সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ব্যাপক ইতিবাচক গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকার সমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, "এপ্রিলের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার।" পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ১৯ লাখ ডলার করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ হাজার ৮৬২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর আগে মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় আসার মাধ্যমে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও যথাক্রমে ৩০২ কোটি ৭ লাখ এবং ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের নজির। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার আগমন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি মাসের তৃতীয় চালানে আরও সাত হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের টার্মিনালে এই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন্স) কাজী রবিউল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, গত ২০ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাম্পিং শুরু হওয়ার প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর এই ডিজেল গন্তব্যে এসে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি মাসের ১১ ও ১৯ এপ্রিল আরও দুটি পৃথক চালানে মোট ১৩ হাজার টন জ্বালানি এসেছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৩৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে মোট চারটি চালানে ভারত থেকে ২৫ হাজার টন জ্বালানি আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এই ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগে রেল ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহনের দীর্ঘ সময় ও জটিলতা অনেকাংশে কমেছে। গত ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই আমদানি কার্যক্রমের চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর ভারত থেকে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিপিসির তথ্যমতে, এই পাইপলাইন ব্যবহার করে বছরে ১০ লাখ টন পর্যন্ত তেল আমদানি করা সম্ভব, যা কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলো পার্বতীপুর ডিপো থেকে এই ডিজেল সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সারাদেশের টিসিবি কার্ডধারী নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ ৩২ হাজার লিটার পরিশোধিত পাম তেল ও ২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সংগ্রহে সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় হবে মোট ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩২ টাকা। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আমেরিকার পাওয়ার হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি থেকে ১৮১ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয়ে পাম তেল কেনা হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঢাকার গুলশানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইজ সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ২ হাজার টন মসুর ডাল সংগ্রহের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে এদিনের সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়নি। এর মধ্যে বাপেক্স কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘৩টি অনুসন্ধান কুকূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খনন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কূপ খননের প্রস্তাবটি আলোচনার বাইরে ছিল। একইভাবে ‘সিলেট-১২ নম্বর কূপ খনন (তেল কূপ)’ এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি সংগ্রহের প্রস্তাবগুলোও বৈঠকে উত্থাপন করা হয়নি। এছাড়া নেসকো ও বাপবিবোর বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত একাধিক প্যাকেজ এবং সিরাজগঞ্জ ও ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুনর্নির্ধারিত লেভেলাইজড ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাবগুলোও এদিনের সভায় উপস্থাপন করা হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের এই বড় মজুত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আগামী জুলাই মাসে ইতালি থেকে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও যৌথ বিজনেস প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলাসান্দ্রোর এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা উল্লেখ করে বলেন, “ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী।”
সাক্ষাৎকালে বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, “বাংলাদেশ ও ইতালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। ইতালি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” মন্ত্রী ইতালীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে ইতালির বিনিয়োগ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফার্নিচার, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বন্ধ জুটমিল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে। দেশের তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সুবিধা।”
বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং পোশাক শিল্পের বাইরেও চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হন। এই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহিম খানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত পেট্রোকেমিক্যাল মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সংগৃহীত হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে শুরু করে লিপস্টিক, চুইংগাম, জুতা এমনকি মানুষের দাঁতের নকল পাটিও তৈরিতে পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে।
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর প্রধান রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?” পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের মোট তেলের ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো উপাদানগুলো প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইল প্রতি কেজি ৯০ সেন্টে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১ ডলার ৩৩ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাক তৈরিতে অন্তত ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ গুণতে হচ্ছে। এফডিআরএ-এর বিশ্লেষণ মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এক জোড়া জুতার দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, আঠাজাতীয় পণ্যের কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ বাড়ায় তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।”
শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে সরবরাহ চেইনের এই চাপ আরও প্রকট হবে। ইতিমধ্যে রিনসেরু-এর মতো পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের প্রতিটি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন অনেক সাধারণ পণ্যের দামও এখন পরোক্ষভাবে পেট্রোকেমিক্যালের কারণে আকাশচুম্বী হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মধ্যেও পারস্য উপসাগর থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল রফতানির তথ্য পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন খাত বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ জারির পরবর্তী সপ্তাহেই এই রফতানি সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা জানায়, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পর ১৩ এপ্রিল থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সময়ে তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর ৩৪টি যাতায়াত শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৯টি জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে গেছে এবং ১৫টি জাহাজ সেখানে প্রবেশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-কে (এপি) পাঠানো এক ইমেইলে জানিয়েছে, উপসাগর ত্যাগ করা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টি ইরানি অপরিশোধিত তেলে পূর্ণ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ছয়টি জাহাজে মোট প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা হচ্ছিল।
তবে এই তেলের চালান শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র: এপি
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও সূচক ছিল ইতিবাচক। ডিএসইতে দিনের শুরুতে চাঙ্গাভাব থাকলেও আধা ঘণ্টার ব্যবধানে বিক্রেতাদের চাপে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতন ঘটে। তবে লেনদেনের শেষভাগে বড় মূলধনি কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচক সামান্য বেড়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স মাত্র ০.০০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনশেষে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়লেও ১৯৯টির দর কমেছে এবং ৫৮টির দাম স্থিতিশীল ছিল। বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় ১৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কমে ৮৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং।
অন্যদিকে, সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে এবং ১০৩টির দাম কমেছে। সিএসইতে ২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হলেও বাছাই করা কিছু বড় কোম্পানির ভালো পারফরম্যান্সের কারণে সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান বহুমুখী প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধির জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই দাবি উত্থাপন করে। বৈঠকে বিআরপিডি সার্কুলার-০৭/২০২৫-এর আওতায় আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি রুগ্ন শিল্পগুলোর পুনর্বাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বিজিএমইএ-র পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, খেলাপি হিসাবের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৫-এর পরিবর্তে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে অনেক সংকটাপন্ন কারখানা নীতি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নীতি সহায়তাগুলো অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক সময়মতো কার্যকর না করায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার হয়।
বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও সভায় তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ মনে করে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক তথ্য যাচাই ও নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন, যা কার্যকর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে। ডেপুটি গভর্নর বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম কনডম উৎপাদনকারী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান কারেক্স সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তারা পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মূল্যবৃদ্ধির এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় এই শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোহ মিয়া কিয়াত এক সাক্ষাৎকারে জানান, জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পরিবেশক পর্যায়ে পণ্যের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে খুবই নাজুক, দাম বাড়ছে। এ মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতেই হচ্ছে।” কারেক্স প্রতি বছর ৫০০ কোটির বেশি কনডম তৈরি করে এবং তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে কনডম তৈরির প্রধান উপকরণ সিন্থেটিক রাবার ও নাইট্রাইল থেকে শুরু করে প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও সিলিকন লুব্রিকেন্টের দাম হু হু করে বাড়ছে। কারেক্সের প্রধান নির্বাহী জানান, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে; যেখানে আগে এক মাস সময় লাগত, এখন সেখানে দুই মাস সময় ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, “অনেক কনডম এখন জাহাজেই পড়ে আছে, এখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি। কিন্তু সেগুলোর চাহিদা খুব বেশি।” এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় মজুত শেষ হয়ে আসছে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামই এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ বা তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় স্বর্ণ ও রুপার মূল্য নতুন করে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমার কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।”
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দর ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় ক্রয় করা যাবে। ইতিপূর্বে গত ১৫ এপ্রিল স্বর্ণের মূল্য সর্বশেষ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যেখানে ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট ৫৬ বার স্বর্ণের বাজারমূল্য পরিবর্তন করা হলো, যার মধ্যে ৩২ বার দাম বেড়েছে এবং ২৪ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৯৩ বার স্বর্ণের দর সমন্বয় করা হয়েছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্য কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা কমে এখন ৫ হাজার ৭১৫ টাকায় নেমেছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৩৫ বার রুপার মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যেখানে ১৯ বার দাম বৃদ্ধি ও ১৬ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২৫ সালে রুপার দাম ১৩ বার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ও বিদেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে ৮৬ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে বিদেশে ৪৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৩৭৭ কোটি টাকায়। বিদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এরপরই রয়েছে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান।
একইভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও নিম্নমুখী। জানুয়ারিতে তারা ৩৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
দেশের অভ্যন্তরেও কার্ডের ব্যবহার হ্রাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩,৭২০ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ২৯৮ কোটি টাকা কমে ৩,৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সামগ্রিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে একটি স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৮৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দর ১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পূর্বেই ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে একতরফা এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইরান বা ইসরায়েল আদৌ চূড়ান্তভাবে সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড মেয়ার মন্তব্য করেন, “যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ফলে বাজারে সংকট কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে ডলারের মান বাড়বে, তেল ও সুদের হার বাড়বে এবং স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হবে।”
এই ঘোষণার প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যার ফলে মার্কিন ডলারের মান কিছুটা কমেছে এবং তেলের দামও নিম্নমুখী হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এক বার্তায় জানিয়েছে যে, স্বর্ণের বর্তমান এই দরবৃদ্ধি বেশ নাজুক এবং স্বল্পমেয়াদে তা হ্রাসের ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই মূল্যবান ধাতু পুনরায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী প্রধান হিসেবে মনোনীত কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন যে, সুদের হার কমানোর বিষয়ে তিনি ট্রাম্পকে কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দেননি এবং তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও তেজি ভাব দেখা গেছে; যেখানে রুপার দাম ১.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৭.৯৭ ডলার হয়েছে এবং প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরই আগামী দিনগুলোতে এই বাজারগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।
সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাহাজটি আগামী ৪ বা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করা ট্যাংকারটি লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে আসছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলেছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চালানটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অন্যদিকে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের আরেকটি জাহাজ ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে এখনো হরমুজ প্রণালিতে আটকে রয়েছে। ইরানের বিশেষ অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ—৬৩ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্বালানির ধরন বিবেচনায় ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, পেট্রল ও অকটেন।