সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তীব্র নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভূরাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরগতির মুখে পড়লেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও এ-সংক্রান্ত পণ্যের বাণিজ্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বড় ভরসা হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে এই ধস নেমেছে। তবে ওইসিডির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল শেষে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৯ শতাংশে এবং ২০২৭ সালে তা সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভোক্তা পর্যায়ে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ বছরের এই সময়ের তুলনায় গত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অবশ্য চীন নিজের জ্বালানি আমদানি ও তেলের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তবে জুন ও জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও আগস্টে জি-২০ জোটভুক্ত বহু দেশে তা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। ক্রমবর্ধমান এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বৃদ্ধি করে চলেছে।
বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ওপর ভর করে মার্কিন অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যার ফলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার শক্তিশালী অর্থনৈতিক গতি বজায় রেখে চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবর্তনের কারণে চীনে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ইউরোজোনে ২০২৬ ও ২০২৭ উভয় বছরই প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও তুরস্ক ২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের পরও বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে এশীয় দেশগুলো থেকে এআই-সম্পর্কিত প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তবে গত জুলাইয়ে একাধিক দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন দ্বিপাক্ষিক শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করেছে। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড ইল্ড গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। একই সাথে ক্রমবর্ধমান ঋণ ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। এছাড়া ‘এল নিনো’র মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছে ওইসিডি।
ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট আরও তীব্র রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’। একই সঙ্গে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য পূর্বাভাস ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৯৫ ডলার নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংক অব আমেরিকার গ্লোবাল কমোডিটিজ বিভাগের প্রধান ফ্রান্সিসকো ব্লাঞ্চের নেতৃত্বাধীন বাজার কৌশলবিদদের এক নোটে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, বিকল্প নৌপথ ব্যবহার এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচলের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতির একটি অংশ আপাতত সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। উল্লেখ্য, সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
তবে বিকল্প রুটে তেল পরিবহন বাড়াতে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উদ্যোগ বাজারে সাময়িক স্বস্তি জুগিয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর হামলার শিকার হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত সৌদি আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনটি মঙ্গলবার পুনরায় সচল করা হয়। সীমিত পরিসরে তেল সঞ্চালন শুরু হওয়ায় ইয়ানবু বন্দর থেকেও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে আরামকো। এই ইতিবাচক খবরের পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেলের দর কিছুটা কমে আসে। নভেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুড ১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ২৫ ডলারে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড ১ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৪ দশমিক ৯৯ ডলারে স্থির হয়।
ব্যাংক অব আমেরিকা পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বর্তমান সংকট কেটে গেলে ২০২৭ সাল নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক ও কৌশলগত তেলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় স্বল্পমেয়াদে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি বহাল রয়েছে। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক আয়ের অনুপাতে তেলের দাম এখনো এমন কোনো চরম সীমায় পৌঁছেনি যা তেলের চাহিদায় ব্যাপক ধস নামাতে পারে, আবার বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি।
মন্দা ও শ্লথগতির সব পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে ইউরোজোনভুক্ত দেশগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মধ্যেও জ্বালানির চড়া মূল্যের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তীব্র উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক আর্থিক জরিপ সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোজোনের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতির পরিমাপক ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ফ্ল্যাশ ইউরোজোন কম্পোজিট পিএমআই’ আউটপুট সূচক সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৫৩ দশমিক ১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৫২ দশমিক শূন্য পয়েন্ট। এটি ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে সর্বোচ্চ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক পূর্বাভাসে সূচকটি কমে ৫১ দশমিক ৭ পয়েন্টে নামার আশঙ্কা করা হলেও প্রকৃত ফলাফল অর্থনীতিবিদদের চমকে দিয়েছে। সাধারণত অর্থনীতিতে পিএমআই সূচক ৫০ পয়েন্টের ওপরে থাকাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ বা প্রবৃদ্ধি হিসেবে গণ্য করা হয়।
মূলত সেবা ও উৎপাদন—উভয় খাতের সম্মিলিত অবদানের ফলেই এই গতি সঞ্চার হয়েছে। এর মধ্যে সেবা খাতের পিএমআই ৫১ দশমিক ৬ পয়েন্ট থেকে লাফিয়ে ৫৩ দশমিক শূন্য পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে উৎপাদন খাতের সামগ্রিক সূচক ৫২ দশমিক ৭ পয়েন্টে অপরিবর্তিত থাকলেও এ খাতের উৎপাদন পরিমাপক সূচকটি কিছুটা বেড়ে ৫৩ দশমিক ৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোজোনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও রপ্তানি বাড়ার ওপর ভর করে নতুন পণ্যের ক্রয়াদেশ গত চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগ বাড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
অর্থনীতির এমন শক্তিশালী অবস্থান ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (ইসিবি) আবারও সুদের হার বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রধান বিজনেস ইকোনমিস্ট ক্রিস উইলিয়ামসন জানান, ভূরাজনৈতিক সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানো ইতিবাচক হলেও তা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে বছর শেষ হওয়ার আগেই, বিশেষ করে আগামী অক্টোবরের বৈঠকেই ইসিবি নতুন করে সুদহার বাড়ানোর জোরালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। উল্লেখ্য, জ্বালানিকেন্দ্রীক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইসিবি চলতি বছর ইতিমধ্যেই দুই দফা সুদের হার বাড়িয়েছে এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে আগামী বছরের জুনের মধ্যে আরও তিন দফা সুদহার বাড়ানো হতে পারে।
দেশীয় মুদ্রা টাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেন ও আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তি আরও সহজ করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বিধিমালার আওতায় বিদেশি অংশীদার ব্যাংকগুলোর নামে কোনো ধরনের প্রাথমিক জমা ছাড়াই ‘টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ খোলা ও পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ থেকে সার্কুলার নং-৩৮ জারির মাধ্যমে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) শাখাকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু বক্কার সিদ্দিক এতে স্বাক্ষর করেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশি বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ঋণপত্র (এলসি), চুক্তি ও ইনভয়েস অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রায় খোলা গেলেও লেনদেন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সময় তা প্রচলিত বিনিময় হারের ভিত্তিতে টাকায় রূপান্তর করতে হবে। আমদানিকারকেরা স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা সংশ্লিষ্ট ভস্ট্র অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক দায় শোধ করবেন এবং নির্ধারিত শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে এসব অ্যাকাউন্টে ওভারড্রাফট সুবিধাও গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে অংশীদার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নথিপত্র আদান-প্রদান নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে থাকা অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত অর্থ দেশীয় অর্থনৈতিক খাতে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্দেশনানুযায়ী, এ অর্থ বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট, অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ কিংবা বিদেশে রেমিট্যান্স আকারে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে।
বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘আইএমপি’ ও ‘এক্সপি’ ফরম সংক্রান্ত বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সাথে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিত করতে ‘নো ইউর কাস্টমার’ বা কেওয়াইসি নীতি শতভাগ অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া যেসব দেশ অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন মুদ্রায় লেনদেনে আগ্রহী, তাদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে বিদেশে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আওতা বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ফ্যামিলি কার্ডধারী স্বল্প আয়ের পরিবারের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহের লক্ষ্যে ৭৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ খাদ্যপণ্য কেনা হবে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত এ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার গ্যারান্টির আওতায় এ ক্রয়ের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মসুর ডাল ক্রয়ের জন্য প্রকাশিত উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেওয়া চারটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। এতে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে খুলনার ‘জয়তুন অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেড’। টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) সুপারিশের ভিত্তিতে টিসিবির নির্দিষ্ট গুদাম পর্যন্ত পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতি কেজি মসুর ডালের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ টাকা ৮৯ পয়সা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির মাধ্যমে বিতরণের উদ্দেশ্যে মোট ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৭ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে অনুমোদিত এই ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল যুক্ত হলে সংস্থার নিরাপত্তা মজুত আরও সুদৃঢ় হবে, যা সরকারের চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিয়মিতভাবে কার্ডধারী পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করা হবে।
দেশে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপযোগ সেবা সংযোগের লক্ষ্যে ৩ হাজার ৬২৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৫ টাকা ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। চীন সরকারের ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস পাইপলাইন, বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উত্থাপিত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ শীর্ষক কাজটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে বিনিয়োগ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটির সভায় প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এক ধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দাখিলকৃত দরপত্র যাচাই-বাছাই ও দরকষাকষি শেষে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়। চলতি বছরের ২০ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগ প্রকল্পটির পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রস্তাবনা অনুমোদন করে, যার মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অনুমোদিত প্যাকেজের আওতায় শিল্পাঞ্চলে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রশস্ত একটি সড়ক এবং ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ ও ২৪ মিটার প্রশস্ত আরেকটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশালাকার পানি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য দৈনিক ৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনে সক্ষম সঞ্চালন লাইন ও জেলা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ২৫ মিলিয়ন লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হবে।
পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি আধুনিক বহুমুখী জেটি, একটি কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর এবং দুটি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল নিশ্চিতের অংশ হিসেবে কঠিন বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক শোধন, শোধিত পানির পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও এই প্যাকেজের আওতায় স্থাপন করা হবে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে সব ধরনের ইলিশ মাছ আমদানি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পূর্বে ইস্যুকৃত ইলিশ আমদানির ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করার পর আজ থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব অনাপত্তি সনদ বাতিল ঘোষণা করা হয়, যার প্রেক্ষিতে স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারত থেকে ইলিশের চালান প্রবেশ স্থগিত হয়ে যায়।
হঠাৎ করে আমদানি বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খোলাসা না করা হলেও বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দেশীয় জেলেদের স্বার্থ সুরক্ষার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্দর সূত্রে জানা যায়, প্রতি কেজি ভারতীয় ইলিশের আমদানি মূল্য ৪৮ সেন্ট থেকে সর্বোচ্চ ২ ডলার পর্যন্ত দেখানো হচ্ছিল, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৫০০ টাকা। অথচ সেই ভারতীয় ইলিশকে দেশের বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে প্রচার করে প্রতি কেজি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছিল। এর পাশাপাশি ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের আশঙ্কা এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে স্থানীয় জেলেদের উৎসাহ বজায় রাখতে সরকার এ আমদানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বাজার তদারকির সময় ভারতীয় ইলিশ প্রতারণামূলকভাবে চড়া দামে বিক্রির দায়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করেছে প্রশাসন। বেনাপোল মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার আলোকে বন্দর দিয়ে ইলিশের নতুন কোনো চালান দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে বেনাপোলসহ আশপাশের বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে আকস্মিকভাবে আমদানির অনুমতিপত্র বাতিল করায় বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার দাবি করেছেন আমদানিকারকেরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানির উদ্দেশ্যে ভারতীয় অংশে এলসি খুলে যে পরিমাণ ইলিশ মজুত রাখা হয়েছিল, তা এখন বাধ্য হয়ে লোকসানে ফেরত দিতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে সর্বমোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ মেট্রিক টন ইলিশ দেশে পৌঁছেছে। বাতিলকৃত ১০৩টি সনদ বাদে অবশিষ্ট অনুমোদনের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সৌদি আরবের কৌশলগত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে পুনরায় তেল সরবরাহ শুরু হওয়া এবং চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতে বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এর প্রভাবে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের তেলের দামেই পতন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ১৮ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৫ সেন্ট হ্রাস পেয়ে ৯০ ডলার ১৭ সেন্টে লেনদেন হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়টি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও মঙ্গলবার তা আবার চালু করা হয়। লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা যায়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। তবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশনগুলোর মেরামত সম্পন্ন করে পাইপলাইনটির শতভাগ সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও জ্বালানি বাজারে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ হ্রাস করে বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এর আগে মঙ্গলবারই গত ৮ সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন দরে পৌঁছেছিল।
যদিও যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা আসেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনায় বাজার থেকে অতিরিক্ত ঝুঁকির চাপ অনেকটাই কমছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে।
ভারতীয় রুপির বিপরীতে বিগত দুই বছরে দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে বাংলাদেশি টাকা। এই দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্য বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যার মধ্যে কেবল গেল এক বছরেই টাকার মান বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রতি এক টাকার বিপরীতে মিলছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭৮ ভারতীয় রুপি। এর আগে ২০২৫ সালের একই দিনে এক টাকায় পাওয়া যেত প্রায় শূন্য দশমিক ৭২ রুপি এবং ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এর পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৭০ রুপি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রুপির বিপরীতে টাকার মান ৫ দশমিক ৫ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় মুদ্রায় টাকার সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিপরীত হিসাবেও রুপির তুলনায় টাকার শক্তিশালী অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বর্তমানে এক ভারতীয় রুপি কিনতে যেখানে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ২৮ টাকা, সেখানে গত বছরের একই সময়ে প্রয়োজন হতো প্রায় ১ দশমিক ৩৮ টাকা। অর্থাৎ এক রুপির জন্য এখন আগের চেয়ে ৯ দশমিক ৭২ পয়সা বা ৭ দশমিক ১ শতাংশ কম টাকা লাগছে। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি এক রুপির বিনিময় মূল্য ছিল ১ দশমিক ৪৩ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও টাকার এই ইতিবাচক ধারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রুপির বিপরীতে টাকার ক্রস রেট ছিল ১ দশমিক ২৭৮৯ টাকা থেকে ১ দশমিক ২৭৯৬ টাকা, যার ফলে প্রতি টাকার বিপরীতে শূন্য দশমিক ৭৮১ থেকে শূন্য দশমিক ৭৮২ রুপি মিলেছে।
টাকার এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে জানান, রুপির বিপরীতে টাকার শক্ত অবস্থান দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে ইতিবাচক গতি আনবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর ও পণ্য পরিবহন খরচ অপরিবর্তিত থাকলে ভারত থেকে কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। ফলে ভারতীয় পণ্য ও সেবা আমদানির ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাবেন।
বাণিজ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়া সাধারণ বাংলাদেশিরাও এর সরাসরি সুফল পাবেন বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। তাঁর মতে, রুপির মান কমে যাওয়ায় ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের হোটেল ভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ টাকার হিসাবে আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হবে। তবে আমদানি পণ্যের চূড়ান্ত বাজারদর কেবল মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারদর, শুল্ক কাঠামো এবং লজিস্টিক ব্যয়ের ওপরও নির্ভর করে। মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার বিনিময় হারের গতিবিধি সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’-এ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪ শতাংশের ঘরে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ায় বিদায়ী অর্থবছরের শেষভাগে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছিল, তবে সার্বিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। বিশেষ করে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চার হওয়া প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং জানান, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই অগ্রযাত্রা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। তিনি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিবেশের সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেন।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। এডিবির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশে থাকা সাধারণ মূল্যস্ফীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খাদ্যপণ্যের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া রপ্তানির তুলনায় আমদানির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ বজায় থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও ডলারের মজুত সুরক্ষায় তা বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতির খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় এডিবি জানিয়েছে, আগামী দিনে কৃষি ও সেবা খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান খুঁটি হিসেবে অবদান রাখবে। তবে ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি স্বল্পতা এবং বহির্বিশ্বে চাহিদা হ্রাসের কারণে শিল্প ও বৃহৎ বিনিয়োগ খাতে কিছু চাপ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম, বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, টাকার ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্কারের ধীরগতিকে প্রধান অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে সতর্ক করেছে এডিবি।
রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড করেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় করার পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮ লাখ টাকা যা গত অর্থ বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশী।
মঙ্গলবার মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে বাগেরহাট ও মোংলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বন্দরের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও আর্থিক সাফল্যের এসব তথ্য তুলে ধরেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বন্দর কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও বেড়েছে বন্দরের কার্যক্রম। অর্থবছরটিতে ২৫ হাজার টিইইউজের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে মোংলা বন্দর দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বন্দর ব্যবহারকারী, শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে। জাহাজ আগমন বাড়াতে ‘ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি’র মাধ্যমেও কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি, কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউজ এবং গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট। ভবিষ্যতে এ সক্ষমতা আরও বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের আপগ্রেডেশন এবং কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণ।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলে শিপিং, সিএন্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরকে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া এ প্রকল্পের ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধের পাশাপাশি পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমানো এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বন্দরের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও তা ধরে রাখা। পাশাপাশি নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি করে মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সঙ্গে সরাসরি ফিডার জাহাজ চলাচল বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। উন্নয়ন প্রকল্প ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ফলে গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।
বিপিসি’র চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও সরকার জনগণের কথা বিবেচনা করে এতদিন জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এতে গত প্রায় ছয় মাসে বিপিসিকে অতিরিক্ত ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি’র অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ছয় মাসের এই অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবে মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা করে বিপিসির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসি’র লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৭০ টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করা হলে বিপিসির বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ঘোষিত ৩৫০ বিলিয়ন (৩৫ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় প্রথম প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। মঙ্গলবার দেশটির সরকার জানিয়েছে, প্রথম প্রকল্প হিসেবে টেক্সাসে একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মুনাফা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের মধ্যেই আরও দুটি বড় প্রকল্প বিবেচনায় রাখছে সিউল। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ানের একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের পর সংসদ সদস্য চুং চিন-উক সাংবাদিকদের জানান, টেক্সাসের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি পারমাণবিক চুল্লিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে সরকার। গত বছরের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার যে সমঝোতা হয়েছিল, তা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আইনপ্রণেতাদের এই ব্রিফিং দেওয়া হয়।
শিল্পমন্ত্রী কিম রয়টার্সকে জানান, বিনিয়োগের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারি বিনিয়োগ কমিটির অনুমোদন এবং দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের সঙ্গে আরও আলোচনার প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইউনহাপ জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টেক্সাস বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পারমাণবিক প্রকল্প
তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের এনসিনালে ৬.৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূলত এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ডেটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ইউনহাপ জানায়, প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন দক্ষিণ কোরিয়া করলেও এর মালিকানা মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে সমানভাবে (৫০:৫০) ভাগাভাগি করা হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বড় অঙ্কের তহবিল ছাড়ের প্রয়োজন হতে পারে।
চুং চিন-উক আরও জানান, সিউল মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্টিংহাউস’-এর ৫ থেকে ১০ শতাংশ শেয়ার কেনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ‘আলাস্কা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’ (এলএনজি) প্রকল্পে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্রে মোট আটটি বড় পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে দুটি নির্মিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব ‘এপিআর১৪০০’ মডেলে এবং বাকি ছয়টিতে ব্যবহার করা হবে ওয়েস্টিংহাউসের ‘এপি১০০০’ ডিজাইন। এছাড়া নিজস্ব মুদ্রা ‘ওন’-এর বিনিময় হারে সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করতে চাইছে।
ট্রাম্পের চাপ ও বাণিজ্যিক মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ
জাপানের মতো অন্যান্য দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাচ্ছে অভিযোগ করে মার্কিন কর্মকর্তারা সমালোচনা করে আসছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন এ নিয়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছিল। এছাড়া ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে পর্যাপ্ত সহায়তা না দেওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘কুপাং’-এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সিউলের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে বিনিয়োগ দ্রুত এগিয়ে নিতে চাইছে সিউল।
এর আগে গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জানান, প্রকল্পভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনায় বাণিজ্যিক উপযোগিতা বা মুনাফার প্রশ্নটি একটি বড় জটিলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং সিউল বিনিয়োগকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পলিসি গ্রুপ ‘কোরিয়া ইকোনমিক ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা’র জ্যেষ্ঠ গবেষক হিউন জুং জে বলেন, "প্রথম প্রকল্পের ঘোষণা একটি অর্থপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে উভয় দেশ একটি বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করতে পেরেছে, যা উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি প্রতিশ্রুতির চেয়ে এর বাস্তবায়ন ও ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।"
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সোগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম ইয়ং-জিন বলেন, টেক্সাস বিদ্যুৎ প্রকল্প কোরিয়ান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মার্কিন বাজারে প্রবেশের পথ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ওয়েস্টিংহাউসের অংশীদারিত্ব দক্ষিণ কোরিয়ার মেধা সম্পত্তি রক্ষায় সহায়তা করবে এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা এই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মুনাফা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০ বছরের মুনাফা ফেরত কাঠামোর আওতায় টেক্সাস প্রকল্পটি লাভজনক হবে। দেশটির কৌশলগত বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উপযোগিতাহীন কোনো প্রকল্প যদি জাতীয় নিরাপত্তা বা সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষার স্বার্থে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।