অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ চার বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী মে মাসে। এ চার বছরের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাভাব সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির আরোপ করা ফ্লোর প্রাইসসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে পুরো মেয়াদজুড়েই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বিএসইসি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে নিয়ন্ত্রণে অনন্য দৃষ্টি স্থাপন করেছে বর্তমান কমিশন। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ কমিশনের যথাযথ পদক্ষেপ অব্যাহত না থাকলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত।
তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যতটুকু পড়েছে তা খুবই সামান্য। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এ বাজারে ইতিবাচক রিটার্ন ছিল। পরবর্তীতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকট তৈরি হলে আগে থেকেই এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পেরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। এটি ছিল বাজারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কমিশনের সবচেয়ে বড় যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কমিশন পুরো সময়জুড়ে বাজার উন্নয়নে সংক্রিয় ছিল।
২০২০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাত। ঠিক ওই সময় টালমাটাল পুঁজিবাজারকে সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে বিএসইসিতে কাজে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দীন আহমেদ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন্স সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও সাবেক শিল্প সচিব আব্দুল হালিম। এ ছাড়া তৎকালীন আরেক কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন খোন্দকার কামালুজ্জামান। পরে তার মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিশনার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. রুমানা ইসলামকে নিয়োগ দেয় সরকার। এ চার কমিশনার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দায়িত্ব নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
বর্তমান কমিশনের অধীনে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো
২০২০ সালে ১৭ মে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত লকডাউনে পুঁজিবাজার খোলা রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে আইন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুর্বল ও লোকসানে থাকা কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসক বসানো এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন করা হয়। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জিরো টলারেন্স নীতিতে অনেক কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকদের বিও হিসেবে থাকা শেয়ার স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে অনেকের ব্যাংক হিসাবও। এর বাইরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়।
ওই বছর এসবের পাশাপাশি বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করে কর সুবিধা বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্তসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তাগিদ বৃদ্ধি করা, ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশ সেপ্টেম্বরের আগে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) শক্তিশালী করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, জেড ক্যাটাগরি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পুঁজিবাজারের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগ, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সভা (এজিএম, ইজিএম, পর্ষদ সভা) করার অনুমোদন, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজতর করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ‘ডিজিটাল বুথ’ খোলার অনুমোদন এবং পুঁজিবাজারকে ডিজিটালাইজড করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০২১ সালে পুঁজিবাজারের সুশাসন ফেরাতে বিভিন্ন আইন-কানুন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ ও এককভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ না থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোরতা আরোপ, দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বল কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ও ব্যাংক হিসাব জব্দ, ২০ হাজার কোটি টাকার ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) গঠন, আইপিওতে আসা কোম্পানির শেয়ার আনুপাতিক সমবণ্টন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একাধিক আইপিও বাতিল করা, ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেট (ওটিসি) বাতিল করে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু করা, অল্টারনেটিভ প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ, পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় ২০২০ সালে আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, লভ্যাংশ না দেওয়া ও নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তফসিলি ব্যাংকের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ওই বছর বুকবিল্ডিংয়ের বিডিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ, বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে-বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ডিজিটাল বুথ স্থাপন, পুঁজিবাজারের ব্র্যান্ডিং ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন দেশে ‘রোড শো’-এর কার্যক্রম শুরু করা, বিএসইসিসহ স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ, স্টক এক্সচেঞ্জে বন্ড-সুকুক-ট্রেজারি বন্ড চালুর উদ্যোগ, ব্রোকারেজ হাউসের সংখ্যা বাড়াতে নতুন ট্রেক ইস্যু করা, বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ, স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ, মার্কেট মেকারের অনুমোদন, পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২২ সালে বিএসইসির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সংকট বিবেচনায় পুনরায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা অন্যতম। বৈশ্বিক সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন রোধে ওই বছরের ২৮ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে শেয়ারের দাম কমানো ঠেকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এ ধরনের পদ্ধতি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের পুঁজিবাজারে না থাকলেও আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারমূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ করার সুপারিশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো, পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলে লাপাত্তা হওয়া সেগুলোকে ডি লিস্টিং করিয়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বেশ কিছু আইন-কানুন, বিধিবিধান সংস্কার, কোম্পানিগুলোকে বোনাস লভ্যাংশের বদলে নগদ লভ্যাংশ দিতে অনুপ্রাণিত করা, পুঁজিবাজারে সরকারি সিকিউরিটিজের (ট্রেজারি বন্ড ও ডিবেঞ্চার) লেনদেন চালু, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে শৃঙ্খলায় ফেরানো, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, ইসলামি গ্রিন সুকুকের লেনদেন চালু এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়।
ওই বছর এর বাইরে জাপানে ভার্চুয়ালি রোড শো আয়োজন করা, মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারিদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী পুরস্কার- ২০২২ প্রদান, বাজেটে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ পুনর্বহাল রাখার সুপারিশ, এসএমই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ সহজ করা, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কমোডিটি এক্সচেঞ্জ গঠনে সহায়তা প্রদান, সিএসইর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজিকে অনুমোদন প্রদান, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেট ফান্ড (ইটিএফ) ও অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) গঠনে আইনপ্রণয়ন, বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) মাধ্যমে ফেরত প্রদান, চেক জমা দিয়েই শেয়ার কেনার সুযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুঁজিবাজার নিয়ে গুজব বা ভীতি ছড়ানো কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ, দেশের জনগণকে বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে মাধ্যমিকপর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ, শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত করা ও বোনাস শেয়ার অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন, ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখার কারণে স্তিমিত থাকা নতুন বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে আনতে নগদ লভ্যাংশ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে বৈচিত্র্যময় পণ্য হিসেবে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালু করা, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালু করা, কমোডিটি ও ডেরিভিটিভস এক্সচেঞ্জ চালু করতে বিধিমালা তৈরি করে গেজেট প্রকাশ, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা ইউরোপের দেশগুলোতে রোড শো আয়োজন করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তৃতীয় দফায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা, শেয়ার, ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগকে পুঁজিবাজার এক্সপোজারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তে সুপারিশে প্রদান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি অর্জনে সহায়তার লক্ষ্যে শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গঠনে ইউএনডিপি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসের (আইএফসি) সহায়তার গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ গ্রহণসহ সমঝোতা চুক্তি, নারীদের জন্য ‘অরেঞ্জ বন্ড’নামক এক বিশেষায়িত বন্ড তৈরির উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ প্রদানের সুবিধা বাড়াতে নীতি সয়হতা প্রদান এবং পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সীমা বাড়ানো হয়।
এ ছাড়া ওই বছর ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থের হিসাব সংরক্ষণের জন্য পৃথক ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে সমন্বিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে ইসলামিক শরিয়াভিত্তিক বিভিন্ন প্রকার সিকিউরিটিজ আনা এবং ইসলামিক ক্যাপিটাল মার্কেট গঠনের লক্ষ্যে শরিয়াহ অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের (এসএসি) অনুমোদন, আইওএসকোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল কমিটির (এপিআরসি) সভা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আয়োজন করা, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের নির্দেশনা স্পষ্টীকরণ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজারে সতর্কতা বাড়ানোর উদ্যোগ, মুদ্রা বিনিময় হারের ঝুঁকি কমাতে পুঁজিবাজারে ‘ফরেক্স’ চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে পুনরায় কঠোরতা আরোপ, আইন-পলিসি নির্ধারণ নিয়ে বিএসইসি ও আইএমএফের বৈঠক, ৪ ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রদান, পুঁজিবাজারে স্বতন্ত্র পরিচালকের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি, বিভিন্ন কোম্পানি একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং বছরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে পুঁজিবাজারের সদস্য করা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার আগে উত্তরা ব্যাংকের (তৎকালীন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন) ৪০টি শেয়ার তার যোগ্য উত্তরসূরির নিকট হস্তান্তর করা ২০২৩ সালের অন্যতম বড় অর্জন।
চলতি ২০২৪ সালে শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া বিএসইসি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সিএসইকে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের সনদ প্রদান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী পালন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ৫ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদান, স্টক ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের গ্রাহকের (বিনিয়োগকারী) মার্জিন ঋণের পোর্টফোলিওতে পুনর্মূল্যায়নজনিত অনাদায়কৃত ক্ষতির বিপরীতে রক্ষিতব্য প্রভিশন সুবিধার মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো, প্রায় ৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডের লেনদেন শুরুর সিদ্ধান্ত এবং অডিটর ও অডিট প্রতিষ্ঠান বিএসইসির তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। এটি শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে না, বরং আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতেও স্বস্তি এনেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৫.৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬,৩১ বিলিয়ন ডলার।
এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত অর্থকে বৈধ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে শুধু অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং প্রবাসীদের জন্য দ্রুত, নিরাপদ, সহজ, সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে।
জনতা ব্যাংক পিএলসি একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, বিদেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জনতা ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য কাজ করছে। ২০২৫ সনে জনতা ব্যাংক দেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর অন্যতম ছিল; ব্যাংকটির রেমিট্যান্স গ্রহণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭,৫৫৫ কোটি টাকা। জুন, ২০২৬ পর্যন্ত ফরেন রেমিট্যান্সের পরিমান ১২,৩৭০ কোটি টাকা।
আমাদের লক্ষ্য হবে ‘প্রবাসীর অর্থ, দ্রুততম সময়ে নিরাপদে পরিবারের হাতে’-এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। এজন্য ডিজিটাল রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি, Exchange House ও বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে কার্যকর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, দ্রুত পেমেন্ট নিষ্পত্তি, গ্রাহকবান্ধব সেবা এবং রেমিট্যান্স লেনদেনে স্বচ্ছতা ও কমপ্লায়েন্স আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রবাসীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়াতে তাদের দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য রেমিট্যান্স-ভিত্তিক সঞ্চয়, ঋণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধার সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ, রেমিট্যান্সকে শুধু ভোগব্যয়ের অর্থ হিসেবে না দেখে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত করতে হবে।
অত্র ব্যাংকের দেশের অভ্যন্তরস্থ ৯২৬ টি শাখা ফরেন রেমিট্যান্স পরিশোধের একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক হিসেবে থাকায় এবং ব্যাংক/এক্সচেঞ্জ হাউজের প্রেরিত ফরেন রেমিট্যান্স API এর মাধ্যমে বেনিফিসিয়ারীর হিসাবে ২৪/৭ রেমিট্যান্স জমা করার সার্ভিস নিশ্চিত করতে পারায় ব্যাংক/এক্সচেঞ্জ কোম্পানী অত্র ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরণে এবং বেনিফিসিয়ারীগণ অত্র ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স গ্রহণে উৎসাহিত হয়েছেন।
নেগোশিয়েসন এর মাধ্যমে ব্যাংক/এক্সচেঞ্জ হাউজকে প্রতিযোগীতামূলক এক্সচেঞ্জ রেট প্রদান করায় এবং দ্রুত সার্ভিস নিশ্চিত করায় ব্যাংক/এক্সচেঞ্জ কোম্পানীসমূহ অত্র ব্যাংকে রেমিট্যান্স প্রেরণে আগ্রহী হয়েছে।
অত্র ব্যাংকের ইতালীর রোম ও মিলান শহরে অবস্থিত জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানী এসআরএল, ইতালী এর দুইটি শাখা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতস্থ চারটি শাখার মাধ্যমে Mobile Financial Services এর আওতায় bKash এর মাধ্যমে বৈদেশিক রেমিট্যান্স এর অর্থ উপকারভোগীর ওয়ালেটে দ্রুততম সময়ে প্রদান করায় রেমিটারগণ অত্র ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিত হয়েছেন।
এছাড়া প্রবাসী আয় আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদে দেশে আনার লক্ষ্যে নগদের সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রেরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাভোগীদের কাছেও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারের মাধ্যমে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরকারি ব্যাংকের ভূমিকা
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে Letter of Credit (LC), বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, Trade Finance, Remittance, Foreign Exchange এবং Correspondent Banking-এসব ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলো দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা দিয়ে আসছে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আওতায় আনতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক একটি বড় শক্তি। জনতা ব্যাংক এ ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞ জনবল, বৈদেশিক বাণিজ্য অবকাঠামো, Correspondent Banking Network এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক রপ্তানি মুখী প্রতিষ্ঠান তৈরিতে অন্যতম ভুমিকা পালন করে আসছে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রপ্তানির পরিমান ছিল যথাক্রমে ১৪২৫৫ কোটি, ৮২৫৫ কোটি ও ৬১৬৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে জনতা ব্যাংকের বড় রপ্তানিকারকদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পর রপ্তানি কমে যায়। এর পর অনেক নতুন গ্রাহক অত্র ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে জনতা ব্যাংক ফরেন ট্রেড এর ব্যবসারক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স এর উপর গুরুত্ব আরোপ করছে। রপ্তানি ঋনের ক্ষেত্রে সহজামানতদ্বারা সমৃদ্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখে রপ্তানি ব্যবসা বৃদ্ধির করছে। নতুন ও পুরাতন গ্রাহকদের মাধ্যমে রপ্তানি ব্যবসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই বছরে নতুন করে রপ্তানি খাতে কোনো ফোর্স লোন সৃষ্ট হয়নি।
জনতা ব্যাংকের ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ২৯,৭৫১ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সনের জুন পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ১২.২৬৮ কোটি টাকা। আমদানির ক্ষেত্রে জনতা বাংক পিএলসি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যেমন- বিপিসি, বিএডিসি, বিসিআইসি, বাপেক্স, বিডি পুলিশ, পদ্মা অয়েল, ডিজিডিপি ও খাদ্য অধিদেপ্তরের আমদানিসমূহ জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরকারি ব্যাংক শুধু অর্থায়ন করবে না; বরং উদ্যোক্তার ব্যবসার সম্প্রসারণের অংশীদার হিসেবে কাজ করবে। দ্রুত Trade Processing, ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, AML/CFT Compliance এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জনতা ব্যাংকের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে।
সবশেষে বলতে চাই, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্য-দুটিই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আস্থা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জন-এই দুই জায়গায় ব্যাংকের সেবার মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনতা ব্যাংক PLC রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে তার ঐতিহ্য, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত ও গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের রেমিট্যান্স আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জনতা ব্যাংকের মূল লক্ষ্য হবে-প্রবাসীর আস্থা, উদ্যোক্তার আস্থা এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ-এই তিনটিকে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী ও টেকসই বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স সংগ্রহে বাংলাদেশের সকল ব্যাংকসমূহের মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিগত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জনতা ব্যাংক পিএলসি, কে ‘রেমিট্যান্স এ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রদান করা হয়। এছাড়া জনতা ব্যাংক ২০২৫ সালের জন্য Top Ten Remittance Award-ও পেয়েছে, যা রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
লেখক পরিচিতি :
মো. মজিবর রহমান
ব্যবস্হাপনা পরিচালক
জনতা ব্যাংক পিএলসি
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতির হার আবারও বেড়েছে। ইউরোপের ২১টি দেশের এই জোটে আগস্ট মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে, যা আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের প্রাথমিক তথ্যে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদদের দেওয়া পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে গেছে। এ নিয়ে টানা ষষ্ঠ মাস ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে অবস্থান করছে অঞ্চলটির সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল জ্বালানি খাতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। আগস্টে জ্বালানির দাম বার্ষিকভিত্তিতে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা জুলাইয়ে ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালের শুরুর দিকের সংকটের পর এটিই জ্বালানির দামে সবচেয়ে বড় লাফ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আগস্টের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়, যা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারে, যেখানে সরকারি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার বেড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির পণ্যের দাম বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতি বা ‘কোর ইনফ্লেশন’-এ কিছুটা স্বস্তির দেখা মিলেছে। ইউরোজোনে আগস্টে কোর ইনফ্লেশন জুলাইয়ের ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ সামাল দিতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) আগামী সপ্তাহে আবারও নীতিগত সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন এবার মূল সুদহার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে, যা হবে চলতি বছরে ইসিবির দ্বিতীয় দফা সুদহার বৃদ্ধি। এছাড়া মুডি’স অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ কামিল কোভার জানান, জ্বালানি মূল্যের এই চাপ অব্যাহত থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি আগামী ডিসেম্বরেও নীতিগত সুদহার পুনর্বিবেচনা করে তা আরও বাড়াতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুৎ সুবিধার আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (সাড়ে ১৭ কোটি ডলার) ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট ইন দ্য চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার দুর্গম উপজেলাগুলোতে বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হবে।
এডিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ছয়টি নতুন ৩৩/১১ কিলোভোল্ট উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা আরও ৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার বৃদ্ধি করবে। এছাড়া বিদ্যুৎ অপচয় কমাতে বিশেষ প্রযুক্তির পরিবাহক ব্যবহার করে ৫ হাজার ৩২ কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ১ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার পুরোনো বিতরণ লাইন, চারটি উপকেন্দ্র, একটি সুইচিং স্টেশন এবং একটি আঞ্চলিক মেরামত কেন্দ্রের আধুনিকায়ন করা হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসরত প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষের অর্ধেকের বেশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তির হার ৯৯ শতাংশ হলেও পার্বত্য অঞ্চলে জাতীয় গ্রিডের সুবিধা অত্যন্ত সীমিত; যেখানে খাগড়াছড়িতে ৪৯ শতাংশ, রাঙামাটিতে ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে পুরো পার্বত্য অঞ্চলে গ্রিড বিদ্যুতের হার ৬৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টির পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ বাড়বে এবং নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া প্রকল্পটি বাংলাদেশকে আরও দুর্যোগ সহনশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) ইতিবাচক ধারায় রয়েছে দেশের প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত। গত দুই মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে মোট ৫৮৩ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৩ কোটি ডলার বা ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। এর আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। অর্থ পাচার রোধে কড়াকড়ি ও হুন্ডি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।
প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক গতির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি ফিরেছে এবং আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৩ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে এবং নিট রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার পর বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার ও ডলার বিক্রির চাপে একপর্যায়ে তা কমে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল, যা সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপের ফলে পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি আয়ে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ৪৪৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ শতাংশেরও বেশি। তবে গত বছরের আগস্টে মার্কিন শুল্কহার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানি কম হওয়ায় এবার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে; যদিও চলতি বছরের জুলাই মাসের ৪৭৩ কোটি ডলারের চেয়ে আগস্টে রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলার কমেছে।
দেশের সার্বিক রপ্তানিতে বরাবরের মতোই মূল ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। আগস্ট মাসে এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং মোট আয় এসেছে ৩৬১ কোটি ডলার, যা গত জুলাইয়ে ছিল ৩৮৯ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলারে।
জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯৪০ কোটি মার্কিন ডলার (১.৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন) খরচ কমানোর এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সরবরাহকারীদের যন্ত্রাংশের দাম আমূল কমানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। মূলত বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপে চীনা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মোকাবিলা করতেই জাপানি এই অটোমোবাইল জায়ান্ট এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রয়টার্স প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিওয়াইডি-র মতো চীনা কোম্পানিগুলো উন্নত সফটওয়্যার ও ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং তুলনামূলক অনেক কম দামের কারণে দ্রুত বাজার দখল করে নিচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম মোটরসাইকেল উৎপাদক হোন্ডা বর্তমানে তাদের ধুঁকতে থাকা কার বা গাড়ি নির্মাণ ব্যবসা পুনর্গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইভি সংশ্লিষ্ট খাতের ক্ষতির পরিমাণ শেষ পর্যন্ত ১২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অটোমোবাইল ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক বিপর্যয় হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গ্যাসোলিন-ইলেক্ট্রিক হাইব্রিড গাড়ির ওপর পুনরায় গুরুত্বারোপ করছে।
চলতি বছরের বসন্তে জাপানের উৎসুনিমিয়া শহরে অনুষ্ঠিত এক গোপনীয় বৈঠকে হোন্ডা কর্তৃপক্ষ তাদের প্রধান সরবরাহকারীদের তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। এই খাতগুলো হলো—প্রেসড ও ফোর্জড যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং সফটওয়্যার-চালিত যানবাহনের (এসডিভি) যন্ত্রাংশ। বৈঠকে হোন্ডার পক্ষ থেকে সরবরাহকারীদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনে এই বিশাল সাশ্রয় অপরিহার্য। এছাড়া খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনা উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ বাড়ানো এবং সাধারণ মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ব্যয় হ্রাসের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শিল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় থাকলেও হোন্ডার কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে "বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।" এদিকে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনে নিশান মোটরসের সঙ্গে যৌথভাবে সফটওয়্যার-চালিত যানবাহনের কন্ট্রোল ইউনিট তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে হোন্ডা, যা ২০২৯ সাল নাগাদ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বুধবার এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর জাপানি শেয়ারবাজারে হোন্ডার শেয়ারের দর ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। চীনা প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মার্কিন আমদানি শুল্কের হুমকি এবং ক্রমবর্ধমান শ্রম ব্যয়ও প্রতিষ্ঠানটিকে এমন কঠোর ব্যয় সংকোচনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরও বর্ধিত দরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এবার প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে ২৮ মার্কিন ডলারের বেশি দর অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই অনুমোদন প্রদান করা হয়।
গত ২৪ আগস্টের সভায় প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬৩ ডলার এবং তার এক সপ্তাহ আগে ১৭ আগস্ট ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার দরে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অথচ বিগত বছরের ডিসেম্বরেও এই জ্বালানির দাম ছিল সাড়ে ১০ ডলারের নিচে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এলএনজির আমদানিমূল্য বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
জালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য মোট তিন কার্গো এলএনজি সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলারে ৪৯তম কার্গো, ১-২ অক্টোবরের জন্য বিপি সিঙ্গাপুর থেকে ২৮ দশমিক শূন্য ৩ ডলারে ৫০তম কার্গো এবং ৫-৬ অক্টোবরের জন্য ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুর থেকে ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলারে ৫১তম কার্গো কেনার সুপারিশ অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া জিটুজি ভিত্তিতে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের জন্য অতিরিক্ত আরও এক কার্গো এলএনজি প্রতি ইউনিট ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার দরে সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
একই বৈঠকে দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে এবং কৃষকদের চাহিদা পূরণে মরক্কো থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি ও টিএসপি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার রয়েছে, যার সম্মিলিত ক্রয়ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, মরক্কো থেকে সরকারি পর্যায়ে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানি করা হবে। প্রতি মেট্রিক টন সারের মূল্য ৮৯৪ মার্কিন ডলার হিসেবে এতে ব্যয় হবে ৪৪০ কোটি ৯২ লাখ ৮ হাজার টাকা, যা কৃষি ভর্তুকি খাত থেকে মেটানো হবে। গত ২৫ জুন সম্পাদিত নতুন চুক্তির দর অনুযায়ী এই মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশটি থেকে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
এছাড়া একই দেশ থেকে চুক্তির সপ্তম লটের আওতায় আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৬৬৯ দশমিক ৩৩ মার্কিন ডলার দরে এই সার ক্রয়ে মোট ব্যয় হবে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬০ টাকা। কৃষকদের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
দেশের বাজারে আবারও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, পাম অয়েলের দাম বর্তমান পর্যায়েই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সাথে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় এবং দেশীয় বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৬ এপ্রিল বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়েছিল। তার আগে এই তেলের মূল্য ছিল ১৯৫ টাকা। ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ভোক্তাদের আরও বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার সরাসরি প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। সয়াবিন তেলের কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যার প্রেক্ষিতে এই মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে পাম অয়েলের দাম না বাড়ানোয় বাজারে বিকল্প ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আপাতত স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও লিটার প্রতি ৭৩.৬৭ টাকা থেকে কমিয়ে ৭৩.০৯ টাকা করা হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য এই নতুন দর ঘোষণা করেছে, যা আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হবে।
গত কয়েক মাসের বাজার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এপ্রিলে দুই দফায় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৫৯৯ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এরপর জুনে দাম কিছুটা কমিয়ে ১৮৮৫ টাকা করা হলেও আগস্টে তা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। চলতি মাসে সামান্য দাম কমলেও বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে এলপিজি খাতে নজিরবিহীন অরাজকতা দেখা দেয়, যেখানে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।
এলপিজি খাতের সংকট মেটাতে সরকার আমদানিকারকদের জন্য আমদানিসীমা বাড়ানো, কর হ্রাস এবং জাহাজ ভাড়া টন প্রতি ১০৮ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৫০ ডলার পর্যন্ত করার মতো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছে। এমনকি ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এলসি খোলার অনুমতি দেওয়া হলেও খুচরা বাজারে দরের ওপর কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল থেকে বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। মূলত সৌদি আরামকোর দরের ওপর ভিত্তি করে এই দাম নির্ধারণ করা হয় এবং অন্যান্য খরচ পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ভার আরও ঘনীভূত হয়ে ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে অনাদায়ী বা শ্রেণিকৃত ঋণের অংক বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এক বার্তার মাধ্যমে এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে অনাদায়ী ঋণের এই পরিমাণ দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সেই হিসেবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই অনাদায়ী ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এছাড়া এক বছরের ব্যবধান বিবেচনায় নিলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; ২০২৫ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতে ঋণের মান নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যে সংকট বিরাজ করছে, তা বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থেকে যাওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরেও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বিভিন্ন সময়ে সংস্কারমূলক নানা উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের উদীয়মান জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদানের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে জাপানের বিখ্যাত শিপিং প্রতিষ্ঠান মিতসুই ও.এস.কে. লাইনস (এমওএল)। পরিবেশবান্ধব উপায়ে জাহাজ ভাঙা, উন্নত প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং দক্ষ কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি টেকসই অংশীদারিত্ব তৈরি করতে চায় এই জাপানি কোম্পানি।
বুধবার শিল্প মন্ত্রণালয়ে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে এমওএলের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ দু’টি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।"
বৈঠকে মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, পারদর্শী শ্রমিক এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সুবিধা দেশে বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে সচল ৩১টি পরিবেশবান্ধব ইয়ার্ডের সংখ্যা অচিরেই তিন অঙ্কে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
মন্ত্রী বলেন, "সরকারের লক্ষ্য শুধু পুরোনো জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বিদ্যমান সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্পেরও একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে জাপানের উন্নত প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের জাহাজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।"
জাপান ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশ ও জাপানের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার মাধ্যমে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও জাহাজ নির্মাণ খাতকে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী শিল্পভিত্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।"
এমওএল প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারত্বের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ দেখায়। এ সময় শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান, এমওএলের মহাব্যবস্থাপক কেনতারো উয়েদা, গ্লোবাল শিপ রিসাইক্লিং প্রকল্পের ব্যবস্থাপক তাকাহা উয়েমাতসু এবং এমওএলের জ্যেষ্ঠ পরিচালক সেনজি তোকুমোতোসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যাপক চাহিদার ওপর ভর করে চলতি বছর তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের আয় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। খাতটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য জানিয়েছে। তাইওয়ান বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধুনিক চিপ উৎপাদনের প্রধান প্রাণকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
তাইপেতে আয়োজিত সেমিকন প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট উ চি-ই বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন একটি নতুন স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে নতুন উদ্ভাবনের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “চলতি বছর তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আরও ভালো করছে। আমাদের মোট আয় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এটি ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি।” তবে বিপুল এই আয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি তিনি জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনবল এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত চিপ তাইওয়ানে তৈরি হওয়ায় এটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের বিরুদ্ধে মার্কিন চিপ শিল্প ‘চুরি’র অভিযোগ এনে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রে আরও চিপ কারখানা স্থাপনের জন্য চাপ দিচ্ছেন। এই আধিপত্য টিএসএমসির মতো বিশ্বসেরা চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক শেয়ারবাজারকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বৈশ্বিক চিপ সংগঠন সেমি-র প্রধান অজিত মানোচাও এই দশককে ‘এআই-এর দশক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই অগ্রযাত্রা সব সময় মসৃণ হবে না এবং সামনে অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারগুলো এআই চ্যাটবট ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এই বিশাল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত কতটা লাভজনক হবে এবং শেয়ারবাজারের আকাশচুম্বী দর বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনও বিতর্ক ও উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদার ওপর ভর করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের রপ্তানি খাতে ইতিবাচক গতির সঞ্চার হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) মোট রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯১৬ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল ৮৬৯ কোটি ডলার। বিশেষ করে আগস্ট মাসে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে, যেখানে ৩৯২ কোটি ডলারের বিপরীতে আয় হয়েছে ৪৪৩ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা যায়।
এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি বা ৭.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৫.১২ শতাংশ বেশি। একক মাস হিসেবে আগস্টে পোশাক রপ্তানিতে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৩৮৯ কোটি ডলার। এই সময়ে নিট ও ওভেন—উভয় উপ-খাতেই অগ্রগতির ধারা বজায় ছিল। আগস্টে নিট পোশাকের রপ্তানি ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
রপ্তানি খাতের এই ধারাবাহিক সাফল্য সম্পর্কে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, “নিট ও ওভেন—দুই খাতেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং এ খাতের টেকসই সক্ষমতার প্রতিফলন।” তিনি আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, “বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হলে বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং পোশাক খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।”
কেবল তৈরি পোশাক নয়, বেশ কিছু অপ্রচলিত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানিতেও আগস্ট মাসে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। এই সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ শিল্পে ২৮ দশমিক ৫২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং পাদুকা রপ্তানিতে ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম দুই মাসের সামগ্রিক হিসেবে মুদ্রিত সামগ্রী রপ্তানি ৪১ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ওষুধ রপ্তানি ৩৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে আগস্ট মাসে রপ্তানি বেড়েছে ২৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্য আবারও বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে, যার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। এদিকে নতুন ও উদীয়মান বাজারগুলোতেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী হচ্ছে। তুরস্কে পণ্য রপ্তানি ১৪১ দশমিক ০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪২ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং সৌদি আরবে ৪২ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার বৈচিত্র্য প্রমাণ করে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ক্রেতাদের গভীর আস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্য রপ্তানির কৌশলগত পরিবর্তনের কারণেই বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ এই স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। বুধবার দিনের শুরুতেই তেলের বাজারমূল্য প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) রাত ১২টা ৮ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৮ মিনিটে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের মূল্য ৮০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ দশমিক ২ ডলারে। এর আগে গত মঙ্গলবারও এই দুই ধরনের তেলের দামে ৪ ডলারের বেশি বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সেদিন ব্রেন্টের দাম ২৪ জুলাইয়ের পর এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২৩ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরোহণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত রাতে তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে উপর্যুপরি বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও আক্রমণ শুরু করলে দুই পক্ষ গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় হামলার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, “হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ওপর ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সম্প্রতি হামলার চেষ্টা করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।”
এদিকে মার্কিন হামলার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়বে।” উল্লেখ্য যে, বর্তমান সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা এখন ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে যে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
জর্ডানের সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, তাদের আকাশসীমায় ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রবেশ করলেও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, এসব হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি কুয়েত সরকার জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য ড্রোন হামলার বিষয়টি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চলতি সপ্তাহের এই পাল্টাপাল্টি হামলার আগে গত সপ্তাহের শেষদিকেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল, যা ছিল জুলাইয়ের পর প্রথম বড় আকারের সংঘাত। এর মধ্যে গত সোমবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা হলে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা এখন তেলের বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) তথ্যের বরাতে গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, ২৮ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত ২৬ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে ডিজেল ও হিটিং অয়েলের মতো ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুতও কমেছে প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার ব্যারেল।