ঈদে ঘরমুখো মানুষ রাজধানী ছাড়তে শুরু করায় চাহিদা কমে গেছে শাকসবজি, পেঁয়াজ ও ফলমূলসহ স্থানীয় মৌসুমি ফলের। তাই তরমুজ, আনারস ও আমদানি করা ফলের দাম কিছুটা কমেছে। এদিকে চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গম ও আটার দাম অপরিবর্তিত থাকলেও গরু ও মুরগির মাংস এবং মাছের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, মালিবাগ, হাতিরপুলসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, আজ শুক্রবার গরুর মাংস, মুরগি ও মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। এসব পণ্যের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, ঈদ সামনে রেখে মাংসের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া বাজারে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাছের দামও বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের কসাই আবু বকর জানান, প্রতিকেজি গরুর মাংস ৭৫০ টাকা এবং খাসির মাংস বা ছাগলের মাংস যথাক্রমে ১০০০ ও ১১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার পরিদর্শন করেছেন, তাই হঠাৎ করে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে গত ঈদের চেয়ে এবার পশুর সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় মাংস ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমেছে বলে জানান তিনি।
শুক্রবার কারওয়ান বাজারের বাইরে মান ভেদে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে এবং সপ্তাহের অন্যান্য দিনের চেয়ে কেজিতে ৩০ টাকা বেড়েছে। মান ভেদে খাসির মাংস প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১১৮০ টাকায়, যা কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে।
দাম বেড়েছে ব্রয়লার মুরগিরও। গত সপ্তাহে ছিল ২২০ টাকা তা বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকায়। এ ছাড়া সোনালি মুরগির দামও বেড়েছে। এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজি দরে।
একইভাবে প্রতি কেজি কক মুরগি ৩৭০ থেকে ৩৯০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, মুরগির খাবার ও ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার দাম বাড়ায় মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছে।
এদিকে চাহিদা কমে যাওয়ায় শুক্রবার প্রায় সব সবজির দাম কমলেও ঢেঁড়স, সজিনা, মটরশুঁটি ও করলার মতো নতুন সবজি কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর দামের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। মৌসুম শেষ হওয়ায় বেড়েছে টমেটোর দাম। ভালো মানের টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে। বেগুনসহ অন্যান্য সবজি ৩০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ, চালকুমড়া ও ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মান ভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৬০ টাকা, রসুন ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, আদা ২০০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিমের দাম কিছুটা কমিয়ে প্রতি ডজন বাদামি ডিম ১৩০ টাকা, হাঁসের ডিম প্রতি হালি ৭০ টাকা এবং গৃহপালিত মুরগির ডিম প্রতি হালি ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাপকভাবে কমে গেছে তরমুজের দাম। সবচেয়ে ভালো মানের তরমুজ প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকার এবং মানের ভিত্তিতে প্রতি পিস আনারস ২০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পেয়ারা ৫০ থেকে ৭০ টাকা, পাকা পেঁপে যা রমজানের প্রথম সপ্তাহে ২০০ টাকা বা তার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছিল, তা ১০০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
আপেল, মাল্টা, কমলা ও নাশপাতি ২৬০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি রমজানের প্রথম ২ সপ্তাহে এই ফলগুলো ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো।
এ সপ্তাহে কাঁচাবাজারের অন্যান্য পণ্যের দামে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।
সবুজ শিল্পায়নের অভিযাত্রায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সম্প্রতি নতুন ৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ‘লিড’ (LEED) সনদ অর্জন করায় দেশে বর্তমানে পরিবেশবান্ধব কারখানার মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৪টিতে। যার মধ্যে ১২১টি কারখানা সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্লাটিনাম এবং ১৪৪টি গোল্ড রেটিং প্রাপ্ত। বিশেষত, বিশ্বের সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন শীর্ষ ১০০টি লিড কারখানার তালিকায় এখন অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫২টিই বাংলাদেশের দখলে।
নতুন করে এই স্বীকৃতির তালিকায় যুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী টেক্সটাইলস লিমিটেড (ইউনিট-০২) ৮৬ পয়েন্ট নিয়ে প্লাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত এভারব্রাইট সোয়েটার লিমিটেড ৮৩ পয়েন্ট এবং গাজীপুরের সুরাবাড়ির সিয়াম কম্পিউটারাইজড ইলাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (মামটেক্স) ৮৪ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া গাজীপুরের শ্রীপুরের ওয়েলডান অ্যাপারেল লিমিটেড ৭৫ পয়েন্ট পেয়ে গোল্ড সনদ লাভ করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পানি ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে রোল মডেলে পরিণত করেছে। এই অগ্রযাত্রা সম্পর্কে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘টেকসই শিল্পায়নের সূচকে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক নেতৃত্বের কাতারে। নতুন চারটি কারখানার সংযোজন এ অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করেছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই টেকসই উন্নতির ধারা বজায় রাখতে উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে সবুজ শিল্পায়নের এই রেকর্ড ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার ৩৭৭ টন কাঁচা পাট বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই রপ্তানি প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশই ভারতের বাজারে যাবে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধান আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে বর্তমানের এই ১৮টি প্রতিষ্ঠান সরকারি বিধিনিষেধের আগেই বিদেশি আমদানিকারকদের কাছ থেকে টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার বা টিটির মাধ্যমে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করায় তাদের বিশেষ বিবেচনায় এই রপ্তানি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে টিটি হলো সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
রপ্তানি অনুমোদনের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গণমাধ্যমকে বলেন, “নিষেধাজ্ঞা যেটা আছে তা থাকবে এবং সরকারের অনুমতি নিয়েই কাঁচা পাট রপ্তানি করতে হবে। এ দফায় যাঁদের রপ্তানি অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাঁরা আগেই আমদানিকারকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। ফলে অনুমতি দিতেই হয়েছে।”
অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে তাসফিয়া জুট ট্রেডিং, এ জেড জুট ট্রেডিং, এস এস ট্রেডিং, মেসার্স সুকুমার সরকার, জুট ইমপেক্স, সোনালী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এম এন জুট ট্রেডিং, মেসার্স রশ্মি কবির, সারতাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আর এস ট্রেডার্স, তৌফিক জুট ট্রেডিং, মেসার্স শরীফ আহমেদ, গাজী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, বিডি গোল্ড ফাইবার, হুসনা জুট ফাইবার, মুসা জুট ফাইবার, ঢাকা ট্রেডিং হাউস লি এবং মেসার্স এম ডি আবুল কাসেম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাসফিয়া জুট ট্রেডিং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৪০ টন কাঁচা পাট রপ্তানির বরাদ্দ পেয়েছে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ৬০ টন পাট রপ্তানি করতে পারবে গাজী জুট ইন্টারন্যাশনাল। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা ট্রেডিং হাউস ৮০০ টন, সারতাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ৭৯০ টন, এম এন জুট ট্রেডিং ৫৭০ টন, মেসার্স রশ্মি কবির ৪০০ টন এবং মুসা জুট ফাইবার ৩০০ টন রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর মাসের মধ্যে রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানই বরাদ্দের অতিরিক্ত পাট রপ্তানি করতে পারবে না।
দেশীয় পাটকল মালিকদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে কাঁচা পাট রপ্তানিকে শর্তযুক্ত পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর আগে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের আবেদন জানিয়েছিল। সাধারণত বাংলাদেশ ভারত ছাড়াও চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও নেপালে কাঁচা পাট রপ্তানি করে থাকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ বেল কাঁচা পাট বিদেশে পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
মে মাসের জন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ রোববার এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন এই মূল্য তালিকা প্রকাশ করেছে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আগের মাসের মতোই ১ হাজার ৯৪০ টাকা বহাল থাকছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন এই মূল্য তালিকা আজ ৩ মে রোববার সন্ধ্যা থেকেই সারাদেশে কার্যকর হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসেই এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং আমদানিকারকদের ব্যয় বিশ্লেষণ করে এই মাসে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।
বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম না বাড়লেও যানবাহনে ব্যবহৃত জ্বালানি অটোগ্যাসের দামে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ২ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি লিটার অটোগ্যাস কিনতে গ্রাহকদের ৮৯ টাকা ৫২ পয়সা খরচ করতে হবে, যা আগে ছিল ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা।
১২ কেজি সিলিন্ডার ছাড়াও সাড়ে ৫ কেজি থেকে শুরু করে ৪৫ কেজি পর্যন্ত অন্যান্য সকল সিলিন্ডারের দামও বিইআরসি নির্ধারিত হার অনুযায়ী আনুপাতিক হারে অপরিবর্তিত থাকবে। বিইআরসি স্পষ্ট করেছে যে, সরকারি এই রেট অনুযায়ী গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করা হবে। কোনো বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য দাবি করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য যে, গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা থাকলেও স্থানীয় বাজারে এলপিজির দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে সরকার। বিইআরসি নির্ধারিত এই দাম সারাদেশের সকল ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমাতে স্থানীয় প্রশাসনকেও বাজার মনিটরিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতীয় বাজেটে ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
ইআরডি’র তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত এই সময়ে ঋণের আসল বা মূল অংশ হিসেবে ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে আরও ১২৫ কোটি মার্কিন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এই খাতে মোট ৩২১ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছিল।
প্রতিবেদনে দেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতির ওপর একটি দ্বিমুখী চাপের চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে যখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বোঝা দিন দিন ভারি হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন করে ঋণছাড়ের গতিও আগের তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সরকারের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই খরচের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের বিপরীতে সুদের কিস্তি বাবদও সরকারকে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা গুণতে হচ্ছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, এই বর্ধিত ঋণ পরিশোধের চাপ তা বজায় রাখা কঠিন করে তুলছে।
ইআরডি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ঋণ পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যাতে বাজেটের এই ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।
ময়মনসিংহে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির প্রভাবে সবজির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা—উভয় বাজারেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। রোববার (৩ মে) সকালে নগরীর অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার মেছুয়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা কমে আসায় ক্রেতাদের বাড়তি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে।
বাজারে বর্তমান মূল্যের তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁকরোলের দাম; যা বর্তমানে প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের চেয়ে ১৫-২০ টাকা বেশি। এছাড়া প্রতি কেজি পটোল ৫০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা, কচুর মুখী ৮০ টাকা এবং লতি ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যান্য সবজির মধ্যে চিচিঙ্গা ও ঝিঙে ৬০ টাকা, করলা ৫০ টাকা এবং শসা ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে সজনে ডাঁটার দাম আকাশচুম্বী হয়ে প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় পৌঁছেছে এবং বেগুনের কেজি দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়।
কাঁচামরিচের বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মরিচের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির মাঝেও গাজর ও পেঁপের দাম স্থিতিশীল রয়েছে; যা আগের মতোই কেজিপ্রতি ৫০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় উৎপাদনকারী এলাকাগুলো থেকে পর্যাপ্ত সবজি না আসায় চাহিদার তুলনায় জোগানে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আড়তদারদের মতে, গত চার-পাঁচ দিনের নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ করতে পারছেন না। পাইকারি প্রতিষ্ঠান ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃষ্টির কারণে কৃষকরা পণ্য পাঠাতে না পারায় আমদানি অনেক কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ বস্তা সবজি আসত, এখন তা কমে মাত্র ২-৩ বস্তায় নেমেছে। সরবরাহের এই বিশাল পতনই মূলত পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, পাইকারি দরের চেয়ে আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়তি দামে সবজি বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য প্রাত্যহিক বাজার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবজির এই বাড়তি দাম কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
টানা চার দফা কমার পর বাংলাদেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার বর্তমান দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যা থেকেই এই নতুন দাম সারা দেশে কার্যকর হয়েছে বলে বাজুসের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বাজুসের নির্ধারিত নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এখন ২ লাখ ৩১ হাজার ৯৩৯ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দুই লাখ টাকার মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে অবস্থান করছে। এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ টাকা। মূলত স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই নতুন দর সমন্বয় করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এই দাম বাড়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ৩০ এপ্রিল সকালেই একবার সোনার দাম কমানো হয়েছিল। সেদিন সকালে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমানো হয়েছিল, যা নিয়ে টানা চার দফায় সোনার দাম মোট ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা কমেছিল। কিন্তু বিকেলের দিকে পুনরায় দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসায় সকালের সেই হ্রাসকৃত মূল্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এর ফলে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে সোনার বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতন লক্ষ্য করা গেছে।
সোনার দাম বাড়ানো হলেও দেশের বাজারে রূপার দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বাজুস। ক্যাটাগরি ভেদে রূপার দাম আগের মতোই রাখা হয়েছে। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রূপার দাম ৫ হাজার ৪৮২ টাকা, ২১ ক্যারেটের দাম ৫ হাজার ১৯০ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের রূপা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৪৯০ টাকায়। এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির রূপার দাম প্রতি ভরি ৩ হাজার ৩৮৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে এবং স্থানীয় চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে বাজুস নিয়মিত এই দাম নির্ধারণ করে থাকে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও নাজিরপুর উপজেলার গ্রামগুলোতে উৎপাদিত ‘ঘৃত্তকুমারী’ জাতের বোম্বাই মরিচ এখন বিশ্ববাজারে সুনাম কুড়াচ্ছে। একসময় কেবল পারিবারিক চাহিদা মেটাতে বাড়ির আঙিনায় চাষ করা হলেও বর্তমানে এই মরিচ চীন, জাপান ও থাইল্যান্ডে নিয়মিত রফতানি হচ্ছে। এর ফলে জেলার হাজার হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ী স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। বিশেষ করে চীন ও জাপানের বাজারে এই বিশেষ জাতের মরিচের সুগন্ধ ও তীব্র ঝালের কারণে এর আকাশচুম্বী চাহিদা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ঘৃত্তকুমারী জাতের বোম্বাই মরিচ চাষ অত্যন্ত লাভজনক। একটি গাছ একাধারে দুই থেকে তিন বছর ফল দেয় এবং মৌসুমে প্রতিটি মরিচ খুচরা বাজারে ২ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। নাজিরপুরের বেলুয়া, মুগারঝোড় ও বৈঠাকাটা এবং নেছারাবাদের আটঘর, কুড়িয়ানা ও মাহমুদকাঠির মতো এলাকাগুলোতে এখন বাণিজ্যিকভাবে এই মরিচ উৎপাদিত হচ্ছে। এক একটি গাছে বছরে গড়ে ৩০০ থেকে ১০০০টি পর্যন্ত মরিচ পাওয়া যায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম হওয়ায় সাধারণ চাষিরা এখন ধান বা অন্য ফসলের চেয়ে মরিচ চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
পিরোজপুর থেকে বিদেশে মরিচ রফতানির যাত্রা শুরু হয় মূলত ২০১১-১২ অর্থবছরে, যখন প্রথম জাপানে এই পণ্যটি পাঠানো শুরু হয়। বর্তমানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে মরিচ সংগ্রহ করে আকার অনুযায়ী বাছাই ও প্যাকেটজাত করেন। এরপর তা সড়কপথে ঢাকার কাওরান বাজারে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকেই বড় রফতানিকারকদের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়। যথাযথ বিপণন ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা এই খাত থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা আয় করছেন এবং রফতানির পরিধি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলা থেকে বছরে প্রায় ৩০০ মেট্রিক টন বোম্বাই মরিচ বিদেশের বাজারে রফতানি হচ্ছে। এই ফসলে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না এবং এর স্থায়ীত্ব বেশি হওয়ায় কৃষকরা এতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কৃষকদের আধুনিক ‘মালচিং’ পদ্ধতিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছেন যাতে উৎপাদনের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের থাকে। বর্তমানে পিরোজপুরের এই বোম্বাই মরিচ কেবল স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরও ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে নামিয়ে সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনায় রোববার (৩ মে) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আনুষ্ঠানিকভাবে এই ১০টি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে শুরু করার ঘোষণা দেয়। সাধারণত বাজারে দুর্বল ও জাঙ্ক স্টক হিসেবে পরিচিত কোম্পানিগুলোকেই এই সর্বনিম্ন ক্যাটাগরিতে রাখা হয়, যা ব্যাংকগুলোর জন্য এক ধরনের বড় ইমেজ সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক পিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, ওয়ান ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। এ ছাড়াও এনআরবি ব্যাংক পিএলসি, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি ও রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি এই অবনমনের শিকার হয়েছে। মূলত বিনিয়োগকারীদের টানা দুই বছর কোনো লভ্যাংশ প্রদান করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যমান সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
ক্যাটাগরি পরিবর্তনের ফলে আজ থেকেই এই ব্যাংকগুলোর শেয়ার লেনদেনের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের কারণে এখন থেকে এসব ব্যাংকের শেয়ার কিনতে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের মার্জিন ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা পাবেন না। ফলে বিনিয়োগকারীদের এখন থেকে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ার সম্পূর্ণ নগদ অর্থে কিনতে হবে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব শেয়ারের চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক লেনদেনে প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) একই কারণে আরও তিনটি ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামানো হয়েছিল। সেই ব্যাংকগুলো ছিল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক পিএলসি। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের ১৩টি ব্যাংক একযোগে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে চলে আসায় পুরো ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের ওপর বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অনেক বড় বিনিয়োগকারী এসব শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন বলে জানা গেছে।
বিএসইসির এই কঠোর অবস্থান মূলত বাজারের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির একটি প্রয়াস। দীর্ঘ সময় লভ্যাংশ না দিয়ে কোম্পানি চালানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে একসাথে এতগুলো ব্যাংকের এমন অবনমন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সাশ্রয়ী বিমান ভ্রমণের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের স্পিরিট এয়ারলাইনস দীর্ঘ ৩৪ বছরের পথচলা শেষে তাদের সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকটই এই পতনের মূল কারণ। কোম্পানিটি দেউলিয়া হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গত ২ মে থেকে তাদের সব অপারেশন গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের এভিয়েশন খাতে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের এমন নাটকীয় ও বড় ধরনের পতনের ঘটনা।
আসন সংখ্যার বিচারে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অষ্টম বৃহত্তম এই এয়ারলাইনসটি বেশ কিছুদিন ধরেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটি ‘বেলআউট’ বা বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এই বিমান সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হলো। এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাবে কোম্পানিটির প্রায় ১৪ হাজার নিজস্ব কর্মীসহ অন্তত ১৭ হাজার পেশাজীবী এক নিমেষে তাঁদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, যা মার্কিন শ্রমবাজারে এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্পিরিট এয়ারলাইনস বন্ধ হওয়ার ফলে রাতারাতি কয়েক লাখ যাত্রী চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। শুধু চলতি মে মাসেই প্রতিদিন গড়ে ৩০০টি করে মোট ৯ হাজার ফ্লাইট এবং প্রায় ১৮ লাখ আসন পূর্বনির্ধারিত ছিল, যা এখন বাতিল হয়ে গেছে। এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং যাত্রীদের আপাতত বিমানবন্দরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সরাসরি কেনা টিকিটের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ভাউচার বা রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করা যাত্রীদের অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি এখন আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর ঝুলে আছে।
স্বল্পমূল্যের টিকিটের মাধ্যমে মার্কিন এভিয়েশন শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল স্পিরিট। হ্যান্ডব্যাগ বা ছোট ব্যাগের জন্য আলাদা ফি নিয়ে মূল টিকিটের দাম কমিয়ে রাখা ছিল তাদের ‘আল্ট্রা লো-কস্ট’ মডেলের মূল ভিত্তি। এখন এই বড় সংস্থাটি বাজার থেকে সরে যাওয়ায় প্রতিযোগিতার অভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোতে টিকিটের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে মার্কিন অন্য কয়েকটি এয়ারলাইনস স্পিরিটের রুটগুলোতে ভাড়ার ওপর একটি নির্দিষ্ট ‘ফেয়ার ক্যাপ’ বা ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের আশ্বাস দিয়েছে যাতে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
বৈশ্বিক অটোমোবাইল বাজারে দামের এক বিশাল ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন গাড়ির গড় দামে চীনে বর্তমানে একাধিক উন্নত প্রযুক্তির বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) কেনা সম্ভব হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন গাড়ির গড় মূল্য ছিল প্রায় ৫১ হাজার ৪৫৬ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ির বাজার চীনে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে যানবাহনের দাম দ্রুত হ্রাস পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বেইজিং অটো শো-তে দেখা গেছে, চীনে ২৫ হাজার ডলারের কম দামে ২০০টিরও বেশি ব্যাটারিচালিত ও হাইব্রিড মডেলের গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, দেশটিতে এমন পাঁচটি জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক মডেল রয়েছে যেগুলোর প্রতিটির দাম ১২ হাজার ডলারের নিচে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ একটি গাড়ি কেনার অর্থ দিয়ে চীনে অনায়াসে পাঁচটি জনপ্রিয় ইভি সংগ্রহ করা সম্ভব। মূলত চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে উৎপাদন বৃদ্ধি ও তীব্র ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাই এই অবিশ্বাস্য মূল্য হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কম দামের এই গাড়িগুলো আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও প্রযুক্তির দিক থেকে এগুলো বেশ আধুনিক ও ফিচার-সমৃদ্ধ। যদিও নিরাপত্তার কড়াকড়ি ও বাণিজ্যিক নীতির কারণে এগুলো মার্কিন বাজারে বিক্রি হয় না এবং অদূর ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও কম, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন কারিগরি উৎকর্ষে এগুলো পিছিয়ে নেই। শহুরে গ্রাহকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি এই গাড়িগুলোতে বড় টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে, মাল্টিপল স্টোরেজ এবং স্মার্ট কন্ট্রোল সিস্টেমের মতো আকর্ষণীয় সুবিধা রাখা হয়েছে। এই ক্ষুদ্র ও সাশ্রয়ী ইভিগুলো মূলত স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
সাশ্রয়ী গাড়ির তালিকায় বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে ‘জিলি এক্স২’ মডেলটি, যার প্রারম্ভিক দাম মাত্র ১০ হাজার ৬০ ডলারের মতো। ২০২৫ সালে চীনের বাজারে অন্যতম শীর্ষ বিক্রেতা হিসেবে জায়গা করে নেওয়া এই গাড়িটি একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ২৫৫ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। অন্যদিকে, আরও সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে ‘উলিং হংগুয়াং মিনিইভি’, যার দাম মাত্র ৬ হাজার ৫৬০ ডলার। চার দরজার এই নতুন সংস্করণটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬২ মাইল গতিতে চলতে সক্ষম এবং একবার চার্জে প্রায় ১২৭ মাইল পর্যন্ত সেবা দিতে পারে। মূলত এই বিশাল দামের পার্থক্যের কারণে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব এখন বিশ্ব অটোমোবাইল খাতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ কোকো উৎপাদনকারী দেশ আইভরি কোস্টে তীব্র বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে কোকোর ফলন ও গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশটির কৃষকরা। স্থানীয় চাষিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিরাজমান শুষ্ক আবহাওয়া মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্থায়ী ‘মিড-ক্রপ’ বা মধ্য-মৌসুমের উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবে কোকো গাছগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে না, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইভরি কোস্টে সাধারণত এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষাকাল থাকে। বর্তমানে দেশটিতে কোকো সংগ্রহের কাজ পুরোদমে চললেও কৃষকরা বলছেন, মে মাসের শেষ পর্যন্ত সময়টি গাছের ফলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে কোকো বিনের আকার ছোট হয়ে যায় এবং এর বাণিজ্যিক গুণমান নষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটির প্রধান কোকো উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম।
আঞ্চলিক তথ্যানুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলীয় সুব্রে এলাকায় গত সপ্তাহে মাত্র ১০ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ওই এলাকার গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় ১২ দশমিক ৬ মিলিমিটার কম। এ ছাড়া ডালোয়া ও ইয়ামুসুক্রোর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেও বৃষ্টির অভাবে ছোট কোকো পডগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বাতাসে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার অভাবে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যা কোকো চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যদি দ্রুত ভারি বৃষ্টিপাত শুরু না হয়, তবে আইভরি কোস্টের কোকো উৎপাদন চলতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক হওয়ায় দেশটির এই সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক চকোলেট প্রস্তুতকারক বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিম আফ্রিকার এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইভরি কোস্টের এই বৈরী আবহাওয়া আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে কোকোর দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে নিকেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চীনের সাংহাই ফিউচার এক্সচেঞ্জে এই শিল্প ধাতুর দাম ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ১ লাখ ৫১ হাজার ৪০ ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম আরও বেড়ে ১ লাখ ৫২ হাজার ২৩০ ইউয়ানে উঠেছিল, যা গত জানুয়ারি মাসের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। মূলত সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তার কারণেই বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিকেলের এই আকস্মিক দরবৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা। চীনের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হোয়াইয়ো কোবাল্ট সম্প্রতি তাদের ইন্দোনেশীয় কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জানা গেছে, চলতি মাসে ওই নির্দিষ্ট ইউনিটে নিকেল উৎপাদন প্রায় অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ইন্দোনেশিয়া একাই বিশ্বের মোট নিকেল সরবরাহের প্রায় ১৪ শতাংশ জোগান দেয়, ফলে সেখান থেকে উৎপাদন কমার খবর বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
নিকেল উৎপাদনের এই সংকটের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সালফারের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সালফার আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় মূলত ইন্দোনেশীয় কারখানাগুলোতে এই কারিগরি ও অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকটের এই প্রভাব সরাসরি নিকেলের বৈশ্বিক মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প ধাতুর বাজারে নিকেলের এই তীব্র ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও অন্যান্য প্রধান ধাতুর ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো অন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাতুগুলোর দাম কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। নিকেলের এই একক দরবৃদ্ধিকে মূলত সরবরাহ শৃঙ্খলে আকস্মিক ব্যাঘাত এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর কৌশলগত পরিবর্তনের ফলাফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বৈষম্যমূলক বাজার পরিস্থিতি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে নিকেলের জোগান পুনরায় স্বাভাবিক হওয়া অনেকখানি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং সালফার সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সালফারের সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত উন্নত না হয়, তবে নিকেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্টেইনলেস স্টিল ও ব্যাটারি উৎপাদনসহ বিভিন্ন ভারী শিল্প খাত বড় ধরনের ব্যয়বৃদ্ধির মুখে পড়তে পারে। আপাতত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছেন।
সাতক্ষীরায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আদার দাম কেজিতে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই মসলাজাত পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বর্তমানে জেলার সুলতানপুর বড় বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা দোকানে প্রতি কেজি আদা ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ১৫ দিন আগেও ছিল মাত্র ১১০ টাকা। বাজারের এই আকস্মিক ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি বাজারে আদার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই খুচরা পর্যায়ে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। তবে স্থানীয় কৃষি বিপণন কর্মকর্তারা এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করছেন না। তাঁদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার অজুহাত দিয়ে কৃত্রিমভাবে পণ্যটির দাম বাড়ানো হয়েছে। মূলত পাইকারি পর্যায়ে তদারকির অভাবেই খুচরা বাজারে এমন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চমকপ্রদ বিষয় হলো, ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে আদা আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাস্টম হাউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রায় ৯০ হাজার ৭৪৭ টন আদা দেশে প্রবেশ করেছে, যার বাজারমূল্য ১ হাজার ৮১ কোটি টাকার বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার ১১৬ টন। এত বিপুল পরিমাণ আমদানির পরও স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ আদার দাম বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, পাইকারি ব্যবসায়ীরা পরিবহন খরচ বাড়ার কথা বলে আদার দাম বৃদ্ধি করেছেন, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমদানির তথ্য এবং বাজারের বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়ে যাওয়া সিন্ডিকেটের কারসাজি হতে পারে। সামনে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মসলাজাত পণ্যের চাহিদা আরও বাড়বে, তাই এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ভোক্তাদের দাবি, নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিলে এই ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব।