অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের মেয়াদ চার বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী মে মাসে। এ চার বছরের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাভাব সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির আরোপ করা ফ্লোর প্রাইসসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে পুরো মেয়াদজুড়েই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বিএসইসি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে নিয়ন্ত্রণে অনন্য দৃষ্টি স্থাপন করেছে বর্তমান কমিশন। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ কমিশনের যথাযথ পদক্ষেপ অব্যাহত না থাকলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত।
তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যতটুকু পড়েছে তা খুবই সামান্য। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও এ বাজারে ইতিবাচক রিটার্ন ছিল। পরবর্তীতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানিসহ বিভিন্ন সংকট তৈরি হলে আগে থেকেই এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পেরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। এটি ছিল বাজারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কমিশনের সবচেয়ে বড় যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে কমিশন পুরো সময়জুড়ে বাজার উন্নয়নে সংক্রিয় ছিল।
২০২০ সালের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাত। ঠিক ওই সময় টালমাটাল পুঁজিবাজারকে সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে বিএসইসিতে কাজে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দীন আহমেদ, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন্স সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও সাবেক শিল্প সচিব আব্দুল হালিম। এ ছাড়া তৎকালীন আরেক কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন খোন্দকার কামালুজ্জামান। পরে তার মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিশনার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. রুমানা ইসলামকে নিয়োগ দেয় সরকার। এ চার কমিশনার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দায়িত্ব নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
বর্তমান কমিশনের অধীনে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো
২০২০ সালে ১৭ মে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত লকডাউনে পুঁজিবাজার খোলা রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে আইন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুর্বল ও লোকসানে থাকা কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসক বসানো এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন করা হয়। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জিরো টলারেন্স নীতিতে অনেক কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালকদের বিও হিসেবে থাকা শেয়ার স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে অনেকের ব্যাংক হিসাবও। এর বাইরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়।
ওই বছর এসবের পাশাপাশি বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করে কর সুবিধা বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্তসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তাগিদ বৃদ্ধি করা, ব্যাংকের নগদ লভ্যাংশ সেপ্টেম্বরের আগে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) শক্তিশালী করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, জেড ক্যাটাগরি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পুঁজিবাজারের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের উদ্যোগ, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সভা (এজিএম, ইজিএম, পর্ষদ সভা) করার অনুমোদন, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজতর করা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ও বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ‘ডিজিটাল বুথ’ খোলার অনুমোদন এবং পুঁজিবাজারকে ডিজিটালাইজড করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০২১ সালে পুঁজিবাজারের সুশাসন ফেরাতে বিভিন্ন আইন-কানুন সংস্কার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ ও এককভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ না থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোরতা আরোপ, দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিতে স্বচ্ছতা আনতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বল কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ও ব্যাংক হিসাব জব্দ, ২০ হাজার কোটি টাকার ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) গঠন, আইপিওতে আসা কোম্পানির শেয়ার আনুপাতিক সমবণ্টন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একাধিক আইপিও বাতিল করা, ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেট (ওটিসি) বাতিল করে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু করা, অল্টারনেটিভ প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ, পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় ২০২০ সালে আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, লভ্যাংশ না দেওয়া ও নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং তফসিলি ব্যাংকের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ওই বছর বুকবিল্ডিংয়ের বিডিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ, বিনিয়োগ বাড়াতে দেশে-বিদেশে ব্রোকার হাউসের শাখা হিসেবে ডিজিটাল বুথ স্থাপন, পুঁজিবাজারের ব্র্যান্ডিং ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন দেশে ‘রোড শো’-এর কার্যক্রম শুরু করা, বিএসইসিসহ স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ, স্টক এক্সচেঞ্জে বন্ড-সুকুক-ট্রেজারি বন্ড চালুর উদ্যোগ, ব্রোকারেজ হাউসের সংখ্যা বাড়াতে নতুন ট্রেক ইস্যু করা, বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ, স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ, মার্কেট মেকারের অনুমোদন, পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২২ সালে বিএসইসির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক সংকট বিবেচনায় পুনরায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা অন্যতম। বৈশ্বিক সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন রোধে ওই বছরের ২৮ জুলাই দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে শেয়ারের দাম কমানো ঠেকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এ ধরনের পদ্ধতি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের পুঁজিবাজারে না থাকলেও আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বহাল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারমূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে নির্ধারণ করার সুপারিশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো, পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলে লাপাত্তা হওয়া সেগুলোকে ডি লিস্টিং করিয়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বেশ কিছু আইন-কানুন, বিধিবিধান সংস্কার, কোম্পানিগুলোকে বোনাস লভ্যাংশের বদলে নগদ লভ্যাংশ দিতে অনুপ্রাণিত করা, পুঁজিবাজারে সরকারি সিকিউরিটিজের (ট্রেজারি বন্ড ও ডিবেঞ্চার) লেনদেন চালু, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে শৃঙ্খলায় ফেরানো, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, ইসলামি গ্রিন সুকুকের লেনদেন চালু এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়।
ওই বছর এর বাইরে জাপানে ভার্চুয়ালি রোড শো আয়োজন করা, মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারিদের কাজে উৎসাহ বাড়াতে স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী পুরস্কার- ২০২২ প্রদান, বাজেটে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ পুনর্বহাল রাখার সুপারিশ, এসএমই প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ সহজ করা, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কমোডিটি এক্সচেঞ্জ গঠনে সহায়তা প্রদান, সিএসইর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজিকে অনুমোদন প্রদান, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেট ফান্ড (ইটিএফ) ও অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) গঠনে আইনপ্রণয়ন, বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) মাধ্যমে ফেরত প্রদান, চেক জমা দিয়েই শেয়ার কেনার সুযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুঁজিবাজার নিয়ে গুজব বা ভীতি ছড়ানো কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ, দেশের জনগণকে বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে মাধ্যমিকপর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তকে বিনিয়োগ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ, শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত করা ও বোনাস শেয়ার অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালা পরিবর্তন, ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখার কারণে স্তিমিত থাকা নতুন বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে আনতে নগদ লভ্যাংশ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে বৈচিত্র্যময় পণ্য হিসেবে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালু করা, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালু করা, কমোডিটি ও ডেরিভিটিভস এক্সচেঞ্জ চালু করতে বিধিমালা তৈরি করে গেজেট প্রকাশ, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা ইউরোপের দেশগুলোতে রোড শো আয়োজন করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তৃতীয় দফায় ফ্লো প্রাইস আরোপ করা, শেয়ার, ডিবেঞ্চার, করপোরেট বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগকে পুঁজিবাজার এক্সপোজারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তে সুপারিশে প্রদান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা এসডিজি অর্জনে সহায়তার লক্ষ্যে শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গঠনে ইউএনডিপি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসের (আইএফসি) সহায়তার গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ গ্রহণসহ সমঝোতা চুক্তি, নারীদের জন্য ‘অরেঞ্জ বন্ড’নামক এক বিশেষায়িত বন্ড তৈরির উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ প্রদানের সুবিধা বাড়াতে নীতি সয়হতা প্রদান এবং পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ সীমা বাড়ানো হয়।
এ ছাড়া ওই বছর ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থের হিসাব সংরক্ষণের জন্য পৃথক ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে সমন্বিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে ইসলামিক শরিয়াভিত্তিক বিভিন্ন প্রকার সিকিউরিটিজ আনা এবং ইসলামিক ক্যাপিটাল মার্কেট গঠনের লক্ষ্যে শরিয়াহ অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের (এসএসি) অনুমোদন, আইওএসকোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল কমিটির (এপিআরসি) সভা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আয়োজন করা, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের নির্দেশনা স্পষ্টীকরণ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজারে সতর্কতা বাড়ানোর উদ্যোগ, মুদ্রা বিনিময় হারের ঝুঁকি কমাতে পুঁজিবাজারে ‘ফরেক্স’ চালুর উদ্যোগ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে পুনরায় কঠোরতা আরোপ, আইন-পলিসি নির্ধারণ নিয়ে বিএসইসি ও আইএমএফের বৈঠক, ৪ ব্রোকারেজ হাউসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রদান, পুঁজিবাজারে স্বতন্ত্র পরিচালকের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি, বিভিন্ন কোম্পানি একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত এবং বছরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে পুঁজিবাজারের সদস্য করা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার আগে উত্তরা ব্যাংকের (তৎকালীন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন) ৪০টি শেয়ার তার যোগ্য উত্তরসূরির নিকট হস্তান্তর করা ২০২৩ সালের অন্যতম বড় অর্জন।
চলতি ২০২৪ সালে শুরুতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া বিএসইসি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সিএসইকে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের সনদ প্রদান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী পালন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে ৫ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদান, স্টক ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের গ্রাহকের (বিনিয়োগকারী) মার্জিন ঋণের পোর্টফোলিওতে পুনর্মূল্যায়নজনিত অনাদায়কৃত ক্ষতির বিপরীতে রক্ষিতব্য প্রভিশন সুবিধার মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো, প্রায় ৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেডের লেনদেন শুরুর সিদ্ধান্ত এবং অডিটর ও অডিট প্রতিষ্ঠান বিএসইসির তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ও স্বস্তির আভাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৬৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে ৯৭ দশমিক ১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলে ৬২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৫ দশমিক ৪ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। মূলত সরবরাহ সংকট কাটার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ কিছুটা কমে আসায় এই দরপতন ঘটেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন হামলা এবং এর জবাবে হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে পরবর্তীতে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সফল হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমিত হলে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে, যা দাম কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
এদিকে তেলের বাজারে দরপতন ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মজুত হ্রাসের তথ্য নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, গত ২৯ মে শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল কমেছে। বর্তমানে মার্কিন তেলের মোট মজুত দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেলে। বাজার বিশ্লেষকরা যেখানে মজুত মাত্র ৪০ লাখ ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেখানে মজুত হ্রাসের হার দ্বিগুণ হওয়ায় বাজারে এক ধরনের অস্থিরতার আভাস রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ‘হাইতং ফিউচার্স’ বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে জানিয়েছে যে, তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আবারও বাড়তে পারে। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত দ্রুত হ্রাস পাওয়া এবং বৈশ্বিক চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে বাজারকে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান স্বস্তি স্থায়ী না হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে তেলের বাজার পুনরায় অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি জ্বালানি তেলের বাজারে পড়ছে। যদিও বর্তমানে দাম কিছুটা কমেছে, তবে প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর অস্থিরতা এবং বড় দেশগুলোর মজুত কমে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন নিবিড়ভাবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ যেকোনো ছোটখাটো সংঘর্ষ তেলের মূল্যে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে পারে। আগামী সপ্তাহগুলোতে বিশ্ববাজারের এই গতিধারা বজায় থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সদ্য সমাপ্ত মে মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ৪৪০ কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, এই রপ্তানি আয় আগের মাস অর্থাৎ এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। তবে গত বছরের মে মাসের তুলনায় এই আয় ৭ শতাংশ কম, কারণ গত বছর একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৪৭৪ কোটি ডলারের পণ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, মে মাসে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং শিপিং প্রক্রিয়ায় ধীরগতির ফলে বার্ষিক ভিত্তিতে রপ্তানি আয় কিছুটা নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে মে মাসে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ইপিবির তথ্য বলছে, গত মাসে পোশাক খাত থেকে মোট আয় এসেছে ৩৫৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৮ শতাংশেরও বেশি কম। এর মধ্যে নিটওয়্যার থেকে ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ এবং ওভেন গার্মেন্টস থেকে ১৬২ কোটি ৪৮ লাখ ডলার আয় হয়েছে। পোশাক খাতের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিও প্রায় ১৩ শতাংশ কমে ১০ কোটি ৯৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া কৃষিপণ্য রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ২ শতাংশ কমে ৬ কোটি ৭১ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে কিছু প্রচলিত ও অপ্রচলিত খাতে রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মে মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেশি। এই আয়ের অর্ধেকের বেশি এসেছে পাট সুতা রপ্তানি থেকে। হোম টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানিও ৪ শতাংশ বেড়ে ৮ কোটি ৭২ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করে ২ কোটি ৭২ লাখ ডলার এবং হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি করে ২ কোটি ৯২ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই-মে) চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মোট রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারের পণ্য। এটি গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের তুলনায় প্রায় আড়াই শতাংশ কম, যেখানে গত বছর আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে রপ্তানি আয়ে ২৫ শতাংশের বড় প্রবৃদ্ধি দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে টানা কয়েক মাস মন্দা ভাব বজায় ছিল। গত এপ্রিলে আয় আবার ৩৩ শতাংশ বাড়লেও মে মাসের এই সাময়িক ধীরগতি সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে বছর শেষে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্য গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন মাশুল ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটির নেতারা মনে করছেন, বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। তাঁদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। এই সংকট নিরসনে এবং দেশের স্টিল ও রি-রোলিং শিল্প বাঁচানোর স্বার্থে সরকারের কাছে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, করোনা-পরবর্তী সময় থেকেই দেশের শিল্প খাত এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদহার, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, চলতি মূলধনের অভাব এবং গ্যাস-বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে অনেক কারখানা এখন লাভের বদলে লোকসানে চলছে। গত কয়েক বছরে বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ডিমান্ড মাশুল ১২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্য বেড়েছে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হলে শিল্পের আর্থিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বড় কারখানাগুলো সরাসরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এক্সট্রা হাই টেনশন (ইএইচটি) লাইনের গ্রাহক এবং তারা নিজস্ব সাবস্টেশনে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। ফলে এসব কারখানায় কার্যত কোনো সিস্টেম বা ট্রান্সমিশন লস নেই। তা সত্ত্বেও ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জসহ বিভিন্ন অতিরিক্ত খরচের কারণে প্রকৃত বিদ্যুৎ বিল আগে থেকেই অনেক বেশি ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে ইএইচটি-১ গ্রাহকের ক্ষেত্রে অফ-পিক সময়ের মূল্য প্রতি ইউনিটে ৯ দশমিক ৬১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৩৯ টাকা এবং পিক টাইমের মূল্য ১৫ দশমিক ৮২ টাকা করা হয়েছে। ব্যয়ের এই বিশাল পার্থক্য সমন্বয় করা কারখানাগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএসএমএ আরও উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে জ্বালানির দাম কমতির দিকে থাকলেও দেশীয় বাজারে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি একমুখী নীতিকে নির্দেশ করে। শিল্প খাতের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর পড়বে। শিল্পকে অতিরিক্ত চাপের মুখে রেখে টেকসই অর্থনীতি গঠন করা সম্ভব নয় বলেই সংগঠনটি মনে করে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
পরিশেষে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, বিদ্যুতের বর্তমান মূল্যকাঠামো এখন কেবল একটি ট্যারিফ ইস্যু নয়, বরং এটি শিল্পের টিকে থাকার মৌলিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। স্টিল শিল্পের মতো ভারী শিল্পগুলো দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের মেরুদণ্ড, তাই এই খাত দুর্বল হয়ে পড়লে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইস্পাত খাতের পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিল্প মালিকরা মনে করেন, যথাযথ নীতি সহায়তা এবং বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করা হলে এই খাত পুনরায় সচল হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখতে পারবে।
বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক পর্যালোচনা বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বৈঠকে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘প্রগতি’ নামক বিশেষ স্কিমটি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বেসরকারি ব্যাংক কর্মী প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেনশন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, যেখানে বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন। সচিব নির্দেশ দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখায় সর্বজনীন পেনশনের জন্য আলাদা ডেস্ক স্থাপন করতে হবে এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে তাঁদের কর্মীদের প্রগতি স্কিমে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘প্রগতি’ স্কিমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী নিজে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বহন করবে। ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক চাঁদা নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে এবং ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীরা আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন। এই স্কিমের আওতায় জমা দেওয়া চাঁদার ওপর যেমন আয়কর রেয়াত পাওয়া যাবে, তেমনি প্রাপ্ত পেনশনও সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত থাকবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি থাকায় বিনিয়োগের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে জমানো অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে তোলার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শ্রমজীবী মানুষের অধিকাংশেরই অবসর-পরবর্তী কোনো আর্থিক সুরক্ষা নেই। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে প্রগতিসহ চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ছাড়িয়েছে এবং জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকায়। বর্তমানে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে এই প্রকল্পের চাঁদা সংগ্রহ করছে। পেনশন কর্তৃপক্ষ আশা করছে, বেসরকারি ব্যাংক খাতের প্রায় এক লাখের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী এই স্কিমে যুক্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
পেনশন ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করতে ভবিষ্যতে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম চালু এবং নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশনের সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়াও ব্যাংকের আউটসোর্সিং কর্মীদের এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকারি ব্যাংকে নিজস্ব পেনশন ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি ব্যাংকে এই সুযোগ নেই, তাই প্রগতি স্কিমটি এই খাতের শূন্যতা পূরণে একটি টেকসই ও কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করবে।
সদ্য সমাপ্ত মে মাসে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে বড় হোঁচট খাওয়ায় সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আলোচিত মাসে গত বছরের একই মাসের তুলনায় সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশের বেশি। বুধবার (৩ জুন) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি রয়েছে ৪ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই মাসে যা হয়েছিল ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি বছরের মে মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই মাসে যা হয়েছিল ৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে দেশের মোট রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা হয়েছিল ৪৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পোশাক রপ্তানি হয় ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
প্রসঙ্গত, টানা আট মাস রপ্তানি আয় কমার পর গত এপ্রিলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছিল। তবে মে মাসে আবারও রপ্তানি কমে যাওয়ায় সেই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বুধবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় সংগঠনটি উল্লেখ করে যে, তার এই অনন্য অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং বলিষ্ঠ অবস্থানের একটি যুগান্তকারী স্বীকৃতি।
বিজিএমইএ তাদের বার্তায় বিশ্বাস প্রকাশ করেছে যে, ড. খলিলুর রহমানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বহুপাক্ষিক দক্ষতা বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিজিএমইএ আরও মনে করে যে, জাতিসংঘের এই প্রভাবশালী পদের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকালীন বাণিজ্য সুবিধা বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার মতো জাতীয় ও কৌশলগত অর্থনৈতিক দাবিগুলো বিশ্বমঞ্চে জোরালোভাবে উপস্থাপন ও সফলভাবে আদায় করতে সক্ষম হবেন।
পোশাক শিল্পের প্রধান এই সংগঠনটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মেয়াদে সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার এই নেতৃত্ব বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি আরও সুউচ্চ করবে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা ৮ দিনের দীর্ঘ ছুটি শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। বুধবার সকাল থেকেই এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল হয়েছে বলে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।
পানামা সোনামসজিদ পোর্ট লিংক লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা টিপু সুলতান এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, সোনামসজিদ আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপ এবং স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ সিদ্ধান্তে গত ২৬ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত সব ধরনের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এই সময়ে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ খোলা ছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ছুটি শেষে বুধবার সকাল থেকে বন্দরের কার্যক্রম তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরেছে। ইতিমধ্যে উভয় দেশের বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল শুরু হওয়ায় বন্দরে আবারও কর্মব্যস্ততা ও চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প এখন কেবল দেশীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য ওষুধ শিল্প এখন শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে এক আস্থার নাম হয়ে উঠছে। দেশের রপ্তানি খাতে ওষুধশিল্প এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক অগ্রগতির পর এবার প্রথমবারের মতো ২৫ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এই খাত থেকে ১৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে এককভাবে ওষুধ রপ্তানি আয় বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছরের বাকি দুই মাসে আয় ২৫ কোটি ডলারের ঘর স্পর্শ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ বছরের ব্যবধানে এই খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। গত দেড় দশকে কেবল একবারই রপ্তানি আয় সামান্য কমেছিল, নতুবা প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় ছিল। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই খাত ২০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে এক নতুন মাইলফলক অর্জন করেছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও দেশীয় ওষুধের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। গত দুই বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওষুধপণ্য রপ্তানির জন্য বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং উন্নত দেশগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদন পেয়েছে। দেশের মোট ওষুধ রপ্তানির প্রায় অর্ধেক আয় আসছে বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে। রপ্তানির তালিকায় অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ ও বিকন ফার্মার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও।
ওষুধ রপ্তানিতে ধারাবাহিক সাফল্য এলেও এই শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কাঁচামালের ওপর অত্যধিক আমদানিনির্ভরতা। দেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও এর মূল কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই)-এর সিংহভাগই চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য ১৭ বছর আগে এপিআই শিল্পপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শিল্পপার্কটির প্লটগুলো অধিকাংশ অব্যবহৃত থাকায় স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
তবে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো ওষুধশিল্পেও বৈশ্বিক বাজারে বড় সাফল্য অর্জনের সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ৪০টিরও বেশি এপিআই উৎপাদন করছে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা পেলে দেশের মোট চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হবে। যথাযথ টাস্কফোর্স গঠন এবং নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে এই শিল্পকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। বুধবার মূল্যবান এই ধাতুর দামে সামান্য পতন ঘটায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। রয়টার্স সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৪৭৬.৫০ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে আগস্টে সরবরাহযোগ্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচারও শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪,৫০৪.৪০ ডলারে কেনাবেচা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করতে পারে।
সাধারণত উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের বাজারের জন্য নেতিবাচক হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের পরিবর্তে অধিক মুনাফা পাওয়া যায় এমন খাতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন, যার ফলে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের মূল্যের গতিপথ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, তেলের বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করবে। এসব ক্ষেত্রে যেকোনো নতুন সংকেত সরাসরি বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রয়টার্স ও দ্য বিজনেসলাইন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) ধাতুটির দাম দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ৩ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা ২০২২ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৯ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ওই অঞ্চল থেকে ধাতুটির রফতানি এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছর বিশ্ববাজারে ২০ লাখ টনেরও বেশি অ্যালুমিনিয়ামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি তামার দামও বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ১৩ হাজার ৮৪০ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া সিসা ও টিনের দাম সামান্য বাড়লেও নিকেলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করতে তামা, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহা আমদানির শুল্ক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার নতুন আদেশে নির্দিষ্ট কিছু কৃষি যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশ থেকে বুলডোজার ও ফর্কলিফটের মতো ভারি শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে। তবে কোনো বিদেশি কোম্পানি যদি তাদের উৎপাদিত যন্ত্রপাতিতে ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ মার্কিন স্টিল বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করে, তবে তারা বিশেষ ১০ শতাংশ শুল্ক সুবিধা লাভ করবে, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
দেশের পুঁজিবাজারে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনের গতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্যসূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। এদিন ডিএসইতে চলতি বছরের সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৯ কোটি ১৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র একদিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১৯৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এটি গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে একক দিনে সর্বোচ্চ লেনদেনের ঘটনা। উল্লেখ্য যে, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বাজারটিতে ১ হাজার ৪০০ কোটি ৮৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল।
ঈদুল আজহার ছুটির আগে থেকেই শেয়ারবাজারে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছিল, তা ছুটির পরেও অব্যাহত রয়েছে। ঈদের আগে টানা পাঁচ কার্যদিবস এবং ঈদের পর লেনদেন হওয়া তিন কার্যদিবস মিলিয়ে টানা আট দিন ধরে বাজারে তেজি ভাব বিরাজ করছে। এই আট কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ২৩৮ পয়েন্ট। বুধবার লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর বাড়তে শুরু করে এবং দিনশেষে ২৪৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার তালিকায় নাম লেখায়। বিপরীতে দাম কমেছে ৯৮টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৪১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৯ এবং বাছাই করা ভালো ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৭ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৫৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লভ্যাংশ প্রদানের ভিত্তিতে ভালো মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১২৯টির শেয়ার দর বেড়েছে এবং ৪৫টির কমেছে। অন্যদিকে ‘জেড’ গ্রুপের ৭১টি কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে এবং ২২টির দাম কমেছে।
এদিন লেনদেনের শীর্ষে ছিল মীর আকতার হোসেন লিমিটেড, যার ৩০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল একমি পেস্টিসাইড এবং ২৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সোনারগাঁও টেক্সটাইল। শীর্ষ দশের তালিকায় আরও রয়েছে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, এনসিসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, টেকনো ড্রাগস, জেনেক্স ইনফোসিস, গোল্ডেন সন এবং আরডি ফুড।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০৪ পয়েন্ট বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪৮টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ৬৪টির এবং ২৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে বুধবার মোট ৩১ কোটি ৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি। পুঁজিবাজারের এমন ধারাবাহিক উত্থান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে প্রদান করা রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ওপর নতুন করে এককালীন শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে ফি আরোপ করেছে সরকার। মূলত সরকারি গ্যারান্টির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঋণ গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়।
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি যদি দেশি অথবা বিদেশি কোনো উৎস থেকে ঋণ নিতে চায় এবং সেই ঋণের সুরক্ষায় সরকারের গ্যারান্টির প্রয়োজন হয়, তবে ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত হারে এই ফি পরিশোধ করতে হবে। পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি ঋণ আইন, ২০২২ এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি নীতিমালা, ২০১৪-এর বিধান অনুযায়ী অর্থ বিভাগ এই গ্যারান্টি ফি আরোপ করতে পারবে। নির্ধারিত এই অর্থের পরিমাণ সরকারি চালানের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ পাওয়ার জন্য সরকারি গ্যারান্টির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে; নতুন এই ফি ব্যবস্থার ফলে তারা ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হবে এবং গ্যারান্টির ব্যবহার একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে।
সাধারণত বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, জ্বালানি তেল আমদানি কিংবা কৃষি খাতে অর্থায়নের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে। ঋণদাতা সংস্থাগুলো এসব ক্ষেত্রে ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যারান্টি চেয়ে থাকে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সেই নিশ্চয়তা প্রদান করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সরকারের দেওয়া গ্যারান্টির মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে ৫৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ৪৮ Margot ৫৯০ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের অর্ধেকের বেশি অংশ রয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এর বাইরে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বিভিন্ন কৃষি ঋণের বিপরীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি গ্যারান্টি কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এর কৃষি ঋণ কর্মসূচির সুরক্ষায় এই রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি বড় ভূমিকা পালন করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থায়নের পথ সহজ হলেও এর ফলে সরকারের ওপর এক ধরনের সম্ভাব্য দায় তৈরি হয়। ঋণ পরিশোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে সেই বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরেই বর্তায়। তাই এই ফির প্রবর্তন রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সুসংহত করার পাশাপাশি আর্থিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজার মূলধনের দিক থেকে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের তালিকায় সপ্তম স্থানে নেমে এসেছে ভারত। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়া ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। মূলত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা, দুর্বল আয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে আশানুরূপ বিনিয়োগ না থাকাকে ভারতের এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। রয়টার্স সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বর্তমানে এআই চিপের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তিশালী অবস্থান দেশটিকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান পরিলক্ষিত হয়েছে। দেশটির কসপি, কসদাক ও কোনেক্স সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট মূল্য এখন ৪ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমেছে। উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বৈশ্বিক তালিকায় দুই ধাপ নিচে নেমে গেছে ভারত। এর আগে গত মাসেই দেশটি তাইওয়ানের কাছে নিজের অবস্থান হারিয়েছিল।
বার্নস্টেইনের বিশ্লেষক ভেনুগোপাল গ্যারে ও নিখিল আরিলা জানিয়েছেন, প্রায় ১৮ মাস আগেও ভারতের শেয়ারবাজারের মূলধন দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে সাড়ে তিন গুণ এবং তাইওয়ানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। তবে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যেই ভারতের সেই বিশাল ব্যবধানের লিড পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে গেছে। চলতি বছর ভারতের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিফটি ৫০ ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং বিএসই সেনসেক্স ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে ভারতের আইটি খাতের সূচক ১৯ শতাংশ কমেছে, যা মূলত দুর্বল আয়ের পূর্বাভাস ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপের ফল।
২০২৬ সালের এ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ারবাজার থেকে রেকর্ড ২ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮৯১ কোটি ডলার তুলে নেওয়ার রেকর্ড ছিল। এর ফলে এমএসসিআই গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ইনডেক্সে ভারতের হিস্যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ থেকে কমে এখন ১২ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কার্মিনিয়াকের ফান্ড ম্যানেজার নাওমি ওয়েস্টেল একে একটি “স্মরণীয় পতন” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর আকাশচুম্বী হওয়ায় দেশটির প্রধান সূচক কসপি ১০৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক চাহিদার কারণে তাইওয়ানের প্রধান সূচক বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি থেকে ভারত পর্যাপ্ত সুবিধা নিতে পারছে না। বর্তমানে বিশ্বে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও চিপ তৈরির মূল কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া। তবে লাইটহাউজ ক্যান্টনের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা অভয় লাইজাওয়ালা মনে করেন, “এআই ইকোসিস্টেম বা ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ, কুলিং সিস্টেম ও ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। ভারত এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এআই যুগে নিজেদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার ভালো সুযোগ পেতে পারে।”