সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জুন মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াজাত পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ৪২০ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের একই মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বরাবরের মতোই এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। জুন মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিটওয়্যার থেকে এসেছে ১৮৪ কোটি ১ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে ১৫৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি আয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৫১ লাখ ডলারে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও ৪৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে এসেছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। গত বছরের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ খাতে আয় হয়েছে ৮ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তাজা সবজি, ফল, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্রে সামান্য নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। বছরের প্রথম দিকের কয়েক মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের কারণে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল না। তবে অর্থবছরের শেষ মাসে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার রপ্তানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইলসহ মোট ২৭ ধরনের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নতি এবং বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ জুন মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থবছরে মোট ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ৯৬৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বেশি। তবে বিশাল প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি কাস্টম হাউস। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বুধবার রাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, মূলত পাম অয়েল, ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফলমূল, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং খাদ্যপণ্য আমদানির মাধ্যমে এই বড় অংকের রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্য ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। আমদানিনির্ভর এই রাজস্ব ব্যবস্থায় পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়ার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আদায়ের ওপর।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে এখনো চট্টগ্রাম কাস্টমসের ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার বিশাল বকেয়া রয়ে গেছে। এর মধ্যে এককভাবে পেট্রোবাংলার কাছেই পাওনা রয়েছে ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, যেখান থেকে গত এক বছরে কোনো বকেয়াই আদায় করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে পাওনা রয়েছে ৩ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। যদিও চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা বকেয়া আদায় হয়েছে, তবে মোট পাওনার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানিয়েছে, বকেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বকেয়া পরিশোধ করলে আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) খরচ কমাতে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টের সেবা ফি বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নতুন হার ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগে এই সেবার সর্বনিম্ন হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার সাথে অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হতো। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এই নির্দেশনা দেশের সব ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার লক্ষ্যে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয় পক্ষকে ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়মের ফলে এখন থেকে ব্যাংক হিসাব, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টের কাছ থেকে ভ্যাটসহ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ফি কাটতে পারবে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ আরও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্যান্য সকল ফি ও চার্জ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে কোনো ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে তারা আরও আকর্ষণীয় অফার প্রদান করতে পারবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারিকৃত আগের সার্কুলারের আংশিক সংশোধন করে এই নতুন হার নির্ধারণ করা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। তবে দাম কমলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর থেকে চিরস্থায়ীভাবে নির্ভরতা কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে এশিয়ার শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় ক্রেতারা এখন আর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নয়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ক্রয়ের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারায় এক আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছে বলে নিক্কেই এশিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
বাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তেলের বাজার শান্ত হয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারে নেমে এসেছে। নৌপথ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও এশীয় দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের তেল পরিবহনে বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয় এড়াতে ক্রেতারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাজার ধরে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে হয়তো এখন বড় অংকের ছাড়ে বা ডিসকাউন্টে তেল বিক্রি করতে হতে পারে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে জাপান তাদের আমদানি নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাপানের মোট আমদানির ৯৩ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসলেও দেশটি এখন জুলাইয়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে শতভাগ তেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাপান তাদের শোধনাগারগুলোকে আধুনিকায়ন করছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিশেষ করে মার্কিন অপরিশোধিত তেল সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করার কাজ শুরু করেছে। এশীয় বাজারের এই প্রবণতা দেখে বিশ্বখ্যাত তেল কোম্পানিগুলো এখন নাইজেরিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ক্রেতাদের এই বিমুখতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ‘দুবাই ক্রুড’-এর ওপর, যার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের অন্য তেলের তুলনায় দ্রুত কমছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের (OPEC) একক আধিপত্য এখন বড় সংকটের মুখে। কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে গেছে এবং ইরানও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের একচ্ছত্র রাজত্ব এখন পতনের মুখে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এশিয় দেশগুলোর এই কৌশলগত পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে আকরিক লোহার দামে ব্যাপক ধস নেমেছে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রধান ভোক্তা দেশ চীনের ইস্পাত কারখানাগুলোর মুনাফা হ্রাস এবং মৌসুমি চাহিদাকমার কারণে বাজারে এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হেলেনিক শিপিং-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্ববাজারে আকরিক লোহার চুক্তি মূল্য এখন প্রতি টন ৭৪০ ইউয়ানের নিচে নেমে গেছে। মূলত কাঁচামালের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলেও সে অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে ইস্পাতের চাহিদা না থাকায় এই দরপতন ঘটেছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চীনের ইস্পাত শিল্প বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনের ইস্পাত কারখানাগুলোর মুনাফা কমে ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ কম। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে গত মাসে চীনের শানসি প্রদেশে একটি কয়লা খনি দুর্ঘটনাকে দায়ী করা হচ্ছে। ওই দুর্ঘটনার পর কোকিং কয়লার দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ইস্পাত উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যা কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য করেছে।
এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অতিরিক্ত হওয়ায় চীনের বন্দরগুলোতে অবিক্রীত আকরিক লোহার মজুদ রেকর্ড ১৬ কোটি টনে পৌঁছেছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ভারসাম্যহীনতার কারণে আকরিক লোহার বাজার শিগগিরই ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, বৈশ্বিক নির্মাণ খাতের স্থবিরতা এবং ইস্পাত কারখানাগুলোর উৎপাদন সীমিত রাখার প্রবণতা বজায় থাকলে আকরিক লোহার এই দরপতন আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাস (জানুয়ারি-জুন) বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারের জন্য ছিল এক চরম অস্থিরতার সময়। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কঠোর মুদ্রানীতি—এই তিন শক্তির লড়াইয়ে ওলটপালট হয়ে গেছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার এবং পণ্যবাজার। নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গত ছয় মাসে এশিয়ার আর্থিক খাতের এই উত্থান-পতনের নেপথ্য চিত্র।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জ্বালানি তেলের অস্থিরতা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে। বিশ্ববাজারে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার, যা যুদ্ধের শিখর সময়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছে যায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন রেকর্ড তৈরি করে। তবে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক শান্তি চুক্তির ফলে বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়েছে।
এআই বিপ্লব: প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির রক্ষাকবচ
যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে মেমোরি চিপ ও সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়। এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও জাপান। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের উত্থান ছিল বিস্ময়কর; প্রতিষ্ঠানটি বাজারমূল্যে একসময় টেক জায়ান্ট স্যামসাংকেও ছাড়িয়ে গিয়ে বিশ্বের অন্যতম দামী কোম্পানিতে পরিণত হয়। জাপানের কিওক্সিয়া হোল্ডিংসও এ সময় রেকর্ড মুনাফা অর্জন করে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি, তাইওয়ানের তাইএক্স ও জাপানের নিক্কেই সূচক প্রথমার্ধে একাধিকবার ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারে মুদ্রার উল্টো পিঠ
প্রযুক্তি খাতে রেকর্ড গড়লেও সামগ্রিক বাজারে ছিল মিশ্র চিত্র। প্রথমার্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার থেকে প্রায় ৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে ইন্দোনেশিয়ায়; দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। এমএসসিআই ইন্দোনেশিয়ার রেটিং কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের আগ্রাসী অবস্থানের কারণে এশিয়ার মুদ্রাগুলো খাদের কিনারে গিয়ে ঠেকেছে। ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর পরিবর্তে বাড়ানোর আশঙ্কায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলার শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে জাপানি ইয়েন ১৯৮৬ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে (প্রতি ডলারে ১৬২ ইয়েন) পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ওন ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। থাইল্যান্ডের বাত, ফিলিপাইনের পেসো ও ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহও ডলারের বিপরীতে নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে।
স্বর্ণ ও বন্ডবাজারের অস্থিরতা
২০২৬ সালের শুরুতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম ট্রয় আউন্সপ্রতি রেকর্ড ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং উচ্চ সুদহারের কারণে পরবর্তীতে স্বর্ণের চাহিদা কমতে থাকে। গত সপ্তাহে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ছিল বড় এক ধাক্কা। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের বাজেট ঘাটতির ফলে সরকারি বন্ডের সুদহার বা ইল্ড ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের পরবর্তী ছয় মাসেও বাজারের অস্থিরতা কমার লক্ষণ নেই। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, এআই খাতের নতুন বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত সিদ্ধান্তই হবে আগামীর মূল চালিকাশক্তি। ফলে এশিয়ার দেশগুলোকে মুদ্রার মান রক্ষা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। প্রযুক্তির জয়গান থাকলেও যুদ্ধের ছায়া থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি বৈশ্বিক আর্থিক খাত।
ভোক্তাপর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও জাহাজভাড়া কমে আসায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ১ হাজার ৮৮৫ টাকার সিলিন্ডার এখন ১ হাজার ৫২৮ টাকায় পাওয়া যাবে। আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন এই দর ঘোষণা করেন, যা আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও কমানো হয়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে কমিয়ে ৭৪ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করেছে কমিশন। বিইআরসি চেয়ারম্যান জানান, সৌদি আরবের কনট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রতি মাসেই এই দাম সমন্বয় করা হয়। গত কয়েক মাস ধরে এলপিজির দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির পর এই বড় মাপের হ্রাস সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বিশেষ স্বস্তি নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২ জুন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তারও আগে এপ্রিল মাসে দুই দফায় দাম বাড়িয়ে প্রায় ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছিল। মূলত ২০২৫ সালের শেষ সময় থেকে এলপিজি বাজারে যে অস্বাভাবিক অস্থিরতা চলছিল, তা নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত মূল্যে বাজারে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২১ সাল থেকে নিয়মিত বিরতিতে এই সমন্বিত মূল্য ঘোষণা করে আসছে বিইআরসি।
টানা দুই দফা হ্রাসের পর আবারও দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে গ্রাহকদের এখন থেকে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা গুনতে হবে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে নতুন এই দর সারা দেশে কার্যকর হয়েছে বলে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে।
বাজুসের নির্ধারিত নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৩ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ৩০ জুন স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে দামের এই উর্ধ্বমুখী পরিবর্তন ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছর এ নিয়ে দেশের বাজারে রেকর্ড ৮৫ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করল বাজুস। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে ৪২ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ৪২ বার কমানো হয়েছে, আর একবার ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। মূলত স্থানীয় বাজারের অস্থিরতা এবং তেজাবি স্বর্ণের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এই ঘনঘন দাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাবও স্থানীয় স্বর্ণের বাজারে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়া বা কমার সীমা বা সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ১০১৮তম কমিশন সভায় এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মঙ্গলবার বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো পূর্বানুমোদন ছাড়াই সার্কিট ব্রেকারসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য মাপকাঠি নির্ধারণ ও কার্যকর করতে পারবে।
বিএসইসির নতুন নির্দেশনার ফলে ২০২১ সালের ১৭ জুন ইস্যু করা সার্কিট ব্রেকার সংক্রান্ত আগের আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে ডিএসই এবং সিএসই তাদের নিজস্ব প্রবিধানমালা ও প্রতিদিনের বাজার পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে শেয়ারের দাম ওঠা-নামার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করবে।
বর্তমানে কার্যকর থাকা নিয়ম অনুযায়ী, ২০০ টাকার নিচের শেয়ারের দাম একদিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ এবং উচ্চমূল্যের শেয়ারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠা-নামা করতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জ চাইলে বর্তমান এই নিয়ম বহাল রাখতে পারে অথবা বাজারের স্বার্থে যেকোনো সময় তা পরিবর্তন করতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর পেশাদারিত্ব বাড়বে এবং বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে বাজার পরিচালনার ক্ষমতা স্টক এক্সচেঞ্জের হাতে হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াকে পুঁজিবাজারের আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিবর্তন দেশের বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বের প্রধান তুলা রফতানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে তুলার বাজারে বর্তমানে বড় ধরনের মন্দা লক্ষ্য করা গেছে। দেশটির প্রধান ‘আপল্যান্ড’ জাতের তুলার সাপ্তাহিক নিট বিক্রি অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৮ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে আপল্যান্ড ও প্রিমিয়াম পিমা—উভয় জাতের তুলার আন্তর্জাতিক চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে বিক্রির গতি কমলেও বৈশ্বিক বাজারে মার্কিন তুলার মোট সরবরাহের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ফাইবার টু ফ্যাশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
ইউএসডিএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলমান ২০২৫-২৬ বিপণন বর্ষে আপল্যান্ড তুলার নিট সাপ্তাহিক বিক্রি ৫৩ শতাংশ কমে মাত্র ৮৩ হাজার ৯০০ রানিং বেলে (প্রতি বেলের ওজন ২২৬ কেজি ৮০ গ্রাম) দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদার এই মন্থরগতির মধ্যেও ভিয়েতনাম ৩১ হাজার ৩০০ রানিং বেল তুলা কিনে এককভাবে শীর্ষ আমদানিকারকের স্থান দখল করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত কিনেছে ১৪ হাজার ৩০০ রানিং বেল। বাংলাদেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো ১৪ হাজার ২০০ রানিং বেল তুলা বুকিং দিয়ে তৃতীয় শীর্ষ ক্রেতার মর্যাদা ধরে রেখেছে। এ ছাড়া চীন ৭ হাজার ৬০০ বেল এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৪ হাজার ৫০০ বেল তুলা ক্রয়ের চুক্তি করেছে। তবে নিকারাগুয়া ও কিছু নামহীন গন্তব্য থেকে আগের পুরনো ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ায় সামগ্রিক বিক্রির হিসাবে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিক্রি কমলেও এ সপ্তাহে মার্কিন তুলা রফতানি ও সরবরাহের চিত্রটি ছিল তুলনামূলক ইতিবাচক। মোট আপল্যান্ড তুলা সরবরাহ ২০ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ২০০ রানিং বেলে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ২ হাজার ৮০০ রানিং বেল তুলা বুঝে পেয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যথাক্রমে ৪৮ হাজার ৬০০ বেল এবং ২৫ হাজার ৯০০ রানিং বেল তুলা আমদানি করেছে। অন্যদিকে উচ্চমানের পিমা তুলার চাহিদাও ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪ হাজার ৩০০ রানিং বেলে নেমেছে। পিমা তুলার বাজারেও ২ হাজার রানিং বেল কিনে শীর্ষস্থানে ছিল ভারত, আর বাংলাদেশ আমদানি করেছে মাত্র ৩০০ বেল। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলার কেনাবেচা সাময়িকভাবে মন্থর হলেও বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর নিয়মিত ক্রয়াদেশ বজায় থাকায় মার্কিন তুলা বাজার বড় কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক চাহিদা পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন তুলার এই বাজার অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে কোকো উৎপাদন বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে এই পণ্যের দাম গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিজনেস রেকর্ডার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইন্টারকন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জে কোকোর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও একই সময়ে কফি ও চিনির বাজারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের বাজারে কোকোর মূল্য ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ৩ হাজার ৮৭৭ পাউন্ডে কেনাবেচা হয় এবং লেনদেনের এক পর্যায়ে তা ৩ হাজার ৯৫৪ পাউন্ডে উন্নীত হয়। বিশ্বের শীর্ষ কোকো উৎপাদনকারী দেশ আইভরি কোস্ট ও ঘানায় মূল ফসল আহরণে বিলম্বের পূর্বাভাস এবং এল নিনোর উদ্বেগ এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পাশাপাশি আইভরি কোস্টের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগামী মৌসুমের আগাম কোকো বিক্রি স্থগিত রাখায় বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যা দামকে আরও উসকে দিয়েছে।
লন্ডনের পাশাপাশি নিউইয়র্কের বাজারেও কোকোর দর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ৫ হাজার ১৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিনের শুরুতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২৬০ ডলারে উঠেছিল। তবে এই বাজার পরিস্থিতির স্থায়িত্ব নিয়ে ডাচ বহুজাতিক ব্যাংক রাবোব্যাংক কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আবহাওয়ার ঝুঁকির কারণে সাময়িকভাবে দাম বাড়লেও ২০২৬-২৭ মৌসুমে কোকোর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হতে পারে। ফলে বর্তমানের এ বাড়তি দামকে তারা কিছুটা ‘অতিরিক্ত বা অতিরঞ্জিত’ বলে মনে করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্টোনেক্সের তথ্য অনুযায়ী ফসল তোলার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা না কাটলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এই চাপ আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে।
অন্যদিকে কোকোর বাজারে চাঙ্গাভাব থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যারাবিকা কফির মূল্যে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। এক দিন আগেই ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ দরে পৌঁছানো কফির মূল্য বৃহস্পতিবার ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি পাউন্ড ২ হাজার ৭১৯ ডলারে নেমে আসে। মূলত বিশ্বের শীর্ষ কফি উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলে এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় কফির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ফসল সংগ্রহের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দেশটির শীর্ষ কফি সমবায় সংস্থা কোওক্সুপে জানিয়েছে, গত বছরের এই সময়ে যেখানে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ কফি সংগৃহীত হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ কফি তোলা সম্ভব হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য বাজারের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বর্তমানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ‘কোরিয়া ইমপোর্ট এক্সপো ২০২৬’-এ ৩২টি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের সরব অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ও বিনিয়োগ সক্ষমতা নতুনভাবে তুলে ধরেছে। ২৩ থেকে ২৫ জুন সিউলের বিখ্যাত কোএক্স হলে এই প্রদর্শনীটি আয়োজন করে কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেবিসিসিআই), যেখানে সার্বিক সহযোগিতায় ছিল সিউলের বাংলাদেশ দূতাবাস। কোরিয়া ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (কেওআইএমএ)-এর চেয়ারম্যান ইয়ং-মি ইউন এই মেলাটি উদ্বোধন করেন, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তৌফিক ইসলাম শাতিলসহ দেশী-বিদেশী অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
এবারের প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নটি ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে সাজানো হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশকে আন্তর্জাতিক আমদানিকারকদের সামনে তুলে ধরা। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী ২০০টিরও বেশি স্টলের মধ্যে বাংলাদেশের ৩২টি প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক, প্রিমিয়াম চামড়াজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং আইটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার সমাধান প্রদর্শন করে। এছাড়া বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)-এর অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রদর্শনীর ফাঁকে কেবিসিসিআই সভাপতি শাহাব উদ্দিন খানের নেতৃত্বে ৪১ সদস্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল কোরিয়ান আমদানিকারক ও ক্রেতাদের সঙ্গে ১৫টিরও বেশি ‘বিজনেস-টু-বিজনেস’ (বিটুবি) বৈঠকে অংশ নেয়। কেওআইএমএ-র চেয়ারম্যান ইয়ং-মি ইউনের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করা হয়। মেলা শেষে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত তৌফিক ইসলাম শাতিল বলেন, “বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দূতাবাস সব সময় ব্যবসায়ীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।”
অনুষ্ঠানে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক কয়েকজন রাষ্ট্রদূত এবং বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা কোরিয়ান বাজারে নতুন ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক যোগাযোগ স্থাপনের এক অনন্য সুযোগ পেয়েছেন। সামগ্রিকভাবে, এই আয়োজনটি এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী মনে করছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। সংগঠনটির মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা শেয়ারবাজারের আধুনিকায়ন ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বুধবার (১ জুলাই) বিএমবিএর সেক্রেটারি জেনারেল সুমিত পোদ্দার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই বাজেটকে দূরদর্শী আখ্যা দিয়ে সরকারের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
সংগঠনটি বিশ্বাস করে যে, বাজেটে ঘোষিত পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখার পাশাপাশি বাজারে নতুন পুঁজির প্রবাহ নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও-র কর সুবিধা সম্প্রসারণ, জিরো-কুপন বন্ডে কর ছাড়, লভ্যাংশ সুবিধা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের কর কাঠামোর যে যৌক্তিক সমন্বয় করা হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ছাড়াও ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিশেষ সাধুবাদ জানিয়েছে বিএমবিএ।
বিএমবিএ আরও উল্লেখ করেছে যে, একটি টেকসই ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত সংস্কারমূলক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে তারা সব সময় সক্রিয় থাকবে। ভবিষ্যতেও শেয়ারবাজারের সার্বিক উৎকর্ষ সাধনে বাজারের সকল অংশীজনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি। মূলত এই বাজেটের সুফল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।