যতবারই এ দেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ততবারই দেখা গেছে একশ্রেণির মানুষ হইহই, রইরই, গেল গেল সব গেল, শিক্ষা গেল, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গেল- এমন সব কথা বলে রাস্তায় মিছিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার করে আসছে। চলতি বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার আগে এবং পরেও চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেওয়ার নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। কোথাও অভিভাবকরা, কোথাও শিক্ষকরা, কোথাও বা বিশেষজ্ঞ নামেও নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। নতুন এ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী আগামী নতুন বছরে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, ধর্মীয় উন্মাদনা, মিথ্যাচার ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা গোটা জাতিকেই যেন জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, বলার চেষ্টা হচ্ছে আপনারা কেন ঘুমিয়ে আছেন, প্রতিবাদ করুণ ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও অনেকে শিক্ষাক্রমকে অপপ্রচারের শিখণ্ডী বানাতে মাঠে নেমে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব আজগুবি কথা প্রচার করা হচ্ছে যা উচ্চারণ করাও শোভনীয় নয়।
শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হতেই পারে; কিন্তু সেটি পাঠ্য বিষয়ের বিভিন্ন সূচি ধরে ধরে গঠনমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেই সাধারণত করা হয়ে থাকে। সেসবের চেষ্টা দেখি না। যা কিছু বলা হয়, তা গড়ে হরিবোল বললেও যেন কম বলা হবে। এভাবে তো কোনো শিক্ষাক্রমকে মূল্যায়ন করা যায় না। শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষার দর্শন, হৃদপিণ্ড যা একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞই বোঝেন। যেমন- একজন হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার মানুষের হৃদপিণ্ড সম্পর্কে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের এখানে পাঠ্যবই নিয়ে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে অনেকেই মাঠে নেমে পড়েন। অনেকের গাইড বইয়ের ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা থেকে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকদের মধ্যে ঘৃতাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার অনেক শিক্ষক নিজেদের লাভালাভ হিসাব করেও এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। বর্তমান শিক্ষাক্রম নিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পাঠদানের পরিবর্তে বই ছুড়ে মেরে শিক্ষামন্ত্রীকে গালাগাল করছেন এমন কথাও আমি শুনতে পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে গোটা বিষয়টাই আমার কাছে খুব বেশি অবাক হওয়ার মতো নয়। কারণ ’৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে হালের নতুন শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের নানা অবস্থান আমার দেখা বিষয়, বোঝারও বিষয়। স্পষ্টই বুঝতে পারি যে শিক্ষাক্রম নিয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের বক্তব্যে থাকে গঠনমূলক সমালোচনা। বাকি যারা উঠেপড়ে সমালোচনা করেন তাদের নানান জনের নানা উদ্দেশ্য, স্বার্থ, অজ্ঞতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি কোনোকালেই জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম দ্বারা গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাই নানা অব্যবস্থাপনায় আক্রান্ত থেকেছে চিরকালই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে আসেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ’৮০ সালের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এরপর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসা। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পরই নানা গোষ্ঠী নানা অপবাদে এমন একটি শিক্ষানীতিকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল যারা এর ভেতরের দর্শনটি বুঝতে অক্ষম ছিল। তাদেরই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হলো ’৭৫-এর পর। দেশে তখন থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো বিভিন্ন ধারার ও নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে যার মতো করে গড়ে তোলা শুরু করেছে। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হালচাল হলে সেই জাতি কোনোভাবেই শিক্ষার দর্শন দ্বারা গঠিত হতে পারে না। আমরাও সে কারণে হতে পারিনি। আমাদের মধ্যে এতসব বিভাজন সৃষ্টির মূলেই হচ্ছে ‘নামে শিক্ষাব্যবস্থা, বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির অব্যবস্থা’। সেটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের আসল রূপ। আমাদের কোনো স্তরেই শিক্ষাক্রম ঠিক নেই। যে যার মতো করে প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ছে, বই-পুস্তক ঠাসা আর পরীক্ষার জাঁতাকলে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করার এক ভয়ংকর তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় জাতির কয়েকটি প্রজন্মও তেমনি কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিকার দক্ষ, জীবন, কর্ম, জ্ঞান ও সৃজনশীলতায় বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মানব গড়ে তুলতে আমরা পেরেছি বলে দাবি করতে পারব না। কারণ শিক্ষার দর্শনই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষার দর্শন হচ্ছে কি পড়ব বা পড়াব, কেন পড়ব বা পড়াব, পড়ার অর্জনটা কী হবে বা হবে না- সেটি হাতেনাতে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি দাবি করতে পারব যে আমাদের এ ৫ দশকের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে প্রতিবছর হাজার হাজার ধনী ঘরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কেন? একবারও কি আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি? আমাদের করণীয় কী সেগুলো সম্পর্কে কতজনই বা আমরা অবহিত? কিন্তু যখনই দেশে শিক্ষায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই বিরোধিতাটা প্রবলভাবেই আসে, বিরোধিতাটা যদি গঠনমূলক হতো তাহলে আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু গোটা বিরোধিতাটাই যখন ব্যঙ্গাত্মক, বিদ্রূপাত্মক এবং নানা ধরনের শ্লেষ, মনগড়া, ধর্মকে মিশিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন বুঝতেই হবে এত বছরের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বের হয়ে এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই শিখনফল ব্যঙ্গবিদ্রূপ, তামাশা, অপরাজনীতি ও বিভ্রান্ত করতে যতটা ‘পারদর্শিতা’ অর্জন করেছে, নীতি-নৈতিকতা, যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞানে দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষরূপে গড়ে উঠতে অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। কারণ সেই শিক্ষাক্রমটাই এতদিনকার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা হয়নি। একটা উদাহরণ দিই। শ্রীলঙ্কা আমাদের চেয়ে ছোট দেশ হলেও নানাভাবে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেছে। দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে কারণেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গেল বছর তাদের দেশে অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন করেছিল। এমনকি সরকারপ্রধানের প্রাসাদও দখল করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে কেউ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কিছুই ধ্বংস করেনি। এর মানে কী? আমরা কি এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো ফল বের করতে পারব? এ ধরনের ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটত তাহলে কি হতো? ভাঙচুর, লুটপাট, মারামারি, কাটাকাটি, কি না হতো? শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই পার্থক্যটি টানার কারণ হচ্ছে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ কিছু নীতি-নৈতিকতা, যুক্তি ও বিবেকবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেসবের চর্চা কোথায়? এখানেই বোঝা যায় শিক্ষাক্রমের পার্থক্যের মধ্যেই ভিন্ন জাতি গঠনের কারণ নিহিত থাকার।
বর্তমানে যেই শিক্ষাক্রম সরকার স্কুলপর্যায়ে প্রবর্তন করেছে সেটিকে এক কথায় জীবন, কর্ম ও জ্ঞানমুখী জনশক্তি তৈরি করার আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের আগের সৃজনশীলব্যবস্থা কিছু কিছু সফলতা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পরীক্ষা আর মুখস্থবিদ্যার পুরাতন পদ্ধতির মধ্যেই আমাদের শিক্ষার্থীরা আটকে ছিল। শিক্ষার্থীরা শেষ বিচারে পরীক্ষার্থীই থেকেছে। পরীক্ষার জন্য তাদের গাইডবই ক্রয় করতে আর টিউটরের কাছে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাতে শিক্ষার্থীদের ওপর মুখস্থবিদ্যার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপেছিল। গতানুগতিক শিক্ষায় বিশ্বাসী শিক্ষক ও অভিভাবকরা যুগযুগ ধরে এমনটি দেখে এসেছেন, শিখে এসেছেন। তারা জিপিএ-৫ পাওয়ায় সন্তানের ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কয়জন সেই ভবিষ্যতের মালিক হতে পেরেছেন ? আমাদের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও ছিল গতানুগতিক। শ্রেণিপাঠ, মুখস্তবিদ্যা আদায় করা, পরীক্ষার মূল্যায়নও সেভাবে নির্ধারণ করা হতো। আর এর জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইডবই, শ্রেণিপাঠের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের বাড়ি বাড়ি কোচিং নেওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। এটি কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীর জ্ঞান, জীবন ও শিক্ষার মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এখন পৃথিবীর বেশির ভাগ রাষ্ট্রেই অচল হয়ে গেছে। আমরা যুগযুগ ধরে সেটাকেই নানা নামে অব্যাহত রেখেছি। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তাদের জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা সেভাবে গড়ে উঠছে না। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নেই এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা এবং শিক্ষকতার পেশায় নিজেদের যুক্ত রাখার প্রবণতায় বিরাট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এদের একটা বিরাট অংশই আধুনিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে করোনাকালে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষাক্রম বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু করোনাকাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আগের বোধ, বিশ্বাস আর অভ্যস্ততার মধ্যে গুটিয়ে থাকলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকা যাবে না। পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতায় আসতে হবে।
নতুন শিক্ষাক্রম কেবলই প্রবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে। এর পরিমার্জন, পরিবর্ধন এবং উন্নততর করার আবশ্যকতা থাকতেই পারে; কিন্তু এটিকে বাতিল করে আগের মুখস্থ বিদ্যা এবং গাইডবই, টিউশননির্ভর শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার যারা দাবি করেন তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষা নয়, শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করা হতে পারে। যে শিক্ষকরা সেখানে ফিরে যেতে চান, তারাও একই দোষে দোষী। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা প্রতিটি শিক্ষকেরই দায়িত্ব। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষকেরই পঠনপাঠনের নিয়মিত অভ্যাস নেই। তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা ও শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। অথচ শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ এবং নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী হাতেকলমে শেখন, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই যুগের সঙ্গে যেমন তাল মেলাতে পারেন, শিক্ষার্থীদেরও গড়ে তুলতে অবদান রাখতে পারেন। অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা নয় বরং সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, আস্থা রাখা এবং তাদের জীবন, কর্ম ও জ্ঞান দক্ষতায় গড়ে তোলার শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রতি আস্থাশীল হতেই হবে। অপপ্রচার, গুজব, ব্যঙ্গবিদ্রূপ শিক্ষার সঙ্গে যায় না, জীবনের সঙ্গেও নয়। এটাই শিক্ষার দর্শন।
লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ব্যাপক ইতিবাচক গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকার সমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, "এপ্রিলের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার।" পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ১৯ লাখ ডলার করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ হাজার ৮৬২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর আগে মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় আসার মাধ্যমে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও যথাক্রমে ৩০২ কোটি ৭ লাখ এবং ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের নজির। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার আগমন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি মাসের তৃতীয় চালানে আরও সাত হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের টার্মিনালে এই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন্স) কাজী রবিউল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, গত ২০ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাম্পিং শুরু হওয়ার প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর এই ডিজেল গন্তব্যে এসে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি মাসের ১১ ও ১৯ এপ্রিল আরও দুটি পৃথক চালানে মোট ১৩ হাজার টন জ্বালানি এসেছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৩৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে মোট চারটি চালানে ভারত থেকে ২৫ হাজার টন জ্বালানি আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এই ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগে রেল ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহনের দীর্ঘ সময় ও জটিলতা অনেকাংশে কমেছে। গত ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই আমদানি কার্যক্রমের চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর ভারত থেকে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিপিসির তথ্যমতে, এই পাইপলাইন ব্যবহার করে বছরে ১০ লাখ টন পর্যন্ত তেল আমদানি করা সম্ভব, যা কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলো পার্বতীপুর ডিপো থেকে এই ডিজেল সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সারাদেশের টিসিবি কার্ডধারী নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ ৩২ হাজার লিটার পরিশোধিত পাম তেল ও ২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সংগ্রহে সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় হবে মোট ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩২ টাকা। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আমেরিকার পাওয়ার হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি থেকে ১৮১ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয়ে পাম তেল কেনা হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঢাকার গুলশানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইজ সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ২ হাজার টন মসুর ডাল সংগ্রহের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে এদিনের সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়নি। এর মধ্যে বাপেক্স কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘৩টি অনুসন্ধান কুকূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খনন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কূপ খননের প্রস্তাবটি আলোচনার বাইরে ছিল। একইভাবে ‘সিলেট-১২ নম্বর কূপ খনন (তেল কূপ)’ এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি সংগ্রহের প্রস্তাবগুলোও বৈঠকে উত্থাপন করা হয়নি। এছাড়া নেসকো ও বাপবিবোর বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত একাধিক প্যাকেজ এবং সিরাজগঞ্জ ও ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুনর্নির্ধারিত লেভেলাইজড ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাবগুলোও এদিনের সভায় উপস্থাপন করা হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের এই বড় মজুত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আগামী জুলাই মাসে ইতালি থেকে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও যৌথ বিজনেস প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলাসান্দ্রোর এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা উল্লেখ করে বলেন, “ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী।”
সাক্ষাৎকালে বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, “বাংলাদেশ ও ইতালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। ইতালি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” মন্ত্রী ইতালীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে ইতালির বিনিয়োগ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফার্নিচার, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বন্ধ জুটমিল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে। দেশের তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সুবিধা।”
বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং পোশাক শিল্পের বাইরেও চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হন। এই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহিম খানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত পেট্রোকেমিক্যাল মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সংগৃহীত হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে শুরু করে লিপস্টিক, চুইংগাম, জুতা এমনকি মানুষের দাঁতের নকল পাটিও তৈরিতে পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে।
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর প্রধান রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?” পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের মোট তেলের ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো উপাদানগুলো প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইল প্রতি কেজি ৯০ সেন্টে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১ ডলার ৩৩ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাক তৈরিতে অন্তত ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ গুণতে হচ্ছে। এফডিআরএ-এর বিশ্লেষণ মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এক জোড়া জুতার দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, আঠাজাতীয় পণ্যের কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ বাড়ায় তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।”
শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে সরবরাহ চেইনের এই চাপ আরও প্রকট হবে। ইতিমধ্যে রিনসেরু-এর মতো পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের প্রতিটি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন অনেক সাধারণ পণ্যের দামও এখন পরোক্ষভাবে পেট্রোকেমিক্যালের কারণে আকাশচুম্বী হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মধ্যেও পারস্য উপসাগর থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল রফতানির তথ্য পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন খাত বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ জারির পরবর্তী সপ্তাহেই এই রফতানি সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা জানায়, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পর ১৩ এপ্রিল থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সময়ে তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর ৩৪টি যাতায়াত শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৯টি জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে গেছে এবং ১৫টি জাহাজ সেখানে প্রবেশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-কে (এপি) পাঠানো এক ইমেইলে জানিয়েছে, উপসাগর ত্যাগ করা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টি ইরানি অপরিশোধিত তেলে পূর্ণ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ছয়টি জাহাজে মোট প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা হচ্ছিল।
তবে এই তেলের চালান শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র: এপি
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও সূচক ছিল ইতিবাচক। ডিএসইতে দিনের শুরুতে চাঙ্গাভাব থাকলেও আধা ঘণ্টার ব্যবধানে বিক্রেতাদের চাপে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতন ঘটে। তবে লেনদেনের শেষভাগে বড় মূলধনি কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচক সামান্য বেড়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স মাত্র ০.০০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনশেষে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়লেও ১৯৯টির দর কমেছে এবং ৫৮টির দাম স্থিতিশীল ছিল। বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় ১৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কমে ৮৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং।
অন্যদিকে, সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে এবং ১০৩টির দাম কমেছে। সিএসইতে ২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হলেও বাছাই করা কিছু বড় কোম্পানির ভালো পারফরম্যান্সের কারণে সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান বহুমুখী প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধির জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই দাবি উত্থাপন করে। বৈঠকে বিআরপিডি সার্কুলার-০৭/২০২৫-এর আওতায় আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি রুগ্ন শিল্পগুলোর পুনর্বাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বিজিএমইএ-র পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, খেলাপি হিসাবের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৫-এর পরিবর্তে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে অনেক সংকটাপন্ন কারখানা নীতি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নীতি সহায়তাগুলো অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক সময়মতো কার্যকর না করায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার হয়।
বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও সভায় তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ মনে করে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক তথ্য যাচাই ও নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন, যা কার্যকর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে। ডেপুটি গভর্নর বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম কনডম উৎপাদনকারী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান কারেক্স সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তারা পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মূল্যবৃদ্ধির এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় এই শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোহ মিয়া কিয়াত এক সাক্ষাৎকারে জানান, জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পরিবেশক পর্যায়ে পণ্যের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে খুবই নাজুক, দাম বাড়ছে। এ মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতেই হচ্ছে।” কারেক্স প্রতি বছর ৫০০ কোটির বেশি কনডম তৈরি করে এবং তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে কনডম তৈরির প্রধান উপকরণ সিন্থেটিক রাবার ও নাইট্রাইল থেকে শুরু করে প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও সিলিকন লুব্রিকেন্টের দাম হু হু করে বাড়ছে। কারেক্সের প্রধান নির্বাহী জানান, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে; যেখানে আগে এক মাস সময় লাগত, এখন সেখানে দুই মাস সময় ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, “অনেক কনডম এখন জাহাজেই পড়ে আছে, এখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি। কিন্তু সেগুলোর চাহিদা খুব বেশি।” এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় মজুত শেষ হয়ে আসছে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামই এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ বা তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় স্বর্ণ ও রুপার মূল্য নতুন করে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমার কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।”
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দর ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় ক্রয় করা যাবে। ইতিপূর্বে গত ১৫ এপ্রিল স্বর্ণের মূল্য সর্বশেষ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যেখানে ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট ৫৬ বার স্বর্ণের বাজারমূল্য পরিবর্তন করা হলো, যার মধ্যে ৩২ বার দাম বেড়েছে এবং ২৪ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৯৩ বার স্বর্ণের দর সমন্বয় করা হয়েছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্য কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা কমে এখন ৫ হাজার ৭১৫ টাকায় নেমেছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৩৫ বার রুপার মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যেখানে ১৯ বার দাম বৃদ্ধি ও ১৬ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২৫ সালে রুপার দাম ১৩ বার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ও বিদেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে ৮৬ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে বিদেশে ৪৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৩৭৭ কোটি টাকায়। বিদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এরপরই রয়েছে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান।
একইভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও নিম্নমুখী। জানুয়ারিতে তারা ৩৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
দেশের অভ্যন্তরেও কার্ডের ব্যবহার হ্রাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩,৭২০ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ২৯৮ কোটি টাকা কমে ৩,৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সামগ্রিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে একটি স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৮৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দর ১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পূর্বেই ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে একতরফা এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইরান বা ইসরায়েল আদৌ চূড়ান্তভাবে সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড মেয়ার মন্তব্য করেন, “যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ফলে বাজারে সংকট কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে ডলারের মান বাড়বে, তেল ও সুদের হার বাড়বে এবং স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হবে।”
এই ঘোষণার প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যার ফলে মার্কিন ডলারের মান কিছুটা কমেছে এবং তেলের দামও নিম্নমুখী হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এক বার্তায় জানিয়েছে যে, স্বর্ণের বর্তমান এই দরবৃদ্ধি বেশ নাজুক এবং স্বল্পমেয়াদে তা হ্রাসের ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই মূল্যবান ধাতু পুনরায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী প্রধান হিসেবে মনোনীত কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন যে, সুদের হার কমানোর বিষয়ে তিনি ট্রাম্পকে কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দেননি এবং তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও তেজি ভাব দেখা গেছে; যেখানে রুপার দাম ১.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৭.৯৭ ডলার হয়েছে এবং প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরই আগামী দিনগুলোতে এই বাজারগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।
সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাহাজটি আগামী ৪ বা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করা ট্যাংকারটি লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে আসছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলেছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চালানটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অন্যদিকে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের আরেকটি জাহাজ ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে এখনো হরমুজ প্রণালিতে আটকে রয়েছে। ইরানের বিশেষ অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ—৬৩ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্বালানির ধরন বিবেচনায় ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, পেট্রল ও অকটেন।