পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত তিন জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমেটেডের বিক্রি বাবদ আয়ে চলতি ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তবে অপরিচালন খাত থেকে অর্জিত আয়ের সুবাদে ভালো করেছে তিনটি কোম্পানিই। ফলে হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারি এ কোম্পানিগুলো বেশ ভালো মুনাফা লুফে নিতে পেরেছে। কোম্পানি তিনটি সর্বশেষ প্রকাশিত চলতি হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে দৈনিক বাংলা। প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুসারে, চলতি ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন জ্বালানি তেল কোম্পানির সম্মিলিতভাবে বিক্রি বাবদ আয় হয়েছে ৩০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানি তিনটির আয় হয়েছিল ৩২৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত আয় কমেছে ১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। শতকরা হিসেবে সর্বশেষ সমাপ্ত ছয় মাসে আয় কমেছে ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। মূলত কোম্পানিগুলোর বিক্রি কমে যাওয়ায় আয়েও ভাটা পড়েছে।
কোর বিজনেস বা পরিচালন খাত থেকে কোম্পানি তিনটির আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কমলেও অপরিচালন আয় বা মূলধনী আমানতের বিপরীতে ভালো আয় হয়েছে। আলোচ্য সময়ে কোম্পানি তিনটির সমন্বিত অপরিচালন আয় হয়েছে ৬৬৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ৫৫৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে তিন কোম্পানির সমন্বিত অপরিচালন আয় বেড়েছে ১০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে প্রথমার্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি কমেছে। তবে ব্যাংক আমানতের বিপরীতে সুদহার ভালো পাওয়ায় তাদের অপরিচালন খাত থেকে ভালো আয় এসেছে। ফলে কোম্পানিগুলোর মুনাফাও বেড়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন জ্বালানি তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৫৫৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ৫১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কোম্পানি তিনটির নিট মুনাফা কমেছে ৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শতকরা হিসেবে সর্বশেষ সমাপ্ত ছয় মাসে মুনাফা কমেছে ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কোম্পানিভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অকটেন, পেট্রল, কেরোসিন, ডিজেল, এলওডি, ফার্নেস অয়েল, জেবিও, লুব অয়েল, এলপিজি ও বিটুমিনসহ নয়টি জ্বালানি কম-বেশি বিক্রি করে পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। এর বাইরে এলডিও, জেট এ-১, এসবিপি, এমটিটি, মেরিন ফুয়েল ও গ্রিজের বেশির ভাগই বিক্রি করে পদ্মা অয়েল কোম্পানি।
একক কোম্পানি হিসেবে আলোচিত তিন কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে পদ্মা অয়েল। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটি বিক্রি বাবদ আয় হয়েছে ১৩৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছিল ১৩৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ হিসেবে বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বা ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আলোচ্য প্রথমার্ধে কোম্পানির অপরিচালন আয় হয়েছে ১৭১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১৬৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত ছয় মাসে কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১৬২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১৫৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা বেড়েছে ৪ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আলোচ্য সময়ে তাদের বিক্রি কিছুটা কমেছে। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নগদ বিক্রি বেড়েছে। ফলে নগদ পরিচালন প্রবাহ বেড়েছে। পাশাপাশি অপরিচালন খাত থেকে (আমানতের বিপরীতের সুদ আয়) ভালো আয় এসেছে। যার সুবাদে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি এসেছে।
চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিক্রি বাবদ আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আলোচ্য তিন কোম্পানির মধ্যে জ্বালানি বিক্রিতে কোম্পানিটির অবস্থান দ্বিতীয়। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১১৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির অপরিচালন আয় হয়েছে ২২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১৮০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১৮৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১৮৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ হিসেবে বছরের ব্যবধানে কোম্পানির নিট মুনাফায় ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের বিক্রি কিছুটা কমায় গ্রস আনিংসও কমেছে। তা ছাড়া বাকিতে বিক্রি বৃদ্ধি, কর্মীদের বেতন বৃদ্ধিসহ কয়েকটি কারণে নগদ পরিচালন প্রবাহও কিছুটা কমেছে। তা সত্ত্বেও ভালো অপরিচালন আয়ের সুবাদে মুনাফা বেড়েছে।
যমুনা অয়েল জ্বালানি তেল বিক্রিতে তিন কোম্পানির মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। কোম্পানিটি চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ৬৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৭১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিক্রি বাবদ আয় কমেছে ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বা ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানির অপরিচালন আয় হয়েছে ২৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ কোম্পানিটি সর্বশেষ ছয় মাসে তিন কোম্পানির মধ্যে অপরিচালন আয় অর্জনে শীর্ষে রয়েছে। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির অপরিচালন আয় হয়েছিল ২১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ১৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ হিসেবে বছরের ব্যবধানে কোম্পানির নিট মুনাফা বেড়েছে ৩৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমানতে সুদ আয় ভালো পাওয়ায় আলোচ্য সময়ে তাদের অপরিচালন আয় বেড়েছে। যার সুবাদে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে বাকিতে বিক্রি বাড়ায় তাদের নগদ প্রবাহ কিছুটা কমেছে।
চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহরে অনুষ্ঠিতব্য ১০ম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপো (সিএসএই) এবং ৩০তম চায়না কুনমিং আমদানি ও রপ্তানি মেলায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
আগামী ১১ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এই আন্তর্জাতিক মেলায় সংগঠনটির সভাপতি খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে বলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। প্রতিনিধি দলে দেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ওষুধ, চামড়া, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং উৎপাদনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
বিসিসিসিআইয়ের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে কার্যকর বিটুবি সংযোগ স্থাপন করা। বিশেষ করে চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং কৃষিভিত্তিক উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধি করে দুই দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া বাংলাদেশে সরাসরি চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে দেশীয় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করাও এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সফরকালে প্রতিনিধি দলটি এক্সপোর বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ফোরাম এবং বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক বৈঠকে অংশ নেবে। প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিসিসিসিআই এবং চীনের মেশিনারি ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানি ও রপ্তানি চেম্বারের (সিসিআইইএম) মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। পাশাপাশি ব্যাংক অব হুঝৌ কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্য একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলমান রয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বহুল আলোচিত দুই প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই মঙ্গলবার (৯ জুন) কোম্পানি দুটি তীব্র ক্রেতা সংকটের মুখে পড়েছে। লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হলেও সে তুলনায় ক্রেতা না থাকায় অধিকাংশ বিনিয়োগকারী তাদের শেয়ার বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার লেনদেনের শুরুতেই উভয় কোম্পানির কয়েক লাখ শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন দামে বিক্রির প্রস্তাব এলেও ক্রয়ের ঘর ছিল প্রায় শূন্য। ক্রেতা সংকটের কারণে পুরো দিনে বেক্সিমকোর মাত্র ৮ হাজার ২৬টি এবং ইসলামী ব্যাংকের ৪০ হাজার ৪১৬টি শেয়ার লেনদেন সম্ভব হয়েছে। বেক্সিমকোর শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ১১০ টাকা ১০ পয়সায় দীর্ঘদিন আটকে থাকার পর মঙ্গলবার তা সর্বনিম্ন ৯৯ টাকা ১০ পয়সা দরে বিক্রির আদেশ দিলেও ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার ফলে মাত্র ১১ লাখ ৯০ হাজার টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
শেয়ারবাজারের লাগাতার পতন রোধে গত পাঁচ বছরে কয়েক দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল বিএসইসি। সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাজার অস্থিতিশীল হলে ২০২২ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় দফায় এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়। অধিকাংশ শেয়ারের ওপর থেকে ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা এতদিন বহাল ছিল। বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর গত সোমবার কোম্পানি দুটির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়, যা মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কোম্পানি দুটির শেয়ারের এই দরপতন মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা কাটানোর অংশ। দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম আটকে রাখায় তা প্রকৃত বাজারদর প্রতিফলিত করছিল না। ফলে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির এক ধরণের তাড়াহুড়ো দেখা দিয়েছে, যা শুরুতে দরপতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেয়ারের দাম একটি যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে সহায়ক হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের ফলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে। তাদের মতে, ফ্লোর প্রাইসের কারণে মার্জিন ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি বাড়ছিল এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর হবে এবং বাজারের গতিশীলতা বাড়বে। স্বল্পমেয়াদে এই দরপতন অস্থিরতা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সুস্থ ও স্বচ্ছ শেয়ারবাজার গড়ে তোলার জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। মূলত প্রকৃত চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে বাজার পরিচালিত হওয়ার পথ সুগম হওয়ায় পুঁজিবাজারের গভীরতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্য রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরণের উল্লম্ফন ঘটেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত চীনের সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কয়েক সপ্তাহের মাথায় এই ইতিবাচক বাণিজ্যিক চিত্র সামনে এলো, যেখানে তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
চীনের শুল্ক প্রশাসনের (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ কাস্টমস) দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্য রফতানির আর্থিক পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের মে মাসে এই রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৮.৮ বিলিয়ন ডলার। মূলত গত বছরের একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা অস্থির বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাবে দুই দেশের রফতানি বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও হ্রাস পেয়েছিল। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সফরের পর বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতির বৃহত্তম দুই অংশীদারের মধ্যে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পূর্বের বছরের তুলনায় রফতানির এই বিশাল প্রবৃদ্ধি দুই দেশের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন নিরসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পল্লী অঞ্চলে আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার আবর্তনযোগ্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের আওতায় কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত সরল সুদ বা মুনাফা প্রযোজ্য হবে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ তহবিল সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কৃষি খাতের জন্য এ তহবিল গঠন করা হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদি স্কিমটি আবর্তনযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রতিবছর গ্রাহক পর্যায়ে পুনঃবিতরণ করা যাবে। এ স্কিমের আওতায় বিতরণকৃত ঋণ ব্যাংকসমূহ তাদের বার্ষিক কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতেও প্রদর্শন করতে পারবে।
এ স্কিমে অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদ বা মুনাফা হারে এই পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা পাবে। আর কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফার হার (সরল) হবে ৮ শতাংশ।
বিদ্যমান বার্ষিক কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার আওতাভুক্ত সব প্রকার শস্য-ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি খাত এবং আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডসহ অন্য পল্লী ঋণ খাতে এ স্কিমের আওতায় অর্থায়ন করা যাবে। অধিক সংখ্যক প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষককে এ ঋণ সুবিধা দিতে খাতভিত্তিক ঋণসীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে নীতিমালায়। এর মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা, শস্য ও ফসল খাতে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা, কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে ২০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য পল্লী ঋণ ও আয় উৎসারী খাতে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা ঋণ পাওয়া যাবে।
ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের সহায়তার জন্য শস্য ও ফসল চাষের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ (শুধুমাত্র শস্য-ফসল দায়বদ্ধকরণের বিপরীতে) প্রদান করা যাবে। এছাড়া নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করার লক্ষ্যে প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে বিকল্প জামানত (ব্যক্তিগত বা দলগত জামানত) গ্রহণ করা যাবে। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ বার এ স্কিমের সুবিধা নিতে পারবেন এবং এ ঋণের অর্থ কোনোভাবেই পুরাতন ঋণ সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতাও এ তহবিল থেকে ঋণ পাবেন না।
কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ অপব্যবহার বা অসদ্ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে অথবা গ্রাহক পর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অর্থের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ শাস্তিমূলক সুদসহ এককালীন অর্থ কেটে নেবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ওই ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে তা আদায় করা হবে।
সার্কুলারে ব্যাংকগুলোকে ফসল কাটার মৌসুম শুরুর আগেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা এবং ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে ব্যানার স্থাপনের মাধ্যমে এই ঋণের ব্যাপক প্রচারণার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সার বাণিজ্যের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রফতানি বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে বর্তমানে তেলের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ইউরোপীয় গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের জ্বালানি খরচ ইতিমধ্যে ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাসকে আরও উসকে দিচ্ছে।
আর্থিক সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলে এই অস্থিরতার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বড় ধরনের নেতিবাচক সংশোধন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অন্তত ৭০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সাথে ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস ২০২৬ সালের জন্য তাদের বিশ্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে তেলের এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী গতির কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব বজায় রয়েছে। ফিচের মতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য প্রবাহ আগামী জুলাইয়ের আগে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার প্রবল প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে। ইউক্রেন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বোমার আওয়াজ হাজার মাইল দূরে এই সরু গলিগুলোতেও অর্থনৈতিক ভূকম্পন তৈরি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং ডলারের অস্থিতিশীল দরের কারণে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। লোকসান এড়াতে আমদানিকারকরা এখন অতিরিক্ত মজুত করার পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক পণ্য আমদানিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বাকিতে পণ্য বিক্রি অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে পণ্য পৌঁছানোর সময় প্রায় ২৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পণ্যের বাজারদরে।
এদিকে দেশের বৈদেশিক পণ্য বাণিজ্যেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। আলোচ্য সময়ে দেশে মোট ৫৮.২২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হলেও রফতানি আয় হয়েছে মাত্র ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানির তুলনায় রফতানি না বাড়ায় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্যের মূল্য চড়া থাকায় এই ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, একই সময়ে প্রবাসীরা ২ হাজার ৯৩২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯.৫ শতাংশ বেশি। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও শেয়ারবাজারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট বর্তমানে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্বের পর্যটন অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে শীর্ষ স্থান দখলের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে চীন। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, চীন খুব শীঘ্রই বিশ্বের বৃহত্তম ‘আউটবাউন্ড ট্রাভেল’ বা দেশ থেকে বিদেশে ভ্রমণের বাজারে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং পর্যটন বান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে চীন বিশ্বমঞ্চে এক অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৫০টিরও বেশি দেশের নাগরিকদের জন্য ৩০ দিন পর্যন্ত ভিসামুক্ত থাকার সুবিধা প্রদান, উন্নত বিমান ও রেল যোগাযোগ এবং প্রবেশপথে অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক সিস্টেম চালুর মতো পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের চীনে আকৃষ্ট করছে। ২০২৫ সালে ৬৮ মিলিয়নেরও বেশি বিদেশি পর্যটক চীন সফর করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫.৫ শতাংশ বেশি। এ সময় পর্যটকদের ব্যয় ১০.৫ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা করোনা মহামারির পূর্ববর্তী রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ডব্লিউটিটিসি পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে চীনের পর্যটন ব্যয় ২২.৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এছাড়া ব্যবসায়িক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও দেশটি বর্তমানে ১৯২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। নতুন পর্যটন জোন, সাংস্কৃতিক আকর্ষণ এবং থিম পার্ক তৈরির মাধ্যমে চীন তার পর্যটন খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে। সংস্থাটির মতে, ২০৩৬ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে তৈরি হওয়া প্রতি পাঁচটি চাকরির একটি হবে চীনে। আগামী এক দশকে এই খাতের আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডব্লিউটিটিসির প্রেসিডেন্ট ও সিইও গ্লোরিয়া গ্যেভারা চীনের এই সাফল্যের প্রশংসা করে বলেন, “নির্দিষ্ট কিছু নীতি সংস্কার কীভাবে বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা বাড়াতে পারে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি আনতে পারে, চীনের ঘুরে দাঁড়ানোই তার বড় প্রমাণ।” তিনি আরও যোগ করেন যে, চীন যদি এই গতি বজায় রাখে এবং ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করে, তবে তারা অচিরেই পর্যটন অর্থনীতিতে বিশ্বের অবিসংবাদিত শীর্ষ দেশে পরিণত হবে। চীন সরকার পর্যটন খাতকে বর্তমানে তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল রূপ ও ‘এল নিনো’র প্রভাবে চলতি সপ্তাহে এশিয়ার প্রধান রফতানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থার সতর্কবাণী অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে ঘাটতির তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের রফতানি মূল্যে। খবর বিজনেস রেকর্ডার।
ভিয়েতনামে চলতি সপ্তাহে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম প্রতি টনে প্রায় ১০ ডলার বেড়ে ৪১৫-৪২০ ডলারে পৌঁছেছে। মে মাসে দেশটির চাল রফতানি গত বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও এল নিনোর দীর্ঘমেয়াদী হুমকির কারণে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। থাইল্যান্ডেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম ৪৫০ ডলারে স্থির থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্বের শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভারতের বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় চালের দাম এখনও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্থানীয় ভোক্তা ও কৃষক উভয়েই বড় ধরণের সংকটে পড়েছেন। দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দাবদাহ বোরো ধান কাটার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ধানের ফলন কমে যাচ্ছে এবং প্রধান উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে ধান দ্রুত শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায় ২ লাখ টন চালের ক্ষতি হওয়ার পর এই নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে।
বৈশ্বিক বাজারে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাপপ্রবাহের দ্বিমুখী সংকটে বাংলাদেশের বাজারে চালের সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম এখনও উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, এল নিনো পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যা সমগ্র এশিয়ার কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মূলত প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাই এখন চালের বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
দেশের পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে নবগঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর শীর্ষ পদে নিয়োগ সম্পন্ন করেছে সরকার। সোমবার (৮ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের ঘোষণা দেয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কাজী শায়রুল হাসানকে ব্যাংকটির পরিচালক ও চেয়ারম্যান এবং আবেদুর রহমান সিকদারকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আগামী তিন বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে কাজে যোগদানের আগে উভয়কে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ করতে হবে।
ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান বেসরকারি আর্থিক খাতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। এর আগে তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (সাবিনকো)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দীর্ঘ সময় সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, নতুন এমডি আবেদুর রহমান সিকদার বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ব্যাংকিং সেক্টরে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নতুন গঠিত এই ব্যাংকটির পরিচালনায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ও আর্থিক সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একত্রিত করে এই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের এই নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে। মূলত এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রভাবশালী দুই প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শেয়ারের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যস্তর প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
আজ সোমবার (৮ জুন) বিএসইসির সার্ভেইল্যান্স বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হয়। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে মঙ্গলবার (৯ জুন) থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ারের লেনদেন সাধারণ অন্যান্য সিকিউরিটিজের মতো স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার সীমার মধ্যে পরিচালিত হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান স্বাক্ষরিত আদেশে জানানো হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরোপিত ফ্লোর প্রাইস সংক্রান্ত সকল শর্ত ও বিধিনিষেধ বাতিল করা হয়েছে। কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, ২০২১ সালের জুন মাসের পূর্ববর্তী আদেশ অনুযায়ী সকল তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে প্রচলিত সার্কিট ব্রেকারের ঊর্ধ্ব ও নিম্নসীমা এখন থেকে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও কার্যকর থাকবে। মূলত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, বাজারের সুষ্ঠু পরিচালনা এবং পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্সের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ফ্লোর প্রাইসের কারণে এই দুই বড় কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে এক ধরণের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ফলে এখন থেকে শেয়ার দুটির প্রকৃত চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে বাজারমূল্য নির্ধারিত হওয়ার পথ সুগম হলো। এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে যে, বিএসইসির এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের নতুন করে বাজারে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্বের অধীনে দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার (৮ জুন) দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এদিন লেনদেনের শুরু থেকেই বিক্রির চাপ বাড়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা ৯ কার্যদিবস সূচক উর্ধ্বমুখী থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়ে গিয়েছিল, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। মূলত এই প্রবণতার কারণেই বাজারে বড় ধরণের সংশোধন দেখা দিয়েছে, যাকে তারা “স্বাভাবিক মূল্য সংশোধন” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে অধিকাংশ খাতের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। বাজারটিতে ১০২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও বিপরীতে দর হারিয়েছে ২৪৭টি এবং ৪৪টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। এর ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩৩ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ৫ হাজার ৪৮২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একইসাথে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমেছে। লেনদেনের অংকের দিকে তাকালে দেখা যায়, এদিন ১ হাজার ৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ৪৫৬ কোটি টাকা কম।
লেনদেনের শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, জেনেক্স ইনফোসিস ও এনসিসি ব্যাংক প্রধান সারিতে ছিল। এছাড়া শীর্ষ ১০-এর তালিকায় উঠে এসেছে আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও দরপতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৮৪ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৩১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সেখানে লেনদেন হওয়া ২৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৪টির দাম কমেছে এবং লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। দীর্ঘদিনের টানা উর্ধ্বগতির পর বাজারের এই স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রক্রিয়াটি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা সংগ্রহের স্বাভাবিক ফল।
দেশের করদাতার সংখ্যা বাড়াতে এবং কর ফাঁকি রোধে ব্যাংক হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে নতুন হিসাব খোলার পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যাংক হিসাব সচল রাখতেও টিআইএন থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হতে পারে। মূলত ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণিকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থী, সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী এবং বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কর অব্যাহতি প্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আসন্ন জাতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী এ সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।
বর্তমানে দেশে বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাব থাকলেও তার বড় একটি অংশে টিআইএন নেই। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী টিআইএন না থাকলে ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর বাড়তি হারে উৎসে কর দিতে হয়, তবে হিসাব সচল রাখার ক্ষেত্রে টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক ছিল না। প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এই প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ব্যাংক, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ইউটিলিটি সেবা এবং ভূমি কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে এনবিআরের অনলাইন সংযুক্তি স্থাপনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব ছাড়াও করের পরিধি বাড়াতে আরও কিছু নতুন উদ্যোগ বিবেচনা করছে সরকার। এর মধ্যে ১৫০ সিসি বা তার বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নতুন করে কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উইথহোল্ডার্স রেজিস্ট্রেশন নম্বর (উইন) চালুর প্রস্তাবও থাকতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, কঠোর এই নিয়ম কার্যকর হলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি তৈরি হতে পারে, যা ব্যাংকিং লেনদেন কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রাখে। টিআইএন বাধ্যতামূলক করার ফলে গ্রাহকরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে নগদ লেনদেনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লেবাননে হামলার প্রতিবাদে ইসরায়েলের দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ২.৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫.৫০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দামও ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯২.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে যে নাজুক যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, দীর্ঘ কয়েকমাস পর এই প্রথম ইরান সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হামলা চালাল। এর জবাবে ইসরায়েলও পাল্টা হামলা শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
উল্লেখ্য যে, গত এক সপ্তাহ ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছিল। তবে সাম্প্রতিক এই সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে কী ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য আরও বাড়ার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের বাইরে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পণ্য ও বাজারকেন্দ্রিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং নতুন ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোর বিকাশে সহায়তা করাই এই বিশেষ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই তহবিলটি তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যের মাধ্যমে গঠিত হবে এবং এটি একটি আবর্তনশীল বা রিভলভিং ফান্ড হিসেবে পরিচালিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ শতাংশ সুদে এই পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে এবং এর বিপরীতে রপ্তানিকারক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৭ শতাংশ। তহবিলের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড বা কিস্তি পরিশোধে বিরতি পাওয়ার সুযোগ থাকবে। ঋণের সুদ হিসাব করা হবে কমতি স্থিতি বা রিডিউসিং ব্যালেন্স পদ্ধতিতে।
রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭ অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ ও ‘বিশেষ উন্নয়ন’ হিসেবে চিহ্নিত খাতগুলো এই স্কিমের আওতায় ঋণ সুবিধা পাবে। বিশেষ করে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারকারী রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে এই সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যেখানে চামড়া ও পাট শিল্পকে বহুমুখীকরণের বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যের ভারসাম্য উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোও নিজস্ব পদ্ধতিতে এই স্কিমে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
তবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। সিআইবি প্রতিবেদনে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত প্রতিষ্ঠান, রপ্তানি আয় সময়মতো দেশে আনতে ব্যর্থ কোম্পানি এবং ইতিপূর্বে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাবে না। এছাড়া ঋণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৭০:৩০ ঋণ-ইকুইটি অনুপাত বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন করবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান তথ্যে গড়মিল করলে বা তহবিলের অপব্যবহার করলে প্রচলিত সুদের অতিরিক্ত ৫ শতাংশ হারে জরিমানা আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রয়োজনীয় ধারার ক্ষমতাবলে এই স্কিমটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে।