চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘ সময় ধরে গভীর আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে ভালোমানের শেয়ারের চরম অভাব এবং নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত ১০ বছরে যেসব আইপিও বাজারে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে অধিকাংশের অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। বর্তমান বাজারে ভালো শেয়ারের চেয়ে দুর্বল ও মাঝারি মানের কোম্পানির সংখ্যাই বেশি, যার ফলে মানসম্পন্ন বিনিয়োগ পণ্যের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে বছরের পর বছর ধরে বাজার ছাড়ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
বেনিফিশারি ওনার্স (বিও) হিসাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত এক দশকে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইপিও না আসা, ভালো শেয়ারের অনুপস্থিতি, দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ক্রমাগত লোকসান এবং করপোরেট সুশাসনের অভাবই বিনিয়োগকারী কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। তারা মনে করেন, বাজারকে গতিশীল করতে দ্রুত শক্তিশালী আইপিও আনা জরুরি, অন্যথায় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরও হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের শেয়ারবাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৫৩ হাজার। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে। অর্থাৎ গত ১০ বছরে পুঁজিবাজারে বিও হিসাব কমেছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার বা প্রায় ৪৭ শতাংশ। বর্তমান দেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের কম মানুষের বিও হিসাব রয়েছে, যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশের বেশি মানুষ শেয়ারবাজারে যুক্ত।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীরা তখনই বাজারে সক্রিয় থাকবেন যখন তারা যৌক্তিক লভ্যাংশের নিশ্চয়তা পাবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাজারে সেই স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। ভালো মানের আইপিও আনার চেষ্টা সফল হয়নি এবং যেগুলো এসেছে সেগুলোও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউস ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির অব্যবস্থাপনার কারণেও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, "গত ১০ বছরে বাজারে আসা অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ কিংবা তার বেশি লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ সময়ে অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অর্ধেকেরও বেশি কমেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লভ্যাংশও দেয়নি। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষার ঘাটতি এবং করপোরেট সুশাসনের অবনতির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউস ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, আর পুরোনো অনেক বিনিয়োগকারী ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।"
সাইফুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, অনেকে কেবল আইপিওতে আবেদনের উদ্দেশ্যে বিও হিসাব চালু রাখতেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে কোনো কোম্পানিই আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেনি। এর আগে আসা আইপিওগুলোর মানও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বিও হিসাবের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি কমিয়েও বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখা সম্ভব হয়নি, কারণ শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন নতুন কোম্পানির আগমন ঘটেনি। তবে বর্তমান সরকারের মেয়াদে শেয়ারবাজারে ৫০ লাখ নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে আলোচনা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজারে করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং ভালো আইপিও আনা সম্ভব হলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হবে।
সিডিবিএলের লিঙ্গ ও শ্রেণিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক দশকে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের তুলনায় নারী বিনিয়োগকারীদের বাজার ছাড়ার হার অনেক বেশি। একইভাবে দেশি আমানতকারীদের চেয়ে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বেশি সংখ্যায় পুঁজিবাজার ত্যাগ করেছেন এবং একক হিসাবের তুলনায় যৌথ বিও হিসাব বন্ধের হার ছিল বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১ জুলাই পুরুষ বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৯০ হাজার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৬৩ হাজারে। অর্থাৎ পুরুষ বিনিয়োগকারী কমার হার অর্ধেকের কম। অন্যদিকে, আলোচিত ১০ বছরে নারী বিও হিসাবের সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার থেকে অর্ধেকেরও বেশি কমে ৩ লাখ ৯৪ হাজারে নেমে এসেছে। একই সময়ে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের হিসাব ১ লাখ ৫৭ হাজার থেকে ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪৩ হাজারে এসে ঠেকেছে। এছাড়া একক বিও হিসাব ১৯ লাখ ৫৩ হাজার থেকে কমে ১২ লাখ ১৫ হাজার হয়েছে এবং যৌথ বিও হিসাবের সংখ্যা ১১ লাখ ৯০ হাজার থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে মাত্র ৪ লাখ ৪২ হাজারে নেমেছে।
অবশ্য সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর বাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি মোট বিও হিসাব ছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার, যা গত ৩০ জুন শেষে ৩৪ হাজার বেড়ে ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে পৌঁছায়। তবে বিও হিসাব বাড়ার পাশাপাশি শেয়ারশূন্য বা নিষ্ক্রিয় হিসাবের সংখ্যাও সমান্তরালভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরের শুরুতে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯value হাজারে। অর্থাৎ গত ছয় মাসে নিষ্ক্রিয় হিসাব বেড়েছে ২৭ হাজার।
সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব এই বিষয়ে বলেন, বছরের প্রথমার্ধে বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকায় অনেকে মুনাফা তুলে নিয়ে অ্যাকাউন্ট খালি করে ফেলেছেন। এছাড়া সমস্যাগ্রস্ত ব্রোকারেজ হাউসগুলো থেকে শেয়ার স্থানান্তর এবং বার্ষিক ফি এড়াতে নিষ্ক্রিয় হিসাব বন্ধ করাও এর পেছনে বড় কারণ হতে পারে। তবে বাজারে নতুন ভালো আইপিও এলে এই প্রবণতা বদলে যাবে।
অন্যদিকে, শেয়ারশূন্য হিসাব বৃদ্ধির পেছনে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন। তিনি জানান, অনেক বিনিয়োগকারী একটি ব্রোকারেজ হাউস থেকে অন্য হাউসে লিংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার স্থানান্তর করলে আগের হিসাবটি শূন্য হয়ে যায়। আবার কোনো ব্রোকারেজ হাউসের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীরা শেয়ার অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন। অনেকে শেয়ার বিক্রি করে সাময়িকভাবে সাইডলাইনে চলে যান, আবার কেউ ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে রাখেন। তাই নতুন হিসাব বৃদ্ধি এবং শেয়ারশূন্য হিসাব বেড়ে যাওয়াকে সবসময় একই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না, এটি বিনিয়োগকারীদের ভিন্ন ভিন্ন কৌশলের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত সমাপ্ত হয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার দিন শেষ হয়ে গেছে, তবে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বিবৃতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে এই বড় ধরনের লাফ দেখা যায়।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর জবাবে ইরান অভিমুখে সামরিক আক্রমণ চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে গিয়ে ঠেকে। একই সময়ে মার্কিন মানদণ্ড অনুযায়ী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলারে পৌঁছায়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তেলের মূল্য পুনরায় যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে এসেছিল।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বাংলাদেশ ও স্পেনের যৌথ পুঁজিতে গড়ে ওঠা ‘স্পেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ গত ৬ জুন থেকে টিনজাত ভুট্টা বিদেশে পাঠানো শুরু করেছে। উদ্বোধনী চালানের বিভিন্ন ধাপে স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপের একাধিক বাজারে ২০০ কনটেইনার প্রক্রিয়াজাত ভুট্টা পাঠানো হচ্ছে। এই চালানের আর্থিক মূল্য ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী শেল্টেক্ গ্রুপ এবং বৈশ্বিক প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান স্পেনভিত্তিক সেলেরিও গ্রুপ যৌথভাবে পার্বতীপুরের এই কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ৪ হাজার চুক্তিবদ্ধ কৃষক উচ্চ ফলনশীল জাতের ভুট্টা চাষ করছেন। এই কৃষিশিল্প উদ্যোগে ইতিমধ্যে ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করে শেল্টেক্ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর আহমেদ জানান, এই খাতে ভালো সম্ভাবনা দেখেই তারা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। সেলেরিও গ্রুপ মূলত প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের বিপণনের দায়িত্ব সামলাবে। আগামী পাঁচ বছর পার্বতীপুর কারখানায় প্রস্তুত হওয়া সমস্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী তাদের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হবে, যার ফলে পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে তাদের বাড়তি কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
কারখানায় আসা ভুট্টাগুলো প্রথমে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডে যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ক্যান বা কৌটাজাত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয় এবং সবশেষে কনটেইনারে ভরে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।
প্রায় দেড় বছর আগে এই কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। গত বছরের জুন মাসে স্পেন থেকে আনা বিশেষ জাতের ভুট্টার বীজ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চাষিদের মাধ্যমে প্রথম চাষাবাদ শুরু হয়। কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কেনার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই বীজ সরবরাহ করছে।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষ করা একেকটি ভুট্টার ছড়ার ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম হয়। তবে স্পেনের এই হাইব্রিড বীজে উৎপাদিত ছড়ার ওজন ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। বর্তমানে ৪ হাজার চাষি যুক্ত থাকলেও ভবিষ্যতে এই নেটওয়ার্কে আরও ৪০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
ভুট্টার পাশাপাশি এই কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজও শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে আনারস সংগ্রহ করে তা টিনজাত করা হচ্ছে রপ্তানির উদ্দেশ্যে। এর বাইরে আমও প্রক্রিয়াজাতকরণের তালিকায় রয়েছে।
শেল্টেক্ গ্রুপের এমডি তানভীর আহমেদ আরও জানান, পার্বতীপুরের এই প্ল্যান্ট থেকে টিনজাত ভুট্টা ও আনারসের পাশাপাশি ফ্রুট ককটেল, শুকনা আনারস এবং শুকনা আম প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে পাঠানো হবে। এর বাইরে তাজা আম ও লিচুও রপ্তানি করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, কারখানাটির বার্ষিক ১৫ থেকে ১৭ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করার সক্ষমতা রয়েছে, যা পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে ২০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। ২০২৮ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কৃষিপণ্যের পাশাপাশি আবাসন খাতেও বড় ধরনের বিনিয়োগে যাচ্ছে শেল্টেক্ গ্রুপ। রাজধানীর বনশ্রীতে নিজেদের ৫৩ কাঠা জায়গার ওপর ‘শেল্টেক্ লিগ্যাসি প্লাজা’ নামে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ১৭ তলা শপিংমল নির্মাণের কাজ শুরু করেছে তারা। প্রায় ২ লাখ বর্গফুট আয়তনের এই বাণিজ্যিক ভবনটি তৈরিতে ৫৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে ৩৫০টি দোকান ও ফুড কোর্টসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে।
এর বাইরে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগে ২১টি আবাসিক প্রজেক্ট নির্মাণ করছে শেল্টেক্, যেখানে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বাড়াতে এনভয় টেক্সটাইলস প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে, যার কাজ আগামী বছরের মধ্যে শেষ হবে। এর বাইরে সিলেটে অ্যাব্রেসিভ পেপার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাইন্ডটেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। পরিবেশ সুরক্ষায় নিজেদের বিভিন্ন কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমাতে ১০ মেগাবাইটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
বর্তমানে শেল্টেক্ ও এনভয় লিগ্যাসি গ্রুপের অধীনস্থ ৩১টি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং সেখানে ১৭ হাজার কর্মী কর্মরত আছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মী সংখ্যা ৫৮ হাজারে এবং বার্ষিক লেনদেন ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগের বিষয়ে তানভীর আহমেদ বলেন, তারা এই বিনিয়োগের প্রক্রিয়া এক থেকে দেড় বছর আগেই শুরু করেছেন। মূলত রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আমদানির বিকল্প পণ্য দেশেই তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে এই বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সমস্ত অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন বিবেচনা করেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, তাই এই বিনিয়োগে ঝুঁকির মাত্রা খুবই কম।
দেশের ব্যাংকিং খাতে জমা থাকা মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই রয়েছে কোটিপতি হিসাবধারীদের নিয়ন্ত্রণে। সহজ করে বললে, ব্যাংকে জমা হওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৪০ টাকাই রয়েছে কোটি টাকার অ্যাকাউন্টগুলোতে। এছাড়া লাখপতিদের হিসাবে জমা আছে আরও ৫৬ শতাংশ আমানত। এর অর্থ দাঁড়ায়, ব্যাংক খাতের মোট অর্থের ৯৬ শতাংশেরই মালিক লাখপতি ও কোটিপতিরা। এর বিপরীতে দেশের ব্যাংক হিসাবগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই হাজার টাকার অ্যাকাউন্ট হলেও, সেখানে জমা রয়েছে মোট আমানতের মাত্র ৪ শতাংশ। অথচ মোট ব্যাংক হিসাবের ১ শতাংশের চেয়েও কম অ্যাকাউন্ট কোটিপতিদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের শেষ নাগাদ দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে শুরু করে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে অর্থের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক আমানতের ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবগুলোতে আমানত ছিল ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৫৬ শতাংশ। আর ১ টাকা থেকে ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত আমানত থাকা ছোট হিসাবগুলোতে জমার পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের মাত্র ৪ শতাংশ।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তিগত হিসাবের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও যুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা থাকাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। এর মধ্যে ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি থাকা উচ্চ অঙ্কের হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম জমা রয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ১৮০টি অ্যাকাউন্টে। আর ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকার কম জমা থাকা ক্ষুদ্র হিসাবের সংখ্যা ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫০টি।
সাম্প্রতিক তিন মাসেও নতুন আমানতের সিংহভাগ গেছে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্টে। গত ডিসেম্বর শেষে কোটিপতি হিসাবে জমার পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। এই একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা এবং হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৭ লাখ। অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই ত্রৈমাসিকে ব্যাংকে যে নতুন আমানত এসেছে, তার প্রায় অর্ধেকই যুক্ত হয়েছে কোটিপতিদের হিসাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জমার পরিমাণ অনুযায়ী দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোকে মোট ২৪টি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছে। এর মধ্যে ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকার কম জমার ভিত্তিতে ৫টি শ্রেণি, ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম জমার ভিত্তিতে ৯টি শ্রেণি এবং ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমার ভিত্তিতে ১০টি শ্রেণি রয়েছে। এই ২৪টি স্তরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা রয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিমাণের হিসাবগুলোতে।
তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। তবে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মার্চ শেষে এই শ্রেণির প্রতিটি হিসাবে গড় জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা, যার বড় অংশই শতকোটিপতিদের হিসাব। এই কোটিপতিদের তালিকায় ব্যক্তিশ্রেণির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত হিসাব সংখ্যার দিক থেকে বেশি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে অর্থের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি থাকে। বিশেষ করে সরকারি বড় প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের বিশাল অঙ্কের তহবিল ব্যাংকে রাখা হয়। আবার ব্যক্তিপর্যায়েও অনেকে নিজের কোম্পানির নামে টাকা জমা রাখেন। ফলে লাখপতি ও কোটিপতি হিসাবেই আমানতের বড় অংশ পুঞ্জীভূত দেখায়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, "বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্রান্তিক শেষে ব্যাংক হিসাব ও তাতে জমা অর্থের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে ব্যক্তির হিসাব যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাবও। ব্যক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে বেশি অর্থ জমা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের কাছে অনেক অর্থ থাকে। আবার বেসরকারি খাতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের হিসাবেও শত শত কোটি টাকা থাকে। তাই ব্যাংক হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে সাধারণ আমানতকারীদের হিসাব বেশি হলেও জমা অর্থের দিক থেকে কোটিপতি হিসাবের অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি।"
পরিসংখ্যান বলছে, গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই তিন মাসে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ২ হাজার ৪৪১টি বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টিতে দাঁড়িয়েছে। আমানত বৃদ্ধির এই ধারা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে। ডিসেম্বর শেষে এই স্তরে ১ হাজার ৯৯৭টি হিসাবে জমা ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে ২ হাজার ৭৪টি হিসাবে ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ এই এক শ্রেণিতেই তিন মাসে জমা বেড়েছে ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
বিপরীতে কোটিপতিদের কিছু নির্দিষ্ট স্তরে আমানত কমেছে। যেমন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা জমা থাকা হিসাবে ডিসেম্বর শেষে ৩৯ হাজার ১০ কোটি টাকা থাকলেও মার্চে তা কমে ৩৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা হয়েছে। এছাড়া ২০ থেকে ২৫ কোটি, ২৫ থেকে ৩০ কোটি, ৩৫ থেকে ৪০ কোটি এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা জমা থাকা হিসাবগুলোতেও এই তিন মাসে অর্থ কমেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র ঈদুল ফিতর থাকায় নির্বাচন কেন্দ্রিক এবং উৎসব কেন্দ্রিক বিপুল পরিমাণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থার সংকট পুরোপুরি না কাটায় অনেকে টাকা তুলে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করছেন।
অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাবের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সবচেয়ে কম আমানত রয়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জমা থাকা অ্যাকাউন্টগুলোতে। গত মার্চ শেষে এই স্তরে মোট জমার পরিমাণ কিছুটা কমে ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা হয়েছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৪ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। একই সাথে এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যাও ৬৩ লাখ ৪১ হাজার ৬১৮টি থেকে কমে ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১টি হয়েছে।
তবে হিসাবের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় অবস্থান ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা থাকা হিসাবগুলোর। মার্চ শেষে এই শ্রেণির হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ৫১২টি, যেখানে মোট জমার পরিমাণ ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এই শ্রেণির হিসাব ছিল ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই শ্রেণির গ্রাহকদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী বা স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা মূলত বেতন বা দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করেন, কিন্তু বড় কোনো সঞ্চয় করেন না।
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী যত মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। সুইজারল্যান্ডের সুপরিচিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইউবিএস প্রকাশিত 'বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন' থেকে জানা যায়, উক্ত সময়ে দেশটিতে ৪ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ মিলিয়নিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমেরিকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২শ মানুষ এই তালিকায় প্রবেশ করেছেন।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত বছর বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১০ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্ধিত বিপুল সম্পদের অর্ধেকের বেশির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং মূল ভূখণ্ড চীনে।
তবে দেশটিতে সম্পদের এমন পাহাড় গড়লেও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সেখানকার মোট সম্পদের ৩১ দশমিক ৬ শতাংশই কুক্ষিগত ছিল শীর্ষ এক শতাংশ পরিবারের কাছে। এর ঠিক উল্টোদিকে, নিচের সারিতে থাকা ৫০ শতাংশ পরিবারের কাছে সব মিলিয়ে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে গত জানুয়ারিতে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি মন্তব্য করেন যে, গুটি কয়েক মানুষের কাছে পরিবারের সম্পদগুলো কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে এবং সময়ের পরিক্রমায় এই বৈষম্য কেবল বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শীর্ষ ধনীদের সম্পদ ফুলেফেঁপে ওঠার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাতেও। গত মাসে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার রেকর্ড গড়েন ২০০২ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ইলন মাস্ক। রকেট নির্মাণকারী কোম্পানি স্পেসএক্স শেয়ারবাজার নাসডাকে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরই তিনি এই অভাবনীয় মাইলফলক অর্জন করেন। যদিও স্পেসএক্স ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ার বিক্রির কারণে সৃষ্ট চাপে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে তার সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। অন্যদিকে, গত মাসে প্রকাশিত আর্থিক তথ্য বিবরণীর বরাতে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর অন্তত ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন, যার প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারই এসেছে ক্রিপ্টো মুদ্রা থেকে।
একশ্রেণির মানুষের এমন রমরমা অবস্থার বিপরীতে খাদ্য ও জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা। গত বছরের একই সময়ের সাপেক্ষে মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। পণ্য ও সেবামূল্যের ওঠা-নামা পর্যবেক্ষণে সরকারের ব্যবহৃত ভোক্তা মূল্যসূচকের তথ্য বলছে, গত এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যের দাম ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং জ্বালানি খরচ ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন এই সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা গেছে গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত ইকোনমিস্ট ও ইউগভের যৌথভাবে পরিচালিত এক জনমত জরিপে। সেখানে অংশ নেওয়া সিংহভাগ মার্কিন নাগরিকই সম্পদ বৈষম্যকে একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার এই ফারাককে ‘অত্যন্ত বড় সমস্যা’ বলে মনে করেন ৫২ শতাংশ মানুষ। ২৮ শতাংশ নাগরিক এটিকে ‘মোটামুটি বড় একটি সমস্যা’ হিসেবে মত দিয়েছেন। এছাড়া ১৪ শতাংশের কাছে এটি ‘ছোটখাটো সমস্যা’ হলেও, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ৬ শতাংশ মনে করেন যে সম্পদ বৈষম্য আসলে কোনো সমস্যাই নয়।
তিন বছর আগের তীব্র অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির এই ধারাবাহিক অগ্রগতির স্বীকৃতিস্বরূপ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকা থেকে উন্নত করে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
গত ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ আয়ভিত্তিক দেশগুলোর শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশ করে, যেখানে শ্রীলঙ্কার এই উত্তরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিকে এই নতুন আয়ের তালিকায় উন্নীত করা হয়েছে। মূলত শিল্প খাতের পুনরুত্থান, পর্যটন শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ এবং আর্থিক সেবা খাতের গতিশীলতা এই অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
শ্রীলঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে বিশ্বব্যাংক ‘পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ২০২২ সালে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দেশটি যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেখান থেকে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তারা প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক সেবার প্রসারের মাধ্যমে। যদিও উচ্চ মধ্যম আয়ের নির্ধারিত সীমাটি শ্রীলঙ্কা অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে পার হতে পেরেছে, তবুও এই অর্জন দেশটির অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতার একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক মূলত চারটি আয়ভিত্তিক ভাগে বিন্যস্ত করে থাকে—উচ্চ আয়, উচ্চ মধ্যম আয়, নিম্ন মধ্যম আয় এবং নিম্ন আয়। এই তালিকায় শ্রীলঙ্কার নতুন অবস্থান দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের যাত্রায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের এই নতুন তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে আগের ক্যালেন্ডার বছরের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) হিসাব করে। বিশ্বের মোট ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্ত করে তৈরি করা এই নতুন তালিকাটি ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে আত্মঘাতী বোমা হামলা, পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারি এবং এর জের ধরে তৈরি হওয়া বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতার সংকটের কারণে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা তাদের সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ (সোভরেন ডিফল্ট) হয়েছিল। এর ফলে দেশটির অর্থনীতি বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক সহায়তায় গৃহীত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কর্মসূচি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে আনা সময়োপযোগী সংস্কার, বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, পর্যটন খাতের দ্রুত পুনরুজ্জীবন, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নতিই শ্রীলঙ্কার দেউলিয়া দশা থেকে এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
দেশের ব্যাংকগুলোর ট্রেড ফাইন্যান্স বা বাণিজ্য অর্থায়ন খাতে সম্পদের গুণগত মানের ওপর ক্রমান্বয়ে চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্সে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলোর বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ঋণ পোর্টফোলিওতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। কিছু ব্যাংকে এই খেলার হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠানে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য অর্থায়নে বড় এক্সপোজার রয়েছে, সেখানে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংক’ শীর্ষক এক রিভিউ কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে এই চিত্র উঠে আসে। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বিআইবিএম ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি প্রফেসর ও এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাজ্জাদ হায়দার চৌধুরী এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।
গবেষক দলের পক্ষ থেকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিআইবিএমের প্রফেসর (সিলেকশন গ্রেড) ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। তিনি উল্লেখ করেন, বাণিজ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড দায়গুলো জোরপূর্বক ঋণে (ফোর্সড লোন) রূপান্তরিত হওয়াই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি, তুলা ও বিভিন্ন কাঁচামাল, চিনি, সার, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির বিপরীতে দেওয়া ট্রেড ফাইন্যান্সে এ ধরনের ফোর্সড লোন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান নষ্ট করছে।
এই গবেষণায় রপ্তানি অর্থায়ন কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব ব্যাংকিং কর্মকর্তা জানান, আইনগতভাবে কার্যকর কোনো ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়াই ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহারের কারণে রপ্তানি অর্থায়নে খেলাপির সৃষ্টি হচ্ছে। নিশ্চিত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহার করার কথা থাকলেও, এর ভিত্তি যদি দুর্বল বা আইনগতভাবে অকার্যকর হয়, তবে পুরো অর্থায়ন প্রক্রিয়াটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর ফলে রপ্তানি আয় যথাসময়ে না এলে বাণিজ্য অর্থায়নের স্বয়ং-পরিশোধযোগ্য বৈশিষ্ট্যটি নষ্ট হয়ে যায় এবং তা দ্রুত ফোর্সড লোনে পরিণত হয়ে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কর্মশালায় বক্তারা বাণিজ্য অর্থায়ন কার্যক্রমের আধুনিকায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের মান উন্নয়নে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করার লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ট্রেড ডকুমেন্টের জন্য আধুনিক আইনি ও ডিজিটাল অবকাঠামো প্রস্তুত করা জরুরি। এর পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান ঠিক রেখে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং রুখতে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বাণিজ্য অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেন মহাপরিচালক। সেই সঙ্গে পণ্যভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও কার্যকর বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিক করতে রংপুরের ৯টি ৩৩/১১ কেভি এআইএস উপকেন্দ্রের উন্নয়ন ঘটাবে। এ সংক্রান্ত ১৪১ কোটি ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৬ টাকার একটি ক্রয় প্রস্তাব সায় দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বুধবার (৮ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
‘নেসকো এলাকায় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীন প্যাকেজ-জিডি-৬ (পি-০৬)-এর মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলের ওই উপকেন্দ্রগুলোর নকশা তৈরি, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং তা সচল করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অ্যাডেক্স করপোরেশন লিমিটেড (এসিএল) ও অ্যাডেক্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (এইইএল) যৌথ উদ্যোগ এই কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করার সুপারিশ প্রদান করে।
একই সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার একটি ভেরিয়েশন প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। এটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পরিচালিত ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর সিআইবি-২-প্যান-ডব্লিউ-৩০-এর অংশ।
সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত এই কাজের মূল চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছিল ১১০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ভেরিয়েশন বাবদ আরও ৬ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ৬১৯ টাকা অনুমোদন করা হয়, যা আদি চুক্তিমূল্যের চেয়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে পুরো প্রকল্পের সংশোধিত চুক্তিমূল্য দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ৬১৯ টাকা। এই নির্মাণকাজটি সম্পাদনের দায়িত্বে রয়েছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
দেশের বাজারে আবারও সোনা ও রুপার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩২৩ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দাম কমানোর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে আজ সকাল ১০টা থেকেই দেশের বাজারে সোনা ও রুপার এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে।
বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। গতকাল পর্যন্ত এই মানের সোনার দাম ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর পাশাপাশি ২১ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা। এই নতুন দামের ফলে ক্রেতারা আগের চেয়ে কিছুটা কমে স্বর্ণালঙ্কার ক্রয় করতে পারবেন।
উচ্চ মানের সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মানের সোনার দামও কমানো হয়েছে। বাজুসের নির্ধারিত নতুন দাম অনুযায়ী, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা এখন থেকে দেশের বাজারে ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকায় বিক্রি হবে। অন্যদিকে, সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকা।
সোনার দাম কমানোর পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও কমিয়েছে সংগঠনটি। নতুন তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা এবং ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হবে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকায়। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ২ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রপ্তানি, শ্লথ বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এডিবির সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে আগামী ২০২৭ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সমন্বয়, পরিবহন খরচ এবং মুদ্রার বিনিময় হারের প্রভাবে ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশেই অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া ২০২৭ অর্থবছরে এটি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ভোগ কমে যাচ্ছে। দুর্বল রপ্তানি ও শ্লথ আমদানির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, উৎপাদন ও কৃষি খাতও উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং সার সংকটের মতো কাঠামোগত সমস্যার কারণে চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং স্থিতিশীল সেবা খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কিছুটা টিকিয়ে রেখেছে বলে জানিয়েছে এডিবি। সংস্থার বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের অফিসার-ইন-চার্জ আকিরা মাতসুনাগা জানান, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট দূরীকরণে ধারাবাহিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও জ্বালানি সংকট না কাটলে প্রবৃদ্ধির এই গতি খুব বেশি শক্তিশালী হবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু বড় ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও শিপিং খরচ বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি এবং বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে বাণিজ্য বিধিনিষেধের ফলে রপ্তানি চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর ক্রমাগত চাপ, বৈশ্বিক অর্থায়নের কঠিন শর্তাবলি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিপ উৎপাদন খাতে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রডকমের সঙ্গে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি বিশাল সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে টেক জায়ান্ট অ্যাপল। এই চুক্তির আওতায় ব্রডকম যুক্তরাষ্ট্রে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্সে অবস্থিত একটি কারখানা সম্প্রসারণ করবে। গত সোমবার ব্রডকম ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এই চুক্তির কথা জানালেও বুধবার অ্যাপল বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। মূলত আইফোনসহ অ্যাপলের বিভিন্ন ডিভাইসের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রযুক্তির চিপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো 'এফবিএআর ফিল্টার' (FBAR filters) নামক বিশেষ রেডিওফ্রিকোয়েন্সি চিপ উৎপাদন করা, যা অ্যাপল ডিভাইসের ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও নিখুঁত করতে সহায়তা করবে। অন্তত ২০২৩ সাল থেকেই অ্যাপল ও ব্রডকম যৌথভাবে এই প্রযুক্তিটি নিয়ে কাজ করছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে ব্রডকম তাদের কলোরাডো কারখানার উন্নয়নে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এবং সেখান থেকে অন্তত ১৫ বিলিয়ন চিপ উৎপাদিত হবে বলে জানানো হয়েছে। অ্যাপলের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আরও বেশি চিপ সংগ্রহের পরিকল্পনারই একটি অংশ।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ফোর্ট কলিন্সে তৈরি এই অত্যাধুনিক উপাদানগুলো তাদের গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স ও কানেক্টিভিটি প্রদানের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। তিনি মার্কিন সরবরাহকারীদের সাথে বিনিয়োগের এই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পেরে গর্ব প্রকাশ করেন এবং এই প্রকল্পে সমর্থন দেওয়ার জন্য বর্তমান প্রশাসন ও প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল অ্যাপলের পণ্যের মানই বাড়াবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় চিপ উৎপাদন শিল্পে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ সরবরাহের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশটিকে এগিয়ে রাখবে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতাধীন শিল্পনগরীগুলোতে গত চার বছরের ব্যবধানে পণ্য রপ্তানি আয় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিসিকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ যুক্ত হলেও রপ্তানি আয় বাড়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। একই সঙ্গে শিল্পনগরীগুলোতে বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকা খালি প্লটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিসিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটির অধীনস্থ ৮৮৭টি রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান মোট ৪৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছিল। সেই সময়ে এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা এবং জাতীয় রপ্তানি আয়ে বিসিকের অবদান ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেলেও রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকায়। ফলে জাতীয় রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বিসিকের অবদান এখন ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিসিকের এসব শিল্পে মূলত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, বস্ত্র, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হয়।
শিল্প প্লটগুলোর বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত বিসিকের মোট ১৩ হাজার ৩৬৪টি প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৭টি বর্তমানে খালি রয়েছে। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুন মাসে এই খালি প্লটের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৩৯টি এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে ছিল ১ হাজার ৩টি। পরিসংখ্যান বলছে, শিল্পনগরীগুলোতে নতুন উদ্যোক্তা আসার হার কমে যাওয়ায় প্রতি বছরই খালি প্লটের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ২৩৭টি খালি প্লট রয়েছে সিরাজগঞ্জ শিল্পনগরীতে। এ ছাড়া রাজশাহী শিল্পনগরী-২, চুয়াডাঙ্গা এবং বরগুনার শিল্পনগরীগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লট অবরাদ্দকৃত অবস্থায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত উদ্যোক্তার অভাব এবং নতুন শিল্প এলাকা যুক্ত হওয়ায় খালি প্লটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বিসিক কর্মকর্তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে খালি প্লটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্লট দ্রুত বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে অনেক সময় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বাজারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে বিনিয়োগ বাড়লেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের ক্ষুদ্র শিল্প খাত। এই পরিস্থিতি উত্তরণে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজতর ও ব্যবসাবান্ধব করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে জ্বালানি শোধন সক্ষমতা বাড়াতে ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি)। সরকারের অ-রিয়াতকালীন ঋণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি (এসসিএনসিএল) সম্প্রতি এই অর্থায়নের প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। যদিও এই ঋণের শর্তসমূহ বেশ কঠোর ও ব্যয়বহুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবুও দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পটিকে অত্যন্ত কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইএসডিবির এই অর্থায়ন মূলত দুটি ভিন্ন প্যাকেজে বিভক্ত। এর মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’ প্যাকেজের আওতায় ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’ এর অধীনে ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হবে। ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারের ‘টার্ম সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’ (এসওএফআর) বেঞ্চমার্কের ভিত্তিতে, যার সাথে নির্দিষ্ট স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম যুক্ত থাকবে। ২০ বছর মেয়াদি এই ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য ৫ বছরের রেয়াতকাল সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এই অর্থায়নকে ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ বা উচ্চ ব্যয়বহুল হিসেবে অভিহিত করেছে।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক তেল শোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিটটি বাস্তবায়িত হলে এর সাথে আরও ৩০ লাখ টন সক্ষমতা যুক্ত হবে, যার ফলে বার্ষিক মোট শোধন ক্ষমতা তিন গুণ বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এর ফলে বিদেশ থেকে সরাসরি পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি থেকে ইউরো-৫ মানের ডিজেল ও গ্যাসোলিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির চাপও কমিয়ে আনবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩১ হাজার ০০০ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই উন্নয়ন কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে। ইআরডি সুপারিশ করেছে যে, ঋণ হস্তান্তরের আগে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে যাতে এই বিশাল ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি না হয়।
উল্লেখ্য, ইস্টার্ন রিফাইনারির এই দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনাটি ২০১০ সালে প্রথম গ্রহণ করা হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অর্থায়ন সংকট এবং বিভিন্ন সময়ে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে বর্তমানে এই উদ্যোগটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগামী আগস্ট মাসে আইএসডিবির প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় এই চূড়ান্ত ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।