বীর সাহাবী
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক আমিন ভূঁইয়ার সময় চালু হওয়া কাগজবিহীন বা পেপারলেস অফিস ব্যবস্থাপনা থেকে সরে আসছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, কর্মীরা এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেও শুধু সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আমলে চালু হওয়ার কারণে এটা বাদ দিচ্ছে বর্তমান পর্ষদ। তবে বর্তমান পর্ষদ বলছে, পদ্ধতিটি তাদের কাজের জন্য উপযোগী নয়। তা ছাড়া এতে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় তা ব্যয়বহুল।
ডিএসইর কাগজবিহীন ব্যবস্থাপনা বন্ধে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সব কর্মকর্তাকে ই-মেইল পাঠিয়েছে ডিএসইর মানবসম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়েছে, রোববাারে মধ্যে সবাই যেন তাদের প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সার্ভার থেকে ডাউনলোড করে রাখেন।
ওই ই-মেইলের একটি অনুলিপি এসেছে দৈনিক বাংলার হাতেও। এতে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর এ প্ল্যাটফর্ম মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে। এরপর আর কেউ চাইলেও তা ব্যবহার করতে পারবে না।
সময়, ব্যয়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিবেচনায় ডিএসই চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি কাগজবিহীন অফিস ব্যস্থাপনা চালু করে। ডিএসইর চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান অনলাইনে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে ডিএসইর অফিশিয়াল সব কাজই হতো কাগজ ছাড়াই। নতুন এই ব্যবস্থাপনায় কাগজপত্র সংরক্ষণের ঝুট-ঝামেলা থেকে মুক্ত হন কর্মকর্তারা।
কাগজবিহীন ব্যবস্থাপনার জন্য মানডে ডটকম নামে একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো। এটি একটি ক্লাউডভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যা ব্যবহারকারীদের নিজস্ব অ্যাপ্লিকেশন এবং প্রকল্প পরিচালনা করতে যেকোনো সফটওয়্যার তৈরি করে দেয়।
এ পদ্ধতি চালু হওয়ায় ডিএসইতে কাগুজে চিঠিপত্রের ব্যবহার প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। এতে সময়ের সঙ্গে বাঁচে অর্থও। এতে রীতিমতো অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ডিএসইর কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘পেপারলেস মাধ্যম ব্যবহার করতে আমাদের যে সফটওয়্যারটি আছে, এতে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। আগের মতো আর কাগজপত্রের ঝামেলা নেই। নির্ঝঞ্ঝাট একটা মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলো সম্পাদন করতে পারছি। ডিএসইর নেয়া খুবই ভালো একটি উদ্যোগ এটা।’
অনেকটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘এত সুবিধাজনক একটি মাধ্যম হবার পরও শুধু আগের এমডি এটা চালু করেছিলেন বলেই ডিএসইর বর্তমান কর্তৃপক্ষ এটাকে বাদ দিতে চাচ্ছেন। মানবসম্পদ বিভাগ থেকে আমাদের ই-মেইলে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, সব নথিপত্র যেন ডাউনলোড করে রাখি। আমরা আর এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারব না।’
ডিএসইর ব্যবস্থাপক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, ‘এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিজেদের একটি আলাদা কর্মপরিধি তৈরি হয়েছিল। যার মাধ্যমে একে অন্যের কাজগুলো খুব সহজেই বুঝতে ও করতে পারতাম। নিজেদের কাজ ভাগ করে নিতে পারতাম। কেউ কাজ না করলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনা যায় এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে। এত ভালো একটা কার্যক্রম বাদ দিলে আমাদের কাজের অগ্রগতি অনেকটাই কমে যাবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কর্মকর্তা জানান, ‘কাগুজে চিঠিপত্র অনেক সময় পিয়ন না থাকলে পড়ে থাকত। বৃহস্পতিবারের চিঠি রোববার পৌঁছাত। কিন্তু সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো চিঠি বা নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে যায়। পুঁজিবাজারের মতো সংবেদনশীল একটা বাজারে এ তাৎক্ষণিকতা খুব জরুরি। কিন্তু সেটা আর থাকছে না। বর্তমান নেতৃত্ব আসলে আগের এমডির সবকিছু মুছে ফেলতে চান।’
তবে কর্মকর্তাদের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ডিএসইর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাইফুর রহমান মজুমদার। তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘যে সফটওয়্যারটা ব্যবহার করা হতো, তাতে মূলত যেসব অভ্যন্তরীণ ডকুমেন্টস আসত সেগুলোই রাখা হতো। এর মাধ্যমে চিঠিপত্র বণ্টন করে দেয়া হতো। কিন্তু এই পেপারলেস সফটওয়্যার দিয়ে আমাদের পারপাস সার্ভ হচ্ছে না।’
তার দাবি, ‘মানডে ডটকম খুব ব্যয়বহুল একটা সফটওয়্যার। তারপরও এটা আমরা ব্যবহার করতাম যদি এটা আমাদের জন্য উপযোগী হতো। এটা একদমই ডিএসইর কাজের উপযোগী না। আগের এমডি এই সফটওয়্যারটা নিয়েছেনই খুব কম সময়ের মধ্যে। উনি যোগদান করার কয়েক দিনের মধ্যেই এটা নিয়েছিলেন। তাতেও কোনো সমস্যা ছিল না, যদি এটা এক্সচেঞ্জের জন্য উপযোগী হতো। আর এটা পেপারলেস তো দূরের কথা, আরও পেপার সংশ্লিষ্টতা বাড়িয়েছে। এটা ব্যবহার করে যদি উপকার হতো, তাহলে বোর্ড এটাকে পায়ে ফেলে দিত না।’
আগের এমডির প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব থেকেই এটা বাদ দেয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘যে এমডি চলে গেছেন তাকে নিয়ে এমন ভাবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। পরিচালনা পর্ষদ সব কিছুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাকে নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই।’
কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের উদ্দীপনা ফেরাতে গত ২৩ আগস্ট ৯৫ জনকে পদোন্নতি দিয়েছিলেন ডিএসইর সদ্য বিদায়ী এমডি তারিক আমিন ভূঁইয়া। কিন্তু নিজেদের মনমতো না হওয়ায় শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ। এ টানাপোড়েনের শেষ হয় এমডির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। পরে পদোন্নতি পাওয়া সেসব কর্মকর্তার আগের পদ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে ই-মেইল করে ডিএসইর বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।
কর্মকর্তাদের ওই ক্ষোভের ভেতরেই নতুন করে সাবেক এমডির চালু করা কাগজবিহীন ব্যবস্থাপনাও বাতিল করছে ডিএসইর বর্তমান কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডিএসইর সাবেক এমডি তারিক আমিন ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
গত চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা এখন খাদের কিনারায়। এই অস্থিরতার প্রভাবে কেবল খাদ্যাভ্যাস নয়, একটি সাধারণ পরিবারের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে চলে যায় বলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার মান ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে চরম আপস করে চলতে হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, বেপারি ও আড়তদারসহ অসংখ্য অংশীজন থাকায় খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে সবুজ মরিচের দাম বাড়ে ১১৬ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডাল ৭৮ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ। সরবরাহ চেইন যত দীর্ঘ হচ্ছে, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তত বেশি হচ্ছে। এই শৃঙ্খলে বিশেষ করে চালের বাজারে অটো রাইস মিলারদের পর্যায়েই মুনাফার হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা দরিদ্র শ্রেণির ওপরই পড়ছে। প্রকৃত মজুরি না বাড়ায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন সাধারণ মানুষকে সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করে চলতে হচ্ছে, যা দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ইনফ্লেইশন ডাইনামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য উচ্চ অবস্থানে থাকলে এবং দেশীয় জ্বালানি সরবরাহে চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতেও মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকতে পারে।” বিশেষ করে জ্বালানি ও কোর বা মূল পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির ধরনে এখন পরিবর্তন এসেছে। আগে কেবল খাদ্য পণ্যের দাম বাড়লে হাহাকার তৈরি হতো, তবে এখন জ্বালানি ও সেবা খাতগুলোও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বর্তমানে প্রোটিনজাত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি পরিবহন, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ সেবার ব্যয় বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। একইসঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও লুব্রিকেন্টের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত করলেও সম্প্রতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর স্বার্থে তা কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, নীতি সুদহার কমানোর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আইএমএফ ও এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছিই থাকতে পারে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে গবেষকরা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমিয়ে আনা, পাইকারি বাজারে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুতদারি রুখতে কঠোর নজরদারি এবং আধুনিক কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব, তাই কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের বাজার ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত নীতিগত সংস্কার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পের সক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এই বিশাল বাজারের অন্তত ১২ শতাংশ অংশীদারত্ব অর্জন করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তুলা-নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পোশাকশিল্প বর্তমানে দ্রুত গতিতে তুলাভিত্তিক পণ্য থেকে কৃত্রিম তন্তু বা সিনথেটিক তন্তুর দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি কৌশলের অংশ হিসেবে এই বর্ধিত বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতি ও পোশাকশিল্পের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার কার্যকর রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এমএমএফ কাঁচামালের শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করা জরুরি। পাশাপাশি দেশে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ও সিনথেটিক সুতা উৎপাদন সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলোকেও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ তুলাভিত্তিক হলেও বিশ্ববাজারের চাহিদা এখন সিনথেটিক ও মিশ্র তন্তুর পোশাকের দিকে সরে যাচ্ছে, যা এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম তন্তু খাতের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএফটিআই-এর বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার বিস্তার, বিশেষায়িত ঋণ কর্মসূচি এবং আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে অ্যাকটিভওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের হার ব্যাপক হ্রাস এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবাদে ভারতের পোশাক রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মতিলাল ওসওয়ালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকরা বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে প্রস্তাবিত ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণসংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত চার মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানিতে শুল্কের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে আসায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ভারতের শুল্ক ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মতিলাল ওসওয়াল জানিয়েছে, ‘মার্কিন শুল্ক কাঠামোর এই স্পষ্টতা পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের মনে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ও আনুষঙ্গিক দোকানের বিক্রি জুনে আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, যা শক্তিশালী গতি নির্দেশ করে।’ এই চাহিদার সুবাদে ভারতীয় উদ্যোক্তারা নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে, গত ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে ভারতের টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পোশাকের ওপর যুক্তরাজ্যের ৮ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা পাকিস্তান, তুরস্ক ও বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতের সক্ষমতা বাড়াবে। মতিলাল ওসওয়ালের মতে, ‘স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব কিছুটা ধীরে দেখা গেলেও আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতের শেয়ার ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার এক চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে এই চুক্তি।’
একইভাবে ২০২৭ সালে ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন এফটিএ কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারেও ভারতীয় পোশাক রপ্তানির ওপর থাকা ১০ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক উঠে যাবে। বর্তমানে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো চীন ও বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে, যা ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মতিলাল ওসওয়াল উল্লেখ করেছে, ‘ইইউ বর্তমানে প্রধানত চীন ও বাংলাদেশ থেকেই পোশাক সংগ্রহ করে, আর ভারত থেকে কেনে খুবই সামান্য—যা মূলত কয়েক দশকের শুল্ক-সংক্রান্ত স্থবিরতারই ফল। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো যখন চীন ও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে, তখন এই এফটিএ বাড়তি রপ্তানির বড় সুযোগ এনে দিচ্ছে। তবে আমেরিকার মতো একক কাঠামোর বাজারের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছুটা খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ায় এই বৃদ্ধির গতি হবে ধীর ও ধারাবাহিক।’
ভারতের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর শক্তিশালী ও সমন্বিত টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম স্পিনিং সক্ষমতার দেশ হিসেবে ভারত সুতা কাটা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিজস্ব উৎস থেকেই সম্পন্ন করতে পারে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল সরবরাহের সক্ষমতা বেশ সীমিত। চীন ও ভিয়েতনামও বর্তমানে কৃত্রিম তন্তু ও ইলেকট্রনিকস খাতের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে শুল্ক সুবিধা মিললেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতা এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ ভারতের চেয়ে কম হওয়ার কারণে নিটওয়্যার খাতে তারা কাঠামোগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটিতে শ্রমিকদের মজুরি ভারতের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম, যা মোট পোশাক উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ। এছাড়া রপ্তানির পরিধির দিক থেকেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় ৩৫ কোটি ডলারের বেশি হলেও ভারতের মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান এই মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছে।
মতিলাল ওসওয়াল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, মার্কিন বাজারে চাহিদার পুনরুত্থান এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির কল্যাণে ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে ভারতের বড় টেক্সটাইল রপ্তানিকারকদের রাজস্ব বার্ষিক প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এই লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ভারতকে বড় পরিসরে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জরুরি ভিত্তিতে নজর দিতে হবে।
বৈশ্বিক গাড়ি বিক্রির বাজারে টানা সাত বছর ধরে নিজেদের শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে জাপানের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর করপোরেশন। জাপান টুডে-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে ৫৩ লাখ ৯০ হাজার গাড়ি বিক্রি করেছে। এই অসামান্য সাফল্যের মাধ্যমে তারা তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানির ফক্সওয়াগনকে পেছনে ফেলেছে, যাদের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪১ লাখ ৩০ হাজার গাড়ি। শীর্ষস্থান বজায় রাখলেও বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় টয়োটার সামগ্রিক বিক্রিতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ পতন পরিলক্ষিত হয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রথম বড় ধাক্কা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীনের বাজারে চাহিদার নিম্নগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিই মূলত এই বিক্রয় হ্রাসের প্রধান কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লজিস্টিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় টয়োটার সরবরাহ ও উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার ফলে জাপান থেকে উক্ত অঞ্চলে রপ্তানি ৩৬ শতাংশ কমে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক বিক্রি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পেছনে চীনের বাজারে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ ধস বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে উত্তর আমেরিকার বাজারে হাইব্রিড গাড়ির জোরালো চাহিদার সুবাদে সেখানে বিক্রি দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে।
জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারেও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে টয়োটা। বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুচ্চালিত ও হাইব্রিড গাড়ির সম্মিলিত বিক্রি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২৭ লাখ ১০ হাজার ইউনিটে উপনীত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো শুধু বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) বাজার, যেখানে বিক্রি ২ দশমিক ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৯৩ হাজার ১৭২ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। এটি টয়োটার ব্যবসায়িক ইতিহাসে প্রথমার্ধের সর্বোচ্চ বিক্রির একটি নতুন রেকর্ড হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজারে টয়োটার এই অভাবনীয় সাফল্য প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এক বিশাল শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি চলছে। উত্তরে ব্যস্ত চট্টগ্রাম বন্দর, সামনে আধুনিক কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত বিমানবন্দর এবং দক্ষিণে আগামীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর—এই কৌশলগত বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ৭৮৩ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠছে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চলটিতে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে সরকার।
এই শিল্পাঞ্চলটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে এটি সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি দুটি প্রধান বন্দরের সঙ্গে সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে। দীর্ঘ এক দশকের নানা আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে গত সোমবার এই শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি) এই প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছে।
শিল্পাঞ্চলটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর নিজস্ব একটি বহুমুখী জেটি থাকবে, যেখানে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া কারখানার বর্জ্য শোধনে প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি), দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস সঞ্চালন লাইন এবং পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। পণ্য পরিবহনের সুবিধার জন্য ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীরের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে যে শিল্প-করিডর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, এই চীনা শিল্পাঞ্চল হবে তার মূল প্রাণকেন্দ্র। তবে এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। বর্তমানে কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের যে স্বল্পতা রয়েছে, এই শিল্পাঞ্চলটি সচল হলে তা দূর হবে এবং পণ্যবাহী যানের আনাগোনায় টানেলটি আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য থাকায়, এই দুটি বড় প্রকল্প একই সময়সীমার মধ্যে একে অপরের পরিপূরক হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রবিবারে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ব্যাপক আধিপত্য পরিলক্ষিত হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডের দাপটে বাজারে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পেলেও প্রধান সূচকে এক ধরনের মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। লেনদেনের সূচনালগ্নেই একাধিক মিউচুয়াল ফান্ড দর বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
লেনদেন চলাকালীন মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকলেও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলো বিপরীতমুখী আচরণ করায় সূচকের বড় উত্থান বাধাগ্রস্ত হয়। দিনশেষে ডিএসইতে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ১৪৯টির দাম হ্রাস পেয়েছে এবং ৪৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ৩২টির দর বেড়েছে এবং মাত্র একটির দর কমেছে।
কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো মানের ৯৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বেড়েছে এবং ৮৬টির কমেছে। মাঝারি মানের লভ্যাংশ প্রদানকারী ৪৩টি কোম্পানির দর বৃদ্ধি পেলেও ২৪টির দর হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ বা ‘জেড’ ক্যাটাগরির ৫৫টি কোম্পানির শেয়ার দর ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং ৩৯টির দাম কমেছে।
বাজারের সূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সামান্য বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে ডিএসই-৩০ সূচক ৩ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। এদিন বাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের তুলনায় ২১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা বেশি।
এদিন লেনদেনের শীর্ষে অবস্থান করছে মালেক স্পিনিং, যার ৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসিআই ফর্মুলেশন, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরি, বেক্সিমকো, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালটেন্টস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, কপারটেক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং সায়হাম কটন।
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১২৭টির দর বেড়েছে এবং ৬৬টির কমেছে। তবে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের কার্যদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে বিশেষ কর প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়কর আইন, ২০২৩-এর নতুন বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা আর্থিক সুবিধা পাবেন। আজ রবিবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে রাজস্ব প্রশাসন।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করলে ব্যক্তিশ্রেণির ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের করদাতারা প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ রেয়াত বা ছাড় পাবেন। তবে এই ছাড়ের সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে ২৫ হাজার টাকা। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কোনো ধরনের কর প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় করের অতিরিক্ত ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা—এই দুইয়ের মধ্যে যা বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হবে। একইভাবে ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যা বেশি হবে, সেই পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত কর হিসেবে প্রযোজ্য হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মনে করছে, সময়ের শুরুতে রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা দেওয়ার ফলে করদাতারা উৎসাহিত হবেন এবং দেশে কর পরিপালনের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে। এতে কর প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে সংস্থাটি বিশ্বাস করে।
উল্লেখ্য, গত ২২ জুলাই থেকে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের জন্য অনলাইন বা ই-রিটার্ন সেবা উন্মুক্ত করা হয়েছে। করদাতারা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই রিটার্ন জমা দিতে পারবেন এবং মোবাইল ব্যাংকিং বা কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে পারবেন। রিটার্ন দাখিলে কোনো ধরনের কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত অফিস চলাকালীন নির্ধারিত কল সেন্টারের মাধ্যমে সহায়তা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের পর কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে না বিধায় এনবিআর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন দাখিল করার জন্য করদাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে অবশেষে ব্যবসায়ী মহল থেকেই দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নারায়ণগঞ্জের প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক আজ রোববার সকালে মতিঝিলস্থ ফেডারেশন ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সংগঠনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। উল্লেখ্য যে, মো. ফজলুল হক এর আগে বিকেএমইএর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে আইসিসি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৬ জুলাই এক আদেশের মাধ্যমে মো. ফজলুল হককে ১২০ দিনের জন্য এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর আগে গত ২৭ জুন সাবেক প্রশাসক আবদুর রহিম খানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে এই পদটি শূন্য ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ধাপে ধাপে সরকারি কর্মকর্তারা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করলেও আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে তারা নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারেননি। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই একজন সফল ব্যবসায়ীকে এই পদে বসানোর দাবি জানানো হচ্ছিল যাতে করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন প্রশাসক মো. ফজলুল হক গণমাধ্যমকে জানান, “১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এফবিসিসিআইয়ের ব্যবসায়ী নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে সরকার যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটি পালন করতে যথাযথ চেষ্টা করব।” তিনি সংগঠনের সাধারণ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেছেন। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে এফবিসিসিআইয়ের গতিহীনতা কাটবে এবং দ্রুত একটি গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করছেন।
দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্প খাতে অর্থায়নের প্রবাহ আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ প্রদানের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিএমএসএমই ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। তবে ঋণ বিতরণে এই ইতিবাচক ধারা দেখা গেলেও আদায়ের ক্ষেত্রে কিছুটা মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য দ্বিতীয় প্রান্তিকে সিএমএসএমই খাতে মোট ৭০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ৬২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য যে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঋণ বিতরণে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থায়নের বড় অংশই সরবরাহ করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তাদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে ৫৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সিএমএসএমই খাতে মোট স্থিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের সামগ্রিক স্থিত ঋণের ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তবে ঋণ বিতরণে গতি এলেও আদায়ের চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই খাত থেকে ঋণ আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা কম। এর আগে প্রথম প্রান্তিকেও ঋণ আদায়ে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এই খাতের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তবে ঋণ আদায়ের শ্লথগতি কাটিয়ে উঠতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এই খাতে অর্থায়নের প্রধান উৎসহিসেবেতাদেরঅবস্থানআরওশক্তিশালীকরেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে চার শ কোটি টাকা পাওনা পরিশোধ না করেই নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পোল্যান্ডের আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড এলপিপি। দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে বকেয়া অর্থ আটকে রাখার পর গত ৩০ জুলাই এক চিঠির মাধ্যমে পোলিশ এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
চিঠিতে এলপিপি উল্লেখ করেছে যে, তারা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল পর্যালোচনা করছে এবং এই সময়কালে বাংলাদেশে সব ধরনের নতুন ক্রয়াদেশ ও পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে তারা পোশাক সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোনো বিকল্প দেশে উৎপাদনের সুযোগ খোঁজার বিষয়েও ইঙ্গিত দিয়েছে। মূলত পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশের রপ্তানিকারক ও বায়িং হাউসগুলো আইনি প্রক্রিয়া শুরু করায় এলপিপি এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে সব মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এই বিরোধের সূত্রপাত হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। সে সময় সরাসরি ব্যবসায়িক জটিলতা এড়াতে এলপিপির গ্যারান্টিতে ‘এফইএস রিটেইল’ নামক একটি রুশ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পোশাক সরবরাহ করেছিল বাংলাদেশের অন্তত ৪০টি কারখানা। তবে পণ্য পৌঁছানোর পর দীর্ঘ দেড় বছর পার হলেও কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। সম্প্রতি এলপিপি ওই রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সরাসরি দেনা-পাওনার সম্পর্ক অস্বীকার করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এলপিপি বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পোশাক সংগ্রহ করে থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা মালিকদের সাথে জরুরি বৈঠক করেছে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পাওনা পরিশোধ না করলে এলপিপিকে বাংলাদেশে কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির এই অনিয়মের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা গত দেড় বছর ধরে পাওনা চেয়ে বারবার যোগাযোগ করলেও কোনো ইতিবাচক ফল পাননি। এক পর্যায়ে এলপিপি বকেয়া অর্থের ৫০ শতাংশ ছাড়ের প্রস্তাব দিলেও তা স্থানীয় কারখানাগুলোর জন্য মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। বর্তমানে এই অচলাবস্থার কারণে বহু কারখানায় বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক ও কাঁচামাল অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে, যা সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। মূলত পাওনা না মেটানোর একটি অপকৌশল হিসেবেই এলপিপি এই একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
চীনা ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি-র বিশ্বব্যাপী বিক্রয় প্রবৃদ্ধি জুলাই মাসে টানা তৃতীয় মাসের মতো অব্যাহত রয়েছে। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কিছুটা স্থবির থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এই অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত বিওয়াইডি-র আনুষ্ঠানিক বিবৃতির ভিত্তিতে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, গত জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪,১৯,২১১টি গাড়ি বিক্রি করেছে। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৮ শতাংশ বেশি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বিওয়াইডি-র রপ্তানি চিত্র। জুলাই মাসে যাত্রীবাহী গাড়ি এবং পিকআপ ভ্যানের বিদেশের বাজারে সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ১২৪.৩ শতাংশ বেড়ে ১,৭৯,৮৪১ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। মূলত শক্তিশালী বৈশ্বিক চাহিদাই চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে কোম্পানিটিকে সহায়তা করেছে।
চলতি বছরের মে মাস থেকেই বিওয়াইডি-র বিক্রির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশবান্ধব গাড়ির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ এবং বিওয়াইডি-র সাশ্রয়ী ও উন্নত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।
উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আরও ৪৩টি চীনা প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার মার্কিন সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে খাদ্য ও ধাতু শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।
এই কোম্পানিগুলোকে ‘উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট এনটিটি লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের বিধান অনুযায়ী, তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যগুলো বাধ্যতামূলক শ্রমে তৈরি বলে ধরে নেওয়া হয়। আমদানিকারকরা যদি অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে এটি ভুল প্রমাণ করতে না পারেন, তবে ওইসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পায় না। তবে বেইজিং জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম বা অন্য কোনো নির্যাতনের অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ প্রকাশিত এই বিজ্ঞপ্তিতে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই তালিকায় যুক্ত করা হলো। এর ফলে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ১৮৭-এ দাঁড়িয়েছে, যা ২০২১ সালে এই আইন কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত একক বৃহত্তম সম্প্রসারণ।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে একে ভিত্তিহীন ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা হিসেবে অভিহিত করেছে। মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের বাণিজ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ‘গঠনমূলক ভিডিও কল’ হওয়ার মাত্র একদিন পরই এই ঘোষণা এলো। চীন তার কোম্পানিগুলোর সুরক্ষায় “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” গ্রহণ করবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
মার্কিন সরকারের দাবি অনুযায়ী, চারটি কোম্পানি উইঘুর ও অন্যান্য নির্যাতিত গোষ্ঠীকে নিয়োগ বা স্থানান্তরের কাজে জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। এছাড়া বাকি ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকায় যুক্ত করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, তারা জিনজিয়াংয়ের বিভিন্ন সরকারি শ্রম কর্মসূচির সাথে যুক্ত উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে থাকে। হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়নার চেয়ারম্যান জন মুলেনার এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আজকের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ক্রীতদাসদের শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।”
ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস এসব অভিযোগকে “একটি মিথ্যা” বলে অভিহিত করেছে। তারা দাবি করেছে, চীনা আইন অনুযায়ী জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ এবং জিনজিয়াংয়ের কর্মীরা তাদের পেশা নির্বাচনে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ইলেকট্রিক গাড়ি ও জ্বালানি সঞ্চয়কারী ব্যাটারির কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও রয়েছে। রয়টার্স এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য নতুন তালিকাভুক্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করলেও ব্যবসায়িক সময়ের বাইরে হওয়ায় কারো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এসডিআইসি জিনজিয়াং লিথিয়াম ইন্ডাস্ট্রি এবং তাদের মূল প্রতিষ্ঠান এসডিআইসি জিনজিয়াং লুওবুপো পটাশ। এছাড়া লিথিয়াম ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক জিনজিয়াং তিয়ানহংজি টেকনোলজিও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। অন্যদিকে, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স ও শিল্প যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ইলেকট্রোলাইটিক ক্যাপাসিটর নির্মাতা হুনান আইহুয়া গ্রুপকেও তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন শু শিয়ং। গত শনিবার (১ আগস্ট) থেকে তাঁর এই নিয়োগ কার্যকর হয়েছে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তিনি এরিক এম. ওয়াকারের স্থলাভিষিক্ত হলেন, যিনি বিগত ছয় বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শেভরন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শেভরন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার আগে শু শিয়ং শেভরন চায়নার ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠানের আপস্ট্রিম বাণিজ্যিক কার্যক্রম, জ্বালানি মূল্য শৃঙ্খল এবং একাধিক যৌথ উদ্যোগ পরিচালনা করেছেন। ২০০৭ সালে শেভরনে যোগদানের পর থেকে তিনি কৌশল নির্ধারণ, ব্যবসায়িক পূর্বাভাস, ট্রেডিং ও পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীর্ঘ পেশাদার জীবনে তিনি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী পরামর্শ প্রদান, নতুন বাণিজ্যিক ক্ষেত্র তৈরি এবং অংশীদারদের সাথে বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উচ্চশিক্ষায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গণমাধ্যম সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।