কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে ই-কমার্স খাতে আস্থার সংকট রয়েছে। তা সত্ত্বেও পোক্ত অবকাঠামো ও জনসংখ্যায় তারুণ্যের প্রাধান্যে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এই খাত প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে রোববার বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম আয়োজিত বাংলাদেশ ই-কমার্স সামিটের দ্বিতীয় অধিবেশনের একটি প্যানেল আলোচনায় এমন অভিমত জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।
দ্য ই-কমার্স ওয়ে প্লেথোরা অব অপরচুনিটিজ ওয়েটিং টু বি ডিসকাভারড শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, ‘এক দশকে বাংলাদেশের ই-কমার্স প্রত্যাশা পূরণের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও সাম্প্রতিক সময়ের ই-কমার্স স্ক্যাম ইত্যাদি কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ডেলিগ্রামের সাবেক সিইও ওয়াইজ রাহিমের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য রাখেন চালডালের সিইও ও কো ফাউন্ডার ওয়াসিম আলীম, দারাজের সিইও তাসফিন আলম, সেবার সিইও ইমতিয়াজ হালিম ও এটুআইএর হেড অব ই-কমার্স রেজওয়ানুল হক জামি।
চালডালের ওয়াসিম আলীম বলেন, ‘গত এক দশকে ই-কমার্স অবকাঠামো তৈরি হলেও, প্রত্যাশিত গ্রোথ নেই। দারাজের সিইও বলেন, ২০৩০ সাল নয়, তার আগেই ই-কমার্স খাত তার প্রত্যাশিত সাফল্য পাবে।
সেবার সিইও ইমতিয়াজ হালিম বলেন, ‘সাধারণ বাজারে যে পণ্যটা পাওয়া যায় না, সেটা খুঁজতে আমি দারাজে যাই। চালডালে যাচ্ছি ভালো মানের ফল কিনতে। ই-কমার্স যদি সাধারণ বাজারের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করতে না পারে তাহলে মানুষ ই-কমার্সমুখী হবে না। কনভিনিয়েন্স, বেটার প্রাইস ও এক্সসেস টু ব্র্যান্ড- এই তিনটা জিনিস ই-কমার্সকে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ই-কমার্স প্রত্যাশিত সাফল্য পাবে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্সে বড় ধরনের গ্রোথ হবে, এটা নিশ্চিত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থা নীতিগত সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।
এটুআইএর রেজওয়ানুল হক জামি বলেন, ই-কমার্সে আস্থার সংকট রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স স্ক্যাম হয়েছে। তারপরও ই-কমার্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি মানুষ। গ্রাহকের মাইন্ডসেট ও চাহিদা যারা দ্রুত পূরণ করতে পারবে তারাই এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘২০৩০ সাল নাগাদ ই-কমার্সের বাজার ১০ থেকে ১০০ গুণ বাড়বে বলে আশা করি। আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। যেখানে আমাদের অর্থের বিনিময় হবে স্মার্ট। এ খাতে সরকার নীতিগত সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।’
আধুনিক যুগের জন্য ই-কমার্সকে নতুন ভাবে গড়ে তোলার মূলমন্ত্র নিয়ে সামিটে ৪টি কি-নোট সেশন, ৩টি প্যানেল আলোচনা, ২টি ইনসাইট সেশন, ২টি কেস স্টাডি এবং ১টি পলিসি ডায়ালগ দিনব্যাপী সামিটে অনুষ্ঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞ আলোচকরা উন্নয়নশীল প্রযুক্তি, জালিয়াতি নিরাপত্তা, ভোক্তা পুনরাবৃত্তি, লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট, পেমেন্টসহ ই-কমার্স সম্পৃক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন এই আয়োজনে।
সামিটটির দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শমী কায়সার। তার বক্তব্যে উঠে আসে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধিসহ বাংলাদেশ ই-কমার্স সামিট আয়োজনটির প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা।
বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম সম্মেলনের স্বাগত বক্তৃতায় বলেন, ই-কমার্স একটি দ্রুত অগ্রগতিশীল খাত। প্রতিবছরই আমরা এই খাতে অনেক আধুনিক উদ্ভাবন ও অনুশীলন লক্ষ্য করেছি। তাই, এসব পরিবর্তন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের দায়িত্ব। এই সম্মেলনটি ই-কমার্স খাতকে অভিনব যাবতীয় পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার সূচকের ওঠানামার মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন কমলেও অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেড়েছে। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এতথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার ডিএসই প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১০৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে যথাক্রমে ১০২৭ ও ১৯৬৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এ দিন ডিএসইতে ৬০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ৬৪ কোটি টাকার লেনদেন কমেছে। আগের দিন ডিএসইতে ৬৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছিল।
বুধবার ডিএসইতে ৩৮৯টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের লেনদেন হয়েছে।
এগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩৬টি কোম্পানির, কমেছে ১৯২টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬১টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর।
এ দিন লেনদেনের শীর্ষে থাকা ১০ প্রতিষ্ঠান হলো—ওরিয়ন ইনফিউশন, স্কয়ার ফার্মা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, রূপালী লাইফ, চাটার্ড লাইফ, প্রগতি লাইফ, বেক্সিমকো ফার্মা, খান ব্রাদার্স ও সামিট পোর্ট।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১৪ হাজার ২৩৫ পয়েন্টে। বুধবার সিএসইতে হাতবদল হওয়া ১৯৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৮৬টির, কমেছে ৯১টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির কোম্পানির শেয়ার দর।
এ দিন সিএসইতে ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। যা আগের দিনের চেয়ে ২ কোটি টাকার লেনদেন বেড়েছে। আগের দিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছিল।
বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার বা ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রামে একটি উচ্চপর্যায়ের পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারস অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ (এইসিওবিবি)-এর যৌথ উদ্যোগে চিটাগাং ক্লাব লিমিটেড মিলনায়তনে এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপটি আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানে দেশের ব্যাংকিং খাত, কাস্টমস, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএফআইইউর ভারপ্রাপ্ত প্রধান মো. মফিজুর রহমান খান চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন বিএফআইইউর পরিচালক মো. মোস্তাকুর রহমান। দিনব্যাপী আয়োজিত এই পলিসি ডায়ালগে দুটি পৃথক প্যানেল আলোচনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। প্রথম প্যানেল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশে ট্রেড বেইজড মানি লন্ডারিং—ব্যাংকিং ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কমপ্লায়েন্স চ্যালেঞ্জ। এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন বিএফআইইউর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিজেই। আলোচনায় বক্তারা টিবিএমএল-এর পরিবর্তিত ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশনস প্রতিপালন এবং ট্রেড ফাইন্যান্স পর্যবেক্ষণের বিদ্যমান ঘাটতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা উন্নত সিডিডি ও কেওয়াইসি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া প্যানেলিস্টরা অর্থপাচার রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক অ্যানোমালি ডিটেকশন, ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান গ্রহণের প্রতি বিশেষ জোর দেন।
দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল টিবিএমএল প্রতিরোধে গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাক্টিসেস বা আন্তর্জাতিক সেরা চর্চা—সমন্বিত উদ্যোগ ও আগামী দিনের করণীয়। এই পর্বে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত স্যাংশন স্ক্রিনিং, আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময় বা ক্রস-বর্ডার ইনফরমেশন শেয়ারিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তারা ট্রেড-ভিত্তিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগুলো দেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএফআইইউর ভারপ্রাপ্ত প্রধান মো. মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই দেশে আরও শক্তিশালী, টেকসই ও দায়িত্বশীল কমপ্লায়েন্স কালচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারীরা টিবিএমএল প্রতিরোধে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সমাপনী বক্তব্যে বিএফআইইউ নেতৃত্ব অ্যান্টি মানি লন্ডারিং (এএমএল) ও কমব্যাটিং ফিন্যান্সিং অব টেররিজম (সিএফটি) প্রতিপালন জোরদার করার পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিনীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১১৯তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামক দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়ে ইতোমধ্যে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে।
এর আগে সূত্র জানিয়েছিল, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের কী দায়িত্বপালন করবে, কোন ধরনের কর্মকর্তা দায়িত্বপালন করবেন- এসব বিষয়ে অনুমোদনের পর বিভাগ দুটিতে কর্মকর্তাদের পদায়ন শুরু হবে।
২০২৫ সালের মে মাসে সরকার এনবিআরকে ভেঙে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠন করেছে, যার উদ্দেশ্য কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নীতি প্রণয়ন করবে রাজস্ব নীতি বিভাগ আর তা প্রয়োগ ও আদায় করবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
রাজস্ব নীতি বিভাগের প্রধান দায়িত্ব হলো কর আইন প্রণয়ন, কর হার নির্ধারণ করা। এছাড়া আন্তর্জাতিক কর চুক্তি তত্ত্বাবধান, কর ফাঁকি রোধে নীতিমালা তৈরি, কর ফাঁকি ও কর ফাঁকির প্রবণতা মূল্যায়নও এ বিভাগের দায়িত্ব।
অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্ব আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক আদায় ও প্রয়োগ, কর আদায় সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা ও নিরীক্ষা করা। এনবিআরের বর্তমান জনবল এই বিভাগে স্থানান্তরিত হবে।
দেশের বাজারে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে স্বর্ণের দাম আবার বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনায় ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ টাকা। এর মাধ্যমে ফের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় উঠলো মূল্যবান এ ধাতুটির দাম।
স্থানীয় বাজারে তেজাবী স্বর্ণের (পাকা সোনা) দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ দাম বাড়ানো হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠক করে এ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এর আগে গত সোমবার ঘোষণা দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার থেকে ভালো মানের ১ ভরি স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয় ৪ হাজার ১৯৯ টাকা। তার আগে ১৫ জানুয়ারি ২ হাজার ৬২৫ টাকা, ১৩ জানুয়ারি ৪ হাজার ১৯৯ টাকা এবং ১১ জানুয়ারি ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানো হয়। অর্থাৎ, ৫ দফায় ভালো মানের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম বাড়ানো হলো ১৭ হাজার ৩২২ টাকা। এতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সোনার সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হলো।
এতোদিন ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকা। গতকাল মঙ্গলবার এ দাম নির্ধারণ করা হয়। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে এখন নতুন রেকর্ড তৈরি হলো।
এখন সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনায় ৪ হাজার ৩১৬ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৪৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনায় ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২১ টাকা।
সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন বাড়লেও অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কমেছে। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার ডিএসই প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ১০৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে যথাক্রমে ১০৩০ ও ১৯৭০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এদিন ডিএসইতে ৬৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ৭৬ কোটি টাকার লেনদেন বেড়েছে। আগেরদিন ডিএসইতে ৫৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছিল।
মঙ্গলবার ডিএসইতে ৩৮৮টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ২১০টি কোম্পানির, কমেছে ১০৯টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৯টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ৪৩ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১৪ হাজার ২৪২ পয়েন্টে। এদিন সিএসইতে হাত বদল হওয়া ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ১০২টির, কমেছে ৫৫টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৫টির কোম্পানির শেয়ার দর।
মঙ্গলবার সিএসইতে ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। যা আগের দিনের চেয়ে ১ কোটি টাকার লেনদেন কমেছে। আগের দিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১২ কোটি ৩৩ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এফবিসিসিআই ও প্রতিযোগিতা কমিশনের মতবিনিময়
ব্যবসা-বাণিজ্যে সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এফবিসিসিআই ও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর এফবিসিসিআই ভবনে ‘প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যাবলি অবহিতকরণ’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন- এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন (সচিব) এ এইচ এম আহসান।
তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা আইনের মূল লক্ষ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করে ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সভার শুরুতে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর উদ্দেশ্য ও কমিশনের কার্যাবলি নিয়ে উপস্থাপনা করেন- কমিশনের সহকারী পরিচালক নুরুদ্দিন জোবায়ের।
মুক্ত আলোচনা পর্বে ব্যবসায়ী নেতারা জেলা পর্যায়সহ তৃণমূলের ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে আইন প্রণয়ন, সংশোধন এবং কমিশনের শুনানি কার্যক্রমে এফবিসিসিআইসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানান তারা।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন- প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার ও ড. আফরোজা বিলকিস, এফবিসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগির, বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ফলের চাহিদা বাড়ছে বিদেশে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রপ্তানি আয়ে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ফল রপ্তানি করে বাংলাদেশ যেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের ফল রপ্তানি আয় প্রায় ১১৬ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং উপপরিচালক (রপ্তানি) মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘কাঁঠাল, আনারসসহ নানা জাতের ফল বাংলাদেশ থেকে নিতে চায় অনেক দেশ। বিদেশে ক্রমেই বাংলাদেশের উৎপাদিত ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নীতি ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক আবু মোখলেস আলমগীর হোসাইন কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ বিষয়ে বাসসকে বলেন, ‘কৃষিপণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের ডেডিকেটেড কোনো কার্গো বিমান নেই। যাত্রীদের বিমানে করে কৃষিপণ্য বহির্বিশ্বে রপ্তানি হয়ে থাকে। শাক-সবজিসহ পচনশীল কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে যে ফ্যাসিলিটেজ প্রয়োজন, সেই ফ্যাসিলিটি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত দেশগুলো কৃষিপণ্যে যে ধরনের স্যানিটাইজেশন মেইন্টেন করে থাকে। আমাদের দেশে এর প্রচুর ঘাটতি আছে। গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিস খুবই প্রয়োজন। কৃষকদের যদি স্যানিটাইজেশন বিষয়ে আরও বেশি বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয় তবে আমাদের কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়বে। ইপিবি রপ্তানিকারকদের অ্যাডভোকেসি করে থাকে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে রপ্তানিকারকদের যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে সে বিষয়ে আমরা নিয়মিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে থাকি।
এ ছাড়া গত দুই বছর কৃষিপণ্যে রপ্তানি আয়ের সূচক নিম্নমুখী থাকলেও এবার তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিপণ্যে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
ইপিবির তথ্যমতে, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষিতে রপ্তানি আয় ছিল যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ২ ও ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এরপর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষিতে রপ্তানি আয় কমে হয় যথাক্রমে ৮২৭ ও ৯৬৪ মিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ গত অর্থবছরে এই আয় বেড়ে হয় ৯৮৮ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলারে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চা থেকে রপ্তানি আয় হয় ৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার। একই অর্থবছরে সবজি থেকে রপ্তানি আয় হয় ৮১ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার। তামাকজাত পণ্যে রপ্তানি আয় ২৫১ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন ডলার। মসলা জাতীয় পণ্যে রপ্তানি আয় ৫৬ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার। ড্রাই ফুডে রপ্তানি আয় ১৮৬ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার। তেল বীজ থেকে রপ্তানি হয় ২৪ দশমিক শূন্য ৬ মিলিয়ন ডলার।
এসব তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, পান পাতার চাহিদাও বহির্বিশ্বে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন ডলারের পান পাতা রপ্তানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ রপ্তানি আয় বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া গত অর্থবছরে উদ্ভিদ চর্বি এবং তেল রপ্তানিতে আয় হয় ১১৮ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন ডলার। চিনি রপ্তানিতে ২০ দশমিক ৮২, পানীয় রপ্তানিতে ৩৫ দশমিক ৪৭, খৈল রপ্তানিতে শূন্য দশমিক ১৩ ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয় ১২১ দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য ১৩০-এর বেশি দেশি রপ্তানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য রপ্তানি হয় ভারতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১১ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে ভারতে। সৌদি আরবে একই অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১১৪ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া আরব আমিরাত, বেলজিয়াম, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বেশি চাহিদা। এসব দেশে গত অর্থবছরে যথাক্রমে রপ্তানি হয়েছে, ৭৪, ৭০, ৫১, ৪১ ও ৪৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। রপ্তানি বাজার বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ওমান, ফিলিপাইন, কাতার, চায়না ও কানাডাতেও বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। যেখানে নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
ফলে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সোয়া ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এনবিআর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৬২ হাজার ২০৯ কোটি ১২ লাখ টাকা।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, গত ছয় মাসে আয়কর খাতে আদায় হয়েছে ৬১ হাজার ৮৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৪০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
অন্যদিকে শুল্ক বা কাস্টমস খাতে ৬৫ হাজার কোটি ৮৫ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৮৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ঘাটতি ১২ হাজার ১৪০ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
আর ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৪৯৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাটে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাট থেকে যথাক্রমে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ, ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
একক মাস হিসেবেও ডিসেম্বরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। আলোচ্য মাসে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ১৯ লাখ ৫ কোটি টাকার রাজস্ব। ডিসেম্বর রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১০.২৫ শতাংশ। এ ছাড়া ডিসেম্বরে ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার শুল্ক, ১২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ও ১৩ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার আয়কর আদায় করে এনবিআর।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে গত ১০ নভেম্বর বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।
দেশের আরও দুই বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) অতিরিক্ত আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। এ ক্ষেত্রে কাট-অফ হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে, গত ১২ জানুয়ারি ১০ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত আরও ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। তার আগে গত ৮ জানুয়ারি ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ২০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ৬ জানুয়ারি ১৪টি ব্যাংক থেকে ২২ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছিল। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
আর সর্বশেষ এসব ক্রয়ের ফলে শুধু চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারির ২০ তারিখ পর্যন্ত) মোট ক্রয়ের পরিমাণ হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার, যা ৩.৮৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, (গতকাল) মঙ্গলবার দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৪৫ মিলিয়ন (৪ কোটি ৫০ লাখ) মার্কিন ডলার ক্রয় করা হয়েছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২.৩০ টাকা এবং কাট-অফ রেটও ১২২.৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
ফলে নতুন বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসে মোট ক্রয় দাঁড়াল ৭৪ কোটি ৩০ লাখ (৭৪৩ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত মোট ক্রয় হয়েছে ৩,৮৭৮.৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। এর অর্থ ঋণের টাকা দিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী করে দেখানো হয়েছিল। এখন আমরা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অর্থ ছাড়াই শক্তিশালী রিজার্ভ গঠনের পথে রয়েছি। বর্তমানে রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, শিগগিরই ৩৫ বিলিয়ন ডলার হবে।
গত সোমবার রাতে গুলশানের পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) আয়োজিত সিস্টেমেটিক এফোর্টস টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইকোনমিক পালস: ইমপোর্টেন্স অব পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, এখন আমাদের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ফরেন এক্সচেঞ্জ রেট শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। মানি মার্কেট এখন ভালো সময় অতিবাহিত করছে। ডিসেম্বরে আমানত ৬ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারি মাসের ১৮ দিনে রেমিট্যান্সে ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে।
পিএমআই সূচকের বিষয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের রিয়েল টাইম ডাটার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কাজটি সহজ করেছে পিএমআই। যদিও পিএমআই সূচকটি আমাদের দেশে নতুন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান বলেন, বাংলাদেশে রপ্তানি খাতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে আমাদের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। পোশাকশিল্পে আমরা আরও বেশি বিনিয়োগ করব।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ।
তিনি বলেন, ইনডেক্স (সূচক) দিয়ে কোনো কিছুর বর্তমান অবস্থান জানা যায়। পিএমআইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান যে কেউ জানতে পারে। এতে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জেনে বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। সরকারি ডাটা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে না। কিন্তু পিএমআইয়ের ডাটা সবার জন্য উন্মুক্ত; যা দেশের সক্ষমতা ও বর্তমান অবস্থার স্পষ্ট জানান দেয়।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআই চেয়ারম্যান কামরান তানভিরুর রহমান।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ধরনের সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো। তবে তৈরি পোশাক প্রস্ততকারকদের শঙ্কা, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ও দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার চেয়েছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। সোমাবার (১৯ জানুয়ারি) ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ‘যদিও পোশাক রপ্তানিকারীরাই বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা, তারপরও এ রকম স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন আমাদের মতামত পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।’
সেলিম রহমান আরও বলেন, এই একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানিতে এ–জাতীয় রক্ষণশীল শুল্ক আরোপের আগে অবশ্যই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের গুরুতর ক্ষতি হচ্ছি, সেটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং নীতিগতভাবে চরম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
মূলত দেশীয় সুতাকলগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকার এই বন্ড–সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে সেলিম রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে স্পিনিং মিলগুলোর জন্য শুল্কের কৃত্রিম ‘সুরক্ষা’ নয়, বরং প্রয়োজন নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার আধুনিকায়ন। বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে সরকার তাদের সরাসরি প্রণোদনা দিতে পারে, কিংবা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারে।’
সেলিম রহমানের শঙ্কা, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে ২০২৫- ২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে। শুধু ডিসেম্বর মাসে কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর ওপর উচ্চ দামে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেবেন। এতে প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতি হবে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের আরও দাবি: বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক না বসিয়ে তাদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্য যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদনকারীদের করপোরেট কর রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি শিহাব উদদৌজা চৌধুরী, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রমুখ।
দেশে চলমান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র সরবরাহ সংকট নিরসনে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি। সরকার থেকে সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান রোববার রাতে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এই আমদানি প্রক্রিয়া সরকার থেকে সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বাজারে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম স্থিতিশীল রাখা। ইতিমধ্যেই বিপিসির চেয়ারম্যানকে প্রক্রিয়াটি দ্রুত শুরু করার জন্য মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এলপিজির প্রকট সংকট দেখা দিলে গত ১০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল বিপিসি। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে কোনো কারণে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে বা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে সরকারের পক্ষে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকারিভাবে বাজারে হস্তক্ষেপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকায় ভোক্তারা ভোগান্তির শিকার হন।
বিপিসির সেই আবেদনের যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই সরকার শেষ পর্যন্ত এলপিজি আমদানির অনুমতি প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি শুরু হলে বাজারে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া আধিপত্য কমবে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে করে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং কৃত্রিম সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে একটি কার্যকর হাতিয়ার থাকবে।
বছর ঘুরে আবারও দোরগোড়ায় চলে এসেছে শবে বরাত ও রমজান মাস। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত ও ১৭ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে শবে বরাত আসতে বাকি ১৭ দিন, আর রোজা আসতে বাকি ঠিক এক মাস। প্রতি বছর রোজা ও শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুদের উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। গত ৪ থেকে ৫ মাস ধরে পণ্য মজুদের তোড়জোড় চলছে। ইতোমধ্যেই অনেক পণ্য চলে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে, কিছু আছে পাইপলাইনে। তবে এবার রোজার আগে ভোক্তাকে ভোগাতে পারে ৫ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ, আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি ভালো হলেও শবে বরাত ও রোজার আগে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেন। এবার যে পাঁচ ধরনের পণ্য ভোক্তাকে ভোগাতে পারে তার মধ্যে আছে- ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুর এবং সবজি। এর মধ্যে সবজি বাদে বাকি চার পণ্যই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিগত চার-পাঁচ মাসে পেঁয়াজ আমদানি কম হলেও ভোজ্য তেল, চিনি এবং খেজুর আমদানি বেড়েছে এবং মজুদ পরিস্থিতিও খারাপ না। তবু এসব পণ্যের দাম ঠিকই বেড়ে যাবে রোজার আগে। এই পাঁচ পণ্যের বাইরে মুরগি, মাছ, গরুর মাংস, ছোলা এবং বেসনের দামও বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে রোজার আগ দিয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, শবে বরাত-রোজার মতো বড় উপলক্ষ এলেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেট করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে কষ্ট দেন ভোক্তাকে। এ মন্তব্য করে বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা নিজেদের মুনাফা ছাড়া আর কিছুই চেনে না। রোজার মাস ঘিরে তারা সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে বাড়তি মুনাফা লুফে নেওয়ার জন্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না, বরং এবার বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কেননা সামনে নির্বাচন, সরকারসহ সবার নজর এখন নির্বাচনের দিকে। বাজারের ভোগ্যপণ্যের দিকে কারও তেমন নজর নেই। তা ছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে নতুন সরকার এসেই বাজার সামাল দিতে পারবে না। তাই এবার রোজায় দেশের মানুষকে আরও বেশি ভুগতে হতে পারে ভোগ্যপণ্য নিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে বিগত সরকারের মতো একই পন্থায় কাজ চলছে এখনো। পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকে না সরকারের হাতে, এতে এক রকম সংকট দেখা দেয়। প্রতি বছরই দেখা যায় শবে বরাতের আগ পর্যন্ত গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু বেড়ে যায় শবে বরাতের আগে। এখন বাজারে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় গরুর মাংস পাওয়া যাচ্ছে, শবে বরাতের আগে বেড়ে ৮৫০ টাকা কেজি হবে না- এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না। তাই সরকারের উচিত ভোটের পাশাপাশি বাজারের দিকেও নজর দেওয়া।
অন্যদিকে এনবিআর ও চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, এ বছর আমদানি নির্ভর ৬ পণ্যের আমদানি পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। গত বছরের রোজার আগের পাঁচ-ছয় মাস আগ দিয়ে এসব পণ্য যে হারে আমদানি হয়েছিল, এ বছর আমদানি পরিস্থিতি তার চেয়ে ভালো। পণ্য আমদানি বেশি হলে তো পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা না। অথচ বিগত সরকারের আমলেও দেখা গেছে পণ্য পর্যাপ্ত আমদানি হলেও শবে বরাত ও রোজার আগ দিয়ে ঠিকই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে পণ্যমূল্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও আগের সরকারের পথেই হাঁটছে। পণ্য মূল্য কমাতে বা বাজার নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এই সরকারকে।
বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে রোজা ও শবে বরাতে মূলত চিনি, ভোজ্য তেল, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ ও গরুর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে গরুর মাংসের জোগান প্রায় শতভাগই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই মেটানো হয়। বাকি ছয় পণ্য আমদানিতে প্রায় ছয় মাস আগে থেকে আমদানির প্রস্তুতি নিতে হয়। ডলার সংকট এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা থাকলেও এবারও এসব পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত বছরের চেয়ে পণ্য আমদানি পরিস্থিতি বেশ ভালো এবার।
পণ্য আমদানি পরিস্থিতি : সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল ও খেজুরের মতো পণ্য বেশি পরিমাণে আমদানি করতে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেকটাই বেড়েছে। তথ্য বলছে, এ সময় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে। মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, এডিবল অয়েল লিমিটেড ও টিকে গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভোজ্যতেল ও চিনির প্রধান আমদানিকারক।
অন্যদিকে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল ও ছোলাজাতীয় পণ্য আমদানি করে বেসরকারি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক গ্রুপগুলো। কারণ দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মেটায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৪ টন। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪৪৬ টন।
অন্য নিত্যপণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৫০ হাজার ৩৫৫ টনের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ হাজার ৯১২ টন। ছোলার এলসি ৪২ হাজার ৮৯১ টন থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার ৫১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। গত দুই মাস নভেম্বর-ডিসেম্বরেও প্রায় একই হারে এলসি খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আমদানিকারক ও ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার আগেভাগেই চিনিসহ ছয় ধরনের পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার বেড়েছে। কারণ রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা সাধারণত অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য আগেভাগেই পণ্যগুলো আমদানির ঋণপত্র খোলা বাড়িয়েছেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি শুরু করেছেন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, খেজুর, মটর ডাল ও চিনির চাহিদা রমজানে বেড়ে যায়। বছরজুড়ে দেশে ছোলার চাহিদা থাকে দেড় লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজানে পণ্যটির চাহিদা থাকে ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পণ্যটি ৬০-৬২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে আমদানি খরচসহ অন্য খরচ মিলিয়ে পাইকারিতে ৭০-৭৫ টাকায় ক্রেতারা কিনতে পারবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খেজুর আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ টন, মসুর ডাল ৪০ হাজার ২৬ টন, মটর ডাল (সব ধরনের) ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৯ টন ও ছোলা ১১ হাজার ৬২৪ টন।
চিনির বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, আগে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মিলমালিকরা। তারাই ইচ্ছামতো দাম বাড়াতেন এবং কমাতেন। এসব মিলমালিক ছাড়া অন্য কেউ চিনি আমদানি করতে পারতেন না। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিনি আমদানি উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। যে কারণে নতুন করে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি করছেন। সে কারণে এবার চিনির দাম না বাড়ার কথা, কিন্তু রোজার আগে ঠিকই বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, পণ্যের আমদানি ভালো হলেও ডলারের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণপত্র খোলা নিয়ে নানান জটিলতার কারণে সার্বিকভাবে পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামেও সেটির প্রভাব দেখা যাবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাজার ব্যবস্থায় প্রত্যেকটা পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের জানা নেই। কে কতটুকু আমদানি করছেন, কে কত পরিমাণে এবং কত টাকায় বিক্রি করছেন, তারও কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই। এই দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজারের দীর্ঘকালীন এই সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি দীর্ঘময়াদি বা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে।