দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
গত সপ্তাহে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের গতি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার মূলধন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিনই মূল্য সূচক বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সপ্তাহ পার করেছে বাজার। এর ফলে ডিএসইর বাজার মূলধন আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বৃদ্ধি পেলেও প্রধান মূল্য সূচকের ক্ষেত্রে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ১৭৯টির দর কমেছে এবং ২২টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের হিসাব অনুযায়ী ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায়, যা পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় ২ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বেশি। এর আগে গত সপ্তাহেও বাজার মূলধন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল, ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোট মূলধন বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। তবে মূলধন বাড়লেও ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৩৪ দশমিক ৬২ পয়েন্ট বা দশমিক ৫৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে শরিয়াহ্ সূচক ও ডিএসই-৩০ সূচকেও গত সপ্তাহজুড়ে কিছুটা পতন দেখা গেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতিতে বেশ চাঞ্চল্য দেখা গেছে। ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, মালেক স্পিনিং এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট। এছাড়া একমি পেস্টিসাইড, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল।
বাংলাদেশ থেকে তাজা আনারস আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে পাকিস্তান সরকার। শুক্রবার এক আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে ইসলামাবাদে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সফল পরিণতি হিসেবে এই বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই রপ্তানি অনুমতি লাভের পেছনে ইসলামাবাদস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন, করাচির উপ-হাইকমিশন, বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরলস প্রচেষ্টা কাজ করেছে। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের সাথে কয়েক বছর ধরে চলমান যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমেই আজকের এই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়েছে।
বিপুল চাহিদাপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশি আনারস প্রবেশের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ হলো। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই অনুমোদনের ফলে কেবল আনারস নয়, বরং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য ও ফলমূল আদান-প্রদানের পথও প্রশস্ত হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অষ্টম সভায় সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং থেকে এক কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী। সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি প্রক্রিয়ায় এই জ্বালানি সংগ্রহের প্রস্তাবটি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অনুমোদিত এই চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ ও ১২ আগস্টের মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি দেশে এসে পৌঁছাবে। দরপত্রের শর্তানুসারে, প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের জন্য ব্যয় হবে "২১.৫৫ মার্কিন ডলার"। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক বার্তার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে গণমাধ্যম।
সভায় আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই এলএনজি সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। নির্ধারিত দাম ও সময়সীমা বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে এই জ্বালানি সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদী এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
অপরপক্ষে, গানভর ইউএসএ এলএলসি-এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি ক্রয়ের একটি প্রস্তাবও উক্ত সভায় পর্যালোচনার জন্য আনা হয়েছিল। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই প্রস্তাবটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর বিবেচিত হয়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এই প্রস্তাবটি আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে নেওয়ায় কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
দেশের স্বর্ণ খাতকে একটি আধুনিক, সুসংগঠিত এবং জবাবদিহিমূলক শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘জাতীয় স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিশেষ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বর্ণ ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনয়ন, বৈধ বাণিজ্যের প্রসার এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণ আরও শক্তিশালী করা। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিমালার খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। উক্ত সভায় বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আগামী রোববারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ও অংশীজনদের এই খসড়ার ওপর লিখিত মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দেশের স্বর্ণ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাবে দেশের স্বর্ণ খাত একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বর্ণ খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মন্ত্রী বলেন, "সরকারের লক্ষ্য হলো স্বর্ণ ব্যবসাকে অন্যান্য শিল্প খাতের মতো পূর্ণাঙ্গ আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এনে একটি স্বীকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং স্বর্ণের লেনদেন ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।" নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে স্বর্ণের আমদানি থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বর্ণের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, "বৈধভাবে আমদানি করা এবং দেশে সংরক্ষিত স্বর্ণ জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতোই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করে।" চোরাচালান বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দামের সামঞ্জস্য না থাকলে পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। এ ক্ষেত্রে দুবাইয়ের মতো বৈশ্বিক স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর কর ও শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
খসড়া নীতিমালায় স্থানীয় কারিগরদের তৈরি স্বর্ণালংকার রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর জন্য সুলভ মূল্যে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশে বিশেষ করে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। একটি যুগোপযোগী ও সুসংগঠিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভোক্তারা ন্যায্য মূল্যে স্বর্ণ কেনার সুযোগ পাবেন।" ভারতসহ বিশ্বের প্রধান স্বর্ণ রপ্তানিকারক দেশগুলোর নীতিমালা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করা হবে বলে জানানো হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রী অংশীজনদের আশ্বস্ত করে বলেন, "সরকারের উদ্দেশ্য নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি করা নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা।" সকল পক্ষের সুপারিশ ও মতামত যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনে আরও আলোচনার মাধ্যমে এই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
দেশের শেয়ারবাজারে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিন ভালো মানের মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির পাশাপাশি দুর্বল খাতের প্রতিষ্ঠান এবং অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের দাম কমেছে। এই ঢালাও দরপতনের ফলে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) মূল্য সূচকের অবনতি ঘটেছে। তবে সূচক কমলেও উভয় বাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেনের শুরুর দিকে মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতের শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে লেনদেনের শেষ আড়াই ঘণ্টায় বাজারের চিত্র বদলে যায় এবং ব্যাপক বিক্রয় চাপের মুখে দরপতনের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। দিন শেষে ডিএসইতে মাত্র ৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ২৬৩টির দাম কমেছে এবং ৪১টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে মাত্র ২টির দাম বাড়লেও ৩০টির দাম কমেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভালো কোম্পানি বা যারা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ প্রদান করে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৯টির শেয়ার দর কমেছে এবং মাত্র ৪৫টির বেড়েছে। মাঝারি মানের কোম্পানির ক্ষেত্রে ৫২টির দাম কমেছে এবং ১৮টির বেড়েছে। অন্যদিকে, লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭২টির দাম কমেছে এবং ২৫টির দাম বেড়েছে। ব্যাপক দরপতনের কারণে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮৬০ পয়েন্টে নেমেছে। একইভাবে ডিএসই-৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।
সূচক কমলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বেড়ে ১ হাজার ১৪৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, যাদের প্রায় ৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল যথাক্রমে সেনা ইন্স্যুরেন্স এবং একমি পেস্টিসাইড। এছাড়া শীর্ষ তালিকায় সামিট এলায়েন্স পোর্ট, মালেক স্পিনিং, বেক্সিমকো ও মুন্নু ফেব্রিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থান করে নিয়েছে।
দেশের অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬৪ পয়েন্ট কমেছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২৭টির দাম কমেছে এবং ৮৭টির দাম বেড়েছে। সূচক কমলেও সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে ২৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ১৮ কোটি ৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে সপ্তাহের শেষ দিনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কাবস্থা ও বিক্রয় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের গতিতে নজিরবিহীন ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এর আগে ১৯৯৩ সালে ঋণের প্রবৃদ্ধি এতটা নিচে নেমেছিল।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়া, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের পাহাড়সম চাপ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে ঋণপ্রবাহে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত বছরের জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এমনকি করোনা মহামারির চরম বিপর্যয়ের সময়ও এই প্রবৃদ্ধি কখনও সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার সরাসরি অর্থ হলো দেশে নতুন বিনিয়োগের গতি মন্থর হওয়া। যেহেতু দেশের কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তাই বিনিয়োগ কমলে তার নেতিবাচক প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দেওয়ার চেয়ে পুরনো ঋণ আদায়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অনেক ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক অবস্থা ও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে বড় অংকের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল উচ্চ সুদহার নয়, বরং অবকাঠামোগত নানা সংকট বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার অনেক নতুন প্রকল্প চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সাথে ডলারের বাজারের অস্থিরতা, কাঁচামাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্থিতিশীলতা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার হারও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোকে আরও রক্ষণশীল করে তুলেছে। গত মার্চ পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো বড় শিল্পঋণের ঝুঁকি না নিয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে অধিক নিরাপদ মনে করছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তাদের মতে, অতীতে প্রভাবশালী গ্রাহকরা যেভাবে ঋণ নিয়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন বা অর্থ পাচার করেছেন, সেই তুলনায় বর্তমানের এই সতর্ক ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দিতে পারে।
অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নীতিসুদ বা রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে প্রথম কমানোর সিদ্ধান্ত। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ সহজ হবে এবং ঋণের সুদহারও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদনমুখী খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল এবং সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা শিথিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত হলো, শুধুমাত্র সুদহার কমিয়ে বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বিনিয়োগে জোয়ার আনা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে সবার আগে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বর্তমান সরকার আগামী দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নিয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত না হলে তা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অর্থবছর শেষে ৮ শতাংশে পৌঁছাবে।
ইউরোপীয় অঞ্চলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রসারের অংশ হিসেবে পর্তুগালে প্রথমবারের মতো ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান রেনাটা পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে দেশটিতে তাদের ওষুধের প্রথম চালানটি সফলভাবে প্রেরণ করেছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে এই বাণিজ্যিক অগ্রগতির তথ্য নিশ্চিত করেছে ওষুধ ও রসায়ন খাতের এই শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিটি।
রেনাটার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম চালানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (ইইউ-জিএমপি) অনুমোদিত রাজেন্দ্রপুর ও মিরপুর কারখানা থেকে উৎপাদিত অ্যামান্টাডিন ক্যাপসুল, ফ্লুড্রোকর্টিসোন এবং ক্যাবারগোলিন ট্যাবলেট পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, পর্তুগালের বাজারে এই প্রবেশ তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ কৌশলের একটি বিশেষ মাইলফলক, যা সমগ্র ইউরোপে রেনাটার বাণিজ্যিক উপস্থিতিকে আরও সুসংহত করবে।
এর আগে গত ৩ জুলাই রেনাটা পিএলসি আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও মাল্টাসহ ইউরোপের ছয়টি দেশে থাইরয়েড চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লেভোথাইরক্সিন সোডিয়াম ট্যাবলেট বাজারজাতকরণের অনুমতি লাভ করে। বিকেন্দ্রীকৃত অনুমোদন প্রক্রিয়ার অধীনে পাওয়া এই স্বীকৃতির মাধ্যমে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইইউ-জিএমপি অনুমোদিত রেনাটার সর্বাধুনিক প্ল্যান্টে এই ওষুধগুলো উৎপাদিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে দেশের শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত রেনাটা পিএলসির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকারও বেশি। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের একটি বড় অংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকলেও এতে বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। পর্তুগালে এই নতুন যাত্রা কোম্পানির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা অস্থিরতা বৈশ্বিক এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এতদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না। এখন জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আরও বড় একটি পরিবর্তন সামনে এসেছে। সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার কাঠামোও ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে।
এখনও অনিশ্চয়তায় হরমুজ প্রণালি
পাঁচ মাস পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজিবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না।
গত মার্চে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি 'ফোর্স ম্যাজিউর' ঘোষণা করার পর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সম্প্রতি উত্তেজনা কিছুটা কমলেও বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
২৯ জুলাই কাতারএনার্জির এলএনজিবাহী জাহাজ আল আরিশ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। ১১ জুলাইয়ের পর এটিই ছিল প্রণালি ত্যাগ করা প্রথম নিবন্ধিত এলএনজি জাহাজ। একই সময়ে কাতারএনার্জি তাদের 'ফোর্স ম্যাজিউর' অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দেয়। এর ফলে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
শুধু সরবরাহ নয়, বদলে যাচ্ছে পুরো বাজার
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, এলএনজি শিল্প এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সরবরাহ ও চাহিদা, উভয় দিক থেকেই ঝুঁকি বাড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি হলে এলএনজি সহজেই বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে এবং বৈশ্বিক চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে। বর্তমান সংকট সেই দুই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আংশিকভাবে সামাল মিললেও ঝুঁকি রয়ে গেছে
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন উৎপাদন এবং অন্যান্য উৎস থেকে বাড়তি সরবরাহের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হারানো এলএনজির প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে বাকি ২৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণের মতো বিকল্প উৎস এখনো নেই। অর্থাৎ বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ বজায় থাকলেও প্রতিবার উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ ভাড়া, বিমা ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়।
এর প্রভাব মূল্যেও স্পষ্ট। জানুয়ারিতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার। জুলাইয়ে তা বেড়ে ২০ থেকে ২২ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে যুদ্ধসংক্রান্ত যেকোনো খবরেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামে তাৎক্ষণিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
চাহিদার কাঠামোও বদলাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে চাহিদার ক্ষেত্রে।
প্রতিটি ভূরাজনৈতিক সংকট দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে আরও উৎসাহিত করছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কিছু দেশ জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে কয়লার ব্যবহারও দীর্ঘায়িত করছে।
শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা হঠাৎ কমে না, তবে বড় ভূরাজনৈতিক সংকট এই পরিবর্তনের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
সামনে চাহিদা কমার আশঙ্কা
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাস স্ট্র্যাটেজিসের সম্ভাব্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে আরব উপসাগর থেকে এলএনজি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত থাকলে ২০২৫-২০২৬ সময়ে বৈশ্বিক চাহিদা প্রায় ৮ শতাংশ কমতে পারে।
অন্যদিকে, শেলের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলতি মৌসুমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি থেমে যেতে পারে, এমনকি সংকোচনও দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলেও রপ্তানি টার্মিনালগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগবে।
উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা মিলবে তো?
বর্তমানে যেসব নতুন এলএনজি প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে আরও প্রায় ২০ কোটি ৭০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে। অথচ গত বছর বিশ্বে মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ কোটি ২০ লাখ টন।
ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে সংকট কি উৎপাদনের হবে, নাকি পর্যাপ্ত ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার?
আস্থাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হবে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে নয়। বরং সফল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, উন্নত লজিস্টিকস, বহুমুখী উৎস, সংরক্ষণ সুবিধা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে।
হরমুজ প্রণালির সংকট শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক এলএনজি শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে, যখন গ্যাসের চেয়ে আস্থার মূল্য আরও বেশি, তখন ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম পুনরায় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ভরিপ্রতি ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে বাজুসের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আজ সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই দর কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এটি বহাল থাকবে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা এই সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকায় বিক্রি হবে। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা। এর আগে গত ৩১ জুলাই বাজুস শেষবারের মতো স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ভরিপ্রতি ২৯২ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম এখন ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা। একইভাবে ভ্যাটসহ ২১ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৩৩ টাকায় পাওয়া যাবে। মূলত বিশ্ববাজার ও স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহের অস্থিতিশীলতার কারণেই জুয়েলারি খাতে এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সোনার এই উচ্চমূল্যের ফলে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুতই কোনো চুক্তি হতে পারে—এমন সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। এই ইতিবাচক খবরের প্রভাবে মঙ্গলবার বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি সচল করার ব্যাপারে ‘আজ অথবা আগামীকাল’ একটি চুক্তি হতে পারে। তার এই বক্তব্যের পরপরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয়। বার্তা সংস্থা এএফপি এই খবর নিশ্চিত করেছে।
বিগত পাঁচ মাস ধরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস বহনকারী ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তবে নতুন করে সমঝোতার পথ প্রশস্ত হওয়ায় বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও; ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান দুটি সূচক নতুন রেকর্ড গড়েছে। পাশাপাশি ইউরোপের প্যারিস ও মিলানের শেয়ার সূচক ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মাদ্রিদের বাজারও আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশাতীত মুনাফা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্যালান্টির ও ক্যাটারপিলারের মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল বাজারের গতি বৃদ্ধি করেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝেও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।
বি. রাইলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট-এর বাজার বিশ্লেষক আর্ট হোগান বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী নিয়ে এই প্রশাসনের কেউ ইতিবাচক কিছু বললেই বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, আজকের লেনদেন তারই বড় উদাহরণ।’ তিনি মনে করেন, চলতি মৌসুমে কোম্পানিগুলোর অসাধারণ মুনাফাও বাজারকে চাঙ্গা রেখেছে।
তবে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ এর আগেও সমঝোতার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। পরিস্থিতির জটিলতা বজায় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে মঙ্গলবারও, যখন হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।
টিকমিল গ্রুপের বাজার কৌশলবিদ প্যাট্রিক মানেলি বলেন, ‘বাজার এখন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করছে। তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক সংঘাত আরও বাড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত কয়েক মাসে তেল কোম্পানিগুলো ব্যাপক মুনাফা করেছে। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বিপি-র মুনাফা কয়েকগুণ বাড়লেও মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে তাদের দরপতন হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরামকো জানিয়েছে তাদের নিট মুনাফা ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ জ্বালানি জায়ান্ট এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জন করেছে। তবে জ্বালানি তেলের দামের এই অস্থিরতা জার্মানির লুফথানসার মতো বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দেশের বাজারে কাঁচামরিচের তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে ভারত থেকে আমদানি জোরদার করা হয়েছে। গত দুই দিনে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৪২০ কেজি ভারতীয় কাঁচামরিচ দেশে প্রবেশ করেছে। সোমবার ৯ হাজার ২০০ কেজি এবং মঙ্গলবার ২৯ হাজার ২২০ কেজি মরিচের চালান বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এই বিপুল পরিমাণ আমদানির প্রভাবে ইতোমধ্যে স্থানীয় বাজারে মরিচের দাম কমতে শুরু করেছে।
আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে প্রতি কেজি মরিচ ২৫ থেকে ৪০ টাকা দরে কেনা হলেও দেশের বাজারে পৌঁছাতে খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আমদানিকারকরা দাবি করেছেন যে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যদি প্রকৃত ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক নির্ধারণ করত, তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে আরও কম মূল্যে মরিচ সরবরাহ করা সম্ভব হতো।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৯ জন ব্যবসায়ীকে প্রায় ৩০ হাজার টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়া হয়েছে। আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তের ওপারে আরও বেশ কিছু ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বৃহস্পতিবার নাগাদ বন্দরে পৌঁছাতে পারে। আমদানিকারকরা স্বল্প লাভে বাজারে পণ্য ছাড়ছেন উল্লেখ করে জানান যে, কাস্টমস ও বন্দরের আনুষঙ্গিক খরচই মূলত প্রকৃত বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের জেরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ২০ শতাংশ কারখানায় চার দিনের টানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার শুরু হওয়া এই সরকারি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি সমন্বয় করে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সীমিত সরবরাহের কারণে গাজীপুরের পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে শত শত পোশাক শ্রমিক তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন, যার ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের ভিড় ও যানবাহনের প্রবল চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
শিল্পাঞ্চল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের তীব্র সংকটের মুখে উৎপাদন সচল রাখতে মালিকেরা ইতিপূর্বে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। কোথাও উৎপাদন লাইন কমিয়ে আনা হয়েছিল, আবার কোথাও শুধুমাত্র রাতের শিফটে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে লম্বা ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে অনেক কারখানা। বিশেষ করে কালিয়াকৈর, টঙ্গী বিসিক ও শ্রীপুর অঞ্চলের কারখানাগুলো গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও ভোগড়া এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন, যার ফলে ভোর থেকেই মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি দেখা গেছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, জেলায় মোট কারখানার প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে ছুটিতে রয়েছে। যার অধিকাংশ তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং ও ডাইং খাতের। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, যানবাহনের বাড়তি চাপের কারণে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিল্প মালিকদের মতে, অব্যাহত গ্যাস সংকটের ফলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার এবং পুরো শিল্প খাত ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাজীপুর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেলায় দৈনিক ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলমান থাকলেও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা পুরোপুরি মিটবে না। রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে শিল্প মালিকেরা দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিউক এনার্জি চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ওয়াল স্ট্রিটের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। এলএসজিই (LSEG) সংকলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৩০ জুন সমাপ্ত তিন মাসে উত্তর ক্যারোলাইনাভিত্তিক এই কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ১ দশমিক ৪৩ ডলার সমন্বিত মুনাফা অর্জন করেছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ১ দশমিক ৩০ ডলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মূলত বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান ব্যয় সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি এই শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর ওপর চরম আবহাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুতায়নের যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় ডিউক এনার্জি ২০২৬ সাল নাগাদ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মাশুল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ‘রেট কেস’ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়। ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমেই মূলত এই মুনাফার ধারা বজায় রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবসায়িক খাতের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিউক এনার্জির ইলেকট্রিক ইউটিলিটি বিভাগ থেকে আলোচ্য প্রান্তিকে মুনাফা অর্জিত হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ফ্লোরিডা, ইন্ডিয়ানা, ওহাইও এবং কেনটাকির প্রায় ৭৯ লাখ গ্রাহককে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করছে এই সংস্থাটি, যাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫১ হাজার মেগাওয়াট। তবে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি থাকলেও ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের খরচ ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সার্বিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ডিউক এনার্জি তাদের পুরো বছরের জন্য সমন্বিত মুনাফার পূর্বাভাস শেয়ারপ্রতি ৬ দশমিক ৫৫ থেকে ৬ দশমিক ৮০ ডলারে অপরিবর্তিত রেখেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের উচ্চ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভব হবে।