মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে খেজুরের চাহিদা তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমানের এই দেশে ১২ মাসই কম-বেশি খেজুরের চাহিদা থাকে। তবে ইফতারে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ এই পণ্যটির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায় পবিত্র রমজান মাসে। আসন্ন রমজান শুরু হচ্ছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসের শুরুতেই। এরই মধ্যে পণ্যটি আমদানিতে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে রমজানকে সামনে রেখে পণ্যটি আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন তারা। একাধিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খেজুর আমদানি করতে কিছু কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক নগদ শতভাগ এলসি মার্জিন চাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এতে আসন্ন রমজানে বাজারে খেজুরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাধারণত কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ওই পণ্য দেশে আসার পর বিল পরিশোধ করার সুযোগ দেওয়া হয়, যা এলসি মার্জিন হিসেবে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের একটি অংশ ব্যাংকগুলোর কাছে জমা দিতে হয়। বিগত বছরগুলোতে রমজানের আগে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি সহজীকরণের লক্ষ্যে কিছু পণ্যে সংরক্ষিতব্য নগদ মার্জিনের হার ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে খেজুরের চাহিদা বিবেচনায় এ পণ্যটিতে নগদে এলসি মার্জিনে শিথিলতার সুবিধা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে রমজান মাসকে সামনে রেখে খেজুর আমদানিতে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্যূন ১০ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালেও পণ্যটি আমদানিতে এলসি মার্জিন ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। তবে এরই মধ্যে ২০২৫ সালের রমজানের চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা পণ্যটির আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও কিছু কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক এলসি খুলে শতভাগ নগদ দাবি করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খেজুর আমদানি করা একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেন, এ বছর রমজান মাস উপলক্ষে খেজুর আমদানি করতে কোনো কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নগদ ১০০ শতাংশ মার্জিন ছাড়া আমদানি-এলসি খুলতে অপারগতা প্রকাশ করছে। কিন্তু আমাদের পক্ষে শতভাগ নগদে কোনোভাবেই জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদার তুলনায় পণ্যটির জোগান অপর্যাপ্ত থাকবে বলে মনে করছি। এতে আসন্ন রমজানে বাজারে খেজুরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে পণ্যটির দাম।
অপর এক ব্যবসায়ী গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে এখনই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যান্য বছরের মতো খেজুরের চাহিদা বিবেচনায় পণ্যটির আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নগদ মার্জিনে এলসি খোলার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি। অন্যথায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এ দেশে সিয়াম সাধনার মাসে সর্বসাধারণের জন্য পণ্যটি ক্রয় করা কষ্টকর হতে পারে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে খেজুরসহ মোট আটটি পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত নগদ মার্জিন ন্যূনতম রাখার নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয় ওই নির্দেশনায়। এ বছরের মার্চ মাসে রমজান শুরু হয়। তাই পণ্যটি আমদানির ক্ষেত্রে রমজানের দুই মাস আগে এলসি মার্জিনে শিথলতার সুযোগ পাওয়া যথাযথ সময়ে হয়নি বলে মনে করছেন আমদানিকারকরা।
তাদের মতে, রমজানের অন্তত ৫-৬ মাস আগেই এমন ঘোষণা আসা উচিত। কেননা পণ্যটির চাহিদা বিবেচনায় অনেক আগেই আমদানি করে হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখতে হয় তাদের। আগামী রমজান মাসের জন্য এখনই যদি সরকার থেকে সাপোর্ট পাওয়া না যায় তাহলে পণ্যটির সরবরাহ এবং দাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
আমদানিকারকরা আরও জানিয়েছেন, দেশে প্রতি বছর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর পুরোটাই আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চল থেকে। ২৫ থেকে ৩০ ধরনের খেজুর আমদানি করা হয়। সারা বছর খেজুরের যে চাহিদা থাকে, এর চেয়ে তিন থেকে চার গুণ চাহিদা বেড়ে যায় রমজানে। ওই এক মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টন খেজুরের দরকার হয়। সেই চাহিদা মেটাতে পাঁচ-ছয় মাস আগে থেকেই খেজুর আমদানি করে হিমাগারে মজুত করতে হয়। তাই এখনই যদি এলসি খুলতে সৃষ্ট সমস্যা দূর করা সম্ভব না হয়, তাহলে আগামী রমজানে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে।
তীব্র জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশে টানা পাঁচ মাস ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে, যা আগের মাস জুনে ছিল দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগে মে মাসে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বর্তমান অর্জনের হার অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর দেশে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বেসরকারি ঋণের চাহিদা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা ছিল। তবে নির্বাচনের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস এবং তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম জানান, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্পে যাচ্ছেন না; তবে আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে ধারাবাহিক স্থবিরতা দেখা গেছে। এই সময়ে অধিকাংশ শিল্পোদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণ না করে বরং উৎপাদন কমিয়েছেন; এমনকি চলমান অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উল্লেখ করেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি মূলত চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ না থাকায় শিল্পমালিকদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগ বা ব্যাংক ঋণ নেওয়ার আগ্রহ নেই।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চাহিদার ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণেও ঋণ সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান জানান, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণের বড় চাপে রয়েছে। ফলে মূলধন সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং তহবিল নিরাপদ রাখতে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গ্যাস সংকট যুক্ত হয়ে বেসরকারি খাতের সামগ্রিক ঋণ প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে রেখেছে।
চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আবহাওয়াজনিত সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্যবাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসির বরাতে হংকংভিত্তিক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ফুতুবুল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার বর্তমানে সরবরাহ ঘাটতি ও বাড়তি চাহিদার ‘সুপার স্কুইজ’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের গড় মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে এইচএসবিসি। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের সম্ভাব্য পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পূর্বাভাসও আগের তুলনায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।
এইচএসবিসির গ্লোবাল কমোডিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল ব্লক্সহ্যাম জানিয়েছেন, ইরান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও এল নিনোর মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে; অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতায় সামগ্রিক পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে পঞ্চম বছরে পদার্পণ করা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেল ও খাদ্যশস্যসহ কৃষিপণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাইরেও সালফার, রাসায়নিক সার, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম, উড়োজাহাজের জ্বালানি ও ন্যাফথার মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাপ্যতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং ধাতু, রাসায়নিক ও কৃষি খাতের পণ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্লুমবার্গ কমোডিটি সূচক চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে মোট ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক মজুদের সুরক্ষা স্তর দ্রুত কমে আসায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ‘ককলস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ব পণ্যবাজার বর্তমানে একটি শক্তিশালী ‘সুপার বুল’ ধারায় রয়েছে; যার ফলে যেকোনো নতুন সরবরাহ বিঘ্ন পণ্যমূল্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সামগ্রিক সরবরাহ ঘাটতি ও এআই অবকাঠামো নির্মাণের বাড়তি চাহিদার কারণে পণ্যবাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ সাধারণ অর্থনৈতিক চক্রের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তিন সপ্তাহের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে যাওয়ার পর আবারও তামার দামে কিছুটা উত্থান দেখা গেছে। গতকাল লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে (এলএমই) তিন মাস মেয়াদি তামার দাম দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ১৪ হাজার ১৫৮ ডলারে উন্নীত হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার ধাতুটির দাম ১৩ হাজার ৯২৬ ডলারে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে এই ধাতুটির সর্বনিম্ন মূল্য।
লন্ডনের পাশাপাশি চীনের বাজারেও তামার দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। চীনের সাংহাই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া তামার চুক্তিমূল্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ১ লাখ ৭ হাজার ৬১০ ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে। মূলত চীনে তামার চাহিদা বৃদ্ধির কিছু ইতিবাচক লক্ষণ বাজারে এমন প্রভাব ফেলেছে। দেশটিতে আমদানি করা তামার চাহিদার অন্যতম নির্দেশক ‘ইয়াংশান কপার প্রিমিয়াম’ গত মঙ্গলবার বেড়ে প্রতি টন ১১০ ডলারে উঠেছে, যা আগস্ট মাসের শুরুর দিকের পর সর্বোচ্চ।
তবে তামার বাজারে এই সামান্য উত্থান দেখা গেলেও বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনো এক ধরনের সতর্কতা বিরাজ করছে। এর মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) কর্তৃক নতুন করে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর হওয়ায় বর্তমানে ফেডের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ফেডারেল রিজার্ভ যদি সত্যিই সুদহার বাড়ায়, তবে তা সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে শিল্প ধাতু হিসেবে বিশ্বজুড়ে তামার চাহিদাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বর্তমান বাজারে তামার দাম কিছুটা বাড়লেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক শিল্পের চাহিদার ওপর।
চীনের অর্থনীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এখন একটি স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত দেশটির আবাসন খাত ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ায় ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পাশাপাশি নতুন শিল্প খাতগুলোর ঋণের চাহিদাও এই বিশাল ঘাটতি পুরোপুরি মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার (পিবিওসি) গভর্নর প্যান গংশেং সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দেশটির অর্থনীতির বর্তমান এই চিত্র তুলে ধরেছেন।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাময়িকী ‘কিউশি’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পিবিওসির গভর্নর এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি মূলত চীনের উন্নত মানের অর্থনীতি তৈরির দিকে অগ্রসর হওয়ারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাই মাসে চীনে নতুন ঋণগ্রহণের পরিমাণ রেকর্ড হারে কমে যায়। আগস্ট মাসে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশ কম ছিল। বিশেষ করে পরিবার ও ব্যবসা খাতগুলোতে ঋণগ্রহণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও এখন চাপের মুখে রয়েছে।
প্যান গংশেং জানান, চীনের অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটার ফলেই ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে জমে থাকা বকেয়া ঋণের মোট পরিমাণ ২৮০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি। এর একটি বড় অংশই আবাসন খাত ও স্থানীয় সরকারের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এসব খাত এখন সংকুচিত হওয়ায় সেখানে নতুন করে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমেছে। ফলে আগের মতো দ্রুতগতিতে সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি এখন যেমন কঠিন, তেমনি এর কোনো বাস্তব প্রয়োজনীয়তাও নেই।
অন্যদিকে, চীনের অর্থনীতিতে বর্তমানে উচ্চ প্রযুক্তি উৎপাদন ও সবুজ প্রযুক্তির মতো খাতগুলো দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এসব আধুনিক খাতের অবদান ছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি। তবে এসব নতুন ব্যবসা জমি বা বিশাল কারখানার চেয়ে প্রযুক্তি, তথ্য ও মেধাস্বত্বের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যাংক ঋণের ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলক কম, যার ফলে আবাসন খাতের সৃষ্ট ঋণের বিশাল ঘাটতি তারা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
জাপানের অর্থনীতিতে টানা চতুর্থ মাসের মতো বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটিতে রফতানি আয়ের পরিমাণ বাড়লেও তার চেয়ে বেশি হারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বাণিজ্য ব্যবধান ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মূলত বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং নিজস্ব মুদ্রার মানের অবনতিই এই ধারাবাহিক ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, গত আগস্ট মাসে দেশটির মোট রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৬ হাজার ৪৭০ কোটির সমান। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রফতানি আয় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু রফতানি বাড়লেও একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।
রফতানির চেয়ে আমদানির হার বেশি হওয়ায় আগস্ট মাসে জাপানের মোট বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের চড়া দাম এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান কমে যাওয়ার কারণেই দেশটির আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলেই রফতানি বাড়ার পরও বিশাল এই বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে জাপানকে।
তবে সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যেও জাপানের প্রযুক্তি পণ্য রফতানিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী চিপ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যাপক চাহিদার কারণে জাপানের সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী সম্পর্কিত পণ্যের রফতানি ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া এই সময়ে দেশটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতির রফতানিও বেড়েছে প্রায় ৪০ দশমিক ১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের মুখে বুধবার এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে অস্থির ও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের পর এই প্রথম ফেড নতুন করে সুদের হার বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সামান্য নিম্নমুখী হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তিও কাজ করছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও সুদের হার বৃদ্ধির নতুন আশঙ্কায় সেই অগ্রগতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইমিংয়ে জ্যাকসন হোল সম্মেলনে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত দেওয়ার পর থেকেই এ সম্ভাবনা জোরালো হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে শক্তিশালী কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির তথ্য উঠে আসায় বাজারে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন ৯০ শতাংশের বেশিতে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি চড়া থাকার আশঙ্কায় চলতি সপ্তাহে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৫ শতাংশের ওপরে উঠেছে, যা ২০০৭ সালের পর অর্থাৎ ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আগে আর দেখা যায়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এখন ফেডের নীতিনির্ধারণী কমিটির ১২ জন সদস্যের ভোটের ফলাফলের ওপর। ফরেক্স ডটকমের বিশ্লেষক ম্যাট ওয়েলার জানান, নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তিনজন বা তার বেশি সদস্য যদি সুদের হার বাড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নেন, তবে বাজার এটিকে ধারাবাহিক সুদের হার বৃদ্ধির সূচনা না ভেবে একটি সাময়িক ‘বীমামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তবে ফেড চেয়ারম্যানের বিরোধিতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় কমিটির সদস্যরা একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও এক দফা সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়ে উঠবে।
ওয়াল স্ট্রিট ও ইউরোপের শেয়ারবাজারের দরপতনের পর এশিয়ার প্রধান প্রধান সূচকগুলোতেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর পাশাপাশি শীর্ষ এআই উদ্যোক্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উন্নয়নের গতি শ্লথ করার আহ্বানের কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাবে বুধবার টোকিও, সাংহাই, সিডনি ও ম্যানিলার শেয়ারবাজারে সূচকের পতন হয়েছে; তবে হংকং, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, তাইপে ও জাকার্তার বাজারে সূচক কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সিউলের বাজার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল।
ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার ও ঋণ আদায়ে জোরদার উদ্যোগের ফলে গত নয় মাসে দেশে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) অনুপাত প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুন শেষে ২ দশমিক ৯৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। তবে অনুপাত কমলেও খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ এখনো বেশ চড়া। গত বছরের সেপ্টেম্বরের ৬ লাখ ৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার বিপরীতে চলতি বছরের জুন শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ব্যাংকিং খাতের গোপন থাকা বা কৃত্রিমভাবে আড়াল করা ঋণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ হ্রাসে এককালীন প্রস্থান নীতি এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলসহ বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব নীতিগত উদ্যোগের সুফল অর্থনীতিতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হলে খেলাপি ঋণের অনুপাত পর্যায়ক্রমে আরও কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাতের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকাশিত তথ্যে প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি আসত না। ২০০৮ সালে খেলাপি ঋণ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে তা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা দেখানো হয়, যদিও শ্বেতপত্রে প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা বলে উঠে আসে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও ব্যাংকিং সংকট উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারের বিকল্প নেই এবং এ জন্য খেলাপি ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম চিহ্নিত করে ব্যাংকের হিসাব পরিষ্কার করার এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সঠিক ঋণ মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘আইএফআরএস-৯’ অনুযায়ী সম্ভাব্য ঋণক্ষতি হিসাবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং ঋণ ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, খেলাপি ঋণ কমার বর্তমান প্রবণতা ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি ইতিবাচক প্রাথমিক সংকেত হলেও এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য ভাবার সুযোগ নেই। টেকসই অগ্রগতির জন্য কেবল পরিসংখ্যানের দিকে না তাকিয়ে ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই-বাছাই ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের প্রান্তিকের তথ্যে এই অগ্রগতির স্থায়ী রূপ বোঝা যাবে, যা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সার্বিক ঋণশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক সফরের মাধ্যমে দূর করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) কার্যালয়ে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি।
বুধবার বিসিসিসিআইয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে চেম্বারের ভূমিকার প্রশংসা করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এবং বিসিসিসিআইয়ের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো যথাযথ বিবেচনার যোগ্য বলে মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে বিসিসিসিআই সভাপতি মো. খোরশেদ আলম বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন। যার মধ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেটের মাধ্যমে চীনে দেশীয় পণ্যের প্রচার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, কাঁচামালের ঘাটতি মেটানো, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহযোগিতা এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৈঠকে বিসিসিসিআই সভাপতির উপদেষ্টা শহীদ আলম চেম্বারের বর্তমান কার্যক্রম ও সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরে জানান, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির অধীনে সংগঠনটি আরও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া তিনি চেম্বারের সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মহাপরিচালককে অবহিত করেন এবং জানান যে, বিধিবিধান অনুসরণ করে সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সর্বজনগ্রাহ্য কমিটি গঠিত হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় বিসিসিসিআইয়ের মহাসচিব, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতিবৃন্দ, পরিচালকবৃন্দ, সাধারণ সদস্য এবং চেম্বারের নির্বাহী পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও সরকারি প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে টেকসই বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর একমত পোষণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে বিশ্ববাণিজ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জুতা শিল্প। লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) তথ্যমতে, দেশের জুতা রপ্তানির ৩০ শতাংশের বেশি যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে চীনের হিস্যা প্রায় ৩৮ শতাংশ কমে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের হাতছাড়া হওয়া বাজারের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ দখল করতে পারলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এ খাতের রপ্তানি আয় পৌনে দুই বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ২২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের জুতা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৫ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে চামড়ার জুতা থেকে এসেছে ১৫ কোটি ১০ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং নন-লেদার জুতা থেকে ১০ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ এ খাত থেকে মোট আয় হয়েছিল ১৭৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
সাশ্রয়ী ও টেকসই হওয়ায় বিশ্বজুড়ে নন-লেদার জুতার চাহিদা বাড়ায় দেশের উদ্যোক্তারাও বড় পরিসরে কারখানা গড়ে তুলছেন। ময়মনসিংহের ভালুকায় ন্যাশনাল পলিমার গ্রুপের ‘শুনিভার্স ফুটওয়্যার’ কারখানায় প্রায় চার হাজার শ্রমিকের পরিশ্রমে মাসে গড়ে ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের জুতা রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া রংপুরের তারাগঞ্জে শতভাগ রপ্তানিমুখী ‘ব্লিং লেদার’ গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠাচ্ছে, যাদের দৈনিক উৎপাদন ৫০ হাজার জোড়ায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমাতে গাজীপুরের মৌচাকে ৩৫ একর জায়গাজুড়ে ‘বাংলাদেশ শু সিটি’ গড়ে তুলেছে জেনিস গ্রুপ, যেখানে জুতা তৈরির প্রায় ৫০টি প্রয়োজনীয় উপকরণ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।
তবে সম্ভাবনার বিপরীতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট এই খাতের উৎপাদন ব্যাহত করছে। এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দৈনিক ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গিয়ে খরচ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাচ্ছে; ফলে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) মান নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের অসন্তোষ থাকায় অনেক উদ্যোক্তাকে বিদেশ থেকেই কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্ব জুতা বাজারে ৬০ শতাংশ হিস্যা নিয়ে শীর্ষস্থানে থাকা চীনের পরেই রয়েছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, তুরস্ক ও ভারত। বাংলাদেশের হিস্যা এখনো তুলনামূলক কম হলেও কম শ্রমমূল্য ও শুল্ক সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশমুখী হচ্ছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, জ্বালানি সমস্যার দ্রুত সমাধান, সাভারের সিইটিপির উন্নয়ন এবং নীতি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জুতা রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৭ দশমিক ৩৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে লক্ষণীয় বৃদ্ধি দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬ দশমিক ৩৭৫ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৯৭৬ মিলিয়ন বা প্রায় ৯৮ কোটি মার্কিন ডলার।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দুই সপ্তাহের হিসাবেও প্রবাসী আয় আসার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। তথ্যানুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ১ দশমিক ৫২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার; ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ধারাবাহিকতায় দৈনিক রেমিট্যান্স প্রবাহেও গতি অব্যাহত রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, কেবল ১৪ সেপ্টেম্বর এক দিনেই প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে ৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার এই শক্তিশালী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান ও বাহ্যিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে হালাল পণ্য অন্যতম প্রধান খাত হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। এ লক্ষ্যে ‘হালাল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম প্রধান খাত’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত নীতিমালা-ভিত্তিক প্রতিবেদন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সোমবার ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের এক বৈঠকে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) এই খাতের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের পর প্রতিবেদনটি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বিসিআই জানিয়েছে, বৈশ্বিক হালাল বাজারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংগঠনটি কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি অংশীজনদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক এবং ১৮ জুলাই সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে দিনব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করা হয়, যার সুপারিশমালার ভিত্তিতেই এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেশে হালাল পণ্যের বিকাশ ও রপ্তানি বাড়াতে একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও শরিয়া মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ, কার্যকর হালাল সনদ ব্যবস্থা প্রবর্তন, রপ্তানি বৃদ্ধির সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রতিবেদনে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিগত সহায়তা ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এ খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে হালাল পণ্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শীর্ষ চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স রেটিং বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে বাড়িয়ে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে সংস্থাটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘ইস্যুয়ার’ এবং ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিংকে ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’-এ অপরিবর্তিত রেখেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গতি ফেরা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড প্রবাসী আয়ের ওপর ভিত্তি করে ঋণমানের এই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক উত্তরণ এবং নতুন সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নীতি সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার থাকলেও ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে চার মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা দেশের বাহ্যিক অর্থায়নকে সুরক্ষা দিচ্ছে। এই স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে এবং মূল্যস্ফীতি পর্যায়ক্রমে কমে আসার আগে ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে।
সার্বিক পূর্বাভাসে ইতিবাচক বার্তা থাকলেও সংকুচিত রাজস্ব ভিত্তি এবং ব্যাংকিং খাতের তীব্র দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের মূল ঋণমান ‘বি২’-তেই বহাল রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সংস্কারের ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর চিত্র উঠে এসেছে এবং ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা নিশ্চিতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ পুনর্গঠন বাবদ প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের মোট ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও অর্জিত রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি সন্তোষজনক রয়েছে এবং ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ, যা নির্দেশ করে খাতটির মূল সমস্যা তারল্য সংকট নয় বরং মূলধনের ঘাটতি।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে দেশের জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সংকট। সম্প্রতি এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে বিদ্যুৎ ও শিল্প কারখানায় যে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছিল, তা দেশের জ্বালানি খাতের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করেছে। এছাড়া আগামী বছরগুলোতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটলে রপ্তানি বাণিজ্য এবং সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। অবশ্য তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ঋণমান আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে মুডি’স। তবে ব্যাংকিং খাতের বিশাল আর্থিক দায়ভার সরাসরি জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে, বৈদেশিক অর্থায়নের পথ সংকুচিত হলে কিংবা পুনরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের ঋণমান পুনরায় অবনমন হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) কৃষিপণ্যের গড় দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। তবে উৎপাদিত পণ্যের দাম কমলেও একই সময়ে কৃষিতে ব্যবহৃত উপকরণ ও সেবার ব্যয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ইইউর পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের বরাতে হেলেনিক শিপিং নিউজ এ খবর জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে টানা তৃতীয় প্রান্তিকের মতো কৃষিপণ্যের দামে পতন দেখা গেল।
ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০টি সদস্য রাষ্ট্রে কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে ডেনমার্কে, যেখানে কৃষিপণ্যের দাম কমেছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া আয়ারল্যান্ডে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া উভয় দেশেই দাম ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ করে কমেছে।
অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কমলেও কৃষিকাজে ব্যবহৃত পণ্য ও সেবামূল্য ইইউর সব সদস্য দেশেই বেড়েছে। দেশগুলোর মধ্যে লিথুয়ানিয়ায় উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খরচ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, যার হার প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া রোমানিয়ায় এই ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লাটভিয়ায় বেড়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রধান কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে আলোচ্য প্রান্তিকে অঞ্চলজুড়ে দুধের দাম ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যের দাম ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে কৃষিতে ব্যবহৃত জ্বালানি ও লুব্রিক্যান্টের ব্যয় ২২ শতাংশ এবং সার ও মাটি উন্নয়ন উপকরণের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। উৎপাদিত পণ্যের কম মূল্য এবং উৎপাদন উপকরণের বাড়তি ব্যয়ের কারণে ইউরোপের কৃষকরা তীব্র আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন।