দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
দেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনো নির্দিষ্ট কিছু শ্রমবাজারের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট অর্জিত রেমিট্যান্সের ৮৬ দশমিক ২৮ শতাংশই এসেছে মাত্র ১০টি দেশ থেকে। একক দেশ হিসেবে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এর পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি ও মালয়েশিয়া। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রবাস আয়ের প্রায় ৮৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ এই শীর্ষ ১০ দেশ থেকেই এসেছিল, যা প্রমাণ করে অর্থবছর পাল্টালেও আয়ের উৎসের ধরনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, মুষ্টিমেয় কিছু দেশের ওপর এমন অতি-নির্ভরশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি কোনো নির্দিষ্ট শ্রমবাজারে মন্দা দেখা দেয় কিংবা অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন আসে, তবে দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত বাজারগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার অন্যান্য সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোকে আরও সাশ্রয়ী ও সহজতর করার পাশাপাশি প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে যেমন প্রবাহ টেকসই হবে, তেমনি কয়েক দেশের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশে মোট ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ের এই আয়ের মধ্যে ২৪৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলারই এসেছে শীর্ষ ১০ দেশ থেকে। এর বিপরীতে বিশ্বের বাকি সব দেশ থেকে এসেছে মাত্র ৩৯ কোটি ২২ লাখ ডলার বা ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। জুলাই মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সৌদি আরব থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। এরপর যুক্তরাজ্য থেকে ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। তালিকায় এর পরেই রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (২৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার), ইতালি (২০ কোটি ৩১ লাখ ডলার) এবং মালয়েশিয়া (২০ কোটি ১৩ লাখ ডলার)। এছাড়া কুয়েত, ওমান, সিঙ্গাপুর ও কাতার—প্রতিটি দেশ থেকেই ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ এসেছে।
রেমিট্যান্সের এই ঘনত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় যে, শুধুমাত্র শীর্ষ ছয়টি দেশ থেকেই জুলাইয়ের মোট আয়ের প্রায় ৬৭ দশমিক ০৬ শতাংশ বা ১৯১ কোটি ৭১ লাখ ডলার সংগৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০ ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে প্রায় ৬৭ ডলারই আসছে এই ছয়টি দেশ থেকে। এর মধ্যে এককভাবে সৌদি আরবের অবদান ২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ের চিত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সে সময় মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে ৩০ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার বা ৮৬ দশমিক ৬৫ শতাংশই এসেছিল শীর্ষ ১০ দেশ থেকে। ওই অর্থবছরেও শীর্ষ পাঁচ দেশ—সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই মোট আয়ের প্রায় ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ বা ২৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার অর্জিত হয়েছিল।
তবে মাসভিত্তিক হিসেবে দেশগুলোর অবস্থানের কিছুটা রদবদল লক্ষ্য করা গেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। তেমনিভাবে ইতালি পঞ্চম এবং মালয়েশিয়া ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। তবে সব হিসাবের ঊর্ধ্বে সৌদি আরব তার শীর্ষস্থানটি অত্যন্ত সুসংহত রেখেছে। পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার এসেছিল এবং চলতি জুলাই মাসেও দেশটি একাই প্রায় ৫৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনো মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার ফলে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজারের যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান কেভিন ওয়ারশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। শুক্রবার তার এই বক্তব্যকে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রানীতির সংকেত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দরপতন লক্ষ্য করা গেছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওয়াইওমিংয়ের জ্যাকসন হোলে আয়োজিত এক সম্মেলনে বহুল প্রতীক্ষিত এই ভাষণে ওয়ারশ মন্তব্য করেন, “মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত প্রবণতা যে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার দিকে স্পষ্টভাবে এবং যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে। তা না হলে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।” এএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার এই বক্তব্যের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত এই বন্ডের হার ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়, যা এখন সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়টি এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইউরোসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান দ্রুতলয়ে বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৩.৭ শতাংশে অবস্থান করছে, যা ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। বিনিয়োগকারীদের মাঝে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে যে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য শীতকালেও উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ওয়ারশ বলেন, “মূল্যস্থিতিশীলতার দিক থেকে আমাদের দায়িত্বের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগুলো বেশি উদ্বেগজনক।” তবে একই সঙ্গে তিনি মার্কিন অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, দেশটির কর্মসংস্থান পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা ‘ভালো’ রয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ প্রধানের এই বক্তব্যের প্রভাবে ওয়াল স্ট্রিটের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দিন শেষে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কিছু সময়ের জন্য বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা নেতিবাচক অবস্থানে গিয়ে থামে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্যাকসন হোলের এই বৈঠকে কেভিন ওয়ারশের বক্তব্য জুলাই মাসের সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট বার্তা প্রদান করেছে। যদিও সুদের হার বাড়ানো এখনো চূড়ান্ত নয়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান থাকলে ওয়ারশ সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষেই অবস্থান নেবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে ইউরোপের শেয়ারবাজারগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, বিশেষ করে বিলাসপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে প্যারিসের সূচক এক শতাংশ বেড়েছে।
এশীয় অঞ্চলের বাজারগুলোতেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। টোকিও ও হংকংয়ের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সিউল ও সাংহাইয়ের বাজারে দরপতন ঘটেছে। প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়ার রেকর্ড মুনাফার খবরের পর বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে চাঞ্চল্য দেখা দিলেও শুক্রবার তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের অতিমূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শঙ্কা কিছুটা প্রশমিত হলেও বাজারের অস্থিরতা কাটেনি।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম সামান্য কমেছে। হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে বিভিন্ন সংকেত এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির বিষয়টি বাজারে প্রভাব ফেলছে। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরানকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ’ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রণালী দিয়ে সম্পন্ন হয়।
মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক আলোচনায় নতুন এক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যাকে সংশ্লিষ্টরা ‘পনির কূটনীতি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেক্সিকোর দুইজন সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, পনিরের নামকরণ সংক্রান্ত এই বিরোধ এখন দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত মেক্সিকোর সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন এক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে এই সংকটের সূত্রপাত, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু পনিরের নামের ওপর বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন মেক্সিকোর এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করছে, কারণ এই চুক্তির ফলে পারমিজিয়ানো রেজিয়ানো, ফেটা এবং মানচেগোর মতো শত শত ইউরোপীয় পণ্যের নামের ওপর ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বা বিশেষ সুরক্ষা কার্যকর হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে মার্কিন উৎপাদকরা মেক্সিকোর বাজারে ‘পারমেসান’ বা ‘ফেটা’ নামে তাদের পনির বিক্রি করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে এই নামগুলো সাধারণ বা জেনেরিক, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মনে করে পারমেসান নাম শুধু উত্তর ইতালির এবং ফেটা নাম শুধু গ্রিসের নির্দিষ্ট অঞ্চলের পনিরের জন্য সংরক্ষিত থাকা উচিত।
এই বিষয়ে ইউএস ডেইরি এক্সপোর্ট কাউন্সিলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেমি কাস্তানেদা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেক্সিকো যা করেছে তা একেবারেই ভুল। মেক্সিকো সরকারকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে সাধারণ নামের পনির উৎপাদনকারী মার্কিন ও মেক্সিকান নির্মাতারা বাজারে টিকে থাকতে পারবে।” উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি এবং মার্কিন-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি (ইউএসএমসিএ) নবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। এই উচ্চ-পর্যায়ের দরকষাকষিতে মার্কিন পনির রপ্তানিকারকদের প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বাজার ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা মেক্সিকান কর্তৃপক্ষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে চুক্তিটি সই হয়েছে, তবে মেক্সিকোর আইনপ্রণেতাদের দ্বারা এটি এখনো অনুমোদিত বা অনুসমর্থিত হয়নি। ইউরোপীয় কমিশন রয়টার্সকে জানিয়েছে যে চুক্তির শর্তাবলীতে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় এবং তারা ইউরোপীয় পনিরের সুরক্ষার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় গত এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, “ইইউ তাদের ক্ষতিকারক জিআই (Geographical Indication) ব্যবস্থাকে নিজের সীমানার ভেতরে এবং বাইরেও সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।” মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ডেইরি উৎপাদকদের ‘ফেটা স্টাইল’ বা ‘ইমিটেশন ফেটা’র মতো শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য করা অপ্রয়োজনীয় এবং এর ফলে ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পনির বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
মেক্সিকো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পনির ব্যবহারকারী দেশগুলোর একটি। যদিও দেশটিতে স্থানীয় ‘ওক্সাকা’ বা ‘কুয়েসো ফ্রেস্কো’ পনির অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবে আশির দশকের পর থেকে আমদানি করা পনিরের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। বর্তমানে মেক্সিকোর মোট পনির চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, যার সিংহভাগ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোতে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের পনির রপ্তানি করে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ২০ কোটি ডলার। ইউরোপীয় উৎপাদকদের মতে, এই বিরোধ মূলত দুটি ভিন্ন কৃষি সংস্কৃতির লড়াই—একদিকে মার্কিন বিপুল উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অন্যদিকে ইউরোপের আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও আভিজাত্য।
মানচেগো পনিরের আঞ্চলিক সুরক্ষা প্রদানকারী একটি সংস্থার প্রধান আন্তোনিও মার্টিনেজ এ প্রসঙ্গে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই উচ্চ-মাত্রার ভোগের দেশ, যা মূলত ‘ডেজিগনেশন অফ অরিজিন’ বা নির্দিষ্ট উৎস সুরক্ষার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।” তিনি মনে করেন, স্পেনের মানচেগো পনিরের ক্ষুদ্র পরিসরে উৎপাদনই এর স্বকীয়তা এবং আকর্ষণের মূল কারণ। মেক্সিকোর স্থানীয় পনির পরিবেশক রডলফো নাভারো ইইউ-এর সাথে এই চুক্তিকে সমর্থন করছেন কারণ এতে ইউরোপীয় পনির আমদানিতে শুল্ক কমবে। তিনি বলেন, “এই পনিরগুলো ভিন্ন বাজারে সেবা দেবে। ইউরোপীয় পনির একটি উচ্চতর স্তরে বিক্রি হবে।”
তবে মেক্সিকান পনির নির্মাতাদের একাংশ মার্কিন উৎপাদকদের বিরুদ্ধে সস্তায় পনির বিক্রি করে স্থানীয় বাজার নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছেন। কৃষি ও বাণিজ্য নীতি বিষয়ক ইনস্টিটিউট গত বছর সতর্ক করেছিল যে সস্তা মার্কিন রপ্তানির কারণে মেক্সিকোর ডেইরি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি মার্কিন পনিরের মান নিয়ে মেক্সিকোর বাজারে কিছু নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। মেক্সিকান পনির বিশেষজ্ঞ জর্জিনা ইয়েসকাস ট্রুজানো বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সস্তায় বিক্রি করতে পারে বলে মেক্সিকোর বাজার তাদের পনিরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আমি খুশি যে ইউরোপীয় পনিরের ওপর শুল্ক কমানো হচ্ছে, কারণ মেক্সিকানরা এখন আরও ভালো পনির খাওয়া শিখতে পারবে।” সামগ্রিকভাবে এই পনির যুদ্ধ এখন উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্কের এক জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্কের রপ্তানি খাতে নতুন এক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশটির রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫.৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি তুরস্কের ইতিহাসে জুলাই মাসের জন্য সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের রেকর্ড। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
তুর্কি পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউট (তুর্কস্ট্যাট) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রী ওমের বোলাত এক লিখিত বিবৃতিতে এই সাফল্যের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল জুলাই মাসের রেকর্ডই নয়, বরং তুরস্কের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি আয়ের নজির। তবে রপ্তানির পাশাপাশি আমদানিতেও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই মাসে আমদানি ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩২.৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ফলে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি ১৩.৬ শতাংশ বেড়ে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে আমদানির বিপরীতে রপ্তানির অনুপাত গত বছরের ৭৯.৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৭.৭ শতাংশে নেমেছে।
বৈশ্বিক প্রতিকূলতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও তুরস্কের অর্থনীতির এই ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। ওমের বোলাত জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে রপ্তানি ৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬১.৫৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে এই সাত মাসে আমদানি ৪.৭ শতাংশ বেড়ে ২২২.০৯ বিলিয়ন ডলার হওয়ায় সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি ৮.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬০.৫৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।
বার্ষিক হিসেবে জুলাই পর্যন্ত তুরস্কের মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২৭৮.৫ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৬৯.৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ৪.৯ শতাংশ বেড়ে ৩৭৫.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাণিজ্য মন্ত্রী জানান, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণবাদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল চাহিদার মধ্যেও তুরস্কের রপ্তানি খাত তার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। অর্থায়ন এবং বৈদেশিক সংস্থার মাধ্যমে সরকার রপ্তানি সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্ত্রী বোলাত বলেন, “আমরা আগামী সময়ে মধ্যমেয়াদি কর্মসূচির ২৮২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাব।” তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের উচ্চ-মূল্য সংযোজন এবং প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তুরস্ক বিশ্ব রপ্তানি মানচিত্রে আরও উঁচুতে অবস্থান গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে অসাধু আমদানির হাত থেকে দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর।
তুরস্কের রপ্তানি পণ্যের প্রধান গন্তব্য হিসেবে গত জুলাই মাসে শীর্ষ অবস্থানে ছিল জার্মানি, যেখানে ২.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠানো হয়েছে। এরপর যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র (১.৬৮ বিলিয়ন ডলার), যুক্তরাজ্য (১.৩৫ বিলিয়ন ডলার), ইরাক এবং ইতালির অবস্থান। অন্যদিকে আমদানির প্রধান উৎস হিসেবে চীন ৫.০৪ বিলিয়ন ডলার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, এরপর রাশিয়া এবং জার্মানির অবস্থান। তুরস্কের মোট রপ্তানি আয়ের ৯৪.৪ শতাংশই এসেছে উৎপাদনশীল খাত থেকে, যার মধ্যে ৪.৪ শতাংশ ছিল উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন পণ্য।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পক্ষ থেকে জরুরি কৌশলগত মজুদ থেকে নতুন করে জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার এই মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা নেই। সংস্থাটির প্রধান ফাতিহ বিরোল সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে এ বিষয়ে বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছে না।
নরওয়েতে আয়োজিত একটি জ্বালানি সম্মেলনের অবকাশে বিরোল জানান, বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর তারা প্রতিনিয়ত কড়া নজর রাখছেন। বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংক্রান্ত শঙ্কা তৈরি হওয়ায় এর আগে গত মার্চ মাসে আইইএ প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তাদের মজুদ থেকে অবমুক্ত করেছিল। এ প্রসঙ্গে আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, ‘কৌশলগত মজুদের প্রায় ৮০ শতাংশ সুরক্ষিত রয়েছে।’
তৈল মজুদের বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও ইউরোপের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মজুত নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোল। জ্বালানি বিষয়ক তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এজিএসআইয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইউরোপের দেশগুলোতে বর্তমানে এলএনজি মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬২ শতাংশ। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আসন্ন ১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই মজুদের পরিমাণ ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
ইউরোপের বর্তমান গ্যাস মজুদকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম উল্লেখ করে বিরোল আসন্ন শীতকাল নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ইউরোপীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে যদি শীতে তুষারপাত বা ঠান্ডার প্রকোপ বেশি হয়, তবে জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সহজ শর্তে এবং দ্রুত ঋণ দেওয়ার টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলছে বেশ কিছু অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে কঠোর সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মাধ্যমে অবৈধ ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যারা মূলত ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত যোগাযোগের তালিকা, ছবি ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, ঋণ আদায়ের নামে পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের ওপর “অযাচিত চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি দেখানো, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটছে।” এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, অনুমোদনবিহীন অর্থ লেনদেন এবং ব্যাপক হয়রানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএফআইইউ ৩১টি অবৈধ অ্যাপের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় থাকা অ্যাপগুলো হলো—সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, টাকা ক্যাশ লোন, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকানাও। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে ঋণ প্রদান একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কার্যক্রম এবং “বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা বৈধ নয়।” এখন পর্যন্ত মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ বিতরণের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করা হয়নি।
সংস্থাটির মতে, অনুমোদনহীন এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে আর্থিক অপরাধ ও মানিলন্ডারিংয়ের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রতারণামূলক উপায়ে অর্থ আত্মসাৎ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এই আইনের অধীনে শাস্তির কঠোর বিধান রয়েছে। বিএফআইইউ সাধারণ মানুষকে পরামর্শ দিয়েছে যেন তারা ঋণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবের তথ্য কিংবা মোবাইলে থাকা ব্যক্তিগত ছবি ও যোগাযোগের তালিকা এসব সন্দেহজনক প্ল্যাটফর্মে শেয়ার না করেন। একই সঙ্গে ঋণ দেওয়ার প্রলোভনে অগ্রিম অর্থ, নিবন্ধন ফি বা প্রসেসিং ফির নামে কোনো লেনদেন না করার জন্য জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনগণকে এ ধরনের প্রতারক চক্র থেকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানিয়েছে।
টানা কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধির পর অবশেষে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী হয়েছে। বিশ্ববাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজারেও মূল্যবান এই ধাতুর দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন। আজ মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দর অনুযায়ী, ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ৭ হাজার ১১৫ টাকা হ্রাস পেয়েছে। আজ সকাল ১০টা থেকে এই নতুন মূল্যসূচি কার্যকর করা হয়েছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মূল্য হ্রাসের এই ঘোষণা প্রদান করে। বাজুস জানিয়েছে, ‘স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে সমন্বয় করা হয়েছে।’ মূলত বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় সংগঠনটি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। স্বর্ণের সাথে সাথে রুপার দামেও আজ পরিবর্তন এসেছে।
সংশোধিত মূল্য তালিকায় দেখা যায়, আজ থেকে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ৬২৮ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের স্বর্ণ ২ লাখ ২৯ হাজার ৭৮১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬১ হাজার ১৯৬ টাকা স্থির করা হয়েছে।
এই মূল্য হ্রাসের পূর্বে বাজারে স্বর্ণের দর ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪৩ টাকা। ২১ ক্যারেট ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ৩ হাজার ১৮৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২০ টাকায়। এর আগে গত ২৫ আগস্ট স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং সেদিন ভরিতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৩৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
স্বর্ণের পাশাপাশি আজ রুপার দামেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। বাজারে এখন ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৩০৭ টাকা। পাশাপাশি ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ৩ হাজার ৩২৪ টাকা করা হয়েছে।
স্মর্তব্য যে, দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি এই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল বাজার। ওই দিন সকালে একযোগে ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছায়। তবে পরবর্তী সময়ে স্বর্ণের দর প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার নিচে নেমে এসেছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত একদিনে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ১৫৫ ডলার হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে রুপার দামও ৩ ডলারের বেশি কমেছে। গোল্ড প্রাইস ডটঅর্গের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি আউন্স স্বর্ণের বৈশ্বিক দর ৪ হাজার ৪৫৫ ডলার। অথচ গত মঙ্গলবার যখন স্বর্ণের দাম শেষবার সমন্বয় করা হয়েছিল, তখন তা ছিল ৪ হাজার ৬২৫ ডলার। অর্থাৎ এই কয়েকদিনে আউন্সপ্রতি ১৭০ ডলার কমেছে।
সাধারণত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তজেনার মধ্যে অনেকদিন দাম কমেছে। মাঝে কিছুদিন বৃদ্ধির পর গতকাল বিশ্ববাজারে স্বর্ণের বড় দরপতন ঘটল।
রাজধানীর খুচরা বাজারে দীর্ঘ এক মাস ধরে ফার্মের মুরগির ডিমের চড়া দাম অব্যাহত রয়েছে, যার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চিনি, আটা ও ময়দার মূল্যবৃদ্ধি। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা চিনির দাম কেজিতে আরও ৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাজারে মোড়কজাত চিনির সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের প্রভাবে খুচরা বাজারে চিনির এই ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এদিকে আটা ও ময়দার দামও কেজিতে গড়ে ৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত আটার দামও কেজিতে ১০ টাকার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা বাজারে ডিমের ডজন এখনও ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে এবং ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় স্থির রয়েছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় পোলট্রি খামারগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে জোগানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাবে ডিম ও মুরগির দাম কমছে না বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বাজারের এই অস্থিতিশীলতার মাঝে কিছুটা স্বস্তির খবর দিচ্ছে পেঁয়াজ, রসুন ও আদার বাজার। কেজিতে ৫ টাকা কমে বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রসুন ও আদার দামও কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। সবজির বাজারেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে; অধিকাংশ সবজি বর্তমানে ১০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে পটোল, ঢ্যাঁড়স, বরবটি ও চিচিঙ্গার দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে কাঁচা মরিচ ও টমেটোর দাম এখনও ১০০ টাকার উপরে অবস্থান করছে।
দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের চড়া মূল্যের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে, যার ফলে অনেকেই খাবারের তালিকা থেকে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্য বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এ এলইডি পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে ইকোলাইট (প্রাইভেট) লিমিটেড। এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বার্ষিক ৬০ লাখ পিস এলইডি বাল্ব, ডেকোরেটিভ লাইটসহ বিভিন্ন ধরনের ল্যাম্প উৎপাদন করবে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করা হবে। নতুন এই প্রকল্পের ফলে ৩০৬ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানা গেছে।
রাজধানীর বেপজা কমপ্লেক্সে সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও ইকোলাইট (প্রাইভেট) লিমিটেডের মধ্যে এই বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন এবং ইকোলাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সোলাইমান নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তিনি তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে অন্য খাতে বিনিয়োগের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের বাইরে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বেপজা তার পণ্য সম্ভারকে বৈচিত্র্যময় করার জন্য কাজ করছে এবং এলইডি পণ্যের অন্তর্ভুক্তি এই বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
বেপজা কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রকল্পটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (প্রকৌশল) আবদুল্লাহ আল মামুন, সদস্য (অর্থ) আ ন ম ফয়জুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ইকোলাইটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে এমন বড় বিনিয়োগ বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের শিল্প খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বস্ত্রশিল্প। সুতা উৎপাদন থেকে শুরু করে কাপড় তৈরি, ডাইং ও ফিনিশিং—পুরো শিল্পশৃঙ্খলই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিনের গ্যাস-সংকট এখন এই শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে চলছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের প্রায় ৬৬০টি বস্ত্রকল তীব্র গ্যাস-সংকটে পড়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
এক মাস ধরে ধুঁকছে উৎপাদন: গাজীপুরের ভবানীপুরে মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের পাঁচটি ইউনিটে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এক মাসের বেশি সময় ধরে কারখানাটির উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি স্বাভাবিক উৎপাদনও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেনের হিসাবে, এক মাসে কম উৎপাদনের কারণে তাদের প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ বাড়লেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই: সাম্প্রতিক কয়েক দিনে দেশের কিছু শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোথাও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, আবার কোথাও দিনের বেলায় চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকছে।
নরসিংদীর সাটিরপাড়ার ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর উৎপাদনে ফিরেছে। কিন্তু শুরুতে শুধু রাতের সময় কারখানাটি চালানো সম্ভব হয়েছে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় উৎপাদন চালু রাখা যাচ্ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়ার মতে, নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া গেলে দীর্ঘ সময় কারখানা চালানো সম্ভব হবে।
নারায়ণগঞ্জে সংকট আরও তীব্র: নরসিংদীর তুলনায় নারায়ণগঞ্জের কিছু শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো বেশি সংকটপূর্ণ। ফতুল্লার বিসিক শিল্পপার্কের এমএস ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ১১০ টন কাপড় ডাইং করার সক্ষমতা রয়েছে। গ্যাস না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে শুধু কারখানার সরাসরি উৎপাদন নয়, পোশাক কারখানায় প্রয়োজনীয় কাপড় সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বস্ত্রশিল্পের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৭৫ শতাংশ উৎপাদন: গ্যাস-সংকটের তীব্রতা সব এলাকায় সমান নয়। শ্রীপুরের একটি বস্ত্রকলের মালিক জানিয়েছেন, তাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে একই এলাকার এশিয়া কম্পোজিট মিলসের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ রানার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ ৩ পিএসআই থেকে বেড়ে ৭–৮ পিএসআই পর্যন্ত পাওয়ায় সুতার উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ একই শিল্পাঞ্চলের মধ্যেও গ্যাস সরবরাহের তারতম্যের কারণে কারখানাভেদে উৎপাদনের চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫২৭টি। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, ব্যবসা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত।
গ্যাসের চাপ কম থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি পুরো সক্ষমতায় চালানো যায় না। উৎপাদন কমে গেলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সময়মতো ক্রয়াদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চললে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পও চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিটিএমএর সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে তার নিজের প্রতিষ্ঠান চৈতি কম্পোজিটেও গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশে নেমেছে। তার মতে, প্রায় এক মাস ধরে অধিকাংশ বস্ত্রকল একই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস-সংকটে বস্ত্রকলগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিদেশি ক্রেতারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন তিনি।
শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংকট তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় বিঘ্নকে দেখা হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে ব্যবহৃত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। পরে ১৫ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক এবং সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এরপর কার্গো-সংক্রান্ত সমস্যায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তিন দিন বন্ধ থাকার পর ২২ আগস্ট সেটি পুনরায় চালু হলে দেশের কিছু এলাকায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
গ্যাস-সংকটের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য যোগ হয়েছে। বিটিএমএর হিসাবে, ২০১৯ সাল থেকে ২৪৪টি বস্ত্রকল বন্ধ রয়েছে।
অর্থাৎ নতুন করে ৬৬০টি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা এমন একটি শিল্পখাতে ঘটছে, যেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই নানা কারণে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট শিল্পটির পুনরুদ্ধারকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বিটিএমএ জানিয়েছে, গ্যাস-সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বস্ত্রকলগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা ও যাচাই করা হচ্ছে। মূল্যায়ন শেষ হলে বন্ধ বা দুর্বল হয়ে পড়া কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে কী ধরনের সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের প্রধান প্রত্যাশা এখন একটি নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা। কারণ কয়েক ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া এবং কয়েক ঘণ্টা না পাওয়া—এভাবে অনিয়মিত সরবরাহে আধুনিক শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন।
গ্যাসের চাপ সাময়িকভাবে কিছুটা বাড়লেও বস্ত্রশিল্পের জন্য স্থায়ী সমাধান এখনো জরুরি। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ ও কম উৎপাদনে থাকা কারখানাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারে। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়াদেশ পূরণে বিলম্ব, আর্থিক ক্ষতি এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই বস্ত্রশিল্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ বাড়ানো নয়—দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। দেশের রপ্তানি ও শিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, তার বড় অংশই নির্ভর করছে এই সংকট কত দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায় তার ওপর।
বন্ধ কলকারখানা চালু এবং স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ১৭টি ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থ দিতে সম্মত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
গত ২৩ মে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কলকারখানা চালু, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সে সময় এক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, এই প্যাকেজটি মূলত একটি ‘উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রণোদনা প্যাকেজের ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে।
প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য। এ তহবিল থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে।
১৬৫ সিসির চেয়ে বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকাশিত নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এ এই নিষেধাজ্ঞার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। নতুন এই আদেশের ফলে সাধারণ ক্রেতা বা বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বের কোনো মোটরসাইকেল বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি বা অ্যাসেম্বলড অবস্থায় দেশে আনতে পারবেন না।
তবে আমদানির ওপর এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এতে দুটি বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের ক্ষেত্রে ১৬৫ সিসির এই ঊর্ধ্বসীমার বিধান প্রযোজ্য হবে না; অর্থাৎ পুলিশ চাইলে এর চেয়ে বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল আমদানি করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় একটি সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেশে বসে সর্বোচ্চ ৫০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্র বা খুচরা যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার একটি ধারাবাহিক পদক্ষেপ। এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪’-এও সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা ছিল। নতুন মেয়াদের নীতিমালায় সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদকদের জন্য উচ্চ ক্ষমতার বাইক তৈরির পথটি মসৃণ রাখা হলো।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর শর্ত পূরণে দেশের বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দ্রুতগতিতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনের দিকে ঝুঁকছে। গত কয়েক বছরে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো নিজেদের কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে, যার বড় একটি অংশই তৈরি পোশাকশিল্পে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইইএফএ-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা ইতিমধ্যে ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। ছোট ছোট স্থাপনাগুলোকে হিসাবে ধরলে এই সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে বলে সংস্থাটির দাবি।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের কারখানার ছাদে ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট ইতিমধ্যে উৎপাদনে রয়েছে। আকিজ বশির গ্রুপ ছাদ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ইতিমধ্যে প্রায় ৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে এবং আরও ৫০ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ওয়ালটন, হা-মীম, প্যাসিফিক জিনসসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান দ্রুত সৌরবিদ্যুতের আওতা বাড়াচ্ছে। ওমেরা সোলার ও সুপারস্টার রিনিউবেল এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত কারখানায় এসব সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে মূল কারণ হলো এর সাশ্রয়ী উৎপাদন খরচ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। বর্তমানে বড় কারখানায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে গড় ব্যয় হয় ১২ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা, অথচ ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ পড়ছে মাত্র ৪ থেকে ৮ টাকা। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাকের ক্রেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বাধ্য করছে। একবার বিনিয়োগ করলে ২০-২৫ বছর জীবনকালের এই প্ল্যান্টগুলোতে তেমন কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নেই। বর্তমানে কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত (ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি) সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমাচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতের এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও কিছু আর্থিক চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। বিজিএমইএ-এর এক জরিপে দেখা গেছে, পোশাক কারখানার মালিকরা সৌরবিদ্যুৎ বসাতে আগ্রহী হলেও মূল প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা। মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা বেশ কঠিন। সিপিডির মতে, দেশের পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে সুদের হার কমানো, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো, শেয়ারবাজারে গ্রিন বন্ড ছাড়া এবং স্বল্প খরচের আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে, চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে সরকার শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ ১৫ শতাংশ কমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকায় নেমে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা এই খাতের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।