সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাগজ বা হার্ডকপি আকারে জমা দেওয়া সকল ভ্যাট রিটার্ন ই-ভ্যাট সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার সময়সীমা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। রবিবার (৭ জুন) সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন এন্ট্রি সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্লোজিং ব্যালেন্স ২০২৬ সালের মে মাস থেকে ‘ফ্রিজ’ বা ‘অপরিচালন যোগ্য’ হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই স্থিতির বিপরীতে কোনো প্রকার সমন্বয় করা যাবে না। মূলত করদাতাদের দাখিলকৃত পূর্ববর্তী সকল মাসিক রিটার্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘হার্ড কপি রিটার্ন এন্ট্রি’ নামে একটি বিশেষ সাব-মডিউল চালুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ই-ভ্যাট সিস্টেম পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হার্ডকপি রিটার্ন এখনও অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আগামী জুলাই মাস থেকে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই এই সময়সীমা আরও তিন মাস বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, ভ্যাট রিফান্ড বা অর্থ ফেরতের আবেদন বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শতভাগ রিটার্ন অনলাইনে থাকা এখন থেকে বাধ্যতামূলক। ফলে পূর্বের সকল রিটার্ন সিস্টেমে এন্ট্রি না করলে কোনো প্রতিষ্ঠান রিফান্ডের আবেদন করার যোগ্যতা হারাবে। রাজস্ব প্রশাসনে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করতেই এনবিআর এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে সকল করদাতার সহযোগিতা কামনা করেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে রবিবার (৭ জুন) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একাধিক নিলাম পদ্ধতি অনুসরণ করে দুইটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এই বৈদেশিক মুদ্রা কেনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এদিন প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসের এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে। এছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪১৬ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, টাকার বিনিময় হারের অস্থিরতা কমানোর পাশাপাশি প্রবাসী আয় ও রফতানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারে চলমান কৌশলের অংশ হিসেবেই বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কেনা হচ্ছে।
দেশের ফল রফতানি খাতে এক নজিরবিহীন সাফল্য অর্জিত হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ফল রফতানি করে বাংলাদেশ ১২ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় করেছে। আগের পুরো অর্থবছরে এই খাতের আয় ছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফল রফতানি থেকে আয় বেড়েছে ৮২ শতাংশেরও বেশি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছর ধরে এই খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে আয় ছিল মাত্র ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার, সেখান থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে এই বিশাল উল্লম্ফন জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রফতানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে বাদাম (তাজা বা শুকনো) এবং তাজা ফলের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে। এছাড়া হিমায়িত ফল ও বাদাম রফতানি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ফলের প্রধান বাজার হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশি ফলের বিশাল চাহিদা এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তবে আন্তর্জাতিক মূলধারার বাজারে এখনও বাংলাদেশের ফলের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারেনি। মূলত বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান নিয়ন্ত্রণ, উন্নত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রফতানি পণ্যের তালিকায় গ্রীষ্মকালীন ফল আম এখনও শীর্ষে রয়েছে। এর পাশাপাশি পেয়ারা, কাঁঠাল, আনারস, লিচু ও কলার চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোতে ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফি চাষের প্রসারের ফলে রফতানিযোগ্য ফলের একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও চুক্তিভিত্তিক চাষের প্রসারের ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মান ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে রফতানি বৃদ্ধিতে লজিস্টিকস এবং অবকাঠামোগত কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। উচ্চ বিমান ভাড়া, মৌসুমে কার্গো পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব রফতানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া কোয়ারেন্টিন সনদ প্রদান ও প্যাকেজিং সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা পর্যায়ের রফতানিকারকরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই সেবাগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে ফল রফতানি আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। আম রফতানির বর্তমান মৌসুম শেষে আয়ের এই অংক আরও বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রফতানি আয় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩.৪১ শতাংশ কমে ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের ফলে গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই এই খাতের সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় রফতানিকারকদের মধ্যে বর্তমানে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান গন্তব্য হলেও বর্তমান অর্থবছরে সেখানে রফতানি ৪.৮৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে মোট রফতানি আয় হয়েছে ১৭.৩৬ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপের দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তারা এখন পোশাক ক্রয়ে অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। একই সাথে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও রফতানি প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আয় ০.০৪ শতাংশ কমে ৭.০৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মার্কিন খুচরা বিক্রেতারা নতুন অর্ডারের চেয়ে পুরনো মজুত শেষ করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। কেবল বড় বাজারগুলোই নয়, গত কয়েক বছর ধরে বাজার বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে যেসব অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও রফতানি আয় প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৫.৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারেও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
পণ্যের ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিটওয়্যার খাতে রফতানি ৪.২৬ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি ২.৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। টি-শার্ট, সোয়েটার থেকে শুরু করে ওভেন শার্ট ও জ্যাকেট—সব ধরণের পণ্যের চাহিদাই আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে নিম্নমুখী। ক্রেতারা এখন কেবল ক্রয়াদেশ কমিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, বরং উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য রফতানিকারকদের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছেন। অভ্যন্তরীণভাবে ক্রমবর্ধমান গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের নতুন মজুরি কাঠামোর কারণে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় রফতানিকারকরা বর্তমানে উভয়সংকটে রয়েছেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, “চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের রফতানি চিত্র থেকে স্পষ্ট যে বৈশ্বিক বাজারে এখনও চাহিদার পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হয়নি। ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন এবং অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বেশি সতর্ক। ফলে রফতানি আয় ও মুনাফা– দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হচ্ছে।” তার মতে, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান এবং অপ্রচলিত বাজারেও আয় কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এখন প্রায় সব বাজারেই ছড়িয়ে পড়েছে।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা এই খাতের শক্তিশালী ভিত ও স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দেয়। প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে একমাত্র কানাডায় ২.২৭ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা কিছুটা স্বস্তি জোগাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো সম্ভব হলে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ববাজারে তার হারানো অবস্থান ফিরে পেতে পারে। বর্তমান এই মন্দা কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং নতুন ক্রেতা আকর্ষণের বিকল্প নেই। বৈশ্বিক চাহিদার পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত রফতানি আয়ের এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশে ৩৭৫ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি বা তৈরি অবস্থায় (সিবিইউ) আমদানির ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বর্তমানে ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি আমদানির সুযোগ না থাকলেও ২০২৬-২০২৯ সালের জন্য প্রস্তাবিত নতুন আমদানি নীতি আদেশে এই সিসিসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই বিধান কার্যকর হলে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির মোটরসাইকেল বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি করে বিপণন করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে এবং চলতি মাসেই চূড়ান্ত আদেশ জারি হতে পারে বলে জানা গেছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের উদীয়মান মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী শিল্প খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে দেশে ইতিমধ্যে জাপানি ও ভারতীয়সহ বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের প্রায় ১০টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এসব কারখানায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত মোটরবাইকগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে নতুন কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে তৈরি বাইক আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে, যা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এছাড়া কিছু অসাধু আমদানিকারক কম মূল্য দেখিয়ে বা কর ফাঁকি দিয়ে উচ্চ সিসির বাইক নিয়ে আসার সুযোগ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা বলছেন যে ঘনঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ ও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তার বিষয়েও নতুন চ্যালেঞ্জের কথা সামনে আসছে। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেল রয়েছে। জনসাধারণের জন্য এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্ষমতার বাইক উন্মুক্ত করে দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১০ লাখ উৎপাদনের বার্ষিক লক্ষ্যের বিপরীতে দেশে বর্তমানে ৫ লাখের কম বাইক বিক্রি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক খাতের স্বার্থ বিবেচনা না করে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা অনুযায়ী নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
বিশ্ববাজারে ইস্পাত তৈরির উপকরণের মূল্য গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি মাসে চীনের বাজারে প্রতি টন স্টিল রেবারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ ইউয়ানে, যার ফলে বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইস্পাতের দাম ৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চীন সরকার কর্তৃক গৃহীত বেশ কিছু বড় ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কারণেই বাজার পরিস্থিতিতে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। খবর হেলেনিক শিপিং।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইস্পাতের প্রধান ব্যবহারকারী খাত হিসেবে আবাসন বা গৃহনির্মাণ শিল্পকে বিবেচনা করা হয়। শীর্ষস্থানীয় রেটিং প্রদানকারী সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী বছরের মধ্যে চীনে আবাসন খাতের দরপতনের প্রবণতা ধীর হয়ে আসতে পারে। দেশটির স্থানীয় প্রশাসনগুলো আবাসন বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে শেনজেন অঞ্চলে বাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পূর্বের কঠোর বিধিমালা শিথিল করা হয়েছে এবং গুয়াংজু এলাকায় আবাসন খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসকল উদ্যোগের ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই ধাতুর চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবাসন শিল্পের পাশাপাশি চীনের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও বর্তমানে ইস্পাতের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে চাহিদার বিপরীতে বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, চীনে ইস্পাতের বার্ষিক উৎপাদন ২ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৮ সালের পর থেকে জুন মাসের হিসেবে সর্বনিম্ন উৎপাদন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সরকারি মেগা প্রকল্পের কারণে বাড়তি চাহিদা এবং অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার দ্বিমুখী প্রভাবে ইস্পাতের বাজারমূল্য আরও কিছুকাল চড়া থাকতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধের মুখে পড়ে গত মে মাসে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে একটি অস্থির যুদ্ধবিরতি চললেও ওয়াশিংটন কর্তৃক তা বারবার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মূলত তেহরানকে একটি নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির শর্তাবলীতে রাজি করাতে গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে এই অবরোধ শুরু করে মার্কিন প্রশাসন। তেহরান এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তখন সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও ইরান উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করে লাভবান হয়েছিল। তবে মে মাস থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ায় সেই সুবিধাজনক অবস্থান এখন সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান তথ্য অনুসারে, ইরানের রফতানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, যা বর্তমানে মার্কিন নজরদারিতে রয়েছে।
বাণিজ্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কেপলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের তেল রফতানি মে মাসে ৩ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে। জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রকাশনা লয়েডস লিস্টের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চের তুলনায় মে মাসে ইরানের জ্বালানি খাত থেকে আয় প্রায় ৮৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মার্চ মাসে দেশটি যেখানে দৈনিক ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করে প্রায় ৫১৩ কোটি ডলার আয় করেছিল, মে মাসে সেই মাসিক আয় কমে মাত্র ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। লয়েডস লিস্ট আরও জানিয়েছে যে, এপ্রিল পর্যন্ত গত ১২ মাসের গড় রফতানির তুলনায় মে মাসে রফতানি কমেছে প্রায় ৮৭ শতাংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ইরানের রফতানি তলানিতে নামার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিক্রি করতে না পারায় ইরান বর্তমানে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে সংরক্ষিত আছে। এ প্রসঙ্গে জ্বালানিনীতি গবেষক ও পরামর্শক মার্ক আয়ুব আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান কৌশলগতভাবে অবশিষ্ট সংরক্ষণ-ক্ষমতা ব্যবহার করছে। তথ্য বলছে, অবরোধ কার্যকর হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত চাপ তৈরি হবে তখনই, যখন এই সংরক্ষণ সক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধের মূল উদ্দেশ্য উৎপাদন বন্ধ করা নয়, বরং তেল বিক্রির অর্থপ্রবাহ আটকে দেওয়া। বিশেষ করে চীনের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরান এখন বড় বাধার সম্মুখীন। যদিও রেলপথকে বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তবে সমুদ্রপথের বিশাল চালানের তুলনায় ট্রেনযোগে তেল পরিবহন অত্যন্ত নগণ্য ও ব্যয়বহুল।
এ সংকটের প্রভাব কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় খোদ মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মার্ক আয়ুবের মতে, ‘শেষ পর্যন্ত যে ধরনের চুক্তিই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন একটাই—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। হয় ইরান কোনো না কোনোভাবে সেখানে প্রভাব বজায় রাখবে, নয়তো এই সংঘাত আরও কয়েক মাস চলতে পারে।’ এক গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর হাতে জব্দ হওয়ার ভয়ে ইরান বর্তমানে ভিএলসিসি ট্যাংকারের পরিবর্তে ছোট আকারের জাহাজ ব্যবহার করে তেল সররাহের চেষ্টা করছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক আভাস দিচ্ছেন, তবে তেহরান তাদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত ও অবরোধ প্রত্যাহারের মতো কঠিন শর্তে অটল রয়েছে।
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষে ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতিতে এক ঐতিহাসিক ও আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসে বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের চিরচেনা নিয়মটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে বছরে মাত্র চারবার বা তিন মাস পর পর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক বোঝা ও হয়রানি যেমন কমবে, তেমনি সাশ্রয় হবে বাড়তি খরচও। এনবিআর জানিয়েছে, পুরো ভ্যাট ব্যবস্থাকে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করা হচ্ছে। ফলে রিটার্ন দাখিলের জন্য করদাতাদের আর সনাতন কাগজের ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান অডিটের আওতায় এলেও তাদের আর কাগুজে নথিপত্র দিতে হবে না। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ইআরপি সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের যাবতীয় লেনদেনের হিসাব রাখে, তবে সেই ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিট সম্পন্ন হবে। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না বললেই চলে।
বর্তমানে কার্যকর ভ্যাট আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে ‘মূসক-৯.১’ ফরমে রিটার্ন জমা দিতে হয়। নির্ধারিত সময়ের সামান্য এদিক-সেদিক হলেই গুনতে হয় বড় অঙ্কের জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মাসিক ব্যবস্থাকে একটি বড় বোঝা হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। এই জটিলতার কারণেই অনেক ব্যবসায়ী ভ্যাট জালের বাইরে থাকতে পছন্দ করতেন। এনবিআর আশা করছে, নতুন ও সহজ এই পদ্ধতি চালুর ফলে ব্যবসায়ীরা কর প্রদানে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন এবং কর ফাঁকির প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রেকর্ড ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছিল। এই সহজ এবং ব্যবসাবান্ধব ত্রৈমাসিক রিটার্ন পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারের বড় ধরনের উত্থানের প্রভাবে গত এক বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে মিলিয়নেয়ার বা লাখপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। ক্যাপজেমিনি ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ রিপোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী লাখপতির সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মোট ২ কোটি ৫৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৯৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ৯৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি। সিএনবিসি সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিবেদনটিতে লাখপতি বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে যাদের নিজস্ব আবাসস্থল ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সামগ্রী বাদে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ১০ লাখ ডলার। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ লাখপতিদের তুলনায় অতিধনী বা ‘আল্ট্রা-হাই-নেট-ওয়ার্থ’ ব্যক্তিদের সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি। বিশেষ করে যাদের ৩ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ রয়েছে, তাদের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে আড়াই লাখে দাঁড়িয়েছে। এই অতিধনীরা মোট লাখপতিদের মাত্র ১ শতাংশ হলেও বিশ্বের সম্মিলিত লাখপতি সম্পদের ৩৫ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে নতুন লাখপতি তৈরির দৌড়ে যথারীতি শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে গত বছর ৭ লাখ ৩০ হাজার নতুন লাখপতি যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭ লাখ ৩০ হাজারে। আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়া অঞ্চলেও উল্লেখ্যযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেখানে লাখপতির সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৮৩ লাখ ৭০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের ৭৬ শতাংশ উত্থান এবং তাইওয়ানের চিপ খাতের প্রভাবে এবার এশিয়ায় এই দুই দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউরোপে লাখপতি বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ, তবে মধ্যপ্রাচ্যে এই সংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ধনী ব্যক্তিরা এখন নগদ অর্থ সঞ্চয় করার চেয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একই সাথে আধুনিক ধনীরা তাদের বিপুল সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এখন আর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক সংস্থার সেবা গ্রহণ করছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঝিমিয়ে পড়া কয়লা শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতে ৭০০ মিলিয়ন বা ৭০ কোটি ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের ঘোষণা দেন তিনি। মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে যখন জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে, তখন সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এই বিশাল তহবিলের যোগান নিশ্চিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ বা প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন কার্যকর করেছে। এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি বিশেষ আইনি ক্ষমতা, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য শিল্পগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রদান করে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও আরকানসাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ১৪টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৪২টি কয়লাখনি সংরক্ষণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে একটি নতুন কয়লা রপ্তানি টার্মিনাল নির্মাণে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই টার্মিনাল নির্মাণের ফলে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া মার্কিন জ্বালানি বিভাগ আরও ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে, যা দিয়ে আলাস্কা ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে দুটি নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
হোয়াইট হাউজে এই ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, “আমরা আজ এমন একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিচ্ছি যা জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে। এর জন্য আমরা পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী কয়লার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, “স্বচ্ছ ও সুন্দর কয়লার শক্তি ব্যবহার করে সব নাগরিকের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম কমিয়ে আনতে আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।” ট্রাম্পের দাবি, এই পুরো বিনিয়োগ প্যাকেজটি সব মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার কর্মসংস্থান ধরে রাখতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য এখন ৪.২৪ ডলারে ঠেকেছে, যা ইরান সংঘাত শুরুর আগে ছিল মাত্র ২.৯৮ ডলার। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত এক বছরে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে ১৭.৯ শতাংশ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমালোচনা করে কয়লাকেই অধিক সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী উৎস হিসেবে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউজ মনে করছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার সাশ্রয় হবে, যা সাধারণ গ্রাহকদের উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের চাপ থেকে রক্ষা করবে।
জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলা এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে আগামী বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ সহায়ক প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, গৃহস্থালি পণ্য ও বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর সুবিধাগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে যে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা রয়েছে, সেটির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির যন্ত্রাংশ আমদানিতে থাকা হ্রাসকৃত শুল্ক সুবিধার মেয়াদও ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে। বৈদ্যুতিক যানের ক্ষেত্রে বর্তমানে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ করের বোঝা কমিয়ে আনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ইভি উৎপাদনে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়, ভ্যাট ও আয়কর সুবিধা দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রফটপ সোলার প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বর্তমানে ৩৬ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এই কর কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব আসতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রথম পাঁচ বছর পূর্ণ কর মুক্তি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে নির্দিষ্ট হারে কর ছাড়ের সুবিধা পাবেন।
শিল্প খাতে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও বছরের শেষ নাগাদ এটি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উচ্চ শুল্ক হারের কারণে প্রতি মেগাওয়াট সোলার স্থাপনে যে ৩ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়, তা শুল্ক কমানোর ফলে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে। তবে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় সোলার যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। অতীতে অসম প্রতিযোগিতার কারণে এই খাতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। কম্পিউটার ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পের প্রসারে বিদ্যমান সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হলে ভোক্তারাও সুফল পাবেন। তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত এই সুবিধার ফলে পণ্যমূল্য কতটুকু কমছে এবং আমদানির বিকল্প তৈরি হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সম্পদের তালিকায় মার্কিন সরকারি বন্ড বা ট্রেজারিকে পেছনে ফেলে স্বর্ণ এখন শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। মূলত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয়ের প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের আকাশচুম্বী দাম এই পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইসিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট বৈশ্বিক রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশই ছিল স্বর্ণ, যা মাত্র এক বছর আগেও ছিল ২০ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে রিজার্ভ হিসেবে ইউরোর অবস্থান ১৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। ইসিবি সভাপতি ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড এই পরিবর্তনের পেছনে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে দায়ী করে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ সঞ্চয়ের প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ৩৬ হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা প্রায় ব্রেটন উডস যুগের কাছাকাছি এক মজবুত অবস্থান নির্দেশ করছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোও এই হিসাব বদলে দেওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও সামগ্রিকভাবে ডলার-নির্ভর সম্পদ এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভের ৪২ শতাংশ দখল করে আছে, তবে বিকল্প সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি ঝোঁক ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২২ সাল থেকে বিশেষ করে চীন, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভারত তাদের স্বর্ণের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
তুরস্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের রিজার্ভ পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি ২২০ টন স্বর্ণ সঞ্চয় করলেও ২০২৬ সালের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৩০ টন স্বর্ণ বিক্রি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। ইসিবি আরও জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় ইউরোর ভূমিকাও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে, গত বছর যার আন্তর্জাতিক ঋণ ইস্যু প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই স্বর্ণমুখী প্রবণতা এবং মার্কিন ট্রেজারির ওপর নির্ভরতা হ্রাস বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মুদ্রা ঝুঁকি এড়াতে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরণের পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রতি ভরিতে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। এর ফলে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকায় নেমে এসেছে। শনিবার সকালে একটি বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস এই নতুন মূল্যতালিকা ঘোষণা করে, যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে যে স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের বা পিওর গোল্ডের দাম হ্রাস পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বর্ণের এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২১ ক্যারেট স্বর্ণ ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকায় বিক্রি হবে। এর আগে গত ২ জুন স্বর্ণের দাম সর্বশেষ সমন্বয় করা হয়েছিল, যখন ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মোট ৭১ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ বার দাম বাড়ানো হলেও ৩৪ বার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম মোট ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বৃদ্ধি ও ২৯ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। প্রতি ভরিতে ৪০৮ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট রুপার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট রুপার ভরি ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ২০৮ টাকা করা হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রুপার দাম মোট ৪২ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২ বার দাম বৃদ্ধি ও ২০ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে।