দুই বছরের করোনা মহামারির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বেশ চাপ সৃষ্টি করেছে। বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের দাম। মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর দুই মাসেই মূল্যস্ফীতির পারদ ৯ শতাংশের ওপরে উঠেছে। অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোও নিম্নমুখী। সাত মাস পর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে গত সেপ্টেম্বরে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা শুনিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব বাংলাদেশেও বেশ ভালোই পড়েছে। এ থেকে আমরা কমে মুক্ত হব- সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।’
বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন মঞ্জুর হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
দুই বছরের বেশি সময়ের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই আশঙ্কার কথা বলছেন, অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করছেন। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমরা তো একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আছে। অর্থনৈতিক-সামাজিক সবদিক থেকেই। বিশেষ করে করোনাভাইরাস-পরবর্তী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধটা আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বের অর্থনীতির জন্য। এখানে রাশিয়া একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ একদিকে হয়ে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যার ফলে দিন দিন সমস্যাগুলো বাড়ছে; নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। তাতে সারা বিশ্ব এর দ্বারা এফেক্টেড হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তো এ থেকে আমরা ব্যতিক্রম নই। কারণ একটা হচ্ছে, যে জ্বালানি তেলের উৎসগুলো অনেকটাই সেই সব দেশের ওপর নির্ভর করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছুটা কমছে, আবার বাড়ছে। তেলের একটি অনিশ্চয়তা আছে।
দ্বিতীয়ত আছে খাদ্যসংকটের একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। তৃতীয়ত হচ্ছে, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। সেসব দেশে এখন মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে। তারা হয়তো এখন তাদের কস্ট অব লিভিং কমাতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর অবস্থা যা, আমাদের অবস্থাও তা। তবে আমরা যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেহেতু অভিঘাতটা আমাদের ওপর অনেক বেশি হবে অন্যান্য দেশের চাইতে।
এটি হচ্ছে মূলত প্রথম কথা; আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমরাও কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। জ্বালানি তেলকে সাশ্রয় করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছি। দেশের অনেক ধরনের সমস্যা হচ্ছে। উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটা কমে গেছে। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার যে অবস্থায় আমরা এসছিলাম গত কয়েক বছরে। বিদ্যুতে নিরবচ্ছিন্ন ছিলাম, সেখানে ব্যাঘাত ঘটেছে। এগুলো সবই কিন্তু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর একটি প্রভাব ফেলছে। তাতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা প্রবৃদ্ধি সেটার ওপর আঘাত আসছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে। সেটি কি আদৌ অর্জন করা সম্ভব হবে?
এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্ব পেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আসলে অর্জন করা খুবই কঠিন। বিশ্বব্যাংক বলেন বা আইএমএফ বলেন, তারা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ সেটা আগের থেকে কমিয়ে এনেছে। আমাদের ৭ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা ছিল, এখন সবাই বলছে ৬ শতাংশ, এমনকি আরও কমও হতে পারে। এই সবকিছুর সঙ্গে যেটা সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য অ্যাডজাস্ট করেছে। এ ছাড়া অন্য যেসব জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি একটা খারাপ পর্যায়ে আছে। সেটা আগস্টে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেপ্টেম্বরে এটা ৯-এর ওপরে ৯ দশমিক ১ হয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা অনেকবার বলেছি। আমাদের গবেষণায়ও দেখেছি যে, মূল্যস্ফীতি এটাকে বলি আমরা হেডলাইনি ইনফ্লেশন। এটা গড়, এটা সবার ওপর কিন্তু ইনফ্লেশনটা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরির মানুষের ওপর ইনফ্লেশনের প্রভাব আলাদা। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিন্তু অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষ হয়তো ১২ শতাংশ ফিল করছে। আমি হয়তো ৯ শতাংশ করছি; আরেকজন হয়তো ৭ শতাংশ ফিল করছে। কারণ এটা কনজামশন বাস্কেটের ওপর নির্ভর করে আপনি কোন জিনিসগুলো খাচ্ছেন, সেই জিনিসগুলোর দাম কেমন বেড়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের আঘাত তো আছেই। দ্বিতীয় হচ্ছে যে করোনাভাইরাস-পরবর্তী যেই ধরনের রিকভারির কথা ছিল; যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেগুলো কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতির ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলোর মধ্যে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেহেতু বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় বেড়েছে; তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরেও প্রভাব পড়েছে। তৃতীয় আরেকটি জিনিস আমাদের সবকিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার, ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার। ডলারের মুদ্রা বিনিময় হার একটি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে একটি বড় প্রভাব পড়েছে। আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। ডলারের যে ব্যবস্থাপনা, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। তারা আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারেছে না তারা কী করবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যদিও পুরোপুরি মার্কেটের ওপর ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশের হাতে। যেহেতু আমাদের একটি বড় অংশ ফাটকাবাজারিতে লিপ্ত হয়ে যাই; আমাদের প্রতিষ্ঠানের ম্যাকানিজমগুলো এতটা শক্তিশালী না। সেদিক থেকে পুরোপুরি যদি আমরা মার্কেটের ওপর ছেড়ে দিই ফল আরও খারাপ হবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভর করছিল। সেটা আরও খারাপ হয়েছে। তারা তিনটি রেট প্রপোজ করেছে। একটি রেমিটারদের জন্য, একটি এক্সপোর্টারদের জন্য আর একটি ইম্পোর্টারদের জন্য। আরও একটি আছে সাধারণ মানুষের জন্য। এখন এ ধরনের মাল্টিপোল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। এ ছাড়া ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এটা আসলে ভালো ভূমিকা রাখে না। একটি বিনিময় হারে অবশ্যই আসতে হবে। আর এই সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব স্ট্রংলি নিতে হবে।
এটা খুব দুঃখজনক হলেও সতি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে অতীতেও দেখা গেছে। পলিসি রেটখ্যাত সুদের হার ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারপর এক্সচেঞ্জ রেট কীভাবে হবে সেটাও ব্যাংকাররা সাজেস্ট করছে। তারা হচ্ছে এন্ড ইউজার, আর এই ইউজারের ওপর যদি আমি ছেড়ে দিই পলিসি মেকিং তার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আমি আশা করব যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সঠিক এবং শক্ত অবস্থান নেবে। যেটা সঠিক হওয়া দরকার, সেটাই নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলবে। কিন্তু আমাদের একটি ইউনিফাইড এক্সচেঞ্জ রেট লাগবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কি ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সঠিক কাজটি করছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
আমি তো বললাম যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব আছে। আমরা অনেক আগে থেকেই বলেছি যে, মুদ্রা সংকট যখন তৈরি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে ব্যবস্থাপনা করে আসছে। বিশেষ করে ৪, ৫, ১০ বছর ধরে সেটা তো তারা মেইনটেইন করতে পারবে না। ক্রাইসিস না থাকলে এই ধরনের এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করা যেতে পারে। এতদিন তো প্রায় ফিক্সড ছিল। আসলে এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সময়ে সময়ে ছাড় দেয়া দরকার ছিল। সেটা না করার ফলে যখন ক্রাইসিস দেখা গেল, রিজার্ভকে ধরে রাখার কথা এল, তখন এক্সচেঞ্জ রেটকে এই লেভেলের ডেপ্রিসিয়েট না করে তাদের উপায় ছিল না। এখন করার পরও দেখা গেল মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংক যা রেট বলছে, সেই রেট ফলো হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি যে কন্ট্রোল ব্যাংকগুলোর ওপরে সেটার দুর্বলতা দেখা গেল। অনেক ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করেছে এই এক্সচেঞ্জ রেট দিয়ে। ইভেন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর কোনো কন্ট্রোল আছে বলে আমার মনে হয় না।
এটি অনেক দিনের পুঞ্জীভূত একটি সমস্য। একটি সংকটের মুখে তাদের পক্ষে এটি ব্যবস্থাপনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ফলে প্রপার এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট করা, প্রপার মনিটরি পলিসি ফর্মুলেশনের জন্য যে সক্ষমতা দরকার সেটা নতুন করে তো আর এখন বিল্ডআপ করা যাবে না। এখন দরকার হচ্ছে তারা প্রয়োজনে যাদের কাছ থেকে সাজেশন নেয়া দরকার বা তাদের নিজেদের যে এক্সপার্টেজ আছে সেগুলো ডেভেলপ করে, আমি মনে করি সেন্ট্রাল ব্যাংকের নিজ যোগ্যতায় নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এটি ব্যাংকারদের ওপর একদমই ছেড়ে দেয়া উচিত না। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে আসলে। আমরা এই মুহূর্তে দেখছি, ব্যবসায়ীদের চাপে হোক, যেকোনো কারণেই হোক, সুদের হার আসলে যেভাবে ফিক্স করে রাখা হয়েছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই ডিজায়ারেবল না। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির অবস্থা খারাপ। দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার সুদের হারকে ফিক্সড করে বিনিয়োগকে সুবিধা দিয়ে কার লাভ হবে।
জনগণ যখন খারাপ অবস্থায় থাকে, মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন এমপ্লয়মেন্ট রেটও বাড়তে থাকে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ফিন্যান্স ডিভিশনের একটি ভূমিকা থাকা উচিত, এক্সপার্টদেরও ভূমিকা থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে যে, আমাদের এক্সপার্টদের মধ্যে অপিনিয়নগুলো এত বিভেদমূলক এবং এতভাবে তারা দ্বিমত পোষণ করেন যে, তাদের মতামত নিয়েও যে সেন্ট্রাল ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবে, সেটা নিয়েও সমস্য। তর পরও আমি মনে করি ডায়লগটা হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ডায়লগ করা, সেখান থেকে তারা যেটা ভালো মনে করে সেটা তারা নিতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো অর্থনীতিবিদের কথার ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার তো কোনো দরকার নেই।
সরকার বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে। সেটা কি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারটা (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গেল। এই কোয়ার্টার দেখে বলা খুব কঠিন যে, বাংলাদেশে এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কী হবে। আমি মনে করি যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির প্রক্ষেপণ আরও রিভিশন হবে। তারা ছয় মাস পর বলবে যে আরও কমে যাবে, নয় মাস পর বলতে পারে অন্য কথা। আমাদের এক কোয়ার্টার পার হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে আমাদের বলা হয়েছে যে এই তিন মাসের মতো করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে বছর শেষে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু আমরা এই অবস্থায় চলতে পারব কি না, সেটা নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর।
তবে আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটার দিকে বেশি মনোযোগ না দিয়ে মূল্যস্ফীতি কীভাবে আমরা সহনীয় রাখতে পারি, সেটা নিয়েই সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশি কাজ করা উচিত। আমার মনে হয়, এটাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাজারে গেলে দেখতে পাই যে, জিনিসপত্রের মূল্য কীভাবে আকাশচুম্বী ধারণ করছে, সেদিক থেকে সরকারের অনেকগুলো করণীয় আছে। একটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানো বা সহনীয় করার জন্য পলিসিগত কিছু দ্রুত করা দরকার। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যেগুলো নিয়েছে সুদের হার বাড়ানো, ইম্পোর্ট কিছুটা কমানো, এর বাইরে ফিসক্যাল কিছু মেজার আছে। যেমন- জনগণকে সহায়তা দেয়া। বর্তমানে এক কোটি লোককে ১৫ টাকা দরে চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো। যেটাকে আমরা বলি ফিসক্যাল ট্রান্সফার; এ ছাড়া ওপেন মার্কেট সেলস আরও বেশি পরিমাণে বাড়াতে হবে। টিসিবির মাধ্যমে যেটা দেয়া হয়, সেটা যথেষ্ট না। সেটা যদি আরও বেশি আকারে বাড়ানো হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ আরও বেশি আকারে মূল্যস্ফীতির আঘাতটিকে সয়ে যেতে পারবে।
দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে- যাদের ফিক্সড সেলারি, তাদের কাছ থেকে কিন্তু দাবি আসা শুরু হয়েছে যেন তাদের বেতনটা বাড়ানো হয় এবং সেটা হয়তো করতে হতে পারে সামনে। যাদের একটি স্থির আয় আছে বা নিম্ন আয় আছে, তাদের পক্ষে কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে মোকাবিলা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই কাজগুলো করতে গেলে সরকারের কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাবে। ব্যয় যদি বাড়ানো হয়, সে ক্ষেত্রে জিডিপি গ্রোথ হয়তো আরেকটু কম হতে পারে। সেটাও মন্দ হয় না। যদি আমাদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলেও ভালো বলে আমি মনে করি। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর পলিসিগত পদক্ষেপগুলো যথাযথ হওয়া দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যাতে সাধারণ জনগণকে বিপদে ফেলতে না পারে সরকারের দায়িত্ব সাধারণ জনগণকে সহায়তা দেয়া। সেটা পণ্য দিয়েও হতে পারে অথবা টাকা দিয়েও হতে পারে।
আরেকটি হচ্ছে যাদের সেলারি ফিক্সড তাদের সেলারি রিভাইস করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বেড়ে যাবে। অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে পারে। এটি একটি জটিল পরিস্থিতি, ম্যানেজ করার মতো, ব্যালান্স করার মতো ক্যাপাসিটি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতটুকু আছে আমরা জানি না। এতদিন আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস স্টাবিলিটি খুব ভালো ছিল। ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হয়নি। আগে এ রকম কোনো বৈশ্বিক সংকটের মোকাবিলা আমরা করিনি। এই ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য সব ধরনের ব্যালান্স করে আমরা এগোতে পারি কি না। সেটা এখন দেখার বিষয়।
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আগের মতো যদি দেশে হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়, তাহলে এই সংকটের সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সেই আশঙ্কা আছে। তবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। যাতে আমরা সবাই মিলে একভাবে সেটা মোকাবিলা করতে পারি। জনগণের যাতে ক্ষতি না হয়। জনগণের কল্যাণ যাতে ব্যাহত না হয়, সবার এ বিষয়ে একমত হওয়া উচিত। এমন কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন নেয়া ঠিক হবে না ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের’ মতো অবস্থা হয়। সেদিক থেকে সরকার এবং বিরোধী দল যারা আছে আমাদের আশা থাকবে তারা কিছু জাতীয় ইস্যুতে একমত হয়ে এই সময়টা পার করবেন, যাতে সব ধরনের একটি স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কীভাবে এই সময়টা পার করা যায়, কারণ আমরা একটি বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে আছি। আবার যদি দেশীয় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।
ডলারসংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি এই সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কিন্তু আলোচনার বিষয়টি পুরোপুরি অনুপস্থিত। আলোচনা করতে তো অসুবিধা নেই। সিদ্ধান্ত আপনারাই নেন। আপনি আলোচনার টেবিলে সবাইকে নিয়ে আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচন করেন। কারণ সংকটকালীন সময়টা সাধারণ সময় থেকে আলাদা। সুতরাং সেই সময়টাকে ম্যানেজ করতে হলে দূরদর্শিতার সঙ্গে করতে হবে।
আমাদের দেশে রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের দেশে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের মতো গভর্নরের মতো গভর্নর হয়তো নেই। আমাদের যে রিসোর্স আছেন। সেন্ট্রাল ব্যাংকে যদি না থাকে বাইরে যারা আছেন তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তাই বলে শুধু ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সিদ্ধান্ত নেয়াটা যৌক্তিক না। পার্সোনালি যদি কারও সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে সেটা যথেষ্ট নয়। মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত, আসলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে সে বিষয়ে। যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, সেখানে পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এটা হচ্ছে এক দিকের কথা। এর বাইরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখছি, আমাদের আমদানি বাড়ছে আবার কমছে- এগুলো নির্ভর করছে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরে। আমরা একটিমাত্র পণ্য রপ্তানি করি, সেটাও পশ্চিমাদের সঙ্গে। পশ্চিমারা কিন্তু একটি যুদ্ধের মধ্যে আছে। সেটা হয়তো তারা সামাল দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি ধসে যাবে যদি আমাদের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি, প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন করতে পারিনি।
সামনের দিনগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
সামনের দিনগুলো কেমন হবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপরে। যুদ্ধ যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে চলে যায়, তাহলে তো কথাই নেই। খুবই অবস্থা খারাপ। আর এটা বর্তমান অবস্থায় যদি লিংগার করতে থাকে এবং সামনে শীত আসছে সামনে ইউরোপকে যদি রাশিয়া গ্যাস তেল বন্ধ করে দেয়, সেখানে ইউরোপে একটি সংকট তৈরি হতে পারে। এই সংকটের চাপ কিন্তু আমাদের দিকে লাগবে। পোশাক রপ্তানির একটি বড় মার্কেট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ওপেক বলছে, তেলের দাম কমিয়ে দেবে। তেলেন দাম বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা আছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব একটি আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখছি না।
আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। এই যে আপনি অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ, সংকট বা চাপের কথাগুলো বলছেন। এগুলো মোকাবিলা করতে এই মুহূর্তে আমাদের কী কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। দুটিই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকঋণের সুদের হার যেটা এখন ৯ শতাংশ বেঁধে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সেটা ১২ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আর আমানতের সুদের হার যেটা ৬ শতাংশ আছে, সেটা ৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি সরাসরি বলতে চাই, নয়-ছয় সুদের হার থেকে বারো-নয় সুদের হার বেঁধে দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরামর্শ বলেন আর দাবিই বলেন- এ বিষয়টি আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছি।
এখানে একটি বিষয় আলোচনায় আসতে পারে যে, নয়-ছয় সুদের হার তো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে করা হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখনকার পেক্ষাপট আর এখনকার পেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। তখন দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের নিচে। আর এখন ৯ শতাংশের ওপর।
এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলা হয়েছিল সুদের হার নয়-ছয় থাকলে ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যদি এটা বোঝানো যায় যে, এটা বাড়ালেও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং বড় অংশে দেশের জন্য ভালো হবে। তাহলে নিশ্চয় সেটা উনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন না, ওনার বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বা যারা পলিসি মেকার আছেন, তাদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তগুলো যাতে তথ্যনির্ভর হয়, তখন ওনাকে বোঝানো গেলে তাহলে ওনার পক্ষে হয়তো সিদ্ধান্ত ভালোভাবে দেয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ ধরনের একটি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের জায়গাটা চিন্তা করবেন এবং অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখানে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আরও একটি অনুরোধ করব। এই কঠিন সংকট মোকাবিলার জন্য তিনি একটি হাই প্রোফাইল কমিটি তৈরি করবেন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। এটা মন্ত্রিপর্যায়ে হতে পারে, সচিব পর্যায়ে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা সেখানে থাকতে পারেন, ব্যবসায়ীরা থাকতে পারেন। এটি হয়তো ভালো কাজ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে হতে পারে। সেটা যদি হয় আরও ভালো হবে। সেই কমিটির পরামর্শে সংকট মোকাবিলায় সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী বসতে পারেন। কারণ তারা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে যদি দেশের অবস্থা খারাপ করে ফেলে তাহলে তো সমস্যা আরও বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে তো কাজ আছেই। আমরা অর্থনীতিবিদরা তো শুধু বলতে পারি কী করতে হবে, দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্তটাও সরকারকেই নিতে হবে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আরো ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নিলামের মাধ্যমে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে এই অর্থ কেনা হয়েছে।
জানা গেছে, এর আগে গত সপ্তাহেও দুই দিনে একই দরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে মোট ১২০ মিলিয়ন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত বাজার থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে এই ডলার কেনার ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও স্থানীয় মুদ্রার (টাকা) তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে এই ডলার কেনার পর বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে।
দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাসে ঈদুল আযহা সামনে রেখে প্রবাসীরা আগেভাগেই দেশে অর্থ পাঠাতে শুরু করেছেন। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই ধারাবাহিকতায় চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনেই দেশে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মাস শেষে প্রবাসী আয় তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানিয়েছেন।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদ উপলক্ষে কোরবানির পশু কেনা এবং পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম ১৯ দিনে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২১২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭০ পয়সা ধরে) এর পরিমাণ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এর আগে মার্চ মাসে দেশে এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, যা একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এই অঙ্ক ছিল ৩০২ কোটি বা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে দুই হাজার ৮৩৪ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরে এই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) প্রাঙ্গণে এক সৌজন্য সফরে এসেছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাইকমিশনার ডা. রাজীব রঞ্জন। গত রোববার আয়োজিত এই বিশেষ সভায় তিনি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বিকাশে ভারতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতা বিনিময়ের বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
উক্ত অনুষ্ঠানে সিএসই’র চেয়ারম্যান এ. কে. এম. হাবিবুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. সাইফুর রহমান মজুমদারসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম, শাহজাদা মাহমুদ চৌধুরী ও নাজনীন সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। সভার এক পর্যায়ে সিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাজারের বহুমুখীকরণ এবং বিশেষ করে ‘ডেরিভেটিভস মার্কেট’ ও ‘মাল্টি অ্যাসেট ক্লাস এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভারতের সফল অভিজ্ঞতা ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। তিনি ভারতীয় বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারদের বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বাজারে বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান জানান।
প্রতিনিধি দলের প্রধান ডা. রাজীব রঞ্জন তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘পুঁজিবাজার বিষয়ে ভারতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আগ্রহী। যৌথ কারিগরি সেশন ও নলেজ ট্রান্সফার প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশেষত কমোডিটি ডেরিভেটিভস খাতে ভারতের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের আর্থিক বাজারকে আরও উন্নত করতে পারে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ‘মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়া (এমসিএক্স) এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া (এসইবিআই)-এর সফল মডেলটি সিএসই’র জন্য একটি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে।’ রাজীব রঞ্জনের মতে, ভারত বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং একটি প্রকৃত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে গণ্য করে এবং দ্বিপাক্ষিক এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও নিবিড় হবে।
সিএসই’র চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ভারতের সহকারী হাইকমিশনারকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মতামতের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং দুই দেশের আর্থিক খাতের এই মেলবন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। একটি গণমাধ্যম এই সংবাদের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক অভিনব পডকাস্ট সিরিজ চালু করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের এই দূরদর্শী পদক্ষেপটি মূলত এই খাতের সার্বিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তারকারী নানাবিধ বিষয় নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার একটি অনন্য প্রয়াস। এই ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের অপার সম্ভাবনা ও সত্যনিষ্ঠ চিত্র প্রতিফলিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই ব্যতিক্রমী পডকাস্ট আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, সফল ব্যবসায়ী, শীর্ষ ব্যাংকার ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের সুচিন্তিত মতামত ও প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ও এর সম্ভাব্য বহুমাত্রিক প্রভাব, মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং শিল্প প্রবৃদ্ধির ধারা অক্ষুণ্ণ রাখার মতো সমসাময়িক ও জটিল বিষয়গুলো। এই তথ্যবহুল পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশের বাণিজ্য, ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুশাসনে আরও বিজ্ঞানসম্মত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে নীতিনির্ধারকদের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে।
জাতীয় অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে অপরিসীম অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রায়শই তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে সমাজে নানারকম ভুল ধারণা ও অপপ্রচার ছড়ানো হয়। বিজিএমইএ-র এই যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মটি তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে সেইসব অসত্য বয়ান দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠনের পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, পোশাক শিল্পের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ এবং তা মোকাবিলায় কার্যকর কর্মকৌশল নির্ধারণে এই পডকাস্ট সিরিজটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরও মনে করেন যে, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের সামগ্রিক ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত হবে।
পরিবর্তনশীল বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এই ক্ষণে বিজিএমইএ-র এই পডকাস্ট সিরিজ জ্ঞান ও নীতি-নির্ধারণী সংলাপ বিনিময়ের এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এরই মধ্যে অনুষ্ঠানটির দুটি আকর্ষণীয় পর্ব প্রচারিত হয়েছে এবং আরও বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় পর্ব অতি শীঘ্রই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। পডকাস্টের এই পর্বগুলো বিজিএমইএ-র নিজস্ব ডিজিটাল মাধ্যমসহ ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত সম্প্রচার করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছে। নিয়মিত নতুন পর্বগুলোর হালনাগাদ তথ্য জানতে সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
জাতীয় বিনিয়োগ কাঠামোকে আরও সংহত ও যুগোপযোগী করতে এক বড় ধরণের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে সরকার। এর ফলে বর্তমানের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠান— বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনিক এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমগুলোকে একটি একক ছাতার নিচে এনে বিনিয়োগ সেবা প্রদানকে আরও সহজতর ও ফলপ্রসূ করা। সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত সংস্থাগুলোকে একীভূত করে ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে একটি নতুন ও বৃহৎ জাতীয় দপ্তর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারি এই পদক্ষেপের ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদান আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মূলত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতেই এই সমন্বিত প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা’ গঠিত হলে শিল্প স্থাপন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্পদ ও জনবলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।
দেশের জ্বালানি তেলের ঘাটতি কাটাতে আরও পাঁচটি জাহাজ দেশে আসছে। গত সপ্তাহে যেখানে ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এসেছে, সেখানে চলতি সপ্তাহেই ১ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেল ও ৩২ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে এসব জাহাজ আসছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে ওমান থেকে ৩৫ হাজার টন এবং দুপুরে মালয়েশিয়া থেকে ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে গোল্ডেন হরাইজন ও এফপিএমসি। এ ছাড়া বিকেলে ভারত থেকে আরও ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে প্যাসিফিক ইনডিগো বন্দরে ভিড়ার কথা রয়েছে।
জাহাজগুলোর লোকাল এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইনের প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম জানান, "দেশে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি মাথায় রেখে দ্রুততম সময়ে তেল খালাসের বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আগে থেকে লাইটার জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জাহাজ এসে ভেড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেল খালাস শুরু করে দেওয়া হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "গত শুক্রবার ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে চারটি জাহাজ এসে ভিড়েছিল।" এসব জাহাজের তেল খালাস কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে আজ যুক্ত হচ্ছে ১.০১ লাখ টন জ্বালানি তেল বহনকারী আরও তিনটি জাহাজ।
আগামী তিন দিনের মধ্যে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ৩২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে হাফনিয়া চিতা দেশে পৌঁছাবে। এরপর বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ৩২ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে আসবে জিং টং ৭৯৯।
আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে উত্তেজনার প্রভাবে স্বর্ণের মূল্যে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স-এর তথ্যানুসারে, সোমবার দিনের শুরুতে স্পট স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ‘৪ হাজার ৮০৯ দশমিক ৭১ ডলারে’ দাঁড়িয়েছে, যা গত ১৩ এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন। একইসাথে মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার দরও ১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ‘৪ হাজার ৮২৯ দশমিক ৪০ ডলারে’ নেমেছে। বাজার বিশ্লেষক ইলিয়া স্পিভাক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, “গত সপ্তাহে বাজার যে মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল, তা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্বর্ণের দাম কমেছে। এর ফলে আবারও ‘যুদ্ধকালীন বাণিজ্য’ পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।” মূলত অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় মার্কিন ডলার এবং বন্ড ইল্ড—উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। ডলার সূচক শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে স্বর্ণ এখন বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ায় হরমুজ প্রণালীতে নৌ-যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজার ও শেয়ারবাজারে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি জাহাজ আটক করার পর তেহরান থেকে প্রতিশোধের হুমকি আসায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে ওসিবিসির কৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওং মন্তব্য করেছেন, “স্বর্ণের দিকনির্দেশনা এখন বৈশ্বিক ঝুঁকির পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনার অগ্রগতি এর ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।” উল্লেখ্য যে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই সংঘাতের প্রভাবে স্বর্ণের দাম এরই মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, কারণ উচ্চ সুদের হার এই মূল্যবান ধাতুর বিনিয়োগ আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।
বিশ্ববাজারে মূল্যের এই নিম্নমুখী ধারার ফলে দেশের বাজারেও স্বর্ণ ও রুপার দাম কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা যায় যে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেকোনো সময় অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে। বর্তমানে দেশে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ‘২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা’ নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ‘২ লাখ ৩৮ হাজার ৮২০ টাকা’ এবং ১৮ ক্যারেটের ভরি ‘২ লাখ ৪ হাজার ৭০৩ টাকায়’ কেনাবেচা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণের পাশাপাশি রুপা ও প্যালাডিয়ামের দামেও পতন দেখা গেছে; স্পট সিলভারের দাম কমে প্রতি আউন্স ‘৮০ দশমিক ৩৬ ডলারে’ ঠেকেছে।
জ্বালানি তেলের সুষম বণ্টন ও বিপণন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে সরকারি উদ্যোগে তৈরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ফুয়েল পাস বিডি’র নিবন্ধন কার্যক্রম আরও ১৯টি জেলায় উন্মুক্ত করা হয়েছে। সোমবার ২০ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বার্তার মাধ্যমে এই সম্প্রসারণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বর্তমান অস্থির পরিস্থিতির মাঝে তেলের যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এই উদ্ভাবনী পাইলট কর্মসূচিটি হাতে নিয়েছে। নতুন করে এই সুবিধার আওতায় আসা জেলাগুলোর তালিকায় রয়েছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহের মতো প্রধান প্রধান মহানগরী ও বিভাগীয় অঞ্চলে এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের কাছে সুশৃঙ্খলভাবে জ্বালানি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে সকল জেলাতেই ফুয়েল পাস ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। সরকারি এই ডিজিটাল পদক্ষেপটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সংস্কারে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার দরপতনের ধারা অব্যাহত ছিল। অধিকাংশ শেয়ার ও ইউনিটের মূল্য হ্রাস পাওয়ার ফলে এক্সচেঞ্জটির প্রতিটি মূল্যসূচকই নিম্নমুখী হয়েছে। তবে বাজারে উল্লেখযোগ্য বিক্রয় আদেশের সমান্তরালে বেশ কিছু সিকিউরিটিজে মানসম্মত ক্রয় চাহিদাও বজায় ছিল, যার প্রভাবে সার্বিক লেনদেনের পরিমাণ গত কার্যদিবসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সোমবার সকালের দিকে বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সময়ের সাথে সাথে শেয়ার বিক্রির চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দুপুর নাগাদ দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন নিশ্চিত হয়।
ডিএসইতে এদিন ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০৭টিরই দরপতন ঘটেছে এবং মাত্র ১২০টির দাম বেড়েছে; বাকি ৬২টির দাম ছিল অপরিবর্তিত। ফলস্বরূপ, প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৫ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৩২ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। এছাড়া শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬০ পয়েন্টে এবং বাছাইকৃত ডিএস-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট হারিয়ে ১ হাজার ৯৮০ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন ডিএসইতে মোট ৮২৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বেশি।
অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের পতন লক্ষ করা গেছে। বাজারটির সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ২৮ পয়েন্ট হারিয়ে ১৪ হাজার ৭২৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সেখানে লেনদেন হওয়া ১৯২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯০টির দর কমেছে এবং ৮১টির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসাথে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ গত দিনের তুলনায় কমে ৩৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাজারের এই মিশ্র প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতার আভাস দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও টেক্সটাইল খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে আঙ্কারা যাবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রতিনিধি দল। রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, পরিচালক ফয়সাল সামাদ ও পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তুরস্ক দূতাবাসের কমার্সিয়াল কাউন্সেলরও বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন দিক নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। তুরস্কের রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দ্রুত বিজিএমইএ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল তুরস্ক সফরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিজিএমইএ সভাপতি এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "পণ্য বহুমুখীকরণে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বাজার এবং এই সফর দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতায় নতুন গতি সঞ্চার করবে।" তিনি বাংলাদেশের ম্যান-মেড ফাইবার ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্কের শক্তিশালী রিফাইনিং সক্ষমতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী কাঁচামাল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈঠকে ২০১১ সাল থেকে কার্যকর ‘সেফগার্ড ডিউটি’ প্রত্যাহার এবং একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়।
তুরস্ক থেকে আমদানি করা তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কারিগরি বিষয়গুলো নিয়েও মতবিনিময় হয়। এ প্রেক্ষিতে বিজিএমইএ তুরস্কের অর্গানিক কটন ও আধুনিক টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। বৈঠকে তুর্কি এয়ারলাইন্স এবং ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের উন্নত লজিস্টিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনাও আলোচিত হয়। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে তুরস্কের সহযোগিতা কামনা করেন বিজিএমইএ সভাপতি।
বিজিএমইএ’র অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক খাতে কর্মরত মার্চেন্ডাইজারদের জন্য তুরস্কের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বৈঠকে আশা প্রকাশ করা হয়, তুরস্কের সঙ্গে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন দীর্ঘ ১৭ বছর পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ নির্বাচনে ‘খ’ প্যানেলের প্রার্থী হাসেন আলী সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি হরিণ প্রতীক নিয়ে এক হাজার ৪১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ক’ প্যানেলের খন্দকার মিজানুর রহমান ক্রিকেট ব্যাট প্রতীকে এক হাজার ২৬ ভোট পেয়েছেন।
সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চেম্বার ভবনে ভোটগ্রহণ চলে এবং গণনা শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন ফলাফল ঘোষণা করেন।
নির্বাচনে ‘খ’ প্যানেলে অংশ নেন বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ‘ক’ প্যানেলের ২১টি পদের মধ্যে বিএনপিপন্থি নয় জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন এবং জামায়াতপন্থি ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটের ফলাফলে ১১টি পদে জয়ী হয় ‘ক’ প্যানেল এবং ‘খ’ প্যানেল পায় ১০টি পদ।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে ‘ক’ প্যানেলের শামসুর রহমান শান্তন ঘুড়ি প্রতীকে এক হাজার ১৭০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সহ-সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন ‘খ’ প্যানেলের জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যিনি চশমা প্রতীকে এক হাজার ৭৫ ভোট পেয়েছেন।
পরিচালনা পর্ষদের ১৮টি পরিচালকের মধ্যে ১০টি পদ পেয়েছে ‘ক’ প্যানেল এবং ৮টি পদ গেছে ‘খ’ প্যানেলের দখলে। ‘ক’ প্যানেল থেকে নির্বাচিতরা হলেন রেজাউল করিম, শাহ মো. মাইনুল হোসেন শান্ত চৌধুরী, হাসিবুল আলম, ইমাম মেহেদী, আহসান হাবীব, শাকিলুর রহমান, মো. কামরুজ্জামান, রুহুল আমীন, ফরহাদ হোসেন এবং মোবাশ্বের আলী।
অন্যদিকে ‘খ’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত পরিচালকরা হলেন তৌহিদ হাসান, মাইনুল হক, মো. শামসুজ্জামান, তাসনিম হোসেন, গোলাম সাকলাইন, এ জে এম জান্নাতুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম এবং মাহমুদ হাসান।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরিফ হোসেন জানান, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ২ হাজার ৯০০ জন এবং তাদের মধ্যে ২ হাজার ৪৩৪ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং দীর্ঘদিন পর নির্বাচন হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে।
ভারত থেকে ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুর তেল ডিপোতে এসে পৌঁছেছে আরো ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল।
আজ রবিবার দুপুরে এর তথ্য নিশ্চিত করেন পার্বতীপুর রেল তেল ডিপোর মেঘনা পেট্রোলিয়াম কম্পানির ম্যানেজার।
এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রেল হেড তেল ডিপোতে তেল এসে পৌঁছায়।
তারও আগে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পার্বতীপুর রিসিপ্ট টার্মিনালে ডিজেল সরবরাহের পাম্পিং কার্যক্রম শুরু হয়।
জানা গেছে, চলতি এপ্রিল মাসে মোট চারটি চালানের মাধ্যমে ভারত থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি আনার কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত ১১ এপ্রিল ৮ হাজার মেট্রিক টন এবং ১৮ এপ্রিল শনিবার ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসেছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত চারটি চালানে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এসেছে।
ভারতের আসামে অবস্থিত নুমালিগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে পাইপলাইনে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রেলহেড ওয়েল ডিপোতে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের রিসিপ্ট টার্মিনালে এ ডিজেল পৌঁছায়।
এরপর সেখান থেকে রিসিপ্ট টার্মিনাল থেকে জ্বালানি রেলহেড অয়েল ডিপোর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিন কম্পানিতে সরবরাহ করা হয়।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী ভারত আগামী ১৫ বছর ডিজেল সরবরাহ করবে এবং বছরে ২ থেকে ৩ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করা যাবে। পরে ব্যবহার, খরচ ও চাহিদা অনুযায়ী আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হবে। এই পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন তেল ভারত থেকে আমদানি করা সম্ভব বলেও বিপিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগে খুলনা ও চট্টগ্রাম থেকে রেল ওয়াগনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে তেল আসতে সময় লাগতো ৬ থেকে ৭ দিন।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট যেন ব্যবসায়ীদের জন্য ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে বরং ‘সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ হয়—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের প্রেক্ষাপটে করজাল সম্প্রসারণ ও ব্যবসা সহজীকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এমসিসিআই এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
সেমিনারের স্বাগত বক্তব্যে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের বিনীত প্রত্যাশা– আসন্ন জাতীয় বাজেটটি যেন ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে বরং ‘সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ হয়।”
সেমিনারে তিনি বাজেট প্রণয়নে ছয়টি নির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন, যার মধ্যে করজাল সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, করপোরেট কর হ্রাস, ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল চালু, পিএসআর ও আইনি অসংগতি দূরীকরণ, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং এসএমই খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
করজাল সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে কামরান টি রহমান বলেন, দেশে এক কোটির বেশি ‘টিআইএন’ থাকলেও অর্ধেকেরও কম করদাতা রিটার্ন জমা দেন। এনআইডি ও টিআইএন ডেটাবেজ সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, নতুন করদাতাদের ভীতি কমাতে বছরে মাত্র ১০০ বা ১ হাজার টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ নির্ধারণ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজে রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
করপোরেট কর বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, করহার কমানো হলেও ‘নগদ লেনদেনের’ কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থনীতির বাস্তবতায় এই শর্ত বাতিলের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরও ২.৫ শতাংশ কমানোর দাবি জানান তিনি।
সেমিনারে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। আগামী বাজেটে অতিরিক্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তা বিদ্যমান করদাতাদের জন্য হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘যখনই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়, তখন যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এতে নতুন করদাতারা কর দিতে নিরুৎসাহিত হন।’ ২০০৯ সাল থেকে ভ্যাট সংগ্রহে ‘ইসিআর বা ফিসক্যাল’ ডিভাইস ব্যবহারের কথা থাকলেও গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সেমিনারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া, নিউএইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম এবং ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন। বক্তারা প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস করতে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থায় একটি সমন্বিত ‘ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল’ চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।