সংবিধান নতুন করে লেখা হবে না কি সংশোধন হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী ধারাবাহিক বৈঠক শেষে বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে ছাত্রদের আহ্বানে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর চার দিনের মাথায় ১২ আগস্ট বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় বেশ কিছু রাজনৈতিক দল আলোচনার বাইরে রয়ে যায়। গতকাল এমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের রূপরেখা, নির্বাচনের রূপরেখাসহ নানা বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরে। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে সংবিধানের কাঠামোগত সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনাসহ নানা বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
এ বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম ও ৬টি ইসলামী দলের নেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি না থাকার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি একটা যৌক্তিক সময় নিয়ে সংস্কারগুলো করে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে বলেছেন।
এ বৈঠক সম্পর্কে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ হয়েছে। সরকারের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া জানতে চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের রূপরেখা, নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হবে তা জানতে চেয়েছে। দ্রুতই আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা।
মাহফুজ আলম আরও বলেন, সংস্কারের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে সরকারের মেয়াদ ঠিক হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের প্রস্তাবনা ভিত্তিতেই রূপরেখা দেওয়া হবে। একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা হবে।
গতকাল শনিবার বিকেল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বৈঠকে দলগুলো তাদের প্রস্তাবনা ও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। সংবিধান ইস্যুতেও মতামত দেয় দলগুলো।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল, দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না- এমন প্রস্তাব দেয়। তা ছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার যেসব সংস্কার করতে পারে না সেইসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচন দেওয়ার পরামর্শ দেয় দলটি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংবিধান সংশোধন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা, ক্ষমতার ভারসাম্যসহ ২১ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে গণফোরাম। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাসহ ৮৩টি প্রস্তাব দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ১২ দফা সুপারিশ করেছে ১২ দলীয় জোট। জোটটির নেতারা বলেন, এই দুর্যোগময় মুহূর্তে সাহসিকতার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিরাজমান সংকট সমাধানে সময় লাগবে। সরকারকে এই সময় দিতে দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুত আছে। এ সময় একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিও জানান নেতারা।
গত ১২ আগস্ট বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ যেসব দল ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছিল, তাদের এবারের বৈঠকে ডাকা হয়নি। আমন্ত্রণ পায়নি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় পার্টি, জাতীয়বাদী সমমনা জোট, ১২ দলীয় জোট ও বাংলাদেশ জাসদ ডাক পেয়েছে।
গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় প্রথমে খেলাফতে আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ ৭টি ইসলামী দলের প্রতিনিধিরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। খেলাফত মজলিশের নেতৃত্ব দেন দলটির আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ। প্রতিনিধিদলে ছিলেন ড. আহমদ আবদুল কাদের, মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মুনতাসীর আলী। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নেতৃত্ব দেন মাওলানা ইউসুফ আশরাফ। প্রতিনিধিদলে থাকবেন মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা জালাল উদ্দিন। পরে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) পক্ষে নেতৃত্ব দেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমেদ। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন ড. রেদোয়ান আহমেদ, নেয়ামূল বশির, নুরুল আলম তালুকদার ও আওরঙ্গজেব বেলাল।
এরপর বিকেল ৫টায় মতবিনিময় সভায় জাতীয়বাদী সমমনা জোট থেকে নেতৃত্বে দেন এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, গণদলের এ টি এম গোলাম মওলা চৌধুরী, এনডিপির আবু তাহের, বাংলাদেশ ন্যাপের শাওন সাদেকি, সাম্যবাদী দলের সৈয়দ নুরুল ইসলাম।
সন্ধ্যা ৬টায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বাংলাদেশ জাসদ ও ১২ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। ১২ দলীয় জোটের নেতৃত্বে দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহিউদ্দিন ইকরাম, লেবার পার্টির একাংশের ফারুক রহমান, জাগপা একাংশের তাসমিয়া প্রধান, কল্যাণ পার্টির শামসুদ্দিন পারভেজ ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের শাহ আহমেদ বাদল। বাংলাদেশ জাসদের নেতৃত্ব দেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন নাজমুল হক প্রধান, মুশতাক হোসেন, আবদুল কাদের হাওলাদার, কাজী সদরুল হক।
সন্ধ্যা ৭টায় গণফোরাম ও জাতীয় পার্টির বৈঠক করে। জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব দেন দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তার প্রতিনিধিদলে ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান চুন্নু, মাশরুর মওলা ও সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। আর গণফোরামের নেতৃত্ব দেবেন ড. কামাল হোসেন। তার প্রতিনিধিদলে থাকবেন মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, এস এম আলতাফ হোসেন, মিজানুর রহমান, জগলুল হায়দার আফ্রিক, মহিব উদ্দিন আবদুল কাদের ও মোশতাক আহমেদ।
এদিকে বৈঠক থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু অবহিত করেন। এ সময় ইসলামী দলগুলোর একজন মুখপাত্র বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে অযৌক্তিক সময় নষ্ট করবে না অন্তর্বর্তী সরকার।
এ ছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে আসন্ন দুর্গাপূজায় কেউ যাতে নৈরাজ্য করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে ইসলামী দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।
নেতারা জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত সময়ে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানানো হয়। তারা আরও জানান, সংলাপে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য নিশ্চিত করা, দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ সাংবিধানিক বেশ কিছু সংস্কারের দাবিও উপস্থাপন করেছেন নেতারা।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৭ প্রস্তাব বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের
বিকেল ৩টায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের পক্ষ থেকে সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সাত দফা উপস্থাপন করেন।
এগুলো হচ্ছে:
১. প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
ক. নির্বাচন-সংক্রান্ত সংস্কার: জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগকারীদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। সে জন্য আসনভিত্তিক বিজয়ী সংসদ সদস্যদের বাইরে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা।
খ. নির্বাচনবিধি-সংক্রান্ত সংস্কার: প্রার্থীদের নিজস্ব প্রচারণার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার ও প্রকাশনার ব্যবস্থা করা। যোগ্য সৎ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা।
২. সাংবিধানিক সংস্কার:
ক. বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে প্রদত্ত একচ্ছত্র ক্ষমতা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। তাই এ ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ভারসাম্য সৃষ্টি করা।
খ. দুই মেয়াদের বেশি একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা বন্ধ করা।
গ. প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দলীয় পদ থেকে পদত্যাগের বিধান করা।
ঘ. সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা।
৩. বিচার ব্যবস্থা: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা। বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার স্বার্থে বিচারপতি নিয়োগ ও বিয়োগের জন্য জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থা: শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিতর্কিত বিষয়গুলো বাদ দিয়ে ধর্মীয় ও নৈতিকতা শিক্ষা সংযোজন করা।
৫. পুলিশ ও প্রশাসন: পুলিশ ও প্রশাসনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহারের পথ বন্ধ করা।
৬.কোরআন সুন্নাহবিরোধী আইন/নীতি প্রণয়ন না করা।
৭. হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী ও আলেম ওলামা এবং রাজনৈতিক নেতাদের নামে দায়ের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা।
দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংক পিএলসি নিজেদের নতুন করপোরেট প্রধান কার্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডে একটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় আয়তনের জমি ও নির্মাণাধীন বহুতল ভবন কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। রাজধানীর ২০৮, বীর উত্তম মীর শওকত সড়কে (তেজগাঁও লিংক রোড) অবস্থিত ৯৫ দশমিক ১০ শতাংশ বা ৫৭ দশমিক ৬৪ কাঠা আয়তনের এই জমিটি ব্যাংকটি অধিগ্রহণ করবে। এই জমির সঙ্গেই ‘সুইস টাওয়ার’ নামের ২৬ তলাবিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক নির্মাণাধীন ভবন কেনা হবে, যার নিচে তিনটি বেজমেন্ট ফ্লোর রয়েছে।
এই বিশাল অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় পূবালী ব্যাংকের সর্বমোট ব্যয় হবে ৮০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে আয়কর অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কোনো ধরনের ভ্যাট এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। তবে এত বড় অঙ্কের সম্পদ অধিগ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি এখনই চূড়ান্ত হচ্ছে না; এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক ছাড়পত্র বা অনুমোদন পাওয়ার পরই জমি ও নির্মাণাধীন এই বহুতল ভবনটি অধিগ্রহণের মূল প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করবে পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সম্পদ অধিগ্রহণের এই খবরের পাশাপাশি সম্প্রতি ব্যাংকটির আর্থিক সূচকেও বেশ ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ রয়েছে। আলোচ্য এই হিসাব বছরে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮ টাকা ৩৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) উন্নীত হয়েছে ৫৪ টাকা ৩২ পয়সায়। এর আগের ২০২৪ হিসাব বছরেও প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের মোট ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেছিল, যেখানে তাদের ইপিএস ছিল ৬ টাকা ৭৪ পয়সা এবং এনএভিপিএস ছিল ৪৬ টাকা ৮ পয়সা।
আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস পিএলসি (সিআরআইএসএল) পূবালী ব্যাংককে দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ এবং স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-১’ রেটিং প্রদান করেছে। ১৯৮৪ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ঐতিহ্যবাহী এই ব্যাংকটির বর্তমান অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৫৬১ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির রিজার্ভে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার শক্তিশালী তহবিল রয়েছে এবং এর মোট শেয়ার সংখ্যা ১৫৬ কোটির বেশি। এই শেয়ারগুলোর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৩১ দশমিক ৮৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪৩ দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
দেশে চলতি বছর ঢালাওভাবে সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেওয়ার প্রভাবে বিগত কয়েক মাসের ব্যবধানে এর বাজারদরে দেশের ইতিহাসে এক সর্বকালের রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দুই দফায় সর্বমোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমোদন দেওয়া হলেও, এর চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে। রফতানির এই খবরের পর থেকে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদাররা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন, যার ফলে সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। রফতানির সুযোগে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎসব-আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ এই সুগন্ধি বা চিনিগুঁড়া চাল এখন অনেকেরই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাত্র কয়েক মাস আগেও পাইকারি বাজারে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তার সর্বনিম্ন দাম ছিল ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এক মাস আগে সেই দাম ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছায় এবং বর্তমানে তা আরও বেড়ে ৯ হাজার ৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে; অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে পাইকারিতে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৭৮ টাকা। খুচরা বাজারেও এর প্রভাব ভয়াবহ; দুই মাস আগে সর্বনিম্ন ১১০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া চিনিগুঁড়া চাল বর্তমানে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর মোড়কজাত ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে তা ২০০ টাকাও ছাড়িয়ে গেছে। দামের এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আতপ কাটারিসহ বিভিন্ন কম দামি সরু চাল চিনিগুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে বাজারে ভেজাল চালের দৌরাত্ম্য বাড়িয়েছেন, যা ভোক্তাদের সরাসরি প্রতারিত করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে রফতানির অনুমতি দেওয়া হলেও গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৭৯টি প্রতিষ্ঠান রফতানির চূড়ান্ত অনুমতিপত্র গ্রহণ করেছে। প্রতি কেজি চাল রফতানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ ডলার নির্ধারণ করা এবং রফতানিযোগ্য চালের অনুমোদন হস্তান্তর না করার মতো কঠোর শর্তের কারণে অনেকেই চূড়ান্ত অনুমতি নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। চট্টগ্রামের চাক্তাই চাল মিল মালিক সমিতির মতে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান লাভের আশায় রফতানির অনুমতি নিলেও তারা মূলত চাল মজুদ করে রেখেছে এবং বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়াচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই রফতানি প্রক্রিয়া শেষ করা না হলে সুগন্ধি চালের বাজার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুগন্ধি চালের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের সাধারণ হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের হোটেল মালিক সমিতির তথ্যমতে, বস্তাপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ টাকার মতো দাম বাড়লেও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ভাত কিংবা পোলাও-বিরিয়ানির দাম ক্রেতাদের ওপর চাপানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে তারা বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। উল্লেখ্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিপুল চাহিদাকে কেন্দ্র করে ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুগন্ধি চাল রফতানি শুরু হয়। গত ২০২৫ সালে সরকার ২৩ হাজার ৯৫৯ টন চাল রফতানির অনুমতি দিয়েছিল; কিন্তু চলতি বছর পুরনো রফতানির সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই দ্বিগুণ পরিমাণ রফতানির অনুমোদন দেওয়ায় বাজারে এই তীব্র সংকট ও মজুদদারির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জাপানের মিনিভ্যান সেগমেন্টে দীর্ঘদিন ধরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের যে একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে, সেটি ভাঙতে এবং বাজারে নিজেদের হারানো অবস্থান ফিরে পেতে দীর্ঘ ১৬ বছর পর নতুন নকশার ‘এলগ্র্যান্ড’ মিনিভ্যান উন্মোচন করেছে নিশান মোটর কোম্পানি। গত মে মাসের শেষ দিক থেকে জাপানের বাজারে এই নতুন গাড়িটির অগ্রিম বুকিং নেওয়া শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ছয় হাজারের বেশি অগ্রিম ক্রয়াদেশ বা অর্ডার পেয়েছে। নিশান আশা করছে, দীর্ঘ বিরতির পর বাজারে আসা নতুন এই মডেলের হাত ধরে তারা তাদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী টয়োটাকে বেশ ভালোভাবে টেক্কা দিতে সক্ষম হবে।
নতুন এই এলগ্র্যান্ড মডেলে বেশ কিছু বৈপ্লবিক ও আকর্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে নিশান। গাড়িটিতে নিশানের তৈরি তৃতীয় প্রজন্মের অত্যাধুনিক ‘ই-পাওয়ার’ হাইব্রিড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে এর শক্তিশালী ইঞ্জিনটি মূলত একটি জেনারেটর হিসেবে কাজ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি গাড়িটির বাহ্যিক নকশাতেও জাপানি সংস্কৃতির দারুণ এক ছোঁয়া রাখা হয়েছে। এর সামনের দিকের গ্রিলটিতে ঐতিহ্যবাহী জ্যামিতিক কাঠের কারুকাজ ‘কুমিকো’-এর আদলে তৈরি একটি বিশেষ গ্রিড প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা গাড়িটিকে একটি আভিজাত্যপূর্ণ ও নান্দনিক রূপ দিয়েছে।
জাপানের বাজারে নতুন এই প্রিমিয়াম এলগ্র্যান্ড মিনিভ্যানের প্রাথমিক দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯ লাখ ইয়েন। আগের যেকোনো মডেলের তুলনায় নতুন এই গাড়িটির জ্বালানি দক্ষতা প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে এটি প্রতি লিটার জ্বালানিতে ১৬ দশমিক ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে সক্ষম। গাড়িটি উন্মোচন উপলক্ষে ইয়োকোহামায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিশান জাপানের মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের করপোরেট এক্সিকিউটিভ আকিরা সুগিমোতো জানান, নতুন এই মিনিভ্যানটি কেবল মানুষ বা মালামাল পরিবহনের জন্যই নয়, বরং যাত্রীদের ভ্রমণের সময়টুকুকে আরও আরামদায়ক করে তোলার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। রেললাইনের ওপর দিয়ে মসৃণভাবে ট্রেন চলার মতো চমৎকার অভিজ্ঞতাই এই মিনিভ্যানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া ২০২৭ অর্থবছরের মধ্যে এই মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত (এআই) পরবর্তী প্রজন্মের ড্রাইভিং প্রযুক্তি যুক্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে।
জাপানের বড় মিনিভ্যানের বাজারটি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে টয়োটার একচেটিয়া দখলে রয়েছে, যা বিক্রির পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। গত ২০২৫ সালে টয়োটা তাদের জনপ্রিয় ‘অ্যালফার্ড’ ও ‘ভেলফায়ার’ মডেলের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইউনিট গাড়ি বিক্রি করেছিল, যেখানে একই সময়ে নিশানের এলগ্র্যান্ড বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৪২৬টি। তবে নিশানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় জাপানের দেশীয় বাজারটি এখন অন্যতম প্রধান গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্রেতাদের বিপুল প্রাথমিক সাড়া এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি নতুন এই মডেলের ওপর ভর করে মিনিভ্যানের বাজারে নিজেদের সেই পুরনো গৌরব ও শক্ত অবস্থান নিশান আবারও ফিরে পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সামাল দিতে এবং আন্তর্জাতিক সঞ্চয় বা রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপে উঠে এসেছে যে, অংশগ্রহণকারী প্রায় ৮৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপকই মনে করেন আগামী ১২ মাসে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকগুলোতে স্বর্ণের মজুদ আরও বৃদ্ধি পাবে। ডব্লিউজিসি গত নয় বছর ধরে এ ধরনের বার্ষিক জরিপ পরিচালনা করে আসলেও, এবারই স্বর্ণ কেনার আগ্রহের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে তারা নিজ নিজ ব্যাংকে স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছেন; বিপরীতে মাত্র ১ শতাংশ ব্যাংক মজুদ কমানোর কথা ভাবছে এবং বাকিরা বর্তমান অবস্থাই অপরিবর্তিত রাখতে আগ্রহী।
স্বর্ণের প্রতি বৈশ্বিক ব্যাংকগুলোর এই আকর্ষণ কেবল স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৮৩ শতাংশ কর্মকর্তা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক মোট রিজার্ভে স্বর্ণের অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যা আগের বছরের জরিপে ছিল ৭৬ শতাংশ। বর্তমানে জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক রিজার্ভে স্বর্ণ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, গত বছর যার হার ছিল ৮১ শতাংশ। স্বর্ণের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে ঐতিহ্যবাহী বিদেশী মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের ওপর ব্যাংকারদের আস্থা বেশ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে; প্রায় ৭৪ শতাংশ কর্মকর্তা মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরে বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের আধিপত্য অনেকটাই কমে আসবে এবং ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলো রিজার্ভের সম্পদ বিভিন্ন নিরাপদ খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারকদের কাছে কৌশলগত আপৎকালীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণকে প্রাধান্য দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক ও বাস্তবমুখী কারণ রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা অর্থনৈতিক বা আর্থিক সংকটকালে স্বর্ণের শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্সকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া ৮৪ শতাংশ কর্মকর্তা দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মান ধরে রাখার উৎকৃষ্ট মাধ্যম এবং ৮২ শতাংশ কর্মকর্তা সার্বিক বিনিয়োগে ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে স্বর্ণের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন, যা বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি এটি সংরক্ষণের বিষয়েও ব্যাংকগুলো এখন বেশ সতর্ক; বিগত এক বছরে ৯ শতাংশ ব্যাংক নিজ দেশে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং ১০ শতাংশ ব্যাংক বিদেশে রাখা স্বর্ণের অবস্থান বৈচিত্র্যময় করেছে, তবে এত পরিবর্তনের পরও বিদেশে স্বর্ণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (৫৭ শতাংশ) প্রথম পছন্দে এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ভল্ট (৪৯ শতাংশ) দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের (চীন ব্যতীত) প্রধান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈশ্বিক বিভাগের প্রধান শাওকাই ফ্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোই মূলত সরকারের এই ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি জানান, নীতিনির্ধারকরা এখন সুদের হার, টানা মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে স্বর্ণকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। তার দেওয়া তথ্যমতে, গত চার বছরে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গড়ে প্রতি বছর এক হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণ কিনেছে, যা গত এক দশকের গড় ক্রয়ের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানের এই চরম অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রিজার্ভের সুরক্ষায় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের এই অপরিহার্যতা আগামী দিনগুলোতেও বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা ধরে রাখবে বলে তিনি দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার যোগান নিশ্চিত করতে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন ও সুশৃঙ্খল ‘অপারেশনাল গাইডলাইন’ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে প্রকাশিত মাস্টার সার্কুলারে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে আনতে ব্যর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠান এবং ঋণ পরিশোধে অসমর্থ ব্যাংকগুলো ইডিএফ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। মূলত রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এডি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৬ মাস মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে SOFR + ০.৫০ শতাংশ সুদে ডলার তহবিল পাবে এবং রপ্তানিকারকদের কাছে এটি সর্বোচ্চ SOFR + ১.৫০ শতাংশ সুদে বিতরণ করতে পারবে। যদি কোনো ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে আমদানি ব্যয় মেটানোর পর ইডিএফের পুনঃঅর্থায়ন পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তবে সেই অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য তারা অতিরিক্ত ১ শতাংশ সুদ আদায় করতে পারবে। তবে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বকেয়া অর্থের ওপর প্রচলিত সুদের সাথে আরও ৪ শতাংশ অতিরিক্ত ‘দণ্ডসুদ’ কার্যকর হবে। ইডিএফ ঋণের সাধারণ মেয়াদ হবে ১৮০ দিন, যা বিশেষ ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ দর্শিয়ে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য ঋণের সর্বোচ্চ সীমাও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএভুক্ত সদস্যরা সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার এবং বিকেএমইএ ও ফ্ল্যাক্সাভুক্ত সদস্যরা ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ইডিএফ সুবিধা নিতে পারবেন। এছাড়া বিটিএমএ সদস্যরা বাল্ক আমদানির জন্য ২ কোটি ডলার এবং চামড়াজাত পণ্যসহ অন্যান্য খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ইনল্যান্ড ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানিতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার অন্তত ১০ দিন আগে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আবেদন করতে হবে এবং সেই আবেদনপত্রে ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) বা তদুর্ধ্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন এই নীতিমালার ফলে ইডিএফ তহবিলের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে এবং রপ্তানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং টেকসই ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করতে কৌশলগত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং গ্লোবাল রিপোর্টিং ইনিশিয়েটিভ (জিআরআই)। এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে দেশীয় পোশাক কারখানাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে ‘ইমপ্রুভিং ট্র্যান্সপারেন্সি ফর সাসটেইনেবল বিজনেস (আইটিএসবি)’ শীর্ষক একটি বিশেষ উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে শুরু হতে যাওয়া এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় বিজিএমইএ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেশের পোশাক খাতে দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ ব্যবসা পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং বা টেকসই ব্যবসায়িক প্রতিবেদনের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। জিআরআই স্ট্যান্ডার্ডস অনুসরণ করে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে দেশের কারখানাগুলো বৈশ্বিক বাজারে আস্থা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।
আইটিএসবি উদ্যোগের আওতায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রশিক্ষণ, ওয়েবিনার ও বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এর ফলে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জিআরআইয়ের বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ তুলে ধরার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশে এই উদ্যোগের ট্রেনিং অ্যান্ড আউটরিচ পার্টনার হিসেবে কাজ করছে দ্য সাসটেইনেবিলিটি নেক্সাস (সাসনেক্স)। চলতি বছরের মে ও জুলাই মাসে আয়োজিত বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন, যেখানে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের ব্যবহারিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
জিআরআইয়ের চিফ অব স্ট্যান্ডার্ডস বাস্তিয়ান বাক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিজিএমইএর সঙ্গে এই অংশীদারত্ব বাংলাদেশের পোশাক খাতে স্বচ্ছতা ও প্রভাবভিত্তিক রিপোর্টিং জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইটিএসবি উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করে জিআরআই স্ট্যান্ডার্ডসের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিফলিত হবে এবং খাতটির জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে।’
বিজিএমইএর রেসপন্সিবল বিজনেস হাব ও সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াসিম জাকারিয়া এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এরই মধ্যে পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল উৎপাদনে বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এখন সেই অর্জনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সঠিকভাবে পরিমাপ ও উপস্থাপন করাই প্রধান লক্ষ্য। জিআরআইয়ের সঙ্গে এই যৌথ উদ্যোগ কারখানাগুলোকে আধুনিক সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিংয়ে দক্ষ করে তুলবে, যা ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা চিহ্নিত করতেও সহায়তা করবে।’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেওয়া বিভিন্ন সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসার প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন থেকে ইতোমধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের স্তরে পৌঁছেছে। ২০টি দেশের ৭০ জন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সমন্বয়ে এই পাইপলাইনটি গঠিত হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের এই বিনিয়োগ রূপান্তরের হার প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট সন্তোষজনক। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এক কনসেপ্ট নোটের মাধ্যমে বিডা এই সাফল্যের কথা তুলে ধরে।
বিডার তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিনিয়োগের প্রধান উৎস হিসেবে তুরস্ক, চীন, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। বিশেষ করে হংকংভিত্তিক হ্যান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগটি অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল। শুরুতে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫০ মিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করা হলেও বিডা, বেজা ও বেপজার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত তা দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় মিরসরাইয়ে একটি পোশাক কারখানা এবং কেরানীগঞ্জে একটি সমন্বিত টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল কমপ্লেক্স নির্মিত হবে, যা প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
টেক্সটাইল খাতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে চীনের শানডং হেনগলি টেক্সটাইলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান লিড বাংলাদেশ টেক্সটাইল টেকনোলজি। এছাড়া আবাসন ও নির্মাণ খাতের উন্নয়নে চট্টগ্রামে ৩২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করছে চায়না লেসো গ্রুপ। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে পিভিসি পাইপ, সোলার প্যানেল ও স্যানিটারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হবে। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে মেগারিচ নামক প্রতিষ্ঠান ১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে এয়ারলাইন অ্যামেনিটি কিট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য লাইফস্টাইল পণ্য সরবরাহ করবে।
বিমার মতো সেবা খাতেও বিদেশি বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য খবর রয়েছে। শ্রীলঙ্কার সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি স্থানীয় বিমা কোম্পানির ৬০ শতাংশ মালিকানা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এর ফলে ডিজিটাল বিমা সেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কার্যক্রম দেশে আরও প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মালয়েশীয় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এমআর ডিআইওয়াই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭টির বেশি মেগাস্টোর পরিচালনা করছে। বিডা জানিয়েছে, গত এক বছরে দেড় বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবায়নের স্তরে নেওয়া একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। আগামী এক বছরে আরও দেড় বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ পাইপলাইনে যুক্ত করার লক্ষ্যে সংস্থাটি এখন দেশ ও খাতভিত্তিক বিশেষ দল গঠন করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরণের দরপতনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবারের লেনদেন। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিনে সূচকের এমন বড় অবনমন এর আগে দেখা যায়নি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টরা একে বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র হিসেবেই দেখছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। মোট ৩১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম হ্রাস পেয়েছে, যার বিপরীতে মাত্র ৫৯টির দর বেড়েছে এবং ২০টি প্রতিষ্ঠানের দাম অপরিবর্তিত ছিল। শেয়ারের ব্যাপক দরপতনের প্রভাবে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬৬ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮০৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। পাশাপাশি শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১৬ পয়েন্ট এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২৩ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। এদিন লেনদেনের গতিও কিছুটা মন্থর ছিল; মোট ৯৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম।
দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৫৮ পয়েন্ট কমেছে। সেখানে ১৮৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমলেও ৫৪টির দাম বেড়েছে এবং ২২টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল। তবে ডিএসইর বিপরীতে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে ২০ কোটি ১৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ১৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
দেশের গৃহায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফ্ল্যাট বিক্রিতে বড় ধসের পাশাপাশি নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, শুল্ক-করের বোঝা এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে এই খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি ও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাবে ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ সংশ্লিষ্ট ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পে মন্দার ছায়া পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা গেছে পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস প্রাইস ইনডেক্সেও, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমেছে।
বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কম থাকলেও উপকরণের মূল্য হ্রাসের কোনো লক্ষণ নেই। পরিবহন খরচ ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক নির্মাণ ব্যয় বেড়েই চলেছে। যদিও রডের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু চাহিদার অভাবে এর বিক্রি প্রায় ৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে থাই গ্লাসসহ কিছু উপকরণের দাম আগের চেয়ে অনেকটা বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নির্মাণকাজের মৌসুম হওয়ায় তখন চাহিদা বাড়ে। বর্ষাকালে কাজ কমে যাওয়ায় বিক্রিও কমে যায়। ফলে কিছু পণ্যের দাম কমলেও অনেক পণ্য আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।’
উচ্চ সুদের হারের কারণে ক্রেতারা আবাসন ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে রাজধানীর আবাসন বাজারে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে, যার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সিমেন্ট ও রড উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। আবাসন খাতের সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের এক নেতা বলেন, ‘আবাসনখাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৬৯টি শিল্প জড়িত। ফলে এ খাতে মন্দা দেখা দিলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত ও লাখো শ্রমিকের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আবাসন খাতে নির্মাণের ব্যয় প্রায় ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। কাঁচামালের দাম ও কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও অনেক বেড়েছে। সংকট উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘নিবন্ধন ব্যয় কমানো, গৃহায়নবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে এ খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে গতি সঞ্চার ও বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো না গেলে এই মন্দা দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নয় মাস আগে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এখনো স্থায়ী আমদানি শেড চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ওপর সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে খোলা আকাশের নিচে স্তূপ করে রাখা শত শত টন আমদানিকৃত পণ্য ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট, বারকোড বা আরএফআইডি ভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় পণ্য শনাক্তকরণ ও সরবরাহে চরম ধীরগতি দেখা দিয়েছে। গুদাম সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৫০টির মতো ফ্লাইটে বিপুল পরিমাণ কার্গো আসে। নিয়মিত ফ্লাইটের পণ্য যাচাই করতে সময় কম লাগলেও বিশেষ চার্টার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন সময় লেগে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টন পণ্য আসায় দ্রুতই বিপুল পরিমাণ কার্গো খালাসের অপেক্ষায় জমে থাকে। পরবর্তীতে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মালামাল বুঝে নেওয়ার পর সেগুলো সর্টিং ও চূড়ান্ত ডেলিভারিতে আরও কয়েক দিন বাড়তি সময়ের প্রয়োজন হয়। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য আসায় কার্গো ভিলেজে জায়গার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট চালান খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় একদিকে পণ্য ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে খোলা জায়গায় পড়ে থাকা মালামাল প্রতিকূল আবহাওয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত বছরের অক্টোবর মাসে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের কার্গো ওয়্যারহাউজটি ভস্মীভূত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শেডটি সংস্কারের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলায় আমদানিকৃত পণ্যের ধারণক্ষমতা অনেক কমে গেছে। রাখার জায়গা না থাকায় প্রতিদিন আসা বিপুল পরিমাণ নতুন চালান খোলা জায়গায় ফেলে রাখতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিকমানের একটি বিমানবন্দরে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য এভাবে খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকার ঘটনা বাণিজ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মূলত সংস্কার কাজে ব্যর্থতা এবং বিকল্প সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কার্গো ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্কারকৃত অংশে সামান্য পরিমাণ পণ্য রাখা সম্ভব হলেও প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। বিমানবন্দরে সাধারণত জরুরি শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও সংবেদনশীল সরঞ্জাম আমদানি করা হয়, যা নিরাপদ সংরক্ষণের অভাবে গুণগত মান হারাচ্ছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল কার্গো ট্র্যাকিং ও আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট চালু করা না গেলে এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বর্তমানে বিদ্যমান এই অচলাবস্থা নিরসনে তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালুর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নকিয়া চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মুনাফা অর্জন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ক্লাউড খাতের গ্রাহকদের চাহিদা বৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নকিয়ার তুলনামূলক পরিচালন মুনাফা ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩৪ মিলিয়ন ইউরোতে (প্রায় ৪৯৬.১১ মিলিয়ন ডলার) দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান এলএসইজি-র পূর্বাভাস অনুযায়ী এই মুনাফা ৩৮২ মিলিয়ন ইউরো হওয়ার কথা ছিল।
রয়টার্সের তথ্যমতে, নকিয়া বর্তমানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই ডাটা সেন্টার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার-অপটিক সরঞ্জাম বিক্রিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে মেমোরি চিপের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। নকিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাস্টিন হোটার্ড এক বিবৃতিতে বলেন, ‘চাহিদা এখনো বেশ শক্তিশালী, তবে সরবরাহের সংকটই বর্তমানে শিল্পের প্রধান সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ দিতে উৎসাহিত করছে।’
গত বছর ইনটেলের ডাটা সেন্টার ও এআই গ্রুপ থেকে নকিয়ায় যোগ দেওয়ার পর হোটার্ড ডাটা সেন্টার ব্যবসার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার সঙ্গে বিশাল অংকের চুক্তিও সম্পন্ন করেছেন। চলতি প্রান্তিকে নকিয়ার মোট বিক্রয় ৪.৮২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা বাজার প্রাক্কলনের চেয়েও বেশি। এর মধ্যে এআই ও ক্লাউড গ্রাহকদের কাছ থেকে আসা আয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ৪৪৬ মিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ২.৮ বিলিয়ন ইউরোর ক্রয়াদেশ পেয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী সুইডিশ প্রতিষ্ঠান এরিকসন গত সপ্তাহে সতর্ক করেছিল যে, এআই চাহিদার কারণে মেমোরি চিপের ক্রমবর্ধমান ব্যয় তাদের ব্যবসায়িক মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে নকিয়া এর বিপরীতে পুরো বছরের সম্ভাব্য পরিচালন মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আগের পূর্বাভাস ২ বিলিয়ন থেকে ২.৫ বিলিয়ন ইউরো থাকলেও এখন তা সংশোধন করে ২.১ বিলিয়ন থেকে ২.৬ বিলিয়ন ইউরো নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা আশা করছে, ব্যবসার এই ইতিবাচক ধারা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
আন্তর্জাতিক সংঘাতের পাশাপাশি এবার বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থার দিকে কঠোর নজর দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্যের পর এবার তিনি ওষুধের বাজারকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। তবে ওষুধের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত শুল্ক এখনই কার্যকর হচ্ছে না।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে আগামী ১ আগস্ট থেকে পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সকল জেনেরিক ওষুধ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। তবে এই সময়সীমা পার হওয়ার পর ২০২৮ সাল থেকে এক বছরের জন্য শুল্কের হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে তা আরও বাড়িয়ে ২০০ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ২১ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধের উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনরায় ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব কারখানা ও উৎপাদন কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে, তাদের জন্য এটি এক ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর ‘মোস্ট-ফেভারড-নেশন’ বা সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশভিত্তিক নীতিমালার মাধ্যমে ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বজায় রেখেছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বের অন্যান্য উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রে যে মূল্যে ওষুধ বিক্রি করা হয়, মার্কিন নাগরিকরাও যেন সেই একই বা তার চেয়ে কম মূল্যে ওষুধ কিনতে পারেন।
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) দেওয়া তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ওষুধের ৯০ শতাংশের বেশি জেনেরিক ক্যাটাগরির। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, পেটেন্টভুক্ত ব্র্যান্ডেড ও উদ্ভাবনী ওষুধের ক্ষেত্রে বর্তমান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। উল্লেখ্য যে, গত বছর বড় কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মার্কিন সরকারের সঙ্গে বিশেষ চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ায় কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ওষুধ শুল্কমুক্ত সুবিধা লাভ করেছিল।
এর আগে গত এপ্রিলে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আমদানিকৃত ব্র্যান্ডেড ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি সরকারের নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে রাজি না হয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনের নিশ্চয়তা না দেয়, তবে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক সম্পাদকীয়তে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে যে, এর ফলে মার্কিন বাজারে কম দামের জেনেরিক ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত প্রেসক্রাইবড ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশই জেনেরিক এবং এর প্রায় ৭০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোম্পানিগুলোর পক্ষে দ্রুত উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া কিংবা অতিরিক্ত শুল্কের ব্যয় বহন করা বেশ কঠিন হবে। ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় জেনেরিক ওষুধে মুনাফার হার কম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচের বোঝা সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে বলে আশঙ্কা করছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
দীর্ঘ ১৮ মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশে আবারও মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং। আগামী বছরের জানুয়ারি নাগাদ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্যামসাং স্মার্টফোন দেশের বাজারে পুনরায় সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের হাত ধরে বাংলাদেশে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে মোবাইল ফোন সংযোজন শুরু করেছিল স্যামসাং।
নরসিংদীর শিবপুরে অবস্থিত কারখানায় ইতোমধ্যে স্যামসাং ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটর তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও স্মার্টফোন তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। বুধবার কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে এসব তথ্য প্রদান করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জিজুন কিম। ওই সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্যামসাং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাংমিন জাং এবং ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব।
ফেয়ার গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের আনুষ্ঠানিক পরিবেশক হিসেবে তারা যাত্রা শুরু করে। ২০১৭ সালে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন কারখানা স্থাপন করার পর ২০১৮ সালে দেশে তৈরি প্রথম স্যামসাং স্মার্টফোন বাজারে আনে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে ফেয়ার গ্রুপের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল স্মার্টফোন খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই কারখানায় বছরে প্রায় ২৫ লাখ ইউনিট মোবাইল ফোন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।
স্যামসাংয়ের পাশাপাশি ফেয়ার গ্রুপ বর্তমানে চীনের হাইসেন্স ব্র্যান্ডের পণ্যও উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হচ্ছে ২০২৭ সাল নাগাদ দুই ব্র্যান্ড মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রেফ্রিজারেটর উৎপাদন করা। বর্তমানে তারা বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার হাইসেন্স রেফ্রিজারেটর তৈরি করছে। কারখানা পরিদর্শনে স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইনে ধাতব কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ সংযোজন ও গুণগত মান যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করা যায়।
ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন বিরতি প্রসঙ্গে জানান, ২০২৩ সালে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে পড়ায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত স্যামসাং স্মার্টফোন উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছিল। সে সময়কার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সে সময় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, বাজার ৪জি থেকে ৫জি ডিভাইসে রূপান্তরিত হওয়ায় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের প্রয়োজনীয়তাও এই বিলম্বের অন্যতম কারণ। কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ লাখ হ্যান্ডসেট হলেও উৎপাদন পুনরায় শুরুর প্রথম বছরেই পুরো সক্ষমতা ব্যবহারের লক্ষ্য এখনই নেওয়া হচ্ছে না।
কারখানা পরিদর্শন শেষে রাষ্ট্রদূত জিজুন কিম ফেয়ার ইলেকট্রনিকসকে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশাল কর্মীবাহিনী ও কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় দেশটিকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে ফেয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান রুহুল আলম আল মাহবুব অবৈধ পথে মোবাইল ফোন আমদানির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, সহায়ক নীতিগত পরিবেশ পাওয়া গেলে স্থানীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। স্যামসাং বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাংমিন জাং জানান, স্যামসাং বৈশ্বিক মান বজায় রেখে ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের সঙ্গে যৌথভাবে এ দেশে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।