বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে আরেকটি বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যেই ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে বাজারের আগুনে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে কিছুটা রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ৩ লাখ টাকা থেকে এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। তবে করপোরেট করে হাত দেননি অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল; কর আগের মতোই থাকছে। বিদ্যমান করপোরেট কর হিসেবে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৭ শতাংশ করই অপরিবর্তিত থাকছে।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বয়স্ক ভাতা বাড়ছে ১০০ টাকা; বিধবা ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে’ যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটের আগে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি তার এবারের বাজেটেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছেন। আর বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে, সেই সময় নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সাফ বলে দিয়েছেন, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ‘পূরণ হবে না’। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আমদানি কমে যাচ্ছে। এই পরিবেশে প্রবৃদ্ধি খুব একটা যে হবে, সেটা আশা করা ঠিক না। এ বছর বলা হচ্ছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে। আমার বিবেচনায় সেটাও কমে হয়তো ৫-এর ঘরে চলে আসবে। আগামী বছর যে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু হবে তা মনে হয় না। তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোন জাদুবলে আসবে। এটা অসম্ভব; অবাস্তব লক্ষ্য। অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘গড় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশ। সেই মূল্যস্ফীতি কীভাবে ৬ শতাংশে নেমে আসবে- এটাও আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রধান গুরুত্বে রেখে সরকারকে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করি।’
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা) চেয়ে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। টাকার এই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ২১ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বছর বাজেট দিতে গিয়ে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়’ প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, জ্বালানি ও ডলারসংকট এবং মূল্যস্ফীতি তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মধুর হতে দেয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে হাঁটতে হয়েছে কৃচ্ছ্রের পথে। তার ওপর বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে স্বস্তি আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বছরে এবং দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে জনতুষ্টির খুব বেশি সুযোগ রাখার পথ মুস্তফা কামালের সামনে নেই। তার পরও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর নির্বাচনী স্লোগানটিকেই তিনি বাজেটে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “আমাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম মানুষ আর চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়; মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে; বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে; বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।”
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। কিন্তু মহামারির ধাক্কায় সেই ধারায় কিছুটা ছেদ পড়ে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার ঝুঁকি থাকলেও বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন মুস্তফা কামাল।
৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা যাবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
মহামারির ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে লাগাম দেয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন।
তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশের মতো।
গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা করা হয়।
আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের দেশি-বিদেশি উৎস অনুসন্ধান হবে রাজস্ব খাতের নীতি-কৌশল। রাজস্ব আহরণে সব সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি সহজীকরণসহ অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে কর নেট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজন কর আদায় সহায়ক ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস স্থাপন ও সম্প্রসারণ, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, কর প্রশাসনের অটোমেশন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে।’
২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় কয়েক বছর ধরেই তা সম্ভব হচ্ছে না। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। তার পরও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টানা প্রায় দুই বছর নির্মাণ খাতের কার্যক্রম ছিল অনেকটাই মন্থর। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় এবং নির্মাণ মৌসুম শুরু হওয়ায় খাতটিতে চাহিদা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু ঠিক এই সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাবে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আবারও স্থবির হয়ে পড়তে পারে পুরো নির্মাণ খাত।
বাংলাদেশের নির্মাণশিল্প মূলত আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক সমস্যার মুখে পড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক শিপিং কোম্পানি বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। এতে আগে যেখানে কাঁচামাল দেশে পৌঁছাতে প্রায় ৪৫ দিন লাগত, এখন সময় লাগছে প্রায় ৬০ দিন বা তারও বেশি।
জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে শিপিং চার্জ ও বীমা প্রিমিয়ামও বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফিউচার মার্কেটে কাঁচামালের বুকিং মূল্য বাড়ায় স্থানীয় বাজারেও নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সূচনা হয়। পরে ইরান পাল্টা হামলা চালালে পরিস্থিতি দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের কয়েক দিনের মধ্যে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যদিও চীন ও রাশিয়ার মতো মিত্র দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দেয়। একই সময়ে অঞ্চলটির বিভিন্ন জ্বালানি পরিশোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে বড় চাপে ফেলেছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ধীরগতির। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্মাণ মৌসুম শুরু হওয়ায় সম্প্রতি খাতটিতে কিছুটা গতি ফিরে আসে। এতে রড ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের।
ইস্পাত উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগে দেশে প্রথম গ্রেডের রডের দাম প্রতি টন ছিল প্রায় ৭৭ থেকে ৮৩ হাজার টাকা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ থেকে ৮২ হাজার টাকায়। গত এক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই টনপ্রতি ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। সর্বশেষ বাজারে রড বিক্রি হয়েছে টনপ্রতি প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ হাজার টাকায়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন উৎপাদনকারীরা।
সিমেন্ট কোম্পানি ও ডিলারদের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১ মার্চ প্রতি ব্যাগ (৫০ কেজি) সিমেন্টের দাম ছিল ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা। কয়েক দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে বর্তমানে ৪৭০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এর মধ্যে কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেড ৪ মার্চ থেকে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ৫ টাকা বাড়ায় এবং পরে আরও ৫ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়, যা বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। একইভাবে ফ্রেশ সিমেন্ট প্রতি ব্যাগে ১০ টাকা বাড়ানোর পাশাপাশি বিক্রয় কমিশন বন্ধ করেছে। এনজিএস সিমেন্ট ৫ টাকা, রুবি সিমেন্ট ১০ টাকা এবং ডায়মন্ড সিমেন্টও ১০ টাকা করে দাম বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি সপ্তাহেই আবার দাম বাড়তে পারে বলে ডিলারদের জানানো হয়েছে।
নির্মাণ মৌসুম শুরুর সময় দেশের শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম, একেএস, কেএসআরএম ও জিপিএইচসহ বিভিন্ন কোম্পানি রড উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। গত ডিসেম্বরের তুলনায় তখন উৎপাদন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজে কাঁচামাল পরিবহনেও বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের কারণে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য লোডিং ও সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে এবং বাজারে দাম আরও দ্রুত বাড়ছে বলে দাবি শিল্প সংশ্লিষ্টদের।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রড ও সিমেন্টের বাজার দুর্বল অবস্থায় ছিল। নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা এবং নির্মাণ মৌসুমের কারণে চাহিদা বাড়লেও হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পুরো বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে নির্মাণ খাতের কাঁচামালের বাজারে রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর বাজারগুলোতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে মুরগি ও ডিমের দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মুরগির পাশাপাশি চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিমও। তবে আমিষের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও স্বস্তি ফিরেছে সবজির দামে। অন্যদিকে ঈদের প্রস্তুতি হিসেবে চিনি ও সেমাইয়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও ও তেজকুনিপাড়া এলাকা ঘুরে বাজারের এমন বৈচিত্র্যময় চিত্র দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোজার শুরুর দিকে মুরগির দাম কিছুটা কমলেও শেষ সময়ে এসে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হু হু করে বাড়ছে এর দাম। গত সপ্তাহে ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি গতকাল ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। একইভাবে সোনালি মুরগির দাম বেড়ে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায় পৌঁছেছে। বিক্রেতারা বলছেন, খামার ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। মুরগির পাশাপাশি প্রতি ডজন ডিমেও ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে; বর্তমানে এক ডজন বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে চাহিদা আরও বাড়লে মুরগির দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম।
এদিকে দীর্ঘ সময় সংকটে থাকা ভোজ্যতেলের সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বাজারে খোলা ও বোতলজাত উভয় ধরণের তেলের উপস্থিতি আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে সরবরাহের উন্নতি হলেও সংকটের অজুহাতে গত সপ্তাহে বেড়ে যাওয়া দাম এখনও কমেনি। অন্যদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে লাচ্ছা সেমাই, বাংলা সেমাই ও চিনির বিক্রি ব্যাপক জমে উঠেছে। শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়াতে অনেক ক্রেতাই আগেভাগে এসব শুকনো খাবার কিনে রাখছেন। বাজারে মানভেদে লাচ্ছা সেমাইয়ের কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং খোলা চিনির কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ভোক্তাদের জন্য একমাত্র স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে সবজির বাজার। রোজার শুরুর দিকে শাক-সবজির দাম আকাশচুম্বী থাকলেও এখন তা অনেকটা কমে এসেছে। বিশেষ করে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় ওঠা বেগুনের কেজি এখন মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায় নেমেছে। এছাড়া আলু, শসা, গাজর ও শিমের দাম সাধারণ মানুষের হাতের নাগালেই রয়েছে। স্থিতিশীল আছে পেঁয়াজের দামও। সব মিলিয়ে আমিষের বাজারে বাড়তি খরচের চাপে সাধারণ মানুষ হিমশিম খেলেও সবজি ও ঈদ সামগ্রীর সহজলভ্যতা বাজার পরিস্থিতিতে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করছে। তদারকি জোরদার করলে অন্যান্য পণ্যের দামও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে এলেও এবং রমজানের তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোতে এখনো আশানুরূপ কেনাকাটার জোয়ার দেখা যাচ্ছে না। দেশের প্রায় ৫ হাজারের বেশি ছোট-বড় ফ্যাশন হাউস এবং কয়েক শ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড এই উৎসব মৌসুমের ওপর বিনিয়োগ ও লাভের বড় অংশ নির্ভর করলেও এবার বাজারের চিত্র বেশ বৈচিত্র্যময় ও খানিকটা হতাশাজনক। টুয়েলভ, লা রিভ, আড়ং, ক্যাটস আই কিংবা রঙ বাংলাদেশের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর সংগ্রহে নতুনত্ব থাকলেও ক্রেতাদের মধ্যে আগের মতো কেনাকাটার সেই ত্বরিত ঝোঁক বা ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল দেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নতুন সরকার গঠনের পর বাজারের স্থবিরতা কাটবে, কিন্তু বাস্তবে বেচাবিক্রিতে ভালো-মন্দের এক মিশ্র প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের গাণিতিক প্রত্যাশা ছিল অন্তত গত বছরের তুলনায় এবার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিক্রি বাড়বে। সেই আশা থেকেই রাজধানীর নামী দামী শপিং মল থেকে শুরু করে অলিগলির আউটলেটগুলো ঢেলে সাজানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাজারে ক্রেতা থাকলেও তাঁরা অত্যন্ত ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে কেনাকাটা করছেন। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে শুরু করে মিরপুর, এলিফ্যান্ট রোড বা আজিজ মার্কেটের মতো এলাকাগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতারা জামাকাপড় দেখছেন এবং দামের তুলনায় মানের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। আগের বছরগুলোর মতো মাসের শেষ দিকে যে পরিমাণ হুড়োহুড়ি থাকে, তা এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত। অনেকেই পোশাকের ধরন আর বর্তমানের গুমোট আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে হালকা সুতি কাপড়ের পোশাক বেশি পছন্দ করছেন।
এবার ঈদের পোশাক সংগ্রহে ফ্যাশন হাউসগুলো আধুনিক আর দেশি ঐতিহ্যের ফিউশনকে প্রাধান্য দিয়েছে। তবে নজরকাড়া সংগ্রহের বিপরীতে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত আউটলেট থেকে জানা গেছে যে সেখানকার বেচাবিক্রি এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাদের মতে বাজার পরিস্থিতি অনেকটা অনিশ্চিত। অথচ এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে। যেমন, শীর্ষস্থানীয় কিছু ফ্যাশন হাউসের কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী তাঁদের বিক্রি গত বছরের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। রঙের আধিক্য এবং পোশাকের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহক এখনও ব্র্যান্ড শপে আস্থা রাখছেন।
কাপড়ের ধরন হিসেবে বরাবরের মতোই মেয়েদের থ্রি-পিস ও টু-পিসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সিল্ক, খাদি কিংবা বয়েল কাপড়ের মাঝে এবার সুতি পোশাকই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে সংগ্রহে বড় পরিবর্তন না আসলেও আধুনিক কাটিংয়ের পাঞ্জাবি আর পাজামার আবেদন অম্লান রয়েছে। তবে পাইকারি বাজারের মন্থর গতির রেশ সরাসরি খুচরা বাজার ও শোরুমগুলোতে প্রভাব ফেলেছে। অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার বাজারের চড়া মূল্যের কথা চিন্তা করে কেনাকাটায় সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং তুলনামূলক বাজেটের ভেতর ভালো কিছু পাওয়ার জন্য বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ব্যবসায়ী বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপ সরাসরি ফ্যাশন সেক্টরের ওপর প্রভাব ফেলছে। ‘রঙ বাংলাদেশ’-এর মতো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো গত বছরের তুলনায় কিছু বেশি বিক্রি করলেও সামগ্রিকভাবে বাজারের প্রকৃত চাঙ্গা ভাব ফিরে পেতে তারা আরও কয়েক দিন অপেক্ষার প্রহর গুনছে। শেষ মুহূর্তের কয়েক দিনে যদি সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় না জমে, তবে উৎসবনির্ভর বিশাল এই বাজার ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কাও থেকে যায়। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ কেনাকাটায় যে আস্থার সংকটের ছাপ পড়েছে, তার উত্তরণ কেবল বাজারের আসন্ন কয়েক দিনের চাঞ্চল্যেই নিহিত রয়েছে।
দেশের বাজারে টানা দুই দফা মূল্যবৃদ্ধির পর অবশেষে স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচাইতে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৩২৪ টাকা হ্রাস করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে বাজুস এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন এই দাম নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং সকাল ১০টা থেকেই এই দর সারা দেশে কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পাকা সোনার দাম কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণ এখন থেকে বিক্রি হবে ২ লাখ ৬৭ হাজার ১০৬ টাকায়। এর আগে গতকাল বুধবার দাম বাড়ার পর এই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৩০ টাকা। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। নতুন দরে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৭৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৮৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪০১ টাকা।
স্বর্ণের দরপতনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এদিন কমেছে রুপার দামও। বাজুস জানিয়েছে, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা কমিয়ে ৬ হাজার ৩৫৭ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২১ ক্যারেট রুপা ৬ হাজার ৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৫ হাজার ১৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৩ হাজার ৯০৭ টাকায়। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রায় প্রতিদিনই এই মূল্যবান ধাতুর দাম ওঠানামা করছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে স্বর্ণের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। মাত্র এক দিন আগেই বুধবার সকালে ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা দাম বাড়িয়েছিল বাজুস। তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আবারও ৩ হাজার টাকার বেশি দাম কমায় ক্রেতা ও সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে সোনার দামের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সামনের দিনগুলোতে দেশীয় বাজারেও এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ তার বেশ কয়েকটি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের বিরুদ্ধে এক নতুন ও ব্যাপকভিত্তিক বাণিজ্য তদন্ত শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিশন গ্রিয়ার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারার অধীনে এই তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। যদি এই তদন্তে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা’র প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর বড় অংকের আমদানি শুল্ক আরোপ করার সুযোগ পাবে ওয়াশিংটন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের মতে, এই তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন দেশের উৎপাদন খাতের ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ এবং উৎপাদন সংক্রান্ত নীতি ও কর্মকাণ্ড পরীক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র দেখতে চায় এই দেশগুলোর বাণিজ্য নীতি অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি-না এবং তা মার্কিন স্বার্থ বা বাণিজ্যের পথে বাধা সৃষ্টি করছে কি-না। তদন্তের আওতায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত। তবে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে তাদের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডাকে।
রাষ্ট্রদূত জেমিশন গ্রিয়ার এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, “অন্যান্য দেশ যারা তাদের অতি-উৎপাদনের সমস্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর নিজের শিল্পভিত্তিকে বিসর্জন দেবে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বিদেশি দেশগুলোর এই অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় শিল্পকে সরিয়ে দিচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বিদেশি প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন শ্রমিকদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থান ও সরবরাহ চেইন দেশে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই তদন্তের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন গত মাসে ট্রাম্পের আগের একটি শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা করেছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছিল, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট এমন ঢালাও শুল্ক আরোপ করতে পারেন না। সেই ধাক্কা সামলে নতুন এই তদন্তের মাধ্যমে মূলত অন্যান্য দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করার এক শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার পেতে চাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যা ১৫ শতাংশে বাড়ানোর হুমকিও দিয়ে রেখেছেন তিনি। আগামী জুলাই মাসে আগের অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই তদন্ত সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই তদন্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যে বর্তমানে প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে, যার প্রধান অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এছাড়া সরকার বর্তমানে বস্ত্র ও চামড়াজাত পণ্যসহ ৪৩টি খাতে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য যে নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে, তা ‘অন্যায্য বাণিজ্যনীতি’ হিসেবে মার্কিনিদের কাছে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে যে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় চাহিদার ব্যাপক ঘাটতি (৬০ শতাংশের বেশি সক্ষমতা অলস) রয়েছে, তাও ‘কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা’ হিসেবে তদন্তে উঠে আসতে পারে। সব মিলিয়ে এই তদন্তের ফলাফল বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা নিরসন এবং জোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বড় ধরণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন থেকে শুক্রবার ও শনিবারের সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও বিপিসির অধীনে থাকা প্রধান তেল স্থাপনা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ডিপোগুলো খোলা থাকবে। আজ বৃহস্পতিবার বিপিসির সচিব শাহিন সুলতানি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই বিশেষ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে ছুটির দিনেও পাম্পগুলোতে তেলের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিপিসি স্পষ্ট করেছে যে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অস্থিরতার মাঝেও জনগণের জ্বালানি চাহিদা পূরণে দেশে তেল আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। তেলের জন্য বিদেশি আমদানিকারক ও জাহাজগুলোর পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেল দেশে আসছে এবং বন্দরে বড় চালান খালাস করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানিকৃত এই জ্বালানি তেল সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের ডিলার ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামসহ প্রধান স্থাপনাগুলো থেকে নিয়মিত রেলের ওয়াগন ও রোড ট্যাংকারের মাধ্যমে তেলের গাড়ি বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া তেলের ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত কেনাকাটার হিড়িক সামাল দেওয়া। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও অহেতুক আতঙ্কে মানুষ অতিরিক্ত তেল মজুদ করছে, যার ফলে বিপণন ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির এই দুই দিনে ডিপোগুলো পূর্ণ গতিতে সচল রাখার মাধ্যমে সরকার এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে চায়। বিপিসি মনে করছে, সরবরাহ চেইন শক্তিশালী রাখার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা লাঘব হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি আরও মজবুত হবে।
পবিত্র শবে কদর ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে আগামী ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিন বন্ধ থাকবে দেশের উভয় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পূর্বনির্ধারিত ছুটির মধ্যবর্তী ১৮ মার্চ (বুধবার) নির্বাহী আদেশে এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ডিএসই ও সিএসইতে কোনো লেনদেন বা দাপ্তরিক কার্যক্রম থাকবে না।
স্টক এক্সচেঞ্জ দুটি জানিয়েছে, পবিত্র রমজান মাস ও ঈদের ছুটি শেষে অফিসের সময়সূচি আবার আগের নিয়মে ফিরে যাবে। স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী ডিএসই ও সিএসইর অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। আর লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত। এরপর দুপুর ২টা ২০ মিনিট থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পোস্ট ক্লোজিং লেনদেন সেশন সম্পন্ন হবে।
টানা ৭ দিনের বন্ধের ফলে ঈদ পরবর্তী সময়ে ২৪ মার্চ থেকে উভয় শেয়ারবাজারে নিয়মিত লেনলেন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তাদের লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দ্রুততর করতে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম ইন্টারফেস বা এপিআই সংযোগের পরিধি বৃদ্ধি করেছে। নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) ব্যবহারের অনুমতি দিতে নতুন করে আরও ১১টি ব্রোকারেজ হাউজকে ‘ফিক্স সার্টিফিকেশন’ প্রদান করা হয়েছে। বুধবার (১১ মার্চ) ডিএসই মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হাউজগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে এই সনদ তুলে দেওয়া হয়।
নতুন এই সার্টিফিকেশন প্রাপ্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মধ্যে রয়েছে আকিজ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, ইউনাইটেড সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এন এফ ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, অমর সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং কমার্স ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের মতো নামী প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও এই তালিকায় আছে মোনা ফিন্যান্সিয়াল কনসালটেন্সি, প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ, প্রাইলিঙ্ক সিকিউরিটিজ, রেমন্স ইনভেস্টমেন্ট এবং স্কাইলাইন সিকিউরিটিজ লিমিটেড। এই শংসাপত্র পাওয়ার ফলে ব্রোকারেজ হাউজগুলো এখন নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে নাসডাক ম্যাচিং ইঞ্জিনের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে লেনদেন পরিচালনা করতে পারবে।
সনদ প্রদান অনুষ্ঠানে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও অগ্রগতি তুলে ধরে জানান, পুঁজিবাজারকে প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বমানের করতে ২০২০ সাল থেকে এপিআই ভিত্তিক লেনদেন চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে মোট ৭৬টি ব্রোকারেজ হাউজ আবেদন করেছিল। আজকের এই ১১টি হাউজসহ এখন পর্যন্ত মোট ৫৮টি প্রতিষ্ঠানকে সফলভাবে ফিক্স সার্টিফিকেশন প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি ব্রোকারেজ হাউজ ইতিমধেই পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের নিজস্ব ওএমএস সেবা চালু করে বিনিয়োগকারীদের উন্নত ডিজিটাল সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
পুঁজিবাজারের এই প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরণের সুবিধা বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করার ফলে লেনদেনের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি ব্রোকারেজ হাউজগুলো তাঁদের গ্রাহকদের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির সুযোগ পাবে। অনুষ্ঠানে ডিএসইর প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুর রহমান এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো. আসিফুর রহমানসহ আইসিটি ও অপারেশন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ডিএসই কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে যে, পর্যায়ক্রমে সকল ব্রোকারেজ হাউজকে এই ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনা গেলে দেশের পুঁজিবাজার আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের উদ্বেগের মাঝে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক খবর হয়ে এসেছে ভারত থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি। ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোতে পৌঁছেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মজুত স্বাভাবিক রাখা এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে এই তেল আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোর তত্ত্বাবধায়ক মো. আহসান হাবিব চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারতের আসাম রাজ্যের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এই সরবরাহ শুরু হয়েছিল গত সোমবার (৯ মার্চ)। টানা তিন দিনের প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলের মধ্যে পুরো ৫ হাজার টন ডিজেল ডিপোর ট্যাংকে জমা হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বর্তমান পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন এবং নুমালিগড় রিফাইনারির কাছে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের বিশেষ প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
তবে ভারত থেকে এই বড় চালানের আগমনে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও স্থানীয় পর্যায়ে তেলের জোগান নিয়ে অস্বস্তি রয়েই গেছে। দিনাজপুরের পেট্রোল পাম্প মালিক ও পরিবেশক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. রজব আলী সরকারের অভিযোগ, বর্তমানে পাম্পগুলোতে চাহিদার তুলনায় তেল কম দেওয়া হচ্ছে এবং ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। তেলবাহী ট্যাংক-লরিগুলো তেলের জন্য টানা তিন দিন পর্যন্ত ডিপোতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে, যা গ্রাহক পর্যায়েও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে ডিজেল ও পেট্রোল সরবরাহে রেশনিং বজায় রেখে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ কম জ্বালানি সরবরাহ করছে ডিপো কর্তৃপক্ষ।
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং কৃষিতে সেচ নিশ্চিত করার জন্য এই পাইপলাইনটি অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনের কাজ শুরু হয় যা বর্তমানে বাংলাদেশের তেলের বাজারে বড় একটি স্তম্ভ। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় গত ২০২৫ সালে রেকর্ড ১ লাখ ২৪ হাজার টনের বেশি ডিজেল এসেছে এই রুট দিয়ে। বর্তমান বিশ্ববাজারের টালমাটাল অবস্থায় ভারতের এই তেল সরবরাহ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিখাত সচল রাখতে বড় ধরণের রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনতে এবং জনভোগান্তি কমাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। বুধবার (১১ মার্চ) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিপিসি জানিয়েছে, এতদিন বিভাগীয় শহরগুলোতে দৈনিক গড় বিক্রির চেয়ে ২৫ শতাংশ কমিয়ে তেল সরবরাহ করা হলেও এখন থেকে তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, পাম্পগুলোতে এখন আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হবে।
বিপিসি তাদের নির্দেশনায় স্পষ্ট করেছে যে, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা এই রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে। তবে বর্তমান সরবরাহ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত বিভাগীয় শহরগুলোতে গ্রাহকদের তেলের চাহিদা মেটাতে এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। বর্ধিত এই বরাদ্দ অনুযায়ী যেন সঠিক সময়ে পাম্পগুলোতে তেল পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ডিপো সুপার, বিক্রয় কর্মকর্তা, ডিলার ও এজেন্টদের জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার একটি আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই শঙ্কা থেকে দেশে যেন দীর্ঘমেয়াদী সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় গত রবিবার থেকে তেলের দোকানে রেশনিং প্রথা বা নির্ধারিত পরিমাণে তেল বিক্রি শুরু হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক বা ‘প্যানিক বায়িং’ দেখা দেয়, যার ফলে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দিনভর যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর মানুষের জটলা লেগেই ছিল।
পাম্পগুলোতে তেল নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেলেও সরকারের তরফ থেকে বারবার অভয় দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিপিসি বারবার উল্লেখ করেছে যে দেশে বর্তমান চাহিদার তুলনায় তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং তেলের কোনো হাহাকার নেই। পাম্পগুলোতে তেলের বরাদ্দ বাড়ার ফলে জনমনে যে ভয় ও সংশয় কাজ করছিল, তা অনেকাংশেই কেটে যাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সাথে বিপিসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করতে তারা বদ্ধপরিকর।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুসরণ করে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এসব এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকার বেশি।
বুধবার (১১ মার্চ) অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অনুমোদন অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ১০৫(৩)(ক) অনুসারে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের মের্সাস টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে এক কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। ২০২৬ সালের ৫-৬ এপ্রিল সরবরাহযোগ্য এই (৫ম) কার্গো এলএনজির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩০৪ টাকা। এতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়বে ২১ দশমিক ৫৮ মার্কিন ডলার।
এছাড়া একই প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার পোসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে দুটি কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ৯-১০ এপ্রিল সরবরাহযোগ্য (৬ষ্ঠ) কার্গোর জন্য ব্যয় হবে ৮৭৩ কোটি ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৮ টাকা, যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৭৬ মার্কিন ডলার।
একই কোম্পানি থেকে ১২-১৩ এপ্রিল সরবরাহযোগ্য (৭ম) আরেকটি কার্গো এলএনজি আমদানিতেও একই পরিমাণ ব্যয় ধরা হয়েছে—৮৭৩ কোটি ৩৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৮৮ টাকা। এ ক্ষেত্রেও প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২০ দশমিক ৭৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, বৈঠকে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি পাম অয়েল ও রাইস ব্র্যান তেল আমদানির প্রস্তাবেও অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
পবিত্র শবে কদর ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের উভয় শেয়ারবাজারে টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময়ে কোনো লেনদেন বা দাপ্তরিক কার্যক্রম থাকবে না।
সূত্র জানায়, আগামী ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।
জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের পূর্বনির্ধারিত ছুটির মধ্যবর্তী দিন ১৮ মার্চ (বুধবার) নির্বাহী আদেশে এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে লেনদেন ও অফিস কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
স্টক এক্সচেঞ্জ দুটি জানিয়েছে, পবিত্র রমজান ও ঈদের ছুটি শেষে অফিসের সময়সূচি আবার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসবে।
সাধারণ সময়সূচি অনুযায়ী ডিএসই ও সিএসইর অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। আর শেয়ার লেনদেন চলবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত।
এরপর দুপুর ২টা ২০ মিনিট থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পোস্ট ক্লোজিং লেনদেন সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
টানা সাত দিনের ছুটি শেষে আগামী ২৪ মার্চ থেকে উভয় শেয়ারবাজারে পুনরায় নিয়মিত লেনদেন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলেও দেশে ডিজেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ২৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে ‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের একটি ট্যাংকার চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে। গত ১১ দিনের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় ডিজেলবাহী জাহাজ।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিকেলে জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে জ্বালানি খালাসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত সোমবার ‘শিউ চি’ নামের আরেকটি জাহাজ ২৭ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। নতুন চালান যুক্ত হওয়ায় দেশের জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে আরও তিনটি ডিজেলবাহী ট্যাংকার পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে ‘এসপিটি থেমিস’ ১২ মার্চ বন্দরে ভেড়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৩ মার্চ ‘র্যাফেলস সামুরাই’ এবং ১৫ মার্চ ‘চাং হাং হং তু’ নামের আরও দুটি ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছাবে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন করে ডিজেল রয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এই পাঁচটি ট্যাংকার মিলিয়ে দেশে মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৫ মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল যুক্ত হবে।
বিপিসির হিসাবে, নতুন আসা এই পাঁচটি জাহাজের ডিজেল দিয়ে দেশের বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী অন্তত ১২ দিনের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার গত রোববার থেকে দৈনিক ডিজেল সরবরাহ কমিয়ে ৯ হাজার মেট্রিক টনে নামিয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি মজুত বজায় রাখা যায়।
এই সাশ্রয়ী সরবরাহ পদ্ধতি অব্যাহত থাকলে নতুন আসা ডিজেল দিয়ে প্রায় ১৬ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে। বর্তমানে দেশে যে মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আরও ১৬ থেকে ১৭ দিনের জ্বালানি প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। ফলে নতুন চালান যোগ হওয়ায় সব মিলিয়ে প্রায় এক মাসের ডিজেল চাহিদা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা থাকবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিপিসির বাণিজ্যিক ও অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সোমবার প্রথম জাহাজটি আসার পরপরই দ্রুততার সঙ্গে জ্বালানি খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবারের দ্বিতীয় জাহাজটির খালাস প্রক্রিয়াও সচল রয়েছে এবং পরবর্তী জাহাজগুলো সময়মতো পৌঁছালে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
বিপিসি কর্তৃপক্ষের মতে, ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত থাকায় বাজারে যে কৃত্রিম সংকট বা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসবে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিপিসি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।