জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এনবিআরের পরামর্শক কমিটির সভায় অগ্রিম আয়কর (এআইটি), ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (এটি) প্রত্যাহার, ব্যাংক ঋণের সুদহার হ্রাসসহ ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের মতামতের গুরুত্ব দেয়। যে উন্নয়ন-অগ্রগতি হচ্ছে, সেখানে কেউ বাদ থাকুক সেটা আমরা চাই না। আগামী অর্থবছরের বাজেটের জন্য ব্যবসায়ীদের দেওয়া প্রস্তাবসমূহ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে এনবিআরের ৪৪তম পরামর্শক কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান। এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। সভায় এফবিসিসিআইয়ের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতা ও উদ্যোক্তারা বক্তব্য দেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকার এবং বেসরকারি খাত সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব। বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন একটা চলমান প্রক্রিয়া। সব কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের মতামতের গুরুত্ব থাকবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান বলেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটের জন্য যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে। সবাই যদি কেবল অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য করতে চান, তাহলে রপ্তানি বাড়বে না। তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি সম্প্রসারণের জন্য ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে।
ব্যবসায়ীরা কর ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কর ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। স্মার্ট বাংলাদেশ র্নিমাণে সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে আমাদের যেমন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও রাজস্ব ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে কর আহরণের সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে। এই সক্ষমতা যদি অর্জন করতে না পারি, তাহলে উন্নত বিশ্বে আমরা যেতে পারব না। ব্যবসায় ব্যয় কমানো কিংবা ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে এনবিআর কাজ করছে বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, কর সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ব্যবসায়ীর যদি অসন্তোষ থেকে থাকে, আমি মনে করি সেটি ব্যক্তিপর্যায়ের। এই অসন্তোষ সংশ্লিষ্ট কমিশনার কিংবা রাজস্ব বোর্ডে কথা বলে সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি আশ্বস্ত করেন ব্যবসায়ীদের।
এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম ব্যবসায় খরচ কমাতে আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আমদানিকৃত কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যসহ শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি), ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (এটি) প্রত্যাহার, ব্যাংক ঋণের সুদহার হ্রাসসহ আমদানি পণ্যের যথাযথ শুল্কায়ন এবং পণ্য খালাসের জটিলতা দূর করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে তিনি রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পণ্য, কাঁচামাল ও সেবা ক্রয়কে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানান।
মাহবুবুল আলম মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের প্রকৃত আয় বিবেচনায় রেখে আগামী জাতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাক থেকে বৃদ্ধি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।
আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে ব্যাংকিং কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, কেউ যদি এনবিআরের কোনো কর্মকর্তার কারণে হয়রানির শিকার হন। সেই অভিযোগ জানানোর জায়গা নেই। তবে এফবিসিআিই এবং এনবিআরের সমন্বয়ে একটা অভিযোগ সেল গঠন করা হলে ব্যবসায়ীরা সেখানে অভিযোগ করতে পারবেন। আগামী বাজেটে এ ধরনের একটা অভিযোগ সেল গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া এফবিসিসিআই ব্যবসা সহজীকরণের সেবা বাড়াতে ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বিভাগ নামে একটি বিভাগ গঠনের প্রস্তাব করেন।
মাহবুবুল আলম রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পসহ সব রপ্তানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর হার ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে পূর্বের ন্যায় ০ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা আগামী ৫ বছর পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করেন। এ ছাড়া তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, বুট, ডাল, হলুদ, মরিচ, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনিসহ সকল প্রকার কৃষিজাত নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যকে উৎসে কর কর্তনের আওতাবহির্ভূত রাখার প্রস্তাব করেন। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শিল্প, বিনিয়োগ ও জনবান্ধব হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সভায় এনবিআরের তিনজন সদস্য আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সম্পর্কিত কার্যক্রমের ওপর আলাদা তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
তীব্র মূল্যস্ফীতি ও কঠোর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ঐতিহাসিক দরপতনের শিকার হয়েছে ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়াল। দেশটির খোলাবাজারে প্রথমবারের মতো প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ২৫ লাখ ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট পাশিজির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু জানায়, মঙ্গলবার ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমে যায়। এদিন লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৪৮ হাজার রিয়ালে পৌঁছালেও দিনশেষে তা ২৫ লাখ ৪২ হাজার রিয়ালে স্থিতিশীল হয়। এর আগের দিন সোমবারও ডলারের দর ২৪ লাখ রিয়ালে পৌঁছে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং সমুদ্রপথে আরোপিত অবরোধ দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য এবং প্রধান আয়ের উৎস জ্বালানি তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরোধ ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাবে স্থানীয় মুদ্রার এই ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনীতিতে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নতুন নোট মুদ্রণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। এর বিপরীতে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক খরচ বহুলাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সামগ্রিক ডিজিটাল লেনদেন ইকোসিস্টেম পরিচালনায় বাৎসরিক ব্যয় হয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। এ হিসাবে মাথাপিছু বার্ষিক ডিজিটাল লেনদেনের খরচ দাঁড়ায় মাত্র ৩৪৮ টাকা। বিপরীতে প্রচলিত নগদ ব্যবস্থাপনার মাথাপিছু খরচ এর তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ছায়া অর্থনীতির রাজস্ব ক্ষতি ব্যতীত কেবল নগদ টাকা ব্যবস্থাপনায় বছরে খরচ হয় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যার মাথাপিছু পরিমাণ ৪ হাজার ৪৯৫ টাকা। অন্যদিকে ছায়া অর্থনীতির কারণে রাজস্ব ক্ষতি যুক্ত করলে নগদ ব্যবহারের সামগ্রিক ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়; যার ফলে মাথাপিছু ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা। অর্থাৎ সামগ্রিক বিবেচনায় ছায়া অর্থনীতিসহ নগদ ব্যবস্থাপনার এই ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি। এছাড়া ডিজিটাল লেনদেন খাত থেকে প্রতি বছর ২ হাজার ৩১১ কোটি টাকার রাজস্ব বা আয় অর্জিত হয়, যা মাথাপিছু হিসেবে প্রায় ১৩৫ টাকা। তবে নগদ ব্যবস্থাপনার বিপুল ব্যয় সাধারণের দৃষ্টিগোচর না হলেও ডিজিটাল সেবার মাশুল সরাসরি ব্যবহারকারীর নজরে আসে। ফলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়া সত্ত্বেও অনেকের কাছে এটি বেশি ব্যয়বহুল মনে হয় এবং নগদ টাকার প্রতিই তাদের নির্ভরশীলতা বজায় থাকে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ হাজার ৮১২ কোটি টাকার ব্যয়ভার বহন করেন সাধারণ গ্রাহকরা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টদের প্রায় ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, ইস্যুকারী বা অরিজিনেটিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা এবং অ্যাকোয়ারার বা রিসিভিং প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থার কর্মী ও জালিয়াতি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পরোক্ষ খাতে প্রায় ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক পরিচালনায় ব্যয় হয় প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিপরীতে এই খাত থেকে অর্জিত মোট আয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫২২ কোটি টাকা আয় করে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেটওয়ার্ক থেকে প্রায় ৩৪৮ কোটি টাকা, রিসিভিং প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৩৪৬ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক কার্ড স্কিম থেকে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা অর্জিত হয়।
ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত ও প্রযুক্তিগত কিছু বাধার কারণে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এখনও প্রত্যাশিত গতি পায়নি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনে দৈনিক ৫০ হাজার টাকার সীমা নির্ধারণ বড় অঙ্কের লেনদেনকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। একই সঙ্গে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কার্যকরী মূলধনের সংকট তৈরি হয়। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগের ঘাটতি এবং নগদ লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল মাধ্যমের বহুমুখী ধাপ ব্যবহারের জটিলতাও সাধারণ মানুষের আগ্রহের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে লেনদেন আরও সহজ করতে এবং বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে একক ‘বাংলা কিউআর’ চালুর পাশাপাশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও অন্তর্নিহিত ঝুঁকি পুরোপুরি না কাটায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে এই সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে তিনি জানান, “গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।” একই সাথে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও তা দীর্ঘ মেয়াদে স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে এখনও যথেষ্ট নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দর সমন্বয় এবং প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় উসকে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে নীতি শিথিল করা হলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যকে দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামায় সার্বিক সূচকে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের ওপর পণ্য ও সেবামূল্যের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। এছাড়া জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন ও জ্বালানির ব্যয়বৃদ্ধি উৎপাদন এবং পরিবহনে বাড়তি ব্যয় তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও শ্লথগতির মধ্যে রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হলেও তৃতীয় প্রান্তিকে তা ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার ধারণা রয়েছে, যেখানে শিল্প খাতে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকোচন দেখা গেছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি ঋণের দুর্বল গতি অর্থনৈতিক স্থবিরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও চলতি অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা উন্নতির আভাস মিলেছে।
অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকাসহ সর্বমোট ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্যাকেজ ও বিভিন্ন পুনরর্থায়ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট কাটাতে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত আগস্টে নীতি সুদহার কিছুটা কমানোর ফলে আন্তঃব্যাংক লেনদেন ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের ইল্ডে স্বস্তি ফিরলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে রয়েছে। গত আগস্টে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ঋণশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকলেও নতুন অর্থবছরের শুরুতে আর্থিক হিসাবের দুর্বলতায় সামগ্রিক ভারসাম্যে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অবশ্য প্রবাসী আয়ে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বাভাস দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশের পূর্বাভাস দিলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের পূর্বানুমান কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও আর্থিক খাতের নানা চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
চীনা বাজারে ক্রমাগত মন্দা ও দুর্বল বিক্রির প্রেক্ষাপটে মুনাফা হ্রাস পাওয়ার পর এবার স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মুনাফার মার্জিন পুনরুদ্ধারে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছে জার্মানির বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ। বুধবার বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিনিয়োগকারীদের জন্য আয়োজিত দুই দিনব্যাপী কৌশলগত সম্মেলনে এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার কথা রয়েছে। বার্নস্টেইনের বিশ্লেষকরা বিএমডব্লিউ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, প্রতিষ্ঠানটির অটোমোটিভ বিভাগ ২০২৮ সালের মধ্যে মুনাফার মধ্যমেয়াদি মার্জিন ৩ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে এই মার্জিন ৮ থেকে ১০ শতাংশে ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
গত জুন মাসে চীনা বাজারে দুর্বল পারফরম্যান্সের জেরে অপ্রত্যাশিত মুনাফা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেয় বিএমডব্লিউ, যা তিন বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ঘটল। চীনে বিক্রি হ্রাস এবং মার্কিন শুল্কের কারণে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এই ধাক্কা সামলাতে জার্মানির কারখানাগুলো থেকে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে মিউনিখভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি, যা ভক্সওয়াগন ও মার্সিডিজ-বেঞ্জের নেওয়া ব্যয় সংকোচন নীতির অনুরূপ। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। তবে বুধবারের লেনদেনে তাদের শেয়ার দর ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক স্টিফেন রেইটম্যান বলেন, “বিএমডব্লিউ বুঝতে পেরেছে যে এর সমাধান কেবল খরচ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবনী পণ্যের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকেও জোর দিচ্ছে।” তিনি আরও জানান, বিদ্যুচ্চালিত আইএক্সথ্রি এসইউভি সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্মের ‘নয়ে ক্লাসে’ মডেলের গাড়িগুলো তাদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
বিএমডব্লিউর বর্তমান এক্স৭ মডেলের চেয়েও উন্নত একটি বিলাসবহুল এসইউভি বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে এম ও আলপিনা সিরিজের গাড়িগুলোর পরিসর আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি জার্মানিতে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ৩ সিরিজ স্পোর্টস সেডান উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রায় ২০০ কোটি ইউরো বা ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বার্নস্টেইনের তথ্যমতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বিএমডব্লিউর কারখানাগুলো শতভাগ সক্ষমতায় চললেও চীনের কারখানাই হচ্ছে “উৎপাদন সমন্বয় এবং সক্ষমতার নমনীয়তা প্রয়োজন এমন প্রধান ক্ষেত্র।”
টানা চার কার্যদিবস ধরে চলা ধারাবাহিক দরপতনের অবসান ঘটিয়ে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবগুলো প্রধান মূল্যসূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এদিন লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইতে ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে, যা দিনের শেষ পর্যন্ত বজায় ছিল। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯০টির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের দর। ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বাছাই করা ৩০ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ১৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১০৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০২ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে।
কোম্পানিগুলোর শ্রেণিভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো কোম্পানির মধ্যে ৯৫টির শেয়ারদর বাড়লেও কমেছে ৬৯টির এবং ৩১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। মাঝারি মানের ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ২২টির দাম কমেছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ৭টির দর। এছাড়া লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ ‘জেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫০টির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ৩৯টির পতন হয়েছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৯টির দর। লেনদেন হওয়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ৬টির দাম বাড়লেও ১৩টির কমেছে এবং ১৪টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
মূল্যসূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের গতিও বেড়েছে। এদিন বাজারটিতে মোট ৬৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ কেনাবেচা সম্পন্ন হয়, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের চেয়ে ৬৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বেশি। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে শীর্ষে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় এর পরেই রয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, বেক্সিমকো ফার্মা, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সায়হাম টেক্সটাইল, ব্র্যাক ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, নিটল ইন্স্যুরেন্স, ইভিন্স টেক্সটাইল এবং এনভয় টেক্সটাইল।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বেশিরভাগ সিকিউরিটিজের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৭টির শেয়ারদর বাড়ার বিপরীতে ৭৪টির দাম কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনশেষে বাজারটিতে মোট ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের ২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগামী ৪ অক্টোবর দেশব্যাপী ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিনিয়োগ সংক্রান্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অধিকার সুরক্ষার বার্তা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে এ বিশেষ কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) কনভেনশন অডিটোরিয়ামে (লেভেল-১) এই উদ্বোধনী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। উদ্বোধনী এ আয়োজনে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারবৃন্দ ছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) শীর্ষ প্রতিনিধিগণসহ দেশের পুঁজিবাজারের প্রায় এক হাজার অংশীজন সমবেত হবেন।
বিএসইসির উদ্যোগে এবারের আন্তর্জাতিক এই সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স, ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ‘ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স, ডিজিটাল ডেসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে এই আলোচনায় আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধ, অনলাইন স্ক্যাম থেকে সাবধানতা অবলম্বন এবং বিনিয়োগকারীদের টেকসই সুরক্ষার নানা দিক নিয়ে বিশদ মতবিনিময় করা হবে।
বাংলাদেশের ব্যক্তিগত পরিবহন খাতে বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বা ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের (ইভি) ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আকর্ষণীয় বিক্রয়োত্তর সেবার ওপর ভর করে দেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিলাসবহুল ব্র্যান্ড যেমন টেসলা, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ এবং অডির উপস্থিতি থাকলেও সামগ্রিক চার চাকার ইভি বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ শেয়ারই এখন বিওয়াইডি, ডিপাল ও এমজির মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর দখলে। বিশেষ করে দেশে বিক্রিত প্রায় তিন হাজার ব্যক্তিগত ইভির মধ্যে এককভাবে চীনা ব্র্যান্ড বিওয়াইডি দেড় হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বিক্রি ২০০ থেকে ২৫০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আমেরিকা, ইউরোপ বা জাপানি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক গাড়ির আকাশচুম্বী দামের বিপরীতে চীনা ইভিগুলো ৩৫ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে পাওয়া যাওয়ায় দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের প্রধান পছন্দে পরিণত হয়েছে। এছাড়া সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে প্রায় ১৪ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে বিদ্যুৎচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারের পরিচালন ব্যয় নেমে এসেছে মাত্র দেড় থেকে সাড়ে তিন টাকায়। দুই চাকার স্কুটারের বাজারে এই সাশ্রয়ী চিত্র আরও স্পষ্ট; যেখানে মাত্র ৯ থেকে ১০ টাকার বিদ্যুতে একটি ই-স্কুটার ৭০ থেকে ৭২ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ চলতে পারে। ফলে স্কুটারের সম্পূর্ণ বাজারই বর্তমানে চীন আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তবে আমদানির পাশাপাশি দেশীয়ভাবে সংযোজন শিল্পও বিকশিত হচ্ছে; আরএফএল গ্রুপের ‘রাইডো’ ব্র্যান্ড স্থানীয় কারখানায় যন্ত্রাংশ সংযোজনের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে ই-স্কুটার বাজারজাত করছে এবং চীনা বিনিয়োগকারীরাও অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেডে পূর্ণাঙ্গ সংযোজন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করছেন।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশে ব্যাটারিচালিত স্কুটারের বিক্রি বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে যেখানে দেশজুড়ে মাসে মাত্র ৯৬৯টি স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, তা চলতি বছরের এপ্রিলের জ্বালানি সংকটের সময় সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ হাজারে পৌঁছায় এবং সর্বশেষ আগস্টেও মাসিক বিক্রি ৩ হাজার ৪১৪টিতে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আনুষ্ঠানিক তথ্যেও এই রূপান্তরের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে নিবন্ধিত ৮২৬টিরও বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৪৭৮টি গাড়ি কেবল চলতি বছরেই নিবন্ধিত হয়েছে; যা ২০২১ সালের মাত্র চারটি এবং ২০২৫ সালের ২৩৮টি নিবন্ধনের তুলনায় এক বিশাল উল্লম্ফন।
তবে দেশে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে পর্যাপ্ত গণ-চার্জিং স্টেশনের অভাব। বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি চার্জিং স্টেশন কার্যকর রয়েছে, যার বেশিরভাগই বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত। ফলে দূরপাল্লার যাতায়াতে চার্জিং নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কাটাতে অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি গাড়ির সাথে নিজস্ব হোম চার্জার সরবরাহ করছে এবং মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরগুলোতে নতুন করে অর্ধশতাধিক দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও মোটরে ছয় থেকে আট বছরের দীর্ঘমেয়াদি ওয়ারেন্টি এবং তিন বছরের মধ্যে বাইব্যাক বা পুনরায় ক্রয়ের সুবিধা নিশ্চিত করায় ক্রেতাদের মাঝে প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট যানবাহনের ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎচালিত করার যে নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং বাজেটে শুল্কছাড় দিয়েছে, তার ফলে আগামী দিনগুলোতে ই-বাইক ও সাশ্রয়ী গাড়ির দাম আরও পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট দুই কোটি ২০ লাখ ইভির প্রায় ৭৫ শতাংশই তৈরি করছে চীন এবং দেশটি বছরে রেকর্ড ২৫ লাখ ইভি রপ্তানি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু তৈরি গাড়ি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশে পূর্ণাঙ্গ সংযোজন, ব্যাটারি কারখানা এবং সহায়ক লজিস্টিকস শিল্প গড়ে তুলতে পারলে জ্বালানি সাশ্রয় ও নগরীর বায়ুদূষণ হ্রাসের পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের যাবতীয় ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের সব তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। বিএফআইইউর দায়িত্বশীল এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংকগুলোকে পাঠানো নির্দেশনায় সালমান মুক্তাদিরের নামে পরিচালিত সব ধরনের ব্যাংক হিসাবের তথ্য, হিসাব খোলার ফরম (এওএফ), গ্রাহক পরিচিতি সংক্রান্ত কেওয়াইসি নথি এবং বিস্তারিত হিসাব বিবরণী বা ব্যাংক স্টেটমেন্টের সফটকপি জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএফআইইউর সরবরাহ করা এক্সেল ফাইলে তাঁর হিসাবগুলোর বিস্তারিত তথ্য, অর্জিত সুদ এবং উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) সংক্রান্ত যাবতীয় বিবরণ পূরণ করে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় এই আর্থিক তথ্য তলব করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পরিপত্রের আলোকে এসব তথ্যের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি ভবনে সালমান মুক্তাদিরের কার্যালয় ও স্টুডিওতে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার পর চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং পরবর্তীতে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান মন্তব্য করেছেন যে, সালমান মুক্তাদিরসহ সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা করে সরকার।
ইউরোপের জ্বালানি ও ঋণসংক্রান্ত উদ্বেগের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নীতি সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের মান চলতি বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে গত ১৪ মাসের মধ্যে ইউরোর বিপরীতে ডলারের সবচেয়ে বড় মাসিক উত্থান হতে চলেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
মঙ্গলবার ইউরোর দর কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৩১২ ডলারে, যা ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন। বুধবার এশিয়ার বাজারে তা সামান্য পরিবর্তন হয়ে ১ দশমিক ১৩৩৭ ডলারে লেনদেন হয় এবং জাপানি মুদ্রা ইয়েনের বিপরীতেও তা প্রায় ১৭৮ পয়েন্টে সমর্থন খুঁজছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোর বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা টানা তৃতীয় প্রান্তিক ধরে ডলারকে মুনাফার ধারায় রেখেছে।
ডলারের শক্তিমত্তার প্রভাবে অস্ট্রেলীয় ডলারের দর আগস্টের শুরুর পর প্রথমবারের মতো ৭০ সেন্টের নিচে নেমে গেছে। দেশটির মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য কম হওয়ায় মুদ্রাটির মান নয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬৯৫৯ ডলারে নেমে আসে। বৈদেশিক মুদ্রা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা মার্কেটস-এর প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ট ডনেলি বলেন, “মার্কিন অর্থনীতি অত্যন্ত চাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে, বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও ফ্রান্সের রাজনীতি ইউরোর জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপে গ্যাসের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা, যার কারণে জার্মানির সঙ্গে ফরাসি বন্ডের মুনাফার ব্যবধান বেড়ে ১১৫ বেসিস পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা ইউরোর সম্ভাব্য পতন থেকে রক্ষা পেতে আগাম সুরক্ষা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে ডলারের এই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখতে আগামীতে আরও জোরালো মার্কিন তথ্যের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুইস ফ্রাঁ-এর বিপরীতে ডলার প্রায় ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৮৩৫৮ ফ্রাঁতে উঠেছে। তবে জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ মুদ্রা হস্তক্ষেপ এবং ব্যাংক অব জাপানের নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে ডলারের বিপরীতে ইয়েন কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দর ২ শতাংশ এবং পুরো তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে এশিয়ার বাজারে ১৫৬ দশমিক ৩৮ ইয়েনে লেনদেন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সুদহার নির্ধারণের বিষয়ে ধারণা পেতে বাজার বর্তমানে দেশটির কোর পিসিই মূল্যস্ফীতি সূচক এবং আসন্ন কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের ওপর নজর রাখছে। তবে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস সুদহার বাড়ানোর বিষয়ে “জরুরি কোনো প্রয়োজন নেই” বলে মন্তব্য করার পর নীতি সুদহার বৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা ম্লান হয়েছে। এর প্রভাবে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা ৩ দশমিক ৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে এবং আগামী মাসে সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৭১ শতাংশ থেকে কমে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে নিউজিল্যান্ড ডলারের দর শূন্য দশমিক ৫৬৪৬ ডলারে নেমে গেছে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড তিন মাসের সর্বনিম্নে নেমে ১ দশমিক ৩২৩৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে চীনের জাতীয় ছুটির প্রাক্কালে শেষ কার্যদিবসে ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা ইউয়ান টানা সপ্তম প্রান্তিকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার পথে রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ধাতু ভোক্তা দেশ চীনে সেপ্টেম্বর মাসে কারখানা খাতের কার্যক্রম পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার তথ্যে বুধবার বিশ্ববাজারে তামার দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দেশটিতে সপ্তাহব্যাপী আসন্ন জাতীয় ছুটির কারণে সামগ্রিক লেনদেনের গতি কিছুটা শ্লথ ছিল।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি তামার বেঞ্চমার্ক মূল্য জিএমটি ০৩টা ৩০ মিনিট নাগাদ শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন ১৪ হাজার ৪৭১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জে (এসএইচএফই) সর্বাধিক লেনদেন হওয়া নভেম্বর মেয়াদের তামার দর শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩০ ইউয়ান বা ১৬ হাজার ৩৪০ দশমিক ২০ ডলারে পৌঁছায়। তবে দীর্ঘ ছুটির কারণে সংক্ষিপ্ত হওয়া চলতি সপ্তাহে পণ্যটির সার্বিক দর শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ কমে সমাপ্তির পথে রয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) আগস্টের ৪৯ দশমিক ৮ পয়েন্ট থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৫০ দশমিক ১ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে রেটিংডগ-এর একটি বেসরকারি জরিপে কারখানা কার্যক্রমে আরও দ্রুতগতির সম্প্রসারণ পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে পিএমআই সূচক আগের ৫১ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ১ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
চীনের জাতীয় দিবসের ছুটি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে এসএইচএফই-এর কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং আগামী ৮ অক্টোবর তা পুনরায় চালু হবে। দীর্ঘ ছুটির মুখে পড়ে ধাতুটির সরাসরি বা ভৌত চাহিদাও কিছুটা কমেছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রিমিয়াম আগের দিনের শীর্ষ অবস্থান থেকে কমে প্রতি টনে ১ হাজার ৫০ ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। তবে আমদানিকৃত কাঁচামালের প্রতি চীনা শিল্পখাতের চাহিদার নির্দেশক ইয়াংশান কপার প্রিমিয়াম সামান্য বেড়ে টনপ্রতি ১১৯ ডলার হয়েছে।
মার্কিন বন্ডের ক্রমবর্ধমান মুনাফার ওপর ভর করে ডলারের মান শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, যা মাসভিত্তিক হিসাবে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধির পথে রয়েছে। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য ডলারে নির্ধারিত ধাতুর ক্রয়মূল্য বেড়ে যায়। পাশাপাশি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দর ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজার চাঙ্গা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক পুনরায় নীতি সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে বজায় রেখেছে।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে লেনদেন হওয়া অন্যান্য ধাতুর মধ্যে অ্যালুমিনিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ এবং নিকেলের দর শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে জিংকের দর শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ ও টিনের দর শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সিসার দাম অপরিবর্তিত ছিল। অন্যদিকে সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জে অ্যালুমিনিয়ামের দর শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ, জিংক শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, সিসা শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ এবং নিকেলের দর ১ দশমিক ০০ শতাংশ কমেছে, তবে টিনের দাম ছিল অপরিবর্তিত।
দেশব্যাপী নগদবিহীন বা ক্যাশলেস লেনদেনকে আরও গতিশীল ও সর্বজনীন করতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ‘বাংলা কিউআর’ কোড ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) অর্থ স্থানান্তর সেবা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ ব্যবস্থার আওতায় একজন গ্রাহক অন্য যেকোনো ব্যক্তির বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে কিংবা মোবাইল অ্যাপে কিউআর কোডের ছবি আপলোড করে সরাসরি আন্তঃব্যাংক ও এমএফএস লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন। একই সাথে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে ডিজিটাল মাধ্যমে পণ্য ও সেবার মূল্য নেওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রেতার ওপর আরোপিত ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) স্থগিত করা হয়েছে, যা আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকেই কার্যকর হবে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের অর্থ পাওয়ার সাথে সাথেই তা স্বয়ংক্রিয় ও তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর হিসাবে জমা হয়ে যাবে, ফলে অর্থ পাওয়ার জন্য বিক্রেতাদের আর অপেক্ষা করতে হবে না। এছাড়া ১ শতাংশ এমডিআর বাতিলের পাশাপাশি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ইন্টারচেঞ্জ ফি শূন্য নির্ধারণ করায় ব্যাংক ও এমএফএসগুলো এখন থেকে মার্চেন্টদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে বা নামমাত্র মূল্যে এই ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা দিতে পারবে। পাশাপাশি লেনদেন বাড়াতে ১ অক্টোবর থেকেই জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের (এনপিএসবি) মাধ্যমে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি কিউআর লেনদেনের বিপরীতে অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ বাণিজ্যিক মার্চেন্ট বাংলা কিউআর সেবার আওতায় এসেছেন। গত ১ জুলাই একক বাংলা কিউআর চালুর পর বিগত ৯০ দিনের ব্যবধানে এ মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা গড়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জুন মাসে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ লেনদেনের মাধ্যমে ২৮ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ হতো, বর্তমানে তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লেনদেনে গড়ে ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার মাইলফলকে পৌঁছেছে।
আরিফ হোসেন খান জানান, ডিজিটাল অর্থনীতির এই রূপান্তরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গণপরিবহন খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ আন্তঃডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কার্যকরী কমিটি একযোগে নীতিগত কৌশল বাস্তবায়ন করছে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ডিজিটালাইজেশনের পরিধি আরও সুসংহত হবে।
ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গরুর মাংসের নির্ধারিত বার্ষিক কোটা অতিক্রমকারী অংশের ওপর অতিরিক্ত ৫৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে। ইয়াহু নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত কোটার বাইরে ব্রাজিল থেকে প্রবেশ করা গরুর মাংসের চালানে বিদ্যমান ১২ শতাংশ নিয়মিত শুল্কের সঙ্গে আরও ৫৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যুক্ত হবে। তবে এই বাড়তি শুল্ক পুরো আমদানির ওপর নয়; শুধুমাত্র নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত পরিমাণের ওপর প্রযোজ্য হবে। চলতি ২০২৬ সালের জন্য ব্রাজিলের জন্য চীনের গরুর মাংস আমদানির বার্ষিক কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১১ লাখ ৬ হাজার টন। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এই কোটা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয়ে যাওয়ায় এখন থেকে অতিরিক্ত সব চালানের ওপর এই বাড়তি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ খামারি ও স্থানীয় মাংস উৎপাদন খাতকে অতিরিক্ত আমদানির বিরূপ প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে চলতি বছরের শুরুতেই তিন বছর মেয়াদি বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘সেফগার্ড’ নীতি কার্যকর করেছে বেইজিং। এই কাঠামোর আওতায় ব্রাজিলসহ প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করে তা অতিক্রম করলে অতিরিক্ত ৫৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের শর্ত রাখা হয়। ব্রাজিলের মাংস শিল্পের জন্য চীনের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য; দেশটি গত বছর প্রায় ১৭ লাখ টন গরুর মাংস একাই চীনে রপ্তানি করেছিল। বর্তমান কোটা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এবং তা দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ব্রাজিলের মাংস রপ্তানিকারকদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
এর আগে আগস্টেই চীনা কর্তৃপক্ষ আভাস দিয়েছিল যে ব্রাজিলের জন্য বরাদ্দকৃত কোটার ৯০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়ে গেছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ তা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে এই পদক্ষেপ কেবল কোনো একক দেশকে নিশানা করে নয়, বরং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় সব বড় সরবরাহকারী দেশের জন্যই এ সাধারণ সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রযোজ্য। তবে কোটার অতিরিক্ত রপ্তানি সচল রাখতে হলে অতিরিক্ত শুল্কের বিষয়টি এখন চীন-ব্রাজিল মাংস বাণিজ্যে নতুন অর্থনৈতিক বিবেচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে সংকটের চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আমদানিকারক ও অপারেটররা দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে দাবি করলেও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও একটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তুলনায় এই বাড়তি ব্যয় ৪১৫ থেকে ৫১৫ টাকা।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পাওয়া সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনে দেশে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগের মাস আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের পুরো মাসের হিসাব এখনো পাওয়া না গেলেও মাসের প্রথম ২২ দিনের আমদানি আগস্টের মোট আমদানির তুলনায় অনেক কম।
নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের ব্যবধান: বিইআরসি ২ সেপ্টেম্বর সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে। নতুন দাম ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘোষিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের ব্যবধান কমেনি; বরং সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগের মধ্যে অনেক এলাকায় গ্রাহকদের বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন পাইপলাইনের গ্যাস-সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সদস্যরা। রান্নার জন্য যাদের সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাদের জন্য বাড়তি ব্যয় এড়ানোর সুযোগ সীমিত। নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পেলে একদিকে সংসারের মাসিক বাজেট বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহকারীদের কাছে ঘুরেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এলপিজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি, জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজের প্রাপ্যতা ও কার্গো সংগ্রহের ওপর।
গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মধ্যেও কাতার-সংশ্লিষ্ট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। অর্থাৎ নৌপথে ঝুঁকি থাকলেও সব ধরনের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ—এমন নয়। তবে এলএনজির জাহাজ চলাচলের তথ্যকে সরাসরি এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতির সমতুল্য হিসেবে দেখা যাবে না।
বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিকারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্গো সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকার পরও কোনো কোনো সরবরাহকারী চুক্তির তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম পণ্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খোলাবাজার থেকেও চাহিদামতো কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান সরবরাহ বজায় রাখতে রেশনিং করছে। এ ছাড়া এলপিজির মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করেছিল বলে আমদানিকারকদের বক্তব্য। বর্তমানে এই প্রিমিয়াম ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে বলে তারা জানিয়েছেন। বাড়তি ব্যয় নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব ব্যয়ের তথ্য আমদানিকারকদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পাওয়া। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আমদানি ব্যয়, চুক্তির শর্ত ও সরবরাহের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলে বাজারে দাম বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি কারণের নির্দিষ্ট অবদান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে দেশে এলপিজির কোনো বড় সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য তুলে ধরে তারা আমদানি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, বাজারে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়া এবং খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার অভিযোগ এই দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট ব্যবধান তুলে ধরছে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। দেশে মোট কত এলপিজি আমদানি হয়েছে এবং কী পরিমাণ মজুত রয়েছে, তা এক ধরনের হিসাব। আর সেই গ্যাস সময়মতো ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা আরেকটি বিষয়। জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও পরিবহন, বিতরণ বা স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের সমস্যা হলে নির্দিষ্ট এলাকায় সংকট তৈরি হতে পারে।
খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কয়েকটি কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। ফলে বাজারে পণ্য কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কোম্পানিগুলোর দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার মজুত করছেন এবং বেশি দামে বিক্রি করছেন।
এসব অভিযোগের কোনটি কতটা সত্য, তা নির্ধারণে কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহের তথ্য, পরিবেশকদের কাছে পাঠানো সিলিন্ডারের পরিমাণ, খুচরা বিক্রির রসিদ এবং মজুতের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু আমদানির পরিসংখ্যান দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না। একইভাবে, মজুতের অভিযোগ উঠলেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীকে দায়ী করার সুযোগ নেই—প্রয়োজন তদন্ত ও প্রমাণ।
উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বরেও আমদানি কমে যাওয়ার পর এলপিজির বাজারে একই ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। তখন কোনো কোনো এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিলে খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।