বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে আরেকটি বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যেই ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে বাজারের আগুনে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে কিছুটা রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ৩ লাখ টাকা থেকে এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। তবে করপোরেট করে হাত দেননি অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল; কর আগের মতোই থাকছে। বিদ্যমান করপোরেট কর হিসেবে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৭ শতাংশ করই অপরিবর্তিত থাকছে।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বয়স্ক ভাতা বাড়ছে ১০০ টাকা; বিধবা ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে’ যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটের আগে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি তার এবারের বাজেটেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছেন। আর বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে, সেই সময় নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সাফ বলে দিয়েছেন, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ‘পূরণ হবে না’। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আমদানি কমে যাচ্ছে। এই পরিবেশে প্রবৃদ্ধি খুব একটা যে হবে, সেটা আশা করা ঠিক না। এ বছর বলা হচ্ছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে। আমার বিবেচনায় সেটাও কমে হয়তো ৫-এর ঘরে চলে আসবে। আগামী বছর যে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু হবে তা মনে হয় না। তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোন জাদুবলে আসবে। এটা অসম্ভব; অবাস্তব লক্ষ্য। অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘গড় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশ। সেই মূল্যস্ফীতি কীভাবে ৬ শতাংশে নেমে আসবে- এটাও আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রধান গুরুত্বে রেখে সরকারকে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করি।’
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা) চেয়ে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। টাকার এই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ২১ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বছর বাজেট দিতে গিয়ে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়’ প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, জ্বালানি ও ডলারসংকট এবং মূল্যস্ফীতি তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মধুর হতে দেয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে হাঁটতে হয়েছে কৃচ্ছ্রের পথে। তার ওপর বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে স্বস্তি আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বছরে এবং দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে জনতুষ্টির খুব বেশি সুযোগ রাখার পথ মুস্তফা কামালের সামনে নেই। তার পরও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর নির্বাচনী স্লোগানটিকেই তিনি বাজেটে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “আমাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম মানুষ আর চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়; মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে; বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে; বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।”
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। কিন্তু মহামারির ধাক্কায় সেই ধারায় কিছুটা ছেদ পড়ে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার ঝুঁকি থাকলেও বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন মুস্তফা কামাল।
৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা যাবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
মহামারির ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে লাগাম দেয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন।
তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশের মতো।
গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা করা হয়।
আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের দেশি-বিদেশি উৎস অনুসন্ধান হবে রাজস্ব খাতের নীতি-কৌশল। রাজস্ব আহরণে সব সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি সহজীকরণসহ অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে কর নেট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজন কর আদায় সহায়ক ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস স্থাপন ও সম্প্রসারণ, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, কর প্রশাসনের অটোমেশন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে।’
২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় কয়েক বছর ধরেই তা সম্ভব হচ্ছে না। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। তার পরও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
দেশের বাজারে টানা তিন দফা কমানোর পর আবারও সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। ২১ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি সোনার দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৫৮ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকায়। এর আগে বুধবার পর্যন্ত এই মানের সোনার ভরি ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকা। স্থানীয় বাজারে অলঙ্কার তৈরির প্রধান উপাদান ‘তেজাবি’ বা পিওর গোল্ডের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দর সমন্বয় করা হয়েছে বলে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে।
নতুন নির্ধারিত মূল্য তালিকায় সোনার প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই দামের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ২৭ thousand ৩৩১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা এখন থেকে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৮৯ টাকায় বিক্রি হবে। সোনার মূল্যের পাশাপাশি বাজুস রুপার দামও পুনর্নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা, ২১ ক্যারেটের ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৬০৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সাধারণ ও সনাতন পদ্ধতির রুপার দামও ৩ হাজার ৭৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিই মূলত স্থানীয় বাজারে দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তনের মূল কারণ। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর থেকেই বিশ্ববাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা ও দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনা ৪ হাজার ৫৩৭ মার্কিন ডলারে লেনদেন হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে সোনার দাম এক পর্যায়ে ৫ হাজার ৫৫০ ডলারে উঠেছিল, যা পরবর্তীতে কিছুটা নিম্নমুখী হয়ে বর্তমানে বর্তমান অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গত কয়েক মাস সোনার বাজারের জন্য এক ঐতিহাসিক সময় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারে এক দিনেই ভরিপ্রতি রেকর্ড ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়েছিল বাজুস। সে সময় ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছিল, যা এ দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম। তবে পরবর্তীতে কয়েক দফায় দাম কিছুটা কমিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হলেও আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপটে আবারও এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ ক্রেতা ও অলঙ্কার ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, উৎসবের এই মৌসুমে সোনার এমন লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি কেনাকাটার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য সোনার অলঙ্কার সংগ্রহ করা এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজুস জানিয়েছে, তাঁরা নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজার এবং স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটের দর পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেই অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করেন। ভবিষ্যতে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম কমে আসে, তবে স্থানীয় বাজারেও দ্রুত দাম কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বাস প্রদান করেছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে টানা আট দিন বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যকার সকল প্রকার আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ মে (সোমবার) থেকে শুরু করে ১ জুন (সোমবার) পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক স্থবিরতা বজায় থাকবে। তবে পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধ থাকলেও বুড়িমারী ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বৈধ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক থাকবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সোমবার এক দাপ্তরিক নোটিশের মাধ্যমে এই ছুটির ঘোষণা দেয়। স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা অঞ্চলের আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সংগঠনগুলোর সাথে যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ছুটির বিষয়ে ইতোমধ্যে উভয় দেশের কাস্টমস বিভাগ, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ভুটানের সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। বুড়িমারী স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা সালাউজ্জামান ওপেল জানান, দীর্ঘ বিরতি শেষে আগামী ২ জুন থেকে পুনরায় নিয়মিত বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে বুড়িমারী ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে আমদানি-রপ্তানি বন্ধের প্রভাব যাত্রীদের ওপর পড়বে না এবং ইমিগ্রেশন সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকবে। বুড়িমারী কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মতলেবুর রহমান জানিয়েছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী ছুটির দিনগুলোতেও কিছু জরুরি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে। মূলত পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগ করে নিতেই এই বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর খুচরা বাজারে মসলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও আমদানির কেন্দ্রস্থল দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকার বাজারে পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ ও এলাচসহ বিভিন্ন মসলার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা এই পরিস্থিতির জন্য বাজার তদারকির ঘাটতি এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে দায়ী করেছেন। বর্তমানে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, আদা ২০০ টাকা এবং কাঁচামারিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মানভেদে এলাচের দাম কেজিতে কয়েকশ টাকা বেড়ে ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। এমনকি লবণের দামও কেজিতে ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে ।
বিপরীতে, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানির পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে মসলার কোনো সংকট নেই এবং দামও কমতে শুরু করেছে। হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে জিরা, আদা, সাদা এলাচসহ বিভিন্ন মসলা এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা করা হচ্ছে।” কাস্টমস বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে ২৬ হাজার মেট্রিক টনের বেশি মসলা আমদানি হয়েছে, যার মধ্যে জিরা ও ছোট এলাচই রয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টন।
বর্তমানে হিলিতে পাইকারি পর্যায়ে জিরার দাম কমে ৫৪০ থেকে ৫৬০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এছাড়া সাদা এলাচের দামও প্রতি কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। হিলির পাইকারি বাজারের বিক্রেতা মো. আনোয়ার হোসেনের মতে, নতুন সরকারের কঠোর নজরদারি এবং পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে এবার দাম কমেছে।
হিলি কাস্টমস বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল আজম জানান, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মসলা জাতীয় পণ্য দ্রুত খালাসের জন্য সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করে বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার ঈদে দেশে মসলার কোনো ধরনের সংকট সৃষ্টি না হয় এবং বাজারদর ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঢাকার খুচরা বাজারে যখন অগ্নিমূল্য বিরাজ করছে, তখন দেশের প্রধান এই আমদানি পয়েন্টে পর্যাপ্ত মজুত ও দাম কমে আসার খবরটি সাধারণ ক্রেতাদের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বিশাল ব্যবধান কমাতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি জোরদার করা জরুরি।
দেশের ডেইরি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে নিউজিল্যান্ডকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)’র সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর ডিসিসিআই গুলশান সেন্টারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং শ্রীলঙ্কাকায় নিযুক্ত নিউজিল্যান্ডের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেভিড পাইনের মধ্যকার সাক্ষাৎ হয়। এসময় ডিসিসিআইয়ের পক্ষে এ আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়াও নিউজিল্যান্ডের অনাবাসিক হাইকমিশনার ডেভিড পাইন স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও নিউজিল্যান্ডের বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা বজায় থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিউজিল্যান্ডের এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা।
বৈঠকে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, ডেইরি শিল্প ও খাদ্য নিরাপত্তার বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিউজিল্যান্ড শীর্ষে অবস্থান করছে। তিনি নিউজিল্যান্ডের কারিগরি সহায়তা কামনা করে বলেন, “বাংলাদেশের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদন, ডেইরি খামারের আধুনিকায়ন, গবাদিপশুর উন্নত জাত উন্নয়ন, মৎস, ভেটেরিনারি প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি বাংলাদেশকে সহায়তার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।” এছাড়া তিনি জলবায়ু ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতেও নিউজিল্যান্ডের বেসরকারি খাতকে একক বা যৌথ বিনিয়োগে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৯৭ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাসকীন আহমেদ নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্য-প্রযুক্তি সেবা আরও বেশি পরিমাণে আমদানির জন্য নিউজিল্যান্ডের ব্যবসায়ীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, এই খাতের পণ্যগুলো নিউজিল্যান্ডের গ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
হাইকমিশনার ডেভিড পাইন তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশী পণ্যের জন্য নিউজিল্যান্ড শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখবে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, ‘এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশী পণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি দেশটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’ ডেভিড পাইন দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের সম্ভাবনার ওপর জোর দেন এবং বলেন যে এই লক্ষ্যে উভয় দেশের সরকারকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
নিউজিল্যান্ডের খাদ্যপণ্যের উচ্চমান ও জিএমও-মুক্ত বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরে হাইকমিশনার বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে শুধু রপ্তানি নয়, আমদানির ক্ষেত্রও বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। তিনি বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের গভীর আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ডিসিসিআই-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী ও সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে বড় ধরণের ইতিবাচক গতি সঞ্চার হয়েছে। চলতি মে মাসের প্রথম ১৯ দিনেই প্রবাসীরা বৈধ পথে মোট ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, মে মাসের শুরু থেকে এই সময় পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১৩ কোটি ৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের বছর একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে অর্থ পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট ৩ হাজার ১৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় যুক্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদুল আজহার বাড়তি কেনাকাটা ও কোরবানির খরচের কথা মাথায় রেখে প্রবাসীরা তাঁদের পরিবারের নিকট অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরণের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
ইতিপূর্বে গত মার্চ মাসে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার আসার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে মাসিক আয়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছিল এবং এর পরের মাস এপ্রিলেও ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের শক্তিশালী প্রবাহ বজায় ছিল। বর্তমানের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অর্থবছরের শেষে প্রবাসী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে হুন্ডি প্রতিরোধে কড়াকড়ি ও ব্যাংকিং চ্যানেলে সুবিধা বৃদ্ধির ফলে প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন ।
পবিত্র ঈদুল আজহা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে টানা আট দিন বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যকার সকল প্রকার আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ মে (সোমবার) থেকে শুরু করে ১ জুন (সোমবার) পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক স্থবিরতা বজায় থাকবে। তবে পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধ থাকলেও বুড়িমারী ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বৈধ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক থাকবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সোমবার এক দাপ্তরিক নোটিশের মাধ্যমে এই ছুটির ঘোষণা দেয়। স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা অঞ্চলের আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্ট সংগঠনগুলোর সাথে যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ছুটির বিষয়ে ইতোমধ্যে উভয় দেশের কাস্টমস বিভাগ, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ভুটানের সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। বুড়িমারী স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা সালাউজ্জামান ওপেল জানান, দীর্ঘ বিরতি শেষে আগামী ২ জুন থেকে পুনরায় নিয়মিত বাণিজ্য কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে, বুড়িমারী ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ সাইফুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে আমদানি-রপ্তানি বন্ধের প্রভাব যাত্রীদের ওপর পড়বে না এবং ইমিগ্রেশন সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকবে। বুড়িমারী কাস্টমসের সহকারী কমিশনার মতলেবুর রহমান জানিয়েছেন যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী ছুটির দিনগুলোতেও কিছু জরুরি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে। মূলত পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগ করে নিতেই এই বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে সকল সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি বাধ্যতামূলকভাবে শতভাগ ‘এ-চালান’ পদ্ধতির মাধ্যমে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা দিতে হবে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করা হয়েছে, যা সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। মূলত সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের উপসচিব ইশরাত জাবিন স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবিধান অনুযায়ী সরকারের সকল আয় ‘সংযুক্ত তহবিল’ বা ‘প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব’-এ জমা হওয়া আবশ্যক। ট্রেজারি নীতিমালা অনুযায়ী এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত টিএসএ-এর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও অনেক দপ্তর এখনও পুরোনো ম্যানুয়াল কোড ব্যবহার করছে। এমনকি টিএসএ এড়িয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে পৃথক হিসাব খুলে অর্থ সংরক্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে, যা সরকারের নগদ অর্থের সঠিক হিসাব নিরূপণে বাধা সৃষ্টি করছে।
সরকারের ভাষ্যমতে, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অলসভাবে পড়ে থাকায় জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্র সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিভিন্ন উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে পরিপত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, ১ জুলাই থেকে ‘এ-চালান’ ব্যতিরেকে অন্য কোনো পদ্ধতিতে অর্থ গ্রহণ বা জমা করা যাবে না। কোনো দপ্তরে পৃথক কোনো ব্যবস্থাপনা চালু থাকলে তা অবিলম্বে বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি দপ্তরকে তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ আগামী ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার ফলে সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চিত্র স্পষ্ট হবে এবং ঋণের সুদজনিত ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আর্থিক খাতের এই সংস্কার অত্যন্ত সময়োপযোগী।
বিমা ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের জয়জয়কারে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের দুই পুঁজিবাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) এদিন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচক এবং লেনদেনের পরিমাণ—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বিমা খাতের ব্যাপক প্রভাবের ফলে লেনদেনের শুরু থেকেই বাজারে ইতিবাচক গতির সঞ্চার হয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে এদিন ১৯৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে দাম কমেছে ১৩১টির এবং ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত রয়েছে। বিশেষভাবে বিমা খাতের ৪৪টি এবং আর্থিক খাতের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধি সামগ্রিক বাজারকে চাঙ্গা রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২২২ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। অন্যান্য সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬১ এবং বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৭৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সূচক বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বুধবার বাজারটিতে মোট ৮৪১ কোটি ১২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ১৬৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বেশি। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এনসিসি ব্যাংক, যার ৪২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এছাড়া আরডি ফুড, টেকনো ড্রাগস, মীর আখতার হোসেন ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের দিক থেকে সামনের সারিতে ছিল।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের ইতিবাচক চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৭টির দাম বেড়েছে এবং ৮৭টির দাম কমেছে। সিএসইতে এদিন মোট ৪৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা থাকা ভালো কোম্পানির পাশাপাশি ‘জেড’ গ্রুপের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) তাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক পারফরম্যান্স ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে শরিয়াহ সূচকে বড় ধরণের সমন্বয় সাধন করেছে। বুধবার সিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, এই নতুন সমন্বয়ের ফলে সূচকে তিনটি নতুন কোম্পানি যুক্ত হওয়ার বিপরীতে আগের ১২টি কোম্পানিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩ জুন থেকে সংশোধিত এই শরিয়াহ সূচকটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। বর্তমানে সিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৮৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্য থেকে বাছাইকৃত ১০৩টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে এই শরিয়াহ সূচকটি গঠিত হয়েছে।
সূচকে নতুন করে স্থান পাওয়া কোম্পানিগুলো হলো— এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি পিএলসি এবং সায়হাম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। অন্যদিকে, পারফরম্যান্সের মাপকাঠিতে পিছিয়ে থাকায় বা শরিয়াহ মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় বাদ পড়া ১২টি কোম্পানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— গ্রামীণফোন লিমিটেড, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি, এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি, এবং বারাকা পাওয়ার লিমিটেড। এছাড়াও ডরিন পাওয়ার, নাভানা সিএনজি, অলিম্পিক এক্সেসরিজ ও সায়হাম কটন মিলসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছে।
নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের জন্য শরিয়াহ সম্মত কোম্পানি বাছাই করতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে সিএসই কর্তৃপক্ষ। শরিয়াহ সূচকের এই পরিবর্তন শেয়ারবাজারে নির্দিষ্ট ঘরানার বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের দাম শক্তিশালী হয়েছে। বুধবার ডলারের মান গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও ক্রমবর্ধমান থাকায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বড় ধরণের অর্থনৈতিক চাপ তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং অস্ট্রেলীয় ও নিউজিল্যান্ড ডলারসহ প্রধান প্রধান মুদ্রার বিপরীতে এর মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরেছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ইরান সমঝোতায় আগ্রহী হতে পারে, তবুও তিনি আবারও হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার মুদ্রাকৌশলবিদ ক্যারল কং মনে করেন, ফেডের কঠোর অবস্থান ডলারকে আরও শক্তিশালী করবে।
ডলারের এই শক্তিশালী অবস্থানের কারণে জাপানি ইয়েনের মান প্রতি ডলারে ১৬০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা গত ৩০ এপ্রিলের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান। ইয়েনের এই পতনের ফলে টোকিও পুনরায় মুদ্রাবাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল থাকায় তেলের দামে অস্থিরতা কমছে না। বুধবার প্রাথমিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১০ দশমিক ৮ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের উচ্চমূল্য এবং জ্বালানি তেলের চড়া দাম দেশের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলবে। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা এবং স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আসন্ন বাজেটে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য এই নতুন সীমা কার্যকর হবে। মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের কর বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই বর্ধিত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পূর্বতন সরকারের ঘোষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।
এনবিআর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই অর্থবছরে বার্ষিক ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে কোনো আয়কর দিতে হবে না। এর পরবর্তী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ এবং এর পরের ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ হারে কর ধার্য করা হয়েছে। আয়ের পরিমাণ আরও বেশি হলে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হবে। বর্তমানে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পরবর্তী এক লাখ টাকার জন্য ৫ শতাংশ হারে কর দেওয়ার যে বিধান রয়েছে, নতুন কাঠামোতে তাতে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিশেষ ক্যাটাগরির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতাদের জন্য এই সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত ‘জুলাই যোদ্ধা’ করদাতাদের ক্ষেত্রেও করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বর্তমানের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমার এই বর্ধিত হার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বর্ধিত সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বাজেটে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য টানা তৃতীয়বারের মতো কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। সংশোধিত মূল্য অনুযায়ী, ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৫৮ টাকা পর্যন্ত হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গতকাল ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা। বুধবার সকালে বাজুসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয় এবং এদিন সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই দর কার্যকর হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি বা পিওর গোল্ড’-এর দাম কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে ঘরোয়া বাজারেও দাম কমানো হয়েছে। নতুন দরের তালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২৫ হাজার ২৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের প্রতি ভরির মূল্য ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্বর্ণের দাম কমলেও রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা আগের মতোই ৫ হাজার ৬৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও স্বর্ণের দাম কিছুটা পড়তির দিকে রয়েছে। স্বর্ণের বৈশ্বিক বাজারদর সংক্রান্ত ওয়েবসাইট গোল্ডপ্রাইস ডট ওআরজি-র তথ্যমতে, প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম বর্তমানে ৪ হাজার ৪৬৫ ডলারে অবস্থান করছে। অথচ গত ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে আউন্স প্রতি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৫০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। উল্লেখ্য, ওই সময় দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়ে এক লাফে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং প্রতি ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছে ইতিহাস গড়েছিল। বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিরতা কিছুটা স্থিমিত হওয়ায় দেশের বাজারে এই ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় বিদেশি আধিপত্য বাড়ছে। এই খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রান্তিকীকরণ করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। তাই এসব সম্পদে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা এবং বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ’ (সিএসআর) আয়োজিত নীতিনির্ধারণী গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলা হয়। ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসআর-এর নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার।
আলোচনায় অংশ নেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ক্যাব সভাপতি আবু আলম শহীদ খান, সাবেক সচিব শফিক জামান, বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান, ঢাকা স্টিম উপদেষ্টা সম্পাদক হাসান মামুন, ঢাকা স্টিমের প্রধান নির্বাহী কর্নেল (অব.) মো. সোহেল রানা, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ কো-অর্ডিনেটরসবুজ এইচ চৌধুরী, এফসিএ, এটিজেএফবি সাধারণ সম্পাদক বাতেন বিপ্লব ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ইকতান্দার হোসাইন হাওলাদার।
মূল প্রবন্ধে সাকিব আনোয়ার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নামে মূলত দেশীয় অর্থের ও ঋণের ব্যবহার হচ্ছে। পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে বিদেশি অপারেটরের ১৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার বা ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশই এসেছে দেশীয় ও আঞ্চলিক ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ থেকে।
অন্যদিকে, দেশীয় উদ্যোক্তারা সমান সুযোগ পেলে যে আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে সক্ষম, তার প্রমাণ হলো সিডিডিএল ও এমজিএইচ গ্রুপ। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সিডিডিএল আগের অপারেটরের চেয়ে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি উৎপাদনশীলতা দেখিয়েছে। একইভাবে, এনসিটি পরিচালনায় এমজিএইচ গ্রুপ বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে কনটেইনার প্রতি বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাছাড়া, ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এমজিএইচ গ্রুপ লালদিয়ায় গ্রিন টার্মিনাল নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে যাওয়ার সমালোচনা করে প্রবন্ধে বলা হয়, আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অস্বাভাবিক দ্রুততায় মাত্র ১৩ দিনে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আইএফসির নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ৬২ দিন।
এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের (৯৩.৫০ ও ৯৭.৫০ ডলার) চেয়ে কনটেইনার প্রতি বেশি রাজস্ব (৯৮.৫০ ডলার) দেয়ার প্রস্তাব করলেও, সরকার বিদেশিদের নিয়েই মূল্যায়ন কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
বক্তারা বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা পেতে বিদেশি কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রদূত ও রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে লবিং করছে। কিন্তু দেশীয় লজিস্টিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের এমন কোনো অর্থবহ সংলাপ নেই। আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিপক্ষে নই, কিন্তু পিসিটির মতো ঋণের টাকায় ‘এফডিআই’ দেখানোর কোনো মানে হয় না। বিদেশি প্রযুক্তি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা বা যৌথ উদ্যোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, কৌশলগত খাতে দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নীতি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলে। সবশেষে কৌশলগত অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রে দেশীয় কোম্পানির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন বন্দর নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়।