দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্প দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প শুরুর সময় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসত তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছিল।
এ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় চারটি উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসিফরজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রকল্পের ফলাফল প্রমাণ করে, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে শিল্পখাতের রূপান্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্রান্ট কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব সহায়তার মাধ্যমে পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং নতুন বিদেশি বাজারে প্রবেশে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ইআরএফের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন (কো-ইনভেস্টমেন্ট) এসেছে, যা সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে।
প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।
প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের গড় রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।
এছাড়া ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে ইসিফরজে প্রকল্প। এর আওতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এছাড়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি) এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নকাজও সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তিসেবা, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে। তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই নারী।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় তিন গুণ।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আব্দুর রহমান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সফল অংশীদারত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে ইসিফরজে প্রকল্পকে উল্লেখ করেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্ভাবনী দিক ছিল অনুদান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সংস্থা উপকারভোগী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি এবং নির্ধারিত অগ্রগতি যাচাইয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড়ের কাজ পরিচালনা করেছে। এতে একদিকে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও উৎসাহিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য তারই প্রমাণ।
সুত্র: বাসস
আমদানি দায় পরিশোধের কারণে ডলারের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক বাজার ও রেমিট্যান্স চ্যানেল থেকে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দরে ডলার না কেনার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অলিখিত নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে রেখে ডলারের দর একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরে রাখতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই আকস্মিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে বেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ব্যাংকারদের তথ্যমতে, আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার আশপাশে থাকলেও, রেমিট্যান্স চ্যানেল থেকে আসা ডলার কোনোভাবেই ১২৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সার নিচে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তঃব্যাংক বাজারে এভাবে সর্বোচ্চ দর নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় অনেক ব্যাংকই ওই দরে লেনদেন করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও ব্যাংকারদের মতে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর রাখতে হলে ডলারের দর সম্পূর্ণভাবে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত; নতুবা কৃত্রিমভাবে দর নিয়ন্ত্রণ করলে আন্তঃব্যাংক বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডলারের দর কম রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন পদক্ষেপ নিলেও, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার জোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। এদিকে গত জুনের শেষ দিক থেকেই বাজারে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং গত সোমবার অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা দরে আমদানির ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধ করেছে। এর মধ্যেই চলতি জুলাই মাসে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় তাদের প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, নতুন এই ঋণ কর্মসূচিতে চুক্তিবদ্ধ হতে হলে আইএমএফের পূর্ববর্তী শর্ত অনুযায়ী বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা এবং বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ সীমিত রাখার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে সরকারি এলসির অর্থ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসির মাধ্যমে আমদানি দায় নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে গত জুন মাসে দেশে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ গত আট মাসের মধ্যে একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ডলারের প্রবাহের তুলনায় বহির্গমন বেশি হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এই অসম চাপ তৈরি হয়েছে এবং টাকার অবমূল্যায়নের আশঙ্কায় গত প্রায় দেড় মাস ধরে বাজার থেকে ডলার কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ ডলার সংকট ও অস্থিরতা এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি দ্বিপক্ষীয় (জিটুজি) চুক্তির আওতায় চলতি বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য প্রায় ১৬ হাজার ৮৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা মূল্যের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির একটি বিশাল প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ৩৩তম সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই যুগান্তকারী সুপারিশ করা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে সমঝোতা অনুযায়ী নির্ধারিত প্রিমিয়াম, আমদানির পরিমাণ এবং প্রচলিত সূচক মূল্য বিবেচনা করে মোট ছয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিস্তারিত প্রস্তাব সভায় উত্থাপন করা হয়েছিল। প্রস্তাবনা অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইএনওসি, চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল), থাইল্যান্ডের ওকিউটি এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি থেকে সরকারি পর্যায়ে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে।
জ্বালানি তেল আমদানির এই বৃহৎ প্রস্তাবের পাশাপাশি ওই একই সভায় দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অবকাঠামো সংক্রান্ত আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন ও ঝুঁকি হ্রাস (রিভার)’ প্রকল্পের আওতায় একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে বগুড়া জেলার ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-কাম-বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ১২৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং আহাদ বিল্ডার্স-এর যৌথ উদ্যোগকে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘দেশব্যাপী সার সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুরে ১০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি সার বাফার গুদাম নির্মাণে ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার কার্যাদেশ এমবিএল-আরইএল যৌথ উদ্যোগের অনুকূলে দেওয়ার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংশোধিত সমন্বিত বিদ্যুৎ ট্যারিফ অনুমোদনের সুপারিশও এই সভায় গৃহীত হয়েছে। আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড পরিচালিত ৪৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল (উত্তর) বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই নতুন ট্যারিফ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি ইউনিট বা কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের সমন্বিত ট্যারিফ ৪ দশমিক ০৯৪৫ মার্কিন সেন্ট বা ৫ দশমিক ০২৮১ টাকা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হিসাবের ভিত্তিতে এই দর ঠিক করা হয়েছে, যেখানে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর, ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টর, ৬ শতাংশ ইকুইটির ওপর মুনাফার হার, প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৮০ পয়সা এবং প্রতি এক হাজার স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট (এসসিএফ) গ্যাসের মূল্য ৪৩৮ টাকা ৯১ পয়সা বিবেচনা করে এই নতুন ট্যারিফ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়াতে তিনটি পৃথক ক্রয় প্রস্তাবও এই সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাব-জোন ৬, ৭, ১১ ও ১৮-এ উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা নির্মাণের জন্য ১২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার কার্যাদেশ মনিকো লিমিটেডকে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানকার বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক নির্মাণ প্রকল্পে ২১১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার কার্যাদেশ রেভেরি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের অনুকূলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর বাইরে ‘জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্পের পরামর্শক সেবার চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি ও ব্যয় সংশোধনের প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে পরামর্শক সেবার ব্যয় ৮৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার চেইল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, ইউশিন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন এবং বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্ল্যানিং কনসালট্যান্টস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক সেবা প্রদান করছে।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বর্তমানে সুসংহত অবস্থানে রয়েছে অতিক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাত। বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তৃণমূল পর্যায়ে শিল্পায়ন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে এই খাতের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন তিন কোটিরও বেশি মানুষ। দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ১৭ লাখ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আওতাভুক্ত। গত এক দশকে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় নতুনত্ব এসেছে। তবে এই খাতের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে রয়ে গেছে। প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকায় তারা ব্যাংক ঋণ, সরকারি প্রণোদনা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই খাতটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি।
সিএমএসএমই খাতের অগ্রযাত্রায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাব। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৫ শতাংশ এই খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ঋণের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে মোট ঋণের ১৯ শতাংশের বেশি সিএমএসএমই খাতে থাকলেও বর্তমানে তা ১৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ঋণের এই অপ্রতুলতার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও বা অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদের সংকট রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করোনা পরবর্তী প্রভাব, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং ডলারের সংকটের মতো প্রতিকূল পরিবেশেও এ খাতের উদ্যোক্তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও স্থানীয়ভাবে আমদানিবিকল্প পণ্য উৎপাদনে অনেকে সফল হচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা বা ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে দেশের বাজার ধরে রাখতে এই ছোট উদ্যোগগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এজন্য বিসিক শিল্পনগরী সম্প্রসারণ এবং বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তার চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের রপ্তানি ঝুড়ি সমৃদ্ধ করতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সিএমএসএমই খাতকে অগ্রাধিকারে রাখা জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে কেবল একটি বাণিজ্যিক খাত হিসেবে না দেখে একে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কর-সুবিধা নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং নীতিগত বাধাগুলো দ্রুত দূর করা সম্ভব হলে এই খাতটি জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারই পারে সিএমএসএমই খাতকে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল অবস্থানে পৌঁছে দিতে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী নৌপথগুলো পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পুনরায় সচল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। চট্টগ্রাম হতে রাজধানী অভিমুখে নৌপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ব্যয় হয় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, অথচ ট্রাকে করে অর্থাৎ সড়কপথে সেই একই মালামাল আনতে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ পড়ে। অর্থাৎ নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ সড়কপথের চেয়ে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কম হয়। রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অভ্যন্তরীণ নৌ-বাণিজ্যের প্রসার ও বাংলাদেশের বৃত্তাকার নৌপথের পুনরুজ্জীবনে খাল খনন কর্মসূচির ভূমিকা শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী (এ্যানি)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তাসকীন আহমেদ তথ্য দেন যে, জাতীয় পর্যায়ে প্রতি কিলোমিটার নৌপথে টনপ্রতি মালামাল পরিবহনের ব্যয় ২-৩ টাকা হলেও সড়কপথে এই খরচ ১০ থেকে ১২ টাকা। তিনি মনে করেন, দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নৌপথগুলো কার্যকর করা গেলে তা জাতীয় জিডিপিতে ১ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী জানান, নদীর বর্জ্য, দূষণ, দখল ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পৌর এলাকায় বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজ ও কারখানার বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলার ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং এ সমস্যা নিরসনে তিনি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণ রোধে নতুন প্রকল্প গ্রহণের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বল্প মূল্যে শিল্পবর্জ্য পরিশোধনে চীনের কারিগরি সহায়তায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় ছোট ছোট ইটিপি বা বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন ও নেদারল্যান্ডসের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব মন্তব্য করেন যে, নৌপথের পুনরুদ্ধার ও পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে নিচু সেতু ও বক্স কালভার্টগুলো দ্রুত অপসারণ করা জরুরি। সেই সঙ্গে সরকারি সকল সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর তিনি জোর দেন।
সেমিনারে উপস্থিত বক্তারা নৌপথ সচল, খাল খনন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন অনেক বেশি সাশ্রয়ী হবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।
বিশ্বখ্যাত বায়োটেকনোলজি জায়ান্ট বায়োজেন বুধবার তাদের চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, বিরল রোগের চিকিৎসার ওষুধের ব্যাপক চাহিদার কারণে কোম্পানির মুনাফা এবং মোট রাজস্ব উভয়ই ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে নতুন ওষুধের এই সাফল্যের বিপরীতে কোম্পানির পুরনো ও জনপ্রিয় মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ওষুধের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দামের চাপের কারণে বিক্রি কিছুটা কমেছে, যা কোম্পানির ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করে রেখেছে।
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের প্রধান নজর রয়েছে বায়োজেনের নতুন আলঝেইমার ড্রাগ 'লেকিমবি' (Leqembi) এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তির ওপর। জাপানিজ কোম্পানি এজাই (Eisai)-এর সাথে যৌথভাবে তৈরি এই আলঝেইমার ড্রাগটির বৈশ্বিক বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শুরুতে এর উচ্চমূল্য এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে বাজারে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও, বর্তমানে সেই বাধা কাটিয়ে ওষুধটি চিকিৎসকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। বায়োজেন কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ভবিষ্যতে এই ওষুধের আরও সুবিধাজনক 'আন্ডার-দ্য-স্কিন' ফরম্যাট বাজারে এলে এর ব্যবহার এবং কাটতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতে এবং নতুন নতুন রোগের চিকিৎসায় নেতৃত্ব দিতে বায়োজেন সম্প্রতি ৫.৬ বিলিয়ন ডলারে অ্যাপেলিস ফার্মাসিউটিক্যালসকে অধিগ্রহণ করেছে। এটি ২০২৩ সালে রিয়াটা ফার্মাসিউটিক্যালস কেনার পর তাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এই চুক্তির মাধ্যমে বায়োজেন কিডনি রোগের চিকিৎসা এবং নতুন কিছু বিরল রোগের ওষুধের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। যদিও এই বড় মাপের অধিগ্রহণের কারণে কোম্পানির ২০২৬ সালের সম্ভাব্য মুনাফার পূর্বাভাসে কিছুটা কাটছাঁট করতে হয়েছে। আগে ২০২৬ সালে প্রতি শেয়ারে মুনাফা ১৪.২৫ থেকে ১৫.২৫ ডলার ধরা হলেও, বর্তমানের বিনিয়োগ ও অধিগ্রহণ সংক্রান্ত খরচের কারণে তা ১২ থেকে ১৩ ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
আর্থিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হওয়া প্রান্তিকে বায়োজেন শেয়ার প্রতি ৩.৬০ ডলার অ্যাডজাস্টেড মুনাফা অর্জন করেছে, যেখানে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল মাত্র ২.৯৫ ডলার। কোম্পানির মোট ত্রৈমাসিক রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ২.৭৪ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রত্যাশিত ২.৪৬ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রাকে অনেকটা পেছনে ফেলেছে। তবে ইতিবাচক এই খবরের মাঝেই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের পুরনো মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস পোর্টফোলিও। বিশেষ করে 'টেকফিডেরা'র মতো ওষুধের বিক্রি ১৩ শতাংশ কমে ৯৬৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সামগ্রিকভাবে বায়োজেন এখন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিটি তাদের পুরনো ও বাজার হারানো ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে লেকিমবি-র মতো নতুন উদ্ভাবন এবং অ্যাপেলিস-এর মতো কৌশলগত অধিগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের প্রবৃদ্ধি সচল রাখার চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের জন্য সংশোধিত মুনাফার প্রাক্কলন বিশ্লেষকদের ধারণার কাছাকাছিই (১২.৭২ ডলার) রয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোম্পানিটি দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য বর্তমানে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। আগামী দিনগুলোতে এই নতুন ওষুধগুলোই বায়োজেনের ভাগ্য নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সপ্তাহের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কার্যদিবসে সূচকের ইতিবাচক ধারার পর চতুর্থ দিন বুধবার দেশের শেয়ারবাজারে আবারও দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)—উভয় বাজারেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমার ফলে প্রধান সূচকগুলো নিচের দিকে নেমে গেছে। তবে সূচকের পতন ঘটলেও ডিএসইতে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেনের শুরুটা বেশ ইতিবাচক ছিল এবং প্রথম তিন ঘণ্টা সূচক ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রাখে। তবে লেনদেনের শেষ এক ঘণ্টায় বাজারে বড় ধরণের দরপতনের প্রবণতা দেখা দেয়, যার ফলে দাম বাড়ার তুলনায় কমার তালিকা দীর্ঘ হয়। দিন শেষে ডিএসইতে ১১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে দাম কমেছে ২৩৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের দর। বিশেষ করে লভ্যাংশ প্রদানের ভিত্তিতে ভালো মানের বা ‘এ’ ক্যাটাগরির ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের দরপতন বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ‘বি’ ও ‘জেড’ গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ারেরও দর কমেছে।
বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮৭৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একই সাথে ডিএসই-৩০ সূচক এবং শরিয়াহ সূচকেও নিম্নগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে মূল্যসূচক কমলেও ডিএসইতে টাকার অংকে লেনদেন আগের দিনের চেয়ে ৮১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩৪২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের এই শীর্ষে অবস্থান করেছে আর্গন ডেসিমস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং বেক্সিমকোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। শীর্ষ ১০-এর তালিকায় সায়হাম টেক্সটাইল, ব্র্যাক ব্যাংক ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর মতো কোম্পানিগুলোও জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৫ পয়েন্ট কমেছে। সেখানে ২৬৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২৭টির দর কমেছে এবং ১১৩টির দাম বেড়েছে। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় কমে ৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী শুরুর পর শেষ সময়ের বিক্রির চাপে বাজার নেতিবাচক পরিস্থিতিতে দিন শেষ করেছে।
বৈদেশিক লেনদেনের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সেবা বাণিজ্যের প্রসারে একটি নতুন ‘ডিজিটাল পেমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রবর্তন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে এখন থেকে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো বিদেশি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈধভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর (আউটওয়ার্ড রেমিট্যান্স) সুযোগ পাবে। এই সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা সিডিপিএসপি হিসেবে অভিহিত করেছে।
নতুন এই কাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট’ (ডিভিএ) ব্যবস্থার প্রচলন। এটি মূলত গ্রাহকের জন্য একটি ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে কাজ করবে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাস্টার অ্যাকাউন্টের অধীনে পরিচালিত হবে। এই ডিভিএ ব্যবহার করে গ্রাহকরা ব্যক্তিগত ও সরকারি ভ্রমণ, চিকিৎসা সেবা, ভিসা ফি প্রদান, হোটেল বুকিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ মেটাতে পারবেন। এমনকি সীমিত পরিসরে ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার সুবিধাও এই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, রিটেনশন কোটাসহ রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাবের বিপরীতেও এই সুবিধা গ্রহণ করা যাবে।
তবে ব্যাংকগুলোকে এই ধরনের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা চালু করার আগে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে। এতদিন পর্যন্ত দেশীয় ব্যাংকগুলো কেবল বিদেশ থেকে অর্থ দেশে আনার (ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স) সেবা প্রদানে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর হলে ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্স খাতে গতির সঞ্চার হবে এবং পেপ্যাল বা স্ট্রাইপের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশের বাজারে তাদের কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে আরও বেশি আগ্রহী হবে।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়টি ব্যাংকের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে বুধবার প্রকাশ করা এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপরীতে একটি ব্যাংক লোকসানের ধকল কাটিয়ে লাভের ধারায় ফিরেছে, একটির মুনাফা সংকুচিত হয়েছে এবং অন্য একটির ধারাবাহিক লোকসানের ব্যবধান আরও বড় হয়েছে।
আর্থিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলোচিত সময়ে ব্র্যাক ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) এবং এনসিসি ব্যাংকের মুনাফায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারপ্রতি আয় বৃদ্ধির দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক; গত বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকটির ইপিএস ১ টাকা ৩৪ পয়সা থাকলেও চলতি বছরে তা লাফিয়ে ২ টাকা ৫৫ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত নিট সুদ আয় এবং বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লাভ বাড়ার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরা ব্যাংকের ইপিএস আগের বছরের ৪৬ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ১৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যার পেছনের চালিকাশক্তি হিসেবে বিনিয়োগ ও কমিশন আয় বৃদ্ধি এবং ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হ্রাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে মিডল্যান্ড ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় ২ পয়সা থেকে বেড়ে ২৬ পয়সা এবং ইউসিবির আয় ৮ পয়সা থেকে ১৫ পয়সায় পৌঁছানোর তথ্য জানা গেছে। মূলত সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী পারফরম্যান্সের কারণেই ইউসিবির লাভ বেড়েছে। এছাড়া এনসিসি ব্যাংক তাদের বিনিয়োগের আয় বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজারের পুরোনো প্রভিশন ফেরত পাওয়ার ফলে ইপিএস ৯৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ১ পয়সা করেছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে এনআরবি ব্যাংক; আগের বছরের একই সময়ে ১ টাকা ২৯ পয়সা শেয়ারপ্রতি লোকসানে থাকলেও এবারের প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান কাটিয়ে ১ পয়সা মুনাফা প্রদর্শন করেছে।
বিপরীত চিত্রের মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। গত বছরের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় ১৮ পয়সা থেকে কমে মাত্র ১ পয়সায় নেমে এসেছে। এছাড়া আগে থেকেই আর্থিক সংকটে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি লোকসান ২৮ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৫ পয়সা হয়েছে।
ব্যয় হ্রাসের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে জার্মানির প্রখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মার্সিডিজ-বেঞ্জ। এর ফলে মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দরে উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে চীনের বাজারে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপের বাজারে চীনাদের ক্রমবর্ধমান বিস্তার মার্সিডিজের মূল ব্যবসায়িক গন্তব্য নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত শুল্ক এবং চীনা প্রতিযোগীদের চাপের কারণে জার্মানির অটোমোবাইল শিল্প বর্তমানে একটি প্রতিকূল সময় পার করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফক্সওয়াগন, মার্সিডিজ এবং বিএমডব্লিউ-এর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যয় হ্রাসের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করেছে। মঙ্গলবার মার্সিডিজের শেয়ারের দর এক পর্যায়ে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও দিনের শেষভাগে তা ২ দশমিক ৯ শতাংশে এসে স্থির হয়। মর্নিংস্টার-এর বিশ্লেষক রেলা সুসকিন এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, "এমন এক পরিবেশে যেখানে কিছু গাড়ি নির্মাতা তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে সতর্কবাণী দিচ্ছে, সেখানে মার্সিডিজ একটি স্পষ্ট এবং আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছে।"
দ্বিতীয় প্রান্তিকে মার্সিডিজ-বেঞ্জের সামগ্রিক আয় ৩ শতাংশ হ্রাস পেলেও তাদের পরিচালন মুনাফা ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো বা ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মূলত প্রশাসনিক এবং গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের খরচ কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ভ্যান ও আর্থিক সেবা ইউনিটের শক্তিশালী অবস্থান এই মুনাফা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া তাদের লিজ প্রদানকারী সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাথলন বিক্রির পরিকল্পনা থেকে আসা ১৩১ মিলিয়ন ইউরোও লভ্যাংশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে স্টুটগার্ট-ভিত্তিক এই গাড়ি নির্মাতার জন্য ভবিষ্যৎ পথ এখনো চ্যালেঞ্জিং। এক সময়ের লাভজনক চীনের বাজারে স্থানীয় নির্মাতাদের কাছে বড় ধরনের বাজার হারানোর পর এখন সেই চীনা প্রতিযোগীরাই ইউরোপে গাড়ি রফতানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ির বাজার চীনে মার্সিডিজের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হারাল্ড উইলহেল্ম জানিয়েছেন যে, ইউরোপের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় চলতি বছরের মুনাফার হার পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে।
সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মার্সিডিজ বর্তমানে তাদের জার্মানির কারখানাগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির মতো পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে, যেখানে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, সেখানে কারখানা সম্প্রসারণের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ওলা ক্যালেনিয়াস প্রতিযোগিতামূলক বাজার প্রসঙ্গে বলেন, "আমাদের পণ্যের দামের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যয় হ্রাসের জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।" ইউরোপে প্রবেশ করা চীনা কোম্পানিগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে তাদের মূল লক্ষ্য সাধারণ গাড়ির বাজার হলেও, "তবে এটি হাত গুটিয়ে বসে থাকার বা নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো কোনো কারণ নয়।"
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জয়জয়কারে কপাল খুলেছে দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সের। উন্নত মেমোরি চিপের আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১ হাজার ২৪২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান চিপ সরবরাহকারী হিসেবে এসকে হাইনিক্স বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে। ইচিয়নে সদর দপ্তর থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক ফলাফলকে “সর্বকালের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক পারফরম্যান্স” হিসেবে অভিহিত করেছে। মূলত বিশ্বজুড়ে এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রতিযোগিতার ফলে তাদের ব্যবসায় এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বুধবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি ৯৪ ট্রিলিয়ন ওন বা প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে, যা কোম্পানিটির ইতিহাসে এক প্রান্তিকের হিসেবে সর্বোচ্চ আয়। তবে মুনাফার এই বিশাল উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের মনে এআই খাতের বাজারমূল্য নিয়ে কিছুটা উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়ে এআই মাইক্রোচিপ বিভাগের বিপণন প্রধান পার্ক জুন-দেওক জানান, বিনিয়োগের গতি কমে আসা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন নিজস্ব ডেটা সেন্টার নির্মাণের চেয়ে ভাড়ার দিকে ঝুঁকছে এবং উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে পার্কের মতে, এসব পরিবর্তন বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সংকেত নয় বরং এটি “এখন পর্যন্ত তৈরি বিশাল এআই অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তা থেকে আয় করার প্রক্রিয়ার অংশ।”
বার্তা সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে এসকে হাইনিক্সের পরিচালন মুনাফা ৫৫৭ শতাংশ বেড়ে ৬০ ট্রিলিয়ন ওনে দাঁড়িয়েছে। ফ্ল্যাশ মেমোরি নির্মাতা কিওক্সিয়ায় থাকা শেয়ার বিক্রির এককালীন আয়ও এই মুনাফায় প্রভাব ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছর তারা প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ওন নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানায়, “প্রধান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কারণে অতিরিক্ত সরবরাহের অনুরোধও বাড়ছে।” বিবৃতিতে মেমোরি চিপের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে আরও বলা হয়, “এআই সেবা থেকে অর্জিত আয়ের মাধ্যমে এসব বিনিয়োগ সমর্থিত হওয়ায় মেমোরি চাহিদার গতি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
এদিকে এসকে হাইনিক্সের মূল প্রতিষ্ঠান এসকে গ্রুপ এনভিডিয়ার সাথে সম্মিলিতভাবে এআই খাতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি মার্কিন শেয়ারবাজারে এডিআর তালিকাভুক্তির মাধ্যমে তারা বড় অংকের তহবিল সংগ্রহ করলেও বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দামে কিছুটা পতন লক্ষ্য করা গেছে। কেবি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক কিম ডং-ওয়নের মতে, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও এআই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন যে মেমোরি চিপের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং সরবরাহের এই ঘাটতি ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। উল্লেখ্য, এসকে হাইনিক্সের প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ইলেকট্রনিকসও তাদের মুনাফায় বড় ধরণের চমক দেখানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
সরকার টু সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুনভর ইউএসএ এলএলসির কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বর্তমানে কাতার, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মোট পাঁচটি কোম্পানির সঙ্গে সাতটি জিটুজি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করে আসছে। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এবং ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুনভর ইউএসএ এলএলসি ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছর মেয়াদে প্রতি বছর ছয়টি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব পেশ করে। মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য প্রক্রিয়াকরণের প্রাথমিক অনুমোদন পায়।
প্রস্তাবিত এই উদ্যোগটি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে থাকবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সরাসরি চুক্তি কার্যকর করবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের লাগামহীন অস্থিরতার মাঝেও দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প কারখানায় গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শামছুজ্জামান (সুরুজ)।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে গত ২৩ জুলাই ২০২৬ খ্রি. তারিখে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে এ নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মোঃ শামছুজ্জামান (সুরুজ)-কে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান পদে গ্রেড-২ মর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মো. শামসুজ্জামান (সুরুজ) পেশায় সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি সুপ্রিম কোর্ট এবং ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন ভবনে পৃথক চেম্বারের মাধ্যমে আইন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।
১৯৭০ সালে টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার মশুদ্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শামসুজ্জামান (সুরুজ)। দীর্ঘদিনের আইন পেশার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি সম্পৃক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও আধুনিকায়নে তিনি ভূমিকা রাখবেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।