যতবারই এ দেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ততবারই দেখা গেছে একশ্রেণির মানুষ হইহই, রইরই, গেল গেল সব গেল, শিক্ষা গেল, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গেল- এমন সব কথা বলে রাস্তায় মিছিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার করে আসছে। চলতি বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার আগে এবং পরেও চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেওয়ার নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। কোথাও অভিভাবকরা, কোথাও শিক্ষকরা, কোথাও বা বিশেষজ্ঞ নামেও নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। নতুন এ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী আগামী নতুন বছরে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, ধর্মীয় উন্মাদনা, মিথ্যাচার ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা গোটা জাতিকেই যেন জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, বলার চেষ্টা হচ্ছে আপনারা কেন ঘুমিয়ে আছেন, প্রতিবাদ করুণ ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও অনেকে শিক্ষাক্রমকে অপপ্রচারের শিখণ্ডী বানাতে মাঠে নেমে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব আজগুবি কথা প্রচার করা হচ্ছে যা উচ্চারণ করাও শোভনীয় নয়।
শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হতেই পারে; কিন্তু সেটি পাঠ্য বিষয়ের বিভিন্ন সূচি ধরে ধরে গঠনমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেই সাধারণত করা হয়ে থাকে। সেসবের চেষ্টা দেখি না। যা কিছু বলা হয়, তা গড়ে হরিবোল বললেও যেন কম বলা হবে। এভাবে তো কোনো শিক্ষাক্রমকে মূল্যায়ন করা যায় না। শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষার দর্শন, হৃদপিণ্ড যা একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞই বোঝেন। যেমন- একজন হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার মানুষের হৃদপিণ্ড সম্পর্কে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের এখানে পাঠ্যবই নিয়ে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে অনেকেই মাঠে নেমে পড়েন। অনেকের গাইড বইয়ের ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা থেকে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকদের মধ্যে ঘৃতাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার অনেক শিক্ষক নিজেদের লাভালাভ হিসাব করেও এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। বর্তমান শিক্ষাক্রম নিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পাঠদানের পরিবর্তে বই ছুড়ে মেরে শিক্ষামন্ত্রীকে গালাগাল করছেন এমন কথাও আমি শুনতে পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে গোটা বিষয়টাই আমার কাছে খুব বেশি অবাক হওয়ার মতো নয়। কারণ ’৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে হালের নতুন শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের নানা অবস্থান আমার দেখা বিষয়, বোঝারও বিষয়। স্পষ্টই বুঝতে পারি যে শিক্ষাক্রম নিয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের বক্তব্যে থাকে গঠনমূলক সমালোচনা। বাকি যারা উঠেপড়ে সমালোচনা করেন তাদের নানান জনের নানা উদ্দেশ্য, স্বার্থ, অজ্ঞতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি কোনোকালেই জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম দ্বারা গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাই নানা অব্যবস্থাপনায় আক্রান্ত থেকেছে চিরকালই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে আসেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ’৮০ সালের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এরপর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসা। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পরই নানা গোষ্ঠী নানা অপবাদে এমন একটি শিক্ষানীতিকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল যারা এর ভেতরের দর্শনটি বুঝতে অক্ষম ছিল। তাদেরই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হলো ’৭৫-এর পর। দেশে তখন থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো বিভিন্ন ধারার ও নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে যার মতো করে গড়ে তোলা শুরু করেছে। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হালচাল হলে সেই জাতি কোনোভাবেই শিক্ষার দর্শন দ্বারা গঠিত হতে পারে না। আমরাও সে কারণে হতে পারিনি। আমাদের মধ্যে এতসব বিভাজন সৃষ্টির মূলেই হচ্ছে ‘নামে শিক্ষাব্যবস্থা, বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির অব্যবস্থা’। সেটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের আসল রূপ। আমাদের কোনো স্তরেই শিক্ষাক্রম ঠিক নেই। যে যার মতো করে প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ছে, বই-পুস্তক ঠাসা আর পরীক্ষার জাঁতাকলে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করার এক ভয়ংকর তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় জাতির কয়েকটি প্রজন্মও তেমনি কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিকার দক্ষ, জীবন, কর্ম, জ্ঞান ও সৃজনশীলতায় বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মানব গড়ে তুলতে আমরা পেরেছি বলে দাবি করতে পারব না। কারণ শিক্ষার দর্শনই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষার দর্শন হচ্ছে কি পড়ব বা পড়াব, কেন পড়ব বা পড়াব, পড়ার অর্জনটা কী হবে বা হবে না- সেটি হাতেনাতে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি দাবি করতে পারব যে আমাদের এ ৫ দশকের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে প্রতিবছর হাজার হাজার ধনী ঘরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কেন? একবারও কি আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি? আমাদের করণীয় কী সেগুলো সম্পর্কে কতজনই বা আমরা অবহিত? কিন্তু যখনই দেশে শিক্ষায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই বিরোধিতাটা প্রবলভাবেই আসে, বিরোধিতাটা যদি গঠনমূলক হতো তাহলে আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু গোটা বিরোধিতাটাই যখন ব্যঙ্গাত্মক, বিদ্রূপাত্মক এবং নানা ধরনের শ্লেষ, মনগড়া, ধর্মকে মিশিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন বুঝতেই হবে এত বছরের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বের হয়ে এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই শিখনফল ব্যঙ্গবিদ্রূপ, তামাশা, অপরাজনীতি ও বিভ্রান্ত করতে যতটা ‘পারদর্শিতা’ অর্জন করেছে, নীতি-নৈতিকতা, যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞানে দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষরূপে গড়ে উঠতে অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। কারণ সেই শিক্ষাক্রমটাই এতদিনকার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা হয়নি। একটা উদাহরণ দিই। শ্রীলঙ্কা আমাদের চেয়ে ছোট দেশ হলেও নানাভাবে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেছে। দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে কারণেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গেল বছর তাদের দেশে অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন করেছিল। এমনকি সরকারপ্রধানের প্রাসাদও দখল করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে কেউ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কিছুই ধ্বংস করেনি। এর মানে কী? আমরা কি এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো ফল বের করতে পারব? এ ধরনের ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটত তাহলে কি হতো? ভাঙচুর, লুটপাট, মারামারি, কাটাকাটি, কি না হতো? শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই পার্থক্যটি টানার কারণ হচ্ছে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ কিছু নীতি-নৈতিকতা, যুক্তি ও বিবেকবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেসবের চর্চা কোথায়? এখানেই বোঝা যায় শিক্ষাক্রমের পার্থক্যের মধ্যেই ভিন্ন জাতি গঠনের কারণ নিহিত থাকার।
বর্তমানে যেই শিক্ষাক্রম সরকার স্কুলপর্যায়ে প্রবর্তন করেছে সেটিকে এক কথায় জীবন, কর্ম ও জ্ঞানমুখী জনশক্তি তৈরি করার আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের আগের সৃজনশীলব্যবস্থা কিছু কিছু সফলতা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পরীক্ষা আর মুখস্থবিদ্যার পুরাতন পদ্ধতির মধ্যেই আমাদের শিক্ষার্থীরা আটকে ছিল। শিক্ষার্থীরা শেষ বিচারে পরীক্ষার্থীই থেকেছে। পরীক্ষার জন্য তাদের গাইডবই ক্রয় করতে আর টিউটরের কাছে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাতে শিক্ষার্থীদের ওপর মুখস্থবিদ্যার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপেছিল। গতানুগতিক শিক্ষায় বিশ্বাসী শিক্ষক ও অভিভাবকরা যুগযুগ ধরে এমনটি দেখে এসেছেন, শিখে এসেছেন। তারা জিপিএ-৫ পাওয়ায় সন্তানের ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কয়জন সেই ভবিষ্যতের মালিক হতে পেরেছেন ? আমাদের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও ছিল গতানুগতিক। শ্রেণিপাঠ, মুখস্তবিদ্যা আদায় করা, পরীক্ষার মূল্যায়নও সেভাবে নির্ধারণ করা হতো। আর এর জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইডবই, শ্রেণিপাঠের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের বাড়ি বাড়ি কোচিং নেওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। এটি কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীর জ্ঞান, জীবন ও শিক্ষার মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এখন পৃথিবীর বেশির ভাগ রাষ্ট্রেই অচল হয়ে গেছে। আমরা যুগযুগ ধরে সেটাকেই নানা নামে অব্যাহত রেখেছি। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তাদের জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা সেভাবে গড়ে উঠছে না। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নেই এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা এবং শিক্ষকতার পেশায় নিজেদের যুক্ত রাখার প্রবণতায় বিরাট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এদের একটা বিরাট অংশই আধুনিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে করোনাকালে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষাক্রম বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু করোনাকাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আগের বোধ, বিশ্বাস আর অভ্যস্ততার মধ্যে গুটিয়ে থাকলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকা যাবে না। পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতায় আসতে হবে।
নতুন শিক্ষাক্রম কেবলই প্রবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে। এর পরিমার্জন, পরিবর্ধন এবং উন্নততর করার আবশ্যকতা থাকতেই পারে; কিন্তু এটিকে বাতিল করে আগের মুখস্থ বিদ্যা এবং গাইডবই, টিউশননির্ভর শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার যারা দাবি করেন তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষা নয়, শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করা হতে পারে। যে শিক্ষকরা সেখানে ফিরে যেতে চান, তারাও একই দোষে দোষী। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা প্রতিটি শিক্ষকেরই দায়িত্ব। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষকেরই পঠনপাঠনের নিয়মিত অভ্যাস নেই। তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা ও শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। অথচ শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ এবং নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী হাতেকলমে শেখন, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই যুগের সঙ্গে যেমন তাল মেলাতে পারেন, শিক্ষার্থীদেরও গড়ে তুলতে অবদান রাখতে পারেন। অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা নয় বরং সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, আস্থা রাখা এবং তাদের জীবন, কর্ম ও জ্ঞান দক্ষতায় গড়ে তোলার শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রতি আস্থাশীল হতেই হবে। অপপ্রচার, গুজব, ব্যঙ্গবিদ্রূপ শিক্ষার সঙ্গে যায় না, জীবনের সঙ্গেও নয়। এটাই শিক্ষার দর্শন।
লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের প্রধান দুই পুঁজিবাজারে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সবকটি সূচকের বড় উত্থান ঘটেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দীর্ঘ দুই মাস পর লেনদেনের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৯৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া শরিয়াহ সূচক এবং বাছাই করা ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক যথাক্রমে ৩ ও ২০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬৫ এবং ২ হাজার ৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকায় সূচকের এই ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে এদিন ১ হাজার ৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা গত ১৭ ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ লেনদেন। গত কার্যদিবসের তুলনায় এদিন লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বেড়েছে, ১২১টির কমেছে এবং ৫৭টি কোম্পানির দাম অপরিবর্তিত ছিল। বিশেষ করে ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী ১৩০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের ৪৭টি কোম্পানির দরও ইতিবাচক ছিল। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে সিটি ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
এদিকে অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের বড় উত্থান হলেও লেনদেনের গতি ছিল কিছুটা নিম্নমুখী। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এদিন ৬০ পয়েন্ট বেড়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১০টির দাম বৃদ্ধি পেলেও ৯১টির দর কমেছে এবং ২৯টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। তবে বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ গত দিনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে ১৭ কোটি ৫২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহের শুরুর দিকে কিছুটা দরপতন থাকলেও তৃতীয় দিনের ধারাবাহিকতায় চতুর্থ দিনে বাজারের এই চাঙ্গাভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করা, করের হার সমসাময়িক করা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং আহরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রাক-বাজেট সংলাপে ডিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে ৫৪টি সুপারিশ সম্বলিত প্রস্তাবনার সারসংক্ষেপ এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের কাছে উপস্থাপন করেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ড. একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী।
প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিদ্যমান করহার ২৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা, সাধারণ নাগরিকদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা এবং বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম কর ৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি কাস্টমস ও ভ্যাট রিফান্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে সম্পূর্ণ অটোমেশন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। ডিসিসিআই-এর সংশ্লিষ্ট কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, করজাল সম্প্রসারণ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হলে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে।
সংলাপে ড. পাটোয়ারী আরও বলেন, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য বিনিময়ের জন্য সেন্ট্রাল এপিআই ইন্টিগ্রেশন চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া কোম্পানির আমানতের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা এবং নিট সম্পদের ওপর আরোপিত সারচার্জ ধাপে ধাপে বিলোপ করার প্রস্তাব দেন তিনি। তার মতে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ভ্যাট রিফান্ডের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভ্যাট সংগ্রহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
ব্যবসায়ীদের এসব প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, আসন্ন বাজেটে শুল্ক হার কমানোর চেয়ে নন-ট্যারিফ বাধা দূর করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে এবং অর্থনীতির চাকায় নতুন গতি সঞ্চার হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, কর ফাঁকিদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে এনবিআর কঠোর অবস্থানে থাকবে, তবে সৎ করদাতারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখের কম হলেও অর্থনীতির বিশালত্ব বিবেচনায় এটি কোটির ঘরে থাকা উচিত ছিল। তিনি জানান, করপোরেট করহার ইতিমধ্যে কমিয়ে ২৭.৫ শতাংশে আনা হয়েছে এবং কার্যকর করহার যেন আর না বাড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে করপোরেট রিটার্ন দাখিল অনলাইনে বাধ্যতামূলক করা হবে এবং ভ্যাট ও কর রিফান্ড ব্যবস্থাও ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। উক্ত বৈঠকে ডিসিসিআই-এর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৫ হাজার ১২৫ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫.১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫,১২৫.৯০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর হিসাব পদ্ধতি ‘বিপিএম-৬’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ ৩০.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর আগে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৫,০৩৮ মিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩০,৩৬৬.২৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভে সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মোট রিজার্ভ (গ্রস রিজার্ভ) থেকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় বাদ দিলে প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ নির্ধারণ করা হয়, যা দেশের বৈদেশিক লেনদেন সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ নির্ধারণ এবং এটিকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ প্রস্তুতকারকরা।
এ প্রস্তাবনা আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর কাছে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)।
বর্তমানে রপ্তানির বিপরীতে ১ শতাংশ হারে উৎসে কর আদায় করা হচ্ছে, যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধন আটকে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ হার কমানো হলে শিল্পখাত উৎসাহিত হবে এবং রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এই প্রেক্ষাপটে, আগামী পাঁচ বছরের জন্য উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, বর্তমানে চূড়ান্ত কর নির্ধারণের সময় উৎসে কাটা কর সমন্বয় করা হয়, ফলে এটিকে চূড়ান্ত কর হিসেবে নির্ধারণ করলে সরকারের রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বিজিএপিএমইএ জানায়, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন পণ্যে রপ্তানি প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে উৎসে কর কমানো হলে রপ্তানি খাত উৎসাহিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধি পাবে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, উচ্চ হারে উৎসে কর কাটার কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, ডলার সংকট এবং আর্থিক ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত আয়করমুক্ত সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলে কর প্রদানে আগ্রহ বাড়বে এবং রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
এছাড়া কোম্পানির সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতের সুদ বা মুনাফার ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকে বিনিয়োগে আগ্রহী হয় এবং তারল্য সংকট মোকাবিলা সহজ হয়।
এছাড়া মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২–এর “প্রচ্ছন্ন রপ্তানি” সংজ্ঞা সংশোধনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সংজ্ঞায় তিনটি শর্ত থাকলেও আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়া অন্য শর্তগুলোতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন ও স্থানীয় ঋণপত্রের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংজ্ঞাটিকে আরও আধুনিক ও বাস্তবসম্মত করতে সব ধরনের এলসি, সেলস কনট্রাক্ট, পারচেজ অর্ডারসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক দলিল অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি রপ্তানি মূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরটিজিএস, এফডিডি, এফটিটি ইত্যাদি লেনদেন পদ্ধতিকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) তা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। প্রধান বাজার ডিএসইর মূল সূচক ডিএসইএক্স ২৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৫৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া শরিয়াহ সূচক ও ডিএসই-৩০ সূচক যথাক্রমে ২ ও ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১০৬২ ও ১৯৮৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইতে এদিন মোট ৯২৯ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে, যা গত কর্মদিবসের তুলনায় ১০৫ কোটি টাকা বেশি। বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৮৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১৫টির শেয়ার দর বেড়েছে এবং ১০৮টির দাম কমেছে, যেখানে ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। লেনদেনের এই চাঙ্গাভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের পুঁজিবাজার সিএসইতে সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১২ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৭৩৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে এই বাজারে লেনদেনের অংক আগের দিনের তুলনায় প্রায় ১ কোটি টাকা কমে ৩৩ কোটি ২৯ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। সিএসইতে হাতবদল হওয়া ২১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১৬টির দর বৃদ্ধি পেলেও ৭৭টির দাম কমেছে এবং ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম আগের অবস্থাতেই স্থির রয়েছে।
ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছে নয়টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)। মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের নিকট এই সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বিসিসিসিআই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ জেড এম আজিজুর রহমান। তিনি দুই দেশের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্প বিকাশের স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জামিলুর রহমান জানান যে, বর্তমানে শুধুমাত্র সরকারি পর্যায়ে এলএনজি আমদানির সুযোগ রয়েছে। তিনি দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বেসরকারি খাতকেও এলএনজি আমদানির অনুমতি দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান। জবাবে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান যে, জ্বালানি সমস্যা নিরসনে সরকার অত্যন্ত সক্রিয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে। এলএনজি আমদানির প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে সহায়ক হতে পারে।
সভায় চীনা উদ্যোক্তাদের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট চাও চংচং দাপ্তরিক নথিপত্র যাচাইকরণের জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং চেম্বারের অন্যান্য সদস্যরা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকালে উদ্ভূত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ৯ দফা সুপারিশের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। উক্ত বৈঠকে বিডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিসিসিসিআই-এর নির্বাহী পরিচালক আবু তাহেরসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
ভ্যাট রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি ডিজিটাল করার সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে ব্যবসায়ীরা নানাবিধ কারিগরি ও দাপ্তরিক জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। মঙ্গলবার বিকেলে এনবিআর কার্যালয়ে আয়োজিত প্রাক-বাজেট সংলাপে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ উত্থাপনের পর সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান দায়িত্ব পালনে ত্রুটির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, গ্রাহক সেবায় অবহেলা বা কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংলাপে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হারেস মোহাম্মদ অভিযোগ করেন যে, দীর্ঘকাল ধরে ম্যানুয়ালি রিটার্ন জমা দিলেও বর্তমানে তা গ্রহণ করা হচ্ছে না। অথচ দাপ্তরিকভাবে পুরোনো তথ্য অনলাইনে হালনাগাদ না থাকায় নতুন করে রিটার্ন দাখিল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি মাঠপর্যায়ের সমস্যাটি তুলে ধরে বলেন, “প্র্যাকটিক্যালি অনেকদিন ধরে আমরা ম্যানুয়ালি রিটার্ন দিচ্ছি। এখন সেটি রিসিভ করছে না। কিন্তু অনলাইনে দিতে গেলে বলছে—আপনার ডেটা আপডেট নেই, আগে আপডেট করতে হবে। কিন্তু এই আপডেট কীভাবে করব, সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, তথ্য হালনাগাদ করতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের নামে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
এনবিআর চেয়ারম্যান জবাবে বলেন যে, অনলাইন ব্যবস্থার লক্ষ্যই ছিল ব্যবসায়ীদের দাপ্তরিক কাজ দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজতর করা। তথ্য হালনাগাদ করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল এবং অনেকেই তা সম্পন্ন করেছেন। তবে ব্যবসায়ীরা যখন বিভিন্ন স্তরের আমলাতান্ত্রিক বাধার কথা উল্লেখ করেন, তখন চেয়ারম্যান আশ্বস্ত করে বলেন, “কোনো চেক নেই। যদি কোথাও পেন্ডিং থাকে, সেটির রিপোর্ট আমরা আজ সন্ধ্যায় নেব। কোথায় কতগুলো পেন্ডিং আছে তা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হবে, যাতে দ্রুত সব অনুমোদন দেওয়া হয়। কেউ অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” আলোচনার এক পর্যায়ে ম্যানুয়ালি নেওয়া তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “একদম ঠিক বলেছেন। এটা আমাদের দায়িত্ব ছিল, আমরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছি।”
আলোচনায় উঠে আসে যে, ভ্যাট কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলির কারণেও ব্যবসায়ীরা স্থায়ী কোনো সমাধান পাচ্ছেন না এবং একই সমস্যার জন্য বারবার বিভিন্ন দপ্তরে ধরণা দিতে হচ্ছে। এনবিআর প্রধান ব্যবসায়ীদের সব সমস্যা খোলাখুলি বলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের কোনো জটিলতা থাকার কথা নয়। আপনারা মন খুলে সমস্যার কথা বলুন, আমরা সমাধানের চেষ্টা করবো।” তবে আলোচনার শেষ পর্যায়ে মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে ব্যবসায়ী নেতা হারেস মোহাম্মদ মন্তব্য করেন, “আমরা ম্যানুয়ালি রিটার্ন দিয়েছি, কিন্তু অনলাইনে দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছি। আপনাদের কাছে অনেক সময় পৌঁছানোই যায় না—অফিসের ভেতরে নানা স্তরের বাধা থাকে। সমস্যাটা এখানেই। গত মাসেও আপডেট না হওয়ায় আমাকে ম্যানুয়ালি রিটার্ন জমা দিতে হয়েছে। এই মাসেও একই কারণে সেটাই করতে বাধ্য হয়েছি। এটিই বাস্তবতা।”
প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) তানভীর গনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় দেশের পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেম, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতা, ডিএসই’র ভূমিকা এবং সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি ডিএসই’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ও উঠে আসে।
বৈঠকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও জোরদার করা এবং বাজারের গভীরতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পৌনে দুই লাখ মেট্রিক টন তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ও ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৯৮ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
বৈঠক পরবর্তী তথ্যানুযায়ী, "ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য" ডিবিএস ট্রেডিং হাউস এফজেডসিও থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৫০ হাজার টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন কেনা হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য ১ হাজার ২৩ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অন্য একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আর্চার এনার্জি এলএলসি থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৪ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার টাকা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের মজুত ব্যবস্থা সচল রাখতে নিয়মিতভাবেই এ ধরনের আমদানির প্রস্তাবগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সভায় জ্বালানি খাতের পাশাপাশি অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার একটি পানি সরবরাহ প্রকল্পের জন্য ফিখ্টনার জিএমবিএইচ অ্যান্ড কো. কেজি (জিইআর) নামক বিদেশি সংস্থাকে পরবর্তী ২৪ মাসের জন্য পুনরায় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে কমিটি, যার জন্য সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৯৭ কোটি টাকা। এছাড়া খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে উন্মুক্ত দরপত্রের ভিত্তিতে ২১৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ৩ কোটি নতুন হেসিয়ান বস্তা ক্রয়ের একটি প্রস্তাবও বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। মোট ১৯টি দরদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই বস্তাগুলো সংগ্রহ করা হবে বলে জানা গেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ ৬৯ হাজার টন ডিজেল ও অকটেন নিয়ে একযোগে পাঁচটি বিশাল জাহাজ পৌঁছেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানির মধ্যে ইতিমধ্যে দুটি জাহাজ থেকে তেল খালাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায় যে, ‘এমটি ওকট্রি’ ও ‘এমটি কেপ বনি’ নামক দুটি জাহাজ ডলফিন জেটিতে নোঙর করে প্রায় ৬৮ হাজার টন ডিজেল খালাস করছে। এই সরবরাহ আসার ফলে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট নিরসনে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে আরও তিনটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ‘এমটি লিয়ান সং হু’ প্রায় ৪১ হাজার টন ও ‘এমটি প্যাসিফিক ইন্ডিগো’ ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ভারত থেকে এসেছে এবং তাইওয়ান থেকে ‘এমটি নাভে সিয়েলো’ নিয়ে এসেছে প্রায় ২৭ হাজার টন অকটেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (গণসংযোগ) ফারজিন হাসান মৌমিতা গণমাধ্যমকে বলেন, “জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় রয়েছে। সেগুলো ধীরে ধীরে জেটিতে ভিড়বে এবং শিগগিরই জ্বালানি খালাস করা হবে।” তিনি আরও প্রত্যাশা করেন যে, এই জাহাজগুলো থেকে তেল খালাস সম্পন্ন হলে দেশের সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বিপিসির বাণিজ্যিক ও পরিচালনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন জানান, আমদানিকৃত এই জ্বালানি দ্রুততম সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ডিপোসমূহে সরবরাহ করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া গত ১৯ দিনে বিপিসি দেশের অভ্যন্তরীণ তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও ১৫ হাজার ১৭০ টন অকটেন সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে সুপার পেট্রো পিএলসি একাই ১১ হাজার ৬১৫ টন সরবরাহ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ধারাবাহিকভাবে আরও কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করায় নিকট ভবিষ্যতে দেশে জ্বালানি সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। এই বিশাল মজুত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আহরণে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এনবিআরের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংস্থাটি ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ১১.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুল্ক, ভ্যাট এবং আয়কর—এই তিনটি প্রধান খাতের কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছুঁতে পারেনি। আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর, যেখানে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, যা ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার ঘাটতি নির্দেশ করে। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ঘাটতির পরিমাণ ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং আমদানি শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে। কেবল মার্চ মাসের পরিসংখ্যানেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে ৬০ হাজার ৫০ কোটি টাকার লক্ষ্য থাকলেও সংগৃহীত হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। তবে বছরওয়ারি হিসাবে মার্চ মাসেও ২.৬৭ শতাংশের একটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে।
ভারতের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে টানা চার দিনের জন্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ এই স্থলবন্দরটিতে নির্ধারিত সময়জুড়ে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত থাকবে।
গত সোমবার বিকেলে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বুড়িমারী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এএসএম নিয়াজ নাহিদ।
সংস্থাটির প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জারি করা নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সোমবার পাঠানো ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভারতের চ্যাংরাবান্ধা ও বাংলাদেশের বুড়িমারী স্থলবন্দরের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।
এদিকে, বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় টানা চার দিন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
আগামী শনিবার থেকে আবারও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু হবে।
কুচবিহার জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও ব্যবসায়ীদের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।
এএসএম নিয়াজ নাহিদ বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে মঙ্গলবার থেকে চার দিন সব ধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হয়েছে।’
বুড়িমারী স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুর রহমান জানান, এই সময় ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি চিকিৎসা এবং ভুটান ও নেপালগামী যাত্রীরা এই ইমিগ্রেশন ব্যবহার করতে পারবেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ২১ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ম্যানেজার ও ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের ইনচার্জ কেফায়েতুল ওয়ারেস।
তাদের জানানো অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) পর্যন্ত স্থলবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
পরদিন শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় আগামী শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল থেকে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হবে।
এই সময়ের মধ্যে ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পাসপোর্টধারী যাত্রীদের পারাপারও স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভুটান ও বাংলাদেশ সংলগ্ন জলপাইগুড়ি জেলার আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় ভোটগ্রহণে ঝুঁকি কমাতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, "সরকারি ছুটি দিনসহ মোট চার দিন স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। শনিবার সকাল থেকে আবারও তা স্বাভাবিক হবে।"
বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেফায়েতুল ওয়ারেস বলেন, "আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধের সময়টাতেও স্বাভাবিকভাবে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা খোলা থাকবে। তবে ভারত যেহেতু ভোট উপলক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই তারা পাসপোর্টধারী গ্রহণ করবে না। আর গ্রহণ না করলে কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।"