দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
এক সময়ের আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে দেশ একদা ওষুধের জন্য বিদেশের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকত, আজ সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের বিশাল এক শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশই এখন মেটাচ্ছেন দেশীয় উৎপাদকরা। শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয়, গুণগত মান এবং সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশি ওষুধের দাপট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৩২টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে এবং গত ১০ বছরে এই খাতের রপ্তানি আয় ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ১৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানিতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২১৩ মিলিয়ন ডলার, যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের এই শক্তিশালী অবস্থান দেশের ওষুধশিল্পের সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানেরই প্রমাণ দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো অত্যন্ত কঠোর মাননিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলোতেও বাংলাদেশি ওষুধের অনুপ্রবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা এই শিল্পের জন্য এক বিশাল গৌরবের বিষয়।
রপ্তানির গত এক দশকের চিত্র:
গত দশ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৮৯ মিলিয়ন ডলার, তা ধাপে ধাপে বেড়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত রপ্তানি আয় ৮৯ মিলিয়ন থেকে এক লাফে ১৮৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কিছুটা হ্রাস পেয়ে তা ১৭৫ মিলিয়ন ডলারে নামে, তবে দ্রুতই সেই ধাক্কা কাটিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ২০৫ মিলিয়ন ডলারে ফিরে আসে। সর্বশেষ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১.৭ শতাংশ, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির পথ এখন অনেক বেশি সুসংহত।
শীর্ষ গন্তব্য ও বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৩০.৫৯ মিলিয়ন ডলার)। এরপর পর্যায়ক্রমে মিয়ানমার, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্র, কম্বোডিয়া, আফগানিস্তান, কেনিয়া, পাকিস্তান, চিলি এবং যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে পর্তুগালের মতো নতুন বাজারেও রপ্তানি শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘আসিয়ান’ অঞ্চল এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি জেনেরিক ওষুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উৎপাদকরা মনে করছেন, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বৃহৎ আমদানিকারক দেশগুলোতে বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সাফল্যের নেপথ্যে ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:
এই খাতের অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়নেও মনোনিবেশ করেছে। জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের দক্ষতা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে মেধাস্বত্ব বা পেটেন্ট সুবিধার ছাড় ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকায় বাংলাদেশ সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারছে। এছাড়া সরকার বর্তমানে সক্রিয় ওষুধ উপাদান বা কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদনে বিশেষ জোর দিচ্ছে। মুন্সিগঞ্জে স্থাপিত এপিআই শিল্প পার্ক এই আমদানিনির্ভরতা কমাতে ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা:
বিশেষজ্ঞ ও শিল্প মালিকদের মতে, আগামী তিন বছরের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইউএস এফডিএ) এর নিয়মিত অডিট কার্যক্রম পুনরায় গতিশীল হলে বাংলাদেশের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর জন্য মার্কিন বাজারে রপ্তানির এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো উচ্চমূল্যের জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুত করে রেখেছে, যা অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে। সরকারও এই লক্ষ্য অর্জনে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা প্রদান করছে।
সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
ওষুধ রপ্তানিকে বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে নিয়ে যেতে হলে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মতো প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের সনদ লাভ, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি)-এ আরও বেশি বিনিয়োগ এবং নতুন জেনেরিক ও বিশেষায়িত ওষুধ উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই আন্তর্জাতিক পেটেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের সাহসী বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি অদূর ভবিষ্যতে বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করবে—এমনটিই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফইএস রিটেইলের ইনভয়েস ও বকেয়া পাওনা সংক্রান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে একটি সুষ্ঠু ও আইনানুগ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং ইউরোপীয় পোশাক ব্র্যান্ড এলপিপি এসএ। আজ মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে উভয় পক্ষই সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার এই ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে বাংলাদেশের সমগ্র পোশাক খাত এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্কের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে আলোচিত বিষয়টি মূলত কয়েকটি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং ইনভয়েস-সংক্রান্ত বকেয়া দায়ের দাবিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়েছে। এলপিপি স্পষ্ট করে বলেছে যে, এই সুনির্দিষ্ট দাবির ক্ষেত্রে তারা আইনগতভাবে দেনাদার বা অর্থ পরিশোধে দায়বদ্ধ কোনো পক্ষ নয়। ব্র্যান্ডটি আরও দাবি করেছে যে, বাংলাদেশে তাদের প্রত্যক্ষ সরবরাহকারী ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের পাওনা তারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিয়মিত ও যথাযথভাবে পরিশোধ করে আসছে। বিজিএমইএ এলপিপির এই অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো আইনগতভাবে দায়ী পক্ষগুলোর কাছে উত্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো বর্তমানে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনা শুধুমাত্র আইনগতভাবে দায়ী পক্ষের সঙ্গেই হওয়া উচিত। এলপিপি জানিয়েছে, সম্প্রতি তাদের পণ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পর্যালোচনার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষা এবং একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যা কোনো প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ছিল না। বর্তমানে এলপিপির সঙ্গে যুক্ত ৩৫০টিরও বেশি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় ঢালাও ও বিভ্রান্তিকর প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজিএমইএ মনে করে, এ ধরণের অপপ্রচার লাখো পোশাকশ্রমিক এবং দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিষয়টির সুশৃঙ্খল নিষ্পত্তির লক্ষে বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং অংশীজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখবে। পাশাপাশি এলপিপির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো ধরনের হয়রানি বা ভিত্তিহীন আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও সংগঠনটি কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই যৌথ অবস্থান আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করবে না এবং বৈধ দাবি উত্থাপনের অধিকারও সীমিত করবে না বলে বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং এলপিপি এসএর পরিচালক ডোরোটা জানকোভস্কা-টমকৌ স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের টেকসই উন্নয়নের প্রতি উভয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একটি স্বচ্ছ ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম বজায় রাখতে তাঁরা একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
দেশে ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল টাস্কফোর্স অন ডিরেগুলেশন অ্যান্ড বিজনেস ফ্যাসিলিটেশন’ গঠন করেছে সরকার। এই টাস্কফোর্সের প্রধান লক্ষ্য হলো বিদ্যমান সকল জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
টাস্কফোর্সের কাঠামো অনুযায়ী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে পরিবেশমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের। এছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারীকেও এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, নৌপরিবহন সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এবং রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজকে (আরজেএসসি) সদস্য করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এফবিসিসিআই, এফআইসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতিদেরও এই টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
টাস্কফোর্সের কার্যপরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূলত ব্যবসা সহজীকরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের রোডম্যাপ অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের গতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। লাইসেন্স প্রাপ্তি, বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের সমস্যা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র পাওয়ার ধাপগুলো সহজ করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করবে এই কমিটি। এছাড়া সরকারি সেবায় ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ও স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে হয়রানি কমানোর নীতিগত দিকনির্দেশনাও দেবে এই টাস্কফোর্স।
ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় এই টাস্কফোর্স বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যকার আন্তঃজটিলতা দ্রুত নিরসন করবে এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ এবং কাজ সম্পাদনে বিলম্বের বিষয়গুলো সরাসরি তদারকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে। প্রতি তিন মাস অন্তর টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে দেশে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমুখী করার লক্ষে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) আয়োজিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টে (আরসিইপি) সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত সময় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে নিউজিল্যান্ডের সক্রিয় সমর্থন কামনা করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরসিইপি সদস্যপদ লাভের জন্য গৃহীত বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম তুলে ধরা হয় এবং এই আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ব্লকের সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রভাব ও সমর্থন প্রার্থনা করা হয়।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকাল বৃদ্ধি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণকাল বাড়ানোর যে আবেদন বাংলাদেশ জাতিসংঘে পেশ করেছে, তার সপক্ষে নিউজিল্যান্ডের জোরালো সমর্থন চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই অতিরিক্ত সময় এলডিসি-পরবর্তী টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে একটি কার্যকর প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এছাড়া, দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়েও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তা বাজার নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধজাত ও কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই এফটিএ বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
সহযোগিতা আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার্ষিক ‘দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ’ গঠন এবং এফটিএ আলোচনার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইসাথে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজলভ্য ও গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ ভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই পদ্ধতিতে সব ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তঃব্যাংক চার্জ বা ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ক্যাশলেস পেমেন্টে উৎসাহিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে জারিকৃত নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধে কোনো আন্তঃপ্রতিষ্ঠান মাশুল কার্যকর থাকবে না। এর আগে এই ধরনের লেনদেনে ১ শতাংশ বা তার বেশি মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বহাল ছিল, যার একটি অংশ গ্রাহকের ব্যবহৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করতে হতো। আন্তঃব্যাংক এই সার্ভিস চার্জ শূন্য করার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ গ্রহণ করা তাদের জন্য আরও সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনতে যে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে, সেই অর্থ সরাসরি ব্যবসায়ীদের হাতে না গিয়ে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানসমূহ লাভ করবে। প্রতিটি যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অংকের ওপর ভিত্তি করে এই প্রণোদনা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টকে কিউআর সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা একুয়াইরিং ব্যাংক লেনদেনের ০.১০ শতাংশ এবং গ্রাহকের ব্যবহৃত অ্যাপ প্রদানকারী বা ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান ০.২০ শতাংশ হারে অর্থ পাবে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট যোগ্য লেনদেনে সর্বমোট ০.৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে, যার সুফল ব্যবসায়ীরা কম মাশুল প্রদানের মাধ্যমে ভোগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
‘বাংলা কিউআর’ মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবর্তিত একটি একক ও সর্বজনীন কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থা, যা অংশগ্রহণকারী সকল ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপের মধ্যে আন্তঃসংযুক্ত। এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক যেকোনো অ্যাপ ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করেই কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। ফলে ব্যবসায়ীদের এখন আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কোড রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। গত ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই নগদনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই প্রণোদনা সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছে। কোনো বড় অংকের লেনদেনকে কৃত্রিমভাবে ভেঙে ছোট ছোট একাধিক লেনদেনে রূপান্তর করা বা ‘ট্রানজেকশন স্ট্রাকচারিং’ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যর্থ হওয়া, বাতিল, রিফান্ড বা বিতর্কিত কোনো লেনদেনের বিপরীতে কোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে না। কোনো মার্চেন্টের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রণোদনার অর্থ ফেরত নেওয়া বা পরবর্তী বরাদ্দের সাথে সমন্বয় করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। এতে নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হওয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ ক্রেতারা নগদ টাকা বহনের ঝামেলা ছাড়াই কেনাকাটা করতে পারবেন এবং ছোট দোকানদারদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে শুকনো মরিচের আমদানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসেই এই বন্দর দিয়ে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ হাজার ৩৩৫ টনেরও বেশি শুকনো মরিচ বেশি আমদানি করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। মূলত দেশের মসলা বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই আমদানিকারকরা এই পণ্যটি আমদানিতে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
ভোমরা কাস্টম হাউজের রাজস্ব শাখার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে এই স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ টন শুকনো মরিচ দেশে এসেছে। এই আমদানিকৃত পণ্যের মোট মূল্য ১৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে ৪ হাজার ৩১ টন শুকনো মরিচ আমদানি করা হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ১১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবার এক মাসেই অতিরিক্ত ১ হাজার ৩৩৪ টন মরিচ আমদানি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে তাদের আমদানির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থলবন্দরে শুকনো মরিচের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও সাতক্ষীরার স্থানীয় খুচরা বাজারগুলোতে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। দেখা গেছে বিভিন্ন খুচরা পর্যায়ে এখনো প্রতি কেজি শুকনো মরিচ ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, যা এক মাস আগের দামের সাথে অপরিবর্তিত। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আমদানি ও সরবরাহ বাড়লেও পাইকারি পর্যায়ে দাম না কমায় খুচরা বাজারে দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে পর্যাপ্ত আমদানির পরেও দাম স্থির থাকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (১০ আগস্ট) দেশের শেয়ারবাজারে বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর অভাবনীয় দাপট লক্ষ্য করা গেছে। বিমা কোম্পানিগুলোর এই ইতিবাচক প্রবণতার প্রভাবে টানা দুই দিনের ঢালাও দরপতন থেকে বেরিয়ে এসেছে পুঁজিবাজার। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই আজ মূল্যসূচকের পাশাপাশি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে।
দিনের শুরু থেকেই ডিএসইতে বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। লেনদেনের শুরুতে বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল মনে হলেও শেষভাগে বিমার পাশাপাশি অন্যান্য খাতের কোম্পানিগুলোও দাম বাড়ার তালিকায় যোগ দেয়। দিনশেষে ডিএসইতে ১৯৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ১২৯টির দাম কমেছে এবং ৬৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। বিশেষ করে বিমা খাতের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৩টিরই শেয়ারের দাম বেড়েছে, যা বাজারকে পতনের বৃত্ত থেকে টেনে তুলতে সহায়ক হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতের চিত্রও ছিল ইতিবাচক; ২০টি ফান্ডের দাম বেড়েছে।
সূচকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২২ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৪৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৭৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক দশমিক ৬০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৭৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সূচক বাড়লেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ গত কার্যদিবসের তুলনায় ৫৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা কমে ৯০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বেক্সিমকো, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও স্থান করে নিয়েছে এমএল ডাইং, ব্র্যাক ব্যাংক এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৫টির শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং ৯৯টির দাম কমেছে। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় বেড়ে ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডিএসইতে ১২০টির শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৫১টির দাম কমেছে।
দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে প্রবর্তিত ‘বাংলা কিউআর’ পদ্ধতিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। গত ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক হওয়া এই ব্যবস্থায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ লাখ বার কোড স্ক্যান করে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। লেনদেনের এই ক্রমবর্ধমান হার সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং প্রচলিত অভ্যাসের পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে। গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে প্রায় ১৭ লাখ লেনদেনের মাধ্যমে ৪৮৭ কোটি টাকা আদান-প্রদান করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতিটি লেনদেনের গড় আর্থিক মূল্য ছিল ২ হাজার ৮৬৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি আধুনিক ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা কিউআরের এই দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হওয়ায় গ্রাহকেরা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাপ ব্যবহার করে একটি মাত্র কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারছেন।
ডিজিটাল এই পদ্ধতির প্রসারের ফলে শুধু নিরাপদ ও সহজ লেনদেনই নিশ্চিত হচ্ছে না, বরং এটি সার্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও জাল টাকার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নতুন মুদ্রা ছাপানোর পেছনে সরকারের বিপুল ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে সাধারণ ও ক্ষুদ্র কেনাকাটায় এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একটি একক কিউআর কোড ব্যবহারের সুবিধার কারণে দোকানদারদের এখন আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কোড রাখার প্রয়োজন পড়ছে না, যা ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভিড়ের সময় ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেনকে ত্বরান্বিত করে এবং নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার ঝামেলা কমিয়ে দেয়। খুচরা টাকা দেওয়া বা পাওয়ার সমস্যার সমাধান হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই সময় সাশ্রয় হচ্ছে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের ওপর আরোপিত চার্জ এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজনীয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে স্বল্প মুনাফায় পরিচালিত ছোট দোকানগুলোর জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্যের এই ধারা বজায় থাকলে এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তঃব্যবহারযোগ্যতার সুবিধার কারণে গ্রাহকরা এখন নির্দিষ্ট কোনো সেবাদাতার ওপর নির্ভরশীল না থেকে যেকোনো পেমেন্ট অ্যাপ দিয়ে অনায়াসেই অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন। সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক আর্থিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি এবং অন্যান্য শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য আন্তর্জাতিক ডেবিট, প্রিপেইড বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে। আজ সোমবার (১০ আগস্ট) কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন নির্দেশনার কথা জানানো হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকসমূহ এখন থেকে শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই বিশেষ কার্ড ইস্যু করতে পারবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন ফি পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, শিক্ষা খাতের এই বিশেষ লেনদেনকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এটি নিয়মিত ভ্রমণ কোটা বা প্রচলিত অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক কার্ডটি শিক্ষার্থীর নিজের নামে অথবা তাঁর অভিভাবক বা যিনি শিক্ষার যাবতীয় ব্যয় বহন করছেন, তাঁর নামে ইস্যু করা যাবে। তবে এডি ব্যাংকগুলোকে কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় নিয়ন্ত্রক আনুষ্ঠানিকতা কঠোরভাবে পালন করতে হবে। এছাড়া ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এই কার্ডের মাধ্যমে শুধুমাত্র অনুমোদিত শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয়ই পরিশোধ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল এডি ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে যাতে তারা প্রতিটি লেনদেনের যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ করে এবং নির্ধারিত পারপাস কোড ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেয়। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে এবং হুন্ডির মতো অবৈধ পথে অর্থ লেনদেনের প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্রাজিলের বিখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমব্রায়ের (Embraer) চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দুর্দান্ত ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেছে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে কোম্পানিটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি নিট মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। সোমবার প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ১১১ কোটি রিয়াল বা ২১৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব বা আয় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৩৪ কোটি রিয়ালে পৌঁছেছে, যা এমব্রায়েরের ইতিহাসে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের জন্য একটি নতুন রেকর্ড।
মূলত বিশ্ববাজারে আধুনিক বিমানের চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এমব্রায়ের এই শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। মুনাফা ও রাজস্বের পাশাপাশি কোম্পানিটির কর ও সুদপূর্ব আয় বা ইবিআইটিডিএ (EBITDA) গত বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেড়ে ১৮১ কোটি রিয়ালে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিমানের আন্তর্জাতিক বাজারে বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো জায়ান্টদের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করছে ব্রাজিলের এই বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। রেকর্ড পরিমাণ আয়ের এই খবর প্রকাশের পর বিশ্ব পুঁজিবাজারেও কোম্পানিটির শেয়ারের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সোমবার বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণে ইরান ও ওমানের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর খবরে অপরিশোধিত তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে চলতি সপ্তাহে প্রকাশ হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে নজর রাখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ইউরোপের প্রধান সূচক স্টক্স ৬০০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার ০.২ শতাংশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকের ফিউচার ০.৪ শতাংশ বেড়েছে।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
এশিয়ার শেয়ারবাজারও সোমবার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আগের সপ্তাহে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় জাপানের নিকেই সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
বৈশ্বিক শেয়ারের এমএসসিআই সূচকও সোমবার দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারের পরবর্তী বড় অনুঘটক হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইকে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, জুলাইয়ে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। জুনে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা জুনে ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
জেফরিজের জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার বলেন, "আমরা এ বছর ফেডের পক্ষ থেকে কোনো সুদহার বৃদ্ধির পূর্বাভাস রাখছি না। মূল বিষয় হবে এ সপ্তাহের মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন।"
তার মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকলে এবং বর্তমান পর্যায় থেকে আরও কমে এলে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নিয়ে বাজারের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে। ফেড ফিউচার বাজারে সেপ্টেম্বরে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন প্রায় ৪৫ শতাংশ ধরা হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৬৭ শতাংশ।
শক্তিশালী আয়েও চাঙা শেয়ারবাজার
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন কোম্পানির শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল। ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকদের হিসাবে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানির ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের বিনিয়োগ আয় বাদ দিলে শেয়ারপ্রতি আয় গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর ৭৬ শতাংশ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
জেপিমরগ্যানের কৌশলবিদরা ২০২৬ সালের জন্য এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর শেয়ারপ্রতি আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৩৬৫ ডলার করেছেন, যা বার্ষিক ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে সূচকটির লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার পয়েন্ট করা হয়েছে। সোমবার সূচকটি ৭ হাজার ৭৫৮ পয়েন্টে ছিল।
চলতি সপ্তাহে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল প্রকাশের চাপ কিছুটা কম থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস, নেটওয়ার্কিং সরঞ্জাম নির্মাতা সিসকো এবং ক্লাউড অবকাঠামো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কোরউইভের ফলাফলের দিকে নজর থাকবে।
এদিকে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৬৪৩ শতাংশে নেমেছে। চলতি সপ্তাহে বাজারে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ট্রেজারি বন্ড ইস্যু হতে পারে বলে বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। ইউরোর দর সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি, ১ ইউরোতে ১ দশমিক ১৫৬ ডলার ছিল। অন্যদিকে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলার দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৮ দশমিক ৪৮ ইয়েনে উঠেছে। তবে বাজারে জাপানি কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাইয়ের বৈঠকের মতামতের সারসংক্ষেপে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এতে প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরে সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।
নতুন করে শুল্ক পরিবর্তনের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই পণ্য আমদানি করায় জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে কনটেইনারে পণ্য আমদানি বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেসকার্টেস সিস্টেমস গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রবন্দরগুলোতে ২০ ফুট সমতুল্য ইউনিট বা টিইইউ হিসেবে ২৫ লাখ কনটেইনার পণ্য ওঠানামা করেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে এটি জুলাইয়ের চতুর্থ সর্বোচ্চ আমদানি।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ের প্রায় রেকর্ড আমদানির তুলনায় এবার আমদানি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। ডেসকার্টেসের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। তারপরও মহামারির আগের সময়ের তুলনায় আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়েছে।
নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য দেশে আনার চেষ্টা করায় জুলাইয়ের আমদানিতে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে বৈশ্বিক আমদানির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ ‘সেকশন ১২২’ শুল্কের মেয়াদ শেষ হয়। পরে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়। এসব দেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
জুলাইয়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কনটেইনারে পণ্য পাঠানোর পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটি থেকে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ১২৯ টিইইউ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে, যা এক বছরের মধ্যে চীনের সর্বোচ্চ মাসিক চালান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর বিভিন্ন শুল্ক আরোপ করলেও কনটেইনারে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী।
যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার আমদানির প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত দেশটির বড় খুচরা বিক্রেতারা। শরৎ ও শীতকালীন ছুটির মৌসুমকে সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত বছরের এই সময়ে আমদানি বাড়ায়। তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় একের পর এক অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মৌসুমি আমদানির সময়সীমা আরও দীর্ঘ হচ্ছে এবং আগেভাগেই পণ্য আনা হচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারি, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত পরিবর্তনশীল শুল্কনীতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি, পানামা খালে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি বিধিনিষেধ এবং লোহিত সাগরে চলমান সংকটও আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে প্রভাব ফেলছে।
ডেসকার্টেস সিস্টেমস গ্রুপ জানিয়েছে, এসব ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার কারণে পরিবহন ব্যয়, জাহাজ চলাচলের রুট এবং পণ্য সংগ্রহের কৌশলে পরিবর্তন আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের সামনে শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা আগামী দিনেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৭২৮ কোটি বা ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি। একই সময়ে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইও ১৫ শতাংশ কমেছে।
‘ট্রাম্প শুল্ক’সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে অর্থবছরের শেষ দিকে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বড় হয়েছে। এর আগে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
সাম্প্রতিক দুই অর্থবছরে ঘাটতি কমার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও তা বড় আকারে বেড়েছে। গত জুনে ৭১৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭৪ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। বিপরীতে ওই মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪২০ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে অর্থবছরের শেষ মাসের আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছিল তৎকালীন সরকার। এতে আমদানি ব্যয় কমার পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতিও নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত ছিল এবং ঘাটতি দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে গত অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবেও বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ বা ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর আগে জুলাই-আগস্ট সময়ে এই হিসাবে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। শুধু জুলাই মাসেই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে বাংলাদেশ বড় ধরনের উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরের শুরুতে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা যায়। ডিসেম্বর শেষে অর্থবছরের প্রথমার্ধে তা বেড়ে ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। নয় মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও বড় উদ্বৃত্ত ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হিসাবে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামগ্রিক লেনদেনে ৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিট ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই পেয়েছে। আগের অর্থবছরে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের এই ভারসাম্যহীনতা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।