ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য ৬০ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় ৬ হাজার টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বগুড়ার রায় এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের কাছ থেকে এই মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
সচিবালয়ে আজ মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাহেদা পারভীন সাংবাদিকদের জানান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র (জাতীয়) পদ্ধতিতে বগুড়ার রায় এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের কাছ থেকে ৬ হাজার টন মসুর ডাল (৫০ কেজির বস্তায়) ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৬০ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম ১০০ টাকা ৭৯ পয়সা, যা আগে ছিল ১০১ টাকা ৩৩ পয়সা।
এর আগে গত ২৭ মে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল আমদানির অনুমোদন দেয়। প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১০১ টাকা ৩০ টাকা, যা আগে ছিল ১০১ টাকা ৯৪ পয়সা। সুপারিশকৃত দরদাতা শবনম ভেজিটেবল ইন্ডাস্ট্রিজ।
তিন দেশ থেকে ৩৯৮ কোটি টাকার সার কিনবে সরকার
রাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে কাতার, মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন সার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে মোট ব্যয় হবে ৩৯৭ কোটি ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার (অপশনাল) ইউরিয়া সার, ৩০ হাজার টন টিএসপি সার এবং ৪০ হাজার টন ডিএপি সার রয়েছে।
সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাহেদা পারভীন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য রাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে কাতারের কাতার কেমিক্যাল অ্যান্ড পেট্রো কেমিক্যাল মার্কেটিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (মুনাজাত) থেকে ১৪তম লটে ৩০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার (অপশনাল) ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১৮ কোটি ৭৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রতি টন সারের দাম পড়বে ২৮০ মার্কিন ডলার, যা আগে ছিল ২৭৯ দশমিক ৬৭ মার্কিন ডলার।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ওসিপি এস এ মরক্কো এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় ওসিপি এস এ মরক্কোর কাছ থেকে ৩০ হাজার টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাব মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিয়েছে বলে জানান জাহেদা পারভীন।
তিনি জানান, এতে ব্যয় হবে ১৩৪ কোটি ৫২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫০ টাকা। প্রতি টন সারের দাম পড়বে ৩৮০ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। যা আগে ছিল ৩৭৯ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সৌদি আরব এবং বিএডিসির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের মা’আদেনের কাছ থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এতে ব্যয় হবে ২৪৪ কোটি ৬৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। প্রতি টন সারের দাম পড়বে ৫১৯ মার্কিন ডলার, যা আগে ছিল ৫১৯ মার্কিন ডলার।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও বেশি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে একটি বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইপিও ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় নীতি ও আইন সংস্কারের বিষয়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিএসইসি কার্যালয়ে কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশীজনদের দেওয়া মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতে আইপিও প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান এবং দ্রুত আইনগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে দৃঢ় আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিএসইসি’র পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫-এর আলোকে আইপিও-সংক্রান্ত আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতকরণ, নিরীক্ষা কার্যক্রম এবং আইপিও আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। আইপিও প্রাইসিং, পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটির তালিকাভুক্তি, ডাইরেক্ট লিস্টিং এবং রাইট ইস্যুসহ পুঁজিবাজারের বেশ কিছু সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরীক্ষক (অডিটর), ইস্যু ম্যানেজার এবং ইস্যুয়ারদের ভূমিকা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার জায়গাটি আরও কীভাবে সুদৃঢ় করা যায়, সে বিষয়েও সভায় বিশদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই মতবিনিময় সভায় বিএসইসি’র চেয়ারম্যান ছাড়াও সংস্থার তিন কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব এবং মো. নাফিজ আল তারিক উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরাও এই সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা সভায় তাঁদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি), বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ), সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইস্যু ম্যানেজারের প্রধান নির্বাহী ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে পুঁজিবাজার সংস্কারে নিজেদের সমর্থন ও সুপারিশ প্রদান করেন।
অংশীজনদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত এই সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা আইপিও প্রক্রিয়ায় বর্তমানে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংস্কারের বিষয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করেন। বিএসইসি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে জানিয়েছে যে, সভায় উপস্থাপিত সকল মতামত ও সুপারিশ কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করতে এবং আইপিও প্রক্রিয়াকে সত্যিকারের কার্যকর, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগকারীবান্ধব একটি ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও যুগোপযোগী আইনগত সংস্কারের সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে কমিশন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি) প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে এই খাতে নিয়োজিত প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কর্মীর চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতির অভাবে আসন্ন এই বিশাল ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বুধবার (১৫ জুলাই) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সময়োপযোগী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল ওয়েবিনার আয়োজনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন ও মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই মহূর্তেই অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর আকস্মিক পরিবর্তন দেশের শ্রমবাজারে নতুন করে এক প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। সিপিডির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল ২০২৪ সালেই দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী কর্মী। ওয়েবিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, বর্তমানে বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং নীতি নির্ধারকদের এই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। উত্তরাধিকার সূত্র এবং বাজার ও কর্মসংস্থানের ভেতরের কাঠামোগত অমিল, দক্ষতার চরম অভাব এবং ভৌগোলিক বিভিন্ন কারণে এমন সংকট তৈরি হচ্ছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বজুড়ে এআই ও অটোমেশনের বিশাল বিপ্লব। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও এর প্রভাবে প্রায় ৯০ লাখ চাকরি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বর্তমানে প্রায় ৮১ লাখে স্থির হয়ে আছে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও এর সিংহভাগই মূলত অনিরাপদ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের আওতাভুক্ত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার এক বিশাল ব্যবধান বা অমিল রয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তির হার ২০ শতাংশেরও কম, আর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। সিপিডি তাদের বিশ্লেষণে ২৭টি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল উপাদান মূল্যায়ন করে ২০৩৫ সালের জন্য শ্রমবাজারের চারটি সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করেছে। তবে সব পরিস্থিতিতেই পাঁচটি বিষয় অভিন্ন থাকবে বলে জানানো হয়েছে, যার মধ্যে ডিজিটালায়ন অপরিবর্তনীয় হওয়া, কর্মসংস্থান উচ্চমূল্যের সেবাখাতে স্থানান্তরিত হওয়া, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার পিছিয়ে থাকা, বৈশ্বিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকা এবং সফলতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করার বিষয়গুলো অন্যতম।
বিদ্যমান নীতিমালায় মূলত চারটি বড় ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য দেশে কোনো সমন্বিত আইনি কাঠামো নেই, অটোমেশনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি, দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন অনেক কম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়নের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এসব বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। শিল্পের বাস্তব চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, জীবনব্যাপী পুনঃদক্ষতা বা রিস্কিলিং কর্মসূচি চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে শিল্প প্রণোদনাকে সরাসরি যুক্ত করা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় শ্রমবাজার তথ্য ব্যবস্থা (এলএমআইএস) গড়ে তোলা, প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল গ্রহণ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধিকে টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম (ইজিএ) তাদের আল তাউইলাহ পরিশোধনাগারটি পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই খবরের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ধাতুটির উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার এটি একটি শক্তিশালী সংকেত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস রেকর্ডার-এ এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি অ্যালুমিনিয়ামের বাজার আদর্শ মূল্য ১ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রতি টন ৩ হাজার ১৪৩ ডলার ৫০ সেন্টে অবস্থান করছে। যদিও সপ্তাহের শেষ লেনদেনের শুরুতে দরপতন হয়েছিল, তবে সামগ্রিকভাবে সাপ্তাহিক হিসেবে এর দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহের ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতার অবসান ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী ধাতু বিক্রি করে দেওয়ায় এবং ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশ হতে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রত্যাশায় বাজারে এই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ইজিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের এই রিফাইনারির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ তা পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসবে। তবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এখনও বড় ধরণের ঝুঁকি বিরাজ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি এখনও বেশ অনিশ্চিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এছাড়া লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জের নিবন্ধিত গুদামগুলোতে বর্তমানে অ্যালুমিনিয়ামের মজুত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা ধাতুটির তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিল্প ধাতুর বাজারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তামার দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ১৩ হাজার ৪৯৫ ডলার ৫০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নিকেলের দাম দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, যার কারণ হিসেবে প্রধান উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সালফার সংকটের কথা বলা হয়েছে। সিসার দাম সামান্য বাড়লেও টিন ও দস্তার দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উৎপাদন পরিস্থিতির এই পরিবর্তন বর্তমানে ধাতু বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য এক বিশেষ পর্যবেক্ষণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান মন্দাভাব ও দেশের সার্বিক রপ্তানি পরিস্থিতি কিছুটা নেতিবাচক থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্থাটি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এক শক্তিশালী মাইলফলক স্থাপন করেছে।
তথ্যমতে, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের সর্বমোট রপ্তানি আয় যেখানে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বেপজার আওতাধীন জোনগুলোর রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে দেশের মোট ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারই এসেছে বেপজা থেকে, যা জাতীয় রপ্তানির প্রায় ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বেপজাধীন শিল্পাঞ্চলগুলো তাদের উৎপাদন ও রপ্তানি ধারা অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি বেপজার জন্য ছিল বিশেষভাবে সাফল্যমণ্ডিত। এই সময়ে চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের ৩৬টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে মোট ৭১৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা বেপজার দীর্ঘ ইতিহাসে একক বছরে সর্বোচ্চ। এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্তত ৭৫ হাজার ৭৪৪ জন নাগরিকের নতুন কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত হবে।
পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও বেপজা অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে চালু থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশই প্রচলিত পোশাক শিল্পের বাইরে গিয়ে ব্লুটুথ হেডফোন, ড্রোন, ল্যাগেজ এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন করছে। বর্তমানে বেপজাধীন জোনগুলোতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে উন্নীত হয়েছে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। শ্রমবাজারের এই প্রবৃদ্ধি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেপজার দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতি আস্থা রেখে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের খাইশি গ্রুপ তাদের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রেক্ষিতে পুনরায় বড় অংকের বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ১২৯টি দেশে বেপজার উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজকে আন্তর্জাতিক মহলে উজ্জ্বল করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেপজার এই ঈর্ষণীয় সাফল্য দেশের শিল্পায়ন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিমা ও বস্ত্র খাতের শেয়ারে ব্যাপক দরপতন দেখা গেছে। তবে বড় মূলধনী ও ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে ইতিবাচক গতির কারণে দিনশেষে প্রধান মূল্যসূচক বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এদিন দাম কমার তালিকায় ছিল অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এবং আগের দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে বড় শেয়ারের ওপর ভর করে সূচক বাড়লেও লেনদেন কমেছে। এর মাধ্যমে চলতি সপ্তাহের চার দিনই দেশের উভয় বাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকল।
লেনদেনের শুরুতে ডিএসইতে বিপুল পরিমাণ শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচক এক পর্যায়ে ৫৫ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম ঘণ্টার পরেই বিমা ও বস্ত্র খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমতে শুরু করলে বাজারের চিত্রে পরিবর্তন আসে। এই খাতের নেতিবাচক হাওয়া অন্যান্য অনেক কোম্পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় দাম কমার তালিকাটি বেশ লম্বা হয়ে ওঠে। তবে বাজারের শীর্ষস্থানীয় ও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে বড় ধরণের পতন না ঘটায় সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানেই স্থির থাকে। দিনশেষে ডিএসইতে ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও বিপরীতে ২১৮টির দাম কমেছে এবং ৫১টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। বিশেষ করে বিমা খাতের ৪৪টি এবং বস্ত্র খাতের ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরে বড় পতন হয়েছে। বিপরীতে বাছাই করা ৩০টি ভালো কোম্পানির মধ্যে ২২টিরই দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৯১ পয়েন্ট বাড়লেও সেখানে লেনদেনের পরিমাণ পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় অনেকটা কমে ৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকায় নেমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০১টির দাম বেড়েছে এবং ১২৫টি প্রতিষ্ঠান দর হারিয়েছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের অনেক শেয়ারে সংশোধন চললেও বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে সূচকের এই উচ্চ অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে দেশটি এখনও শীর্ষ ৫০-এর তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ব্রয়লার উৎপাদনের তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৫৩তম। আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা, পোলট্রি খাদ্যের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য এবং খামারিদের পেশাদার প্রশিক্ষণের অভাব এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে ব্রয়লার মাংস উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব অনুযায়ী, দেশটি প্রায় ২১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাংস উৎপাদন করে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, যারা একই সাথে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারকও বটে। এছাড়াও চতুর্থ অবস্থানে রাশিয়া এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের এই অগ্রগতির পেছনে তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
আজকের আমাদের খাবারের টেবিলে থাকা বহুল পরিচিত ব্রয়লার বা ‘ফার্মের মুরগি’র পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনজ পাখি ‘রেড জাঙ্গলফাউল’ থেকেই আধুনিক গৃহপালিত মুরগির উৎপত্তি। কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ যখন বন্য মুরগিকে নিজেদের প্রয়োজনে পালন করতে শুরু করে, তখন শুরুতে এর উদ্দেশ্য কেবল খাদ্য ছিল না বরং মোরগ লড়াই বা ধর্মীয় আচারও এর সাথে যুক্ত ছিল। সময়ের আবর্তে মানুষ বুঝতে পারে যে মুরগি ডিম ও মাংসের বড় উৎস হতে পারে, তখনই শুরু হয় পরিকল্পিত ও বাছাইকৃত প্রজনন। আধুনিক ব্রয়লার মুরগি মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি জাত, যা উন্নত জেনেটিক নির্বাচন এবং বিজ্ঞানসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফসল।
বাণিজ্যিক পোলট্রি শিল্পের প্রসারে ১৯২৩ সালে আমেরিকার ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের এক কৃষকের ভুলবশত পাওয়া অতিরিক্ত বাচ্চার ঘটনাটি বড় ধরণের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীল মুরগির জাত তৈরির গবেষণা চূড়ান্ত রূপ পায়। বাংলাদেশে এই খাতের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে গবেষণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এবং আশির দশকে ‘আর্বার একরস’-এর মতো উন্নত ব্রয়লার লাইন আসার পর বেসরকারি উদ্যোগে শিল্পটি নতুন গতি লাভ করে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেশজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য খামার গড়ে ওঠে এবং ব্রয়লার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
ব্রয়লার মুরগি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে এগুলোতে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত বড় করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এর দ্রুত বৃদ্ধির মূল কারণ কোনো কৃত্রিম উপাদান নয় বরং বিশেষ জাত নির্বাচন, সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। বর্তমানে পোলট্রি শিল্প বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস হিসেবে দাঁড়িয়েছে এবং এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। খামারি হতে শুরু করে ফিড প্রস্তুতকারী ও পরিবহন শ্রমিক পর্যন্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাতে রূপ নিয়েছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশ অচিরেই বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে আরও উন্নতি করতে সক্ষম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যন্ত জরুরি চারটি সরঞ্জামের ওপর থেকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে যে, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এবং ব্যয়ভার কমিয়ে আনতে শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন বা এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) জারি করা হতে পারে। যেসব সরঞ্জামের ওপর এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ভাসকুলার স্টেন্ট বা হার্টের রিং, অক্সিজেনেটর, পেসমেকার এবং হার্ট ভালভ। বর্তমানে এই পণ্যগুলোর ওপর ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে।
এর আগে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় হার্টের রিং বা স্টেন্টের সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন যে, এই উদ্যোগের ফলে “প্রতিটি রিংয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে।” এনবিআরের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এসআরও জারির মাধ্যমে আমদানি ও বাজারজাতকরণ—উভয় স্তরেই ভ্যাট অব্যাহতি নিশ্চিত করা হবে, যার প্রত্যক্ষ সুবিধা পাবেন রোগীরা। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে যে, এই প্রজ্ঞাপনের খসড়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে দ্রুতই তা কার্যকর করা হবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার হার্টের রিং বা স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এই খাতের বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতি বছর দেশে ১ হাজার ২০০ হতে ১ হাজার ৫০০টি হার্ট ভালভ এবং প্রায় ২ হাজারটি পেসমেকারের চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমানে বাজারে মান ও আমদানিকারক ভেদে প্রতিটি স্টেন্টের দাম ২০ হাজার হতে ২ লাখ টাকা এবং পেসমেকারের দাম ৮০ হাজার হতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ভ্যাট অব্যাহতির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে হার্টের রিংয়ের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশের পরিবহন, লজিস্টিকস এবং সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিনিয়োগ ভবনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিকস উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহের নেতৃত্বে আসা এক প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে সৌদি উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রশংসা করেন। তিনি জানান যে, সৌদি আরবের নিজস্ব উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে বাংলাদেশের এই উদ্যোগগুলোর চমৎকার মিল রয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব বিশ্বজুড়ে একটি লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্যে কাজ করছে এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে বিনিয়োগে নিয়মিত উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশে নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে সৌদি কোম্পানিগুলো তা কাজে লাগাতে আগ্রহী এবং একই সাথে তারা সৌদি আরবে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে।
আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)-এর কার্যক্রমের প্রসঙ্গ। সৌদি উপমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এই টার্মিনালের কার্যক্রমের ৯৮ শতাংশের বেশি কর্মীই বাংলাদেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক লজিস্টিকস খাতে আরও ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ সন্ধানে তাঁর দেশ আগ্রহী। বৈঠকে বিডা, বেজা এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং উভয় পক্ষই বর্তমান ইতিবাচক গতিধারাকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক লাভজনক প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, "আলোচনায় এমন কয়েকটি খাত উঠে এসেছে, যেখানে সৌদি পক্ষের গভীর আগ্রহ রয়েছে এবং যা বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।" তিনি আরও যোগ করেন, "বিশেষ করে লজিস্টিকস ও সরবরাহ শৃঙ্খল—কোল্ড স্টোরেজ থেকে বন্দর পর্যন্ত—এবং আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।" বর্তমানে বিডা বেশ কয়েকটি সৌদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে যাতে তারা বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে পারে এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এই সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশে পরিচালিত সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের বিদ্যমান নীতিমালা আরও সহজ ও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশনার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এখন থেকে তাদের মূল কোম্পানি (প্যারেন্ট কোম্পানি), সহযোগী প্রতিষ্ঠান কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে আরও অনায়াসে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়ন নিশ্চিত হবে এবং দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হবে।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) ও হাইটেক পার্কে অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসব অঞ্চলের বাইরে পরিচালিত সকল বিদেশি মালিকানাধীন উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানও এই বিশেষ সুবিধা লাভ করবে। স্বল্পমেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত অঞ্চলের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে চলতি মূলধনের প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই সুদমুক্ত ঋণ নিতে পারবে। এছাড়া ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ অল-ইন-কস্ট হারে সুদযুক্ত ঋণ নেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব ঋণ মেয়াদের শেষে এককালীন পরিশোধযোগ্য হবে এবং প্রয়োজনে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত তা নবায়ন বা রোলওভার করা যাবে।
মধ্যমেয়াদী অর্থাৎ এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি ক্রয়, সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নির্মাণকাজের জন্য সর্বোচ্চ ৫ কোটি বা ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সুদযুক্ত ঋণ নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ বা ৫ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া পাঁচ বছরের অধিক সময়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণও নেওয়া যাবে, যেখানে বার্ষিক সুদের হার ৩ শতাংশের বেশি হবে না বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালায় বকেয়া বৈদেশিক ঋণকে কোম্পানির মূলধন বা ইক্যুইটিতে রূপান্তরেরও বিধান রাখা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও চীনে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও দেশটিতে ট্যাক্সি ও রাইডশেয়ারিং সেবার ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। মূলত চীনের শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ব্যবস্থা এবং ধীরগতির অর্থনীতির কারণে চালকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াই এই ভাড়া হ্রাসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও চীনে ট্যাক্সি ব্যবহারের হার গত বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত মে মাসেই দেশটিতে ৩০৫ কোটি বার মানুষ ট্যাক্সি বা রাইডশেয়ারিং সেবা গ্রহণ করেছেন। তেলের দাম বাড়ার ফলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের খরচ বাড়লেও বৈদ্যুতিক ট্যাক্সির ভাড়া কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই সেবার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতির কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অনেক মানুষ এখন জীবিকার তাগিদে রাইডশেয়ারিং বা ট্যাক্সি চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। চালকের সংখ্যা হঠাৎ বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিংয়ের একজন রাইডশেয়ারিং চালক জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে সেখানে ভাড়া প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমে গেছে। এই প্রতিযোগিতার ফলে চালকদের আয় কমলেও যাত্রীদের জন্য যাতায়াত অনেক সস্তা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখছে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈদ্যুতিকরণ। বর্তমানে চীনের ১৩ লাখ ট্যাক্সির প্রায় অর্ধেকই বৈদ্যুতিক এবং বড় বড় শহরগুলোতে এই হার প্রায় শতভাগ। চীনের প্রধান রাইডশেয়ারিং অ্যাপ ‘দিদি’র বহরে বর্তমানে ৮০ লাখের বেশি পরিবেশবান্ধব গাড়ি রয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ শতাংশই সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক। এর ফলে জ্বালানি তেলের ওপর দেশটির নির্ভরশীলতা অনেক কমেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে চীনে পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার গত বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ১৪ শতাংশ কমেছে। এমনকি গত জুন মাসে চীনের তেল আমদানিও ৪১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করছে। গ্রিনপিস পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের ট্যাক্সি ও রাইডশেয়ারিং খাতের ৯০ শতাংশ যাতায়াতই হবে বৈদ্যুতিক গাড়ির মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট চীনকে দীর্ঘমেয়াদে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদ্যুতিক যানের দিকে আরও দ্রুত ধাবিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ছাড় ও বিশেষ কর সুবিধা প্রদানের ফলে বাংলাদেশের উদীয়মান বৈদ্যুতিক যান (ইভি) শিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে ঘোষিত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো এখন দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন অপারেটররা এই খাতকে বাংলাদেশের পরবর্তী বৃহৎ অবকাঠামোগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।
বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদনের জন্য বিশেষ কর প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া চার্জিং যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ছাড় এবং চার্জিং স্টেশন ব্যবসায়ীদের জন্য ১০ বছরের আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাব খসড়া নীতিমালায় রাখা হয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১,২০০টি বাণিজ্যিক ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ৩২টি বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হলেও সচল রয়েছে মাত্র ৯টি, যা ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে অবস্থিত। বিপরীতে ভারত ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো চার্জিং অবকাঠামোতে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে।
বর্তমানে পাইপলাইনে থাকা ৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ মূলত ইভি উৎপাদন, সংযোজন এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড মিরসরাইয়ে ইভি কারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ১,৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। নাসির গ্রুপ এবং আকিজ মোটরস প্রত্যেকে ৫০০ কোটি টাকা এবং র্যানকন মোটরস ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া রানার অটোমোবাইলস বৈশ্বিক জায়ান্ট বিওয়াইডি-র সাথে মিলে ২৬০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রাণ-আরএফএল এবং ওয়ালটন গ্রুপও ইলেকট্রিক মোবিলিটি খাতে ৪০০ কোটি টাকার সম্মিলিত বিনিয়োগ বরাদ্দ করেছে।
তবে এই শিল্প প্রসারের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বাণিজ্যিক লাভজনকতা। একটি বাণিজ্যিক ডিসি ফাস্ট-চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। বিনিয়োগকারীদের মূল উদ্বেগ হলো, রাস্তায় পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক যান না নামলে এই বিশাল বিনিয়োগের মুনাফা তুলে আনা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হবে। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চলাচল করলেও নিবন্ধিত যাত্রীবাহী ইভির সংখ্যা এখনও খুবই নগণ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টেকসই ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কেবল বেসরকারি বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সরকারের পক্ষ হতে অবকাঠামো নির্মাণে নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া রাজধানীর গণপরিবহন আধুনিকীকরণে ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস নামানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই খাতের সফলতার জন্য অভিন্ন কারিগরি মানদণ্ড, শক্তিশালী গ্রিড সংযোগ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানটি কোনোমতে ধরে রাখলেও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে আশঙ্কাজনক ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। যখন অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য জোরালো করছে, তখন বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে তার গতি হারাচ্ছে।
ডব্লিউটিও-এর তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে এই রপ্তানি বৃদ্ধির হার মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অথচ এই সময়ে বিশ্বজুড়ে পোশাক রপ্তানিতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বৈশ্বিক চাহিদার এমন ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এক শতাংশের নিচে থাকা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাসেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীন, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি কমেছে। তবে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো ঈর্ষণীয় উন্নতি করেছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সাথে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয়ের ব্যবধান কমে মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া কম্বোডিয়া ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশের রেকর্ড প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতও যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮৩, ৫ দশমিক ৭৯ এবং ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই মন্থর গতির কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে, যা দেশটিকে বাংলাদেশের অত্যন্ত কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে শীর্ষে থাকা চীনের অংশীদারিত্ব কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া এই বাজার মূলত ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো দখল করে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যখন তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগী, তখন বাংলাদেশ নতুন ক্রয়াদেশ পেতে লড়াই করছে। বর্তমানে দেশের পোশাক খাত তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গ্রাফে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ২০২২ সালে রেকর্ড ২৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও পরের বছর তা সংকুচিত হয়ে ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৪ সালে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি আবারও এক শতাংশের নিচে নেমে আসায় এই খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, যদি দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না যায়, তবে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে দ্বিতীয় স্থানের লড়াই এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন রূপ নিয়েছে।
টানা কয়েক দিনের ধারাবাহিক উত্থানে দেশের শেয়ারবাজার বর্তমানে দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক এবং লেনদেনের পরিমাণ উভয়ই দীর্ঘ সময়ের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকতার বজায় রেখে মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১৯৯টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে ১৩৭টির দাম কমেছে এবং ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। দাম বাড়ার তালিকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থাকায় এদিন ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৯১১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের এই অবস্থান গত দুই বছর চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ সূচকটি ৫ হাজার ৯৪২ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছিল।
মূল্যসূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের গতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। মঙ্গলবার বাজারটিতে ১ হাজার ৬৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা সোমবারের তুলনায় ২৩২ কোটি ১৪ লাখ টাকা বেশি। গত সোমবার লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর আগে গত রোববার লেনদেনের পরিমাণ ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল, যা ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড গড়েছিল। এছাড়া ডিএসইর শরিয়াহ সূচক এদিন ১০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২০৭ এবং বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ২২৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) এদিন ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৭টির দাম বেড়েছে এবং ৮৯টির দর কমেছে। বাকি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম দিন শেষে অপরিবর্তিত ছিল।