টানা দুই সেশনে বাড়ার পর গতকাল মঙ্গলবারও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ নিহত, ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পর গাজার সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের বাজার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকালে আগামী ডিসেম্বর মাসের জন্য বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩ সেন্ট বেড়ে ৭১ দশমিক ৮৩ ডলারে উঠেছে। এ ছাড়া নভেম্বর মাসের চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআইয়ের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১ সেন্ট বেড়ে ৬৮ দশমিক ২৮ ডলারে উঠেছে।
এর আগে, সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম নভেম্বরের সরবরাহ চুক্তিতে আগের দিনের তুলনায় ১ ডলার ১২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাড়ে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য পৌঁছায় ৭৩ ডলার ১০ সেন্টে। ডিসেম্বরের সরবরাহ চুক্তিতে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে আগের দিনের তুলনায় ১ ডলার শূন্য ৪ সেন্ট বা ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয় ৭২ ডলার ৫৮ সেন্টে। অন্যদিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম আগের দিনের তুলনায় ৯৩ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাড়ে; ব্যারেলপ্রতি মূল্য স্থির হয়েছে ৬৯ ডলার ১১ সেন্টে।
এদিকে বিদায়ী সেপ্টেম্বরে ব্রেন্ট ফিউচারের দাম ৯ শতাংশ কমেছে। এ নিয়ে টানা তিন মাস ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর আর কোনো মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এতটা কমেনি। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৭ শতাংশ কমেছে- এক বছরের মধ্যে কোনো প্রান্তিকে এটাই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ মূল্যহ্রাস। একইভাবে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম গত মাসে ৭ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ১৬ শতাংশ কমেছে।
এর আগে, গত শুক্রবারও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে গত সপ্তাহজুড়ে তেলের দাম কমেছে। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত ব্রেন্টের দাম কমেছে ৩ শতাংশের মতো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম কমেছে ৫ শতাংশের মতো।
দেশের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না নামায় এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান থাকায় নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতেও কঠোর ও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবারও সংকোচনমূলক নীতির ধারা অব্যাহত রাখার জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে বহুল আলোচিত নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের এই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভায় এই নতুন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, নতুন অর্থবছরের বড় বাজেট, প্রণোদনা কর্মসূচি, তারল্য সহায়তা এবং ডলার ক্রয়ের কারণে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি হয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে; তাই এই মুহূর্তে নীতি সুদহার কমিয়ে সম্প্রসারণমূলক বা সহজ নীতিতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সরকার নতুন অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম এই সতর্ক অবস্থানকে সমর্থন করে বলেন, “বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার কমিয়ে বাজার সহজ করা সমীচীন হবে না। রাজস্বনীতি যেখানে সম্প্রসারণমুখী, সেখানে মুদ্রানীতিও সহজ করা হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সতর্ক বা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে।”
অন্যদিকে ভিন্ন মত পোষণ করে পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, “শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। করব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। বর্তমানে উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ছে। আমার মতে, নীতি সুদহার ১ শতাংশ কমিয়ে ৯ শতাংশে আনা হলে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগে গতি ফিরত।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরোপুরি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে যায় এবং নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসের মুদ্রানীতিতেও এটি ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) নিম্নসীমা সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অর্থবছর শুরুর আগেই সময়োপযোগী একটি মুদ্রানীতি দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি ‘বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক’ (BGIS) জারির মাধ্যমে বাজার থেকে ৫,৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। ২৭৩ দিন মেয়াদি এই ইজারা সুকুক বন্ড বা ইসলামিক ট্রেজারি বিলের নিলামে ইসলামী ব্যাংক ও শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে অভূতপূর্ব ও রেকর্ড ভাঙা আগ্রহ দেখা গেছে। সরকারের নির্ধারিত চাহিদার তুলনায় এবার ১০ গুণেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫৬,৬০৭ কোটি টাকার বিড (আবেদন) জমা পড়েছে। দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ বা বিনিয়োগের গতি ধীর থাকায়, ইসলামী ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সুকুককে সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা।
রোববার (২৮ জুন, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংক বার্ষিক ৯.৩৬ শতাংশ ভাড়া (মুনাফা) হারে প্রথমবারের মতো এই স্বল্পমেয়াদি সুকুক নিলামের আয়োজন করে। এই ইস্যুর বিপরীতে জমা পড়া ৫৬,৬০৭ কোটি টাকার বিশাল তহবিল থেকে সরকার কেবল তার নির্ধারিত ৫,৫০০ কোটি টাকা গ্রহণ করেছে। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২’-এর বিপরীতে এই সুকুক বা ইসলামিক বন্ডটি জারি করা হয়েছে। এই নিলামে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক একাই ৪,৪০০ কোটি টাকার আবেদন করেছিল, তবে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ব্যাংকটি প্রোপোরশনেট (অনুপাতিক) হারে মাত্র ৪৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পেয়েছে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকগুলো সরকারের ঘাটতি বাজেট মেটাতে যেভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে দেদারসে বিনিয়োগের সুযোগ পায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য সেই বিকল্প খুবই সীমিত। ফলে সুকুকই তাদের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যম। তিনি আরও জানান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায় থেকেও উল্লেখযোগ্য আবেদন এসেছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তি পর্যায়ের সকল গ্রাহকের আবেদনই (যেমন ব্যাংকের মাধ্যমে আসা ৬ কোটি টাকা) শতভাগ অনুমোদন করেছে।
সুকুকটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একটি ‘ইজারা সুকুক’। যার ফলে ২৭৩ দিনের মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারীরা মূল অর্থের সঙ্গে এককালীন অর্জিত মুনাফা বা ভাড়া ফেরত পাবেন। এতে সাধারণ নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত মোট ১১ বার সুকুক জারি করেছে, যার মধ্যে আগের ১০টিই ছিল ৫ ও ১০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি বন্ড। আর ১১তম এই সুকুকটি ছিল দেশের প্রথম স্বল্পমেয়াদি ইজারা সুকুক। সব মিলিয়ে সরকার এই ইসলামিক ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মোট ৫৩,৫০০ কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহ করল। যার মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই ৫টি সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে তোলা হয়েছে ২৯,৫০০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে সরকার সুকুকের বাজার থেকে আরও প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দূরদর্শী পরিকল্পনা করছে, যা দেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম চার অর্থবছরের (২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২) দীর্ঘদিনের বকেয়া ও অনাদায়ী আয়কর বাবদ মোট ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা এককালীন পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে এসে সরকারের এই পাওনা পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিএসসিএলের পক্ষ থেকে পাঠানো এক অফিশিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দীর্ঘদিনের এই অনাদায়ী বকেয়া ট্যাক্স নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় কোনো কিস্তি বা বিলম্ব না করে এককালীন ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। বিএসসিএল কর্তৃপক্ষ মনে করে, অতীতের এই বড় আর্থিক দায় পরিশোধের সাহসী উদ্যোগ তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মাইলফলক পদক্ষেপ। এই দায়মুক্তি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তিকে আরও বেশি সুসংহত করবে এবং ভবিষ্যতে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমাদুর রহমান এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএসসিএলের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা, সততা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। প্রতিষ্ঠানের অতীতের যেসব বড় বড় আর্থিক দায় অনিষ্পন্ন বা বকেয়া অবস্থায় পড়ে ছিল, সেগুলো পর্যায়ক্রমে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছি। চার অর্থবছরের অনাদায়ী এই বিপুল পরিমাণ আয়কর পরিশোধ সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক সাফল্য বা মুনাফা অর্জন করা নয়; বরং একটি জবাবদিহিমূলক, টেকসই ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসসিএলকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তোলা।”
উল্লেখ্য, প্রথম কয়েক বছর লোকসানে থাকার পর বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে প্রথমবারের মতো একটি নিট লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বিএসসিএল। কোম্পানির সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছিল ২৪৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং মোট ব্যয় হয়েছিল ২০৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই মুনাফার ধারা সচল থাকার মাঝেই বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি দেশের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক মহলে উজ্জ্বল হয়েছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের চলমান সংকটের মাঝে এবার দেশের মেরুদণ্ড খ্যাত কৃষি খাতের ঋণ নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগের তথ্য সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ শতাংশই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে, সেখানে বিগত সরকারের আমলের অনিয়ম ও লুটপাটের ধারাবাহিকতায় এই হার এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বকেয়া ঋণের পরিমাণও, যা আগামীতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। রোববার (২৮ জুন, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতের মাধ্যমে কৃষি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি বা পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে অলৌকিকভাবে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ শতাংশ। অথচ গত বছরের (২০২৫) মে মাসেও এই খাতে বিতরণকৃত ৫৮ হাজার ৩২১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ছিল মাত্র ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা (১১ দশমিক ৮০ শতাংশ)। তারও আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক থেকে দুই বছরের ব্যবধানে দেশের কৃষি ঋণের খেলাপি তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আর্থিক খাতের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে যে ব্যাপক লুটপাট ও আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে, তার বড় একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষি ঋণেও। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ভুয়া বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লুটপাটের উদ্দেশ্যে যেসব বড় বড় কৃষি ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোই এখন আর ব্যাংকে ফেরত আসছে না এবং ক্রমান্বয়ে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি খেলাপি হওয়ার আগের ধাপ অর্থাৎ ‘বকেয়া’ ঋণের স্থিতিও আকাশচুম্বী হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ বা নবায়ন না করায় এই বকেয়া ঋণগুলো এখন খেলাপি হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত যেখানে বকেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৯ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের মে মাসে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, মে মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঋণ বিতরণ আড়াই শতাংশ কমলেও, সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে আগের বছরের তুলনায় কৃষি ঋণ বিতরণ কিছুটা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে কৃষি অর্থায়ন বা ঋণ বিতরণ বাড়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে যেভাবে জ্যামিতিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করাকে ব্যাংকগুলোর এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এই বিশাল খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সব ব্যাংককে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কঠোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারের ধারাবাহিকতায় দেশের বাজারেও স্বর্ণের দামে বড় পতন হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম কমার প্রেক্ষিতে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২৬৬ টাকা পর্যন্ত কমিয়েছে। বাজুসের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের বাজারে এখন থেকে সবথেকে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে গ্রাহকদের খরচ পড়বে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা।
আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) সকালে বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভ্যাটসহ স্বর্ণের এই নতুন পুনর্নির্ধারিত দাম আজ সকাল ১০টা থেকেই দেশজুড়ে কার্যকর হয়েছে। এর আগে সবশেষ গত ২৭ জুন সকালে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই দাম বহাল থাকবে।
বাজুসের নতুন দরপত্র অনুযায়ী প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম:
বাজুস তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, প্রতিটি অলঙ্কারের ডিজাইন ও মান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে মজুরি প্রযোজ্য হবে। তবে স্বর্ণালঙ্কারের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গেই ভ্যাট যুক্ত থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে কোনো ভ্যাট আদায় করা যাবে না।
উল্লেখ্য, বিশ্ববাজার ও স্থানীয় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে এই নিয়ে চলতি ২০২৬ সালে দেশের বাজারে রেকর্ড ৮৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করল বাজুস। এর মধ্যে ৪১ দফা দাম বাড়ানো হয়েছে, ৪১ দফা কমানো হয়েছে এবং ১ দফা ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এমন অস্থিরতার কারণেই স্থানীয় বাজারেও দ্রুত দাম পরিবর্তন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা।
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে অবশেষে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্দিষ্ট হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বা বহুল আলোচিত ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ আরোপ এবং সব খুচরা দোকানের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার বিতর্কিত প্রস্তাব থেকে সরকার সরে আসছে। একই সঙ্গে তামাক খাতে প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধি শিথিল করা এবং ভূমির মালিকদের জন্য মূলধনি মুনাফা কর (গেইন ট্যাক্স) কমানোর বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদে নতুন অর্থ বিলটি ‘অর্থ আইন’ হিসেবে পাস হওয়ার আগেই এই পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বছরে ৫০ লাখ টাকা বা তার বেশি টার্নওভার (বার্ষিক বিক্রি) রয়েছে এমন খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয় এবং এর নিচের প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ১ জুলাই থেকে টার্নওভারের পরিমাণ নির্বিশেষে দেশের সব খুচরা ব্যবসাকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এই প্রস্তাবের পর দেশজুড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এতে ক্ষুদ্র দোকানের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মাঠপর্যায়ের ভ্যাট কর্মকর্তাদের হয়রানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। ব্যবসায়ীদের এমন যৌক্তিক দাবির মুখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিল পাস হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট বিধানটি বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানান, এই প্রস্তাবটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল। তাছাড়া অনেক মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও সাধারণ ভ্যাট ব্যবস্থার পরিবর্তে প্যাকেজ ভ্যাটের সুবিধা নিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখার জোর দাবি জানিয়ে আসছিল। সংগঠনের সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অধিকাংশেরই সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই। এই ব্যবস্থা চালু হলে হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতেন এবং এসএমই খাতে অস্থিরতা তৈরি হতো।”
দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে। গত অর্থবছরে আদায়কৃত ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার মোট ভ্যাটের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) আওতাধীন মাত্র ১০৯টি বড় প্রতিষ্ঠান থেকে। তাই সংগঠনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতি খুচরা দোকানদারদের হয়রানি না করে ভ্যাট অটোমেশন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
অর্থ বিলে আরও যেসব সংশোধন আসতে পারে:
দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির বার্তা দিয়ে আবারও বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ হাজার ৩১৪ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৬ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রোববার (২৮ জুন, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আনুষ্ঠানিকভাবে রিজার্ভ বৃদ্ধির এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৮ জুন পর্যন্ত দেশের মোট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ যেখানে ৩৬ হাজার ৩১৪ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার, সেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা ‘বিপিএম-৬’ (BPM6) হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৭৩৮ দশমিক ০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (৩১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার)।
এর মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ গত ২৫ জুন পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৮২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৫৩২ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আইএমএফের হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ বেড়েছে ২০৫ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারার কারণেই রিজার্ভের এই ধারাবাহিক উন্নতি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস লিমিটেড। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় বাচ্চা উৎপাদনের উপযোগী ১০ হাজার ৪৪০টি ডিম বা ‘হ্যাচিং এগ’ রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আজ রবিবার (২৮ জুন) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী করার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দুয়ার উন্মোচিত হলো, যা দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নাইজেরিয়ায় রপ্তানি করা এই ডিমগুলো মূলত উচ্চমানের ‘রস ৩০৮ ব্রয়লার’ (প্যারেন্ট হ্যাচিং এগস) জাতের। এই সাড়ে ১০ হাজার হ্যাচিং ডিম বিক্রি করে বাংলাদেশের মোট ১৮ হাজার ৭২৯ মার্কিন ডলার (বর্তমান বাজারে প্রায় ২২ লাখ টাকা) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। আজ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশেষ রপ্তানি কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি খাতকে রপ্তানিমুখী হিসেবে গড়ে তোলার যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, তাঁর সেই দূরদর্শী নির্দেশনায় আমাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতও ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত হচ্ছে। আজকের এই পোলট্রি পণ্য রপ্তানি কার্যক্রম সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।” তিনি আরও যোগ করেন, বাংলাদেশ যখন নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ করে বিদেশে পোলট্রি পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়, তখন তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতা ও উন্নত মানেরই প্রতিফলন ঘটায়।
ভবিষ্যতে নাইজেরিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই বিশেষ ডিম রপ্তানির পরিধি আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যতম চালিকাশক্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, শাহজালাল বিমানবন্দরের কোয়ারেন্টাইন স্টেশনের ইনচার্জ মোহাম্মদ ওমর ফারুক, কাজী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান, পরিচালক কাজী জিশান হাসান, কাজী জাহিন হাসান এবং সিইও গাজী এম শামসুদ্দিনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ ১১৫ দিন আটকে থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে অপরিশোধিত তেলবাহী (ক্রুড অয়েল) বিশাল ট্যাংকার ‘নর্ডিক পোলক্স’। ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি গত বুধবার (২৪ জুন) নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। আগামী ৬ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকে (ইআরএল) সরবরাহ করা হবে, যা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর দেশজুড়ে স্বাভাবিক জ্বালানি চাহিদা মেটাবে।
বিদেশি পতাকাবাহী এই বিশালাকার ট্যাংকারটি গত ১ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে ১ লাখ টন ক্রুড তেল বোঝাই করেছিল। কিন্তু হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে জাহাজটি সেখানেই আটকা পড়ে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে এই পরিবহন কার্যক্রম তদারকি করছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)। দীর্ঘ ৩ মাস ২৫ দিন আটকে থাকার কারণে বিপুল পরিমাণ ডেমারেজ বা বিলম্ব মাশুল তৈরি হলেও বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নিশ্চিত করেছেন যে, পূর্ব চুক্তির কঠোর শর্তানুযায়ী বিএসসি বা বিপিসি কাউকেই এই অতিরিক্ত খরচের এক টাকাও বহন করতে হবে না; সম্পূর্ণ ডেমারেজ খরচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানই মেটাবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডিএনওসি) থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যার মূল রুটই হলো হরমুজ প্রণালি। চলতি বছরের শুরুতে এই কৌশলগত নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নর্ডিক পোলাক্স আটকে পড়ে এবং ক্রুড তেলের তীব্র অভাবে গত ১৪ এপ্রিল ইআরএলের শোধন কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। এর ফলে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গিয়ে সাময়িক তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।
এই চরম সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার তখন দ্রুত চড়া মূল্যে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি শুরু করে। একই সঙ্গে বিকল্প রুট হিসেবে সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর এবং ওমান উপসাগরে অবস্থিত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর ব্যবহার করে ক্রুড তেল আনা শুরু হয়, যা হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলে। বিএসসি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা এই বিকল্প রুটগুলোর মাধ্যমেই অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে, যার ফলে ইআরএলের বর্তমান উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। এর মাঝে ‘নর্ডিক পোলক্স’ মুক্ত হয়ে ফিরে আসা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় স্বস্তির খবর।
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান ইসলামীক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের আর্থিক অবস্থার ধারাবাহিক অবনতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) কোম্পানিটির লোকসান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো ধরনের লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। লোকসান বৃদ্ধি ও লভ্যাংশ না দেওয়ার এই দ্বিমুখী ধাক্কায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইসলামীক ফাইন্যান্সের শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ০.৯৩ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ০.৬২ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়েছে ০.৩১ টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ। এছাড়া গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪৬ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটির চরম আর্থিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, বিগত ২০২৫ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ০.৩৯ টাকা হলেও সার্বিক আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার ‘নো ডিভিডেন্ড’ নীতি গ্রহণ করেছে পর্ষদ। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য ছিল ২.৩৮ টাকা। লভ্যাংশ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য আলোচ্য বিষয়াবলি শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতিক্রমে অনুমোদনের জন্য আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আহ্বান করা হয়েছে। এই এজিএমে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণের জন্য আগামী ৯ আগস্ট রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে সারা দেশে বাধ্যতামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে সর্বজনীন আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ক্যাশলেস সোসাইটি বা নগদবিহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় নগদ অর্থের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার পাশাপাশি লেনদেনের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা আরও বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এতদিন দেশের খুচরা বিক্রেতা বা দোকানদারদের বিকাশ, রকেট, নগদ কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড প্রদর্শন করতে হতো, যা ছিল বেশ ঝামেলার। ‘বাংলা কিউআর’ বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে বিক্রেতাদের দোকানে একটিমাত্র কিউআর কোড থাকবে। গ্রাহকরা তাদের সুবিধাজনক যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাপ ব্যবহার করে সেই একক কোড স্ক্যান করেই দ্রুত পেমেন্ট করতে পারবেন। ফুটপাতের ক্ষুদ্র বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় শপিংমল—সর্বত্র এই ব্যবস্থা চালু হলে ছোট-বড় সব ধরনের কেনাকাটা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও হাবিবুর রহমান জানান, এই উদ্যোগের ফলে ডিজিটাল লেনদেনে মানুষের অভ্যস্ততা বাড়বে, যা টাকা ছাপানোর বিশাল খরচ বাঁচাবে এবং সরকারি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এই অনবদ্য প্রসারের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালেই ডিজিটাল লেনদেনে ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে গ্রাহকদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রগুলো। এই ঝুঁকি এড়াতে বাংলা কিউআর ব্যবহারের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের তাদের ব্যক্তিগত পিন (PIN) বা ওটিপি (OTP) গোপন রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কার্যাদেশের ঘাটতি, মালিকদের তীব্র আর্থিক সংকট, শ্রম অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা হ্রাস, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা অর্থনৈতিক সংকট সামগ্রিক শিল্প খাতকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবস্থিত, যার ফলে কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজার হাজার শ্রমিক।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের বাইরের কারখানার সংখ্যাই বেশি—প্রায় ২৮৭টি। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে বিজিএমইএ-র ১০৮টি, বিকেএমইএ-র ৩৫টি, বিটিএমএ-র আটটি এবং বেপজার আওতাধীন ১৯টি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে কেবল চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (৩১ মে পর্যন্ত) উৎপাদন ও কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় ৭৯টি কারখানা মোট ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড নামের দুটি বড় কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এর আগে আল-মুসলিম গ্রুপও তাদের কারখানা থেকে ১ হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়।
এই চরম বিপর্যয় থেকে শিল্প খাতকে টেনে তুলতে এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকার পৃথক বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। তবে বিজিএমইএ এবং অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের কঠোর শর্ত ও জামানতসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এই জরুরি ঋণের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না।
বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সিআইবি (CIB) প্রতিবেদন সন্তোষজনক না থাকা এবং অদক্ষতার কারণে সব বন্ধ কারখানা হয়তো চালু করা সম্ভব নয়। তবে সংগঠনটির সহসভাপতি শিহাব উদদোজা চৌধুরী জানান, প্রায় ২০০টি বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিক বন্ধ কারখানা সরকারের এই আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৭ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ এবং ন্যূনতম ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়ার জন্য তারা সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। আগ্রহী কারখানাগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে ইতিমধ্যেই দুটি নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজিএমইএ, যাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানো হবে।
আগামী ১ জুলাই থেকে অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌপথে চলাচলকারী সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযানের বিভিন্ন চার্জ ও সেবামূলক ফি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যয় এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাঝে এই ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
সর্বশেষ ২০১৯ সালে সরকার নৌপথের এই ফি বৃদ্ধি করেছিল। দীর্ঘ ৭ বছর পর গত মাসে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে কার্গো জাহাজ, বাল্কহেড ও মাছ ধরার নৌকার সংরক্ষণ ফি (কনজারভেন্সি চার্জ) প্রতি গ্রস টনে বর্তমানের ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে লঞ্চ মালিকদের জন্য বার্ষিক সংরক্ষণ ফি ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা থেকে ১৫০ টাকা করা হয়েছে এবং প্রতি আট ঘণ্টার জন্য পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে যাত্রী ও পণ্যবাহী উভয় খাতের মালিকরাই বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন। ঢাকা-বরিশাল রুটের সুন্দরবনস নেভিগেশন কোম্পানির পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই তারা যাত্রী সংকটে ভুগছেন এবং টিকে থাকতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম নিচ্ছেন। এই অবস্থায় নতুন চার্জ তাদের ক্ষতির মুখে ফেলবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কোস্টাল শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নাজমুল হোসেন হামদু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া সিমেন্টের কাঁচামাল, গম, ডাল, তেল ও লবণ লাইটার জাহাজের মাধ্যমে সারা দেশে যায়। নৌপথের খরচ বাড়লে তাদের বাধ্য হয়েই জাহাজের ভাড়া বাড়াতে হবে, যা পুরো সাপ্লাই চেইনকে প্রভাবিত করবে।
ব্যবসায়িক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ নৌপথে পরিবহন করা হয়। নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ফির কারণে গম, সয়াবিন ও ভুট্টার মতো পণ্য পরিবহনের খরচ প্রতি টনে ৩৬ টাকা পর্যন্ত বাড়বে। এছাড়া আবাসন ও সিমেন্ট খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্লিংকার ও ফ্লাই অ্যাশের মতো কাঁচামাল পরিবহনে বাড়তি খরচের কারণে প্রতি বস্তা সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় ৩ টাকারও বেশি বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এমনিতেই জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী, তার ওপর দেশের নৌপথের এই বাড়তি ব্যয়ের চূড়ান্ত বোঝা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই মেটাতে হবে।