চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
চলতি মার্চ মাসের প্রথম সাত দিনেই দেশে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার করে প্রবাসী আয় দেশে প্রবেশ করেছে। ঈদকে সামনে রেখে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক গতি দেখা যাচ্ছে।
রবিবার (৮ মার্চ) এ তথ্য জানিয়েছেন আরিফ হোসেন খান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার।’
তার দেওয়া তথ্যে আরও জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৩৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ ২২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীরা দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতে সামগ্রিকভাবে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বাড়ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। জানুয়ারি মাসে আসে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।
আর গত ডিসেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। আজ রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রীর কার্যালয়ে এই আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ডিসিসিআই সভাপতি ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতি সুদের হার ক্রমান্বয়ে হ্রাসের প্রস্তাব তুলে ধরেন। এছাড়া তিনি প্রকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সহায়তায় ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পুনর্বিবেচনা এবং শ্রেণিকরণের সময়সীমা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বৈঠকে তাসকীন আহমেদ বলেন, “মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা জোরদার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হবে।”
ঢাকা চেম্বারের এই প্রস্তাবনাগুলোর বিপরীতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, দেশের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো বেসরকারি খাত। বর্তমান সরকার শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগকে শীর্ষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এ খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বেশি ব্যবসাবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ানোও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।
উক্ত বৈঠকে ডিসিসিআই-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী এবং সহ-সভাপতি সালিম সোলায়মান উপস্থিত ছিলেন।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ায় প্রধান সূচকগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পতন নেমে এসেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, দিনভর লেনদেনে ৩৯০টি কোম্পানির মোট ২৩ কোটি ৯২ লাখ ৪২ হাজার ২০টি শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে। এতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩১ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৩২০ টাকা।
দিনশেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২৩১ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট কমে ৫,০০৯ পয়েন্টে নেমে আসে। একই সময়ে ডিএসই-৩০ সূচক ৯১ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট কমে ১,৯১৯ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৩৫ দশমিক ২৫ পয়েন্ট কমে ১,০১৩ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে অবস্থান করে।
লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে শেয়ারদর বেড়েছে মাত্র ১০টির। বিপরীতে ৩৭১টি কোম্পানির দর কমেছে এবং ৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণের ভিত্তিতে শীর্ষে ছিল— সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, রবি আজিয়াটা লিমিটেড, খান ব্রাদার্স পিপি, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, শাইনপুকুর সিরামিকস, ইনটেক লিমিটেড ও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি।
দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সিটি ইন্স্যুরেন্স, বাটা সু ও হাওয়া অয়েল।
অন্যদিকে দর কমার শীর্ষ তালিকায় রয়েছে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, দুলামিয়া কটন, এসএস স্টিল, নর্দার্ন জুট, প্রাইম ব্যাংক, পিডিএল, সার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও এনবিএল।
উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের মার্চ মাসের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা। গত মাসে এ দাম ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ লিটারপ্রতি ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য শূন্য দশমিক ৬২৫৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (৮ মার্চ) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন দাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ৯৪ টাকা ৯৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৫ টাকা ১২ পয়সা করা হয়েছিল। একই সময়ে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি শূন্য দশমিক ৬২৪৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৬২৫৭ ডলার নির্ধারণ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন নির্ধারিত মূল্য রোববার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হবে।
পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ার পেছনে কেবল কর প্রণোদনা বা ইনসেনটিভের ঘাটতি দায়ী নয় বলে মন্তব্য করেছেন মো. আবদুর রহমান খান। তার মতে, বাজারের মূল সমস্যাগুলো অন্য জায়গায় রয়েছে, যেগুলো সমাধান না করলে শুধু প্রণোদনা দিয়ে স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।
রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট ইন দ্য স্টক মার্কেট’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ)।
তিনি বলেন, ‘ইনটেনসিভ সমাধান নয়, আগেও আমরা অনেক বেশি ইনটেনসিভ দিয়ে দেখেছি, তাতেও ভালো ফল আসেনি। বর্তমানে যে সাড়ে ৭ শতাংশ ট্যাক্স পার্থক্য রয়েছে, সেটি কম নয়।’
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ।
এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা গত বছর ক্যাপিটাল গেইনে (মূলধনি মুনাফা) ট্যাক্স কমিয়েছিলাম, তার ফলে দুই-তিন দিন বাজার ভালো ছিলো। পরে আবার আগের মতো খারাপ হলো। তাহলে সমস্যা তো ক্যাপিটাল গেইনে ছিলো না। ইনটেনসিভ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে উন্নয়ন করা যায় না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যাংকে টাকা রেখে, বিমায় পলিসি করে এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে মানুষ ঠকেছে। এখানে আমাদের পলিসিতে সমস্যা ছিলো, আছে। বিশ্বের কোনো দেশের অর্থনীতিই পুঁজিবাজার বাদ দিয়ে এগোতে পারেনি। আমরা কেন পুঁজিবাজারকে উদ্যোক্তাদের জন্য আগ্রহের জায়গায় নিতে পারিনি? এর বড় কারণ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যাংক থেকে হয়েছে। তাহলে পুঁজিবাজার থেকে টাকা না নিয়ে উদ্যোক্তারা কেন ব্যাংকে যাচ্ছে, সেটির কারণ খুঁজতে হবে?’
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী কেন আসবে? এখানে অবশ্যই ব্যাংকের থেকে পুঁজিবাজারে বেশি লাভ পাওয়ার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যারা অডিটর (নিরীক্ষক) আছেন, নিয়ন্ত্রক রয়েছেন, তাদের বাছাই করে এমন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে, যেগুলো ভালো মুনাফা দিতে সক্ষম। অথচ বাংলাদেশে যে কোম্পানিগুলো বিগত বছরগুলোতে এসেছে তার বেশিরভাগ খারাপ ছিলো। এর অনেকগুলো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বন্ধ হওয়ার অবস্থায় রয়েছে।’
মিউচুয়াল ফান্ড খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘মিউচুয়াল ফান্ড হলো নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম। কিন্তু আমাদের দেশে এটি বড় ব্যর্থতা যে এখানে সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতি হয়েছে। তাহলে বিনিয়োগকারীর জন্য মিউচুয়াল ফান্ড নিরাপদ বিনিয়োগ হলো কীভাবে? এখানে তো আমরা বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের এই জায়গাগুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। ইনটেনসিভ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কিছুই উন্নতি হবে না। ইনটেনসিভের চিন্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মো. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাই বড় প্রতিবন্ধকতা। তার মতে, তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোকে বেশি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মধ্যে থাকতে হয়, তাই তাদের আকৃষ্ট করতে করপোরেট কর ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
আলোচনায় সুমিত পোদ্দার বলেন, গত দুই বছরে কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারে আসেনি। তার মতে, ভালো কোম্পানি আনতে হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য দেওয়া ট্যাক্স ইনসেনটিভের ব্যবধান বাড়ানো উচিত। উদাহরণ হিসেবে তিনি শ্রীলঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রণোদনা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে মো. সাইসুদ্দিন বলেন, ‘আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেছি, এখনো কেন আমাদের ইনটেনসিভ নিয়ে ভাবতে হবে? এখানে নিশ্চয়ই সিস্টেমে কিছু সমস্যা আছে। আমাদের সমস্যাগুলো খুঁজতে হবে। ইনটেনসিভ দিয়ে নয়, সমস্যার সমাধান খুঁজে ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে ইকুইটি নির্ভরতা কমিয়ে ফিক্সড ইনকাম ও ফিক্সড কুপন ধরনের পণ্যের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে বাজারে আস্থা বাড়বে এবং সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মনির হোসেন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মমিনুল ইসলাম, একে এম হাবিবুর রহমান এবং রিয়াদ মাহমুদ।
দেশে টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও স্পষ্টভাবে পড়েছে। প্রায় আট মাস পর আবারও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে।
সর্বশেষ হিসাবে, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। এর আগের মাস জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে। জানুয়ারিতে একই খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ফলে টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। আগের মাস জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আটজন অর্থনীতিবিদ। তাদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হলে ডলার বাজার ও রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত রিজার্ভ ধরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
একই সঙ্গে তারা এখনই নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন তারা।
শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক বৈঠকে এসব মতামত তুলে ধরা হয়। আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে মুদ্রানীতি কমিটির এক সদস্যের পদত্যাগ এবং অর্থনীতিবিদদের আপত্তির কারণে সেই বৈঠক শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। এরই মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারের সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপ নির্ধারণে অর্থনীতিবিদদের মতামত জানতে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে অংশ নেন মোস্তাফিজুর রহমান, ফাহমিদা খাতুন, মোস্তফা কে মুজেরী, মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সেলিম রায়হান, মাসরুর রিয়াজ, এ কে এনামুল হক এবং নাজমুস সাদাত খান।
এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পাশাপাশি চারজন ডেপুটি গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়মিত বিশ্লেষণ করে জনসাধারণকে জানাতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন। এতে বাজারে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক কমবে বলে তারা মনে করেন।
বৈঠকে আলোচনা হয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ডলার বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আবারও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ প্রেক্ষাপটে কী ধরনের নীতি নেওয়া উচিত সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মতামত জানতে চান গভর্নর। তিনি এ সময় বলেন, ‘তিনি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।’ একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তাই সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে যে রিজার্ভ রয়েছে তা সংরক্ষণ করতে হবে এবং রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করে আমদানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরের মতো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তারা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ঋণ দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে অতিরিক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও মত দেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা আরও বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তাই এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পেতে পারেন, সে বিষয়েও বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গত মাসে কর্মসংস্থানের সংখ্যা অপ্রত্যাশিতভাবে কমে গেছে। এতে দীর্ঘদিনের শক্তিশালী শ্রমবাজারে নতুন করে দুর্বলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে দেশটিতে পে-রোল বা কর্মসংস্থান কমেছে ৯২ হাজার। একই সময়ে বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
কর্মসংস্থান কমার অর্থ হলো চাকরির সংখ্যা বা শ্রমবাজারে কর্মরত মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া। এর আগে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করেছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কমতে পারে। রয়টার্স পরিচালিত এক জরিপেও একই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, নিয়োগের গতি কমলেও বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে অক্টোবরের সাময়িক শাটডাউনের পর একক মাসে সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান হ্রাসের ঘটনা ঘটে ফেব্রুয়ারিতে। বিশেষ করে ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখন মার্কিন শ্রমবাজারেও স্পষ্ট হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব খাতেই কর্মসংস্থান কমেছে। এমনকি দেশটির অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত হিসেবে বিবেচিত স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মূলত ওই খাতে ব্যাপক ধর্মঘটের কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মী কাজ হারিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরির ক্ষেত্রেও অস্থিরতা কমেনি। দেশটির শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ফেডারেল সরকারে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার বা প্রায় ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
শুধু সাম্প্রতিক মাসই নয়, শ্রম দপ্তর জানিয়েছে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও কম ছিল প্রকৃত সংখ্যা।
তবে শ্রমবাজারের এমন পরিস্থিতির মধ্যেও আশাবাদী কেভিন হ্যাসেট। মার্কিন ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক হিসেবে তিনি সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সামনের মাসগুলোয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রাখবে। সামনে অনেক বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হতে যাচ্ছে। ফলে কাজ করতে আগ্রহীরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো চাকরি খুঁজে পাবেন।’
প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের আগে নতুন কাগজের নোট বাজারে ছাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। গ্রাহকেরা এসব নতুন নোট সংগ্রহ করে সাধারণত পরিবার-পরিজন ও শিশুদের ঈদ সালামি হিসেবে দিয়ে থাকেন। সময়ের সঙ্গে এটি এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, ফলে ঈদের আগে নতুন নোটের চাহিদাও বেড়ে যায়।
তবে চলতি বছর সেই সুযোগ থাকছে না।
রবিবার (৮ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে এবারের ঈদ উপলক্ষে বাজারে নতুন টাকা সরবরাহ করা হবে না।
সাধারণত প্রতিবছর ঈদের ১০-১৫ দিন আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন মানের (৫, ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকা) নতুন নোট গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়। এটি আমাদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত মুদ্রা সরবরাহ থাকায় এবং বিশেষ কিছু নীতিগত কারণে নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নেই।
দেশে কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রি-পেইড কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই প্রবণতার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে কার্ডের ব্যবহার, লেনদেনের ধরণ এবং কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। সময়ের ব্যবধানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৪৪ কোটি টাকায়।
বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক এবং একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফসি) কার্ড সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যাংক ডেবিট কার্ড সেবা পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি শেষে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড মিলিয়ে কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি।
পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখে। অর্থাৎ এই সময়ে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১৫ শতাংশ।
এদিকে ২০২০ সালের আগস্ট শেষে দেশে সব ধরনের কার্ড ছিল প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ। পরে তা বেড়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৬৯ লাখে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যাংকের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকেরা মোট ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন।
এই ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা, যা মোট ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। তাদের পর যুক্তরাজ্য, ভারত, মোজাম্বিক, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও সৌদি আরবের নাগরিকেরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে এগিয়ে ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড রুটে জাহাজ আটকে থাকায় সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
শত শত পণ্যবাহী জাহাজ সাগরে আটকা পড়েছে। এর মধ্যে পচনশীল খাদ্য ও জীবিত পশুবাহী কনটেইনারগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এফটির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ৪২৫টি কনটেইনার জাহাজের মধ্যে অন্তত ৯০টি পারস্য উপসাগরে আটকা আছে। এছাড়া ১০০টিরও বেশি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটকে যাওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ড্রোন হামলার ঝুঁকির কারণে উপসাগরীয় বন্দরগুলোতে মালামাল খালাস করা বর্তমানে অসম্ভব। হিমায়িত খাদ্য ও গবাদিপশুবাহী জাহাজগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন। দুবাইয়ের জেবেল আলী ও ওমানের সালালাহ বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় এশিয়ার দূরবর্তী বন্দরগুলোতেও জট সৃষ্টি হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চারটি জাহাজে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য হালাল মাংস পরিবহনের উদ্দেশ্যে জীবিত গবাদিপশু আছে। শিপিং জায়ান্ট মায়ের্স্কের চিফ প্রডাক্ট অফিসার জোহান সিগসগার্ড জানান, শেলফ লাইফ কম হওয়ায় হিমায়িত পণ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে লাতিন আমেরিকা থেকে আসা এসব পণ্যের জন্য বিকল্প স্টোরেজ খোঁজা হচ্ছে।
উপসাগরীয় বন্দরগুলো অকার্যকর হওয়ায় চাপ পড়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার তানজুং পেলেপাস, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এবং উত্তর আফ্রিকার তানজিয়ার ও আলজেসিরাস বন্দরে। সিঙ্গাপুরে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য অপেক্ষার সময় ২ দশমিক ৯ দিন থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৫ দিনে পৌঁছেছে। হ্যাপাগ-লয়েডের প্রধান নির্বাহী রলফ হাববেন জ্যানসেন জানিয়েছেন, তারা বিকল্প বন্দরের জন্য ব্যবস্থা করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি এমএসসি ১৯ শতকের একটি সামুদ্রিক আইন প্রয়োগ করে জানিয়েছে, কনটেইনারগুলো নিকটস্থ সুবিধাজনক বন্দরে নামিয়ে দেয়া হবে। গ্রাহকদের নিজ খরচে সেখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৮০০ ডলার ‘ডেভিয়েশন কস্ট’ দিতে হবে।
স্থবির আকাশপথ ও সড়কপথের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মোট এয়ার কার্গোর ১৩ শতাংশ স্থবির। অনেক বিমান অবতরণ করতে পারছে না। ডিএইচএল শত শত ট্রাক ব্যবহার করে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করছে। লজিস্টিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সপ্তাহের অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে অন্তত চার সপ্তাহ সময় লাগবে।
শিপিং বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইস্তানবুল হাব সচল থাকায় তুর্কি এয়ারলাইনস ব্যবসায়িক সুবিধা পেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খরচ ও জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বৈশ্বিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের দোকানপাট ও শপিংমলে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।
শনিবার রাজধানীতে সংগঠনের সভাপতি হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি বলেন, 'এটি (জ্বালানি সংকট) আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি হয়েছে। এই সংকটটি তৈরি হয়েছে আমেরিকা, ইসরায়েল এবং ইরানের যুদ্ধের কারণে। আমরা মনে করি যেকোনো কারণেই হোক, আমাদেরকে সাশ্রয়ী হতে হবে। আগামীকাল (রোববার) থেকে আমরা সমস্ত মার্কেটে আলোকসজ্জাগুলো বন্ধ রাখব। পাশাপাশি খুব অপ্রয়োজনীয় বাতি যেগুলো আছে সেগুলো আমরা বন্ধ রাখব।'
এদিকে সরকারও জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে জ্বালানি তেল সরবরাহ রেশনিং পদ্ধতিতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। একই সঙ্গে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা ঠেকাতে রোববার থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে যথাযোগ্য গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬ উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
৮ মার্চ উদযাপন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (বিআরপিডি) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে।
সার্কুলারটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বরাবর পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের যে প্রস্তুতি চলছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকিং খাতেও দিবসটি যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
চলতি বছর দিবসটির জন্য সরকার নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো, ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সব ধরনের কর্মসূচি ও প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী তাদের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যাতে ব্যাংকিং খাতে দিবসটি যথাযথভাবে উদযাপিত হয়।
সার্কুলারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় রেখে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে এবং উদযাপন কার্যক্রমে নির্ধারিত প্রতিপাদ্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।