সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
দেশে নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল ও প্লাস্টিক কার্ডভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পাশাপাশি কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে যেখানে দেশে সব মিলিয়ে কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তা ৯৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে মাসিক মোট লেনদেন ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
কার্ডের ধরনভেদে প্রবৃদ্ধিতেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৩৬ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বাড়লেও সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার, যার প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এই লেনদেনের ৫০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা সুপারশপে; এছাড়া ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, এটিএম থেকে নগদ উত্তোলন, ফার্মেসিতে ওষুধের বিল ও পোশাকের দোকানেও উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কার্ডের ব্যবহার সম্প্রসারিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই মাসে বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে অবস্থানকালে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেনের মাধ্যমে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। অন্যদিকে বিদেশি পর্যটক ও নাগরিকেরা বাংলাদেশে এসে আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৪টি লেনদেনে মোট ২৩৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন, সরকারি সেবা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে কার্ডের এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এই অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, কার্ড জালিয়াতি, ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আর্থিক শিক্ষার ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা জরুরি। প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ও গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের পরিধি ভবিষ্যতে আরও প্রসারিত হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ফ্যামিলি কার্ডধারী নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের লক্ষ্যে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে মোট ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নিয়মিত বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই ক্রয় প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, টিসিবির মাধ্যমে বিতরণের জন্য স্থানীয়ভাবে জাতীয় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এই মসুর ডাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয় এবং কারিগরি মূল্যায়ন শেষে তিনটি প্রস্তাবই যোগ্য বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান খুলনার ‘জয়তুন অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেড’ থেকে এই ডাল কেনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, টিসিবির নির্ধারিত গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম ধরা হয়েছে ৭৬ টাকা ৭৯ পয়সা, যার ফলে প্রতি মেট্রিক টনের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ৭৯০ টাকা। ১০ হাজার টন ডাল ক্রয়ে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং এই আর্থিক বরাদ্দের বিপরীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাউন্টার গ্যারান্টি প্রদান করা হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির মাধ্যমে মোট ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর আগে অর্থবছরের শুরুতে ১৭ হাজার ৫২৮ টন মসুর ডাল কেনা হয়েছিল। নতুন এই ১০ হাজার টন যুক্ত হওয়ার ফলে চলতি অর্থবছরে টিসিবির সংগৃহীত মোট মসুর ডালের পরিমাণ দাঁড়াল ২৭ হাজার ৫২৮ টনে; যা নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে নিয়মিত সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সহায়ক হবে।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত দেশে কোনো তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে। তবে চলমান এই সংকটের প্রকৃত আর্থিক ও উৎপাদনজনিত প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যাবে না, এর প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হতে অন্তত আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
পোশাকশিল্পের বাস্তবতা তুলে ধরে বিজিএমইএ সভাপতি জানান, কোনো কারখানায় তাৎক্ষণিকভাবে সংকট তৈরি হলেও তা এক দিনে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। পাইপলাইনে থাকা ক্রয়াদেশ শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ব্যাংকের আর্থিক দায়দেনা মেটানোর মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়ায় প্রায় ছয় মাসের দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। তিনি জানান, গ্যাস সংকট চলাকালে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং ও ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার কর্মদিবসের জায়গায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে অতিরিক্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত কারখানা চালু রাখতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে সম্প্রতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা কার্যকর হওয়ায় কারখানাগুলোতে স্বস্তি ফিরছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ টেকসই রাখতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিজিএমইএ সভাপতি জানান, এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছে; যা বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি সমস্যার বড় ধরনের সমাধান সম্ভব। এছাড়া কারখানায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে অর্থ ফেরত আসা এবং উচ্চ সুদের হার বড় প্রতিবন্ধকতা হওয়ায় এ খাতে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ বা সবুজ অর্থায়নের সুবিধা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের বিষয়ে মাহমুদ হাসান খান জানান, গত এক দশক ধরে প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন গন্তব্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর ধারাবাহিক উদ্যোগ চলছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের মোট পোশাক রপ্তানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার বাইরের নতুন বাজারগুলো থেকেই আসছে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অংশীদার তৈরি করতে হংকংয়ে এইচএসবিসির উদ্যোগে আয়োজিতব্য আসন্ন রোডশোতে নতুন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
চলতি বছরের বাকি সাড়ে তিন মাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রায় ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক ও পেট্রো চায়না এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি থেকে সরাসরি সরকার টু সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় এসব জ্বালানি কেনা হবে। বুধবার অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল ছাড়াও একই সময়ের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরাসরি প্রক্রিয়ায় আরও ৬ লাখ ৯৫ হাজার টন গ্যাস ওয়েল এবং জেট ফুয়েল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাধারণত মোট জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে জিটুজি এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৫০:৫০ অনুপাতে কেনার যে নির্ধারিত শর্ত ছিল, জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের বৈঠকে তা শিথিল করে জিটুজি চুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এর আগেও জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র ছাড়া জ্বালানি আমদানির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি দরপত্র ছাড়াই ১৮ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া গত আগস্ট মাসে দুই দফায় মোট ২২ কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছিল; যার মধ্যে ১৯ আগস্ট সাতটি কোম্পানি থেকে ১৪টি কার্গো এবং ৬ আগস্ট ৮ কার্গো এলএনজির পাশাপাশি আপৎকালীন চাহিদা মেটাতে ৫ হাজার টন এলপিজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ছয় মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে বাড়তি ব্যয়ে এবং কখনো কখনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সরাসরি তেল ও গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ২৭ দেশের এই জোটে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোর পোশাক রপ্তানি হয়েছে; যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের এই হার সর্বোচ্চ। অথচ একই সময়ে বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও প্রধান দুই প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের রপ্তানি ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং চীনের রপ্তানি ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউয়ের মোট পোশাক আমদানি ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। শীর্ষ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের রপ্তানি ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, ভারতের ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১২ দশমিক ১২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ, মরক্কোর ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার রপ্তানি ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ চীন ও ভিয়েতনাম ছাড়া বাকি সব দেশেরই রপ্তানি কমলেও ইউরোপের ক্রেতারা সামগ্রিক গড় হ্রাসের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি হারে তৈরি পোশাক কেনা কমিয়েছে।
মূল্যের পাশাপাশি রপ্তানির পরিমাণ এবং প্রতি কেজির গড় দরেও বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ ৭৫ কোটি ১৯ লাখ কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা পরিমাণের দিক থেকে আগের বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। অন্যদিকে চীন ৮১ কোটি ৬২ লাখ কেজি পোশাক রপ্তানি করে তাদের সরবরাহ ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। এছাড়া ইউরোপের বাজারে চীনের প্রতি কেজি পোশাকের গড় দর ২০ দশমিক ২০ ইউরো হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩ দশমিক ৮০ ইউরোতে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে নেমেছে, যদিও সেখানে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক একাধিক কারণকে দায়ী করছেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, দেশের ভেতরের তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির পাশাপাশি ইউরোপের বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা হ্রাস, চীনের আগ্রাসী বিপণন এবং ভারতের সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রভাবে ক্রয়াদেশ অন্যত্র সরে যাচ্ছে। তবে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল উল্লেখ করেছেন, বছরের প্রথম পাঁচ মাসের তুলনায় জুন ও জুলাইয়ে রপ্তানি হ্রাসের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে, যা পরবর্তী মাসগুলোতে পুনরুদ্ধারের কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তীব্র জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশে টানা পাঁচ মাস ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে, যা আগের মাস জুনে ছিল দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগে মে মাসে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বর্তমান অর্জনের হার অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর দেশে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বেসরকারি ঋণের চাহিদা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা ছিল। তবে নির্বাচনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস এবং তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম জানান, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্পে যাচ্ছেন না; তবে আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে ধারাবাহিক স্থবিরতা দেখা গেছে। এই সময়ে অধিকাংশ শিল্পোদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণ না করে বরং উৎপাদন কমিয়েছেন; এমনকি চলমান অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উল্লেখ করেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি মূলত চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না থাকায় শিল্পমালিকদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ বা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার আগ্রহ নেই।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চাহিদার ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণেও ঋণ সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান জানান, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণের বড় চাপে রয়েছে। ফলে মূলধন সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং তহবিল নিরাপদ রাখতে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গ্যাস সংকট যুক্ত হয়ে বেসরকারি খাতের সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে রেখেছে।
চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আবহাওয়াজনিত সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্যবাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসির বরাতে হংকংভিত্তিক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ফুতুবুল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার বর্তমানে সরবরাহ ঘাটতি ও বাড়তি চাহিদার ‘সুপার স্কুইজ’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের গড় মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এইচএসবিসি। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের সম্ভাব্য পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পূর্বাভাসও আগের তুলনায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।
এইচএসবিসির গ্লোবাল কমোডিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ব্লক্সহ্যাম জানিয়েছেন, ইরান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও এল নিনোর মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে; অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতায় সামগ্রিক পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে পঞ্চম বছরে পদার্পণ করা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল ও খাদ্যশস্যসহ কৃষিপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাইরেও সালফার, রাসায়নিক সার, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম, উড়োজাহাজের জ্বালানি ও ন্যাফথার মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাপ্যতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং ধাতু, রাসায়নিক ও কৃষি খাতের পণ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্লুমবার্গ কমোডিটি সূচক চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে মোট ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক মজুদের সুরক্ষা স্তর দ্রুত কমে আসায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ‘ককলস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ব পণ্যবাজার বর্তমানে একটি শক্তিশালী ‘সুপার বুল’ ধারায় রয়েছে; যার ফলে যেকোনো নতুন সরবরাহ বিঘ্ন পণ্যমূল্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সামগ্রিক সরবরাহ ঘাটতি ও এআই অবকাঠামো নির্মাণের বাড়তি চাহিদার কারণে পণ্যবাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ সাধারণ অর্থনৈতিক চক্রের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তিন সপ্তাহের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে যাওয়ার পর আবারও তামার দামে কিছুটা উত্থান দেখা গেছে। গতকাল লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি তামার দাম দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ১৪ হাজার ১৫৮ ডলারে উন্নীত হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার ধাতুটির দাম ১৩ হাজার ৯২৬ ডলারে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এই ধাতুটির সর্বনিম্ন মূল্য।
লন্ডনের পাশাপাশি চীনের বাজারেও তামার দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। চীনের সাংহাই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া তামার চুক্তিমূল্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ১ লাখ ৭ হাজার ৬১০ ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। মূলত চীনে তামার চাহিদা বৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক লক্ষণ বাজারে এমন প্রভাব ফেলেছে। দেশটিতে আমদানি করা তামার চাহিদার অন্যতম নির্দেশক ‘ইয়াংশান কপার প্রিমিয়াম’ গত মঙ্গলবার বেড়ে প্রতি টন ১১০ ডলারে উঠেছে, যা আগস্ট মাসের শুরুর দিকের পর সর্বোচ্চ।
তবে তামার বাজারে এই সামান্য উত্থান দেখা গেলেও বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনো এক ধরনের সতর্কতা বিরাজ করছে। এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) কর্তৃক নতুন করে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর হওয়ায় বর্তমানে ফেডের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ফেডারেল রিজার্ভ যদি সত্যিই সুদহার বাড়ায়, তবে তা সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে শিল্প ধাতু হিসেবে বিশ্বজুড়ে তামার চাহিদাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বর্তমান বাজারে তামার দাম কিছুটা বাড়লেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক শিল্পের চাহিদার ওপর।
চীনের অর্থনীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এখন একটি স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত দেশটির আবাসন খাত ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ায় ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পাশাপাশি নতুন শিল্প খাতগুলোর ঋণের চাহিদাও এই বিশাল ঘাটতি পুরোপুরি মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার (পিবিওসি) গভর্নর প্যান গংশেং সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দেশটির অর্থনীতির বর্তমান এই চিত্র তুলে ধরেছেন।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাময়িকী ‘কিউশি’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পিবিওসির গভর্নর এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি মূলত চীনের উন্নত মানের অর্থনীতি তৈরির দিকে অগ্রসর হওয়ারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাই মাসে চীনে নতুন ঋণগ্রহণের পরিমাণ রেকর্ড হারে কমে যায়। আগস্ট মাসে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশ কম ছিল। বিশেষ করে পরিবার ও ব্যবসা খাতগুলোতে ঋণগ্রহণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও এখন চাপের মুখে রয়েছে।
প্যান গংশেং জানান, চীনের অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটার ফলেই ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে জমে থাকা বকেয়া ঋণের মোট পরিমাণ ২৮০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি। এর একটি বড় অংশই আবাসন খাত ও স্থানীয় সরকারের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এসব খাত এখন সংকুচিত হওয়ায় সেখানে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। ফলে আগের মতো দ্রুতগতিতে সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি এখন যেমন কঠিন, তেমনি এর কোনো বাস্তব প্রয়োজনীয়তাও নেই।
অন্যদিকে, চীনের অর্থনীতিতে বর্তমানে উচ্চ প্রযুক্তি উৎপাদন ও সবুজ প্রযুক্তির মতো খাতগুলো দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এসব আধুনিক খাতের অবদান ছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি। তবে এসব নতুন ব্যবসা জমি বা বিশাল কারখানার চেয়ে প্রযুক্তি, তথ্য ও মেধাস্বত্বের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যাংক ঋণের ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলক কম, যার ফলে আবাসন খাতের সৃষ্ট ঋণের বিশাল ঘাটতি তারা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
জাপানের অর্থনীতিতে টানা চতুর্থ মাসের মতো বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটিতে রফতানি আয়ের পরিমাণ বাড়লেও তার চেয়ে বেশি হারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বাণিজ্য ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মূলত বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং নিজস্ব মুদ্রার মানের অবনতিই এই ধারাবাহিক ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, গত আগস্ট মাসে দেশটির মোট রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৬ হাজার ৪৭০ কোটির সমান। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রফতানি আয় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু রফতানি বাড়লেও একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।
রফতানির চেয়ে আমদানির হার বেশি হওয়ায় আগস্ট মাসে জাপানের মোট বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের চড়া দাম এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান কমে যাওয়ার কারণেই দেশটির আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলেই রফতানি বাড়ার পরও বিশাল এই বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে জাপানকে।
তবে সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যেও জাপানের প্রযুক্তি পণ্য রফতানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী চিপ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যাপক চাহিদার কারণে জাপানের সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী সম্পর্কিত পণ্যের রফতানি ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এই সময়ে দেশটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতির রফতানিও বেড়েছে প্রায় ৪০ দশমিক ১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের মুখে বুধবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে অস্থির ও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের পর এই প্রথম ফেড নতুন করে সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সামান্য নিম্নমুখী হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তিও কাজ করছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও সুদের হার বৃদ্ধির নতুন আশঙ্কায় সেই অগ্রগতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইমিংয়ে জ্যাকসন হোল সম্মেলনে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকেই এ সম্ভাবনা জোরালো হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে শক্তিশালী কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য উঠে আসায় বাজারে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন ৯০ শতাংশের বেশিতে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি চড়া থাকার আশঙ্কায় চলতি সপ্তাহে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৫ শতাংশের ওপরে উঠেছে, যা ২০০৭ সালের পর অর্থাৎ ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আগে আর দেখা যায়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন ফেডের নীতিনির্ধারণী কমিটির ১২ জন সদস্যের ভোটের ফলাফলের ওপর। ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ম্যাট ওয়েলার জানান, নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তিনজন বা তার বেশি সদস্য যদি সুদের হার বাড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নেন, তবে বাজার এটিকে ধারাবাহিক সুদের হার বৃদ্ধির সূচনা না ভেবে একটি সাময়িক ‘বীমামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তবে ফেড চেয়ারম্যানের বিরোধিতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় কমিটির সদস্যরা একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও এক দফা সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়ে উঠবে।
ওয়াল স্ট্রিট ও ইউরোপের শেয়ারবাজারের দরপতনের পর এশিয়ার প্রধান প্রধান সূচকগুলোতেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর পাশাপাশি শীর্ষ এআই উদ্যোক্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উন্নয়নের গতি শ্লথ করার আহ্বানের কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাবে বুধবার টোকিও, সাংহাই, সিডনি ও ম্যানিলার শেয়ারবাজারে সূচকের পতন হয়েছে; তবে হংকং, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, তাইপে ও জাকার্তার বাজারে সূচক কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সিউলের বাজার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল।
ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার ও ঋণ আদায়ে জোরদার উদ্যোগের ফলে গত নয় মাসে দেশে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) অনুপাত প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুন শেষে ২ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। তবে অনুপাত কমলেও খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ এখনো বেশ চড়া। গত বছরের সেপ্টেম্বরের ৬ লাখ ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার বিপরীতে চলতি বছরের জুন শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ব্যাংকিং খাতের গোপন থাকা বা কৃত্রিমভাবে আড়াল করা ঋণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ হ্রাসে এককালীন প্রস্থান নীতি এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব নীতিগত উদ্যোগের সুফল অর্থনীতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হলে খেলাপি ঋণের অনুপাত পর্যায়ক্রমে আরও কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাতের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকাশিত তথ্যে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি আসত না। ২০০৮ সালে খেলাপি ঋণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা দেখানো হয়, যদিও শ্বেতপত্রে প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা বলে উঠে আসে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও ব্যাংকিং সংকট উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারের বিকল্প নেই এবং এ জন্য খেলাপি ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম চিহ্নিত করে ব্যাংকের হিসাব পরিষ্কার করার এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সঠিক ঋণ মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘আইএফআরএস-৯’ অনুযায়ী সম্ভাব্য ঋণক্ষতি হিসাবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং ঋণ ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, খেলাপি ঋণ কমার বর্তমান প্রবণতা ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি ইতিবাচক প্রাথমিক সংকেত হলেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য ভাবার সুযোগ নেই। টেকসই অগ্রগতির জন্য কেবল পরিসংখ্যানের দিকে না তাকিয়ে ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই-বাছাই ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের প্রান্তিকের তথ্যে এই অগ্রগতির স্থায়ী রূপ বোঝা যাবে, যা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সার্বিক ঋণশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক সফরের মাধ্যমে দূর করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) কার্যালয়ে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি।
বুধবার বিসিসিসিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে চেম্বারের ভূমিকার প্রশংসা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এবং বিসিসিসিআইয়ের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো যথাযথ বিবেচনার যোগ্য বলে মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে বিসিসিসিআই সভাপতি মো. খোরশেদ আলম বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন। যার মধ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেটের মাধ্যমে চীনে দেশীয় পণ্যের প্রচার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, কাঁচামালের ঘাটতি মেটানো, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহযোগিতা এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৈঠকে বিসিসিসিআই সভাপতির উপদেষ্টা শহীদ আলম চেম্বারের বর্তমান কার্যক্রম ও সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরে জানান, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির অধীনে সংগঠনটি আরও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া তিনি চেম্বারের সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মহাপরিচালককে অবহিত করেন এবং জানান যে, বিধিবিধান অনুসরণ করে সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সর্বজনগ্রাহ্য কমিটি গঠিত হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় বিসিসিসিআইয়ের মহাসচিব, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতিবৃন্দ, পরিচালকবৃন্দ, সাধারণ সদস্য এবং চেম্বারের নির্বাহী পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও সরকারি প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে টেকসই বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর একমত পোষণ করেন।