দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যে বিগত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের প্রান্তিক দরপতন ঘটেছে। মূলত সুদের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস এবং এই মূল্যবান ধাতুর প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমে যাওয়ায় বাজারে এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত মঙ্গলবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৯৪২ ডলার ৯৯ সেন্টে নেমে আসে, যা গত নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন অবস্থান। অথচ বছরের শুরুতে খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রবল চাহিদার মুখে স্বর্ণের মূল্য রেকর্ড ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে উঠেছিল। গত তিন মাসে এই ধাতুর দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের এই দরপতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশের দেওয়া সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত বড় ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু স্বর্ণ থেকে নিয়মিত কোনো লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই বিনিয়োগকারীরা এখন সরকারি বন্ডের মতো লাভজনক খাতের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের আশঙ্কায় অনেকে লোকসান এড়াতে স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এছাড়া বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এবং স্পেস-এক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের আইপিও-তে বিনিয়োগের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করতে স্বর্ণের বাজার থেকে সরে আসছেন। অন্যদিকে, স্বর্ণের ইটিএফ তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রত্যাহার এবং চীনে খুচরা গ্রাহকদের ফিউচার ট্রেডিংয়ে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করায় বাজারের অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও সরবরাহ খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপানে খাদ্যপণ্যের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। খবর জাপান টুডে। বৈশ্বিক এই অস্থিরতার কারণে চলতি জুলাই মাসেই দেশটিতে ২ হাজার ৫০০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাপানের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান তেইকোকু ডেটাব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুলাইয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৬টি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হবে এবং বিগত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম কোনো একটি নির্দিষ্ট মাসে দাম বাড়ার তালিকায় থাকা পণ্যের সংখ্যা দুই হাজার অতিক্রম করল।
মূল্যবৃদ্ধির এই তালিকায় থাকা পণ্যগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য। বিশেষ করে টিনজাত খাবার ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার তালিকায় থাকা স্লাইস ব্রেড এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি রুটিও এই মূল্যবৃদ্ধির আওতাভুক্ত। তেইকোকু ডেটাব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল এবং প্লাস্টিক উৎপাদনের মূল উপাদান ন্যাপথার দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের প্যাকেজিং ও ট্রের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শিল্পোদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে এই বাড়তি খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী আগস্ট মাসেও প্রায় ২ হাজার পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা হবে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে, জাপানে এই বছরজুড়ে পর্যায়ক্রমে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক না হলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এই মূল্যস্ফীতির চাপ আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই ঊর্ধ্বমুখী ছিল বাজার, যার ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৭২টির দর বেড়েছে, যেখানে মাত্র ২৯টির দাম কমেছে এবং ৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজার মূলধনে। গত এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা বেড়ে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের শেষে ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।
সূচকের চিত্রেও গত সপ্তাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯১ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াহ সূচক ২৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট এবং বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৩০ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বেড়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সূচকগুলোর এমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান বাজারে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে বাজারে লেনদেনের গতিও ছিল নজরকাড়া। প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ১ হাজার ৪৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। লেনদেনের শীর্ষে আধিপত্য বজায় রেখেছে বেক্সিমকো লিমিটেড। এরপরই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ও মালেক স্পিনিং। এছাড়া আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালটেন্টস, এনসিসি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং সিটি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। সার্বিকভাবে গত সপ্তাহটি শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও চাঙ্গা ছিল।
দেশের কৃষি খাতে বিপ্লব ঘটাতে নির্মিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সার কারখানা ‘ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি’ উৎপাদনের প্রথম বছরেই অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এই মেগা প্রকল্পটি।
যেখানে ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানাটি মুনাফার মুখ দেখেছে, সেখানে বিসিআইসির অধীনে থাকা বাকি চারটি ইউরিয়া সার কারখানা একই সময়ে সম্মিলিতভাবে ৪১৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার সর্বোচ্চ ২১৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এছাড়া শাহজালাল ফার্টিলাইজার ১৩৪ কোটি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ৩৩ কোটি এবং যমুনা ফার্টিলাইজার ৩০ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। মূলত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাব এবং পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারাই এই লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সার বিক্রি থেকে সরাসরি আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্তি ছিল ৮৯৯ কোটি টাকা। সব ধরনের ব্যয় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন শুরু না হওয়া এবং ঋণের সুদের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ৩৩৭ কোটি টাকার বেশি লোকসানে ছিল।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ একর জমিতে এই আধুনিক কারখানাটি নির্মাণ করা হয়েছে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে উদ্বোধন করা হলেও বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন শুরু হয় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে। বর্তমানে এটি দেশের সার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে কারখানাটির দীর্ঘমেয়াদি দায়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা, যার সিংহভাগই জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং এমআইজিএ-র ঋণ। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, উৎপাদনের প্রথম বছর থেকেই নিজস্ব আয় দিয়ে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত এক বছরে কিস্তি বাবদ প্রায় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে মাঝপথে কয়েকদিন উৎপাদন ব্যাহত হলেও কারখানাটি লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ সার উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে মুনাফার এই ধারা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে ১১ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও প্রায় ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের গমের বাজারে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রথমবারের মতো চিরাচরিত উৎস রাশিয়া ও ইউক্রেনকে টপকে দেশের প্রধান গম সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে আর্জেন্টিনা। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট আমদানিকৃত গমের প্রায় ৩০ শতাংশই এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে সর্বমোট ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ আমদানির রেকর্ড। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আমদানির হার বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের গমের চাহিদার জন্য মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভর করতে হতো এবং প্রায় প্রতি বছরই এই দুই দেশের কোনো একটি তালিকার শীর্ষে থাকত। তবে ২০২২ সালে দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে গম সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশি আমদানিকারকেরা বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু করেন এবং সেই প্রচেষ্টার ফলেই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আর্জেন্টিনা এখন শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে মোট ২২ লাখ টন গম আমদানি করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।
বিপরীত দিকে, বাংলাদেশের বাজারে রাশিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য অনেকটাই কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট গমের ৪৪ শতাংশ রাশিয়া থেকে এলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যার পরিমাণ ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টন। এছাড়া আমদানির তালিকায় ব্রাজিলের অবস্থানও লক্ষ্য করা গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার টন গম দেশে এসেছে, যা দেশের মোট গম আমদানির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের এই কৌশল আমদানির চিত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বজায় রাখা এবং শিল্প ও কৃষি খাতের চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নতুন করে আরও ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এই আমদানির মূল লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বর্তমানের ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমদানিতব্য এই জ্বালানির মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল রয়েছে। সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এই জ্বালানি সরবরাহ করবে। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এই কেনাকাটায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ২৫ পয়সা ধরে এই আমদানিতে মোট ৬২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় হবে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে বিপিসির এই সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করেছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, আমদানির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কার্যাদেশ প্রদানের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে ‘নোয়া’ বা নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড ইস্যু করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পরপরই তেল সরবরাহ শুরু হবে। মূলত প্রতি ছয় মাসের নিয়মিত আমদানির অংশ হিসেবেই জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই বাড়তি মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকট এবং জাহাজ চলাচলের বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এছাড়া বিমা কোম্পানিগুলোর বাড়তি প্রিমিয়ামের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় দেশের শিল্পোৎপাদন ও কৃষিকাজ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই বাড়তি ব্যয়ের ঝুঁকি গ্রহণ করেছে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলা বাস্তবায়িত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তারা সুফল পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখাই এই বৃহৎ আমদানির মূল উদ্দেশ্য।
পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি ৩৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (পিবিএস) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। স্থানীয় বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত চার বছরের মধ্যে পাকিস্তানের এটিই সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি, যা দেশটির সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট আমদানি ব্যয় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বিদায়ী জুন মাসে এই ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে; মে মাসের তুলনায় জুন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। রপ্তানি আয়ের এই বড় পতন এবং আমদানির খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী। একেডি সিকিউরিটিজের গবেষণা পরিচালক মুহাম্মদ আওয়াইস আশরাফ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাকিস্তানের আমদানি বিল বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিমা খরচও বহুগুণ বেড়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে তুলা উৎপাদন কমে যাওয়ায় তুলা আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে ভারতের সস্তা চালের আধিপত্য এবং আফগানিস্তান ও ইরানের সাথে সীমান্ত জটিলতার কারণে পাকিস্তানের চাল ও সবজি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানের ব্রোকারেজ হাউসগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, রপ্তানি বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা না কমালে এই ঘাটতি পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার কমায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক মন্দা পাকিস্তানের রপ্তানি বাজারকে সংকুচিত করে তুলছে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে পাকিস্তানকে এখন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর দিকে আরও বেশি মুখাপেক্ষী হতে হবে।
টানা ছয় কার্যদিবস উর্ধ্বমুখী থাকার পর চলতি সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দর সংশোধনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত কয়েক দিনের টানা উত্থানের ফলে অনেক শেয়ারের দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানোয় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেওয়ার কৌশল নিয়েছেন, যার ফলে এই দর সংশোধন ঘটেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ৩৯৪টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৩টির দাম বেড়েছে এবং ১৮৫টির দাম কমেছে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৪৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একই সাথে বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসই-৩০ আগের দিনের তুলনায় ১৬ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে ডিএসই শরিয়াহ সূচক সামান্য (০.৮০ পয়েন্ট) বেড়ে ১ হাজার ১৬৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচক কমার পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা কমেছে; এদিন মোট ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৩৪ কোটি টাকা কম।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪২ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৪০৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় বেড়ে ৬০ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১০টির দাম বেড়েছে এবং ৯৪টির দাম কমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সপ্তাহের শেষ দিনে এই দর সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। টানা কয়েকদিন সূচকের বড় উত্থানের পর বিনিয়োগকারীরা সাময়িকভাবে মুনাফা ঘরে তোলার চেষ্টা করেন। তারা মনে করছেন, আজকের এই দর সংশোধনের ফলে শেয়ারের দাম নতুন করে ক্রয়যোগ্য স্তরে নেমে এসেছে, যা আগামী সপ্তাহের শুরুতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হারের আকস্মিক ওঠানামা থেকে দেশের আমদানিকারকদের সুরক্ষা দিতে ‘ফরোয়ার্ড রেট’ চুক্তি চালুর ঐতিহাসিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সরবরাহকারী ও ক্রেতা ঋণের আওতায় ইউজেন্স আমদানির (পণ্য গ্রহণের নির্দিষ্ট সময় পর অর্থ পরিশোধ) ক্ষেত্রে এখন থেকে আমদানিকারকরা সুদের হার আগাম নির্ধারণ করে নিতে পারবেন। এই পদক্ষেপের ফলে বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মানদণ্ডভিত্তিক সুদের হার তথা ‘এসওএফআর’ (SOFR)-এর অস্থিতিশীলতাজনিত আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
ফরোয়ার্ড রেট চুক্তি মূলত একটি আর্থিক সুরক্ষা কবচ, যার মাধ্যমে আমদানিকারক ও ব্যাংক ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদের হার এখনই স্থির করে নিতে পারে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ব্যবস্থাটি কেবলমাত্র প্রকৃত আমদানি লেনদেনের ঝুঁকি প্রশমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং কোনো ধরনের ফাটকাবাজি বা স্রেফ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। ব্যাংকগুলোর জন্য এই প্রক্রিয়ায় মার্জিন নির্ধারণের সর্বোচ্চ সীমা রাখা হয়েছে ১০ ভিত্তি পয়েন্ট। এছাড়া, কোনো ব্যাংক তাদের গত ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ২৫ শতাংশের বেশি এই চুক্তির আওতায় আনতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, ব্যাংকগুলোকে এই চুক্তির বিপরীতে একই দিনে সমান্তরাল লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের বাজারঝুঁকি পুরোপুরি সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো নিজেদের হিসাবে কোনো ঝুঁকি বহন করবে না। আন্তর্জাতিক মানসম্মত চুক্তিকাঠামো ব্যবহার এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চুক্তির আগাম সমাপ্তি ঘটলে তা প্রচলিত বাজারদরে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং সকল প্রয়োজনীয় দলিল সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এসওএফআর রেট যখন ঘনঘন পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন এই চুক্তি আমদানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে এবং খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে। একই সাথে, দেশে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আর্থিক ডেরিভেটিভস বাজারের বিকাশেও এটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে দেশের আমদানি বাণিজ্যে আর্থিক স্থায়িত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জুন মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াজাত পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ৪২০ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের একই মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বরাবরের মতোই এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। জুন মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিটওয়্যার থেকে এসেছে ১৮৪ কোটি ১ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে ১৫৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি আয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৫১ লাখ ডলারে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও ৪৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে এসেছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। গত বছরের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ খাতে আয় হয়েছে ৮ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তাজা সবজি, ফল, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্রে সামান্য নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। বছরের প্রথম দিকের কয়েক মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের কারণে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল না। তবে অর্থবছরের শেষ মাসে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার রপ্তানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইলসহ মোট ২৭ ধরনের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নতি এবং বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ জুন মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থবছরে মোট ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ৯৬৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বেশি। তবে বিশাল প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি কাস্টম হাউস। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বুধবার রাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, মূলত পাম অয়েল, ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফলমূল, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং খাদ্যপণ্য আমদানির মাধ্যমে এই বড় অংকের রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্য ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। আমদানিনির্ভর এই রাজস্ব ব্যবস্থায় পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়ার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আদায়ের ওপর।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে এখনো চট্টগ্রাম কাস্টমসের ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার বিশাল বকেয়া রয়ে গেছে। এর মধ্যে এককভাবে পেট্রোবাংলার কাছেই পাওনা রয়েছে ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, যেখান থেকে গত এক বছরে কোনো বকেয়াই আদায় করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে পাওনা রয়েছে ৩ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। যদিও চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা বকেয়া আদায় হয়েছে, তবে মোট পাওনার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানিয়েছে, বকেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বকেয়া পরিশোধ করলে আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) খরচ কমাতে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টের সেবা ফি বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নতুন হার ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগে এই সেবার সর্বনিম্ন হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার সাথে অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হতো। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এই নির্দেশনা দেশের সব ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার লক্ষ্যে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয় পক্ষকে ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়মের ফলে এখন থেকে ব্যাংক হিসাব, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টের কাছ থেকে ভ্যাটসহ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ফি কাটতে পারবে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ আরও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্যান্য সকল ফি ও চার্জ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে কোনো ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে তারা আরও আকর্ষণীয় অফার প্রদান করতে পারবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারিকৃত আগের সার্কুলারের আংশিক সংশোধন করে এই নতুন হার নির্ধারণ করা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। তবে দাম কমলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর থেকে চিরস্থায়ীভাবে নির্ভরতা কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে এশিয়ার শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় ক্রেতারা এখন আর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নয়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ক্রয়ের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারায় এক আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছে বলে নিক্কেই এশিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
বাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তেলের বাজার শান্ত হয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারে নেমে এসেছে। নৌপথ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও এশীয় দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের তেল পরিবহনে বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয় এড়াতে ক্রেতারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাজার ধরে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে হয়তো এখন বড় অংকের ছাড়ে বা ডিসকাউন্টে তেল বিক্রি করতে হতে পারে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে জাপান তাদের আমদানি নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাপানের মোট আমদানির ৯৩ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসলেও দেশটি এখন জুলাইয়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে শতভাগ তেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাপান তাদের শোধনাগারগুলোকে আধুনিকায়ন করছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিশেষ করে মার্কিন অপরিশোধিত তেল সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করার কাজ শুরু করেছে। এশীয় বাজারের এই প্রবণতা দেখে বিশ্বখ্যাত তেল কোম্পানিগুলো এখন নাইজেরিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ক্রেতাদের এই বিমুখতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ‘দুবাই ক্রুড’-এর ওপর, যার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের অন্য তেলের তুলনায় দ্রুত কমছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের (OPEC) একক আধিপত্য এখন বড় সংকটের মুখে। কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে গেছে এবং ইরানও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের একচ্ছত্র রাজত্ব এখন পতনের মুখে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এশিয় দেশগুলোর এই কৌশলগত পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।