সংকটের মধ্যে ও জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট নিয়ে আসছে সরকার। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে হাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যে আসছে এই বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এবারের বাজেট হবে দেশের ৫২তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৪তম বাজেট।
আকারের দিক থেকে এটিই হবে দেশের বৃহত্তম বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এটি হবে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে পঞ্চম বাজেট উপস্থাপন করবেন। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার।
প্রথা অনুযায়ী ৩০ জুন অথবা তার আগের দিন ২৯ জুন প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয়। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন। ২৮ জুন থেকে কোরবানির ঈদের ছুটি শুরু হবে। সে কারণে এবার বাজেট পাস হবে ২৬ জুন।
এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ‘উন্নয়নের দীর্ঘ অগ্রযাত্রা পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিমুখে’। এতে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সরকার এবং স্মার্ট সমাজ করার কথা তুলে ধরা হয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন’।
শেষ তিনটি বাজেট করোনা মহামারি আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে দিতে হয়েছে সরকারকে। এবারও সেই সংকটের মধ্যেই আরেকটি বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোট আর আইএমএফের শর্তের চাপ।
বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্যদিকে টান পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্ত; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ ফের চড়ছে। এপ্রিলে এই সূচক ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মে মাসের তথ্য পাওয়া গেলে সেটি দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন। টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ইতিমধ্যেই জোর রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
অর্থনীতিতে টানাপোড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত আর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকার বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন বাজেট। সে হিসাবে আগামী বাজেটের ছয় মাস (জুলাই-ডিসেম্বর) বাস্তবায়ন করবে বর্তমান সরকার। আর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বাকি ছয় মাস, জানুয়ারি থেকে জুন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। বাজারে ডলারের সংকট এখনো কাটেনি।
এমন সংকটকালেই টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মূলত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা সাজিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা- আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এসব শর্ত পূরণের বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে নতুন বাজেটে। আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে এসব শর্ত সম্পর্কিত। আইএমএফ প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে। বাকি অর্থ সমান ছয় কিস্তিতে দেবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কম সুদের এই ঋণের বাকি কিস্তিগুলো নির্বিঘ্নে পাওয়ার জন্য নতুন বাজেটে আইএমএফের শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান কবে হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে আগামী বছরও উচ্চমূল্যস্ফীতির প্রবণতা থাকবে। সে জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যেহেতু এটা এই সরকারের শেষ বাজেট, তাই আসন্ন বাজেটটি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে নির্বাচনের প্রতিফলন থাকে। নতুন বাজেটে দেয়া পদক্ষেপগুলো যাতে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে; খুশি হয়। কর্মকর্তারা সেই নির্দেশনা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বছরও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে নতুন অর্থবছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এবার যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে নতুন বাজেট করতে হচ্ছে। যুদ্ধ সব দেশকেই কমবেশি প্রভাবিত করেছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি কমলে কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
যুক্তিসংগত ভারসাম্য রেখে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয়ও কমানো যাবে না। এসব বিবেচেনা করে কৌশলপূর্ণ একটি বাজেট দিচ্ছি আমরা।’
রাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহুমুখী চাপের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি, আইএমএফের শর্তের খড়্গ, ভর্তুকির বোঝা, নির্বাচনী বছরে বাড়তি খরচের চাহিদা, অর্থায়ন সংকট- এসব মিলিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে নতুন বাজেট তৈরিতে হিমশিম খেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
আয়ের পথ সীমিত, তার পরও নির্বাচনে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে বড় বাজেট আসছে। যেখানে আইএমএফের একগাদা শর্ত মানতে গিয়ে অবাধে করছাড় তুলে দিয়ে বরং করের বোঝা বাড়ানোর মতো অপ্রিয় পথে হাঁটতে হতে পারে সরকারকে। যে কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সারেও ভর্তুকির চাপ থাকবে। চাপ থাকবে এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দামে যে ২৮ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে, তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যদিও আইএমএফের শর্তের কারণে ভর্তুকি থেকে সরে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষির প্রসার আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চিন্তা করে সরকার শিগগিরই হয়তো ভর্তুকি তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তি করার কারণে সরকারকে বেশ কিছু কঠিন শর্ত পালন করতে হবে। আর এসব শর্তের প্রতিফলন নতুন বাজেটে থাকবে। যেমন- রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে (ডাবল ডিজিট) নিতে হবে। এটি করতে হলে গণহারে যে করছাড় দেয়া আছে, তা তুলে দিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেয়া কর অবকাশ সুবিধা তুলে দিতে কঠোর হতে হবে। এটি করা হলে দেশীয় শিল্পগুলো কমবেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।
তা ছাড়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্য যখন নানা ধরনের চাপের মধ্যে, তখন বাড়তি করের বোঝা চাপবে তাদের ওপর। এর সঙ্গে সব স্তরের করের বোঝা বাড়বে। কারণ আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে আসছে অর্থবছরে অন্তত ৬৫ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। এটি করতে কমবেশি ব্যক্তিশ্রেণির কর যেমন বাড়বে, তেমনি সব স্তরেই করের চাপ পড়বে। এটি নির্বাচনের আগে অজনপ্রিয় হলেও শেষ পর্যন্ত না করে পারবে না সরকার। এমনিতেই রাজস্ব আয়ে নাজুক অবস্থা চলছে। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, অন্যদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দিতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমি পরিষ্কারভাবে বলেছি যে, বর্তমান এই কঠিন সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের মানুষ সত্যিই কষ্টে আছে। তাদের আগে স্বস্তি দিতে হবে। তারপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাতে হবে। সেই সঙ্গে রিজার্ভ যাতে আর না কমে সে জন্য রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কম সুদের বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে।’
এবারও ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা
বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। বিবিএস ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাব কষে বলেছে- এবার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি বলছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে; কবে শেষ হবে- নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। যুদ্ধের প্রভাব প্রতিনিয়ত পড়ছে অর্থনীতিতে। ডলারের দর বেড়েই চলেছে; ৮৬ টাকার ডলার হাতে গুনে ১০৯ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ডলারের এই উল্লম্ফনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির সব খাতেই পড়ছে।
এদিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এসব সংকটের মধ্যেও আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫ অর্জন করতে চান অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। আর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এবার জিডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ ৬ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
নতুন বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরকারি আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব করবেন ৫ লাখ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ শতাংশের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাজেটে মোট ঘাটতি নির্ধারণ করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রী অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে কোন উৎস থেকে কত টাকা তিনি ঋণ করবেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। বাজেটের সারসংক্ষেপ থেকে জানা গেছে, ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এটি মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে তিনি ঋণ নিতে চান ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি, আর সঞ্চয়পত্র থেকে নেবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা নেবেন বিদেশি ঋণ।
এদিকে প্রায় পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট থেকে অর্থমন্ত্রী খরচের দুটি খাত নির্ধারণ করেছেন। এর একটি হলো সরকারের আবর্তক ব্যয় বা পরিচালন ব্যয়। এর আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং জিডিপির ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয়, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছর উন্নয়ন ব্যয়ের মোট আকারকেও দুভাবে নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি ব্যয়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ এডিপির জন্য।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে সরকার ব্যয় করবে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিদ্যুতে, যার পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে যাবে ১৭ হাজার কোটি, রপ্তানি ভর্তুকিতে যাবে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং প্রণোদনায় ব্যয় হবে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাতের ভর্তুকিতে ব্যয় হবে আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরও সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতগুলোর ব্যয়ে। আগামী অর্থবছর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেট ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
আফ্রিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় এক বৈপ্লবিক বাণিজ্যিক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে গণচীন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহাদেশটির ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫৩টি দেশ এখন থেকে চীনের বাজারে কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই পণ্য রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। আগামী দুই বছরের জন্য কার্যকর থাকা এই বিশেষ সুবিধার আওতায় দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর ও নাইজেরিয়ার মতো আফ্রিকার শীর্ষ ২০টি শক্তিশালী অর্থনীতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুক্রবার (১ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়া এই উদ্যোগকে চীন-আফ্রিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন সময়ে চীন এই উদার বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণ করল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আমদানির ওপর কর বাড়িয়ে কঠোর সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানিকৃত গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে বিশ্ব বাণিজ্যে নিজের প্রভাব আরও সংহত করার কৌশল নিয়েছেন। এর আগে চীন আফ্রিকার ৩৩টি অনুন্নত দেশের জন্য শুল্ক তুলে নিলেও এবার মহাদেশের প্রায় সব দেশকেই এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হলো।
আফ্রিকার ৫৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র দেশ হিসেবে এই বিশাল শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে থাকছে ইসওয়াতিনি। বেইজিংয়ের এই কঠোর অবস্থানের মূল কারণ হলো, ইসওয়াতিনি আফ্রিকার একমাত্র রাষ্ট্র যারা এখনো তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। চীনের ‘এক চীন’ নীতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করায় দেশটি এই বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো। তবে বাকি ৫৩টি দেশ এই চুক্তির ফলে সরাসরি উপকৃত হবে এবং চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে তাদের রপ্তানি পণ্যের বাজারজাতকরণ অনেক সহজ ও লাভজনক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই নীতি বাস্তবায়নের সুফল এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২৪ মেট্রিক টন আপেলের একটি বিশাল চালান শুক্রবার চীনের শেনঝেন বন্দরে পৌঁছেছে, যা কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই প্রথম পণ্য হিসেবে বাজারে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে। কেনিয়ার কফি ও অ্যাভোকাডো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাইট্রাস ফল ও ওয়াইনের ওপর আগে ৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক ধার্য ছিল, যা এখন সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। এ ছাড়া আইভরি কোস্ট ও ঘানার মতো দেশগুলোও তাদের রপ্তানি পণ্যের ওপর এই বিশাল ছাড় পাওয়ায় দারুণভাবে লাভবান হবে বলে জানিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
চীনের স্টেট কাউন্সিলের শুল্ক কমিশনের মতে, এই উদ্যোগ কেবল বাণিজ্যই বাড়াবে না বরং চীন ও আফ্রিকার মধ্যকার পারস্পরিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিপুল জনসংখ্যার এই মহাদেশ থেকে সস্তায় কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে চীন যেমন তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাবে, তেমনি আফ্রিকার দেশগুলোও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে সক্ষম হবে। বিশ্ব বাণিজ্যের এই নতুন মেরুকরণ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যের প্রতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে ধারণা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশটির রিজার্ভ ৪ দশমিক ৮২ বিলিয়ন বা প্রায় ৪৮২ কোটি মার্কিন ডলার হ্রাস পেয়েছে। শুক্রবার (১ মে) ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য জানা গেছে। এই পতনের ফলে দেশটির মোট রিজার্ভ বর্তমানে ৬৯৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন বা ৬৯ হাজার ৮৪৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান।
আরবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভের প্রায় প্রতিটি খাতেই এবার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মজুতের সবচেয়ে বড় অংশ বিদেশি মুদ্রা সম্পদ (এফসিএ) ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার কমে বর্তমানে ৫৫৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের মজুতও ১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়ে ১২০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এ ছাড়া স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে রক্ষিত রিজার্ভের পরিমাণও গত এক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
অথচ এর ঠিক আগের সপ্তাহে অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল শেষ হওয়া সাত দিনে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশ ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। সে সময় মজুত ২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৭০৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ভারতের রিজার্ভ তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তর ৭২৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক পতন দেশটির অর্থনীতিতে সাময়িক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় মূল্যের ওঠানামা এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী। বিশেষ করে ভারতীয় রুপির মানের বড় ধরনের পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে খোলা বাজারে ডলার বিক্রি করে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রিজার্ভের ওপর। আরবিআই জানিয়েছে, তারা বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদাও রিজার্ভের এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ভারতের বর্তমান মজুত এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে যা দিয়ে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা দীর্ঘমেয়াদী আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী কৌশল এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ পুনরায় বৃদ্ধি পেলে দ্রুতই এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বড় শহরগুলোতে তীব্র যানজট, ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং ডেলিভারি সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দেশে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে বাইসাইকেল চালানো একটি আধুনিক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে, যা যাতায়াতের পাশাপাশি শরীরচর্চার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত এক বছরে দেশের বাজারে বড় তিনটি দেশীয় ব্র্যান্ডের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বাইসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যা এই খাতের ক্রমবর্ধমান উন্নতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশেষ করে মেঘনা গ্রুপ, আরএফএল এবং আকিজ ভেঞ্চারের মতো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দেশের বাজারের অর্ধেকেরও বেশি চাহিদা পূরণ করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শীর্ষ তিনটি ব্র্যান্ড ৪৪০ কোটি টাকার বাইসাইকেল বিক্রি করলেও ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে ৫৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই তিন প্রতিষ্ঠানের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকারও বেশি। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার বাইসাইকেল বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছরের ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি বাইসাইকেল বিক্রি হয়। মোট বিক্রির প্রায় অর্ধেকই শিশুদের দখলে থাকলেও বাকি অংশ মূলত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও পেশাজীবীরা ব্যবহার করেন।
এক দশক আগেও বাংলাদেশের বাইসাইকেল বাজার প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিদেশি ব্র্যান্ডের দখলে ছিল, কিন্তু বর্তমানে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো ৫০ শতাংশের বেশি বাজার দখল করে নিয়েছে। যন্ত্রাংশসহ দেশে বাইসাইকেলের বার্ষিক বাজারের আকার এখন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। মেঘনা গ্রুপ বর্তমানে তাদের সাতটি কারখানার মাধ্যমে যন্ত্রাংশের প্রায় ৭০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করছে এবং বছরে ১৫০ কোটি টাকারও বেশি পণ্য বিক্রি করছে। একইভাবে আরএফএল এবং আকিজ ভেঞ্চার বড় ধরনের বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি বাইসাইকেল এখন ইউরোপসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বাইসাইকেল বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যার সিংহভাগই রপ্তানি করেছে মেঘনা গ্রুপ। আরএফএল গ্রুপ বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত তাদের পণ্য সরবরাহ করছে। এমনকি নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আকিজ ভেঞ্চারও সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের বাজারে সফলভাবে বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু করেছে। উন্নত মান ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বাইসাইকেলের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বাইসাইকেল শিল্পে সরকারি নীতি সহায়তা এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সাহসী বিনিয়োগ এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা ভবিষ্যতে বাইসাইকেলের বাজারকে আরও বড় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই খাতে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাইসাইকেল রপ্তানি থেকে অর্জিত আয় বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের উৎপাদনশীল খাতের প্রবৃদ্ধি গতিশীল করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা বা ‘লং-টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি’র (বিবি-এলটিএফএফ) কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে একজন একক ঋণগ্রহীতা একটি ব্যাংকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। তবে দুই বা ততোধিক ব্যাংকের মাধ্যমে সিন্ডিকেটেড অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই ঋণের সীমা হবে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি মার্কিন ডলার। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই নীতিমালায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (পিএফআই) জন্য তহবিলের সুদের হার তাদের ‘ক্যামেলস’ রেটিং অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। রেটিং-১ প্রাপ্ত ব্যাংকসমূহ ৫ বছর মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ, ৭ বছর মেয়াদে ১.২৫ শতাংশ এবং ১০ বছর মেয়াদে ১.৫০ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ পাবে। অন্যদিকে, রেটিং-২ প্রাপ্ত ব্যাংকগুলো ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য ১.২৫ থেকে ১.৭৫ শতাংশ সুদে এবং রেটিং-৩-এ থাকা ব্যাংকগুলো ১.৫০ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এর ফলে শক্তিশালী আর্থিক ভিতের ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে।
উদ্যোক্তা পর্যায়ে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সুনির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়েছে। সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহের ব্যয় এবং পরিচালন খরচ বিবেচনা করে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার নির্ধারণ করবে। তবে এই সুদের হার কোনোভাবেই ব্যাংকগুলোর ‘কস্ট অব ফান্ড’ বা তহবিল ব্যয়ের চেয়ে ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এই বাধ্যবাধকতার ফলে শিল্পোদ্যোক্তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক সুদে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবেন, যা দেশের শিল্পায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে এই অর্থায়ন সুবিধার বিষয়ে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিল, যেখানে সুদের হার আন্তর্জাতিক বাজারদর বা ‘সোফর’ (SOFR)-এর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো। পূর্ববর্তী নিয়মে ব্যাংকগুলো তহবিলের ব্যয়ের ওপর সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত মার্জিন যোগ করার সুযোগ পেত। বর্তমান সংশোধিত নীতিমালায় সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতি সহজ করার পাশাপাশি ঋণের সীমা বৃদ্ধি করায় বড় শিল্প প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা অনেক সহজতর হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এই উদ্যোগটি ডলার সংকটের সময়ে শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সহায়তা প্রদান করবে।
সামগ্রিকভাবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপটি দেশের ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প ও উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ার ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। ব্যাংকগুলো এখন থেকে বর্ধিত এই সীমার মধ্যে ঋণ বিতরণ করতে পারবে, যা দেশের বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠীগুলোকে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। শিল্পখাতের অংশীজনরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে।
সরকার ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ করার পর তেলের বাজারে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নতুন দরের তেল এখনো বাজারে না আসলেও খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাঁদের কাছে থাকা পুরোনো মজুত করা তেল নতুন ও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছে বর্তমানে যে ভোজ্যতেল রয়েছে, তা আগের কম দামে কেনা হলেও সরকারি ঘোষণার সুযোগ নিয়ে তাঁরা সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি ও আমদানিকারকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের নতুন মূল্য ঠিক করা হয়েছে ৯৭৫ টাকা। এই নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই বাজারজুড়ে পুরোনো তেলের ওপর নতুন দাম চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।
সাধারণ ভোক্তাদের অভিযোগ, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকেই তেলের বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল। ডিলার ও কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। মূলত দাম বাড়ার আগাম সংকেত পেয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করে রেখেছিলেন। এখন নতুন দাম ঘোষণার পর তাঁরা সেই মজুত করা পুরোনো তেলই বাড়তি দামে বাজারে ছাড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বোতলের গায়ে লেখা আগের দাম ঘষে তুলে ফেলে ক্রেতাদের প্রতারিত করা হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী ও মিরপুরসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা পাঁচ লিটারের পুরোনো বোতল নির্ধারিত ৯৫৫ টাকার পরিবর্তে ৯৬০ থেকে ৯৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। এমনকি খোলা সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত ১৮০ টাকার পরিবর্তে ১৯২ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার ও ডিলার পর্যায়ে দাম বেশি হওয়ায় তাঁরাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যদিও বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকায় অসাধু চক্র বারবার এমন কারসাজি করার সুযোগ পাচ্ছে। নতুন দরের তেল বাজারে আসার আগেই পুরোনো মজুতের ওপর বাড়তি দাম আদায় করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী ক্রেতারা আশা করছেন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দ্রুত বাজার অভিযানে নামবে এবং গায়ের দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়া ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনবে। অন্যথায় নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মরিশাসে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ব্রামার ফন্ট্রিয়ার পিই টু লিমিটেড দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রানার অটোমোবাইলস পিএলসির ৫০ লাখ শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে গত ৯ এপ্রিল এই শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে বলে কোম্পানিটি ডিএসইকে নিশ্চিত করেছে। সুইডেনভিত্তিক ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্সের এই বিদেশি বিনিয়োগ ফান্ডটি রানার অটোমোবাইলসের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে যুক্ত রয়েছে।
৫০ লাখ শেয়ার বিক্রির পর রানার অটোমোবাইলসে ব্রামার ফন্ট্রিয়ারের মালিকানা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে রানারের ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪ হাজার ৩৪৭টি শেয়ার রয়েছে, যা মোট শেয়ারের ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই বিক্রির আগে ব্রামারের কাছে রানার অটোমোবাইলসের ১৬ দশমিক ১২ শতাংশ বা ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪ হাজার ৩৪৭টি শেয়ার ছিল। মূলত ধাপে ধাপে মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার কৌশলী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সর্বশেষ শেয়ার বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রানার অটোমোবাইলসে ব্রামার ফন্ট্রিয়ারের বিনিয়োগের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি ১০৫ কোটি টাকার বিনিময়ে রানারের ১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৬১টি শেয়ার কিনে প্রথম বিনিয়োগ শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে দুই দফায় বোনাস শেয়ার পাওয়ার ফলে তাদের শেয়ারের পরিমাণ বেড়ে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫২১টিতে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে রানার অটোমোবাইলস যখন আইপিও-র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন কোম্পানিটিতে ব্রামারের শেয়ার ধারণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
আর্থিক সূচকের দিক থেকে রানার অটোমোবাইলস পিএলসি বর্তমানে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১১৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সঞ্চিত বা রিজার্ভ তহবিলে বর্তমানে ৪৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা জমা রয়েছে। বাজারে রানার অটোমোবাইলসের মোট শেয়ার সংখ্যা ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২টি, যার একটি বড় অংশই সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
কোম্পানিটির বর্তমান মালিকানা কাঠামো অনুযায়ী, ৫০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি অংশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ২২ দশমিক ৯৩ শতাংশ শেয়ার। ব্রামার ফন্ট্রিয়ারের এই বড় অংকের শেয়ার বিক্রির ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, অটোমোবাইল খাতের এই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত ব্যাংকগুলোর পৃথক পরিচালনা পর্ষদ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া ব্যাংকগুলো হলো—এবি ব্যাংক পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি, ওয়ান ব্যাংক পিএলসি, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি এবং এনআরবি ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পৃথক মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের (পিএসআই) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচিত সময়ে তিনটি ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে এবি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৩ টাকা ৪২ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট দায় রয়েছে ৩৬ টাকা ২ পয়সা। একইভাবে আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণও গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে; ব্যাংকটি সমন্বিতভাবে শেয়ারপ্রতি ১৩ টাকা ৩২ পয়সা লোকসান গুনেছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংক শেয়ারপ্রতি ৭ টাকা ৫৫ পয়সা লোকসান দিয়েছে এবং ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ টাকা ৩৭ পয়সা।
তালিকায় থাকা অন্য তিনটি ব্যাংক মুনাফা অর্জন করলেও এবার বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। মার্কেন্টাইল ব্যাংক ২০২৫ হিসাব বছরে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ১০ পয়সা মুনাফা করেছে এবং ওয়ান ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ২৮ পয়সা। এনআরবি ব্যাংকও গত বছরের তুলনায় মুনাফা কিছুটা বৃদ্ধি করে শেয়ারপ্রতি ২০ পয়সায় উন্নীত করেছে। তবে মুনাফা থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাংক লভ্যাংশ না দিয়ে সেই অর্থ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ২৩ টাকা ৯২ পয়সা, ওয়ান ব্যাংকের ২২ টাকা ৪৬ পয়সা এবং এনআরবি ব্যাংকের ১২ টাকা ৮৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকগুলোর বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) সময়সূচি ও রেকর্ড ডেটও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এবি ব্যাংকের এজিএম আগামী ১৮ জুন এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এজিএম ২৪ জুন অনুষ্ঠিত হবে; এই দুই ব্যাংকেরই রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ মে। আইএফআইসি ব্যাংকের এজিএম হবে ২৯ জুন এবং রেকর্ড ডেট ২১ মে। ওয়ান ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক—উভয় প্রতিষ্ঠানের এজিএম আগামী ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবশেষে এনআরবি ব্যাংক ২০ আগস্ট তাদের সাধারণ সভা আহ্বান করেছে। প্রতিটি ব্যাংকই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাদের বার্ষিক সাধারণ সভা পরিচালনা করবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতন হয়েছে। ২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই ব্যবসায়িক সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ২ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা শেষ কার্যদিবসে কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১১৮ কোটি টাকায়। অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দাম কমায় এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১২ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ২৮৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ২৪৬টির এবং ২৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। প্রধান সূচক কমলেও শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১৪ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৫৩ পয়েন্টে নেমেছে। তবে বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসই-৩০ গত সপ্তাহে কিছুটা ইতিবাচক ছিল এবং ২ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এই মিশ্র প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা সতর্ক অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সূচক ও বাজার মূলধন কমলেও গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের গতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সপ্তাহজুড়ে মোট ৪ হাজার ৭১৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২০২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বেশি। প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহের গড় লেনদেনের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ বা ৪০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। এই বাড়তি লেনদেন বাজারে ক্রেতাদের সক্রিয়তা বাড়ার প্রমাণ দিলেও বিক্রির চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত দরপতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গত সপ্তাহে মন্দাভাব লক্ষ্য করা গেছে। এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক সিএএসপিআই ও সিএসআই যথাক্রমে দশমিক ১৭ শতাংশ ও দশমিক ৯৩ শতাংশ কমেছে। সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে ৩০৮টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেনে অংশ নেয়, যার মধ্যে ১১৬টির দাম বেড়েছে এবং ১৭৩টির দাম কমেছে। এছাড়া সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কমে ১৪৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে উভয় বাজারেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা মুনাফা সংগ্রহের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে পণ্যটির বাজারদর কমে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। মূলত বিশ্ববাজারে চিনির বিপুল মজুত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে চলমান অস্থিরতার প্রভাবেই এই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরবরাহের আধিক্য এবং জ্বালানি খাতের অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে চিনির বাণিজ্যিক ভারসাম্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
আইসিই (ICE) এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম কমে পাউন্ডপ্রতি ১৩ ডলার ৪৬ সেন্টে নেমে এসেছে। এর আগে গত শুক্রবার দাম আরও কমে ১৩ ডলার ২২ সেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম দামের রেকর্ড। যদিও সাদা চিনির দাম দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ৪১৯ ডলার ৭০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে চিনির বাজারে এক ধরনের মন্দা ভাব বিরাজ করছে। বাজারে চিনির অতিরিক্ত সরবরাহ দামের ওপর এই নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করছে।
চিনির এই দরপতনের পেছনে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে চিনি উৎপাদনকারী কলগুলো ইথানল উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে সরাসরি চিনি উৎপাদনে মনোযোগ বাড়ায়। এর ফলে বাজারে চিনির জোগান হঠাৎ অনেক বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম কমতে শুরু করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনায় তেলের বাজারে যে স্বস্তি দেখা গেছে, তা ইথানল বিমুখতা বাড়িয়ে চিনির উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করেছে।
ব্রোকার প্রতিষ্ঠান এডমিস-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ বিপণন মৌসুমে বিশ্ববাজারে চিনির বড় ধরনের উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরবর্তী মৌসুমে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ কমে গিয়ে চিনির বাজারে সামান্য ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় যদি পুনরায় তেল সংকট দেখা দেয়, তবে বায়োফুয়েল হিসেবে চিনির চাহিদা আবারও বাড়তে পারে। আপাতত অতিরিক্ত সরবরাহের চাপই বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে।
চিনির এই নজিরবিহীন দরপতন বৈশ্বিক চিনি উৎপাদনকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের অ্যাসোসিয়েটেড ব্রিটিশ ফুডসের চিনি বিভাগ তাদের ব্যবসায় বড় অংকের লোকসানের কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আশঙ্কা করছে, ইউরোপীয় বাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিক কম থাকায় পুরো বছর জুড়ে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বের অনেক চিনি উৎপাদনকারী দেশ তাদের বর্তমান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের পর এবার কয়লার দামেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে এই জ্বালানি পণ্যটির দাম সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজার সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি টন কয়লার দাম এখন ১৩০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। অথচ মাত্র এক মাস আগে গত ২০ মার্চ কয়লার দাম ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪৬ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছেছিল। এক মাসের ব্যবধানে পণ্যটির এমন দরপতন বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমনের আভাস পাওয়ায় কয়লার বাজারে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লার ওপর থাকা বাড়তি চাপের অবসান ঘটছে।
কয়লার দাম কমার পেছনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান জোগানকেও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার ব্যবহার কমতে শুরু করেছে। ইতিপূর্বে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ গ্যাসের চড়া দামের কারণে বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকেছিল। এখন গ্যাসের প্রাপ্যতা সহজলভ্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কয়লার সামগ্রিক চাহিদা ও দাম—উভয়ই হ্রাস পাচ্ছে।
দাম কমলেও কয়লার বাজার এখনই পুরোপুরি স্থিতিশীল বা ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রেশ এখনো বিদ্যমান থাকায় জ্বালানি বাজারে এক ধরনের অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা কাজ করছে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে কয়লার দাম কমতির দিকে থাকলেও গত মার্চের শুরুতে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগের সময়ের তুলনায় এটি এখনো প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। ফলে বিশ্ববাজারের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন অনেকখানি কূটনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
বর্তমানে কয়লা আমদানিকারক দেশগুলো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে। যদি আগামী দিনগুলোতে আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও কমে আসে এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তবে কয়লার দাম দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে। সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পমালিকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার এই নিম্নমুখী ধারা একটি স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুতের খরচ কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশে জাপানি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো যাচাই করতে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত প্রিমিয়াম সুপারশপ ‘ইউনিমার্ট’ পরিদর্শন করেছে জাপানের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্যমন্ত্রী সুজুকি নোরিকাজু। বাংলাদেশে মানসম্মত জাপানি পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এই সফরের আয়োজন করা হয়। পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দল ইউনিমার্টের আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানের বিপণন অবকাঠামো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সুপারশপটি ঘুরে দেখার সময় জাপানি কৃষিমন্ত্রী বাংলাদেশে ‘মেড ইন জাপান’ পণ্যের উপস্থিতি আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, উচ্চমানের কৃষি ও খাদ্যপণ্য এবং জাপানি কনজিউমার গুডসের জন্য বাংলাদেশের বাজার অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। জাপানি প্রতিনিধি দল ইউনিমার্টের শেলফে থাকা পণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রদর্শনীর প্রশংসা করার পাশাপাশি এখানকার গ্রাহকদের রুচি ও চাহিদা সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। জাপানি নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির এই দেশে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির পণ্যের বাজার দিনদিন বড় হচ্ছে।
পরিদর্শন পরবর্তী এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে আমদানি শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা এবং আইনি প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে জাপানি মন্ত্রী দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকর সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বাধার বিন্ধ্যাচলগুলো দূর করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের সাধারণ ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে আরও বেশি গুণগত মানের জাপানি পণ্য সরাসরি সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।
ইউনিমার্ট পরিদর্শনের সময় প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক শারফুদ্দিন আকতার রশিদ, ইউনিমার্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী মাহফুজুর রহমান এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শাহিন মাহমুদ। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন। ইউনাইটেড গ্রুপের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আধুনিক রিটেইল চেইনে জাপানি বিনিয়োগ ও পণ্য সরবরাহের বিষয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাপানের কৃষিমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে খাদ্য আমদানি ও খুচরা বাণিজ্য খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এর ফলে খুচরা ও আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে দুই দেশের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। এই সফরের সরাসরি প্রভাব হিসেবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের বড় বড় সুপারশপগুলোতে জাপানি ডেইরি পণ্য, সি-ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সম্পর্কের লক্ষ্যেই এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনটি সম্পন্ন হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যমুনা ব্যাংক পিএলসি সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে ব্যবসায়িক ও আর্থিক সূচকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ব্যাংকটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হওয়ায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বিনিয়োগকারীদের জন্য ২৯ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ঘোষিত এই লভ্যাংশ ও অন্যান্য এজেন্ডায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে আগামী ২৭ জুলাই সকাল ১০টায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে এবং এর জন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ জুন।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ হিসাব বছরে যমুনা ব্যাংকের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫৫৬ কোটি টাকায়, যা আগের বছর ছিল মাত্র ২৭৯ কোটি টাকা। আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি বড় সাফল্য দেখিয়েছে; এক বছরের ব্যবধানে আমানত ১৬ শতাংশ বা ৪ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৩৬ হাজার ৩২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মুনাফা ও আমানত বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়ে (ইপিএস), যা আগের বছরের ২ টাকা ৯৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৯২ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।
ব্যাংকটির এই উন্নতির ধারা চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকাঞ্চলেও (জানুয়ারি-মার্চ) বজায় রয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে যমুনা ব্যাংকের সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৯৪ পয়সা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ টাকা ৯১ পয়সা। চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৮ টাকা ৮৮ পয়সায়। প্রতিটি আর্থিক সূচকের এই ইতিবাচক পরিবর্তন ব্যাংকটির শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ জানান, গ্রাহকদের আস্থার কারণেই আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেওয়ায় তা ২ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই-বাছাই এবং প্রাইমারি ডিলার হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকটি বড় অংকের ফি আয় করছে। ব্যাংকের নগদ প্রবাহ অত্যন্ত সন্তোষজনক হওয়ায় ব্যালেন্স শিটের ওপর চাপ না ফেলে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণীয় নগদ লভ্যাংশ প্রদান করা সম্ভব হয়েছে।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯৩ কোটি ৯৩ লাখের বেশি। বর্তমানে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোর ৪০ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। এ ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৫৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ১৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সুশাসন ও নিয়মিত বিধিবিধান পরিপালনের মাধ্যমে ব্যাংকটি আগামী দিনেও তাদের এই ব্যবসায়িক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট রয়েছে।
মে মাসের জন্য জ্বালানি তেলের বর্তমান বাজারদর অপরিবর্তিত রেখে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। গত ১৯ এপ্রিল শেষ দফায় মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নতুন আদেশে আগের সেই বর্ধিত মূল্যই বহাল রাখার কথা জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত মাসের ওই মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশে অকটেনের দাম ২০২২ সালের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
এর আগে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আদেশে ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেন ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল, যার প্রফলে গণপরিবহনের ভাড়া সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্রতর হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ২০২২ সালের মার্চে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৩৭ ডলারে উঠেছিল, অন্যদিকে ২০২১ সালে করোনার সময় তা সর্বনিম্ন ৫০ ডলারে নেমেছিল।
চলতি বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ‘জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা’ কার্যকর করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রতি মাসে বিশ্ববাজারের সঙ্গে দামের সামঞ্জস্য বিধান করা। এই বিধিমালা অনুযায়ী বিপিসি ও অন্যদের কমিশন অপরিবর্তিত থাকবে, কেবল আমদানিমূল্যের তারতম্যের ভিত্তিতে প্রতি মাসে দর কমবে বা বাড়বে। যদিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, বিএনপি সরকার এপ্রিলের শুরুতে বিশ্ববাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও দাপ্তরিকভাবে দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল, যা পরবর্তীতে মাসের ১৯ তারিখে গিয়ে এক লাফে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
সরকারি নির্দেশিকায় মূল্য নির্ধারণের যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, "অকটেন ও পেট্রোল ব্যক্তিগত যানবাহনে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হয় বিধায় এর মূল্য বিলাস দ্রব্য (লাক্সারি আইটেম) হিসেবে সব সময় ডিজেলের চেয়ে বেশি রাখা হয়।" এই গাণিতিক ফর্মুলা অনুযায়ী অকটেন ও ডিজেলের দামের ব্যবধান লিটারপ্রতি অন্তত ১০ টাকা নিশ্চিত করতে ‘α’ ফ্যাক্টর বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের বাজারে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তেল সংগ্রহের হিড়িক পড়লে গত ৬ মার্চ থেকে পাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং শুরু করা হয়, যার ফলে পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও বিশেষ তদারকি কর্মকর্তা নিয়োগ দিলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস পর চলতি সপ্তাহ থেকে পাম্পগুলোর উপচে পড়া ভিড় কিছুটা কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা বজায় থাকলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।