দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন পণ্য ও বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে হালাল অর্থনীতি। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি ওষুধ, প্রসাধনী, পোশাক, পর্যটন, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাকে ঘিরে দ্রুত সম্প্রসারিত এই বাজারে বাংলাদেশ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে রপ্তানির নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের মুসলিম ভোক্তাদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হালাল অর্থনীতি এখন আর শুধু খাদ্যপণ্যের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। সর্বশেষ State of the Global Islamic Economy প্রতিবেদনের হিসাবে, হালাল খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, পরিমিত ফ্যাশন, ভ্রমণ এবং বিনোদনসহ ছয়টি ভোক্তা খাতে মুসলিমদের ব্যয় ২০২৪ সালে প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৯ সালে তা ৩ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এ বিশাল বাজারের একটি অংশ ধরতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে। দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, চামড়া, পোশাক, প্রসাধনী ও কৃষিপণ্য খাতের বিদ্যমান সক্ষমতা হালাল মানদণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে এসব খাত থেকে নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে হালাল খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের বড় উৎপাদনভিত্তি রয়েছে। মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য, হিমায়িত খাবার, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পানীয়ের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে। যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ, ট্রেসেবিলিটি, প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সনদ নিশ্চিত করা গেলে এসব পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ওষুধ খাতেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। হালাল ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্ষেত্রে ওষুধের উপাদান, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এশীয় ও আফ্রিকান দেশগুলোতে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যও হালাল অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারিত একটি খাত। হালাল কসমেটিকসে শুধু উপাদানের উৎস নয়, উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়াতেও নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে হয়। বাংলাদেশে প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে। এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন পণ্য যুক্ত হতে পারে।
তবে এই বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ব্যবসায়ীরা হালাল সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল ও ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করছেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা না থাকায় রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে একটি একক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক কর্মশালাতেও ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা একক জাতীয় হালাল কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং সমন্বিত নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া হালাল পণ্যকে শুধু ধর্মীয় মানদণ্ডের বিষয় হিসেবে না দেখে উৎপাদন, গবেষণা, পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন, বিপণন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে দেশটি বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে একই ধরনের সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, দক্ষ হালাল অডিটর, নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং পণ্যের উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত কার্যকর ট্রেসেবিলিটি। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের হালাল মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার পারস্পরিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হালাল সনদ থাকলেই আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। পণ্যের মান, নিরাপত্তা, মূল্য, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হালাল অর্থনীতিকে একটি সমন্বিত বাণিজ্যিক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। হালাল লজিস্টিকসও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। খাদ্য ও অন্যান্য হালাল পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এই অবকাঠামো তৈরি হলে বাংলাদেশ শুধু পণ্য উৎপাদন নয়, হালাল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবেও যুক্ত হতে পারবে।
এদিকে দেশে হালাল পণ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহও বাড়ছে। ২০২৬ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেসের আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে উৎপাদক, রপ্তানিকারক, বিনিয়োগকারী, ক্রেতা, সার্টিফিকেশন সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য হালাল অর্থনীতি রপ্তানি বহুমুখীকরণের একটি বড় সুযোগ। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মোডেস্ট ফ্যাশন, চামড়া ও জীবনধারাভিত্তিক পণ্যে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব রপ্তানি আয়ে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেশন, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক লজিস্টিকস এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর একসঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে।
বিশ্বের হালাল ভোক্তা বাজার যখন কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি নতুন রপ্তানি খাত নয়, বরং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একযোগে ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠিয়েছে। এছাড়া বিবিধ দণ্ড হিসেবে আরও পাঁচজন কর্মকর্তার বেতন কমিয়ে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। সংস্থাটির ইতিহাসে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একযোগে এত বড় পরিসরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ মার্চ বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ অন্য কমিশনারদের কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখা এবং লাঞ্ছিত করার অভিযোগে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এই ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও একজন কর্মকর্তা আগেই অন্য অভিযোগে বরখাস্ত হওয়ায় বাকি ২২ জনের ওপর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। অত্যন্ত সংগোপনে গত মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ৬ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় ১৬ জন কর্মকর্তার নামে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যানের গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে সেই মামলাটি করেন। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এই ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সরকারের পক্ষ থেকে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা কমিশনে পৌঁছায়।
দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বিএসইসি থেকে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় এবং আজ বুধবার বরখাস্তের আনুষ্ঠানিক চিঠি তাঁদের হাতে পৌঁছানো হয়েছে। অনেকে কমিশনের সদর দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই পত্র গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য, গত বছর বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্দোলনে নামেন। ওই দিন তাঁরা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনী এসে তাঁদের উদ্ধার করে। আন্দোলন চলাকালে সংস্থাটিতে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
তৎকালীন মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, "বিএসইসি চেয়ারম্যান (সাবেক) খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে এবং কমিশনার (সাবেক) মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখের উপস্থিতিতে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে সভা চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাসহ আরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশনের সভাকক্ষে জোরপূর্বক ও অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। এরই মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কমিশনের মূল ফটকে তালা দেন, সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই, কমিশনের লিফট বন্ধ করে দেন এবং বিদ্যুৎ–সংযোগ বন্ধ করে মারাত্মক অরাজকতা ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।" মূলত দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং উর্ধ্বতনদের হেনস্তা করার দায়ে এই বৃহৎ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করল কমিশন।
বাংলাদেশে সিগারেটের খুচরা মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজারে থাকা বেশ কিছু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের দাম কমানোর অনুমতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আবেদন করেছে বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)। তবে বর্তমান বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, বাজারে থাকা কোনো সিগারেট ব্র্যান্ডের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই। ফলে বিএটির এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধানে সংশোধনী আনা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ জুলাই বিএটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এনবিআরে পাঠানো এক পত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের দাম কমানোর আবেদন জানানো হয়। বর্তমানে কার্যকর থাকা নিয়ম অনুযায়ী, একবার বাজারজাত করা কোনো সিগারেটের মূল্য কমানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিএটি তাদের ডারবি, পাইলট ও হলিউড ব্র্যান্ডের প্রতি প্যাকেটের দাম ৭২ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৩ টাকা এবং লাকি স্ট্রাইকের দাম ১০৮ টাকা থেকে কমিয়ে ৯২ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। এই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সফল করতে তারা বিদ্যমান সাধারণ আদেশের নির্দিষ্ট ধারাটি পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছে।
এই প্রস্তাবের ফলে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করছেন নীতিবিশ্লেষকরা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত হারে মূল্য কমানো হলে সরকার প্রতি প্যাকেটে প্রায় সাড়ে সাত টাকা রাজস্ব হারাতে পারে, যা বছর শেষে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি করতে পারে। যদিও তামাক কোম্পানিটির দাবি, দাম কমানো হলে তাদের বিক্রি কয়েকশ কোটি শলাকা বৃদ্ধি পাবে, যা সরকারকে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব এনে দেবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রি বাড়লেও ভোক্তারা উচ্চমূল্যের সিগারেট ছেড়ে কম মূল্যের সিগারেটের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয় কমিয়ে দেবে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশলকে সফল করতে দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত রাজস্ব নীতি পরিবর্তন করা সমীচীন নয়। সাধারণত জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে তামাকজাত পণ্যের দাম ও কর বাড়ানো হয় ধূমপান নিরুৎসাহিত করার জন্য। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্র্যান্ডের দাম কমানোর অনুমতি দেওয়া হলে তা তামাক করনীতির ইতিহাসে একটি নেতিবাচক নজির হয়ে থাকবে। এছাড়া অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে আইন প্রয়োগ ও বাজার তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠনের মতে, সিগারেটের দাম কমানো হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে। বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয় এবং বর্তমান সরকারি নীতির মূল লক্ষ্য হলো কর বাড়িয়ে এই ব্যবহার কমিয়ে আনা। তামাকবিরোধী গবেষকদের আশঙ্কা, দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা আরও বাড়বে এবং জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সরকার যখন তামাকের ব্যবহার কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে, তখন এই প্রস্তাবটি দেশের তামাক করনীতি এবং জনস্বাস্থ্য নীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এনবিআর যদি এই আবেদন গ্রহণ করে বিধান সংশোধন করে, তবে তা দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো সিগারেট ব্র্যান্ডের দাম কমানোর সরকারি অনুমোদন হিসেবে গণ্য হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আয়ের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি কার্যকর হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আল জাজিরা বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাত ১২টার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক প্রয়োগ পিছিয়ে দেওয়ার এই ঘোষণা প্রদান করেন।
পরবর্তীতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রশাসন আগামী ২২ আগস্ট পর্যন্ত শুল্ক স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প ও কার্নির মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর এই কূটনৈতিক সফলতা আসে।
এই বিশাল শুল্ক কার্যকর হলে ইলেকট্রনিক্স, শিল্প যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য ও ওয়াইনসহ কানাডার প্রায় ২০.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানি বাণিজ্য চরম ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল। ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ একটি বার্তার মাধ্যমে জানান যে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্তকরণের সাপেক্ষে তিন দিনের জন্য শুল্ক স্থগিত করা হয়েছে।
শুল্ক স্থগিতের চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই বিষয়টি কিলেস্টোন এক্সএল পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। উল্লেখ্য যে, অ্যালবার্টা থেকে নেব্রাস্কা পর্যন্ত দৈনিক ৮ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনে সক্ষম এই প্রকল্পের অনুমতি ২০২১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাতিল করেছিলেন।
আলোচনার বিষয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি জানান, দ্বিপক্ষীয় সংলাপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। তিনি বর্তমানে কানাডার অর্থনীতিকে আরও স্বাধীন ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়, যার ফলে মার্কিন প্রশাসনের এই সাময়িক স্থগিতাদেশ দেশটির জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে। ইতিপূর্বে ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো-কানাডা এগ্রিমেন্ট (ইউএসএমসিএ) অনুযায়ী দুই দেশের বাণিজ্য শুল্কমুক্ত থাকলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপ সেই স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অস্থিরতার হুমকিতে ফেলেছিল।
দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানার অব্যবহৃত সম্পদকে পুনরায় উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে ঢাকার ডেমরা ও কুষ্টিয়ায় তিনটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমিতে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মূলত নতুন শিল্পায়ন নিশ্চিত করা, আধুনিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এই বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) এক উচ্চপর্যায়ের সভায় সম্প্রতি এই ভূ-সম্পত্তিগুলো ন্যস্ত করার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ডেমরা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস এবং করিম জুট মিলস গত দুই দশক ধরে লোকসানের কারণে বন্ধ রয়েছে। এই দুটি কারখানার প্রায় ১৩৩ একর জমি এখন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের ৮৩ একর এবং করিম জুট মিলসের ৫০ একর ভূমি রয়েছে। পঞ্চাশের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকলেও এখন সেখানে আধুনিক শিল্প অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো পরিষেবা নিশ্চিত করে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ দ্রুত শুরু হবে।
একই প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া সুগার মিলসের ২২০ একর জমিতেও একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই চিনি কলটি দীর্ঘ ধারাবাহিক লোকসানের মুখে ২০২০ সালে চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কারখানার ভেতরে থাকা শত কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সরকার এখন এই বিশাল এলাকাকে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষে কাজ করছে। মিলের যাবতীয় দায়দেনা পরিশোধের পর জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার লক্ষে প্রশাসনিক তৎপরতা চলছে।
এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আদমজী জুট মিলের সফল অভিজ্ঞতাকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যেভাবে একটি রুগ্ন পাটকলকে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) রূপান্তর করে বর্তমানে সেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও বিপুল রফতানি আয় নিশ্চিত করা হয়েছে, ঠিক একই মডেলে এই নতুন অঞ্চলগুলো পরিচালিত হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে নবগঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’-এর সমন্বিত বিনিয়োগ কাঠামোর আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে আসবে এবং জমি ব্যবস্থাপনা আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
দেশের পুঁজিবাজারে দরপতনের ধারা কোনোভাবেই থামছে না। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবারও (১৮ আগস্ট) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম হ্রাস পেয়েছে। এই নিয়ে টানা পাঁচ কার্যদিবস শেয়ারবাজার পতনের বৃত্তে আটকে থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা গেছে। আজ ভালো-মন্দ নির্বিশেষে প্রায় সব খাতের শেয়ারেই ঢালাও দরপতন হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরুতে ডিএসইতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও দুপুর ১২টার পর থেকেই পরিস্থিতি প্রতিকূল হতে শুরু করে। বিশেষ করে বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যাপক দরপতন অন্যান্য খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দিনশেষে ডিএসইতে মাত্র ৭৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যেখানে ২৬৬টি প্রতিষ্ঠানের দরপতন হয়েছে এবং ৪৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লভ্যাংশ প্রদানকারী শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১২৯টিরই দাম আজ কমেছে।
সূচকের বিচারে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৭৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসের ধারাবাহিক পতনে সূচকটি মোট ১৩০ পয়েন্ট হারালো। বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। তবে দরপতনের মধ্যেও লেনদেনের পরিমাণ সামান্য বেড়ে ৯৯৮ কোটি ১০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বেশি।
লেনদেনের শীর্ষে আজ আধিপত্য বিস্তার করেছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, যার মোট ৫২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিল যথাক্রমে আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং এনভয় টেক্সটাইল। শীর্ষ ১০ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও স্থান পেয়েছে শমরিতা হাসপাতাল, মালেক স্পিনিং ও বেক্সিমকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) চিত্র ছিল হতাশাজনক। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১০ পয়েন্ট কমেছে। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৪টিরই দাম আজ হ্রাস পেয়েছে। লেনদেনের পরিমাণও গত দিনের তুলনায় কমে ৭৩ কোটি ২২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। বাজারের এই অস্থিতিশীলতা কাটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের প্রথম ধাপ নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে বাস্তবায়ন হয়েছে। এতে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১৩৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আনামুল হক রাষ্টীয় সংবাদ সংস্থা বাসস-কে জানান যে, এই মেগা প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে অত্যন্ত নিপুণ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রথম ধাপের কাজ শেষ করতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর ফলে অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় ১৩৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থেকেছে। প্রকল্প পরিচালকের মতে, ‘এটি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সফল বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ।’ ইতিমধ্যে ভূমি উন্নয়ন, প্রশস্ত সড়ক, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সীমানাপ্রাচীরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ এবং ইলেকট্রোমেকানিক্যাল কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এই অঞ্চলে মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০১টি ইতিমধ্যে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে। বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরে মোহাম্মদ আনামুল হক বলেন, ‘দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল ভালো সাড়া পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইজারা চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে।’ বেপজার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৬২ কোটি মার্কিন ডলার। এসব কারখানা পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে গেলে প্রায় ২ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে এই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে থাকা ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টি চীনের, দুটি দক্ষিণ কোরিয়ার এবং একটি করে কানাডা ও বাংলাদেশের মালিকানাধীন। এসব কারখানায় তৈরি পোশাক, অন্তর্বাস, উন্নত মানের জুতা ও জুতার উপকরণ, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র এবং প্যাকেজিং সামগ্রী উৎপাদিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাস নাগাদ এই অঞ্চলে প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে চারটি ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে।
তৈরি পোশাকের প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে এখানে উন্নত ওষুধ, তামাক শিল্পের যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি প্লেট, ড্রোন এবং হাইড্রোপনিক টেন্টের মতো উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মিরসরাইয়ে ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চলটি প্রশাসনিক সুবিধার্থে দুটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এখানে শুল্কমুক্ত আমদানি-রপ্তানি সুবিধা, কর অবকাশ এবং বেপজার বিশেষ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার উপকেন্দ্র স্থাপনসহ অন্যান্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
বেপজা এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। পরিবেশবান্ধব মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট আয়তনের প্রায় ১৯ দশমিক ৬০ শতাংশ এলাকা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোহাম্মদ আনামুল হক মন্তব্য করেন, ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু একটি বিনিয়োগকেন্দ্র নয়; কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে একসঙ্গে যুক্ত করে এটি দেশের শিল্পায়নে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সব প্রতিষ্ঠান পুরোদমে উৎপাদনে এলে এখান থেকে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব হবে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবনজীবিকার সংস্থান হবে। পরিশেষে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাজেটের চেয়ে কম ব্যয়ে কাজ শেষ করা বেপজার দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছতারই পরিচায়ক।
দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত মার্জিন বিধিমালার সংশোধনী আজ মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক সংশোধিত এই বিধিমালা গতকাল সোমবার রাতে গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর আজ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিশনের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নতুন এই বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণের অনুপাত নির্ধারণের পাশাপাশি বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণের অনুপাত হবে ১:১। অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারী তাঁর নিজস্ব ইক্যুইটি বা পুঁজির সমপরিমাণ অর্থই কেবল ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন। তবে সকল কোম্পানি এই ঋণের আওতায় আসবে না। জীবন বিমা ব্যতীত অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত (PE) ৪০ অতিক্রম করলে অথবা শেয়ারপ্রতি আয় (EPS) ঋণাত্মক হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে কোনো মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিবি (PB) অনুপাত ৩-এর বেশি হলে বা নিট সম্পদ মূল্য (NAV) ঋণাত্মক হলে সেগুলো ঋণের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগকারীর হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ না থাকলে তিনি মার্জিন ঋণের আবেদন করতে পারবেন না। এছাড়া শুধুমাত্র মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোই এই ঋণের সুবিধা পাবে। ‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ ক্যাটাগরির শেয়ারের পাশাপাশি এসএমই বোর্ড, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং ওটিসি প্ল্যাটফর্মের সিকিউরিটিজগুলো ঋণের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় মার্জিন কল বা আগাম নোটিশের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পোর্টফোলিওর ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীকে আগাম নোটিশ প্রদান করবে। যদি ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রির অধিকার থাকবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের। এছাড়া কোনো একক সিকিউরিটিতে মোট বকেয়া মার্জিন ঋণের ২০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্জিন ঋণের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি পৃথক ও ডেডিকেটেড ব্যাংক হিসাব বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে দুই সদস্যের একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকতে হবে, যারা বছরে অন্তত চারটি সভা করবে। কোনো প্রতিষ্ঠান শরিয়াহভিত্তিক ঋণ পদ্ধতি চালু করতে চাইলে তাঁদের অবশ্যই একটি শরিয়াহ সুপারভাইজারি বোর্ড গঠন করতে হবে। বিএসইসি জানিয়েছে, এই নতুন বিধিমালার ফলে বাজারে অধিকতর স্বচ্ছতা ফিরবে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
চোরাচালান প্রতিরোধ ও আমদানি-রপ্তানি আইন লঙ্ঘনের দায়ে আটক ও বাজেয়াপ্ত করা পণ্য দ্রুত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে। এই আদেশের আওতায় নিলামের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ধরনের পণ্য সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে বিক্রয়, হস্তান্তর এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করার বিস্তারিত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বোর্ড কর্তৃক প্রবর্তিত ই-নিলাম বা লাইভ ই-অকশন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে ‘অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্তকৃত পণ্যের নিষ্পত্তি পদ্ধতি সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এই আদেশে স্বাক্ষর করেন। নতুন এই নির্দেশনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২ জুলাই জারি করা পূর্ববর্তী স্থায়ী আদেশটি বাতিল করা হয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে আগের বিশেষ এসআরও কার্যকর থাকবে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কাস্টমস, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড ও আনসারের মতো আটককারী সংস্থাগুলোকে জব্দকৃত পণ্য নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দিতে হবে। মূল্যবান ধাতু, হীরা বা বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের সনদ প্রয়োজন হবে এবং সাময়িকভাবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুযোগ থাকছে। সাধারণ পণ্য গুদামে গ্রহণের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সময়ের কোনো সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। পণ্য জমা দেওয়ার সময় মডেল, ব্র্যান্ড ও মূল্যসহ বিস্তারিত তথ্য রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলে মূল্যবান সামগ্রী বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থানান্তর করতে হবে।
আটককৃত পণ্য চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির আগে তার দাবিদারকে দাবি প্রমাণের জন্য সাত কর্মদিবসের নোটিশ প্রদান করতে হবে। ই-মেইল, কুরিয়ার বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে এই নোটিশ দেওয়া যাবে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালিকানা প্রমাণিত হয় এবং প্রযোজ্য শুল্ক ও জরিমানা পরিশোধ করা হয়, তবে পণ্য খালাসের সুযোগ মিলবে। অন্যথায় পণ্যটি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে। নিলাম প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য কমিশনারের নেতৃত্বে এক বা একাধিক নিলাম কমিটি গঠিত হবে, যেখানে প্রয়োজনে বাইরের বিশেষজ্ঞ সদস্যও রাখা যাবে।
নিলামের ক্ষেত্রে ই-নিলামকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে রাখা হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বা সিল্ড নিলামের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে নিলামের আগেই কিছু পণ্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির সুযোগ রয়েছে। যেমন- বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিএমটিএফ) তাদের জন্য নির্ধারিত ৫৩ ধরনের পণ্য সংরক্ষিত মূল্যের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ দামে কিনতে পারবে। এছাড়া টিসিবি চাইলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ করতে পারবে। মাদক ও বিদেশি সিগারেট পর্যটন কর্পোরেশনের কাছে এবং প্রত্নসম্পদ জাদুঘরে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতামত গ্রহণ করতে হবে।
নিলামে অংশগ্রহণকারীদের জন্য কঠোর যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দরদাতাদের ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, টিআইএন এবং আয়কর রিটার্নের সনদ থাকতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এনআইডি ও আয়কর সংক্রান্ত তথ্য বাধ্যতামূলক। নিলামের কমপক্ষে সাত কর্মদিবস আগে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে এবং এনবিআরের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রথম নিলামে সংরক্ষিত মূল্যের ৬০ শতাংশ দর পাওয়া গেলে তা অনুমোদিত হবে, নতুবা দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় নিলাম ডাকতে হবে। ই-নিলামের ক্ষেত্রে প্রথম দফাই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করা হবে। প্রথমে নিলামের ব্যয় ও ফ্রেইট চার্জ মেটানো হবে, এরপর সরকারি শুল্ক-কর এবং সবশেষে হেফাজতকারীর পাওনা পরিশোধ করা হবে। যদি কোনো দরদাতা বা প্রতিষ্ঠান নিলাম প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের আশ্রয় নেয়, তবে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব পণ্য নিলামে বিক্রিযোগ্য নয় বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলো ধ্বংস করার জন্য কাস্টমস ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করবে। পণ্য ধ্বংসের আগে বিস্তারিত ইনভেন্টরি প্রস্তুত করে কমিটির উপস্থিতিতে তা সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে এনবিআরকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। আদেশের পরিশিষ্টে যানবাহন, ইলেকট্রনিকস ও মেডিকেল সরঞ্জামসহ ৫৩টি পণ্যের তালিকা দেওয়া হয়েছে যা বিশেষ শর্তে হস্তান্তরের যোগ্য। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা জানিয়েছে এনবিআর।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে জুলাই মাসে কানাডার বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে ৩ শতাংশে উঠেছে। এমন এক সময়ে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিল, যার মাত্র কয়েক দিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন কঠোর শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই দ্বিমুখী সংকট কানাডার সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপের সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক পরিহারের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এখন ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর’ পর্যায়ে রয়েছে। তবে আলোচনার গভীরতর বিষয়সমূহ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অনীহা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন প্রকাশ্যে আলোচনা নিয়ে কথা বলার সময় নয়।’
সোমবার দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দায়ী। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাইয়ে পেট্রোলের দাম বেড়েছে প্রায় ২৫.৭ শতাংশ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট অবরোধ এবং জুলাইয়ের শেষভাগে লোহিত সাগরে আংশিক জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকার ফলে পেট্রোলের মূল্যে এই ঊর্ধ্বমুখী চাপের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে জুন মাসে কানাডার মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২.৮ শতাংশ।
জ্বালানির পাশাপাশি বিমান ভ্রমণসহ পর্যটন খাতের বিভিন্ন সেবার ব্যয় বৃদ্ধিও এই মূল্যস্ফীতির পেছনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া বিশ্লেষকদের মতে, কানাডায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে ভোক্তাদের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিও এখানে প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানের ৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত সীমার তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী। তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটবে না ব্যাংকটি। এর কারণ হিসেবে তারা মনে করছেন, দেশটির অর্থনীতির সামনে বর্তমানে আরও বড় ধরনের বাণিজ্যিক ঝুঁকি বিদ্যমান।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কাটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক বিরোধ। বুধবার থেকে কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ভয়াবহ শুল্ক পরিস্থিতি এড়াতে কানাডার একদল আলোচক বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে কয়েক মাস ধরে কানাডার গাড়ি, ইস্পাত, কাঠ ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে যে শুল্কজনিত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। অটোয়া এই সংকট নিরসনে বেশ কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহল ও ওয়াইন কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের বিপণিবিতানগুলোতে পুনরায় বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রাদেশিক সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই কোনো সম্মানজনক সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটন নতুন শুল্ক কার্যকর করলে কানাডা পাল্টা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, তিনি চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন। যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাঁর সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
টিডি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ লেসলি প্রেস্টন মনে করেন, সোমবার প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির এই পরিসংখ্যান কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তে ‘আতঙ্কিত করবে না’। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নমনীয় অবস্থানে রেখেছে। প্রেস্টনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার শুল্ক আরোপের হুমকি এবং তা স্থগিত করার বিষয়টি কানাডার অর্থনীতির জন্য একটি ‘আস্থার বড় ধাক্কা’ হিসেবে কাজ করছে। ১৯ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ৫০ শতাংশ শুল্ক এড়াতে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কানাডার অর্থনীতি গভীর ঝুঁকির মধ্যেই অবস্থান করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ও উত্তপ্ত রূপ নিয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২৭ সেন্ট বা ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১.১৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী সেশনেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল।
একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড অয়েলের ক্ষেত্রেও। আজ ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৪২ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫.০৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এটি ব্যারেলপ্রতি ৮৫.৩৭ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল, যা ১ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা এবং তেহরানের আক্রমণাত্মক অবস্থানই মূলত বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান সংকট নিরসনে ওয়াশিংটনের অনমনীয় অবস্থান এবং তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি—উভয় দিক থেকেই উত্তেজনার পারদ চড়ছে। এই বৈশ্বিক সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহনের প্রধান রুটগুলো হুমকির মুখে পড়তে পারে, যার ফলে তেলের দাম আরও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে তামার দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতনামা খনি কোম্পানি বিএইচপি-র বার্ষিক মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতের আমূল পরিবর্তনের ফলে এই ধাতুর চাহিদা এখন তুঙ্গে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
মঙ্গলবার বিএইচপি তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, ৩০ জুন সমাপ্ত হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আয়ের পরিমাণ ১৪.৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮ বিলিয়ন ডলারে। তামা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানে থাকা এই কোম্পানিটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে তারা এই ধাতুর উৎপাদন আরও প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। চলতি অর্থবছরে বিএইচপি রেকর্ড পরিমাণ লৌহ আকরিক উৎপাদন করার পাশাপাশি কয়লা ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও সাফল্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তামা।
ভবিষ্যতেও এই তামা কোম্পানিটির অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএইচপির প্রধান নির্বাহী ব্র্যান্ডন ক্রেইগ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘তামাই বিএইচপির প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।’ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তামার গড় বাজারদর গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে কোম্পানির আয়ের চিরাচরিত প্রধান উৎস লৌহ আকরিককে পেছনে ফেলে তামা শীর্ষস্থান দখল করেছে। বিএইচপির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো মোট পরিচালন মুনাফার অর্ধেকেরও বেশি অংশ এসেছে তামা খাত থেকে।
বিএইচপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে তামার বার্ষিক চাহিদা ৫ কোটি টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে নতুন বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক তৈরির প্রয়োজন হবে, যেখানে বিপুল পরিমাণ তামার ব্যবহার অনিবার্য। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান প্রসারের ফলে ডেটা সেন্টারগুলোতেও এই ধাতুর প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বাড়বে। তবে কোম্পানিটি তামার বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের সতর্কবার্তাও প্রদান করেছে। তাদের মতে, বর্তমানে বিদ্যমান খনিগুলো ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং নতুন বড় কোনো খনি প্রকল্পের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ব্যবসায়িক এই সাফল্যের প্রেক্ষাপটে বিএইচপি তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রতি শেয়ারে ১.৭২ মার্কিন ডলার হারে লভ্যাংশ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই ঘোষণার পর সব মিলিয়ে লভ্যাংশের মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে। এদিকে লভ্যাংশের সংবাদ ও মুনাফার খবরে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দিনের শুরুর লেনদেনেই বিএইচপির শেয়ারের দর ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৪.২৪ অস্ট্রেলীয় ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে। তবে বিশ্বের বৃহত্তম এই অর্থনীতির দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়ায় সোমবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর আগে মার্কিন শেয়ারবাজার ওয়াল স্ট্রিটেও বড় ধরনের দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছিল। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ফেডারেল রিজার্ভ আগামী মাসেও সুদের হার বাড়াতে পারে। সেই প্রত্যাশায় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাকের সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে শ্রমবাজারের গতি ধীর হওয়া এবং খুচরা বিক্রির হার কমে যাওয়ার তথ্য আসায় সেই উদ্দীপনায় ভাটা পড়েছে। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বিক্রির পরিমাণ আগের মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা গত এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ভোক্তা আস্থাও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যা মার্কিন অর্থনীতির শক্তি নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে।
বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, অর্থনীতির এই দুর্বলতা ফেডকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে বাধ্য করবে। ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা মনে করেন, কর্মসংস্থান ও খুচরা বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে মার্কিন অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে আসছে। ফলে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ক্ষীণ। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা যেখানে ৫০ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে মাত্র ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
মার্কিন অর্থনীতির এই অনিশ্চয়তার প্রভাব এশীয় বাজারেও অনুভূত হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি খাতের হাত ধরে কিছু বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরার চেষ্টা করছে। হংকংয়ের বাজারে প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবা, টেনসেন্ট এবং জেডি ডটকমের শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এছাড়া সাংহাই ও তাইপের বাজারেও দরবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। জাপানের টোকিও বাজার প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কিওক্সিয়া এবং সফটব্যাংকের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। তবে সিডনি, সিঙ্গাপুর এবং ম্যানিলার শেয়ারবাজারগুলোতে সামান্য দরপতন দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি সপ্তাহে ওয়ালমার্ট, হোম ডিপো এবং টার্গেটের মতো বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। এই প্রতিবেদনগুলো থেকে মার্কিন ভোক্তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা এবং ব্যয়ের প্রবণতা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, শুক্রবার অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের যে দরপতন হয়েছিল, সোমবারও সেই ধাক্কা পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি মার্কিন এই মুদ্রাটি। সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন।