অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ চার বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী মে মাসে। এ চার বছরের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাভাব সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির আরোপ করা ফ্লোর প্রাইসসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে পুরো মেয়াদজুড়েই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বিএসইসি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে নিয়ন্ত্রণে অনন্য দৃষ্টি স্থাপন করেছে বর্তমান কমিশন। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ কমিশনের যথাযথ পদক্ষেপ অব্যাহত না থাকলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত।
তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যতটুকু পড়েছে তা খুবই সামান্য। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এ বাজারে ইতিবাচক রিটার্ন ছিল। পরবর্তীতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকট তৈরি হলে আগে থেকেই এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পেরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। এটি ছিল বাজারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কমিশনের সবচেয়ে বড় যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কমিশন পুরো সময়জুড়ে বাজার উন্নয়নে সংক্রিয় ছিল।
২০২০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাত। ঠিক ওই সময় টালমাটাল পুঁজিবাজারকে সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে বিএসইসিতে কাজে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দীন আহমেদ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন্স সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও সাবেক শিল্প সচিব আব্দুল হালিম। এ ছাড়া তৎকালীন আরেক কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন খোন্দকার কামালুজ্জামান। পরে তার মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিশনার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. রুমানা ইসলামকে নিয়োগ দেয় সরকার। এ চার কমিশনার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দায়িত্ব নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
বর্তমান কমিশনের অধীনে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো
২০২০ সালে ১৭ মে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত লকডাউনে পুঁজিবাজার খোলা রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে আইন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুর্বল ও লোকসানে থাকা কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসক বসানো এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন করা হয়। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জিরো টলারেন্স নীতিতে অনেক কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকদের বিও হিসেবে থাকা শেয়ার স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে অনেকের ব্যাংক হিসাবও। এর বাইরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়।
ওই বছর এসবের পাশাপাশি বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করে কর সুবিধা বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্তসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তাগিদ বৃদ্ধি করা, ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশ সেপ্টেম্বরের আগে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) শক্তিশালী করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, জেড ক্যাটাগরি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পুঁজিবাজারের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগ, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সভা (এজিএম, ইজিএম, পর্ষদ সভা) করার অনুমোদন, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজতর করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ‘ডিজিটাল বুথ’ খোলার অনুমোদন এবং পুঁজিবাজারকে ডিজিটালাইজড করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০২১ সালে পুঁজিবাজারের সুশাসন ফেরাতে বিভিন্ন আইন-কানুন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ ও এককভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ না থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোরতা আরোপ, দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বল কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ও ব্যাংক হিসাব জব্দ, ২০ হাজার কোটি টাকার ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) গঠন, আইপিওতে আসা কোম্পানির শেয়ার আনুপাতিক সমবণ্টন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একাধিক আইপিও বাতিল করা, ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেট (ওটিসি) বাতিল করে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু করা, অল্টারনেটিভ প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ, পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় ২০২০ সালে আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, লভ্যাংশ না দেওয়া ও নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তফসিলি ব্যাংকের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ওই বছর বুকবিল্ডিংয়ের বিডিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ, বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে-বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ডিজিটাল বুথ স্থাপন, পুঁজিবাজারের ব্র্যান্ডিং ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন দেশে ‘রোড শো’-এর কার্যক্রম শুরু করা, বিএসইসিসহ স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ, স্টক এক্সচেঞ্জে বন্ড-সুকুক-ট্রেজারি বন্ড চালুর উদ্যোগ, ব্রোকারেজ হাউসের সংখ্যা বাড়াতে নতুন ট্রেক ইস্যু করা, বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ, স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ, মার্কেট মেকারের অনুমোদন, পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২২ সালে বিএসইসির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সংকট বিবেচনায় পুনরায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা অন্যতম। বৈশ্বিক সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন রোধে ওই বছরের ২৮ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে শেয়ারের দাম কমানো ঠেকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এ ধরনের পদ্ধতি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের পুঁজিবাজারে না থাকলেও আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারমূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ করার সুপারিশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো, পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলে লাপাত্তা হওয়া সেগুলোকে ডি লিস্টিং করিয়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বেশ কিছু আইন-কানুন, বিধিবিধান সংস্কার, কোম্পানিগুলোকে বোনাস লভ্যাংশের বদলে নগদ লভ্যাংশ দিতে অনুপ্রাণিত করা, পুঁজিবাজারে সরকারি সিকিউরিটিজের (ট্রেজারি বন্ড ও ডিবেঞ্চার) লেনদেন চালু, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে শৃঙ্খলায় ফেরানো, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, ইসলামি গ্রিন সুকুকের লেনদেন চালু এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়।
ওই বছর এর বাইরে জাপানে ভার্চুয়ালি রোড শো আয়োজন করা, মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারিদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী পুরস্কার- ২০২২ প্রদান, বাজেটে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ পুনর্বহাল রাখার সুপারিশ, এসএমই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ সহজ করা, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কমোডিটি এক্সচেঞ্জ গঠনে সহায়তা প্রদান, সিএসইর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজিকে অনুমোদন প্রদান, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেট ফান্ড (ইটিএফ) ও অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) গঠনে আইনপ্রণয়ন, বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) মাধ্যমে ফেরত প্রদান, চেক জমা দিয়েই শেয়ার কেনার সুযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুঁজিবাজার নিয়ে গুজব বা ভীতি ছড়ানো কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ, দেশের জনগণকে বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে মাধ্যমিকপর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ, শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত করা ও বোনাস শেয়ার অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন, ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখার কারণে স্তিমিত থাকা নতুন বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে আনতে নগদ লভ্যাংশ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে বৈচিত্র্যময় পণ্য হিসেবে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালু করা, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালু করা, কমোডিটি ও ডেরিভিটিভস এক্সচেঞ্জ চালু করতে বিধিমালা তৈরি করে গেজেট প্রকাশ, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা ইউরোপের দেশগুলোতে রোড শো আয়োজন করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তৃতীয় দফায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা, শেয়ার, ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগকে পুঁজিবাজার এক্সপোজারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তে সুপারিশে প্রদান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি অর্জনে সহায়তার লক্ষ্যে শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গঠনে ইউএনডিপি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসের (আইএফসি) সহায়তার গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ গ্রহণসহ সমঝোতা চুক্তি, নারীদের জন্য ‘অরেঞ্জ বন্ড’নামক এক বিশেষায়িত বন্ড তৈরির উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ প্রদানের সুবিধা বাড়াতে নীতি সয়হতা প্রদান এবং পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সীমা বাড়ানো হয়।
এ ছাড়া ওই বছর ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থের হিসাব সংরক্ষণের জন্য পৃথক ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে সমন্বিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে ইসলামিক শরিয়াভিত্তিক বিভিন্ন প্রকার সিকিউরিটিজ আনা এবং ইসলামিক ক্যাপিটাল মার্কেট গঠনের লক্ষ্যে শরিয়াহ অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের (এসএসি) অনুমোদন, আইওএসকোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল কমিটির (এপিআরসি) সভা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আয়োজন করা, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের নির্দেশনা স্পষ্টীকরণ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজারে সতর্কতা বাড়ানোর উদ্যোগ, মুদ্রা বিনিময় হারের ঝুঁকি কমাতে পুঁজিবাজারে ‘ফরেক্স’ চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে পুনরায় কঠোরতা আরোপ, আইন-পলিসি নির্ধারণ নিয়ে বিএসইসি ও আইএমএফের বৈঠক, ৪ ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রদান, পুঁজিবাজারে স্বতন্ত্র পরিচালকের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি, বিভিন্ন কোম্পানি একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং বছরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে পুঁজিবাজারের সদস্য করা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার আগে উত্তরা ব্যাংকের (তৎকালীন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন) ৪০টি শেয়ার তার যোগ্য উত্তরসূরির নিকট হস্তান্তর করা ২০২৩ সালের অন্যতম বড় অর্জন।
চলতি ২০২৪ সালে শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া বিএসইসি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সিএসইকে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের সনদ প্রদান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী পালন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ৫ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদান, স্টক ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের গ্রাহকের (বিনিয়োগকারী) মার্জিন ঋণের পোর্টফোলিওতে পুনর্মূল্যায়নজনিত অনাদায়কৃত ক্ষতির বিপরীতে রক্ষিতব্য প্রভিশন সুবিধার মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো, প্রায় ৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডের লেনদেন শুরুর সিদ্ধান্ত এবং অডিটর ও অডিট প্রতিষ্ঠান বিএসইসির তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যে বিগত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের প্রান্তিক দরপতন ঘটেছে। মূলত সুদের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস এবং এই মূল্যবান ধাতুর প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমে যাওয়ায় বাজারে এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত মঙ্গলবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৯৪২ ডলার ৯৯ সেন্টে নেমে আসে, যা গত নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন অবস্থান। অথচ বছরের শুরুতে খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রবল চাহিদার মুখে স্বর্ণের মূল্য রেকর্ড ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে উঠেছিল। গত তিন মাসে এই ধাতুর দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের এই দরপতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশের দেওয়া সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত বড় ভূমিকা রেখেছে। যেহেতু স্বর্ণ থেকে নিয়মিত কোনো লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই বিনিয়োগকারীরা এখন সরকারি বন্ডের মতো লাভজনক খাতের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের আশঙ্কায় অনেকে লোকসান এড়াতে স্বর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এছাড়া বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এবং স্পেস-এক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের আইপিও-তে বিনিয়োগের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করতে স্বর্ণের বাজার থেকে সরে আসছেন। অন্যদিকে, স্বর্ণের ইটিএফ তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রত্যাহার এবং চীনে খুচরা গ্রাহকদের ফিউচার ট্রেডিংয়ে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করায় বাজারের অস্থিরতা আরও বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও সরবরাহ খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপানে খাদ্যপণ্যের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। খবর জাপান টুডে। বৈশ্বিক এই অস্থিরতার কারণে চলতি জুলাই মাসেই দেশটিতে ২ হাজার ৫০০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাপানের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান তেইকোকু ডেটাব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুলাইয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৬টি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হবে এবং বিগত তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম কোনো একটি নির্দিষ্ট মাসে দাম বাড়ার তালিকায় থাকা পণ্যের সংখ্যা দুই হাজার অতিক্রম করল।
মূল্যবৃদ্ধির এই তালিকায় থাকা পণ্যগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য। বিশেষ করে টিনজাত খাবার ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার তালিকায় থাকা স্লাইস ব্রেড এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি রুটিও এই মূল্যবৃদ্ধির আওতাভুক্ত। তেইকোকু ডেটাব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল এবং প্লাস্টিক উৎপাদনের মূল উপাদান ন্যাপথার দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের প্যাকেজিং ও ট্রের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শিল্পোদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে এই বাড়তি খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী আগস্ট মাসেও প্রায় ২ হাজার পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা হবে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে, জাপানে এই বছরজুড়ে পর্যায়ক্রমে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক না হলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এই মূল্যস্ফীতির চাপ আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই ঊর্ধ্বমুখী ছিল বাজার, যার ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৭২টির দর বেড়েছে, যেখানে মাত্র ২৯টির দাম কমেছে এবং ৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজার মূলধনে। গত এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা বেড়ে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের শেষে ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।
সূচকের চিত্রেও গত সপ্তাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯১ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াহ সূচক ২৫ দশমিক ২৮ পয়েন্ট এবং বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৩০ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বেড়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সূচকগুলোর এমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান বাজারে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে বাজারে লেনদেনের গতিও ছিল নজরকাড়া। প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ১ হাজার ৪৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। লেনদেনের শীর্ষে আধিপত্য বজায় রেখেছে বেক্সিমকো লিমিটেড। এরপরই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ও মালেক স্পিনিং। এছাড়া আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালটেন্টস, এনসিসি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং সিটি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। সার্বিকভাবে গত সপ্তাহটি শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও চাঙ্গা ছিল।
দেশের কৃষি খাতে বিপ্লব ঘটাতে নির্মিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সার কারখানা ‘ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি’ উৎপাদনের প্রথম বছরেই অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এই মেগা প্রকল্পটি।
যেখানে ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানাটি মুনাফার মুখ দেখেছে, সেখানে বিসিআইসির অধীনে থাকা বাকি চারটি ইউরিয়া সার কারখানা একই সময়ে সম্মিলিতভাবে ৪১৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার সর্বোচ্চ ২১৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এছাড়া শাহজালাল ফার্টিলাইজার ১৩৪ কোটি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ৩৩ কোটি এবং যমুনা ফার্টিলাইজার ৩০ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। মূলত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাব এবং পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারাই এই লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সার বিক্রি থেকে সরাসরি আয় হয়েছে ১ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং সরকারি ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্তি ছিল ৮৯৯ কোটি টাকা। সব ধরনের ব্যয় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন শুরু না হওয়া এবং ঋণের সুদের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ৩৩৭ কোটি টাকার বেশি লোকসানে ছিল।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ একর জমিতে এই আধুনিক কারখানাটি নির্মাণ করা হয়েছে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে উদ্বোধন করা হলেও বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন শুরু হয় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে। বর্তমানে এটি দেশের সার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে কারখানাটির দীর্ঘমেয়াদি দায়ের পরিমাণ ১২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা, যার সিংহভাগই জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং এমআইজিএ-র ঋণ। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, উৎপাদনের প্রথম বছর থেকেই নিজস্ব আয় দিয়ে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত এক বছরে কিস্তি বাবদ প্রায় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে মাঝপথে কয়েকদিন উৎপাদন ব্যাহত হলেও কারখানাটি লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ সার উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে মুনাফার এই ধারা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে ১১ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও প্রায় ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টন সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের গমের বাজারে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রথমবারের মতো চিরাচরিত উৎস রাশিয়া ও ইউক্রেনকে টপকে দেশের প্রধান গম সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে আর্জেন্টিনা। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট আমদানিকৃত গমের প্রায় ৩০ শতাংশই এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমাপ্ত অর্থবছরে দেশে সর্বমোট ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ আমদানির রেকর্ড। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আমদানির হার বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের গমের চাহিদার জন্য মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভর করতে হতো এবং প্রায় প্রতি বছরই এই দুই দেশের কোনো একটি তালিকার শীর্ষে থাকত। তবে ২০২২ সালে দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে গম সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশি আমদানিকারকেরা বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু করেন এবং সেই প্রচেষ্টার ফলেই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে আর্জেন্টিনা এখন শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে মোট ২২ লাখ টন গম আমদানি করা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।
বিপরীত দিকে, বাংলাদেশের বাজারে রাশিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য অনেকটাই কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট গমের ৪৪ শতাংশ রাশিয়া থেকে এলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যার পরিমাণ ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টন। এছাড়া আমদানির তালিকায় ব্রাজিলের অবস্থানও লক্ষ্য করা গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার টন গম দেশে এসেছে, যা দেশের মোট গম আমদানির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের এই কৌশল আমদানির চিত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বজায় রাখা এবং শিল্প ও কৃষি খাতের চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নতুন করে আরও ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এই আমদানির মূল লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বর্তমানের ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমদানিতব্য এই জ্বালানির মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল রয়েছে। সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড’ এই জ্বালানি সরবরাহ করবে। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এই কেনাকাটায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ২৫ পয়সা ধরে এই আমদানিতে মোট ৬২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় হবে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে বিপিসির এই সংক্রান্ত প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করেছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, আমদানির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও কার্যাদেশ প্রদানের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে ‘নোয়া’ বা নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড ইস্যু করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পরপরই তেল সরবরাহ শুরু হবে। মূলত প্রতি ছয় মাসের নিয়মিত আমদানির অংশ হিসেবেই জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই বাড়তি মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকট এবং জাহাজ চলাচলের বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে ট্রানজিট সময় ও পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এছাড়া বিমা কোম্পানিগুলোর বাড়তি প্রিমিয়ামের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় দেশের শিল্পোৎপাদন ও কৃষিকাজ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই বাড়তি ব্যয়ের ঝুঁকি গ্রহণ করেছে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। ডলার সংকটের মধ্যেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলা বাস্তবায়িত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তারা সুফল পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখাই এই বৃহৎ আমদানির মূল উদ্দেশ্য।
পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি ৩৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (পিবিএস) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। স্থানীয় বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, গত চার বছরের মধ্যে পাকিস্তানের এটিই সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি, যা দেশটির সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের মোট আমদানি ব্যয় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর বিপরীতে রপ্তানি আয় ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বিদায়ী জুন মাসে এই ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে; মে মাসের তুলনায় জুন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। রপ্তানি আয়ের এই বড় পতন এবং আমদানির খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী। একেডি সিকিউরিটিজের গবেষণা পরিচালক মুহাম্মদ আওয়াইস আশরাফ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাকিস্তানের আমদানি বিল বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিমা খরচও বহুগুণ বেড়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে তুলা উৎপাদন কমে যাওয়ায় তুলা আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে ভারতের সস্তা চালের আধিপত্য এবং আফগানিস্তান ও ইরানের সাথে সীমান্ত জটিলতার কারণে পাকিস্তানের চাল ও সবজি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাকিস্তানের ব্রোকারেজ হাউসগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, রপ্তানি বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা না কমালে এই ঘাটতি পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার কমায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক মন্দা পাকিস্তানের রপ্তানি বাজারকে সংকুচিত করে তুলছে। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে পাকিস্তানকে এখন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর দিকে আরও বেশি মুখাপেক্ষী হতে হবে।
টানা ছয় কার্যদিবস উর্ধ্বমুখী থাকার পর চলতি সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দর সংশোধনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত কয়েক দিনের টানা উত্থানের ফলে অনেক শেয়ারের দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানোয় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেওয়ার কৌশল নিয়েছেন, যার ফলে এই দর সংশোধন ঘটেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ৩৯৪টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৩টির দাম বেড়েছে এবং ১৮৫টির দাম কমেছে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৪৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একই সাথে বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসই-৩০ আগের দিনের তুলনায় ১৬ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে ডিএসই শরিয়াহ সূচক সামান্য (০.৮০ পয়েন্ট) বেড়ে ১ হাজার ১৬৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচক কমার পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা কমেছে; এদিন মোট ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৩৪ কোটি টাকা কম।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের পতন লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪২ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৪০৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় বেড়ে ৬০ কোটি ৩৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১০টির দাম বেড়েছে এবং ৯৪টির দাম কমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সপ্তাহের শেষ দিনে এই দর সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। টানা কয়েকদিন সূচকের বড় উত্থানের পর বিনিয়োগকারীরা সাময়িকভাবে মুনাফা ঘরে তোলার চেষ্টা করেন। তারা মনে করছেন, আজকের এই দর সংশোধনের ফলে শেয়ারের দাম নতুন করে ক্রয়যোগ্য স্তরে নেমে এসেছে, যা আগামী সপ্তাহের শুরুতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হারের আকস্মিক ওঠানামা থেকে দেশের আমদানিকারকদের সুরক্ষা দিতে ‘ফরোয়ার্ড রেট’ চুক্তি চালুর ঐতিহাসিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সরবরাহকারী ও ক্রেতা ঋণের আওতায় ইউজেন্স আমদানির (পণ্য গ্রহণের নির্দিষ্ট সময় পর অর্থ পরিশোধ) ক্ষেত্রে এখন থেকে আমদানিকারকরা সুদের হার আগাম নির্ধারণ করে নিতে পারবেন। এই পদক্ষেপের ফলে বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মানদণ্ডভিত্তিক সুদের হার তথা ‘এসওএফআর’ (SOFR)-এর অস্থিতিশীলতাজনিত আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
ফরোয়ার্ড রেট চুক্তি মূলত একটি আর্থিক সুরক্ষা কবচ, যার মাধ্যমে আমদানিকারক ও ব্যাংক ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদের হার এখনই স্থির করে নিতে পারে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ব্যবস্থাটি কেবলমাত্র প্রকৃত আমদানি লেনদেনের ঝুঁকি প্রশমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং কোনো ধরনের ফাটকাবাজি বা স্রেফ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। ব্যাংকগুলোর জন্য এই প্রক্রিয়ায় মার্জিন নির্ধারণের সর্বোচ্চ সীমা রাখা হয়েছে ১০ ভিত্তি পয়েন্ট। এছাড়া, কোনো ব্যাংক তাদের গত ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ২৫ শতাংশের বেশি এই চুক্তির আওতায় আনতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, ব্যাংকগুলোকে এই চুক্তির বিপরীতে একই দিনে সমান্তরাল লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের বাজারঝুঁকি পুরোপুরি সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো নিজেদের হিসাবে কোনো ঝুঁকি বহন করবে না। আন্তর্জাতিক মানসম্মত চুক্তিকাঠামো ব্যবহার এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চুক্তির আগাম সমাপ্তি ঘটলে তা প্রচলিত বাজারদরে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং সকল প্রয়োজনীয় দলিল সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এসওএফআর রেট যখন ঘনঘন পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন এই চুক্তি আমদানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে এবং খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে। একই সাথে, দেশে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আর্থিক ডেরিভেটিভস বাজারের বিকাশেও এটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে দেশের আমদানি বাণিজ্যে আর্থিক স্থায়িত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জুন মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে। তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াজাত পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ৪২০ কোটি ২৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৫ সালের একই মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বরাবরের মতোই এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক খাত। জুন মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিটওয়্যার থেকে এসেছে ১৮৪ কোটি ১ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে ১৫৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি আয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৫১ লাখ ডলারে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও ৪৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে এসেছে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। গত বছরের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ খাতে আয় হয়েছে ৮ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তাজা সবজি, ফল, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্রে সামান্য নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। বছরের প্রথম দিকের কয়েক মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের কারণে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল না। তবে অর্থবছরের শেষ মাসে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার রপ্তানি খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইলসহ মোট ২৭ ধরনের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নতি এবং বিকল্প বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ জুন মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা মনে করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থবছরে মোট ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ৯৬৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বেশি। তবে বিশাল প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি কাস্টম হাউস। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বুধবার রাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, মূলত পাম অয়েল, ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফলমূল, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং খাদ্যপণ্য আমদানির মাধ্যমে এই বড় অংকের রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্য ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। আমদানিনির্ভর এই রাজস্ব ব্যবস্থায় পণ্য আমদানির পরিমাণ বাড়ার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আদায়ের ওপর।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে এখনো চট্টগ্রাম কাস্টমসের ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার বিশাল বকেয়া রয়ে গেছে। এর মধ্যে এককভাবে পেট্রোবাংলার কাছেই পাওনা রয়েছে ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, যেখান থেকে গত এক বছরে কোনো বকেয়াই আদায় করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে পাওনা রয়েছে ৩ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। যদিও চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা বকেয়া আদায় হয়েছে, তবে মোট পাওনার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানিয়েছে, বকেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বকেয়া পরিশোধ করলে আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) খরচ কমাতে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টের সেবা ফি বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নতুন হার ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগে এই সেবার সর্বনিম্ন হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার সাথে অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হতো। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এই নির্দেশনা দেশের সব ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার লক্ষ্যে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয় পক্ষকে ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়মের ফলে এখন থেকে ব্যাংক হিসাব, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টের কাছ থেকে ভ্যাটসহ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ফি কাটতে পারবে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ আরও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্যান্য সকল ফি ও চার্জ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে কোনো ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে তারা আরও আকর্ষণীয় অফার প্রদান করতে পারবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারিকৃত আগের সার্কুলারের আংশিক সংশোধন করে এই নতুন হার নির্ধারণ করা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। তবে দাম কমলেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর থেকে চিরস্থায়ীভাবে নির্ভরতা কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে এশিয়ার শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় ক্রেতারা এখন আর একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নয়। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ক্রয়ের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারায় এক আমূল পরিবর্তন শুরু হয়েছে বলে নিক্কেই এশিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
বাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তেলের বাজার শান্ত হয়েছে এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারে নেমে এসেছে। নৌপথ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও এশীয় দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলের তেল পরিবহনে বীমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয় এড়াতে ক্রেতারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাজার ধরে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে হয়তো এখন বড় অংকের ছাড়ে বা ডিসকাউন্টে তেল বিক্রি করতে হতে পারে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে জাপান তাদের আমদানি নীতি পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত জাপানের মোট আমদানির ৯৩ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসলেও দেশটি এখন জুলাইয়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে শতভাগ তেল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাপান তাদের শোধনাগারগুলোকে আধুনিকায়ন করছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিশেষ করে মার্কিন অপরিশোধিত তেল সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যময় করার কাজ শুরু করেছে। এশীয় বাজারের এই প্রবণতা দেখে বিশ্বখ্যাত তেল কোম্পানিগুলো এখন নাইজেরিয়া, কানাডা এবং অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ক্রেতাদের এই বিমুখতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ‘দুবাই ক্রুড’-এর ওপর, যার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের অন্য তেলের তুলনায় দ্রুত কমছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের (OPEC) একক আধিপত্য এখন বড় সংকটের মুখে। কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে গেছে এবং ইরানও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের একচ্ছত্র রাজত্ব এখন পতনের মুখে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এশিয় দেশগুলোর এই কৌশলগত পরিবর্তন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।