দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার (মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি) বেশ খানিকটা বেড়েছে, তবে ডলারের হিসাবে কমেছে। কমেছে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি বা বর্তমান মূল্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। ডলারের হিসাবে জিডিপির আকার ৪৬০ দশমিক ২২ বিলিয়ন থেকে ৪৫৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। আর মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৯৩ ডলার থেকে ২৮ ডলার কমে হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ ডলার।
মঙ্গলবার এই তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিএস। তবে এটি চূড়ান্ত নয়, প্রাথমিক বা সাময়িক হিসাব। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর) তথ্য হিসাব করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধির হার ও মাথাপিছু আয়সহ অন্যান্য সূচক কিছুটা কম-বেশি হয়ে থাকে। বরাবরই এমনটা হয়ে থাকে।
গত ১১ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছিলেন, প্রাথমিক হিসাবে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। মাথাপিছু আয় কিছুটা কমেছে। তবে কী পরিমাণ কমেছে তা তিনি সে দিন বলেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় মাথাপিছু আয় ও ডলারের হিসাবে জিডিপির আকার কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মতিয়ার রহমান। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে গত বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে জিডিপির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থবছর শেষ হলে দুই-এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করা হবে। প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ৩০ পয়সা ধরে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়েছিল। ডিসেম্বরে সেই ডলারের দাম বেড়ে ৯৭ টাকা ৮১ পয়সা হয়েছিল। সেই দর ধরেই জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের হিসাব করা হয়েছে। আর সে কারণেই টাকার অঙ্কে জিডিপির আকার বাড়লেও ডলারের হিসাবে কমেছে।’
গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে টাকার হিসাবে জিডিপির আকার ছিল ৩৯ লাখ ৭১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে ছিল ৪৬০ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। আর মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে অর্থনীতির প্রধান তিন খাতের মধ্যে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ, গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে যা ছিল ৩ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। সাময়িক হিসাবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ; গত অর্থবছরে হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা সাময়িক হিসাবে ছিল ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, সাময়িক হিসাবে অর্থনীতির প্রধান তিন খাতেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে।
২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তথ্য প্রকাশ করছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। তার আগে ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে জিডিপির হিসাব প্রকাশ করা হতো।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে, ২০০৫-০৬ ভিত্তি বছরের হিসাবে যা ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। নতুন হিসাবে তা কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। একইভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়।
তবে নতুন হিসাবে প্রতিবছরই মাথাপিছু আয় বেশ খানিকটা করে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে পুরোনো হিসাবে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪ ডলার। নতুন হিসাবে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৩২৬ ডলার। একইভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ ডলার থেকে বেড়ে ২ হাজার ২০৯ ডলার হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫১ ডলার থেকে বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৩ ডলার।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৭৮ পয়সা হিসাবে ডলারের হিসাবে ছিল ৩৭৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৩২৬ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির আকার বেড়ে হয় ৩৫ লাখ ৩০ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮১ পয়সা হিসাবে ৪১৬ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার।
করোনাভাইরাস মহামারির আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ধারাবাহিক অগ্রগতির পথ ধরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ (ভিত্তি বছর পরিবর্তনের পর ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ) প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বাংলাদেশ, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি। গত এক দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল সাড়ে ৬ শতাংশের মতো। আর চার বছরে এই হার ছিল ৭ শতাংশের ওপরে।
তবে ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও তছনছ হয়ে যায়, পাল্টে যায় সব হিসাব-নিকাশ। তার পরও ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে আগের বারের (২০১৯-২০) মতো ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। কিন্তু করোনার ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে, যা ছিল তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। মহামারির কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। কোনো কোনো দেশে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ।
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরলেও পরে তা সংশোধন করে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি বলেছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হবে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ বলেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হবে।
গত ২০২১-২২ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে ৭ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেদিক থেকে চলতি অর্থবছর প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে ১ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
দেশে মাথাপিছু আয় নিয়ে এক প্রশ্নে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম বলেন, চলতি মাথাপিছু আয় টাকার হিসাবে বাড়লেও ডলারের হিসাবে কিছুটা কমেছে। তবে কোনো অঙ্ক তিনি বলেননি।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তির পর প্রথম রুশ ডিজেলবাহী ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারটি নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে এবং আগামী ৭ নভেম্বর সেখানে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের উচ্চমূল্য কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি মাসে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা তাঁর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, মাল্টার পতাকাবাহী মাঝারি আকারের ট্যাংকার ‘আজিওই ফানেন্দেস’ গত ২২ অক্টোবর রাশিয়ার বাল্টিক সাগর তীরবর্তী প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন অতি-স্বল্প সালফারযুক্ত ডিজেল বোঝাই করে। তবে এ চালানের ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম রুশ জ্বালানি পণ্য আমদানির ঘটনা হতে পারে।
ট্রাম্প গত ৯ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে তিন লাখ মেট্রিক টন বা ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন রপ্তানির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, চুক্তির আওতায় প্রথম জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছে। তবে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য কি না, তা তিনি নিশ্চিত করেননি। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম ট্যাংকারের যাত্রার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী চালানগুলোও নিয়মিত পাঠানো হবে। চুক্তির আওতায় রাশিয়া ডিজেল রপ্তানিতে নিজেদের আরোপ করা স্বেচ্ছামূলক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে রাশিয়া মূলত তুরস্ক, ব্রাজিল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডিজেল রপ্তানি করে আসছে। রেলপথে মধ্য এশিয়াতেও জ্বালানি সরবরাহ করে দেশটি। এলএসইজি ও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর রুশ ডিজেলবাহী জাহাজগুলো পুরোনো গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে। অন্তত দুটি ট্যাংকারের তুরস্ক ও ব্রাজিলের দিকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্রে আরও জ্বালানি পাঠানো হবে। তাঁর মতে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বাড়িয়ে প্রতি মাসে স্বাভাবিক তিন থেকে সাড়ে তিন মিলিয়ন টনে উন্নীত করতে পারবে।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ দাবি করেছেন, ডিজেল চুক্তির অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের সহযোগিতা চেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেনিম বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইউরোপের এই বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। যদিও আগস্টে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ফিরে এসেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ৮০ হাজার ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফলে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশও আগের বছরের আগস্টের তুলনায় বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশগুলো মোট ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আমদানির মূল্য কমেছে ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে আগস্টে আমদানি বেড়ে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। টানা আট মাসের হিসাবের মধ্যে আগস্টের এই প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বাজারে ডেনিমের চাহিদা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরছে।
ইইউর ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বছরের প্রথম আট মাসে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। এ সময়ে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান থেকে আমদানি হয়েছে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ইউরো এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা তুরস্ক থেকে ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম।
শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও রপ্তানি আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই পতন ইউরোপের সামগ্রিক ডেনিম আমদানি হ্রাসের হার ৪ দশমিক ৪০ শতাংশের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশ গত বছরের ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে। তবে আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই মাসে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মাসটিতে ইইউর ডেনিম আমদানিতে মোট যে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বৃদ্ধির কারণে।
আগস্টের এই অগ্রগতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হারও কিছুটা কমেছে। জুলাই শেষে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম ছিল। আগস্টের প্রবৃদ্ধির পর আট মাস শেষে সেই পতন নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ, এক মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির অবনতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
ইইউর ডেনিম বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিক আমদানিতেও প্রভাব পড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তুরস্ক থেকে ডেনিম আমদানির মূল্য কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। ইউরোপের বাজারে ডেনিম আমদানি কমার ক্ষেত্রে তুরস্কের এই পতন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া মরক্কো থেকে আমদানি ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং তিউনিসিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে কয়েকটি দেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এ সময়ে মিসর থেকে ডেনিম আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ইউরো। আর ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বৃদ্ধির হার ছিল ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। তুরস্কের সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ সেই সুযোগের পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। বরং মিসর, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে নিজেদের সরবরাহ বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজারে অংশ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম দামের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নকশা ও উৎপাদনে নমনীয়তা এবং নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি দেশগুলো দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা পেতে পারে। তাই ইউরোপীয় ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারলে নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বাংলাদেশের।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য কমলেও শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে। আগস্টের প্রবৃদ্ধি বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখালেও প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখে বাজারে নিজেদের অংশ বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিকারকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা আট দিন বন্ধ থাকার পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে। শনিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পণ্যবাহী একটি ট্রাক দেশে প্রবেশের মাধ্যমে এ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল হয়।
এর আগে দুর্গাপূজার অবকাশ উপলক্ষে গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সব ধরনের পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এই পুরো সময়ে হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে বৈধ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন ছিল।
বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরায় শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করে হিলি স্থলবন্দর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী জানান, দীর্ঘ আট দিনের ছুটি শেষে শনিবার দুপুর থেকে বন্দরে পুরোদমে পণ্য খালাস ও আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। অপরদিকে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন জানান, পণ্যবাহী যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে পাসপোর্টধারী ভ্রমণকারীদের পারাপার প্রক্রিয়া সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গতকাল শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বা ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ২৭ সেন্ট হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিলের পর ব্রেন্টের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা। এসব হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর এবং হরমুজ প্রণালিসহ আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এলপিএল ফিন্যান্সিয়ালের প্রধান ক্রস-অ্যাসেট কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সৌদি আরবে জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে হুতিদের হামলার পর সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো দেশটির ধাহরানে অবস্থিত প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর জানিয়েছে দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তবে এ ঘটনার কারণ কিংবা সংশ্লিষ্ট জাহাজের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। গত ৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে সামুদ্রিক পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাতের ঝুঁকি। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো বলেন, গত সপ্তাহে তেলবাহী জাহাজে হামলার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়লেও পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব, তবে সংঘাত ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরবরাহসংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। লুইজিয়ানার লেক চার্লস শোধনাগারে সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব মোকাবিলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় দেশটির কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে জি-৭ দেশগুলোর মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তের পর এটিই জার্মানির প্রথম এমন পদক্ষেপ।
অন্যদিকে লিবিয়ার হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল পরিবহনের একটি পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির জাতীয় তেল করপোরেশনের প্রধান রয়টার্সকে জানিয়েছেন। এতে ওই দুই তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র পক্ষকাল আগে কানাডা থেকে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য মেইনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের মুখে থাকা রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের তৎপরতার পরই মূলত হোয়াইট হাউস এই শুল্ক ছাড়ের পদক্ষেপ নেয়।
হোয়াইট হাউসের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ছাড়ের তালিকায় প্লাইউডের শিট, কিছু বিশেষ কাগজজাত সামগ্রী, শীতলীকরণ সরঞ্জাম ও সুনির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে কয়েকটি পণ্যে স্বস্তি দেওয়া হলেও কার্পেট, নির্দিষ্ট ধরনের ভালভ ও বর্জ্যজাত সামগ্রীর ওপর নতুন শুল্ক আরোপেরও ঘোষণা রয়েছে, যা আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে মরিয়া ডেমোক্র্যাটরা মেইনের সিনেট আসনটিকে বিশেষ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্য সংঘাতের বিরূপ প্রভাবে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলিন্স জানান, ব্লুবেরি, আলু, আপেল এবং সামুদ্রিক শৈবাল চাষে ব্যবহৃত উপকরণের মতো মেইনের কৃষিশিল্পের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যগুলোতে তিনি এই শুল্ক ছাড় নিশ্চিত করেছেন। তিনি তুলে ধরেন যে স্থানীয় কৃষকেরা এমন সব বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও প্যাকেজিং উপকরণের জন্য কানাডার ওপর নির্ভরশীল, যা যুক্তরাষ্ট্রে সহজলভ্য নয় কিংবা তার বিকল্প ব্যবহার অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
কানাডার মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। কিন্তু গত আগস্টে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে অটোয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প, যা হকিস্টিক থেকে সিমেন্ট পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যকে প্রভাবিত করেছে। এর আগে অটোমোবাইল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের ওপর আরোপিত মার্কিন শুল্কের জেরে দেশটিতে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং টানা দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে কানাডা প্রযুক্তিগত মন্দার কবলে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কানাডার মন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান যে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি অটোয়া অবগত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এসব পদক্ষেপ পর্যালোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে কানাডা প্রস্তুত রয়েছে।’ বৈশ্বিক বাণিজ্যে দীর্ঘকাল ধরে অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে—এমন দাবি তুলে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প বন্ধু ও প্রতিপক্ষ উভয় পক্ষের ওপরই ব্যাপক হারে শুল্ক চাপিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির সতর্কবার্তা জারির পর আগাম সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে টানা তিন দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের দাপ্তরিক ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। পোর্টালটি সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংযোগ ব্যবস্থা ও সার্বিক আর্থিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গেলে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত বার্তা প্রদর্শিত হতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক সাইবার হুমকির তথ্য পাওয়ার পরপরই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাইটটিতে প্রবেশাধিকার স্থগিত করা হয়। বর্তমানে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষা বলয় আরও জোরদার করার কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটি সচল করা হচ্ছে না। ওয়েবসাইটটি ফের চালুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো ঠিক হয়নি বলেও জানান তিনি, তবে ব্যাংকিং লেনদেন ও আন্তসংযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা ‘পিএইচপি’তে বড় ধরনের ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পরই মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাইবার ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছে সাইবার সুরক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজ। এই বৈশ্বিক ঝুঁকির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও সতর্কতা জারি করা হলে তারই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব ওয়েবসাইটের সুরক্ষায় এ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে কোমল পানীয়ের ক্যান তৈরির একটি বড় কারখানা গড়ে তুলতে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে চীনের প্রতিষ্ঠান অ্যালু হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রায় ১৩ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হচ্ছে কারখানাটিতে বছরে ১০০ কোটি ক্যান উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা, যার প্রয়োজনীয় মূল যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সরাসরি চীন থেকে আমদানি করা হবে।
২০২৪ সালে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে নিবন্ধিত হয়ে প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। ইতিমধ্যে কারখানার বেসমেন্ট তৈরির ধাপ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী আট মাসের মধ্যে অবকাঠামোগত সব কাজ শেষ করে উৎপাদনে যাওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে অ্যালু হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউয়ান ডিংইয়ান গণমাধ্যমকে বলেন, "কারখানাটিতে বছরে ১০০ কোটি পানীয়ের ক্যান উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের বাজার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করা হবে। বাকি ১০ শতাংশ দেশের বাজারে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।"
বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে বাইরে থেকে পানীয়ের ক্যান নিয়ে আসতে হয়, যাতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। দেশে এ ধরনের শিল্প চালু হলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বড় সাশ্রয় সম্ভব হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে কারখানাটি চালু করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে গ্যাস সংযোগের অনিশ্চয়তা। এ সমস্যা সমাধানে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে দেশের বাজারে কোকা-কোলা, পেপসি, মোজো, স্প্রাইট, মিরিন্ডা, পাওয়ার ও মাউন্টেন ডিউয়ের মতো কোমল পানীয়, জুস এবং এনার্জি ড্রিংকসে ক্যানের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে গুণগত মান রক্ষা, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারযোগ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বজুড়েই অ্যালুমিনিয়াম ক্যানের কদর বাড়ছে। প্যাকেজিং আকর্ষণীয় করতে এখন অগমেন্টেড রিয়েলিটি নকশা কিংবা তাপমাত্রায় রঙ বদলানো বিশেষ কালির মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু হয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে পানীয়ের ক্যানের বাজার ছিল ৩ হাজার ৭৯ কোটি ডলারের, যা ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে ২০২৬ সালে ৩ হাজার ২৮৭ কোটি ডলার এবং ২০৩৪ সাল নাগাদ ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে। গত বছর এই বৈশ্বিক বাজারের ৩৫ দশমিক ৪৪ শতাংশই উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, কালিয়াকৈরের এ বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের আমদানি নির্ভরতা ঘোচার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী ক্যান উৎপাদনের একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লোকসান এবং নগদ অর্থ ব্যয় দ্বিগুণ হওয়ায় সুইডিশ গাড়ি নির্মাতা ভলভো কারসের শেয়ারের দর এক দিনেই ২৪ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে আরও ২ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সুইডেনে প্রায় ২ হাজার এবং অন্যান্য দেশে ৫০০ কর্মী চাকরি হারাবেন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ভলভোর সমন্বিত পরিচালন লোকসান হয়েছে ৩৭০ কোটি সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ৩৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমান। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৫৮০ কোটি ক্রোনা মুনাফা করেছিল। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসেও লোকসানের পরিমাণ এত বেশি হওয়ার কথা ছিল না। এ সময়ে কোম্পানিটির নগদ অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯০ কোটি ক্রোনায়, যা আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিগুণ।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাকান স্যামুয়েলসন বলেন, “২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিক ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক এবং এটি এমন একটি বছরের প্রতিফলন, যা প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই আমাদের চলমান ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।” তিনি জানান, কর্মী ছাঁটাইয়ের কাজ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। ভলভো জানিয়েছে, পরামর্শক চুক্তি বাতিল, স্বাভাবিকভাবে কর্মীসংখ্যা কমে আসা এবং নির্দিষ্ট কর্মীদের জন্য চাকরি ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন ছাঁটাই কার্যকর করা হবে। এতে কোম্পানির মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ প্রভাবিত হবেন। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি আরও ৩ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। পাশাপাশি আগামী বছরের শেষ নাগাদ পরোক্ষ ব্যয় ও পরিবর্তনশীল খরচ থেকে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি ক্রোনা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।
চীনা প্রতিষ্ঠান গিলির সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন ভলভো বৈদ্যুতিক গাড়ির অনিশ্চিত চাহিদা, শুল্কের চাপ এবং চীনের কঠিন বাজার পরিস্থিতির কারণে সংকটে পড়েছে। ইউরোপের গাড়ি নির্মাতারাও দুর্বল চাহিদা, চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কারখানার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে চাপের মুখে রয়েছে। বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ফক্সভাগেনও সর্বোচ্চ ১ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে এবং কয়েকটি কারখানা বন্ধের বিষয় বিবেচনা করছে। ভলভোর সংকট মোকাবেলায় স্যামুয়েলসন ২০২৫ সালে অবসর থেকে ফিরে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন। ব্যয় সংকোচন, আঞ্চলিক বাজারভিত্তিক কার্যক্রম এবং গিলির সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। কোম্পানিটির মোট মুনাফার হারও এক বছরের ব্যবধানে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল নতুন বৈদ্যুতিক এসইউভি ইএক্স৬০-এর। তবে ব্যাটারি সংযোজনের সমস্যায় গাড়িটির উৎপাদন পিছিয়ে গেছে। চলতি বছরে ৪০ হাজার গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ইউনিট তৈরি হয়েছে। এ মাসের শুরুতে ভলভো পুরো বছরের বিক্রির পরিমাণ ও নগদ অর্থ প্রবাহ নিয়ে পূর্বাভাসও প্রত্যাহার করে নেয়। চীনের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে মূল্যযুদ্ধে না জড়িয়ে মুনাফার হার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের আয় প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। আগামী বছর স্যামুয়েলসনের স্থলাভিষিক্ত হবেন স্কোডার সাবেক প্রধান ক্লাউস জেলমার। বিশ্লেষকদের মতে, ভলভোর সংকট কাটিয়ে ওঠার দায়িত্ব তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কোম্পানিটি দশকের শেষ নাগাদ ১৩টি নতুন গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে ছয়টি চীনের বাজারের জন্য তৈরি হবে। স্যামুয়েলসনের আশা, এসব নতুন মডেল বাজারে আসার আগে চীনে কোম্পানির কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না।
স্যামুয়েলসন স্বীকার করেছেন, চীনে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও আগে স্থানীয় বাজারের উপযোগী করা প্রয়োজন ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আগে উপলব্ধি করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হয়েছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মিয়া সাত্তার। তিনি রাশিয়ার ব্যবসায়ী মহলে পরিচিত একজন উদ্যোক্তা ও ন্যাশনাল গ্রুপের কর্ণধার। গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) মস্কোয় রাশিয়ান ফেডারেশনের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে কাউন্সিলের সাংগঠনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পাদালকো। নতুন দায়িত্বের জন্য তিনি মিয়া সাত্তারকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানান। পাদালকো বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই কাউন্সিলের কাজ চলা উচিত। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের বাজারসংক্রান্ত বিশ্লেষণ তৈরি, সহযোগিতার সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করা এবং বাজারে প্রবেশের বাধা খুঁজে বের করা হবে প্রধান কাজ।’ বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার ওপরও তিনি জোর দেন।
পাদালকোর মতে, কাউন্সিল রুশ-বাংলাদেশ আন্তঃসরকার কমিশনের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। উদ্যোক্তাদের প্রস্তাব একত্র করে ব্যবসা ও যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো সরকারি পর্যায়ে তোলা হবে।
রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। স্বাধীনতার সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ নতুন প্ল্যাটফর্ম পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বাড়াবে।’ কাউন্সিলের কাজে দূতাবাস সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় এশিয়া বিভাগের প্রধান ভ্যাচেস্লাভ এরমোলায়েভ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।’ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে তিনি যৌথ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের জটিলতা ও বাণিজ্যের পণ্যতালিকা বাড়ানোর প্রয়োজনের কথাও বলেন তিনি।
রুশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান আনাস্তাসিয়া রোমানোভা বলেন, ‘কাউন্সিল গঠনের ফলে ব্যবসার সুনির্দিষ্ট চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আন্তঃসরকার কমিশনের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা যাবে।’ জ্বালানি, রসায়ন, কৃষি-শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তিকে তিনি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে মিয়া সাত্তার জ্বালানি, কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, পরিবহন অবকাঠামো ও হালকা শিল্পে সহযোগিতার সুযোগের কথা তুলে ধরেন। সম্ভাব্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শস্য গুদাম নির্মাণ এবং ঢাকায় রাশিয়ার প্রাক্তন ট্রেড রিপ্রেজেন্টেশনের জায়গায় একটি শিল্পপার্ক গড়ে তোলা।
তিনি জানান, রুশ কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার সঙ্গে কাজ করছে এবং তৈরি পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী আমদানি করছে। রাশিয়া ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশি মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহকারীদের অ্যাক্রেডিটেশনের কাজও চলছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রধান বাধা হিসেবে মিয়া সাত্তার বাংলাদেশে পণ্যের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার কথা বলেন। এর সমাধানে মান নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় ও সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তার মূল্যায়নে, রুশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশ মানে প্রায়ই কেবল বস্ত্রশিল্প আর রূপপুর প্রকল্প। এই ধারণা বদলাতে তিনি একটি সমন্বিত তথ্য পোর্টাল, খাতভিত্তিক বিজনেস মিশন এবং রুশ চেম্বার ও রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টারের সহায়তায় ব্যবসায়ীদের স্থায়ী যোগাযোগের প্রস্তাব দেন।
মিয়া সাত্তার বলেন, ‘আমাদের একক কোনো ফোরামের প্রয়োজন নেই, বরং নিয়মিত বিটুবি যোগাযোগ প্রয়োজন।’ প্রকল্প পর্যালোচনার জন্য কাউন্সিলের অধীনে স্থায়ী খাতভিত্তিক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনেরও প্রস্তাব করেন তিনি। বৈঠকে ‘প্রডইনটর্গ’-এর জেনারেল ডিরেক্টর আলেকজান্ডার সিরতসেভ বাংলাদেশে রুশ সার ও শস্য সরবরাহের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কৃষি-শিল্পবিষয়ক একটি ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরেট ও ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। স্তানিস্লাভ সিমাকোভকে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। আগামী নভেম্বরে আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকের ফাঁকে ঢাকায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের মহাসচিব ভ্লাদিমির পোলজকভ, এসএমই করপোরেশনের ইভজেনিয়া ইগোরোভা, রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট তাতিয়ানা বেলকেভিচ ও নোভাটেকের সালতানাত সাকামবায়োভা।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বেড়েছে। সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলা এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের খবরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে জ্বালানি তেলের দর। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৩৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৩ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ০.৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৯৯ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন তেলের দামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অঞ্চলটিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, তেলক্ষেত্র ও সমুদ্রপথে হামলার ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে।
সৌদি আরবে হামলায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরসংলগ্ন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দরে হামলা চালানোর পাশাপাশি দেশটির একটি তেলক্ষেত্র ও বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে।
ইয়ানবু বন্দর সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে বিকল্প পরিবহনপথ হিসেবে লোহিত সাগরসংলগ্ন অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় হামলার খবর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করে। হামলার কারণে সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে হামলার খবরের পাশাপাশি প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানিতে কতটা প্রভাব পড়েছে, সেটিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটলেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন। এ ধরনের অনিশ্চয়তা তেলের বাজারে দামের ওঠানামা বাড়িয়ে দেয়।
ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা
তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে বড় ধরনের যৌথ হামলার পরিকল্পনা করছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের চলতি সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মাসের শুরুতে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। তবে পরিকল্পনার বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য এবং বাস্তবে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার বিষয়টি এক নয়। পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত বাড়লে শুধু দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়।
বছরের শুরু থেকে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৮৫ শতাংশের বেশি
চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সামনে কোন দিকে যাবে তেলের বাজার
বিশ্ববাজারে তেলের দাম আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যাবে, তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কতটা সচল থাকে তার ওপর নির্ভর করবে। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিপথে বাধা সৃষ্টি হলে দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিপরীতে, উত্তেজনা কমে আসা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার নিশ্চয়তা তৈরি হলে বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তেলের দামের অস্থিরতা নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশ্ববাজারে দাম দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্যমতে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলারের সমান। মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে শুধু উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকেই সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সুদের এই বিপুল অঙ্কটি বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে হওয়া মোট ব্যয় (৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিনিয়োগ (২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের বিনিয়োগের (২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার) চেয়েও অনেক বেশি।
ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ পরিশোধের এই অতিরিক্ত চাপ সরাসরি ইউরোপের জনজীবনে অভিঘাত তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, নিম্ন মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতির প্রতিবাদে সম্প্রতি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। ফ্রান্সে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই একদিনে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দেশটিতে ২০০২ সালের পর থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ বা ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার সর্বোচ্চ প্রায় ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা জার্মানির ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ সুদের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি অতীতে বড় সংকটে পড়া ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বর্তমানে ফ্রান্সের ঋণের খরচ বেশি, আর ইউরোপে কেবল যুক্তরাজ্যের ঋণের খরচ এর চেয়ে ওপরে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
সরকারি ঋণের আর্থিক মূল্যের হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ)। অন্যদিকে জাপানের মোট ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় দেশটির ঋণের বোঝা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ, যা তাদের জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। অন্যান্য প্রধান দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০২ শতাংশ), ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১৩৮ শতাংশ) এবং জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ৬৫ শতাংশ)। সরকারগুলো সাধারণত রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে নির্দিষ্ট মেয়াদের বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করে। তবে বন্ডের বাজারমূল্য কমলে ও ইল্ড বা প্রত্যাশিত মুনাফার হার বাড়লে সরকারকে অতিরিক্ত সুদ গুনতে হয়, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেবল পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে আটকে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন ও অবকাঠামোর মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এই আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে সরকারগুলোকে বাধ্য হয়ে করের বোঝা বাড়াতে হচ্ছে কিংবা নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে যাওয়ার প্রভাব বেসরকারি ব্যাংক খাতেও পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি তৈরির ঋণ, গাড়ি কেনা কিংবা ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। ঋণ কোনো দেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় হাতিয়ার হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুদের এমন চড়া বোঝা রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতাকে সীমিত করে তুলছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিদেশে ভ্রমণ, চিকিৎসা, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধে বাংলাদেশিদের ব্যাংক কার্ড ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে ইস্যু করা বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে মোট ৯৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ৫০৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ ছাড়া ডেবিট কার্ডে ৪২২ কোটি এবং প্রিপেইড কার্ডে ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যয়ের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে। এর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে থাইল্যান্ড (১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ), ভারত (৯ দশমিক ১২ শতাংশ) এবং সিঙ্গাপুর (৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ)।
বিদেশে ব্যয়ের পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে দেশের ভেতরেও সামগ্রিক কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের আর্থিক আকার বেড়েছে প্রায় ১০৩ শতাংশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যেখানে কার্ডে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, চলতি বছরের আগস্টে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭০ কোটি টাকায়। একই সময়ে ব্যাংক কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯৬ শতাংশ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা ২ কোটি ৭০ লাখের কিছু বেশি থাকলেও চলতি বছরের আগস্টে তা উন্নীত হয়েছে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ২৪১টিতে। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৪টি ডেবিট কার্ড, ৯২ লাখ ৭০ হাজার ৯৮৮টি প্রিপেইড কার্ড এবং ২৮ লাখ ৫ হাজার ৪৪৯টি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে।
সার্বিক লেনদেন ইতিবাচক ধারায় থাকলেও আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডে খরচের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। আলোচ্য মাসে দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ডে মোট ৪ হাজার ৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে, যা আগের মাস জুলাইয়ের ৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার চেয়ে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগস্টে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এ ছাড়া খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ৫১৮ কোটি টাকা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ৪৪২ কোটি টাকা এবং ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয়ে ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন গ্রাহকেরা।
অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে তাঁদের আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়িয়েছেন। গত আগস্টে বাংলাদেশে বিদেশি কার্ডের মাধ্যমে মোট ২৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের মাস জুলাইয়ের তুলনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে বার্ষিক হিসাবে এই প্রবৃদ্ধি আরও চমকপ্রদ; গত বছরের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে বিদেশি কার্ডে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৩৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো ও তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলা, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। সপ্তাহজুড়েই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এই উচ্চমূল্যের আশপাশে অবস্থান করছে, যা গত মঙ্গলবার পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ৭৫ ডলারে উঠেছিল। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগর পর্যন্ত গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ফলে অঞ্চলটিতে জাহাজভাড়া ও বিমাঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে তেল উত্তোলন, জাহাজে পরিবহন এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
উচ্চমূল্য ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাতের প্রভাব, উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্থরতার কারণে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে বিশ্বে তেলের দৈনিক চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৫ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেতে পারে এবং পুরো বছরজুড়েই গড় চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। বিপরীতে চলতি বছর বৈশ্বিক বার্ষিক তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসেই বিশ্বে তেলের বাণিজ্যিক মজুত এক কোটি ব্যারেল কমেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগের তুলনায় প্রায় ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কম। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দাম আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকলেও অর্থনৈতিক শ্লথগতির কারণে জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা কমে গেলে দামের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা সীমিত থাকবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিশ্ববাজারে তেলের এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। যদিও দেশে প্রতি মাসের শুরুতে সরকার নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে থাকে এবং বিশ্ববাজারের দামের তাত্ক্ষণিক প্রতিফলন ঘটে না, তবে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেলে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়াতে হতে পারে। আর স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষির সেচ, গণপরিবহন এবং শিল্প কারখানার পরিচালন ব্যয় একযোগে বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেশের বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তাঁর মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যার কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা কোনো ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এর ফলে বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদে আটকে পড়ার মুখে পড়েছে এবং বিদ্যমান সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, সে বিষয়ে সরকারের নীতিগত রূপরেখায় স্পষ্টতার ঘাটতি রয়েছে। সরকার বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে যে জোর দিচ্ছে তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অতীতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এ ক্ষেত্রে অবিলম্বে সমন্বিত ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতি গ্রহণের তাগিদ দেন এই অর্থনীতিবিদ।