দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
দেশে নতুন ব্যাংকনোট মুদ্রণের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় গত এক বছরে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অডিটেড ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট বা নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোট ছাপাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট খরচ হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এটি আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) ২৩৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকার তুলনায় প্রায় ৯৫.৪৬ শতাংশ বা ২২৪ কোটি টাকারও বেশি। দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এই নিয়মিত মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এমন বিশাল ব্যয় বৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে টাকা তৈরির বিশেষ নিরাপত্তা কাগজ ও কালি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বৈশ্বিক বাজারে এসব কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজার না থাকায় দরকষাকষির সুযোগ কম থাকে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন নোটের ছাপানোর পরিমাণ খুব একটা না বাড়লেও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাই মূলত ব্যয়ের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের ওঠানামা এই ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খুব একটা ভূমিকা রাখেনি। এক বছরের ব্যবধানে ডলারের দাম মাত্র ৮ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় মুদ্রণ খরচে এর প্রভাব ছিল নগণ্য। এছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে নোটের নকশা পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটির ব্যয়ও এই উচ্চ ব্যয়ের জন্য দায়ী নয়। নকশা পরিবর্তনের কাজ মূলত নামমাত্র খরচে সম্পন্ন হয় এবং এতে মুদ্রণে সামান্য জটিলতা তৈরি হলেও আর্থিক ব্যয়ের মূল ভারটি বহন করতে হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিকে।
বিগত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই ব্যয়টি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত নোট মুদ্রণ ব্যয় ৩৩৭ কোটি থেকে ৩৮৪ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মূলত আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার ফলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গত অর্থবছরে নোট ব্যবস্থাপনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ গুনতে হয়েছে।
দেশীয় স্পিনিং মিল মালিকদের দীর্ঘদিনের বিরোধিতা ও পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের বর্জ্য সুতা (ওয়েস্ট ইয়ার্ন) আমদানির অনুমতি প্রদান করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে আমদানিকৃত এই কাঁচামালের অপব্যবহার রোধে কঠোর শর্ত হিসেবে ‘ব্যাংক গ্যারান্টি’ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সোমবার এনবিআরের দ্বিতীয় সচিবের সই করা এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এইচএস কোড ৫৫০৫, ৫৫০৬ ও ৫২০৭-এর অন্তর্ভুক্ত নির্দিষ্ট মানের বর্জ্য সুতা এখন থেকে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা যাবে। তবে এই সুবিধা কেবলমাত্র বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার জন্য প্রযোজ্য হবে। আমদানির সময় প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থের একটি নিঃশর্ত ও অপরিবর্তনীয় ব্যাংক গ্যারান্টি কাস্টমস স্টেশনে জমা রাখতে হবে। উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে সেই গ্যারান্টি পুনরায় অবমুক্ত করা হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত নিম্ন ও মধ্যমূল্যের পোশাক এবং নিটওয়্যার তৈরিতে এই সাশ্রয়ী কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। বৈশ্বিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অন্যদিকে, স্পিনিং মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, অনিয়ন্ত্রিত আমদানির ফলে দেশীয় সুতা শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দুই পক্ষের এই মতপার্থক্য দূর করতে একটি বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশের ভিত্তিতে এনবিআর ভারসাম্যমূলক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত থাকার ফলে আমদানিকৃত সুতা কেবল রপ্তানি পণ্য উৎপাদনের জন্যই ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা সঠিকভাবে তদারকি করা সম্ভব হবে। পোশাক রপ্তানিকারকরা জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির এই কঠিন সময়ে কাঁচামাল সংগ্রহে কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাসায়নিক আমদানির ক্ষেত্রে জাপানের ওপর অতিরিক্ত ‘জামানত’ বা ফি আদায় শুরু করেছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি অনুযায়ী, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার দরের চেয়ে পরিকল্পিতভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করে চীনের স্থানীয় শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার থেকেই নতুন এই বাণিজ্যিক কড়াকড়ি কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জাপান থেকে আমদানি করা ‘ডাইক্লোরোসিলেন’ নামের রাসায়নিকের বিষয়ে গত জানুয়ারি থেকে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করা হয়েছিল। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদন শিল্পে এই রাসায়নিকটির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী রাষ্ট্র হলো জাপান। এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানি নেতৃত্বের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সোমবার চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ‘প্রাথমিক প্রমাণে দেখা গেছে, জাপান থেকে আমদানি করা পণ্যগুলো ডাম্পিংয়ের বা কম দামে পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত এবং এতে চীনের ডাইক্লোরোসিলেন শিল্প উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।’ এই ক্ষতির হাত থেকে দেশীয় শিল্পকে বাঁচাতে ‘নিরাপত্তা জামানত’ হিসেবে সাময়িক এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ধারিত হারে এই অতিরিক্ত অর্থ জমা দিতে হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অধিকাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য জামানতের হার ৯৯ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে টোকিওভিত্তিক ডেনাল সিলেনের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কমিয়ে ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। জাপানি রাসায়নিক খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান শিন-এৎসু কেমিক্যাল এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি তাদের ব্যবসার ‘খুবই ছোট একটি অংশ এবং সামগ্রিক ব্যবসায় এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে না’।
চীনের এমন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জাপান সরকার। দেশটির মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা এক নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন যে, টোকিও এই বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ‘যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাপান এরই মধ্যে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।’ তবে এই ব্যবস্থা ঠিক কতদিন স্থায়ী হবে বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে আসবে, সে বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে সুগন্ধি চাল রপ্তানির পূর্বানুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে, ইতিপূর্বে অনুমোদন পাওয়া ২৭৮টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত চালের পরিমাণ এখন থেকে অর্ধেকে নেমে আসবে। এই সংশোধিত নিয়মটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ বলবৎ থাকবে। এর ফলে বড় বড় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে মাঝারি ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের সকল রপ্তানিকারকের ওপর এই নতুন বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।
রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক হিসাব রাখতে সরকার ১০টি কঠোর শর্তারোপ করেছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রপ্তানিকারকদের অবশ্যই রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭-এর সকল বিধান যথাযথভাবে পালন করতে হবে। প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের গুণগত মান ও তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করবে এবং জাহাজীকরণের কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় জমা দিতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের কাঙ্ক্ষিত মূল্য বজায় রাখতে প্রতি কেজি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য বা এফওবি রেট ১.৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই রপ্তানি অনুমোদন হবে সম্পূর্ণ অহস্তান্তরযোগ্য এবং কোনো প্রতিষ্ঠানই সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে অন্য কাউকে দিয়ে পণ্য পাঠাতে পারবে না। এমনকি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই সরকার যেকোনো সময় এই অনুমতি বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। রপ্তানি আয়ের সত্যতা প্রমাণের জন্য পিআরসি বা প্রসিডস রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ভবিষ্যতে নতুন করে রপ্তানি অনুমোদনের আবেদন করতে হলে আগের কোটার বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রমাণাদি দাখিল করতে হবে।
তথ্যানুযায়ী, এর আগে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৪৫ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন চাল রপ্তানির অনুমতি থাকলেও গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মাত্র ২ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন চাল বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে মূল দর্শন হলো বৈদেশিক মুদ্রার অর্জনের চেয়ে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। অভ্যন্তরীণ বাজারে সুগন্ধি চালের দাম সাধারণের নাগালে রাখা এবং কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় এই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূলত চাল রপ্তানি একবারে বন্ধ না করে একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে আনাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।
উত্তর আমেরিকার দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্যের ওপর কানাডার ঘোষিত পাল্টা শুল্ক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের মধ্যকার চলমান বাণিজ্য বিরোধ এক নতুন ও জটিল মোড় নিল।
কানাডা সরকার প্রধানত যন্ত্রপাতি, বস্ত্র, ইস্পাত, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, কৃষি উপকরণ এবং দুগ্ধজাত পণ্যসহ ৭০০-এর অধিক পণ্যের ওপর এই নতুন শুল্ক আরোপ করেছে। আমদানিকৃত এসব পণ্যের ধরন অনুযায়ী শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, কানাডার শ্রমিক, কৃষক, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতেই ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে এই পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। মূলত ওয়াশিংটনের নেওয়া শুল্ক নীতির সমপরিমাণ জবাব দিতেই অটোয়া এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল গত জুলাই মাসে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ঘোষণা করেন। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সঙ্গে কানাডার ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’-এর অভিযোগ তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আগস্ট মাসে দুই দেশ একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনায় বসলেও ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা সম্ভব হয়নি। এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাল্টা শুল্কের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিকদের সহায়তায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার। তবে এই শুল্ক যুদ্ধ কেবল কর আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; কানাডার এই পদক্ষেপের ঠিক আগের দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকে যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিক্রি বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শুরু না করলে প্রতিষ্ঠানটি দেশটিতে নিষিদ্ধ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। এমনকি উত্তেজনার এক পর্যায়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারের জন্য অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার বিতর্কিত নির্দেশও দিয়েছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার এই পাল্টা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি নির্মাতাদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ কানাডা তাদের তৈরি গাড়ির অন্যতম প্রধান বাজার। অন্যদিকে, আল জাজিরায় প্রকাশিত কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক নীতির কারণে দেশটির অভ্যন্তরে অন্তত ৫৫০ ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। ঐ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই শুল্কের ফলে সৃষ্ট মোট আর্থিক বোঝার প্রায় ৯৬ শতাংশই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে যাবে।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা পণ্য অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলামে বিক্রির মাধ্যমে গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৫৯৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এর মধ্যে গত দেড় বছরেই আয় হয়েছে ২৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা নিলাম রাজস্বে একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্য সরানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্বও বাড়ছে।
কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনার খালি করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় নিলামযোগ্য পণ্য নিলামে বিক্রি করা হচ্ছে এবং নিলামের উপযোগী নয়-এমন পণ্য ধ্বংস করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ২৪টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিলামে ১ হাজার ৮১৪টি লট বিক্রি করে ১১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়।
২০২২ সালে ৪২টি নিলামের মাধ্যমে ১ হাজার ৩৮১টি লট বিক্রি করে আয় হয় ১৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে ২৩টি নিলামে ৬৩২টি লট বিক্রি করে রাজস্ব আসে ৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
২০২৪ সালে ৫৫টি নিলামের মাধ্যমে ৫১১টি লট বিক্রি করে ২৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা আয় হয়। ২০২৫ সালে ৬০টি নিলামে ১ হাজার ৪০টি লট বিক্রি করে আয় হয় ১২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৪৫টি অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ৩৮৩টি লট বিক্রি করে ১৫৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আয় হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কে এম কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোরশেদ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানান, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিলাম ব্যবস্থাপনা, পণ্যের তালিকা প্রস্তুত (ইনভেন্টরি) এবং নিলামকৃত পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার কাজে তার প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিলামের মাধ্যমে ২৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে, যা এত স্বল্প সময়ে নিলাম থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার সহকারী কমিশনার আবু সুফিয়ান বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী খালাস না হওয়া পণ্য অনলাইন ও প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে নিলামের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিলাম করা পণ্য বিক্রি থেকে রাজস্ব আয়ও বেড়েছে।’
তিনি আরও জানান, নিলামের উপযোগী নয়-এমন পণ্য সরিয়ে বন্দরের ইয়ার্ড খালি করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়ছে, অন্যদিকে বন্দরের সক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রোববার দেশটির কর্তৃপক্ষ মূলত অধিক পরিমাণ পেট্রোল ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের প্রচলিত জ্বালানি নীতি অনুযায়ী পেট্রোলের দাম তিনটি স্তরে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে একজন গ্রাহক প্রতি মাসে প্রথম ৬০ লিটার ব্যবহারের জন্য প্রতি লিটারে ১,৫০০ তোমান এবং পরবর্তী ৫০ লিটারের জন্য ৩,০০০ তোমান পরিশোধ করেন। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগে প্রতি লিটারে ৫,০০০ তোমান দিতে হলেও এখন থেকে তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তোমান হলো ইরানে ব্যবহৃত একটি অনানুষ্ঠানিক মুদ্রা একক, যা ১০ ইরানি রিয়ালের সমান।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক বিবৃতিতে জানান, "তৃতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম দ্বিগুণ করে প্রতি লিটার ১০ হাজার তোমান করা হবে।" এই নতুন দাম স্থানীয় সময় ৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মোহাজেরানি আরও স্পষ্ট করে বলেন, "বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে বিভিন্ন দামের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে শেষ পর্যন্ত প্রতি লিটারে ১০ হাজার তোমান দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।" তবে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ইরানে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম। সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করে আসছে, যা দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে পরিচিত। পেট্রোলের দাম বাড়ানোর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মানে রেকর্ড দরপতন হয়েছে। গত রোববার কালোবাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে একটি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এই হার ছিল প্রায় ১৭ লাখ রিয়াল।
ইরানের ওপর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ঘোষিত 'অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ' নীতির অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানের আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে আনা। এই নতুন পদক্ষেপগুলো মূলত ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞারই ধারাবাহিকতা। ইরান যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করতে না পারে, সেজন্য দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দ্বিমুখী চাপে ইরানের অর্থনীতি এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (বিটিটিএফ) ২০২৬’। দেশের পর্যটন শিল্পের প্রসার এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এই মেলার আয়োজন করছে। আয়োজকরা আশা করছেন যে এবারের আসরে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিস্তারিত তুলে ধরেন টোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ। তিনি জানান, ইতোমধ্যে নেপাল, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ এবং ফিলিপাইনের পর্যটন প্রতিনিধিরা মেলায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবসহ আরও বেশ কিছু দেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের আয়োজনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রধান পৃষ্ঠপোষক বা টাইটেল স্পন্সর হিসেবে যুক্ত থাকছে।
মেলায় মোট চারটি হলের অধীনে ২০০টিরও বেশি বুথ ও স্টলে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স, হোটেল, ট্যুর অপারেটর এবং পর্যটন বোর্ডগুলো তাদের আকর্ষণীয় অফার ও সেবা তুলে ধরবে। টোয়াব সভাপতির তথ্যমতে, মেলায় ২২০টিরও বেশি প্রদর্শক প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে এবং প্রায় ৬০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আড়াই হাজার বাণিজ্যিক প্রতিনিধি এবং ২৫০ জন বায়ারের উপস্থিতিতে মেলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ নেবে।
মোহাম্মদ হানিফ তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিটিটিএফ গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন বাজারে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই মেলার মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি পাবে, তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং এবং অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। মেলাটি আয়োজনে সহযোগিতা করছে পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং এফবিসিসিআই-সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর।
এল নিনোর প্রভাব এবং পশ্চিম আফ্রিকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে টানা ছয় মাস ধরে কোকোর দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত আগস্ট মাসে পণ্যটির দাম ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মেট্রিক টন ৬ হাজার ৭৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং জলবায়ুজনিত সমস্যার কারণে গত মাসে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ায় গমের দাম প্রতি বুশেলে ২১ শতাংশ বেড়েছে। দেশ দুটির মধ্যে চলমান সংঘাত এবং বন্দরগুলো বন্ধ থাকায় কৃষ্ণসাগরে শস্য লোডিং কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ব্রাজিলে উৎপাদন হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফলন কম হওয়ার কারণে ভুট্টার দাম ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় সয়াবিনের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এ পণ্যে চীনের ব্যাপক চাহিদার ফলে সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
এশিয়ার প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারতে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রত্যাশার চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টির কারণে চালের দাম ৯ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। তবে ব্রাজিলে বৃষ্টির পূর্বাভাসের কারণে কফির দাম ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় চিনির দাম ২১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, কারণ ইথানল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে আখ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে তীব্র গরম ও খরার কারণে তুলার দাম ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইতালীয় ব্যাংকিং গ্রুপ ইন্তেসা সানপাওলোর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ দানিয়েলা কোরসিনি আনাদোলুকে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে এল নিনোর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কোকোর দাম বেড়েছে।” তিনি আরও সতর্ক করে জানান যে, আগামী মাসগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকায় সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া হারমাটান বাতাস এই অঞ্চলের কোকো গাছগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কোরসিনি আরও বলেন, “এর ফলে অনেক বিশ্লেষক ২০২৬-২৭ সালের বৈশ্বিক উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছেন এবং কেউ কেউ সতর্ক করেছেন যে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে, বিশেষ করে এশিয়ায়, বিশ্ববাজার আবার ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।”
রাবোব্যাংকের কমোডিটি বিশ্লেষক ওরান ভ্যান ডর্ট আনাদোলুকে জানান যে, আইভরি কোস্ট এবং ঘানায় শস্যের ধীর বিকাশ এবং এল নিনোর ঝুঁকি কোকোর বাজারে এই তেজ সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও যোগ করে বলেন, “আমার মতে, বর্তমান পরিস্থিতির অনেকখানিই গণমাধ্যমের এল নিনোর নেতিবাচক চিত্রায়ন এবং মধ্যবর্তী ফসল নিয়ে উদ্বেগের কারণে ঘটছে, যা বাজারে এক ধরনের ফটকা প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।” গত বছর খরার উদ্বেগ কমায় কোকোর দাম ৪৪ শতাংশের বেশি কমলেও এ বছরের শুরু থেকেই তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে দাম কিছুটা কম থাকলেও মার্চ মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পণ্যটির মূল্য বেড়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়া ও যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব খাদ্য পণ্যের বাজারে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে।
সোমবার বিশ্ববাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) তাদের মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জাপানি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন—এমন প্রত্যাশায় দীর্ঘদিনের চাপে থাকা ইয়েনের ব্যাপক দরপতন ঠেকিয়ে তা শক্তিশালী অবস্থানে ফিরেছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আগামী শুক্রবার প্রকাশিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির তথ্য। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই চলতি মাসের শেষের দিকে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, যা মূলত মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ সম্ভাবনা কাজ করছে যে, গত শুক্রবারের শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর ফেডারেল রিজার্ভ এই মাসেই সুদের হার বাড়াতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে এই সপ্তাহের মুদ্রাস্ফীতির পরিসংখ্যানের ওপর।
সোমবার জাপানি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান ১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ১৫৪ দশমিক ৪২-এ নেমে এসেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। এর আগে গত আগস্টে ওয়াশিংটন ও টোকিও যৌথভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করলেও ইয়েনের মান ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে মূলধন প্রত্যাবাসন এবং মার্কিন রাজনৈতিক চাপের কারণে ইয়েন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এমইউএফজি-র সিনিয়র কারেন্সি অ্যানালিস্ট লি হার্ডম্যান এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, "এ বছর আমরা যখনই হস্তক্ষেপের পর ইয়েনকে শক্তিশালী হতে দেখেছি, ১৫৫ স্তরটি ডলার/ইয়েনের জন্য একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই স্তরটি অতিক্রম করা একটি ইতিবাচক সংকেত এবং আমরা ইয়েনের আরও উন্নতি দেখতে পারি।" তিনি আরও যোগ করেন, "বাজার এত দিন বিষয়টিকে একতরফা মনে করেছিল যে ইয়েন কেবল দুর্বলই হবে। কিন্তু ব্যাংক অব জাপান সুদের হার বাড়ানোর গতি বৃদ্ধি করায় এখন তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।"
ইয়েনের এই শক্তিশালী অবস্থানের কারণে অন্যান্য মুদ্রার ওপরও প্রভাব পড়েছে। ইয়েনের বিপরীতে ইউরো ১ শতাংশ কমে ১৭৯ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। তবে ডলারের বিপরীতে ইউরো ও পাউন্ড সামান্য শক্তিশালী হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও (ইসিবি) বৈঠকে বসবে, যেখানে ইউরো জোনের সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বিবিএইচ-এর গ্লোবাল হেড অফ মার্কেটস স্ট্র্যাটেজি ইলিয়াস হাদ্দাদ বলেন, "মুদ্রাস্ফীতির তথ্য যদি বেশি আসে (হট সিপিআই প্রিন্ট), তবে সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার বৃদ্ধি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে এবং ইউএস ডলার আরও শক্তিশালী হবে। তবে তথ্য যদি আশাব্যঞ্জক বা শীতল হয়, তবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা বাড়বে এবং ডলার কিছুটা দুর্বল হতে পারে।" তিনি আরও মনে করেন, সুদের হার বৃদ্ধি পেলেও ডলার যে নতুন কোনো উচ্চতায় পৌঁছাবে এমন সম্ভাবনা কম, কারণ অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের নীতি কঠোর করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংক অব জাপানের বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন ৭৫ শতাংশ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গ্লোবাল হেড অফ রিসার্চ এরিক রবার্টসেন বলেন, যদি ইয়েন ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকে, তবে এটি ইঙ্গিত দেবে যে ইয়েন এবং ডলারের সুদের হার বৃদ্ধি বিনিয়োগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির নজর এখন শুক্রবারের মার্কিন মুদ্রাস্ফীতির তথ্যের দিকে।
চীনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন করে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া গত রোববার জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মোট ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান বা ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের এই তহবিল প্রদান করা হবে। সিনহুয়া আরও জানিয়েছে, এই অর্থায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতিতে ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বেইজিং যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, এটি তারই সর্বশেষ উদাহরণ। বর্তমানে চীন বাণিজ্য সংঘাত, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে যাওয়াসহ নানা বহুমুখী প্রতিকূলতার মোকাবিলা করছে। এই বিশাল আর্থিক প্যাকেজের আওতায় তিনটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও পাঁচটি বিমা কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশনের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, এই অর্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের অর্থনীতিতে ঋণ দেওয়ার জন্য আরও বেশি অর্থ দেবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাইরের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও বাড়াবে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘকাল ধরেই আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। বর্তমানে শ্রমবাজারের সংকট, দীর্ঘস্থায়ী আবাসন মন্দা এবং প্রযুক্তির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে চীন তার অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি লক্ষণীয়ভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার অভাব এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্য দেশটির শক্তিশালী রপ্তানি খাতকেও ম্লান করে দিয়েছে। গত জুলাই মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম।
গত মার্চ মাসে চীন চলতি বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে, যা ১৯৯১ সালের পর দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন লক্ষ্যমাত্রা। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে চীন প্রকারান্তরে বর্তমান অর্থনীতির ভঙ্গুর দশাকেই স্বীকার করে নিয়েছে বলে একটি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। সব মিলিয়ে নতুন এই মূলধন জোগান চীনের অর্থনৈতিক ভিতকে মজবুত করতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি বাড়লেও তা সরকারের জন্য বিশেষ কোনো স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি। নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে অর্থ এসেছে, তার প্রায় পুরোটা চলে গেছে পুরনো সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের আসল টাকা ফেরত দিতে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের নিট ঋণপ্রাপ্তি ছিল একেবারেই সামান্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে, একই সময়ে গ্রাহকদের মেয়াদপূর্তি ও মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙানো বাবদ আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ফলে পুরো অর্থবছর শেষে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি ছিল ৬৮ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট বিক্রি ৩৫ শতাংশের বেশি বাড়লেও নিট ঋণ বাড়েনি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত নিট অর্থ বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তবে প্রকৃত প্রাপ্তি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বাড়ার পেছনে প্রধানত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় দায়ী। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় অনেকেই জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন। এছাড়া গত অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর বেশি মুনাফা দেওয়ায় অনেকে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সরিয়ে বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছেন।
সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত ঋণ না পাওয়ায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বছরের শেষ মাস জুনের তথ্যে দেখা যায়, সে মাসেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে ভাঙানোর পরিমাণ বেশি ছিল। জুন মাসে ১০ হাজার ২২৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ১০ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। ফলে শেষ মাসে সরকারকে উল্টো ৩৬৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ পাওয়ার চিত্র নিম্নমুখী। ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তী দুই অর্থবছর (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং সরকারকে নতুন ঋণের বদলে উল্টো হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট ঋণ ইতিবাচক হলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় অত্যন্ত কম।
বাংলাদেশের বিদ্যমান কোম্পানি আইনকে বিশ্বমানের এবং আধুনিক করার লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের আইনে ব্যাপক সংশোধনী আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। মূলত ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজতর করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং ব্যবসায়িক সুশাসন নিশ্চিত করাই এই নতুন সংস্কারের মূল লক্ষ্য। সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া সংশোধনীর ওপর আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ব্যবসায়ীদের সুচিন্তিত মতামত নিয়ে একটি কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৯৪ সালের পর কোম্পানি আইনে মাত্র দুটি ছোটখাটো সংস্কার হয়েছে। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে যুগোপযোগী করতে হবে। এ জন্য নতুন করে আদর্শ নির্ধারণে খুব বেশি কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যেখানে ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করছে। সেসব দেশের উদাহরণ আমরা নিতে পারি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইনের এই সংস্কার মূলত এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বহুমুখী পদক্ষেপের একটি অংশ মাত্র।
আইনের খসড়া বিশ্লেষণের জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সময়ের আবেদন জানানো হলে মন্ত্রী তা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি বলেন ৬০ দিন সময় লাগবে, তাহলে ৬০ দিন নেন। এর আগে আমি করে কী করব? আপনারা প্রস্তুত না থাকলে যখন প্রস্তুত হবেন, তখন জানাবেন। প্রস্তুত হয়ে জানালে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাব।’ মন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘এটা কয়েকশ উপাদানের মধ্যে একটি এলিমেন্ট। কোম্পানি আইন সংশোধন তার মধ্যে মাত্র একটি। তাই ৩০ দিন সময় নিলে নিন। তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসুন।’
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, এক ব্যক্তি কোম্পানি বা ওপিসি গঠনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন সাধারণ উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে নিবন্ধনের জন্য সর্বনিম্ন পরিশোধিত মূলধনের সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোম্পানির উদ্দেশ্য বা সংঘস্মারক পরিবর্তনের জন্য এখন আর উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না; জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রারের অনুমোদনের মাধ্যমেই তা সম্পাদন করা সম্ভব হবে। প্রথমবারের মতো কোম্পানি আইনের অধীনে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর-কে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটালাইজেশনকে ত্বরান্বিত করতে এবার ইলেকট্রনিক উপায়ে কোম্পানির নথিপত্র সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। মানিলন্ডারিং ও কর ফাঁকি রোধে ‘হিতগ্রাহী স্বত্ব’ বা প্রকৃত মালিকানার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমাদের সবার জন্য একটা ট্রানজিশন টাইম। মাথা ঠান্ডা রেখে ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এই সময়টা পার হতে হবে। বাস্তবভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।’ সভায় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম-এর নোটিশের সময়সীমা এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন।