বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে আরেকটি বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যেই ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে বাজারের আগুনে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে কিছুটা রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ৩ লাখ টাকা থেকে এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। তবে করপোরেট করে হাত দেননি অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল; কর আগের মতোই থাকছে। বিদ্যমান করপোরেট কর হিসেবে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৭ শতাংশ করই অপরিবর্তিত থাকছে।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বয়স্ক ভাতা বাড়ছে ১০০ টাকা; বিধবা ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে’ যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটের আগে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি তার এবারের বাজেটেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছেন। আর বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে, সেই সময় নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সাফ বলে দিয়েছেন, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ‘পূরণ হবে না’। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আমদানি কমে যাচ্ছে। এই পরিবেশে প্রবৃদ্ধি খুব একটা যে হবে, সেটা আশা করা ঠিক না। এ বছর বলা হচ্ছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে। আমার বিবেচনায় সেটাও কমে হয়তো ৫-এর ঘরে চলে আসবে। আগামী বছর যে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু হবে তা মনে হয় না। তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোন জাদুবলে আসবে। এটা অসম্ভব; অবাস্তব লক্ষ্য। অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘গড় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশ। সেই মূল্যস্ফীতি কীভাবে ৬ শতাংশে নেমে আসবে- এটাও আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রধান গুরুত্বে রেখে সরকারকে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করি।’
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা) চেয়ে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। টাকার এই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ২১ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বছর বাজেট দিতে গিয়ে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়’ প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, জ্বালানি ও ডলারসংকট এবং মূল্যস্ফীতি তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মধুর হতে দেয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে হাঁটতে হয়েছে কৃচ্ছ্রের পথে। তার ওপর বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে স্বস্তি আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বছরে এবং দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে জনতুষ্টির খুব বেশি সুযোগ রাখার পথ মুস্তফা কামালের সামনে নেই। তার পরও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর নির্বাচনী স্লোগানটিকেই তিনি বাজেটে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “আমাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম মানুষ আর চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়; মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে; বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে; বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।”
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। কিন্তু মহামারির ধাক্কায় সেই ধারায় কিছুটা ছেদ পড়ে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার ঝুঁকি থাকলেও বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন মুস্তফা কামাল।
৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা যাবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
মহামারির ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে লাগাম দেয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন।
তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশের মতো।
গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা করা হয়।
আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের দেশি-বিদেশি উৎস অনুসন্ধান হবে রাজস্ব খাতের নীতি-কৌশল। রাজস্ব আহরণে সব সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি সহজীকরণসহ অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে কর নেট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজন কর আদায় সহায়ক ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস স্থাপন ও সম্প্রসারণ, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, কর প্রশাসনের অটোমেশন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে।’
২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় কয়েক বছর ধরেই তা সম্ভব হচ্ছে না। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। তার পরও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ব্যাপক ইতিবাচক গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকার সমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, "এপ্রিলের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার।" পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ১৯ লাখ ডলার করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ হাজার ৮৬২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর আগে মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় আসার মাধ্যমে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও যথাক্রমে ৩০২ কোটি ৭ লাখ এবং ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের নজির। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার আগমন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি মাসের তৃতীয় চালানে আরও সাত হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের টার্মিনালে এই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন্স) কাজী রবিউল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, গত ২০ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাম্পিং শুরু হওয়ার প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর এই ডিজেল গন্তব্যে এসে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি মাসের ১১ ও ১৯ এপ্রিল আরও দুটি পৃথক চালানে মোট ১৩ হাজার টন জ্বালানি এসেছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৩৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে মোট চারটি চালানে ভারত থেকে ২৫ হাজার টন জ্বালানি আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এই ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগে রেল ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহনের দীর্ঘ সময় ও জটিলতা অনেকাংশে কমেছে। গত ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই আমদানি কার্যক্রমের চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর ভারত থেকে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিপিসির তথ্যমতে, এই পাইপলাইন ব্যবহার করে বছরে ১০ লাখ টন পর্যন্ত তেল আমদানি করা সম্ভব, যা কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলো পার্বতীপুর ডিপো থেকে এই ডিজেল সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সারাদেশের টিসিবি কার্ডধারী নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ ৩২ হাজার লিটার পরিশোধিত পাম তেল ও ২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সংগ্রহে সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় হবে মোট ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩২ টাকা। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আমেরিকার পাওয়ার হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি থেকে ১৮১ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয়ে পাম তেল কেনা হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঢাকার গুলশানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইজ সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ২ হাজার টন মসুর ডাল সংগ্রহের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে এদিনের সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়নি। এর মধ্যে বাপেক্স কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘৩টি অনুসন্ধান কুকূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খনন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কূপ খননের প্রস্তাবটি আলোচনার বাইরে ছিল। একইভাবে ‘সিলেট-১২ নম্বর কূপ খনন (তেল কূপ)’ এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি সংগ্রহের প্রস্তাবগুলোও বৈঠকে উত্থাপন করা হয়নি। এছাড়া নেসকো ও বাপবিবোর বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত একাধিক প্যাকেজ এবং সিরাজগঞ্জ ও ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুনর্নির্ধারিত লেভেলাইজড ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাবগুলোও এদিনের সভায় উপস্থাপন করা হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের এই বড় মজুত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আগামী জুলাই মাসে ইতালি থেকে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও যৌথ বিজনেস প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলাসান্দ্রোর এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা উল্লেখ করে বলেন, “ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী।”
সাক্ষাৎকালে বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, “বাংলাদেশ ও ইতালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। ইতালি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” মন্ত্রী ইতালীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে ইতালির বিনিয়োগ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফার্নিচার, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বন্ধ জুটমিল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে। দেশের তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সুবিধা।”
বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং পোশাক শিল্পের বাইরেও চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হন। এই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহিম খানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত পেট্রোকেমিক্যাল মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সংগৃহীত হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে শুরু করে লিপস্টিক, চুইংগাম, জুতা এমনকি মানুষের দাঁতের নকল পাটিও তৈরিতে পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে।
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর প্রধান রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?” পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের মোট তেলের ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো উপাদানগুলো প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইল প্রতি কেজি ৯০ সেন্টে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১ ডলার ৩৩ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাক তৈরিতে অন্তত ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ গুণতে হচ্ছে। এফডিআরএ-এর বিশ্লেষণ মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এক জোড়া জুতার দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, আঠাজাতীয় পণ্যের কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ বাড়ায় তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।”
শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে সরবরাহ চেইনের এই চাপ আরও প্রকট হবে। ইতিমধ্যে রিনসেরু-এর মতো পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের প্রতিটি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন অনেক সাধারণ পণ্যের দামও এখন পরোক্ষভাবে পেট্রোকেমিক্যালের কারণে আকাশচুম্বী হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মধ্যেও পারস্য উপসাগর থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল রফতানির তথ্য পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন খাত বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ জারির পরবর্তী সপ্তাহেই এই রফতানি সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা জানায়, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পর ১৩ এপ্রিল থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সময়ে তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর ৩৪টি যাতায়াত শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৯টি জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে গেছে এবং ১৫টি জাহাজ সেখানে প্রবেশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-কে (এপি) পাঠানো এক ইমেইলে জানিয়েছে, উপসাগর ত্যাগ করা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টি ইরানি অপরিশোধিত তেলে পূর্ণ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ছয়টি জাহাজে মোট প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা হচ্ছিল।
তবে এই তেলের চালান শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র: এপি
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও সূচক ছিল ইতিবাচক। ডিএসইতে দিনের শুরুতে চাঙ্গাভাব থাকলেও আধা ঘণ্টার ব্যবধানে বিক্রেতাদের চাপে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতন ঘটে। তবে লেনদেনের শেষভাগে বড় মূলধনি কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচক সামান্য বেড়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স মাত্র ০.০০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনশেষে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়লেও ১৯৯টির দর কমেছে এবং ৫৮টির দাম স্থিতিশীল ছিল। বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় ১৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কমে ৮৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং।
অন্যদিকে, সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে এবং ১০৩টির দাম কমেছে। সিএসইতে ২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হলেও বাছাই করা কিছু বড় কোম্পানির ভালো পারফরম্যান্সের কারণে সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান বহুমুখী প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধির জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই দাবি উত্থাপন করে। বৈঠকে বিআরপিডি সার্কুলার-০৭/২০২৫-এর আওতায় আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি রুগ্ন শিল্পগুলোর পুনর্বাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বিজিএমইএ-র পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, খেলাপি হিসাবের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৫-এর পরিবর্তে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে অনেক সংকটাপন্ন কারখানা নীতি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নীতি সহায়তাগুলো অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক সময়মতো কার্যকর না করায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার হয়।
বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও সভায় তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ মনে করে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক তথ্য যাচাই ও নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন, যা কার্যকর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে। ডেপুটি গভর্নর বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম কনডম উৎপাদনকারী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান কারেক্স সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তারা পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মূল্যবৃদ্ধির এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় এই শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোহ মিয়া কিয়াত এক সাক্ষাৎকারে জানান, জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পরিবেশক পর্যায়ে পণ্যের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে খুবই নাজুক, দাম বাড়ছে। এ মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতেই হচ্ছে।” কারেক্স প্রতি বছর ৫০০ কোটির বেশি কনডম তৈরি করে এবং তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে কনডম তৈরির প্রধান উপকরণ সিন্থেটিক রাবার ও নাইট্রাইল থেকে শুরু করে প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও সিলিকন লুব্রিকেন্টের দাম হু হু করে বাড়ছে। কারেক্সের প্রধান নির্বাহী জানান, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে; যেখানে আগে এক মাস সময় লাগত, এখন সেখানে দুই মাস সময় ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, “অনেক কনডম এখন জাহাজেই পড়ে আছে, এখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি। কিন্তু সেগুলোর চাহিদা খুব বেশি।” এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় মজুত শেষ হয়ে আসছে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামই এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ বা তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় স্বর্ণ ও রুপার মূল্য নতুন করে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমার কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।”
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দর ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় ক্রয় করা যাবে। ইতিপূর্বে গত ১৫ এপ্রিল স্বর্ণের মূল্য সর্বশেষ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যেখানে ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট ৫৬ বার স্বর্ণের বাজারমূল্য পরিবর্তন করা হলো, যার মধ্যে ৩২ বার দাম বেড়েছে এবং ২৪ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৯৩ বার স্বর্ণের দর সমন্বয় করা হয়েছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্য কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা কমে এখন ৫ হাজার ৭১৫ টাকায় নেমেছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৩৫ বার রুপার মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যেখানে ১৯ বার দাম বৃদ্ধি ও ১৬ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২৫ সালে রুপার দাম ১৩ বার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ও বিদেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে ৮৬ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে বিদেশে ৪৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৩৭৭ কোটি টাকায়। বিদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এরপরই রয়েছে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান।
একইভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও নিম্নমুখী। জানুয়ারিতে তারা ৩৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
দেশের অভ্যন্তরেও কার্ডের ব্যবহার হ্রাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩,৭২০ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ২৯৮ কোটি টাকা কমে ৩,৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সামগ্রিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে একটি স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৮৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দর ১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পূর্বেই ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে একতরফা এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইরান বা ইসরায়েল আদৌ চূড়ান্তভাবে সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড মেয়ার মন্তব্য করেন, “যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ফলে বাজারে সংকট কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে ডলারের মান বাড়বে, তেল ও সুদের হার বাড়বে এবং স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হবে।”
এই ঘোষণার প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যার ফলে মার্কিন ডলারের মান কিছুটা কমেছে এবং তেলের দামও নিম্নমুখী হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এক বার্তায় জানিয়েছে যে, স্বর্ণের বর্তমান এই দরবৃদ্ধি বেশ নাজুক এবং স্বল্পমেয়াদে তা হ্রাসের ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই মূল্যবান ধাতু পুনরায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী প্রধান হিসেবে মনোনীত কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন যে, সুদের হার কমানোর বিষয়ে তিনি ট্রাম্পকে কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দেননি এবং তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও তেজি ভাব দেখা গেছে; যেখানে রুপার দাম ১.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৭.৯৭ ডলার হয়েছে এবং প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরই আগামী দিনগুলোতে এই বাজারগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।
সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাহাজটি আগামী ৪ বা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করা ট্যাংকারটি লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে আসছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলেছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চালানটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অন্যদিকে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের আরেকটি জাহাজ ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে এখনো হরমুজ প্রণালিতে আটকে রয়েছে। ইরানের বিশেষ অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ—৬৩ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্বালানির ধরন বিবেচনায় ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, পেট্রল ও অকটেন।