দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা আর উপচে পড়া ভিড়ে আজ পর্দা নামছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ৩০তম আসরের। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) পূর্বাচল উপশহরের ৪ নম্বর সেক্টরের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে মাসব্যাপী এই বাণিজ্য উৎসব।
সমাপনী অনুষ্ঠানে স্টল ও প্যাভিলিয়নসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা অংশগ্রহণকারীদের পুরস্কৃত করা হবে। অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) মেলার শেষদিনে যেন প্রাণ ফিরে পায় পুরো প্রাঙ্গণ। সকাল থেকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা। জুমার নামাজের পর বিকেল গড়াতেই মানুষের ঢল নামে। অনেক স্টলে ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে হিমসিম খেতে দেখা গেছে বিক্রয় প্রতিনিধিদের। শেষ দিনের মূল্যছাড়ে কেনাকাটার ধুমে বিক্রেতাদের মুখেও ছিল স্বস্তির হাসি।
বাংলাদেশ স্কয়ার ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন প্যাভিলিয়নে শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী ও তরুণদের ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়। এবারের মেলায় ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘বাংলাদেশ স্কয়ার’ দর্শনার্থীদের বিশেষ আগ্রহ কাড়ে। পাশাপাশি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কার্যক্রম ও রপ্তানি খাতের সক্ষমতা তুলে ধরতে নির্মিত ‘এক্সপোর্ট এনক্লেভ’ ছিল ভিন্নমাত্রার সংযোজন।
এবারের মেলায় ১১টি বিদেশি দেশসহ মোট ৩২৪টি স্টল ও প্যাভিলিয়ন অংশ নেয়। মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও জুলাই আন্দোলনে আহতরা পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে বিনামূল্যে মেলায় প্রবেশের সুযোগ পান।
তবে মেলার আনন্দে কিছুটা ছেদ টেনেছে ঢাকা বাইপাস সড়কের দীর্ঘ যানজট। কাঞ্চন সেতুর পূর্ব পাশে টোলপ্লাজা এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে আটকে পড়েন অনেক দর্শনার্থী।
নির্মাণাধীন সড়কের ধুলা-বালিতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। যদিও ঢাকা শহর থেকে সরাসরি আগত দর্শনার্থীরা তুলনামূলকভাবে যানজটমুক্ত সড়কে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করেছেন।
ঢাকা থেকে দূরে হওয়ায় পণ্য বহনের ঝামেলা এড়াতে অনেক ক্রেতা মেলায় এসে পণ্য দেখে অর্ডার দিয়েছেন নিজ নিজ এলাকার শোরুমে ডেলিভারির জন্য। ফ্রি হোম ডেলিভারি সুবিধাও ছিল ক্রেতাদের বড় আকর্ষণ।
ম্যানুয়াল টিকিটের ভোগান্তি পেছনে ফেলে এবার ই-টিকেটিং ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় প্রবেশ করেন দর্শনার্থীরা। প্রবেশ গেটে ছিল না উল্লেখযোগ্য ভিড় বা ধাক্কাধাক্কি।
মেলায় দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের গৃহস্থালি সামগ্রী, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্স, ফার্নিচার, জুয়েলারি, পাটজাত পণ্য, লেদার, স্পোর্টস গুডসসহ নানা পণ্যের পসরা সাজানো হয়। কোথাও কোথাও বাইরে তুলনায় বেশি দামে ট্যাগ লাগিয়ে বড় ছাড়ে বিক্রির অভিযোগ থাকলেও ক্রেতারা ছাড়ের সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন।
শিশুদের জন্য স্থাপিত দুটি শিশু পার্কেই দিনভর ছিল ভিড়। নিরাপত্তা নিশ্চিতে র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি অগ্নি নিরাপত্তায় ফায়ার সার্ভিস এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো।
নাদিয়া ফার্নিচারের বিক্রয় প্রতিনিধি আকাশ মাহমুদ বলেন, দর্শনার্থীরা সরাসরি কিনছেন, আবার অনেকে অগ্রিম দিয়ে ফ্রি হোম ডেলিভারিতে অর্ডার দিচ্ছেন। বিক্রি ভালো হয়েছে।
দিল্লি অ্যালুমিনিয়ামের বিক্রয় প্রতিনিধি পরিতোষ সরকার বলেন, এবার মেলার ব্যবস্থাপনা আগের চেয়ে অনেক গোছানো। আমরা সব পণ্যে ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়েছি।
ঢাকার রায়েরবাগ থেকে আসা ব্যবসায়ী আবু সাইদ বলেন, পঞ্চমবারের মতো মেলায় এলাম। এ বছর পরিবেশ অনেক নান্দনিক। ইলেকট্রনিক পণ্য ফ্রি হোম ডেলিভারিতে কিনেছি।
মেলার ইজারাদার ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের হেড অব অপারেশন আমিনুল ইসলাম হৃদয় জানান, শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেল ৫টা পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি দর্শনার্থী টিকিট কেটে মেলায় প্রবেশ করেছেন। তার ভাষায়, এবারের বাণিজ্যমেলা সার্বিকভাবে সফল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব তরফদার সোহেল রহমান বলেন, শীত উপেক্ষা করেই শুরু থেকে দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল। শেষ দিকে এসে মেলা আরও জমে ওঠে। এবারের আয়োজন ব্যবসায়িকভাবে সফল।
শেষ দিনে জনসমাগম আর ছাড়ের উত্তাপে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা যেন পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত কেনাকাটার উৎসবে।
সব সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের পাশাপাশি এখন থেকে মেয়াদি আমানতের বিপরীতেও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী। আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে মাসিকভিত্তিক মুনাফা তুলতে পারবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এ ছাড়া রেমিট্যান্স ও সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে মুনাফা তাৎক্ষিকভাবে তোলা যাবে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
গভর্নর বলেন,‘ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কিছু দুষ্টুচক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে কিছু অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সেগুলো নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো পরিকল্পনাই শতভাগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয় এবং সেগুলো সমাধানে কাজ করা হয়। তবে কিছু মহল একীভূত কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে যত অপপ্রচার করুক, সকল আমানতকারীর মূল আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে পর্যায়ক্রমে তা ফেরত দেওয়া হবে। এ বিষয়ে আগেও জানানো হয়েছে। বর্তমানে গ্রাহকরা যেকোনো স্কিম থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তুলতে পারছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ বাজারদরে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতে মুনাফার হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এক বছরের কম মেয়াদি আমানতে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে আমানতকারীদের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার ২ বছরের জন্য যে ৪ শতাংশ সহায়তা দিচ্ছে, তাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তাই কেউ যেন গুজবে বিভ্রান্ত না হয়।’
ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে সরকার। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। তাদের বিতরণ করা ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৭৭ শতাংশ এখন খেলাপি।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক উন্নয়নভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াতে থিম্যাটিক বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। টেকসই অর্থায়নের কাঠামো গড়ে তুলতে দুই সংস্থার মধ্যে গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স কোলাবোরেশন’ শীর্ষক এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার।
সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইউএনডিপি বাংলাদেশ টেকসই অর্থায়ন ও বিনিয়োগ ট্যাক্সোনোমি প্রবর্তন, থিম্যাটিক বন্ড ইস্যুকারীদের ইস্যুর আগে ও পরে কারিগরি সহায়তা, কমিশন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রশিক্ষণ এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিনিময়ে কাজ করবে।
এ ছাড়া থিম্যাটিক বন্ডের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, বন্ড রিপোর্টিং সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রভাব পরিমাপ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রবর্তন এবং তৃতীয় পক্ষীয় সত্যায়ন ব্যবস্থার বিকাশেও সহায়তা দেবে ইউএনডিপি।
সব মিলিয়ে গ্রিন, সোশ্যাল, ক্লাইমেট, এসডিজি ও অন্যান্য টেকসই থিম্যাটিক বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে এই অংশীদারিত্ব।
থিম্যাটিক বন্ড হলো এমন একটি বন্ড, যার মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য বা থিমে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা থাকে। অর্থাৎ সাধারণ বন্ডে টাকা যেকোনো কাজে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু থিম্যাটিক বন্ডে টাকা ব্যবহার করতে হয় নির্দিষ্ট একটি খাতে বা লক্ষ্য অনুযায়ী।
থিম্যাটিক বন্ডের প্রধান ধরনগুলো হলো- সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য গ্রিন বন্ড; স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী আবাসনের মতো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অর্থায়নের জন্য সোশ্যাল বন্ড; গ্রিন ও সোশ্যাল—দুই ধরনের প্রকল্পেই অর্থায়নের জন্য সাসটেইনেবিলিটি বন্ড; জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ক্লাইমেট বন্ড এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এসডিজি বন্ড উল্লেখ্যযোগ্য।
অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি বাজার ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সুশাসন জোরদার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ় করার মাধ্যমে আমরা একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বাজার কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছি।
ইউএনডিপি ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি সহায়ক ও পূর্বাভাসযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও জানান রাশেদ মাকসুদ। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে প্রতিষ্ঠিত করা, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং থিম্যাটিক বন্ডের বিকাশে গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে থিম্যাটিক বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশগত ও সামাজিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আহরণের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানো এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। থিম্যাটিক বন্ড এসব ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজি আহরণে অনুঘটকের ভূমিকা রাখতে পারে।
স্টেফান লিলার আরও বলেন, বিএসইসির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ইউএনডিপি বাংলাদেশের থিম্যাটিক বন্ড বাজারের সহায়ক পরিবেশ শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ইউএনডিপির বাংলাদেশের প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট ড. মালিহা মুজাম্মিল, কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস প্যারে এবং বিএসইসির কমিশনার মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জট, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নিরসন, ভৌত ও আর্থিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধসহ চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে খালাস করা হয়নি এমন ২,৮০০ টন বিভিন্ন পণ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। এতে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে এবং বন্দরের ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনায়ও গতিশীলতা এসেছে। খবর কাস্টমস হাউস, চট্টগ্রামের।
কাস্টমস হাউসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি নিয়ে পণ্যচালানটির নিলাম কার্যক্রম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর প্রতিযোগিতামূলক নিলামে ১৩ জন বিডার অংশগ্রহণ করেন। সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিড মূল্যে পণ্যচালানটি বিক্রয় করা হয়। বিডমূল্য, ভ্যাট ও আয়করসহ ১১ কোটি ৬৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধের পর বিডারের অনুকূলে পণ্যচালানটির খালাস হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস জানায়, চালানটি পণ্যের পরিমাণ বিবেচনায় কাস্টমস হাউস, চট্টগ্রামের ইতিহাসে নিলামকৃত সর্ববৃহৎ পণ্যচালান।
দেশের তৈরি পোশাক খাতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন বৈশ্বিক মাইলফলক স্থাপন করেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘লিড প্লাটিনাম’ সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বোচ্চ ১১০ নম্বরের মধ্যে ১০৮ নম্বর পেয়ে এ স্বীকৃতি পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্য দিয়ে হ্যামস গার্মেন্টস বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত লিড-সার্টিফায়েড তৈরি পোশাক কারখানা হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।
ইউএসজিবিসির উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি তিনটি নতুন তৈরি পোশাক কারখানা লিড সনদ অর্জন করেছে, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প উন্নয়নে বৈশ্বিক পর্যায়ে দেশের নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেডের সঙ্গে আরও দুটি পোশাক কারখানা লিড সনদপ্রাপ্ত হয়েছে। কারখানা দুটি হলো—গাজীপুরের ইকোট্রিমস বাংলাদেশ লিমিটেডের ইউনিট-১ এবং নাফা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ইউনিট-১।
এর মধ্যে ইকোট্রিমস বাংলাদেশ লিমিটেড নামের কারখানাটি ভবনের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ক্যাটাগরিতে লিড সংস্করণ চার দশমিক এক অনুযায়ী মূল্যায়িত হয়েছে। কারখানাটি ৭০ পয়েন্ট অর্জন করে গোল্ড স্তরের সনদ পেয়েছে।
অন্যদিকে, নাফা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ইউনিট-১ নির্মাণ ক্যাটাগরিতে লিড সংস্করণ চার অনুযায়ী মূল্যায়িত হয়েছে। কারখানাটি ৬৫ পয়েন্ট অর্জন করে গোল্ড স্তরের সনদ অর্জন করেছে।
এই তিনটি কারখানা যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭৩। এর মধ্যে ১১৫টি প্লাটিনাম এবং ১৩৯টি গোল্ড স্তরের সনদপ্রাপ্ত।
এছাড়া বিশ্বে সর্বোচ্চ রেটপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০টি লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে বর্তমানে ৬৯টি কারখানাই বাংলাদেশের, যা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের শক্ত অবস্থানকে তুলে ধরে।
বিশ্বব্যাপী উৎপাদন খাতে যখন জলবায়ু দায়বদ্ধতা, সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা এবং এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (ইএসজি) মানদণ্ড ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—তখন এই অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিবেশগত মানদণ্ডে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মদক্ষতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্জন পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের শিল্প খাতে টেকসই উন্নয়ন এখন আর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ বা সীমিত কারখানার মধ্যে আটকে নেই। বরং এটি শিল্পের মূলধারায় পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শতাধিক পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যেই হ্যামস গার্মেন্টসের এই রেকর্ড শিল্প খাতের জন্য নতুন মানদণ্ড স্থাপন করল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য কার্বন বিধিনিষেধ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশের শিল্পখাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণে টেকসই নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হ্যামস গার্মেন্টসের এই সাফল্য ইঙ্গিত দেয়—বাংলাদেশ কেবল বৈশ্বিক প্রত্যাশার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে না, বরং টেকসই শিল্প উন্নয়নের নতুন মানদণ্ড নির্ধারণেও ভূমিকা রাখছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও সাবেক সিবিএ।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্ত অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালনের ডাক দিয়েছেন তাঁরা। একইভাবে পরদিন রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। রোববার বিকেল ৫টায় আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাবেক সিবিএ’র পক্ষ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
এরপর দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন শ্রমিক দলের বিক্ষোভকারীরা। ওই মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচিতে কয়েকশ শ্রমিক কর্মচারী অংশ নেয়।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘সারাদেশ নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে আছে৷ এর ফাঁকে সরকার চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সরকার বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে।’
‘আমরা মনে করি এনসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়া চরম আত্মঘাতী একটি সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব চরমভাবে হুমকির সম্মুখীন হবে।
কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এনসিটি বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করেছি। আগামী শনিবার ৮ ঘণ্টা বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম এবং রোববার ৮ ঘণ্টা প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এরপরও সরকার এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক-কর্মচারি ঐক্য পরিষদ (স্কপ) বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা তৃতীয় দফায় আরও এক মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, করদাতারা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোনো প্রকার জরিমানা ছাড়াই তাদের ই-রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. একরামুল হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে দ্বিতীয় দফার বর্ধিত সময়সীমা অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল আগামী ৩১ জানুয়ারি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, মূলত আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রেক্ষাপটে করদাতাদের বাড়তি সুবিধা দিতে এবং অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়াটি সবার জন্য সহজতর করতে এই সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেহেতু চলতি বছর থেকে সকল করদাতার জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তাই অনেক করদাতারই ডিজিটাল পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে বাড়তি সময়ের প্রয়োজন ছিল। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে এনবিআর এই তৃতীয় দফা সময় বাড়ানোর পথে হেঁটেছে।
আয়কর আইন অনুযায়ী, প্রতিবছর ৩০ নভেম্বর আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মিত সময়সীমা শেষ হয়। তবে এবার বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রথমে ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছিল। নতুন করে আরও এক মাস সময় পাওয়ায় এখন করদাতারা অনেকটা স্বস্তিতে তাদের কর সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য অনলাইনে জমা দিতে পারবেন। এনবিআর আশা করছে, এই বাড়তি সময়ের মধ্যে এখনও যারা রিটার্ন জমা দেননি, তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন করবেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৩১ লাখের বেশি করদাতা সফলভাবে তাদের ই-রিটার্ন অনলাইনে জমা দিয়েছেন। গত আগস্ট মাস থেকে এনবিআর সকল শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই ই-রিটার্ন পোর্টালে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের এই ডিজিটাল উদ্যোগের ফলে কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করদাতাদের হয়রানিও অনেকাংশে কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এনবিআর জানিয়েছে, নির্ধারিত নতুন সময়সীমা অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির পর রিটার্ন জমা দিতে হলে আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা ও অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হতে পারে। তাই এই সময়ের মধ্যেই সকলকে রিটার্ন জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে এবং আদায়ে গতি ফেরাতে এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় ইচ্ছাকৃত ও বড় মাপের ঋণ খেলাপিদের নাম ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করার অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক বিশেষ চিঠিতে এই প্রস্তাবসহ খেলাপিদের নিয়ন্ত্রণে আরও বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
এবিবির এই সুপারিশমালায় কেবল নাম ও ছবি প্রকাশই নয়, বরং খেলাপিদের ওপর নানামুখী সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রস্তাব হলো— ব্যাংক অথবা আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকলেও কোনো ব্যক্তি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে তার বিদেশ গমনে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা প্রদানের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোকে দেওয়া। পাশাপাশি, ঋণ খেলাপি ব্যক্তিরা যাতে দেশের কোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী ও কঠোর নির্দেশনা জারির আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা চর্চায় বাধা সৃষ্টি করা গেলে প্রভাবশালী খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ঋণ খেলাপিদের জামানত হিসেবে রাখা সম্পদ নিলাম করার প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ ও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আকর্ষণীয় করার প্রস্তাবও দিয়েছে এবিবি। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিলামে সম্পদ কেনাকে উৎসাহিত করতে ক্রেতাদের জন্য বিশেষ আয়কর রেয়াত সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) বিদ্যমান অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা ও প্রয়োজনীয়তা বিলোপ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে খেলাপি ঋণের আংশিক অবলোপন বা রাইট-অফ সুবিধা দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। এর পাশাপাশি লিয়েন করা শেয়ার দ্রুত নগদায়নের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মানবিক দিক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম শিথিলের প্রস্তাব করেছে এবিবি। বিশেষ করে কোনো ঋণগ্রহীতার মৃত্যু হলে কিংবা মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং একক মালিকানাধীন কুটির ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ মওকুফের প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে এ জাতীয় সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে হেড অব আইসিসির (ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) বাধ্যতামূলক মতামত গ্রহণের যে কঠিন শর্ত রয়েছে, তা শিথিলের দাবি জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ১২ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ে একটি কার্যকর মহাপরিকল্পনা চাওয়া হয়েছিল, যার প্রেক্ষিতেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এসব সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সুপারিশ প্রদান করা হলো। ব্যাংক খাতের সংস্কারে এই প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও এক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ভরিতে প্রায় ২২ হাজার ৫১০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে অলঙ্কার ক্রয়ের স্বপ্ন।
আজ সকালে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটে কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, এখন থেকে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে গুনতে হবে ২ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৬ টাকা। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৮০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকায়।
স্বর্ণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রুপার দামও। এক লাফে রুপার দাম ভরিতে ৮১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম এখন ৮ হাজার ৫৭৩ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৮ হাজার ১৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৬ হাজার ৯৯৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ২৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অলঙ্কারের কাঁচামালের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অলঙ্কার ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জুয়েলারি অ্যাসোসিয়েশন আরও স্পষ্ট করেছে যে, বাজুস নির্ধারিত এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গহনার ডিজাইন বা কারুকাজ এবং গুণমানভেদে মজুরির ক্ষেত্রে তারতম্য হতে পারে। বিগত কয়েক মাসে বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কয়েক দফা বাড়লেও দেশের বাজারে আজ যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, তা স্মরণকালের সকল রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। মূলত বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাজারেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া ঋণ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব অর্থছাড়- উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই–ডিসেম্বর সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ প্রতিশ্রুতি কমেছে ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হ্রাস পেয়েছে ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিপরীতে, এই ছয় মাসে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
ইআরডির তথ্য বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকার মোট ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ২৯৮ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪৯৯ বিলিয়ন ডলারে- অর্থাৎ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার কম।
এ দিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই–নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীকে পরিশোধ করেছিল ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১৯৫ বিলিয়ন ডলারে।
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) ইয়ার্ন, ফেব্রিক ও ডেনিম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে।
কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সিবিশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ) এবং দ্যা সাব-কাউন্সিল অব টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি, চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি টেক্স চায়না) এর যৌথ আয়োজনে চার দিনের এ প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে।
বুধবার আইসিসিবির ৩ নম্বর রাজদর্শন হলে এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনীদ্বয়ে ৬৫০টির বেশি বুথ নিয়ে ১৫টিরও অধিক দেশের প্রায় ৩২৫টি কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, সেমস-গ্লোবাল, ইউএসএ অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিক প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহেরুন এন. ইসলাম, উপস্থিত ছিলেন, দ্য অ্যাম্বাসি অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব চায়না ইন বাংলাদেশ কমার্শিয়াল কনস্যুলেটসং সং ইয়াং, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আরিফুর রহমান খান প্রমুখ।
পোশাকশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সুতা, ফ্যাব্রিক, ট্রিমস এবং আনুষাঙ্গিক সরঞ্জামকেন্দ্রিক অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত ও শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ২৫তম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার্ন অ্যান্ড ফেব্রিক শো ২০২৬ - উইনটার অ্যাডিশন। একইসাথে, বিশ্বব্যাপী ডেনিম, জিন্স এবং আনুষাঙ্গিক নির্মাতাদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের সামগ্রিক ডেনিম ও পোশাকশিল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৮ম ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ডেনিম শো ২০২৬।
প্রদর্শনীসমূহ সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ আয়োজিত বিশ্বব্যাপী বহুল প্রশংসিত ও তিনটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত টেক্সটাইল সিরিজ অব এক্সিবিশনের একটি অংশ, যা প্রতি বছর বাংলাদেশ, ব্রাজিল, মরক্কো, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হয়। টেক্সটাইল সিরিজ অব এক্সিবিশন্স ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্পের অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে।
সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ অ্যান্ড এশিয়া প্যাসিফিকের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহেরুন এন. ইসলাম বলেন, প্রদর্শনীরা ক্রেতা এবং সরবরাহকারীদের জন্য বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত একটি কার্যকর মিটিং প্লেস, যেখানে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রেতা এবং সরবরাহকারীরা ব্যবসার প্রসারে কাজ করতে পারবেন। এ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সেমস-গ্লোবাল ইউএসএ এবং সিসিপিআইটি-টেক্স চায়নার যৌথ প্রচেষ্ঠার ৯ম বর্ষ পূর্তি হলো। এ প্রদর্শনীগুলো বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।
পূর্বাচলের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র (ডিআইটিএফ)এ মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় জমে উঠেছে। ক্রেতা-দর্শনার্থী বাড়ায় বিক্রি বাড়াতে আকর্ষণীয় অফার আর ছাড় দিচ্ছে সব প্যাভিলিয়ন ও স্টলে। মেলার দেশীয় সব পণ্যের স্টলগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। বিক্রিতে খুশি ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়ে যেন দম ফেলারও সুযোগ নেই বিক্রয়কর্মীদের।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার গিয়ে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
মাসব্যাপী এ মেলার আজ ২৫ তম দিন। দুপুরের পর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতা, উদ্যোক্তা আর দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ায় প্রতিটি স্টলেই দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অফার ও বিশেষ ছাড়। এই অফার আর ছাড়কে কেন্দ্র করেই শেষ সময়ে এসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ক্রেতা-বিক্রেতা আর উদ্যোক্তাদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।
মেলায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে প্লাস্টিকের তৈরি গৃহস্থালি সব জিনিসপত্র স্টিল, অ্যালোমিনিয়াম ও নানা ধরনের ইলেক্ট্রনিক পণ্য কুকার, জুস মেকার, জুস ব্লেন্ডার, ওভেন, রাইস কুকারসহ ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ ফ্যাশেনেবল পোশাক ব্লেজার ও খাদ্যপণ্যে।
দুরন্ত সাইকেল দিচ্ছে ২১ হাজার ৩৩৫ টাকা মূল্যের ‘এলিট’ এবং ১৭ হাজার টাকা মূল্যের ‘পোর্টার প্লাসের সঙ্গে ৭ হাজার ৬৫ টাকা মূল্যের একটি ‘বাইক ট্রেইনার’ সম্পূর্ণ ফ্রি। এছাড়াও নির্দিষ্ট মডেলে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। শিশুদের সাইকেল বিক্রি করছে ৪ হাজার ২০০ থেকে ১০ হাজার টাকায়। বড়দের সাইকেল ১৪ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা। বিশেষ আকর্ষণ ইউরোপিয়ান প্যাডেল অ্যাসিস্ট ইলেকট্রিক সাইকেল মেলায় দাম ৫৫ হাজার টাকা।
সিফা এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন ক্রোকারিজ স্টলে মেলায় মাত্র ১২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের ক্রোকারিজ পণ্য।
মেলায় ব্লেজারে রাজকীয় অফার দিয়েছে টপ টেন ব্লেজার মেলা উপলক্ষে ক্রেতাদের জন্য মাত্র ১২শ’ টাকায়। এছাড়া মেলায় বিভিন্ন অফার দিচ্ছে থ্রি-পিস বিক্রেতারা। এর মধ্যে ‘গোল্ডেন অফার’ নাম দিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান মাত্র ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায় তিন সেট থ্রি-পিস বিক্রি করছে। এছাড়া ফ্যামিলি অফারে এক সেট থ্রি-পিস ৪৫০ টাকা ও তিন সেট ১ হাজার ১০০টাকা।
এদিকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফার্নিচারে মিলছে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। সঙ্গে মেলায় বুকিং দিলে ফ্রি হোম ডেলিভারি ব্যবস্থা রয়েছে।
বেকারি পণ্যের জন্য বিস্ক ক্লাব ও অলটাইমের প্যাভিলিয়নে দিচ্ছে ‘আলট্রা সেভার’ প্যাকেজে ১১৯৫ টাকার পণ্য পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকায়। ‘মেগা সেভার’ প্যাকেজে ৯৬৫ টাকার পণ্য কেনা যাবে মাত্র ৮০০ টাকায়। ‘সুপার সেভার’ প্যাকেজে ৬২৫ টাকার পণ্য পাওয়া যাবে মাত্র ৫০০ টাকায়।
এছাড়া ‘বিস্ক ক্লাব হাউস’, ‘মামা ম্যাজিক’, ‘কেক ফিউশন’, ‘কুকিজ কম্বো’ প্যাকেজে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে। দুটি অথবা চারটি পণ্য কিনলে একটি ফ্রি অফারের সুযোগও রয়েছে।
মেলায় স্টল-প্যাভিলিয়নের অফারগুলো দেখছিলেন ইব্রাহিম মিয়া। তিনি বলেন, কিছু বেকারি আইটেম কিনেছি। গৃহস্থালি সামগ্রী কেনার জন্য দেখছি। প্রতিটি স্টলে ছাড় দিচ্ছে। যেখানে ছাড় বেশি, সেখান থেকেই কিনব।
গাজীপুর থেকে পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছেন সিরাজ মোল্লা। তিনি বলেন, মাসব্যাপী এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় শেষের দিকেই ব্যবসায়ীরা চূড়ান্ত ছাড় দিয়ে থাকে। এই সুযোগ লুফে নিতেই শেষের দিকে মেলায় আসা। বিশেষ ছাড় পেয়ে কিছু জামা কাপড় ও ইলেকট্রনিক্স মালামাল কিনেছি।
ক্রেতা রেহানা আক্তার জানান, শেষের দিকে মেলার প্রতিটি প্যাভিলিয়ন ও স্টলে ছাড়ের হিড়িক পড়ে যায়। তাই মেলার শেষের দিকে আসা। একই ছাদের নিচে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনার জায়গা বাণিজ্য মেলাই সম্ভব। ৪০ শতাংশ ছাড়ে ছেলের জন্য একটি সাইকেল কিনেছি।
টপ সেভেনের বিক্রয় প্রতিনিধি রোমান সরকার বলেন, মেলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্টকের মালগুলো বিক্রি করতেই আমরা বিভিন্ন অফার ও ছাড় দিয়ে বিক্রি করছি। ক্রেতারাও এই সুযোগ লুফে নিচ্ছে।
সিফা এন্টারপ্রাইজ ক্রোকারিজ স্টলের ম্যানেজার সুমন হোসেন বলেন, মেলার শেষ সময়ে ক্রেতা টানতে আমরাও বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করছি। এসব পণ্য কিনতে আমাদের স্টলে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। বেশ সাড়া পাচ্ছি।
মিয়াকো প্যাভিলিয়ন ম্যানেজার নুরুন্নবী বলেন, নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী নিয়ে আমরা এবারের মেলায় হাজির হয়েছি। মেলার প্রথম দিকে শৈত্য প্রবাহ ছিল। ফলে বিক্রি তেমন হয়নি। তবে ছুটির দিনগুলো থেকেই মেলা জমে উঠে। এখন শেষ সময়ে এসে বিক্রি বাড়াতে আমরাও বিশেষ ছাড় দিচ্ছি। ক্রেতারাও তা লুফে নিচ্ছেন। ক্রেতা সামাল দিতে বিক্রয় কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। মেলা শেষ দিকে এসে বিক্রি অনেক বেড়েছে।
দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এক বড় ধরনের সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়া ৯টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মধ্যে ৬টিকেই চূড়ান্তভাবে বন্ধ বা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এই কঠোর সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সভার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অবসায়নের তালিকায় থাকা এই ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো— ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ফলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা তারা পুরোপুরি হারিয়েছে। তবে তালিকায় থাকা অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান— প্রাইম ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে (বিআইএফসি) তাৎক্ষণিকভাবে অবসায়ন না করে তাদের আর্থিক সূচক উন্নয়নের জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা উন্নতি করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূলত বিগত সরকারের সময় বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ঋণের অর্থ আত্মসাতের কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। বিশেষ করে আলোচিত পিকে হালদার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে যে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি, তাদের বিরুদ্ধেই মূলত এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আমানতকারীদের জন্য আশার কথা হলো, গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তাদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এসব রুগ্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার আগেই তাদের গচ্ছিত রাখা মূল টাকা ফেরত পাবেন। আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল অনুমোদন করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে যে, গ্রাহকরা কেবল তাদের জমা রাখা আসল বা মূল টাকা ফেরত পাবেন, কোনো সুদ বা মুনাফা প্রদান করা হবে না। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের প্রস্তুতি চলছে, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় থাকা হাজার হাজার আমানতকারীর মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।