সপ্তাহ ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে সবজি ও মুরগির বাজার চড়া রয়েছে। সরবরাহ বাড়লেও আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ।আজ শুক্রবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও তালতলা বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে সব ধরনের সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, বলছেন বিক্রেতারা। কচুরমুখীর কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৭০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। পেঁপের কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ধুন্দল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, কচুর লতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঝিঙে ৬০ টাকা, শসা ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারগুলোতে শীতকালীন সবজি শিম ২০০ টাকা কেজি, ফুলকপি প্রতিটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা,পাকা টমেটো প্রকারভেদে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং গাজর ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেবুর হালি ১০ থেকে ২০ টাকা, ধনে পাতার কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা কলার হালি ৪০ টাকা এবং মিষ্টি কুমড়ার কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
লাল শাকের আঁটি ১৫ টাকা, লাউ শাক ৪০ টাকা, মুলা শাক ১৫ টাকা, পালং শাক ১৫ থেকে ২০ টাকা, কলমি শাক ১০ টাকা, পুঁই শাক ৩০ টাকা এবং ডাঁটা শাক ২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। সপ্তাহ ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আদা ২৮০ টাকা, রসুন ২২০ টাকা এবং আলু কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সম্প্রতি বন্যার কারণে অনেক মুরগির খামারে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে রাজধানীর বাজারগুলোতে চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মুরগি। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগি ২৬০ থেকে ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি হাইব্রিড ২২০ টাকা, দেশি মুরগি ৫২০ টাকা, লেয়ার লাল মুরগি ৩৩০ টাকা এবং সাদা লেয়ার ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে গরুর মাংস কেজি প্রতি ৬৫০ থেকে ৭৮০ টাকা, গরুর কলিজা ৭৮০ টাকা, গরুর মাথার মাংস ৪৫০ টাকা, গরুর বট ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং খাসির মাংস কেজিপ্রতি ১ হাজার ১৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারগুলোতে এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। হাঁসের ডিমের ডজন ১৮০ টাকা, দেশি মুরগির ডিমের হালি ৮৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সরবরাহ বাড়লেও আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছের কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের মাছ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাষের শিংয়ের কেজি (আকারভেদে) ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা, রুইয়ের দাম কেজিতে বেড়ে (আকারভেদে) ৩৩০ থেকে ৫০০ টাকা, দেশি মাগুর ৮০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা, মৃগেল ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা, চিংড়ি ৭০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়, বোয়াল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, কাতল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, পোয়া ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ টাকা, কই ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, মলা ৫৫০ টাকা, বাতাসি টেংরা এক হাজার ৩০০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, কাচকি ৫০০ টাকা, পাঁচমিশালি ২২০ টাকা, রূপচাঁদা ১ হাজার ২০০ টাকা, বাইম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, দেশি কই এক হাজার ২০০ টাকা, শোল ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, আইড় ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা, বেলে ৮০০ টাকা এবং কাইক্ক্যা ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এসব বাজারে পাঁচ কেজি সয়াবিন তেল ৮১৮ টাকা, দেশি মসুর ডালের কেজি ১৪০ টাকা, মিনিকেট চাল ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা, নাজিরশাইল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেড চার দিন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর তাদের কারখানার সার্বিক উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় সম্পূর্ণভাবে শুরু করেছে। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে সাময়িক অচলাবস্থা তৈরির পর গত শনিবার (২৭ জুন) থেকে কারখানাটিতে পুরোদমে কাজ শুরু হয়। আজ রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারখানার ভেতরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে গত ২৩ জুন শ্রমিকদের চাকুরিকালীন সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন সার্ভিস বেনিফিট নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষের জেরে অ্যাপেক্স স্পিনিং তাদের কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। উদ্ভূত উদ্ভেগের মুখে সে সময় কারখানার প্রায় ৫ হাজার শ্রমিককে সাময়িক লে-অফ করা হয়েছিল, যা কোম্পানির নিয়মিত উৎপাদন সূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে শঙ্কা তৈরি করে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক আলোচনার পর বিরোধের অবসান ঘটে এবং কারখানায় কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের সফল অবসান এবং কারখানা পুরোপুরি সচল হওয়ার এই ঘোষণা শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে আজ রবিবারের বাজার লেনদেনেও; ডিএসইতে লেনদেন শুরুর আড়াই ঘণ্টার মাথায় অ্যাপেক্স স্পিনিংয়ের প্রতিটি শেয়ারের দাম ২.১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬৩.১০ টাকায় উন্নীত হয়। যদিও চার দিনের এই সাময়িক উৎপাদন বন্ধের কারণে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বা শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যের বিস্তারিত কারণ কোম্পানির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে অ্যাপেক্স স্পিনিংয়ের ব্যবসায় কিছুটা মন্দাভাব লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সমাপ্ত হওয়া ৯ মাসের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বার্ষিকভিত্তিতে কোম্পানির রপ্তানি আয় ৯ শতাংশ কমে ৩.৮৩ বিলিয়ন (৩৮৩ কোটি) টাকায় নেমেছে এবং একই সময়ে নিট মুনাফা ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২১.৫ মিলিয়ন (২ কোটি ১৫ লাখ) টাকা হয়েছে। এই সাময়িক ধীরগতি সত্ত্বেও, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩০.২৪ মিলিয়ন টাকা বার্ষিক মুনাফা করেছে এবং পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অংশ হিসেবে বিগত ৫ বছর ধরে নিয়মিত ২০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) বিতরণ করে আসছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীনের ১১টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও শীর্ষ কর্মকর্তারা এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। গত ২৫ জুন অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের এই অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেন।
বিডা চেয়ারম্যান জানান, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সফলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের করনীতি-সংক্রান্ত পূর্বাভাস (ট্যাক্স আউটলুক) প্রকাশ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপের, যারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পিপিপি প্রকল্পে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া ঝংসিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার শিল্প স্থাপনে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং সাংহাই এসইউএস এনভায়রনমেন্ট বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৮৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন ও বন্ডেড গুদাম নির্মাণে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে সিসিইসিসি, যার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে চায়না ফিউচার এনার্জির গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে ২৫০ মিলিয়ন ডলার, শেনজেন কাইফা টেকনোলজির স্মার্ট বৈদ্যুতিক মিটার উৎপাদনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং এসএফ এক্সপ্রেসের কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে ১৮০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। অন্যদিকে হুয়াক্সিন টেক্সটাইল পায়রায় সুতা উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১৯০ মিলিয়ন ডলার এবং সিআরআরসি জিয়ান বিএমটিএফের সাথে যৌথভাবে রেল যন্ত্রাংশ কারখানায় ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও চায়না কেপাই এডুকেশন আধুনিক অ্যাপ্লাইড বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে ২৭০ মিলিয়ন ডলার এবং শানডং ঝংসিন ফার্মাসিউটিক্যাল ভেষজ উদ্ভিদ চাষে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস আজ রবিবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দিয়ে লেনদেন শুরু হয়েছে। মূলত বড় মূলধনী এবং শক্তিশালী মৌল ভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বৃদ্ধির কারণে বাজার এই গতিশীলতা পেয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন বাজেটে কর রেয়াত বা ট্যাক্স রেবেট সংক্রান্ত কর প্রণোদনা ঘোষণার পর সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইকুইটি বিনিয়োগের আকর্ষণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসকে চাঙ্গা করে তুলেছে।
লেনদেনের প্রথম দেড় ঘণ্টার (৯০ মিনিট) মধ্যেই প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক লেনদেন ৫২৫ কোটি (৫.২৫ বিলিয়ন) টাকা অতিক্রম করেছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রমাণ দেয়। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক 'ডিএসইএক্স' (DSEX) ৪৮ পয়েন্ট বা ০.৮৪ শতাংশ বেড়ে ৫,৭০০ পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-পরিবহন সংকটের উদ্বেগ কিছুটা কমে আসায় বৈশ্বিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মনোভাব ইতিবাচক ছিল এবং তারা বাছাইকৃত ব্লু-চিপ শেয়ার ক্রয়ে সক্রিয় ছিলেন।
আজকের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে বেক্সিমকো লিমিটেড। গত ৯ জুন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর শেয়ারটির দর প্রায় ৭৫ শতাংশ সংশোধিত হয়েছিল, তবে আজ এটির দর ৯.৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩১.২০ টাকায় উন্নীত হয়। একই সাথে কোম্পানিটি ডিএসইর টার্নওভার চার্টের শীর্ষে অবস্থান করে, যেখানে এককভাবে প্রায় ৯৯ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের গ্লোবাল ডিপোজিটরি রসিদ (জিডিআর) লেনদেন পুনরায় শুরু হওয়ার খবরটিও বিনিয়োগকারীদের মাঝে ইতিবাচক উদ্দীপনা জুগিয়েছে।
বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৭৩টির দাম কমেছে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৭৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর। অধিকাংশ খাতের শেয়ারের দাম বাড়ায় পুরো বাজার জুড়েই এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে; সিএসইর প্রধান সূচক 'ক্যাসপি' (CASPI) ৯৮ পয়েন্ট বেড়ে ১৫,০২৪ পয়েন্টে এবং 'সিএসসিএক্স' (CSCX) সূচক ৬১ পয়েন্ট বেড়ে ৯,৩২৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের বাজারে আমদানিকৃত অফিশিয়াল স্মার্টফোনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আমদানিকৃত মোবাইল ফোনের ওপর দেওয়া বিদ্যমান শুল্কছাড়ের মেয়াদ আর না বাড়ানোর ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এই সিদ্ধান্তের কারণে বৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেটগুলোর দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে প্রিমিয়াম বা ফ্ল্যাগশিপ ফোন কিনতে ক্রেতাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ গুণতে হবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবৈধ বা 'গ্রে-মার্কেট'-এর হ্যান্ডসেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বৈধ আমদানিকারকদের টিকিয়ে রাখতে গত জানুয়ারিতে সরকার আমদানিকৃত স্মার্টফোনের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছিল। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই বিশেষ সুবিধার ফলে আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের ওপর কার্যকর করের মোট হার ৬৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৩.৪৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে এনবিআর এই প্রণোদনার মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ১ জুলাই থেকে কার্যকর করের হার পুনরায় পূর্বের ৬৪.২৫ শতাংশে ফিরে যাচ্ছে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)-এর সভাপতি জাকারিয়া শহিদ এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপ, প্রসেসর, মাদারবোর্ড এবং ব্যাটারির দাম ক্রমাগত বাড়ায় উৎপাদন খরচ ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী। এর ওপর আমদানি শুল্ক আগের অবস্থায় ফিরে গেলে স্মার্টফোনের দাম অনিবার্যভাবে আরও বাড়বে, যা সাধারণ ক্রেতাদের আবারও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আসা অবৈধ গ্রে-মার্কেটের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে এনবিআরের মতে, গত কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ বা স্থানীয় উৎপাদন প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় এই শুল্কছাড় প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এন্ট্রি-লেভেল এবং মিড-রেঞ্জ ফোনের একটি শক্তিশালী সংযোজন শিল্প গড়ে উঠলেও অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং এবং শাওমির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনগুলোর জন্য দেশ পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা মনে করেন, স্মার্টফোন এখন আর কোনো বিলাসদ্রব্য নয়, বরং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ডিজিটাল অবকাঠামো। উচ্চ করের কারণে বৈধ পথে আমদানি কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব হারাবে এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও গ্রে-মার্কেটের দাপট কমানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ডলার সংকট ও এলসি (ঋণপত্র) জটিলতা কাটিয়ে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলপথ দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানি আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকার পর এই রেল ইয়ার্ডে ফিরতে শুরু করেছে আগের সেই চেনা কর্মব্যস্ততা। মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে এই রুট থেকে সরকারের রাজস্ব আয় এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংকট কাটিয়ে সচল এলসি: ব্যবসায়ীরা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছুদিন ডলার সংকট ও এলসি জটিলতার কারণে আমদানি স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী এলসি অনুমোদন করায় সয়াবিন, ভুসি, পাথর, পেঁয়াজ ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
শনিবার (২৭ জুন) পর্যন্ত দর্শনা রেল ইয়ার্ডে ২০টি মালবাহী রেক (ট্রেনের বগি সমষ্টি) খালাস করা হয়েছে। মাস শেষে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়ার্ডজুড়ে শ্রমিকদের ব্যস্ততা: সরেজমিনে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেল ইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ভারত থেকে আসা ওয়াগনগুলো থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। এরপর সেসব পণ্য চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী শাহিন পারভেজ জানান, পণ্য আমদানিতে এখন আর কোনো বড় সমস্যা নেই। নিয়মিত এভাবে ট্রেন এলে ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন সাধারণ দিনমজুর ও কুলি শ্রমিকেরা।
রাজস্ব ঘুরে দাঁড়ানোর আশা: কাস্টমসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছরে এই রুট দিয়ে প্রায় ২০০টি রেকে পণ্য আমদানির মহাপরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৯,৭৪৯টি ওয়াগনে ৫ লাখ৭৬ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়। রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: আমদানি কমে ৪,৪৮৬টি ওয়াগনে (২ লাখ ৫২ হাজার ১০১ মেট্রিক টন) নেমে আসে। ফলে রাজস্ব নেমে যায় মাত্র ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকায়।
তবে চলতি অর্থবছরে আমদানির গ্রাফ যেভাবে ওপরের দিকে উঠছে, তাতে রাজস্ব আদায় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশাবাদী কাস্টমস বিভাগ।
যা বলছেন স্টেশন মাস্টার: চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেল স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাজমা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর এই রুটে মালবাহী ট্রেনের চলাচল অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
তবে এখন পরিস্থিতির আশাব্যাঞ্জক উন্নতি হয়েছে। ভুট্টা, পাথর ও ফ্লাই অ্যাশের মতো পণ্যের ওয়াগন প্রতিনিয়ত আসছে। আমদানিকারকরা এই রুটের প্রতি আস্থা রাখলে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে এক অভাবনীয় সাফল্যের দেখা পেয়েছে গ্রিস। গত ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) দেশটিতে পর্যটকদের আগমন এবং এই খাত থেকে অর্জিত আয়—উভয় ক্ষেত্রেই এক ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউরো নিউজ’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসেই পর্যটন খাত থেকে গ্রিসের আয় প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ বা ৭৫ কোটি ২৯ লাখ ইউরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশটিতে পর্যটন খাত থেকে মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭৯ কোটি ইউরোতে। আয়ের এই উল্লম্ফন গ্রিসের জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী গতির সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যটকদের উপস্থিতিও গ্রিসে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে মোট ৫২ লাখ ৪০ হাজার বিদেশি পর্যটক গ্রিস ভ্রমণ করেছেন। এই সংখ্যাটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। মূলত দর্শনীয় স্থানগুলোর আধুনিকায়ন এবং কার্যকর প্রচারণার ফলেই ইউরোপের এই দেশটিতে পর্যটকদের আকর্ষণ বহুগুণ বেড়েছে। গ্রিসের পর্যটন খাতের এই অভাবনীয় অগ্রযাত্রার সংবাদটি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের নজর কেড়েছে।
দেশের ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদী বন্ড বা সুকুক বাজারে আনছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের লক্ষ্যে ২৭৩ দিন মেয়াদী এই ‘স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ইস্যু করা হচ্ছে। সাধারণ প্রবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি এই স্কিমে মাত্র ১০ হাজার টাকা থেকে বিনিয়োগ শুরু করা যাবে।
এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে চালু থাকা সরকারি সুকুকগুলো ছিল মূলত ৫ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী। তবে আগামীকাল রবিবার প্রথমবারের মতো এই স্বল্পমেয়াদী সুকুকের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই আবেদন প্রক্রিয়া চলবে। এই বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে এককালীন মুনাফা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এটি মূলত একটি ‘ইজারা সুকুক’ পদ্ধতি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল অর্থ এবং এর ওপর অর্জিত মুনাফা একসাথে বুঝে পাবেন। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান—সবার জন্যই বিনিয়োগের এই সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
আবেদনের নিয়মাবলী:
আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সহজেই এই নিলামে অংশ নিতে পারবেন। পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউল’ (এসএসএম) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যারা প্রথমবারের মতো এই খাতে বিনিয়োগ করবেন, তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর’ (এসআই) আইডি খুলে নিতে হবে। তবে আগে থেকে সুকুক বিনিয়োগকারী হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে নতুন করে আইডির প্রয়োজন হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগ শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ সরকারি গন্তব্য নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি সরকারও স্বল্প সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের সংস্থান করতে পারবে। এই সুকুকের বিপরীতে অন্য সব সরকারি সিকিউরিটিজের মতোই ‘রেপো’ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন বিনিয়োগকারীরা।
সুকুক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট:
শরিয়াহভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বিপরীতে সম্পদ বা নির্দিষ্ট প্রকল্পের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যে আইনি দলিল ইস্যু করা হয়, তাকেই সুকুক বলা হয়। বন্ডে বিনিয়োগকারীরা সুদ পেলেও সুকুকধারীরা নির্দিষ্ট সম্পদের আয় থেকে মুনাফার অংশ লাভ করেন। সুকুক শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো এমন একটি দলিল যা কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির ওপর মালিকানার প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে ৮ হাজার কোটি টাকার ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম সুকুকের যাত্রা শুরু হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ সরকার বিভিন্ন মেয়াদী সুকুকের মাধ্যমে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ কোটি টাকাই এসেছে সরকারি নিলামের মাধ্যমে।
বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সুকুক একটি স্বীকৃত শক্তিশালী অর্থায়ন পদ্ধতি। মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে শীর্ষস্থানে থাকলেও ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কাতার এমনকি অমুসলিম দেশ যেমন সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রেও এটি বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সুকুক বাজারের মোট মূলধন ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রির প্রবল চাপে শুক্রবার এশিয়ার প্রধান পুঁজিবাজারগুলোতে ভয়াবহ দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রি শুরু করলে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এদিন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক ‘কোসপি’ লেনদেনের একপর্যায়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেলে বাজারে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ‘সার্কিট ব্রেকার’ কার্যকর করে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখা হয়। চলতি সপ্তাহে তৃতীয়বার এবং এ বছরে পঞ্চমবারের মতো দেশটিতে এই পদক্ষেপ নিতে হলো। দিন শেষে কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত বেড়ে গেছে—বিনিয়োগকারীদের এমন ধারণাই এই দরপতনের মূল কারণ। এর ওপর গত বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠে। চিপ বা যন্ত্রাংশের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অ্যাপল তাদের আইপ্যাড ও ম্যাকবুকের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের বড় দরপতন ঘটে। অন্যদিকে মাইক্রোসফটও তাদের এক্সবক্স গেমিং কনসোলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এ বিষয়ে আলফা প্যাসিফিক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ডেভিড মাকারিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে যে উল্লম্ফন হয়েছিল, অনেক বিনিয়োগকারী এখন সেখান থেকে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য বাস্তবসম্মত কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করছেন তারা। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, তবে বাজার এখন অনেক বেশি বাছ-বিচার করছে।
জাপানের শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশটির প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ এদিন ৪ শতাংশের বেশি পয়েন্ট হারিয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংকের শেয়ারের দাম একদিনেই ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে গেছে। এ ছাড়া তাইওয়ান ও চীনের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের সূচক পতন পরিলক্ষিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার উচ্চ ব্যয় এখন সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। কিয়োটো ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন ক্যাপিটালের বিশ্লেষক রেমন্ড উ বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, সেই বিনিয়োগের তুলনায় এসব প্রযুক্তির চাহিদা কতটা দ্রুত বাড়বে এবং পণ্যের দাম বাড়লে ডিভাইসের বিক্রি কমে যাবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে অ্যাপলের শেয়ার একদিনে ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি খাতে অতি-বিনিয়োগের আশঙ্কায় শেয়ারবাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের খুচরা বা খুচরা ঋণ বাজারকে আরও গতিশীল করতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণপ্রাপ্তি সহজতর করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বা পার্সোনাল ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সময়সীমা বর্তমানের পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করা হয়েছে। একই সাথে ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit) বৃদ্ধির ওপর দীর্ঘদিনের যে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, তাও পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি সার্কুলার পাঠানো হয়েছে।
সংশোধিত এই নীতিমালার ফলে ব্যাংকগুলো এখন তাদের মোট ঋণ প্রবৃদ্ধির হারের চেয়েও বেশি হারে ভোক্তা ঋণের পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ করতে পারবে। এর আগে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল যে, একটি ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না তাদের ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি। এই ‘ক্যাপ’ বা সীমা তুলে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন আরও স্বাধীনভাবে ব্যক্তিগত ঋণ বিতরণে উৎসাহিত হবে। এতে বাজারে ঋণের প্রবাহ যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদাও দ্রুত মেটানো সম্ভব হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ এক ধাক্কায় তিন বছর বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির (EMI) পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এর ফলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শ্রেণির মানুষের জন্য ঋণের বোঝা বহন করা সহজ হবে এবং ব্যাংক থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী এই ঋণের পোর্টফোলিও সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত মে মাসে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত ঋণের সীমা ২০ লাখ টাকা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান এই নতুন উদ্যোগটি মূলত দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘ ছয় মাস বিরতির পর গত শুক্রবার (২৬ জুন) থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের (এলএসই) অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) পুনরায় লেনদেন শুরু হয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের। কোম্পানিটির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্টসের (জিডিআর) ওপর আরোপিত ট্রেডিং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর এই কার্যক্রম শুরু হয়। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের শেয়ারবাজারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি হবে।
শনিবার (২৭ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ডিবিএ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং পরবর্তী সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন যথাসময়ে প্রকাশ না করায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে বেক্সিমকো ফার্মার জিডিআর লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বিধিমালা অনুযায়ী, স্থগিতাদেশের মেয়াদ ছয় মাসের বেশি দীর্ঘায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তালিকাচ্যুত বা ডি-লিস্টিং হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা তালিকাচ্যুতি ঠেকাতে ডিবিএ-র মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
ডিবিএ জানায়, সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএসইসি ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর সমন্বয় করা হয়। পরবর্তীতে বিএসইসির বিশেষ অনুমতিক্রমে আয়োজিত বোর্ড সভায় কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন ও প্রকাশ করে। আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হওয়ায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ তাদের স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ডিবিএ মনে করে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত হবে। একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সময়োপযোগী সংস্কার এবং বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ সহযোগিতার জন্য ডিবিএ-র পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান, সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ এবং গণমাধ্যমের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১১০ কোটি ডলারের একটি বড় অংকের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। গত ২৬ জুন বৈশ্বিক এই দাতা সংস্থাটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঋণ সহায়তার কথা জানানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে সার ও জ্বালানির দাম এবং সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতেই এই উদ্যোগ। এর পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জঁ পেম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্য, সার ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র কৃষক এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।’
এই বিশাল অর্থায়নের একটি অংশ অর্থাৎ ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি’ বা খাদ্যনিরাপত্তায় জরুরি সহায়তা প্রকল্পের অধীনে। এই তহবিলের মাধ্যমে চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুম এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি অংশ আমদানি করতে হয়। এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৬ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার অর্ধেকই হবে ইউরিয়া। এর ফলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ও এই প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার সোলেমান কুলিবালি বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমন ও বোরো মৌসুম থেকে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাই সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই হুমকিতে পড়বে না, সেই সঙ্গে দারিদ্র্য বাড়বে, প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও।’
এদিকে, ঋণের বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে ‘কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স’ বা আপৎকালীন দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মসূচির আওতায়। এই অর্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নগদ সহায়তা প্রদান ও জীবিকা পুনর্বাসনে খরচ করা হবে। এর লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখা।
পাশাপাশি, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে, যাতে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও পানির মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। এই প্রকল্পের অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই ছাড় করার কথা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ লেসলি জিন ইউ করদেরো এ প্রসঙ্গে জানান, ‘বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাস করে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে বড় ধরনের সংকট থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হবে।’
বিশ্বজুড়ে ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে মৎস্য ও জলজ কৃষির বিশাল বাজার। বাংলাদেশের মৎস্যখাত বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক মৎস্য খাতে মোট প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে। বিশাল এই বাণিজ্যিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের উৎপাদন তথ্যের ভিত্তিতে মৎস্যচাষে (অ্যাকুয়াকালচার) বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণেও বিশ্বে নিজেদের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
রেকর্ড উৎপাদন ও বিশাল বাজারমূল্য
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৎস্য খাত এখন বিশ্বে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। ২০২৪ সালে মৎস্য ও মৎস্যচাষ মিলিয়ে বিশ্বে রেকর্ড ২৩ কোটি ৫০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৫.২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন এবং শৈবালের উৎপাদন ৪ কোটি টন।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো মৎস্যচাষ বা অ্যাকুয়াকালচার। শুধুমাত্র এই খাতেই ১৪ কোটি ২০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টন জলজ প্রাণীর মূল্য ৩৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং ৩ কোটি ৯০ লাখ টন শৈবালের মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার।
বিশ্ববাজারের নিয়ন্ত্রক এশিয়া ও শীর্ষ পাঁচ দেশ
বিশ্বের মৎস্য বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ এখন এশিয়ার হাতে। বৈশ্বিক মোট মৎস্য উৎপাদনের ৭৬ শতাংশ এবং মৎস্যচাষের ৯২ শতাংশই আসে এশিয়া থেকে।
মৎস্যচাষে উৎপাদিত জলজ প্রাণীর বৈশ্বিক বাজারে একক আধিপত্য দেখাচ্ছে ৫টি দেশ। মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮২ শতাংশই জোগান দিচ্ছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে চীনের অংশীদারত্ব সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে ভারত (১২%), ইন্দোনেশিয়া (৬%), ভিয়েতনাম (৫%) এবং বাংলাদেশ (৩%)।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে ২২ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত এবং ১৪ লাখ টন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য ‘মৎস্যচাষ’
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ ধরার চেয়ে এখন বাণিজ্যিকভাবে মৎস্যচাষ বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন জলজ প্রাণী উৎপাদিত হয়েছে, যার ৫৩ শতাংশই এসেছে মৎস্যচাষ থেকে এবং ৪৭ শতাংশ এসেছে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে। এই জলজ প্রাণীগুলোর প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
বাণিজ্যিক মৎস্য খামারিদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো পাখনাযুক্ত মাছ (Finfish), যা অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদিত মোট মাছের ৮৯ শতাংশ। এছাড়া সামুদ্রিক ও উপকূলীয় মৎস্যচাষেও বৈচিত্র্য এসেছে, যেখানে মোলাস্ক, খোলসযুক্ত প্রাণী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর চাষ বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই ৫৬৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের ৩ শতাংশ অংশীদারত্ব প্রমাণ করে যে মৎস্য খাত দেশের অর্থনীতিতে একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার এবং রপ্তানিমুখী মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলারের মৎস্য রপ্তানি বাণিজ্য গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যকে অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তার মান নিশ্চিতকরণ এবং নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে মূল্য সংযোজিত মৎস্যপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্যখাত আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
তাদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ এখনও সীমিত। তাই সরকারি নীতিসহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের মৎস্যশিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং এটি রপ্তানিমুখী অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ফলগুলোর মুকুটে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক নতুন পালক। বর্তমানে দেশে মোট ৬৪টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication) সনদ লাভ করেছে, যার মধ্যে একক ক্যাটাগরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখাচ্ছে ফল। আম, লিচু, কাঁঠাল ও কলার মতো সুপরিচিত ফলসহ বর্তমানে জিআই স্বীকৃত দেশীয় ফলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪টিতে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইনি স্বীকৃতির ফলে ফলগুলোর গুণগত মান যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী ‘অরিজিন-বেজড’ বা উৎস ভিত্তিক ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা, যারা এখন বাজারে তাদের উৎপাদিত ফলের ন্যায্য ও প্রিমিয়াম মূল্য নিশ্চিত করতে পারছেন।
কেন এই জিআই স্বীকৃতি?
জিআই মূলত একটি আইনি সুরক্ষা, যা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা উৎপাদন পদ্ধতির কারণে কোনো পণ্যের অনন্য স্বাদ ও ঘ্রাণকে স্বীকৃতি দেয়। কোনো একটি ফলের জাত অন্য এলাকায় চাষ হলেও, জিআইভুক্ত অঞ্চলের ফলের স্বকীয়তা ও সংরক্ষণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা হয়, যা একে বিশ্ববাজারে একটি বিশেষ ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করায়।
তালিকায় স্থান পাওয়া ১৪টি ফল:
বর্তমানে বাংলাদেশের জিআই তালিকায় আমের জয়জয়কার লক্ষ্য করা গেছে। এ তালিকায় রয়েছে:
তৈরি হচ্ছে ‘জিআই আম বেল্ট’
আমের একের পর এক জাত জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে একটি শক্তিশালী ‘জিআই আম বেল্ট’ বা বিশেষ আম বলয় গড়ে উঠছে। এর ফলে সিজনজুড়ে বিভিন্ন সময়ে উন্নত মানের আম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বাজারজাত করার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিগন্ত ও কৃষি-পর্যটন:
ফলের এই ভৌগোলিক স্বীকৃতি শুধু রপ্তানি সম্ভাবনাকেই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ বা কৃষি-পর্যটন বিকাশেও নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। লটকন, লিচু বা কাঁঠালের মতো ফলগুলোর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, জিআই স্বীকৃতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ফলগুলো ‘প্রিমিয়াম পণ্য’ হিসেবে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হবে।