রবিবার, অক্টোবর ২, ২০২২

বিশ্ববাজারে কমেছে বেশির ভাগ পণ্যের দাম

বিশ্ববাজারে কমেছে বেশির ভাগ পণ্যের দাম
জুন থেকে আগস্টের মধ্যে ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, চাল, চিনি, গম ও সোনার দাম কমেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত

  • ইকবাল হোসেন

আন্তর্জাতিক বাজারে অধিকাংশ পণ্যের দাম নিম্নমুখী অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ববাজারে গত জুন থেকে আগস্টের মধ্যে ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, চাল, চিনি, গম ও সোনার দাম কমেছে। বেশির ভাগ পণ্যের দাম নিম্নমুখী হওয়ায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে বাংলাদেশের মতো সেসব দেশ যারা এগুলো আমদানি করে চাহিদা মেটায়। কিন্তু সহসা এর তেমন সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংক প্রতি মাস শেষে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান প্রধান পণ্যের দামের হিসাব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বিশ্বের প্রধান প্রধান বাজারের চিত্র তুলে ধরা হয়। সেপ্টেম্বরের পণ্যের দামের প্রতিবেদনটি শনিবার প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জুন ও জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশির ভাগ পণ্যের দাম কমেছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেশি থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের বাজারে পড়তে বাধ্য। কারণ বাংলাদেশ ভোজ্যতেল, চিনি ও জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছে। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকলে স্বাভাবিকভাবে আমদানি খরচ কমবে। দেশের বাজারেও কয়েক মাসের মধ্যে এর প্রভাব পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, জুনে পাম তেলের দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৫০১ মার্কিন ডলার, তা আগস্টে ৪৭৫ ডলার কমে ১ হাজার ২৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সয়াবিন তেলের দামও কমেছে। জুনে সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ৭৫২ ডলার ছিল, তা আগস্টে ১৫৩ ডলার কমে ১ হাজার ৫৯৯ ডলারে অবস্থান করে। সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জুনে চিনির দাম প্রতি টন ছিল ২৪২ ডলার, মার্চে তা ৩ ডলার কমে ২৩৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে চালের দাম কিছুটা কমেছে। জুনে থাইল্যান্ডে প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম ছিল ৪৪৪ ডলার, যা মার্চে ১৩ ডলার কমে বেড়ে ৪৩১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ২৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম প্রতি টন ২০ ডলার কমে ৪৪১-৪২১ ডলার হয়েছে। একই সময় গমের বাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ গমের দাম জুনে ছিল টনপ্রতি ৪৬৯ ডলার, যা ৮৭ ডলার কমে ৩৮২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৭২ ডলার কমেছে। জুনে মূল্যবান ধাতুটির দাম ছিল প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮৩৭ ডলার, আগস্টে তা কমে ১ হাজার ৭৬৫ ডলারে অবস্থান করে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে আসার মূল কারণ হলো- বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাস। অবশ্য মন্দা হলে তখন নতুন সংকট তৈরি হবে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমে যাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে যাওয়া বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের বিবেচনায় স্বস্তির খবর। তবে ডলারের দর যদি বাড়তে থাকে এবং স্থিতিশীল না হয়, তাহলে দেশের বাজারে এর সুফল তেমন পাওয়া যাবে না। অবশ্য পণ্যের দর বৃদ্ধিজনিত ব্যয়ের চাপ কমতে থাকলে ডলারের দাম কমার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে। আরেকটি প্রশ্ন হলো- বিশ্ববাজারের এ পরিস্থিতি টেকসই হবে কি না। তাদের মতে, ফিউচার্স মার্কেটের (ভবিষ্যতে মূল্য পরিশোধের জন্য এখন চুক্তি) মূল্য পরিস্থিতিও কমতির দিকে। যেমন- ফিউচার্স মার্কেটে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানের চেয়ে ৮ শতাংশ কম। গ্যাসের দাম ৪২ শতাংশ কম। ফলে পণ্যমূল্য কমে যাওয়ার বিষয়ে আশা বেড়েছে। বিশ্ববাজারের এখনকার নিম্নমুখী প্রবণতার মূল কারণ মন্দার পূর্বাভাস। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর ফলে ভোগের চাহিদা কমে যাচ্ছে। মন্দা হলে তখন বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে। অবশ্য খুব বড় মন্দা হবে বলে তিনি মনে করছেন না। তার মতে, মন্দা স্বল্পমেয়াদি হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।


মোংলায় মেট্রোরেলের কোচ ও ইঞ্জিন, নদী পথে যাচ্ছে ঢাকার দিয়াবাড়ী

মোংলায় মেট্রোরেলের কোচ ও ইঞ্জিন, নদী পথে যাচ্ছে ঢাকার দিয়াবাড়ী
মোংলা বন্দরে জাহাজ থেকে মেট্রোরেলের কোচ ও ইঞ্জিন খালাস হচ্ছে। ছবি: দৈনিক বাংলা
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
মেট্রোরেলের দ্বাদশ চালানে আসা ৮টি কোচ ও ৪টি ইন্জিন খালাসের কাজ চলছে। রোববার সকাল ৭টা থেকে জাহাজটি থেকে কোচ ও ইন্জিন খালাস শুরু হয়। খালাস করে তা রাখা হচ্ছে জাহাজের পাশে ভেড়ানো বার্জে (নৌযান)। একেকটি বার্জ পরিপূর্ণ হলে ছেড়ে যাচ্ছে ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়ী মেট্রোরেলের ডিপোর উদ্দেশে।
শনিবার বিকেলে জাপান থেকে আসা এ জাহাজটি বন্দরের ৮ নম্বর জেটিতে ভেড়ে। সেখানে জাহাজ থেকে সন্ধ্যায়ই ঢাকার পাওয়ার গ্রীড কোম্পানী লিঃ এর মালামাল খালাস শুরু হয়ে রাতেই শেষ হয়। এসব মালামালই নদী পথে ঢাকায় যাচ্ছে।

মোংলা বন্দরে জাহাজ থেকে মেট্রোরেলের কোচ ও ইঞ্জিন খালাস হচ্ছে। ছবি: দৈনিক বাংলা

জাহাজটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট এনসিয়েন্ট স্টিম শিপ কোম্পানীর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (অপারেশন) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, রোববার সকাল ৭টা থেকে মেট্রোরেলের কোচ খালাস শুরু হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ৪টি কোচ বার্জে নামানো হয়েছে। বার্জে নামানোর পরই এ মালামাল নদী পথে ঢাকার দিয়াবাড়ী মেট্রোরেলের ডিপোর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রোববার সন্ধ্যা নাগাদ সব মালামাল খালাস শেষ হবে। এরপর সোমবার দুপুরে জাহাজটি এ বন্দর ত্যাগ করবে।
এখন পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোরেলের ১১৬টি কোচ ও ইন্জিন এসেছে। তবে এখনও আসতে বাকী রয়েছে ২৮ টি কোচ ও ইন্জিন।


প্রবৃদ্ধির শীর্ষে বাংলাদেশ

প্রবৃদ্ধির শীর্ষে বাংলাদেশ
ইউরোপে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত
  • ইউরোপে পোশাক রপ্তানি

বীর সাহাবী

নানা সংকটের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পালে হাওয়া লেগেছে। এ অঞ্চলে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। এ সময় মোট রপ্তানি আয়ে চীনকেও ইউরোপের বাজারে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ।

ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ১ হাজার ২২৩ কোটি বা ১২.২৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে ইইউ অঞ্চলে চীন প্রথমে রয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ১৩১ কোটি বা ১১.৩১ বিলিয়ন ডলার পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে বাংলাদেশ সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে সারা বিশ্ব থেকে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে শুধু বাংলাদেশ থেকেই বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করেছিল ৭৮২ কোটি বা ৭.৮২ বিলিয়ন ডলার।

আলোচ্য সময়ে ইউরোপের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছর একই সময়ে দেশটি রপ্তানি করেছিল ১ হাজার ৩৯ কোটি বা ১০.৩৯ বিলিয়ন ডলার। তুরস্ক ইইউ’র তৃতীয় বৃহত্তম পোশাকের উৎস। এ সময় দেশটির রপ্তানি ২০ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। তুরস্ক থেকে এই ৬ মাসে ৬১০ কোটি বা ৬.১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। আগের বছর একই সময়ে দেশটি এ অঞ্চলে পোশাক রপ্তানি করেছিল ৫০৭ কোটি বা ৫.৭ বিলিয়ন ডলার। এরপর রপ্তানিতে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভারত। এ সময়ে দেশটি ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করে ২৫৮ কোটি বা ২.৭৬ বিলিয়ন ডলারের। যা আগের বছরে একই সময়ের চেয়ে ২০.৩৮ শতাংশ বেশি। গত বছর একই সময়ে দেশটি রপ্তানি করেছিল ২২০ কোটি বা ২.২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া। এ সময়ে দেশটি ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করেছে ১৬৭ কোটি বা ১.৬৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক। দেশটির রপ্তানি বেড়েছে ২৪.৯০ শতাংশ। আগের বছর একই সময়ে রপ্তানি করেছিল ১১৯ কোটি বা ১.১৯ বিলিয়ন ডলার।

আলোচ্য সময়ে ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ পোশাক রপ্তানিরকারক দেশের মধ্যে রয়েছে- ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। দেশগুলোর এ অঞ্চলে রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২৩.৪৯ শতাংশ, ৩২.২৮ শতাংশ, ২০.৯০ শতাংশ, ১৫.১৯ শতাংশ এবং ২৮.৬৪ শতাংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি নিয়ে তৈরি পোশাক মালিক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘প্রাণঘাতী করোনা মহামারির পর ঘুরে দাঁড়ানো এবং ভোক্তাদের কেনাকাটা বৃদ্ধির ফলে ইউরোপের খুচরা বিক্রি স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে।’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মন্দার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিজিএমইএ পরিচালক বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মন্দার কারণে ২০২২ সালের বাকি সময়টিতে প্রবৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কতটা টিকে থাকবে, তা ভাবনার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘অস্বাভাবিক দীর্ঘ গ্রীষ্মের কারণে শীতের পোশাকের চাহিদাও ইউরোপে বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছিল। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের আমদানি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে খুচরা বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় ক্রেতারা আপাতত সতর্ক অবস্থানে আছেন বলেও জানান মো. মহিউদ্দিন রুবেল।’

অন্যদিকে আমেরিকার অফিশিয়াল ডেটা সোর্স ‘অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপেরেল (ওটিইএক্সএ)’ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ের জন্য সর্বশেষ পোশাক আমদানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। ওটিইএক্সএর মতে, ২০২১ সালের একই সময়ের (জানুয়ারি-জুলাই) তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার পোশাক আমদানি ৫৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। আর পুরো বিশ্ব থেকে তাদের আমদানি বেড়েছে ৩৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে।


বাজারের আগুনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে

বাজারের আগুনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি।
প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলা
প্রকাশিত

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমছে। সুদের হার হ্রাস ও নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপের কারণে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে নেমে এসেছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর গত বৃহস্পতিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রির হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে মাত্র ৮ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত বছরের আগস্টে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই আগস্টের চেয়ে গত বছরের আগস্টে ৪৪৯ গুণ বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩৯৩ কোটি ১১ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে বিক্রির অঙ্ক ছিল ২ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। হিসাব বলছে, এই বছরের জুলাইয়ের চেয়ে গত বছরের জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র খাতে সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।

আর অর্থবছরের দুই মাসের হিসাবে অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৪০১ কোটি ২০ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭৩২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ের চেয়ে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সঞ্চয়পত্রে ১৪ দশমিক ২৯ গুণ বেশি বিনিয়োগ হয়েছিল।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে সব জিনিসের দামই চড়া। পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব খাতেও খরচ বেড়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে সরকারের ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

বিক্রির চাপ কমাতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। তার পরও বাড়তে থাকে বিক্রি।

সবশেষ সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারকে যাতে বেশি সুদ পরিশোধ করতে না হয়, সে জন্য বিক্রি কমাতে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশের মতো কমিয়ে দেয় সরকার। এর পরও বিক্রি বাড়ছিল। তবে গত কয়েক মাস ধরে বিক্রি বেশ কমেছে। এখন একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমার কারণ ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এমনিতেই দুই বছরের করোনা মহামারির কারণে মানুষের আয়-উপার্জন কমে গেছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। কারও বেতন কমেছে। এরপর শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা। এই ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশে ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক দরপতন হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এমনিতেই বাজারে জিনিপত্রের দাম বেশি ছিল। এরপর যুদ্ধের কারণে তা আরও বেড়ে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অর্থাৎ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে মানুষ আর আগের মতো সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছে না।’

গবেষক জায়েদ বখত বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর পরও ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায়। ব্যাংকে বা অন্য কোনোখানে টাকা রাখলে এত মুনাফা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হচ্ছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ; এখানে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই, মাস শেষে বা নির্দিষ্ট সময় শেষে সুদ-আসল পাওয়া যায়। তাই সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি, একটু বেশি মুনাফার আশায় কিনেই চলেছিল। তবে এখন আর সঞ্চয়পত্র কেনার মতো সঞ্চয় নেই মানুষের কাছে। সে কারণে কমে গেছে এ খাতে বিনিয়োগ।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসভিত্তিক) গত জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাস শেষ হয়ে গেলেও আগস্ট মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিএস। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আগের মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করে পরিসংখ্যান ব্যুরো। কিন্তু তার ব্যত্যয় হওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ৫ আগস্ট জ্বালানি তেলের ৫০ শতাংশ দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে। সেটা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ১০ শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছতে পারে। সে কারণে সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করছে না বিবিএস।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘যখন মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশে দেরি হয়, তখন সরকারের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাধারণত প্রথম সপ্তাহেই মূল্যস্ফীতির তথ্য তৈরি হয়ে যায়। তা হলে এখনো দিচ্ছে না কেন? তথ্য-উপাত্ত নিয়ে রাজনৈতিকীকরণ বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নীতি ঠিক করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কারসাজি করা হচ্ছে, তথ্য ঢেকে রাখা হচ্ছে। ৯-১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি যা-ই হোক না কেন, এটা প্রকাশ করা উচিত। বিভিন্ন দেশ তাদের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করে ফেলছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরও ৩ শতাংশের মতো মূল্যস্ফীতি বাড়বে।’

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর মধ্যে গ্রাহকদের মূল টাকা (বিনিয়োগ) ও মুনাফা (সুদ) বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৮৮ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। যার মধ্যে সরকারকে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর এ খাতে সরকারের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৯১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরেছিল। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্যের চেয়ে এই খাত থেকে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ কম ঋণ নিয়েছে সরকার।

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত অর্থবছরে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৮ কোটি ২৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ ৭০ হাজার ২২৯ কোটি টাকা গ্রাহকদের পরিশোধ করা হয়। সে হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।

এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে, ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারকে যাতে বেশি সুদ পরিশোধ করতে না হয়, সে জন্য গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে দেয় সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক রকম সুদের হার, ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক রকম হার এবং ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেক রকম হার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।

তবে ১৫ লাখ টাকার নিচে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হারে সরকার হাত দেয়নি। অর্থাৎ আগে যে হারে সুদ পাওয়া যেত, এখনো সেই হারে পাওয়া যাবে। এর আগে ২০১৫ সালে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার গড়ে ২ শতাংশের মতো কমিয়েছিল সরকার।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল গ্রাহকদের পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।


আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশে মুগ্ধ আইএমএফ

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশে মুগ্ধ আইএমএফ
ছবি: সংগৃহীত
আবদুর রহিম হারমাছি
প্রকাশিত

আবদুর রহিম হারমাছি

বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দ্রুত বিকাশের গল্প শুনে মুগ্ধ হয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আন্তোয়েনেট এম সায়েহ।

তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এগোচ্ছে। সমানতালে এগোচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি; উন্নত হচ্ছে আর্থিক সেবাদান প্রক্রিয়া। বর্তমানে বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেনের জন্য মোবাইল ফোনের ব্যবহার একটি সাধারণ ব্যাপার। মানুষ ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, শাখাবিহীন ব্যাংকিং এবং মোবাইল মানি ব্যবহারে অভ্যস্ত। এক দশকে দেশটির এই সাফল্য দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। এ ক্ষেত্রে অনেক দেশের বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার আছে।’

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথচলা নিয়ে আয়োজিত এক ওয়েবিনারের তিনি এ কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফের সদর দপ্তর থেকে ওয়েবিনারটি পরিচালনা করা হয়। এতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন আন্তোয়েনেট এম সায়েহ। বাংলাদেশ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বক্তব্য রাখেন।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর চ্যাং ইয়ং রি। আরও দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিনিয়র আইএমএফের ইনস্টিটিউট ফর ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তাও উ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান।

কেনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যাট্রিক নজোরোজসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই শর বেশি ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিরা ওয়েবিনারে অংশ নেন।

‘ফিনটেক অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অ্যান্ড দ্য কেস অব বাংলাদেশের ‘পিয়ার-লার্নিং সিরিজ’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন আইএমএফের ডিএমডি আন্তোয়েনেট এম সায়েহ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আজকের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যাত্রা শুরু হয় এক দশক আগে। এই সময়ে দেশটি বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার মধ্যে আনতে সক্ষম হয়েছে। এই যাত্রা, যা প্রথম মাইক্রোক্রেডিট (ক্ষুদ্র ঋণ) দিয়ে শুরু হয়েছিল, তারপর থেকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সব দিককে কভার করার জন্য বিকশিত হয়েছে। একদিকে যেমন সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। তেমনি ব্যবহার ও গুণমানের দিক দিয়েও অনেক দূর এগিয়ে গেছে দেশটি।’

‘বর্তমানে বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেনের জন্য মোবাইল ফোনের ব্যবহার একটি সাধারণ ব্যাপার। মানুষ ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, শাখাবিহীন ব্যাংকিং এবং মোবাইল মানি ব্যবহারে অভ্যস্ত। অল্প সময়ের মধ্যে স্বপ্নের মতো এসব সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।’

এম সায়েহ বলেন, ‘সরকারি নীতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোগকে সক্ষম করেছে এবং নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করেছে। আর সুবিধাগুলো শুধু শহুরে এলাকার জন্যই নয়; কৃষি এবং গ্রামীণ খাতগুলোও নীতির জন্য অগ্রসর হয়েছে-যেমন ফ্লোর অন ক্রেডিট, যা রেয়াত শর্তে পুনঃঅর্থায়ন লাইন দ্বারা সমর্থিত।’

‘অবশ্যই, এই গতি বজায় রাখার জন্য সুবিধাকে আরও প্রসারিত করতে এবং লিঙ্গগত ব্যবধানগুলোকে দূর করতে আরও কাজ করা দরকার। তবে আমি অবশ্যই বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে তাদের সাম্প্রতিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলের সমৃদ্ধ নীতিমালার জন্য প্রশংসা করব, যা অগ্রাধিকার খাতে ঋণ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়ন, লিঙ্গ অগ্রাধিকার, গ্রামীণ এলাকায় অর্থের সুবিধা এবং সবুজ অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে কভার করে।’

‘বাংলাদেশ ডিজিটাল অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বিনিয়োগ করেছে এবং সেই অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে অনেক নতুন কোম্পানির আবির্ভাব হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে আমি জেনে ও শুনে মুগ্ধ হয়েছি। ক্রেডিট ব্যুরো, সম্পদ নিবন্ধন, পেমেন্ট সিস্টেম এবং মাইক্রো-ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মতো ক্ষেত্রগুলোকে ক্রমাগত জোর দেয়া আর্থিক পরিষেবার খরচ আরও কমিয়ে দেবে। এর মধ্যে কিছু অর্জনের জন্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে সহযোগিতা করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। কিন্তু উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।’

‘বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে আমি বলতে চাই, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৈষম্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার ক্ষমতা রাখে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘ওয়েবিনারে আইএমএফের কর্মকর্তারা ছাড়াও সব দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশে প্রশংসা করেছেন। আমি এতে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছি। তাতে বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।’

আইএমএফের ওয়েবসাইটে ওয়েবিনারটি সরাসরি প্রচার করা হয়।

ব্যাকিং সেবার বাইরে থাকা এবং সীমিত ব্যাংকিং সেবা পাওয়া জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে ১০ বছর আগে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস খাত। ১০ বছরের পথচলায় এমএফএস খাতের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে অনেক অর্জন, যা দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বের বুকে উদাহরণ তৈরি করেছে।

দেশের কোটি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে এমএফএস খাতের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। এখন একজন গ্রাহক তার দৈনন্দিন প্রায় সব ধরনের আর্থিক লেনদেন এমএফএস দিয়েই করতে পারেন। টাকা যেখানে প্রয়োজন সেখান থেকেই ব্যবহারের এই অনন্যতার কারণেই এমএফএস বিপ্লব আনতে পেরেছে।

সরকারের সদিচ্ছা, বাংলাদেশ ব্যাংকের যথাযথ দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধান এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরন্তর প্রচেষ্টায় গত এক দশকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে এমএফএস। ২০১৩ সালে যেখানে বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ, এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে ২০২১ সালে এসে তা বেড়ে ৬৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

১১ কোটির বেশি গ্রাহকসংখ্যা, দৈনিক আড়াই হাজার কোটি টাকার লেনদেন এবং ১১ লাখের বেশি এজেন্টের সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক নিয়ে এমএফএস খাত বাংলাদেশের আর্থিক খাতের চেহারা বদলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রায় সব ব্যাংক এখন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকেও ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে।


যেভাবেই হোক, ডলারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে

যেভাবেই হোক, ডলারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে
ইকবাল আহমেদ।
রাজিউল হাসান
প্রকাশিত

বাংলাদেশের সিলেটের সন্তান ইকবাল আহমেদ ওবিই ডিবিএ এখন যুক্তরাজ্যের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একজন। বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানিতে শীর্ষে তিনি। একসঙ্গে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে কাজ করে চলেছেন, অবদান রাখছেন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করায়। সম্প্রতি তিনি দৈনিক বাংলার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার সহকারী বার্তা সম্পাদক রাজিউল হাসান।

দৈনিক বাংলা: করোনা মহামারির ধাক্কার মধ্যেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দুই ধাক্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে যোগ হয়েছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন। ব্রেক্সিটের ধাক্কা তো আছেই। সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে এখন ব্যবসায়িক অবস্থা কেমন যাচ্ছে?

ইকবাল আহমেদ: যুক্তরাজ্যের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য প্রথম ধাক্কা ব্রেক্সিট। আমরা তো ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুরো অংশকে এক ভূখণ্ড ভাবতাম। আমরা যুক্তরাজ্য থেকে এসব দেশে পণ্য রপ্তানি না, সরবরাহ করতাম। শুল্কমুক্ত এই বাজারের ‍সুবিশালতার জন্য ইউরোপে অনেক ব্যবসাই সফল হয়েছে। কিন্তু ব্রেক্সিট ভয়াবহ ধাক্কা দিল। আমাদের পণ্যে আবগারি শুল্ক, মাশুল যোগ হলো। ফলে পণ্যের দাম বেড়ে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ল অনেক ব্যবসা।

এই ধাক্কার মধ্যেই এল করোনা মহামারি। সব বন্ধ হয়ে গেল। তবে এ সময়ে অনলাইন বাজারটা বড় হলো। করোনার ধাক্কা সামাল দিতে যুক্তরাজ্যের সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে।

দৈনিক বাংলা: অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শীত পর্যন্ত বা তার বেশি সময় দীর্ঘায়িত হবে। এতে বৈশ্বিক সংকট আরও ভয়াবহ হবে। এই সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যে কোনো প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কি? সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে?

ইকবাল আহমেদ: যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাচ্ছে, তার প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যে। কাজেই এই যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় তত বড় হবে। এই অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে। অবশ্য যুক্তরাজ্যের সরকার ব্যবস্থাও নিচ্ছে। সম্প্রতি ৪৫ বিলিয়ন পাউন্ডের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন নতুন অর্থমন্ত্রী, যাকে মিনিবাজেট বলা হচ্ছে। এই প্যাকেজে যুক্তরাজ্যের ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দৈনিক বাংলা: আপনার প্রতিষ্ঠান সিমার্ক পিএলসি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজার থেকে মাছসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বাজারে সরবরাহ করে। কী ধরনের পণ্য আপনি আমদানি ও রপ্তানি করেন?

ইকবাল আহমেদ: চিংড়ি রপ্তানি করে আমরা স্বর্ণপদক, রৌপ্যপদকসহ অনেক স্বীকৃতি পেয়েছি। বাংলাদেশ থেকে আমরাই চিংড়ির সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক। ইউরোপের বাজারে প্রক্রিয়াজাতকৃত চিংড়ি সরবরাহ করি। ইউরোপের ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনগুলো, এয়ারলাইন, রেস্তোরাঁসহ অনেকেই আমাদের গ্রাহক। বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি ছাড়াও আমরা সবজিসহ আরও কিছু জিনিস রপ্তানি করি। ইউরোপের দেশগুলোসহ বিশ্বের ৭০টি দেশে পণ্য রপ্তানি করি আমরা।

ইউরোপের বাজারে আমরা কেবল মাছ আর হিমায়িত সবজিই সরবরাহ করি না। আমরা শিঙাড়া, সমুচা, পরোটা, ড্রাইকেকসহ নানা ধরনের স্ন্যাকসও বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে সরবরাহ করি। ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠান আমাদের পণ্যের গ্রাহক।

বাংলাদেশ ছাড়াও অনেক দেশ থেকে আমরা পণ্য আমদানি করি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ। যেমন ব্রাজিল থেকে আমরা পোল্ট্রি আমদানি করে ইংল্যান্ডে নিজেদের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করি। এর বাইরে যুক্তরাজ্যে আমাদের আরও কিছু ব্যবসা রয়েছে। যেমন আবাসন ব্যবসা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন ভাড়া ইত্যাদি। আমাদের হসপিটালিটি ডিভিশনের আওতায় হোটেল, রেস্তোরাঁ পরিচালিত হয়।

দৈনিক বাংলা: বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষত বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বৈশ্বিক চলমান অস্থিরতার কোনো প্রভাব পড়েছে কি?

ইকবাল আহমেদ: আমরা ডলারে পণ্য আমদানি করি। ডলারের বিপরীতে পাউন্ড দিনে দিনে দুর্বল হচ্ছে। এতে আমাদের আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। গ্রাহক বেশি দামে সে পণ্য কিনতে চাইছে না। ফলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খুব সহজ হিসাব এটা। এই অস্থিরতা যত দিন গড়াবে, তত বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে যুক্তরাজ্যেই অনেক ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে।

বাংলাদেশেও কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আপাতদৃশ্যে মনে হচ্ছে, রপ্তানিকারকরা ডলারের দাম বাড়ায় লাভবান হচ্ছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারেও তো পণ্যের দাম বাড়ছে। আমদানিকারকরা বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া বাংলাদেশে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি।

দৈনিক বাংলা: তাহলে এই পরিস্থিতির সমাধান কী?

ইকবাল আহমেদ: আমি দুবাইয়ের উদাহরণ দিতে পারি। তারা আর যা-ই হোক, ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার অবনমন ঠেকিয়ে রেখেছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব তাদের ওখানে সেভাবে পড়েনি। কাজেই যেভাবেই হোক, ডলারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে। তাহলে দেশীয় বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

দৈনিক বাংলা: বাংলাদেশকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে হলে কী পদক্ষেপ নিতে হবে?

ইকবাল আহমেদ: বাংলাদেশ থেকে আমি চিংড়িসহ কিছু পণ্য আমদানি করি। গুণগতমানের উন্নয়ন ঘটানো গেলে আরও অনেক কিছু আমদানি করা যেত। বাংলাদেশে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সে তুলনায় গবেষণায় বিনিয়োগ কম। উৎপাদন কীভাবে হচ্ছে, সে ব্যাপারে নজরদারি কম। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহারে নজরদারি নেই। উদাহরণ দিই একটা। বাংলাদেশে কিন্তু প্রচুর আম হয়। কিন্তু সে আমের সিংহভাগ আমরা আমদানি করতে পারি না। আম কীভাবে উৎপাদন হচ্ছে, কীভাবে সংরক্ষণ হচ্ছে, তার কিন্তু নজরদারি নেই। ফলে আমের মান কেমন, সেটা নিশ্চিত করতে পারে না কেউ। এভাবে তো আর আমদানি হয় না। কাজেই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মানের দিকে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। এই খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় আসে। এভাবে একটা খাতের ওপর এতটা নির্ভরশীল থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যেকোনো মুহূর্তে এই খাতে ধস নামলে বা আয় কমে গেলে বিপদ ঘটতে পারে। কাজেই অন্য খাতকেও রপ্তানিমুখী করতে হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়াতে হবে। সরকারকেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরেকটা বিষয়। দেশে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ আনতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান যত বেশি দেশে আসবে, তত কর্মসংস্থান হবে, দেশে রপ্তানিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

দৈনিক বাংলা: বাংলাদেশে এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন আপনি। এ দেশে ব্যাংক করার পরিকল্পনা এল কী করে? উদ্যোক্তাদের একজোট করলেন কীভাবে?

ইকবাল আহমেদ: আমি বিদেশে থাকলেও মনটা সবসময় বাংলাদেশে থাকে। এ কারণে দেশের জন্য সবসময় কিছু না কিছু করতে চেয়েছি আমি। তারই অংশ হিসেবে একসময় ব্যাংকের কথা মাথায় এল। এতে বহুমাত্রিক লাভ। প্রথমত, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন, দ্বিতীয়ত, দেশে কর্মসংস্থান হবে, তৃতীয়ত, এই ব্যাংক সফল হলে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। এসব দিক বিবেচনায় আমি বাংলাদেশে এনআরবি ব্যাংক গড়ার পরিকল্পনা করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। নিজের আগ্রহ ও তাদের উৎসাহে আমি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানরত ৪৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাকে খুঁজে বের করি। এভাবেই আসলে শুরু।

আমি ব্যাংকটিকে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংক হিসেবে গড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিস্থিতি ও সময়ের জন্য পারিনি।

দৈনিক বাংলা: বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে জড়িত থাকার কারণে আপনি এখানকার অবস্থা সম্পর্কে অবগত। সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেশের ব্যাংক খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো কী?

ইকবাল আহমেদ: বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সম্ভাবনা প্রচুর। তবে নজরদারি বাড়াতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বেশি সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে। যেসব ব্যাংক ভালো করছে না, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। একটা ব্যাংক কতটা ভালো করবে অথবা কতটা লোকসানি হবে, তা নির্ভর করে আসলে পরিচালনা পর্ষদের নীতির ওপর। এখন ধরা যাক, একটা খারাপ লোককে জেনেশুনে ঋণ দিয়ে দিল একটা ব্যাংক। সে ঋণখেলাপি হয়ে গেল। এ ক্ষেত্রে লোকসান তো গুনতেই হবে। শুধু তা-ই নয়, বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপি এক সময় রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করে।

কাজেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা বসছেন, তাদের নীতি কী, এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ ব্যাংক খাত যত শক্তিশালী হবে, অর্থনীতি তত জোর পাবে।

দৈনিক বাংলা: ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য ব্রিটিশ সরকার আপনাকে ওবিই ও ডিবিএ উপাধি দিয়েছে। এই উপাধিগুলো আসলে কী?

ইকবাল আহমেদ: ওবিই হচ্ছে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এমপায়ার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এই উপাধি দেয়া হয় যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাজ্যের শীর্ষ রপ্তানিকারক হয়েছি আমি। পাশাপাশি আমি যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলাম। এসব কারণে ব্রিটিশ সরকার ওই উপাধি আমাকে দিয়েছে।

আর ডিবিএ হলো ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। শিক্ষা ও ব্যবসা খাতে অবদান রাখার জন্য এই ডিগ্রি দেয়া হয়।

আমি যে শুধু যুক্তরাজ্যে ব্যবসা খাতে অবদান রাখার জন্য পুরস্কৃত হয়েছি, তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশ সরকারও আমাকে বেশ কয়েকবার সেরা রপ্তানিকারক হিসেবে পুরস্কৃত করেছে।

দৈনিক বাংলা: অতি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেলেন। বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে আপনার পরিচয় রয়েছে। এমনকি চট্টগ্রামে আপনার কারখানা উদ্বোধন করতে প্রিন্সেস অ্যান এসেছিলেন। এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

ইকবাল আহমেদ: ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশ আগে থেকে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। রানির গার্ডেন পার্টিতে আমি পাঁচবার গিয়েছি। বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে আমার চারবার দেখা হয়েছে। আর প্রিন্সেস অ্যানের সঙ্গে তো অনেকবার হয়েছে। বর্তমান রাজার অর্গানাইজেশনের দুটি প্রকল্পে আমি সংশ্লিষ্ট। এর একটি ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সহযোগিতা। এই প্রকল্পকে বলে মোজাইক। এতে আমি সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট।

দৈনিক বাংলা: আপনি বেশ কিছু দাতব্য কাজেও জড়িত। সে কাজগুলো সম্পর্কে যদি বলতেন।

ইকবাল আহমেদ: আমি বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাজ করি। সিলেটে আমি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ার পরিকল্পনা আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে রুরাল ইউনিভার্সিটি। প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েরা বিশ্বমানের পড়ালেখা করার সুযোগ পাবে। ইংল্যান্ডে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে গৃহহীনদের মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দেয়ার চেষ্টা করি আমি। বাংলাদেশ হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতের যেখানে সুযোগ পেয়েছি, সেখানেই আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।

দৈনিক বাংলা: এখন যারা উদ্যোক্তা হতে চান বা চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ?

ইকবাল আহমেদ: প্রথম কথা, পড়ালেখার কোনো বিকল্প নেই। আগে পড়ালেখা করতে হবে। তারপর কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে বেশি ভালো। বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে সবকিছু শেখা যায় না। একটা গণ্ডির মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানে সবদিকের সব কাজের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। অভিজ্ঞতা পরিপূর্ণ করে তারপর ব্যবসা শুরু করতে হবে। আরেকটা কথা, ব্যবসার ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল হতে হবে। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এখন। এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে।

দৈনিক বাংলা : সব উদ্যোক্তা প্রথম দফায়ই সফল হন না। বারবার চেষ্টার পরও বিফল হয়ে এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন অনেকে। তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ?

ইকবাল আহমেদ: অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা হয়। এর জন্য কিছু বিষয় অন্যতম দায়ী। অনেকে আছেন, এক ব্যবসায় ভালো করতে না পেরে অন্য ব্যবসায় চলে যান। এভাবে সুইচ করতে থাকলে আপনি কোনো ব্যবসায়ই ভালো করতে পারবেন না। একটার পেছনে লেগে থাকতে হবে। যত ব্যর্থ হবেন, তত অভিজ্ঞতা হবে। আরেকটা কথা, যখন দেখা যাবে, কিছুতেই একা সফল হওয়া যাচ্ছে না, তখন অংশীদার জোগাড় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হলো, আমার মধ্যে যে চিন্তা, যে সৃজনশীলতা নেই, তা আমার অংশীদারের মধ্যে থাকতে পারে। কাজেই সাফল্যের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। একজন না পারলে, দুজন, দুজন না পারলে চারজনে মিলে উদ্যোগ নিতে হবে।

দৈনিক বাংলা: বাংলাদেশে আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আর কী করতে হবে?

ইকবাল আহমেদ: সর্বপ্রথম তরুণ প্রজন্মকে ব্যবসায় আগ্রহী করতে হবে। চাকরির ওপর ব্যবসাকে জোর দিতে হবে। সরকারের দিক থেকেই এই বার্তাটা আসতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে জোরালো অবস্থান নিতে হবে। প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, ব্যাংক ঋণসহ সবকিছু আরও সহজ করতে হবে। ব্যাংক যদি আমাদের ঋণ না দিত, তাহলে আজ যতটুকুই এসেছি, তা কী আসতে পারতাম? কাজেই ব্যাংক খাতকে এখানে জোরালো অবস্থান নিতে হবে।

দৈনিক বাংলা: আপনাকে ধন্যবাদ।

ইকবাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।