অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সহায়তায় তার ইমেজ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ বাজার সুবিধা (জিএসপি) ফিরে পেতে চান ব্যবসায়ীরা। নিষেধাজ্ঞা আরোপের এক দশক পেরোলেও এখনও জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে আনতে পারেনি বাংলাদেশ।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করেন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন করে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া প্রসেঙ্গ পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এটা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তিনি সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি। তার ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগায়ি আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা পেতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘এলসি খুলতে ছয়টা ব্যাংক মার্জিন চাচ্ছে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা গভর্নরের সঙ্গে কথা বলবেন। নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। কারখানার নিরাপত্তা জরুরি। তবে এটা সমাধান হয়ে যাবে। এখন কোনো ঝামেলা নেই। বায়ারদের একটা আস্থার অভাব ছিল এটাও কেটে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বায়ারদের সঙ্গে কথা বলবেন, এটা বড় পাওয়া।’
বর্তমানে ব্যবসার হালাচাল প্রসঙ্গে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘দেশ আকস্মিক বন্যার কবলে পড়েছে। আমাদের শত শত ট্র্যাক মিরসরাই এলাকা পড়ে আছে। এগুলোতে নিরাপত্তার সমস্যা আছে। সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বন্যার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামে সমস্যা হচ্ছে। তাই নারায়ণগঞ্জের পানগাও পোর্ট দ্রুত উন্নয়ন বা চালু করা দরকার।’
তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য প্রচলিত টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার (টিটি) ডিসকাউন্টিং সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ইতিপূর্বে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের জরুরি স্বল্পমেয়াদি তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত চলতি হিসাবের বিপরীতে লিয়েন রেখে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারতো। এখন থেকে ব্যাংকগুলো আর এই সুবিধা পাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সার্কুলারে উল্লেখ করেছে যে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন কল মানি মার্কেট, রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) এবং আন্তঃব্যাংক ঋণের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারছে। ফলে দীর্ঘদিনের পুরনো এই টিটি ডিসকাউন্টিং সুবিধাটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর অপরিহার্য বলে মনে করছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে এই টিটি ডিসকাউন্টিং সুবিধার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে তা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। এই বাস্তবতার নিরিখে গত ১ জুলাই থেকেই এই সুবিধা বাতিল বলে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়েছে। মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার সুশৃঙ্খল কাঠামো বজায় রাখতেই এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে এখন থেকে তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্য আরও গতিশীল বাজারভিত্তিক পদ্ধতিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিকূলতা কাটিয়ে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই দেশের পণ্য রপ্তানি খাতে ইতিবাচক মোড় দেখা দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ মোট ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা পূর্ববর্তী মাস জুনের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুসারে, সরকার নির্ধারিত মাসিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার বেশি আয় অর্জিত হয়েছে এই এক মাসেই। বছরভিত্তিক হিসেবে গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় আয় সামান্য হ্রাস পেলেও সামগ্রিক চাঙ্গাভাবকে অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক খাতে জুলাই মাসে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আয় হয়েছে। যদিও বিগত বছরের একই মাসের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম, তবে জুনের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের উচ্চ রপ্তানি ভিত্তির কারণে এই সামান্য হ্রাসকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানীকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, "২০২৫ সালের জুলাই মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি ২৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে ছিল।" সেই উচ্চ সোপানের তুলনায় চলতি বছরের অর্জনকে তারা স্বাভাবিক ও সন্তোষজনক বলে অভিহিত করেছে।
বিজিএমইএ তাদের বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেছে, "গ্যাস সংকট, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্যান্য প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও এক মাসে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি শিল্পের সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় বহন করে।" ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে ওভেন পোশাকের রপ্তানি ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ হ্রাস পেলেও নিট পোশাকের ক্ষেত্রে এই পতনের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে সামান্য নেতিবাচক ধারা থাকলেও পাট ও পাটজাত পণ্যে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চিত্রে দেখা যায়, শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে ৯১ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য নিয়ে বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। তবে অপ্রচলিত বাজার হিসেবে ভারত ও সৌদি আরবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে নজরকাড়া, যা যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৩০ এবং ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। নীতিনির্ধারকদের মতে, উৎসবের মৌসুমকে সামনে রেখে বিশ্ববাজার থেকে নতুন ক্রয়াদেশের প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজতর হবে।
এদিকে, ডব্লিউটিওর 'ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫' অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে টানা পঞ্চমবারের মতো দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। যদিও তালিকার শীর্ষে থাকা চীনের রপ্তানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবে বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নিয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্বিতীয় অবস্থান সুসংহত করতে হলে অটোমেশন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা নিশ্চিত হলে আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির এই ধারা আরও বেগবান হবে বলে মনে করছে বিজিএমইএ।
বিশ্বের দুই শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইব একীভূত হয়ে একটি বিশাল কোম্পানি গঠনের সম্ভাব্য আলোচনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ খবরে সোমবার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে অ্যাস্ট্রাজেনেকার শেয়ারের দর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়, যা এফটিএসই ১০০ সূচকের ওই দিনের সর্বোচ্চ দরপতন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ব্রিটিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইবের মধ্যে একীভূত হওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে অ্যাস্ট্রাজেনেকার বাজারমূল্য প্রায় ২৬৪ বিলিয়ন ডলার এবং ব্রিস্টল মায়ার্সের ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। একীভূত হলে সম্মিলিত বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার, যা তাদের বাজারমূলধনের দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ এবং বার্ষিক আয়ের দিক থেকে বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানিতে পরিণত করবে।
তবে সম্ভাব্য এই মেগা-মার্জারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না অনেক বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষক। তাদের মতে, প্রধান নির্বাহী পাসকাল সরিওটের নেতৃত্বে অ্যাস্ট্রাজেনেকা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা, উদ্ভাবন ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে সফল। তাই বর্তমান অবস্থায় এত বড় একীভূতকরণের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেফরিজের বিশ্লেষকদের ভাষ্য, অ্যাস্ট্রাজেনেকার বর্তমান প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিবেচনায় কোম্পানিটির কোনো ধরনের আর্থিক প্রকৌশল বা মেগা-মার্জারের প্রয়োজন নেই।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই চুক্তির অন্যতম সুবিধা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অ্যাস্ট্রাজেনেকার অবস্থান আরও শক্তিশালী করা, কারণ ব্রিস্টল মায়ার্সের আয়ের বড় অংশই আসে মার্কিন বাজার থেকে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের বৃহৎ একীভূতকরণ প্রায়ই গবেষণা ও উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি দুই প্রতিষ্ঠানের ক্যানসারের ওষুধের পোর্টফোলিওতে মিল থাকায় একচেটিয়া ব্যবসাবিরোধী (অ্যান্টিট্রাস্ট) আইনগত জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসার কথা। কোম্পানিটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণাও দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য এই একীভূতকরণ কোম্পানির গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শেয়ারহোল্ডাররা। রিপোর্ট প্রকাশের পর সম্ভাব্য একীভূতকরণ নিয়ে অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোনো মন্তব্য করেনি। ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইবও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
পাকিস্তানের টায়ার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গান্ধারা টায়ার অ্যান্ড রাবার কোম্পানি লিমিটেড (জিটিওয়াইআর) উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি দেশে টায়ার রপ্তানির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে। গালফ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন অর্গানাইজেশন (জিএসও)-এর সনদ অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের উৎপাদিত টায়ার রপ্তানি করতে পারবে।
পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে (পিএসএক্স) তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি সোমবার এক দাপ্তরিক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে। কোম্পানির ভাষ্য, জিএসওর অনুমোদন তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক টায়ার শিল্পে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, জিএসও সনদ পাওয়ার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ বাজারে তাদের প্রবেশ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেও কাজ করছে কোম্পানিটি। গান্ধারা টায়ার আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উচ্চমানের টায়ার উৎপাদনের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করার কৌশল বাস্তবায়ন করছে তারা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসইউভি ও ক্রসওভার যানবাহনের জন্য নতুন আকারের টায়ার বাজারে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গান্ধারা টায়ার অ্যান্ড রাবার কোম্পানি পরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। আগে প্রতিষ্ঠানটি দ্য জেনারেল টায়ার অ্যান্ড রাবার কোম্পানি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে মোটরযান ও মোটরসাইকেলের টায়ার এবং টিউব উৎপাদন ও বিপণনই তাদের প্রধান ব্যবসা।
সম্প্রতি বড় ধরনের দরপতন ও অস্থিরতা কাটিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার ফিরতে শুরু করেছেন। গত শুক্রবার একদিনেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড ৭ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের শেয়ার কিনেছেন, যা দেশটির পুঁজিবাজারের ইতিহাসে আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। চিপ নির্মাতা খাতের শক্তিশালী অবস্থান এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ঘিরেই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের এই আস্থা ফিরছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাস জুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অস্থিরতা চললেও স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্সের মতো বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ভিত্তি এখনো অটুট রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই অস্থিরতা কোনো ব্যবসায়িক সংকটের কারণে নয়, বরং ‘লিভারেজ’ বা ঋণের মাধ্যমে কেনা শেয়ারের অত্যধিক চাপের কারণে তৈরি হয়েছিল।
জেপি মরগানের গবেষণা অনুযায়ী, জুন মাসের শেষের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারভিত্তিক লিভারেজড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF) গুলোর সম্পদের পরিমাণ যেখানে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছিল, গত সপ্তাহে তা কমে ১৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, উচ্চ ঝুঁকির বিনিয়োগগুলো বাজার থেকে অনেকটা বেরিয়ে গেছে, যা বাজারকে স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বালফোর ক্যাপিটাল গ্রুপের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা স্টিভ লরেন্স বলেন, "এটি কোনো আয়ের বা ব্যবসায়িক সংকট ছিল না, বরং এটি ছিল একটি লিভারেজ ইভেন্ট। আমি স্যামসাংয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কোম্পানিটির ব্যবসা বা মেমোরি চিপের চাহিদায় কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।"
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মেমোরি চিপের চাঙ্গা বাজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির প্রসারের ফলে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো কোম্পানিগুলোর মুনাফা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে জুন মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার যখন চূড়ায় ছিল, তখন থেকে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ স্যামসাংয়ের শেয়ারের দর প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল। মূলত কিছু বড় হেজ ফান্ডের শেয়ার বিক্রির চাপের কারণে এই দরপতন ত্বরান্বিত হয়।
বাজারের এই অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের পেছনে একক শেয়ারভিত্তিক ‘লিভারেজড ইটিএফ’ কে দায়ী করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা ঋণের মাধ্যমে এসব ফান্ডে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করায় বাজারে অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী কু ইউন-চিয়ল যথাযথ বিবেচনা ছাড়াই এ ধরনের উচ্চ ঝুঁকির বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছেন।
সিটি গ্রুপের এক হিসেব অনুযায়ী, লিভারেজড ইটিএফ-এর কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজার থেকে অতিরিক্ত ঝুঁকির চাপ কমে গেছে। জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের বড় সংশোধনের পরবর্তী ১২ মাসে বাজার গড়ে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
শুক্রবার কোরিয়ান বেঞ্চমার্ক ইনডেক্স ‘কসপি’ (KOSPI) ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়লেও সোমবার তা আবার ৫ শতাংশ কমেছে, যা বাজারে অস্থিরতা এখনো কিছুটা বজায় থাকার ইঙ্গিত দেয়। তবে ফ্রাঙ্কলিন টেম্পলটন ইনস্টিটিউটের গবেষণা প্রধান ল্যারি হ্যাথাওয়ে মনে করেন, মার্কিন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন দক্ষিণ কোরিয়ার বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ার নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবারে দেশের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর টানা তিন দিনের আধিপত্য বজায় থাকলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এদিন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর হ্রাসের পাশাপাশি প্রধান মূল্য সূচক ও লেনদেনের অংকের অবনমন ঘটেছে। লেনদেনের শুরুতে মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দর বৃদ্ধিতে সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিলেও দিনের শেষ ভাগে বড় মূলধনী প্রতিষ্ঠানের দরপতনে চিত্র বদলে যায়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে সব খাত মিলিয়ে ১৬৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ১৬৯টির দাম কমেছে এবং ৫৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ২৪টি মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বাড়লেও ৫টির দাম হ্রাস পেয়েছে। লভ্যাংশ প্রদানের ভিত্তিতে শ্রেণিভুক্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো মানের ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে এবং ৯২টির দর কমেছে। মাঝারি মানের ২৮টি কোম্পানির দর বাড়লেও বিপরীতে ৩৭টির দাম কমেছে। এছাড়া লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে থাকা ৫৩টি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে এবং ৩৯টির দাম হ্রাস পেয়েছে।
এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮৮৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একইভাবে বাছাই করা কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট হারিয়ে ২ হাজার ২০৪ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৮৬ পয়েন্টে নেমে গেছে। সূচকের অবনতির পাশাপাশি এদিন লেনদেনের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। বাজারে মোট ১ হাজার ২১০ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের চেয়ে ৪৭ কোটি ১১ লাখ টাকা কম।
লেনদেনের শীর্ষে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি অবদান রেখেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, যার ৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া শীর্ষ তালিকায় রয়েছে ফারইস্ট নিটিং, মুন্নু ফেব্রিক্স, এসিআই ফরমুলেশন, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, কুইন সাউথ টেক্সটাইল, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, সায়হাম টেক্সটাইল ও মালেক স্পিনিং।
দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের পতন হয়েছে। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩০ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০৭টির দর বৃদ্ধি পেলেও ৯৭টির দর কমেছে। তবে সিএসইতে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পেয়ে ২২ কোটি ৬২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মূলত বড় মূলধনী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরে পতন বাজার সূচককে নিম্নমুখী রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
বাজার মূল্যের দিক থেকে চীনের বৃহত্তম চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি (CXMT) বেইজিংয়ে তাদের দ্বিতীয় মেমোরি-চিপ কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রসারের ফলে চিপের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা মেটাতেই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর এই বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই নতুন ১২ ইঞ্চির মেমোরি-চিপ (DRAM) কারখানাটি বেইজিংয়ের ইঝুয়াং এলাকায় নির্মিত হতে পারে। এই এলাকাটি বর্তমানে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এবং এখানে সিএক্সএমটির একটি সক্রিয় ডির্যাম কারখানা আগে থেকেই রয়েছে। নতুন এই প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে অন্তত ৬ কোটি ইউয়ান আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।
গত মাসে চীনের পুঁজিবাজারে সিএক্সএমটি ৮.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আইপিও (IPO) সংগ্রহ করে, যা দেশটির সেমিকন্ডাক্টর খাতের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম লিস্টিং। বর্তমানে সাংহাই এবং হেফেই অঞ্চলেও প্রতিষ্ঠানটির নতুন কারখানা নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে প্রতি মাসে ৬ লাখ ওয়াফার ছাড়িয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজস্ব চিপ শিল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সিএক্সএমটি এখন বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশ্ববাজারে বর্তমানে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, এসকে হাইনিক্স এবং মাইক্রনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মেমোরি-চিপের প্রায় ৯০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করলেও, এআই অবকাঠামো এবং ডেটা সেন্টারের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে সিএক্সএমটি দ্রুত সেই ব্যবধান কমিয়ে আনতে চাইছে।
সিএক্সএমটির এই উত্থানের পেছনে চীনের ‘হেফেই মডেল’ বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, যেখানে স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন কৌশলগত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় করে তুলতে সহায়তা করে। বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত নতুন কারখানার ক্ষেত্রেও স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়নে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইঝুয়াং এলাকাটি বর্তমানে চীনের চিপ শিল্পের বড় একটি হাব। এখানে চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি (SMIC), চিপ তৈরির সরঞ্জাম নির্মাতা নাওরা টেকনোলজি এবং স্মার্টফোন নির্মাতা শাওমির (Xiaomi) মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কারখানা রয়েছে। সিএক্সএমটির নতুন কারখানাটি নির্মিত হলে এই অঞ্চলে প্রযুক্তি খাতের আধিপত্য আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের এই আলোচনা ও অর্থায়ন কাঠামোর আকার পরবর্তীতে পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা নানাবিধ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক অভাব অনটন জয় করে বর্তমানে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। শৈশবে পিতৃহানি কিংবা অল্প বয়সে বিয়ের মতো প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন। জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা এবং নিজস্ব মেধা কাজে লাগিয়ে তারা গ্রামীণ জনপদে তৈরি করছেন নতুন নতুন কর্মসংস্থান। অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন বড় বড় কারখানা গড়ার পরিবর্তে গ্রামের অন্যান্য সাধারণ নারীদের ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে।
শুধু হস্তশিল্প নয়, বর্তমানে সেলাই শিক্ষা, পোশাক তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান। পুঁজির সংকট মোকাবিলা করে অনেকে ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু করা ব্যবসাকে এখন বড় আকার দিয়েছেন, যেখানে আরও অনেকের কাজের সংস্থান হচ্ছে। বিশেষ করে এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই খাতের মাধ্যমে নারীরা এখন কেবল গৃহস্থালি কাজেই সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন।
বিগত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিউটি ও ওয়েলনেস সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় নারীদের সম্পৃক্ততা এখন দৃশ্যমান। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা শুধু নিজের পরিবারের সচ্ছলতাই আনছেন না, বরং আশেপাশের অনেক পরিবারের জন্য আয়ের পথ সুগম করছেন। ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তনে এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা জামানতের অভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের নির্দেশনা রয়েছে, তবুও মাঠপর্যায়ে এই সুবিধা আরও সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে এই খাত থেকে আরও বেশি অবদান আশা করা সম্ভব।
নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে এসএমই ফাউন্ডেশন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। পণ্য উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানটির ইনকিউবেশন সেন্টারগুলো বিশেষ সুবিধা প্রদান করছে। এছাড়া আমদানি-রপ্তানি বিষয়ক পরামর্শ ও নীতিনির্ধারণী সহায়তার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা নতুন এমএসএমই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে এই খাতের গতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আধুনিক ই-কমার্স ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ঘরে বসেই ফেসবুক বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সুবিধা পাওয়ায় ব্যবসার প্রাথমিক খরচ অনেক কমে এসেছে। তবে এই ডিজিটাল সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও উন্নত কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নারীদের এই অগ্রযাত্রা কেবল ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অবস্থান সুসংহত করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে। সহায়ক নীতি ও সময়োপযোগী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করে তুলবে।
গত চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা এখন খাদের কিনারায়। এই অস্থিরতার প্রভাবে কেবল খাদ্যাভ্যাস নয়, একটি সাধারণ পরিবারের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যে চলে যায় বলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার মান ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে চরম আপস করে চলতে হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরবরাহ শৃঙ্খলে ফড়িয়া, বেপারি ও আড়তদারসহ অসংখ্য অংশীজন থাকায় খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে সবুজ মরিচের দাম বাড়ে ১১৬ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডাল ৭৮ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ। সরবরাহ চেইন যত দীর্ঘ হচ্ছে, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তত বেশি হচ্ছে। এই শৃঙ্খলে বিশেষ করে চালের বাজারে অটো রাইস মিলারদের পর্যায়েই মুনাফার হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকা ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা দরিদ্র শ্রেণির ওপরই পড়ছে। প্রকৃত মজুরি না বাড়ায় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন সাধারণ মানুষকে সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করে চলতে হচ্ছে, যা দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ইনফ্লেইশন ডাইনামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য উচ্চ অবস্থানে থাকলে এবং দেশীয় জ্বালানি সরবরাহে চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতেও মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকতে পারে।” বিশেষ করে জ্বালানি ও কোর বা মূল পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির ধরনে এখন পরিবর্তন এসেছে। আগে কেবল খাদ্য পণ্যের দাম বাড়লে হাহাকার তৈরি হতো, তবে এখন জ্বালানি ও সেবা খাতগুলোও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বর্তমানে প্রোটিনজাত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যেমন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি পরিবহন, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ সেবার ব্যয় বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। একইসঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও লুব্রিকেন্টের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত করলেও সম্প্রতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর স্বার্থে তা কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, নীতি সুদহার কমানোর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আইএমএফ ও এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছিই থাকতে পারে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে গবেষকরা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে অপ্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী স্তর কমিয়ে আনা, পাইকারি বাজারে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুতদারি রুখতে কঠোর নজরদারি এবং আধুনিক কোল্ড চেইন ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব, তাই কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের বাজার ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত নীতিগত সংস্কার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পের সক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এই বিশাল বাজারের অন্তত ১২ শতাংশ অংশীদারত্ব অর্জন করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তুলা-নির্ভরতা হ্রাসের পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পোশাকশিল্প বর্তমানে দ্রুত গতিতে তুলাভিত্তিক পণ্য থেকে কৃত্রিম তন্তু বা সিনথেটিক তন্তুর দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি কৌশলের অংশ হিসেবে এই বর্ধিত বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতি ও পোশাকশিল্পের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার কার্যকর রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এমএমএফ কাঁচামালের শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করা জরুরি। পাশাপাশি দেশে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার ও সিনথেটিক সুতা উৎপাদন সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলোকেও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ তুলাভিত্তিক হলেও বিশ্ববাজারের চাহিদা এখন সিনথেটিক ও মিশ্র তন্তুর পোশাকের দিকে সরে যাচ্ছে, যা এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম তন্তু খাতের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএফটিআই-এর বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার বিস্তার, বিশেষায়িত ঋণ কর্মসূচি এবং আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে অ্যাকটিভওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কের হার ব্যাপক হ্রাস এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবাদে ভারতের পোশাক রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মতিলাল ওসওয়ালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকরা বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে প্রস্তাবিত ভারত-ইইউ এফটিএ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণসংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত চার মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানিতে শুল্কের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমে আসায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ভারতের শুল্ক ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মতিলাল ওসওয়াল জানিয়েছে, ‘মার্কিন শুল্ক কাঠামোর এই স্পষ্টতা পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের মনে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ও আনুষঙ্গিক দোকানের বিক্রি জুনে আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, যা শক্তিশালী গতি নির্দেশ করে।’ এই চাহিদার সুবাদে ভারতীয় উদ্যোক্তারা নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে, গত ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে ভারতের টেক্সটাইল খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পোশাকের ওপর যুক্তরাজ্যের ৮ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা পাকিস্তান, তুরস্ক ও বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতের সক্ষমতা বাড়াবে। মতিলাল ওসওয়ালের মতে, ‘স্বল্পমেয়াদে এর প্রভাব কিছুটা ধীরে দেখা গেলেও আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যের বাজারে ভারতের শেয়ার ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার এক চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে এই চুক্তি।’
একইভাবে ২০২৭ সালে ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন এফটিএ কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারেও ভারতীয় পোশাক রপ্তানির ওপর থাকা ১০ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক উঠে যাবে। বর্তমানে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো চীন ও বাংলাদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে, যা ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মতিলাল ওসওয়াল উল্লেখ করেছে, ‘ইইউ বর্তমানে প্রধানত চীন ও বাংলাদেশ থেকেই পোশাক সংগ্রহ করে, আর ভারত থেকে কেনে খুবই সামান্য—যা মূলত কয়েক দশকের শুল্ক-সংক্রান্ত স্থবিরতারই ফল। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো যখন চীন ও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে, তখন এই এফটিএ বাড়তি রপ্তানির বড় সুযোগ এনে দিচ্ছে। তবে আমেরিকার মতো একক কাঠামোর বাজারের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছুটা খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ায় এই বৃদ্ধির গতি হবে ধীর ও ধারাবাহিক।’
ভারতের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর শক্তিশালী ও সমন্বিত টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা উৎপাদনকারী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম স্পিনিং সক্ষমতার দেশ হিসেবে ভারত সুতা কাটা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিজস্ব উৎস থেকেই সম্পন্ন করতে পারে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল সরবরাহের সক্ষমতা বেশ সীমিত। চীন ও ভিয়েতনামও বর্তমানে কৃত্রিম তন্তু ও ইলেকট্রনিকস খাতের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে শুল্ক সুবিধা মিললেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রতিযোগিতা এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ ভারতের চেয়ে কম হওয়ার কারণে নিটওয়্যার খাতে তারা কাঠামোগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটিতে শ্রমিকদের মজুরি ভারতের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম, যা মোট পোশাক উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ। এছাড়া রপ্তানির পরিধির দিক থেকেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকের বার্ষিক আয় ৩৫ কোটি ডলারের বেশি হলেও ভারতের মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান এই মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছে।
মতিলাল ওসওয়াল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, মার্কিন বাজারে চাহিদার পুনরুত্থান এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির কল্যাণে ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থবছরের মধ্যে ভারতের বড় টেক্সটাইল রপ্তানিকারকদের রাজস্ব বার্ষিক প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এই লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ভারতকে বড় পরিসরে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জরুরি ভিত্তিতে নজর দিতে হবে।
বৈশ্বিক গাড়ি বিক্রির বাজারে টানা সাত বছর ধরে নিজেদের শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে জাপানের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর করপোরেশন। জাপান টুডে-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে ৫৩ লাখ ৯০ হাজার গাড়ি বিক্রি করেছে। এই অসামান্য সাফল্যের মাধ্যমে তারা তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানির ফক্সওয়াগনকে পেছনে ফেলেছে, যাদের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪১ লাখ ৩০ হাজার গাড়ি। শীর্ষস্থান বজায় রাখলেও বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় টয়োটার সামগ্রিক বিক্রিতে ২ দশমিক ৮ শতাংশ পতন পরিলক্ষিত হয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রথম বড় ধাক্কা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীনের বাজারে চাহিদার নিম্নগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিই মূলত এই বিক্রয় হ্রাসের প্রধান কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লজিস্টিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় টয়োটার সরবরাহ ও উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার ফলে জাপান থেকে উক্ত অঞ্চলে রপ্তানি ৩৬ শতাংশ কমে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক বিক্রি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়ার পেছনে চীনের বাজারে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ ধস বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে উত্তর আমেরিকার বাজারে হাইব্রিড গাড়ির জোরালো চাহিদার সুবাদে সেখানে বিক্রি দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে।
জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারেও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে টয়োটা। বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুচ্চালিত ও হাইব্রিড গাড়ির সম্মিলিত বিক্রি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২৭ লাখ ১০ হাজার ইউনিটে উপনীত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো শুধু বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) বাজার, যেখানে বিক্রি ২ দশমিক ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৯৩ হাজার ১৭২ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। এটি টয়োটার ব্যবসায়িক ইতিহাসে প্রথমার্ধের সর্বোচ্চ বিক্রির একটি নতুন রেকর্ড হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজারে টয়োটার এই অভাবনীয় সাফল্য প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এক বিশাল শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি চলছে। উত্তরে ব্যস্ত চট্টগ্রাম বন্দর, সামনে আধুনিক কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত বিমানবন্দর এবং দক্ষিণে আগামীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর—এই কৌশলগত বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ৭৮৩ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠছে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চলটিতে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে সরকার।
এই শিল্পাঞ্চলটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে এটি সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি দুটি প্রধান বন্দরের সঙ্গে সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে। দীর্ঘ এক দশকের নানা আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে গত সোমবার এই শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন’ (সিআরবিসি) এই প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছে।
শিল্পাঞ্চলটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর নিজস্ব একটি বহুমুখী জেটি থাকবে, যেখানে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া কারখানার বর্জ্য শোধনে প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি), দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস সঞ্চালন লাইন এবং পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে। পণ্য পরিবহনের সুবিধার জন্য ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীরের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে যে শিল্প-করিডর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, এই চীনা শিল্পাঞ্চল হবে তার মূল প্রাণকেন্দ্র। তবে এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। বর্তমানে কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের যে স্বল্পতা রয়েছে, এই শিল্পাঞ্চলটি সচল হলে তা দূর হবে এবং পণ্যবাহী যানের আনাগোনায় টানেলটি আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য থাকায়, এই দুটি বড় প্রকল্প একই সময়সীমার মধ্যে একে অপরের পরিপূরক হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।