দেশে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। দুই বছরের করোনা মহামারি আর এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বেশ চাপে পড়া অর্থনীতির জন্য এই বিদেশি ঋণ এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩ সালে বেসরকারি খাতের ঋণের সুদ-আসল বাদ ১৬২ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১০৯ টাকা) হিসাবে টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ১৭ হাজার ৭০১ কোটি টাকা।
এমন একটা সময় এই বড় অঙ্কের কিস্তি শোধ করতে হচ্ছে, যখন দেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভ কমতে কমতে ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। রিজার্ভের যে এই পতন, তাতে বিদেশি ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ একটি কারণ বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশের ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সমষ্টিগতভাবে ২৫ দশমিক ৯৫ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে, যা ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এই ঋণের মধ্যে স্বল্পকালীন ঋণ ছিল ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এসব স্বল্পকালীন ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ বছর। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় গত এক বছরে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণ খুব একটা নেননি।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পকালীন বিদেশি ঋণ পরিশোধের ফলে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এমনিতেই বেশ নাজুক অবস্থায় আছে; গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২১ সালের আগস্টে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সূচক রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উঠে গিয়েছিল; এক বছর আগেও ছিল ৪২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে হিসাব করলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল রিজার্ভের অর্থ দিয়ে গঠিত ৭ বিলিয়ন ডলার ইডিএফের (রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল) আকার ধাপে ধাপে কমিয়ে রিজার্ভ বাড়াতে হবে। সেই শর্ত মেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইডিএফের আকার কমিয়ে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে। একইসঙ্গে আরও কয়েকটি তহবিল এবং শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ২০ কোটি ডলার ঋণ এবং দু-তিনটি প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে দেয়া ১ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে আলাদা করে নিট রিজার্ভের হিসাব করার শর্ত দিয়েছিল আইএমএফ।
কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছিল, কোনো দেশের আপৎকালীন সংকট মেটানোর জন্য রিজার্ভ রাখা হয়। কিন্তু রিজার্ভ থেকে বিভিন্ন তহবিল এবং প্রকল্পে দেয়া ঋণ বাংলাদেশ চাইলেই যখন-তখন খরচ করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার আইএমএফের এই শর্ত মেনে নিয়েছে। চলতি জুন থেকেই আইএমএফের শর্ত মেনে নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর এসব শর্ত মানতে গিয়েই ইডিএফের আকার কমানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সে হিসাবেই ইডিএফের ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার এবং অন্য তহবিল ও প্রকল্পের ১ বিলিয়ন ডলার মোট ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বাদ দিলে নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের সুদ-আসল শোধ করতে হবে ১৬২ কোটি ডলার
ডলারসংকটের মধ্যেই চলতি ২০২৩ সালে দেশের বেসরকারি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের কিস্তি বাবদ ১.৬২ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মূল (প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট) বাবদ শোধ করতে হবে ১.২৭ বিলিয়ন ডলার। সেই সঙ্গে ৩৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হবে সুদ বাবদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হবে চলতি ২০২৩ সালে। ২০০৯ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩১ বছরের হিসাবেও এটি সর্বোচ্চ পরিমাণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের পরিমাণ আগের সময়ের তুলনায় হঠাৎ বেড়ে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই বাণিজ্যিক ঋণের বেশির ভাগই পরিশোধ করতে হবে টেলিযোগাযোগ খাতকে। তবে প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী দশকগুলোতে এই ঋণ পরিষেবা ক্রমান্বয়ে কমে যেতে পারে।
এদিকে এত বেশি পরিমাণ বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক এবং দীর্ঘদিন আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসা আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ এখন গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এই ঋণ নেয়, তখন ডলারের দর ছিল ৮৪-৮৫ টাকা বা তারও কম। এখন সেই ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের জন্য ১১০ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। বলা যায়, বড় বিপদেই পড়েছেন তারা। সুদের পাশাপাশি তাদের আরও বেশি চাপ নিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ডলারের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এসব ঋণ দ্রুত পরিশোধের একটি প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দিন যত যাচ্ছে, বিদেশি ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়ছেই।
এ বিষয়ে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো কোনো ব্যাংক আমদানি করার জন্য ঋণপত্র খুলতে পারছে না। কারণ তাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডলার নেই। ফলে এত বড় অর্থ পরিশোধ করা অবশ্যই কঠিন। আবার ব্যবসায়ীরা চাইছেন দ্রুত ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে। কারণ তারা মনে করছেন সামনে ডলারের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। তারা টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু ব্যাংকগুলোর কাছে তো ডলার নেই। ফলে এক রকমের চাপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১ কোটি ৬০ লাখ এমএমবিটিইউ গ্যাসবাহী ৫টি এলএনজি কার্গো ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। জুন মাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার মোট ৯ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুন পর্যন্ত ৫ কার্গো দেশে পৌঁছেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের জন্য ক্রয়কৃত ৯ কার্গো এলএনজির মধ্যে ৫টি স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি চার কার্গো স্পট মার্কেট থেকে আনা হবে।
এর আগে গত মে মাসে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেটের মাধ্যমে মোট ১১ কার্গো এলএনজি আমদানি করে, যাতে গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ এমএমবিটিইউ।
মিজানুর রহমান বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি–স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট—সব উৎস থেকেই নিয়মিত এলএনজি আমদানি করছে।
গড়ে প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩২ লাখ এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে বলে জানান মিজানুর রহমান।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, কাতারভিত্তিক কাতার এনার্জি এবং ওমান সরকারের জ্বালানি ও পণ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করে থাকে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এলএনজি সরবরাহ করছে।
প্রতি মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে সরকার স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করে থাকে।
দেশে নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১২৩ কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বা ৩১.২৩ বিলিয়ন ডলার)
একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রায় গঠিত বিভিন্ন তহবিলসহ মোট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ৩৫.৮০ বিলিয়ন ডলার।
বুধবার (১৭ জুন) সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর।
এর আগে গত মে মাসে নিট রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। তবে দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের বিল পরিশোধের পর তা ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে রিজার্ভ আবারও ৩১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) ব্যবস্থার আওতায় প্রতি দুই মাস পরপর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আমদানি-সংক্রান্ত বিল পরিশোধ করা হয়।
দেশের বাজারে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এই সিদ্ধান্তে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যাটসহ সোনার বিক্রয়মূল্য ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। নতুন নিয়মে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ২ হাজার ৫০৮ টাকা ভ্যাট যুক্ত করায় এর চূড়ান্ত দাম পৌঁছেছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায়। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং আজ সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই মূল্য দেশজুড়ে কার্যকর করা হয়েছে।
ভ্যাটসহ নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, আজ থেকে দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের সোনার দাম পড়বে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী সোনা কেনাবেচা করতে হবে।
এর আগে গত ১৫ জুন সকালে সর্বশেষ দেশের বাজারে সোনার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। সে সময় পূর্বের তুলনায় ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা নির্ধারণ করেছিল সংগঠনটি। এছাড়া সে সময় ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ লাখ Chess হাজার ৫৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর ছিল।
বাজুস তাঁদের বিজ্ঞপ্তিতে কিছু জরুরি নিয়মাবলীও স্পষ্ট করেছে। নতুন মূল্যতালিকায় স্বর্ণালঙ্কারের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট সরাসরি যুক্ত থাকায় এখন থেকে খুচরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে আর কোনো ভ্যাট আদায় করা যাবে না। তবে অলঙ্কারের নকশা বা ডিজাইন অনুযায়ী জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়মিত মজুরি বা মেকিং চার্জ যুক্ত করতে পারবে। এছাড়া রুপার অলঙ্কারের ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপের বিষয়ে খুব শিগগিরই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর ভারতীয় রুপির বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশি টাকা। বর্তমানে বাংলাদেশের ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে ৭৯ ভারতীয় রুপি, যা মাত্র কিছুদিন আগেও ছিল মাত্র ৭৩ রুপি।
একইভাবে আগে যেখানে ১০০ রুপি কিনতে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রায় ১৪০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতো, মুদ্রা বাজারের বর্তমান হারের কারণে এখন সেখানে লাগছে মাত্র ১২৩ টাকা।
মুদ্রা বিনিময় হারের এই বড় ধরনের পরিবর্তনে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত বাণিজ্য, আমদানি কার্যক্রম এবং ভারতগামী পাসপোর্টধারী যাত্রীদের মধ্যে বড় রকমের স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীকে যাত্রার আগেই বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ভারতীয় দূতাবাসের ভিসা ফি ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ভারতের বন্দর চার্জ ৪০০ রুপি, বাংলাদেশ সরকারের ভ্রমণ কর ১ হাজার টাকা এবং বন্দর ফি ৬৫ টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এর বাইরেও ভিসার সিরিয়াল সংগ্রহ ও যাতায়াত বাবদ একটি বড় অঙ্কের ব্যয় হয়। ফলে রুপির উচ্চমূল্যের কারণে এতদিন ভারত ভ্রমণ সাধারণ মানুষের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছিল।
শুধু ভ্রমণই নয়, রুপির চড়া দামের কারণে ভারত থেকে পণ্য আমদানিতেও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছিল দেশের ব্যবসায়ীদের, যার ফলে অনেক আমদানিকারক লোকসানের আশঙ্কায় তাঁদের ব্যবসার পরিধি সীমিত করে ফেলেছিলেন।
তবে সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই রুপির বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান লক্ষণীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে এবং গত তিন দিনের ব্যবধানে টাকার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। এতে ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহারকারী পাসপোর্টধারী রাশেদুজ্জামান জানান, টাকার মান বাড়ায় ভারত ভ্রমণের খরচ আগের চেয়ে কিছুটা কমবে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত স্বস্তির বিষয়।
অন্যদিকে বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বাংলাদেশি টাকা শক্তিশালী হওয়ায় ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক ব্যয় কমবে এবং দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, বিগত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশি টাকার মান রুপির বিপরীতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচল আরও বৃদ্ধি পাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
বেনাপোল বন্দর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১ হাজার ৮৩৬ জন দেশি-বিদেশি পাসপোর্টধারী যাতায়াত করেছেন এবং একই দিনে ৩৪৫টি ট্রাকে করে দুই দেশের আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানান, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের জোরালো প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশি টাকার এই ইতিবাচক ধারা যদি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তবে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল হবে এবং সীমান্ত অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
দীর্ঘদিনের লোকসান এবং বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেইন পিৎজা হাট বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে এর মূল প্রতিষ্ঠান ইয়াম! ব্র্যান্ডস। মোট ২৭০ কোটি ডলারের বিনিময়ে এই বিশ্বখ্যাত পিৎজা চেইনটির মালিকানা হস্তান্তর করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পিৎজা হাটের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ১৫০ কোটি ডলারে কিনে নিচ্ছে প্রাইভেট ইকুইটি সংস্থা লংরেঞ্জ ক্যাপিটাল। তবে চীনের ব্যবসায়িক অংশটি আলাদা একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি ডলারে কিনে নেবে ইয়াম চায়না হোল্ডিংস।
এ বিষয়ে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের প্রধান নির্বাহী ক্রিস টার্নার মন্তব্য করেছেন, 'লংরেঞ্জ এবং ইয়াম চায়না-র অধীনে পিৎজা হাট ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি ভালো অবস্থানে থাকবে। এই নতুন মালিকানা রেস্তোরাঁ খাতে গভীর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে।' মূলত মান্ধাতা আমলের আউটলেট এবং বিক্রয় হ্রাসের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ইয়াম! ব্র্যান্ডস ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কয়েকশ আউটলেট বন্ধ করে দিতে পারে।
১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরু করা পিৎজা হাট ১৯৭৭ সালে পেপসিকোর অধীনে যায় এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের একটি অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে কেএফসি ও ট্যাকো বেলের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড থাকলেও পিৎজা হাটের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাজার গবেষণা সংস্থা গ্লোবালডাটা-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিল সন্ডার্স জানান, 'ইয়ামের ব্যবসায়িক পোর্টফোলিওতে দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে দুর্বল ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পিৎজা হাট।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ব্র্যান্ডটিকে পুনরুজ্জীবিত করার এবং দুর্বল পারফরম্যান্স করা আউটলেটগুলো বন্ধ করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এই বিভাগটিকে আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন, ইয়াম তা দিতে প্রস্তুত নয়।'
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যেই এই বিক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে পারে। বিক্রির খবর প্রকাশ্যে আসার পর পুঁজিবাজারে ইয়াম! ব্র্যান্ডসের শেয়ারদরে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পিৎজা হাট থেকে সরে আসায় ইয়াম! ব্র্যান্ডস এখন তাদের অন্যান্য সফল ব্র্যান্ডগুলোর ওপর অধিক মনোযোগ দিতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। সংস্থাটি মনে করে, দীর্ঘদিনের দুর্বল রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া এবং সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিচ-এর এই বিশ্লেষণের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের তুলনায় বৃদ্ধি করে ১০.২ শতাংশে উন্নীত করা। এটি সম্ভব হলে ১৯৯৩ সালের পর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের রেকর্ড হবে। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে সরকার প্রায় ১৮ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে, যার বিপরীতে সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ শতাংশ। বাজেটে কর প্রদান সহজ করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থা শিথিল করার মতো ইতিবাচক সংস্কারের কথা বলা হলেও ফিচ সতর্ক করে জানিয়েছে যে, অতীতের দুর্বল বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতার কারণে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চাপ সরকারকে বিপাকে ফেলতে পারে বলে মনে করছে ফিচ। এবারের বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা এবং ১৮.৭ শতাংশ ভৌত অবকাঠামো খাতের জন্য রাখা হয়েছে। তবে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশে সচরাচর বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ ব্যয়ে এক ধরনের ঘাটতি বা মন্থর গতি থাকে, যা মূলত বড় কোনো আর্থিক বিপর্যয় বা ঘাটতি থেকে সরকারকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়া জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি সরবরাহে গুরুত্বারোপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ফিচ।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে সরকারের সাথে বড় ধরনের দ্বিমত পোষণ করেছে এই ঋণমান সংস্থা। সরকার যেখানে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করছে, সেখানে ফিচ-এর পূর্বাভাস বলছে এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩.৫ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাই এই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ফিচ মনে করে, রাজস্ব ও ব্যয় উভয়ই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ার কারণে বাজেট ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত ৩.৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
আইএমএফ-এর সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা চূড়ান্ত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছে ফিচ। সংস্থাটির মতে, নতুন কোনো সংস্কার কর্মসূচিতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সরকারের বেশ কিছু সময় লেগে যেতে পারে। এমতাবস্থায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং অবকাঠামো খাতে পিপিপি উদ্যোগগুলোর কার্যকর প্রয়োগই হবে নতুন সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা নিরসনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথেই ইরানের তেল ও জ্বালানি খাতের ওপর থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, এ সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে ইরান পুনরায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির সুযোগ পাবে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের আওতায় ইরান কেবল তেল বিক্রির সুযোগই পাবে না, বরং এই প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাংকিং লেনদেন, জাহাজ পরিবহন এবং বিমা সেবার ওপর থাকা বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সুবিধাগুলো সম্পূর্ণভাবে চুক্তির শর্ত পালনের ওপর নির্ভর করবে। ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, তাদের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করতে হবে এবং বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নিরবচ্ছিন্ন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ ব্রেট এরিকসন এই পদক্ষেপকে ইরানের জন্য ‘বিলিয়ন ডলারের বিশাল ছাড়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, কয়েক মাসের প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পর ওয়াশিংটন এখন তেহরানকে এমন কিছু আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে যা ভবিষ্যতে পুনরায় প্রত্যাহার করা কঠিন হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে বর্তমানে মজুত ও ট্যাংকারে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে, যার একটি বড় অংশ চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই বাজারে ছাড়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহেই তা চূড়ান্ত রূপ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধে বিরতি আসবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হবে। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালি থেকে তাদের নিজ নিজ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেবে।
শান্তিপ্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যদিও এই পরিকল্পনাটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে, এর মাধ্যমে উভয় পক্ষকে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে অর্থনৈতিকভাবে প্রলুব্ধ করাই মূল লক্ষ্য। এই বিশাল অংকের তহবিলের অর্ধেকের বেশি জোগানের প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে হোঁচট খাওয়ার পর চতুর্থ দিন বুধবার (১৭ জুন) পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এদিন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রধান সব মূল্যসূচক ও লেনদেনের পরিমাণেও উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই), যেখানে লেনদেন বাড়লেও মূল্যসূচকের পতন হয়েছে।
বুধবার লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইতে ক্রেতাদের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দিন শেষে বাজারটিতে ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, যেখানে কমেছে ১৫৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৪টির দর। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৬২১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। পাশাপাশি শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৭ পয়েন্ট এবং বাছাইকৃত বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসই-৩০ ২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের গতিতেও বুধবার ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ডিএসইতে মোট ১ হাজার ২১১ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা বেশি। লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে সামিট এলায়েন্স পোর্ট, যার প্রায় ৯৯ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে ছিল বেক্সিমকো ফার্মা ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স। শেয়ার দরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদিন ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন বা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর চেয়ে লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি ছিল। এই গ্রুপের ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে, বিপরীতে ভালো মানের ৯৪টি কোম্পানির দরপতন হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ২২ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। তবে ডিএসইর মতো এখানেও দাম বাড়ার তালিকায় আধিপত্য ছিল বেশি প্রতিষ্ঠানের; ১১১টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে এবং কমেছে ৯৩টির। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী দিনের ৩০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার তুলনায় কিছুটা বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসইতে সূচকের এই প্রত্যাবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও ভালো মানের কোম্পানিগুলোর দরপতন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিদেশে রাখা তাদের স্বর্ণের মজুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। একই সাথে স্বর্ণ সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় স্থানের খোঁজ করছে তারা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক স্বর্ণভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত লন্ডন ও নিউইয়র্কের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। ফাইনান্সিয়াল টাইমস (এফটি)-র এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ১৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে তারা ইতিমধ্যে তাদের স্বর্ণের মজুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে বা সংরক্ষণের স্থান পরিবর্তন করেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চেয়ে স্বর্ণ এখন অনেক দেশের কাছে অধিক নির্ভরযোগ্য রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা এবং জরুরি অবস্থায় বিদেশের ভল্টে থাকা স্বর্ণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
ইতিমধ্যে ফ্রান্স তাদের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে থাকা ১২৯ টন স্বর্ণ সরিয়ে পুরোপুরি নিজ দেশে সংরক্ষণ করছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশটি প্রায় ১১ বিলিয়ন ইউরো মুনাফাও করেছে। ভারতও গত তিন বছরে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে থাকা তাদের স্বর্ণের একটি বড় অংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। বর্তমানে ভারতের মোট স্বর্ণের মাত্র ২২ শতাংশ বিদেশে রয়েছে, যা তিন বছর আগে ছিল ৫৫ শতাংশ। এছাড়া জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলোতেও বিদেশে রাখা স্বর্ণ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কর্মকর্তা শাওকাই ফ্যান জানান, ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ ও স্বর্ণের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল লক্ষ্য। এর ফলে এশীয় আর্থিক কেন্দ্রগুলো, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও হংকং এখন স্বর্ণ সংরক্ষণের বিকল্প গন্তব্য হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও লন্ডন এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণবাজার হিসেবে টিকে আছে, তবে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে স্বর্ণ রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হার ৬৪ শতাংশ থেকে কমে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভেও এই হার ১৭ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশে নেমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ সংরক্ষণের এই স্থান পরিবর্তন কেবল একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার খোলাবাজার বা ‘স্পট মার্কেট’ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুধবার (১৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আন্তর্জাতিক কোটেশন পদ্ধতিতে মোট তিন কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১১২ কোটি টাকার বেশি। তবে ক্রয় কমিটি বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে দুই কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে, যার জন্য সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের কারণে বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ‘ফোর্স মেজর’ ধারা প্রয়োগ করছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। আসন্ন জুন ও জুলাই মাসের শুরুতেই দেশের ভেতরে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পট মার্কেট থেকে এই জরুরি ক্রয়ের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সচিব আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী হওয়ায় তৃতীয় কার্গোটি কেনার ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা হবে যে, এই সময়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কোনো চালান দেশে পৌঁছায় কিনা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আমদানি কৌশলকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে।
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সার উৎপাদনকারী দেশগুলোতে সৃষ্টি হওয়া লজিস্টিক ও পরিবহন জটিলতার প্রেক্ষিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বড় অংকের ইউরিয়া সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৭ জুন) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। মূলত আসন্ন কৃষি মৌসুমে কৃষকদের মাঝে নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রচলিত আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ায় সার সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া সারের চাহিদা বা ‘মিনি পিক সিজন’ মোকাবিলায় আগাম মজুত গড়ে তোলা অপরিহার্য। এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ‘ডেলটা স্টার ট্রেডিং’ এবং রাশিয়ার ‘পিজেএসসি আরকন’-এর কাছ থেকে লটভিত্তিক মোট ১ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, এর মধ্যে রাশিয়া থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে প্রায় ৭০৫ কোটি টাকার তিনটি পৃথক ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৮ কোটি ৫৫ লাখ ৫৯ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয়ে আরব আমিরাত থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন এবং ১৮৫ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৪৩৭ টাকা ব্যয়ে সৌদি আরবের ‘সাবিক অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০৭ দশমিক ০১ মার্কিন ডলার। এছাড়াও টিএসপিসিএল-এর জন্য ১৭১ কোটি টাকার রক সালফার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ সারের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় নিয়মিতভাবেই বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হয়। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় সরকার জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির আওতায় দ্রুত সার মজুত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। সারের এই আগাম সংগ্রহ আসন্ন কৃষি মৌসুমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরুর দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) বাজারটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইইউ-র পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল ৩৫৭ কোটি ইউরো, সেখানে এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ইউরোতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ৬৯ কোটি ইউরো আয় হারিয়েছে। একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে এই পতনের হার ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
ইউরোপীয় বাজারে এই ধসের পেছনে প্রধান দুটি কারণ হিসেবে রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস এবং পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিই ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদায় মন্দা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে রপ্তানিকারক দেশগুলোর ওপর।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন, তুরস্ক, ভারত এবং ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোও ইউরোপের বাজারে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির সম্মুখীন। চীন শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও তাদের রপ্তানি ৪ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে তুরস্ক হারিয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ বাজার। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, পুরো ইউরোপীয় বাজারে আমদানিতে মন্দা চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চীন ইতিমধ্যে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রির ‘ডিটুসি’ (ডিরেক্ট টু কনজ্যুমার) প্রক্রিয়ায় অনেক এগিয়ে গেছে, যা বাংলাদেশকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। ফলে এই বাজারে দীর্ঘস্থায়ী পতন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে টিকে থাকতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সমস্যা সমাধান এবং আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
ডিজিটাল বাংলাদেশ পেরিয়ে দেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের মহাসড়কে। পকেটে মানিব্যাগ না থাকলেও স্মার্টফোন দিয়ে নিমেষেই কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের গল্প এখন আর রূপকথা নয়। তবে এই ঝকঝকে বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধূসর চিত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী প্রচারণা আর ‘বাংলা কিউআর’ বা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের পরও এ দেশের মানুষের পকেট থেকে এখনো কাগজের নোট বিদায় নেয়নি। দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো নগদ টাকার ওপরেই সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালেও দেশের মোট লেনদেনের দুই-তৃতীয়াংশ—অর্থাৎ ৬৭.২ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে নগদ অর্থে। অবশ্য ইতিবাচক দিক হলো, ২০২৪ সালে নগদে লেনদেনের এই হার ছিল ৭২ শতাংশ। সেই তুলনায় ২০২৫ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার কিছুটা বেড়ে ৩২.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গতি ধীর হলেও রূপান্তর যে ঘটছে, তা স্পষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শত কোটি টাকার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরও কেন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ লেনদেন এখনো নগদের বৃত্তেই আটকে আছে?
টাকার অঙ্ক যখন ৩১১ লাখ কোটি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে সর্বমোট লেনদেন হয়েছে ৩১১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০৯ লাখ কোটি টাকাই হাতবদল হয়েছে নগদ কাগজের নোটে। আর ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছে ১০২ লাখ কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট বলতে আমরা যা ভাবছি, তার সবটা কিন্তু প্রকৃত ‘ক্যাশলেস’ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ) কিংবা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে যখনই কোনো গ্রাহক টাকা ক্যাশ-আউট করছেন বা জমা দিচ্ছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটিকে ‘নন-ডিজিটাল’ বা নগদ লেনদেন হিসেবেই গণ্য করছে। লেনদেন যখন পুরোপুরি অ্যাপ বা ব্যাংকিং চ্যানেলের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে (যেমন এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার বা সরাসরি মার্চেন্ট পেমেন্ট), কেবল তখনই তা প্রকৃত ডিজিটাল ট্রানজেকশন।
ক্যাশলেস সমাজ না হওয়ার ৩টি মূল অন্তরায়: অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্তাদের মতে, এই ধীরগতির পেছনে মূল কারণগুলো হলো:
অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল পরিধি: দেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান বিশাল। পরিবহন খাত, কৃষি, কাঁচাবাজার, ক্ষুদ্র খুচরা ও পাইকারি বাজারের একটি বিশাল অংশ এখনো প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশের অনানুষ্ঠানিক খাত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতির অনেক বড় অংশে এখনো নগদে লেনদেন হয়। তাদের এখনো ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।’
কর এড়ানোর মানসিকতা: ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা। এখানে প্রতিটি আদান-প্রদানের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা হিসাব থেকে যায়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে চান না কেবল করের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য। নগদে লেনদেন করলে প্রকৃত আয় গোপন করা সহজ হয়, যা ডিজিটাল মাধ্যমে অসম্ভব।
অবকাঠামোর অভাব ও আস্থার সংকট: শহরাঞ্চলে কিউআর কোড বা ডিজিটাল পেমেন্টের চল বাড়লেও গ্রামীণ হাট-বাজার বা প্রান্তিক পর্যায়ে এর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। সবার কাছে স্মার্টফোন বা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধাও নেই। এর বাইরে বড় একটি সমস্যা হলো গ্রাহকের আস্থার অভাব। এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. তৌহিদুল আলম খান সতর্ক করে বলেন, সাইবার জালিয়াতির ঘটনা, মাঝেমধ্যে লেনদেন ব্যর্থ হওয়া (Failed transaction) এবং ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর জটিল ইন্টারফেসের কারণে সাধারণ মানুষের মনে ডিজিটাল অনীহা তৈরি হয়। ফলে তারা সুরক্ষার স্বার্থে আবার নগদ লেনদেনের দিকেই ঝুঁকে পড়েন।
নোট ছাপানোর চড়া মূল্য দিচ্ছে অর্থনীতি: নগদ টাকার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিকে এক বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ব্যাংক খাতের হিসাব অনুযায়ী, বাজারে কাগজের নোটের সরবরাহ ঠিক রাখতে, ছেঁড়া-ফাটা নোট বাতিল করে নতুন নোট ছাপাতে এবং এই মুদ্রা ব্যবস্থাপনার পেছনে সরকারকে বছরে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। দেশ যদি দ্রুত ক্যাশলেস ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারত, তবে এই বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।
পথ কোন দিকে: ক্যাশলেস সমাজ গড়ার লক্ষ্য এই নয় যে রাতারাতি বাজার থেকে সব নগদ টাকা তুলে নেওয়া হবে। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো নগদ ও ডিজিটাল—দুই মাধ্যমেই যেন মানুষ সমান সুযোগ পায় এবং ধীরে ধীরে ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনে মানুষকে আকৃষ্ট করতে হলে শুধু কঠোর নীতি বা আইন চাপিয়ে দিলে হবে না; বরং এই প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। একই সাথে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা গেলেই কেবল ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন সত্যি হবে।