যতবারই এ দেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ততবারই দেখা গেছে একশ্রেণির মানুষ হইহই, রইরই, গেল গেল সব গেল, শিক্ষা গেল, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গেল- এমন সব কথা বলে রাস্তায় মিছিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার করে আসছে। চলতি বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার আগে এবং পরেও চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেওয়ার নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। কোথাও অভিভাবকরা, কোথাও শিক্ষকরা, কোথাও বা বিশেষজ্ঞ নামেও নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। নতুন এ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী আগামী নতুন বছরে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, ধর্মীয় উন্মাদনা, মিথ্যাচার ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা গোটা জাতিকেই যেন জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, বলার চেষ্টা হচ্ছে আপনারা কেন ঘুমিয়ে আছেন, প্রতিবাদ করুণ ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও অনেকে শিক্ষাক্রমকে অপপ্রচারের শিখণ্ডী বানাতে মাঠে নেমে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব আজগুবি কথা প্রচার করা হচ্ছে যা উচ্চারণ করাও শোভনীয় নয়।
শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হতেই পারে; কিন্তু সেটি পাঠ্য বিষয়ের বিভিন্ন সূচি ধরে ধরে গঠনমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেই সাধারণত করা হয়ে থাকে। সেসবের চেষ্টা দেখি না। যা কিছু বলা হয়, তা গড়ে হরিবোল বললেও যেন কম বলা হবে। এভাবে তো কোনো শিক্ষাক্রমকে মূল্যায়ন করা যায় না। শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষার দর্শন, হৃদপিণ্ড যা একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞই বোঝেন। যেমন- একজন হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার মানুষের হৃদপিণ্ড সম্পর্কে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের এখানে পাঠ্যবই নিয়ে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে অনেকেই মাঠে নেমে পড়েন। অনেকের গাইড বইয়ের ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা থেকে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকদের মধ্যে ঘৃতাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার অনেক শিক্ষক নিজেদের লাভালাভ হিসাব করেও এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। বর্তমান শিক্ষাক্রম নিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পাঠদানের পরিবর্তে বই ছুড়ে মেরে শিক্ষামন্ত্রীকে গালাগাল করছেন এমন কথাও আমি শুনতে পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে গোটা বিষয়টাই আমার কাছে খুব বেশি অবাক হওয়ার মতো নয়। কারণ ’৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে হালের নতুন শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের নানা অবস্থান আমার দেখা বিষয়, বোঝারও বিষয়। স্পষ্টই বুঝতে পারি যে শিক্ষাক্রম নিয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের বক্তব্যে থাকে গঠনমূলক সমালোচনা। বাকি যারা উঠেপড়ে সমালোচনা করেন তাদের নানান জনের নানা উদ্দেশ্য, স্বার্থ, অজ্ঞতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি কোনোকালেই জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম দ্বারা গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাই নানা অব্যবস্থাপনায় আক্রান্ত থেকেছে চিরকালই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে আসেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ’৮০ সালের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এরপর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসা। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পরই নানা গোষ্ঠী নানা অপবাদে এমন একটি শিক্ষানীতিকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল যারা এর ভেতরের দর্শনটি বুঝতে অক্ষম ছিল। তাদেরই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হলো ’৭৫-এর পর। দেশে তখন থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো বিভিন্ন ধারার ও নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে যার মতো করে গড়ে তোলা শুরু করেছে। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হালচাল হলে সেই জাতি কোনোভাবেই শিক্ষার দর্শন দ্বারা গঠিত হতে পারে না। আমরাও সে কারণে হতে পারিনি। আমাদের মধ্যে এতসব বিভাজন সৃষ্টির মূলেই হচ্ছে ‘নামে শিক্ষাব্যবস্থা, বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির অব্যবস্থা’। সেটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের আসল রূপ। আমাদের কোনো স্তরেই শিক্ষাক্রম ঠিক নেই। যে যার মতো করে প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ছে, বই-পুস্তক ঠাসা আর পরীক্ষার জাঁতাকলে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করার এক ভয়ংকর তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় জাতির কয়েকটি প্রজন্মও তেমনি কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিকার দক্ষ, জীবন, কর্ম, জ্ঞান ও সৃজনশীলতায় বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মানব গড়ে তুলতে আমরা পেরেছি বলে দাবি করতে পারব না। কারণ শিক্ষার দর্শনই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষার দর্শন হচ্ছে কি পড়ব বা পড়াব, কেন পড়ব বা পড়াব, পড়ার অর্জনটা কী হবে বা হবে না- সেটি হাতেনাতে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি দাবি করতে পারব যে আমাদের এ ৫ দশকের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে প্রতিবছর হাজার হাজার ধনী ঘরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কেন? একবারও কি আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি? আমাদের করণীয় কী সেগুলো সম্পর্কে কতজনই বা আমরা অবহিত? কিন্তু যখনই দেশে শিক্ষায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই বিরোধিতাটা প্রবলভাবেই আসে, বিরোধিতাটা যদি গঠনমূলক হতো তাহলে আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু গোটা বিরোধিতাটাই যখন ব্যঙ্গাত্মক, বিদ্রূপাত্মক এবং নানা ধরনের শ্লেষ, মনগড়া, ধর্মকে মিশিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন বুঝতেই হবে এত বছরের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বের হয়ে এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই শিখনফল ব্যঙ্গবিদ্রূপ, তামাশা, অপরাজনীতি ও বিভ্রান্ত করতে যতটা ‘পারদর্শিতা’ অর্জন করেছে, নীতি-নৈতিকতা, যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞানে দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষরূপে গড়ে উঠতে অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। কারণ সেই শিক্ষাক্রমটাই এতদিনকার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা হয়নি। একটা উদাহরণ দিই। শ্রীলঙ্কা আমাদের চেয়ে ছোট দেশ হলেও নানাভাবে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেছে। দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে কারণেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গেল বছর তাদের দেশে অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন করেছিল। এমনকি সরকারপ্রধানের প্রাসাদও দখল করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে কেউ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কিছুই ধ্বংস করেনি। এর মানে কী? আমরা কি এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো ফল বের করতে পারব? এ ধরনের ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটত তাহলে কি হতো? ভাঙচুর, লুটপাট, মারামারি, কাটাকাটি, কি না হতো? শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই পার্থক্যটি টানার কারণ হচ্ছে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ কিছু নীতি-নৈতিকতা, যুক্তি ও বিবেকবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেসবের চর্চা কোথায়? এখানেই বোঝা যায় শিক্ষাক্রমের পার্থক্যের মধ্যেই ভিন্ন জাতি গঠনের কারণ নিহিত থাকার।
বর্তমানে যেই শিক্ষাক্রম সরকার স্কুলপর্যায়ে প্রবর্তন করেছে সেটিকে এক কথায় জীবন, কর্ম ও জ্ঞানমুখী জনশক্তি তৈরি করার আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের আগের সৃজনশীলব্যবস্থা কিছু কিছু সফলতা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পরীক্ষা আর মুখস্থবিদ্যার পুরাতন পদ্ধতির মধ্যেই আমাদের শিক্ষার্থীরা আটকে ছিল। শিক্ষার্থীরা শেষ বিচারে পরীক্ষার্থীই থেকেছে। পরীক্ষার জন্য তাদের গাইডবই ক্রয় করতে আর টিউটরের কাছে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাতে শিক্ষার্থীদের ওপর মুখস্থবিদ্যার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপেছিল। গতানুগতিক শিক্ষায় বিশ্বাসী শিক্ষক ও অভিভাবকরা যুগযুগ ধরে এমনটি দেখে এসেছেন, শিখে এসেছেন। তারা জিপিএ-৫ পাওয়ায় সন্তানের ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কয়জন সেই ভবিষ্যতের মালিক হতে পেরেছেন ? আমাদের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও ছিল গতানুগতিক। শ্রেণিপাঠ, মুখস্তবিদ্যা আদায় করা, পরীক্ষার মূল্যায়নও সেভাবে নির্ধারণ করা হতো। আর এর জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইডবই, শ্রেণিপাঠের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের বাড়ি বাড়ি কোচিং নেওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। এটি কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীর জ্ঞান, জীবন ও শিক্ষার মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এখন পৃথিবীর বেশির ভাগ রাষ্ট্রেই অচল হয়ে গেছে। আমরা যুগযুগ ধরে সেটাকেই নানা নামে অব্যাহত রেখেছি। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তাদের জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা সেভাবে গড়ে উঠছে না। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নেই এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা এবং শিক্ষকতার পেশায় নিজেদের যুক্ত রাখার প্রবণতায় বিরাট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এদের একটা বিরাট অংশই আধুনিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে করোনাকালে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষাক্রম বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু করোনাকাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আগের বোধ, বিশ্বাস আর অভ্যস্ততার মধ্যে গুটিয়ে থাকলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকা যাবে না। পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতায় আসতে হবে।
নতুন শিক্ষাক্রম কেবলই প্রবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে। এর পরিমার্জন, পরিবর্ধন এবং উন্নততর করার আবশ্যকতা থাকতেই পারে; কিন্তু এটিকে বাতিল করে আগের মুখস্থ বিদ্যা এবং গাইডবই, টিউশননির্ভর শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার যারা দাবি করেন তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষা নয়, শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করা হতে পারে। যে শিক্ষকরা সেখানে ফিরে যেতে চান, তারাও একই দোষে দোষী। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা প্রতিটি শিক্ষকেরই দায়িত্ব। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষকেরই পঠনপাঠনের নিয়মিত অভ্যাস নেই। তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা ও শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। অথচ শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ এবং নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী হাতেকলমে শেখন, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই যুগের সঙ্গে যেমন তাল মেলাতে পারেন, শিক্ষার্থীদেরও গড়ে তুলতে অবদান রাখতে পারেন। অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা নয় বরং সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, আস্থা রাখা এবং তাদের জীবন, কর্ম ও জ্ঞান দক্ষতায় গড়ে তোলার শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রতি আস্থাশীল হতেই হবে। অপপ্রচার, গুজব, ব্যঙ্গবিদ্রূপ শিক্ষার সঙ্গে যায় না, জীবনের সঙ্গেও নয়। এটাই শিক্ষার দর্শন।
লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন যে, দেশে এলপিজি গ্যাসের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ কারসাজি কাজ করছে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন। উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, যদিও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সংগতি রেখে এলপিজির দাম কিছুটা বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উপদেষ্টা জানান যে, ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে দেশের প্রতিটি জেলায় এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে বাজার তদারকি করবে এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখা হলে সাথে সাথে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মূলত সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই তাৎক্ষণিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আরও উল্লেখ করেন যে, গতকাল অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও এলপিজির দাম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমানে বাজারে যে হারে দাম বাড়ানো হয়েছে তার কোনো যৌক্তিক বা বাস্তব কারণ নেই। এটি পুরোপুরি ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের একটি অপকৌশল। সরকার এই কারসাজির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়া খুচরা ও পাইকারি উভয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। সরকারের এই তৎপরতার ফলে খুব দ্রুতই এলপিজির দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর এবার দেশীয় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার কথা বিবেচনা করে সেই অনুমতি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল থেকে ভারত থেকে নতুন করে পেঁয়াজ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ‘ইমপোর্ট পারমিট’ বা আইপি ইস্যু করা বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো। হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা জানিয়েছেন যে, তারা নতুন করে আমদানির অনুমতির জন্য সকাল থেকে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করলেও কোনো আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। তবে যাদের কাছে আগের ইস্যু করা পারমিট রয়েছে, তাঁরা আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত সেই পুরনো অনুমতির বিপরীতে ভারত থেকে পেঁয়াজ আনতে পারবেন। মূলত স্থানীয় কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের সঠিক দাম পান এবং বাজার যেন আমদানিকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক মোবারক হোসেন জানিয়েছেন, গত ৭ ডিসেম্বর থেকে নিয়মিত পেঁয়াজ আমদানির ফলে বাজারে দাম বেশ স্থিতিশীল হয়ে এসেছিল। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু নতুন করে আমদানির অনুমতি বন্ধের খবরটি বাজারে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে প্রতি কেজিতে প্রায় ২ টাকা দাম বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন যে, ভারত থেকে আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পেঁয়াজের দাম পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সোমবারও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ১২টি ট্রাকে ৩৪৪ টন পেঁয়াজ দেশে প্রবেশ করেছে, তবে এগুলো সবই ছিল আগের আমদানির অনুমতির বিপরীতে আসা চালান।
হিলি স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপসহকারী সংগনিরোধ কর্মকর্তা ইউসুফ আলী এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার থেকে নতুন কোনো আইপি প্রদান করা হচ্ছে না। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, আগের ইস্যু করা পারমিটগুলোর মেয়াদ ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত থাকায় ওই সময়ের মধ্যে মালবাহী ট্রাকগুলো দেশে প্রবেশ করতে পারবে। আমদানিকারকরা মনে করছেন, দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। বর্তমানে বন্দরের আমদানিকারকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশে শোক দিবস চলায় এবার মেলা ২ দিন পিছিয়ে ৩ জানুয়ারি শুরু হয়। এছাড়া বেশ কয়েক দিন ধরে শৈত্যপ্রবাহের কারণে সূর্যেরও দেখা মিলছে না। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে রূপগঞ্জ। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়াও। ফলে মেলার তৃতীয় দিনেও আশানুরূপ ক্রেতার দেখা মেলেনি। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর কুয়াশার কারণে মানুষ নেহায়েত প্রয়োজন না হলে ঘর থেকেই বের হচ্ছেন না। হেড লাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। তারপরও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সম মিলিয়ে বাণিজ্য মেলায় লোক সমাগম কম। বিক্রেতারা আশায় আছেন রোদ ওঠলে এবং কুয়াশা কমলে মেলায় ক্রেতা দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়বে বেচাবিকিও হবে।
ধানমন্ডির ছালমা বেগম বলেন, তিন বছর ধরেই বাণিজ্য মেলায় আসছি। বিগত সময়গুলোতে বিআরটিসি বাস সার্ভিস খুব খারাপ ছিল। ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠতে হতো। তবে এবার খুব সুন্দর সিস্টেম করেছে।
এদিকে মেলার তৃতীয় দিন চললেও মেলায় আগত দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্রেতার সংখ্যা কম। বেশির ভাগই আসছেন ঘুরতে ও ফটো সেশন করতে। মেলার ফোয়ারার সামনে কথা হয় সিয়ামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুনেছি মেলা এবার বর্ণিল সাজে সেজেছে। তাই আসলাম ফটো সেশন করতে।’ মেলায় ঘুরতে এসেছেন তিন বন্ধু শুভ, সাদেক ও অসীম। তারাও ছবি তোলায় ব্যস্ত।
জানা গেছে, গত বছর মেলার উদ্বোধনের দিন তিন হাজার ক্রেতা-দর্শনার্থী টিকিট নিয়ে মেলায় প্রবেশ করেন। এবার মেলার উদ্বোধনের দিন ১১ হাজার ৭৪৩ জন দর্শনার্থী টিকিটে মেলায় প্রবেশ করেছেন। তাতে গত বছরের তুলনায় এবার ব্যবসা সফল মেলা হবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন। তবে এখন ঘুরে ঘুরে পণ্য দেখলেও খুব শিগগিরই পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হবে।
মেলা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৩৪টি সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি থাকছে পাঁচটি ওয়াচ টাওয়ার। সতর্ক অবস্থায় থাকবে একাধিক পুলিশের টিম। মেলায় প্রবেশের টিকিট ইজারাদারের ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের (হেড অব অপারেশন) এস এম আমিনুল ইসলাম বলেন, শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে গত রোববার বিকেল ৫টা পর্যন্ত টিকিট কেটে ২৭ হাজার ৩৭২ জন দর্শনার্থী মেলায় প্রবেশ করেছেন। এবার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মেলার কিছু স্টল এখনো নির্মীয়মাণ। হাতুড়ির টুং-টাং আওয়াজ বিদ্যমান। কারিগরদের কথা বলার সুযোগ নেই। কেউ কাঠ ও বোর্ড সাজাচ্ছেন। কেউ কাঠে তারকাটা মারছেন। কেউবা স্টল নির্মাণে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর মাপ নিচ্ছেন।
মেলাপ্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এমন সুন্দর পরিবেশে দর্শনার্থীদের কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও লাইভে এসে স্বজনদের দেখাচ্ছেন। মনোমুগ্ধকর এই পরিবেশের স্থায়িত্ব চান ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।
মেলা প্রাণবন্ত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মেলার আয়োজক রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মেলায় যেকোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাত শতাধিক পুলিশ সদস্য। থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একাধিক দল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি গেট ইজারাদারের পক্ষ থেকে থাকছে স্বেচ্ছাবেক দল। মেলায় আসা শিশুদের জন্য থাকছে শিশু পার্ক।
মিস্টার নুডলসের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর তেমন সুবিধা করতে পারিনি। এ বছর যেহেতু দেশ নতুনভাবে স্বাধীন হয়েছে, তাই এবার ভালো কিছু আশা করছি।’ নাভানা ফার্নিচারের বিক্রয় প্রতিনিধি আরিফুল আলম বলেন, ‘এবার ভালো বেচাকেনা আশা করছি। এখন দর্শনার্থী আসছে ঠিকই, কিন্তু তারা ফটো সেশনে ব্যস্ত। ভারত থেকে আসা শীতের কাপড় বিক্রির স্টলের কর্মচারী দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, ‘স্টল ও প্যাভিলিয়নের কর্মচারীদের থাকা-খাওয়ার সমস্যা। কম দামে খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো। বাড়তি দাম এড়াতে কেউ কেউ বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে খাচ্ছেন। তবে এবার ভালো ব্যবসা আশা করছি।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব তরফদার সোহেল রহমান বলেন, মেলা এলাকায় ধুলাবালির সমস্যা সমাধানে প্রতিনিয়ত পানি দেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। মেলার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পরিবেশ অনুকূলে থাকায় কেনাবেচার ধুম পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মাদকের অজুহাতে ভেনিজুয়েলায় চালানো মার্কিন হামলার পর অনিশ্চয়তা বেড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর বেড়েছে স্বর্ণের দাম। যা গত ২৯ ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ দাম। খবর রয়টার্সের
মূলত নিরাপদ বিনিয়োগের কথা ভেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছে বিনিয়োগকারীরা। মার্কিন-ভেনিজুয়েলা উত্তেজনার পর সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সোমবার (৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এক লাফে ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তা এখন এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশের সময় বিকাল ৩টার দিকে স্পট গোল্ডের দাম ২.৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,৪৩৩.২৯ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে ২৬ ডিসেম্বর স্বর্ণের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪,৫৪৯.৭১ ডলারে পৌঁছেছিল।
মার্কেটপালস বাই ওএনডিএর বিশ্লেষক জাইন ভাওদা বলেন, ‘সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্বর্ণের বাজারে। এতে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও দুটি দেশকে সতর্ক করে বলেন, ‘মাদক প্রবাহ কমাতে ব্যর্থ হলে কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।’
ভাওদা এই ক্ষেত্রে সতর্ক করে রেখেছেন, ‘ভেনিজুয়েলায় অভিযানের পর মেক্সিকোকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের মন্তব্য লাতিন আমেরিকায় ভবিষ্যৎ সামরিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে স্বর্ণের চাহিদা উচ্চ পর্যায়েই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
ডিসেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। আগের মাস নভেম্বরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। তবে এক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিবিএসের হিসাবে, জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে।
তথ্যানুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ— যা নভেম্বরে ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য-বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, আগের মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ।
তবে বার্ষিক তুলনায় মূল্যস্ফীতির চিত্র কিছুটা স্বস্তিদায়ক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। সে সময় খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং খাদ্য-বহির্ভূত খাতে ছিল ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্ব-নিম্ন ওঠানামা বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং ডলারের বিনিময়হারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যদিও আগের বছরের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবু ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সমন্বয় জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত দুই দিন ধরে লেনদেন কার্যক্রম শুরু করেছে। এই দুই দিনে নতুন করে ৪৪ কোটি টাকা নতুন ডিপোজিট পেয়েছে ব্যাংকটি। গ্রাহকের আস্থা থাকার কারণে নতুন করে গ্রাহকেরা ডিপোজিট রাখছেন বলে তার অভিমত।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, ‘গত দুদিন যাবত ব্যাংকটি গ্রাহকের টাকা দেওয়া শুরু করেছে। এই দুই দিনে আগের আমানতকারীরা ১০৭ কোটি টাকা টাকা তুলেছেন। অন্যদিকে নতুন করে ডিপোজিট এসেছে ৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিট ডিপোজিট ঘাটতি ৬৩ কোটি টাকা।’
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে সৎ ও যোগ্যদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরি নিয়ে চিন্তা নেই, তবে ফরেনসিক রিপোর্টে দায়ীদের চিহ্নিত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। ১২ হাজার কর্মীর মধ্যে সৎ ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে।’
এ সময় ব্যাংক পরিচালনা ও মুনাফা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে বাজার ও শরিয়াহ ভিত্তিতে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা ও ভয়ভীতি ছিল। দেশ-বিদেশের অনেক পরামর্শক নানা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা সেগুলো অতিক্রম করতে পেরেছি। আমাদের গল্পটা ইতিবাচক, এবং যে ডাটা পাচ্ছি, তা আমাদের আস্থা আরও বাড়াচ্ছে।’
তিনি জানান, ব্যাংকটির সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রমে গতি ফেরানো এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধসহ সব ধরনের ডিজিটাল সেবা নির্বিঘ্ন করা। একই সঙ্গে খরচ কমানো ও আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
গভর্নর আরও বলেন, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকলেও পরিচালিত হবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। এটি কোনো সরকারি পে-স্কেলে চলবে না। নতুন ও বিদ্যমান কর্মকর্তাদের বেতন হবে বেসরকারি ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায়। পাঁচটি ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন বেতন কাঠামো একীভূত করে একটি ইউনিফাইড স্কেলে নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই তা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ২.৫৭ বিলিয়ন ডলার নতুন সার্বভৌম অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ২০২৪ সালের ১.১৮ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
২০২৫ সালের কর্মসূচিতে জ্বালানি, পরিবহন, ব্যাংকিং সংস্কার, নগর পরিষেবা, জলবায়ু সহনশীলতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং কক্সবাজারে জীবিকা ও পরিষেবার উন্নয়নে অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এডিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ বছরের সার্বভৌম ঋণ পোর্টফোলিও বিভিন্ন খাত ও অর্থায়ন পদ্ধতির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণ প্রতিফলিত করেছে।
এডিবি কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর পর্বে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলোতে সহায়তায় আমরা গর্বের সঙ্গে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটের কারণে এ ধরনের সহায়তা আরও জটিল হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের প্রতিশ্রুতিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, উন্নত অবকাঠামো ও সেবা এবং মানব উন্নয়নে আমাদের যৌথ মনোযোগকে প্রতিফলিত করে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৫ সালে এডিবির সার্বভৌম প্রতিশ্রুতিগুলো অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে জোর দিয়েছে। মোট ২.৫৭ বিলিয়ন ডলারের দশটি প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবহন অবকাঠামো খাতে, ২৩ শতাংশ আর্থিক খাতে এবং ১৬ শতাংশ সরকারি খাত ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনে বরাদ্দ রাখা হয়।
এ ছাড়া জ্বালানি খাতে ১১ শতাংশ, পানি ও নগর উন্নয়নে ৯ শতাংশ এবং মানব ও সামাজিক উন্নয়নে ৬ শতাংশ অর্থায়ন করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলারের দক্ষিণ এশিয়া উপআঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা-চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলওয়ে উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল লাইনের উন্নয়ন হবে এবং ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন পরিসেবার জন্য একটি বাইপাস নির্মাণ করবে।
এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য হলো- ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীলকরণ ও সংস্কার কর্মসূচি (উপকর্মসূচি ১), যা রেগুলেশন, করপোরেট শাসন, সম্পদের গুণগত মান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে এবং ৪০০ মিলিয়ন ডলারের জলবায়ু-সহনশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি (উপকর্মসূচি ২), যা জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে নির্গমন হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি প্রচারের জন্য পরিকল্পিত।
এডিবি জানিয়েছে, উন্নত প্রকল্প প্রস্তুতি ও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার কারণে ২০২৫ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এসেছে। পাশাপাশি সার্বভৌম নয় এমন অর্থায়নের মাধ্যমে বস্ত্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বাণিজ্য অর্থায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, ক্ষুদ্রঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বেসরকারি বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এডিবি ৭২০ মিলিয়ন ডলারসহ অর্থায়ন সংগ্রহে সহায়তা করেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নীতিগত সহায়তা দিয়েছে।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে এডিবির সার্বভৌম ও সার্বভৌম নয়—দুই ধরনের ঋণ প্রতিশ্রুতির মোট পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৪২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে দেশে এডিবির ৪৮টি সক্রিয় সার্বভৌম প্রকল্প রয়েছে, যার মোট মূল্য ১০.৮ বিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে এডিবি জানায়, অর্থনৈতিক করিডর উন্নয়ন, বহুমাত্রিক লজিস্টিকস জোরদার, সরকারি ও পুঁজিবাজার সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করাই হবে তাদের মূল অগ্রাধিকার।
এডিবি একটি শীর্ষস্থানীয় বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এডিবির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৬৯, যার মধ্যে এশীয় অঞ্চলের সদস্য ৫০।
দেশে প্রাণী স্বাস্থ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে তিন দিনব্যাপী আহকাব আন্তর্জাতিক এক্সপো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
‘সুস্থ প্রাণী, সমৃদ্ধ জাতি’ স্লোগানে আগামী ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি রাজধানীর পূর্বাচল এক্সপ্রেস হাইওয়ে-সংলগ্ন ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরাতে (আইসিসিবি) অনুষ্ঠিত হবে অ্যানিম্যাল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আহকাব)-এর ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক এক্সপো-২০২৬।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান আয়োজকরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- আহকাবের সভাপতি সায়েম উল হক, সেক্রেটারি জেনারেল মো. আনোয়ার হোসেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. সবুর, আইটি ও মিডিয়া সাব-কমিটির আহ্বায়ক রাশেদুল জাকির, সদস্য তারিকুর রহমান, ডা. রাকিবুলসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, এবারের এক্সপোতে ১৪টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এতে থাকবে ১২৮টি বিদেশি স্টল ও ৬৫ জন আন্তর্জাতিক প্রদর্শক। পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করবে।
তারা আরও জানান, আগামী বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুর ৩টায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এক্সপোর উদ্বোধন করবেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক ডা. মো. আবু সুফিয়ান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সুস্থ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ জীবিকাকে শক্তিশালী করে দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে সুস্থ পোষা প্রাণী মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তারা বলেন, শক্তিশালী ভেটেরিনারি সেবা ও কার্যকর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়।
এর ফলে মানুষ ও পরিবেশ উভয়ই সুরক্ষিত থাকে। এ এক্সপো খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, বাণিজ্য ও রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে।
তারা আরও বলেন, এক্সপোতে দেশি-বিদেশি শীর্ষ কোম্পানির আধুনিক পণ্য, ভ্যাকসিন, ওষুধ, ফিড সলিউশন, ডায়াগনস্টিকস ও প্রযুক্তি প্রদর্শিত হবে। পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক বাণিজ্য বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। খামারি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, কৃষি উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগও থাকবে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় সকল করদাতাদের রিটার্ন e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। করদাতাগণ কর্তৃক এযাবতকালে হার্ড কপি আকারে দাখিলকৃত সকল মাসিক রিটার্ন অনলাইন সিস্টেমে এন্ট্রি করার জন্য e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ Hard Copy Return Entry নামে একটি নতুন সাব-মডিউল সংযোজন করা হয়েছে। উক্ত সাব-মডিউলটির কর্মসম্পাদন প্রক্রিয়ার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আজ একটি পরিপত্র জারি করেছে। পরিপত্রটি যথাযথভাবে অনুসরণ করে করদাতাগণ নিজেরাই e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ তাদের পূর্বের দাখিলকৃত হার্ড কপি রিটার্ন সিস্টেমে এন্ট্রি করতে পারবেন।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় করদাতা কর্তৃক দাখিলকৃত পেপার রিটার্ন (হার্ড কপি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ এন্ট্রিকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের CPC (Central Processing Centre) ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ভ্যাট কর্মকর্তাগণ করদাতাদের দাখিলকৃত হার্ড কপি রিটার্নের তথ্য সিস্টেমে এন্ট্রি করেন। ভ্যাট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ডেটা এন্ট্রি করা হলে এতে কোনো ভুল হলে এর দায়-দায়িত্ব নির্ধারনে জটিলতা তৈরি হয়। তাছাড়া, ভ্যাট অফিস কর্তৃক বিপুল পরিমান পেপার রিটার্ন e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ এন্ট্রি দেয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ কাজ। বিদ্যমান পদ্ধতিতে দাখিলকৃত পেপার রিটার্ন e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ যথাসময়ে এন্ট্রি কওরা সম্ভব হয় না বিধায় করদাতাগণের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুদ ও জরিমানা আরোপিত হচ্ছে। এ কারণে পরবর্তীতে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে চাইলেও জরিমানা পরিশোধ না করে অনলাইনে রিটার্ন দেয়ার সুযোগ না থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করদাতা অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন না।
Hard Copy Return Entry সাব-মডিউলটি সংযোজনের ফলে যে সকল করদাতা মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৬৪ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে হার্ড কপি রিটার্ন দাখিল করেছেন তারা এখন জরিমানা ও সুদ ব্যতিরেকে e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ তাদের দাখিলকৃত হার্ড কপি রিটার্ন নিজেরাই এন্ট্রি করতে পারবেন। করদাতাগণ তাদের ই-মেইল ও মোবাইল ফোনে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এর লিঙ্ক পাবেন যার মাধ্যমে সহজেই Hard Copy Return Entry সাব-মডিউলটি ব্যবহার করতে পারবেন।
পূর্বের দাখিলকৃত সকল হার্ডকপি রিটার্ন করদাতাগণ আগামী ৩১/০৩/২০২৬ তারিখ পর্যন্ত কোন জরিমানা ও সুদ ব্যতিরেকে সিস্টেমে নিজেরাই এন্ট্রি করতে পারবেন। পূর্বের দাখিলকৃত পেপার রিটার্নগুলো e-VAT System (ই-ভ্যাট সিস্টেম) এ এন্ট্রি সম্পন্ন হলে সকল করদাতা নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাদের সকল ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে দাখিল করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সকল কার্যক্রম ডিজিটাল করার মাধ্যমে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদীহিতা আনার চলমান উদ্যোগে সম্মানিত করাদাতাগণের সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসে পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণেও ব্যাপক গতির সঞ্চার হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই চট্টগ্রাম কাস্টমস ৩১ হাজার ৬০২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিশাল অংকের রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই অর্থবছরের জন্য শুরুতে ৯২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২৭ বছর আগের তুলনায় বর্তমানের রাজস্ব আহরণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া দেশের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে বর্তমানে চিনি, ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে রাজস্ব আদায়ের ধারাটি বেশ ইতিবাচক রয়েছে। কাস্টমসের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করছেন যে, আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছরের নির্ধারিত ১ লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করা সম্ভব হবে। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সার্ভার জটিলতা এবং পণ্য পরীক্ষা বা এক্সামিনেশন সংক্রান্ত কিছু বিড়ম্বনার কথা জানানো হয়েছে, যা নিরসন করা গেলে রাজস্ব আদায়ের গতি আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতাও আগের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বমানের বন্দরের তালিকায় এর অবস্থানকে আরও সুসংহত করছে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারবাহী পণ্যের ৯৮ শতাংশই এই বন্দরের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং করা হয়। ২০২৫ সালে এই বন্দর রেকর্ড পরিমাণ কনটেইনার এবং জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে, যেখানে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫ শতাংশ এবং কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ইউএস কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে বন্দরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
বন্দরকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করতে বর্তমানে ‘পোর্ট ইকোসিস্টেম’ এবং ‘পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম’ প্রবর্তনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে বন্দরে নতুন ৭০ হাজার বর্গমিটারের বিশাল ইয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে এবং ভারী পণ্য ওঠানামার জন্য লালদিয়া এলাকায় নতুন জেটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বে টার্মিনালে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আধুনিক কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে, যা সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। মূলত আধুনিকায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমন্বয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্দর এখন দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
নতুন বছরের শুরুতেই সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি খরচের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তাপর্যায়ে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপি গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আজ রোববার বিকেলে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগের মাসের তুলনায় ৫৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের বর্তমান মূল্য ১ হাজার ২৫৩ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকায়। নতুন এই মূল্য আজ রোববার সন্ধ্যা থেকেই সারা দেশে কার্যকর হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এলপি গ্যাসের পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি লিটারে অটোগ্যাসের দাম বেড়েছে ২ টাকা ৪৮ পয়সা। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের তারতম্য বিবেচনা করে প্রতি মাসেই বিইআরসি এই দাম সমন্বয় করে থাকে। তবে নতুন বছরের শুরুতেই এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের রান্নার খরচ এবং যাতায়াত ব্যয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ডিসেম্বর মাসেও এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল। গত মাসে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও লিটার প্রতি ১ টাকা ৭৪ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছিল। টানা দুই মাস ধরে গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় খুচরা বাজারের ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সরকারি এই নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার জন্য নিয়মিত তদারকি করা হবে। কোনো বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দাবি করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মিয়ানমারে চলমান দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র টেকনাফ স্থলবন্দর গত ৯ মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নাফ নদের মিয়ানমার অংশে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) ব্যাপক দাপট থাকায় পণ্যবাহী নৌযান চলাচল এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ধস নেমেছে এবং সরকার গত কয়েক মাসে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে এবং নাফ নদে পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে জান্তা সরকারের সাথে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধের জেরে সীমান্ত বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১২ এপ্রিল মংডু থেকে পণ্যবাহী বোট বন্দরে এসেছিল, যার পর থেকে আর কোনো বড় চালান টেকনাফে পৌঁছায়নি।
স্থলবন্দরের বর্তমান চিত্র অত্যন্ত করুণ এবং এক সময়ের ব্যস্ত এই এলাকা এখন প্রায় জনমানবহীন প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। শত শত ট্রাক ও শ্রমিকের আনাগোনার বদলে এখন সেখানে খাঁ খাঁ করছে তালাবদ্ধ গুদাম এবং খালি ঘাট। এমনকি বন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরাও এখন অনেকটা অলস সময় পার করছেন এবং লোকবল কমিয়ে আনা হয়েছে। বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে তাদের প্রায় ৩০ লাখ টাকা করে লোকসান গুণতে হচ্ছে এবং গত ৯ মাসে এই ক্ষতির পরিমাণ তিন কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনেক পচনশীল পণ্য গুদামেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত করেছে। অনেক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বড় ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে এখন বিকল্প পথ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।
এই সংকটের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, যেখানে অন্তত ১০ হাজার মানুষ সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার নিবন্ধিত শ্রমিক ছাড়াও ট্রাকচালক, হেল্পার ও ছোট ব্যবসায়ীরা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্রমিক নেতাদের মতে, এই বন্দর ছিল টেকনাফ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা নির্বাহের পথ, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পরিবারগুলো চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতিসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাণিজ্য পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে আটকে থাকা পণ্যগুলো নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সীমান্ত বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বর্তমানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় দিন গুনছেন।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর, মোংলা বন্দরে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬ অর্থবছর) ছয় মাসে ২৮টি কন্টেইনার জাহাজসহ রেকর্ড ১৭ হাজার ৩৮৭টি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
সমুদ্র বন্দরটিতে গত ছয় মাসে রেকর্ড ৪৪০টি বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর করেছে, যার ফলে এর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সময়কালে, মোট ৫ হাজার ২৪৪টি আমদানি করা গাড়ি ১৫টি জাহাজের সঙ্গে নোঙর করা হয়েছিল, যেখানে ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭০টি পণ্য আমদানি করা হয়েছিল এবং ৪২ হাজার ৬৭১টি পণ্য রপ্তানি করা হয়েছিল বন্দর থেকে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের (এমপিএ) উপসচিব মো. মাকরুজ্জামান নিশ্চিত করেন, ১ জুলাই, ২০২৪ থেকে ৩০ জুন, ২০২৫ পর্যন্ত, বন্দরটি ২৬টি জাহাজের মাধ্যমে ১ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার ৬১১ টন আমদানিকৃত পণ্য এবং ৮৭ হাজার ৮০০ টন রপ্তানিকৃত পণ্য পরিচালনা করেছে এবং ১১ হাজার ৫৭৯টি রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানি করেছে।
১ জুলাই, ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত গত ছয় মাসে ৬৩.৭০ লাখ টনেরও বেশি পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১.০৪ কোটি টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মোংলা বন্দরে জাহাজ আগমন আকর্ষণের জন্য বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এমপিএ রেকর্ড জাহাজ নোঙর করেছে।
মাকরুজ্জামান উল্লেখ করেন, খাদ্যশস্য, সিমেন্টের কাঁচামাল, ক্লিংকার, সার, অটোমোবাইল, যন্ত্রপাতি, চাল, গম, কয়লা, তেল, পাথর, ভুট্টা, তৈলবীজ এবং এলপিজির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি সহজতর করে জাতীয় চাহিদা পূরণে বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া, মোংলা বন্দর সাদা মাছ, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, কাঁকড়া, মাটির টাইলস, রেশম কাপড় এবং সাধারণ পণ্যসম্ভারসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এমপিএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০.৪১ মিলিয়ন টন পণ্যসম্ভার পরিচালনার মাধ্যমে ৩৪৩.৩৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে একটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে।
নিট মুনাফা হয়েছে ৬২.১ কোটি টাকা, যা এমপিএ নির্ধারিত ২০.৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০৩.৪৯ শতাংশ বেশি।
এই সময়ের মধ্যে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর দিয়ে মোট ১১ হাজার ৫৭৯টি রিকন্ডিশনড যানবাহন আমদানি করা হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানায়, মোংলা-ঘাসিয়াখালী রুটসহ বেশ কয়েকটি নদীপথে ড্রেজিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ফলে বৃহত্তর জাহাজগুলি সরাসরি বন্দর জেটিতে ভিড়তে সক্ষম হয়েছে। এই উন্নয়নের ফলে নাব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে, যা বন্দরে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন, বন্দর তিনটি প্রধান বিভাগেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে: কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো ভলিউম এবং জাহাজ আগমন।
নৌপরিবহন বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত বছর একাধিকবার বন্দর পরিদর্শন করেছেন এবং এর কার্যক্রমের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
আমদানিকৃত প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, সার, পুনঃনির্ধারিত যানবাহন, এলপিজি, স্ল্যাগ, চুনাপাথর, সয়াবিন তেল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেল, তাজা পণ্য, সাধারণ পণ্যসম্ভার, জিপসাম, যন্ত্রপাতি, কাঠ, কয়লা, পাথর, ক্লিঙ্কার, পাম তেল, ফার্নেস তেল, উড়াল ছাই, লোহা, তেলবীজ, ইস্পাত পাইপ এবং গুড়।
প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চিংড়ি, সাদা মাছ, শুকনো মাছ, কাদামাটি, কাঁকড়া, যন্ত্রপাতি, সুতির সুতা, হিমায়িত খাবার এবং অন্যান্য সাধারণ পণ্য।
সরকারি নির্দেশনা অনুসারে, বন্দর কর্তৃপক্ষ শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডোর এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে আসছে যাতে কার্যক্রম নিশ্চিত করে পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়।
নৌযান আগমন বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য, এমপিএ একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবসা উন্নয়ন স্থায়ী কমিটিও গঠন করেছে, যা ইতোমধ্যেই কার্যকর ইতিবাচক ফলাফল প্রদান করেছে।