দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি শেষে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারার যে সূচনা হয়েছিল, তা দ্বিতীয় কার্যদিবসেও অব্যাহত রয়েছে। ছুটির আগের পাঁচ কার্যদিবস এবং ছুটির পরের টানা দুই কার্যদিবস মিলিয়ে টানা সাত দিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে বাজারে। মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বৃদ্ধির পাশাপাশি সূচক ও লেনদেনে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।
মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে থাকে, যা দিনের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এদিন ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৩০টির শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১১৬টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৭টির দর। লভ্যাংশ প্রদানের ভিত্তিতে ভালো মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১১৫টির দাম বেড়েছে এবং ৫৯টির কমেছে। মাঝারি মানের ৫০টি এবং লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪০৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৮৯ এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৪৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের দিক থেকেও এদিন বড় অগ্রগতি হয়েছে। ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ১৬৮ কোটি ৪ লাখ টাকা বেশি।
লেনদেনের শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যমুনা ব্যাংক ৩৫ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে প্রথম স্থান দখল করেছে। তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক (২৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা) এবং সিটি ব্যাংক (১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা)। শীর্ষ দশে আরও জায়গা করে নিয়েছে আরডি ফুড, অগ্নি সিস্টেম, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং লাভেলো আইসক্রিমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে, সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাজারে ২১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২৮টির শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং ৫৮টির কমেছে। সিএসইতে মোট ২৭ কোটি ১৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। বাজারের এই বর্তমান স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক উত্থান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে মোবাইল ফোনের সিম প্রতিস্থাপনের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বর্তমানে একটি সিম হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একই নম্বর পুনরায় সচল করতে গ্রাহককে ২০০ টাকা কর প্রদান করতে হয়। সরকারের নতুন এই পরিকল্পনায় সাধারণ সিমের পাশাপাশি ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ বা আইওটি সিম প্রতিস্থাপনের করও মওকুফ করার চিন্তাভাবনা চলছে।
সিম প্রতিস্থাপন কর বাতিলের এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় হতে পারে। তবে উচ্চপর্যায় থেকে ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মোবাইল অপারেটরগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এই কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের যুক্তি হলো, একটি সিম প্রথমবার ক্রয়ের সময় যেহেতু একবার কর দেওয়া হয়, তাই একই নম্বরের সিম পুনরায় নেওয়ার ক্ষেত্রে কর আরোপ করা মূলত দ্বৈত করের শামিল। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে টেলিকম খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে এবং দীর্ঘদিনের একটি যৌক্তিক দাবির প্রতিফলন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এপ্রিল মাসের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ১৮ কোটি ৭০ লাখ। সাধারণত মোবাইল ফোন চুরি হলে বা সিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্রাহক সিম প্রতিস্থাপন করে থাকেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৫ লাখ সিম প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে নতুন সিম বিক্রির ক্ষেত্রেও ২০০ টাকা কর নির্ধারিত রয়েছে এবং সব মিলিয়ে এ খাত থেকে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। অপারেটরভিত্তিক গ্রাহক সংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৫০ লাখ, রবির ৫ কোটি ৭৮ লাখ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৫ লাখ এবং সরকারি অপারেটর টেলিটকের গ্রাহক সংখ্যা ৬৮ লাখ। এই কর প্রত্যাহার করা হলে দেশের এক বিশাল সংখ্যক মোবাইল ব্যবহারকারী সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবেন।
সদ্য সমাপ্ত মে মাসে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের এই প্রবাসী আয়ের চিত্র প্রকাশ করেছে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের মে মাসের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২৯৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ডিসেম্বর থেকে টানা ছয় মাস ধরে প্রতি মাসে তিন বিলিয়ন বা তিনশ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় দেশে আসছে। এর আগে মার্চে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলার এবং এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। এছাড়া জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও এই প্রবাহ তিন বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল।
ব্যাংকভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন, যার পরিমাণ মে মাসে ছিল প্রায় ২৩৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে একক ব্যাংক হিসেবে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। মে মাসে এই ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ৫৯ কোটি ২১ লাখ ডলার। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৭ কোটি ডলার, যা একক ব্যাংক হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে ৫৬ কোটি ৬৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যেখানে অগ্রণী ব্যাংক সোয়া ২৪ কোটি ডলার নিয়ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকও ৪১ কোটি ডলার সংগ্রহ করে তালিকায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পবিত্র ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময় এবং আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবাসীরা আগের চেয়ে বেশি অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা সমন্বয় করাও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই-মে) সামগ্রিক চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। এই সময়ে দেশে মোট ৩ হাজার ২৭৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এই অংক ছিল ২ হাজার ৭৫০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। রেমিট্যান্সের এই জোয়ারের প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও গতি ফিরছে। সোমবার পর্যন্ত দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রবর্তিত বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে নিট রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বৃহৎ কনটেইনার পরিচালনাকারী ইউনিট নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) গত মে মাসে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এক অনন্য ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। মাসটিতে এই টার্মিনালটি ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার পরিচালনা করেছে, যা এনসিটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নজির। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে আগের রেকর্ডটি গড়েছিল এই টার্মিনাল।
সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বন্দর পরিচালনা বোর্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান সিডিডিএল এই টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। মে মাসে এনসিটিতে পরিচালিত কনটেইনারগুলোর মধ্যে আমদানিজাত পণ্যের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৮৫১ টিইইউস এবং রপ্তানিজাত পণ্যের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ৬৪৫ টিইইউস। পুরো মাসজুড়ে হিসাব করলে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ৮১ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে।
টার্মিনালটির কার্যক্রম সম্পর্কে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “২০২৫ সালের ৭ জুলাই এনসিটির অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সিডিডিএল টার্মিনালটির কার্যক্রমে গতি এনেছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাহাজ পয়েন্ট, ডেলিভারি পয়েন্ট, অ্যাপ্রাইজ পয়েন্ট, সিএন্ডএফ শেডসহ বিভিন্ন প্রবেশ ও বহির্গমন গেটগুলোতে নিয়োজিত কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতার ফলে কনটেইনার খালাস ও লোডিং কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের যাবতীয় কর্মকাণ্ড প্রধানত তিনটি বিশেষায়িত টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে এনসিটি বর্তমানে প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) মাধ্যমেও নিয়মিতভাবে কনটেইনারবাহী জাহাজগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে এমন বৈশ্বিক সংকটকালীন পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ওপেক প্লাস। আগামী ৭ জুন জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেখানেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।
রয়টার্সের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ওপেক প্লাসের শীর্ষ সাতটি সদস্য রাষ্ট্র আগামী জুলাই মাসের জন্য তাদের সম্মিলিত দৈনিক তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল বৃদ্ধি করতে পারে। অবশ্য এই সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে এখন পর্যন্ত ওপেক কিংবা শীর্ষ দুই উৎপাদক দেশ সৌদি আরব ও রাশিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জোটের জ্বালানি তেলের উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলেও এপ্রিল মাস থেকে প্রতি মাসেই ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। যদিও মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইউএইর এই প্রস্থান বিশ্ববাজারে জোটের সামগ্রিক প্রভাবে কিছুটা নেতিবাচক ছায়া ফেললেও অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও সংহত করতে সহায়ক হবে।
ওপেকের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের নেতিবাচক ধাক্কা লেগেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে জোটের দৈনিক তেল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল, সেখানে এপ্রিল মাসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। এর মধ্যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদনই দৈনিক ৯৯ লাখ ব্যারেল কমে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুদ্ধের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, ইরাক ও কুয়েতের মতো শীর্ষ রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলো, যাদের আপৎকালীন সময়ে অতিরিক্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। আগামী ৭ জুনের নির্ধারিত বৈঠকে মূলত সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান, রাশিয়া ও ওমান—এই সাতটি দেশ অংশগ্রহণ করবে। তবে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২২ সালে গৃহীত দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমানোর যে মূল নীতিটি ছিল, তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ পর্যন্ত বহাল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওপেকের এই সিদ্ধান্তের দিকে বর্তমানে তাকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ ক্রেতাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—পছন্দের খাবার মিলবে তো? দাম কি আরও বাড়বে? নাকি পণ্যের মান হবে নিম্নমুখী? তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসল অর্থনৈতিক ধাক্কাটি এখনও আসা বাকি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি কোনোভাবে ইরান যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হন, তবুও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলো এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আগামী মৌসুমের ফসল উৎপাদনের ওপর। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ সংকটের প্রকৃত ভয়াবহ রূপ আগামী ছয় মাসের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ফেব্রুয়ারির শেষে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের দাম দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে চাষাবাদের খরচ এখন সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের তীব্র সংকট। এফএও-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তরেরো বলেন, ‘আপাতত আমাদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। আসল সংকট তৈরি হবে আগামী মৌসুমে। আফ্রিকার ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলসহ সবখানেই একই সমস্যা।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আগামীকালই যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হয়, তাও খাদ্যের দাম কমবে না। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থা এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে। তবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি বড় বিপর্যয় হয়তো এড়ানো যেতে পারে। আর যদি হরমুজ প্রণালি না খোলে, তবে ২০২৭ সালের শেষভাগে বিশ্বের মোট উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’
স্পেনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে সংস্থার মহাপরিচালক চ্যু দংইউ বলেন, ‘আমরা এখন কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করছে ধাক্কা সামলানো যাবে নাকি ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বিশ্ব এক গভীর খাদ্য সংকটে পড়বে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণেই মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।’ তার মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার ওপর একটি মরণঘাতী আঘাত। বর্তমানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার তৈরির কাঁচামালের সরবরাহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বড় কোম্পানিগুলো যেভাবে কম খরচে দ্রুত পণ্য পাওয়ার বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, তা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গিয়ে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ যদি সহসাই খুলে দেওয়া হয়, তবুও বিশ্বজুড়ে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জার্মান শিপিং প্রতিষ্ঠান হাপাগ-লয়েডের করপোরেট কমিউনিকেশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিলস হাউপ্টের মতে, ‘যুদ্ধ বা বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়া মানেই লজিস্টিকস খাতের যুদ্ধ শেষ হওয়া নয়। শত শত জাহাজ বন্দরে ভেড়ার জন্য অপেক্ষায় আছে। এই জট কাটানোই হবে বিশাল কাজ।’ আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যার মধ্যে ৪শ জাহাজ ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে। বাকি জাহাজগুলো সুয়েজ খাল অথবা আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা খরচ ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি জ্বালানি কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে কাতার এনার্জি এবং কুয়েত পেট্রোলিয়ামের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ‘অনিবার্য পরিস্থিতি’ বা ফোর্স মজিউর ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিমা খরচ বা প্রিমিয়াম প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এনএসআই ইনস্যুরেন্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী অস্কার সেকালি জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই চড়া হার কমবে না। এমনকি একটি জাহাজকে এই পথ দিয়ে পার হতে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
লজিস্টিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রোনের ক্রমবর্ধমান হুমকি ও নতুন যুদ্ধকৌশল শিপিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৮টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আইএমও নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে অনেক কোম্পানি এখন হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুট খুঁজছে। যেমন সৌদি আরব এরই মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে তেলের চালান পাঠানো শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, করোনাকালীন যেমন বিশ্ব চীন থেকে তাদের সাপ্লাই চেইন সরিয়ে নিয়েছিল, এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর চিরস্থায়ী নির্ভরতা কমে যেতে পারে। সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।
দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে গতিশীল করতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ কর সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারীর মধ্যে সম্পাদিত নির্দিষ্ট পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট বা পিপিএ অনুযায়ী সরবরাহ করতে হবে। ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অবশিষ্ট থাকলে তা নেট-মিটারিং পদ্ধতির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের সুযোগ থাকছে।
এই খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর কেটে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ কর রেয়াতের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তবে তাদের মোট পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ প্রদেয় আয়করের বিপরীতে রেয়াত হিসেবে প্রাপ্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অন্তরায় হচ্ছে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক ও কর হার। বর্তমানে ডিসি কেবল, প্যানেল স্ট্রাকচার কিংবা ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে মোট শুল্কভার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল প্রযুক্তিগত ব্যয়ের সমান্তরালে কর কাঠামোই প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ দখল করে নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সোলার প্যানেল আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং ইনভারটারের ক্ষেত্রে প্রায় ২৯ শতাংশ শুল্কভার রয়েছে। অন্যদিকে পিভি-ডিজি কন্ট্রোলারের ক্ষেত্রে এই করের পরিমাণ ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত এবং শুধুমাত্র কেবলের ক্ষেত্রেই শুল্কভার ৫৮ শতাংশের বেশি। যেহেতু বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, তাই উচ্চ শুল্কহার প্রকল্পের সার্বিক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এই কর সুবিধা ও রেয়াত প্রদানের সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে এবং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্য হ্রাসের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। মূল্যবান এই ধাতুর দাম প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬৬ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকায় নেমে এসেছে, যা সোমবার পর্যন্ত ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ১২১ টাকা।
মঙ্গলবার সকালে একটি বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস এই দাম পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত করেছে। নতুন এই দর আজ সকাল ১০টা থেকে কার্যকর করা হয়েছে। সংগঠনটি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে যে, “তেজাবি (পিওর গোল্ড) স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দাম কমানো হয়েছে।”
বাজুসের নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এখন থেকে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকায় বিক্রি হবে। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ১৬৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৭৩ টাকায়।
স্বর্ণের পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও কিছুটা কমানো হয়েছে। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৬৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট রুপা ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৪৪১ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ডের সরবরাহ ও দামের ওপর ভিত্তি করে এই সমন্বয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ সারিতে। আর এই বিশাল পোশাক শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তুলা। টেক্সটাইল খাতের কাঁচামালের এই বিশাল চাহিদাকে লক্ষ্য করে এবার নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন তুলা রপ্তানি বাড়াতে ওয়াশিংটনের নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে অন্যতম শীর্ষ ও কৌশলগত বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন চাচ্ছে, বাংলাদেশ যেন তাদের তৈরি পোশাকে মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল ব্যবহার করে। আর এর বিনিময়ে বাংলাদেশ পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা বা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার।
সম্প্রতি মার্কিন কৃষি বিভাগ (USDA) দেশটির ঝিমিয়ে পড়া তুলা খাতকে চাঙা করতে ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’ (Great American Cotton Plan) বা ‘মহান মার্কিন তুলা পরিকল্পনা’ চালু করেছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই হলো—বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বৃহৎ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোকে মার্কিন তুলা ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশি বস্ত্র ও পোশাকপণ্য শূন্য শুল্কে বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমেরিকার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই আকর্ষণীয় সুবিধার আড়ালে রয়েছে একটি বড় শর্ত। বাংলাদেশ কতটা শুল্ক সুবিধা পাবে, তা সরাসরি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী পরিমাণ তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে, তার ওপর। যদিও এই সুবিধার সুনির্দিষ্ট সমীকরণ বা গাণিতিক ব্যাখ্যা এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি।
নীতিমালার ধোঁয়াশা ও ‘রুলস অব অরিজিন’: আমেরিকার এই প্রস্তাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যেমন বড় সম্ভাবনার, তেমনি এর পেছনে রয়েছে কিছু নীতিগত জটিলতা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (BTMA) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা করেছেন। তার মতে, মার্কিন তুলার মান অত্যন্ত চমৎকার এবং দেশের সুতা ও বস্ত্রকল মালিকরা মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি তুলা কিনছেন। কিন্তু এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রথম বড় বাধা হলো ‘রুলস অব অরিজিন’ বা পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত কঠোর শর্তাবলি।
শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পেতে হলে একটি পোশাকে ঠিক কত শতাংশ মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম তন্তু থাকতে হবে, সে বিষয়ে মার্কিন নীতিমালায় এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূত্র ধরে জানা গেছে, কম শুল্কের এই সুবিধা হয়তো ঢালাওভাবে সব পোশাক রপ্তানির জন্য প্রযোজ্য হবে না। বরং এটি নির্দিষ্ট একটি কোটা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি। নীতিমালার এই ধোঁয়াশা না কাটলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
লিড টাইম ও প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার লড়াই: নীতিগত জটিলতার পাশাপাশি দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জটি হলো ভৌগোলিক দূরত্ব এবং ‘লিড টাইম’ বা পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগা। বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান শক্তি হলো দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশ বা মধ্য এশিয়া থেকে তুলা আমদানি করতে যেখানে সামান্য কিছু দিন সময় লাগে, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজে করে তুলা বাংলাদেশে পৌঁছাতে ৪৫ দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়।
তুলা আমদানিতে এই অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে পোশাকের উৎপাদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বা কম্পিটিটিভনেস কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধানের জন্য বিটিএমএ-র পক্ষ থেকে একটি চমৎকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা বাংলাদেশে মার্কিন তুলা সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বন্ডেড গুদাম বা ‘তুলা ব্যাংক’ সুবিধা তৈরির দাবি জানিয়েছেন। দেশে মার্কিন তুলার পর্যাপ্ত স্টক থাকলে আমদানিকারকরা তাৎক্ষণিকভাবে কাঁচামাল কিনতে পারবেন এবং ৪৫ দিনের দীর্ঘ লিড টাইম ১০ থেকে ১৫ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আগামী সপ্তাহের বৈঠক: এই চুক্তি এবং এর শর্তাবলীকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অনুকূলে নিয়ে আসতে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) পরিচালক ফয়সল সামাদ জানিয়েছেন, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ‘রুলস অব অরিজিন’-এর শর্তগুলো কী হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে আগামী সপ্তাহেই ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবে বিজিএমইএ। এর আগে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের (USTR) সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও, তারা জানিয়েছিলেন যে নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য ঘাটতি ও দুই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সমীকরণ; যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক আগ্রহের পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক তুলার বাজার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাকি বড় অংশটি আসে অন্যান্য দেশ থেকে। মার্কিন প্রশাসন চাচ্ছে এই ৯ শতাংশের কোটা দ্রুত বাড়িয়ে তাদের নিজেদের তুলা চাষি
ও টেক্সটাইল কাঁচামাল উৎপাদনকারীদের বড় অঙ্কের মুনাফা এনে দিতে।
এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে:
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য: চলতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্য প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
আমদানি-রপ্তানি চিত্র: ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারে (যার ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক)। এর বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে মাত্র ২.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
বাণিজ্য ঘাটতি: এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭.৯ শতাংশ বেশি।
আমেরিকা মূলত এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশকে দিয়ে তাদের তুলা কেনাতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’ বাংলাদেশের জন্য একটি দ্বিধারী তলোয়ারের মতো। একদিকে মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের হাতছানি, যা আমাদের রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে মার্কিন তুলা আমদানির বাধ্যবাধকতা, রুলস অব অরিজিনের কঠিন শর্ত এবং ৪৫ দিনের দীর্ঘ লিড টাইমের ঝুঁকি।
বাংলাদেশ যদি কূটনৈতিক চাতুর্য ও দক্ষ আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে সহজ শর্তে ‘রুলস অব অরিজিন’ আদায় করতে পারে এবং দেশের মাটিতে মার্কিন তুলার নিজস্ব গুদাম সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই চুক্তি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। অন্যথায়, শর্তের বেড়াজালে পড়ে শুল্ক সুবিধা অধরাই থেকে যেতে পারে। তাই আগামী দিনে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাথে বিজিএমইএ এবং সরকারি পর্যায়ের আলোচনাটিই নির্ধারণ করবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ।
বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে সকল প্রকার শুল্ক ও কর মওকুফ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই বিশেষ সুবিধাটি পেতে হলে আগামী এক মাসের মধ্যে আমদানিকারকদের তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। এ বিষয়ে এনবিআর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়েছে যে, নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে এসব যান আমদানিতে এখন থেকে কোনো শুল্ক-কর দিতে হবে না।
আমদানিকারকদের জন্য জারিকৃত প্রথম শর্ত অনুযায়ী, আমদানিকৃত বাস বা ট্রাক অবশ্যই সম্পূর্ণ নতুন হতে হবে এবং রিকন্ডিশন গাড়ির ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট যানে ব্যবহৃত ব্যাটারি যেন প্রতিস্থাপন ছাড়াই কমপক্ষে সাত বছর অথবা তিন লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এর সপক্ষে প্রয়োজনীয় ওয়ারেন্টি ও প্রামাণ্য দলিল থাকতে হবে। তৃতীয় শর্ত মতে, আমদানিকৃত এসব ইলেকট্রিক যানকে বিআরটিএ অথবা রপ্তানিকারক দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত মানের হতে হবে কিংবা প্রয়োজনীয় টাইপ অ্যাপ্রোভাল সনদ থাকতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপনে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চালকসহ সর্বনিম্ন ১৭ আসনের বৈদ্যুতিক বাস এবং ৫ টন বা তার বেশি সক্ষমতার বৈদ্যুতিক ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ভ্যাটের আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর থেকে পূর্ণ অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই শুল্কমুক্ত সুবিধাটি আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। উল্লেখ্য যে, গত ৩ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে এমন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরবর্তীতে ২১ মে এনবিআর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি জারি করে।
বিগত এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ‘জ্বালানি তেল’ অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করে আসছে। তেলের নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বড় বড় চুক্তি এবং বিধ্বংসী যুদ্ধ। তবে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তেলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গায় উঠে আসছে ‘পানি’। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট ভবিষ্যৎ বিশ্বে পানির অধিকার বা ‘ওয়াটার রাইটস’কে সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়া এ প্রসঙ্গে জানান, “একবিংশ শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি।” বিশ্বজুড়ে শিল্পায়ন, কৃষি ও প্রযুক্তির প্রসারে পানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী খরার কারণে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন পানিকে কেবল জনসেবামূলক সাধারণ উপাদান হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির কোনো বিকল্প না থাকায় একবিংশ শতকের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব তেলের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা পানির চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক চাহিদার সমান। বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালেই প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ এই খাতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া ২০৩০ সাল নাগাদ ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার বেড়ে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, এখনো বিশ্বের মোট পানির প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি খাতে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো চরম পানি সংকটে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার বড় অংশ জুড়ে থাকবে পানির অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা।
তেল বা স্বর্ণের মতো পানির কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববাজার এখনো গড়ে না উঠলেও অনেক দেশে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় ইতোমধ্যে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পানি লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য পানির পৃথক বাজার তৈরি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় চিপ নির্মাণে ব্যবহৃত এক একর-ফুট পানি থেকে যে রাজস্ব অর্জিত হয়, তা তুলা চাষের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এই ব্যাপক পার্থক্যের কারণেই পানির অধিকার এখন ভূমি উন্নয়নের অধিকারের মতোই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে পানি অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো এই খাতে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। পানির এই ঘাটতি এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানছে। ২০২৩ সালে মরক্কোয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষিপণ্য উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যায় এবং তিউনিসিয়ায় শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ ধসে পড়ে, যা দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় এবারের কোরবানির পশুর বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গবাদিপশু বিক্রির পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় খামারি, চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় ধরণের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন। কৃষি অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, সরকার এ বছর ১ কোটি ১ লাখ পশু কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, বাস্তবে তার তুলনায় অন্তত ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে। এর ফলে কোরবানিযোগ্য পশুর একটি বিশাল অংশ অবিক্রীত থেকে উদ্বৃত্ত হিসেবে খামারগুলোতে ফিরে গেছে। মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনও চলমান থাকলেও প্রাথমিক পরিসংখ্যান এক হতাশাজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ বছর দেশে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল। চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম পশু কোরবানি হয়েছে। একইভাবে খুলনা ও রংপুরেও চাহিদার তুলনায় কোরবানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। চট্টগ্রাম ও বগুড়া জেলাতেও একই ধরণের প্রবণতা দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পশুখাদ্য ও ওষুধের আকাশছোঁয়া দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে গেছে যে, ক্রেতা সংকটে অনেক খামারি শেষ মুহূর্তে লোকসান দিয়ে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও তুলতে না পেরে পশু অবিক্রীত অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে দেশে মাংসের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২৭৫ টাকা, বর্তমানে তা ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় ঠেকেছে। একইভাবে খাসির মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০১৫ সালে ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর দেশে ডেইরি খাতের বিপ্লব ঘটলেও তা বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বড় আকারের পশু কোরবানির বদলে শরিক বা ভাগের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। অনেক পরিবার আবার আর্থিক সংকটের কারণে এবার কোরবানি দেওয়া থেকেই বিরত থেকেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিগত নয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, করোনা মহামারি কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার সময়গুলোতে দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ২০১৯ সালে দেশে রেকর্ড ১ কোটি ৬ লাখ পশু কোরবানি হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংখ্যা আর অর্জিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাজার চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ভোগের হার কমে গেছে। যদিও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দাবি করছে যে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার কারণেই বাজারে পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদাই প্রকৃত অর্থে সংকুচিত হয়েছে।
এদিকে কোরবানির পরবর্তী সময়ে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে সরকার কিছুটা ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫৬ লাখের বেশি পশুর চামড়া প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের আওতায় এসেছে। চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে সরকার বিভাগীয় শহরগুলোতে আধুনিক কসাইখানা স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া সাভারের ট্যানারি শিল্পে পরিবেশগত মান উন্নয়ন ও প্রযুক্তির বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের বড় ধরণের আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে পশুর উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজারের বাস্তব চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
ব্রাজিলে চলতি মৌসুমে কফি উৎপাদন ও বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে পূর্বের সমস্ত মাইলফলক ছাড়িয়ে যাওয়ার এক অভাবনীয় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের সুবাদে বিশ্বের শীর্ষ এই কফি উৎপাদনকারী দেশে এবার রেকর্ড পরিমাণ ফলনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির জাতীয় শস্য সংস্থা ‘কোনাব’ এবং শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কফি উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬ কোটি ৬৭ লাখ ব্যাগে (প্রতি ব্যাগ ৬০ কেজি) পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে উচ্চমানের অ্যারাবিকা কফির ফলন ২৮ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ব্যাগ হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং রোবাস্তা কফির উৎপাদন ২ কোটি ৯ লাখ ব্যাগে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উৎপাদন বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক কফি বাণিজ্যে। বৈশ্বিক পণ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ইসিওএম-এর ব্রাজিলীয় শাখা ‘এইসা’ জানিয়েছে যে, আগামী জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন বর্ষে দেশটিতে কফি রপ্তানির একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কার্লোস সান্তানা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, “এবার সবুজ কফি রফতানি প্রায় পাঁচ কোটি ব্যাগে পৌঁছতে পারে, যা ২০২৪ সালের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে।”
বিগত বছরগুলোতে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে কফি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং বৈশ্বিক মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্রাজিলের এই রেকর্ড উৎপাদন ও রপ্তানি বিশ্ববাজারের সেই ঘাটতি মেটাতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার মাঝেও ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। যদি এল নিনোর প্রভাবে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ শুরু হয়, তবে আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে কফি গাছের ফুল ফোটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার ভয়ে কৃষকরা কফি বিক্রির গতি কমিয়ে দিতে পারেন। বর্তমানে দেশটিতে কফি সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ ফসল কাটা সম্পন্ন হয়েছে।