পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য দেশের মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
গতকাল রোববার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন। এ সময় বিএসইসির কমিশনার মোহসিন চৌধুরী, ফারজানা লালারুখ, বিএসইসির কর্মকর্তারা এবং আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সরকারি মালিকানাধীন বিনিয়োগ কোম্পানি হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে আইসিবিকে বিশেষ অবদান রাখতে হবে। পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য দেশের মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি জরুরি। মিউচুয়াল ফান্ডকে আরও বেশি জনপ্রিয় করতে এবং এই খাতের উন্নয়ন, বিকাশে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইসিবিকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও কল্যাণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংস্কার। দেশের পুঁজিবাজারের টেকসই ও যথাযথ সংস্কারের জন্য বিএসইসির গঠিত টাস্কফোর্স স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং সংস্কারের পরিকল্পনায় টাস্কফোর্সের অধীন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বেশ কিছু ফোকাস গ্রুপ কাজ করবে।
আইসিবির উদ্দেশে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, পুঁজিবাজারের টেকসই ও যথাযথ সংস্কার আনয়নে আইসিবি সক্রিয়, দায়িত্বশীল ও অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে আইসিবি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজার হতে অর্থ সংস্থানের নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ, সিকিউরিটিজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ট্রেক হোল্ডার্স মার্জিন রেগুলেশন্সের সংস্কার, গ্রাহকের সমন্বিত ব্যাংক হিসাবের সুদ বণ্টন-সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সংস্কার, ব্রোকারেজ কমিশনের যুক্তিসংগত নিম্নসীমা নির্ধারণ, ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন ও সুদ প্রদান সহজীকরণ, দেশে বিদ্যমান সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ, মার্কেট মেকার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন, স্টক ব্রোকারের মাধ্যমে ট্রেজারি বিলের অকশনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিশেষায়িত বন্ড-গ্রিন ফাইন্যান্সিংসহ ব্লু-ইকোনমিক জোনভিত্তিক বিভিন্ন প্রোডাক্ট/সেবা চালুকরণ, সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের ক্ষেত্রে শেয়ার সেটেলমেন্টের সময়সীমার সংস্কার, পুঁজিবাজারের কর-সংক্রান্ত পলিসির সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরে।
এ সময় পুঁজিবাজারে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তকরণ ও নতুন পণ্য আনয়নে আইসিবির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান আইসিবির কর্মকর্তারা। এ ছাড়া দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নের বিষয়েও আইসিবি বেশ কিছু কৌশলগত প্রস্তাবনা সভায় তুলে ধরে।
তিন বছর আগের তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির এই ধারাবাহিক অগ্রগতির স্বীকৃতিস্বরূপ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকা থেকে উন্নত করে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
গত ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ আয়ভিত্তিক দেশগুলোর শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে, যেখানে শ্রীলঙ্কার এই উত্তরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিকে এই নতুন আয়ের তালিকায় উন্নীত করা হয়েছে। মূলত শিল্প খাতের পুনরুত্থান, পর্যটন শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ এবং আর্থিক সেবা খাতের গতিশীলতা এই অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
শ্রীলঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে বিশ্বব্যাংক ‘পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ২০২২ সালে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দেশটি যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেখান থেকে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তারা প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক সেবার প্রসারের মাধ্যমে। যদিও উচ্চ মধ্যম আয়ের নির্ধারিত সীমাটি শ্রীলঙ্কা অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে পার হতে পেরেছে, তবুও এই অর্জন দেশটির অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতার একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক মূলত চারটি আয়ভিত্তিক ভাগে বিন্যস্ত করে থাকে—উচ্চ আয়, উচ্চ মধ্যম আয়, নিম্ন মধ্যম আয় এবং নিম্ন আয়। এই তালিকায় শ্রীলঙ্কার নতুন অবস্থান দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যাত্রায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের এই নতুন তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে আগের ক্যালেন্ডার বছরের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) হিসাব করে। বিশ্বের মোট ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্ত করে তৈরি করা এই নতুন তালিকাটি ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে আত্মঘাতী বোমা হামলা, পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারি এবং এর জের ধরে তৈরি হওয়া বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতার সংকটের কারণে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা তাদের সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ (সোভরেন ডিফল্ট) হয়েছিল। এর ফলে দেশটির অর্থনীতি বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক সহায়তায় গৃহীত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কর্মসূচি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে আনা সময়োপযোগী সংস্কার, বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, পর্যটন খাতের দ্রুত পুনরুজ্জীবন, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নতিই শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া দশা থেকে এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেড ফাইন্যান্স বা বাণিজ্য অর্থায়ন খাতে সম্পদের গুণগত মানের ওপর ক্রমান্বয়ে চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্সে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলোর বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ঋণ পোর্টফোলিওতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। কিছু ব্যাংকে এই খেলার হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠানে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য অর্থায়নে বড় এক্সপোজার রয়েছে, সেখানে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংক’ শীর্ষক এক রিভিউ কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে এই চিত্র উঠে আসে। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বিআইবিএম ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর ও এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাজ্জাদ হায়দার চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।
গবেষক দলের পক্ষ থেকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি উল্লেখ করেন, বাণিজ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড দায়গুলো জোরপূর্বক ঋণে (ফোর্সড লোন) রূপান্তরিত হওয়াই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি, তুলা ও বিভিন্ন কাঁচামাল, চিনি, সার, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির বিপরীতে দেওয়া ট্রেড ফাইন্যান্সে এ ধরনের ফোর্সড লোন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নষ্ট করছে।
এই গবেষণায় রপ্তানি অর্থায়ন কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব ব্যাংকিং কর্মকর্তা জানান, আইনগতভাবে কার্যকর কোনো ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়াই ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহারের কারণে রপ্তানি অর্থায়নে খেলাপির সৃষ্টি হচ্ছে। নিশ্চিত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহার করার কথা থাকলেও, এর ভিত্তি যদি দুর্বল বা আইনগতভাবে অকার্যকর হয়, তবে পুরো অর্থায়ন প্রক্রিয়াটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর ফলে রপ্তানি আয় যথাসময়ে না এলে বাণিজ্য অর্থায়নের স্বয়ং-পরিশোধযোগ্য বৈশিষ্ট্যটি নষ্ট হয়ে যায় এবং তা দ্রুত ফোর্সড লোনে পরিণত হয়ে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কর্মশালায় বক্তারা বাণিজ্য অর্থায়ন কার্যক্রমের আধুনিকায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের মান উন্নয়নে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করার লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ট্রেড ডকুমেন্টের জন্য আধুনিক আইনি ও ডিজিটাল অবকাঠামো প্রস্তুত করা জরুরি। এর পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান ঠিক রেখে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং রুখতে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেন মহাপরিচালক। সেই সঙ্গে পণ্যভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও কার্যকর বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক করতে রংপুরের ৯টি ৩৩/১১ কেভি এআইএস উপকেন্দ্রের উন্নয়ন ঘটাবে। এ সংক্রান্ত ১৪১ কোটি ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৬ টাকার একটি ক্রয় প্রস্তাব সায় দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বুধবার (৮ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
‘নেসকো এলাকায় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীন প্যাকেজ-জিডি-৬ (পি-০৬)-এর মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলের ওই উপকেন্দ্রগুলোর নকশা তৈরি, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং তা সচল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অ্যাডেক্স করপোরেশন লিমিটেড (এসিএল) ও অ্যাডেক্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (এইইএল) যৌথ উদ্যোগ এই কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করার সুপারিশ প্রদান করে।
একই সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার একটি ভেরিয়েশন প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। এটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পরিচালিত ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর সিআইবি-২-প্যান-ডব্লিউ-৩০-এর অংশ।
সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত এই কাজের মূল চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছিল ১১০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ভেরিয়েশন বাবদ আরও ৬ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ৬১৯ টাকা অনুমোদন করা হয়, যা আদি চুক্তিমূল্যের চেয়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে পুরো প্রকল্পের সংশোধিত চুক্তিমূল্য দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ৬১৯ টাকা। এই নির্মাণকাজটি সম্পাদনের দায়িত্বে রয়েছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
দেশের বাজারে আবারও সোনা ও রুপার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩২৩ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে আজ সকাল ১০টা থেকেই দেশের বাজারে সোনা ও রুপার এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে।
বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। গতকাল পর্যন্ত এই মানের সোনার দাম ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর পাশাপাশি ২১ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা। এই নতুন দামের ফলে ক্রেতারা আগের চেয়ে কিছুটা কমে স্বর্ণালঙ্কার ক্রয় করতে পারবেন।
উচ্চ মানের সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মানের সোনার দামও কমানো হয়েছে। বাজুসের নির্ধারিত নতুন দাম অনুযায়ী, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা এখন থেকে দেশের বাজারে ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকায় বিক্রি হবে। অন্যদিকে, সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকা।
সোনার দাম কমানোর পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও কমিয়েছে সংগঠনটি। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকায়। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ২ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রপ্তানি, শ্লথ বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এডিবির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে আগামী ২০২৭ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয়, পরিবহন খরচ এবং মুদ্রার বিনিময় হারের প্রভাবে ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া ২০২৭ অর্থবছরে এটি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ভোগ কমে যাচ্ছে। দুর্বল রপ্তানি ও শ্লথ আমদানির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, উৎপাদন ও কৃষি খাতও উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং সার সংকটের মতো কাঠামোগত সমস্যার কারণে চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং স্থিতিশীল সেবা খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কিছুটা টিকিয়ে রেখেছে বলে জানিয়েছে এডিবি। সংস্থার বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের অফিসার-ইন-চার্জ আকিরা মাতসুনাগা জানান, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট দূরীকরণে ধারাবাহিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট না কাটলে প্রবৃদ্ধির এই গতি খুব বেশি শক্তিশালী হবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও শিপিং খরচ বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি এবং বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে বাণিজ্য বিধিনিষেধের ফলে রপ্তানি চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর ক্রমাগত চাপ, বৈশ্বিক অর্থায়নের কঠিন শর্তাবলি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিপ উৎপাদন খাতে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রডকমের সঙ্গে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি বিশাল সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে টেক জায়ান্ট অ্যাপল। এই চুক্তির আওতায় ব্রডকম যুক্তরাষ্ট্রে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্সে অবস্থিত একটি কারখানা সম্প্রসারণ করবে। গত সোমবার ব্রডকম ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এই চুক্তির কথা জানালেও বুধবার অ্যাপল বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। মূলত আইফোনসহ অ্যাপলের বিভিন্ন ডিভাইসের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রযুক্তির চিপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো 'এফবিএআর ফিল্টার' (FBAR filters) নামক বিশেষ রেডিওফ্রিকোয়েন্সি চিপ উৎপাদন করা, যা অ্যাপল ডিভাইসের ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও নিখুঁত করতে সহায়তা করবে। অন্তত ২০২৩ সাল থেকেই অ্যাপল ও ব্রডকম যৌথভাবে এই প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে ব্রডকম তাদের কলোরাডো কারখানার উন্নয়নে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এবং সেখান থেকে অন্তত ১৫ বিলিয়ন চিপ উৎপাদিত হবে বলে জানানো হয়েছে। অ্যাপলের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও বেশি চিপ সংগ্রহের পরিকল্পনারই একটি অংশ।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ফোর্ট কলিন্সে তৈরি এই অত্যাধুনিক উপাদানগুলো তাদের গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স ও কানেক্টিভিটি প্রদানের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। তিনি মার্কিন সরবরাহকারীদের সাথে বিনিয়োগের এই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পেরে গর্ব প্রকাশ করেন এবং এই প্রকল্পে সমর্থন দেওয়ার জন্য বর্তমান প্রশাসন ও প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল অ্যাপলের পণ্যের মানই বাড়াবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় চিপ উৎপাদন শিল্পে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ সরবরাহের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশটিকে এগিয়ে রাখবে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতাধীন শিল্পনগরীগুলোতে গত চার বছরের ব্যবধানে পণ্য রপ্তানি আয় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিসিকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হলেও রপ্তানি আয় বাড়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একই সঙ্গে শিল্পনগরীগুলোতে বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকা খালি প্লটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিসিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটির অধীনস্থ ৮৮৭টি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মোট ৪৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছিল। সেই সময়ে এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা এবং জাতীয় রপ্তানি আয়ে বিসিকের অবদান ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেলেও রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকায়। ফলে জাতীয় রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বিসিকের অবদান এখন ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিসিকের এসব শিল্পে মূলত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, বস্ত্র, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হয়।
শিল্প প্লটগুলোর বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত বিসিকের মোট ১৩ হাজার ৩৬৪টি প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৭টি বর্তমানে খালি রয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন মাসে এই খালি প্লটের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৩৯টি এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে ছিল ১ হাজার ৩টি। পরিসংখ্যান বলছে, শিল্পনগরীগুলোতে নতুন উদ্যোক্তা আসার হার কমে যাওয়ায় প্রতি বছরই খালি প্লটের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ২৩৭টি খালি প্লট রয়েছে সিরাজগঞ্জ শিল্পনগরীতে। এ ছাড়া রাজশাহী শিল্পনগরী-২, চুয়াডাঙ্গা এবং বরগুনার শিল্পনগরীগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লট অবরাদ্দকৃত অবস্থায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত উদ্যোক্তার অভাব এবং নতুন শিল্প এলাকা যুক্ত হওয়ায় খালি প্লটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বিসিক কর্মকর্তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে খালি প্লটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্লট দ্রুত বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে অনেক সময় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বাজারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে বিনিয়োগ বাড়লেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের ক্ষুদ্র শিল্প খাত। এই পরিস্থিতি উত্তরণে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজতর ও ব্যবসাবান্ধব করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে জ্বালানি শোধন সক্ষমতা বাড়াতে ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি)। সরকারের অ-রিয়াতকালীন ঋণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি (এসসিএনসিএল) সম্প্রতি এই অর্থায়নের প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। যদিও এই ঋণের শর্তসমূহ বেশ কঠোর ও ব্যয়বহুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবুও দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পটিকে অত্যন্ত কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইএসডিবির এই অর্থায়ন মূলত দুটি ভিন্ন প্যাকেজে বিভক্ত। এর মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’ প্যাকেজের আওতায় ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’ এর অধীনে ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হবে। ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারের ‘টার্ম সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’ (এসওএফআর) বেঞ্চমার্কের ভিত্তিতে, যার সাথে নির্দিষ্ট স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম যুক্ত থাকবে। ২০ বছর মেয়াদি এই ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য ৫ বছরের রেয়াতকাল সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এই অর্থায়নকে ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ বা উচ্চ ব্যয়বহুল হিসেবে অভিহিত করেছে।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক তেল শোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিটটি বাস্তবায়িত হলে এর সাথে আরও ৩০ লাখ টন সক্ষমতা যুক্ত হবে, যার ফলে বার্ষিক মোট শোধন ক্ষমতা তিন গুণ বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে সরাসরি পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি থেকে ইউরো-৫ মানের ডিজেল ও গ্যাসোলিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির চাপও কমিয়ে আনবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩১ হাজার ০০০ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই উন্নয়ন কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে। ইআরডি সুপারিশ করেছে যে, ঋণ হস্তান্তরের আগে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে যাতে এই বিশাল ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি না হয়।
উল্লেখ্য, ইস্টার্ন রিফাইনারির এই দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনাটি ২০১০ সালে প্রথম গ্রহণ করা হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থায়ন সংকট এবং বিভিন্ন সময়ে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে বর্তমানে এই উদ্যোগটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগামী আগস্ট মাসে আইএসডিবির প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় এই চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি বা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির দৌড়ে সবার উপরে স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ এই ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে বাংলাদেশে ১২৩ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এসেছিল, ২০২৫ সালে তা প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিনিয়োগের এই উল্লম্ফন বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
আঙ্কটাড-এর মতে, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও উচ্চ ব্যয়জনিত কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ প্রবাহে অস্থিরতা থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের এই অর্জন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও দেশটির মোট স্থায়ী মূলধন গঠনে বিদেশি বিনিয়োগের অংশ এখনও কিছুটা কম, তবে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে দেশীয় বিনিয়োগও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। সামগ্রিকভাবে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এফডিআই ৬ শতাংশ বেড়ে ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যার পেছনে ডিজিটাল অবকাঠামো, উৎপাদন শিল্প ও জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতগুলোর বিশেষ অবদান রয়েছে।
উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলো গত বছরও বিনিয়োগকারীদের পছন্দের শীর্ষে ছিল এবং এই অঞ্চলে মোট ৬৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এই বৃহত্তর আঞ্চলিক সফলতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। উৎপাদনশীল শিল্প, সেবা, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আরও প্রবল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী এই সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম এবং প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থায় ধারাবাহিক উন্নতির ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি হ্রাস পাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রধান কিছু বাজারে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বড় বাজারগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাত গত অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম আয় করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত এই অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে মোট রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বেড়ে ২০ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং দেশটিতে রপ্তানির অংশ ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া কানাডার বাজারে রপ্তানি ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই তিনটি বাজারে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৩৫ শতাংশের বেশি পরিবাহিত হয়েছে, যা ইউরোপের বাজারে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা লাঘব করতে সহায়ক হয়েছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। এর ফলে মোট রপ্তানি আয়ে ইইউর অংশীদারিত্ব পূর্বের ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ হতে কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও রপ্তানি ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে। ইউরোপ ও অপ্রচলিত বাজারগুলোতে এই ধারাবাহিক সংকোচন দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
পণ্যের ধরণ অনুযায়ী দেখা গেছে, নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ হ্রাস পেলেও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো ছিল। ওভেন খাতে রপ্তানি হ্রাসের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রধান বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকা বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও ইইউ ও অপ্রচলিত বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা মোকাবিলায় বাজার বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর আরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের বিত্তবান ব্যক্তিদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানটি টানা চতুর্থবারের মতো ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের ‘গ্লোবাল ওয়েলথ অ্যান্ড লাইফস্টাইল ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, বিলাসপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে ধনী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার গড় ব্যয় ডলারের হিসাবে ১০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
জুলিয়াস বেয়ার জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরের শক্তিশালী মুদ্রা ব্যবস্থা, অতিরিক্ত আবাসন ব্যয় এবং গাড়ির উচ্চ মূল্যের কারণেই এটি শীর্ষস্থান বজায় রেখেছে। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ এবং প্রথমবারের মতো শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিয়েছে মোনাকো। এর ফলে গত বছরের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা হংকং এবার চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জুরিখ ও মোনাকোর অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে স্থানীয় বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে সুইস ফ্রাঁ ও ইউরোর বিপরীতে ডলারের দুর্বলতা বেশি ভূমিকা রেখেছে।
র্যাঙ্কিংয়ে আরও দেখা গেছে যে, গত বছর শীর্ষ দশে থাকা দুবাই এবার সাত ধাপ পিছিয়ে ১৪তম অবস্থানে নেমে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সেখানে ব্যয় কমেছে; বরং অন্যান্য শহরে ব্যয় আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থানের কারণে দুবাইয়ের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের লন্ডন এক ধাপ পিছিয়ে পঞ্চম স্থানে নেমেছে এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শক্তিশালী মুদ্রার বদৌলতে ছয় ধাপ এগিয়ে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বিলাসী জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বিলাসপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় গহনার দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বিলাসবহুল ঘড়ির দাম ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সাল হতে বিলাসপণ্যের গড় দাম ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলিয়াস বেয়ারের একটি বৈশ্বিক জরিপে ৩৭০ জন উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তির মতামত গ্রহণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে অনিশ্চয়তা বাড়লেও ধনীদের ব্যয়ের ধরনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারা বর্তমানে বিলাসবহুল ভ্রমণ, অভিজ্ঞতাভিত্তিক সেবা এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা ও বিলাসপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাই এখন বিত্তবানদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রধান উৎপাদনকারী দেশসমূহে মজুত হ্রাস পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে কফি ও চিনির বাজার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শীর্ষ রোবাস্তা কফি উৎপাদনকারী দেশ ভিয়েতনামের স্থানীয় বাজারে। সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডসের কৃষকরা বর্তমানে প্রতি কেজি কফি বিন প্রায় ৩ ডলার ৪৮ সেন্ট থেকে ৩ ডলার ৫০ সেন্টে বিক্রি করছেন, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
ভিয়েতনামের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, তীব্র গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ছত্রাকের আক্রমণের কারণে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা সংকটে রয়েছেন। বেশিরভাগ চাষির মজুত শেষ হয়ে আসায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, যার ফলে দাম আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত শুক্রবার প্রতি টন রোবাস্তা কফি ৩ হাজার ৭৩১ ডলারে কেনাবেচা হয়েছে, যদিও এর একদিন আগে তা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৯২০ ডলারে পৌঁছেছিল। এল নিনোর প্রভাবে ভিয়েতনামের আগামী মৌসুমের উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় শীর্ষ রোবাস্তা উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলেও পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কফি সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা শস্যের গুণগত মান নষ্ট করতে পারে। আফ্রিকার উগান্ডাতেও কফি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ইন্দোনেশিয়ায় নতুন সংগ্রহ শুরু হলেও বিশ্ববাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব এখনও লক্ষ্য করা যায়নি। সামগ্রিকভাবে টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো কফির বাজারে এই চড়া দাম অব্যাহত রয়েছে।
কফির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে চিনির দামও ঊর্ধ্বমুখী। ইউরোপের তীব্র দাবদাহে চিনির ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বাজারে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সাদা চিনির দাম বর্তমানে ৪৮৭ ডলার ২০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলের মধ্য-দক্ষিণ অঞ্চলে জুনের প্রথমার্ধে চিনি উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। তবে ভারতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় চিনির এই মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, লন্ডনের বাজারে কোকোর দাম সামান্য হ্রাস পেয়ে প্রতি টন ৩ হাজার ৭২৬ পাউন্ডে নেমেছে। তবে শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ আইভরি কোস্টে আগামী মৌসুমে কোকো উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এই পণ্যের বাজারদর এখনও সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিকূল জলবায়ু পরিবর্তন যে বিশ্বব্যাপী নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ও বাজারমূল্যকে অস্থির করে তুলছে, এটি তারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন করে শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে সমুদ্রপথে পণ্য আমদানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে কন্টেইনার আমদানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮.২ শতাংশ। সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেসকার্টেস সিস্টেমস গ্রুপ বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রবন্দরগুলো মোট ২৪ লাখ ৬২৭ টিইইউ (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনারের একক) পণ্য হ্যান্ডেল করেছে। তবে জুনে আমদানির এই বড় প্রবৃদ্ধি থাকলেও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী আমদানির পরিমাণ ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের তুলনায় ০.৩ শতাংশ কম ছিল।
বিশ্লেষক ও আমদানিকারকদের মতে, মূলত পরিবহন ব্যয় এবং আসন্ন শুল্ক জটিলতা এড়াতেই ব্যবসায়ীরা আগেভাগে পণ্য আনার এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চুক্তিতে বাড়তি জ্বালানি খরচ যোগ করছে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এই বাড়তি খরচ এড়াতে আমদানিকারকরা জুন মাসকেই উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন। এছাড়া জুলাই মাসের শেষে জবরদস্তিমূলক শ্রম সংক্রান্ত ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন শুল্ক আরোপের একটি জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই জোড়া আর্থিক চাপ থেকে বাঁচতে আমদানিকারকরা নির্ধারিত সময়ের আগেই পণ্য মজুত করার জন্য বড় আকারের কার্গো মুভমেন্ট শুরু করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আমদানির জোয়ারে সবচেয়ে বড় উৎস দেশ হিসেবে আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে চীন। ডেসকার্টেসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছরের জুনে চীন থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ রেকর্ড ২৭.৪ শতাংশ বেড়েছে। শুধুমাত্র জুন মাসেই চীন থেকে ৮ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৪ টিইইউ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে, যা দেশটির সামগ্রিক আমদানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। মূলত বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা এবং আসন্ন বাণিজ্যিক কড়াকড়িকে মাথায় রেখেই মার্কিন ব্যবসায়ীরা তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে আগেভাগেই এই বিশাল পরিমাণ পণ্য আমদানির কৌশল নিয়েছেন বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।