দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। টানা তিন দিন ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর বুধবার তেলের দরপতন লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০৬ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও সমহারে হ্রাস পেয়ে ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে এসেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে তেলের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। ফিলিপ নোভার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেভা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে অনিশ্চয়তা তেলের দামকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে বাজার এখনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে না।’ তিনি সতর্ক করে জানান যে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য কোনো নতুন হুমকি তৈরি হলেই তেলের দামে আবারও শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি ফিরে আসতে পারে।
মঙ্গলবার তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার মূলে ছিল স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসা এবং হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেইজিং সফরে যাচ্ছেন, যেখানে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে। যদিও ট্রাম্প ইতিপূর্বে মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের সহায়তা তাঁর প্রয়োজন হবে না।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি সরবরাহ ঘাটতির কারণে চলতি বছরজুড়ে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের ওপরেই থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাবে মার্কিন অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা অপরিবর্তিত রাখার পথে হাঁটতে পারে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ক্যাপিটাল ইকোনমিকস এক নোটে জানিয়েছে যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার ভবিষ্যতে তেলের চাহিদাকে সংকুচিত করে দিতে পারে। অন্যদিকে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির মজুত ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরণের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদহার হ্রাসের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে। বুধবার স্পট গোল্ডের বাজার দরে এই পতন পরিলক্ষিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স নিশ্চিত করেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বুধবার স্পট গোল্ডের দাম দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭১০ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আগের সেশনে স্বর্ণের দাম গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল, কিন্তু নতুন অর্থনৈতিক তথ্যের চাপে তা স্থায়ী হতে পারেনি। অন্যদিকে জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণ ফিউচার্সের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭১৭ দশমিক ৫০ ডলারে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন অর্থনীতির সাম্প্রতিক শক্তিশালী মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি ফেডকে উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্বর্ণের বাজারে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন উন্মুখ হয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের দিকে। বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তজনা নিরসনে এই বৈঠকের ফলাফল আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে এক নতুন মোড় নিয়ে আসতে পারে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানিতে শুল্ক এক ধাক্কায় ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার। মঙ্গলবার এক দাপ্তরিক আদেশের মাধ্যমে এই নতুন কর কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে মূল্যবান ধাতু চোরাচালান পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নতুন নীতি অনুযায়ী, স্বর্ণ ও রৌপ্য আমদানির ওপর ১০ শতাংশ বেসিক কাস্টমস ডিউটি এবং ৫ শতাংশ কৃষি অবকাঠামো ও উন্নয়ন সেস (এআইডিসি) আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের এখন থেকে ১৫ শতাংশ কার্যকর কর গুনতে হবে। ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশনাল সেক্রেটারি সুরেন্দ্র মেহতা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চলতি হিসাবের ঘাটতি প্রত্যাশামাফিক নিয়ন্ত্রণে শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। তবে এতে চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের দাম আগেই অনেক বেশি ছিল।’
উল্লেখ্য যে, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ ভোক্তা দেশ এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বর্ণের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। রিজার্ভ সুরক্ষার স্বার্থে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বে দেশবাসীকে অন্তত এক বছর স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শেয়ারবাজারে অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে স্বর্ণভিত্তিক ফান্ডে বিনিয়োগ গত বছরের তুলনায় ১৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালে শুল্ক কমানোর ফলে অবৈধ পথে স্বর্ণ আসা কিছুটা কমেছিল, তবে বর্তমানের এই উচ্চ শুল্ক চোরাচালানকারীদের আবারও উৎসাহিত করবে। এপ্রিল মাসেই ৩ শতাংশ আইজিএসটি আরোপের ফলে ভারতে স্বর্ণ আমদানি গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত আমদানিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বুলিয়ন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয়ের প্রবাহে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে ১৪৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাস আয়ের এই ইতিবাচক চিত্রের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, গত ১১ মে একদিনেই প্রবাসীরা প্রায় ১৬ কোটি ২০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসের প্রথম ১১ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯২ কোটি ২০ লাখ ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক; গত ১ জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত দেশে মোট ৩ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার, অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ১০ মাসেই প্রবাসী আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের বিশেষ প্রণোদনা, ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ ও আধুনিক করা এবং বর্তমান প্রশাসনের ওপর প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান আস্থা এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
টানা পাঁচ কার্যদিবসের দরপতনের বৃত্ত ভেঙে অবশেষে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের শেয়ারবাজার। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যসূচকও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ এক লাফে হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ডিএসইর লেনদেনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দামে ইতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় এবং এই ধারা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। দিনশেষে ডিএসইতে ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩৮টির এবং ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। বিশেষ করে লভ্যাংশ প্রদানকারী শক্তিশালী কোম্পানি এবং ‘জেড’ গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
মূল্যসূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ডিএসই-৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। লেনদেনের গতিতেও ব্যাপক চাঙ্গাভাব দেখা গেছে; মঙ্গলবার ডিএসইতে ১ হাজার ১০১ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। আজকের লেনদেনে শীর্ষস্থানে ছিল মুন্নু সিরামিক, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং অ্যাকমি পেস্টিসাইড। এছাড়া শীর্ষ দশ তালিকায় আরও ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এনসিসি ব্যাংক এবং ওরিয়ন ইনফিউশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে অংশ নেওয়া ২০৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৯টির দর বেড়েছে এবং ৬৭টির দাম কমেছে। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে ২১ কোটি ৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
দেশের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী খাত ও স্টার্টআপগুলোর বিকাশে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। প্রথমবারের মতো ৩৯টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগে ৪২৫ কোটি টাকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ (বিএসআইসি)-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এই বিশেষ তহবিলের শুভ সূচনা করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএসআইসি-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের এই প্রাথমিক তহবিলটি ব্যাংকগুলোর বার্ষিক নিট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এটি কোনো এককালীন বিনিয়োগ নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে মূলধন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্টার্টআপগুলোর ‘সিড’, ‘লেট-সিড’ এবং ‘সিরিজ-এ’ পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি ও প্রুডেনশিয়াল ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হবে যাতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এরকম একটা কর্মযজ্ঞ বিশাল ব্যাপার। এই অনুষ্ঠানটির মেসেজ হলো, স্টার্ট আপ বিনিয়োগকে এটি আত্মবিশ্বাসী করবে। আমাদের একটি প্রোগ্রাম আছে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি। এই উদ্যোগের আওতায় ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অনেক কাজ করা যাবে আশা করি। এই বিনিয়োগে কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না আমি কথা দিচ্ছি। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে যে স্বচ্ছতা আমরা আনতে চাচ্ছি তা এর মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ব্যাংক খাত এবং অর্থনীতিতে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা সমাধান করতে জেপি মরগ্যান, বিশ্বব্যাংক, আইএফসির সাথে মিলেমিশে এই সরকার কাজ করছে। দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরণের সমস্যা হয়েছে যা আমি বলতে চাই না। এই উদ্যোগকে সরকার যতভাবে দরকার সব দিক দিয়েই সহযোগিতা করবে।'
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান বলেন, 'বাংলাদেশের আর্থিক খাতের পরবর্তী ধাপের উন্নয়নে এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। বিএসআইসি দেশীয় মূলধনকে উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।' অতীতের অভিজ্ঞতার কথা টেনে তিনি বলেন, 'প্রথম ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে যা সফল হয়নি। পরবর্তীতে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে তাদের নিট লাভের ১% দিয়ে তহবিল গঠন করতে বলা হয়। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) বাংলাদেশ ব্যাংককে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে খুবই সহযোগিতা করেছে। এরকম কাজের ক্ষেত্রে এবিবি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি যেই লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে তা অবশ্যই সফল হবে। তবে আমি অনুরোধ করতে চাই, এই বিনিয়োগের সুফল যেন প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ পায়। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ এর সুফল না পেলে একটা বড় অংশ বঞ্চিত থাকবে এই উদ্যোগের। সামনে আরেকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে। ক্যাশলেস সোসাইটি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে এবিবি সহযোগিতা করবে বলে আশা প্রকাশ করছি।'
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসলেও দেশীয় মূলধনের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। বর্তমানে এই বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্মটি সেই শূন্যতা পূরণ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। মঙ্গলবার প্রকাশিত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, দেশের অর্থনীতি এখনও একটি ভঙ্গুর ও অসম পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত মার্চ মাস শেষে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিম্ন প্রবৃদ্ধি, অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে বিদ্যমান চাপ অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী অস্থিরতা কিছুটা স্তিমিত হলেও জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় ও শিল্প খাতের মন্থর গতির কারণে সামগ্রিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরাজমান এক ধরণের সতর্কাবস্থান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করে রেখেছে। এমসিসিআই-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, দুর্বল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গৃহীত কঠোর মুদ্রানীতি বাজারে চাহিদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ও ব্যবসায়িক গতি কমিয়ে দিয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর। এতে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং ডলারের অস্থিতিশীলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতির এই প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের বা রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ রিজার্ভের অবস্থানকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। এমসিসিআই মনে করে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক খাতে একটি ন্যূনতম স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক উন্নতির মৃদু ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবুও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানাবিধ ঝুঁকির কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
দেশের অর্থব্যবস্থাকে ক্যাশলেস করার লক্ষ্যে এক বড় ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী জুলাই মাস থেকে দেশের প্রতিটি ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লেনদেনের জন্য ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’র (বিএসআইসি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
গভর্নর জানান, দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলা কিউআর হলো এমন একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক অ্যাপ কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) ব্যবহার করে গ্রাহকরা নিরাপদ পেমেন্ট করতে পারবেন। এতে বিক্রেতার জন্য হিসাব রাখা সহজ হবে এবং ক্রেতার জন্য কার্ড বা নগদ টাকার বহন করার প্রয়োজন কমবে। যেকোনো ব্যাংকে হিসাবধারী ব্যবসায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে ৩-৪ দিনের মধ্যেই এই কিউআর কোড সংগ্রহ করতে পারবেন বলে এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
অনুষ্ঠানে ৪২৫ কোটি টাকার মূলধন নিয়ে নবগঠিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার ঘোষণা দেওয়া হয়। ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফার ১ শতাংশের সমন্বয়ে এই বিশেষ তহবিলটি গঠন করা হয়েছে। এটি মূলত নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সিড ও সিরিজ-এ পর্যায়ে মূলধন সহায়তা প্রদান করবে। বিএসআইসি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন স্পষ্ট করেছেন যে, শুধু তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ নয়, বরং সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই উদ্যোক্তারাও এই অর্থায়নের আওতায় থাকবেন।
উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিলের জোগান আরও বাড়াতে গভর্নর আরও একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব বিনিয়োগের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল খাতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান করবে। বাংলা কিউআর কোড গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও বেশ সহজ রাখা হয়েছে। মাসিক ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবির প্রয়োজন হবে; তবে লেনদেন এর বেশি হলে টিন সার্টিফিকেট ও ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে আলুর মূল্যে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলে আলুর ব্যাপক উৎপাদন এবং বিশাল উদ্বৃত্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গত এক মাসেরও কম সময়ে পণ্যটির ফিউচার বা আগাম চুক্তির দাম ৭০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রলেপে বিশ্বজুড়ে কৃষি উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির আশঙ্কায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে ইউরো নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২১ এপ্রিল আলুর বেঞ্চমার্ক চুক্তির মূল্য যেখানে প্রতি ১০০ কেজিতে মাত্র ২ ইউরো ১১ সেন্ট ছিল, তা কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৮ ইউরো ৫০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আলুর দাম বেড়েছে প্রায় ৭০৫ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উল্লম্ফন বাস্তব চাহিদার চেয়ে বরং আর্থিক খাতের আগাম জল্পনা-কল্পনারই ফল। বর্তমানে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও জার্মানিতে আলুর বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, বরং আলুর প্রাচুর্য এতটাই বেশি যে অবিক্রিত পণ্য সরাতেও হিমশিম খাচ্ছেন চাষীরা।
আলুর এই অভাবনীয় বাজার দরের নেপথ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক সার ও জ্বালানি সংকটের প্রবল আশঙ্কা। আলু চাষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সারের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন কৃষকরা। জাতিসংঘের মতে, বৈশ্বিক কৃষি খনিজ উপাদান ও সারের এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই পরিবহিত হয়। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় চড়া দামে আলুর আগাম চুক্তি কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, পাইকারি ও আগাম চুক্তির বাজারে এই অস্থিরতা থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের প্রভাবে সার ও জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
দেশের আবাসন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার প্রতিরোধে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে রিহ্যাব প্রতিনিধি দলের সাথে আয়োজিত এক যৌথ সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। রিহ্যাবের পক্ষ থেকে অপ্রদর্শিত আয়ের বিনিয়োগ ঠেকাতে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
বিএফআইইউ-এর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় রিহ্যাব প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। সভায় বিএফআইইউ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুনসহ অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় মূলত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর করণীয়, গ্রাহক যাচাইকরণ (কেওয়াইসি) এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, দেশের আবাসন খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরে রিহ্যাব সবসময় সরকারের আইন ও নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ’র সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল করতে রিহ্যাব কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তিনি মনে করেন, নিবন্ধন খরচ কমানো গেলে লেনদেনে স্বচ্ছতা আসবে এবং অর্থপাচারের প্রবণতা হ্রাস পাবে।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রিয়েল এস্টেট খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য পূরণে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইন অনুযায়ী রিপোর্টিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে রিহ্যাব ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। সভায় উপস্থিত অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং এ বিষয়ে দুদক ও এনবিআর-এর সাথে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
বিএফআইইউ কর্মকর্তারা সভায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কারিগরি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। উভয় পক্ষই আবাসন খাতে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সভায় রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকবৃন্দও অংশগ্রহণ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ধাতু, সার এবং কৃষিপণ্যের দামে বড় ধরণের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির সাথে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং বড় দেশগুলোর মুদ্রানীতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে গত এপ্রিল মাসজুড়ে বিশ্ববাজারকে এক টালমাটাল অবস্থায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে।
জ্বালানি তেলের বাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব সবথেকে বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এপ্রিলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টানা চতুর্থ মাসের মতো মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড। নৌপথে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক অগ্রগতির ক্ষীণ আশাতেই এই দাম কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শিল্প ধাতুর বাজারেও একই ধরণের চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে। ইন্দোনেশিয়া নিকেল আকরিকের দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে এর মূল্য ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত তামার চাহিদাও তুঙ্গে থাকায় এর দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোতে উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় এর দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া দস্তা ও সিসার বাজারও এপ্রিল মাসে ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারও সাধারণ মানুষের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারের উচ্চমূল্য ও প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কায় গমের দাম ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে ভুট্টা ও সয়াবিনের দামও যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ ও ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। তবে চালের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে; পর্যাপ্ত মজুত ও চাহিদা হ্রাসের ফলে এর দাম ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে তুলা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এর দাম রেকর্ড ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। এর ফলে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে খাদ্যদ্রব্যের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে, যার মূল ভিত্তি ছিল তাদের শক্তিশালী ‘ইস্ট–ওয়েস্ট’ বা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। এই বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা এড়িয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
আরামকোর সাম্প্রতিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সময়ে তাদের রাজস্ব আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিকূল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈশ্বিক বাজারে তেলের জোগান অব্যাহত রাখায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। সৌদি আরামকোর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন—যা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতায় পৌঁছেছে—নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ধমনি হিসেবে প্রমাণ করেছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কার প্রভাব কমাতে সহায়তা করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বস্তি দিয়েছে।’
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রলেপে তা গত ফেব্রুয়ারি থেকে স্থবির হয়ে রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে ঠেকেছে, যা যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। আমিন নাসের মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদি আজই বা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু হয়, তাহলেও তেল বাজারের ভারসাম্য ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে। কিন্তু যদি আজ থেকে আরও কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তাহলে আমরা ধারণা করছি সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বাজার ২০২৭ সালের আগে স্বাভাবিক হবে না।’
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক ধরণের অস্থিতিশীল শান্তি আলোচনা চললেও সংঘাতের ছায়া এখনও কাটেনি। এমন অনিশ্চয়তার মাঝেও আরামকো তাদের ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের ত্রৈমাসিক লভ্যাংশ অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আরামকোর লভ্যাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ দেশটির সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ৮০ শতাংশেরও বেশি মালিকানা রয়েছে। দাহরানভিত্তিক এই জ্বালানি জায়ান্ট বিশ্বজুড়ে ৭৬ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে।
বিদেশি ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ‘ভিসা বন্ড’ বা ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি ডিপোজিটের অর্থ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দূর করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে নির্দিষ্ট শর্ত পালন সাপেক্ষে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই সরাসরি এই অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি ভিসা প্রদানের শর্ত হিসেবে ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত দাবি করে, তবে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর হয়ে ব্যাংক সেই অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করতে পারবে। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ যাত্রার এই দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সহজতর এবং হয়রানিমুক্ত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংকগুলো আবেদনকারীদের জন্য আন্তর্জাতিক বা ভার্চুয়াল কার্ড ইস্যু করতে পারবে যাতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা আগাম জমা বা প্রিলোড করা থাকবে। এছাড়া বিদ্যমান কার্ডহোল্ডাররা তাঁদের ভ্রমণ কোটার অধীনে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই অর্থ শুধুমাত্র ভিসা সংক্রান্ত সিকিউরিটি ডিপোজিট পরিশোধের ক্ষেত্রেই ব্যয়যোগ্য। গ্রাহকরা তাঁদের এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ), রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাব কিংবা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহার করেও এই সেবা নিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব উন্নত দেশে ভিসার জন্য আর্থিক নিশ্চয়তা বা বন্ড জমা দিতে হয়, সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন এই নীতি অত্যন্ত সহায়ক হবে। সাধারণত ‘ভিসা বন্ড’ হলো একটি নির্দিষ্ট জামানত যা আবেদনকারী ভিসার শর্ত মেনে নিজ দেশে ফিরে আসবেন— এমন নিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে জমা নেওয়া হয় এবং শর্ত পূরণ শেষে তা ফেরতযোগ্য।