দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খাদ্য মজুত সুসংহত করার লক্ষ্যে নয় হাজার মেট্রিক টন ছোলা এবং এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান তেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি)।
সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিসিজিপির ৪৩তম সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে এবং উন্মুক্ত বাজারে নিত্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতেই এই পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার অস্ট-গ্রেইন এক্সপোর্টস পিটিওয়াই লিমিটেড থেকে ৯ হাজার টন ছোলা আমদানি করা হবে। প্রতি কেজি ৮৪ টাকা ৬৭ পয়সা হিসেবে এই আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
পাশাপাশি দেশীয় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির (এলটিএম) আওতায় স্থানীয় চারটি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান তেল সংগ্রহ করা হবে। দুই লিটারের পিইটি বোতলে সরবরাহযোগ্য এই তেলের প্রতি লিটারের মূল্য ধরা হয়েছে ১৮১ টাকা ৫০ পয়সা। চুক্তির আওতায় গ্রিন অয়েল অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ এবং প্রধান অয়েল মিলস লিমিটেড উভয়েই ২০ লাখ লিটার করে এবং মজুমদার ব্র্যান অয়েল মিলস লিমিটেড ও মজুমদার প্রোডাক্টস লিমিটেড প্রত্যেকে ৩০ লাখ লিটার করে তেল সরবরাহ করবে।
প্রয়োজনীয় এই খাদ্যপণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে টিসিবির মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগ আরও বেগবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) শুরু হয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং প্রযুক্তিবিষয়ক তিন দিনব্যাপী একাদশ ‘বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো ২০২৬’। বৃহস্পতিবার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) এবং রিমসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনী আগামী শনিবার পর্যন্ত চলবে।
উদ্বোধনী আয়োজন থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনীতে বিশ্বের ২৭টি দেশের দুই শতাধিক ব্র্যান্ড অংশগ্রহণ করেছে। প্রদর্শনী চলাকালে প্রায় চব্বিশ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে বলে আয়োজক পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে সমৃদ্ধ করতে বাপা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। এই প্রদর্শনী কেবল পণ্য প্রদর্শনের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ খাতের সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। কৃষকদের ফলিত ফসলের যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রপ্তানি বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে তিনি মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জোর দেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রচুর উৎপাদন, ভালো প্রক্রিয়াকরণ ও সরকারের নীতি সহায়তার মাধ্যমে এ খাত ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া বাপার সভাপতি মাহবুব আনাম, এক্সপো আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী আহসান খান চৌধুরী, বাপার সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম এবং সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম।
ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে একে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম খাদ্য অপচয় রোধ, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজনের ওপর আলোকপাত করেন।
শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী আহসান খান চৌধুরী বিদেশি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাপার সভাপতি মাহবুব আনাম জানান, আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশীয় পণ্যের অবস্থান সুসংহত করা এবং টেকসই সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই আয়োজন, যা প্রযুক্তিগত সংযোগ ও রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
প্রদর্শনীতে স্বয়ংক্রিয় প্রসেসিং, মোড়কীকরণ, কোডিং, লেবেলিং, মান নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং স্মার্ট ফ্যাক্টরি সংশ্লিষ্ট চার সহস্রাধিক আধুনিক প্রযুক্তিগত সমাধান তুলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইতালি, জাপান, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, স্পেন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এতে অংশ নিয়েছে।
মূল আয়োজনের অংশ হিসেবে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ছাড়াও একই ভেন্যুতে চলছে 'ফুড ইনগ্রেডিয়েন্টস বাংলাদেশ এক্সপো ২০২৬'। প্রদর্শনীটি প্রথম দুই দিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং সমাপনী দিনে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বাম্পার ফলন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি চাহিদার ওপর ভর করে চলতি আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে রেকর্ড ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মেট্রিক টন ভুট্টা রপ্তানির পথে রয়েছে আর্জেন্টিনা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং তীব্র তাপদাহে ইউরোপের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্রেতারা বিকল্প বাজার হিসেবে আর্জেন্টিনার দিকে ঝুঁকছেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভুট্টা রপ্তানিকারক দেশ আর্জেন্টিনা তাদের ২০২৫/২৬ মৌসুমের ফসল তোলার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ মৌসুমে দেশটিতে মোট ৭ কোটি ১৭ লাখ মেট্রিক টন ভুট্টা উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা পাঁচ বছর আগের পূর্ববর্তী রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
আর্জেন্টিনার শস্য রপ্তানিকারক ও ক্রাশিং সমিতি সিআইএআরএ-সিইসি (CIARA-CEC)-এর প্রধান গুস্তাভো ইদিগোরাস রয়টার্সকে জানান, বর্তমানে দাম এবং পরিমাণের দিক থেকে আর্জেন্টিনার ভুট্টা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত প্রতিযোগিতাসক্ষম অবস্থানে রয়েছে। সাধারণ সময়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মেয়াদে যেখানে রপ্তানির পরিমাণ থাকে গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টন, সেখানে এবার তা এক কোটি টনে পৌঁছাতে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত ইউক্রেনের শস্যের ওপর নির্ভরশীল উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকেই এবার চাহিদার প্রধান চাপ আসছে।
আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইনডেক’ (INDEC)-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে আর্জেন্টিনার ভুট্টা সরবরাহ ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৬৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে মরক্কোয় রপ্তানি এক লাফে ১৩৩ শতাংশ বেড়ে ১৫ লাখ ৫০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া মিশরে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ লাখ টন এবং আলজেরিয়ায় ১০ শতাংশ বেড়ে ২৪ লাখ টনে পৌঁছেছে।
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের প্রধান বন্দর ওদেসায় রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে দানিউব নদীপথ ব্যবহার করা হলেও ইউরোপজুড়ে তীব্র খরা ও রেকর্ড তাপপ্রবাহের কারণে নদীর পানি কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে গত মাসে ইউক্রেনের রপ্তানি ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। আর্জেন্টিনার সাবেক বাণিজ্য সচিব ও বাজার বিশ্লেষক হাভিয়ের প্রেসিয়াডো পাতিনো বলেন, নৌপথ অবরুদ্ধ থাকায় ইউক্রেনীয় শস্য মূলত ইউরোপের অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার জন্য।
পাশাপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভুট্টা রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিবর্তনও আর্জেন্টিনার পালে হাওয়া দিয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যানুযায়ী, ব্রাজিলে জৈব জ্বালানি বা ইথানল শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণের কারণে গত তিন বছরে দেশটির ভুট্টা রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিলের সরবরাহ কমে যাওয়াকে আর্জেন্টিনার রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি বাণিজ্যিক সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসেই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে বড় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। পণ্য আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় মাসটিতে সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৯ কোটি মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুলাইয়ে পণ্য আমদানিতে দেশের মোট ব্যয় হয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি খাত থেকে আয় এসেছে ৪৩৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ কম। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের মধ্যকার ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি এক লাফে ২০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে ছিল ১৫১ কোটি ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স) উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশ। জুলাই মাসে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর ওপর ভর করে মাসটিতে চলতি হিসাবে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত বজায় ছিল, যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল সাড়ে ১২ কোটি ডলার।
এদিকে অর্থবছরের প্রথম মাসে আর্থিক হিসাবের (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) ঘাটতি কিছুটা কমে ৬৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৮ কোটি ডলার। তবে একই সময়ে দেশে বিদেশি ঋণ, অনুদান ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ কিছুটা কমেছে। জুলাই মাসে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ কোটি ডলার কম। বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক সূচকের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে ছিল ৫৪ কোটি ডলার।
চীনা প্রযুক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতার অভিযোগ তুলে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্ড মোটর কোম্পানি’র তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি। তবে ডেট্রয়েটভিত্তিক বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি পরিবহনমন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে বলেছে, পুরো অভিযোগটিই ‘ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা’।
বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে জানা যায়, গত মঙ্গলবার মার্কিন পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক চিঠিতে পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিম ফার্লিকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, প্রতিষ্ঠানটির ‘সাম্প্রতিক কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড নিজস্ব ভবিষ্যৎকে ক্রমেই চীনা সরকারের সমর্থনপুষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলছে।
পরিবহনমন্ত্রী বিশেষভাবে মিশিগানের মার্শালে অবস্থিত ফোর্ডের ‘ব্লুওভাল ব্যাটারি পার্ক’ কারখানায় চীনা ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সিএটিএল’-এর প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ডাফি মন্তব্য করেন, চীনা কারিগরি জ্ঞানের ওপর নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় নীতির মূল লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
এ ছাড়া স্পেনে চীনের ‘গিলি’ কোম্পানির সঙ্গে ফোর্ডের যৌথ উদ্যোগ এবং চীন থেকে বিলাসবহুল ‘লিংকন’ ব্র্যান্ডের গাড়ির উৎপাদন ২০৩০ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে না আনার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেন মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী।
পরিবহনমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফোর্ড। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ডাফির চিঠিতে স্পষ্ট ‘তথ্যগত ভুল’ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডাফির এই পদক্ষেপকে কেবল ‘শিরোনাম পাওয়ার জন্য ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া একটি প্রচেষ্টা’ বলে আখ্যা দেয় তারা।
একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা যে ফোর্ডের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফোর্ড জানায়, গত আগস্টে ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক তাঁদের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে এনে আমাদের চমকে দেবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে ইউরোপের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সময় বিকেল ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ইউরোপীয় মানদণ্ডের বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দাম ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে ৭৬ দশমিক ৭ ইউরোতে (প্রায় ৮৯ দশমিক ১ মার্কিন ডলার)।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও এলএনজি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রুট ‘হরমুজ প্রণালি’তে উদ্ভূত অচলাবস্থা নিরসন করে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। যা বিশ্ববাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে।
এদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সংঘাত তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত সোমবার ইরান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সংঘাত বৃদ্ধি পেলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে থাকা মার্কিন তেল ও গ্যাস অবকাঠামোসহ সার্বিক জ্বালানি স্থাপনাগুলো আরও বড় ধরনের হামলার মুখে পড়তে পারে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার এই কৌশলগত জলপথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদের জাহাজ চলাচল বহুলাংশে স্থগিত করেছে। একই সাথে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে শরৎকাল পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত সরবরাহ স্থগিতাদেশ)-এর সময়সীমা বৃদ্ধি করেছে দেশটি।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় ইউরোপে আসন্ন শীত মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে গ্যাস মজুতকরণের স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মজুতগারগুলোতে মাত্র ৬৬ শতাংশ গ্যাস সঞ্চিত রয়েছে, যা এই ঋতুর সাধারণ গড় মজুতের তুলনায় অনেকটাই কম।
মজুত ঘাটতির কারণে আসন্ন শীত মৌসুমে চরম শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলে কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হলে ইউরোপের জ্বালানি বাজার নজিরবিহীন সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অর্থনৈতিক অঞ্চল-২ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্য রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৫০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতির একটি চালান ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল পর্যায়ে প্রবেশ করল। এর ফলে বেপজার আওতাধীন আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলিয়ে দেশে চালু শিল্পাঞ্চলের মোট সংখ্যা দাঁড়াল ১০টিতে।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রথম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘লিজ টোব্যাকো মেশিনারি কম্পানি লিমিটেড’। গত ৩ সেপ্টেম্বর বেপজা থেকে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে প্রথম চালানটি পাঠায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা শতভাগ রপ্তানিমুখী এ কারখানাটিতে তামাকজাত পণ্য উৎপাদনের যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করা হয়। ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি বেপজার অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ দশমিক ৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বর্তমানে এতে ২৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
নতুন বাজারে এই চালানের গুরুত্ব তুলে ধরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২-এর নির্বাহী পরিচালক মো. ওহিদুজ্জামান গনমাধ্যমকে বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলক কম। এ প্রেক্ষাপটে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২ থেকে দেশটিতে রপ্তানি শুরু হওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
প্রশাসনিক ও পরিচালন কার্যক্রম সহজতর করতে মিরসরাইয়ে ১ হাজার ১৩৮ দশমিক ৫৫ একর আয়তনের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ ও ২ নামে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল-১-এ বরাদ্দপ্রাপ্ত ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চল-২-এ বরাদ্দ পাওয়া ১৮টি কারখানার মধ্যে লিজ টোব্যাকো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ও রপ্তানিতে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবশিষ্ট ১৪টি প্রতিষ্ঠানের কারখানার নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য এই সীমা ছাড়াল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও আলজাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বুধবার লেনদেনের একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ০৭ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪ দশমিক ৭৩ ডলারে দাঁড়ায়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের নৌযানে হামলার চেষ্টা চালানোর পর তারা দেশটির একাধিক তেলবাহী জাহাজ ‘ধ্বংস’ করেছে। এর আগে সৌদি আরবের চারটি শহরে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় আগস্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে গত এপ্রিলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলে সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরবর্তীতে কিছুটা দরপতন হলেও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় গোল্ডম্যান স্যাকস, ব্যাংক অব আমেরিকা ও এইচএসবিসিসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলো তেলের ভবিষ্যৎ মূল্যের পূর্বাভাস বাড়িয়ে দিয়েছে। এই উত্তেজনার প্রভাব গ্যাসের বাজারেও পড়েছে, যার ফলে যুক্তরাজ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের বৈশ্বিক পণ্যবাজার গবেষণার সহ-প্রধান দান স্ট্রুইভেনের মতে, সমুদ্রপথে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সিএনবিসির ‘স্কোয়াক বক্স এশিয়া’ অনুষ্ঠানে তেলের দর ১২০ ডলারে পৌঁছানোর ঝুঁকি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই সম্ভব।’
জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বছরের শেষ নাগাদ নীতিগত সুদের হার বাড়াতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়ালে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়। এর ফলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তীব্র হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও সামগ্রিক জ্বালানি তেলের চাহিদায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম চালু রাখতে প্রায় ১ হাজার ৩ কোটি টাকা (৩০ কোটি দিরহাম বা ৮ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার) মূলধন জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী পরিশোধিত মূলধনের ঘাটতি মেটাতে আজ বুধবারের মধ্যেই দেশটিতে ৮ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ১০৪ মার্কিন ডলার স্থানান্তরের জন্য জনতা ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, দেশটিতে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হিসেবে ন্যূনতম ৪০ কোটি দিরহাম থাকা বাধ্যতামূলক হলেও প্রতিষ্ঠানটির ছিল মাত্র ১০ কোটি দিরহাম। দীর্ঘদিনের এই ৩০ কোটি দিরহামের ঘাটতির কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর একাধিকবার ব্যাংকটিকে সতর্ক করে চিঠি দেয়। সবশেষ নির্দেশনায় একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে কার্যক্রম সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিতে প্রশাসক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলা, নতুন কোনো আর্থিক সেবা দেওয়া বন্ধ এবং সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তাদের পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইউএইতে জনতা ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নূন্যতম মূলধনের শর্ত পূরণ করা আবশ্যক; যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সংরক্ষিত বিভিন্ন উপখাত থেকে স্থানীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে এই তহবিল পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো। সরকারের এই অর্থ জোগানের ফলে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইনে অবস্থিত চারটি শাখার কার্যক্রম বন্ধের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হলো।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে সেবা দিয়ে আসছে জনতা ব্যাংক। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দেশে অর্থ পাঠানো, চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব খোলার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এই শাখাগুলো। এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড এবং ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে ঋণপত্র (এলসি) খোলা, কমার্শিয়াল গ্যারান্টি ও বাণিজ্যিক ঋণ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানির সুযোগ পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। সম্প্রতি ঘোষিত ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯’-এ রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই নীতি সংশোধন করে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত পুরোনো রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান নিষেধাজ্ঞার কারণে একদিকে সাধারণ ক্রেতারা আধুনিক প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব পরিবহন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরে জানানো হয়, দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে দেশের গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত পরিবহনের চাহিদা মেটাতে রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত রিকন্ডিশন্ড ইভি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তরল জ্বালানি আমদানি করে। এ অবস্থায় দেশে প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শর্তসাপেক্ষে এসব গাড়ি আমদানির রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, আমদানির পূর্বে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে কার্যকর পরিদর্শন এবং ব্যাটারির সক্ষমতা (স্টেট অব হেলথ বা এসওএইচ) ন্যূনতম ৭০ শতাংশ থাকার প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাটারির আয়ুষ্কালের নিশ্চয়তা থাকা এবং বন্যা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বড় ধরনের দুর্ঘটনায় কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার বিকাশ ঘটাতে চার্জিং স্টেশন স্থাপন, ডায়াগনস্টিকস ও সার্ভিসিং অবকাঠামোয় দেশীয় বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা অব্যাহত রাখা জরুরি। সেই সঙ্গে বর্তমান বাজেটের শুল্ক-কাঠামো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা করে বয়সসীমাসহ অন্যান্য শর্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন চললেও এর প্রভাব পড়ছে না দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর। বিশেষ করে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক সংকটের বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে ভারতের বাজারে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা বিগত বছরের একই সময়ে ছিল ৩১ কোটি ১৩ লাখ ডলার। এই প্রবৃদ্ধি বর্তমানের অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে চীন ও অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আড়াই শতাংশের কিছু বেশি, আর জাপানে রপ্তানি পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের টানাপড়েন বিভিন্ন ইস্যুতে দৃশ্যমান হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে নানা শীতলতা সত্ত্বেও বাণিজ্যে তার কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। যদিও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনো প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের উপরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে ইতিহাস গড়েছিল। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতায় কিছুটা উঠানামা দেখা যায়। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলো তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। এছাড়া পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া এবং প্লাস্টিক সামগ্রীও নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে কিছু নীতিগত জটিলতা ও শুল্ক-অশুল্ক বাধা এখনো বিদ্যমান। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগ বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের নির্দেশনা জারি করে। এছাড়া কয়েকটি স্থলবন্দর দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পানীয় ও ফার্নিচার রপ্তানির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও দেশীয় বস্ত্র শিল্প সুরক্ষায় সুতা আমদানিতে কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। এসব বিধিনিষেধের কারণে মাঝে বাণিজ্যিক গতি কিছুটা মন্থর হলেও সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে তার বড় কোনো প্রভাব পড়েনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কূটনৈতিক সম্পর্কে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সহকারী হাই কমিশনে হামলা এবং ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক হলেও সম্পর্কের বরফ পুরোপুরি গলেনি। এমনকি ট্রানজিট সুবিধা ও সুনির্দিষ্ট বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরোপিত বিধিনিষেধ বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাসত্ত্বেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা কমছে না। দেড়শ কোটি মানুষের বিশাল চাহিদা মেটাতে ভৌগোলিক ও আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের জন্য এখনো সবচেয়ে সুবিধাজনক উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই বাণিজ্যিক ধারা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বিদ্যমান অশুল্ক বাধাগুলো দূর করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ করতে এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বজায় থাকলে রাজনৈতিক টানাপড়েন ছাপিয়ে বাণিজ্যের ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা সম্ভব। সম্প্রতি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে এবং এই সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার সুযোগ রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে প্রচলিত বন্ড সুবিধা বাতিল করে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির নতুন বিধান কার্যকর করেছে। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এনবিআরের কাস্টমস, রফতানি ও বন্ড শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হয়। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এনবিআরের জারিকৃত আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, “বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস হেডিং ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাধীন ১০–৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলো। তবে ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী প্রকৃত রফতানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে এ সুতা আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।” আদেশে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট রফতানিকারককে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা বিটিএমএর প্রত্যয়নপত্র কাস্টমস স্টেশনে জমা দেওয়ার পাশাপাশি প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থের নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান করতে হবে। আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য পুরোপুরি রফতানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে এই ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা এই আদেশ গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর ধরা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্বাক্ষরিত চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি, অথচ সভার কার্যবিবরণীতে এটি সিদ্ধান্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। সংগঠন দুটির মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবতাবিবর্জিত ও আত্মঘাতী এবং এটি কার্যকর হলে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন যে, প্রয়োজনীয় সুতার অন্তত ৫০ শতাংশ স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা এবং বাকি ৫০ শতাংশ আমদানির সুযোগ দেওয়ার নিয়মটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অযৌক্তিক।
পোশাক খাতের নেতৃবৃন্দ চিঠিতে আরও জানান, দীর্ঘদিনের প্রচলিত বন্ড ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই এ শিল্প বর্তমানে সুসংহত অবস্থানে পৌঁছেছে। এখন হঠাৎ করে বন্ড সুবিধা সরিয়ে নেওয়া হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। তারা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে শুধু দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় সুতার জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় তারা জরুরি ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন।
পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর এক কার্যদিবসের ব্যবধানে মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) আবারও দরপতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মূল্যহ্রাসের পাশাপাশি সূচকের পতন হয়েছে, যদিও লেনদেনের অংকে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দর কমার তালিকায় অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠান থাকলেও সামগ্রিক মূল্যসূচক ও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত রবিবারের ভয়াবহ ধসে ডিএসইর প্রধান সূচক ১০৩ পয়েন্ট হারিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। যদিও সোমবার বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু মঙ্গলবার সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। লেনদেনের শুরুর ভাগে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধিতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে প্রধান সূচক ৬১ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তবে দুপুর ১২টার পর এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মাত্রাতিরিক্ত বিক্রয় চাপের মুখে বাজারের গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং দিনশেষে বড় উত্থানের সম্ভাবনা ম্লান হয়ে পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে এদিন ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বাড়লেও ২৫২টির দর কমেছে এবং ৬১টি প্রতিষ্ঠানের মূল্য অপরিবর্তিত ছিল। এর ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় ২৮ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ৫ হাজার ৫৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১০৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১০৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সূচক কমলেও লেনদেনের পরিমাণ আগের কার্যদিবসের চেয়ে ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা বেড়ে ৫৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এদিনের লেনদেনে শীর্ষস্থান দখল করেছে এনভয় টেক্সটাইল, যার ২৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। পরবর্তী অবস্থানে থাকা মালেক স্পিনিং ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ যথাক্রমে ২৫ কোটি ৯ লাখ ও ২২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার লেনদেন সম্পন্ন করেছে। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় আরও ছিল আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সায়হাম কটন ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ২০১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৬টির দর কমলেও ৮৬টির দর বৃদ্ধি পাওয়ায় সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৮ পয়েন্ট বেড়েছে।