সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই দুই অবরোধের মধ্যবর্তী সময়ে গত চার সপ্তাহে ইরান ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য রপ্তানি করেছে। এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি থেকে দেশটির আয় হয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সোমবার (১৩ জুলাই) সামুদ্রিক যান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ট্যাংকারট্যাকার্স’ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ তেল ইতিমধ্যে রপ্তানি করা হলেও এখনো কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছে। ট্র্যাকিং গ্রুপটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই মার্কিন নৌবাহিনী পুনরায় অবরোধ কার্যকর করতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের প্রায় ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এখনো রপ্তানির অপেক্ষায় রয়ে গেছে। তবে সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, ‘ইরান যদি তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, সেক্ষেত্রে অবরোধ এলাকার মধ্যেই ৬০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল ভাসমান অবস্থায় মজুদ রাখার সক্ষমতা বা জায়গা রয়েছে।’
এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত বর্তমানে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত সোমবার দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের মাঝে গত এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালীতে তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনার পর সেই পরিস্থিতি আবারও পাল্টে যায়। গত রবিবার রাত থেকে শুরু হওয়া দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় ইরানের অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এর জবাবে কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রে গত জুন মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কোনো সমাধান না হওয়ায় এটি সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ কোনো স্বস্তি বয়ে আনবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। রয়টার্স জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতির এই নিম্নমুখী প্রবণতা ফেডারেল রিজার্ভকে এই বছর সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সম্ভবত সরিয়ে রাখতে পারবে না। ভোক্তা মূল্যসূচকের এই প্রত্যাশিত ধীরগতি মূলত গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতির কারণে পেট্রোলের দাম কিছুটা কমে যাওয়ার প্রতিফলন। তবে গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনার পর সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে এবং পুনরায় শুরু হয়েছে সামরিক সংঘাত।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও উর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং ট্রিপল এ-এর তথ্য অনুযায়ী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালন প্রতি ৩.৮৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এদিকে সোমবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপ করবে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বোস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ব্রায়ান বেথুন বলেন, "কষ্টের মাত্রা কেবল ১০ থেকে ৯-এ নেমেছে, ভোক্তারা এখনও অনেক কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।" তিনি আরও সতর্ক করে জানান যে সংকট এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ মঙ্গলবার তাদের প্রতিবেদনে জানায় যে জুন মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক গত বছরের তুলনায় ৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের করা রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী মে মাসে এই বৃদ্ধির হার ছিল ৪.২ শতাংশ, যা ছিল ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। যদিও ফেডারেল রিজার্ভের মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশ, কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে তা এখনও অর্জিত হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভ গত জুন মাসের বৈঠকে সুদের হার ৩.৫০ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রাখলেও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের বৈঠকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা বর্তমানে ৫০.৮ শতাংশ। এই অনিশ্চয়তার প্রভাবে সোমবার মার্কিন শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন লক্ষ করা গেছে, যেখানে নাসডাকের সূচক দেড় শতাংশেরও বেশি কমেছে। কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোঙ্ক বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, "পণ্যের দাম এখনও চড়া রয়েছে এবং কিছু দোকানে দাম কমানোর কথা বলা হলেও তা মানুষের মোট খরচে বিশেষ প্রভাব ফেলবে না, কারণ অন্যান্য খরচ বেড়েই চলেছে।" তিনি আরও মনে করেন যে সাধারণ মানুষ এখনও বর্ধিত ব্যয়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা আরও সতর্ক করেছেন যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে সারের দাম এবং পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। এর সাথে দেশের কিছু অংশে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। খাদ্য ও জ্বালানি খাত বাদে জুন মাসে মূল ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২.৮ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সিটিগ্রুপের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হোলেনহর্স্টের মতে, "ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল মূল্যস্ফীতি, যা সরাসরি তেলের দাম দ্বারা প্রভাবিত হয় না।"
তবে অনেক বিশেষজ্ঞই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন। তাদের মতে, মূল মূল্যস্ফীতির সহনীয় অবস্থান এটাই ইঙ্গিত দেয় যে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর পথে রাখতে পারে। প্যানথিওন ম্যাক্রোইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েল টম্বস মনে করেন, "জুনের ভোক্তা মূল্যসূচকের প্রতিবেদনটি এই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।"
ফলে জ্বালানির দামে সাময়িক স্বস্তি এলেও মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ সুদের চাপ থেকে মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের মুক্তি এখনই মিলছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে। ভূরাজনৈতিক এই অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দরপতন হয়েছে। অ্যারাবিয়ান বিজনেসের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিটকয়েনের দাম ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে এবং বর্তমানে এই ডিজিটাল মুদ্রার বাজারমূল্য ৬২ হাজার ৮০০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে।
সোমবার লেনদেনের শুরুর দিকে বিটকয়েনের দাম সাময়িকভাবে ৬৪ হাজার ২৫০ ডলার অতিক্রম করলেও দুই দেশের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত এর দাম কমতে শুরু করে। অথচ গত সপ্তাহে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার খবর আসার পরও বিটকয়েন ৬৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিটকয়েনের মূল্যে বড় ধরনের ওঠানামা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত ১ জুলাই এর দাম কমে ৫৭ হাজার ৮০০ ডলারে নামলেও সেখান থেকে প্রায় ১১ শতাংশ ঘুরে দাঁড়িয়ে বাজারমূল্য ৬৪ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছেছিল।
বাজার পর্যালোচনাকারীরা মনে করছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায়ীরা এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং সুদের হারের পূর্বাভাসের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে কড়া নজর রাখছেন। বিটকয়েনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাজার বিশ্লেষক নাগহাম হাসান জানান, বিটকয়েন এখন মূলত তিনটি কারণে চাপের মুখে রয়েছে। এগুলো হলো "অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও নতুন আইপিও কোম্পানির দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকে পড়া।"
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া এবং দেশ দুটির মধ্যে কোনো স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারে বিটকয়েনসহ অন্যান্য বিনিয়োগে সতর্কতা ও অনিশ্চয়তা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৩ দশমিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং জেনসন অ্যান্ড নিকলসন প্যাকেজিং লিমিটেডের মধ্যে একটি ভূমি লিজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বেজার সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, জেনসন অ্যান্ড নিকলসন প্যাকেজিং লিমিটেড জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬ দশমিক ৩৪ একর জমির ওপর তাদের কারখানা স্থাপন করবে। এই নতুন বিনিয়োগের ফলে দেশের শিল্পখাতে প্রায় ৬০০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে। এই কারখানায় মূলত উচ্চমানের রিজিড প্লাস্টিক পেইল, শিল্পে ব্যবহৃত রং, ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং এবং মেটাল প্যাকেজিং উৎপাদিত হবে, যা মূলত বার্জার পেইন্টসের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের চাহিদা পূরণ করবে।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, জেনসন অ্যান্ড নিকলসন প্যাকেজিং লিমিটেড দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টসের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, বার্জার পেইন্টস ইতিমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৪০ একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে এবং আগামী দুই মাসের মধ্যেই সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেজার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) সালেহ আহমদ এই বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর নতুন এ বিনিয়োগ বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। দ্রুত ও বিনিয়োগবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে বেজা কাজ করছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা স্বল্প সময়ে শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন শুরু করতে পারেন।"
জেনসন অ্যান্ড নিকলসন প্যাকেজিং লিমিটেডের পরিচালক এবং ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী তার বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রং শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে চায়।" একই সাথে তিনি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে একটি অমিত সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে ইউটিলিটি সেবা ও নীতিগত কিছু জটিলতা দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে জেনসন অ্যান্ড নিকলসন প্যাকেজিং লিমিটেডের পক্ষে রুপালী হক চৌধুরী এবং বেজার পক্ষে সালেহ আহমদ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এসময় উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বাড়ছে। মঙ্গলবার তেলের মূল্য প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা ২০২০ সালের মে মাসের পর এক দিনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় ১২টা ৫১ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য।
মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে সমঝোতা স্মারকটিকে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে পুনরায় যুদ্ধ ও অবরোধের পথে হাঁটায় বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোমবার ওমানের আঞ্চলিক জলসীমায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। ওই হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং প্রণালিতে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে ব্যয় আদায়ের ইঙ্গিত দেন।
বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের বন্দর আব্বাস এবং কিশ দ্বীপে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে দাবি করেছে স্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো।
সংকট কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, হুতিরা যদি লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারে আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। গ্যাবেলি ফান্ডসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সাইমন ওয়ং মনে করেন, এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত জুন মাসে প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বিশেষ করে শস্যজাতীয় খাদ্যের মূল্যে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের ফলে বৈশ্বিক খাদ্য বাজারে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সংস্থাটির মতে, মে মাসের সংশোধিত সূচকের চেয়ে জুনে এফএওর খাদ্য মূল্যসূচক গড়ে ১৩০ দশমিক ৩ পয়েন্টে নেমেছে, যা দশমিক ৪ শতাংশ কম। খবর ওয়ার্ল্ড-গ্রেইন ডটকম।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত মাসে সামগ্রিক খাদ্যমূল্য হ্রাসের পেছনে প্রধান কারণ ছিল শস্যের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়া। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের দেশগুলোতে দ্রুত ফসল কাটার সম্ভাবনা ও উন্নত সরবরাহের ফলে বিশ্ববাজারে গমের দাম ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কাকে অনেকাংশে প্রশমিত করেছে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারক দেশগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত এবং জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রভাবে ভুট্টার দাম এক লাফে ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বার্লি ও যবের দামেও যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪ এবং ৮ শতাংশ পতন লক্ষ্য করা গেছে।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, মাংস ও উদ্ভিজ্জ তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও শস্যের ব্যাপক দরপতনের কারণে সামগ্রিক মূল্যসূচক শেষ পর্যন্ত নিম্নমুখী ছিল। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, জুনে উদ্ভিজ্জ তেলের মূল্যসূচক মে মাসের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৯২৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মূলত অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় সরিষার তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং জৈব জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে পাম অয়েল ও সরিষার তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে দক্ষিণ আমেরিকায় সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে, অন্যান্য শস্যের দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দর ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এশিয়ায় ভারতের চালের ব্যাপক চাহিদা এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় জুনে এফএও চালের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান সামগ্রিক সূচকটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি হলেও ২০২২ সালের মার্চের ঐতিহাসিক রেকর্ড সর্বোচ্চের চেয়ে এখনো ১৯ শতাংশ কম রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও রাশিয়ার প্রধান জ্বালানি প্রকল্প ইয়ামাল এলএনজি থেকে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার ঠিক কয়েক মাস আগে সাইবেরিয়ার এই বিশাল প্রকল্পের প্রায় পুরো উৎপাদনই ইউরোপীয় দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের দেওয়া তথ্যমতে, বছরের প্রথমার্ধে ইয়ামাল এলএনজি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রায় ৯৮ লাখ ৯০ হাজার টন গ্যাস সংগ্রহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসেও রাশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাত সচল রাখতে ইউরোপের অর্থ ও বাজারের বড় ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি সংস্থা উরগেভাল্ডের একটি হিসাব অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ এলএনজি কেনার বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো পরিশোধ করেছে।
গ্যাস আমদানির দেশভিত্তিক তালিকায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ফ্রান্স সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ টন গ্যাস আমদানি করেছে। এর পরেই রয়েছে বেলজিয়াম (২৯ লাখ টন) এবং স্পেন (২৭ লাখ টন)। উরগেভাল্ডের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক প্রচারক সেবাস্টিয়ান রোটার্স এই পরিসংখ্যানকে 'উদ্বেগজনক' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা তীব্র হওয়ার পরও ইউরোপের এই আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে ইইউর বিধিমালা অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে রাশিয়ার এলএনজি কেনা নিষিদ্ধ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। ইয়ামাল এলএনজি থেকে আসা প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে দেশগুলোকে নিশ্চিত করতে হয় যে, তা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ। তবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাশিয়ার এলএনজি আমদানির ওপর ইউরোপের পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে, যার ফলে রাশিয়াকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে।
প্রকল্পটির সফলতার পেছনে বিশেষ ধরনের 'আর্ক৭ আইস-ক্লাস' ট্যাংকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। এই বিশেষায়িত জাহাজগুলো দ্রুত ইউরোপীয় বন্দরে যাতায়াত করতে পারে, যা রাশিয়ার রপ্তানি কার্যক্রমকে সহজতর করেছে। এর বিপরীতে এশিয়ায় পৌঁছাতে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয় বলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ওই অঞ্চলে ইয়ামালের রপ্তানি প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে। এমনকি এই আইস-ক্লাস জাহাজগুলো মেরামতের জন্য এখনো ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মতো ইউরোপীয় শিপইয়ার্ডের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
উরগেভাল্ডের সেবাস্টিয়ান রোটার্স মনে করেন, 'ইয়ামাল এলএনজি একটি ছোট বিশেষায়িত জাহাজ বহর, ইউরোপীয় বন্দর ও ইউরোপীয় সেবার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালায়। ইউরোপ এখনো এই তিনটি সুবিধাই দিয়ে যাচ্ছে।' ২০১৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইয়ামাল এলএনজি প্রকল্পের যাত্রা শুরু করেন, যা বর্তমানে রাশিয়ার বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। নোভাটেকের প্রধান মালিকানাধীন এই প্রকল্পে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস এবং চীনের সিএনপিসি অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, ইইউর নিষেধাজ্ঞার বিধানে কিছু 'অস্পষ্টতা' থাকায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু ইউরোপে নয়, প্রয়োজনে ইয়ামাল প্রকল্প থেকেই গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। এতে করে বাজারটির প্রধান মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই ইতিবাচক ধারার পেছনে মূলত ব্যাংক ও বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই), যেখানে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠান। তবে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও ডিএসইতে তা আগের কার্যদিবসের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেনের শুরু থেকেই ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দিনের সমাপ্তিতে ১৮১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৬৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৮টির দর। খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৬টি ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং ৪টির দাম কমেছে। বিমা খাতে ৩৫টি কোম্পানির দরবৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ২২টির। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৬৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডিএসইতে এদিন ১ হাজার ৪১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২৫০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা কম। লেনদেনের শীর্ষে ছিল মালেক স্পিনিং, যার ৫৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক এবং ২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। শীর্ষ দশের অন্য তালিকায় ছিল লাভেলো আইসক্রিম, সার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ফারইস্ট নিটিং ও লাফার্জহোলসিমের মতো প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপের শেয়ারে মিশ্র প্রবণতা ছিল। ‘জেড’ গ্রুপ বা লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৬৪টির দাম বেড়েছে এবং ৩৩টির দাম কমেছে। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো মানের ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যদিও ১০১টির দাম কমেছে। সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১৮ পয়েন্ট বেড়েছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২২টির দাম বেড়েছে এবং ৯১টির দাম কমেছে। সিএসইতে এদিন লেনদেন হয়েছে ৩০ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগের দিনের ১০ কোটি ১১ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের টানা ভারী বর্ষণ ও এর ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কেবল জনদুর্ভোগের কারণ নয়, বরং দেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট এই কৃত্রিম বন্যা এখন শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা
দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় বন্দরনগরী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে বর্হিনোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনও ধীর হয়ে পড়েছে। সড়ক ও মহাসড়ক তলিয়ে যাওয়ায় রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক সময়মতো বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না, যার ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত শিপমেন্ট মিস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও বৃষ্টির পানি ঢুকে বিভিন্ন শেডে রাখা কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য ও শিল্প কাঁচামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপদ সংরক্ষণাগার না থাকায় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ায় প্রায় প্রতি বছরই এই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
শিল্প ও ব্যবসা খাতে সংকট
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত জলাবদ্ধতার কারণে চরম সংকটে পড়েছে। কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব এবং বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বাড়তি পরিবহন ব্যয়, গুদাম খরচ ও ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। অনেক শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকরা জলাবদ্ধতার কারণে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এর বাইরে শিল্প কারখানার পরিবেশগত মান রক্ষায় যে বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আসাদগঞ্জে জলাবদ্ধতা গত এক দশকে হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি করেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতেও এসব এলাকার আড়তে পানি ঢুকে বিপুল পরিমাণ চাল, ডাল, চিনি ও মসলাসহ ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়েছে। বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজধানীর ভাসমান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্রেতা উপস্থিতি কমে যাওয়ায় এবং অনেক দোকান বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজি নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকাকে সংকটে ফেলছে।
বাজারমূল্য ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি
টানা বৃষ্টির প্রভাবে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। পণ্যবাহী ট্রাক পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় এবং অনেক ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবজি ও মাছের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুদিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পটল, বেগুন, করলাসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে মাছ ও ব্রয়লার মুরগির দামও ঊর্ধ্বমুখী, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর নিউমার্কেটের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক লেনদেনও স্থবির হয়ে পড়েছে।
কৃষি, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি
শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও জলাবদ্ধতা বড় আঘাত হেনেছে। শাকসবজি ও ফসলের খেত তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় কৃষকরা নিঃস্ব হচ্ছেন। অন্যদিকে, জলাবদ্ধতার ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অবকাঠামোগত দিক থেকে সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় সংস্কার কাজে সরকারের বিপুল পরিমাণ বাজেট ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান। এর মধ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলাবদ্ধতা নতুন করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলো কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমন্বিত ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার না হলে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতি বছরই জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে শহরের প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল দখল। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিক না হলেও পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তারা মনে করেন, যান্ত্রিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার চেয়ে প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অন্যথায় প্রতি বছর বৃষ্টির কারণে জাতীয় অর্থনীতির যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থমকে দিতে পারে। এখন কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলাই সময়ের প্রধান দাবি।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির শেয়ারের দাম ও লেনদেনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় কোম্পানি দুটির লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই-সিএসই) কর্তৃপক্ষ এই স্থগিতাদেশ প্রদান করে।
সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়িক কোনো অগ্রগতি বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের (পিএসআই) ঘোষণা ছাড়াই সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাজার পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় সোমবার সকালে দিনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য কোম্পানি দুটির শেয়ার কেনাবেচা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক মাসে উভয় কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুতগতিতে বেড়েছে। গত ১৪ জুন ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১৪৬ দশমিক ৩০ টাকা, যা ৯ জুলাই বৃদ্ধি পেয়ে ১৭০ দশমিক ৬০ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ কয়েক কার্যদিবসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারের দর বৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি। গত ২২ জুন এই শেয়ারের দাম ছিল ৩৭ দশমিক ৩০ টাকা, যা ৯ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ দশমিক ২০ টাকায়। মাত্র কয়েক দিনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৩২ দশমিক ৯০ টাকা বা ৮৮ দশমিক ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ হিসেবে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর আগে ডিএসই ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স ও উসমানিয়া গ্লাসের কাছে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে চিঠি পাঠালেও কোম্পানি দুটির পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। জবাবে তারা জানিয়েছে যে, "বর্তমানে তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত তথ্য নেই যা শেয়ারের দাম বা লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পারে।"
ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই শেয়ারের দাম ও লেনদেনের এই ব্যাপক উত্থানের পেছনে কোনো বিশেষ চক্রের কারসাজি বা গোপন তথ্য পাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা বর্তমানে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তের অংশ হিসেবে কোম্পানি দুটির কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অতিরিক্ত তথ্য তলব করা হয়েছে।
দেশের নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে, যেখানে সুদের হার হবে অনধিক ৭ শতাংশ। এর পাশাপাশি স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের বিকাশে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (প্রথম বাজেট) অধিবেশনের ২৩তম দিনে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান যে, তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িকভাবে উৎসাহিত করতে কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র (সিএমএসএমই) খাতের নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই বিশেষ তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং প্রয়োজনীয় জামানত প্রদান সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণের সুবিধা পাবেন।
স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি আরও সহজ করার লক্ষে অর্থমন্ত্রী জানান যে, ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পৃথক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের পাশাপাশি স্টার্টআপগুলোতে ইক্যুইটি বা সরাসরি মূলধনী বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্তাবধানে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশগ্রহণে ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, পিএলসি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো সরাসরি মূলধনী সহায়তা লাভ করতে পারবে।
দেশের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকারদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল পরিচালিত হচ্ছিল, যা ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার আরও একটি বৃহৎ তহবিল গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম কমানোর বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভ্যাটসহ প্রতি ভরি স্বর্ণালঙ্কারের দাম সর্বোচ্চ দুই হাজার ২১৬ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টায় বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এই নতুন দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বর্ণের মূল্য হ্রাসের পাশাপাশি রুপার দামও কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সংশোধিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাটসহ সবচেয়ে উন্নত মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। গতকাল পর্যন্ত এই মানের স্বর্ণের বাজারমূল্য ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা। এখন থেকে ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকায় কেনা যাবে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। নতুন দরে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৮৫৮ টাকা।
সপ্তাহের শুরুতেই বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। সোমবার সকালে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারসূচক নিম্নমুখী হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা মুদ্রা ও বন্ড বাজারেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের আশায় ডলারের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে মার্কিন মুদ্রার মান এবং সরকারি বন্ডের সুদহার উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেবেন, যার দিকে এখন পুরো বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা তাকিয়ে আছেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের কথা রয়েছে। যদিও জ্বালানির দাম আগের কয়েক সপ্তাহে কিছুটা কম ছিল, তবে বর্তমান উত্তেজনায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় তেলের দাম আগের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করানো হয়েছে, তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এই নৌপথে চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের দিকে নজর রাখছেন। মঙ্গলবার থেকে বড় মার্কিন ব্যাংকসহ নেটফ্লিক্স ও জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো প্রতিষ্ঠানের আয়ের তথ্য প্রকাশিত হবে। যদিও সিটি ব্যাংকের বিশ্লেষকরা প্রযুক্তি খাত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এখনো আশাবাদী, তবে সপ্তাহের শুরুতে শেয়ারবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। জাপানের নিক্কেই সূচকসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকেও বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে।
তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেব মনে করেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকবে। গত শনিবার গ্রাহকদের উদ্দেশে দেওয়া এক নোটে সহদেব বলেন, ‘এ সময়ের মধ্যে তেলের দামে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে, তবে তা এই সীমার মধ্যেই থাকবে।’ অন্যদিকে, আইজির বাজার–বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ মনে করেন, তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘জুন মাসে তেলের দাম যে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গেল, তার পেছনে বাজারের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা যতই নাজুক হোক, তা টিকে থাকবে। তবে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় প্রমাণিত হয়েছে, সে ধারণার ভিত্তি কতটা ভঙ্গুর ছিল।’ এদিকে মার্কিন বন্ডের সুদহার বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সোনার আকর্ষণ কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমেছে।