সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। টানা তিন দিন ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর বুধবার তেলের দরপতন লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০৬ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও সমহারে হ্রাস পেয়ে ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে এসেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে তেলের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। ফিলিপ নোভার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেভা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে অনিশ্চয়তা তেলের দামকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে বাজার এখনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে না।’ তিনি সতর্ক করে জানান যে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য কোনো নতুন হুমকি তৈরি হলেই তেলের দামে আবারও শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি ফিরে আসতে পারে।
মঙ্গলবার তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার মূলে ছিল স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসা এবং হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেইজিং সফরে যাচ্ছেন, যেখানে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। যদিও ট্রাম্প ইতিপূর্বে মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের সহায়তা তাঁর প্রয়োজন হবে না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি সরবরাহ ঘাটতির কারণে চলতি বছরজুড়ে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের ওপরেই থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা অপরিবর্তিত রাখার পথে হাঁটতে পারে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ক্যাপিটাল ইকোনমিকস এক নোটে জানিয়েছে যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার ভবিষ্যতে তেলের চাহিদাকে সংকুচিত করে দিতে পারে। অন্যদিকে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির মজুত ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরণের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদহার হ্রাসের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে। বুধবার স্পট গোল্ডের বাজার দরে এই পতন পরিলক্ষিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নিশ্চিত করেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বুধবার স্পট গোল্ডের দাম দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭১০ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আগের সেশনে স্বর্ণের দাম গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, কিন্তু নতুন অর্থনৈতিক তথ্যের চাপে তা স্থায়ী হতে পারেনি। অন্যদিকে জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণ ফিউচার্সের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭১৭ দশমিক ৫০ ডলারে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন অর্থনীতির সাম্প্রতিক শক্তিশালী মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি ফেডকে উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্বর্ণের বাজারে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন উন্মুখ হয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের দিকে। বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তজনা নিরসনে এই বৈঠকের ফলাফল আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে এক নতুন মোড় নিয়ে আসতে পারে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানিতে শুল্ক এক ধাক্কায় ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার। মঙ্গলবার এক দাপ্তরিক আদেশের মাধ্যমে এই নতুন কর কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে মূল্যবান ধাতু চোরাচালান পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নতুন নীতি অনুযায়ী, স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানির ওপর ১০ শতাংশ বেসিক কাস্টমস ডিউটি এবং ৫ শতাংশ কৃষি অবকাঠামো ও উন্নয়ন সেস (এআইডিসি) আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের এখন থেকে ১৫ শতাংশ কার্যকর কর গুনতে হবে। ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশনাল সেক্রেটারি সুরেন্দ্র মেহতা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চলতি হিসাবের ঘাটতি প্রত্যাশামাফিক নিয়ন্ত্রণে শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। তবে এতে চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের দাম আগেই অনেক বেশি ছিল।’
উল্লেখ্য যে, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ ভোক্তা দেশ এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বর্ণের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। রিজার্ভ সুরক্ষার স্বার্থে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে দেশবাসীকে অন্তত এক বছর স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেয়ারবাজারে অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে স্বর্ণভিত্তিক ফান্ডে বিনিয়োগ গত বছরের তুলনায় ১৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালে শুল্ক কমানোর ফলে অবৈধ পথে স্বর্ণ আসা কিছুটা কমেছিল, তবে বর্তমানের এই উচ্চ শুল্ক চোরাচালানকারীদের আবারও উৎসাহিত করবে। এপ্রিল মাসেই ৩ শতাংশ আইজিএসটি আরোপের ফলে ভারতে স্বর্ণ আমদানি গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত আমদানিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বুলিয়ন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয়ের প্রবাহে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে ১৪৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাস আয়ের এই ইতিবাচক চিত্রের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, গত ১১ মে একদিনেই প্রবাসীরা প্রায় ১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসের প্রথম ১১ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯২ কোটি ২০ লাখ ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক; গত ১ জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত দেশে মোট ৩ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার, অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ১০ মাসেই প্রবাসী আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের বিশেষ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ ও আধুনিক করা এবং বর্তমান প্রশাসনের ওপর প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান আস্থা এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
টানা পাঁচ কার্যদিবসের দরপতনের বৃত্ত ভেঙে অবশেষে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের শেয়ারবাজার। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যসূচকও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ এক লাফে হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ডিএসইর লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দামে ইতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় এবং এই ধারা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। দিনশেষে ডিএসইতে ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩৮টির এবং ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। বিশেষ করে লভ্যাংশ প্রদানকারী শক্তিশালী কোম্পানি এবং ‘জেড’ গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
মূল্যসূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। লেনদেনের গতিতেও ব্যাপক চাঙ্গাভাব দেখা গেছে; মঙ্গলবার ডিএসইতে ১ হাজার ১০১ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। আজকের লেনদেনে শীর্ষস্থানে ছিল মুন্নু সিরামিক, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং অ্যাকমি পেস্টিসাইড। এছাড়া শীর্ষ দশ তালিকায় আরও ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এনসিসি ব্যাংক এবং ওরিয়ন ইনফিউশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে অংশ নেওয়া ২০৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৯টির দর বেড়েছে এবং ৬৭টির দাম কমেছে। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে ২১ কোটি ৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী খাত ও স্টার্টআপগুলোর বিকাশে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। প্রথমবারের মতো ৩৯টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগে ৪২৫ কোটি টাকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ (বিএসআইসি)-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এই বিশেষ তহবিলের শুভ সূচনা করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএসআইসি-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের এই প্রাথমিক তহবিলটি ব্যাংকগুলোর বার্ষিক নিট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এটি কোনো এককালীন বিনিয়োগ নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে মূলধন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্টার্টআপগুলোর ‘সিড’, ‘লেট-সিড’ এবং ‘সিরিজ-এ’ পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি ও প্রুডেনশিয়াল ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হবে যাতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এরকম একটা কর্মযজ্ঞ বিশাল ব্যাপার। এই অনুষ্ঠানটির মেসেজ হলো, স্টার্ট আপ বিনিয়োগকে এটি আত্মবিশ্বাসী করবে। আমাদের একটি প্রোগ্রাম আছে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি। এই উদ্যোগের আওতায় ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অনেক কাজ করা যাবে আশা করি। এই বিনিয়োগে কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না আমি কথা দিচ্ছি। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে যে স্বচ্ছতা আমরা আনতে চাচ্ছি তা এর মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ব্যাংক খাত এবং অর্থনীতিতে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা সমাধান করতে জেপি মরগ্যান, বিশ্বব্যাংক, আইএফসির সাথে মিলেমিশে এই সরকার কাজ করছে। দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরণের সমস্যা হয়েছে যা আমি বলতে চাই না। এই উদ্যোগকে সরকার যতভাবে দরকার সব দিক দিয়েই সহযোগিতা করবে।'
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান বলেন, 'বাংলাদেশের আর্থিক খাতের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নে এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। বিএসআইসি দেশীয় মূলধনকে উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।' অতীতের অভিজ্ঞতার কথা টেনে তিনি বলেন, 'প্রথম ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে যা সফল হয়নি। পরবর্তীতে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে তাদের নিট লাভের ১% দিয়ে তহবিল গঠন করতে বলা হয়। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) বাংলাদেশ ব্যাংককে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে খুবই সহযোগিতা করেছে। এরকম কাজের ক্ষেত্রে এবিবি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি যেই লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে তা অবশ্যই সফল হবে। তবে আমি অনুরোধ করতে চাই, এই বিনিয়োগের সুফল যেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ পায়। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ এর সুফল না পেলে একটা বড় অংশ বঞ্চিত থাকবে এই উদ্যোগের। সামনে আরেকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে। ক্যাশলেস সোসাইটি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে এবিবি সহযোগিতা করবে বলে আশা প্রকাশ করছি।'
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসলেও দেশীয় মূলধনের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। বর্তমানে এই বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্মটি সেই শূন্যতা পূরণ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। মঙ্গলবার প্রকাশিত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, দেশের অর্থনীতি এখনও একটি ভঙ্গুর ও অসম পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত মার্চ মাস শেষে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিম্ন প্রবৃদ্ধি, অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে বিদ্যমান চাপ অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী অস্থিরতা কিছুটা স্তিমিত হলেও জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় ও শিল্প খাতের মন্থর গতির কারণে সামগ্রিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরাজমান এক ধরণের সতর্কাবস্থান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করে রেখেছে। এমসিসিআই-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, দুর্বল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গৃহীত কঠোর মুদ্রানীতি বাজারে চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও ব্যবসায়িক গতি কমিয়ে দিয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর। এতে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ডলারের অস্থিতিশীলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতির এই প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের বা রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ রিজার্ভের অবস্থানকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। এমসিসিআই মনে করে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক খাতে একটি ন্যূনতম স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক উন্নতির মৃদু ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবুও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানাবিধ ঝুঁকির কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
দেশের অর্থব্যবস্থাকে ক্যাশলেস করার লক্ষ্যে এক বড় ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুলাই মাস থেকে দেশের প্রতিটি ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লেনদেনের জন্য ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’র (বিএসআইসি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
গভর্নর জানান, দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলা কিউআর হলো এমন একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক অ্যাপ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) ব্যবহার করে গ্রাহকরা নিরাপদ পেমেন্ট করতে পারবেন। এতে বিক্রেতার জন্য হিসাব রাখা সহজ হবে এবং ক্রেতার জন্য কার্ড বা নগদ টাকার বহন করার প্রয়োজন কমবে। যেকোনো ব্যাংকে হিসাবধারী ব্যবসায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে ৩-৪ দিনের মধ্যেই এই কিউআর কোড সংগ্রহ করতে পারবেন বলে এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
অনুষ্ঠানে ৪২৫ কোটি টাকার মূলধন নিয়ে নবগঠিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণা দেওয়া হয়। ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফার ১ শতাংশের সমন্বয়ে এই বিশেষ তহবিলটি গঠন করা হয়েছে। এটি মূলত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সিড ও সিরিজ-এ পর্যায়ে মূলধন সহায়তা প্রদান করবে। বিএসআইসি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন স্পষ্ট করেছেন যে, শুধু তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ নয়, বরং সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই উদ্যোক্তারাও এই অর্থায়নের আওতায় থাকবেন।
উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিলের জোগান আরও বাড়াতে গভর্নর আরও একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বিনিয়োগের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করবে। বাংলা কিউআর কোড গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও বেশ সহজ রাখা হয়েছে। মাসিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবির প্রয়োজন হবে; তবে লেনদেন এর বেশি হলে টিন সার্টিফিকেট ও ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে আলুর মূল্যে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলে আলুর ব্যাপক উৎপাদন এবং বিশাল উদ্বৃত্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গত এক মাসেরও কম সময়ে পণ্যটির ফিউচার বা আগাম চুক্তির দাম ৭০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রলেপে বিশ্বজুড়ে কৃষি উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির আশঙ্কায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে ইউরো নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২১ এপ্রিল আলুর বেঞ্চমার্ক চুক্তির মূল্য যেখানে প্রতি ১০০ কেজিতে মাত্র ২ ইউরো ১১ সেন্ট ছিল, তা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৮ ইউরো ৫০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আলুর দাম বেড়েছে প্রায় ৭০৫ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উল্লম্ফন বাস্তব চাহিদার চেয়ে বরং আর্থিক খাতের আগাম জল্পনা-কল্পনারই ফল। বর্তমানে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও জার্মানিতে আলুর বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, বরং আলুর প্রাচুর্য এতটাই বেশি যে অবিক্রিত পণ্য সরাতেও হিমশিম খাচ্ছেন চাষীরা।
আলুর এই অভাবনীয় বাজার দরের নেপথ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক সার ও জ্বালানি সংকটের প্রবল আশঙ্কা। আলু চাষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সারের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন কৃষকরা। জাতিসংঘের মতে, বৈশ্বিক কৃষি খনিজ উপাদান ও সারের এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই পরিবহিত হয়। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় চড়া দামে আলুর আগাম চুক্তি কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, পাইকারি ও আগাম চুক্তির বাজারে এই অস্থিরতা থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের প্রভাবে সার ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
দেশের আবাসন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার প্রতিরোধে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে রিহ্যাব প্রতিনিধি দলের সাথে আয়োজিত এক যৌথ সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। রিহ্যাবের পক্ষ থেকে অপ্রদর্শিত আয়ের বিনিয়োগ ঠেকাতে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
বিএফআইইউ-এর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় রিহ্যাব প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। সভায় বিএফআইইউ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুনসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় মূলত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয়, গ্রাহক যাচাইকরণ (কেওয়াইসি) এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশের আবাসন খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরে রিহ্যাব সবসময় সরকারের আইন ও নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ’র সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল করতে রিহ্যাব কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তিনি মনে করেন, নিবন্ধন খরচ কমানো গেলে লেনদেনে স্বচ্ছতা আসবে এবং অর্থপাচারের প্রবণতা হ্রাস পাবে।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রিয়েল এস্টেট খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য পূরণে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইন অনুযায়ী রিপোর্টিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে রিহ্যাব ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। সভায় উপস্থিত অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং এ বিষয়ে দুদক ও এনবিআর-এর সাথে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বিএফআইইউ কর্মকর্তারা সভায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কারিগরি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। উভয় পক্ষই আবাসন খাতে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সভায় রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকবৃন্দও অংশগ্রহণ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ধাতু, সার এবং কৃষিপণ্যের দামে বড় ধরণের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির সাথে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং বড় দেশগুলোর মুদ্রানীতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে গত এপ্রিল মাসজুড়ে বিশ্ববাজারকে এক টালমাটাল অবস্থায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে।
জ্বালানি তেলের বাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব সবথেকে বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এপ্রিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড। নৌপথে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক অগ্রগতির ক্ষীণ আশাতেই এই দাম কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিল্প ধাতুর বাজারেও একই ধরণের চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে। ইন্দোনেশিয়া নিকেল আকরিকের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে এর মূল্য ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত তামার চাহিদাও তুঙ্গে থাকায় এর দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোতে উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় এর দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দস্তা ও সিসার বাজারও এপ্রিল মাসে ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারও সাধারণ মানুষের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারের উচ্চমূল্য ও প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কায় গমের দাম ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে ভুট্টা ও সয়াবিনের দামও যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ ও ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে চালের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে; পর্যাপ্ত মজুত ও চাহিদা হ্রাসের ফলে এর দাম ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে তুলা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এর দাম রেকর্ড ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। এর ফলে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে খাদ্যদ্রব্যের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে, যার মূল ভিত্তি ছিল তাদের শক্তিশালী ‘ইস্ট–ওয়েস্ট’ বা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। এই বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা এড়িয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
আরামকোর সাম্প্রতিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সময়ে তাদের রাজস্ব আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিকূল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈশ্বিক বাজারে তেলের জোগান অব্যাহত রাখায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। সৌদি আরামকোর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন—যা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতায় পৌঁছেছে—নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ধমনি হিসেবে প্রমাণ করেছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কার প্রভাব কমাতে সহায়তা করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বস্তি দিয়েছে।’
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রলেপে তা গত ফেব্রুয়ারি থেকে স্থবির হয়ে রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে ঠেকেছে, যা যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। আমিন নাসের মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি আজই বা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু হয়, তাহলেও তেল বাজারের ভারসাম্য ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে। কিন্তু যদি আজ থেকে আরও কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তাহলে আমরা ধারণা করছি সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বাজার ২০২৭ সালের আগে স্বাভাবিক হবে না।’
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক ধরণের অস্থিতিশীল শান্তি আলোচনা চললেও সংঘাতের ছায়া এখনও কাটেনি। এমন অনিশ্চয়তার মাঝেও আরামকো তাদের ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের ত্রৈমাসিক লভ্যাংশ অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আরামকোর লভ্যাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ দেশটির সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ৮০ শতাংশেরও বেশি মালিকানা রয়েছে। দাহরানভিত্তিক এই জ্বালানি জায়ান্ট বিশ্বজুড়ে ৭৬ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে।
বিদেশি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ‘ভিসা বন্ড’ বা ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দূর করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে নির্দিষ্ট শর্ত পালন সাপেক্ষে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই সরাসরি এই অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি ভিসা প্রদানের শর্ত হিসেবে ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত দাবি করে, তবে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর হয়ে ব্যাংক সেই অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করতে পারবে। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ যাত্রার এই দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সহজতর এবং হয়রানিমুক্ত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংকগুলো আবেদনকারীদের জন্য আন্তর্জাতিক বা ভার্চুয়াল কার্ড ইস্যু করতে পারবে যাতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা আগাম জমা বা প্রিলোড করা থাকবে। এছাড়া বিদ্যমান কার্ডহোল্ডাররা তাঁদের ভ্রমণ কোটার অধীনে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই অর্থ শুধুমাত্র ভিসা সংক্রান্ত সিকিউরিটি ডিপোজিট পরিশোধের ক্ষেত্রেই ব্যয়যোগ্য। গ্রাহকরা তাঁদের এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ), রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাব কিংবা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করেও এই সেবা নিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব উন্নত দেশে ভিসার জন্য আর্থিক নিশ্চয়তা বা বন্ড জমা দিতে হয়, সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন এই নীতি অত্যন্ত সহায়ক হবে। সাধারণত ‘ভিসা বন্ড’ হলো একটি নির্দিষ্ট জামানত যা আবেদনকারী ভিসার শর্ত মেনে নিজ দেশে ফিরে আসবেন— এমন নিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে জমা নেওয়া হয় এবং শর্ত পূরণ শেষে তা ফেরতযোগ্য।