যতবারই এ দেশে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ততবারই দেখা গেছে একশ্রেণির মানুষ হইহই, রইরই, গেল গেল সব গেল, শিক্ষা গেল, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গেল- এমন সব কথা বলে রাস্তায় মিছিল, সভা-সমাবেশ, সেমিনার করে আসছে। চলতি বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার আগে এবং পরেও চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেওয়ার নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। কোথাও অভিভাবকরা, কোথাও শিক্ষকরা, কোথাও বা বিশেষজ্ঞ নামেও নতুন শিক্ষাক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে। নতুন এ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী আগামী নতুন বছরে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, ধর্মীয় উন্মাদনা, মিথ্যাচার ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা গোটা জাতিকেই যেন জাগিয়ে তোলা হচ্ছে, বলার চেষ্টা হচ্ছে আপনারা কেন ঘুমিয়ে আছেন, প্রতিবাদ করুণ ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও অনেকে শিক্ষাক্রমকে অপপ্রচারের শিখণ্ডী বানাতে মাঠে নেমে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব আজগুবি কথা প্রচার করা হচ্ছে যা উচ্চারণ করাও শোভনীয় নয়।
শিক্ষাক্রম নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হতেই পারে; কিন্তু সেটি পাঠ্য বিষয়ের বিভিন্ন সূচি ধরে ধরে গঠনমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেই সাধারণত করা হয়ে থাকে। সেসবের চেষ্টা দেখি না। যা কিছু বলা হয়, তা গড়ে হরিবোল বললেও যেন কম বলা হবে। এভাবে তো কোনো শিক্ষাক্রমকে মূল্যায়ন করা যায় না। শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষার দর্শন, হৃদপিণ্ড যা একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞই বোঝেন। যেমন- একজন হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার মানুষের হৃদপিণ্ড সম্পর্কে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের এখানে পাঠ্যবই নিয়ে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে অনেকেই মাঠে নেমে পড়েন। অনেকের গাইড বইয়ের ব্যবসা লাটে ওঠার আশঙ্কা থেকে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকদের মধ্যে ঘৃতাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। আবার অনেক শিক্ষক নিজেদের লাভালাভ হিসাব করেও এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। বর্তমান শিক্ষাক্রম নিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পাঠদানের পরিবর্তে বই ছুড়ে মেরে শিক্ষামন্ত্রীকে গালাগাল করছেন এমন কথাও আমি শুনতে পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে গোটা বিষয়টাই আমার কাছে খুব বেশি অবাক হওয়ার মতো নয়। কারণ ’৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে হালের নতুন শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের নানা অবস্থান আমার দেখা বিষয়, বোঝারও বিষয়। স্পষ্টই বুঝতে পারি যে শিক্ষাক্রম নিয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের বক্তব্যে থাকে গঠনমূলক সমালোচনা। বাকি যারা উঠেপড়ে সমালোচনা করেন তাদের নানান জনের নানা উদ্দেশ্য, স্বার্থ, অজ্ঞতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটি কোনোকালেই জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাক্রম দ্বারা গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাই নানা অব্যবস্থাপনায় আক্রান্ত থেকেছে চিরকালই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। শিক্ষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে আসেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ’৮০ সালের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এরপর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসা। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পরই নানা গোষ্ঠী নানা অপবাদে এমন একটি শিক্ষানীতিকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল যারা এর ভেতরের দর্শনটি বুঝতে অক্ষম ছিল। তাদেরই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল হলো ’৭৫-এর পর। দেশে তখন থেকে ব্যাঙের ছাতার মতো বিভিন্ন ধারার ও নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে যার মতো করে গড়ে তোলা শুরু করেছে। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন হালচাল হলে সেই জাতি কোনোভাবেই শিক্ষার দর্শন দ্বারা গঠিত হতে পারে না। আমরাও সে কারণে হতে পারিনি। আমাদের মধ্যে এতসব বিভাজন সৃষ্টির মূলেই হচ্ছে ‘নামে শিক্ষাব্যবস্থা, বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরির অব্যবস্থা’। সেটিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের আসল রূপ। আমাদের কোনো স্তরেই শিক্ষাক্রম ঠিক নেই। যে যার মতো করে প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ছে, বই-পুস্তক ঠাসা আর পরীক্ষার জাঁতাকলে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করার এক ভয়ংকর তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় জাতির কয়েকটি প্রজন্মও তেমনি কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিকার দক্ষ, জীবন, কর্ম, জ্ঞান ও সৃজনশীলতায় বেড়ে ওঠা শিক্ষিত মানব গড়ে তুলতে আমরা পেরেছি বলে দাবি করতে পারব না। কারণ শিক্ষার দর্শনই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষার দর্শন হচ্ছে কি পড়ব বা পড়াব, কেন পড়ব বা পড়াব, পড়ার অর্জনটা কী হবে বা হবে না- সেটি হাতেনাতে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা কি দাবি করতে পারব যে আমাদের এ ৫ দশকের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা যুগোপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে প্রতিবছর হাজার হাজার ধনী ঘরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কেন? একবারও কি আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি? আমাদের করণীয় কী সেগুলো সম্পর্কে কতজনই বা আমরা অবহিত? কিন্তু যখনই দেশে শিক্ষায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই বিরোধিতাটা প্রবলভাবেই আসে, বিরোধিতাটা যদি গঠনমূলক হতো তাহলে আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু গোটা বিরোধিতাটাই যখন ব্যঙ্গাত্মক, বিদ্রূপাত্মক এবং নানা ধরনের শ্লেষ, মনগড়া, ধর্মকে মিশিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে, তখন বুঝতেই হবে এত বছরের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বের হয়ে এসেছেন তাদের বেশির ভাগেরই শিখনফল ব্যঙ্গবিদ্রূপ, তামাশা, অপরাজনীতি ও বিভ্রান্ত করতে যতটা ‘পারদর্শিতা’ অর্জন করেছে, নীতি-নৈতিকতা, যুক্তিবাদী জ্ঞানবিজ্ঞানে দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষরূপে গড়ে উঠতে অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। কারণ সেই শিক্ষাক্রমটাই এতদিনকার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা হয়নি। একটা উদাহরণ দিই। শ্রীলঙ্কা আমাদের চেয়ে ছোট দেশ হলেও নানাভাবে তারা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেছে। দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। সে কারণেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গেল বছর তাদের দেশে অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন করেছিল। এমনকি সরকারপ্রধানের প্রাসাদও দখল করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকে কেউ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কিছুই ধ্বংস করেনি। এর মানে কী? আমরা কি এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেও কোনো ফল বের করতে পারব? এ ধরনের ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটত তাহলে কি হতো? ভাঙচুর, লুটপাট, মারামারি, কাটাকাটি, কি না হতো? শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই পার্থক্যটি টানার কারণ হচ্ছে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ কিছু নীতি-নৈতিকতা, যুক্তি ও বিবেকবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেসবের চর্চা কোথায়? এখানেই বোঝা যায় শিক্ষাক্রমের পার্থক্যের মধ্যেই ভিন্ন জাতি গঠনের কারণ নিহিত থাকার।
বর্তমানে যেই শিক্ষাক্রম সরকার স্কুলপর্যায়ে প্রবর্তন করেছে সেটিকে এক কথায় জীবন, কর্ম ও জ্ঞানমুখী জনশক্তি তৈরি করার আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন। আমাদের আগের সৃজনশীলব্যবস্থা কিছু কিছু সফলতা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পরীক্ষা আর মুখস্থবিদ্যার পুরাতন পদ্ধতির মধ্যেই আমাদের শিক্ষার্থীরা আটকে ছিল। শিক্ষার্থীরা শেষ বিচারে পরীক্ষার্থীই থেকেছে। পরীক্ষার জন্য তাদের গাইডবই ক্রয় করতে আর টিউটরের কাছে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাতে শিক্ষার্থীদের ওপর মুখস্থবিদ্যার চাপ জগদ্দল পাথরের মতো চেপেছিল। গতানুগতিক শিক্ষায় বিশ্বাসী শিক্ষক ও অভিভাবকরা যুগযুগ ধরে এমনটি দেখে এসেছেন, শিখে এসেছেন। তারা জিপিএ-৫ পাওয়ায় সন্তানের ‘উজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কয়জন সেই ভবিষ্যতের মালিক হতে পেরেছেন ? আমাদের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও ছিল গতানুগতিক। শ্রেণিপাঠ, মুখস্তবিদ্যা আদায় করা, পরীক্ষার মূল্যায়নও সেভাবে নির্ধারণ করা হতো। আর এর জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইডবই, শ্রেণিপাঠের চেয়ে কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের বাড়ি বাড়ি কোচিং নেওয়ার দৌড়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। এটি কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীর জ্ঞান, জীবন ও শিক্ষার মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা এখন পৃথিবীর বেশির ভাগ রাষ্ট্রেই অচল হয়ে গেছে। আমরা যুগযুগ ধরে সেটাকেই নানা নামে অব্যাহত রেখেছি। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তাদের জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা সেভাবে গড়ে উঠছে না। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নেই এমন খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা এবং শিক্ষকতার পেশায় নিজেদের যুক্ত রাখার প্রবণতায় বিরাট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এদের একটা বিরাট অংশই আধুনিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে করোনাকালে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষাক্রম বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু করোনাকাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আগের বোধ, বিশ্বাস আর অভ্যস্ততার মধ্যে গুটিয়ে থাকলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকা যাবে না। পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতায় আসতে হবে।
নতুন শিক্ষাক্রম কেবলই প্রবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে। এর পরিমার্জন, পরিবর্ধন এবং উন্নততর করার আবশ্যকতা থাকতেই পারে; কিন্তু এটিকে বাতিল করে আগের মুখস্থ বিদ্যা এবং গাইডবই, টিউশননির্ভর শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার যারা দাবি করেন তাদের উদ্দেশ্য শিক্ষা নয়, শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করা হতে পারে। যে শিক্ষকরা সেখানে ফিরে যেতে চান, তারাও একই দোষে দোষী। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা প্রতিটি শিক্ষকেরই দায়িত্ব। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষকেরই পঠনপাঠনের নিয়মিত অভ্যাস নেই। তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা ও শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। অথচ শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ এবং নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী হাতেকলমে শেখন, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমেই যুগের সঙ্গে যেমন তাল মেলাতে পারেন, শিক্ষার্থীদেরও গড়ে তুলতে অবদান রাখতে পারেন। অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা নয় বরং সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, আস্থা রাখা এবং তাদের জীবন, কর্ম ও জ্ঞান দক্ষতায় গড়ে তোলার শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রতি আস্থাশীল হতেই হবে। অপপ্রচার, গুজব, ব্যঙ্গবিদ্রূপ শিক্ষার সঙ্গে যায় না, জীবনের সঙ্গেও নয়। এটাই শিক্ষার দর্শন।
লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাগজ বা হার্ডকপি আকারে জমা দেওয়া সকল ভ্যাট রিটার্ন ই-ভ্যাট সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার সময়সীমা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। রবিবার (৭ জুন) সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন এন্ট্রি সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্লোজিং ব্যালেন্স ২০২৬ সালের মে মাস থেকে ‘ফ্রিজ’ বা ‘অপরিচালন যোগ্য’ হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই স্থিতির বিপরীতে কোনো প্রকার সমন্বয় করা যাবে না। মূলত করদাতাদের দাখিলকৃত পূর্ববর্তী সকল মাসিক রিটার্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘হার্ড কপি রিটার্ন এন্ট্রি’ নামে একটি বিশেষ সাব-মডিউল চালুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ই-ভ্যাট সিস্টেম পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হার্ডকপি রিটার্ন এখনও অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আগামী জুলাই মাস থেকে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই এই সময়সীমা আরও তিন মাস বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, ভ্যাট রিফান্ড বা অর্থ ফেরতের আবেদন বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শতভাগ রিটার্ন অনলাইনে থাকা এখন থেকে বাধ্যতামূলক। ফলে পূর্বের সকল রিটার্ন সিস্টেমে এন্ট্রি না করলে কোনো প্রতিষ্ঠান রিফান্ডের আবেদন করার যোগ্যতা হারাবে। রাজস্ব প্রশাসনে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করতেই এনবিআর এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে সকল করদাতার সহযোগিতা কামনা করেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে রবিবার (৭ জুন) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একাধিক নিলাম পদ্ধতি অনুসরণ করে দুইটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এই বৈদেশিক মুদ্রা কেনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এদিন প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসের এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে। এছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪১৬ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, টাকার বিনিময় হারের অস্থিরতা কমানোর পাশাপাশি প্রবাসী আয় ও রফতানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারে চলমান কৌশলের অংশ হিসেবেই বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কেনা হচ্ছে।
দেশের ফল রফতানি খাতে এক নজিরবিহীন সাফল্য অর্জিত হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ফল রফতানি করে বাংলাদেশ ১২ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় করেছে। আগের পুরো অর্থবছরে এই খাতের আয় ছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফল রফতানি থেকে আয় বেড়েছে ৮২ শতাংশেরও বেশি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছর ধরে এই খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে আয় ছিল মাত্র ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার, সেখান থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে এই বিশাল উল্লম্ফন জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রফতানি আয়ের সিংহভাগ এসেছে বাদাম (তাজা বা শুকনো) এবং তাজা ফলের বিভিন্ন শ্রেণি থেকে। এছাড়া হিমায়িত ফল ও বাদাম রফতানি থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ফলের প্রধান বাজার হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশি ফলের বিশাল চাহিদা এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তবে আন্তর্জাতিক মূলধারার বাজারে এখনও বাংলাদেশের ফলের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারেনি। মূলত বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান নিয়ন্ত্রণ, উন্নত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রফতানি পণ্যের তালিকায় গ্রীষ্মকালীন ফল আম এখনও শীর্ষে রয়েছে। এর পাশাপাশি পেয়ারা, কাঁঠাল, আনারস, লিচু ও কলার চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলোতে ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফি চাষের প্রসারের ফলে রফতানিযোগ্য ফলের একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও চুক্তিভিত্তিক চাষের প্রসারের ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মান ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে রফতানি বৃদ্ধিতে লজিস্টিকস এবং অবকাঠামোগত কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। উচ্চ বিমান ভাড়া, মৌসুমে কার্গো পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব রফতানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া কোয়ারেন্টিন সনদ প্রদান ও প্যাকেজিং সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা পর্যায়ের রফতানিকারকরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই সেবাগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব হলে ফল রফতানি আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। আম রফতানির বর্তমান মৌসুম শেষে আয়ের এই অংক আরও বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রফতানি আয় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩.৪১ শতাংশ কমে ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের ফলে গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই এই খাতের সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারগুলোতে ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় রফতানিকারকদের মধ্যে বর্তমানে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান গন্তব্য হলেও বর্তমান অর্থবছরে সেখানে রফতানি ৪.৮৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে মোট রফতানি আয় হয়েছে ১৭.৩৬ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপের দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তারা এখন পোশাক ক্রয়ে অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। একই সাথে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও রফতানি প্রবৃদ্ধি কার্যত থমকে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আয় ০.০৪ শতাংশ কমে ৭.০৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মার্কিন খুচরা বিক্রেতারা নতুন অর্ডারের চেয়ে পুরনো মজুত শেষ করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। কেবল বড় বাজারগুলোই নয়, গত কয়েক বছর ধরে বাজার বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে যেসব অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও রফতানি আয় প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৫.৬৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বাজারেও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
পণ্যের ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নিটওয়্যার খাতে রফতানি ৪.২৬ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি ২.৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। টি-শার্ট, সোয়েটার থেকে শুরু করে ওভেন শার্ট ও জ্যাকেট—সব ধরণের পণ্যের চাহিদাই আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে নিম্নমুখী। ক্রেতারা এখন কেবল ক্রয়াদেশ কমিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, বরং উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তারা পণ্যের দাম কমানোর জন্য রফতানিকারকদের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছেন। অভ্যন্তরীণভাবে ক্রমবর্ধমান গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের নতুন মজুরি কাঠামোর কারণে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় রফতানিকারকরা বর্তমানে উভয়সংকটে রয়েছেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, “চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের রফতানি চিত্র থেকে স্পষ্ট যে বৈশ্বিক বাজারে এখনও চাহিদার পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হয়নি। ক্রেতারা এখন আগের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন এবং অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বেশি সতর্ক। ফলে রফতানি আয় ও মুনাফা– দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হচ্ছে।” তার মতে, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান এবং অপ্রচলিত বাজারেও আয় কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এখন প্রায় সব বাজারেই ছড়িয়ে পড়েছে।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা এই খাতের শক্তিশালী ভিত ও স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দেয়। প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে একমাত্র কানাডায় ২.২৭ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা কিছুটা স্বস্তি জোগাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো সম্ভব হলে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ববাজারে তার হারানো অবস্থান ফিরে পেতে পারে। বর্তমান এই মন্দা কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং নতুন ক্রেতা আকর্ষণের বিকল্প নেই। বৈশ্বিক চাহিদার পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত রফতানি আয়ের এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশে ৩৭৫ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি বা তৈরি অবস্থায় (সিবিইউ) আমদানির ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বর্তমানে ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি আমদানির সুযোগ না থাকলেও ২০২৬-২০২৯ সালের জন্য প্রস্তাবিত নতুন আমদানি নীতি আদেশে এই সিসিসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এই বিধান কার্যকর হলে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির মোটরসাইকেল বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি করে বিপণন করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে এবং চলতি মাসেই চূড়ান্ত আদেশ জারি হতে পারে বলে জানা গেছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের উদীয়মান মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী শিল্প খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে দেশে ইতিমধ্যে জাপানি ও ভারতীয়সহ বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের প্রায় ১০টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। এসব কারখানায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত মোটরবাইকগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে নতুন কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে তৈরি বাইক আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে, যা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এছাড়া কিছু অসাধু আমদানিকারক কম মূল্য দেখিয়ে বা কর ফাঁকি দিয়ে উচ্চ সিসির বাইক নিয়ে আসার সুযোগ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা বলছেন যে ঘনঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ ও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
নিরাপত্তার বিষয়েও নতুন চ্যালেঞ্জের কথা সামনে আসছে। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত ক্ষমতার মোটরসাইকেল রয়েছে। জনসাধারণের জন্য এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্ষমতার বাইক উন্মুক্ত করে দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশের মোটরসাইকেলের বাজার মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১০ লাখ উৎপাদনের বার্ষিক লক্ষ্যের বিপরীতে দেশে বর্তমানে ৫ লাখের কম বাইক বিক্রি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক খাতের স্বার্থ বিবেচনা না করে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা অনুযায়ী নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
বিশ্ববাজারে ইস্পাত তৈরির উপকরণের মূল্য গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি মাসে চীনের বাজারে প্রতি টন স্টিল রেবারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ ইউয়ানে, যার ফলে বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইস্পাতের দাম ৩ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত চীন সরকার কর্তৃক গৃহীত বেশ কিছু বড় ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কারণেই বাজার পরিস্থিতিতে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। খবর হেলেনিক শিপিং।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইস্পাতের প্রধান ব্যবহারকারী খাত হিসেবে আবাসন বা গৃহনির্মাণ শিল্পকে বিবেচনা করা হয়। শীর্ষস্থানীয় রেটিং প্রদানকারী সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী বছরের মধ্যে চীনে আবাসন খাতের দরপতনের প্রবণতা ধীর হয়ে আসতে পারে। দেশটির স্থানীয় প্রশাসনগুলো আবাসন বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে শেনজেন অঞ্চলে বাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পূর্বের কঠোর বিধিমালা শিথিল করা হয়েছে এবং গুয়াংজু এলাকায় আবাসন খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসকল উদ্যোগের ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই ধাতুর চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবাসন শিল্পের পাশাপাশি চীনের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও বর্তমানে ইস্পাতের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে চাহিদার বিপরীতে বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, চীনে ইস্পাতের বার্ষিক উৎপাদন ২ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৮ সালের পর থেকে জুন মাসের হিসেবে সর্বনিম্ন উৎপাদন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সরকারি মেগা প্রকল্পের কারণে বাড়তি চাহিদা এবং অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার দ্বিমুখী প্রভাবে ইস্পাতের বাজারমূল্য আরও কিছুকাল চড়া থাকতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধের মুখে পড়ে গত মে মাসে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে একটি অস্থির যুদ্ধবিরতি চললেও ওয়াশিংটন কর্তৃক তা বারবার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মূলত তেহরানকে একটি নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির শর্তাবলীতে রাজি করাতে গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে এই অবরোধ শুরু করে মার্কিন প্রশাসন। তেহরান এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে ওয়াশিংটনের কর্মকাণ্ডকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তখন সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও ইরান উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করে লাভবান হয়েছিল। তবে মে মাস থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ায় সেই সুবিধাজনক অবস্থান এখন সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান তথ্য অনুসারে, ইরানের রফতানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, যা বর্তমানে মার্কিন নজরদারিতে রয়েছে।
বাণিজ্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কেপলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের তেল রফতানি মে মাসে ৩ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে। জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রকাশনা লয়েডস লিস্টের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চের তুলনায় মে মাসে ইরানের জ্বালানি খাত থেকে আয় প্রায় ৮৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মার্চ মাসে দেশটি যেখানে দৈনিক ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল রফতানি করে প্রায় ৫১৩ কোটি ডলার আয় করেছিল, মে মাসে সেই মাসিক আয় কমে মাত্র ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। লয়েডস লিস্ট আরও জানিয়েছে যে, এপ্রিল পর্যন্ত গত ১২ মাসের গড় রফতানির তুলনায় মে মাসে রফতানি কমেছে প্রায় ৮৭ শতাংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ইরানের রফতানি তলানিতে নামার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিক্রি করতে না পারায় ইরান বর্তমানে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে সংরক্ষিত আছে। এ প্রসঙ্গে জ্বালানিনীতি গবেষক ও পরামর্শক মার্ক আয়ুব আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান কৌশলগতভাবে অবশিষ্ট সংরক্ষণ-ক্ষমতা ব্যবহার করছে। তথ্য বলছে, অবরোধ কার্যকর হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত চাপ তৈরি হবে তখনই, যখন এই সংরক্ষণ সক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধের মূল উদ্দেশ্য উৎপাদন বন্ধ করা নয়, বরং তেল বিক্রির অর্থপ্রবাহ আটকে দেওয়া। বিশেষ করে চীনের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরান এখন বড় বাধার সম্মুখীন। যদিও রেলপথকে বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তবে সমুদ্রপথের বিশাল চালানের তুলনায় ট্রেনযোগে তেল পরিবহন অত্যন্ত নগণ্য ও ব্যয়বহুল।
এ সংকটের প্রভাব কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় খোদ মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মার্ক আয়ুবের মতে, ‘শেষ পর্যন্ত যে ধরনের চুক্তিই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন একটাই—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। হয় ইরান কোনো না কোনোভাবে সেখানে প্রভাব বজায় রাখবে, নয়তো এই সংঘাত আরও কয়েক মাস চলতে পারে।’ এক গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর হাতে জব্দ হওয়ার ভয়ে ইরান বর্তমানে ভিএলসিসি ট্যাংকারের পরিবর্তে ছোট আকারের জাহাজ ব্যবহার করে তেল সররাহের চেষ্টা করছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক আভাস দিচ্ছেন, তবে তেহরান তাদের আটকে থাকা অর্থ ফেরত ও অবরোধ প্রত্যাহারের মতো কঠিন শর্তে অটল রয়েছে।
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষে ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতিতে এক ঐতিহাসিক ও আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসে বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের চিরচেনা নিয়মটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে বছরে মাত্র চারবার বা তিন মাস পর পর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ দিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক বোঝা ও হয়রানি যেমন কমবে, তেমনি সাশ্রয় হবে বাড়তি খরচও। এনবিআর জানিয়েছে, পুরো ভ্যাট ব্যবস্থাকে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড করা হচ্ছে। ফলে রিটার্ন দাখিলের জন্য করদাতাদের আর সনাতন কাগজের ফাইল নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান অডিটের আওতায় এলেও তাদের আর কাগুজে নথিপত্র দিতে হবে না। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ইআরপি সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের যাবতীয় লেনদেনের হিসাব রাখে, তবে সেই ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিট সম্পন্ন হবে। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না বললেই চলে।
বর্তমানে কার্যকর ভ্যাট আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে ‘মূসক-৯.১’ ফরমে রিটার্ন জমা দিতে হয়। নির্ধারিত সময়ের সামান্য এদিক-সেদিক হলেই গুনতে হয় বড় অঙ্কের জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মাসিক ব্যবস্থাকে একটি বড় বোঝা হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। এই জটিলতার কারণেই অনেক ব্যবসায়ী ভ্যাট জালের বাইরে থাকতে পছন্দ করতেন। এনবিআর আশা করছে, নতুন ও সহজ এই পদ্ধতি চালুর ফলে ব্যবসায়ীরা কর প্রদানে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন এবং কর ফাঁকির প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।
এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে রেকর্ড ১ লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছিল। এই সহজ এবং ব্যবসাবান্ধব ত্রৈমাসিক রিটার্ন পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে ভ্যাট নিবন্ধনের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারের বড় ধরনের উত্থানের প্রভাবে গত এক বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে মিলিয়নেয়ার বা লাখপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। ক্যাপজেমিনি ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ রিপোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী লাখপতির সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মোট ২ কোটি ৫৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৯৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ৯৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি। সিএনবিসি সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রতিবেদনটিতে লাখপতি বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে যাদের নিজস্ব আবাসস্থল ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সামগ্রী বাদে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ১০ লাখ ডলার। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ লাখপতিদের তুলনায় অতিধনী বা ‘আল্ট্রা-হাই-নেট-ওয়ার্থ’ ব্যক্তিদের সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি। বিশেষ করে যাদের ৩ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ রয়েছে, তাদের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে আড়াই লাখে দাঁড়িয়েছে। এই অতিধনীরা মোট লাখপতিদের মাত্র ১ শতাংশ হলেও বিশ্বের সম্মিলিত লাখপতি সম্পদের ৩৫ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে নতুন লাখপতি তৈরির দৌড়ে যথারীতি শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে গত বছর ৭ লাখ ৩০ হাজার নতুন লাখপতি যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭ লাখ ৩০ হাজারে। আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়া অঞ্চলেও উল্লেখ্যযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেখানে লাখপতির সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৮৩ লাখ ৭০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের ৭৬ শতাংশ উত্থান এবং তাইওয়ানের চিপ খাতের প্রভাবে এবার এশিয়ায় এই দুই দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউরোপে লাখপতি বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ, তবে মধ্যপ্রাচ্যে এই সংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ধনী ব্যক্তিরা এখন নগদ অর্থ সঞ্চয় করার চেয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একই সাথে আধুনিক ধনীরা তাদের বিপুল সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য এখন আর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক সংস্থার সেবা গ্রহণ করছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঝিমিয়ে পড়া কয়লা শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতে ৭০০ মিলিয়ন বা ৭০ কোটি ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের ঘোষণা দেন তিনি। মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে যখন জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে, তখন সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এই বিশাল তহবিলের যোগান নিশ্চিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ বা প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন কার্যকর করেছে। এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি বিশেষ আইনি ক্ষমতা, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য শিল্পগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রদান করে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও আরকানসাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ১৪টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৪২টি কয়লাখনি সংরক্ষণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে একটি নতুন কয়লা রপ্তানি টার্মিনাল নির্মাণে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই টার্মিনাল নির্মাণের ফলে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া মার্কিন জ্বালানি বিভাগ আরও ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে, যা দিয়ে আলাস্কা ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে দুটি নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
হোয়াইট হাউজে এই ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, “আমরা আজ এমন একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিচ্ছি যা জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে। এর জন্য আমরা পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী কয়লার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, “স্বচ্ছ ও সুন্দর কয়লার শক্তি ব্যবহার করে সব নাগরিকের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম কমিয়ে আনতে আজ আমরা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।” ট্রাম্পের দাবি, এই পুরো বিনিয়োগ প্যাকেজটি সব মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার কর্মসংস্থান ধরে রাখতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য এখন ৪.২৪ ডলারে ঠেকেছে, যা ইরান সংঘাত শুরুর আগে ছিল মাত্র ২.৯৮ ডলার। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত এক বছরে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে ১৭.৯ শতাংশ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমালোচনা করে কয়লাকেই অধিক সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী উৎস হিসেবে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউজ মনে করছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার সাশ্রয় হবে, যা সাধারণ গ্রাহকদের উচ্চ বিদ্যুৎ বিলের চাপ থেকে রক্ষা করবে।
জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলা এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে আগামী বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ সহায়ক প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, গৃহস্থালি পণ্য ও বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর সুবিধাগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে যে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা রয়েছে, সেটির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির যন্ত্রাংশ আমদানিতে থাকা হ্রাসকৃত শুল্ক সুবিধার মেয়াদও ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে। বৈদ্যুতিক যানের ক্ষেত্রে বর্তমানে থাকা প্রায় ৯০ শতাংশ করের বোঝা কমিয়ে আনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ইভি উৎপাদনে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়, ভ্যাট ও আয়কর সুবিধা দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রফটপ সোলার প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বর্তমানে ৩৬ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এই কর কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব আসতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রথম পাঁচ বছর পূর্ণ কর মুক্তি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে নির্দিষ্ট হারে কর ছাড়ের সুবিধা পাবেন।
শিল্প খাতে বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও বছরের শেষ নাগাদ এটি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উচ্চ শুল্ক হারের কারণে প্রতি মেগাওয়াট সোলার স্থাপনে যে ৩ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়, তা শুল্ক কমানোর ফলে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে। তবে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় সোলার যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। অতীতে অসম প্রতিযোগিতার কারণে এই খাতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। কম্পিউটার ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পের প্রসারে বিদ্যমান সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হলে ভোক্তারাও সুফল পাবেন। তবে নীতিনির্ধারকদের উচিত এই সুবিধার ফলে পণ্যমূল্য কতটুকু কমছে এবং আমদানির বিকল্প তৈরি হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সম্পদের তালিকায় মার্কিন সরকারি বন্ড বা ট্রেজারিকে পেছনে ফেলে স্বর্ণ এখন শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। মূলত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয়ের প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের আকাশচুম্বী দাম এই পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইসিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট বৈশ্বিক রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশই ছিল স্বর্ণ, যা মাত্র এক বছর আগেও ছিল ২০ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে মার্কিন ট্রেজারির অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে রিজার্ভ হিসেবে ইউরোর অবস্থান ১৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। ইসিবি সভাপতি ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড এই পরিবর্তনের পেছনে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে দায়ী করে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ সঞ্চয়ের প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ৩৬ হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা প্রায় ব্রেটন উডস যুগের কাছাকাছি এক মজবুত অবস্থান নির্দেশ করছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোও এই হিসাব বদলে দেওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও সামগ্রিকভাবে ডলার-নির্ভর সম্পদ এখনও বৈশ্বিক রিজার্ভের ৪২ শতাংশ দখল করে আছে, তবে বিকল্প সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি ঝোঁক ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২২ সাল থেকে বিশেষ করে চীন, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভারত তাদের স্বর্ণের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
তুরস্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের রিজার্ভ পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশটি ২২০ টন স্বর্ণ সঞ্চয় করলেও ২০২৬ সালের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৩০ টন স্বর্ণ বিক্রি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। ইসিবি আরও জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থায় ইউরোর ভূমিকাও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে, গত বছর যার আন্তর্জাতিক ঋণ ইস্যু প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই স্বর্ণমুখী প্রবণতা এবং মার্কিন ট্রেজারির ওপর নির্ভরতা হ্রাস বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মুদ্রা ঝুঁকি এড়াতে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরণের পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রতি ভরিতে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা কমিয়ে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। এর ফলে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৭৩ টাকায় নেমে এসেছে। শনিবার সকালে একটি বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস এই নতুন মূল্যতালিকা ঘোষণা করে, যা ওই দিন সকাল ১০টা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে যে স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের বা পিওর গোল্ডের দাম হ্রাস পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বর্ণের এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২১ ক্যারেট স্বর্ণ ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৭ টাকায় বিক্রি হবে। এর আগে গত ২ জুন স্বর্ণের দাম সর্বশেষ সমন্বয় করা হয়েছিল, যখন ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মোট ৭১ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ বার দাম বাড়ানো হলেও ৩৪ বার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম মোট ৯৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বৃদ্ধি ও ২৯ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। প্রতি ভরিতে ৪০৮ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট রুপার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট রুপার ভরি ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ২০৮ টাকা করা হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রুপার দাম মোট ৪২ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২ বার দাম বৃদ্ধি ও ২০ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে।