বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে আরেকটি বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যেই ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে বাজারের আগুনে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে কিছুটা রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ৩ লাখ টাকা থেকে এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। তবে করপোরেট করে হাত দেননি অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল; কর আগের মতোই থাকছে। বিদ্যমান করপোরেট কর হিসেবে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৭ শতাংশ করই অপরিবর্তিত থাকছে।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বয়স্ক ভাতা বাড়ছে ১০০ টাকা; বিধবা ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে’ যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটের আগে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি তার এবারের বাজেটেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছেন। আর বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে, সেই সময় নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সাফ বলে দিয়েছেন, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ‘পূরণ হবে না’। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আমদানি কমে যাচ্ছে। এই পরিবেশে প্রবৃদ্ধি খুব একটা যে হবে, সেটা আশা করা ঠিক না। এ বছর বলা হচ্ছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে। আমার বিবেচনায় সেটাও কমে হয়তো ৫-এর ঘরে চলে আসবে। আগামী বছর যে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু হবে তা মনে হয় না। তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোন জাদুবলে আসবে। এটা অসম্ভব; অবাস্তব লক্ষ্য। অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘গড় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশ। সেই মূল্যস্ফীতি কীভাবে ৬ শতাংশে নেমে আসবে- এটাও আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রধান গুরুত্বে রেখে সরকারকে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করি।’
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা) চেয়ে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। টাকার এই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ২১ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বছর বাজেট দিতে গিয়ে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়’ প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, জ্বালানি ও ডলারসংকট এবং মূল্যস্ফীতি তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মধুর হতে দেয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে হাঁটতে হয়েছে কৃচ্ছ্রের পথে। তার ওপর বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে স্বস্তি আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বছরে এবং দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে জনতুষ্টির খুব বেশি সুযোগ রাখার পথ মুস্তফা কামালের সামনে নেই। তার পরও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর নির্বাচনী স্লোগানটিকেই তিনি বাজেটে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “আমাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম মানুষ আর চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়; মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে; বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে; বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।”
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। কিন্তু মহামারির ধাক্কায় সেই ধারায় কিছুটা ছেদ পড়ে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার ঝুঁকি থাকলেও বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন মুস্তফা কামাল।
৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা যাবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
মহামারির ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে লাগাম দেয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন।
তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশের মতো।
গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা করা হয়।
আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের দেশি-বিদেশি উৎস অনুসন্ধান হবে রাজস্ব খাতের নীতি-কৌশল। রাজস্ব আহরণে সব সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি সহজীকরণসহ অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে কর নেট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজন কর আদায় সহায়ক ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস স্থাপন ও সম্প্রসারণ, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, কর প্রশাসনের অটোমেশন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে।’
২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় কয়েক বছর ধরেই তা সম্ভব হচ্ছে না। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। তার পরও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিকূল আবহাওয়ার শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ায় চালের উৎপাদন সামান্য বৃদ্ধির পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশটিতে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ ১ কোটি ৯৩ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। উৎপাদনের এই হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এমন ইতিবাচক পূর্বাভাস দেশটির খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি স্বস্তির বার্তা বহন করছে।
সামগ্রিক উৎপাদনের চিত্র ইতিবাচক হলেও বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক তথা এপ্রিল থেকে জুন মাসে ফলন কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় এই প্রান্তিকে চাল উৎপাদন হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৬১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ কম। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম কয়েক মাসের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ফলন এই দ্বিতীয় প্রান্তিকের সম্ভাব্য ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে সামগ্রিক ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় কোনো বাধা তৈরি হয়নি।
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা চালের এই উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন। এর প্রধান কারণ হলো দেশটিতে বর্তমানে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া এই বিশেষ আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রভাবে এ বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র খরা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যা সরাসরি ধানের ফলন ও গুণমানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
২৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ইন্দোনেশিয়ায় চাল প্রধান খাদ্যশস্য হওয়ায় এর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। প্রলম্বিত খরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে দেশটির সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সেচ প্রকল্প নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বছরের প্রথমার্ধের পূর্বাভাস আশাব্যঞ্জক হলেও এল নিনোর তীব্রতা বাড়লে বছরের শেষার্ধের ফলন নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। সরকারি পর্যায় থেকে নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে প্রাকৃতিক রাবারের দাম গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জে রাবারের দাম প্রতি কিলোগ্রামে ২ ডলার ২২ সেন্টে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। তথ্য অনুযায়ী, কেবল চলতি বছরের শুরু থেকেই এই পণ্যটির দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মূলত লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বড় কোম্পানিগুলো আগেভাগেই রাবার মজুত করতে শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। খনিজ তেল থেকে তৈরি কৃত্রিম রাবার উৎপাদন বর্তমানে বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় টায়ারসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য নির্মাতারা এখন বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক রাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। থাইল্যান্ডের শীর্ষ রাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘শ্রী ট্রাং এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, টায়ার উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এখন তাদের গুদামে সাধারণ মজুতের তুলনায় বেশি পরিমাণ কাঁচামাল নিশ্চিত করতে চাইছে। তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে ল্যাটেক্স বা প্রাকৃতিক রাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার এই প্রবণতা থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার অন্যান্য রাবার সরবরাহকারী দেশগুলোর জন্য বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদনের এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এশিয়ার দেশগুলো, যার মধ্যে একাই ৩৪ শতাংশ উৎপাদন করে থাইল্যান্ড। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও আইভরি কোস্ট এই খাতের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকারী দেশ। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারের প্রায় ৪৫ শতাংশ রাবার একাই ব্যবহার করে চীন। বিশেষ করে দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) উৎপাদন সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাবারের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় ইভির ওজন বেশি থাকে এবং এর ব্যাটারির ভার ও তাৎক্ষণিক গতি সামলাতে টায়ারে উচ্চমানের প্রাকৃতিক রাবার বেশি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।
রাবারের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার টায়ার নির্মাতারা ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে বাজারে টায়ারের দাম বাড়ানো হতে পারে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং জ্বালানি তেলের বাজার চড়া থাকলে প্রাকৃতিক রাবারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি রাবার উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ পুনরায় বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে কার্বন নিঃসরণকারী এই জ্বালানির ব্যবহার ও আমদানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, চলতি মে মাসে বিশ্বজুড়ে কয়লা আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব ইতিহাসে কয়লা আমদানির তৃতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড। সাধারণত উত্তর গোলার্ধে শীতকাল শেষ হওয়ার পর এ সময় চাহিদা কম থাকার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার এই বাড়তি চাহিদার ফলে কয়লাবাহী জাহাজের সংখ্যা ও পরিবহন ব্যয় কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মার্কেট ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরগাস জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় মে মাসে কয়লা পরিবহনের ভাড়ার হার গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া গত কয়েক মাসে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজ ভাড়াও ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় কাতার বা উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন কয়লা আমদানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এশিয়ার দেশগুলোতে কয়লার চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে দেখা যাচ্ছে। থাইল্যান্ড তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পুনরায় সচল করেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে পরিবেশবান্ধব বিধিনিষেধ শিথিল করে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহেই দক্ষিণ কোরিয়া গত বছরের তুলনায় ৪ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন করেছে। জাপান ও ভিয়েতনামেও একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিপিং অ্যাসোসিয়েশন বিমকোর তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে কয়লা সরবরাহ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে কয়লাবাহী মাঝারি আকারের পণ্যবাহী জাহাজগুলোর ব্যবহার এখন তুঙ্গে রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী দেশ চীন তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় চীন এখন কয়লা থেকে কেমিক্যাল তৈরির কারখানায় উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রচণ্ড গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে কয়লার চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। সাধারণত জুলাই মাস থেকে শীতের জন্য কয়লা মজুত করা হলেও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশই আগেভাগে মজুত কার্যক্রম শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশই এখন দূষণকারী এই জ্বালানির দিকে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাত সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও টানা তিন মাস ধরে স্থবির হয়ে পড়েছে নির্মাণ খাত। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এ খাতের অন্যতম প্রধান উপাদান ইস্পাত শিল্পের ওপর, যার ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজধানীর গুলশানে গতকাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) আয়োজিত এক যৌথ আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। সভায় দেশের প্রধান চারটি খাতের ওপর পরিচালিত জরিপ ভিত্তিক প্রতিবেদন ‘পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স’ (পিএমআই) উপস্থাপন করা হয়।
পিএমআই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সামগ্রিক সূচক আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ১ পয়েন্ট বেড়ে ৫৪ দশমিক ৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সূচক মান ৫০-এর উপরে থাকলে তা সংশ্লিষ্ট খাতের সম্প্রসারণ নির্দেশ করে। এপ্রিলে কৃষি খাতের সূচক ৭০ দশমিক ৭, উৎপাদন খাতে ৫৬ দশমিক ৯ এবং সেবা খাতে ৫১ দশমিক ৮ পয়েন্ট পাওয়া গেছে। এই তিনটি খাত সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও ব্যতিক্রম কেবল নির্মাণ খাত। এপ্রিলে এই খাতের সূচক মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪৪ দশমিক ৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা স্পষ্টত সংকোচন বা স্থবিরতার বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, নির্মাণ খাতের এই নিম্নমুখী প্রবণতা ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসেও এই খাতটি ৫৮ দশমিক ২ পয়েন্ট নিয়ে সম্প্রসারণের ধারায় ছিল, কিন্তু ফেব্রুয়ারি ও মার্চে তা হ্রাস পেয়ে ৪৯ দশমিক ২ পয়েন্টে স্থবির হয়ে যায়। সভায় পিইবির সিনিয়র ম্যানেজার হাসনাত আলম বলেন, নির্মাণ খাত সংকুচিত হয়ে পড়ায় স্টিল বা ইস্পাত খাতের কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কর্মসংস্থান, উৎপাদন ক্ষমতা এবং আমদানি-রপ্তানির প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করেই এই সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা হয়েছে।
আলোচনা সভায় পিইবির চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ অর্থনীতির গতিশীলতা বুঝতে পিএমআই সূচকের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এই সূচকের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন তৈরি করে। এটি সরকার ও বেসরকারি খাতকে সঠিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড মেটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক স্টিফেন পোহ জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে সিঙ্গাপুরে এই সূচকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়ে আসছে এবং বাংলাদেশেও এটি দ্রুত নীতিনির্ধারকদের আস্থার জায়গায় পৌঁছাবে।
এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ফারুক আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত রবি আজিয়াটা, কোকা-কোলা বেভারেজ এবং পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিএমআইয়ের মতো তথ্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। বক্তারা মনে করেন, নির্মাণ খাতের এই স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে ইস্পাত শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মসলা আমদানিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাস্টমসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে মসলা আমদানির পরিমাণ প্রায় ৬২ হাজার মেট্রিক টন হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সরকারের সংগৃহীত রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমে গেছে, যা শতাংশের হিসাবে গত বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কম। আমদানির এই অস্বাভাবিক ছন্দপতন দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের সার্বিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আমদানিকারকদের দাবি অনুযায়ী, দেশে মসলার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বন্দর দিয়ে আমদানি কমার প্রধান কারণ হলো চোরাচালান। ভারতসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে প্রচুর পরিমাণ মসলা দেশীয় বাজারে প্রবেশ করছে। আমদানিকারকরা জানান, বৈধভাবে এক কেজি জিরা আমদানিতে যেখানে সরকারকে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং এক কেজি এলাচের ক্ষেত্রে ১ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়, সেখানে অবৈধ পথে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা খরচ করে পণ্য আনা সম্ভব হচ্ছে। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে বৈধ আমদানিকারকরা বাজার হারাচ্ছেন এবং সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ নিশ্চিত রাজস্ব থেকে।
আমদানি তথ্যের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, রসুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশের বিশাল ধস নেমেছে। গত বছর যেখানে ১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি রসুন এসেছিল, এবার তা নেমেছে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টনে। একইভাবে এলাচ আমদানি কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জিরার ক্ষেত্রে এই হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়াও লবঙ্গ, আদা এবং মরিচ আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, চাহিদা অনুযায়ী প্রতি বছর আমদানি যেখানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়ার কথা, সেখানে আমদানির এমন নিম্নগতি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
তবে আমদানির পরিমাণ কমলেও আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে পাইকারি পর্যায়ে মসলার বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় এবার ঈদে কোনো ধরনের সংকটের সম্ভাবনা নেই। গত বছরের তুলনায় এবার পাইকারি বাজারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মসলার দাম বরং কমেছে। যেমন, সাদা এলাচ কেজিপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনি ও লবঙ্গের দামও এখন অনেকটাই নিম্নমুখী। তবে পাইকারি বাজারে দাম কম থাকলেও খুচরা পর্যায়ে কেজিতে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আকাশচুম্বী পার্থক্যের কারণে সাধারণ ক্রেতারা এর পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১২ ধরনের মসলাজাতীয় পণ্য মিলিয়ে দুই লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি আমদানি হয়েছিল, যা থেকে রাজস্ব এসেছিল ৫৫৫ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টনে এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৫৭ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি এবং শুল্ক কাঠামোর যৌক্তিক সংস্কার করা গেলে আবারও বন্দর দিয়ে বৈধ আমদানি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে।
দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমিয়ে আনতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে গ্রাহকের ওপর যে ‘দণ্ড সুদ’ আরোপ করা হয়, তা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে দণ্ড সুদ নিতে পারবে। ইতিপূর্বে এই সুদের হার ছিল সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
বুধবার (১৩ মে ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সার্কুলারটি দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের বোঝা কিছুটা লাঘব করা এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমকে আরও উৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মূলত ২০২৪ সালের মে মাসে জারি করা পূর্ববর্তী একটি সার্কুলার সংশোধন করে এই নতুন নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনার কারিগরি দিক অনুযায়ী, কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হলে সেই সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্যই কেবল এই দণ্ড সুদ প্রযোজ্য হবে। এ ক্ষেত্রে চলমান ঋণ ও তলবি ঋণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঋণস্থিতির ওপর ০ দশমিক ৫ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করা যাবে। তবে মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্থিতির ওপর নয়, বরং শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণ কিস্তির ওপর এই হার প্রযোজ্য হবে। এর ফলে মেয়াদি ঋণের গ্রাহকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্পষ্ট করেছে যে, আগের সার্কুলারের অন্যান্য প্রধান নির্দেশনাগুলো আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকবে। এই নতুন নিয়মটি জারির সাথে সাথেই কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যবসায়ীদের যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে এই পরিবর্তন বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ব্যাংক খাতের সুশাসন ও গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে এ ধরণের নীতিনির্ধারণী সংস্কার চালিয়ে যাবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রপ্তানি নগদ প্রণোদনার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর যে ১০ শতাংশ উৎসে কর ধার্য রয়েছে, তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। এনবিআরের এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রপ্তানি খাত থেকে সরকারের কর আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। তবে এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যখন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রপ্তানি খাতের জন্য চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাটসহ বিভিন্ন উপখাতে সরকার প্রায় ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা হিসেবে বরাদ্দ রেখেছে। যদি আগামী অর্থবছরেও এই প্রণোদনার হার এবং রপ্তানি পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে, তবে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করার ফলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবে। এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, বর্তমানে যেখানে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, সেখানে করের বোঝা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই বাজেট প্রস্তাবনা এবং অর্থ বিলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে এনবিআরের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উক্ত বৈঠকে এনবিআর তাদের প্রস্তাবিত নতুন কর কাঠামোগুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করবে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং পর্যালোচনার পর এই প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে এবং পরবর্তীতে বাজেট অধিবেশনে তা উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে কর বাড়ানোর এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে আগামী বাজেটে করের হার বাড়ানো হবে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, নগদ প্রণোদনার অর্থ পেতে তাদের ইতোমধ্যেই নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। এর ওপর করের হার দ্বিগুণ করা হলে প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং শিল্পের সক্ষমতা কমে যাবে। ফলে রপ্তানিকারকরা কর না বাড়িয়ে বরং বিদ্যমান জটিলতা নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সাধারণ ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিতে যাচ্ছে সরকার। ব্যাংকে রাখা আমানতের ওপর বর্তমানে যে আবগারি শুল্ক আরোপিত হয়, তার করমুক্ত সীমা বর্তমানের তুলনায় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরে ব্যাংক হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকলে গ্রাহকদের কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। বর্তমানে এই শুল্কমুক্ত সীমা রয়েছে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় ব্যাংক আমানতের এই নতুন শুল্ক কাঠামোর প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ধাপের শুল্কমুক্ত সীমা বৃদ্ধি করা হলেও পরবর্তী স্তরগুলোর করের হার ও সীমা আপাতত অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ, ৫ লাখ টাকার ওপরে সঞ্চয় থাকলে পূর্বের নিয়মেই নির্দিষ্ট হারে শুল্ক কর্তন করা হবে। মূলত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের ওপর করের বোঝা কিছুটা কমাতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক হিসাবে ৫ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতি বা ব্যালেন্স থাকলে বছরে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে, উচ্চবিত্ত গ্রাহক বা বড় আমানতকারীদের জন্য আগের নিয়মই বহাল থাকছে। যে সকল হিসাবে জমার পরিমাণ ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, তাদের ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্ক প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের হিসাব থেকে এই অর্থ সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়, যা সরকারের আয়ের অন্যতম একটি বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে আবগারি শুল্ক খাত থেকে সরকার প্রতি বছর ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে। নতুন করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সীমা কার্যকর করা হলে সরকারের রাজস্ব আয়ে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সীমা বাড়ানোর ফলে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কমে যেতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে সরকার এই রাজস্ব ঘাটতি মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংক আমানতের ওপর এই ধরনের শুল্ক ব্যবস্থা আধুনিক কর কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকে নিজের কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখার জন্য সরকারকে শুল্ক দেওয়া অনেকটা জরিমানার মতো দেখায়। তাঁরা এই ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে পুরোপুরি তুলে দিয়ে আরও আধুনিক ও ন্যায়সংগত কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (১৩ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, আগামী জুলাই মাস থেকে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস (ফাস) ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। মূলত দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়ায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অবসায়ন হতে যাওয়া এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর মধ্যে ফাস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ক্ষেত্রে তা ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। মূলত বিগত সরকারের আমলে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনার প্রভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মৃতপ্রায়। বিশেষ করে পিকে হালদার সংশ্লিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার ফলে আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা ফেরত পাচ্ছিলেন না। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা না থাকায় ব্যাংক রেজুলেশন আইনের অধীনে এগুলোকে অবসায়ন করার পথ বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অবসায়ন প্রক্রিয়ার কারিগরি ও প্রশাসনিক ধাপগুলো নিয়েও সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। জুলাই মাস থেকে এই কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে পরিচালককে ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁদের সহায়তায় আরও দুজন করে কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকবেন, যারা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায় পর্যালোচনা করবেন। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে এবং তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা আসবে এবং তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ আমানতকারীদের জন্য একটি বড় আশার বাণী শুনিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জানানো হয়েছে, অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফেরত দেওয়া হবে। এর জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আগামী জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বাজেটে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার পরই আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের কাজ শুরু করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা দিয়ে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য পাওনাদারের দাবি মেটানো হবে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত বছরের মে মাসে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা জমা দিলেও এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক ছিল না। যদিও শুরুতে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম অবসায়নের তালিকায় আসার গুঞ্জন ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত নয়টি থেকে যাচাই-বাছাই করে এই পাঁচটিকেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন অনুযায়ী একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের চেয়ে অবসায়নকেই এই মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টেকসই সমাধান হিসেবে মনে করছে দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশে কার্যরত তফসিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের লক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উদ্যোগে গত বুধবার (১৩ মে) কক্সবাজারের একটি স্থানীয় হোটেলে ‘প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’ আয়োজন করা হয়। এই সম্মেলনে বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ক কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। মূলত দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিপালন কাঠামো শক্তিশালী করাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
সম্মেলনের প্রধান অতিথি বিএফআইইউ-এর প্রধান কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মো. মামুন তাঁর বক্তব্যে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের ফলে একদিকে যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে, অন্যদিকে ই-কমার্স প্রতারণা, সাইবার ঝুঁকি এবং ট্রেড-বেইজড মানিলন্ডারিংয়ের মতো অপরাধগুলোও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অপরাধ দমনে কার্যকর করপোরেট গভর্ন্যান্স, প্রযুক্তি নির্ভর নজরদারি এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিংয়ের (এসটিআর) প্রতি কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। বিশেষ করে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি নিরাপদ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
আর্থিক অপরাধ দমনে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে এবং এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানিলন্ডারিং (এপিজি) কর্তৃক ২০২৭-২৮ মেয়াদে অনুষ্ঠেয় ‘মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন’-এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সম্মেলনে জানানো হয় যে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। বিএফআইইউ-এর উপপ্রধান কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান খান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। তিনি ব্যাংকিং খাতে নৈতিক চর্চা বা ইথিক্যাল প্র্যাকটিসের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে পৃথক পৃথক উপস্থাপনার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ, রিস্ক বেইজড সুপারভিশন, ঋণ জালিয়াতি ও ক্যাপিটাল ফ্লাইট বা পুঁজি পাচার প্রতিরোধের কৌশলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। প্যানেল আলোচনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের সিআইডি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বক্তারা ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেনামি প্রতিষ্ঠান, ভুয়া জামানত ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়ার মতো ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় গ্রাহকের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই এবং নিয়মিত লেনদেন পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন। এছাড়া প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ক্রমান্বয়ে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী পরিপালন সংস্কৃতি গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়। সাইবার ঝুঁকি এবং নতুন ধরনের আর্থিক অপরাধগুলো চিহ্নিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দেন বিএফআইইউ কর্মকর্তারা। একটি টেকসই ও নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সকল স্টেকহোল্ডারের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সম্মেলন শেষ হয়। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। বুধবার রাজধানীর গুলশানে ডিসিসিআই সেন্টারে তুর্কিশ ইলেক্ট্রো টেকনোলজি এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (টিইটি)-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। টিইটির সহ-সভাপতি বুরাক বাসেগমেজলার-এর নেতৃত্বে আসা সাত সদস্যের এই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস শেনও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, এ ধরণের সফর বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। তিনি জানান যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৩৪ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ছিল ৪১৬ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে তুর্কি উদ্যোক্তাদের প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারের বিদ্যমান বিনিয়োগের তথ্য তুলে ধরে তিনি তৈরি পোশাক, চামড়া, পাটজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং হোম টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন উদীয়মান খাতে যৌথ বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানান।
তুর্কি প্রতিনিধিদলের নেতা বুরাক বাসেগমেজলার বাংলাদেশের বাজারের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন যে এখানে ইলেকট্রনিক পণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স এবং জেনারেটরের ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে। তুরস্কের বিনিয়োগকারীরা এই খাতগুলোতে একক কিংবা যৌথভাবে মূলধন বিনিয়োগে আগ্রহী। তিনি আরও জানান যে আগামী নভেম্বরে তুরস্কের একটি বৃহৎ ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে এবং দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিজনেস টু বিজনেস (বিটুবি) বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাষ্ট্রদূত রামিস শেন তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের বাণিজ্যের অমিত সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী এবং সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্যসূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমলেও বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর অভাবনীয় দরবৃদ্ধির ফলে সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে মূল্যসূচক বাড়লেও উভয় বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
ডিএসইর লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরু থেকেই বিমা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ ছিল, যা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে। দিনশেষে ৪১টি বিমা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে দর হারিয়েছে ১৬টি। সার্বিকভাবে ডিএসইতে ১৫২টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়লেও ১৮৬টি প্রতিষ্ঠানের দরপতন হয়েছে এবং ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। এর ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৪৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডিএসই-৩০ সূচক ১ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল্যসূচক বাড়লেও ডিএসইতে আজ লেনদেনের গতি ছিল মন্থর। বুধবার বাজারটিতে ৮৫৬ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের ১ হাজার ১০১ কোটি ৫২ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ২৪৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা কম। আজকের লেনদেনে শীর্ষে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, আরডি ফুড এবং মুন্নু সিরামিক। এছাড়া লাভেলো আইসক্রিম, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং এনসিসি ব্যাংকের শেয়ারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কেনাবেচা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) চিত্রটি ছিল ভিন্ন। সেখানে সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৩ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২২৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৫টির দাম কমেছে এবং ৯৫টির দাম বেড়েছে। তবে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় বেড়ে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোকে উৎসাহিত করতে সরকার যে নগদ প্রণোদনা প্রদান করে, তার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ উৎসে কর ধার্য করার প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে সরকার আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে। এক গণমাধ্যম সূত্রে এই সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের খবরটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে রপ্তানি প্রণোদনার জন্য সরকার ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের করপোরেট কর যেখানে ২২ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে প্রণোদনার ওপর মাত্র ১০ শতাংশ কর অত্যন্ত কম। মূলত রাজস্বের ভিত্তি মজবুত করতেই তাঁরা এই কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। তবে এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যখন দেশের পোশাক খাতসহ অন্যান্য শিল্প উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানি হ্রাসের চাপের মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
সরকারের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ প্রসঙ্গে বলেন, "গত কয়েক বছরে এসব প্রণোদনার হার কমানো হয়েছে। আমাদের জন্য এসব প্রণোদনা এখন প্রায় দান-অনুদানের মতো। আমরা এই অর্থের ওপর আরোপিত কর কর্তনের ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম।" তাঁর মতে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কর কমানোর পরিবর্তে বাড়ানো হবে সম্পূর্ণ ‘অযৌক্তিক’। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন যে, কর বাড়লে প্রণোদনার প্রকৃত সুফল কমে যাবে এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, সরকার ইতিপূর্বে তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিল যে আগামী বাজেটে করের হার বাড়ানো হবে না। বিজিএমইএ-র এক শীর্ষ নেতা এক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, "সরকার আমাদের বলেছিল, আগামী বাজেটে যেন আমরা কোনো কর সুবিধা না চাই। তবে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে কর বাড়ানো হবে না। কিন্তু এখন আমরা শুনছি, রপ্তানি প্রণোদনার ওপর কর বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।" বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে এনবিআরের এক বিশেষ বৈঠকে এই প্রস্তাবটি নিয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাটসহ ৪৩টি রপ্তানি খাত বিভিন্ন হারে এই নগদ সহায়তার সুবিধা পাচ্ছে।