সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। গত কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এলেও গত তিন মাসে ধারাবাহিকভাবে বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, সৌদি আরব থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৈধ চ্যানেলে মোট ৩৭৭ কোটি ডলার সমপরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৩৫২ কোটি ডলার। এর মানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স বেশি এসেছে ২৪ কোটি ডলার বা ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ।
গত অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সৌদি আরবের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেশি ছিল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩০৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। আর একই সময় সৌদি আরব থেকে ৩০৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার এসেছে। তবে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে সৌদি আরব থেকে ডলার বেশি আসার কারণে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান নেয় মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি।
এ বিষয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের কো-অর্ডিনেটর ড. মোহাম্মাদ জালাল উদ্দিন শিকদার দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাইরের দেশে গিয়ে একজন দক্ষ শ্রমিকের চেয়ে একজন অদক্ষ শ্রমিক কম টাকা উপার্জন করেন। তবে দেশে একজন অদক্ষ শ্রমিক একজন দক্ষ শ্রমিকের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান।’
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত অর্থবছরে দেশটি থেকে এসেছে ৩০৩ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য। সেখান থেকে এসেছে ২০৮ কোটি ডলার। পঞ্চম অবস্থানে থাকা কুয়েত থেকে ১৫৬ কোটি ডলার এসেছে। এ ছাড়া কাতার থেকে ১৪৫, ইতালি থেকে ১১৯, মালয়েশিয়া থেকে ১১৩, ওমান থেকে ৭৯ এবং বাহরাইন থেকে ৫৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ২ হাজার ১৬১ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরে আসে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার। এর মানে গত অর্থবছর রেমিট্যান্স বেশি এসেছে ৫৮ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে শেষ মাস জুনে এসেছে ২২০ কোটি ডলার, গত ৩৫ মাসের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এর আগে এক মাসে সর্বোচ্চ ২৬০ কোটি ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২১ সালের জুলাইয়ে। আর এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে অতিমারি করোনার মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। এর অর্থ ঋণের টাকা দিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী করে দেখানো হয়েছিল। এখন আমরা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অর্থ ছাড়াই শক্তিশালী রিজার্ভ গঠনের পথে রয়েছি। বর্তমানে রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, শিগগিরই ৩৫ বিলিয়ন ডলার হবে।
গত সোমবার রাতে গুলশানের পুলিশ প্লাজায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) আয়োজিত সিস্টেমেটিক এফোর্টস টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইকোনমিক পালস: ইমপোর্টেন্স অব পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, এখন আমাদের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ফরেন এক্সচেঞ্জ রেট শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। মানি মার্কেট এখন ভালো সময় অতিবাহিত করছে। ডিসেম্বরে আমানত ৬ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারি মাসের ১৮ দিনে রেমিট্যান্সে ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে।
পিএমআই সূচকের বিষয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের রিয়েল টাইম ডাটার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কাজটি সহজ করেছে পিএমআই। যদিও পিএমআই সূচকটি আমাদের দেশে নতুন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান বলেন, বাংলাদেশে রপ্তানি খাতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে আমাদের বিনিয়োগ অব্যাহত থাকবে। পোশাকশিল্পে আমরা আরও বেশি বিনিয়োগ করব।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ।
তিনি বলেন, ইনডেক্স (সূচক) দিয়ে কোনো কিছুর বর্তমান অবস্থান জানা যায়। পিএমআইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান যে কেউ জানতে পারে। এতে বিশ্ববাসী বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জেনে বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। সরকারি ডাটা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে না। কিন্তু পিএমআইয়ের ডাটা সবার জন্য উন্মুক্ত; যা দেশের সক্ষমতা ও বর্তমান অবস্থার স্পষ্ট জানান দেয়।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআই চেয়ারম্যান কামরান তানভিরুর রহমান।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু ধরনের সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো। তবে তৈরি পোশাক প্রস্ততকারকদের শঙ্কা, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ও দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার চেয়েছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। সোমাবার (১৯ জানুয়ারি) ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ‘যদিও পোশাক রপ্তানিকারীরাই বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা, তারপরও এ রকম স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলাকালীন আমাদের মতামত পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।’
সেলিম রহমান আরও বলেন, এই একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানিতে এ–জাতীয় রক্ষণশীল শুল্ক আরোপের আগে অবশ্যই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের গুরুতর ক্ষতি হচ্ছি, সেটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং নীতিগতভাবে চরম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
মূলত দেশীয় সুতাকলগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকার এই বন্ড–সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে সেলিম রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে স্পিনিং মিলগুলোর জন্য শুল্কের কৃত্রিম ‘সুরক্ষা’ নয়, বরং প্রয়োজন নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার আধুনিকায়ন। বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে সরকার তাদের সরাসরি প্রণোদনা দিতে পারে, কিংবা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারে।’
সেলিম রহমানের শঙ্কা, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে ২০২৫- ২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে। শুধু ডিসেম্বর মাসে কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর ওপর উচ্চ দামে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেবেন। এতে প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতি হবে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের আরও দাবি: বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক না বসিয়ে তাদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্য যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদনকারীদের করপোরেট কর রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি শিহাব উদদৌজা চৌধুরী, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রমুখ।
দেশে চলমান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র সরবরাহ সংকট নিরসনে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি। সরকার থেকে সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান রোববার রাতে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এই আমদানি প্রক্রিয়া সরকার থেকে সরকার বা জিটুজি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বাজারে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম স্থিতিশীল রাখা। ইতিমধ্যেই বিপিসির চেয়ারম্যানকে প্রক্রিয়াটি দ্রুত শুরু করার জন্য মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এলপিজির প্রকট সংকট দেখা দিলে গত ১০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল বিপিসি। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে কোনো কারণে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে বা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে সরকারের পক্ষে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকারিভাবে বাজারে হস্তক্ষেপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকায় ভোক্তারা ভোগান্তির শিকার হন।
বিপিসির সেই আবেদনের যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই সরকার শেষ পর্যন্ত এলপিজি আমদানির অনুমতি প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি শুরু হলে বাজারে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া আধিপত্য কমবে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে করে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং কৃত্রিম সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে একটি কার্যকর হাতিয়ার থাকবে।
বছর ঘুরে আবারও দোরগোড়ায় চলে এসেছে শবে বরাত ও রমজান মাস। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত ও ১৭ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে শবে বরাত আসতে বাকি ১৭ দিন, আর রোজা আসতে বাকি ঠিক এক মাস। প্রতি বছর রোজা ও শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুদের উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। গত ৪ থেকে ৫ মাস ধরে পণ্য মজুদের তোড়জোড় চলছে। ইতোমধ্যেই অনেক পণ্য চলে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে, কিছু আছে পাইপলাইনে। তবে এবার রোজার আগে ভোক্তাকে ভোগাতে পারে ৫ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ, আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি ভালো হলেও শবে বরাত ও রোজার আগে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেন। এবার যে পাঁচ ধরনের পণ্য ভোক্তাকে ভোগাতে পারে তার মধ্যে আছে- ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুর এবং সবজি। এর মধ্যে সবজি বাদে বাকি চার পণ্যই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিগত চার-পাঁচ মাসে পেঁয়াজ আমদানি কম হলেও ভোজ্য তেল, চিনি এবং খেজুর আমদানি বেড়েছে এবং মজুদ পরিস্থিতিও খারাপ না। তবু এসব পণ্যের দাম ঠিকই বেড়ে যাবে রোজার আগে। এই পাঁচ পণ্যের বাইরে মুরগি, মাছ, গরুর মাংস, ছোলা এবং বেসনের দামও বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে রোজার আগ দিয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, শবে বরাত-রোজার মতো বড় উপলক্ষ এলেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেট করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে কষ্ট দেন ভোক্তাকে। এ মন্তব্য করে বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা নিজেদের মুনাফা ছাড়া আর কিছুই চেনে না। রোজার মাস ঘিরে তারা সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে বাড়তি মুনাফা লুফে নেওয়ার জন্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না, বরং এবার বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কেননা সামনে নির্বাচন, সরকারসহ সবার নজর এখন নির্বাচনের দিকে। বাজারের ভোগ্যপণ্যের দিকে কারও তেমন নজর নেই। তা ছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে নতুন সরকার এসেই বাজার সামাল দিতে পারবে না। তাই এবার রোজায় দেশের মানুষকে আরও বেশি ভুগতে হতে পারে ভোগ্যপণ্য নিয়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে বিগত সরকারের মতো একই পন্থায় কাজ চলছে এখনো। পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকে না সরকারের হাতে, এতে এক রকম সংকট দেখা দেয়। প্রতি বছরই দেখা যায় শবে বরাতের আগ পর্যন্ত গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু বেড়ে যায় শবে বরাতের আগে। এখন বাজারে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় গরুর মাংস পাওয়া যাচ্ছে, শবে বরাতের আগে বেড়ে ৮৫০ টাকা কেজি হবে না- এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না। তাই সরকারের উচিত ভোটের পাশাপাশি বাজারের দিকেও নজর দেওয়া।
অন্যদিকে এনবিআর ও চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, এ বছর আমদানি নির্ভর ৬ পণ্যের আমদানি পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। গত বছরের রোজার আগের পাঁচ-ছয় মাস আগ দিয়ে এসব পণ্য যে হারে আমদানি হয়েছিল, এ বছর আমদানি পরিস্থিতি তার চেয়ে ভালো। পণ্য আমদানি বেশি হলে তো পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা না। অথচ বিগত সরকারের আমলেও দেখা গেছে পণ্য পর্যাপ্ত আমদানি হলেও শবে বরাত ও রোজার আগ দিয়ে ঠিকই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে পণ্যমূল্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও আগের সরকারের পথেই হাঁটছে। পণ্য মূল্য কমাতে বা বাজার নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এই সরকারকে।
বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে রোজা ও শবে বরাতে মূলত চিনি, ভোজ্য তেল, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ ও গরুর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে গরুর মাংসের জোগান প্রায় শতভাগই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই মেটানো হয়। বাকি ছয় পণ্য আমদানিতে প্রায় ছয় মাস আগে থেকে আমদানির প্রস্তুতি নিতে হয়। ডলার সংকট এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা থাকলেও এবারও এসব পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত বছরের চেয়ে পণ্য আমদানি পরিস্থিতি বেশ ভালো এবার।
পণ্য আমদানি পরিস্থিতি : সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল ও খেজুরের মতো পণ্য বেশি পরিমাণে আমদানি করতে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেকটাই বেড়েছে। তথ্য বলছে, এ সময় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে। মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, এডিবল অয়েল লিমিটেড ও টিকে গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভোজ্যতেল ও চিনির প্রধান আমদানিকারক।
অন্যদিকে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল ও ছোলাজাতীয় পণ্য আমদানি করে বেসরকারি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক গ্রুপগুলো। কারণ দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মেটায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৪ টন। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪৪৬ টন।
অন্য নিত্যপণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৫০ হাজার ৩৫৫ টনের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ হাজার ৯১২ টন। ছোলার এলসি ৪২ হাজার ৮৯১ টন থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার ৫১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। গত দুই মাস নভেম্বর-ডিসেম্বরেও প্রায় একই হারে এলসি খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আমদানিকারক ও ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার আগেভাগেই চিনিসহ ছয় ধরনের পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার বেড়েছে। কারণ রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা সাধারণত অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য আগেভাগেই পণ্যগুলো আমদানির ঋণপত্র খোলা বাড়িয়েছেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি শুরু করেছেন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, খেজুর, মটর ডাল ও চিনির চাহিদা রমজানে বেড়ে যায়। বছরজুড়ে দেশে ছোলার চাহিদা থাকে দেড় লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজানে পণ্যটির চাহিদা থাকে ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পণ্যটি ৬০-৬২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে আমদানি খরচসহ অন্য খরচ মিলিয়ে পাইকারিতে ৭০-৭৫ টাকায় ক্রেতারা কিনতে পারবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খেজুর আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ টন, মসুর ডাল ৪০ হাজার ২৬ টন, মটর ডাল (সব ধরনের) ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৯ টন ও ছোলা ১১ হাজার ৬২৪ টন।
চিনির বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, আগে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মিলমালিকরা। তারাই ইচ্ছামতো দাম বাড়াতেন এবং কমাতেন। এসব মিলমালিক ছাড়া অন্য কেউ চিনি আমদানি করতে পারতেন না। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিনি আমদানি উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। যে কারণে নতুন করে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি করছেন। সে কারণে এবার চিনির দাম না বাড়ার কথা, কিন্তু রোজার আগে ঠিকই বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, পণ্যের আমদানি ভালো হলেও ডলারের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণপত্র খোলা নিয়ে নানান জটিলতার কারণে সার্বিকভাবে পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামেও সেটির প্রভাব দেখা যাবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাজার ব্যবস্থায় প্রত্যেকটা পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের জানা নেই। কে কতটুকু আমদানি করছেন, কে কত পরিমাণে এবং কত টাকায় বিক্রি করছেন, তারও কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই। এই দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজারের দীর্ঘকালীন এই সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি দীর্ঘময়াদি বা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্যে আবারও বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে, যার ফলে রোববার (১৮ জানুয়ারি) থেকে এই মূল্যবান ধাতুটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) গত ১৪ জানুয়ারি রাতে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৬২৫ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ মূল্য। এর পাশাপাশি ২১ ক্যারেটের স্বর্ণ প্রতি ভরি ২ লাখ ২৪ হাজার ৭ টাকা, ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকায় স্থিতি পেয়েছে। গহনা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের এই মূল্যের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে।
এর আগে গত ১২ জানুয়ারি স্বর্ণের দাম সমন্বয় করে ১৩ জানুয়ারি থেকে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট সাতবার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচবারই দাম বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। বিগত ২০২৫ সালেও স্বর্ণের বাজারের অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। তবে স্বর্ণের দামে এই রেকর্ড ভাঙা ঊর্ধ্বগতি থাকলেও রুপার বাজারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা আগের মতোই ৫ হাজার ৯৪৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং অন্যান্য মানের রুপার দামও অপরিবর্তিত রয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত চারবার রুপার দাম সমন্বয় করা হলেও সর্বশেষ সিদ্ধান্তে এটি স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। বাজুসের এই নতুন মূল্য নির্ধারণের ফলে অলঙ্কার তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর ২০২৬–২০২৮ মেয়াদি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের লক্ষ্যে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। রোববার (১৮ জানুয়ারি) সংগঠনের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এবারের নির্বাচনে সভাপতি, প্রথম সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি এবং পরিচালকসহ সব কটি পদেই সদস্যরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। নির্বাচনের লক্ষ্যে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ড এবং স্বচ্ছ ব্যালট প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
পরিচালনা পর্ষদের মোট ২৯টি পদের বিপরীতে এবারের নির্বাচনে আবাসন ঐক্য পরিষদ, প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ ও হৃদয়ে বাংলাদেশ—এই তিনটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সভাপতি পদের জন্য বর্তমান সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান ছাড়াও নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন আবুল খায়ের সেলিম ও আলী আফজাল। সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন লিয়াকত আলী ভুঁইয়া ও আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া চারটি সহ-সভাপতি পদের বিপরীতে ১০ জন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি সহ-সভাপতি পদের জন্য ৪ জন প্রার্থী চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
সংগঠনের ২২ জন পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে ২০টি পদের জন্য ৩৯ জন এবং চট্টগ্রাম থেকে দুটি পদের জন্য ৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এবারের নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ঢাকা থেকে ৪৬১ জন এবং চট্টগ্রাম থেকে ৫৮ জন সদস্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। এর ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যরা সরাসরি তাদের পছন্দের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মো. সাফিকুর রহমান জানিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয় বরং বাজারের চাহিদা এবং অপারেশনাল ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বহরের সামঞ্জস্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা, অর্থায়নের বিকল্প, সরবরাহ সূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে।’ গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এই ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়, যার আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হবে।
বিমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন যে, কৌশলগতভাবে আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রবাসী ও ব্যবসায়িক চাহিদা সম্পন্ন গন্তব্যগুলোতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও ট্রানজিট যাত্রী বেশি থাকায় ওই অঞ্চলে বহর বাড়ানোর বিষয়টি বিমানের অগ্রাধিকারে রয়েছে। তাঁর মেয়াদের সাফল্য নিয়ে ড. সাফিকুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতের চ্যালেঞ্জিং সময়ে আর্থিক শৃঙ্খলা ও অপারেশনাল স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা তাঁর অন্যতম বড় অর্জন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, টেকসই মুনাফা অর্জন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার মাধ্যমেই বিমানের নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
টিকিটের উচ্চ মূল্য ও যাত্রী সংখ্যা নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষিতে তিনি জানান যে, অতীতে টিকিট বিক্রিতে সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি হলেও বর্তমানে স্বচ্ছ অনলাইন টিকিটিং ও উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনা এবং রুট যৌক্তিককরণের ফলে বিমান বর্তমানে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। জেট ফুয়েলের পুরোনো বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে তিনি জানান যে, বর্তমানে মাসে ২৫ কোটি টাকা করে পরিশোধের পাশাপাশি নতুন জ্বালানি নগদ মূল্যে কেনা হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘ বিরতির পর আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হচ্ছে, যা যাত্রীদের সময় ও দীর্ঘ ট্রানজিটের ভোগান্তি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই রুটটি বাণিজ্যিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশের স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার্থে কটন সুতা আমদানিতে বিদ্যমান বন্ড সুবিধা বাতিল অথবা প্রত্যাহারের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) এনবিআরের কাস্টমস নীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠির তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রণালয় জোর সুপারিশ করেছে। এছাড়া আমদানিকৃত সুতার সঠিক বিবরণ নিশ্চিত করতে বিল অব এন্ট্রিতে কটন সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার বিষয়টি তদারকি করতে কাস্টম হাউসগুলোকে নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত থেকে, যার একটি বড় অংশই নিট গার্মেন্টস শিল্পের অবদান। আশির দশক থেকে এই শিল্পের বিকাশে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দেওয়া হলেও বর্তমানে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছেন। বর্তমানে স্থানীয় বাজার ও নিট গার্মেন্টসের চাহিদা পূরণে দেশীয় শিল্পগুলো সক্ষম হলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অসম প্রতিযোগিতার মুখে তারা সংকটে পড়েছেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের শিল্প খাতে বিশেষ আর্থিক সুবিধা ও প্রণোদনা প্রদান করায় তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম মূল্যে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করছে, যা স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুতার বিক্রয় মূল্য ২.৮৫ মার্কিন ডলারের তুলনায় অনেক কম। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না এবং তাদের বিশাল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত দুই বছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানির পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় সুতার চাহিদা ও বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশের প্রায় ৫০টি বড় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং সচল কলকারখানাগুলো তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। সুতা আমদানির এই ধারা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে নিট গার্মেন্টস শিল্প সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের লিড টাইম বৃদ্ধি পাবে, মূল্য সংযোজন কমে যাবে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
পুঁজিবাজারে জ্বালানি খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসির ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ ও এর দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কোম্পানিটির নিরীক্ষক।
রোববার (১৮ জানুয়ারি, ২০২৬) প্রকাশিত তথ্যানুয়ায়ী, সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানি জানিয়েছে যে, সহযোগী প্রতিষ্ঠান দুটির বর্তমান অচলাবস্থা তাদের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশনের ৯৫ শতাংশ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান আবসার অ্যান্ড ইলিয়াস এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেডের মূল যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যার ফলে সবশেষ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে, তবে প্রতিষ্ঠানটির পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
একইভাবে ইন্ট্রাকোর অপর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো অটোমোবাইলস লিমিটেডের কার্যক্রমও জমির ইজারা চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। ৯৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় থাকা এই প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভোলা নন-পাইপ গ্যাসলাইন ইউনিটে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূল কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নেতিবাচক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে মূল কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর। সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরে ইন্ট্রাকোর শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গত বছরের ৮৮ পয়সা থেকে কমে ৮৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে এবং কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মাত্র ১.২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
কোম্পানিটির আর্থিক অস্থিরতা চলতি ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অব্যাহত রয়েছে, যেখানে শেয়ারপ্রতি আয় ২৬ পয়সা থেকে কমে ২১ পয়সায় নেমে এসেছে। ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই কোম্পানির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ৯৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং এর রিজার্ভে রয়েছে ৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশনের মোট শেয়ারের প্রায় ৪৯ শতাংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকায় সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থা ও অস্তিত্বের সংকট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান দুটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনাই এখন মূল কোম্পানির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানিতে ব্যক্তি, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের ওপর কঠোর সীমা আরোপের একটি আইনি উদ্যোগ মালিকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা ও স্বার্থান্বেষী মহলের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন সংশোধনের খসড়ায় প্রস্তাব করেছে যে, ‘ব্যক্তি, পরিবারের সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একাধিক ব্যাংকে একযোগে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না।’ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যাংক কোম্পানি আইন-২০২৫-এর ১৪(খ) ধারায় নতুন তিনটি উপধারা যোগ করার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২ শতাংশ বা তার বেশি ধারণ করে, তবে একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংকে ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রাখতে পারবে না। এ ছাড়া সরকার ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোনো বিনিয়োগকারী যদি ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারও রাখে, তবুও তার ভোটাধিকার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর প্রস্তাবের বিপক্ষে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। তাদের মতে, পরিচালনা পর্ষদই মূলত ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে এবং যেহেতু পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে, তাই শেয়ার ধারণের ওপর আলাদা সীমার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। বিএবি প্রস্তাব দিয়েছে যেন ‘পরিবার বলতে স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীল সদস্যদের’ বোঝানো হয় এবং একই পরিবারের শেয়ার ধারণের সীমা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সভায় জানান যে, একটি বৃহৎ গ্রুপ একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, যার ফলে সাধারণ আমানতকারীরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং সরকারকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন যে, ‘প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনী চূড়ান্ত করতে আরও সময় প্রয়োজন’ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএবির প্রতিনিধিদের পরবর্তী সভায় একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (১৮ জানুয়ারি) দেশের উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান ও লেনদেনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই গত দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রধান সূচকগুলোও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৭৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৩৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যেখানে শরিয়াহ ও ডিএসই-৩০ সূচক যথাক্রমে ১৩ ও ২৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১০০৯ ও ১৯৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন ডিএসইতে মোট ৪৭৪ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেন হয়েছে, যা গত কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা বেশি; যেখানে আগের দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭৪টির দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩৪টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর।
একইভাবে অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক চিত্রও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৬৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৮৭ পয়েন্টে স্থিতি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ১৬৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে ৯৭টির এবং দর কমেছে ৪৭টির, আর অপরিবর্তিত ছিল ১৯টি কোম্পানির শেয়ার দর। লেনদেনের পরিমাণেও সিএসইতে প্রায় ১ কোটি টাকার প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেখানে গতকাল রোববার মোট ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিন ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। উভয় বাজারের এই ইতিবাচক ধারা ও সূচকের চাঙাভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৭ দিনে প্রবাসীরা মোট ১৮৬ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার বা ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রোববার (১৮ জানুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, এর মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন দেশে এসেছে প্রায় ১০ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে এবার বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে, কারণ ২০২৫ সালের প্রথম ১৭ দিনে দেশে এসেছিল ১১৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিশেষ করে গত ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি—এই তিন দিনেই প্রবাসীরা ১৬ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন।
রেমিট্যান্সের এই উর্ধ্বমুখী ধারা চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রকেও শক্তিশালী করেছে। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৮১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা বছর ব্যবধানে প্রায় ২১ দশমিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে দেশে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং বর্তমান অর্থবছরের সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাসী আয় হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লাইটারেজ জাহাজ সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী মাদার ভেসেল থেকে খালাস প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন আমদানিকারকরা। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২০টি লাইটারেজ জাহাজের মধ্যে যদি ৬৩০টির বেশি আটকে থাকে, তাহলে সংকট হওয়াই স্বাভাবিক। এর ওপর আবার ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ সারাদেশে পণ্য পৌঁছে দিতে বাইরে রয়েছে।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং বা আইভোয়াক
এই তিন সংগঠনের সমন্বয়হীনতা ও জাহাজ মালিকদের অতিমুনাফার আশা এই সংকটের জন্য দায়ী বলছেন কেউ কেউ। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে এ সংকট আরো ঘনীভূত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক)–এর সমন্বয়ে বিডব্লিউটিসিসি গঠিত। মূলত এই তিন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিরিয়াল প্রথা না মানা ও চট্টগ্রামে বরাদ্দকৃত ৯০০ লাইটার জাহাজ মোংলাসহ দেশের অন্য রুটে চলাচলের কারণে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মোহাম্মদ নবী আলম জানান, বিসিভোয়া, কোয়াব ও আইভোয়াক এ তিনটি সংগঠনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল গঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এছাড়া অতি মুনাফার আশায় সিরিয়াল না মেনে এবং চট্টগ্রামে না চালিয়ে লাইটার জাহাজ মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করছে। এ কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ জন্য সবার আগে বিসিভোয়া, কোয়াব এবং আইভোয়াক- এই তিন সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
এদিকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেল বলছে, ৫০ হাজার টনের একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার হয়। সে হিসেবে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় দুইশ থেকে আড়াইশ লাইটারেজ জাহাজ।
বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ তাদের নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও বাকী আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেল থেকে জাহাজ বুকিং নেন। দৈনিক ৮০টি লাইটারেজ বরাদ্দ দেয়া হলেও তিনদিন সেল থেকে কোনো জাহাজ দেয়া হয়নি। যে কারণে প্রায় শতাধিক জাহাজের পণ্য খালাস বন্ধ আছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে যেখানে একটা জাহাজ ৮ থেকে ১০ দিনে খালাস হতো সেখানে এখন একটা জাহাজ প্রায় ২০ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত লাগছে। সে হিসেবে জাহাজ প্রতিদিন যে পরিমাণ ড্যামারেজ খাচ্ছে তা হিসেব করলে প্রতিদিন ৮০টা জাহাজে ১৬ লাখ করে ড্যামারেজ খাচ্ছে।’
আকিজ শিপিং লাইনের এজিএম মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি মাসে কিন্তু আমাদের ৮ থেকে ১০টা জাহাজ থাকে। এখন এই মুহূর্তে আমাদের পোর্টে আছে ৪টা। গত চারদিন থেকে কোনো কাজই হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আহ্বায়ক হাজী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আগে যেটা ১৮ ঘণ্টায় ঢাকায় যেতো এখন সেটা তিনদিন লাগছে। বিভিন্ন জায়গায় জাহাজগুলো কুয়াশার জন্য চালাতে পারছে না। অনেকগুলো চিটাগাং পোর্টের জাহাজ মংলা পোর্টে চলে গেছে যেহেতু মংলা পোর্টে এখন যথেষ্ট মাদার জাহাজ আছে।’
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারওয়ার হোসেন সাগর বলেন, আনলোডিং অপারেশন (খালাস কার্যক্রম) প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যে জাহাজ ১০ দিনে বন্দর ছাড়ার কথা, সেটি এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষা করছে। প্রতিটি জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের দৈনিক ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে মোট ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল। এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজানসংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য—গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেল আছে। আরও পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি রয়েছে। সাতটি জাহাজে সার এবং ২৫টি জাহাজে সিমেন্টের ক্লিংকার বহন করা হচ্ছে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল লাইটার জাহাজের মাধ্যমে নদীবন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পরিবহন করে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে অপেক্ষার সময় বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। কিছু জাহাজ দিনের পর দিন কোনো পণ্যই খালাস করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ৩০-৩৫টি বড় জাহাজ বন্দরে থাকে, কিন্তু গত কয়েক দিনে ৭০-৮০টি জাহাজ অপেক্ষমাণ হয়েছে। লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে দৈনিক খালাস ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
অপরদিকে লাইটার জাহাজের সংকট নিরসনে কঠোর অবস্থানে সরকার। লাইটার জাহাজের সংকট মোকাবিলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।