পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, ‘দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ফের বিপদে ফেলে দিয়েছে। তারপরও বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। বাংলাদেশের এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং অস্থির ডলারের বাজারকে সুস্থির করা। আর এ জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য শামসুল আলম।
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই পরামর্শ দিয়েছেন মৃদুভাষী কিন্তু দৃঢ়চেতা মানুষ শামসুল আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি?
বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন আছে সেটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি কোন রাখঢাক না করে যেটা প্রকৃত অবস্থা, সেটাই তুলে ধরেছেন। চ্যালেঞ্জটা আপনারা জানেন। এই চ্যালেঞ্জটা কিন্তু বিশ্বব্যাপী সবার জন্য। এটা এখন কোনো একক দেশের বিষয় না। করোনাভাইরাস যেমন কোনো একক দেশের বিষয় ছিল না। সে রকম ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সমগ্র বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে দরদামের ক্ষেত্রে, পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রে। মূল্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে এই যুদ্ধের কারণে।
করোনার ধাক্কা সামলে যে সময় আমাদের মতো দেশগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। বেশ কিছু দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিছু কিছু দেশ অবশ্য সংকটের সম্মুখীন হচ্ছিল। বার্তাসংস্থা রয়টার্স যেটা বলেছিল ১২টি দেশ যেকোনো সময় বিপদে পড়তে পারে শ্রীলঙ্কার মতো। এটা মাসখানেক আগের বিশ্লেষণ। সেই সময় রয়টার্সের সেই গবেষণায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে বলা হয়েছে স্থিতিশীল। সেই ১২টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। তার পরে অবস্থাটা একটু পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী দরদামের কারণে। অন্যান্য দেশেও বেড়েছে, আমাদের দেশেও বেড়েছে।
সেই ঘটনা আপনারা শুনেছেন। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। আমেরিকার মতো একটি পরিপক্ব অর্থনীতিতে, যুক্তরাজ্যের মতো একটি মহাশক্তিধর পরিপক্ব অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্র সব কিছু মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি গত জানুয়ারি থেকেই একটু একটু করে বাড়ছিল। সেটা বাড়ছিল কারণ করোনাভাইরাসের পরে সব দেশেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ফলে চাহিদা বাড়ছিল। সে অবস্থায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ লাগে।
এই যুদ্ধ আমাদের মহা সংকটে ফেলে দেয়। বিশেষ করে গমের ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু ৪০ শতাংশ গম ইউক্রেন থেকে আমদানি করতাম। সেই অবস্থায় মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি যেন আরেকটু বাড়া শুরু করল। সেই যুদ্ধের কারণে যেহেতু পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে গেল হঠাৎ করে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ল। বিশেষ করে দুগ্ধপণ্য, ভোগ্যপণ্য চিনি- খাদ্যপণ্য ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে গেল। সবই কিন্তু আন্তর্জাতিক পণ্য, যেটা আমরা আমদানি করি। সেই বাড়ার ফলে সর্বশেষ এসে আমরা বাজেটও ঘোষণা করলাম। তখনও আমরা মোটামুটি আশাবাদী ছিলাম যে, আমরা এগোচ্ছি মূল্যস্ফীতি বাড়া সত্ত্বেও। যদিও জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জুলাইতে এসে আবার একটু কমল, তখন ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই করোনাভাইরাসের মধ্যে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কিন্তু আমি বলব সহনশীল ছিল। কারণ ২০১৩ সালে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১০-২০১১ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
আমি যেটা বলতে চাচ্ছি এরচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকার ক্ষমতা নিয়েছিল। ব্যবস্থাপনা করছিল। তারপর সুন্দরভাবে আস্তে আস্তে মূল্যস্ফীতি কমে এল। অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়ল। সর্ব ক্ষেত্রেই আমরা অগ্রসর হচ্ছিলাম। এখনকার যে মূল্যস্ফীতি অবশ্যই এটা বেশি। এটাকে আমি কোনোভাবেই হালকা করে দেখছি না। আমি যেটা পত্রপত্রিকায় দেখলাম যে, আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ; আর সেপ্টেম্বরে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। ৯ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। যদিও এটা আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়নি।
ভারতেও তাজা শাকসবজি নিয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ এই সেপ্টেম্বরে। আর খাদ্যের মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ বা ৯ দশমিক ৯। সেই অর্থে আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি আমরা খুব বেশি খারাপ করে ফেলছি, বিষয়টি তা না। আমি তুলনাটা দিচ্ছি এই জন্য যে, এই পরিস্থিতি এখন সবাইকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উন্নত দেশ হোক, ভারত হোক, ভারত তো এখন অনেক উচ্চ প্রশংসিত দেশ, উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরও যথেষ্ট সুনাম আছে আমরাও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এশিয়ান টাইগার কাব বা ব্যাঘ্র শাবক হিসেবে আমরা চিহ্নিত হয়েছি। এখন এই মূল্যস্ফীতিটা যদি আমরা ধরি। মূল্যস্ফীতির বাইরে কিন্তু অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। এটা হলো স্বস্তির বিষয়।
অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো নিয়ে কিছু বলবেন?
অর্থনীতির অন্য সূচকগুলো ভালোই আছে বলা যায়। শুধু আমি নয়, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ সব দাতা সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল আছে। আমাদের গত জুন পর্যন্ত শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর যদি ম্যানুফ্যাকচারিং বলি, সেটাও ছিল এই জুনে ১২ শতাংশ। সেবা খাত বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। এতে বোঝা যায় অর্থনীতির যে সাধারণ গতিপ্রবাহ, কর্মকাণ্ড-ব্যবসা বাণিজ্য সবই কিন্তু এর মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনো যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। যদিও এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে হয়। যেটা প্রবৃদ্ধিকে আসলে আঘাত করে। যেমন- আমরা আমদানিকে যখন নিয়ন্ত্রণ করি, যদিও শিল্পপণ্য আমদানি আমরা বন্ধ করিনি বেশি মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ভোগ কমে যাবে। তো সামগ্রিক অর্থে ভোগ কমে গেলে অর্থনীতির যে গুণিতক ফলাফল প্রবৃদ্ধির ওপরে আঘাত আসবে। দ্বিতীয় হলো- মুদ্রা সরবরাহকে আমরা একটু নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। আমরা রেপোর রেট বা নীতি সুদের হার বাড়িয়েছি। নীতি সুদ হার বাড়ানোর অর্থ হলো মুদ্রা সরবরাহকে টেনে ধরা। এর মানে হলো প্রবৃদ্ধি যেভাবে হওয়ার কথা কিছুটা হলেও একটু ধীরগতি হতে পারে। যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশ ভালোভাবে করতে চান, তাহলে আপনাকে প্রবৃদ্ধিকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে।
সেই প্রবৃদ্ধিও এডিবি বলছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। যদিও আমাদের বাজেটে প্রাক্কলন ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আমার যেটা মনে হয়, এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের তো প্রায় এক কোয়ার্টার চলে গেল, হয়তো আমাদের প্রক্ষেপিত সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেটা আসলে মনে হয় হবে না। তবে ৬ শতাংশের ওপরে যদি থাকে, সেটাও বাংলাদেশের জন্য অনেক ভালো পারফরম্যান্স হবে বলে আমি মনে করি।
বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।
বিশ্বব্যাংক সব সময়ই একটু কনজারভেটিভ-রক্ষণশীল। বিশ্বব্যাংক যা বলেছে, প্রতিবারই বাংলাদেশে তার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এবারও তাই হবে আশা করি। তবে আমি আবারও বলছি, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হলেও সেটাকে আমি খুবই ভালো বলে মনে করি। এ কথা ঠিক যে, সেপ্টেম্বরে রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স কিছুটা কমেছে। তবে এক মাস দেখে কোনো কিছুর প্রভাব বলে দেয়া কঠিন। আমি বরং তিন মাসের হিসাবটা দিই, এটাই বেশি নির্ভরযোগ্য। অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রতি মাসের হিসাব নিয়ে কথা বলার চেয়ে কয়েক মাসের গড় নিয়ে কথা বললে বেশি সঠিকভাবে রিফ্লেক্ট করে।
সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স কমলেও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর হিসাব করলে তিন মাসে আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। কিন্তু গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স ১৯ শতাংশ কমে গিয়েছিল। তাই তিন মাসের ধারাটা যদি আমলে নিই তাহলে এখনই শঙ্কিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমি মনে করি সামনে রেমিট্যান্স বাড়বে। আমাদের প্রচুর লোক বিভিন্ন দেশে গেছে গত অর্থবছরে; প্রায় ১০ লাখ লোক গিয়েছে। এর আগের বছর গিয়েছিল মাত্র সাড়ে ৩ লাখ। তাই রেমিট্যান্স বাড়বে, আর বাড়বেটা কারণ হলো- মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধের ফলে লাভবান হচ্ছে অস্ত্র যারা বিক্রি করে সেসব দেশ। দুই হলো যারা তেল বিক্রি করে। মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধে তারা লাভবান হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন প্রচুর কাজকর্ম শুরু হয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। তারা বিলাসবহুল প্রাসাদ বানাচ্ছে। তার মানে আমাদের লেবার ফোর্সের কিন্তু ডিমান্ড থাকবে। গত বছর যেমন ১০ লাখ গিয়েছে, এবারও তাই যাবে। যাওয়ার হারটা কিন্তু বেশি। আর দুই হলো- চীন-আমেরিকার যুদ্ধের কারণে রপ্তানির অনেক চাহিদা আমাদের দিকে চলে আসছে। যদিও ব্যবসায়ীরা দুই-একজন বলছেন, তাদের অর্ডারগুলো কমে গেছে, আমার মনে হয় এটা হচ্ছে সাময়িক। রপ্তানি যদি আমরা প্রপার চ্যানেলে ধরি, রপ্তানি আয়টি এখনো অস্বস্তিকর অবস্থায় পৌঁছেনি।
কিন্তু অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ যে কমছেই। ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
আমি সে আলোচনাতেই আসছিলাম। সেটা আমি বলছি, রেমিট্যান্স বাড়বে, এখনো ইতিবাচক গত বছরের তুলনায়। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি আছে। এটা ঠিক, আমাদের রিজার্ভ চাপের মধ্যে আছে, ৪ অক্টোবর ছিল ৩৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন। যেটা গত বছর এই সময়ে ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সেই অর্থে প্রায় ১০ বিলিয়ন কিন্তু কম। কিন্তু এই যে ৩৬ বিলিয়ন, এটাও আমাদের জন্য সন্তোষজনক। ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। আর রপ্তানি আয়ের কথা বলছি, গত অর্থবছর প্রথম ৩ মাসে রপ্তানি বেড়েছিল ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এবার বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। যদিও কয়েকজন ব্যবসায়ী বলছেন, আমাদের রপ্তানি কমে যাচ্ছে। কিন্তু মোটা দাগে গত তিন মাসে আমাদের রপ্তানি কিন্তু ১৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়েছে।
আর আমদানির উল্লম্ফন কিন্তু কমেছে। গত বছর প্রথম তিন মাসে আমদানি বেড়েছিল ৪৬ শতাংশ। আর এই বছর প্রথম দুই মাসে আমদানি বড়েছে ১৬ শতাংশ। যেহেতু আমরা আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছি। এটা একটি ভালো লক্ষণ, সরকার যে নীতি নিয়েছে, সেটা কার্যকর হচ্ছে। আমদানিকে নিয়ন্ত্রণ করছি, যাতে ডলারের চাহিদাটা কমে আসে। আমাদের সব নীতির লক্ষ্য হচ্ছে ফরেন এক্সচেঞ্জকে স্ট্যাবেল করা। আরেকটা হলো মূল্যস্ফীতিকে কিভাবে বাগে আনতে পারি। এর মধ্যেই আমাদের সব নীতি কিন্তু নিবন্ধিত। আমরা প্রবৃদ্ধি নিয়ে সত্যি কথা বলি, এই মুহূর্তে ভাবছি না এত।
প্রবৃদ্ধি মূল্যবান, এটাকে আমি অবহেলা করছি না। কিন্তু প্রায়োরিটি দিচ্ছি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ডলারটাকে স্ট্যাবল করা। ডলার স্ট্যাবল না হলে আরো ক্ষতি হয়ে যাবে। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ডলারটাকে স্ট্যাবল করতে প্রতি মুহূর্তে লক্ষ রাখছে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক, ফিন্যান্স ডিভিশন। বাংলাদেশ ব্যাংক তো নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে এখন। প্রতিটি মুহূর্ত তাদের জন্য এখন মূল্যবান।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং ডলারের বাজারকে স্বাভাবিক করতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন?
এটা আমি বলব অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমার একটি পরামর্শ থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এটা মনে হয়, এখন একটি বাস্তবতা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। দেখুন যদি মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ হয়। তাহলে আমানতের সুদের হার আপনি ৬ শতাংশ রাখেন কী করে? তার মানে এখন যদি একজন ব্যাংকে আমানত রাখে সে ৩ শতাংশ টাকা হারাবে। এটাতো সমর্থনযোগ্য না। এ ছাড়া ডলার স্ট্যাবল বা স্থিতিশীল করার জন্য আমি মনে করি ঋণের সুদের হার কিছুটা হলেও বাড়ানো দরকার। কারণ, কম থাকাতে সস্তায় পেয়ে যাচ্ছে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা। তাতে হচ্ছে কি? তারা সস্তায় পেয়ে বেশি বিনিয়োগ করলে সমস্যা। কিন্তু আমি তো চাচ্ছি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে। কাজেই সুদের হার বাড়ালে তখন তারা কম নেবে। তখন তারা কম ঋণ নিতে চাইবে, কারণ তখন কস্ট অব ক্যাপিটাল বেড়ে যাবে। যেহেতু এখন ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। এটা একটু কমানোর জন্য সুদের হার একটু বাড়ানো দরকার। এটা অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমার নিজের মূল্যায়ন।
কৃচ্ছ্রসাধন বা ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে আছে কি না?
আমরা এখন প্রকল্প অনেক কম গ্রহণ করছি। আমরা আগে একটি একনেকে ১২ থেকে ১৪টি প্রকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করতাম। সেটি এখন গড়ে নেমে এসেছে ৬টায়। যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ, আমরা এখন সেগুলোই নিচ্ছি। যেগুলো অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান করবে, কৃষি উৎপাদনকে বাড়াবে, যেটা আমাদের পণ্য পরিবহনকে আরো সহজ করবে, যে প্রকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহকে আরো শক্তিশালী করবে- এগুলোতো প্রকল্প নিতেই হবে, এগুলোই নিচ্ছি আমরা। আর যেগুলো বিল্ডিং সাজানো, এখন তা না করলেও চলবে- সেগুলোকে আমরা কিন্তু পিছিয়ে রাখছি। এটা হবে যখন আমাদের অবস্থা স্বাভাবিক হবে, তখন হবে।
কিন্তু অনেক প্রকল্প আছে যাদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ হচ্ছে বিদেশ থেকে কেনাকাটা। যদি এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমাই, তাহলে বিদেশ থেকে কেনাকাটা কমে আসবে, আর তাতে ডলার কম লাগবে। কাজেই একটি হলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনেক সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। আবার প্রকল্প কিন্তু নিচ্ছিও। সেই প্রকল্পগুলো নেয়া হচ্ছে- যেগুলো উৎপাদন ব্যবস্থাকে সহায়তা করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা আর মনে করিনা যে, নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় করা দরকার আছে; এখন এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা দরকার যে, আমরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব কি না। আমরা এখন অর্ধেকের কম বাতি জ্বালিয়ে অফিস করি। এসি ২৫-এ দিই। এভাবে দেশের সব নাগরিকের উচিত এই সাশ্রীয় কর্মসূচি যেন আমরা সবাই বাস্তবায়ন করি। দেশপ্রেমিক প্রত্যেক নাগরিকেরই এই হিসাব করা উচিত বলে আমি মনে করি। এই সমস্য কোনো দলের না। এই সমস্যা পুরো দেশের। এটা বিশ্বের সমস্যা। কাজেই সবার উচিত নিজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে যে সাশ্রীয় কর্মসূচিগুলো আমরা নিয়েছি, সেটাকে সহযোগিতা করা।
রেমিট্যান্স-রপ্তানি আয় ছাড়া রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য আর কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
বৈদেশিক মুদ্রাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য রিজার্ভটাকে বাড়াতেই হবে। রিজার্ভ বাড়লে আমদানির ক্ষেত্রে আমরা স্বচ্ছন্দে থাকি। শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত আর কিছুই আমদানি করতে পারছিল না। তো সে জন্য রিজার্ভটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে জন্য আমরা চাচ্ছি ডলার আনতে। এখন ডলার কিভাবে বাড়ে- বৈদেশিক সহায়তার কারণে, এফডিআই (সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ)-এর কারণে। গত অর্থবছরে আমরা ভালো এফডিআই পেয়েছি; ৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। তার আগের বছর এসেছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন। চলতি অর্থবছরেও এফডিআইপ্রবাহ বেশ ভালো। আমরা এখন চেষ্টা করছি স্বল্প সুদে, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে। সেটা আইএমএফ হোক বিশ্বব্যাংক বা এডিবি হোক। এখন আমার মনে হয়, ইআরডিকেও (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) বিনিদ্র রজনী কাটানো উচিত।
যত বৈদেশিক মুদ্রা এখন সংগ্রহ করা যায়। আমরা স্বল্প সুদে ঋণ চাচ্ছি যেমন লাইবর প্লাস ওয়ান বা এক শতাংশের কম। আর পরিশোধের সময় হচ্ছে ২৫ থেকে ৪০ বছর। ঋণের ক্ষেত্রে জাপান তো কখনো সুদ নেয় না। সেটা মাপ করে দেয়; দিয়ে আবার বলে এটা আবার তোমরা খাটাও অন্য জায়গায়। ঋণটাকে এখন নেয়ার ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট সক্রিয়। তবে সেসব ক্ষেত্রে ঋণ নেব, যেগুলোর লাভ ফিরে আসবে। আমরা ফিরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করব। ইআরডির উচিত এখন বিনিদ্র রজনী কাটানো ঋণ আনার জন্য। আমরা এখন একটি আরামদায়ক জায়গায় আছি। আমাদের মোট ঋণ আমাদের দেশ-বিদেশে মিলে দেশজ আয়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ মাত্র ১৪ শতাংশ। আমরা দুটো মিলে যেতে পারি প্রায় ৬৭ শতাংশে। নেওয়ার সক্ষমতা এখনও আমাদের আছে।
যেসব প্রকল্প আমাদের সক্ষমতা বাড়াবে- এ রকম প্রকল্পে আমাদের ঋণ নিতে হবে। নেয়ার সুযোগ আছে। আমাদের এখন ডলার দরকার, সেটাও দরকার। আর উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার তো চেষ্টা করতে হবে সার্বিকভাবে। পুঁজির যে আমাদের সংকট, সেটা কাটিয়ে উঠব তো আসলে ডলার পেলেই। কাজেই আমার পরামর্শ হবে, ঋণের বিষয়ে আমাদের নেগোসিয়েশনের জন্য আমাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করা দরকার। এ বিষয়ে ইআরডি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসা দরকার।
এ কথা ঠিক যে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে আলোচনাটা আগের মতোই হয়, দেশে দুর্নীতি কমেনি। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই?
দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। আবার দুর্নীতিকে এক দিনে কমানো সম্ভব না। এর গোড়া অনেক গভীরে পতিত। ছড়িয়ে আছে শিকড় সব জায়গায়। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে যতই আপনি শক্ত হবেন বা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাবেন, আপনার জনপ্রিয়তা হুহু করে বেড়ে যাবে। এটা স্বাভাবিক, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটা দেখা গেছে।
একটি বিষয় দেখবেন দুর্নীতি বিষয়ে পদক্ষেপগুলো কিন্তু অনেক দৃশ্যমান। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজিকে দুদক ডেকেছে। একজন প্রাক্তন সেনাপতি এখনো জেলে আছেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ট্রাস্টি এখনো জেলে। ব্যাংকের বেশ কিছু এমডি জেলে গেল। বহু সাজা হচ্ছে, হয়তো আরও হওয়া উচিত।
আমাদের দুর্নীতি তো সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে। সরকারি চাকরিতে বেতন বাড়ানো হলো, কিন্তু দুর্নীতি কমল না। এটা আসলে একটি সামাজিক ব্যাধি। বেতন বাড়ানো-কমানোর সঙ্গে মনে হয় না দুর্নীতি যুক্ত আছে। না হলে বড়লোকেরা দুর্নীতি করে কেন। যারা বড়লোক তারা কেউ বউয়ের নামে কেউ শালার নামে অ্যাপার্টমেন্ট কিনছে। ভালো সুশাসন হলে দুর্নীতি কমে আসবে, একদম নাই করে দিতে পারবেন না। এটা কোনো দেশই পারেনি। তবে মাত্রাটা অনেক কমিয়ে আনতে হবে। আমার দেশে এখন বড় সমস্যা আয় বৈষম্যের। নানানভাবে আমাদের দেশে এখন লুটপাট হচ্ছে, সেটা বন্ধ করতে হবে। যে যেখানে জড়িত আছে, সেখানে তাকে শাস্তি দিতে হবে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান।
গত চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিল (আইজিসি)। আবাদি জমির সংকোচন এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গড় ফলন হ্রাস পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আইজিসি-র সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে গমের উৎপাদন ৩ শতাংশ কমে ৮২ কোটি টনে নামতে পারে এবং ভুট্টার ফলন ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৩০ কোটি টনে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সরবরাহ কমলেও বিশ্বজুড়ে গমের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম এখনই ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উৎপাদন হ্রাসের সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে শস্যের সমাপনী মজুত ৪ শতাংশ কমে ৬১ কোটি ৫০ লাখ টনে গিয়ে ঠেকবে। যদিও এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে আমদানির হার কমতে পারে, তবে সামগ্রিক শস্য বাণিজ্যে ২ শতাংশ পতনের সম্ভাবনা দেখছে সংস্থাটি। এই উৎপাদন ঘাটতির পূর্বাভাসের প্রভাবে গত এক মাসে তৈলবীজ ও শস্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যার মধ্যে গমের দামের উল্লম্ফন ছিল সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এই মূল্যসূচক বর্তমানে প্রায় ৮ শতাংশ উঁচুতে অবস্থান করছে।
খাদ্যশস্যের এমন নেতিবাচক পূর্বাভাসের মাঝে সয়াবিন ও চালের উৎপাদনে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক সয়াবিন উৎপাদন ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪ কোটি ২০ লাখ টনের নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। অন্যদিকে, চালের উৎপাদন গত বছরের ৫৪ কোটি ৫০ লাখ টনের মাইলফলক স্পর্শ করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোর বাড়তি চাহিদার কারণে চালের বিশ্ব বাণিজ্য ৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রধান শস্য গমের সংকট আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটি সুস্থ পুঁজিবাজার যে কোনো আধুনিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করে, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণে সহায়তা করে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে ভূমিকা রাখে, যা শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে সম্ভব নয়। এই বাজারে মিউচুয়াল ফান্ড একটি বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এটি পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও বহুমুখী বিনিয়োগ সুবিধার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার মালিকানার সুযোগ করে দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে অনেক সময় স্থিতিশীল ক্রেতা হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা:
২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ডিএসইএক্স সূচক ৭,৩৬৭.৯৯ পয়েন্টে পৌঁছানোর পর থেকে বাজার দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে এটি নেমে দাঁড়ায় ৫,২৪৫.২২ পয়েন্টে, যা প্রায় ২৮.৮% পতন নির্দেশ করে। এই পতনের মূল কারণগুলো মূলত সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে-বিশ্বব্যাপী সংঘাত, বৈদেশিক মুদ্রা ও ডলার তারল্য সংকট, উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক পরিবর্তন, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আইপিও প্রবাহ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। এর ফলে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) কমেছে, ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলোর ডিসকাউন্ট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফি আয় কমে গেছে।
মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫-এর কিছু নির্দিষ্ট ধারার বিষয়ে উদ্বেগ:
এই প্রেক্ষাপটে, শিল্পখাত নতুন প্রবর্তিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫-এর কিছু ধারাকে গভীর উদ্বেগের সাথে দেখছে। বিধি ৬২(২) অনুযায়ী, কোনো বিদ্যমান ক্লোজড-এন্ড ফান্ড যদি তার ক্রয়মূল্য বা ন্যায্য মূল্যভিত্তিক NAV-এর মধ্যে যেটি বেশি তার তুলনায় ২৫% বা তার বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হয়, তবে ছয় মাসের মধ্যে সেটিকে রূপান্তর বা অবসায়নের জন্য বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৪টি ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩০টি, যাদের সম্মিলিত সম্পদমূল্য (AUM) প্রায় ৪,৩৭৭ কোটি টাকা, এই শর্তের আওতায় পড়ে।
এত বড় পরিসরে বাধ্যতামূলক অবসায়ন হলে প্রায় ২,৬২৭ কোটি টাকার তালিকাভুক্ত শেয়ার ইতোমধ্যে দুর্বল বাজারে বিক্রির চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে ইউনিটধারীদের প্রায় ১,৫৫৭.৬০ কোটি টাকার কাগুজে ক্ষতি স্থায়ী ক্ষতিতে পরিণত হবে এবং শেয়ারের দাম আরও কমে যাবে, যা লাখো খুচরা বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বাজার পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে, যে পুনরুদ্ধার স্বাভাবিকভাবেই এই ডিসকাউন্ট কমিয়ে আনতে পারত।
আমাদের দৃষ্টিতে, কোনো মিউচুয়াল ফান্ড শুধু NAV-এর তুলনায় ২৫% বা তার বেশি ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে, এই কারণেই সেটিকে অবসায়ন করার বাস্তব কোনো উপকারিতা নেই। ডিসকাউন্ট মূলত ইউনিটের বাজারদরকে প্রতিফলিত করে, অন্তর্নিহিত পোর্টফোলিওর গুণগত মানকে নয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে ক্লোজড-এন্ড ফান্ড সাধারণত ডিসকাউন্টে লেনদেন করে, যা দুর্বল বাজারে বাড়ে এবং শক্তিশালী বাজারে কমে আসে। এর চেয়ে অনেক ভালো সমাধান হতে পারে, যখন এই সীমা অতিক্রম হবে, তখন সংশ্লিষ্ট ক্লোজড-এন্ড ফান্ডকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর করা। এতে ইউনিটধারীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তারা বিনিয়োগ ধরে রাখবেন নাকি NAV অনুযায়ী ইউনিট রিডিম করবেন। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর স্বাধীনতা বজায় থাকবে, ডিসকাউন্ট এক ধাপে দূর হবে এবং জোরপূর্বক বিক্রির মাধ্যমে মূল্য ধ্বংস এড়ানো সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় উদ্বেগটি বিধি ৬৭(৪) এবং ৬৭(৭) নিয়ে, যেখানে মিউচুয়াল ফান্ডকে অ-তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বিদ্যমান অ-তালিকাভুক্ত বিনিয়োগ ছয় মাসের মধ্যে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, একটি মিউচুয়াল ফান্ডের অন্য ওপেন-এন্ড বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগও এর আওতায় পড়তে পারে, যদিও এসব ফান্ড বিএসইসি অনুমোদিত, নিয়মিত তদারকির আওতায় এবং দৈনিক NAV প্রকাশ করে; ওপেন-এন্ড স্কিমগুলো আবার প্রতিদিন NAV অনুযায়ী রিডিমযোগ্য। তাই এগুলোকে যৌক্তিকভাবে “অ-তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ” হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিধিগুলো এভাবে প্রয়োগ করা হলে একটি ফান্ডের অন্য ফান্ডে বিনিয়োগের প্রচলিত চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে, বিভিন্ন সম্পদশ্রেণিতে বৈচিত্র্য কমে যাবে এবং দুর্বল বাজারে বিশৃঙ্খল বিক্রির চাপ তৈরি হয়ে স্থায়ী মূলধনী ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
তৃতীয় উদ্বেগটি বিধি ৭৭ নিয়ে, যেখানে ০–৫০ কোটি টাকার AUM সীমায় ব্যবস্থাপনা ফি কমানো হয়েছে এবং ২০০ কোটির উপরে নতুন ০.৭৫% ফি স্তর যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকার AUM-সম্পন্ন ফান্ডগুলোর ব্যবস্থাপনা ফি আয় আনুমানিক ১৩% থেকে ২১% পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বৃহত্তর বাজার পতনের কারণে AUM আগেই কমে যাওয়ার পর এই নতুন চাপ এমন সময়ে আসছে, যখন আধুনিকায়িত কাঠামোর অধীনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিল্পখাতকে গবেষণা, কমপ্লায়েন্স সিস্টেম, প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের AMC-গুলো, যাদের অনেকেই ইতোমধ্যে ব্রেক-ইভেন অবস্থার কাছাকাছি, তারা বিশ্লেষক কাভারেজ কমাতে, নতুন পণ্যের উদ্ভাবন ধীর করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে একীভূত হওয়ার পথে যেতে বাধ্য হতে পারে, যা বিনিয়োগকারীর বিকল্প কমাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে, যা এই বিধিমালার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রত্যাশা:
শিল্পখাত ইউনিটধারীদের সুরক্ষা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড কাঠামো আধুনিকায়নের লক্ষ্যকে পূর্ণ সমর্থন জানায়। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিধিমালাগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলোকে তাদের মূল অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত চলতে দেওয়া উচিত এবং রূপান্তর বা অবসায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তখনকার বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া উচিত। শিল্পখাত এই বিষয়ে আরও ভালো সমাধানের লক্ষ্যে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক সংলাপের প্রত্যাশা করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভারতে। দেশটিতে চলতি মাসেই এ নিয়ে রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো সর্বশেষ সমন্বয়ের মাধ্যমে জ্বালানির দাম পুনরায় বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ০.৮৭ রুপি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৯৯.৫১ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ডিজেলের দামও প্রতি লিটারে ০.৯১ রুপি বেড়ে এখন ৯২.৪৯ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, গত মঙ্গলবারও তেল সংস্থাগুলো দ্বিতীয় দফায় প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ পয়সা করে দাম বাড়িয়েছিল। মাত্র তিন দফার এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভারতের বাজারে জ্বালানির মোট দাম প্রায় ৫ রুপি পর্যন্ত বেড়েছে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতের সাথে যুক্ত লক্ষাধিক মানুষ। গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বড় ধরণের প্রভাব পড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা না কমলে দেশীয় বাজারে দাম আরও বাড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য পুনরায় কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। শনিবার (২৩ মে) সকালে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এদিন সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই দর সারাদেশে কার্যকর হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ড’-এর দাম কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ২৫ হাজার ২৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের দাম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের প্রতি ভরি ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকায় বিক্রি হবে।
স্বর্ণের দাম কমলেও রুপার বাজারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মানভেদে রুপার দাম আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যেখানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঘরোয়া বাজারে মোট ৬৮ বার স্বর্ণের দামের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ বার দাম বাড়ানো হলেও ৩২ বার কমানোর পথে হেঁটেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০২৫ সালেও স্বর্ণের দাম ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কমলে দাম আরও সহনীয় পর্যায়ে আসার আশা করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
বৈদেশিক মুদ্রার যোগান-চাহিদার ভারসাম্য ঠিক রাখতে এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে ধারাবাহিকভাবে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে বুধবার (২০ মে) আরও ৭ কোটি মার্কিন ডলার কিনেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার (২০ মে) এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি জানান, চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে এই ডলার কেনা হয়েছে। নিলামে নির্ধারিত কাট-অফ রেট ছিল একই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি মে মাসেই মোট ৪৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বাজার থেকে সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন দফায় নিলামের মাধ্যমে কেনা ডলারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১৩ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারে টানা দুই দিন কমার পর আবারও বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। মূলত ইরান যুদ্ধকে ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাজারে তেলের নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারদরে।
বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ১০৫ দশমিক ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৯৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ২৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত কয়েক দিনের দরপতনের পর বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ার পেছনে মূলত কয়েকটি শক্তিশালী কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইরান ইস্যুতে এখনো কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় তেলের সরবরাহ লাইনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা বাড়ছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়াও বিশ্ববাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মজুত হ্রাসের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো চূড়ান্ত ও কার্যকর চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি কোনোভাবেই বিবেচনা করা হবে না। হোয়াইট হাউসের এই অনড় অবস্থান তেলের বাজারের অস্থিরতাকে আরও উসকে দিয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, কোনো বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তিনি কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করবেন না এবং প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতেও তিনি প্রস্তুত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সরবরাহ লাইনের ঝুঁকি এবং বড় অর্থনীতির দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ মজুত পরিস্থিতি এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারদর স্থিতিশীল হবে কি না।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব শিল্পপার্ক, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) দ্রুত প্রসারের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার অভূতপূর্ব হারে বাড়ছে। বেইন অ্যান্ড কোম্পানি এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার সবুজ অর্থনীতি ২০২৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে এসব খাতে বিদ্যুতের চাহিদা তিন গুণ বেড়ে ১০০ টেরাওয়াট ঘণ্টার বেশি হতে পারে। এই বিপুল চাহিদাকে এ অঞ্চলের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নতুন এই বর্ধিত চাহিদা পূরণের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এই বিশাল অংকের বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি প্রয়োজন হবে শুধুমাত্র ডেটা সেন্টারগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে। বর্তমানে এই অঞ্চলের সবুজ অর্থনীতির বাজারমূল্য প্রায় ২৯ হাজার কোটি ডলার, যা আগামী চার বছরের মধ্যে ৪৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারীরা এখন বাড়তি অর্থ বা প্রিমিয়াম দিতেও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বিদ্যুৎ ও ইভি খাতের উন্নয়নে ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ও বিদেশি কোম্পানি প্রায় ৫৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাত্র ৬০ শতাংশ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, আর বাকি বিনিয়োগগুলো বিভিন্ন কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মূলত যথাযথ সরকারি নীতিমালার অভাব এবং বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণেই বিনিয়োগকারীরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারছেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের এই অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে গ্রিড বা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা। গত পাঁচ বছরে সঞ্চালন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অস্পষ্টতা, সরকারি অনুমোদনের জটিলতা এবং গ্রিড সংযোগের কঠিন নিয়মাবলী এই সংকটের মূল কারণ। হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের গ্রিড আধুনিকায়নে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি থাকবে, যা উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সবশেষে প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এখন পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের গ্রিড আধুনিকায়নের গতি যদি বিদ্যুতের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়াতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নীতিগত সংস্কারের বিকল্প নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারে চলমান অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের বিপৎসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাধারণত শেয়ারবাজার বা পণ্যের বাজারের সাময়িক উত্থান-পতন উপেক্ষা করা গেলেও বন্ড বাজারের অস্থিরতাকে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টউড ক্যাপিটালের মতে, বর্তমানে তেলের দাম নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি বন্ড বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও বন্ড ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজমান উদ্বেগ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা মার্কিন সরকারের আর্থিক নীতিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বন্ড বাজারের এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা এবং এর ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে এই সমস্যাটি সাময়িক, কিন্তু বন্ড ব্যবসায়ীরা মনে করছেন বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। ফলে সেকেন্ডারি বাজারে বন্ডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। বন্ডের দাম যখন কমে যায়, তখন স্বাভাবিক নিয়মেই সুদের হার বা ইল্ড বেড়ে যায়। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা এখন সরকারকে অর্থ ধার দেওয়ার বিপরীতে অনেক বেশি সুদ দাবি করছেন। এর ফলে সরকারি ঋণ পরিশোধের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার মার্কিন বন্ড বাজারের উদ্বেগ এতটাই তীব্র ছিল যে, ৩০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই দিনে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বাড়লেও সামগ্রিকভাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের পতন হয়েছে। বন্ডের এই উচ্চ সুদহার কেবল বড় বিনিয়োগকারীদের জন্যই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার সরাসরি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের সাথে সম্পর্কিত। ফলে সাধারণ মানুষের ঋণের বোঝা বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়বে।
বন্ড বাজারের বিনিয়োগকারীরা কেবল যুদ্ধ বা তেলের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন নন, বরং তাদের দৃষ্টিতে এখন একাধিক সংকট একসাথে দানা বেঁধেছে। ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ, ভোক্তা ঋণের চাপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিশাল বিনিয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ব্যয়—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বার্কলেজের গবেষণা বিভাগের মতে, উন্নত বিশ্বে ঋণের পরিমাণ অত্যধিক বেড়ে গেছে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এই বিশাল ঋণ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশ্বাস দিয়ে শেয়ারবাজার বা তেলের দাম সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও বন্ড বাজারকে শান্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু কথায় আশ্বস্ত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তন খুঁজছেন। যদি বন্ডের এই দরপতন ও সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর করের বোঝা আরও বাড়বে এবং সামাজিক সেবা খাতে সরকারি ব্যয় কমিয়ে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘এইচঅ্যান্ডএম’ বাংলাদেশের বেশ কিছু বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। মূলত সুইডেনভিত্তিক এই ব্র্যান্ডটি এখন তাদের বৈশ্বিক ক্রয় কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে এবং বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের লক্ষণগুলো দেশের রপ্তানিকারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, গত দেড় বছরে এইচঅ্যান্ডএম তাদের অর্ডারের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে অনেক কারখানায় অর্ডার ছড়িয়ে দেওয়া হতো, এখন তারা শুধু গুটিকয়েক বড় ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করার নীতি গ্রহণ করেছে। এই নতুন কৌশলের ফলে বাংলাদেশের রিদিশা, হেমস, এনএএফএ, ভারটেক্স, স্যান, অ্যাবনি, ফাউনটেইন এবং মুন রেডি উইয়ার্সের মতো প্রায় ১০টিরও বেশি বড় পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি সরে না গেলেও তাদের ‘কম সরবরাহকারী কিন্তু বেশি নিয়ন্ত্রণ’ নীতি অনেক কারখানার নিয়মিত উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বড় সংকটে ফেলছে।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং অনলাইনভিত্তিক নতুন ব্র্যান্ডগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যয় সংকোচনের দিকে কঠোর নজর দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তারা সরবরাহ চেইনের ঝুঁকি কমাতে ‘বাংলাদেশ প্লাস ভারত’ মডেল অনুসরণ করছে। বিশেষ করে ম্যানমেইড ফাইবার বা সিনথেটিক কাপড়ের সহজলভ্যতা, দ্রুত কাঁচামাল সরবরাহের সুবিধা এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সুবিধার কারণে ভারত এখন তাদের কাছে নতুন বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো মূলত তুলাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় সিনথেটিক কাপড়ের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে শুধু সস্তা শ্রম বা কম মূল্যে পণ্য উৎপাদনই বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এইচঅ্যান্ডএম এখন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে যেসব কারখানা আধুনিক প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে রয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর পছন্দের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ছে। এই নতুন পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড পূরণ করা এখন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এইচঅ্যান্ডএম-এর এই কৌশলগত পরিবর্তন বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো এই ব্র্যান্ডটির মোট সংগ্রহের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে, তবুও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন ব্যবস্থাকে দ্রুত আধুনিকায়ন করা জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় শুধু তুলাভিত্তিক পণ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সিনথেটিক তন্তু উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বড় ব্র্যান্ডগুলোর এই বাজার পরিবর্তনের প্রবণতা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সচিবালয়ে গতকাল সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ২ কোটি লিটার ভোজ্যতেল এবং ২০ হাজার টন মসুর ডাল কেনার বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পণ্যগুলো সংগ্রহের জন্য মোট ৫৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। মূলত সরকারের ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিতরণ কার্যক্রম তথা টিসিবির কার্যক্রমকে বেগবান করতেই এই বিশাল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকার মোট এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান তেল এবং এক কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অয়েল সংগ্রহ করবে। রাইস ব্র্যান তেল ক্রয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে প্রতি লিটারের দাম পড়ছে ১৭৯ টাকা ৫০ পয়সা। যশোরের মজুমদার রাইস ব্র্যান অয়েল মিলসসহ মোট চারটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে এই তেল সংগ্রহ করা হবে। অন্যদিকে, ঢাকার সোনারগাঁও সিডস ক্রাশিং মিলস থেকে ১৮৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এক কোটি লিটার পাম অয়েল কেনা হবে, যার প্রতি লিটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৪ টাকা ৩৮ পয়সা।
মসুর ডাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুটি আলাদা প্রস্তাবের মাধ্যমে মোট ২০ হাজার টন ডাল সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। প্রথম ধাপে শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ১০ হাজার টন ডাল কেনা হবে ৮৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০ হাজার টন ডাল কেনা হবে ৮৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে, যা ঢাকার মদিনা ট্রেডিং করপোরেশন এবং রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ডাল মিল থেকে সংগ্রহ করা হবে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভোজ্য পণ্য ছাড়াও বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি বড় ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) জন্য কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং সিস্টেম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসি-কে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পাঁচটি রিভারাইন প্যাট্রল ভেসেল বা নদীপথের টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ১ হাজার ২১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার একটি বড় প্রস্তাবও সভায় পাশ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ডিইডব্লিউএল এবং কেএসবিএল যৌথভাবে এই বিশেষ জাহাজগুলো তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে।
ক্রয় কমিটির এই সামগ্রিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী মূল্যের তেল ও ডাল মজুত রাখাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কোস্টগার্ডের আধুনিকায়ন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নৌ-সীমানা রক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। কার্যাদেশ পাওয়া সকল প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত পণ্য ও সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
ঢাকার বেপজা কমপ্লেক্সে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড ও হংকং-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সানশাইন আউটডোর (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি আধুনিক কারখানা স্থাপন করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠানটি ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক মানের তাঁবু ও বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পিং পণ্য উৎপাদন করার লক্ষ্যে এই বিনিয়োগ চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেপজার পক্ষে নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন এবং সানশাইন আউটডোর (বিডি) কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মি. লিয়াং ডিফা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ করেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সময় উভয় পক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেপজা কর্তৃপক্ষ মীরসরাইয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
নতুন এই কারখানাটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে গেলে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ পিস বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করতে পারবে। তাদের উৎপাদন তালিকায় থাকবে উচ্চমানের তাঁবু, ক্যানোপি, পানি প্রতিরোধী ব্যাগ, ডাফেল ব্যাগ ও স্লিপিং ব্যাগ। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি ভাঁজযোগ্য চেয়ার, এয়ার পিলো, তোষক, মশারি, কার্পেট, মাদুর এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি উৎপাদন করবে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মাথায় রেখে এই আধুনিক উৎপাদন ইউনিটটি সাজানো হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পণ্যের বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কারখানাটি পুরোদমে চালু হলে প্রায় ২ হাজার ৯৭৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন যে, এ ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। মীরসরাইয়ের এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ধীরে ধীরে একটি বড় শিল্প কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে, যেখানে সানশাইন আউটডোরের মতো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও উৎসাহিত করবে।
অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (প্রকৌশল) আবদুল্লাহ আল মামুনসহ প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেপজা কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজ করে যাচ্ছে। সানশাইন আউটডোরের এই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতির প্রতি আস্থার প্রতিফলন। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কারখানাটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত পণ্য রপ্তানি শুরু করা সম্ভব হবে।
দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ও অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ থেকে বুধবার এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ সরাসরি নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট বা ‘নিটা’ হিসেবে জমা করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ায় আগে থাকা প্রশাসনিক জটিলতাগুলো কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
নতুন এই নির্দেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো অডিটরের সনদের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া। আগে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি বা প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করলে সেই অর্থ নিটা অ্যাকাউন্টে জমা করার আগে মূলধনি মুনাফার ওপর প্রযোজ্য কর নির্ধারণের জন্য অডিটরের সনদ বা ‘অডিটরস সার্টিফিকেট’ জমা দিতে হতো। এই সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো, যা শেষ পর্যন্ত বিদেশে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করত। এখন থেকে এই ধাপটি আর প্রয়োজন হবে না।
তবে অডিটরের সনদ না লাগলেও কর আদায়ের বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, শেয়ার বিক্রির অর্থ সরাসরি নিটা অ্যাকাউন্টে জমা করা গেলেও সেই অর্থ বিদেশে পাঠানোর আগে অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলোকে প্রযোজ্য মূলধনি মুনাফা কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। অর্থাৎ কর আদায়ের প্রক্রিয়াটি এখন আরও স্বয়ংক্রিয় এবং দ্রুততর হবে, যেখানে ব্যাংকের ওপর দায়বদ্ধতা বাড়বে কিন্তু গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক সহজ হবে। এর ফলে বিনিয়োগের সময় এবং প্রশাসনিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। বিশেষ করে বর্তমানে শেয়ারবাজারে যে তারল্য সংকট বা বিদেশি বিনিয়োগের অভাব রয়েছে, এই উদ্যোগ তা কাটিয়ে উঠতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিদ্যমান নির্দেশনাগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন এই বিশেষ ছাড় বা নিয়মটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ও সহজতর বিনিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও একধাপ এগিয়ে গেল। এখন থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির পর তাদের প্রাপ্য অর্থ আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও সহজে নিজ নিজ হিসাবে স্থানান্তর করতে পারবেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা সাদা করার সীমিত সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। মূলত আবাসন খাতে জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেস ক্রয়-বিক্রয়ের সময় প্রকৃত লেনদেনের তথ্য গোপন করার ফলে যে বিশাল অংকের অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়, তা মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জটিলতা এবং মৌজা মূল্যের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অর্থকে বৈধ করার সুযোগ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে চায়।
প্রস্তাবিত এই সুযোগের ক্ষেত্রে সরকার একটি বিশেষ শর্ত আরোপের কথা ভাবছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সম্পদ ক্রয় বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই তাদের আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য ঘোষণা করতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক সময় দলিলে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম দেখানো হয়, যার ফলে বাকি অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ফ্ল্যাটের প্রকৃত দাম ২ কোটি টাকা হলেও যদি সরকারি মৌজা রেট অনুযায়ী ৬৫ লাখ টাকায় দলিল হয়, তবে বাকি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বৈধ করতে বিক্রেতাকে পুরো ২ কোটি টাকাই রিটার্নে দেখাতে হবে এবং প্রচলিত আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি কালোটাকা বৈধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারির সময়ে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ সাদা করা হয়েছিল, যেখান থেকে সরকার প্রায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষ দায়মুক্তির বিধান প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, যে কেউ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আয়কর এবং তার ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা প্রদান করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে আগামী বাজেটে আবাসন খাতের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।
কালোটাকা সাদা করার এই নিয়মিত সুযোগ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এমন সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি থাকে। অন্যদিকে, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন যে, বিশেষ কোনো স্কিম ছাড়াই নিয়মিত কর হার পরিশোধ করে যে কেউ অর্থ প্রদর্শন করতে পারেন। তবে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাব প্রতিবছরের মতো এবারও কোনো প্রশ্ন ছাড়াই কম কর হারে অঘোষিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে, যাতে স্থবির হয়ে পড়া আবাসন খাত পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
পরিশেষে, সরকার এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করছে যেখানে একদিকে যেমন রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে তৈরি হওয়া অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার পথ সুগম হবে। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ের ডিজিটাল ও স্বচ্ছ সিস্টেম পুরোপুরি কার্যকর না হচ্ছে, ততক্ষণ এই খাতের অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার প্রয়োজনীয়তা থেকে যাবে। তবে এবারের বাজেটে এই সুযোগটি এমনভাবে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে যেন তা সৎ করদাতাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি না করে এবং স্বচ্ছতার শর্ত পূরণ করে।