সংবিধান নতুন করে লেখা হবে না কি সংশোধন হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী ধারাবাহিক বৈঠক শেষে বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে ছাত্রদের আহ্বানে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর চার দিনের মাথায় ১২ আগস্ট বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় বেশ কিছু রাজনৈতিক দল আলোচনার বাইরে রয়ে যায়। গতকাল এমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের রূপরেখা, নির্বাচনের রূপরেখাসহ নানা বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরে। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে সংবিধানের কাঠামোগত সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনাসহ নানা বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
এ বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম ও ৬টি ইসলামী দলের নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি না থাকার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি একটা যৌক্তিক সময় নিয়ে সংস্কারগুলো করে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে বলেছেন।
এ বৈঠক সম্পর্কে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ হয়েছে। সরকারের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া জানতে চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের রূপরেখা, নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হবে তা জানতে চেয়েছে। দ্রুতই আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা।
মাহফুজ আলম আরও বলেন, সংস্কারের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সরকারের মেয়াদ ঠিক হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের প্রস্তাবনা ভিত্তিতেই রূপরেখা দেওয়া হবে। একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা হবে।
গতকাল শনিবার বিকেল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বৈঠকে দলগুলো তাদের প্রস্তাবনা ও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। সংবিধান ইস্যুতেও মতামত দেয় দলগুলো।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল, দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না- এমন প্রস্তাব দেয়। তা ছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার যেসব সংস্কার করতে পারে না সেইসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচন দেওয়ার পরামর্শ দেয় দলটি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংবিধান সংশোধন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা, ক্ষমতার ভারসাম্যসহ ২১ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে গণফোরাম। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাসহ ৮৩টি প্রস্তাব দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ১২ দফা সুপারিশ করেছে ১২ দলীয় জোট। জোটটির নেতারা বলেন, এই দুর্যোগময় মুহূর্তে সাহসিকতার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিরাজমান সংকট সমাধানে সময় লাগবে। সরকারকে এই সময় দিতে দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুত আছে। এ সময় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিও জানান নেতারা।
গত ১২ আগস্ট বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ যেসব দল ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছিল, তাদের এবারের বৈঠকে ডাকা হয়নি। আমন্ত্রণ পায়নি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় পার্টি, জাতীয়বাদী সমমনা জোট, ১২ দলীয় জোট ও বাংলাদেশ জাসদ ডাক পেয়েছে।
গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় প্রথমে খেলাফতে আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ ৭টি ইসলামী দলের প্রতিনিধিরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। খেলাফত মজলিশের নেতৃত্ব দেন দলটির আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ড. আহমদ আবদুল কাদের, মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মুনতাসীর আলী। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নেতৃত্ব দেন মাওলানা ইউসুফ আশরাফ। প্রতিনিধিদলে থাকবেন মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা জালাল উদ্দিন। পরে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) পক্ষে নেতৃত্ব দেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন ড. রেদোয়ান আহমেদ, নেয়ামূল বশির, নুরুল আলম তালুকদার ও আওরঙ্গজেব বেলাল।
এরপর বিকেল ৫টায় মতবিনিময় সভায় জাতীয়বাদী সমমনা জোট থেকে নেতৃত্বে দেন এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, গণদলের এ টি এম গোলাম মওলা চৌধুরী, এনডিপির আবু তাহের, বাংলাদেশ ন্যাপের শাওন সাদেকি, সাম্যবাদী দলের সৈয়দ নুরুল ইসলাম।
সন্ধ্যা ৬টায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ জাসদ ও ১২ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। ১২ দলীয় জোটের নেতৃত্বে দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহিউদ্দিন ইকরাম, লেবার পার্টির একাংশের ফারুক রহমান, জাগপা একাংশের তাসমিয়া প্রধান, কল্যাণ পার্টির শামসুদ্দিন পারভেজ ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের শাহ আহমেদ বাদল। বাংলাদেশ জাসদের নেতৃত্ব দেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন নাজমুল হক প্রধান, মুশতাক হোসেন, আবদুল কাদের হাওলাদার, কাজী সদরুল হক।
সন্ধ্যা ৭টায় গণফোরাম ও জাতীয় পার্টির বৈঠক করে। জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব দেন দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান চুন্নু, মাশরুর মওলা ও সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। আর গণফোরামের নেতৃত্ব দেবেন ড. কামাল হোসেন। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, এস এম আলতাফ হোসেন, মিজানুর রহমান, জগলুল হায়দার আফ্রিক, মহিব উদ্দিন আবদুল কাদের ও মোশতাক আহমেদ।
এদিকে বৈঠক থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু অবহিত করেন। এ সময় ইসলামী দলগুলোর একজন মুখপাত্র বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে অযৌক্তিক সময় নষ্ট করবে না অন্তর্বর্তী সরকার।
এ ছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে আসন্ন দুর্গাপূজায় কেউ যাতে নৈরাজ্য করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে ইসলামী দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।
নেতারা জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত সময়ে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানানো হয়। তারা আরও জানান, সংলাপে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য নিশ্চিত করা, দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ সাংবিধানিক বেশ কিছু সংস্কারের দাবিও উপস্থাপন করেছেন নেতারা।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৭ প্রস্তাব বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের
বিকেল ৩টায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের পক্ষ থেকে সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সাত দফা উপস্থাপন করেন।
এগুলো হচ্ছে:
১. প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
ক. নির্বাচন-সংক্রান্ত সংস্কার: জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগকারীদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। সে জন্য আসনভিত্তিক বিজয়ী সংসদ সদস্যদের বাইরে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা।
খ. নির্বাচনবিধি-সংক্রান্ত সংস্কার: প্রার্থীদের নিজস্ব প্রচারণার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার ও প্রকাশনার ব্যবস্থা করা। যোগ্য সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা।
২. সাংবিধানিক সংস্কার:
ক. বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রদত্ত একচ্ছত্র ক্ষমতা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। তাই এ ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ভারসাম্য সৃষ্টি করা।
খ. দুই মেয়াদের বেশি একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা বন্ধ করা।
গ. প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের বিধান করা।
ঘ. সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা।
৩. বিচার ব্যবস্থা: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার স্বার্থে বিচারপতি নিয়োগ ও বিয়োগের জন্য জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থা: শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিতর্কিত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে ধর্মীয় ও নৈতিকতা শিক্ষা সংযোজন করা।
৫. পুলিশ ও প্রশাসন: পুলিশ ও প্রশাসনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহারের পথ বন্ধ করা।
৬.কোরআন সুন্নাহবিরোধী আইন/নীতি প্রণয়ন না করা।
৭. হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী ও আলেম ওলামা এবং রাজনৈতিক নেতাদের নামে দায়ের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি হলেও এর প্রভাবে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রাক্কলনের বরাতে জানা গেছে, উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। যদিও ২০১৮ সালের বাণিজ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক প্রধান বাজারগুলোতে শুল্কের হার বাড়লে স্থানীয় তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তীব্র চাপের মুখে পড়বে। রাজধানীর একটি সেমিনারে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ উদ্যোগে এলডিসি উত্তরণের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খানের উপস্থাপিত বিশ্লেষণে উঠে আসে, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা উঠে গেলে দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে কানাডায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৪২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, জাপানে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে বেশ কিছু বড় অংশীদার উত্তরণ-পরবর্তী নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এ সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া অভ্যন্তরীণ আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বহাল রাখবে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান ও তুরস্ক অতিরিক্ত তিন বছর এবং চীন দুই বছরের জন্য এ সুবিধা ধরে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই অন্তর্বর্তী সুবিধা বহাল থাকলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রপ্তানি হিসাব বিবেচনায় উত্তরণের পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত মোট রপ্তানির ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ বা প্রায় ৪ হাজার ৩৫৯ কোটি ডলারের বাজার সুরক্ষিত থাকবে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাণিজ্য ধরে রাখতে বাংলাদেশকে কানাডার জিপিটি প্লাস, ইইউর জিএসপি প্লাস কিংবা যুক্তরাজ্যের এনহ্যান্সড প্রেফারেন্স ব্যবস্থার মতো বিকল্প কাঠামোর শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব কাঠামোর আওতায় পণ্যের উৎসের নিয়মাবলি (রুলস অব অরিজিন) রপ্তানিকারকদের জন্য বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কানাডায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে শুল্কশ্রেণি পরিবর্তন বা যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক হবে। একইভাবে সিরামিক, হোম টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্যেও কঠোর শর্তের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে দেশের রপ্তানি খাত এখনো বিপজ্জনকভাবে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। গেল অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে মাত্র ১০টি পোশাকপণ্য থেকে, যেখানে এককভাবে সুতি টি-শার্ট থেকেই এসেছে ৭০০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। রপ্তানি পণ্যের এই বহুমুখীকরণের ঘাটতি উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে গভীর করছে বলে সেমিনারে সতর্ক করা হয়। দুর্বল কর-জিডিপি অনুপাত, বিদেশি ঋণের গড় সুদহার ২ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে ১২৭ কোটি ডলারে নেমে আসায় সরকারের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া উত্তরণের পর ডব্লিউটিওর বিধিমালার কারণে রপ্তানিতে সরাসরি নগদ ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে নগদ সহায়তার পরিবর্তে কারখানা আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা এবং শ্রমমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে বিএফটিআই। একই সাথে ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় না ঘটলেও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ছাড় উঠে যাওয়ার তিন থেকে চার বছর পর নতুন উদ্ভাবিত ও পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘের বাজেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের আর্থিক চাঁদার হারও বহুগুণ বাড়বে।
পূর্বঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। তবে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ নানা অস্থিতিশীলতার কারণে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে সরকার। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি ইতিবাচক বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠিয়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি মাসেই আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বাড়তি সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সরকার ২০২৬ থেকে ২০২৯ মেয়াদি চার ধাপের একটি জাতীয় পথনকশা গ্রহণ করেছে। এই রূপরেখার আওতায় প্রথম ধাপে সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দ্বিতীয় ধাপে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, তৃতীয় ধাপে শিল্পে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং চূড়ান্ত ধাপে সার্বিক সক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ধরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ লেনদেন ব্যবস্থায় বছরে যে ব্যয় হয়, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৮ ভাগের এক ভাগ। ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবে বছরে নগদ লেনদেনের ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা, যেখানে ডিজিটাল লেনদেনে এ ব্যয় মাত্র ৩৪৮ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক নোটের কাঁচামাল আমদানি, ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে প্রচলন বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। নিয়মিত ব্যবহারে নোট পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত ও ছেঁড়া হয়ে গেলে সেগুলোর পরিবর্তে নতুন নোট ছাপাতে হয়, ফলে বারবার ব্যয় তৈরি হয়। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে এসব ব্যয় কমানোর পাশাপাশি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণের মাধ্যমে দুর্নীতি, চুরি ও অর্থের অপব্যবহার কমানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ লেনদেন পরিচালনায় ব্যাংকগুলোর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোক্তাদের এ-সংক্রান্ত ব্যয় বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ ব্যবস্থাপনা ব্যয় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এসব ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে মুদ্রা ছাপানো ও বিতরণ, অর্থ পরিবহন, নিরাপত্তা, ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ পরিচালনা এবং টাকা তোলা, বহন ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় করা সময়ের মূল্য। নগদ লেনদেনের সঙ্গে ছায়া অর্থনীতির কারণে সরকারের রাজস্ব হারানোর বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে সম্ভাব্য বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেনের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ক্ষতি হিসাবের বাইরে রাখলেও নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি। তবে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায়ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, এ ব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আয় হলেও পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া বেশি মাশুল, লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ। প্রতারণা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, ভুল হিসাবে টাকা চলে যাওয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতার কারণেও অনেক গ্রাহক ও ব্যবসায়ী এ ব্যবস্থায় আগ্রহী হচ্ছেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তরের প্রসার ঘটলেও বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের মোট সংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি এখনো নগদে সম্পন্ন হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুনাফা তুলনামূলক কম হওয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের অতিরিক্ত মাশুল তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই লেনদেনের পদ্ধতি, অর্থ নিষ্পত্তির সময় ও খরচ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেন ভোক্তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা দেয়। এ ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য সেবা, সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণাটি তৈরিতে পেমেন্ট ব্যবস্থার তথ্য ও নীতিমালা পর্যালোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ২১টি সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি দলভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করেছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এ ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর লক্ষ্য কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের পথে বাধা কমানো। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না; সাশ্রয়ী সেবা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজে ব্যবহারযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। পাশাপাশি বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ানো, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব দূর করা, গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষের দক্ষতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগে ডিজিটাল লেনদেনকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য করা গেলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় সাশ্রয় ও আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাজ্যে কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধির গতিতে সামান্য ঊর্ধ্বমুখিতা এবং কর্মসংস্থান বাজারে ধীর পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্রমবাজারের এই মিশ্র পরিস্থিতি আগামী মাসে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওই) নীতি সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করেছে। প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারার পর প্রকাশিত এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কর্মী নিয়োগে দীর্ঘদিনের ভাটা হয়তো তলানিতে পৌঁছে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী জন হিলির প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের আগে এ তথ্য সরকারের জন্যও কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (ওএনএস) হিসাব অনুযায়ী, বোনাস ছাড়া কর্মীদের গড় সাপ্তাহিক আয় চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে এই হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যাওয়ার পর এটি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ধারা বজায় রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের নিয়ে রয়টার্সের জরিপে যেখানে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, প্রকৃত ফলাফল তাকে ছাড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির গতি ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক শূন্য শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের পর এই প্রথম বাড়ল।
যুক্তরাজ্যের রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে তালিকাভুক্ত কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার। এছাড়া আগস্ট মাসের প্রাথমিক হিসাবে ২৬ হাজার কর্মী হ্রাসের কথা বলা হলেও তা সংশোধন করে ১ হাজার বৃদ্ধির তথ্য দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনডিড’-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জ্যাক কেনেডি বলেন, “সর্বশেষ পরিসংখ্যান শ্রমবাজারের কিছুটা সহনশীলতার ইঙ্গিত দেয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্সের প্রতিফলন।” তবে বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি আসন্ন বাজেটের ওপর নির্ভর করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজকের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে শ্রমবাজার কোনোমতে টিকে রয়েছে। প্রশ্ন হলো বাজেট নিয়োগকর্তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কারণ জোগাতে পারে কি না।” উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস নিয়োগকর্তাদের ওপর কর বৃদ্ধি করার পর থেকেই দেশটিতে কর্মী নিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল।
ওএনএস-এর জরিপ অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাজ্যের বেকারত্বের হার কমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালের মধ্যভাগের পর সর্বনিম্ন। তবে কর্মসংস্থানের কিছু পরিসংখ্যানে এখনো দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া তিন মাসে খালি পদের সংখ্যা আগের ৭০৪,০০০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯১,০০০-এ। ২০২১ সালের এপ্রিলের পর এই প্রথম শূন্য পদের সংখ্যা সাত লাখের নিচে নামল, যা মহামারি পরিস্থিতি বাদ দিলে ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের প্রধান অর্থনীতিবিদ সুরেন থিরু বলেন, “শূন্যপদের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া শ্রমবাজারের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যা ইঙ্গিত করে চলতি বছরের এআই-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো নিয়োগের দুর্বল চাহিদা, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ব্যয়।”
শ্রমবাজারের এই তথ্য প্রকাশের পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ডের মান বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দামের ধাক্কা উচ্চ মজুরির দাবির মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, আগামী নভেম্বরের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মূল সুদের হার বাড়িয়ে ৪ শতাংশে উন্নীত করতে পারে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি সম্প্রতি সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ততটাই জরুরি হয়ে পড়বে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আগের মাসের ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাকে আরও দূরে ঠেলে দেবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বৃদ্ধির প্রভাবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস সামান্য বাড়াতে পারে ব্যাংক অব জাপান (বিওজে)। তবে সার্বিক অর্থনীতিতে মূল মূল্যস্ফীতির বড় কোনো পরিবর্তন না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আর্থিক পদক্ষেপে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত চারজন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গত মাসেই নীতি সুদহার বাড়িয়ে ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, জাপানি মুদ্রা ইয়েনের আকস্মিক পতন ঘটে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে না দিলে আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবরের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। তবে এই বৈঠকের পর প্রকাশিতব্য ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির ওপর কড়া নজর রাখার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করবে বিওজে, যার মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আবারও সুদহার বাড়ানোর সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হবে।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “ভোক্তা মূল্যস্ফীতির প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ থাকতে পারে, তবে মূল মূল্যস্ফীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন নেই।” পরবর্তীতে সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাব্য সময় প্রসঙ্গে অপর এক কর্মকর্তা বলেন, “মূল্যস্ফীতির চাপ বিদ্যমান থাকলেও তা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়নি, ফলে এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করার কারণ নেই।”
এর আগে গত জুলাই মাসে দেওয়া পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের মার্চে সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য মূল ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এর পরবর্তী অর্থবছরে তা ২ দশমিক ৪ শতাংশে নামার প্রক্ষেপণ করেছিল ব্যাংক অব জাপান। জ্বালানি তেলের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমে আসবে এমন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ওই হিসাব করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নতুন করে চড়ে যাওয়ায় চলতি মাসের প্রতিবেদনে ২০২৭ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতিতে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন আসতে পারে। নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এ সংশোধন সীমিত পরিসরেই থাকবে; কারণ অর্থনীতিতে মজুরি ও পণ্যের মূল্যের বিপজ্জনক কোনো নেতিবাচক প্রভাব এখনও তৈরি হয়নি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আগের পূর্বাভাসের কাছাকাছি অবস্থানেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি ভরসা জোগানোয় ২০২৬ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বহাল থাকতে পারে। এছাড়া আগামী বছরের এপ্রিল থেকে খাদ্যপণ্যে দুই বছরের জন্য প্রস্তাবিত ভোগ কর হ্রাসের উদ্যোগটি এখনও পার্লামেন্টে পাস না হওয়ায় তা আপাতত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাসে যুক্ত করা হচ্ছে না।
ব্যাংক অব জাপানের গভর্নর কাজুও উয়েদা আগেই সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, দুর্বল মুদ্রা এবং এআই খাতের বাড়তি চাহিদার কারণে অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতি তাদের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ১ অক্টোবরের প্রকাশিত ত্রৈমাসিক জরিপ অনুযায়ী, করপোরেট পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা নতুন করে গতি পায়নি। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের পূর্বাভাস, আগামী বছরের জুনের মধ্যে ব্যাংক অব জাপান তাদের নীতি সুদহার দুবার বাড়িয়ে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করতে পারে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা ১ দশমিক ৭৫ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে উঠেছে। মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এ পর্যায়ে পৌঁছায়। টানা তিন থেকে চার দিন ধরে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে তা কমে ১০৬ থেকে ১০৭ ডলারের মধ্যে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক উত্থানে আবারও গুরুত্বপূর্ণ এই মূল্যস্তরে পৌঁছেছে তেলটি। গত মে মাসের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এ পর্যায়ে ওঠেনি। গত ১৯ মে এর দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৮ ডলার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও বেড়েছে। মঙ্গলবার প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ৮১ ডলারে। তেলের বাজারে লেনদেন চলমান থাকায় এসব দাম পরিবর্তিত হতে পারে। অয়েলপ্রাইসডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামেই সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরে যুদ্ধবিরতির খবরে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা এবং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা—দুইয়ের প্রভাবেই দামের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। পরে জুনের শেষ দিকে তা কমে প্রায় ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। সেই প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে শুরু করে।
তবে জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সংঘাতের বিস্তারের ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে প্রকৃত সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাজারে উদ্বেগ বাড়ায়। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে এবং দাম আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকিও বাজারের জন্য উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদন বা সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের ঝুঁকি বাড়লে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন, যা দামের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সামলানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১১০ ডলারে ওঠায় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকগুলোর সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিনিয়োগ অর্থায়নের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের বার্তা নিয়ে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ডে’। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার প্রধান কার্যালয়ে যৌথভাবে এ বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ। এতে চীনের শীর্ষস্থানীয় ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতের ২৬টি প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন। ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আয়োজনে অংশ নেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পদের হিসাবে শীর্ষ চারে থাকা তিনটি ব্যাংক—ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না ও ব্যাংক অব চায়না। পাশাপাশি অবকাঠামো ও প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ভোক্তা ও স্মার্ট ইলেকট্রনিকস, শিল্পপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য উপস্থাপন করেন চায়না এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং কাং এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল ইসলাম।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যৌথভাবে ‘দ্য নেক্সট ফ্রন্টিয়ার: বাংলাদেশ-চায়না ফাইন্যান্সিয়াল কানেক্টিভিটি’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এত বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো চীনা ব্যাংক সরাসরি কার্যক্রম শুরু করেনি। অথচ সমপরিমাণ কিংবা কম বাণিজ্যের দেশ হওয়া সত্ত্বেও কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে চীনা ব্যাংকগুলোর সরাসরি উপস্থিতি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারিত হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সম্ভাবনা আরও জোরদার হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিনিয়োগ খাতসমূহ, বিশেষ করে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুবিধার দিকগুলো তুলে ধরা হয়। এসব এলাকায় চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়। পরবর্তীতে আয়োজিত নেটওয়ার্কিং পর্বে অংশ নিয়ে চীনা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরাসরি বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও যৌথ অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ হলো আর্থিক সংযোগ স্থাপন। বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী চীনা কোম্পানিগুলোর সহজ ও কার্যকর বাণিজ্য অর্থায়ন, যন্ত্রপাতি কেনার অর্থায়ন, চলতি মূলধন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সহায়তা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণই এ ধরনের অর্থায়নের চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন প্রযুক্তি এবং ব্যবসা ও উৎপাদন সম্প্রসারণে সহায়ক অংশীদারত্ব। বাংলাদেশে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি বাড়লে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে।”
চায়না এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং কাং বলেন, “চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সহায়তাকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না বিশেষায়িত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০টি চলমান প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া বস্ত্র ও স্বাস্থ্যসেবার মতো অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে শীর্ষস্থানীয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে, যা বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবামুখী অর্থনীতির বিকাশে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক অবদান রাখবে।
তেলের দাম কমে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ কিছুটা কমায় সোমবার (১৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম সামান্য বেড়েছে। তবে আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) মুদ্রানীতিবিষয়ক বৈঠকের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। ধারণা করা হচ্ছে, সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে ফেড।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সোমবার স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৭১ ডলার ৬৫ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিসেম্বরে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্যও শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৯১ ডলার ৯০ সেন্ট হয়েছে।
ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্তাউনোভো বলেন, তেলের দাম কমায় ফেডের ওপর চাপ কমেছে, যা স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক। তবে সুদের হারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের নতুন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে সোমবার রুপার দাম শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ, প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
দেশের বাজারে ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকায়। ২১ ক্যারেট ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৬৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৮ টাকা।
প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের রুপার দাম ৪ হাজার ১৯৯ টাকা, ২১ ক্যারেট ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৪৪১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ২ হাজার ৬২৪ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের মান হ্রাস পাওয়া এবং বিশ্ব পুঁজিবাজারগুলোতে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক বাজারে তামাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পজাত ধাতুর দাম বেশ ভালোই বৃদ্ধি পেয়েছে। লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ বা এলএমই-এর বার্ষিক সম্মেলন শুরু হওয়ার প্রাক্কালেই ধাতুর বিশ্ববাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেল।
লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে তিন মাস মেয়াদি তামার দাম শূন্য দশমিক নয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি টন চৌদ্দ হাজার চারশো আশি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে চলতি বছরজুড়ে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে তামার দাম ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেল। অবশ্য এর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে এই শিল্প ধাতুটির দাম রেকর্ড পরিমাণ চৌদ্দ হাজার আটশো পঁচাত্তর ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতনের ধাক্কা সামলে বাজারগুলোতে যখন আবার স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, তখন লগ্নিকারীদের মনে আস্থা ফিরে আসার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ধাতু বাজারেও। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী তামা, দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম এবং টিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতুগুলোর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সরবরাহ চুক্তির নগদ দর তিন মাস পরের মেয়াদী সরবরাহ চুক্তির দামের চেয়েও অনেক বেশি রয়েছে। পুঁজিবাজার ও বাণিজ্যের পরিভাষায় এই বিশেষ অবস্থাকে ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ বলা হয়ে থাকে, যা মূলত নিকট ভবিষ্যতে পণ্যটির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ার একটি স্পষ্ট পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মেরেক্সের ধাতুবাজার গবেষক ইয়ান রোপার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান যে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য নতুন শুল্ক বা ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার আগেই দেশটিতে পরিশোধিত তামার চালান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে চলতি বছরজুড়ে সার্বিকভাবে তামার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর একটি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে আগামী ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য খালাস ও আমদানির সময়সীমা ঘনিয়ে আসবে, যার ফলে বছরের একেবারে শেষভাগে তামার দাম কিছুটা হ্রাস পেতে পারে এবং সেই সময়ে মার্কিন ভূখণ্ডের বাইরে আন্তর্জাতিক অন্য বাজারগুলোতে বাড়তি সরবরাহ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যান্য শিল্প ধাতুর সার্বিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, অ্যালুমিনিয়ামের দাম শূন্য দশমিক আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি টন তিন হাজার এগারো ডলার পঞ্চাশ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে আসন্ন সময়ে ইন্দোনেশিয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালুমিনিয়ামের বড় ধরনের উদ্বৃত্ত দেখা দিতে পারে।
তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি অন্যান্য ধাতুর মধ্যে দস্তার দাম শূন্য দশমিক নয় শতাংশ, নিকেলের দাম শূন্য দশমিক নয় শতাংশ এবং সিসা ও টিনের দাম শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কোনো রকম বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির সরকারি, বেসরকারি এবং বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো এখন থেকে দেশের শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এই বিশেষ সুযোগটি চালুর উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ অন দ্য স্টক এক্সচেঞ্জ) রুলস, ২০২৬’ শীর্ষক একটি নতুন বিধিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ গেজেটের বিশেষ অতিরিক্ত সংখ্যায় এই বিধিমালাটি প্রকাশিত হয় এবং আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তথা বিএসইসির পক্ষ থেকে পাঠানো এক দাপ্তরিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
নতুন এই বিধিমালা প্রবর্তিত হওয়ার ফলে যোগ্যতাপূর্ণ কোম্পানিগুলো নতুন করে কোনো শেয়ার ইস্যু না করে এবং আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বাড়তি অর্থ সংগ্রহ না করেই তাদের প্রতিষ্ঠানে থাকা বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো। এর মাধ্যমে দেশের মূল পুঁজিবাজারে অপেক্ষাকৃত ভালো, স্বচ্ছ এবং প্রতিষ্ঠিত বড় বড় কোম্পানির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে আশা প্রকাশ করছেন।
বিএসইসির প্রণীত চূড়ান্ত বিধিমালা অনুযায়ী, মূলত মোট সাতটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির বা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এই ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে রয়েছে—শতভাগ কিংবা অন্তত একান্ন শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম দশ শতাংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারের মালিকানায় রয়েছে এমন কোম্পানি এবং শতভাগ কিংবা অন্তত একান্ন শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন যেকোনো প্রতিষ্ঠান।
এর পাশাপাশি, সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচশো কোটি টাকার নিট সম্পদমূল্য থাকা স্বয়ংসম্পূর্ণ তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন বিমা কোম্পানিগুলোও এই বিশেষ সুযোগের আওতায় তালিকাভুক্ত হতে পারবে। খসড়া নীতিমালার প্রাথমিক আলোচনায় বার্ষিক লেনদেন বা মোট সম্পদের পরিমাণ পাঁচশো কোটি টাকা হলেই যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার প্রস্তাব থাকলেও, চূড়ান্ত বিধিমালায় তার পরিবর্তে কোম্পানির বার্ষিক লেনদেন কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা হওয়া বাধ্যতামূলক করার কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত এই তালিকাভুক্তির সুযোগের আওতায় রয়েছে বিএসইসিতে নিবন্ধিত যেকোনো স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি। এছাড়া কমিশন যদি প্রয়োজন মনে করে, তবে ভবিষ্যতে অন্য যেকোনো স্বনামধন্য কোম্পানিকেও এই সুবিধার আওতাভুক্ত করার বিশেষ ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে মূল্যসূচকের ধারাবাহিক পতন ও মন্দা ভাব বজায় ছিল। সূচকের পতনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক, এমনকি গত শনিবার চলতি বছরের সর্বনিন্ম লেনদেনের রেকর্ডও হয়েছিল। তবে আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবের দীর্ঘ ছুটির ঠিক আগের শেষ কার্যদিবসে এসে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই সূচক এবং লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এর ফলে একপ্রকার কিছুটা স্বস্তি এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পাঁচ দিনের টানা ছুটির কবলে প্রবেশ করছে দেশের শেয়ারবাজার।
আজ সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বা ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় আঠারো পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচ হাজার চারশত একান্ন পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এর আগে গত রবিবার সূচক এগারো পয়েন্ট এবং শনিবার উনিশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছিল, যার ফলে টানা দুই কার্যদিবসের শ্লথগতি ও পতনের পর শেষ কর্মদিবসে এসে সূচকের এই জোরালো উত্থান ঘটল।
ডিএসইতে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচশো দুই কোটি তেষট্টি লাখ টাকায়। এর আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল তিনশো পঁয়ষট্টি কোটি একষট্টি লাখ টাকার সিকিউরিটিজ। সেই হিসেবে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন একশো সাতাশ কোটি দুই লাখ টাকা অর্থাৎ প্রায় সাঁত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারটিতে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আজ ডিএসইতে মোট তিনশো একাশিটি কোম্পানি ও তহবিলের লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে একশো সাতাশিটি প্রতিষ্ঠান বা প্রায় উনপঞ্চাশ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে একশো ছত্রিশটি প্রতিষ্ঠান বা প্রায় পঁয়ত্রিশ শতাংশের দর কমেছে এবং বাকি আটান্নটি প্রতিষ্ঠান বা পনেরো শতাংশের বেশি কোম্পানির শেয়ারদর অপরিবর্তিত অবস্থায় ছিল।
অপরদিকে বন্দরনগরীর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিএসইতেও আজ ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। এদিন সিএসইতে মোট একুশ কোটি সতেরো লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যেখানে গত কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল আট কোটি উনআশি লাখ টাকা। এই হিসাবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সিএসইতে মোট লেনদেন বেড়েছে বারো কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
এইদিন সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া মোট একশো পঞ্চাশটি কোম্পানির মধ্যে চৌষটিটির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমসংখ্যক অর্থাৎ চৌষটিটি কোম্পানির দর পতন ঘটেছে, এছাড়া অপরিবর্তিত ছিল বাইশটি প্রতিষ্ঠানের দর। দিন শেষে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই সাতষট্টি পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে চৌদ্দ হাজার ছয়শো চার পয়েন্টে গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে এর আগের কার্যদিবসে সূচকটি ছত্রিশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি ও দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্যাস খাতে আর্থিক সংকট তীব্র হচ্ছে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে খরচ পড়ছে প্রায় ১১৭ টাকা। দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে সরবরাহের পর গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৫২ টাকা ১৮ পয়সা। অথচ গ্যাস বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা দরে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ঘাটতি হয়েছে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে আরও ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। নভেম্বর মাসে এ অঙ্ক ৬ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে প্রথম পাঁচ মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস খাতে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতির বিপরীতে সরকার ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ মাত্র ৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে বাড়তি অর্থের সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গেলে প্রতি কার্গোতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। কাতার ও ওমান থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় লোকসান বাড়ছে। চলতি মাসে একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হলে সেটি দ্রুত সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ঘাটতি পূরণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। জ্বালানি একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য, তাই সরবরাহ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লাগত। বর্তমানে তা কিনতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। আগে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাস ১০ ডলারে পাওয়া গেলেও এখন দাম ২২ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ২৭ টাকা ৬৪ পয়সা। এপ্রিল থেকে জুন সময়ে তা বেড়ে ৪৫ টাকা ৭৯ পয়সায় দাঁড়ায়। ওই সময়ে গড় বিক্রয়মূল্য ২৩ টাকা ৬৩ পয়সা থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয় ২১ টাকা ৮২ পয়সা। ঘাটতি কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল পেট্রোবাংলা। তবে এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশে গ্যাস সংকট চলার মধ্যে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ সমালোচনার মুখে পড়লে প্রক্রিয়াটি আপাতত স্থগিত করা হয়।
দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানিকৃত গ্যাসের ব্যয় অনেক বেশি। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনা হয় ১ টাকায়, বাপেক্স থেকে ৪ টাকায়। শেভরন বাংলাদেশের গ্যাসের দাম প্রায় ১২ টাকা এবং টাল্লোর ক্ষেত্রে প্রায় ১০ টাকা। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম ছিল প্রতি ঘনমিটার প্রায় ৪৬ টাকা এবং ওমানের গ্যাসের দাম প্রায় ৪৪ টাকা।
বর্তমানে গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য প্রতি ঘনমিটার ৬ টাকা ৭ পয়সা হলেও আমদানিকৃত গ্যাস যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক গড় মূল্য বেড়ে ৫২ টাকা ১৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে আমদানির অংশ ৭০ শতাংশে পৌঁছালে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, দেশীয় মজুত কমে আসার সময় অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে জোর না দিয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের অবকাঠামো নির্মাণেও ধীরগতি রয়েছে। ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন প্রকল্প আটকে থাকলেও প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালী-বাখরাবাদ সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে চলছে। ফেনী-বাখরাবাদ অংশের ঠিকাদার নিয়োগের কাজও প্রায় চূড়ান্ত।
এদিকে নতুন কূপ খননের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) আটকে রয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আলোচনা করেছেন এবং শিগগিরই দুটি ডিপিপি অনুমোদনের আশা করছেন।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে কমবেশি ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। এ ছাড়া তিতাস গ্যাসের আওতায় ৩৭৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রতিশ্রুত লোড থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাচ্ছে না। একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭৩১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এখনো দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসে এ ক্ষেত্র থেকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য, দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস, নতুন কূপ খননে ধীরগতি এবং প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতা—সব মিলিয়ে গ্যাস খাত গভীর সংকটে পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভর্তুকির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং ভোলার মতো সম্ভাবনাময় উৎসের গ্যাস ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আমদানিনির্ভরতা ও আর্থিক ঘাটতি আরও বাড়বে।
২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশটির ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে করোনা মহামারির সময় ২০২০ ও ২০২১ অর্থবছরে এর চেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে টানা ২৫ বছর বার্ষিক বাজেট ঘাটতিতে থাকল দেশটি।
মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের তুলনায় এবার ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থবছর শুরু হয় অক্টোবর মাসে এবং শেষ হয় পরের বছরের সেপ্টেম্বরে। সে হিসাবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অর্থবছর শেষ হয়েছে।
এ সময়ে সরকারের মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে এসেছে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বেতনভিত্তিক কর থেকে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ব্যয়ের বড় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তায় ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, মেডিকেয়ারে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, ঋণের নিট সুদ পরিশোধে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, স্বাস্থ্য খাতে ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং প্রতিরক্ষায় ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজেট ঘাটতির এ চিত্র সামনে এসেছে। উচ্চ সুদহার ও বিপুল ঋণের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে এটি কেন্দ্রীয় বাজেটের তৃতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাত। অর্থনীতি ভালো গতিতে চললেও মহামারি বা বড় ধরনের মন্দা ছাড়াই ঘাটতি ও ঋণ বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
বাজেট পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, আর্থিক নীতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। ‘কমিটি ফর আ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট’-এর মায়া ম্যাকগিনাস বলেন, ‘আমেরিকার আর্থিক স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং এটি সামলাতে আমাদের এখনই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি বলেন, একবারে বাজেট উদ্বৃত্ত করা বা রাতারাতি সব ঋণ পরিশোধের অবাস্তব লক্ষ্য না নিয়ে আইনপ্রণেতাদের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে আমাদের এমন কিছু বেছে নিতে হবে যা একই সাথে কঠোর কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য। বাজেট ঘাটতিকে জিডিপির ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা (যা বর্তমান পরিমাণের অর্ধেক) সেরকমই একটি উপযুক্ত লক্ষ্য হতে পারে। এটি জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাতকে স্থিতিশীল রাখবে। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর আমাদের হাতে সময়ও খুব বেশি নেই।’
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়েছে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেশটির অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এএফপির অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের রপ্তানি বাড়লেও ভোক্তাদের আস্থাহীনতা ও আবাসন খাতের সংকট অর্থনীতির সামগ্রিক গতি সীমিত করছে। চলতি বছরের জন্য বেইজিং ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির অন্যতম নিম্ন লক্ষ্যমাত্রা।
হুটং রিসার্চের বিশ্লেষক গুও শান এএফপিকে বলেন, রপ্তানি ছাড়া অন্য খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভালো ফল দেখাচ্ছে—এমন খাত খুব কম। তাঁর মতে, চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্দিষ্ট কিছু বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বন্ধকী ঋণের সুদে ভর্তুকি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসব বরাদ্দ দ্রুত কাজে লাগানো প্রয়োজন।
এদিকে জ্বালানির উচ্চমূল্য, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি বছর চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বৈঠকে অংশ নেওয়া আইএমএফ কর্মকর্তারা বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক সহায়তামূলক পদক্ষেপগুলোকে ‘সীমিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।