পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার একটি বন্ড অনুমোদন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গতকাল মঙ্গলবার সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৮৯০তম কমিশন সভায় এ বন্ডটির অনুমোদন দেওয়া হয়। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আলোচ্য বন্ডটির বৈশিষ্ট্য হবে মুদারাবা ফ্লোটিং রেট, নন-কনভার্টিবেল, আনসিকিউরিড সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড। এর প্রধান বেশিষ্ট্য হবে নন-কনভার্টিবেল, অর্থাৎ এ বন্ডের কোনো অংশ শেয়ারে রূপান্তরিত হবে না। বন্ডটির কুপন রেট তথা সুদ হার হবে ৬ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। এটি প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও উচ্চ সম্পদশালী একক ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বরাদ্দ করা হবে। এর প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য হবে ১০ লাখ টাকা। এ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ব্যাংকটি তার টিয়ার-২ মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করবে।
আলোচিত বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ডিবিএইচ ফিন্যান্স। আর এর অ্যারেঞ্জারের হিসেবে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। বন্ডটিকে স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্তারোপ করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের মে মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে ব্যাংকটি জানিয়েছিল, তাদের পর্ষদ সভায় নন-কনভার্টিবেল, আনসিকিউরিড, ফুললি রিডিমেবল ফ্লোটিং রেটবিশিষ্ট ‘এসজেআইবিএল থার্ড মুদারাবা সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড’ ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এ বন্ড ইস্যু করে ব্যাসেল-থ্রি এর অধীনে থাকা তাদের ব্যাংকের টিয়ার-২ মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করা হবে। বন্ডটির মেয়াদকাল হবে ৭ বছর, যা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে নীতিমাল অনুসরণ করে এ বন্ডটি ইস্যু করার কথা জানানো হয় তখন। এরই মধ্যে এ বন্ড ইস্যুর জন্য বিএসইসির অনুমোদন পেল এসজেআইবিএল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত করেনি ব্যাংকটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রোববার দেশটির কর্তৃপক্ষ মূলত অধিক পরিমাণ পেট্রোল ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের প্রচলিত জ্বালানি নীতি অনুযায়ী পেট্রোলের দাম তিনটি স্তরে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে একজন গ্রাহক প্রতি মাসে প্রথম ৬০ লিটার ব্যবহারের জন্য প্রতি লিটারে ১,৫০০ তোমান এবং পরবর্তী ৫০ লিটারের জন্য ৩,০০০ তোমান পরিশোধ করেন। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগে প্রতি লিটারে ৫,০০০ তোমান দিতে হলেও এখন থেকে তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, তোমান হলো ইরানে ব্যবহৃত একটি অনানুষ্ঠানিক মুদ্রা একক, যা ১০ ইরানি রিয়ালের সমান।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক বিবৃতিতে জানান, "তৃতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম দ্বিগুণ করে প্রতি লিটার ১০ হাজার তোমান করা হবে।" এই নতুন দাম স্থানীয় সময় ৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে মোহাজেরানি আরও স্পষ্ট করে বলেন, "বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে বিভিন্ন দামের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে শেষ পর্যন্ত প্রতি লিটারে ১০ হাজার তোমান দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।" তবে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ইরানে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক কম। সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করে আসছে, যা দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে পরিচিত। পেট্রোলের দাম বাড়ানোর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মানে রেকর্ড দরপতন হয়েছে। গত রোববার কালোবাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে একটি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে এই হার ছিল প্রায় ১৭ লাখ রিয়াল।
ইরানের ওপর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ঘোষিত 'অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ' নীতির অংশ হিসেবে তেহরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানের আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে আনা। এই নতুন পদক্ষেপগুলো মূলত ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞারই ধারাবাহিকতা। ইরান যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করতে না পারে, সেজন্য দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দ্বিমুখী চাপে ইরানের অর্থনীতি এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (বিটিটিএফ) ২০২৬’। দেশের পর্যটন শিল্পের প্রসার এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এই মেলার আয়োজন করছে। আয়োজকরা আশা করছেন যে এবারের আসরে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিস্তারিত তুলে ধরেন টোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ। তিনি জানান, ইতোমধ্যে নেপাল, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ এবং ফিলিপাইনের পর্যটন প্রতিনিধিরা মেলায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবসহ আরও বেশ কিছু দেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের আয়োজনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রধান পৃষ্ঠপোষক বা টাইটেল স্পন্সর হিসেবে যুক্ত থাকছে।
মেলায় মোট চারটি হলের অধীনে ২০০টিরও বেশি বুথ ও স্টলে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স, হোটেল, ট্যুর অপারেটর এবং পর্যটন বোর্ডগুলো তাদের আকর্ষণীয় অফার ও সেবা তুলে ধরবে। টোয়াব সভাপতির তথ্যমতে, মেলায় ২২০টিরও বেশি প্রদর্শক প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে এবং প্রায় ৬০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আড়াই হাজার বাণিজ্যিক প্রতিনিধি এবং ২৫০ জন বায়ারের উপস্থিতিতে মেলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ নেবে।
মোহাম্মদ হানিফ তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিটিটিএফ গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন বাজারে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই মেলার মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি পাবে, তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কিং এবং অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। মেলাটি আয়োজনে সহযোগিতা করছে পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং এফবিসিসিআই-সহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর।
এল নিনোর প্রভাব এবং পশ্চিম আফ্রিকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে টানা ছয় মাস ধরে কোকোর দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত আগস্ট মাসে পণ্যটির দাম ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি মেট্রিক টন ৬ হাজার ৭৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং জলবায়ুজনিত সমস্যার কারণে গত মাসে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ায় গমের দাম প্রতি বুশেলে ২১ শতাংশ বেড়েছে। দেশ দুটির মধ্যে চলমান সংঘাত এবং বন্দরগুলো বন্ধ থাকায় কৃষ্ণসাগরে শস্য লোডিং কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ব্রাজিলে উৎপাদন হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফলন কম হওয়ার কারণে ভুট্টার দাম ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকায় সয়াবিনের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এ পণ্যে চীনের ব্যাপক চাহিদার ফলে সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
এশিয়ার প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারতে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রত্যাশার চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টির কারণে চালের দাম ৯ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। তবে ব্রাজিলে বৃষ্টির পূর্বাভাসের কারণে কফির দাম ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় চিনির দাম ২১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, কারণ ইথানল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবে আখ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে তীব্র গরম ও খরার কারণে তুলার দাম ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইতালীয় ব্যাংকিং গ্রুপ ইন্তেসা সানপাওলোর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ দানিয়েলা কোরসিনি আনাদোলুকে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে এল নিনোর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং রেকর্ড তাপমাত্রার কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কোকোর দাম বেড়েছে।” তিনি আরও সতর্ক করে জানান যে, আগামী মাসগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকায় সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া হারমাটান বাতাস এই অঞ্চলের কোকো গাছগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কোরসিনি আরও বলেন, “এর ফলে অনেক বিশ্লেষক ২০২৬-২৭ সালের বৈশ্বিক উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছেন এবং কেউ কেউ সতর্ক করেছেন যে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে, বিশেষ করে এশিয়ায়, বিশ্ববাজার আবার ঘাটতির মুখে পড়তে পারে।”
রাবোব্যাংকের কমোডিটি বিশ্লেষক ওরান ভ্যান ডর্ট আনাদোলুকে জানান যে, আইভরি কোস্ট এবং ঘানায় শস্যের ধীর বিকাশ এবং এল নিনোর ঝুঁকি কোকোর বাজারে এই তেজ সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও যোগ করে বলেন, “আমার মতে, বর্তমান পরিস্থিতির অনেকখানিই গণমাধ্যমের এল নিনোর নেতিবাচক চিত্রায়ন এবং মধ্যবর্তী ফসল নিয়ে উদ্বেগের কারণে ঘটছে, যা বাজারে এক ধরনের ফটকা প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।” গত বছর খরার উদ্বেগ কমায় কোকোর দাম ৪৪ শতাংশের বেশি কমলেও এ বছরের শুরু থেকেই তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে দাম কিছুটা কম থাকলেও মার্চ মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পণ্যটির মূল্য বেড়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়া ও যুদ্ধাবস্থা বিশ্ব খাদ্য পণ্যের বাজারে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে।
সোমবার বিশ্ববাজারে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) তাদের মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জাপানি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন—এমন প্রত্যাশায় দীর্ঘদিনের চাপে থাকা ইয়েনের ব্যাপক দরপতন ঠেকিয়ে তা শক্তিশালী অবস্থানে ফিরেছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আগামী শুক্রবার প্রকাশিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির তথ্য। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই চলতি মাসের শেষের দিকে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, যা মূলত মার্কিন ডলারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রায় ৫৭ শতাংশ সম্ভাবনা কাজ করছে যে, গত শুক্রবারের শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর ফেডারেল রিজার্ভ এই মাসেই সুদের হার বাড়াতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে এই সপ্তাহের মুদ্রাস্ফীতির পরিসংখ্যানের ওপর।
সোমবার জাপানি মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান ১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ১৫৪ দশমিক ৪২-এ নেমে এসেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। এর আগে গত আগস্টে ওয়াশিংটন ও টোকিও যৌথভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করলেও ইয়েনের মান ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে মূলধন প্রত্যাবাসন এবং মার্কিন রাজনৈতিক চাপের কারণে ইয়েন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এমইউএফজি-র সিনিয়র কারেন্সি অ্যানালিস্ট লি হার্ডম্যান এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, "এ বছর আমরা যখনই হস্তক্ষেপের পর ইয়েনকে শক্তিশালী হতে দেখেছি, ১৫৫ স্তরটি ডলার/ইয়েনের জন্য একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই স্তরটি অতিক্রম করা একটি ইতিবাচক সংকেত এবং আমরা ইয়েনের আরও উন্নতি দেখতে পারি।" তিনি আরও যোগ করেন, "বাজার এত দিন বিষয়টিকে একতরফা মনে করেছিল যে ইয়েন কেবল দুর্বলই হবে। কিন্তু ব্যাংক অব জাপান সুদের হার বাড়ানোর গতি বৃদ্ধি করায় এখন তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে।"
ইয়েনের এই শক্তিশালী অবস্থানের কারণে অন্যান্য মুদ্রার ওপরও প্রভাব পড়েছে। ইয়েনের বিপরীতে ইউরো ১ শতাংশ কমে ১৭৯ দশমিক ৫-এ দাঁড়িয়েছে। তবে ডলারের বিপরীতে ইউরো ও পাউন্ড সামান্য শক্তিশালী হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও (ইসিবি) বৈঠকে বসবে, যেখানে ইউরো জোনের সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বিবিএইচ-এর গ্লোবাল হেড অফ মার্কেটস স্ট্র্যাটেজি ইলিয়াস হাদ্দাদ বলেন, "মুদ্রাস্ফীতির তথ্য যদি বেশি আসে (হট সিপিআই প্রিন্ট), তবে সেপ্টেম্বর মাসে সুদের হার বৃদ্ধি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে এবং ইউএস ডলার আরও শক্তিশালী হবে। তবে তথ্য যদি আশাব্যঞ্জক বা শীতল হয়, তবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা বাড়বে এবং ডলার কিছুটা দুর্বল হতে পারে।" তিনি আরও মনে করেন, সুদের হার বৃদ্ধি পেলেও ডলার যে নতুন কোনো উচ্চতায় পৌঁছাবে এমন সম্ভাবনা কম, কারণ অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের নীতি কঠোর করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংক অব জাপানের বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন ৭৫ শতাংশ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গ্লোবাল হেড অফ রিসার্চ এরিক রবার্টসেন বলেন, যদি ইয়েন ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকে, তবে এটি ইঙ্গিত দেবে যে ইয়েন এবং ডলারের সুদের হার বৃদ্ধি বিনিয়োগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির নজর এখন শুক্রবারের মার্কিন মুদ্রাস্ফীতির তথ্যের দিকে।
চীনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন করে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া গত রোববার জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মোট ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান বা ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের এই তহবিল প্রদান করা হবে। সিনহুয়া আরও জানিয়েছে, এই অর্থায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতিতে ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বেইজিং যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, এটি তারই সর্বশেষ উদাহরণ। বর্তমানে চীন বাণিজ্য সংঘাত, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে যাওয়াসহ নানা বহুমুখী প্রতিকূলতার মোকাবিলা করছে। এই বিশাল আর্থিক প্যাকেজের আওতায় তিনটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও পাঁচটি বিমা কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশনের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, এই অর্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের অর্থনীতিতে ঋণ দেওয়ার জন্য আরও বেশি অর্থ দেবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাইরের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও বাড়াবে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘকাল ধরেই আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। বর্তমানে শ্রমবাজারের সংকট, দীর্ঘস্থায়ী আবাসন মন্দা এবং প্রযুক্তির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে চীন তার অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি লক্ষণীয়ভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার অভাব এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্য দেশটির শক্তিশালী রপ্তানি খাতকেও ম্লান করে দিয়েছে। গত জুলাই মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম।
গত মার্চ মাসে চীন চলতি বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে, যা ১৯৯১ সালের পর দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন লক্ষ্যমাত্রা। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে চীন প্রকারান্তরে বর্তমান অর্থনীতির ভঙ্গুর দশাকেই স্বীকার করে নিয়েছে বলে একটি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। সব মিলিয়ে নতুন এই মূলধন জোগান চীনের অর্থনৈতিক ভিতকে মজবুত করতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি বাড়লেও তা সরকারের জন্য বিশেষ কোনো স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি। নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে অর্থ এসেছে, তার প্রায় পুরোটা চলে গেছে পুরনো সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের আসল টাকা ফেরত দিতে। ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের নিট ঋণপ্রাপ্তি ছিল একেবারেই সামান্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে, একই সময়ে গ্রাহকদের মেয়াদপূর্তি ও মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙানো বাবদ আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ফলে পুরো অর্থবছর শেষে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি ছিল ৬৮ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট বিক্রি ৩৫ শতাংশের বেশি বাড়লেও নিট ঋণ বাড়েনি।
সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত নিট অর্থ বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তবে প্রকৃত প্রাপ্তি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বাড়ার পেছনে প্রধানত উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় দায়ী। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় অনেকেই জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন। এছাড়া গত অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর বেশি মুনাফা দেওয়ায় অনেকে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সরিয়ে বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছেন।
সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত ঋণ না পাওয়ায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বছরের শেষ মাস জুনের তথ্যে দেখা যায়, সে মাসেও সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে ভাঙানোর পরিমাণ বেশি ছিল। জুন মাসে ১০ হাজার ২২৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ১০ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। ফলে শেষ মাসে সরকারকে উল্টো ৩৬৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ পাওয়ার চিত্র নিম্নমুখী। ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তী দুই অর্থবছর (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং সরকারকে নতুন ঋণের বদলে উল্টো হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট ঋণ ইতিবাচক হলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় অত্যন্ত কম।
বাংলাদেশের বিদ্যমান কোম্পানি আইনকে বিশ্বমানের এবং আধুনিক করার লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের আইনে ব্যাপক সংশোধনী আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। মূলত ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজতর করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং ব্যবসায়িক সুশাসন নিশ্চিত করাই এই নতুন সংস্কারের মূল লক্ষ্য। সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া সংশোধনীর ওপর আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ব্যবসায়ীদের সুচিন্তিত মতামত নিয়ে একটি কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৯৪ সালের পর কোম্পানি আইনে মাত্র দুটি ছোটখাটো সংস্কার হয়েছে। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে যুগোপযোগী করতে হবে। এ জন্য নতুন করে আদর্শ নির্ধারণে খুব বেশি কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যেখানে ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করছে। সেসব দেশের উদাহরণ আমরা নিতে পারি।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইনের এই সংস্কার মূলত এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বহুমুখী পদক্ষেপের একটি অংশ মাত্র।
আইনের খসড়া বিশ্লেষণের জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সময়ের আবেদন জানানো হলে মন্ত্রী তা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি বলেন ৬০ দিন সময় লাগবে, তাহলে ৬০ দিন নেন। এর আগে আমি করে কী করব? আপনারা প্রস্তুত না থাকলে যখন প্রস্তুত হবেন, তখন জানাবেন। প্রস্তুত হয়ে জানালে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাব।’ মন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘এটা কয়েকশ উপাদানের মধ্যে একটি এলিমেন্ট। কোম্পানি আইন সংশোধন তার মধ্যে মাত্র একটি। তাই ৩০ দিন সময় নিলে নিন। তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসুন।’
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, এক ব্যক্তি কোম্পানি বা ওপিসি গঠনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন সাধারণ উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে নিবন্ধনের জন্য সর্বনিম্ন পরিশোধিত মূলধনের সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোম্পানির উদ্দেশ্য বা সংঘস্মারক পরিবর্তনের জন্য এখন আর উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না; জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রারের অনুমোদনের মাধ্যমেই তা সম্পাদন করা সম্ভব হবে। প্রথমবারের মতো কোম্পানি আইনের অধীনে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর-কে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটালাইজেশনকে ত্বরান্বিত করতে এবার ইলেকট্রনিক উপায়ে কোম্পানির নথিপত্র সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। মানিলন্ডারিং ও কর ফাঁকি রোধে ‘হিতগ্রাহী স্বত্ব’ বা প্রকৃত মালিকানার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমাদের সবার জন্য একটা ট্রানজিশন টাইম। মাথা ঠান্ডা রেখে ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এই সময়টা পার হতে হবে। বাস্তবভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।’ সভায় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম-এর নোটিশের সময়সীমা এবং কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন।
বাংলাদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিপুল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এ খাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণের চাহিদা প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে (প্রায় ১ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন ডলার) পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। যদি ব্যাপকভাবে গৃহস্থালি পর্যায়ে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়, তবে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব, যা জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে।
সম্প্রতি ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আবাসিক খাতের সম্ভাবনা
গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের আবাসিক খাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৫৭.২ শতাংশ অর্থাৎ ৫১.৯৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ এই খাতে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট ৪ কোটি ৩ লাখ পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮৮.৫ শতাংশ পরিবার নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করে, যা সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য বড় একটি ক্ষেত্র।
বিশ্লেষণে দুটি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। যদি মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার গড়ে ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন সম্ভব। এটি দেশের বর্তমান মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। আর যদি মাঝারি মাত্রায় এই প্রযুক্তির প্রসার ঘটে, তবে সক্ষমতা ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রতি এক মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা জাতীয় কোষাগারের বছরে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাশ্রয় করতে পারে। এটি একদিকে যেমন আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের ওপর চাপ কমাবে, অন্যদিকে প্রতি মেগাওয়াটে ৮ হাজার ১০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতেও সহায়তা করবে। বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে সক্ষমতা ভেদে ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বা তার বেশি ব্যয় হয়।
বিশাল বাজার ও কর্মসংস্থান
এই খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ অন্তত ১০ ধরনের হার্ডওয়্যার ও সরঞ্জামের বিশাল বাজার তৈরি হবে। এর মধ্যে সৌর প্যানেলের বাজারমূল্য ৬২৮ মিলিয়ন ডলার এবং ইনভার্টারের বাজারমূল্য ৩৩৫ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, এই খাতের সম্প্রসারণে প্রায় ১৫ লাখ নতুন 'সবুজ কর্মসংস্থান' সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুতের প্রতি ১ কিলোওয়াট সক্ষমতায় গড়ে ২.৫২টি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এমনকি সক্ষমতা অর্ধেক ধরা হলেও এই বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।
বর্তমানে দেশে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩.৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি স্থাপনা ঢাকা বিভাগে অবস্থিত। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নির্ধারণ করেছে।
তবে এই অগ্রগতির পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৮৭ শতাংশ মানুষ সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জানলেও মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ একে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করেন। এছাড়া ২৮ শতাংশ মানুষের ধারণা, সৌর প্যানেল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সরঞ্জাম কেনার উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়, জটিল ঋণ প্রক্রিয়া, উপকরণের ওপর উচ্চ হারে অগ্রিম আয়কর এবং জাতীয় গ্রিডে সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব এই প্রযুক্তির প্রসারে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
সুপারিশসমূহ
এই খাতের দ্রুত প্রসারে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে:
১. আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নেট মিটারিংয়ের শর্ত সহজ করা এবং ডিজিটাল আবেদন প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
২. বিশেষ ঋণ সুবিধা, আংশিক ঋণ নিশ্চয়তা এবং সাশ্রয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের (পে-অ্যাজ-ইউ-সেভ) ব্যবস্থা করা।
৩. সৌর প্যানেল ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া।
৪. অকার্যকর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা।
৫. পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমগুলোকে আধুনিক হাইব্রিড ও গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক নীতিমালা এবং আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রায় ৭০ লাখ ক্ষুদ্র দোকান ব্যবসায়ীকে ক্ষুদ্র শিল্প বা ‘সিএমএসএমই’ খাতের অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। বর্তমান অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্প সুদের ঋণ এবং বিশেষ প্রণোদনারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনের সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান এই দাবিগুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁরা বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি খোলা চিঠিও প্রদান করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে দেশের খুচরা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অতিরিক্ত দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এখন ‘চরম সংকটে’ দিন অতিবাহিত করছেন। অনেক ব্যবসায়ী তাদের জমানো মূলধন খরচ করে কোনোমতে জীবনযাপন করছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন যে, সরকার বিভিন্ন সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতের জন্য নানা প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন স্কিম ঘোষণা করলেও নীতিগত স্বীকৃতির অভাবে ক্ষুদ্র দোকানদাররা সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাঁরা নিজস্ব পুঁজিতে কর্মসংস্থান তৈরি করলেও সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পান না।
এই সংকট থেকে উত্তরণে সমিতির পক্ষ থেকে আট দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। প্রধান দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে—ক্ষুদ্র দোকান ব্যবসায়ীদের সিএমএসএমই বা ক্ষুদ্র শিল্পের আওতায় এনে প্রজ্ঞাপন জারি করা; দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের ঋণের ক্ষেত্রে জামানত ও কাগজের জটিলতা দূর করা; এবং বিভিন্ন মার্কেট ও বাণিজ্যিক এলাকায় চাঁদাবাজি, অবৈধ সার্ভিস চার্জ ও দখলদারি কঠোর হস্তে বন্ধ করা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহনের খরচ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে তেলের বাজার সচল রাখতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ইরাক। দেশটির তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ খুদায়ের শনিবার জানিয়েছেন, ইরাক তাদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সক্ষমতা দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছে। নতুন বিকল্প পথগুলো চালু হলে এই সক্ষমতা দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেলে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাগদাদ। আনাদুলু এজেন্সি-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ইরাকের সরকারি বার্তা সংস্থা আইএনএ (INA)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খুদায়ের বলেন, চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ গড়ে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। তিনি জানান, ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় ফিশখাবুর এবং সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াসের সংযোগকারী কৌশলগত পাইপলাইনগুলোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে রপ্তানি সক্ষমতা দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হবে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতা থেকে রপ্তানি বাণিজ্যকে নিরাপদ রাখতেই এই বিকল্প পথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গত মাসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালিহ আল-জাইদি দুটি প্রধান পাইপলাইন রুট— বসরা-হাদিতা-ফিশখাবুর এবং হাদিতা-বানিয়াসের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় রুটটি দক্ষিণের তেলক্ষেত্রগুলোকে তুর্কি সীমান্তের নিকটবর্তী ফিশখাবুরের সঙ্গে যুক্ত করবে, যার মাধ্যমে ইরাক কিরকুক-জেহান পাইপলাইন এবং তুরস্কের জেহান বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটটি হাদিতার সাথে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরকে সংযুক্ত করে ভূমধ্যসাগরে ইরাকের জন্য নতুন একটি বাণিজ্যিক দ্বার উন্মোচন করবে, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক তেল করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরাকের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক সংঘাত শুরু হলে ইরাকের তেল উৎপাদন দৈনিক ৩৩ লাখ ব্যারেল থেকে নাটকীয়ভাবে কমে ১৩ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছিল। তবে জুলাই ও আগস্ট মাস থেকে এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে এবং উৎপাদন পুনরায় স্বাভাবিক হচ্ছে।
মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনার জেরে হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বারবার বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তেল রপ্তানিকে ঝুঁকিমুক্ত করতেই ইরাক এখন বিকল্প এই রুটগুলো নির্মাণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণসাগরে বন্দর ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় আগস্ট মাসে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম ২০২২ সালের শেষের দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ এবং পোলিশ ইকোনমিক ইনস্টিটিউট (পিআইই)-এর সাম্প্রতিক তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য মূল্য সূচক জুলাই মাসের ১৩০.৮ পয়েন্ট থেকে বেড়ে আগস্টে ১৩৩.৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। গমের পাশাপাশি চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ পাঁচটি প্রধান খাদ্য ক্যাটাগরিতেই মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। তবে বর্তমান এই সূচকটি ২০২২ সালের মার্চ মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সময়ের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় ১৭ শতাংশ নিচে রয়েছে।
পোলিশ ইকোনমিক ইনস্টিটিউট বা পিআইই জানিয়েছে, জুলাই ও আগস্ট মাসে বন্দর অবকাঠামো এবং পণ্যবাহী জাহাজে উপর্যুপরি হামলার কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য বাণিজ্য কার্যত থমকে গেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট গম রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে এই দুই দেশ থেকে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে সংস্থাটি জানায়, ওডেসাসহ দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত বন্দরগুলোতে রুশ হামলার ফলে আগস্টের প্রথম ২৮ দিনে ইউক্রেনের গম রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ কমে ১৬ লাখ মেট্রিক টনে নেমেছে। এটি দেশটির মোট রপ্তানি সক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ।
অন্যদিকে, রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রভাবে দেশটির গম রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। কৃষি পরামর্শক সংস্থা সোভইকোন-এর তথ্যমতে, রাশিয়ার গম রপ্তানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান মৌসুমের প্রথম মাসে রাশিয়ার গম রপ্তানি ছিল মাত্র ১৬ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০১৭-১৮ সালের পর ওই সময়ের জন্য সর্বনিম্ন পরিমাণ।
এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। পিআইই-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহ বা ফিউচার মূল্য গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে শস্য সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার গমের দিকে ঝুঁকছে।
রপ্তানি সচল রাখতে ইউক্রেন এখন পোল্যান্ডসহ প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে বিকল্প স্থলপথ ব্যবহারের জন্য জোর দিচ্ছে। তবে পিআইই সতর্ক করে বলেছে যে, স্থলপথ কোনোভাবেই কৃষ্ণসাগরের বিশাল পরিমাণের বিকল্প হতে পারে না। এছাড়া দানিউব নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়া এবং মালদোভা সীমান্তের কাছাকাছি অবকাঠামোতে হামলার ফলে ইউক্রেনের বিকল্প পথগুলোও এখন হুমকির মুখে। রাশিয়াও তাদের শস্য রপ্তানি সচল রাখতে বাল্টিক সাগরের বন্দরগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করছে, তবে এতে সময় ও পরিবহন খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
কৃষি পণ্য ইউক্রেনের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে দেশটির রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পিআইই সতর্ক করেছে যে, কৃষ্ণসাগরের অবকাঠামোতে নিয়মিত হামলা রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের জন্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং এর ফলে বিশ্ব খাদ্য বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বার্ষিক কোটায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এখন থেকে এক পঞ্জিকাবর্ষে বিদেশ ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মার্কিন ডলার বা এর সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সুযোগ পাবেন। এতদিন এই খরচের ঊর্ধ্বসীমা ছিল ১২ হাজার ডলার।
গত রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারির মাধ্যমে প্রচলিত ভ্রমণ কোটায় এই সংশোধনী নিয়ে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুসারে, অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলো এখন থেকে বার্ষিক কোটার আওতায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে বছরে সর্বমোট ১৮ হাজার ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও নাগরিকদের প্রকৃত চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করেই ভ্রমণ কোটার এই সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভ্রমণ কোটা একলাফে ৬ হাজার ডলার বা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেল।
তবে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে কোটার প্রচলিত নিয়মে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অপ্রাপ্তবয়স্করা বরাবরের মতোই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত সীমার অর্ধেক অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৯ হাজার ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুবিধা ভোগ করবেন।
ভ্রমণ কোটা বৃদ্ধি করা হলেও নগদ ডলার সংগ্রহের ক্ষেত্রে পূর্বের নিয়মই বহাল রাখা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, বার্ষিক বরাদ্দের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার নগদ নোট হিসেবে সঙ্গে রাখতে পারবেন। বরাদ্দের অবশিষ্ট অর্থ কার্ড বা অনুমোদিত অন্য কোনো বৈধ উপায়ে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের ফলে পর্যটন, পারিবারিক সাক্ষাৎ কিংবা অন্যান্য অনুমোদিত প্রয়োজনে বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তি ও ব্যবহারের সুযোগ আরও প্রশস্ত হলো।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে দুই রাষ্ট্রই বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্ট তো লামের সঙ্গে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মো. লুৎফর রহমানের এক সৌজন্য সাক্ষাতে এই বিষয়ের ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয়।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) হ্যানয়ের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, হ্যানয়ে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ বন্ধন এবং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব আরও সুসংহত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে বর্তমান অগ্রগতির চিত্রও গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
উক্ত বৈঠকে অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক বৃদ্ধি, উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর বিনিময় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়। একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান সুদৃঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করার জন্য উভয় পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুই দেশের বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। এর পাশাপাশি পর্যটন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সহজীকরণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধি এবং সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।
বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মো. লুৎফর রহমান তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে ভিয়েতনাম সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সামগ্রিকভাবে এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।