের সেক্ষেত্রে আপত্তি থাকবে না বলেও দাবি করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কুইক রেন্টালের এক সময় প্রয়োজনীতা ছিল। এখন আর তার প্রয়োজনীয়তা নেই। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা উচিত। অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা উচিত। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। সরকার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সরকারের ভুল পরিকল্পনার খেসারত শিল্প খাত বহন করতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি না করে এখন সরকারের উচিত হবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের আমূল সংস্কার আনা। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। বিদ্যুতের অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধ করে অহেতুক খরচ কমিয়ে আনা। এর জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।’
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর চেষ্টার পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেননেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ সভাপতি মির্জা নুরুল গনি শোভন। তিনি দাবি করেন, এর থেকে সরে আসতে হলে দরকার গণতান্ত্রিক সরকারের রাজনৈতিক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এর বাইরে আমলাতন্ত্রের সিদ্ধান্তে কোন কাজ হবে না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘দেশে এখন ডলার সংকট চলছে। ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। এখন যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়, উৎপাদন খরচ বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর। এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সময় নয়।’
রিহাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, ‘বিশ্ববাজারে ঝড় চলছে। এ অবস্থায় ইচ্ছামত দাম বাড়িয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন না।’
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে আমরা রপ্তানিতে বেশ ভালো করতে ছিলাম। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে দেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, সাবেক সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন, এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, বিএসএমএর সভাপতি মনোয়ার হোসেন, বিসিএমএর সভাপতি মো. আলমগীর কবিরসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি'র সঙ্গে তার সংসদ ভবনস্থ কার্যালয়ে চীন ও সিঙ্গাপুরের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎকালে চিফ হুইপ বলেছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অপার সম্ভাবনাময় হলেও পর্যাপ্ত শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের অভাবে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বরগুনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা গেলে এই অঞ্চল শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, বরং দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আজ সোমবার এ সাক্ষাতে বরগুনা জেলার সার্বিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাত নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনার প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বরগুনায় আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক হাব প্রতিষ্ঠা, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরশক্তি খাতের উন্নয়ন, আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং শিল্পের সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সাক্ষাৎকালে বরগুনায় একটি আধুনিক ব্যবসায়িক হাব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল মত প্রকাশ করে যে, জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তীতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভাব্য উন্নয়ন এটিকে ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক হাব প্রতিষ্ঠিত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ আরও সহজ হবে।
গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে চীফ হুইপ বলেন, ব্লু ইকোনমির বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আধুনিক বন্দর অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে, পরিবহন ব্যয় কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
চীন ও সিঙ্গাপুরের প্রতিনিধিদল গভীর সমুদ্র বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের মতে, আধুনিক বন্দর সুবিধা গড়ে উঠলে বরগুনাসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে চীফ হুইপ বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সৌরশক্তিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের অংশ হিসেবে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়। চীফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য শুধু প্রচলিত চাকরির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান, ফ্রিল্যান্সিং এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সেবাবাজারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে লাখো তরুণ-তরুণী ঘরে বসেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
প্রতিনিধিদল বরগুনায় আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রযুক্তি ইনকিউবেশন সেন্টার এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও উচ্চগতির ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে বরগুনা দেশের অন্যতম ডিজিটাল কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে চীফ হুইপ বলেন, কোনো অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি বরগুনায় আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি। তাই শিক্ষাকে শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।
চীন ও সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করে। তারা বিশেষ করে প্রযুক্তি শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে।
সাক্ষাৎ শেষে উভয় পক্ষ সম্ভাব্য প্রকল্পসমূহ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত আলোচনা অব্যাহত রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ব জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শীর্ষে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাতের প্রধান কাঁচামালের জোগানদাতা নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) এবং বিভিন্ন শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ পুনর্ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমানে দেশের জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার শিল্প থেকে বছরে প্রায় ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পমহল দাবি করছে। একই সঙ্গে এই শিল্প দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের জন্য প্রয়োজনীয় ইস্পাতের একটি বড় অংশ সরবরাহ করছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা (রিসাইক্লিং) শিল্পে ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তন, পরিবেশবান্ধব রূপান্তর এবং বৈশ্বিক বাজারের শেয়ারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে শীর্ষ জাহাজ ভাঙা দেশের অবস্থানটি হারায় এবং ভারত শীর্ষস্থানে চলে আসে। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম (NSP) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মাত্র ৮৮টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে (২.৬৮ মিলিয়ন টন), যা ২০২৪ সালের (১৩০টি জাহাজ) তুলনায় ৩২% কম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ২.৭৪ মিলিয়ন গ্রস টন জাহাজ পুনর্ব্যবহার করেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪৩ শতাংশ। এ সময় বিশ্বের ভাঙা বাল্ক ক্যারিয়ারের ৬৭ শতাংশ, গ্যাসবাহী জাহাজের ৫৮ শতাংশ এবং তেলবাহী ট্যাংকারের ৪২ শতাংশ বাংলাদেশে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী হলেও পুনর্ব্যবহারকৃত জাহাজের পরিমাণের দিক থেকে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।
সীতাকুণ্ডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্পাঞ্চল
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে শতাধিক জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ এখানে আনা হয়। এসব জাহাজ ভেঙে পাওয়া ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, পাইপ, কেবল ও অন্যান্য উপকরণ দেশের বিভিন্ন শিল্পে পুনরায় ব্যবহার করা হয়।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইস্পাত শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত থেকে। ফলে নির্মাণ শিল্পের ব্যয় কমাতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদান
জাহাজ ভাঙা শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া পরিবহন, অক্সিজেন সরবরাহ, যন্ত্রাংশ ব্যবসা, ইস্পাত রি-রোলিং মিলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারও এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেয়ে থাকে। আমদানি শুল্ক, কর ও বিভিন্ন ফি বাবদ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
সবুজ জাহাজ পুনর্ব্যবহারের পথে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ‘হংকং কনভেনশন’ কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জাহাজ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের ১৭টি জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
সরকার ধীরে ধীরে অননুমোদিত ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চ্যালেঞ্জও কম নয়
সাফল্যের পাশাপাশি এ শিল্পকে ঘিরে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে আসছে।
এছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জাহাজের কম সরবরাহ এবং নতুন নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার কারণে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে কিছুটা নিম্নগতি দেখা গেছে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে বাংলাদেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প আগামী দশকে আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার পুরোনো জাহাজ আগামী বছরগুলোতে অবসরে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের জাহাজ ভাঙা শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্প শুধু দেশের ইস্পাত খাতকেই শক্তিশালী করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (২২ জুন) দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এদিন লেনদেনের পরিমাণ কমলেও অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিএসই ও সিএসই-র বাজার পর্যালোচনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ৫ হাজার ৫৫৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সূচকের এই বড় পতনের পাশাপাশি ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৯ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১২৯ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৩৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১১০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এদিন ডিএসইতে মোট ৮৭৬ কোটি ৬ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা কম। রবিবার ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
ডিএসইতে এদিন ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে দাম বেড়েছে মাত্র ৩৬টি কোম্পানির। বিপরীতে ৩১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর কমেছে এবং ৩৪টি কোম্পানির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেনের শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বেক্সিমকো ফার্মা, সামিট পোর্ট, ন্যাশনাল ফিড, বিডিথাই এবং রবি। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর হারানোয় সূচকের এই বড় পতন ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই সোমবার ১৬৭ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৮২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৩৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৯টির দাম বেড়েছে, ১৭৪টির কমেছে এবং ২৬টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে লেনদেনের চিত্রে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। সিএসইতে এদিন ৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকার তুলনায় ৪৪ কোটি টাকা বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারে নাইট্রোজেনভিত্তিক রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার দামে ব্যাপক দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের প্রভাব কাটিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার আগেই সারের বাজার নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার বিষয়ক তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান আর্গুসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ইউরিয়া সারের আদর্শ বা বেঞ্চমার্ক মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত এপ্রিলে যখন সরবরাহ সংকট চরমে ছিল, তখন প্রতি টন ইউরিয়া সারের দাম উঠেছিল ৯১৮ ডলারে। সেই দাম এখন নাটকীয়ভাবে কমে ৪৭৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা মূলত যুদ্ধের আগের মূল্যের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত বিশ্বব্যাপী সারের চাহিদা হ্রাস এবং চীন পুনরায় সার রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করায় আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আর্গুসের সার মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান সারাহ মার্লো এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর ইউরিয়ার দাম সবচেয়ে দ্রুত ও বেশি বেড়েছিল। আবার এ নৌপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়ার আগেই এর দামই সবচেয়ে দ্রুতগতিতে কমে গেছে।” তবে সারের এই আকস্মিক দরপতনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সতর্ক করে বলেন যে, সারের চাহিদা কমে যাওয়া কৃষি খাতের জন্য ভালো কোনো খবর নয়। অনেক কৃষক চড়া দামের সময় প্রয়োজনীয় সার কিনতে পারেননি এবং খরচ বাঁচাতে জমিতে কম সার ব্যবহার করেছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব আগামী মৌসুমে ফসলের ফলনের ওপর পড়বে এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সারের দাম যখন আকাশচুম্বী ছিল, তখন ফসলের দাম ছিল তুলনামূলক কম। এতে কৃষকদের মুনাফা হ্রাস পাওয়ায় তারা সার কেনা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেন। সার ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান স্টোনেক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিনভিল জানান, চড়া দামের কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষকরা প্রায় ৫ শতাংশ কম নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করেছেন। শতাংশের হিসাবে এটি কম মনে হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর বিশাল প্রভাব রয়েছে, যা বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে।
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার (২২ জুন) ইরান তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করার পর বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
বাজারের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৫৩ ডলার বা ১ দশমিক ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭৯ দশমিক ০৪ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ দিনের শুরুতে যখন আলোচনার অনিশ্চয়তা ছিল, তখন এর দাম ব্যারেলে ৮২ দশমিক ৩০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর হুমকি এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারিতে তেলের বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হলেও আলোচনার সফল সমাপ্তি সেই আতঙ্ক কাটিয়ে দিয়েছে।
একইভাবে মার্কিন বাজার ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দামও চুক্তির মেয়াদ শেষে ৭৬ দশমিক ৫৩ ডলারে স্থির হয়েছে। তবে আগস্ট মাসের ভবিষ্যৎ চুক্তির জন্য তেলের দাম ৫৫ সেন্ট কমে প্রতি ব্যারেলে ৭৫ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটির কারণে গত শুক্রবার বাজারের আনুষ্ঠানিক দর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই প্রথম দফার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গত রোববার থেকে নিবিড় সংলাপে অংশ নেন। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল গত এপ্রিল থেকে চলে আসা সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অন্তত ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো এবং দুই দেশের সম্পর্ককে পুনরায় স্বাভাবিকীকরণের পথে এগিয়ে নেওয়া। আলোচনার এই ইতিবাচক ফলাফলেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতার আভাস মিলছে।
জাপানের বাজারে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের প্রতীক্ষার পর অবশেষে প্রধান খাদ্যশস্য চালের দাম কমেছে, যা সাধারণ ক্রেতা এবং সরকারের জন্য একটি বড় স্বস্তির সংবাদ হয়ে এসেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত দেশটির সরকারি তথ্যের বরাতে জানানো হয় যে, জরুরি রাষ্ট্রীয় মজুদ থেকে বাজারে চাল সরবরাহ বৃদ্ধিসহ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপের ফলে এই দরপতন সম্ভব হয়েছে। মূলত গত দুই বছর ধরে তীব্র সরবরাহ সংকটের কারণে জাপানে চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। খবর জাপান টুডে।
দেশটির সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিলাসবহুল ‘কোশিহিকারি’ জাত ছাড়া অন্যান্য সাধারণ চালের দাম গত বছরের মে মাসের তুলনায় এবার প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর জাপানে এটিই চালের মূল্যে প্রথম কোনো বড় দরপতন। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশটিতে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনরোষের সৃষ্টি করেছিল। চালের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার মান হ্রাস এবং তৎকালীন সরকারের দুর্নীতির অভিযোগে সৃষ্ট ক্ষোভের জেরে গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার চালের এই সংকট মোকাবিলা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারি জরুরি তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ চাল উন্মুক্ত বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়, যার ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং দাম নিম্নমুখী হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানে ক্রমবর্ধমান পর্যটকের সংখ্যা এবং স্থানীয় কৃষকদের বয়স বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ভবিষ্যতে আবারও সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আপাতত সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখাই হবে নতুন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের বিনিময় হার কমে যাওয়ায় নতুন করে রাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ওসাকা এক্সচেঞ্জে আগামী নভেম্বর মাসের জন্য প্রতি কেজি রাবারের সরবরাহ চুক্তিমূল্য দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪০ দশমিক ৬ ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের মান বর্তমানে ১৬১ দশমিক ৪৫ ইয়েনে নেমে এসেছে, যা গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়।
মুদ্রার এই দরপতনের প্রভাবে চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে রাবারের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী থাকায় রাবারের এই মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণত মুদ্রার মান পরিবর্তন সরাসরি কমোডিটি বাজারের মূল্যে প্রভাব ফেলে, যার প্রতিফলন বর্তমানে রাবারের বাজারে দেখা যাচ্ছে।
দেশীয় টায়ার শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে মোটরসাইকেল টায়ারে আমদানির বিপরীতে সুরক্ষা প্রদান, কৃষি টায়ারে শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টায়ার-টিউব ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমইএ)। সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা এই দাবিগুলো তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমইএ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে লাইট ট্রাক টায়ারে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং কৃষি টায়ার আমদানিতে ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিন নীতি-সহায়তার অভাবে ধুঁকতে থাকা এই খাতের জন্য এসব উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক। আগে দেশীয় কৃষি টায়ারে ভ্যাট থাকলেও আমদানিকৃত পণ্যে তা না থাকায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছিলেন; নতুন বাজেটে সেই বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শিল্পের পূর্ণ বিকাশের জন্য আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
বিটিএমইএ নেতারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল টায়ার উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও বাজারটি এখনও আমদানিনির্ভর রয়ে গেছে। যদি স্থানীয় মোটরসাইকেল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেশীয় টায়ার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয় এবং আমদানিতে যথাযথ শুল্ক বসানো হয়, তবে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। টায়ার আমদানিকারকদের শঙ্কা নাকচ করে দিয়ে নেতারা বলেন, লাইট ট্রাক টায়ারে সম্পূরক শুল্ক বাড়ালে পরিবহন ব্যয় বাড়বে না; বরং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে প্রতিযোগিতার ফলে বাজারদর স্থিতিশীল থাকবে।
তবে টায়ার উৎপাদনের অপরিহার্য কাঁচামাল যেমন রাবার অ্যাক্সিলারেটর ও স্টিল কর্ডের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তারা জানায়, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই অবিলম্বে এই প্রস্তাব প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইভি খাতে ব্যবহৃত টায়ারের ক্ষেত্রেও দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এবং আমদানিকৃত সুবিধাদি সহজ করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিটিএমইএ-এর পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়, দেশীয় টায়ার শিল্পে বর্তমানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হচ্ছে। যদি সরকার ধারাবাহিক নীতি-সহায়তা প্রদান করে, তবে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই টায়ার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে। এটি দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘সবুজ অর্থনীতি’ বা গ্রিন ইকোনমির পরিধিও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। প্রথমবারের মতো এই খাতের মোট বাজারমূল্য ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এলএসইজি) প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে সবুজ অর্থনীতিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর আয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খবরটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস।
এলএসইজি-র সংজ্ঞা অনুসারে, যেসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি কিংবা পরিবেশগত সমাধানভিত্তিক কার্যক্রম থেকে আসে, তাদের সবুজ অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশ্বের প্রায় ২১ হাজার কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সবুজ আয়কে যদি একটি পৃথক শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এটি বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প খাতে পরিণত হবে। কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গারনট ওয়াগনার মনে করেন, ‘১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের অর্থ হলো বিপুল পরিমাণ মূলধন নবায়নযোগ্য, সবুজ ও লো-কার্বন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এসব খাত থেকে দীর্ঘমেয়াদে লাভের আশা করছেন।’ এটি কেবল পরিবেশগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
এলএসইজি-র গ্রিন ইকোনমি বিভাগের প্রধান লিলি দাই জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সাল থেকে সবুজ আয়ের প্রবৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও এই খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে অস্থিতিশীলতা অনেক দেশকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত করেছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, সবুজ অর্থনীতির কোম্পানিগুলোর মধ্যে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধির অন্যতম নির্দেশক। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেটএরা এনার্জি’ কর্তৃক ‘ডোমিনিয়ন এনার্জি’র সম্পদ অধিগ্রহণকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশটি এখনও বিশ্বের বৃহত্তম সবুজ অর্থনীতির বাজার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৭৯ দশমিক ৭ গিগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে মেটা, অ্যামাজন, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো, যারা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের কারণে ডেটা সেন্টারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, যা কিছু কোম্পানির লক্ষ্যমাত্রায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে; তবুও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অবস্থান এখনও সুসংহত। বিশ্লেষকদের মতে, সবুজ অর্থনীতির এই ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য বৈশ্বিক বিনিয়োগের নতুন প্রবণতার প্রতিফলন এবং আগামী দিনেও এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে।
ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজার পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। কয়েক বছরের মন্দাভাব কাটিয়ে বর্তমানে বাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি ও বিক্রির পরিমাণ উভয়েই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গত মে মাসে দেশে মোটরসাইকেল বিক্রিতে প্রায় ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এক বছরের ব্যবধানে একক মাসে বিক্রির এই উল্লম্ফন শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ব্র্যান্ডভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাপানি ও ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলো বর্তমানে বাজারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। গত মে মাসে প্রায় ৫২ হাজার ৫০০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যার বড় একটি অংশ ইয়ামাহা, সুজুকি ও হোন্ডার মতো নামী প্রতিষ্ঠানের। কেবল মে মাসেই নয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের হিসেবেও বিক্রির পরিমাণ ৩ লাখ ৮৭ হাজার ইউনিট ছাড়িয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসা এবং বাজারে নতুন মডেলের আধুনিক সব বাইক আসায় শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।
দেশের মোটরসাইকেল বাজারে বর্তমানে আরেকটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—দামি ও উচ্চ সিসির প্রিমিয়াম বাইকের চাহিদা। একসময় কেবল শখের বশে কেনা হলেও এখন তারুণ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উচ্চ সিসির বাইকগুলো ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে। বিশেষ করে রয়্যাল এনফিল্ডের মতো ব্র্যান্ড গত এক বছরেই প্রায় ১৩ হাজার ইউনিট বাইক বিক্রি করে ৫০০ কোটি টাকার বড় একটি বাজার তৈরি করেছে। এছাড়া ইয়ামাহা আর১৫ বা এফজেড-২৫ এর মতো স্পোর্টস বাইকগুলোর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে মোট বাজারের প্রায় ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম সেগমেন্টের দখলে থাকলেও আগামী কয়েক বছরে এটি ১৫ থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিক্রিত মোটরসাইকেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই স্থানীয় ১০টির মতো আধুনিক কারখানায় উৎপাদিত বা সংযোজিত হচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সমৃদ্ধ এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ। এছাড়া সরকার এই খাত থেকে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করে। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা ও যানজট এড়াতে সাধারণ মানুষের কাছে মোটরসাইকেল দিন দিন অপরিহার্য হয়ে উঠছে। রাইড শেয়ারিং সেবার বিস্তারে এটি অনেকের কর্মসংস্থানের উৎসেও পরিণত হয়েছে। এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি শুল্কনীতি এবং সরকারি নীতিসহায়তা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যতে এই শিল্প কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ নয়, বরং রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম পুনরায় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সোমবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটি জানিয়েছে, ভরিপ্রতি ৪ হাজার ৪৩২ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাজুস তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বেড়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।” এই নতুন দর অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়বে ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার ৩৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ টাকা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
বাজুস আরও জানিয়েছে যে, পরবর্তী কোনো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত দেশের সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই নতুন দাম কার্যকর থাকবে। স্বর্ণালঙ্কারের বিক্রয়মূল্যের সাথে ভ্যাট যুক্ত থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে আর কোনো ভ্যাট আদায় করা যাবে না। তবে অলঙ্কারের নকশা বা ডিজাইন অনুযায়ী নির্ধারিত মজুরি যথারীতি প্রযোজ্য হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত দেশের বাজারে মোট ৭৯ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাজুস, যার মধ্যে ৪০ বার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ৩৯ বার হ্রাস পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার মূল্যবৃদ্ধি এবং ২৯ বার মূল্যহ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এই সময়ে ইইউ দেশগুলোতে মোট ১৭ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার কম। যদিও মে মাসে রপ্তানি আয়ে একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের চিত্র দেখা গেছে, তবে সামগ্রিক হিসাবে এই বাজারে চাহিদা হ্রাসের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশ ইতিবাচক ছিল এবং তখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ আয় ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সেই প্রবৃদ্ধি মূলত পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে হয়েছিল, ক্রয়াদেশের পরিমাণ বাড়ার ফলে নয়। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, যা মে মাসে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারির পর এটিই চলতি বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি আয়।
অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে রপ্তানি আয়ে ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই মাসে ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু হলেও সেপ্টেম্বরে তা কমে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। পরবর্তী মাসগুলোতেও এই অস্থিরতা বজায় ছিল। এ বিষয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, “অর্থবছরের শুরুর মাসগুলোতে রপ্তানির পতন বেশি ছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চাহিদা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে অর্থবছরের বাকি সময়েও এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানি বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। এপ্রিলের ৩১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় মে মাসে জার্মানিতে রপ্তানি বেড়ে ৪০৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অঙ্কটি এখনো জুলাই মাসের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের চেয়ে কম। মে মাসে ইইউতে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশই গেছে জার্মানিতে। অন্যদিকে, স্পেন দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে; মে মাসে দেশটিতে ৩০০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা এপ্রিলের তুলনায় কিছুটা বেশি।
সপ্তাহের শুরুতে প্রথম কার্যদিবস রবিবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ব্যাপক দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। এর ফলে প্রধান মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে বড় মূলধনী কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাছাই করা সূচকটিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। সমান্তরাল চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই), যেখানে মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে দরপতনের তালিকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নাম থাকায় সূচক ও লেনদেন—উভয়ই কমেছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেনের প্রথমার্ধে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও শেষ পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের একাংশের ব্যাপক বিক্রির চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান দরপতনের তালিকায় যুক্ত হয়। দিনশেষে ডিএসইতে মাত্র ৭১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে দর হারিয়েছে ২৯৮টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৭টি প্রতিষ্ঠানের বাজারদর। মানসম্মত বা ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৫টির দাম বাড়লেও ১৪৩টির দরপতন হয়েছে। এছাড়া লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়েছে এবং দর কমেছে ৯৭টি কোম্পানির। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যেও অধিকাংশের দাম হ্রাস পেয়েছে।
সূচকের হিসেবে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২১ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ৫ হাজার ৬৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৪৮ পয়েন্টে নামলেও বাছাই করা ৩০টি ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে। বাজারটিতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৯৪ কোটি টাকারও বেশি কম। লেনদেনের শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, যাদের ৫০ কোটি ৭৮ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। শীর্ষ তালিকায় আরও ছিল সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, রবি এবং এনসিসি ব্যাংক।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১০৪ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২২৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৬৯টির এবং কমেছে ১৩৬টির। সিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের ৮৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকার তুলনায় অনেক কম।