আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের প্রথম কিস্তি ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম কিস্তির এই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে যোগ হয়েছে। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও দীর্ঘদিন আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসা আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, এত দ্রুত আইএমএফের টাকা পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বহুল প্রত্যাশিত ঋণটা পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম কিস্তির অর্থ রিজার্ভে জমা হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
প্রথমেই একটা কথা আমি পরিষ্কার করে বলি, বাংলাদেশ এই ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আবেদন করেছিল ক্রাইসিস পয়েন্টে নয়, ক্রাইসিস প্রিভেনশন পয়েন্টে। অর্থাৎ সরকার শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের মতো সংকটে পড়ে কিন্তু আইএমএফের কাছে ঋণ চায়নি। সংকটটা যেন না আসে, বাংলাদেশ যেন বড় ধরনের বিপদে না পড়ে- সেটা থেকে রক্ষার জন্যই ঋণটা চেয়েছিল। বাংলাদেশ এই বিষয়ে একটু আলাদা অন্যান্য দেশ থেকে। যেমন-পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কা বা আর্জেন্টিনা থেকে। বাংলাদেশের আবেদন খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনুমোদন দিয়েছে আইএমএফ। শুধু তা-ই নয়, সংস্থাটির বোর্ডে ঋণ অনুমোদনের তিন দিনের মাথায় ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বাংলাদেশের রিজার্ভে জমাও হয়েছে। কমতে থাকা রিজার্ভ বেড়েছে। এটা একটি ভালো দিক। দীর্ঘদিন আমি আইএমএফে কাজ করেছি, এত কম সময়ে মোটা অঙ্কের ঋণ অনুমোদন এবং অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম কিস্তি ছাড় খুব কমই দেখেছি। আমার কাছে এটাকে বিরল ঘটনা মনে হয়েছে।
আইএমএফ বলছে, এই টাকা সংকট যাতে না আসে, সে জন্য দেয়া হয়েছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আমি যাই করি না কেন আমাদের কিন্তু প্রেসক্রিপশনটা নিতে হবে। আইএমএফ হচ্ছে একটি হাসপাতালের মতো। আমাদের অসুখ হলে আমরা যেমন ওষুধ খাই, হাসপাতালে যাই। সে রকম আইএমএফ অর্থনীতির জন্য ওষুধ দেয়। তারা দুইভাবে ওষুধ দেয়। টাকা দিয়ে বা ঋণ দিয়ে সাহায্য করে, যেটাকে আর্থিক সহায়তা বলে। সেই পরিমাণটা এখানে বলা হচ্ছে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য। আরেকটি সাপোর্ট হচ্ছে পলিসিগত সাপোর্ট দেয়া। পলিসিগত পরিবর্তন নিয়ে আসা। এটার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে। সরকার জানে আমরাও জানি, টাকা কিন্তু কোনো পারমানেন্ট সমাধান নয়। টাকাটা কয়েক দিনের জন্য আমাদের সহায়তার ব্যবস্থা করবে। আসল যেটা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে নীতির পরিবর্তন।
সেই পরিবর্তনটা আসলে কী, কীভাবে হবে সেই পরিবর্তন?
আমাদের চাহিদা কমাতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থা ভালো করতে হবে। এক্সচেঞ্জ রেট ব্যবস্থাপনা ভালো করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের একটি বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আর এটিই হচ্ছে আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দেখার বিষয় সরকার কী করছে। আমরা যদি ব্যবস্থা না নেই, আমরা যদি সঠিক নীতি গ্রহণ না করি, তাহলে কিন্তু আমাদের রোগ সারবে না। আমাকে আস্তে আস্তে এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রথমে আমাদের কিছু মূল্যস্ফীতি হবে, আমাদের কষ্ট হবে। এটা স্বাভাবিক যেকোনো রোগের সময় এটা হয়। অপারেশনের ক্ষেত্রে হয়; কিন্তু পোস্ট অপারেটিভ যদি ঠিকমতো হয় তাহলে কিন্তু রোগী সুন্দরভাবে তার জীবনে ফিরে আসতে পারে। আমাদের অর্থনীতি আবার সেই নরমাল হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমাদের সংস্কারগুলো সঠিকভাবে নিতে হবে, করতে হবে।
আমাদের নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ী পরিবর্তনটা করতে হয়। টাকা দিয়ে সামান্য কিছু সমস্যা সমাধান হয়। স্থায়ী পরিবর্তন হয় না। প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেয়ার জন্য হচ্ছে টাকা। আর স্থায়ী সমাধানের জন্য দরকার নীতি পরিবর্তন। এই ঋণের যে টাকা, সেটা তো খুব বেশি পরিমাণে না। অল্প কিছু টাকা, খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে যদি আমরা নীতি পরিবর্তন করতে না পারি। বাংলাদেশ গত মাসে দেড় বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে ব্যয় করেছে। তাহলে আইএমএফ থেকে প্রাথমিকভাবে (প্রথম কিস্তি) যে টাকা পাওয়া গেছে, সেটা তো ১৫ দিনের টাকার সমানও না। এটা সাময়িক একটি সাহায্য। এটা কোনো স্থায়ী সমাধান না। স্থায়ী সমাধান করতে হবে আমাদের নীতি পরিবর্তন করার মাধ্যমে।
বাজারে জিনিসপত্রের দাম এমনিতেই চড়া। সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। অনেকেই বলছেন, আইএমএফের কথামতো সংস্কার করতে গেলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম আরও বাড়াতে হবে সরকারকে। সে ক্ষেত্রে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে না?
আমাদের দেশে যে ডলারের ক্রাইসিস আছে সেটা কমাতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, মুদ্রাবাজারে তারল্য বাড়ানো অভ্যন্তরীণভাবে করতে হবে। সরকার সংস্কার শুরু করেছে। বিদ্যুতের দাম ফের বাড়িয়েছে সরকার। কারণ সরকার তো দেনায় পড়ে গেছে। সরকার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কাছে দেনায় আছে। সামিটের কাছেই নাকি সরকারের দেনা তিন হাজার কোটি টাকা। বাকিদের কাছে তো আরও অনেক দেনা হবে। এই টাকাগুলো সরকারকে শোধ করতে হবে। আগামীতে যেন আর না বাড়ে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কাজেই দাম বাড়া তো শুরু, সেটা কোথায় শেষ হবে তা হলো আসল কথা। সরকারের দরকার হবে এটা নিয়ে সামগ্রিকভাবে সবার সঙ্গে বসা। তাদের খুঁজে বের করতে হবে কত কম দাম বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। আমাদের বিদ্যুৎ তো তৈরি করতে হবে। আমাদের বিদ্যুতের দামটাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।
এখন সরকারের দরকার সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে বসে এটা ঠিক করা। এর মধ্যে কিছু কনসেশন চাইতে হবে, যারা পাওয়ার প্রডিউসার তাদের কাছ থেকে। এটা চাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। সামিটকে বলা, ইউনাইটেড গ্রুপকে বলা তোমরা লাভ কম করো, লাভের ভাগটা ছেড়ে দাও; এক বছরের জন্য। এসব ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সিস্টেম লসটাও কমাতে হবে। আমি যদি ৫ শতাংশ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ কমাতে পারি, তাহলে আমাদের ৫ শতাংশ বিদ্যুতের খরচ কমে যায়। এগুলোকে চিন্তার মধ্যে আনতে হবে, সরকারকে শুধু দাম বাড়ালেই হবে না।
আমি আশা করব, সরকার সুদের হার এবং ডলারের দাম দুটিই বাজারের ওপরে ছেড়ে দেবে। মোটামুটিভাবে পুরো বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। পুঁজিবাজারের ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়া উচিত। এটা তো থাকাও উচিত ছিল না। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী থাকবে না বাংলাদেশে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করতেই হবে। কর আহরণ খাতে সংস্কার করতে হবে। এগুলো সরাসরি জনগণকে উপকার করবে না। তবে আখেরে এটা জনগণকে বড় উপকার দেবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমবে, দক্ষতা বাড়বে, কম সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। সরকারের দরকার এখন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিছুই করার দরকার নেই। শুধু আইনের প্রয়োগ করুক। ইসলামী ব্যাংকে বা কোন ব্যাংকে যারা অপকর্ম করেছে, তাদের সরাসরি দায়ী করুক। ধরে নিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করুক।
সরকারকে ফিক্সেশনের মেন্টালিটি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সুদের হার বেঁধে দিলাম, পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম বেঁধে দিলাম, তেলের দাম বেঁধে দিলাম, বিদ্যুতের দাম বেঁধে দিলাম, পানির দাম বেঁধে দিলাম। এটা কেন? আমি যদি চাল, ডাল, গম, ওষুধ সবই কিনতে পারি, ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাজার পরিবর্তন হচ্ছে, তাহলে এই কয়টি জিনিস আমি কেন কিনতে পারব না।
বলা হচ্ছে, আইএমএফের এই ঋণের পর বিশ্বব্যাংক-এডিবিসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলোও বাংলাদেশকে ঋণ দিতে এগিয়ে আসবে। আপনি কী মনে করেন?
সিল অফ এপ্রুভাল যখন গ্লোবালি রেসপেক্টেড হয়। এটার একটি ওয়েট থাকে এটার সঙ্গে কিছু নীতিগত বিষয় সংযুক্ত থাকে। এটার কারণে এটার গুরুত্বটা বিশ্ব জোড়া স্বীকৃত। দেখা যায়, যেখানে আইএমএফ আসে সেখানে অন্যরাও আসতে পারে। সাধারণত বাজার কিন্তু আইএমএফের পলিসিকে সাপোর্ট করে। পৃথিবীজোড়া দেখা গেছে, যখন আইএমএফ একটি দেশে আসে। তখন সেই দেশের কিন্তু বাজারের কিছু গুণগত পরিবর্তন হয়। বৈদেশিক মুদ্রার হার ঠিক হয়। পুঁজিবাজার একটু চাঙ্গা হয়। কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসে। নীতিগুলোর ভালো দিক আছে অবশ্যই। আমরা যেরকম ওষুধ খাই ভালো হওয়ার জন্য। নীতিগুলোকে যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। যেমন ব্যাংকিং খাতে আমাদের সংস্কার করতে হবে। এর মধ্যে দ্বিমতের কিছু নাই। সরকার থেকেও অনেকে বলেন লিখিত বা অলিখিতভাবে। বিদেশিরাও বলেন। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। তা নাহলে সরকার বিপদগ্রস্ত হয়ে যাবে আগামীতে, অর্থের সংকুলান করতে পারবে না। সেগুলো নিয়েও কোনো দ্বিমতের কিছু নাই। এখানে আমি মনে করি আইএমএফের সঙ্গে সরকার বসবে। বসে সুন্দর এটি বাস্তবায়নযোগ্য নীতি বের করবে। যেটা আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে এবং আমাদের যে আর্থিক খাত ও রাজস্ব খাত এই জায়গাগুলোতে সংস্কার এনে আমাদেরকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে, এখনো কিন্তু আমরা সেই জায়গাটা দেখি নাই। সেই ডিটেইলসগুলো আমরা পাই নাই। আমার মনে হয়, সেই ডিটেইলসগুলো ওয়ার্কআউট করা হয়নি। এগুলো হয়তো আগামী মাসগুলোয় তারা করবে।
আমরা আশা করি সরকার আইএমএফ এবং দেশের যারা অভিজ্ঞ লোক আছেন। সরকার তাদের সঙ্গে বসে এই কার্যক্রমটা যেন হাতে নেয়। আইএমএফ চাপিয়ে দিচ্ছে বলে আমরা করছি এটা ঠিক নয়। আমাদের জন্য দরকার আছে সেটা মেনে নিয়েই যেন এই কার্যক্রম শুরু করা হয়।
আইএমএফের ঋণের শর্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার আইএমএফের শর্তগুলো ঠিকমতো মানতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে কী হবে?
হাঁ, এটা ঠিক যে, আইএমএফের ঋণে অনেক সময় অনেক শর্ত থাকে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা ছিল না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কিন্তু বিপদে পড়ে এই ঋণ নেয়নি। আমাদের অবস্থাটা কিন্তু পাকিস্তানের মতো নয়। পাকিস্তানে তাদের কিন্তু এক্সচেঞ্জ রেটকে ফ্লোট করে দিতে হয়েছে। আইএমএফের প্রত্যাবর্তনের পূর্বশর্ত হিসেবে। আমারা তো সেই রকম অবস্থার মধ্যে পড়িনি। আমাদের সেরকম কোনো শর্ত দেয় নাই। আমাদের অবস্থাটা ভিন্ন। আমাদের শর্তগুলো ভিন্ন। আমাদের দেশে যারা অভিজ্ঞ, সে লোকেরা আসেন। আমাদের খাতগুলো নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেন। তাদের সাজেশনগুলো আমলে নিয়ে যারা এই খাতে কর্মরত আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে ব্যবহার করে আমরা যদি করতে পারি অবশ্যই আমরা একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারব।
যদি বাংলাদেশ আইএমএফের কথামতো কাজ না করে, তাহলে মাঝপথে এসে ঋণের কিস্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো শঙ্কা আছে কী?
সে আশঙ্কা আছে। আইএমএফ যে কারণে টাকাটা দিচ্ছে, সেই কাজ যদি ঠিকঠাক মতো না হয়, তাহলে টাকাটা আটকে যেতে পারে, বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো সময় বাংলাদেশ ঠিকভাবে আইএমএফের কথামতো সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে, পুরো টাকাই পেয়েছে। আবার নতুন ভ্যাট আইন সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে নাই। আইএমএফ কিন্তু তখন এই প্রোগ্রামটাকে বন্ধ করে দেয়। তখন কিন্তু আইএমএফ আর টাকা দেয়নি। তখন আমাদের প্রচুর রিজার্ভ ছিল, আমরা তোয়াক্কা করিনি। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা কিছু রিফর্ম করতে গিয়ে কিছু গোষ্ঠীর চাপে আমরা সেটাকে পরিবর্তন করি। যেটা আগের চাইতেও খারাপ একটি আইনে পরিবর্তিত হয়। এটা আইএমএফের ক্ষেত্রে সমর্থন করা উচিত ছিল না, করে নাই। আমরা যে সংস্কারগুলো করব, সেগুলো যে চাপে পড়ে করব সেটা নয়। আমরা আমাদের ভালোর জন্য করব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে আমাদের কাজ করতে হবে। যে সংস্কারগুলো আমরা করব সেগুলো কিন্তু নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর বহু দেশে এগুলো করা হয়ে থাকে, এগুলো নতুন কিছু নয়। আমরা এখানে অবহেলা করেছি। বিশৃঙ্খলা করেছি। এসব কারণে আমরা খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছি। আমাদের এখান থেকে উত্তরণ করতে হলে আমাদের সংস্কারগুলো ঠিকমতো করতে হবে।
আপনি বারবার বলছেন, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সংস্কারগুলো করা উচিত, অনেক আগেই এগুলো করা দরকার ছিল। যদি সরকার সত্যিই সংস্কারগুলো করে, তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন আসবে বলে আপনি মনে করেন?
একটা কথা মনে রাখতে হবে, বৈশ্বিক কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে, সেটা কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলবে না। একদিন না একদিন স্বাভাবিক হবে, স্থিতিশীল হবে। তখন কিন্তু একটি নতুন সম্ভাবনা দেখা দেবে। অতীতের সংকটের সময়ও তেমনটা দেখা গেছে। সেই সম্ভাবনাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে, আবার আগের মতো জিনিসপত্র কিনবে মানুষ। সেই সুযোগটাকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে, নতুন সম্ভাবনার ওই বাজারটাকে ধরতে হবে। আমাদের একটা সুযোগ এসেছে, আইএমএফ টাকার বিনিময়ে যেসব ভালো সংস্কারের কথা বলছে, সেগুলো নিজেদের স্বার্থের জন্য খুবই দরকার মনে করে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর যদি আমরা এটা করতে পারি, তাহলে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের পক্ষে ৮-৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
বর্তমানে আমাদের মূল্যস্ফীতির একটি চাপ আছে। আমাদের ডলারের একটি সংকট চলছে। পর্যাপ্ত ডলার বাজারে নেই। আমাদের দেশে টাকার সংকট দেখা দিচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে ডিপোজিট (আমানত) কমে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, সামগ্রিক অর্থনীতিতে টাকার সংকট আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করেছে। এগুলোর সব কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। সবকিছু কিন্তু বাইরের দোষ না। এগুলোর পেছনে আমাদের নীতিগত সমস্যা আছে। আমাদের আশা সরকার এই সুযোগে এসব সমস্যার সমাধান করবে। আমাদের সবার জন্য তা ভালো হবে, দেশের জন্য মঙ্গল হবে। আইএমএফের প্রোগ্রাম সেই উদ্দেশ্যেই কাজ করুক, সেটাই আমরা চাই। সরকার রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে সেটাকে বাস্তবায়ন করে সেই জায়গাটাতে নিয়ে যাক।
বিশ্ববাজারে খাঁটি স্বর্ণ ও রুপার দরপতনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দাম পুনরায় সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। গতকাল শুক্রবারের ধারাবাহিকতায় আজ শনিবারও দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট বা উন্নত মানের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা হ্রাস পেয়েছে। আজ সকাল ১০টা থেকে এই নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। গত শুক্রবার দাম পুনর্নির্ধারণের পর ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের বিক্রয়মূল্য ছিল ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহার পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বাজারে টানা চার দফায় স্বর্ণের দাম কমানো হয়েছিল, যার ফলে ভরিপ্রতি মোট ১৯ হাজার ৭৭১ টাকা হ্রাস পায়। তবে গত শনিবার, সোমবার ও বৃহস্পতিবার তিন দফায় আবার মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এবং স্বর্ণের দাম ১৪ হাজার ৫৮০ টাকা বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গতকাল ও আজ পর পর দুই দিন স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিল বাজুস।
নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট মানের স্বর্ণ ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯২ টাকা, ১৮ ক্যারেট মানের স্বর্ণ ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯০ টাকায় বিক্রি হবে। বাজুস স্পষ্ট করেছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন দর বহাল থাকবে। তবে অলঙ্কারের ডিজাইন অনুযায়ী মজুরি প্রযোজ্য হবে। এই দামের সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না।
উল্লেখ্য যে, ২০২৬–২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বর্ণের ভ্যাটের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অলঙ্কারের দাম সহনীয় রাখতে বাজেটে প্রতি ভরি স্বর্ণের ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে বর্তমানে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ভ্যাট, মজুরি ও পাথর বাদে অলঙ্কার বিনিময় বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজুসের পূর্ববর্তী নীতিমালা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, রুপার বাজারে আজ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেট বা উন্নত মানের প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ২৪৯ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। রুপার ভ্যাটের বিষয়ে খুব শীঘ্রই নতুন সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে বাজুস সূত্রে জানা গেছে।
দেশের শেয়ারবাজারের লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) চালুর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নতুন করে আরও তিনটি ব্রোকারেজ হাউজকে সফলভাবে ফিক্স (FIX) সার্টিফিকেশন প্রদান করেছে দেশের প্রধান এই পুঁজিবাজার। নতুন করে এই সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—জিএমএফ সিকিউরিটিজ লিমিটেড, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজ লিমিটেড। গত বুধবার ডিএসই ভবনে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে প্রশংসাপত্র ও সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়।
ডিএসই ভবনে আয়োজিত সনদ বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রশংসাপত্র হস্তান্তর করেন ডিএসইর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. আবিদ হোসেন খান। এ সময় জিএমএফ সিকিউরিটিজের পক্ষে হেড অব আইটি লুবনা মাহমুদ, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজের পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাজিব হাসান এবং ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ওয়ালিউল ইসলাম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়ে এই সনদ গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে ডিএসইর উপমহাব্যবস্থাপক জিসান বিন মুবারক ও সহকারী মহাব্যবস্থাপক কামরুন নাহারসহ সংস্থাটির আইটি ও পরিচালনা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পুঁজিবাজারে আন্তর্জাতিক মানের লেনদেন অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২০ সালে বিশ্বখ্যাত নাসডাকের ম্যাচিং ইঞ্জিনের সঙ্গে এপিআইভিত্তিক (API) সংযোগ স্থাপন করে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে ডিএসই। এর ফলে ব্রোকারেজ হাউজগুলো ডিএসইর মূল সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে। এই ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচির আওতায় নিজস্ব ওএমএসের মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনার জন্য এখন পর্যন্ত দেশের মোট ৮৫টি ব্রোকারেজ হাউজ আবেদন করেছে।
নতুন তিনটি ব্রোকারেজ হাউজ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ফিক্স সার্টিফিকেশন পাওয়া মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১-তে। সনদপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫৩টি ব্রোকারেজ হাউজ ইতিমধ্যেই নিজস্ব ওএমএসের মাধ্যমে বাজারে নিয়মিতভাবে দৈনন্দিন লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে খুব দ্রুত নিজস্ব ব্যবস্থায় লেনদেনে যুক্ত হবে বলে আশা করছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ। এই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগটি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য লেনদেন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বাজার বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। কয়েক দিনের ওঠানামার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে এশিয়ার লেনদেন শুরু হতেই অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। গ্রিনউইচ মান সময় রাত ২টা পর্যন্ত আগস্টে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ফিউচারের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৪৩ ডলার, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের মূল্যের চেয়ে মাত্র ৭ শতাংশ বেশি।
এর আগে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সতর্কবার্তার কারণে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি আচরণ ঠিক না করে তবে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেখানে বোমা হামলা শুরু করতে পারে। তবে পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে হওয়া অস্থায়ী চুক্তি কার্যকর হওয়া এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি শান্ত হলে তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। শরীর ও মনের স্বস্তির পাশাপাশি বিশ্ব পুঁজিবাজারেও এর সরাসরি প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
বিরতির পর মার্কিন ও এশীয় শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সোফি স্টেডিয়াম বা আন্তর্জাতিক সূচকগুলোতে এই ইতিবাচক ধারার হাওয়া লেগেছে। আমেরিকার মূল আর্থিক এক্সচেঞ্জগুলোর নেতৃত্বে থাকা নারীদের পাশাপাশি জাপানের পুঁজিবাজারেও বড় উত্থান দেখা গেছে। বিশেষ করে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক এবং ইতালির এফটিএসই এমআইবি সূচকেও এই ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চলমান মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত বুধবার ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা নিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর ফলে ইরান অবিলম্বে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। তবে এই ঘোষণার পরও বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জলপথে নৌ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমানে অন্তত ৫০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এবং নিরাপদ রুট সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে জাহাজ কোম্পানিগুলো এখনও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজমালিক সংগঠন ‘বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল’ (বিমকো) অবশ্য এখনই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। বিমকোর প্রধান নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কর্মকর্তা ইয়াকব লারসেন এক বিবৃতিতে জানান, সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও নিরাপদ নৌপথের বিস্তারিত তথ্যের অভাব থাকায় এই জলপথ এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তিনি জাহাজমালিকদের পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নাবিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ করেন। সার্বিকভাবে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের এই খবর বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করছে।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৪২টি কোম্পানিকে চরম ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। মূলত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সচেতন করা, তাঁদের কষ্টার্জিত বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে যেকোনো ধরনের কৃত্রিম কারসাজি কঠোরভাবে প্রতিহত করার লক্ষ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা, নিরীক্ষকদের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক আর্থিক দুরবস্থার ওপর ভিত্তি করে গতকাল বুধবার ডিএসইর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এই ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’ বা ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় স্থান পাওয়া ৪২টি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকট, বছরের পর বছর লোকসান, কারখানায় স্থায়ীভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকা, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ এবং অত্যন্ত দুর্বল নগদ প্রবাহের (ক্যাশ ফ্লো) মতো নানাবিধ সংকটে ভুগছে। এই তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, জুট স্পিনার্স, দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস, তাল্লু স্পিনিং মিলস এবং শ্যামপুর সুগার মিলস। নিরীক্ষকদের মতে, কোনো কোম্পানির আগামী ১২ মাস স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা থাকলে তাকে এই স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, যা মূলত বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা।
এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ৪২টি কোম্পানির ব্যবসায় টিকে থাকা নিয়ে নিরীক্ষকদের শঙ্কা প্রকাশ করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বার্তা। এটি শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জন্য নয়, বরং পুরো শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোম্পানি ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তারা যদি দ্রুত দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণ না করেন, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। ডিএসই জানিয়েছে, এই তালিকা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যেন যেকোনো বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনার আগেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও বাস্তব ঝুঁকি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে পারেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম এ বিষয়ে ডিএসইর ভূমিকাকে সমর্থন করে বলেন, একটি প্রথম সারির নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফ্রন্টলাইন রেগুলেটর) হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকাশ করা ডিএসইর নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে যদি ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিয়ে কোনো ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি লোকসান বা নিরীক্ষকের বিরূপ পর্যবেক্ষণ থাকে, তবে তা বিনিয়োগকারীদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সামগ্রিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতেরই অংশ। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে আরও বেশি সচেতন ও তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
সারাদেশে বোরো মৌসুমের নতুন ধানের চালের ভরপুর সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও মিলগেট ও পাইকারি মোকামগুলোতে চালের দর কমছে না। ভরা মৌসুমেও বাজারচিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ ধারণ করেছে, যার ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং চলতি মাসের শুরুতে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দরে চাল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম নওগাঁ ও কুষ্টিয়ায় ধানের পর্যাপ্ত ফলন সত্ত্বেও পুঁজিপতি, বড় মিলার ও মৌসুমি মজুদদারদের অবৈধ মজুদ গড়ে তোলার কারণে চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নওগাঁর পাইকারি আড়ত ও মিলগেটে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে দেড় থেকে ২ টাকা এবং সরু চালের দাম ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি কাটারি নাজির ৭০ থেকে ৭২ টাকা, জিরা শাইল ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাইস মিলার গোলাম মোস্তফা জানান, নওগাঁ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়াসহ বিভিন্ন মোকামে বড় মিলাররা কম দরে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে অবৈধভাবে মজুদ করায় চালের বাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। তবে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার দাবি করেন, দেশে ধান-চালের কোনো সংকট নেই; সরকারি গুদামে মোটা জাতের চাল সরবরাহের কারণে বাজারে ধানের দাম সাময়িকভাবে কিছুটা বেড়েছে, যার প্রভাব চালের বাজারে পড়েছে।
ঈদুল আজহার ছুটির পর দেশের অন্যতম বৃহত্তম চালের আড়ত কুষ্টিয়ায় কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন। কুষ্টিয়া পৌর বাজারের খুচরা বিক্রেতা মাহমুদ মনজু জানান, বর্তমানে ২৫ কেজির প্রতি বস্তা মিনিকেট (ব্র্যান্ড) ১ হাজার ৮০০ টাকা (কেজি ৭২ টাকা), নন-ব্র্যান্ড ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা (কেজি ৬৪-৬৬ টাকা) এবং কাজললতা ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আটাশ চালের বস্তা ১ হাজার ৩০০ টাকা (কেজি ৫২ টাকা), বাসমতী ব্র্যান্ডের বস্তা ২ হাজার ২০০ টাকা এবং মোটা চাল প্রতি কেজি ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সামির এগ্রোর পরিচালক সামির খালেক জানান, মণপ্রতি ধানের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়ায় মিল মালিকদের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চালের এই অপ্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের ও সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। নওগাঁ ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সদস্য নাইস পারভীন অভিযোগ করেছেন যে, ধানের হাট, আড়ত ও মিলগেটে সঠিক তদারকি না থাকায় চালের বাজারে অস্থিরতা স্থায়ী হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেন, বাজারে নতুন ধানের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো ধরনের অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। আড়তদারি এবং মিল পর্যায়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে শিগগিরই পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথ অভিযান শুরু করা হবে।
বিশ্ববাজারের ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনকে টপকে শীর্ষ পাঁচটি দামি কোম্পানির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ইলোন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ গবেষণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। গত মঙ্গলবার বিশ্ব পুঁজিবাজারে স্পেসএক্সের শেয়ারদর একলাফে ১৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
শেয়ারের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির পর বর্তমানে স্পেসএক্সের মোট বাজার মূলধন বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে, ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের বর্তমান বাজারমূল্য ২ দশমিক ৬৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর ফলে বাজারমূল্যের দিক থেকে অ্যামাজনকে ষষ্ঠ স্থানে ঠেলে দিয়ে পঞ্চম স্থানটি নিজেদের করে নিয়েছে স্পেসএক্স। এমনকি লেনদেনের একপর্যায়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা মাইক্রোসফটকেও (২.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল মাস্কের এই সফল কসমিক প্রতিষ্ঠানের।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি ও বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর তালিকায় তীব্র প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পেসএক্সের ঠিক ওপরে থাকা প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠান হলো যথাক্রমে এনভিডিয়া, অ্যালফাবেট, অ্যাপল ও মাইক্রোসফট। বিশ্বের শীর্ষ ১০ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৫ দশমিক ০৯ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য নিয়ে সবার ওপরে অবস্থানে রয়েছে চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া। এরপর যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে সার্চ জায়ান্ট গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট (৪.৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং আইফোন নির্মাতা অ্যাপল (৪.৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার)।
স্পেসএক্স ও মাইক্রোসফটের পেছনে থাকা ষষ্ঠ অবস্থানের অ্যামাজনের পর শীর্ষ দশে জায়গা করে নেওয়া অন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হলো সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট ব্রডকম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা, ইলোন মাস্কের আরেকটি জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থাই মূলত স্পেসএক্সের এই অর্থনৈতিক উত্থানের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাজ্যের বাজারে গত মে মাসে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে স্থিতিশীল ও অপরিবর্তিত ছিল। গতকাল দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (ওএনএস) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গত এপ্রিল মাসের মতো মে মাসেও বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার ২ দশমিক ৮ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। বিশ্বখ্যাত তুর্কি সংবাদসংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে এই অর্থনৈতিক তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
মে মাসের মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত এই পরিসংখ্যানটি অর্থনীতিবিদদের পূর্বের ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে। অধিকাংশ বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ধারণা করেছিলেন যে, মে মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি এপ্রিলের চেয়ে কিছুটা বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে ওএনএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বাজারে খাদ্যপণ্য এবং অ্যালকোহলমুক্ত বিভিন্ন পানীয়ের দাম প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার স্বাভাবিকতাও এই দর নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মূল্যস্ফীতির এই স্থিতিশীল অবস্থানের মাঝেই আজ বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ (BoE) তাদের পরবর্তী মূল সুদহার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। দেশটির অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, বর্তমান মুদ্রানীতি ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মূল সুদহার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখতে পারে। সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হলে তা ঋণগ্রহীতা ও দেশীয় ব্যবসা খাতে সাময়িক স্বস্তি ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে চাপ ছিল, তা গত কয়েক মাস ধরে ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে খাদ্য ও পানীয়ের বাইরে জ্বালানি ও সেবা খাতের ব্যয়ের ওপর মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি আগামীতে কেমন থাকবে, তা এখনও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন নীতিনির্ধারকেরা। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের আজকের সুদহার সংক্রান্ত ঘোষণাটি আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি ও পাউন্ডের মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আমেরিকার মূল আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ও শেয়ারবাজারগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে একচেটিয়াভাবে নারীদের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডেরিভেটিভস এক্সচেঞ্জ ‘সিএমই গ্রুপ’ তাদের পরবর্তী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে লিন ফিটজপ্যাট্রিকের নাম ঘোষণা করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক এক্সচেঞ্জগুলোর নীতি-নির্ধারণী পদে আরেকজন সফল নারীনেত্রীর পথচলা শুরু হলো। সিএমই-র বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও সিএফও হিসেবে দায়িত্বরত লিন ফিটজপ্যাট্রিক মূলত দীর্ঘদিনের সিইও টেরি ডাফির স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। ডাফি আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সিইও পদ থেকে অবসর নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
হালনাগাদ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমেরিকার প্রভাবশালী প্রায় সব বড় স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বোচ্চ পদে এখন নারীরাই সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই তালিকার প্রথম অগ্রদূত হলেন অ্যাদেনা ফ্রিডম্যান, যিনি ২০১৭ সালে নাসডাক (Nasdaq)-এর প্রথম নারী সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন এবং ২০২৩ সাল থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পাশাপাশি ২০২২ সাল থেকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ‘নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ’ (NYSE)-এর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আছেন লিন মার্টিন। এছাড়া রেটিং জায়ান্ট এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল (S&P Global)-এর সিইও হিসেবে মার্টিনা চেং এবং ২০২৩ সাল থেকে ইনডেক্স জায়ান্ট এফটিএসই রাসেল (FTSE Russell)-এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফিউনা বাসেট।
তবে আমেরিকার মূল আর্থিক এক্সচেঞ্জগুলোর নিয়ন্ত্রণ নারীদের হাতে এলেও এর বাইরে কিছু বড় অপশনস এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক সূচক প্রতিষ্ঠান এখনও পুরুষদের অধীনে রয়েছে। যেমন—এমএসসিআই ১৯৯৮ সাল থেকে হেনরি ফার্নান্দেজের নেতৃত্বে, বড় অপশনস এক্সচেঞ্জ সিবিওই ক্রেগ ডনোহুর নেতৃত্বে এবং নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের মূল মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আইসিই পরিচালনা করছেন জেফ স্প্রেচার। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নারীরা বাজারের সামগ্রিক পরিচালনাগত দায়িত্বে বেশ শক্ত অবস্থান গড়ে তুললেও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং, বড় চুক্তি সম্পাদন ও সক্রিয় ট্রেডিংয়ের মতো অত্যন্ত লাভজনক ক্ষেত্রগুলোর শীর্ষ পদে এখনও মূলত পুরুষদেরই একক আধিপত্য বজায় রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩৩৫টি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে যে ২০২৬ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বড় বড় ফান্ডসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারীদের অবদানের হার ১৯ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যানটি ধীরগতির অগ্রগতি নির্দেশ করলেও সিএমই গ্রুপের নতুন সিইও হিসেবে লিন ফিটজপ্যাট্রিকের এই আগমন বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীদের ক্ষমতায়নে আরও একটি বড় মাইলফলক হিসেবে যুক্ত হলো।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১ কোটি ৬০ লাখ এমএমবিটিইউ গ্যাসবাহী ৫টি এলএনজি কার্গো ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। জুন মাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার মোট ৯ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুন পর্যন্ত ৫ কার্গো দেশে পৌঁছেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের জন্য ক্রয়কৃত ৯ কার্গো এলএনজির মধ্যে ৫টি স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি চার কার্গো স্পট মার্কেট থেকে আনা হবে।
এর আগে গত মে মাসে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেটের মাধ্যমে মোট ১১ কার্গো এলএনজি আমদানি করে, যাতে গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ এমএমবিটিইউ।
মিজানুর রহমান বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি–স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট—সব উৎস থেকেই নিয়মিত এলএনজি আমদানি করছে।
গড়ে প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩২ লাখ এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে বলে জানান মিজানুর রহমান।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, কাতারভিত্তিক কাতার এনার্জি এবং ওমান সরকারের জ্বালানি ও পণ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করে থাকে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করছে।
প্রতি মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে সরকার স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করে থাকে।
দেশে নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১২৩ কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বা ৩১.২৩ বিলিয়ন ডলার)
একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রায় গঠিত বিভিন্ন তহবিলসহ মোট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ৩৫.৮০ বিলিয়ন ডলার।
বুধবার (১৭ জুন) সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর।
এর আগে গত মে মাসে নিট রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। তবে দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের বিল পরিশোধের পর তা ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে রিজার্ভ আবারও ৩১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) ব্যবস্থার আওতায় প্রতি দুই মাস পরপর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-সংক্রান্ত বিল পরিশোধ করা হয়।
দেশের বাজারে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এই সিদ্ধান্তে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যাটসহ সোনার বিক্রয়মূল্য ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। নতুন নিয়মে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ২ হাজার ৫০৮ টাকা ভ্যাট যুক্ত করায় এর চূড়ান্ত দাম পৌঁছেছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায়। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং আজ সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই মূল্য দেশজুড়ে কার্যকর করা হয়েছে।
ভ্যাটসহ নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, আজ থেকে দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম পড়বে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী সোনা কেনাবেচা করতে হবে।
এর আগে গত ১৫ জুন সকালে সর্বশেষ দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সে সময় পূর্বের তুলনায় ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি। এছাড়া সে সময় ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ Chess হাজার ৫৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর ছিল।
বাজুস তাঁদের বিজ্ঞপ্তিতে কিছু জরুরি নিয়মাবলীও স্পষ্ট করেছে। নতুন মূল্যতালিকায় স্বর্ণালঙ্কারের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট সরাসরি যুক্ত থাকায় এখন থেকে খুচরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে আর কোনো ভ্যাট আদায় করা যাবে না। তবে অলঙ্কারের নকশা বা ডিজাইন অনুযায়ী জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত মজুরি বা মেকিং চার্জ যুক্ত করতে পারবে। এছাড়া রুপার অলঙ্কারের ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপের বিষয়ে খুব শিগগিরই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর ভারতীয় রুপির বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশি টাকা। বর্তমানে বাংলাদেশের ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে ৭৯ ভারতীয় রুপি, যা মাত্র কিছুদিন আগেও ছিল মাত্র ৭৩ রুপি।
একইভাবে আগে যেখানে ১০০ রুপি কিনতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো, মুদ্রা বাজারের বর্তমান হারের কারণে এখন সেখানে লাগছে মাত্র ১২৩ টাকা।
মুদ্রা বিনিময় হারের এই বড় ধরনের পরিবর্তনে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত বাণিজ্য, আমদানি কার্যক্রম এবং ভারতগামী পাসপোর্টধারী যাত্রীদের মধ্যে বড় রকমের স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীকে যাত্রার আগেই বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ভারতীয় দূতাবাসের ভিসা ফি ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ভারতের বন্দর চার্জ ৪০০ রুপি, বাংলাদেশ সরকারের ভ্রমণ কর ১ হাজার টাকা এবং বন্দর ফি ৬৫ টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এর বাইরেও ভিসার সিরিয়াল সংগ্রহ ও যাতায়াত বাবদ একটি বড় অঙ্কের ব্যয় হয়। ফলে রুপির উচ্চমূল্যের কারণে এতদিন ভারত ভ্রমণ সাধারণ মানুষের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছিল।
শুধু ভ্রমণই নয়, রুপির চড়া দামের কারণে ভারত থেকে পণ্য আমদানিতেও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছিল দেশের ব্যবসায়ীদের, যার ফলে অনেক আমদানিকারক লোকসানের আশঙ্কায় তাঁদের ব্যবসার পরিধি সীমিত করে ফেলেছিলেন।
তবে সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান লক্ষণীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে এবং গত তিন দিনের ব্যবধানে টাকার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। এতে ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহারকারী পাসপোর্টধারী রাশেদুজ্জামান জানান, টাকার মান বাড়ায় ভারত ভ্রমণের খরচ আগের চেয়ে কিছুটা কমবে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির বিষয়।
অন্যদিকে বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বাংলাদেশি টাকা শক্তিশালী হওয়ায় ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক ব্যয় কমবে এবং দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, বিগত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশি টাকার মান রুপির বিপরীতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচল আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
বেনাপোল বন্দর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১ হাজার ৮৩৬ জন দেশি-বিদেশি পাসপোর্টধারী যাতায়াত করেছেন এবং একই দিনে ৩৪৫টি ট্রাকে করে দুই দেশের আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানান, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের জোরালো প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশি টাকার এই ইতিবাচক ধারা যদি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তবে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল হবে এবং সীমান্ত অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দীর্ঘদিনের লোকসান এবং বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেইন পিৎজা হাট বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে এর মূল প্রতিষ্ঠান ইয়াম! ব্র্যান্ডস। মোট ২৭০ কোটি ডলারের বিনিময়ে এই বিশ্বখ্যাত পিৎজা চেইনটির মালিকানা হস্তান্তর করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পিৎজা হাটের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ১৫০ কোটি ডলারে কিনে নিচ্ছে প্রাইভেট ইকুইটি সংস্থা লংরেঞ্জ ক্যাপিটাল। তবে চীনের ব্যবসায়িক অংশটি আলাদা একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি ডলারে কিনে নেবে ইয়াম চায়না হোল্ডিংস।
এ বিষয়ে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী ক্রিস টার্নার মন্তব্য করেছেন, 'লংরেঞ্জ এবং ইয়াম চায়না-র অধীনে পিৎজা হাট ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি ভালো অবস্থানে থাকবে। এই নতুন মালিকানা রেস্তোরাঁ খাতে গভীর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে।' মূলত মান্ধাতা আমলের আউটলেট এবং বিক্রয় হ্রাসের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ইয়াম! ব্র্যান্ডস ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কয়েকশ আউটলেট বন্ধ করে দিতে পারে।
১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরু করা পিৎজা হাট ১৯৭৭ সালে পেপসিকোর অধীনে যায় এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের একটি অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে কেএফসি ও ট্যাকো বেলের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড থাকলেও পিৎজা হাটের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাজার গবেষণা সংস্থা গ্লোবালডাটা-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিল সন্ডার্স জানান, 'ইয়ামের ব্যবসায়িক পোর্টফোলিওতে দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে দুর্বল ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পিৎজা হাট।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ব্র্যান্ডটিকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং দুর্বল পারফরম্যান্স করা আউটলেটগুলো বন্ধ করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এই বিভাগটিকে আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন, ইয়াম তা দিতে প্রস্তুত নয়।'
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যেই এই বিক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে পারে। বিক্রির খবর প্রকাশ্যে আসার পর পুঁজিবাজারে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের শেয়ারদরে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পিৎজা হাট থেকে সরে আসায় ইয়াম! ব্র্যান্ডস এখন তাদের অন্যান্য সফল ব্র্যান্ডগুলোর ওপর অধিক মনোযোগ দিতে সক্ষম হবে।