দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
ব্যাংকের শাখা থেকে দূরে থাকা মানুষের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবা মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে এই ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট গ্রাহকের ৮৪ শতাংশের বেশি গ্রামীণ এলাকার। একইভাবে মোট আমানতের প্রায় ৮২ শতাংশও এসেছে গ্রাম থেকে।
শুধু হিসাব খোলা বা আমানত সংগ্রহেই নয়, ঋণ বিতরণ এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও শহরের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৯৩ শতাংশই যাচ্ছে গ্রামীণ এলাকায়। পাশাপাশি দেশের মোট এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সাড়ে ৮৫ শতাংশের অবস্থানও গ্রামাঞ্চলে।
ফলে ব্যাংকের প্রচলিত শাখার বাইরে মানুষের কাছে সহজে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতেও এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এর মধ্যেই চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের তিন মাসের তুলনায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বিতরণ প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গ্রামেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বেশি হিসাব
জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খোলা আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৮১টি। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার হিসাব ২ কোটি ৩০ লাখ ১৩ হাজার ৪টি। অর্থাৎ মোট হিসাবের প্রায় ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশই গ্রামে।
এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানত হিসাব ছিল ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬ হাজার ১৯৭টি। তখন গ্রামীণ এলাকার হিসাব ছিল ২ কোটি ৭ লাখ ৫১ হাজার ৪৪৯টি।
এক বছরের ব্যবধানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানত হিসাব বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় হিসাব বৃদ্ধির হার প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় গ্রাহকগোষ্ঠী।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রামাঞ্চলের গুরুত্ব শুধু গ্রাহক সংখ্যায় নয়, আমানতের পরিমাণেও স্পষ্ট। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানত স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ১২৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার আমানত ৪২ হাজার ৫৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৮২ শতাংশ।
২০২৫ সালের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট আমানত ছিল ৪৫ হাজার ২৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্রামের আমানত ছিল ৩৭ হাজার ৪৮৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে গ্রামীণ এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে পুরো এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।
ঋণ বিতরণেও এগিয়ে গ্রাম
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও গ্রামীণ গ্রাহকদের অংশ শহরের তুলনায় বেশি। জুন শেষে মোট ঋণ হিসাব ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ১৩৮টি। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার ঋণ হিসাব ১ লাখ ৮১ হাজার ৪৯৯টি।
২০২৫ সালের জুনে মোট ঋণ হিসাব ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৯৩টি। গ্রামীণ এলাকায় ছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৬৫টি হিসাব। অর্থাৎ এক বছরে মোট ঋণ হিসাব বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকার ঋণ হিসাব বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
ঋণের স্থিতিতেও গ্রামীণ এলাকার প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৮৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
২০২৫ সালের জুনে গ্রামীণ এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঋণ ছিল ৬ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে গ্রামীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
রেমিট্যান্সের বড় অংশ যাচ্ছে গ্রামে
প্রবাসী আয় বিতরণের ক্ষেত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে মোট ৬ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৫টি ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স লেনদেন হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে এসেছে ৫ হাজার ৯১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছেছে ৫ হাজার ৪৯২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। শহরাঞ্চলে গেছে ৪২৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শহরের তুলনায় গ্রামে প্রায় ১২ দশমিক ৯ গুণ বেশি রেমিট্যান্স পৌঁছেছে।
তবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় রেমিট্যান্স বিতরণ কমেছে প্রায় ৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ। ফলে গ্রামে রেমিট্যান্স পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা শক্তিশালী হলেও সাম্প্রতিক এই পতন খাতটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
গ্রামবাংলার হাতের নাগালে ব্যাংকিং
একসময় ব্যাংকিং সেবা নিতে গ্রামের মানুষকে উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হতো। দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয় এবং সময়ের কারণে অনেকেই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন। এজেন্ট ব্যাংকিং সেই বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
এখন স্থানীয় বাজার, ছোট দোকান কিংবা বসতবাড়ির নিচের আউটলেট থেকেই হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, অর্থ স্থানান্তর, রেমিট্যান্স গ্রহণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাও এজেন্টের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে।
ডেবিট কার্ড, চেকবই ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মতো সুবিধাও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় এসেছে। বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে এই সেবা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে।
এক যুগে গ্রাহক আড়াই কোটির বেশি
দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে। এর আগে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার নীতিমালা জারি করে। বেসরকারি ব্যাংক এশিয়া মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলায় এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু করে।
শুরুতে শুধু গ্রামীণ এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমতি ছিল। পরে নীতিমালা সংশোধন করে পৌরসভা ও শহরাঞ্চলেও এই সেবা চালুর সুযোগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে ৩১টি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৩০টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে সেবা দিচ্ছে। সারাদেশে ১৫ হাজার ৩২১ জন এজেন্টের অধীনে রয়েছে ২০ হাজার ৪৮৮টি আউটলেট। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারী গ্রাহকের অংশগ্রহণও বাড়ছে। মোট আমানত হিসাবের প্রায় অর্ধেক নারীদের। এর বড় একটি অংশ গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের নারী।
ফলে ব্যাংকের প্রচলিত শাখার বাইরে নারীদের আর্থিক সেবার আওতায় আনতেও এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সঞ্চয়, রেমিট্যান্স গ্রহণ ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়ছে।
দ্রুত বাড়ছে আমানত ও ঋণ
সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট আমানত হিসাব দাঁড়িয়েছিল ২ কোটি ৫১ লাখ ৩৯ হাজার ২৯৩টি। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার ১০৯টি। এক বছরে হিসাব বেড়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।
একই সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানত বেড়ে প্রায় ৪৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর প্রায় ৮৩ শতাংশই এসেছে গ্রামীণ এলাকা থেকে।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আমানত হিসাব রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে। এরপর রয়েছে ব্যাংক এশিয়া ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।
ঋণ বিতরণেও গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বা ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। তবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বেশি। তাদের কাছে কেন্দ্রীভূত রয়েছে ২৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নতুন মাত্রা
ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর এবং প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে হাওর, চর ও দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার পুরোপুরি হয়নি। এসব অঞ্চলে সেবা সম্প্রসারণ, এজেন্টদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং গ্রাহকদের আর্থিক বিষয়ে সচেতন করার মাধ্যমে এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং শুধু বিকল্প ব্যাংকিং চ্যানেল নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির অর্থপ্রবাহ, সঞ্চয়, ঋণ ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। গ্রামকে কেন্দ্র করে এর বিস্তার অব্যাহত থাকলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সুসম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশ কানাডার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ বিশাল অংকের শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হওয়া এই ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’-এর কড়া জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই বৈরী আচরণের বিপরীতে কানাডাও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তিনি মার্কিন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সমপরিমাণ অর্থাৎ “ডলার ফর ডলার” বা “সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক” আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্তে শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন ছিল অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন সাপেক্ষ।” তিনি অবিলম্বে তাঁর দেশের আলোচক দলকে ওয়াশিংটন থেকে অটোয়ায় ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। কার্নি আরও জানান যে, তাঁর দেশের আলোচকগণ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কানাডার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আচরণে চুক্তিটি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কানাডাকেই দায়ী করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, “গত সপ্তাহের শুরুতে যেসব শর্তে কানাডা সম্মত হয়েছিল, সে সব শর্তে আজ (শুক্রবার) রাতে তারা বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।” তিনি একে কানাডার জন্য একটি বড় সুযোগ হারানো বলে মন্তব্য করেন। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত চুক্তিতে কানাডায় তৈরি যানবাহনের শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনা এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক অর্ধেক করার প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে শেষ মুহূর্তে দুই পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। যদিও এটি কানাডার মোট রপ্তানির মাত্র ৫ শতাংশ, তবুও এর প্রতীকী ও কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ৩০ দিনের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে কানাডার ওপর কঠোর শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হবে। বর্তমানে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই শাস্তিমূলক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ কানাডাকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রাজনৈতিকভাবেও প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ওপর বড় ধরনের চাপ রয়েছে। দুটি বড় অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কার্নি ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে এবং তারা ওয়াশিংটনকে আর কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এর আগে গত বছর থেকেই ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে কানাডার কুইবেক অঞ্চলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র আপাতত আর কোনো নতুন আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করেনি। এই শুল্ক যুদ্ধ ইতোমধ্যে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা বিভিন্ন খাতকে চরম ক্ষতির মুখে ফেলবে, যার ফলে ব্যবসা বন্ধ হওয়া ও ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়বে বলে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে গত ১৮ মাস ধরে চলা ইস্পাত ও অটোমোবাইল খাতের মন্দা এখন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত ওয়াশিংটনে তিন দিনব্যাপী নিবিড় আলোচনা কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পরই উত্তর আমেরিকার দুই প্রভাবশালী দেশের মধ্যে এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলো।
অবশ্য ওয়াশিংটন ও অটোয়া কোনো চুক্তিতে পৌঁছালেও, তা কানাডার জনগণ ও দেশটির ১০টি প্রদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্য বেশ কঠিন হতো বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কারণ ১৯ আগস্ট প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ কানাডীয় চান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করুক এবং আর কোনো ধরনের ছাড় দিতেও নারাজ তারা।
দেশের শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার হ্রাসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে আয়োজিত এক সেমিনারে সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ সরকারি ঋণের তুলনায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ব্যাপক চাপের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে বেসরকারি খাতের এই নগণ্য প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগের জন্য চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি সিএমএসএমই খাতের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্যাকেজ স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান।
জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, শিল্প খাতের উৎপাদন সচল রাখতে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। তিনি অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি লজিস্টিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ১০টি খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, যথাযথ নীতিগত সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি নিবিড় অংশীদারত্বের মাধ্যমেই বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার প্রতিটি জ্বালানি খাতে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিতে কাজ করছে। এছাড়া ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ড. জায়েদি সাত্তার এবং অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ হ্রাসের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভরতা কমানোর তাগিদও দেওয়া হয় উক্ত সেমিনারে। বর্তমানে উচ্চ ব্যবসায়িক খরচের মুখে থাকা সিএমএসএমই খাতের সুরক্ষা নিশ্চিতে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং চালুর প্রস্তাবটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দেশ ভ্যাটিকান সিটি তাদের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইউরো বা ১১৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশি সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতে পারে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে সৌর শক্তি ও কৃষিকাজের এক অনন্য সমন্বয় ঘটানো হবে, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘এগ্রিবোলটাইক’ সিস্টেম বলা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট, যা ইতালির অন্যতম বৃহত্তম সৌর স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই বিশেষ পদ্ধতিতে মাটি থেকে বেশ কয়েক মিটার উঁচুতে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে, যার ফলে প্যানেলের নিচের জমিতে স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে। প্যানেলগুলোর ছায়া মাটির পানি বাষ্পীভবন রোধ করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে ফসলকে রক্ষা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
রোমের উত্তর-পশ্চিম উপকণ্ঠে ভ্যাটিকানের নিজস্ব মালিকানাধীন ‘সান্তা মারিয়া দি গ্যালেরিয়া’ নামক স্থানে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। চলতি বছরের শুরুতে ইতালি ও ভ্যাটিকানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর সম্প্রতি এক যৌথ কমিশন এই প্রকল্পের কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। যদিও প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় বা সক্ষমতা নিয়ে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবে আলোচনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও অনুমতিসহ পুরো নির্মাণকাজ শেষ করতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে।
৪৫০ হেক্টর আয়তনের এই বিশাল এলাকাটি ১৯৫০-এর দশক থেকেই ভ্যাটিকান রেডিওর সম্প্রচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নতুন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য হলো ভ্যাটিকান রেডিওর ট্রান্সমিশন স্টেশনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পুরো ভ্যাটিকান রাষ্ট্রকে জ্বালানি খাতে স্বাবলম্বী করে তোলা। এছাড়া উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ রোমের বামবিনো গেসু হাসপাতালসহ ভ্যাটিকানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনাগুলোতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত ট্র্যাকিং সোলার প্যানেলগুলো ওই এলাকার প্রায় ২০০ হেক্টর জমি জুড়ে বিস্তৃত থাকবে। প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ইতালিকে সরবরাহ করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক সত্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস এই প্রকল্পকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে পোপ লিও চতুর্দশ এই বিশাল উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
ইতালি ও ভ্যাটিকান সিটির মধ্যে সম্পাদিত বিশেষ চুক্তি অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি ইতালির আয়কর বা অন্যান্য সরকারি ফি থেকে অব্যাহতি পাবে। তবে ইতালির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতালির সরকারি কোষাগারের ওপর কোনো অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো যাবে না। প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৮ সালেও তৎকালীন পোপ বেনেডিক্টের আমলে ভ্যাটিকানের একটি মিলনায়তনের ছাদে কিছু সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল, যা ছিল পবিত্র এই নগরীর প্রথম পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উদ্যোগ।
চীনের ইউনান প্রদেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানিয়েছে কুনমিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি চীনের বিশাল বাজারের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) কুনমিংয়ের ‘দ্য জেনারেল অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনান এন্টারপ্রেনার্সে’ আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের নানাবিধ দিক তুলে ধরা হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে কনস্যুলেটের প্রথম সচিব (বাণিজ্যিক) রিদওয়ানুর রহমান এক বিশদ উপস্থাপনার মাধ্যমে জানান যে, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, পর্যাপ্ত শিল্পভূমি এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের মধ্যবর্তী সংযোগকারী দেশ হওয়ার ফলে বাংলাদেশ চীনের বাজারে প্রবেশের এক কার্যকর পথ তৈরি করছে। এছাড়া প্রস্তাবিত কুনমিং-চট্টগ্রাম করিডোর বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীন থেকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর জন্য এক নবদিগন্তের সূচনা করবে, যা ইউনানের উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্যের বড় সুযোগ বয়ে আনবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত সুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শতভাগ মালিকানা এবং মূলধন ও অর্জিত লভ্যাংশ নির্বিঘ্নে প্রত্যাবাসনের সুযোগ রয়েছে। চীনসহ ৩৪টি দেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি বাংলাদেশে একটি সুসংহত ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। এ সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন ‘Chinese Economic and Industrial Zone’, ‘BIDA-এর ওয়ান স্টপ সার্ভিস’, হাই-টেক পার্ক এবং প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য পোশাক শিল্প, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ নির্মাণ শিল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাপক মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়। অনুষ্ঠান শেষে ইউনানের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে সরাসরি মতবিনিময় করেন। কুনমিংস্থ কনস্যুলেট বর্তমানে ইউনান ছাড়াও সিচুয়ান, চংচিং, গুইঝো ও গুয়াংশি প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের মাঝে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় গত ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের বিক্রির গতি সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধির এই ধীর চিত্র ফুটে উঠেছে, যা মার্কিন নাগরিকদের আর্থিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলছে। মূলত জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছে কর্তৃপক্ষ, যার ফলে ক্রেতাদের কেনাকাটার সক্ষমতা ও ধরনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে উঠতে ওয়ালমার্ট এখন কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুল্ক বাবদ প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পরবর্তীতে আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় এই অর্থ ফেরত পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফেরত পাওয়া বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমিয়ে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১১ হাজার পণ্যের দাম কমানোর কর্মসূচি বা ‘রোলব্যাক’ হাতে নিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে থেকে জুলাই প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির সচল দোকানগুলোতে জ্বালানি বিক্রি বাদে ব্যবসা বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ওয়ালমার্টের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী টার্গেটও সম্প্রতি এক বিলিয়ন ডলারের শুল্ক ফেরত পাওয়ার কথা জানিয়েছে, যা তাদের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। ওয়ালমার্টের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জন ডেভিড রেইনি এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, মূল্য কমানোর ফলে ইতিমধ্যে খেলনা ও খাদ্যপণ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন যে, খুচরা বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয় এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বাজারের বর্তমান অস্থিরতা বিশ্লেষণ করে জন ডেভিড রেইনি বলেন, পেট্রলের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের হাতে অন্যান্য খাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম চার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ক্রেতাদের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘গত জুনে পেট্রলের দামে পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।’ তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ এখন বিলাসিতা কমিয়ে কেবল অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী পণ্যের পেছনেই তাদের সীমিত অর্থ ব্যয় করছেন।
তবে বিক্রি বাড়াতে দাম কমানোর এই কৌশলের পেছনে কিছু ঝুঁকিও দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। বর্তমান মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে শুল্ক ফেরতের এককালীন সুবিধা থেকে, যা ভবিষ্যতে পাওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও স্বয়ংক্রিয় অবকাঠামো নির্মাণে বিশাল বিনিয়োগের পাশাপাশি পণ্যের দাম কমালে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা জানিয়ে জন ডেভিড রেইনি বলেন, ‘যেখানে সম্ভব, মূল্যছাড়কে স্থায়ী করাই আমাদের সব সময়ের আশা ও উদ্দেশ্য।’ মূলত সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে পণ্যমূল্য রেখে ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিশ্বের অন্যতম এই খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
রাজধানীর নভোথিয়েটারে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলা চলবে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই উদ্ভাবন মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইনোভেট টু মার্কেট’। এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশের উদ্ভাবক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিদদের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করা। এর মাধ্যমে দেশে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকে ‘ট্রিলিয়ন-ডলার’ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিন দিনের এই মেলায় ১৫০টিরও বেশি ইনোভেশন শোকেস প্রদর্শিত হবে, যেখানে নবীন ও অভিজ্ঞ উদ্ভাবকদের আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যাবে। পাশাপাশি মেলায় ১৫টিরও অধিক সেশন ও সংলাপের আয়োজন থাকবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন। মেলা প্রাঙ্গণে একটি বিশেষ ইনোভেশন হাব স্থাপন করা হবে, যা নতুন সব চিন্তা ও প্রযুক্তির কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করবে।
শিল্প খাতের সাথে শিক্ষা ও গবেষণা খাতের সেতুবন্ধন মজবুত করতে মেলায় ৫০ জনেরও বেশি শিল্প বিশেষজ্ঞ উপস্থিত থাকবেন। এছাড়াও দেশের স্বনামধন্য ৫০টিরও অধিক করপোরেট, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে এই মেলায়।
তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেলায় অংশ নিতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী, গবেষক, উদ্যোক্তা, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্টার্ট-আপসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে www.innovationfairbd.org ওয়েবসাইটটি ভিজিট করে নিবন্ধনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিদায়ী সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের বড় পতন লক্ষ করা গেছে। গত পাঁচ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দেড় শতাংশেরও বেশি কমেছে। একই সময়ে অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৯৮ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৭৮৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৫ হাজার ৮৮৪ পয়েন্ট। বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ প্রায় ৩০ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৬৩ পয়েন্টে এবং শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ২১ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৫৬ পয়েন্টে থিতু হয়েছে।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে মোট ৩৮৪টি সিকিউরিটিজের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও কমেছে ৩১৪টির দর। অপরিবর্তিত ছিল ১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য। সূচকের এই ধারাবাহিক পতনে ব্র্যাক ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ডমিনেজ, ইসলামী ব্যাংক এবং এলএইচবির শেয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্রে দেখা যায়, ২১ দশমিক ২ শতাংশ লেনদেন নিয়ে শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাত। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সাধারণ বীমা খাতের দখলে ছিল ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ লেনদেন। এছাড়া প্রকৌশল খাত ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, ওষুধ ও রসায়ন খাত ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং ব্যাংক খাত ৭ দশমিক ১ শতাংশ লেনদেন সম্পন্ন করেছে।
অন্যদিকে নেতিবাচক রিটার্নের দিক থেকে শীর্ষে ছিল পাট খাত (৪.৬ শতাংশ), যার পরে রয়েছে কাগজ ও মিউচুয়াল ফান্ড খাত। বিপরীতে একমাত্র সেবা খাতে দশমিক ২ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) চিত্রটি একই ছিল। সেখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই প্রায় ২ শতাংশ কমে ১৫ হাজার ৪৯১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে গত সপ্তাহে ৩২১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হলেও মাত্র ৬৮টির দাম বেড়েছে এবং ২৪১টির দর কমেছে। সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে লেনদেনের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৩১০ কোটি টাকা।
দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য পুনরায় বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৮২ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে স্বর্ণের এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে।
বাজুস থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, আজ সকাল ৯টায় বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে স্বর্ণের এই নতুন দাম নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশোধিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী, এখন থেকে ভ্যাটসহ সবচেয়ে উন্নত মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ১১০ টাকা। উল্লেখ্য যে, গতকাল পর্যন্ত এই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ৬২৮ টাকা। অন্যদিকে, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫ টাকা। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ এখন থেকে ২ লাখ ১ হাজার ৮৪৬ টাকায় বিক্রি হবে এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১২ টাকা।
স্বর্ণের দামের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হয়েছে রুপার দামও। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৫ হাজার ২৪৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৪৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৩৮৩ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।
চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দুই সপ্তাহ আগে যে চিনি প্রতি মণ ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা বেড়ে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে চিনির সরবরাহ কমে গেছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামীতে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির বুকিং দর খুব একটা না বাড়ায় দেশের বাজারে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
চিনির দাম বাড়ার পেছনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমেছে এবং কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের চিনির বাজারে একসময় বড় অংশের জোগান দেওয়া এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে তাদের কারখানা বন্ধ রাখায় সরবরাহ ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের বাজারে মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিনি আসছে, যার ফলে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় যোগ হয়ে পাইকারি বাজারে দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আগের মজুত করা চিনি দিয়ে আপাতত বাজার চললেও নতুন উৎপাদন না থাকায় তা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার পথে।
ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের কথা বললেও এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলেছেন বাজার বিশ্লেষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চিনির আমদানি উন্মুক্ত থাকায় মিল মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কম দামে চিনি বিক্রি করে ছোট আমদানিকারকদের লোকসানে ফেলে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়ে তারা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন জানান, হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগ্রুপ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবেই তারা বেপরোয়া হয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন।
সিন্ডিকেটের এই অভিযোগ অবশ্য সরাসরি অস্বীকার করেছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন। তার মতে, বাজারে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করেই দাম ওঠানামা করে, এখানে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এদিকে, এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দেশের অন্যতম চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাজার তদারকির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ জানান, তাদের নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রয়েছে এবং পাইকারি বাজারে চিনির দাম বাড়ার বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিজের দেশের শেয়ারবাজারে পতন এড়াতে বিপুল পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কোরিয়া সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি (কেএসডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসেই তারা নিট ৪৫০ কোটি ডলারের মার্কিন শেয়ার কিনেছেন। বিনিয়োগের এই হার গত জুনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিনিয়োগ করা ৫০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাজার বদলালেও বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ কৌশল বদলায়নি; নিজ দেশের মতো মার্কিন বাজারে গিয়েও তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালছেন।
কেএসডি জানিয়েছে, জুলাই মাসে কেনা ৪৫০ কোটি ডলারের শেয়ারের মধ্যে প্রায় ৮৪ কোটি ডলারই বিনিয়োগ করা হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এসকে হাইনিক্স’-এর মার্কিন এডিআর-এ। দেশীয় বাজারে সরাসরি শেয়ার কেনার সুযোগ থাকার পরও মার্কিন বাজার থেকে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি দামে ও উচ্চ অস্থিরতার মধ্যে এটি কেনার প্রবণতাকে ‘অতিরিক্ত ফটকাবাজির লক্ষণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন অ্যকাডিয়ান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন ল্যামন্ট। পাশাপাশি কোরীয় বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে তিনগুণ পর্যন্ত রিটার্ন সুবিধাযুক্ত লিভারেজড ইটিএফ (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড)। জুলাইয়ে তাদের কেনা শীর্ষ ১০টি মার্কিন পণ্যের মধ্যে চারটিই ছিল এমন ঝুঁকিপূর্ণ লিভারেজড ফান্ড, যার মধ্যে ‘এসওএক্সএল’ এবং ‘প্রেশেয়ার্স আল্ট্রা কিউকিউকিউ’ উল্লেখযোগ্য।
বিনিয়োগকারীদের এমন বাজার পরিবর্তনের বিষয়ে ফিবোনাচ্চি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা জং ইন ইউন জানান, দেশীয় বাজারে সেমিকন্ডাক্টর শেয়ার বা লিভারেজড ইটিএফে লোকসানের পর তুলনামূলক নিরাপদ ও তরল (লিকুইড) বাজার হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিচ্ছেন। রেলিয়েন্ট গ্লোবাল অ্যাডভাইজার্সের গবেষণা প্রধান ফিলিপ উল ব্যাখ্যা করেন, দেশীয় বাজারে যেসব এআই ও হার্ডওয়্যার শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছিল, মার্কিন বাজারে গিয়ে তারা ঠিক একই ধরনের প্রযুক্তির শেয়ার কিনছেন। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বেঞ্চমার্ক সূচক ঘুরে দাঁড়ালেও স্থানীয় খুচরা বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানে কেনাকাটা করছেন। কোরিয়ার বাজারে মার্জিন ঋণের পরিমাণও গত জুনের ৩৭ ট্রিলিয়ন ওন থেকে কমে চলতি মাসের শুরুতে ২৭ ট্রিলিয়ন ওনে নেমে এসেছে, যা এ বছরে সর্বনিম্ন।
কোরীয় বিনিয়োগকারীদের এই বিপুল পুঁজির প্রবাহ মার্কিন শেয়ারবাজারের সার্বিক সূচকে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ফিলিপ উল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্বারাই বেশি নিয়ন্ত্রিত। তবে ওয়েন ল্যামন্ট সতর্ক করে বলেছেন, সার্বিক সূচকে প্রভাব না ফেললেও নির্দিষ্ট কিছু ছোট শেয়ারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের শেষের দিকে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের কারণে মার্কিন ‘কোয়ান্টাম’ শেয়ারের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কোরিয়া, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের লিভারেজড ইটিএফে এমন আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের দরে তীব্র ওঠানামা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা থেকে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আগামী তিন দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। দুই দেশের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছানোয় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের পণ্যের ওপর এই নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে শুল্ক কার্যকরের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টের মাধ্যমে ট্রাম্প এটি স্থগিতের কথা জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই পোস্টে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, চুক্তির নথিপত্র চূড়ান্ত করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই বাণিজ্য চুক্তিতে কানাডার বাজারে মার্কিন পণ্যের ব্যাপক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও নিজস্ব শ্রমিকদের সুরক্ষায় চুক্তিতে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট বিধানও রাখা হবে বলে জানা গেছে।
হঠাৎ করে শুল্ক স্থগিতের এই সিদ্ধান্তে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলেই স্বস্তি ফিরে এসেছে। নতুন এই নীতি কার্যকর হলে কানাডা থেকে আমদানি করা ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক এবং হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্কের বোঝা চাপত। এর আগে থেকেই কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপিত রয়েছে। নতুন করে আরও পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ হলে তা উভয় দেশের অর্থনীতিতেই বড় ধরনের প্রভাব ফেলত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন শর্ত ও দাবি তুলে ধরেছে। কানাডা দীর্ঘদিন ধরে তাদের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপর থেকে বিদ্যমান শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চাওয়া হলো, মার্কিন গাড়ির ওপর কানাডা যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে তা দ্রুত প্রত্যাহার করা। এর পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের চিজ উৎপাদকদের জন্য কানাডার বিশাল দুগ্ধবাজারে আরও বেশি ও সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এসএস পাওয়ার-১-এর জন্য প্রায় ৩২ লাখ ডলারের বৈদেশিক ঋণ ছাড় ও এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে বুধবার ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ (বিআরপিডি-২) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। একই সঙ্গে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একটি সার্কুলার পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে পূর্বে অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার সিন্ডিকেটেড ঋণে রূপালী ব্যাংক পিএলসির অংশের অবশিষ্ট প্রায় ৩২ লাখ মার্কিন ডলার ছাড় এবং প্রতিষ্ঠানটির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে পূর্বে অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রার সিন্ডিকেটেড ঋণে রূপালী ব্যাংকের অংশের অবশিষ্ট ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ দশমিক ২৮ মার্কিন ডলার ছাড় এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ২৭কক(৩) ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে না।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এ ঋণ সুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আর্থিক দায় সৃষ্টি হবে না। ভবিষ্যতেও এ খাতে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ স্বাক্ষর করেছেন। একই বিষয়ে বিআরপিডি-২ বিভাগের পরিচালক মো. বায়েজিদ সরকার স্বাক্ষরিত সার্কুলার দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।