বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে গতি হারাচ্ছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই)। চলতি ২০২৩ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) এ খাতের অধিকাংশ কোম্পানির আয় কমার পাশাপাশি ব্যয় বেড়েছে। এতে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফায় ভাটা পড়েছে। একদিকে ঋণের বিপরীতে সুদহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া, অন্যদিকে খেলাপি ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে কোম্পানিগুলোর ভবিষৎ সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১০টি এনবিএফআই প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছর ও চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, সমাপ্ত হিসাব বছরের তুলনায় চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে অধিকাংশ কোম্পানির আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। তা ছাড়া এ সময়ে কোম্পানিগুলোর খেলাপি ঋণের বোঝাও বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেন, আলোচ্য সময়ে অধিকাংশ কোম্পানির খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আর খেলাপি ঋণ বাড়লে এমনিতেই স্প্রেড হার কমে যায়। পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিগুলোর তহবিল ব্যয়ও কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতের টাকার অবমূল্যায়নজনিত কারণেও এ সময়ে আমানতের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্রাহকদের উচ্চহারে সুদ দিয়ে রাখতে হচ্ছে। এসব কারণেও মূলত চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে অধিকাংশ কোম্পানির মুনাফা কমেছে।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্য থেকে কোম্পানিটির সার্বিক ব্যয় হয়েছে ৭২ দশমিক ১০ শতাংশ। এ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির কর পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে হয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যেখানে ২০২২ পূর্ণ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ১৯২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছিল ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে হয়েছিল ৩০ কোটি ৫০ লাখ।
প্রথমার্ধে মুনাফা কমার কারণ হিসাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ সময়ে তাদের ঋণের বিপরীতে নিট সুদ আয় কমেছে। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকেও এ সময়ে আয় কমেছে। এ কারণে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরে ডিবিএইচ ফাইন্যানন্সের মোট আয় হয়েছিল ৫১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। এ হিসাব বছরে কোম্পানির নিট মুনাফা ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমে হয়েছিল ১০৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছিল ২৯৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ সময়ে নিট মুনাফা ১২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কমে হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয়ের থেকে ব্যয় ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি হয়েছিল। তবে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বাড়ায় এ সময়ে কোম্পানিটির কর পরবর্তী নিট লোকসান ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে হয়েছে ৩১ কোটি টাকা। যেখানে ২০২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর আয়ের থেকে ব্যয় ৩১ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি হয়েছিল। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট লোকসান আগের বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে হয়েছিল ১৭২ কোটি ১০ লাখ টাকা।
৩০ জুন সমাপ্ত ২০২১-২২ হিসাব বছরে আইসিবি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের মোট আয় হয়েছিল ১ হাজার ৬৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। এ হিসাব বছরে কোম্পানির নিট মুনাফা ২৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ১৪৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২-২৩ চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছে ৮৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৪৯ শতাংশ। আর নিট মুনাফা ৬৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে হয়েছে ৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। আলোচ্য তিন প্রান্তিকে মুনাফা কমার কারণ হিসাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ সময়ে তাদের ক্যাপিটাল গেইন, ঋণের বিপরীতে সুদ আয় ও লভ্যাংশ আয় উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে। এজন্য কোম্পানির নিট মুনাফাও কমেছে।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছে ৬৬৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৪৯ দশমিক ১০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির নিট মুনাফা ২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে হয়েছে ৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা। যেখানে ২০২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ১ হাজার ২৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৯ শতাংশ কমে হয়েছিল ১৯১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে তাদের ঋণের বিপরীতে সুদ আয় কমেছে। এ ছাড়া তাদের বিনিয়োগ আয় এবং কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ আয় কমার পাশাপাশি অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির মুনাফায় ভাটা পড়েছে।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর মোট আয় হয়েছিল ১৪৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ আয়ের থেকে কোম্পানিটির ব্যয় ৩১ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি হয়েছিল। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট লোকসান আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ কমে হয়েছিল ১৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয়ের থেকে ব্যয় ১৪ শতাংশ বেশি হয়েছিল। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে কোম্পানিটির কর পরবর্তী নিট লোকসান ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬১ কোটি ১০ লাখ টাকা।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে আইপিডিসি ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছে ৩৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৭৮ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে হয়েছে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যেখানে ২০২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ৭৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছিল ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে তাদের আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ব্যয় বেশি হয়েছে। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটিকে ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এসব কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছিল ৯৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬১ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ হিসাব বছরে আগের হিসাব বছরের তুলনায় কোম্পানির নিট মুনাফা ৪৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে হয়েছিল ৬৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। আর চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছিল ৪৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬১ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ সময় নিট মুনাফা ৪৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে হয়েছে ৩১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ দ্বারা সুদ হার বেধে দেয়ার করণে চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে তাদের সুদ আয় কমেছে। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে তাদের সম্পদের গুণগত মান অবনতি হওয়ায় এ সময় সঞ্চিতি বাড়াতে হয়েছে। পাশাপাশি লেনদেন কম হওয়ায় আলোচ্য সময়ে তাদের কমিশন, এক্সচেঞ্জ এবং ব্রোকারেজ আয় কমেছে। এসব কারণে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেনন্টের মোট আয় হয়েছে ৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৩২ দশমিক ৭০ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিটির নিট মুনাফা ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে হয়েছে ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা। যেখানে ২০২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ১৫৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। হিসাব বছরটিতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কোম্পানি সচিব সারওয়ার কামাল দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুসারে ব্যয় সাশ্রয়ের পথ অনুসরণ করছি। আলোচ্য সময়ে আমাদের ব্যয় কিছুটা কমেছেও। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে আসলে ব্যয় কমানোটা অনেকটা কষ্টকর। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনেই আমাদের ঋণের ওপর সুদহার কমাতে হয়েছে। পাশাপাশি আমানতের বিবরণীতে গ্রাহক ধরে রাখার স্বার্থেই কিছুটা বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। এসব কারণে চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে আমাদের মুনাফা কমেছে।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরে ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের মোট আয় হয়েছিল ২৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৭১ শতাংশ। এ হিসাব বছরে আগের হিসাব বছরের তুলনায় কোম্পানির নিট মুনাফা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমে হয়েছিল ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছিল ১১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৮০ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ সময় কোম্পানির নিট মুনাফা ৬৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে হয়েছে ১ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে মুনাফা কমার প্রধান কারণ হিসাবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ সময় ব্যয় বৃদ্ধির চাপে তাদের পরিচালন আয় উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে। এতে তাদের নিট মুনাফায় ভাটা পড়েছে।
দেশে ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল টাস্কফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’ গঠন করেছে সরকার। এই টাস্কফোর্সের প্রধান লক্ষ্য হলো বিদ্যমান সকল জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
টাস্কফোর্সের কাঠামো অনুযায়ী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে পরিবেশমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের। এছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারীকেও এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, নৌপরিবহন সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এবং রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজকে (আরজেএসসি) সদস্য করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এফবিসিসিআই, এফআইসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতিদেরও এই টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
টাস্কফোর্সের কার্যপরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূলত ব্যবসা সহজীকরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের রোডম্যাপ অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের গতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। লাইসেন্স প্রাপ্তি, বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের সমস্যা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র পাওয়ার ধাপগুলো সহজ করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করবে এই কমিটি। এছাড়া সরকারি সেবায় ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ও স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে হয়রানি কমানোর নীতিগত দিকনির্দেশনাও দেবে এই টাস্কফোর্স।
ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যকার আন্তঃজটিলতা দ্রুত নিরসন করবে এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ এবং কাজ সম্পাদনে বিলম্বের বিষয়গুলো সরাসরি তদারকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে। প্রতি তিন মাস অন্তর টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমুখী করার লক্ষে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) আয়োজিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টে (আরসিইপি) সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত সময় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন কামনা করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরসিইপি সদস্যপদ লাভের জন্য গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম তুলে ধরা হয় এবং এই আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ব্লকের সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রভাব ও সমর্থন প্রার্থনা করা হয়।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকাল বৃদ্ধি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর যে আবেদন বাংলাদেশ জাতিসংঘে পেশ করেছে, তার সপক্ষে নিউজিল্যান্ডের জোরালো সমর্থন চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই অতিরিক্ত সময় এলডিসি-পরবর্তী টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে একটি কার্যকর প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এছাড়া, দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়েও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তা বাজার নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধজাত ও কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই এফটিএ বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
সহযোগিতা আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠন এবং এফটিএ আলোচনার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসাথে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজলভ্য ও গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই পদ্ধতিতে সব ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তঃব্যাংক চার্জ বা ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ক্যাশলেস পেমেন্টে উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে জারিকৃত নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধে কোনো আন্তঃপ্রতিষ্ঠান মাশুল কার্যকর থাকবে না। এর আগে এই ধরনের লেনদেনে ১ শতাংশ বা তার বেশি মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বহাল ছিল, যার একটি অংশ গ্রাহকের ব্যবহৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করতে হতো। আন্তঃব্যাংক এই সার্ভিস চার্জ শূন্য করার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ গ্রহণ করা তাদের জন্য আরও সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনতে যে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে, সেই অর্থ সরাসরি ব্যবসায়ীদের হাতে না গিয়ে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানসমূহ লাভ করবে। প্রতিটি যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অংকের ওপর ভিত্তি করে এই প্রণোদনা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টকে কিউআর সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা একুয়াইরিং ব্যাংক লেনদেনের ০.১০ শতাংশ এবং গ্রাহকের ব্যবহৃত অ্যাপ প্রদানকারী বা ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ হারে অর্থ পাবে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট যোগ্য লেনদেনে সর্বমোট ০.৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে, যার সুফল ব্যবসায়ীরা কম মাশুল প্রদানের মাধ্যমে ভোগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
‘বাংলা কিউআর’ মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবর্তিত একটি একক ও সর্বজনীন কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা, যা অংশগ্রহণকারী সকল ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপের মধ্যে আন্তঃসংযুক্ত। এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক যেকোনো অ্যাপ ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করেই কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। ফলে ব্যবসায়ীদের এখন আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কোড রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। গত ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই নগদনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই প্রণোদনা সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছে। কোনো বড় অংকের লেনদেনকে কৃত্রিমভাবে ভেঙে ছোট ছোট একাধিক লেনদেনে রূপান্তর করা বা ‘ট্রানজেকশন স্ট্রাকচারিং’ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যর্থ হওয়া, বাতিল, রিফান্ড বা বিতর্কিত কোনো লেনদেনের বিপরীতে কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে না। কোনো মার্চেন্টের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রণোদনার অর্থ ফেরত নেওয়া বা পরবর্তী বরাদ্দের সাথে সমন্বয় করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। এতে নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হওয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ ক্রেতারা নগদ টাকা বহনের ঝামেলা ছাড়াই কেনাকাটা করতে পারবেন এবং ছোট দোকানদারদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে শুকনো মরিচের আমদানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসেই এই বন্দর দিয়ে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ হাজার ৩৩৫ টনেরও বেশি শুকনো মরিচ বেশি আমদানি করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। মূলত দেশের মসলা বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই আমদানিকারকরা এই পণ্যটি আমদানিতে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
ভোমরা কাস্টম হাউজের রাজস্ব শাখার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে এই স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ টন শুকনো মরিচ দেশে এসেছে। এই আমদানিকৃত পণ্যের মোট মূল্য ১৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে ৪ হাজার ৩১ টন শুকনো মরিচ আমদানি করা হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ১১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবার এক মাসেই অতিরিক্ত ১ হাজার ৩৩৪ টন মরিচ আমদানি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে তাদের আমদানির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থলবন্দরে শুকনো মরিচের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও সাতক্ষীরার স্থানীয় খুচরা বাজারগুলোতে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। দেখা গেছে বিভিন্ন খুচরা পর্যায়ে এখনো প্রতি কেজি শুকনো মরিচ ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, যা এক মাস আগের দামের সাথে অপরিবর্তিত। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আমদানি ও সরবরাহ বাড়লেও পাইকারি পর্যায়ে দাম না কমায় খুচরা বাজারে দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে পর্যাপ্ত আমদানির পরেও দাম স্থির থাকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের শেয়ারবাজারে বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর অভাবনীয় দাপট লক্ষ্য করা গেছে। বিমা কোম্পানিগুলোর এই ইতিবাচক প্রবণতার প্রভাবে টানা দুই দিনের ঢালাও দরপতন থেকে বেরিয়ে এসেছে পুঁজিবাজার। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই আজ মূল্যসূচকের পাশাপাশি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে।
দিনের শুরু থেকেই ডিএসইতে বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। লেনদেনের শুরুতে বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল মনে হলেও শেষভাগে বিমার পাশাপাশি অন্যান্য খাতের কোম্পানিগুলোও দাম বাড়ার তালিকায় যোগ দেয়। দিনশেষে ডিএসইতে ১৯৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ১২৯টির দাম কমেছে এবং ৬৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। বিশেষ করে বিমা খাতের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৩টিরই শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা বাজারকে পতনের বৃত্ত থেকে টেনে তুলতে সহায়ক হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতের চিত্রও ছিল ইতিবাচক; ২০টি ফান্ডের দাম বেড়েছে।
সূচকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৪৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৭৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক দশমিক ৬০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৭৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সূচক বাড়লেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ গত কার্যদিবসের তুলনায় ৫৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা কমে ৯০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বেক্সিমকো, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও স্থান করে নিয়েছে এমএল ডাইং, ব্র্যাক ব্যাংক এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৫টির শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং ৯৯টির দাম কমেছে। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় বেড়ে ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডিএসইতে ১২০টির শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৫১টির দাম কমেছে।
দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে প্রবর্তিত ‘বাংলা কিউআর’ পদ্ধতিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। গত ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক হওয়া এই ব্যবস্থায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ লাখ বার কোড স্ক্যান করে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। লেনদেনের এই ক্রমবর্ধমান হার সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং প্রচলিত অভ্যাসের পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে। গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে প্রায় ১৭ লাখ লেনদেনের মাধ্যমে ৪৮৭ কোটি টাকা আদান-প্রদান করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতিটি লেনদেনের গড় আর্থিক মূল্য ছিল ২ হাজার ৮৬৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি আধুনিক ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা কিউআরের এই দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হওয়ায় গ্রাহকেরা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাপ ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারছেন।
ডিজিটাল এই পদ্ধতির প্রসারের ফলে শুধু নিরাপদ ও সহজ লেনদেনই নিশ্চিত হচ্ছে না, বরং এটি সার্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও জাল টাকার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নতুন মুদ্রা ছাপানোর পেছনে সরকারের বিপুল ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে সাধারণ ও ক্ষুদ্র কেনাকাটায় এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একটি একক কিউআর কোড ব্যবহারের সুবিধার কারণে দোকানদারদের এখন আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কোড রাখার প্রয়োজন পড়ছে না, যা ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভিড়ের সময় ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেনকে ত্বরান্বিত করে এবং নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার ঝামেলা কমিয়ে দেয়। খুচরা টাকা দেওয়া বা পাওয়ার সমস্যার সমাধান হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই সময় সাশ্রয় হচ্ছে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের ওপর আরোপিত চার্জ এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজনীয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে স্বল্প মুনাফায় পরিচালিত ছোট দোকানগুলোর জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্যের এই ধারা বজায় থাকলে এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তঃব্যবহারযোগ্যতার সুবিধার কারণে গ্রাহকরা এখন নির্দিষ্ট কোনো সেবাদাতার ওপর নির্ভরশীল না থেকে যেকোনো পেমেন্ট অ্যাপ দিয়ে অনায়াসেই অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন। সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক আর্থিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি এবং অন্যান্য শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক ডেবিট, প্রিপেইড বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে। আজ সোমবার (১০ আগস্ট) কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকসমূহ এখন থেকে শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই বিশেষ কার্ড ইস্যু করতে পারবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন ফি পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, শিক্ষা খাতের এই বিশেষ লেনদেনকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এটি নিয়মিত ভ্রমণ কোটা বা প্রচলিত অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক কার্ডটি শিক্ষার্থীর নিজের নামে অথবা তাঁর অভিভাবক বা যিনি শিক্ষার যাবতীয় ব্যয় বহন করছেন, তাঁর নামে ইস্যু করা যাবে। তবে এডি ব্যাংকগুলোকে কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় নিয়ন্ত্রক আনুষ্ঠানিকতা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এই কার্ডের মাধ্যমে শুধুমাত্র অনুমোদিত শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয়ই পরিশোধ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল এডি ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে যাতে তারা প্রতিটি লেনদেনের যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ করে এবং নির্ধারিত পারপাস কোড ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেয়। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে এবং হুন্ডির মতো অবৈধ পথে অর্থ লেনদেনের প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের বিখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমব্রায়ের (Embraer) চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দুর্দান্ত ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেছে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে কোম্পানিটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি নিট মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। সোমবার প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ১১১ কোটি রিয়াল বা ২১৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব বা আয় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৩৪ কোটি রিয়ালে পৌঁছেছে, যা এমব্রায়েরের ইতিহাসে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের জন্য একটি নতুন রেকর্ড।
মূলত বিশ্ববাজারে আধুনিক বিমানের চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এমব্রায়ের এই শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। মুনাফা ও রাজস্বের পাশাপাশি কোম্পানিটির কর ও সুদপূর্ব আয় বা ইবিআইটিডিএ (EBITDA) গত বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেড়ে ১৮১ কোটি রিয়ালে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিমানের আন্তর্জাতিক বাজারে বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো জায়ান্টদের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করছে ব্রাজিলের এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। রেকর্ড পরিমাণ আয়ের এই খবর প্রকাশের পর বিশ্ব পুঁজিবাজারেও কোম্পানিটির শেয়ারের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সোমবার বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর খবরে অপরিশোধিত তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে চলতি সপ্তাহে প্রকাশ হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে নজর রাখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ইউরোপের প্রধান সূচক স্টক্স ৬০০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার ০.২ শতাংশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকের ফিউচার ০.৪ শতাংশ বেড়েছে।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
এশিয়ার শেয়ারবাজারও সোমবার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আগের সপ্তাহে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় জাপানের নিকেই সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
বৈশ্বিক শেয়ারের এমএসসিআই সূচকও সোমবার দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারের পরবর্তী বড় অনুঘটক হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইকে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, জুলাইয়ে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। জুনে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা জুনে ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
জেফরিজের জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার বলেন, "আমরা এ বছর ফেডের পক্ষ থেকে কোনো সুদহার বৃদ্ধির পূর্বাভাস রাখছি না। মূল বিষয় হবে এ সপ্তাহের মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন।"
তার মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকলে এবং বর্তমান পর্যায় থেকে আরও কমে এলে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নিয়ে বাজারের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে। ফেড ফিউচার বাজারে সেপ্টেম্বরে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন প্রায় ৪৫ শতাংশ ধরা হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৬৭ শতাংশ।
শক্তিশালী আয়েও চাঙা শেয়ারবাজার
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন কোম্পানির শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল। ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকদের হিসাবে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানির ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের বিনিয়োগ আয় বাদ দিলে শেয়ারপ্রতি আয় গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর ৭৬ শতাংশ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
জেপিমরগ্যানের কৌশলবিদরা ২০২৬ সালের জন্য এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর শেয়ারপ্রতি আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৩৬৫ ডলার করেছেন, যা বার্ষিক ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে সূচকটির লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার পয়েন্ট করা হয়েছে। সোমবার সূচকটি ৭ হাজার ৭৫৮ পয়েন্টে ছিল।
চলতি সপ্তাহে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল প্রকাশের চাপ কিছুটা কম থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস, নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম নির্মাতা সিসকো এবং ক্লাউড অবকাঠামো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কোরউইভের ফলাফলের দিকে নজর থাকবে।
এদিকে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৬৪৩ শতাংশে নেমেছে। চলতি সপ্তাহে বাজারে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ট্রেজারি বন্ড ইস্যু হতে পারে বলে বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। ইউরোর দর সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি, ১ ইউরোতে ১ দশমিক ১৫৬ ডলার ছিল। অন্যদিকে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলার দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৮ দশমিক ৪৮ ইয়েনে উঠেছে। তবে বাজারে জাপানি কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাইয়ের বৈঠকের মতামতের সারসংক্ষেপে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এতে প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরে সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।
নতুন করে শুল্ক পরিবর্তনের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই পণ্য আমদানি করায় জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে কনটেইনারে পণ্য আমদানি বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেসকার্টেস সিস্টেমস গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রবন্দরগুলোতে ২০ ফুট সমতুল্য ইউনিট বা টিইইউ হিসেবে ২৫ লাখ কনটেইনার পণ্য ওঠানামা করেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে এটি জুলাইয়ের চতুর্থ সর্বোচ্চ আমদানি।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের প্রায় রেকর্ড আমদানির তুলনায় এবার আমদানি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ডেসকার্টেসের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। তারপরও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে।
নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য দেশে আনার চেষ্টা করায় জুলাইয়ের আমদানিতে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে বৈশ্বিক আমদানির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ ‘সেকশন ১২২’ শুল্কের মেয়াদ শেষ হয়। পরে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়। এসব দেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
জুলাইয়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কনটেইনারে পণ্য পাঠানোর পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটি থেকে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ১২৯ টিইইউ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে, যা এক বছরের মধ্যে চীনের সর্বোচ্চ মাসিক চালান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর বিভিন্ন শুল্ক আরোপ করলেও কনটেইনারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী।
যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার আমদানির প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত দেশটির বড় খুচরা বিক্রেতারা। শরৎ ও শীতকালীন ছুটির মৌসুমকে সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত বছরের এই সময়ে আমদানি বাড়ায়। তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় একের পর এক অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মৌসুমি আমদানির সময়সীমা আরও দীর্ঘ হচ্ছে এবং আগেভাগেই পণ্য আনা হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারি, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল শুল্কনীতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি, পানামা খালে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি বিধিনিষেধ এবং লোহিত সাগরে চলমান সংকটও আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলছে।
ডেসকার্টেস সিস্টেমস গ্রুপ জানিয়েছে, এসব ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে পরিবহন ব্যয়, জাহাজ চলাচলের রুট এবং পণ্য সংগ্রহের কৌশলে পরিবর্তন আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের সামনে শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আগামী দিনেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৭২৮ কোটি বা ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি। একই সময়ে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইও ১৫ শতাংশ কমেছে।
‘ট্রাম্প শুল্ক’সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে অর্থবছরের শেষ দিকে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বড় হয়েছে। এর আগে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
সাম্প্রতিক দুই অর্থবছরে ঘাটতি কমার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও তা বড় আকারে বেড়েছে। গত জুনে ৭১৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭৪ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। বিপরীতে ওই মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪২০ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে অর্থবছরের শেষ মাসের আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছিল তৎকালীন সরকার। এতে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতিও নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত ছিল এবং ঘাটতি দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবেও বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ বা ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর আগে জুলাই-আগস্ট সময়ে এই হিসাবে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। শুধু জুলাই মাসেই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে বাংলাদেশ বড় ধরনের উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরের শুরুতে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা যায়। ডিসেম্বর শেষে অর্থবছরের প্রথমার্ধে তা বেড়ে ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। নয় মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও বড় উদ্বৃত্ত ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হিসাবে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামগ্রিক লেনদেনে ৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিট ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই পেয়েছে। আগের অর্থবছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের এই ভারসাম্যহীনতা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজিল্যান্ডের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। কৃষি প্রযুক্তি, দুগ্ধশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধ ও চামড়াশিল্পের মতো অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে নিউজিল্যান্ডের যৌথ বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউজিল্যান্ড ট্রেড অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ (এনজেডটিই) এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের নানাবিধ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, এনজেডটিই’র দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বাজার ব্যবস্থাপক র্যাচেল ম্যাকগাকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য চলমান রয়েছে, যার মধ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানিই প্রধান। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে নিউজিল্যান্ডে প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়, যার সিংহভাগই তৈরি পোশাক। এই বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে বাংলাদেশ অ-পোশাক পণ্য যেমন: ওষুধ, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাজার সম্প্রসারণে নিউজিল্যান্ডের সহযোগিতা চেয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন ও সাশ্রয়ী মূল্যে তা সরবরাহের সক্ষমতার বিষয়টি নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশাল আইটি জনশক্তিকে নিউজিল্যান্ডের ফিনটেক ও ডিজিটাল সেবা খাতের সাথে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে কারখানা স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে, যা তাদেরকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণে বিশেষ সুবিধা দেবে।
এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন এবং নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি করা। এছাড়া উভয় দেশ দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়ী পরিষদ গঠন এবং নিয়মিত বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সোমবার ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা এবং সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার ঘটনায় তেলের বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
রয়টার্স-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার লেনদেনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯১ সেন্ট বা ১.০৯ শতাংশ বেড়ে ৮৪.৪৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৬১ সেন্ট বা ০.৭৮ শতাংশ বেড়ে ৭৮.৭৯ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ধোঁয়াশা
গত সপ্তাহে আশা করা হয়েছিল যে, ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়া হবে। এই প্রত্যাশায় তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ কমেছিল। উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
তবে রোববার ইরান জানিয়েছে, ওমানের সাথে নতুন শিপিং লেন নির্ধারণের চুক্তিটি ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ থাকলেও এখনই এটি খুলছে না। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটনকে আগে ইরানের ওপর চালানো হামলার ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি লঙ্ঘন করায় তাদের সাথে কোনো আলোচনায় বসবে না তেহরান।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, "বিনিয়োগকারীরা এখন আলোচনার টেবিলে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, বরং বাস্তব প্রমাণ খুঁজছেন। যতক্ষণ না ট্যাঙ্কার চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ তেলের বাজারে এই চড়া দাম বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।"
সৌদি আরবে হামলা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
তেলের দাম বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা। ইয়েমেনের ইরান-পন্থি হুতি বিদ্রোহীরা রোববার সৌদি আরামকোর ‘জিজান’ শোধনাগারে হামলা চালানোর দাবি করেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আডনক’ (ADNOC) জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অন্তত ১৫টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।