বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে আরেকটি বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দুই বছরের করোনা মহামারির ধকল কাটতে না কাটতেই এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির বেহালের মধ্যেই ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে বাজারের আগুনে চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে কিছুটা রেহাই দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ৩ লাখ টাকা থেকে এই সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাদের বার্ষিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কম, তাদের কোনো কর দিতে হবে না। তবে করপোরেট করে হাত দেননি অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল; কর আগের মতোই থাকছে। বিদ্যমান করপোরেট কর হিসেবে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৭ শতাংশ করই অপরিবর্তিত থাকছে।
বয়স্ক ও বিধবা ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বয়স্ক ভাতা বাড়ছে ১০০ টাকা; বিধবা ভাতা ৫০ টাকা বাড়িয়েছেন।
বৈশ্বিক বাস্তবতা আর নানামুখী চাপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ‘স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে’ যাত্রার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটের আগে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেট জাতীয় সংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তিনি তার এবারের বাজেটেও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জিত হবে বলে লক্ষ্য ধরেছেন। আর বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে দেশের অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মধ্যে, সেই সময় নতুন অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানোর ঘোষণাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে আটকে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সাফ বলে দিয়েছেন, বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ‘পূরণ হবে না’। দৈনিক বাংলাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, আমদানি কমে যাচ্ছে। এই পরিবেশে প্রবৃদ্ধি খুব একটা যে হবে, সেটা আশা করা ঠিক না। এ বছর বলা হচ্ছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে। আমার বিবেচনায় সেটাও কমে হয়তো ৫-এর ঘরে চলে আসবে। আগামী বছর যে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু হবে তা মনে হয় না। তাহলে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোন জাদুবলে আসবে। এটা অসম্ভব; অবাস্তব লক্ষ্য। অতি আশাবাদের বদলে বাস্তবতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য ধরাই উচিত ছিল সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘গড় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৯ শতাংশ। সেই মূল্যস্ফীতি কীভাবে ৬ শতাংশে নেমে আসবে- এটাও আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রধান গুরুত্বে রেখে সরকারকে কাজ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
অবশ্য বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও সারের মূল্য কমে আসা, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করি।’
প্রস্তাবিত বাজেটের ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা) চেয়ে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। টাকার এই অঙ্ক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৫ দশমিক ২১ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুস্তফা কামালের দেয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বছর বাজেট দিতে গিয়ে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়’ প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, জ্বালানি ও ডলারসংকট এবং মূল্যস্ফীতি তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মধুর হতে দেয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে হাঁটতে হয়েছে কৃচ্ছ্রের পথে। তার ওপর বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভে স্বস্তি আনার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে আর্থিক খাতের নানামুখী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ বছরে এবং দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে জনতুষ্টির খুব বেশি সুযোগ রাখার পথ মুস্তফা কামালের সামনে নেই। তার পরও স্মার্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর নির্বাচনী স্লোগানটিকেই তিনি বাজেটে ফিরিয়ে এনেছেন। তার এবারের বাজেটের শিরোনাম ‘উন্নয়নের অভিযাত্রার দেড় দশক পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা’।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, “আমাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ মাথাপিছু আয় হবে কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার; দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম মানুষ আর চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়; মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে; বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে; রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের ওপরে; বিনিয়োগ হবে জিডিপির ৪০ শতাংশ। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্ট বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।”
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বাজেটগুলোতে উন্নয়ন খাত বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছিল। কিন্তু মহামারির ধাক্কায় সেই ধারায় কিছুটা ছেদ পড়ে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এবার বিশ্বের অনেক দেশে মন্দার ঝুঁকি থাকলেও বাজেটের আকার বাড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন মুস্তফা কামাল।
৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটে এবার উন্নয়ন ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা যাবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। অনুন্নয়ন ব্যয়ের আরও প্রায় ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়ে, যার পরিমাণ অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
মহামারির ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হতে শুরু করলে বেড়ে যায় আমদানি। তাতে সরকারের জমানো ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির মতো অতটা না বাড়ায় এবং রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে আসায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য আর জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় ডলার বাঁচাতে সরকার বিলাসপণ্য আমদানিতে লাগাম দেয়ার পাশাপাশি কৃচ্ছ্রের পথে হাঁটতে শুরু করে।
রাজস্ব আহরণে এনবিআর বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন।
তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬ শতাংশের বেশি। টাকার ওই অঙ্ক মোট বাজেটের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশের মতো।
গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ শতাংশের মতো। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। সংশোধনে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা করা হয়।
আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের দেশি-বিদেশি উৎস অনুসন্ধান হবে রাজস্ব খাতের নীতি-কৌশল। রাজস্ব আহরণে সব সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি সহজীকরণসহ অন্যান্য সংস্কারের মাধ্যমে কর নেট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য সংযোজন কর আদায় সহায়ক ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস স্থাপন ও সম্প্রসারণ, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, কর প্রশাসনের অটোমেশন ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে।’
২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংশোধনে তা ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। নতুন অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন, তাতে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে রেকর্ড ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশের সমান।
সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হয়। তবে টাকা জোগানোর চাপ থাকায় কয়েক বছর ধরেই তা সম্ভব হচ্ছে না। বরাবরের মতোই বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীকে নির্ভর করতে হবে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর।
তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি তিনি মেটাবেন। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থবছর শেষে তা ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হবে বলে সরকার ধারণা করছে। তার পরও অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।
নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৪৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৬০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৬ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, সংশোধনে তা সামান্য কমিয়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা করা হয়, যদিও মার্চ পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তীব্র নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভূরাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরগতির মুখে পড়লেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও এ-সংক্রান্ত পণ্যের বাণিজ্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বড় ভরসা হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে এই ধস নেমেছে। তবে ওইসিডির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল শেষে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৯ শতাংশে এবং ২০২৭ সালে তা সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভোক্তা পর্যায়ে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ বছরের এই সময়ের তুলনায় গত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অবশ্য চীন নিজের জ্বালানি আমদানি ও তেলের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তবে জুন ও জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও আগস্টে জি-২০ জোটভুক্ত বহু দেশে তা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। ক্রমবর্ধমান এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বৃদ্ধি করে চলেছে।
বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ওপর ভর করে মার্কিন অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যার ফলে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার শক্তিশালী অর্থনৈতিক গতি বজায় রেখে চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবর্তনের কারণে চীনে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ইউরোজোনে ২০২৬ ও ২০২৭ উভয় বছরই প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও তুরস্ক ২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের পরও বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে এশীয় দেশগুলো থেকে এআই-সম্পর্কিত প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তবে গত জুলাইয়ে একাধিক দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন দ্বিপাক্ষিক শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা যোগ করেছে। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড ইল্ড গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। একই সাথে ক্রমবর্ধমান ঋণ ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। এছাড়া ‘এল নিনো’র মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্কবার্তা দিয়েছে ওইসিডি।
ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট আরও তীব্র রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’। একই সঙ্গে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য পূর্বাভাস ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৯৫ ডলার নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংক অব আমেরিকার গ্লোবাল কমোডিটিজ বিভাগের প্রধান ফ্রান্সিসকো ব্লাঞ্চের নেতৃত্বাধীন বাজার কৌশলবিদদের এক নোটে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, বিকল্প নৌপথ ব্যবহার এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচলের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ঘাটতির একটি অংশ আপাতত সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। উল্লেখ্য, সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
তবে বিকল্প রুটে তেল পরিবহন বাড়াতে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উদ্যোগ বাজারে সাময়িক স্বস্তি জুগিয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর হামলার শিকার হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত সৌদি আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনটি মঙ্গলবার পুনরায় সচল করা হয়। সীমিত পরিসরে তেল সঞ্চালন শুরু হওয়ায় ইয়ানবু বন্দর থেকেও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে আরামকো। এই ইতিবাচক খবরের পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেলের দর কিছুটা কমে আসে। নভেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুড ১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ২৫ ডলারে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড ১ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৪ দশমিক ৯৯ ডলারে স্থির হয়।
ব্যাংক অব আমেরিকা পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বর্তমান সংকট কেটে গেলে ২০২৭ সাল নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে নেমে আসতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক ও কৌশলগত তেলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় স্বল্পমেয়াদে সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি বহাল রয়েছে। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক আয়ের অনুপাতে তেলের দাম এখনো এমন কোনো চরম সীমায় পৌঁছেনি যা তেলের চাহিদায় ব্যাপক ধস নামাতে পারে, আবার বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি।
মন্দা ও শ্লথগতির সব পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে ইউরোজোনভুক্ত দেশগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির মধ্যেও জ্বালানির চড়া মূল্যের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তীব্র উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক আর্থিক জরিপ সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোজোনের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতির পরিমাপক ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ফ্ল্যাশ ইউরোজোন কম্পোজিট পিএমআই’ আউটপুট সূচক সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৫৩ দশমিক ১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৫২ দশমিক শূন্য পয়েন্ট। এটি ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর থেকে সর্বোচ্চ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক পূর্বাভাসে সূচকটি কমে ৫১ দশমিক ৭ পয়েন্টে নামার আশঙ্কা করা হলেও প্রকৃত ফলাফল অর্থনীতিবিদদের চমকে দিয়েছে। সাধারণত অর্থনীতিতে পিএমআই সূচক ৫০ পয়েন্টের ওপরে থাকাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ বা প্রবৃদ্ধি হিসেবে গণ্য করা হয়।
মূলত সেবা ও উৎপাদন—উভয় খাতের সম্মিলিত অবদানের ফলেই এই গতি সঞ্চার হয়েছে। এর মধ্যে সেবা খাতের পিএমআই ৫১ দশমিক ৬ পয়েন্ট থেকে লাফিয়ে ৫৩ দশমিক শূন্য পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে উৎপাদন খাতের সামগ্রিক সূচক ৫২ দশমিক ৭ পয়েন্টে অপরিবর্তিত থাকলেও এ খাতের উৎপাদন পরিমাপক সূচকটি কিছুটা বেড়ে ৫৩ দশমিক ৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোজোনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও রপ্তানি বাড়ার ওপর ভর করে নতুন পণ্যের ক্রয়াদেশ গত চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগ বাড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের কাঁধে চাপিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
অর্থনীতির এমন শক্তিশালী অবস্থান ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (ইসিবি) আবারও সুদের হার বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রধান বিজনেস ইকোনমিস্ট ক্রিস উইলিয়ামসন জানান, ভূরাজনৈতিক সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানো ইতিবাচক হলেও তা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে বছর শেষ হওয়ার আগেই, বিশেষ করে আগামী অক্টোবরের বৈঠকেই ইসিবি নতুন করে সুদহার বাড়ানোর জোরালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। উল্লেখ্য, জ্বালানিকেন্দ্রীক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইসিবি চলতি বছর ইতিমধ্যেই দুই দফা সুদের হার বাড়িয়েছে এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে আগামী বছরের জুনের মধ্যে আরও তিন দফা সুদহার বাড়ানো হতে পারে।
দেশীয় মুদ্রা টাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেন ও আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তি আরও সহজ করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বিধিমালার আওতায় বিদেশি অংশীদার ব্যাংকগুলোর নামে কোনো ধরনের প্রাথমিক জমা ছাড়াই ‘টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ খোলা ও পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ থেকে সার্কুলার নং-৩৮ জারির মাধ্যমে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) শাখাকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু বক্কার সিদ্দিক এতে স্বাক্ষর করেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশি বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ঋণপত্র (এলসি), চুক্তি ও ইনভয়েস অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রায় খোলা গেলেও লেনদেন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সময় তা প্রচলিত বিনিময় হারের ভিত্তিতে টাকায় রূপান্তর করতে হবে। আমদানিকারকেরা স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা সংশ্লিষ্ট ভস্ট্র অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক দায় শোধ করবেন এবং নির্ধারিত শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে এসব অ্যাকাউন্টে ওভারড্রাফট সুবিধাও গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে অংশীদার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নথিপত্র আদান-প্রদান নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে থাকা অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত অর্থ দেশীয় অর্থনৈতিক খাতে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্দেশনানুযায়ী, এ অর্থ বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট, অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ কিংবা বিদেশে রেমিট্যান্স আকারে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে।
বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘আইএমপি’ ও ‘এক্সপি’ ফরম সংক্রান্ত বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। একই সাথে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং গ্রাহকের পরিচিতি নিশ্চিত করতে ‘নো ইউর কাস্টমার’ বা কেওয়াইসি নীতি শতভাগ অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া যেসব দেশ অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন মুদ্রায় লেনদেনে আগ্রহী, তাদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে বিদেশে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আওতা বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ফ্যামিলি কার্ডধারী স্বল্প আয়ের পরিবারের মাঝে ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহের লক্ষ্যে ৭৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ খাদ্যপণ্য কেনা হবে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত এ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার গ্যারান্টির আওতায় এ ক্রয়ের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মসুর ডাল ক্রয়ের জন্য প্রকাশিত উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেওয়া চারটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। এতে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে খুলনার ‘জয়তুন অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেড’। টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) সুপারিশের ভিত্তিতে টিসিবির নির্দিষ্ট গুদাম পর্যন্ত পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতি কেজি মসুর ডালের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ টাকা ৮৯ পয়সা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির মাধ্যমে বিতরণের উদ্দেশ্যে মোট ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ১৭ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে অনুমোদিত এই ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল যুক্ত হলে সংস্থার নিরাপত্তা মজুত আরও সুদৃঢ় হবে, যা সরকারের চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিয়মিতভাবে কার্ডধারী পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করা হবে।
দেশে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপযোগ সেবা সংযোগের লক্ষ্যে ৩ হাজার ৬২৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৫ টাকা ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। চীন সরকারের ঋণ ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস পাইপলাইন, বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে উত্থাপিত ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ শীর্ষক কাজটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে বিনিয়োগ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটির সভায় প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এক ধাপ দুই খাম পদ্ধতিতে দাখিলকৃত দরপত্র যাচাই-বাছাই ও দরকষাকষি শেষে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়। চলতি বছরের ২০ আগস্ট পরিকল্পনা বিভাগ প্রকল্পটির পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রস্তাবনা অনুমোদন করে, যার মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অনুমোদিত প্যাকেজের আওতায় শিল্পাঞ্চলে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রশস্ত একটি সড়ক এবং ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ ও ২৪ মিটার প্রশস্ত আরেকটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশালাকার পানি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য দৈনিক ৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনে সক্ষম সঞ্চালন লাইন ও জেলা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ২৫ মিলিয়ন লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হবে।
পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধার্থে প্রকল্প এলাকায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার একটি আধুনিক বহুমুখী জেটি, একটি কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর এবং দুটি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল নিশ্চিতের অংশ হিসেবে কঠিন বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক শোধন, শোধিত পানির পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও এই প্যাকেজের আওতায় স্থাপন করা হবে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে সব ধরনের ইলিশ মাছ আমদানি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পূর্বে ইস্যুকৃত ইলিশ আমদানির ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করার পর আজ থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব অনাপত্তি সনদ বাতিল ঘোষণা করা হয়, যার প্রেক্ষিতে স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারত থেকে ইলিশের চালান প্রবেশ স্থগিত হয়ে যায়।
হঠাৎ করে আমদানি বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খোলাসা না করা হলেও বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং দেশীয় জেলেদের স্বার্থ সুরক্ষার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্দর সূত্রে জানা যায়, প্রতি কেজি ভারতীয় ইলিশের আমদানি মূল্য ৪৮ সেন্ট থেকে সর্বোচ্চ ২ ডলার পর্যন্ত দেখানো হচ্ছিল, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৫০০ টাকা। অথচ সেই ভারতীয় ইলিশকে দেশের বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে প্রচার করে প্রতি কেজি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছিল। এর পাশাপাশি ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের আশঙ্কা এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে স্থানীয় জেলেদের উৎসাহ বজায় রাখতে সরকার এ আমদানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বাজার তদারকির সময় ভারতীয় ইলিশ প্রতারণামূলকভাবে চড়া দামে বিক্রির দায়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করেছে প্রশাসন। বেনাপোল মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার আলোকে বন্দর দিয়ে ইলিশের নতুন কোনো চালান দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে বেনাপোলসহ আশপাশের বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে আকস্মিকভাবে আমদানির অনুমতিপত্র বাতিল করায় বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার দাবি করেছেন আমদানিকারকেরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানির উদ্দেশ্যে ভারতীয় অংশে এলসি খুলে যে পরিমাণ ইলিশ মজুত রাখা হয়েছিল, তা এখন বাধ্য হয়ে লোকসানে ফেরত দিতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে সর্বমোট ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ মেট্রিক টন ইলিশ দেশে পৌঁছেছে। বাতিলকৃত ১০৩টি সনদ বাদে অবশিষ্ট অনুমোদনের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সৌদি আরবের কৌশলগত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে পুনরায় তেল সরবরাহ শুরু হওয়া এবং চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতে বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এর প্রভাবে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের তেলের দামেই পতন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ১৮ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৫ সেন্ট হ্রাস পেয়ে ৯০ ডলার ১৭ সেন্টে লেনদেন হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়টি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও মঙ্গলবার তা আবার চালু করা হয়। লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা যায়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। তবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশনগুলোর মেরামত সম্পন্ন করে পাইপলাইনটির শতভাগ সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও জ্বালানি বাজারে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ হ্রাস করে বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এর আগে মঙ্গলবারই গত ৮ সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন দরে পৌঁছেছিল।
যদিও যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা আসেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনায় বাজার থেকে অতিরিক্ত ঝুঁকির চাপ অনেকটাই কমছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে।
ভারতীয় রুপির বিপরীতে বিগত দুই বছরে দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে বাংলাদেশি টাকা। এই দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্য বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যার মধ্যে কেবল গেল এক বছরেই টাকার মান বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রতি এক টাকার বিপরীতে মিলছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭৮ ভারতীয় রুপি। এর আগে ২০২৫ সালের একই দিনে এক টাকায় পাওয়া যেত প্রায় শূন্য দশমিক ৭২ রুপি এবং ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এর পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৭০ রুপি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রুপির বিপরীতে টাকার মান ৫ দশমিক ৫ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় মুদ্রায় টাকার সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিপরীত হিসাবেও রুপির তুলনায় টাকার শক্তিশালী অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বর্তমানে এক ভারতীয় রুপি কিনতে যেখানে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ২৮ টাকা, সেখানে গত বছরের একই সময়ে প্রয়োজন হতো প্রায় ১ দশমিক ৩৮ টাকা। অর্থাৎ এক রুপির জন্য এখন আগের চেয়ে ৯ দশমিক ৭২ পয়সা বা ৭ দশমিক ১ শতাংশ কম টাকা লাগছে। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি এক রুপির বিনিময় মূল্য ছিল ১ দশমিক ৪৩ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও টাকার এই ইতিবাচক ধারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রুপির বিপরীতে টাকার ক্রস রেট ছিল ১ দশমিক ২৭৮৯ টাকা থেকে ১ দশমিক ২৭৯৬ টাকা, যার ফলে প্রতি টাকার বিপরীতে শূন্য দশমিক ৭৮১ থেকে শূন্য দশমিক ৭৮২ রুপি মিলেছে।
টাকার এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে জানান, রুপির বিপরীতে টাকার শক্ত অবস্থান দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে ইতিবাচক গতি আনবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর ও পণ্য পরিবহন খরচ অপরিবর্তিত থাকলে ভারত থেকে কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। ফলে ভারতীয় পণ্য ও সেবা আমদানির ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাবেন।
বাণিজ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়া সাধারণ বাংলাদেশিরাও এর সরাসরি সুফল পাবেন বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। তাঁর মতে, রুপির মান কমে যাওয়ায় ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের হোটেল ভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ টাকার হিসাবে আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হবে। তবে আমদানি পণ্যের চূড়ান্ত বাজারদর কেবল মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারদর, শুল্ক কাঠামো এবং লজিস্টিক ব্যয়ের ওপরও নির্ভর করে। মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার বিনিময় হারের গতিবিধি সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’-এ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪ শতাংশের ঘরে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ায় বিদায়ী অর্থবছরের শেষভাগে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছিল, তবে সার্বিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। বিশেষ করে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চার হওয়া প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং জানান, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই অগ্রযাত্রা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। তিনি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিবেশের সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেন।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। এডিবির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশে থাকা সাধারণ মূল্যস্ফীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খাদ্যপণ্যের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া রপ্তানির তুলনায় আমদানির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ বজায় থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও ডলারের মজুত সুরক্ষায় তা বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতির খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় এডিবি জানিয়েছে, আগামী দিনে কৃষি ও সেবা খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান খুঁটি হিসেবে অবদান রাখবে। তবে ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি স্বল্পতা এবং বহির্বিশ্বে চাহিদা হ্রাসের কারণে শিল্প ও বৃহৎ বিনিয়োগ খাতে কিছু চাপ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম, বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, টাকার ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্কারের ধীরগতিকে প্রধান অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে সতর্ক করেছে এডিবি।
রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড করেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় করার পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮ লাখ টাকা যা গত অর্থ বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশী।
মঙ্গলবার মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে বাগেরহাট ও মোংলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বন্দরের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও আর্থিক সাফল্যের এসব তথ্য তুলে ধরেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বন্দর কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও বেড়েছে বন্দরের কার্যক্রম। অর্থবছরটিতে ২৫ হাজার টিইইউজের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে মোংলা বন্দর দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বন্দর ব্যবহারকারী, শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে। জাহাজ আগমন বাড়াতে ‘ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি’র মাধ্যমেও কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি, কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউজ এবং গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট। ভবিষ্যতে এ সক্ষমতা আরও বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের আপগ্রেডেশন এবং কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণ।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলে শিপিং, সিএন্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরকে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া এ প্রকল্পের ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধের পাশাপাশি পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমানো এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বন্দরের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও তা ধরে রাখা। পাশাপাশি নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি করে মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সঙ্গে সরাসরি ফিডার জাহাজ চলাচল বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। উন্নয়ন প্রকল্প ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ফলে গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।
বিপিসি’র চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও সরকার জনগণের কথা বিবেচনা করে এতদিন জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এতে গত প্রায় ছয় মাসে বিপিসিকে অতিরিক্ত ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি’র অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ছয় মাসের এই অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবে মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা করে বিপিসির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসি’র লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৭০ টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করা হলে বিপিসির বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ঘোষিত ৩৫০ বিলিয়ন (৩৫ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় প্রথম প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। মঙ্গলবার দেশটির সরকার জানিয়েছে, প্রথম প্রকল্প হিসেবে টেক্সাসে একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মুনাফা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের মধ্যেই আরও দুটি বড় প্রকল্প বিবেচনায় রাখছে সিউল। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ানের একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের পর সংসদ সদস্য চুং চিন-উক সাংবাদিকদের জানান, টেক্সাসের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি পারমাণবিক চুল্লিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে সরকার। গত বছরের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার যে সমঝোতা হয়েছিল, তা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আইনপ্রণেতাদের এই ব্রিফিং দেওয়া হয়।
শিল্পমন্ত্রী কিম রয়টার্সকে জানান, বিনিয়োগের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারি বিনিয়োগ কমিটির অনুমোদন এবং দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের সঙ্গে আরও আলোচনার প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইউনহাপ জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টেক্সাস বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পারমাণবিক প্রকল্প
তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের এনসিনালে ৬.৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূলত এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ডেটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ইউনহাপ জানায়, প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন দক্ষিণ কোরিয়া করলেও এর মালিকানা মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে সমানভাবে (৫০:৫০) ভাগাভাগি করা হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বড় অঙ্কের তহবিল ছাড়ের প্রয়োজন হতে পারে।
চুং চিন-উক আরও জানান, সিউল মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্টিংহাউস’-এর ৫ থেকে ১০ শতাংশ শেয়ার কেনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ‘আলাস্কা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’ (এলএনজি) প্রকল্পে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্রে মোট আটটি বড় পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে দুটি নির্মিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব ‘এপিআর১৪০০’ মডেলে এবং বাকি ছয়টিতে ব্যবহার করা হবে ওয়েস্টিংহাউসের ‘এপি১০০০’ ডিজাইন। এছাড়া নিজস্ব মুদ্রা ‘ওন’-এর বিনিময় হারে সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করতে চাইছে।
ট্রাম্পের চাপ ও বাণিজ্যিক মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ
জাপানের মতো অন্যান্য দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাচ্ছে অভিযোগ করে মার্কিন কর্মকর্তারা সমালোচনা করে আসছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন এ নিয়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছিল। এছাড়া ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে পর্যাপ্ত সহায়তা না দেওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘কুপাং’-এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সিউলের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে বিনিয়োগ দ্রুত এগিয়ে নিতে চাইছে সিউল।
এর আগে গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জানান, প্রকল্পভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনায় বাণিজ্যিক উপযোগিতা বা মুনাফার প্রশ্নটি একটি বড় জটিলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং সিউল বিনিয়োগকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পলিসি গ্রুপ ‘কোরিয়া ইকোনমিক ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা’র জ্যেষ্ঠ গবেষক হিউন জুং জে বলেন, "প্রথম প্রকল্পের ঘোষণা একটি অর্থপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে উভয় দেশ একটি বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করতে পেরেছে, যা উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি প্রতিশ্রুতির চেয়ে এর বাস্তবায়ন ও ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।"
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সোগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম ইয়ং-জিন বলেন, টেক্সাস বিদ্যুৎ প্রকল্প কোরিয়ান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মার্কিন বাজারে প্রবেশের পথ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ওয়েস্টিংহাউসের অংশীদারিত্ব দক্ষিণ কোরিয়ার মেধা সম্পত্তি রক্ষায় সহায়তা করবে এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা এই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মুনাফা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০ বছরের মুনাফা ফেরত কাঠামোর আওতায় টেক্সাস প্রকল্পটি লাভজনক হবে। দেশটির কৌশলগত বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উপযোগিতাহীন কোনো প্রকল্প যদি জাতীয় নিরাপত্তা বা সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষার স্বার্থে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।