তৈরি পোশাক খাতের সামগ্রিক রপ্তানি আয় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ বাড়লেও অপ্রচলিত বাজারে আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত অপ্রচলিত বাজার থেকে পোশাক পণ্যের রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১৮ কোটি ডলার, যা একই সময়ে আগের বছরে ছিল ৭৬৮ কোটি ৯ লাখ ডলার। মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ এসেছে নতুন বাজার থেকে।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাকের পণ্যের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ২৬৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
অপ্রচলিত বাজারের মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে জাপান থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে জাপান থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১৪৫ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। সেখান থেকে তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরে ছিল ১০৬ কোটি ডলার।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকলেও রাশিয়া থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার, যা আগের বছরে ছিল ৪০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক অংশীদার ভারতে পোশাক পণ্যের রপ্তানি কমেছে ২৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ৭৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরে ছিল ৯৫ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের এক নম্বর বাণিজ্যিক অংশীদার চীনে রপ্তানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। আয় হয়েছে ৩১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, যা আগের বছরে ছিল ২৫ কোটি ২ লাখ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে রপ্তানি বেড়েছে ৫৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ সময়ে আয় হয়েছে ২৭ কোটি ৩ লাখ ডলার, যা গত বছর ছিল ১৭ কোটি ২ লাখ ডলার কোরিয়ায় তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ১১ মাসে আয় হয়েছে ৫৭ কোটি ২৮ লাখ ডলার। গত বছর পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৫০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৪৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে। অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি আয় ইতিবাচক থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ। জুলাই-মে সময়ে আয় হয়েছে ২ হাজার ১৬৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। প্রথম ১১ মাসে আয় হয়েছে ৭৪৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। গত বছর একই সময় আয় হয়েছিল ৭৭৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। যুক্তরাজ্যে তৈরি পোশাক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আয় হয়েছে ৫১৬ কোটি ডলার, যা গত বছর ছিল ৪৫৯ কোটি ডলার।
পোশাক পণ্যের রপ্তানি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘প্রচলিত বাজারের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমাতে আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। ফলে নতুন বাজারে রপ্তানির হিস্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং প্রচলিত বাজারের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হারও বেশি।’ বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছি না। সম্ভাবনা অনুযায়ী আমরা রপ্তানি আয় বাড়াতে পারছি না। এক্ষেত্রে সরকারকে অশুল্ক বাধা দূর করা এবং রপ্তানি সহজীকরণের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। ভারত একটি বড় বাজার। কারণ এর রয়েছে অনেক বড় জনসংখ্যা। সেখানে যদি আমরা খুব সামান্য পরিমাণও মার্কেট ধরতে পারি সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন হবে। সুতরাং ভারতসহ সম্ভাবনাময় সব অপ্রচলিত বাজারগুলোর প্রতি সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে এবং বাণিজ্যিক রিংগুলো কাজে লাগাতে হবে।
দেশের পুঁজিবাজারে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হলেও উভয় বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এদিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে আসায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৯২৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে, যা বাজারকে ইতিবাচক ধারায় ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
প্রধান সূচকের পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অন্য দুটি সূচকেও বুধবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ পয়েন্ট বেড়ে যথাক্রমে ১ হাজার ২০৮ ও ২ হাজার ২৪২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে সূচকের এই ইতিবাচক অগ্রগতির দিনে ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৫১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে। এই অংকটি আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৩৬ কোটি টাকা কম, কারণ এর আগের দিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সর্বমোট ৪০০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে সূচক বাড়লেও অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দরপতনের শিকার হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে মাত্র ১৩১টি কোম্পানির, বিপরীতে দর হারিয়েছে ২১৮টি প্রতিষ্ঠান এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫১টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের মূল্য। এদিন লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় থাকা প্রধান ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিএসআরএম স্টিল, ব্র্যাক ব্যাংক, মালেক স্পিনিং, লাফার্জহোলসিম, বিএসসি, এসিআই, রবি, বেক্সিমকো ফার্মা, লাভেলো আইসক্রিম ও সিটি ব্যাংক।
অন্যদিকে, দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচক বাড়ার পাশাপাশি লেনদেন কমার একই চিত্র দেখা গেছে। বুধবার সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৯১ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৮৬৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন সিএসইতে হাতবদল হওয়া ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ারদর বেড়েছে ১০১টির, কমেছে ১২৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে বুধবার মোট ৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৪৬ কোটি টাকা কম; কারণ আগের কার্যদিবসে সিএসইতে ৭৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছিল।
দেশের টেক্সটাইল শিল্পের টেকসই কার্যক্রম নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমানো এবং তীব্র আর্থিক সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ দফা নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল এই প্রস্তাবগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ বা এনপিএল বৃদ্ধি রোধ, শিল্পে তারল্য ফিরিয়ে আনা এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যাংক ঋণের কার্যকর সুদহার পুনরায় ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। এছাড়া এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) সম্প্রসারণ এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
গভর্নরের কাছে দেওয়া চিঠিতে বিটিএমএ উল্লেখ করেছে যে, বর্তমানে তাদের আওতাভুক্ত এক হাজার ৮৫০টি স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিল পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত থেকে এবং এ খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মূল্য সংযোজন হয়। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও কাঁচামালের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে এই খাতের অধিকাংশ মিল বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটে নিপতিত। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে একদিকে যেমন খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিও মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণের লক্ষ্যে জাতীয় শিল্পনীতি-২০২২ এর আলোকে বিটিএমএ তাদের ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বন্ধ মিল ও চলতি মূলধনের প্রাক-অনুমোদন ঋণসুবিধার সময়সীমা বৃদ্ধি, জিটিএফ তহবিলের আকার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (জেডএলডি) প্ল্যান্টকে বিশেষ অর্থায়নের আওতায় আনা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসা ও আর্থিক পুনর্গঠনের আবেদন দাখিলের সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় দেশীয় মিলগুলোর সরবরাহ করা সুতা ও ফেব্রিকের বিল সর্বোচ্চ সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ঋণের শ্রেণিকরণে ওভারডিউ কিস্তির সংখ্যা বর্তমান তিনটির পরিবর্তে আগের মতো ছয়টিতে নির্ধারণ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ইডিএফের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সীমা ২০ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে গত ১২ মাসে প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের ৬৫ শতাংশ নির্ধারণ করা এবং ইডিএফ ঋণের সুদহার পুনরায় ২ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চলমান জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীদের এলসি ও বিল নিষ্পত্তিতে সৃষ্ট বাধা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল দৃঢ়ভাবে জানান যে, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিমুখী (ডিমড এক্সপোর্ট) শিল্পের জন্য প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং বিশেষায়িত অঞ্চলের জন্য নগদ সহায়তা পুনর্বহালসহ এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন বিক্রিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। বৈশ্বিক বাজারে স্মার্টফোন বিক্রির এই হার বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে, যা সর্বশেষ ২০১৩ সালে দেখা গিয়েছিল। মূলত মেমোরি চিপ সংকটের মারাত্মক প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে গোটা মোবাইল ফোন শিল্পে। প্রযুক্তি খাতের সার্বিক উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় এই সংকট এমন এক বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার ফলে স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে চরম ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
প্রখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্মার্টফোন শিল্পে এই মুহূর্তে এক বড় ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিদায়ী এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ কমে গেছে। বিক্রির এই নিম্নমুখী প্রবণতার কারণেই মূলত দ্বিতীয় প্রান্তিকের বৈশ্বিক সরবরাহ বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে, যা মোবাইল ফোন শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকরা এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মেমোরি চিপের তীব্র সংকটকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, বাজারে যন্ত্রাংশের এই ভয়াবহ ঘাটতির কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীর্ষস্থানীয় থেকে শুরু করে মাঝারি সারির স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ডিভাইসগুলো তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে র্যাম এবং ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে একদিকে যেমন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারাও নতুন স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করছেন।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ এই মেমোরি চিপ সংকটের পেছনের মূল কারণ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির আকস্মিক ও বিপুল উত্থানকে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের বড় বড় মেমোরি চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সাধারণ ইলেকট্রনিকস পণ্য বা স্মার্টফোনের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এআই ডেটা সেন্টারের বিশাল চাহিদাকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে বিশ্বজুড়েই এই চিপের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের বরাত দিয়ে জানা যায় যে, এআই প্রযুক্তির দিকে উৎপাদকদের এই আকস্মিক ঝুঁকে পড়ার কারণেই মূলত স্মার্টফোন বাজার বর্তমানের এই চরম সংকটকাল পার করছে।
বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই স্বর্ণের দামে বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার কারণেই এই নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার স্বনামধন্য বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বুধবার লেনদেন শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের দাম ক্রমশ কমতে থাকে, অথচ ঠিক এর আগের কার্যদিবসেই এই মূল্যবান ধাতুটির দাম ২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে বাজার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্যমতে, বুধবার স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ২৫ দশমিক ১২ ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তিতে থাকা গোল্ড ফিউচার্সের দামও ১ শতাংশ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩০ দশমিক ৪০ ডলারে। অথচ এর আগের দিন মঙ্গলবার স্বর্ণের বাজারে বেশ ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসের মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে কমে আসার তথ্য প্রকাশের পর সেদিন স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১০০ দশমিক ৪৯ ডলারে উঠেছিল, যা ছিল গত দুই সপ্তাহের মধ্যে বাজারের সর্বোচ্চ দর। কিন্তু একদিনের ব্যবধানেই সেই ঊর্ধ্বগতি মুখ থুবড়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বর্ণের দিকে কম আগ্রহ দেখান, কারণ স্বর্ণ থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। বর্তমান বাজারে ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং টানা তিন কার্যদিবস ধরে তেলের দাম বেড়েই চলেছে। তেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও বাড়ে, যার ফলে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচুতে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ওআন্ডার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক কেলভিন অং জানান, বাজার এখন মূল্যস্ফীতির ইতিবাচক তথ্যের চেয়ে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে, আর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্বর্ণের দামের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) শীর্ষ কর্মকর্তারাও ইতোমধ্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এখনই সুদের হার কমানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশের মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাদের আরও কিছু তথ্য ও সময় প্রয়োজন। এরই মধ্যে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনকারী মূল্যসূচক বা পিপিআই প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে, যা বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে বিশ্ববাজারে কেবল স্বর্ণই নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর ক্ষেত্রেও দরপতন দেখা গেছে; স্পট সিলভারের দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, তবে এর ব্যতিক্রম হিসেবে প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শেয়ারের দাম ও লেনদেনে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রেইনউইক যজ্ঞেশ্বরের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) বা ব্যবসায়িক অগ্রগতির ঘোষণা ছাড়াই সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের অস্বাভাবিক আচরণ স্টক এক্সচেঞ্জের নজরে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার সকালে কোম্পানিটির শেয়ারের লেনদেন সাময়িক বন্ধ করার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের অবগত করার জন্য এই সিদ্ধান্তটির কথা ডিএসইর ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রেইনউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারের এই অভাবনীয় উত্থান কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, বর্তমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিংবা মৌলভিত্তির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ডিএসইর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১৭ জুন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৫৩৭ দশমিক ৩০ টাকা, যা এক মাসের ব্যবধানে ১৫ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭২ দশমিক ৪০ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে ৪৩৪ দশমিক ৭০ টাকা বা প্রায় ৮০ দশমিক ৯০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে।
শেয়ারদরের এমন অস্বাভাবিক উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ হিসেবে ডিএসই চূড়ান্তভাবে শেয়ারটির লেনদেন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এর আগে গত ৮ জুলাই শেয়ারের এই অস্বাভাবিক দর ও লেনদেন বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ জানতে চেয়ে কোম্পানিটির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তলব করে চিঠি পাঠিয়েছিল ডিএসই। সেই চিঠির জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বর্তমানে তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যা শেয়ারের দাম বা লেনদেনের মাত্রাকে এতটা প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থানে এমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেনি যার কারণে শেয়ারের দাম এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে পারে।
স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, কোম্পানিটির শেয়ারের এই আকস্মিক দরবৃদ্ধির সঙ্গে তাদের বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কোনো সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো গোপন তথ্য পাচার, সমন্বিত লেনদেন বা বাজার কারসাজির মতো কোনো বেআইনি ঘটনার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে তদন্তের স্বার্থে কোম্পানির কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অতিরিক্ত তথ্যও তলব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, রেইনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড ১৯৮৯ সালে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক (মেরিটাইম) খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ সৌদি আরব। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকস সাপ্লাই চেইনের মতো অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের এক নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই বিপুল বিনিয়োগ সম্ভাবনার রূপরেখা নিয়ে গত বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বিনিয়োগ ভবনে সফররত সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিকস বিষয়ক উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহ-এর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগের সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে আলোচনাকালে সৌদি উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহ বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে গৃহীত সরকারি উদ্যোগগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের এই ইতিবাচক নীতিগত অবস্থান সৌদি আরবের নিজস্ব অর্থনৈতিক রূপকল্পের সঙ্গে দারুণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উপমন্ত্রী জানান, সৌদি আরব বর্তমানে নিজেকে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং তাদের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সৌদি কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি, সৌদি আরবে ব্যবসা করতে আগ্রহী বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে সফল সৌদি বিনিয়োগের একটি চমৎকার উদাহরণ টানতে গিয়ে উপমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল’ (আরএসজিটি)-এর চলমান সফল কার্যক্রমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি অত্যন্ত সন্তোষের সঙ্গে জানান যে, বর্তমানে এই টার্মিনালে কর্মরত জনবলের ৯৮ শতাংশেরও বেশি কর্মীই বাংলাদেশি নাগরিক, যা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখছে। পতেঙ্গা টার্মিনালের এই অভাবনীয় সফলতার সূত্র ধরেই মূলত বাংলাদেশের সামুদ্রিক লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরএসজিটি এখন আরও নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে, যা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক শেষে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী আলোচনার সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কের মতো কিছু নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ খাতে সৌদি আরবের এই গভীর আগ্রহ বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এসব খাতের পাশাপাশি দেশের আর্থিক সেবা খাতেও সৌদি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের চমৎকার পরিবেশ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সৌদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু হয়েছে, যাতে এই আলোচনাগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়। দুই দেশের প্রতিনিধিরাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এই পারস্পরিক লাভজনক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে তা আগামী দিনে দুই দেশের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও বেশি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে একটি বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আইপিও ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বিনিয়োগকারীবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় নীতি ও আইন সংস্কারের বিষয়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিএসইসি কার্যালয়ে কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশীজনদের দেওয়া মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতে আইপিও প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান এবং দ্রুত আইনগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে দৃঢ় আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিএসইসি’র পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫-এর আলোকে আইপিও-সংক্রান্ত আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতকরণ, নিরীক্ষা কার্যক্রম এবং আইপিও আবেদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। আইপিও প্রাইসিং, পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটির তালিকাভুক্তি, ডাইরেক্ট লিস্টিং এবং রাইট ইস্যুসহ পুঁজিবাজারের বেশ কিছু সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরীক্ষক (অডিটর), ইস্যু ম্যানেজার এবং ইস্যুয়ারদের ভূমিকা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার জায়গাটি আরও কীভাবে সুদৃঢ় করা যায়, সে বিষয়েও সভায় বিশদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই মতবিনিময় সভায় বিএসইসি’র চেয়ারম্যান ছাড়াও সংস্থার তিন কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব এবং মো. নাফিজ আল তারিক উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরাও এই সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা সভায় তাঁদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি), বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ), সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইস্যু ম্যানেজারের প্রধান নির্বাহী ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে পুঁজিবাজার সংস্কারে নিজেদের সমর্থন ও সুপারিশ প্রদান করেন।
অংশীজনদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত এই সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা আইপিও প্রক্রিয়ায় বর্তমানে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংস্কারের বিষয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করেন। বিএসইসি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে জানিয়েছে যে, সভায় উপস্থাপিত সকল মতামত ও সুপারিশ কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করতে এবং আইপিও প্রক্রিয়াকে সত্যিকারের কার্যকর, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগকারীবান্ধব একটি ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও যুগোপযোগী আইনগত সংস্কারের সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে কমিশন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি) প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে এই খাতে নিয়োজিত প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কর্মীর চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতির অভাবে আসন্ন এই বিশাল ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বুধবার (১৫ জুলাই) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সময়োপযোগী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল ওয়েবিনার আয়োজনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন ও মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই মহূর্তেই অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর আকস্মিক পরিবর্তন দেশের শ্রমবাজারে নতুন করে এক প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। সিপিডির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল ২০২৪ সালেই দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই ছিলেন নারী কর্মী। ওয়েবিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, বর্তমানে বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং নীতি নির্ধারকদের এই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। উত্তরাধিকার সূত্র এবং বাজার ও কর্মসংস্থানের ভেতরের কাঠামোগত অমিল, দক্ষতার চরম অভাব এবং ভৌগোলিক বিভিন্ন কারণে এমন সংকট তৈরি হচ্ছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বজুড়ে এআই ও অটোমেশনের বিশাল বিপ্লব। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও এর প্রভাবে প্রায় ৯০ লাখ চাকরি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বর্তমানে প্রায় ৮১ লাখে স্থির হয়ে আছে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও এর সিংহভাগই মূলত অনিরাপদ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের আওতাভুক্ত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার এক বিশাল ব্যবধান বা অমিল রয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তির হার ২০ শতাংশেরও কম, আর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। সিপিডি তাদের বিশ্লেষণে ২৭টি জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনশীল উপাদান মূল্যায়ন করে ২০৩৫ সালের জন্য শ্রমবাজারের চারটি সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করেছে। তবে সব পরিস্থিতিতেই পাঁচটি বিষয় অভিন্ন থাকবে বলে জানানো হয়েছে, যার মধ্যে ডিজিটালায়ন অপরিবর্তনীয় হওয়া, কর্মসংস্থান উচ্চমূল্যের সেবাখাতে স্থানান্তরিত হওয়া, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার পিছিয়ে থাকা, বৈশ্বিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকা এবং সফলতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করার বিষয়গুলো অন্যতম।
বিদ্যমান নীতিমালায় মূলত চারটি বড় ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য দেশে কোনো সমন্বিত আইনি কাঠামো নেই, অটোমেশনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি, দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন অনেক কম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়নের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এসব বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। শিল্পের বাস্তব চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, জীবনব্যাপী পুনঃদক্ষতা বা রিস্কিলিং কর্মসূচি চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে শিল্প প্রণোদনাকে সরাসরি যুক্ত করা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় শ্রমবাজার তথ্য ব্যবস্থা (এলএমআইএস) গড়ে তোলা, প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল গ্রহণ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধিকে টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা অত্যন্ত কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম (ইজিএ) তাদের আল তাউইলাহ পরিশোধনাগারটি পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। এই খবরের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালুমিনিয়ামের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ধাতুটির উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার এটি একটি শক্তিশালী সংকেত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস রেকর্ডার-এ এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি অ্যালুমিনিয়ামের বাজার আদর্শ মূল্য ১ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রতি টন ৩ হাজার ১৪৩ ডলার ৫০ সেন্টে অবস্থান করছে। যদিও সপ্তাহের শেষ লেনদেনের শুরুতে দরপতন হয়েছিল, তবে সামগ্রিকভাবে সাপ্তাহিক হিসেবে এর দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহের ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতার অবসান ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী ধাতু বিক্রি করে দেওয়ায় এবং ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশ হতে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রত্যাশায় বাজারে এই প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ইজিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের এই রিফাইনারির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ তা পূর্ণমাত্রায় ফিরে আসবে। তবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এখনও বড় ধরণের ঝুঁকি বিরাজ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান সামরিক উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি এখনও বেশ অনিশ্চিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এছাড়া লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জের নিবন্ধিত গুদামগুলোতে বর্তমানে অ্যালুমিনিয়ামের মজুত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা ধাতুটির তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিল্প ধাতুর বাজারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তামার দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন ১৩ হাজার ৪৯৫ ডলার ৫০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নিকেলের দাম দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে, যার কারণ হিসেবে প্রধান উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সালফার সংকটের কথা বলা হয়েছে। সিসার দাম সামান্য বাড়লেও টিন ও দস্তার দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উৎপাদন পরিস্থিতির এই পরিবর্তন বর্তমানে ধাতু বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য এক বিশেষ পর্যবেক্ষণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান মন্দাভাব ও দেশের সার্বিক রপ্তানি পরিস্থিতি কিছুটা নেতিবাচক থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার পাশাপাশি সংস্থাটি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এক শক্তিশালী মাইলফলক স্থাপন করেছে।
তথ্যমতে, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের সর্বমোট রপ্তানি আয় যেখানে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বেপজার আওতাধীন জোনগুলোর রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে দেশের মোট ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারই এসেছে বেপজা থেকে, যা জাতীয় রপ্তানির প্রায় ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বেপজাধীন শিল্পাঞ্চলগুলো তাদের উৎপাদন ও রপ্তানি ধারা অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি বেপজার জন্য ছিল বিশেষভাবে সাফল্যমণ্ডিত। এই সময়ে চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের ৩৬টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের লক্ষ্যে বেপজার সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে মোট ৭১৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা বেপজার দীর্ঘ ইতিহাসে একক বছরে সর্বোচ্চ। এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্তত ৭৫ হাজার ৭৪৪ জন নাগরিকের নতুন কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত হবে।
পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও বেপজা অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে চালু থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশই প্রচলিত পোশাক শিল্পের বাইরে গিয়ে ব্লুটুথ হেডফোন, ড্রোন, ল্যাগেজ এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন করছে। বর্তমানে বেপজাধীন জোনগুলোতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে উন্নীত হয়েছে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। শ্রমবাজারের এই প্রবৃদ্ধি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেপজার দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতি আস্থা রেখে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের খাইশি গ্রুপ তাদের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রেক্ষিতে পুনরায় বড় অংকের বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ১২৯টি দেশে বেপজার উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজকে আন্তর্জাতিক মহলে উজ্জ্বল করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বেপজার এই ঈর্ষণীয় সাফল্য দেশের শিল্পায়ন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিমা ও বস্ত্র খাতের শেয়ারে ব্যাপক দরপতন দেখা গেছে। তবে বড় মূলধনী ও ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে ইতিবাচক গতির কারণে দিনশেষে প্রধান মূল্যসূচক বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এদিন দাম কমার তালিকায় ছিল অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এবং আগের দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে বড় শেয়ারের ওপর ভর করে সূচক বাড়লেও লেনদেন কমেছে। এর মাধ্যমে চলতি সপ্তাহের চার দিনই দেশের উভয় বাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকল।
লেনদেনের শুরুতে ডিএসইতে বিপুল পরিমাণ শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচক এক পর্যায়ে ৫৫ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম ঘণ্টার পরেই বিমা ও বস্ত্র খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমতে শুরু করলে বাজারের চিত্রে পরিবর্তন আসে। এই খাতের নেতিবাচক হাওয়া অন্যান্য অনেক কোম্পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় দাম কমার তালিকাটি বেশ লম্বা হয়ে ওঠে। তবে বাজারের শীর্ষস্থানীয় ও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে বড় ধরণের পতন না ঘটায় সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানেই স্থির থাকে। দিনশেষে ডিএসইতে ১৩১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও বিপরীতে ২১৮টির দাম কমেছে এবং ৫১টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। বিশেষ করে বিমা খাতের ৪৪টি এবং বস্ত্র খাতের ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরে বড় পতন হয়েছে। বিপরীতে বাছাই করা ৩০টি ভালো কোম্পানির মধ্যে ২২টিরই দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৯১ পয়েন্ট বাড়লেও সেখানে লেনদেনের পরিমাণ পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় অনেকটা কমে ৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকায় নেমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০১টির দাম বেড়েছে এবং ১২৫টি প্রতিষ্ঠান দর হারিয়েছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের অনেক শেয়ারে সংশোধন চললেও বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে সূচকের এই উচ্চ অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে দেশটি এখনও শীর্ষ ৫০-এর তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ব্রয়লার উৎপাদনের তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৫৩তম। আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা, পোলট্রি খাদ্যের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য এবং খামারিদের পেশাদার প্রশিক্ষণের অভাব এই খাতে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে ব্রয়লার মাংস উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব অনুযায়ী, দেশটি প্রায় ২১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাংস উৎপাদন করে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, যারা একই সাথে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারকও বটে। এছাড়াও চতুর্থ অবস্থানে রাশিয়া এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের এই অগ্রগতির পেছনে তাদের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
আজকের আমাদের খাবারের টেবিলে থাকা বহুল পরিচিত ব্রয়লার বা ‘ফার্মের মুরগি’র পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনজ পাখি ‘রেড জাঙ্গলফাউল’ থেকেই আধুনিক গৃহপালিত মুরগির উৎপত্তি। কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ যখন বন্য মুরগিকে নিজেদের প্রয়োজনে পালন করতে শুরু করে, তখন শুরুতে এর উদ্দেশ্য কেবল খাদ্য ছিল না বরং মোরগ লড়াই বা ধর্মীয় আচারও এর সাথে যুক্ত ছিল। সময়ের আবর্তে মানুষ বুঝতে পারে যে মুরগি ডিম ও মাংসের বড় উৎস হতে পারে, তখনই শুরু হয় পরিকল্পিত ও বাছাইকৃত প্রজনন। আধুনিক ব্রয়লার মুরগি মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি জাত, যা উন্নত জেনেটিক নির্বাচন এবং বিজ্ঞানসম্মত খাদ্য ব্যবস্থাপনার ফসল।
বাণিজ্যিক পোলট্রি শিল্পের প্রসারে ১৯২৩ সালে আমেরিকার ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের এক কৃষকের ভুলবশত পাওয়া অতিরিক্ত বাচ্চার ঘটনাটি বড় ধরণের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীল মুরগির জাত তৈরির গবেষণা চূড়ান্ত রূপ পায়। বাংলাদেশে এই খাতের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে গবেষণামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এবং আশির দশকে ‘আর্বার একরস’-এর মতো উন্নত ব্রয়লার লাইন আসার পর বেসরকারি উদ্যোগে শিল্পটি নতুন গতি লাভ করে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেশজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য খামার গড়ে ওঠে এবং ব্রয়লার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
ব্রয়লার মুরগি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে এগুলোতে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত বড় করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এর দ্রুত বৃদ্ধির মূল কারণ কোনো কৃত্রিম উপাদান নয় বরং বিশেষ জাত নির্বাচন, সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। বর্তমানে পোলট্রি শিল্প বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস হিসেবে দাঁড়িয়েছে এবং এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। খামারি হতে শুরু করে ফিড প্রস্তুতকারী ও পরিবহন শ্রমিক পর্যন্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাতে রূপ নিয়েছে। সঠিক নীতিগত সহায়তা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশ অচিরেই বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে আরও উন্নতি করতে সক্ষম হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যন্ত জরুরি চারটি সরঞ্জামের ওপর থেকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে যে, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এবং ব্যয়ভার কমিয়ে আনতে শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন বা এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) জারি করা হতে পারে। যেসব সরঞ্জামের ওপর এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ভাসকুলার স্টেন্ট বা হার্টের রিং, অক্সিজেনেটর, পেসমেকার এবং হার্ট ভালভ। বর্তমানে এই পণ্যগুলোর ওপর ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য রয়েছে।
এর আগে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় হার্টের রিং বা স্টেন্টের সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন যে, এই উদ্যোগের ফলে “প্রতিটি রিংয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে।” এনবিআরের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন এসআরও জারির মাধ্যমে আমদানি ও বাজারজাতকরণ—উভয় স্তরেই ভ্যাট অব্যাহতি নিশ্চিত করা হবে, যার প্রত্যক্ষ সুবিধা পাবেন রোগীরা। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে যে, এই প্রজ্ঞাপনের খসড়াটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে দ্রুতই তা কার্যকর করা হবে।
খাত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার হার্টের রিং বা স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয় এবং এই খাতের বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতি বছর দেশে ১ হাজার ২০০ হতে ১ হাজার ৫০০টি হার্ট ভালভ এবং প্রায় ২ হাজারটি পেসমেকারের চাহিদা তৈরি হয়। বর্তমানে বাজারে মান ও আমদানিকারক ভেদে প্রতিটি স্টেন্টের দাম ২০ হাজার হতে ২ লাখ টাকা এবং পেসমেকারের দাম ৮০ হাজার হতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ভ্যাট অব্যাহতির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে হার্টের রিংয়ের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।