মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে বেসামাল অবস্থা। দীর্ঘ সময় ধরে চাপে আছে নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় সংখ্যক মানুষ। বিনিয়োগেও কাটছে না খরা। মুদ্রাবাজারে অস্থিরতায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এমন এক বাস্তবতায় ব্যাংকে বেড়েছে সঞ্চয়। কোটিপতির ঘরে নাম লিখিয়েছেন বেশ কয়েকজন আমানতকারী। অর্থাৎ সংকট থাকলেও দেশে বেড়েছে কোটিপতির সংখ্যা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে কোটি টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৬০৮টি হিসাব। এ সময়ে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ১৯২টি। এসব হিসাবে মোট আমানত ১৬ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি, যাদের আমানতের পরিমাণ ৭ লাখ ৩১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা; যা ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের প্রায় ৪৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতকারী হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৪টি। এসব হিসাবে মোট আমানত ছিল ১৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি, যাদের আমানতের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ৩ হাজার ৬০৮টি । আর আমানত বেড়েছে ৫৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা।
অর্থনীতিতে যখন সংকট চলে, আয়ের পথ সংকুচিত হয়, তখন একশ্রেণির মানুষের হাতে অর্থবিত্ত বেড়ে যাওয়া সুখের লক্ষণ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাজারে জিনিসপত্রের দাম চড়া। পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব খাতেও খরচ বেড়েছে। এতে অনেক মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ দৈনিক বাংলাকে বলেন, সমাজে বৈষম্য থাকা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী। মানুষের আয় না বাড়ার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতেই হিমশিম অবস্থা। এই সময়েও দেশের একটি শ্রেণির মানুষের আয় বেড়ে যাওয়ার অর্থ উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি মানে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। এটাই অর্থনৈতিক বৈষম্য। যে কারণে দেশে কোটি টাকার আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক হিসাবও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।
কোন অ্যাকাউন্টে কত জমা
বাংলাদেশ ব্যাংক ১০টি ক্যাটাগরিতে কোটি টাকার আমানতকারীদের হিসাব করেছে। ছয় মাসে এক কোটি এক টাকা থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৬০৫টি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে এই আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮৭ হাজার ১৬৭টি। জুন শেষে সেটা বেড়ে হয়েছে ৮৯ হাজার ৭৭২টি। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। পাঁচ কোটি এক থেকে ১০ কোটির মধ্যে রয়েছে ১২ হাজার ২৪৫টি হিসাব। এসব অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ ৮৬ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ৫ কোটি ১ টাকা থেকে ১০ কোটির মধ্যে অ্যাকাউন্ট ছিল ১১ হাজার ৯৪৫টি। তাদের হিসাবে জমার পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ১০ কোটি ১ থেকে ১৫ কোটি টাকার ৪ হাজার ৮১টি অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ ৪৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ১৫ কোটি ১ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে ১ হাজার ৮৬৫টি অ্যাকাউন্টে আমানত ৩৩ হাজার ১৪১ কোটি টাকা।
২০ কোটি ১ থেকে ২৫ কোটি টাকার মধ্যে অ্যাকাউন্ট ১ হাজার ২৭৬টি, এসব অ্যাকাউন্টে ২৮ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। ২৫ কোটি ১ থেকে ৩০ কোটির ৯০৯টি অ্যাকাউন্টে আমানত ২৫ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। এর বাইরে ৩০ কোটি ১ থেকে ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ৫০৭টি অ্যাকাউন্টে আমানত ১৬ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা এবং ৩৫ কোটি ১ থেকে ৪০ কোটির মধ্যে ৩৫৩টি হিসাবে ১৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা রয়েছে।
৪০ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ৭২২টি। এসব অ্যাকাউন্টে আমানত ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা ব্যক্তির সংখ্যা ১ হাজার ৮২৪টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব হিসাবে আমানত ২ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রাখা হিসাব সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৬২টি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটি টাকার হিসাব ছিল ৫টি, ১৯৭৫ সালে তা ৪৭টিতে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে কোটিপতি হিসাব লাখ ছাড়িয়ে যায়। এ সময় কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ এক হাজার ৯৭৬টি।
পোশাক রপ্তানির বাইরে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের আরও একটি পণ্য এখন বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার কারখানায় তৈরি নিরাপত্তা ও কার্যকরী জুতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেল-গ্যাস শিল্প, চীনের গভীর খনি এবং ইউরোপের নির্মাণ ও পর্বতারোহণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে পানিরোধী বুট, রাবার ও প্লাস্টিকের জুতা, অ্যালুমিনিয়াম-টো নিরাপত্তা জুতা, সামরিক বুট ও কৌশলগত ব্যবহারের বিশেষ জুতা। ফলে সাধারণ জুতার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত জুতা রপ্তানিতেও বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে তাইওয়ানের মালিকানাধীন জিন চ্যাং শুজ বাংলাদেশ লিমিটেড এই খাতের অন্যতম বড় উৎপাদক। প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রামের দুটি কারখানায় বছরে প্রায় ৪২ লাখ জোড়া নিরাপত্তা জুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৬ হাজার কর্মী ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ১০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্য গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে, ৩০ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং বাকি ১০ শতাংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত এসব জুতা এখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। টিম্বারল্যান্ড, উলভারিন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড, অ্যারিয়াট, হেলি হ্যানসেন, বেলভিল এবং ফাইভ ইলেভেন ট্যাকটিক্যালের মতো ব্র্যান্ডের জন্য বাংলাদেশে জুতা ও বুট তৈরি হচ্ছে। এসব জুতা নির্মাণকাজ, তেল ও গ্যাস উত্তোলন, রাসায়নিক কারখানা, গভীর খনি, সামরিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কারখানায় উৎপাদিত কিছু উন্নতমানের নিরাপত্তা জুতা আন্তর্জাতিক খুচরা বাজারে জোড়া প্রতি ১৫০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়।
বিক্রির পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক সাফল্য
বাংলাদেশে নিরাপত্তা জুতা উৎপাদন এখন আর একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জিন চ্যাং ও গোল্ডেন চ্যাং গোষ্ঠীর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার চার কারখানায় বছরে প্রায় ১ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের দুটি কারখানায় প্রায় ৫০ লাখ এবং কুমিল্লার দুটি কারখানায় প্রায় ৫০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করা হয়। এসব কারখানায় চামড়ার ওপরাংশ, রাবার ও প্লাস্টিকের জুতা, পানিরোধী জুতা ও বুট এবং অ্যালুমিনিয়াম-টো নিরাপত্তা জুতাসহ বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত পণ্য তৈরি হচ্ছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশের কারখানাগুলো। জুতার চাপ সহনশীলতা, নমনীয়তা, পিছলে যাওয়া প্রতিরোধ এবং বৈদ্যুতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি হওয়ায় এসব পরীক্ষার মান আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ কারণে বাংলাদেশের কারখানাগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ জুতার উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত জুতা তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রপ্তানি আয়ের দিক থেকেও নিরাপত্তা জুতার গুরুত্ব বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাবারের সোল ও খাঁটি চামড়ার তৈরি বিশেষায়িত বুট ও নিরাপত্তা জুতা রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ৪৩ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এর মধ্যে গোল্ডেন চ্যাং গোষ্ঠী একাই রপ্তানি করেছে ২৫ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এই শ্রেণির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ এসেছে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে। আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির চার কারখানায় মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ২৩৫ লাখ ডলার এবং এসব কারখানে ১২ হাজার ৪৬২ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে।
সামগ্রিক জুতা রপ্তানিতেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট জুতা রপ্তানি রেকর্ড ১২৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চামড়ার পাশাপাশি নন-লেদার বা চামড়াবিহীন জুতার রপ্তানিও দ্রুত বাড়ছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম দুই মাস, জুলাই ও আগস্ট ২০২৬-এ চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা মিলিয়ে বাংলাদেশ ২৫ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের জুতার চাহিদা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ থেকে দেশটি প্রায় ২২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের জুতা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জুতা আমদানি প্রায় ৩৮ শতাংশ কমেছে। ফলে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো উৎপাদনকারী দেশগুলোতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারে যেভাবে জায়গা করে নিল
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জুতার চাহিদা বাড়ার পেছনে উৎপাদন ব্যয়, শ্রমনির্ভর উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা জুতার সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। বাংলাদেশের জুতা শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরও বড় ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমিক ও উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি কঠোর হওয়া এবং নির্মাণ, শিল্প উৎপাদন, খনি, তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে নিরাপত্তা জুতার বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, বৈশ্বিক শিল্প নিরাপত্তা জুতার বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ১২০০ কোটি থেকে ১৩৮০ কোটি ডলারের মধ্যে। আগামী কয়েক বছরে এই বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের উৎপাদকদের সামনে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত জুতার বাজারে প্রবেশের আরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, আমদানিনির্ভর কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত ও কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা, কাঁচামালের স্থানীয় উৎপাদন এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নিরাপত্তা ও কার্যকরী জুতার বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি নিরাপত্তা জুতা এখন রপ্তানি বহুমুখীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ, চীন থেকে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশি কারখানায় তৈরি বিশেষায়িত জুতার ব্যবহার বাড়ায় দেশের ফুটওয়্যার শিল্পে উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা ও মান ধরে রাখতে পারলে এই খাত ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবারেও দেশের পুঁজিবাজারে অব্যাহত রয়েছে বড় দরপতনের ধারা। লেনদেনের শুরুর দিকে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও দিনশেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মূল্যহ্রাসের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এর ফলে চলতি সপ্তাহের টানা তিন কার্যদিবসেই দরপতনের মুখে পড়ল দেশের পুঁজিবাজার।
এদিন ডিএসইতে ইতিবাচক প্রবণতায় কেনাবেচা শুরু হলে প্রথম ৩৫ মিনিটের মাথায় প্রধান সূচক ৩৫ পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যায়। লেনদেনের প্রথম দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সূচকের এই চাঙ্গাভাব বজায় থাকায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা তৈরি হলেও পরবর্তীতে বাজারে ঢালাও বিক্রির চাপ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সূচকের পতনেই সমাপ্ত হয় দিনের লেনদেন। ডিএসইতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৭৯টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ২৭০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর।
কোম্পানিগুলোর শ্রেণিভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তদূর্ধ্ব লভ্যাংশ দেওয়া ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৪টির দাম বাড়লেও দর হারিয়েছে ১৪০টি প্রতিষ্ঠান। মাঝারি মানের কোম্পানির মধ্যে ১৮টির দরবৃদ্ধির বিপরীতে ৫৩টির দাম কমেছে। এছাড়া লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ১৭টির এবং কমেছে ৭৭টির। এদিন কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বাড়েনি; উল্টো ২৯টির দরপতন ঘটেছে। সার্বিক মূল্যহ্রাসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪২৪ পয়েন্টে নেমেছে। পাশাপাশি বাছাইকৃত ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৭৭ এবং শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৭৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যসূচক নিম্নমুখী হলেও ডিএসইতে লেনদেনের গতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬৪ কোটি ১৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ২৭ কোটি ৬ লাখ টাকা বেশি। একক কোম্পানি হিসেবে লেনদেনের শীর্ষে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, যার ২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। লেনদেনের তালিকায় পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে সায়হাম টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল, অ্যাপেক্স ফুডস, মালেক স্পিনিং, সোনালী লাইফ, ইভিন্স টেক্সটাইল, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, সেনা ইন্স্যুরেন্স এবং একমি পেস্টিসাইড। অন্যদিকে সিএসইতে লেনদেন হওয়া ১৭৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪৭টির দর বাড়লেও ১১০টির দাম কমেছে। ফলে বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬২ পয়েন্ট কমে গেছে এবং মোট ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের ভোগান্তি কমিয়ে দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে একটি ‘স্বতন্ত্র বিজনেস আইডি’ প্রবর্তনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার আওতায় একক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই বাণিজ্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের আবেদন সম্পন্ন করা যাবে। এর মাধ্যমে কোম্পানি নিবন্ধনের পর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে যেখানে বর্তমানে গড়ে ১৮০ থেকে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় অপচয় হয়, তা কার্যকরভাবে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সমন্বিত সেবা প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাবিজ’-এর অধীনে ১৪ দিনের একটি ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি পরিবেশ ও অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্রসহ একাধিক শর্ত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও ঋণপত্র (এলসি) খুলতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতো।
সংস্কারের কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি জানান, সব বাধ্যবাধকতা বাতিল না করে এলসি খোলার আগের অপ্রয়োজনীয় পূর্বশর্তগুলো কমিয়ে আনা, কিছু শর্ত ব্যবসা শুরুর পর পূরণের সুযোগ দেওয়া এবং একাধিক প্রক্রিয়া একই সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পন্ন করাই এই উদ্যোগের মূল কৌশল।
নতুন ব্যবস্থাপনায় কোম্পানি নিবন্ধনের সময়ই একজন উদ্যোক্তা ইউনিক বিজনেস আইডি পেয়ে যাবেন। একটি সমন্বিত ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে কোন আবেদনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কোন ছাড়পত্র বাকি আছে, তা উদ্যোক্তা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উভয়েই পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। প্রাথমিক অনুমোদনের পর নির্ধারিত মেয়াদে পরবর্তী শর্ত পূরণ না হলে প্রয়োজনে যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শর্তপূরণে কোনো আপস না করে সামগ্রিক ধাপগুলোকে ডিজিটাল করা এবং ব্যবসা শুরুর পূর্বশর্ত যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এর আগে গত ১ অক্টোবর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি আনতে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং সংশ্লিষ্ট সেবাসমূহ সমন্বিত করার জোরালো নির্দেশনা দেন। ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ধাপগুলোর ম্যাপিং সম্পন্ন করে বিধিমালা সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে সংস্কারের প্রাথমিক সুফল পাওয়া যাবে এবং পরবর্তী ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে বড় অংশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় এক বছরের মধ্যে এই ডিজিটাল ইকোসিস্টেম পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
কর ফাঁকি প্রতিরোধ, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই উদ্যোগ সফল করতে কর শনাক্তকরণ কাঠামোর সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, জমি ও ফ্ল্যাটের নিবন্ধন, সঞ্চয়পত্র ক্রয়, বিদেশ ভ্রমণ এবং যানবাহন নিবন্ধনের যাবতীয় তথ্যভান্ডার একীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
উদ্যোগটির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ডেটাবেজের সঙ্গে করদাতাদের আয়কর নথি সমন্বিতভাবে খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল মোটরযানের মালিকরা যথাযথভাবে আয়কর বিবরণী দিচ্ছেন কি না এবং তাঁদের প্রদর্শিত বার্ষিক আয় ও মোট সম্পদের সঙ্গে গাড়ির ক্রয়মূল্যের সংগতি রয়েছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এসব সিদ্ধান্তের পর কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সম্পদ গোপনকারী কিংবা কম আয় প্রদর্শনকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন মাত্র ৪৭ লাখ ব্যক্তি। এই বিশাল ফারাক দূর করে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে নিয়মিত করের আওতায় আনতে চায় সংস্থাটি। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা চালু করা হলেও বর্তমানে মোট করদাতার ২ শতাংশেরও কম এই নিরীক্ষার আওতায় আসছেন। সার্বিক বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, রাজস্ব আহরণে নেওয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তা যেন হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং অটোমেশনের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বিনিয়োগের তীব্র সংকোচন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের বহুমুখী দুর্বলতার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। সেই সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মান সংকুচিত হয়েছে এবং টানা চার বছরের মতো বেড়েছে জাতীয় দারিদ্র্যের হার। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬ প্রান্তিকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেশের অর্থনীতির সার্বিক এমন চিত্র উঠে এসেছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাইকারি হারে ভর্তুকি প্রদানের অকার্যকারিতা তুলে ধরে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। মূলত বিদায়ী অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যাওয়ায় সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নামে, যা করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন। প্রবৃদ্ধি কমার মূল কারণ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ধীরগতি এবং পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যাওয়া অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে আরও বাড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাতেও মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র প্রায় ২ শতাংশে সীমিত ছিল এবং তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদনে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচন ঘটে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে বহু কারখানা তাদের সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদনে বাধ্য হয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই কিংবা কর্মঘণ্টা কমাতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশীয় গ্যাসে প্রায় স্বনির্ভর থাকলেও বর্তমানে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে, যার ফলে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল বা বড় গ্যাসক্ষেত্রে কোনো বিঘ্ন ঘটলে পুরো শিল্প সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। একই সাথে নারীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে তাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২৪ সালে নেমে এসেছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে।
এদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে গত অর্থবছরে গড়ে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ালেও বাজারে মূল্যের চাপ কমেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বর্ধিত অর্থ সরবরাহের কারণে আগস্টে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি আবারও ঋণাত্মক ধারায় নেমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী এক বছরে দেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে এবং জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী দারিদ্র্যের অনুপাত বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আয়বৈষম্য বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দেয়।
দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থাকে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে, যার মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। প্রভিশন সংরক্ষণে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের ছাড় দেওয়ায় ব্যাংকের আসল আর্থিক ঝুঁকি আড়ালে রয়েছে এবং খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো এবং সুদের হারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ায় এটি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বৈদেশিক খাতের ক্ষেত্রে গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও আমদানি ব্যয় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের শ্লথগতির কারণে চলতি হিসাবে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সাথে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম আদায় হওয়ায় সরকারের বাজেট ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং ঘাটতি মেটাতে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সংগৃহীত হয়েছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন করে তুলছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগামী অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্বব্যাংক প্রধান তিনটি ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করেছে; যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান দ্রুত পর্যালোচনা করে দুর্বল ব্যাংকে ছাড় বন্ধ করা, জ্বালানি খাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং কর ফাঁকি রোধ ও অযৌক্তিক করছাড় বাতিলের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা।
ইরান কিংবা দেশটির ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক যোগাযোগ বজায় রাখলে বিশ্বের যেকোনো বিদেশি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে বলে কঠোর বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ‘নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ইরানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লেনদেন অব্যাহত রাখলে বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কোনো সময়, আগাম নোটিশ ছাড়াই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। তাই তাদের অবিলম্বে এ ধরনের কার্যক্রম ও সম্পর্ক বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই অভিযানে ইরানের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব নিহত হন এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধের দাবি জানানো হয়। এর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের তীব্রতা বেড়ে যায়। ইরানও পাল্টা জবাব হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানে। একই সাথে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে সার ও জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
এমন পরিস্থিতিতে আগস্টের শেষভাগ থেকে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া আরও জোরালো করে ওয়াশিংটন। ইরান সরকারের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখলে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের সামগ্রিক আর্থিক খাতের পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি, রেল যোগাযোগ, মোটরযান এবং উৎপাদন শিল্পের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর দফায় দফায় নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এমনকি ইরানের কর্তৃপক্ষকে লেনদেনে সহায়তা প্রদানের অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি এবং তুরস্কের একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ওই সতর্কবার্তায় আরও উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ফাঁকি দিয়ে বৈদেশিক লেনদেন সচল রাখতে তেহরান প্রশাসন ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ বা ছায়া ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। ফলে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের অবৈধ লেনদেন ও ছদ্মবেশী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ফ্রান্সের ক্রমবর্ধমান ঋণ সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ইউরোপের একক মুদ্রা ইউরোর মান কমে ১৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইউরোজোনের বন্ড বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় ইউরোর দরপতন সাময়িকভাবে থমকে দাঁড়ালেও মুদ্রাটি এখনো চাপের মুখে রয়েছে। এর বিপরীতে মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড বা সরকারি বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধির ওপর ভর করে শীর্ষ অবস্থানে অপরিবর্তিত রয়েছে মার্কিন ডলার।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, বিগত কার্যদিবসে ইউরোর মান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম কমে দাঁড়িয়েছে এক ডলার ১২ সেন্টে। আগের কার্যদিবসে এটি এক ডলার ১১ দশমিক ৬ সেন্টে নেমে গিয়েছিল, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর থেকে সর্বনিম্ন দর। মূলত ফ্রান্সে উচ্চমাত্রার সরকারি ঋণ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার পাশাপাশি স্পেনের আসন্ন আগাম নির্বাচন ইউরোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। ফরাসি সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি পুরো ইউরোজোনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সামান্য কমায় ফরাসি বন্ডের ইল্ড প্রায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পায়, যা বন্ড বাজারে সৃষ্ট আতঙ্ক কিছুটা প্রশমিত করেছে।
ইউরোর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার কৌশলবিদ জোসেফ কাপুরসো বলেন, “আমরা ইউরো নিয়ে বেশ হতাশাবাদী। আমাদের ধারণা এটি কমে এক ডলার ১০ সেন্টের নিচে নেমে যাবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইউরোর মান বাড়াতে হলে তেলের দামে বড় ধরনের পতন হতে হবে। অপর পথটি হলো বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া, যদিও অদূর ভবিষ্যতে তেমনটি ঘটার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।”
অন্যান্য মুদ্রার বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন ডলার সূচক সামান্য পরিবর্তনের পর ১০২ দশমিক ১৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে, যা আগের সেশনে ১৮ মাসের সর্বোচ্চ ১০২ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে উঠেছিল। প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান তথ্যের কারণে চলতি অক্টোবরে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমে ২২ শতাংশে নেমে এলেও ডিসেম্বরে তা বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে সিএমই ফেডওয়াচ। এছাড়া সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও চাহিদা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আগামী বছর পর্যন্ত বজায় থাকার আভাস পাওয়া গেছে।
বাজারের সামগ্রিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইএনজির মুদ্রা কৌশলবিদ ফ্রান্সেসকো পেসোলে বলেন, “চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই ডলার শক্ত সমর্থন পেতে শুরু করেছে। ইউরোর নিজস্ব দুর্বলতা এখনও ভূমিকা রাখছে, এবং বিশ্বজুড়ে বন্ড ইল্ডের ঊর্ধ্বমুখী গতিও ডলারকে শক্তি জোগাচ্ছে।”
এদিকে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলারের মান শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৮ দশমিক ২১ ইয়েনে। ব্যাংক অব জাপান চলতি মাসেই মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করার ইঙ্গিত দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাদের সুদের হার বাড়ানোর প্রস্তুতিরই প্রতিফলন। অন্যদিকে ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময় মূল্য এক ডলার ৩২ দশমিক ৩ সেন্টে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল এবং অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মান শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৬৯৬ ডলারে নেমে আসে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা ও সয়াবিনের মূল্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কারণে শস্য সংগ্রহের গতি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আগের কার্যদিবসের মূল্যবৃদ্ধির ধারায় ছেদ পড়েছে বলে জানিয়েছে বিজনেস রেকর্ডার।
শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে সবচেয়ে সক্রিয় সরবরাহ চুক্তিতে ভুট্টার দাম শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে প্রতি বুশেল দাঁড়িয়েছে ৪ ডলার ৯৬-৩/৪ সেন্টে। একই সময়ে সয়াবিনের দর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি বুশেল বিক্রি হয়েছে ১২ ডলার ৭৮-১/২ সেন্টে। পাশাপাশি গমের বাজারমূল্যও শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি বুশেল দাঁড়িয়েছে ৬ ডলার ৯১ সেন্টে।
বাজারের গতিপ্রকৃতি প্রসঙ্গে সিঙ্গাপুরের একজন শস্য ব্যবসায়ী বলেন, “বাজারে আজ কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে, কারণ আমরা দামের ওপর মৌসুমভিত্তিক ফসল তোলার চাপ দেখতে পাচ্ছি।”
মার্কিন কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কৃষকেরা এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ২৩ শতাংশ ভুট্টা এবং ২৫ শতাংশ সয়াবিন সংগ্রহ করতে পেরেছেন, যা বিগত পাঁচ বছরের গড় গতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। আইওয়াসহ মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের পশ্চিমাংশে বৃষ্টিপাতের কারণে শস্য উত্তোলনের গতি মন্থর হয়ে পড়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহের অধিকাংশ সময় মধ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করার পূর্বাভাস রয়েছে, যা ফসল সংগ্রহের কাজকে দ্রুত এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গমের বাজারে কিছুটা ভরসা জুগিয়েছে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের বড় অঙ্কের গম ক্রয়ের চুক্তি পণ্যটির দরপতনের তীব্রতাকে সীমিত রাখতে সহায়ক হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা পরিহার করে পূর্বে গৃহীত ঋণের একটি অংশ পরিশোধের পথ বেছে নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে আগের দেনার মধ্য থেকে ৭৮৮ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত জুন শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি যেখানে ৯৪ হাজার ৫২ কোটি টাকা ছিল, তা গত ২৪ সেপ্টেম্বর নাগাদ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায় কিছুটা কমানো হলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ধার করার ধারা অব্যাহত রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুন মাস শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা, যা ২৪ সেপ্টেম্বর নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে ছয় লাখ ১৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সব মিলিয়ে উভয় উৎস থেকে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ১১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি থাকলে সেই ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায় করা কর এবং অন্যান্য উৎসর আয় দিয়ে সরকারের সব ব্যয় মেটানো সম্ভব না হলে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আগের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে এই অর্থ ব্যয় হয়। বাজেটে সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব করে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়। আবার যখন আয় বাড়ে তখন সেই ঋণ ফেরত দেয় সরকার।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সমগ্র ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের, যার মধ্যে প্রথম প্রান্তিকেই ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের অভিমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ শোধ করলে নতুন টাকা বাজারে আসার প্রবণতা কমে, যা মুদ্রানীতির লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সমন্বয় করতে গিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ না নিয়ে তা পরিশোধ করা একটি ইতিবাচক দিক হলেও সরকারের সার্বিক ঋণ ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য বুঝতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ অন্যান্য উৎসের ঋণের হিসাবও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাঁর মতে, ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে জানা গেছে, তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে সাধারণ সড়কে করমুক্ত লাল রঙের ডিজেল (রেড-ডাইড ডিজেল) ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সোমবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এই বিশেষ ডিজেল কেবল কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও অফ-রোড যানের জন্য নির্ধারিত ছিল। মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির লাগামহীন দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ওপর তৈরি হওয়া চাপ প্রশমিত করতেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এ ছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ পাম্পগুলোতে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াও এ পদক্ষেপের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নেব্রাস্কায় আয়োজিত এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প জানান, এই নির্বাহী নির্দেশনার মাধ্যমে সড়কের বাইরে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হচ্ছে, যার ফলে যে কেউ ব্যক্তিগত বা যেকোনো প্রয়োজনে এই করমুক্ত জ্বালানি কিনতে পারবেন। রেড-ডাইড ডিজেলের বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন,‘আমি জানি না এটা আসলে কী, তবে যাই হোক, বলা হচ্ছে এটা খুব ভালো।’ মূলত সহজে চেনার জন্য এই ডিজেলে লাল রং মেশানো হয়, যা গুণগত মানে সাধারণ ডিজেলের মতো হলেও এতে প্রচলিত হাইওয়ে বা মহাসড়ক সংক্রান্ত সরকারি কর যুক্ত থাকে না।
তবে জনসভায় প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের তুলনায় হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তথ্যপত্রে বিষয়টি কিছুটা সুনির্দিষ্ট ও সীমিত আকারে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সড়কে লাল ডিজেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে এবং এই সময়ে চালকদের ওপর কোনো সুদ বা জরিমানা আরোপ করা হবে না। ভবিষ্যতে এই কর স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করার কর্মপন্থা নির্ধারণে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও অঙ্গরাজ্যের গভর্নররা চাইলে নিজেদের এখতিয়ার অনুযায়ী এই ডিজেল ব্যবহারের ওপর নজরদারি ও তল্লাশি বন্ধ রাখতে এবং চালকদের আরোপিত কর মওকুফ করতে পারবেন।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যাপত্রে অবশ্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ইরানের সংঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে বৈশ্বিক পরিশোধনাগারগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট-শাসিত অঙ্গরাজ্যগুলো ‘গ্রিন এনার্জি’ নীতির অজুহাতে বেশ কিছু পরিশোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে বলেও হোয়াইট হাউস অভিযোগ তোলে।
সমাবেশে ইউরোপের সঙ্গে সম্পাদিত একটি সাম্প্রতিক চুক্তিরও প্রশংসা করেন ট্রাম্প, যেটির আওতায় আগামী চার মাসে কৌশলগত মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল পরিশোধিত ডিজেল বাজারে ছাড়ার কথা রয়েছে। ট্রাক, কৃষি যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ খাতে অপরিহার্য এই জ্বালানির দাম সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মস্কো রপ্তানি সীমিত করায় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ ও মূল্যের ওপর বৈশ্বিক চাপ আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, বাংলা কিউআর ব্যবহারে লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর সেবা চালু হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে সারাদেশে ক্যাশলেস লেনদেন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মতিঝিলে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মুস্তাকুর রহমান। এ সময় তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বাংলা কিউআর ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করেন।
গভর্নর বলেছেন, নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে দেশে ক্যাশবিহীন লেনদেন বা ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর অংশ হিসেবে সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম বাংলা কিউআর সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে মাঠপর্যায়ে প্রচারণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর সেবা চালু হয়েছে। গত তিন মাসে এ মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে।
মতিঝিলে প্রচারণাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে শুধু প্রযুক্তি সুবিধা চালু করাই নয়, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। এতে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়বে।
তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিপজ্জনক শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তুরস্কের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সোমবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিজ সেনের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। বৈঠকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, ফল আমদানিতে ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয় উঠে আসে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দুই পক্ষ। আসন্ন তুরস্ক সফরে সে দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিনিয়োগ সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সময় দুই পক্ষ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার আশাবাদ ব্যক্ত করে।
ফল আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে তুরস্কের ফলমূল রপ্তানিকারক সংস্থাগুলোর পরিচিতি ও যোগাযোগের তথ্য চায় বাংলাদেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে ইলেকট্রনিকস ও জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ও গুরুত্ব পায়। এ ধরনের বর্জ্য পরিশোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির জন্য তুরস্কে বিশেষায়িত স্থাপনা বা টিএসডিএফ সংক্রান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়।
চামড়া শিল্প নিয়ে আলোচনায় তুরস্কের রাষ্ট্রদূত জানান, পরিবেশগত কারণে তাঁর দেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ট্যানারির কার্যক্রম কমেছে। একই সঙ্গে সিন্থেটিক চামড়ার ব্যবহার ও কাঁচামাল আমদানির প্রবণতা বেড়েছে।
রাষ্ট্রদূত কমসেকের অধীনে আসন্ন মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন এবং ওয়ার্ল্ড হালাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সামিট ও হালাল এক্সপোতে বাংলাদেশকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কমসেকের মূল সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী অংশ নেবেন। পরবর্তী সম্মেলনে অংশ নেবেন বাংলাদেশের অন্য প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, তুরস্ক দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সেলর এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অভ্যন্তরীণ বাজারে আটার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ১০ লাখ টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। কৃষি ও খাদ্যপণ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ার্ল্ড-গ্রেইন ডটকম’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ২০২৪ সালের পর দেশটিতে প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে সরকারি পর্যায়ে গম আমদানির পদক্ষেপ নেওয়া হলো। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে চাল ও আটার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তারা চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন; এমন পরিস্থিতিতে খোলাবাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারদর সাধারণ মানুষের নাগালে আনতেই এই জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) অধীনস্থ সংস্থা ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের (এফএএস) সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানে গত চার মাসের ব্যবধানে আটার দাম অন্তত ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির প্রতি টন আটার দাম ৪২২ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ ডলারে। বিগত বছরের আগস্টের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দেশটিতে এক বছরের ব্যবধানে আটার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এফএএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সরকারের হঠাৎ বাজার নীতির পরিবর্তনের কারণেই খাদ্যশস্যের বাজারে এমন মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দেশটির প্রাদেশিক সরকারগুলো বিগত বছরগুলোর মতো কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি গম কেনার প্রথা বন্ধ করে পুরো ক্রয়প্রক্রিয়া বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেয়। সরকারি পর্যায়ে কেনাকাটা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা ফসল ঘরে তোলার পর অর্থের প্রয়োজনে দ্রুত মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হন। কার্যকর নজরদারি না থাকায় এই সুযোগে সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও মজুতদারেরা চাল-গমের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং স্বচ্ছতার অভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাতারাতি খাদ্যপণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পাকিস্তানের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত এই খাদ্যশস্যের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তত ১৫ লাখ টন গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করছে এফএএস। তবে সরকারের নির্ধারিত কোটা বিবেচনায় রেখে সংস্থাটি চলতি ২০২৬-২৭ বিপণন বছরের জন্য দেশটির আমদানি প্রাক্কলন ১০ লাখ টনেই স্থির রেখেছে। একই সঙ্গে আগামী বছরের মার্চে স্থানীয় খামারগুলো থেকে নতুন মৌসুমের দেশীয় গম ওঠার আগেই বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে দ্রুত সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।