চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৪০১ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) এই হিসাবটি নিশ্চিত করেছে।
অর্ধবার্ষিক হিসেবে রপ্তানি নিম্নমুখী হলেও একক মাস হিসেবে গত জুন মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির দেখা মিলেছে। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭৬ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার সমমূল্যের পোশাক ক্রয় করেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এই সংগ্রহ ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
সামগ্রিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির চাহিদা মোটের ওপর হ্রাস পেয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির মোট পোশাক আমদানি মূল্যমানের নিরিখে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং পরিমাণের দিক থেকে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আমদানির হ্রাসের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানি হ্রাসের গতি কিছুটা কম।
বাজারের এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কেউ কেউ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে মূল্যমানের বিচারে কম্বোডিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ১ দশমিক ০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের রপ্তানি ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। পোশাক সরবরাহে প্রধান দুই দেশ চীন ও ভারতের পতন ছিল চোখে পড়ার মতো, যেখানে ভারতের রপ্তানি ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং চীনের রপ্তানি কমেছে ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন ও ভারতের পতন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি হলেও কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম এ সময় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
পণ্যের পরিমাণের দিক থেকে বিচার করলেও একই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দৃশ্য স্পষ্ট হয়। প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হ্রাস পেলেও বিপরীতে কম্বোডিয়া ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং পাকিস্তান ২ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তবে ভারত ও চীন পরিমাণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং চীন থেকে ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ কমেছে।
রপ্তানির পাশাপাশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যেও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পোশাকের গড় মূল্য এ সময়ে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে, যা ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। এছাড়া কম্বোডিয়া ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ভারত ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, পাকিস্তান ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ইউনিট মূল্য ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে। তবে চীনের ক্ষেত্রে এই পতনের হার সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমলেও চীন ও ভারতের তুলনায় পতনের হার কম। বাংলাদেশের পতন পাকিস্তানের কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হওয়ায় দেশটির সামগ্রিক পোশাক আমদানি হ্রাসের এই প্রেক্ষাপটটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সে গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেটের প্রাথমিক বিনিয়োগের মূল্য ১০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অ্যালফাবেটের হাতে থাকা স্পেসএক্সের শেয়ারের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। অথচ ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্পেসএক্সে বিনিয়োগ করেছিল মাত্র ৯০০ মিলিয়ন ডলার।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুনে স্পেসএক্সের ৮৬ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক আইপিওর পর অ্যালফাবেট এখন প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারধারী। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) জমা দেওয়া বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। অ্যালফাবেটের নথি অনুযায়ী, জুনের শেষে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ছিল ৫৫১ দশমিক ২ মিলিয়ন স্পেসএক্স শেয়ার। ৩০ জুন স্পেসএক্সের প্রতি শেয়ারের দাম ১৭০ দশমিক ৮৬ ডলার হিসেবে এসব শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৯৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। তবে পরবর্তী সময়ে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম কমেছে। বৃহস্পতিবারের বাজারদর অনুযায়ী, অ্যালফাবেটের ওই শেয়ারগুলোর মূল্য প্রায় ৭৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তবুও এটি ২০১৫ সালে অ্যালফাবেটের করা মূল বিনিয়োগের তুলনায় প্রায় ৮৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
শীর্ষ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের তালিকা
এসইসিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্সে অ্যালফাবেটের পর সবচেয়ে বেশি শেয়ার রয়েছে ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টসের হাতে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছে প্রায় ৩০২ দশমিক ৬ মিলিয়ন শেয়ার। এরপর গিগাফান্ড ম্যানেজমেন্টের ১৭১ দশমিক ৮ মিলিয়ন, বেইলি গিফোর্ডের ৫১ দশমিক ৪ মিলিয়ন এবং ব্ল্যাকরকের ৫১ মিলিয়ন শেয়ার রয়েছে। সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) হাতে রয়েছে প্রায় ১৫৪ দশমিক ১ মিলিয়ন শেয়ার। জুনের শেষে এসব শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ২৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার খনি ব্যবসায়ী জিনা রাইনহার্ট নিয়ন্ত্রিত হ্যানকক প্রসপেক্টিংয়ের হাতে রয়েছে ৮ মিলিয়ন শেয়ার, টাইগার গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ব্রুকফিল্ড করপোরেশনের ১৯ দশমিক ২ মিলিয়ন এবং বালিয়াসনি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন শেয়ার। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যালফাবেট, ফিডেলিটি, গিগাফান্ড, বেইলি গিফোর্ড ও ব্ল্যাকরক, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠান মিলে প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক স্পেসএক্স শেয়ারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের মালিক। এতে কোম্পানিটির প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানায় কয়েকটি বড় বিনিয়োগকারীর আধিপত্য স্পষ্ট হয়েছে। স্পেসএক্স গত ১২ জুন শেয়ারপ্রতি ১৩৫ ডলার দরে পুঁজিবাজারে যাত্রা শুরু করে। ৩০ জুন কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়ে ১৭০ দশমিক ৮৬ ডলারে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে আসে। বৃহস্পতিবার স্পেসএক্সের শেয়ার ১৪১ দশমিক ২৯ ডলারে লেনদেন শেষ হয়। বর্তমান দরটি আইপিও মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি হলেও ৩০ জুনের দামের তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারটির দরে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ৫ আগস্টের পর থেকে স্পেসএক্সের শেয়ারদর প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে
স্পেসএক্সের শেয়ার বর্তমানে অন্যতম সক্রিয়ভাবে লেনদেন হওয়া শেয়ারগুলোর একটি। আইপিওর পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এসইসিতে প্রকাশিত ১৩এফ নথির একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো প্রতি ত্রৈমাসিকে একবার প্রকাশ করা হয়। ফলে জুনের ৩০ তারিখের পর বড় বিনিয়োগকারীরা স্পেসএক্সের শেয়ার কিনেছেন বা বিক্রি করেছেন কি না, এসব নথিতে তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। এদিকে নিয়ন্ত্রক নথিতে স্পেসএক্সের মালিকানার পৃথক তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের হাতে রয়েছে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ মালিকানা।
সব মিলিয়ে স্পেসএক্সের পুঁজিবাজারে প্রবেশের পর প্রকাশিত মালিকানার তথ্য কোম্পানিটির প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের বিপুল মুনাফার চিত্র সামনে এনেছে। বিশেষ করে অ্যালফাবেটের ২০১৫ সালের ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের বর্তমান মূল্য ৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যবস্থা বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গত তিন দিন ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় চিনি পরিশোধনকারী কারখানাগুলোর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ চেইনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে পাইকারি বাজারে চিনির দাম উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মজুত ফুরিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ এবং আবুল খায়ের গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চিনি কারখানাগুলো উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে থেকেই এস আলম ও দেশবন্ধু সুগার মিলের উৎপাদন বিভিন্ন কারণে বন্ধ ছিল। বর্তমানে চালু থাকা মিলগুলোতেও পরিশোধন কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধিকাংশ কারখানায় বর্তমানে যে পরিমাণ চিনির মজুত রয়েছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ তিন থেকে চার দিন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। সেখানে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি মণ চিনির দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার যে চিনি প্রতি মণ ৩ হাজার ৬৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, শুক্রবার তা ৩ হাজার ৭২৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কারখানা থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা এবং নতুন চিনির জোগান না থাকায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরণের ফারাক তৈরি হয়েছে। এর ফলে আসন্ন দিনগুলোতে মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটের মুখে পড়তে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক কম। বিশেষ করে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোর কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। গত জুলাই মাসে একটি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভাসমান টার্মিনাল থেকে এলএনজি খালাস প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে সারাদেশে গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানায়।
তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে। শুক্রবার বিকেল থেকে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনাল থেকে পুনরায় এলএনজি খালাস শুরু হয়েছে বলে আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে এবং আশা করা হচ্ছে শনিবার থেকে শিল্প এলাকাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরে বাজারের সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক করতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অস্বাভাবিক খরচ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জুলাই ও আগস্ট মাসের বকেয়া বিল ১২ মাসের সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে প্রেরিত এক পত্রে এই বিশেষ দাবি জানিয়েছেন।
পত্রে বলা হয়, জুলাই ও আগস্ট মাসে জ্বালানি সংকটের দরুন দেশের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম প্রবলভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক গতিতে কাজ চালাতে পারেনি, যার ফলে বাধ্য হয়ে মালিকদের ডিজেল ও এলপিজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়তি খরচ আগে থেকে নির্ধারিত উৎপাদন ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত না থাকায় শিল্পোদ্যোক্তারা বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
বিকেএমইএ জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জুলাই ও আগস্ট মাসের উচ্চ অংকের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ করা সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা এবং সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বজায় রাখার স্বার্থে এই দুই মাসের বিল আগামী এক বছরের মধ্যে কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা প্রদানের জন্য মন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এমন নীতিগত সহযোগিতা রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে এবং জাতীয় অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে এই প্রস্তাবটি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ইতিবাচক বিবেচনার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে টানা দুই দিনের জন্য আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শনিবার (১৫ আগস্ট) দেশটির ব্যবসায়ীরা কোনো পণ্য গ্রহণ না করায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এছাড়া পরের দিন রোববার ভারতের সাপ্তাহিক সরকারি ছুটি হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে জানা গেছে।
আখাউড়া স্থলবন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নেসার উদ্দিন ভূইয়া এ বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, "স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম শনিবার বন্ধ রাখা হবে বলে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা জানান।" এই সাময়িক বন্ধের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা বিশেষ তৎপরতা হিসেবে গত শুক্রবারই অতিরিক্ত পণ্য ওপার পাঠিয়েছেন।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থবির থাকলেও এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সাধারণ যাত্রী পারাপার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মূলত রোববার ভারতের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় পণ্যবাহী যানবাহনের যাতায়াত বন্ধ থাকবে।
উল্লেখ্য, আখাউড়া স্থলবন্দরটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিমুখী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে বর্তমানে ভারত কিছু নির্দিষ্ট পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখায় সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, প্রতিবেশী দেশ ভারত দ্রুতই তাদের এই বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেবে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কাঞ্চন পেয়ারা’ এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। অতুলনীয় স্বাদ, আকর্ষণীয় রঙ এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার বিশেষ গুণের কারণে এই ফলটি এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঞ্চন পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এর ফলে যেমন প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ছে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।
জুলাই মাস থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে পুরোদমে আসতে শুরু করেছে কাঞ্চন পেয়ারা। বাগান থেকে ফল সংগ্রহ এবং তা পাইকারদের কাছে বিক্রির কাজে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন চন্দনাইশ ও পটিয়া উপজেলার পেয়ারা চাষিরা। বিশেষ করে চন্দনাইশের হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, ধোপাছড়ি ও দোহাজারীসহ পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় এই পেয়ারার ব্যাপক ফলন হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে হওয়ায় উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই ফল সংগ্রহ করছেন। প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় বাজারগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে কেনাবেচা জমে ওঠে এবং ট্রাক-পিকআপে করে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চন্দনাইশের প্রায় ৭২০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা বাগান রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর প্রায় ১১ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় চাষিরা জানান, অন্যান্য ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, কিন্তু বাজারমূল্য বেশ সন্তোষজনক। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অল্প সময়েই ভালো ফলন পাওয়া যায়, যা বহু গ্রামীণ পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, গত ১০-১৫ বছর ধরে কাঞ্চন পেয়ারা বিদেশের বাজারে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার পেয়ারা রপ্তানি হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা আরও বেশি থাকলেও কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবস্থা, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানসম্পন্ন ফলমূল রপ্তানির জন্য একটি বিশেষায়িত ‘প্যাকিং হাউস’ নির্মাণ করা গেলে রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
কৃষি ও অর্থনীতিবিদদের মতে, চন্দনাইশের এই কাঞ্চন পেয়ারা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। কৃষিপণ্যের এই রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয় বাড়ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে চন্দনাইশ অদূর ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে যাতে ফলনের গুণগত মান বিশ্বমানের হয়।
বাংলাদেশ ও কসোভোর মধ্যে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় করতে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু ও ইউরোপীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক সুযোগগুলো ব্যবহারের বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্য পোষণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় দেশটির শিল্প, উদ্যোক্তা, বাণিজ্য ও উদ্ভাবন বিষয়ক মন্ত্রী মিমোজা কুসারি-লিলা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলামের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
উক্ত বৈঠকে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে ওষুধ শিল্প, জৈবপ্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি এবং নিয়মিত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কসোভোর বাজারে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং বাংলাদেশি ওষুধ আমদানির পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে কসোভোর বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান বিনিয়োগ সুবিধার সুযোগ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ত্বরান্বিত করতে একটি ‘যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব বৈঠকে আলোচিত হয়। এছাড়া কসোভোর একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স ও কসোভো চেম্বার অব কমার্সের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং কসোভোতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা নিয়েও বৈঠকে কথা হয়।
কসোভোর মন্ত্রী মিমোজা কুসারি-লিলা তার দেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, অনুকূল কর ব্যবস্থা ও দক্ষ জনবল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করতে পারে। বিশেষ করে সিইএফটিএ এবং ইএফটিএ-র আওতায় ইউরোপের বাজারে প্রবেশের যে সুবিধা কসোভোর রয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পশ্চিম বলকান দেশগুলোর আঞ্চলিক সংযোগ সুবিধাও বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য সহায়ক হবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষই মনে করেন, একটি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। উক্ত সভায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত কসোভোর রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহটি লেনদেনের মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিনই সূচকের অবনমন ঘটায় বিনিয়োগকারীদের মোট পুঁজি বা বাজার মূলধন প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। দরপতনের তালিকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নাম থাকায় লেনদেনের গতিও ছিল পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় মন্থর।
বাজারের সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে দরপতন হয়েছে ২০৮টি প্রতিষ্ঠানের এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকায়, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২৯৯ কোটি টাকা কম। পুঁজি কমলেও প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ২২ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগের সপ্তাহে সূচকটি বড় ধরণের পতন দেখেছিল। অন্যদিকে, ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএসইএস ৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাছাই করা বড় কোম্পানিগুলোর ডিএসই-৩০ সূচকও সামান্য বেড়েছে, তবে তা শতাংশের হিসাবে অত্যন্ত নগণ্য।
গত সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৯৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম। দৈনিক গড় লেনদেন কমার পরিমাণ প্রায় ১৮৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
টাকার অঙ্কে লেনদেনের শীর্ষে আধিপত্য ধরে রেখেছে বেক্সিমকো। কোম্পানিটির প্রতিদিন গড়ে ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ এবং মালেক স্পিনিং। লেনদেনের শীর্ষ দশে আরও স্থান করে নিয়েছে সায়হাম টেক্সটাইল, এমএল ডাইং, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিলি স্থলবন্দরে বিদায়ী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বড় অংকের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক নির্ধারিত ১ হাজার ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৯৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আমদানিকারকরা এই পরিস্থিতির জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হয়রানি ও অবকাঠামোগত সমস্যাকে দায়ী করলেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাবি, শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি কমে যাওয়াই এই ঘাটতির মূল কারণ।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রতিটি মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার ছিল হতাশাজনক। জুলাই মাসে ৫৬ কোটি ২১ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। একইভাবে অক্টোবর, জানুয়ারি ও মার্চ মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোতেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। মে মাসে ২০৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ৫৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বছরের শেষ মাস জুনেও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মতে, হিলি স্থলবন্দরের প্রতি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নীতিগত বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতাই প্রধান অন্তরায়। তাঁদের অভিযোগ, অন্যান্য বন্দরের তুলনায় হিলিতে শুল্কায়নের হার অনেক বেশি এবং পণ্য পরীক্ষার নামে আমদানিকারকদের অহেতুক হয়রানি করা হয়। ক্ষুদ্র বিষয়েও ফাইল রংপুরে পাঠিয়ে দেওয়া এবং ইচ্ছামতো মালামাল ল্যাব টেস্টে পাঠানোর ফলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের অন্যান্য বন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও হিলিতে কঠোর ও মনগড়া অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে, যা আমদানিকারকদের এই বন্দর থেকে বিমুখ করে দিচ্ছে।
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে দিনে মাত্র ৫ থেকে ১৫টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করছে। সড়কের বেহাল দশা, বর্ষাকালে পণ্য লোড-আনলোডের পর্যাপ্ত শেড না থাকা এবং জায়গার সংকটের কারণে বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ভারতীয় ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও আমদানিকারকরা এলসি খুলতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, অন্যান্য বন্দরের মতো পাথর, কয়লা ও ছাইয়ের মতো বাল্ক পণ্য সরাসরি নিজস্ব ইয়ার্ডে নিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হলে রাজস্ব আদায়ের হার পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।
তবে হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের গাফিলতি নেই। তাঁদের মতে, এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার কমে যাওয়া এবং চাল, গম ও ভুট্টার মতো শুল্কমুক্ত বা জিরো পয়েন্ট পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়াই রাজস্ব ঘাটতির নেপথ্যে কাজ করছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা একই দিনে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা ও শুল্কায়ন সম্পন্ন করে দ্রুত ছাড়করণের সেবা দিচ্ছে। শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেলেই কেবল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন। হিলি স্থলবন্দরের এই অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী অর্থবছরেও বড় ধরণের রাজস্ব সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশের বেশি। টাকার হিসাবে বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পণ্য আমদানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট বা পিওএল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, পুরো আমদানি ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই গেছে জ্বালানি তেল আমদানিতে। এর আগে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ওই বছর এ খাতে ৮ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। নতুন রেকর্ডে সেই ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পিওএল আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ৯২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পিওএল আমদানিতে ব্যয় ১০৯ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে গত অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
কোভিড মহামারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় জ্বালানি তেলের চাহিদা ও দাম ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। পরে অর্থনীতি ও শিল্পকারখানা সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯০ ডলারে উঠে যায়। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। ওই বছরের মার্চে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৩৯ ডলারের বেশি হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দাম কমলেও বিভিন্ন সময় যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৫ ডলারের কাছাকাছিও নেমেছিল। ১০ আগস্ট বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার হিসাবে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৮৬ দশমিক ৭২ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ছিল ৮১ ডলার।
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে নয়, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন। নয় মাসের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করলেও চাহিদা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫ হাজার টন। আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে রয়েছে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছিল। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল। বাকি ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী।
এদিকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দামও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১ জুন ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। পরবর্তী জুলাই ও আগস্ট মাসেও এসব দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি তেল আমদানিতে এক বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের মোট পণ্য আমদানির প্রায় এক-সপ্তমাংশ অর্থ জ্বালানি তেলের পেছনে ব্যয় হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। পাবনার ওয়ার্কশপ, ধামরাইয়ের জুতার কারখানা কিংবা কেরানীগঞ্জের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণে নিজেদের উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বড় কারখানা বা রপ্তানিকারকদের মতো জেনারেটর চালিয়ে মেশিন সচল রাখার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা যেমন কমছে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
দেশের অর্থনীতিতে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং থাকায় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত এই খাতের উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কাঁচামালের বাড়তি দামের পাশাপাশি বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় লোকসান বাড়ছে এবং অনেক উদ্যোক্তাকে বাধ্য হয়ে নিজেদের জমানো সঞ্চয় ভেঙে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মূলত দেশে প্রকট হওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি কক্সবাজারে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে এবং গত ১১ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস এবং কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামের মতো নানামুখী অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বিদ্যুতের এই তীব্র সংকট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই খাতের ব্যবসায়ীরা এক বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হলে তারা পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন না, যার ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং এর একটি নেতিবাচক ধারাবাহিক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানায় বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে ইতোমধ্যে ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যাচাই-বাছাই করছে। কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ডেটা সেন্টার, হালকা প্রকৌশল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে তারা এই বিনিয়োগ করতে চায়। এর আগে গত জুন মাসে সরকার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা এমন ৪৪টি বন্ধ কলকারখানার তালিকা করে, যার মধ্যে চিনি, বস্ত্র, কেমিক্যাল, পাট এবং স্টিল ও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একাধিক শিল্পগোষ্ঠী একই কারখানায় বিনিয়োগ করতে চেয়েছে। যেমন ঠাকুরগাঁও ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে যথাক্রমে প্যারাগন, কাজী ফার্মস, নাবিল গ্রুপ, ব্র্যাক ও মিল্ক ভিটা। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ একাই ১৬টি কারখানার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩৫টি প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া আকিজ রিসোর্স ১২টি, টি কে গ্রুপ ১০টি, কাজী ফার্মস ৪টি এবং ট্রান্সকম গ্রুপ ৩টি বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছে। পাশাপাশি স্কয়ার ফুড, বেঙ্গল মিট, এক্সিলেন্ট সিরামিকস এবং গ্রাম উন্নয়ন কর্মের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ আগ্রহের কথা সরকারকে জানিয়েছে।
সরকারি এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অলাভজনক ও বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন। এরপর ৮ জুলাই শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রস্তাবগুলো যাচাই করে বিনিয়োগকাঠামো নির্ধারণের জন্য একটি কার্যকর কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, গত মাসে পাস হওয়া ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬’ অনুযায়ী নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই কারখানাগুলো কোন মডেলে বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। বিডার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই খসড়া নীতিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সরকারি বন্ধ কলকারখানাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার এই সরকারি সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পর সেগুলো যেন শুধু শিল্পকারখানা হিসেবেই ব্যবহৃত হয় এবং কোনোভাবেই আবাসন বা অন্য প্রকল্পে পরিণত না হয়, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল দক্ষতা ও সুনাম আছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ইজারা বা পরিচালনার জন্য বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাজারে গিয়ে এর কোনো প্রভাব বা স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আগের মতোই চড়া থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। সাধারণ ক্রেতাদের মতে, গত এক বছরে চাল ছাড়া প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে নির্দিষ্ট আয়ের সঙ্গে বাজারের বাড়তি ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই মেলাতে পারছেন না তারা।
মূল্যস্ফীতি কমার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, জুলাই মাসে চাল ও মাংসের দাম কমার কারণেই মূলত সূচকে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সরকারি এই হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তব চিত্রের ব্যাপক অসংগতি দেখছেন। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, পরিসংখ্যানে যা দেখানো হচ্ছে, বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। তার মতে, মূল্যস্ফীতি গণনার পদ্ধতিতে কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে, যার ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না এর যথাযথ সংস্কার হচ্ছে, ততক্ষণ এমন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য এবং বাজারের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণেও মূল্যবৃদ্ধির এই সত্যতা পাওয়া যায়। গত এক বছরে চাল ছাড়া সয়াবিন তেল, চিনি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, মাছ, আলু, পেঁয়াজ, আটা ও সবজিসহ প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা, অতিরিক্ত গরম এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূলত জিনিসপত্রের এই দাম বেড়েছে। বাজারে খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেল, আটা, ডাল থেকে শুরু করে রুই, পাঙাশ বা তেলাপিয়ার মতো মাছ এবং ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি। সরবরাহ সংকটে কাঁচামরিচ ও শাকসবজির দামও মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জিনিসপত্রের এই লাগামহীন দামের বিপরীতে মানুষের আয় আনুপাতিক হারে না বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষেরা। বিবিএসের হিসাবে, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে দেশে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। টানা ৫৩ মাস ধরে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকছে। আয় না বেড়ে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে জমানো সঞ্চয় ভাঙছেন অথবা সংসার চালাতে ধারদেনা করছেন। আবার পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরুপায় হয়ে অনেক মানুষ তাদের দৈনন্দিন খাবার, পোশাক বা যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতের অপরিহার্য খরচও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন।