অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপের সুফল মিলতে শুরু করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ ধরে বিশ্বব্যাপী তৈরি হয় ডলারসংকট। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই যেহেতু নিয়ন্ত্রণ হয় মার্কিন ডলার দিয়ে তাই যুদ্ধের অজুহাতে বাড়তে থাকে অতি প্রয়োজনীয় এ মুদ্রাটির চাহিদা। করোনা মহামারিপরবর্তী বাংলাদেশেও বেড়ে যায় আমদানি, যার সুবাদে দেশে চাহিদা বাড়ে মার্কিন ডলারের। ডলারের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে দফায় দফায় বিক্রি করতে হয়েছে ডলার। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে।
তবে ডলারসংকট কিংবা রিজার্ভ কমে যাওয়ার দুশ্চিন্তা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে গভর্নর হিসেবে আবদুর রউফ তালুকদারের নিয়োগের পরই অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে নেওয়া হয় বেশ কিছু পদক্ষেপ। এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি জারি করে বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে নির্দেশনা দেয় ব্যাংকগুলোকে। সেসব পদক্ষেপের সুফল মিলতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, আমদানি ও রপ্তানির ঘাটতি পূরণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের চার মাসে তার আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গেল চার মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমে হয়েছে ৩৮০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা তার আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৬২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের চার মাসের হিসাবে শতকরা বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৬০ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সার আমদানির প্রভাবে যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৮২ কোটি ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতি কমার কারণ হিসাবে বড় অবদান রেখেছে আমদানি নিয়ন্ত্রণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আমদানির হিসেবে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশে মোট আমদানি হয়েছে ২ হাজার ২৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের। যা এর আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে ছিল ২ হাজার ৫৫১ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চার মাসে আমদানি কমেছে ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে রপ্তানি থেকে মোট আয় এসেছে ১ হাজার ৬৪৬ কোটি মার্কিন ডলার। যা তার আগের অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ছিল ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানিতে বড় কোনো প্রবৃদ্ধি না হলেও বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানি বাড়ানো গেলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক দৈনিক বাংলাকে বলেন, অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি কোনো আমদানিকারক যেন পণ্যের বাড়তি দাম দেখিয়ে আমদানি করতে না পারে সেদিকেও রয়েছে কঠোর নজরদারি। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাংককে আমরা সতর্কতার সঙ্গে আমদানির ঋণপত্র খুলতে বলেছি। আমদানিতে যেন কোনোভাবেই কোনো মিথ্যা তথ্য না আসে সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নজরদারি করছে।’ শুধু তাই নয়- আমদানির আড়ালে যেন কোনোভাবেই অর্থ পাচার না হয় সেদিকেও তাদের নজরদারি রয়েছে। ‘বর্তমানে বিশ্ববাজারে আমদানি পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে, এ ছাড়া বাড়তি প্রাইস মনে হলে তা সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এ জন্য আমদানি কিছুটা কমে এসেছে’ বলেও জানান তিনি। আমদানি কমানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ভুল দামে আমদানি করতে দেব না, আমার মনে হয় এতে আমদানি-রপ্তানির মধ্যে ঘাটতি কমে আসবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ কমে ৩ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। যা ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে ছিল ১ হাজার ৭১৫ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি দেখা যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে। করোনা মহামারি প্রথম বছরে বাণিজ্য ঘাটতি সব রেকর্ড ভেঙে ছাড়িয়ে যায় ৩ হাজার ৩২৫ কোটি ডলারের ঘর। সেই হিসাবে গত অর্থবছরে তার আগের বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক হয় বাণিজ্য ঘাটতি। যা চলতি অর্থবছর শেষে আরও কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তবে তার প্রভাবে যেন আমদানি কমে না আসে সেদিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তারা। অর্থনীতিবিদ ও দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশ-আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হোসেন এফসিএ বলেন, ‘রিজার্ভের কথা চিন্তা করে আমদানি কমিয়ে আনতে হবে, সেটা ধীরে ধীরে হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা আমদানি করতে না পারলে রপ্তানিও কমে আসবে।’ তবে তার পরামর্শ আমদানির আড়ালে যেন অর্থ পাচার না হয় সেদিকে আরও নজরদারি বাড়াবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সিন্ডিকেটবিরোধী সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বায়রার সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য মোস্তফা মাহমুদ বলেন, "আপনারা সিন্ডিকেট না ভাঙলে আমরা আমরণ অনশনে যাবো। বারবার এই বাজারকে সিন্ডিকেটের কবলে পড়তে দিব না। আমরা সবার জন্য ব্যবসা চাচ্ছি। নির্দিষ্ট ১০০ জন কেন ব্যবসা করবে? সিন্ডিকেটের এই ১০০ জন চাচ্ছে, শুধু তারাই ব্যবসা করুক। এই সিন্ডিকেট ২৪ হাজার কোটি লোপাট করেছে। আমাদের দাবি দেশে তাদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা।"
তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, "আমরা জানতে পেরেছি পুনরায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে এফডব্লিউসিএমএস নামক একটি সফটওয়্যার সিস্টেমের মাধ্যমে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিন্ডিকেটের প্রধান দাতো মোহাম্মদ আমিন নুর ও মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বপন বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি, এফডব্লিউসিএমএস, এসপিপিএ নামক টুলসগুলো ব্যবহার করে তারা সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করেছে। এই টুলসগুলো হচ্ছে অভিবাসী কর্মীদের শোষণ করার হাতিয়ার। এই নামগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। আইএলও, আইএমওসহ আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলো। বাংলাদেশের প্রতিটি মিডিয়াতে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সচিত্র প্রতিবেদন বহুবার প্রকাশ হয়েছে। তদানীন্তন স্বৈরাচারী সরকার সিন্ডিকেটের পক্ষে থাকার কারণে সিন্ডিকেটকে বিলুপ্ত করা যায়নি এবং তাদের কোনো শাস্তি হয়নি।"
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৬ সালে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ফি ছিল ৪৭ হাজার এবং ২০২১ সালে ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে কর্মীদের কাছ থেকে চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
মোস্তফা মাহমুদ আরও বলেন, "পুরোনো পদ্ধতির ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বদনামের কারণে তারা এই বার নতুন সফটওয়্যার তুরাপ ব্যবহার করছে কর্মী রিক্রুট করা, টাকা নেওয়া ও এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারের নাম দিয়ে একটা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে এজেন্সি ও কর্মী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। এবার তাদের আর্কষণীয় স্লোগান হলো জিরো কস্টে কর্মী প্রেরণ। বিগত দুইবার যেই টাকা নেওয়ার কথা ছিলো তার থেকে অনেক গুণ বেশি টাকা নেওয়ার কারণে এবার জিরো কস্টের প্রস্তাব দিচ্ছে। জিরো কস্টে বাজার উন্মুক্ত করা তাদের একটি কৌশল মাত্র। তাদের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে কর্মী রপ্তানি হলে প্রতিটি কর্মীকে এইবার দিতে হবে ছয়-সাত লাখ টাকা।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা জানতে পেরেছি জিরো কস্টে কর্মী রপ্তানির আড়ালে তারা ২৫টি এজেন্সি নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। ২৫ এজেন্সির বাইরে অন্য কোনো এজেন্সি কোনো কর্মী রপ্তানি করতে পারবে না বলেও সিন্ডিকেটের সদস্যদের তারা নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। যারা সিন্ডিকেটের সদস্য হতে আগ্রহী তাদের থেকে ১৫ কোটি টাকা অগ্রিম নিচ্ছে বলেও শোনা যাচ্ছে। একদিকে তারা সরকারকে জিরো কস্টের কথা বলছে, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার জন্য ১৫ কোটি টাকা নিচ্ছে।"
তিনি বলেন, "প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে কর্মী রিক্রুট করার জন্য বাংলাদেশ সরকার তার নিজস্ব সফটওয়্যার সিস্টেম প্রয়োগ করবে তবু সিন্ডিকেট প্রণীত তুরাপের মাধ্যমে করবো না। আমরা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী মহোদয়কে জানাচ্ছি যে আমরা যেন কিছুতেই সিন্ডিকেটের হোতাদের পাতানো ফাঁদ তুরাপের ফাঁদে পা না দেই। দাতো আমিন ও মোহাম্মদ রুহুল আমিন স্বপনেরা দীর্ঘ অনেক বছর থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের জিম্মি দশা থেকে বাজারটি মুক্ত করে সব বৈধ এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।"
জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন অফিস সময়সূচি কার্যকর করার পর দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন দেখা গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে, পাশাপাশি সূচকগুলোতেও বড় পতন হয়েছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) নতুন সময়সূচি কার্যকর হওয়ার দিনেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অফিস সময়ের পাশাপাশি ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের লেনদেন সময়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
লেনদেন শুরুর পর থেকেই বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। অধিকাংশ শেয়ারের দাম কমতে থাকায় শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে।
দিনের শেষ পর্যন্ত পতনের ধারা অব্যাহত থাকে এবং শেষদিকে তা আরও তীব্র হয়। ডিএসইতে লেনদেন শেষে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ৩৫৪টির। আর ১১টির দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতন বেশি ছিল। এ শ্রেণির ১৭টির দাম বাড়লেও ১৭৮টির কমেছে এবং ৮টি অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির মধ্যে ৪টির দাম বাড়ে, কমে ৭৫টির এবং ১টি অপরিবর্তিত থাকে।
‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪টির দাম বাড়লেও ১০১টির কমেছে এবং ২টির দামে পরিবর্তন হয়নি। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে—১টির দাম বেড়েছে, ৩০টির কমেছে এবং ৩টি অপরিবর্তিত রয়েছে।
অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনের কারণে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১১২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৩৫ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৪৫ পয়েন্টে নেমেছে।
লেনদেনের পরিমাণও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৫১১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১১৪ কোটি টাকা কম।
লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষে ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, যার শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ২৪ লাখ টাকার। এরপর একমি পেস্টিসাইড ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
এছাড়া শীর্ষ লেনদেন তালিকায় আরও ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, জনতা ইন্স্যুরেন্স, ফাইন ফুডস এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে। সিএএসপিআই সূচক ২২৮ পয়েন্ট কমেছে। বাজারটিতে ১৯০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩টির দাম বেড়েছে, ১৪৮টির কমেছে এবং ৯টির দামে পরিবর্তন হয়নি। মোট লেনদেন হয়েছে ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারে কার্ডভিত্তিক লেনদেনে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
রোববার (৫ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ প্রস্তাব তুলে ধরে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ। তাদের মতে, প্রণোদনার মধ্যে ৩ শতাংশ গ্রাহক এবং ২ শতাংশ ব্যবসায়ীরা পেতে পারেন।
সংগঠনটি বলেছে, এতে নগদের ব্যবহার কমবে এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থ লেনদেন সহজ হবে।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। এতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে ব্যাংক, ব্যবসায়ী বা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতারা এই প্রণোদনা দিতে পারে এবং পরে তা অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা যেতে পারে।
আসন্ন বাজেট সামনে রেখে করনীতি সহজীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উৎসে কর কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। রুল ৩৯ অনুযায়ী কর্পোরেট কর নির্ধারণ করলে উৎসে কর ৪ দশমিক ১২৫ শতাংশ এবং অন্য ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য সমান ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ করহার বজায় রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে স্মার্ট কার্ড ও বিক্রয়কেন্দ্র যন্ত্রের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট কাঠামোয় পরিবর্তন এনে কার্বনেটেড পানীয়ের সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।
সংগঠনটির মতে, পানীয় খাতে মোট করভার বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, চাহিদা কমছে এবং বিনিয়োগে বাধা তৈরি হচ্ছে। করহার কমালে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের বর্জ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ সেবাকে ভ্যাটমুক্ত করার প্রস্তাব এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে অ-বাসিন্দা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের করহার কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ এবং ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর সারচার্জ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি খোরশেদ আলম এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ব্যক্তিগত আয়কর সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ, ট্রেড লাইসেন্স ফি কমানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব দেয়।
এদিকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ইউরোচ্যাম বিনিয়োগবান্ধব করনীতি, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ওপর জোর দিয়েছে।
চীনকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। যদিও একই সময়ে রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর দেশটি শীর্ষ অবস্থান হারিয়েছে।
গত শনিবার (৪ এপ্রিল) এ তথ্য প্রকাশ করেছে অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা)। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম, দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে চীন।
অটেক্সার পরিসংখ্যান বলছে, এ সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ কম।
অন্যদিকে, ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। দেশটির রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের ক্ষেত্রে। আলোচ্য সময়ে তাদের রপ্তানি কমেছে ৫৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিও কমেছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দেশটি ১১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।
পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুল্কহার বৃদ্ধি এবং চলমান বৈশ্বিক সংকট—বিশেষ করে যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি—যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ কারণেই চীনের তুলনায় অগ্রগতি সত্ত্বেও মোট রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যথাযথ নীতিগত সহায়তা প্রদান এবং জ্বালানি সংকট সমাধান করতে পারলে শিগগির এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
এর আগে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ওই বছর মোট রপ্তানি আয় ছিল ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণও বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন বর্গমিটারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে গমের দাম। সাম্প্রতিক সময়ে এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি বুশেল গমের দাম দাঁড়িয়েছে ৬ ডলার ৬ সেন্ট, যা প্রায় নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হেলেনিক শিপিং নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
অন্যদিকে প্রতিকূল আবহাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বের অন্যতম গম উৎপাদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, যা ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া দেশটিতে গমের আবাদও কম হয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার ৪ কোটি ৩৮ লাখ একর জমিতে গম চাষ হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় কম।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির এই চাপ অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে গমের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরোপের বাজারে আবারও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি নিবন্ধনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চলতি বছরের মার্চে ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোতে টেসলার গাড়ি নিবন্ধন বেড়েছে চোখে পড়ার মতো হারে। বিশেষ করে ফ্রান্সে এই বৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় তিন গুণের বেশি, আর নরডিক অঞ্চলের দেশগুলোতে তা প্রায় দ্বিগুণ। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের দুর্বল সময় কাটিয়ে টেসলা আবার ইউরোপে নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে। আগের বছরে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতা, নতুন মডেলের ঘাটতি এবং সিইও ইলোন মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কের কারণে কোম্পানিটি বাজারের বড় অংশ হারায়। তবে বছর শেষে মডেল-৩ ও মডেল-ওয়াইয়ের সাশ্রয়ী সংস্করণ আনার পর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
ফ্রান্সে মার্চ মাসে ৯ হাজার ৫৬৯টি নতুন টেসলা গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২০৩ শতাংশ বেশি এবং এটি কোম্পানির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড। একই সময়ে নরওয়েতে ১৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পাশাপাশি সুইডেন ও ডেনমার্কে যথাক্রমে ১৪৪ ও ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাধারণত প্রতিটি প্রান্তিকের শেষদিকে গাড়ি সরবরাহ বাড়ে, যার প্রভাব নিবন্ধনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে ইউরোপের ক্রেতাদের আগ্রহ আবারও টেসলার দিকে ফিরছে।
তবে স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের তথ্য প্রকাশিত হলে ইউরোপে টেসলার প্রকৃত সামগ্রিক চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) সাতটি ব্রোকারেজ হাউজ পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) বরাবর বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
যেসব ব্রোকারেজ হাউজ পরিদর্শনের আওতায় এসেছে সেগুলো হলো—আহমেদ ইকবাল হাসান সিকিউরিটিজ লিমিটেড, শেলটেক ব্রোকারেজ লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড, জেকেসি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং গ্লোব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ফিনটেক কোম্পানি লিমিটেড।
জানা গেছে, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ও ৪ মার্চ এ বিষয়ে ডিএসই কমিশনে একাধিক চিঠি পাঠায়। সেই প্রেক্ষিতেই এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরেজমিনে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।
ডিএসইর পাঠানো চিঠিতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার নিবন্ধন সনদ নবায়ন সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরা হয়।
এ অবস্থায় কমিশন ডিএসইকে নির্দেশ দিয়েছে, উল্লিখিত অভিযোগগুলোর পাশাপাশি পরিদর্শনকালে অন্য কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সেগুলোকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
বিএসইসির চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসই কর্তৃপক্ষ ফরম-(ছ) দাখিল করে জানিয়েছে যে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজগুলো মার্জিন রুল, ১৯৯৯ এবং ২০২২ সালের ২০ মে জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করছে না।
এই প্রেক্ষিতে পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিতে বলা হয়েছে, যেখানে চিহ্নিত অনিয়মসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে দেশের সব দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছে সরকার। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "শুরুতে মন্ত্রিসভা বৈঠকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।"
তিনি জানান, "তবে দোকান মালিক সমিতির আবেদনের পর বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়।"
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, "ব্যবসায়ীদের অনুরোধ বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছেন। তবে জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়সীমার বাইরে থাকবে।"
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগে দোকান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলে তারা সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানান।
ব্যবসায়ী নেতারা প্রয়োজনে দোকান খোলার সময় পিছিয়ে দিয়ে রাত পর্যন্ত ব্যবসার সুযোগ চেয়েছিলেন। তাদের মতে, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ করলে বিক্রিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলে বিদ্যুতের অপচয় রোধে সচেষ্ট হলে এই সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।"
নতুন এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের কিছুটা স্বস্তি মিললেও জ্বালানি সাশ্রয়ে সতর্কতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে সরকার।
দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পরও তারল্য সংকট কাটেনি। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তিন মাসের জন্য মোট ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ঋণপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
একীভূতকরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের চাপ বাড়তে থাকে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই অর্থ সহায়তা দিতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি চারটি ছিল এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলমের প্রভাবাধীন। অনাদায়ী ঋণের চাপ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলো গভীর সংকটে পড়ে এবং একীভূতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একীভূতের পর এক্সিম ব্যাংক ১ হাজার ৫৬৪ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ৪৮২ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৪১৬ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংক ১৬১ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৯৮ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে। এতে এসব ব্যাংকের মোট দায় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
নতুন গঠিত ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি। আমানতকারীদের সুরক্ষায় বিমা তহবিল থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংকট এখনো কাটেনি। পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের ৮৪ শতাংশই খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল খেলাপি ঋণই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করা এবং ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
দেশের ঝিমিয়ে পড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং আইনি কাঠামো সুসংহত করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে। আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বিশেষ ব্যবস্থায় কাজ করে আগামী রোববারের মধ্যে এই কমিটিকে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সংশোধনী প্রস্তাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গঠিত এই ৭ সদস্যের কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বিলটি সংসদে পেশ করা হবে। গত বছরের মে মাসে জারি করা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিশেষ ধারার আলোকে ইতিমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। এই বিশাল প্রক্রিয়ায় গঠিত ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার আমানতকারীদের মাঝে বণ্টন করা হবে। এছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের প্রাথমিক ধাপে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়মিত সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা বাধ্যতামূলক। সেই বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবেই ব্যাংক রেজল্যুশনসহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করেছে ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি। যদিও দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই অধ্যাদেশটি কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাঁদের মতে, আমানতকারীদের সুরক্ষা ও অনিয়ম বন্ধে মূল অধ্যাদেশটিই যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।
অধ্যাদেশ সংশোধনের এই উদ্যোগের ফলে অন্য কয়েকটি ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (একিউআর) প্রক্রিয়া শেষ হলেও সেগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আইন সংশোধনের পরেই জানা যাবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। আইএমএফ-এর পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে এই আইনি সংস্কার ও ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে কাজ করবে বলে জানা গেছে।
মূলত ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হলো দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নিয়ে সেগুলোর সংস্কার করা। আমানতকারীদের জমানো অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারানো এবং ঋণের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা মোকাবিলায় এই আইনটি একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। এই আইনের আওতায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূতকরণ, অবসায়ন বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে এবং একটি শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই আইনি সংস্কার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়ার পরেই নির্ধারিত হবে দেশের রুগ্ন ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ গতিপথ।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বড় ধরণের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রথাগত উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এখন বিকল্প দেশ হিসেবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি তেল আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বৈঠক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইন যেকোনো সময় বিঘ্নিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সরকার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এই বিকল্প আমদানির পথে হাঁটছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আমদানির এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘পিটি ভুমি সিয়াক পাসাকো জাপিন’ থেকে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ক্রয় করা হবে। পাশাপাশি কাজাখস্তানের ‘এক্সন মবিল কাজাখস্তান’ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকেও তেল আমদানির প্রক্রিয়া বর্তমানে জোরালোভাবে চলমান রয়েছে এবং ইতিমধ্যে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ক্রমবর্ধমান হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের ওপর যাতে আর্থিক চাপ বৃদ্ধি না পায়, সে জন্য সরকার জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে দেশে অন্তত এক মাসের পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন। তিনি সাধারণ জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার জন্য সবিনয় অনুরোধ জানান। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সংকট তীব্র হলে স্পট মার্কেট থেকেও দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলার এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকার দেশে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও সাশ্রয়ী নীতিও গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে রাত ৮টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই সব শপিং মল ও বিপণিবিতান বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আমদানির এই নতুন ও বিকল্প উৎসগুলো দেশের শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতার মাঝে বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের এই উদ্যোগকে অর্থনীতিবিদরা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে চরম মন্দাভাব বিরাজ করছে। গত মার্চ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ পতনের রেকর্ড। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিয়ে টানা আট মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ইতিহাসে এর আগে কখনোই টানা আট মাস রপ্তানি কমার নজির দেখা যায়নি, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ গত বছরের একই মাসে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৭ কোটি ডলার বা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সাধারণত প্রতি মাসে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও মার্চ মাসে তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের গত ৯ মাসের সামগ্রিক চিত্রও ম্লান হয়ে পড়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে তিন হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
রপ্তানি আয়ের এই নজিরবিহীন ধসের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বেশ কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। গত বছরের আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্কের ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহ করে আগ্রাসী বাণিজ্য পরিচালনা করছে, যার ফলে বাংলাদেশ ওই বাজারেও পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া মার্চ মাসে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কারখানাগুলো গড়ে ১০ দিনের মতো বন্ধ থাকায় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা রপ্তানি হ্রাসে বড় প্রভাব ফেলেছে।
রপ্তানি খাতের প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা আরও নাজুক। গত মার্চ মাসে একক পণ্য হিসেবে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত বছরের মার্চে পোশাক রপ্তানি থেকে যেখানে ৩৪৫ কোটি ডলার এসেছিল, সেখানে এবার তা ২৭৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামসুদ্দিনের মতে, মার্কিন শুল্কায়ন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর চাপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধও বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং লজিস্টিক জটিলতা রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য বড় রপ্তানি পণ্যও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইপিবির তথ্যমতে, গত ৯ মাসে হোম টেক্সটাইলের রপ্তানি কমেছে ২১ শতাংশ এবং ওষুধের রপ্তানি ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ৭ শতাংশ এবং পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি ধস নেমেছে সবজি রপ্তানিতে, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। তবে এই নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি আয় ১৬ শতাংশ এবং হিমায়িত মাছের রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া কাঁকড়া রপ্তানি ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তি জুগিয়েছে। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজার বহুমুখীকরণ না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশের বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম আরও এক দফা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এপ্রিল মাসের জন্য নির্ধারিত এই নতুন মূল্য তালিকায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এলপিজির পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও একলাফে অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর কাওরান বাজারে অবস্থিত বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এই নতুন দরের ঘোষণা দেন।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, নতুন নির্ধারিত মূল্যে অটোগ্যাসের দাম মূসকসহ প্রতি লিটারে ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে এখন থেকে প্রতি লিটার অটোগ্যাস কিনতে গ্রাহককে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা ব্যয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসেই এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। তবে এবারের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এপ্রিল মাসের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে অন্যান্য ওজনের সিলিন্ডারের দামও সুনির্দিষ্টভাবে পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুবিধার্থে এই দামগুলো ভিন্ন ভিন্ন হারে সমন্বয় করা হয়। নতুন তালিকায় ৫.৫ কেজির ছোট সিলিন্ডারের দাম রাখা হয়েছে ৭৯২ টাকা। মাঝারি আকারের সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে ১২.৫ কেজির দাম ১ হাজার ৮০১ টাকা, ১৫ কেজির দাম ২ হাজার ১৬১ টাকা এবং ১৬ কেজির দাম ২ হাজার ৩০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮ কেজির সিলিন্ডার এখন থেকে পাওয়া যাবে ২ হাজার ৫৯৩ টাকায়।
এছাড়া বড় আকারের বাণিজ্যিক সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে ২০ কেজির দাম ২ হাজার ৮৮১ টাকা, ২২ কেজির দাম ৩ হাজার ১৬৯ টাকা এবং ২৫ কেজির দাম ৩ হাজার ৬০১ টাকা করা হয়েছে। অধিক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে; যেখানে ৩০ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৩২১ টাকা, ৩৩ কেজির দাম ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা, ৩৫ কেজির দাম ৫ হাজার ৪১ টাকা এবং ৪৫ কেজির বিশাল সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৪২৮ টাকা। বিইআরসির এই নতুন দাম আজ থেকেই কার্যকর হবে এবং পুরো এপ্রিল মাস জুড়ে বলবৎ থাকবে। জ্বালানির এই লাগামহীন উর্ধ্বগতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের রান্না ও যাতায়াত ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।