সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম মঙ্গলবার ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
আজ সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫ ডলার ৯৩ সেন্ট। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
গত কয়েক দিনে তেলের দামে ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। কখনো কমছে, আবার কখনো বাড়ছে। গত সপ্তাহে দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে উঠলেও পরে তা দ্রুত ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং পুনরায় আবার সেই সীমা অতিক্রম করে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএসটি মারকির বিশ্লেষক সল কেভনিক বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভিন্ন ভিন্ন বার্তা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপরই নজর রাখছেন, কারণ সংঘাত ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার জানান, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, জোট গঠন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো দেশ খুবই উৎসাহী, আবার কোনো কোনো দেশ অতটা আগ্রহী নয়। আমি মনে করি, কেউ কেউ এতে অংশ নেবে না, অথচ তাদের আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ব্যয়ে সুরক্ষা দিয়ে আসছি।’
হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সহায়তা চেয়েছে। ইরানের হামলার পর এ পথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
আইএনজির পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান ওয়ারেন প্যাটারসন বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন এতটাই বেড়েছে যে দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, বিমা সুরক্ষা বা নৌবাহিনীর পাহারার মতো উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি, কারণ এতে নৌবাহিনীকেও ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।
ওমান ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে পরিবাহিত হয়েছে, যা সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া মোট তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ।
জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এ রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ সংকটের কারণে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, প্রয়োজন হলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে জরুরি মজুত থেকে আরও তেল ছাড়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যে বড় পরিসরে মজুত তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এর আগে এত বড় পরিমাণ তেল একসঙ্গে ছাড়ার নজির নেই। তবে প্রয়োজনে আরও মজুত তেল ছাড়ার সুযোগ এখনও রয়েছে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সম্পাদিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) শুধু শুল্ক হ্রাসের বিষয় নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজ করার একটি বিস্তৃত কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাংলাদেশকে গুণগত নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতেও নজর বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপান ইপিএ স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে সোমবার রাজধানীর বারিধারায় জাপান দূতাবাসে গবেষণা সংস্থা সিপিডির উদ্যোগে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দূতাবাস সহযোগিতা করে।
সেমিনারে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গেই প্রথম এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে জাপান। তাঁর মতে, এটি শুধু পণ্যের শুল্ক কমানোর বিষয় নয়, বরং কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্যবিধিসহ নানা নীতিগত বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মূল প্রবন্ধে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন তুলে ধরেন, জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রক বাধা বিদেশি বিনিয়োগের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বন্দর অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি মনে করেন, জাপানের কঠোর মান বজায় রাখতে হলে দেশের নিয়ন্ত্রক ও পরিদর্শন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
অন্য প্রবন্ধে জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের প্রফেসর ইমেরিটাস কেনিচি ওহনো বলেন, সরকার কী করতে চায়, তার চেয়ে বাস্তবায়নের দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র ইকোনমিক অ্যাডভাইজার পোহ লিন লু শিল্পনীতিকে একটি ‘কড়া ওষুধ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর কার্যকারিতা নির্ভর করে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োগের ওপর।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর দেশের শিল্প খাতের বাস্তব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে নীতির ঘাটতি নেই, মূল সমস্যা বাস্তবায়নে।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কেন শুধু তৈরি পোশাক খাতই বিশেষ সুবিধা পাবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ চাইলে সব খাতের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন নীতি প্রণয়নের বদলে বিদ্যমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের সমস্যার সমাধানেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি, কারণ দেশের রপ্তানি এখনো একটি খাতনির্ভর। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ‘চীন প্লাস ওয়ান’ নীতির কারণে বাংলাদেশ জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ইপিএ কেবল পণ্য বাণিজ্যের চুক্তি নয়, বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের একটি প্ল্যাটফর্ম। তিনি উল্লেখ করেন, চুক্তির সুবিধা পুরোপুরি নিতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে সক্ষমতা বাড়াতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশের বেশি রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা মোকাবিলায় জাপান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাজার হতে পারে। তবে জাপানি বাজারে প্রবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উচ্চমান বজায় রাখা অপরিহার্য।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে বেড়ে ৩৪ হাজার ২২১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের সমান।
সোমবার (১৬ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এই রিজার্ভের পরিমাণ কমে ২৯ হাজার ৫২৮ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যা প্রায় ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ১১ মার্চ গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
উল্লেখ্য, আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাব করার সময় স্বল্পমেয়াদি দায় বাদ দিয়ে প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগের পর যে পরিমাণ থাকে, সেটিকেই নিট রিজার্ভ হিসেবে ধরা হয়।
শরীয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একত্র করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ কার্যক্রম, বিশেষ করে আইটি ইন্টিগ্রেশন, দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
সোমবার (১৬ মার্চ) গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি এ নির্দেশনা দেন।
গভর্নর বলেন, “ব্যাংক খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা ছাড়া বিকল্প নেই।” আইটি সমন্বয় কেন বিলম্বিত হচ্ছে জানতে চাইলে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ব্যাংকের আলাদা ডেটা একত্রিত করতেই সময় বেশি লাগছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চালু থাকবে কিনা তা নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এর জবাবে গভর্নর বলেন, সরকার ইতোমধ্যে নতুন ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জুগিয়েছে এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে গ্রাহকদের জন্য আরও ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার সুযোগ নেই এবং দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে।
এর আগে ৩ মার্চ একই ব্যাংকের প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর দ্রুত এমডি নিয়োগ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি ঋণ আদায় বাড়ানো এবং বন্ধ হয়ে থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ সময় ধরে আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক নেয়।
নতুন এই ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছে, যাদের মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা, যার ৭৭ শতাংশই খেলাপি।
একীভূতকরণের পর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। বিশেষ ব্যবস্থায় আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রতি গ্রাহককে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রদান করা হচ্ছে। এর বেশি আমানতকারীরা প্রতি তিন মাস অন্তর ১ লাখ টাকা করে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। তবে কিডনি ডায়ালাইসিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ আইন ও নিয়ন্ত্রক বিধি ভঙ্গের ঘটনায় পাঁচ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক দণ্ড আরোপ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ টাকা। চলতি মাসে কমিশনের এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন বিভাগ এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করে।
আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তথ্য অনুযায়ী, বিএসইসির একটি পরিদর্শন দল ইনডেক্স এগ্রোর চারটি কারখানা ও প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করে এবং বিভিন্ন সময় জমা দেওয়া নথিপত্র ও রেকর্ড যাচাই করে। পরিদর্শনে উঠে আসে, ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইনডেক্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মধ্যে প্রায় ২ কোটি টাকার একটি সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেন হয়েছে। একই ব্যক্তি উভয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় যুক্ত থাকলেও ৩০ জুন ২০২২ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ লেনদেন প্রকাশ করা হয়নি, যা প্রযোজ্য সিকিউরিটিজ আইনের পরিপন্থী।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান জি কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, আলোচ্য সময়ে কোম্পানির স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো সম্পর্কিত পক্ষের লেনদেন হয়নি। কিন্তু পরিদর্শনে তার ভিন্নতা পাওয়া যায়। পাশাপাশি নির্মাণ ও সিভিল ওয়ার্কের কিছু কাজের অনুমোদন প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম ধরা পড়ে, যেখানে অনুমোদিত কর্মকর্তার পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে।
এসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে কোম্পানিটির এমডি মাহিন বিন মাজহারকে ৫ লাখ টাকা, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ইকবাল আহমেদকে ১ লাখ এবং সেক্রেটারি আবু জাফর আলীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের একটি চিঠির ভিত্তিতে প্রুডেনশিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেডের অনিয়ম সামনে আসে। সেখানে রবি আজিয়াটার এক লাখ শেয়ারের ক্ষেত্রে ডিপোজিটরি হিসাব ও ব্যাক-অফিস সিস্টেমের মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রুডেনশিয়াল ক্যাপিটালের মাধ্যমে আভা দত্ত নামে এক বিনিয়োগকারীর জন্য শেয়ার ক্রয় করা হয় এবং পরে তা অন্য একটি বিও হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবটি খোলা হয় ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ, অর্থাৎ শেয়ার ক্রয়ের প্রায় দুই মাস পর। এটিকেও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রুডেনশিয়াল ক্যাপিটালকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও রেজাউল ইসলামকে ৫ লাখ এবং সাবেক কমপ্লায়েন্স অফিসার এওয়াই জোবায়েরকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া, নাভানা সিএনজি লিমিটেড ও এর পরিচালনা পর্ষদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তবে তাদের ওপর কোনো আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়নি।
ঈদের আগে শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ায় প্রধান সূচকগুলো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে আগের দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শুরু থেকেই বেশিরভাগ শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে থাকে এবং দিনের শেষ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল।
দিনশেষে ডিএসইতে মোট ২৫৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ৭৩টির দাম কমেছে এবং ৬২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
ঈদের আগে শেষ কার্যদিবসে দরবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৩৫৪ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক ডিএসইএস ৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৮১ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৫২ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে।
এদিন ডিএসইতে মোট ৪৬০ কোটি ৩১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৫২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ। ফলে দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৬৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের উত্থান দেখা গেছে। এক্সচেঞ্জটির সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৫০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ হাজার ৩০ পয়েন্টে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রধান মূল্যসূচক ১৭ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ১৬৬ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে।
সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৯টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩৭টির দর কমেছে এবং ৩৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে এদিন মোট ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের দিন সেখানে লেনদেন হয়েছিল ৩৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ।
উল্লেখ্য, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকে টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হচ্ছে। এ সময় শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ থাকবে। নির্ধারিত ছুটি শেষে আগামী ২৪ মার্চ থেকে আবার লেনদেন শুরু হবে।
দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন আরও বিস্তৃত করতে ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে প্রতিটি ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরকে (পিএসও) প্রধান কার্যালয়ে আলাদা ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্ট ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে ক্যাশলেস, ডিজিটাল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলা কিউআর, ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) এবং অনলাইন পেমেন্টের প্রসারের ফলে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ক্যাশলেস বাংলাদেশ উদ্যোগের অংশ হিসেবে খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা মার্চেন্টদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় বাংলা কিউআর লেনদেনে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিবেদন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সমন্বয় জোরদার করতে প্রতিটি ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি ও পিএসও প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠন করতে হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের ক্ষেত্রে ইউনিটটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন পেমেন্ট সিস্টেম কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা। আর এমএফএস, পিএসপি ও পিএসও প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অব্যবহিত এক ধাপ নিচের কর্মকর্তা এ ইউনিটের তত্ত্বাবধান করবেন। ব্যাংকগুলোতে অন্তত চারজন এবং এমএফএস, পিএসপি ও পিএসও প্রতিষ্ঠানে অন্তত দুইজন কর্মকর্তাকে এ ইউনিটে নিয়োগ দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে উপ-মহাব্যবস্থাপক বা সমপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে এমএফএস, পিএসপি ও পিএসও প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দুই ধাপ নিচের একজন কর্মকর্তা এ দায়িত্বে থাকবেন।
এ ইউনিটের দায়িত্বের মধ্যে কর্মকর্তাদের সক্ষমতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ আয়োজন, ডিজিটাল লেনদেন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সমন্বয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া ক্যাশলেস বাংলাদেশ উদ্যোগের আওতায় গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি বছর একটি পৃথক প্রতিবেদন তৈরি করে তা পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি বছরের মার্চ মাসের শেষ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং বাণিজ্য সংগঠনসহ সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’ গঠন করে প্রয়োজনীয় তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
পবিত্র শবে কদর, ঈদুল ফিতর এবং মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে দীর্ঘ বিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই টানা ১০ দিন বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি ও রপ্তানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত থাকবে। হিলি কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৮ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত এই ছুটি কার্যকর হবে। দীর্ঘ বিরতি শেষে আগামী ২৮ মার্চ থেকে পুনরায় বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল হওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন হিলি স্থলবন্দর আমদানি রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী। এই সংক্রান্ত চিঠি ইতিমধ্যে হিলি স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, বিজিবি এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট কাস্টমস ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ উভয় দেশের পরিবহন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে পাঠানো হয়েছে।
ছুটির প্রেক্ষাপট নিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নাজমুল হাসান বলেন, “পবিত্র শবে কদর, ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ১০ দিন বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ২৮ মার্চ থেকে যথারীতি হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় চালু হবে।”
বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত নিয়ে হিলি স্থলবন্দর পুলিশ কর্মকর্তা এসআই ফরিদুর রহমান জানান, স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসাধারী যাত্রীদের পারাপার অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক থাকবে। এছাড়া বন্দরের দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পর্কে হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের উদ্ভিদ নীরোদ কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী জানান, ছুটির সময়ে কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চলমান রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূলত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের উৎসব পালনের সুবিধার্থেই এই দীর্ঘ ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির আকার ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সুপারশপ খাতকে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পার্শ্ববর্তী ভারতের আগেই বাংলাদেশে সুপারশপের কার্যক্রম শুরু হলেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ঘাটতির কারণে এ খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।
তারা মনে করেন, খাতটির টেকসই বিকাশে সরকারের কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যূনতম কর কাঠামোর অযৌক্তিক দিকগুলো সংশোধনের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে সুপারশপ খাতের অবদানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বানও তোলা হয়।
সোমবার (১৬ মার্চ) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ‘বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল খাতের উন্নয়ন: প্রতিবন্ধকতা, উত্তরণের উপায় ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে।
বাংলাদেশ সুপারমার্কেট অনার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিস বড়ুয়া। বৈঠকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ সুপারমার্কেট অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স (বাংলাদেশ) লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুয়াল্লেম আহমেদ চৌধুরী, ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. কাউসার আলম, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, এনবিআরের সাবেক সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. এম আবু ইউসুফসহ অনেকে।
বৈঠকে মো. জাকির হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতিতে সুপারমার্কেট খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও তা অনেক সময় যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় পর্যায়ে এ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন–২০১৩ প্রণয়নেও এর ভূমিকা ছিল।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি সুপারমার্কেটের সঙ্গে হাজার হাজার সরবরাহকারী যুক্ত, যার মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন। ফলে এ খাতের বিস্তার ঘটলে ব্যবসার সুযোগও বাড়ে।
ন্যূনতম কর কমানোর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কর কমানো হলে সুপারমার্কেটের সম্প্রসারণ বাড়বে এবং এতে সরকারের বিভিন্ন উৎস থেকে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। ভ্যাট কমানোর ফলে গত বছর অনেক সুপারমার্কেট তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে এবং নতুন নতুন সুপারশপ চালু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সব দোকানে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) বসানোর দাবিও প্রথমে সুপারমার্কেট খাত থেকেই উঠেছিল। গত ২২ বছর ধরে ভ্যাট ও করসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসছে এ খাত।
সুপারমার্কেট সংস্কৃতি অনেক দেশে উন্নত অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি নীতিগত সহায়তার অভাবে বাংলাদেশে এই খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের হাতবদল বেশি হওয়ার কারণেই দাম বাড়ে। সুপারমার্কেট সরাসরি উৎপাদক বা কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করায় মধ্যবর্তী ধাপ কমে যায় এবং এতে ভোক্তার জন্য মূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ে লাভ না হলেও বিক্রির ওপর যে ন্যূনতম কর আরোপ করা হচ্ছে, তা আয়কর আইনের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, আমাদের এই মুহূর্তে ট্যাক্স আদায়ের যে পদ্ধতিটি আছে, বিশেষ করে মিনিমাম ট্যাক্সের যে ধারণাটি আছে, আমি নিজেও মনে করি ইট ডাজন্ট গো উইথ দ্য ফিলোসফি অব প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স। বিশেষ করে আয়কর আইনের সঙ্গে কোনোভাবেই এটি যায় না।
মূলপ্রবন্ধে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিস বড়ুয়া বলেন, আধুনিক রিটেইল বা সুপারশপ খাতে ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থাকায় এ খাতের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের আকার ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে। তাই পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক ও ডিজিটাল এই খাতে ন্যূনতম কর ‘যৌক্তিকীকরণ’ প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের খুচরা বাজারের আকার প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং এ খাতে সরাসরি ১৭ হাজার ৫০০ এর বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে সুপারশপের মতো কম মুনাফার ব্যবসায় যেখানে কর-পূর্ব আয়ের প্রান্তিক সীমা ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে, সেখানে ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স মূলত প্রকৃত মুনাফার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই করনীতি অনেক ক্ষেত্রে মোট আয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত নিঃশেষ করে দেয়। ফলে এ শিল্পে পুনর্বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
দেশে বিনিয়োগের পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে ১৮০ দিনের একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর পথে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত রোববার (১৫ মার্চ) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বিষয়টি আজ সোমবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ) এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) যৌথভাবে এই রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নমুখী সংস্কারের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো।’
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সহায়তা এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম দ্রুততর করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগও অব্যাহত থাকবে।
এই কর্মপরিকল্পনা ২৫টি উদ্যোগের ভিত্তিতে তিনটি প্রধান স্তম্ভে সাজানো হয়েছে। এগুলো হলো অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগ সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন।
অবকাঠামো উন্নয়নের আওতায় ১৩টি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বন্দর আধুনিকায়ন, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন, শিল্পপার্ক সম্প্রসারণ, ফ্রি ট্রেড জোন ও ডিফেন্স ইকোনমিক জোন উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ও বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের উদ্যোগ। পাশাপাশি জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিনিয়োগ সহায়তা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের সেবার মান উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিডা, বেজা, বেপজা, বিএইচটিপিএ এবং পিপিপি-এর মতো বিনিয়োগ সহায়ক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) আলোচনায় অগ্রগতি, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বেসরকারি খাতের পরামর্শক পরিষদ গঠন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সিঙ্গেল-উইন্ডো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
এই কর্মপরিকল্পনায় বড় বিনিয়োগকারীদের সমস্যার নির্দিষ্ট সমাধানের উদ্যোগও রয়েছে। পাশাপাশি চীনে বিডার প্রথম বিদেশি কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন অংশে দেশের শিল্পখাতের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, ওষুধ শিল্প, চামড়া, টেক্সটাইল ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো অগ্রাধিকার খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, মেরিকালচার, রপ্তানিমুখী চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ এবং নতুন এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত ইশতেহার অনুযায়ী এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ সহায়তা জোরদার এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আসন্ন ঈদুল ফিতরের ছুটির সময়েও দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখা এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সুবিধা নিশ্চিত করতে সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট (এসডিএডি) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ঈদের দিন ছাড়া আগামী ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দর সংলগ্ন ব্যাংক শাখা, উপশাখা এবং বুথগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী খোলা রাখা হবে। এই নির্দেশনা সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রযোজ্য থাকবে।
এদিকে পোশাক শিল্পঘন এলাকাগুলোতে আর্থিক লেনদেন নির্বিঘ্ন রাখতে ১৮ ও ১৯ মার্চ বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যাংক খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ দুই দিন সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের নির্ধারিত ব্যাংক শাখাগুলোতে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দাপ্তরিক কার্যক্রম চলবে। তবে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি লেনদেনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত জোহরের নামাজের জন্য বিরতি থাকবে। মূলত শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধের চাপ সামাল দিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে বন্দর এলাকার ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কেও আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৭ মার্চ এবং ২০ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত বন্দরসংলগ্ন ব্যাংক শাখাগুলোর লেনদেনের সময়সূচি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারণ করবে। তবে ২১ মার্চ চাঁদ দেখা সাপেক্ষে যদি পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়, তাহলে ওই দিন দেশের সব ব্যাংক বন্ধ থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে ঈদের দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও বৈদেশিক বাণিজ্য ও শিল্প খাতের আর্থিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হবে না। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের অর্থ পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছুটির দিনেও গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা জরুরি ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হচ্ছে এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ড। এর ফলে আজকের পর থেকে ফান্ডটি আর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত থাকবে না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিএসই জানায়, ফান্ডটির ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বিজিআইসি) গত বছরের ১১ নভেম্বর একটি চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে গত ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ডিএসই কর্তৃপক্ষ ফান্ডটির ইউনিট স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ায় ফান্ডটির অবসায়নের অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১০ মার্চ ফান্ডটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে।
এর আগে ফান্ডটির মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানো এবং মেয়াদি ফান্ডকে বে-মেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি বিএসইসি।
২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই ফান্ডটির পরিশোধিত মূলধন ছিল ৬১ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একই সঙ্গে ফান্ডটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
ফান্ডটির মোট ইউনিট সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৬ হাজার ৫০। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ছিল ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ ইউনিট। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ছিল ২৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ২০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল অবশিষ্ট ৬৭ দশমিক ৮০ শতাংশ ইউনিট।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে আবারও দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এপি জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজার এবং শেয়ারবাজারেও।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম সকালে ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ৭৩ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে লেনদেনের সময় দাম ১০৬ ডলারের ওপরে ছিল। তিন সপ্তাহ আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এ তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ডব্লিউটিআইয়ের দামও বেড়েছে। এটি ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ৬৮ সেন্টে পৌঁছেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এ তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তেলের বাজারের এই অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা গেছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচক কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ।
হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট সূচকে দশমিক ৭ শতাংশ পতন হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের সেনসেক্স সূচকে দশমিক ১ শতাংশ পতন দেখা গেছে।
মার্কিন ফিউচার বাজারে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ যথাক্রমে দশমিক ৫ ও দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তিনটি শেয়ারবাজার সূচক পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করেছিল।
গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে ওঠায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
এদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।