চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে বাংলাদেশে সার্বিক নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে সোমবার (১২ অক্টোবর) ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, আলোচ্য তিন মাসে দেশে মোট নিট এফডিআই এসেছে ৩৪৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মূলত দেশে আগে থেকেই কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি উদ্যোক্তাদের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ করা আয়ের পরিমাণ আগের বছরের একই মেয়াদের চেয়ে ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে পুনর্বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন মূলধন বা ইকুইটি বিনিয়োগ এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের নিট প্রবাহে স্পষ্ট পতন লক্ষ করা গেছে। আলোচ্য প্রান্তিকে নতুন নিট ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে ৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম। অন্যদিকে আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ সংকুচিত হয়ে নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে। এ খাতে মোট ৩৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেশে আসলেও পুরোনো দায় পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় নিট প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমেছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও তুলে ধরা হয়, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির চড়া মূল্যের কারণে নতুন বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এমন বৈরী বাস্তবতায় বিদ্যমান বিদেশি অংশীদারদের অর্জিত লভ্যাংশ পুনরায় দেশেই খাটানোর প্রবণতা সার্বিক এফডিআই প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন উইং) নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো চ্যালেঞ্জিং।
তিনি জানান, চলমান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এটাই নির্দেশ করে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি তাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা রয়েছে, যা শিল্পের বিস্তার, উৎপাদন সক্ষমতা জোরদার ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে টেকসই বিদেশি পুঁজি টানতে কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঘোষণাও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সংস্থাটির প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব রূপ দিতে সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি পুঁজির নিট প্রবাহ বার্ষিক হিসাবে কিছুটা শ্লথ হয়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে এসব অঞ্চলে নিট এফডিআই এসেছে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম। তবে পূর্ববর্তী প্রান্তিকের মাত্র ০ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলারের সাপেক্ষে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে বিনিয়োগের গতি বেড়েছে অনেকটাই। অন্যদিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরের খাতে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে।
নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করাও তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। এ লক্ষ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে থমকে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের উন্নয়নকাজ গতি পেয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এ প্রকল্প নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাকে ঘিরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা দৃশ্যমান। এছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে অর্জিত মাইলফলক ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে সফল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থায়ী কর্মসংস্থানে রূপান্তরের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আয়কর বিবরণী দাখিল করলে বিশেষ কর ছাড়ের সরকারি প্রণোদনা ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে সাধারণ করদাতাদের মাঝে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা মোট ১২ লাখ ৫৩ হাজার রিটার্ন জমা দিয়েছেন। পূর্ববর্তী করবর্ষের একই মেয়াদের তুলনায় এই দাখিলের হার ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ সময়ে প্রায় তিন লাখ করদাতা আগাম রিটার্ন দিয়ে সরকারি ছাড়ের সুফল ভোগ করেছেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত করবর্ষের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৭ লাখ ৯ হাজার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা আয়কর বিবরণী দাখিল করেছিলেন। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত বিশেষ সুবিধা অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া করদাতাদের প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ছাড় দেওয়া হয়, যা কর পরিশোধের সময় তাঁদের সার্বিক করদায় থেকে সমন্বয় করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ সুযোগ অনেক করদাতা কাজে লাগিয়েছেন। তারা ভালো অঙ্কের কর ছাড়ও পেয়েছেন।’
এদিকে নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে আর্থিক জরিমানার নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতা কোনো ছাড়ের সুবিধা পাবেন না। পরবর্তীতে আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি অঙ্কে বেশি, সেই হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে জরিমানার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যা অঙ্কে বেশি হবে সেই অনুযায়ী।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতার কারণে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট বাড়তি ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগিতার ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে সংস্থাটির সঙ্গে একটি অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান।
অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিজয়ী হয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করায় নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই যাবতীয় নীতি, কৌশল ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের পরামর্শের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সরকারের নিজস্ব নীতিগত অগ্রাধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে পর্যায়ক্রমিক বা ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রস্তাবিত এই অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা বাংলাদেশের সঙ্গে বহুপাক্ষিক এ সংস্থার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব লাঘবে এই সহযোগিতা সরকারের বাড়তি আর্থিক দায় লাঘব এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কতখানি ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারবে, তা চলমান আলোচনার অগ্রগতি ও সহায়তার ধরনের ওপরই নির্ভর করছে।
বিশ্বের অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি বা প্রায় ৫৭ শতাংশ আয় নির্দিষ্ট পাঁচটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশগুলো হলো জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি পৌঁছেছে ১০২ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারে। বিগত অর্থবছরের একই প্রান্তিকে যা ছিল ৯৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সে হিসেবে আলোচ্য তিন মাসে এই দেশগুলোতে সম্মিলিত রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রচলিত বাজারের বাইরে বিশ্বের নতুন বাজারগুলোতে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৮১ কোটি ডলার। এর মধ্যে উল্লিখিত পাঁচটি দেশ থেকেই এসেছে মোট রপ্তানির ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ আয়। অর্থাৎ অপ্রচলিত বাজারে সামগ্রিক রপ্তানি সম্প্রসারিত হলেও তা এখনো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল।
অপ্রচলিত বাজারের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রেখেছে জাপান। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। শুধু জাপান থেকেই এসেছে অপ্রচলিত বাজারের মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ০২ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের বাজারে রপ্তানি হয়েছে ২০ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক; তবে শীর্ষ পাঁচ বাজারের মধ্যে একমাত্র ভারতের বাজারেই রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে এবং সেখানে পতন হয়েছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অন্যদিকে অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে তুরস্কে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটিতে যেখানে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৬ কোটি ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তুরস্কে রপ্তানি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশে। এছাড়া ইতিবাচক ধারা বজায় রেখে দক্ষিণ কোরিয়ায় পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ১২ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
পরিসংখ্যানের তুলনামূলক পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে, শীর্ষ পাঁচ বাজারে রপ্তানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল তুরস্কের বাজার। দেশটিতে এককভাবে রপ্তানি বেড়েছে ৮ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা শীর্ষ পাঁচ দেশের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধির প্রায় ৯০ শতাংশের সমান। তুরস্কের এই উল্লম্ফন বাদ দিলে বাকি চারটি দেশে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর ফলে এটি সুস্পষ্ট যে নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক স্ফীতি মূলত একটি একক দেশের ওপর ভর করে এসেছে।
একক মাস হিসেবে সদ্যসমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসেও এই গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ওই মাসে শীর্ষ পাঁচ দেশে পোশাক রপ্তানি পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের ২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার থেকে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। সেপ্টেম্বরে তুরস্কে রপ্তানি ২২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং জাপানে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়ে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। তবে ওই মাসেও ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে সামান্য ছন্দপতন ঘটে; যেখানে ভারতে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ রপ্তানি কমেছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, নতুন বাজারে রপ্তানির এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি গন্তব্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজারে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে একটি বাজারের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবেলা করা সহজ হবে। এ ছাড়া খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাজারে অবস্থান আরও সুসংহত করতে পণ্যের বহুমুখীকরণ, ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব, উৎপাদন ব্যয়ের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং কৌশলগত বাজারভিত্তিক বিপণন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভারতের মতো পতনমুখী বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে জ্বালানি বিপর্যয়, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত রূপান্তরের বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এই জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে এ সপ্তাহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একত্রিত হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
সোমবার থেকে শুরু হয়ে শনিবার পর্যন্ত চলমান এই বৈশ্বিক আয়োজনে বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জলবায়ুগত ঝুঁকিতে সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল ও ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে সরকারি ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিচ্ছে আইএমএফ। এমন দ্বিমুখী বাস্তবতায় সম্মেলনজুড়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সপ্তাহজুড়ে বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠক, প্রকাশ্য বিতর্ক এবং নীতিনির্ধারণী ঘোষণা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে মঙ্গলবার আইএমএফ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরবে এবং সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ঝুঁকির বিস্তারিত খতিয়ান প্রকাশ করা হবে।
এর আগে সিঙ্গাপুরে সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মন্তব্য করেন, ‘সহজভাবে বলতে গেলে, বিশ্ব অর্থনীতি এখন বিপরীতমুখী দুটি শক্তির টানাপোড়েনে রয়েছে। একদিকে জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক ধাক্কা, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাহিদায় ইতিবাচক উল্লম্ফন।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এই দুই বিপরীতমুখী প্রবাহের অভিঘাত বিশ্বের প্রতিটি দেশে একভাবে পড়ছে না।
ব্যাংকক বৈঠকের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে চলেছে ইরানে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অভিঘাত। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আইএমএফ সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব বিভিন্ন দেশের ওপর অত্যন্ত অসমভাবে পড়ছে, যার বড় শিকার আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো। তবে মহামারির পর থেকে একের পর এক ধাক্কায় পর্যুদস্ত এসব দেশকে ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয় সংকোচন ও আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। যদিও সমালোচকদের মতে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর পক্ষে এমন ব্যয়সংকোচন নীতি মেনে চলা প্রায় অসম্ভব, ফলে বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি আর্থিক সংহতি ও কার্যকর সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি সেন্টারের পরিচালক কেভিন পি গ্যালাগার নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের প্রভাব, পশ্চিমা দেশগুলোতে সুদের হার বৃদ্ধি ও এল নিনোর কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকটের ফলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দরিদ্র সদস্যদেশগুলো চরম চাপে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এ সংকট মোকাবিলায় তাদের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে একদিকে জরুরি ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা দেওয়া যায়, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এসব ধাক্কার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করা যায়।’
এদিকে সংকটের ভয়াবহতা নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনেও চরম সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। রোববারের ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আরও লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের অতলে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। ইউএনডিপির প্রশাসক আলেকজান্ডার ডি ক্রু বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, ‘তেল ও খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় লাখ লাখ পরিবারের হাতে সংকট মোকাবিলার কোনো বাড়তি সঞ্চয় থাকছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা কয়েক কোটি থেকে শুরু করে কয়েক শ কোটি নয়, বরং কয়েক কোটি বা তারও বেশি—এমনকি কয়েক শ কোটি নয়, কয়েক শ মিলিয়ন মানুষকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’ এ অবস্থায় উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে কার্যত এক ‘অসম্ভব’ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে জানিয়ে ডি ক্রু বলেন, নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন হয় দরিদ্র নাগরিকদের সহায়তা ছাঁটাই করা, নয়তো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন রূপরেখাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো কঠিন পথ খোলা রয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউরোপের অগ্রসর অর্থনীতিগুলো জ্বালানি সংকটের অভিঘাত তুলনামূলকভাবে সামলে উঠতে পারলেও তারাও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ করে দিয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে ব্যাপক মূলধনি বিনিয়োগ শেয়ারবাজারকে নতুন শিখরে নিয়ে গেছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসমতে, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিমাণ অতীতের রেলপথ, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড কিংবা বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত সপ্তাহে এ প্রযুক্তির বিস্তার প্রসঙ্গে জর্জিয়েভা বলেন, “আপনি এআইকে ভালোবাসুন, অপছন্দ করুন কিংবা ভয় পান—এটি এখন বাস্তবতা। বিশ্ব অর্থনীতিতে বিভিন্ন দেশের আপেক্ষিক অবস্থান ও সাফল্য নির্ধারণে এআই দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
সম্মেলন চলাকালে এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক অভিঘাত নিয়ে একাধিক সেশন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতা এড়ানোর বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। তাছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে জি২০ জোটের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকসহ একাধিক নীতিনির্ধারণী আলোচনা হবে, যেখানে বৈশ্বিক বন্ডের মুনাফার হার দ্রুত বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ জরুরি দায়িত্বের কারণে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না বলে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ নিশ্চিত করেছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির মতে, সাশ্রয়ী প্রযুক্তির এআই প্রয়োগের মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও স্বনিয়োজিত পেশাজীবীরা ব্যবসা সম্প্রসারণ, পণ্য বিপণন, গ্রাহকসেবা প্রদান এবং মজুত ব্যবস্থাপনার মতো দৈনন্দিন কাজগুলো আরও সহজে সম্পাদন করতে পারেন। এর ফলে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মীরাও জটিল ও উচ্চ দক্ষতার কাজ করার সুযোগ পাবেন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব মূল্যায়ন তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ ভ্যালেন্টিনা ক্যালদেরন-মেজিয়া। তিনি জানান, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও আত্মকর্মসংস্থানের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। এসব দেশে সাধারণ মুঠোফোন ব্যবহার করেও ব্যবসায়িক মজুত নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহক যোগাযোগ ও প্রচারণার কাজে ছোট এআই প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা জোরদারে সহজলভ্য প্রযুক্তির যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের তরুণ কর্মী ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অনুষ্ঠানে ‘স্মল এআই’ বা ছোট এআই বলতে এমন ব্যবহারিক ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা পরিচালনায় বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ কিংবা জটিল কারিগরি অবকাঠামোর প্রয়োজন পড়ে না। এ ধরনের প্রযুক্তির সহায়তায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পণ্যের মজুত তদারকি, ক্রেতাদের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব প্রদান, বিক্রির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ ও প্রচারণা কম সময়ে সম্পন্ন করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কেবল উৎপাদনশীলতা বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয় না; প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে কিছু নির্দিষ্ট কাজের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রযুক্তির সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
আলোচনায় সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও বিশদ আলোকপাত করা হয়। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ গোরিউনোভা মন্তব্য করেন, এআইয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত শিক্ষকদের সহায়ক হিসেবে, তাদের বিকল্প বা প্রতিস্থাপক হিসেবে নয়। তিনি উল্লেখ করেন, স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শিখন চাহিদা পূরণ, পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ভার লাঘবে এই প্রযুক্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বৃহৎ পরিসরে তা কার্যকরের পূর্বে শিক্ষাব্যবস্থার সুরক্ষা এবং পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা জরুরি। এছাড়া শিশুদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি, কৌতূহল ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের ডেটা যাচাইয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার এক অংশগ্রহণকারীর প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ সামীক্ষা খারে বলেন, এককভাবে পূর্ণাঙ্গ এআই-সার্বভৌমত্ব গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এটি প্রযুক্তিগত বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই দৃঢ় ডেটা সুরক্ষার পাশাপাশি উন্মুক্ত নীতিমালা, পারস্পরিক সমন্বয় এবং অংশীদারিত্বমূলক অবকাঠামো ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক, কৃষি, আর্থিক খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এআই প্রয়োগের বিস্তর সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় কর্মীবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থানের পথ উন্মোচিত হতে পারে। যদিও এই সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক অনুদান বা কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি, তবে টেকসই রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন ও নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনের মূল নেতৃত্বপর্বে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম এবং আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার অংশ নিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও গুণগত কর্মসংস্থান প্রসারে এআইয়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে।
মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেশে অর্থ প্রেরণের প্রক্রিয়া সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে একগুচ্ছ নতুন প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মালদ্বীপের স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়ায় লেনদেন সুবিধা চালুকরণ, পর্যটকদের ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যয় নির্বাহের বিশেষ ব্যবস্থা এবং দুই দেশের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি সম্পাদন।
গত ৮ অক্টোবর মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটি’র (এমএমএ) গভর্নর আহমেদ মুনাওয়ারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব রূপরেখা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, মালদ্বীপে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের পরিবেশ উন্নত করতে পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা স্বদেশে কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাতে গিয়ে এখনো নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে অভিবাসী কর্মীদের উপার্জিত অর্থ যেন নিরাপদে, স্বল্পতম সময়ে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং নামমাত্র খরচে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো সম্ভব হয়, সেজন্য উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
উত্থাপিত প্রথম প্রস্তাবে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) কাঠামোর আওতায় মালদ্বীপের মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহার করে প্রবাসী আয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে মালদ্বীপ থেকে পাঠানো রুফিয়া বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সুবিধাভোগী পরিবারের কাছে সরাসরি টাকায় রূপান্তর করে দেওয়া যাবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে মালদ্বীপে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ ব্যয়ের জটিলতা নিরসনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে দেশটির অনুমোদিত ব্যাংক ও রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্রমণকালীন খরচ রুফিয়ায় পরিশোধের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অনুমোদিত ব্যাংকগুলো টাকায় ব্যবহারযোগ্য লেনদেন কার্ড সরবরাহ করতে পারবে এবং পরবর্তীতে দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নীতি অনুযায়ী এসব আর্থিক দায় নিষ্পত্তি করা হবে।
তৃতীয় প্রস্তাবে অভিবাসী শ্রমিকদের অর্থ প্রেরণের পথ উন্মুক্ত রাখতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়েছে, প্রস্তাবিত এসব আর্থিক মডেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ এবং বিদ্যমান আর্থিক আইনকানুন পুরোপুরি পরিপালন করতে হবে।
এসব উদ্যোগকে কার্যকর রূপ দিতে মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ সংলাপে বসার আগ্রহও ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মালেতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্রতিনিধিদল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে উদ্যোগগুলো চালুর প্রশাসনিক শর্তাবলি, অপারেশনাল রূপরেখা এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেন নিষ্পত্তির কারিগরি দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
উপলব্ধ তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে মালদ্বীপে অবস্থানরত দুই লাখেরও বেশি বিদেশি শ্রমিকের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ এক লাখেরও অধিক ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। তবে নানামুখী সংকটের জেরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ কম। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার ডলার সমমূল্যের প্রবাসী আয় এসেছে।
মালদ্বীপ থেকে বৈধ উপায়ে অর্থ পাঠাতে গিয়ে প্রবাসীদের আর্থিক ক্ষতির মূল কারণ সেখানকার স্থানীয় মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জটিলতা। দ্বীপরাষ্ট্রটির ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে সরাসরি স্থানীয় রুফিয়া গ্রহণ করতে চায় না। ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের খোলাবাজার থেকে বাড়তি মূল্যে ডলার কিনে তবেই ব্যাংকিং চ্যানেল বা এক্সচেঞ্জ হাউসে যেতে হয়। এর ওপর ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে গুনতে হয় চড়া কমিশন। ডলার কেনায় লোকসান এবং অতিরিক্ত কমিশনের এই দ্বিমুখী ব্যয়ের কারণেই মূলত প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ প্রেরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি মূলধন আসার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই প্রান্তিক ধরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ সংকোচনের মুখে পড়ল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নেমেছিল, যা ছিল প্রায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এদিকে দেশে আগে থেকে পরিচালিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল-জুনে সার্বিক নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সার্বিক ঋণমান দফায় দফায় কমানো হয়েছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কোনো দেশের বিনিয়োগঝুঁকি মূল্যায়নে ঋণমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হওয়ায় এটি মূলধন আসার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতের বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণও বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, যার কারণে নতুন শিল্প বা প্রকল্পে পুঁজি বিনিয়োগের আগ্রহে ভাটা পড়ছে।
নতুন বিদেশি বিনিয়োগ মূলত দেশে আসা অপ্রচলিত ও নতুন মূলধনের আগমনকে নির্দেশ করে। এই খাতে টানা পতন প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদ্যোক্তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
নতুন পুঁজির প্রবাহ কমলেও আলোচিত প্রান্তিকে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। নতুন মূলধন, পুনর্বিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ ঋণ মিলিয়ে এপ্রিল-জুন সময়ে সার্বিক নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। গত বছরের একই প্রান্তিকে এর অঙ্ক ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার, যার ফলে বার্ষিক হিসাবে নিট বিদেশি বিনিয়োগে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মূলত দেশে আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ পুনর্বিনিয়োগের ফলেই এই বৃদ্ধি দৃশ্যমান হয়েছে, যদিও পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে তা ২২ শতাংশ কম।
মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বলতে মূলত দেশে ব্যবসারত পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্জিত লাভের যে অংশ বাইরে না পাঠিয়ে পুনরায় দেশেই লগ্নি করা হয়, তাকে বোঝায়। ফলে এর মাধ্যমে সার্বিক বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন কোনো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী দেশে এসেছেন—এমনটি নির্দেশ করে না। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এই খাতের পুনর্বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে, যা গত বছরের একই মেয়াদে ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। আলোচিত সময়ে এ খাতে মোট ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার আসলেও বিপরীতে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার প্রত্যাহার হয়ে যায়, ফলে নিট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান তিনটি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ ঋণে। এপ্রিল-জুন সময়ে এ খাতে নিট ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে মাত্র ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে, যা জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের তুলনায় ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময়ের ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় এই পতন প্রায় ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। আলোচ্য প্রান্তিকে এই খাতে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে প্রবেশ করলেও প্রায় ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার বাইরে চলে যায়, যার ফলে নিট সংযোজন ছিল যৎসামান্য।
এদিকে বিশ্বব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান দুর্বল অবস্থাকে সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চলতি বছরের জুনের তথ্যমতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। তাছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমা ছিল ১০ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং আর্থিক খাতের চলমান অস্থিতিশীলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমান মারাত্মক চাপে রয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর নাগাদ ঋণমান নির্ধারণকারী বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে কিছুটা ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান 'বি২' অপরিবর্তিত রেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ দেশটির ঋণমান 'বি+' বহাল রাখলেও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রবিবার মূল্যসূচকের নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে দেশের উভয় পুঁজিবাজারে দিনের লেনদেন সমাপ্ত হয়েছে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সার্বিক সূচক কমলেও লেনদেনের পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়েছে; তবে অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের পাশাপাশি কমেছে লেনদেনের অংকও।
বাজারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২৪ পয়েন্ট হারিয়ে দিনশেষে ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। অন্যান্য সূচকের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮০ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ ৩০ কোম্পানির সূচক ডিএসই-৩০ আগের দিনের চেয়ে ২ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১০৩ পয়েন্টে নেমেছে। এদিন এক্সচেঞ্জটিতে লেনদেন হওয়া ৩৮৫টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের মধ্যে ৭৯টির দর বাড়লেও কমেছে ২৬৪টির এবং দর অপরিবর্তিত ছিল ৪২টি সিকিউরিটিজের।
সূচক হ্রাস পেলেও ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। রবিবার বাজারটিতে মোট ৫৬৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা পূর্বের কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বেশি। এর আগের কার্যদিবসে ডিএসইতে ৫৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা সম্পন্ন হয়েছিল।
এদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৫ পয়েন্ট খুইয়ে ১৪ হাজার ৬৩৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এদিন দাম বেড়েছে ৫৩টির, কমেছে ১২৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর। সূচকের পতনের সঙ্গে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি টাকায়, যা আগের কার্যদিবসের ১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ৪ কোটি টাকা কম।
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক রাডার ও স্বয়ংক্রিয় এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পর বিদেশি উড়োজাহাজের কাছ থেকে আকাশসীমা ব্যবহারের ফি আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওভারফ্লাই ফি বাবদ আয় হয়েছে ৮০৫ কোটি ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। পরের ছয় মাসে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকায়। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন রাডার ও উন্নত নজরদারি ব্যবস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বৃদ্ধিও রাজস্ব বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
ওভারফ্লাই ফি হলো কোনো দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য দেশে যাতায়াতকারী উড়োজাহাজের কাছ থেকে আদায় করা নির্ধারিত চার্জ। এ ক্ষেত্রে উড়োজাহাজকে সংশ্লিষ্ট দেশে অবতরণ করতে হয় না। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক আকাশপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ খাত থেকে রাজস্ব আয়ের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো রাডার, সীমিত নজরদারি এবং বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আকাশসীমার কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত রাডার কাভারেজ না থাকায় উড়োজাহাজ শনাক্ত ও আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আধুনিক আকাশসীমা ব্যবস্থাপনা
দেশের আকাশসীমা নজরদারি ও উড়োজাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে ফ্রান্সের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থ্যালেসের সহায়তায় নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স (এটিএম-সিএনএস) ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা, যার অর্থায়ন করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নিজস্ব তহবিল থেকে। পরে ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় রাডার, যোগাযোগ ও নেভিগেশন প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বেবিচকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আকাশসীমায় উড়োজাহাজ শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের রাডারও নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ দিকে নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাডারের সরাসরি আওতার বাইরে থাকা এলাকায় উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণের জন্য অন্যান্য প্রযুক্তিও ব্যবহারের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এই প্রযুক্তির ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমা দিয়ে চলাচলকারী উড়োজাহাজের অবস্থান, গতিপথ ও চলাচল সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে শুধু ওভারফ্লাই ফি আদায়ই নয়, একই সঙ্গে উড়োজাহাজের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, আকাশপথের যান চলাচল সমন্বয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও সুবিধা হচ্ছে। বেবিচকের কর্মকর্তাদের মতে, উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ফলে আগের তুলনায় একই রুটে আরও বেশি উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মাসে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বেশি আয়
রাজস্বের মাসভিত্তিক হিসাবেও নতুন ব্যবস্থার পর আয় বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওভারফ্লাই ফি থেকে আয় হয় প্রায় ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ, মার্চে ৬২ কোটি ১৮ লাখ, এপ্রিলে ৬৭ কোটি ৫৩ লাখ, মে মাসে ৭০ কোটি ৪৮ লাখ এবং জুনে প্রায় ৬৭ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাসিক আয় সাধারণত ৬৯ থেকে ৭১ কোটি টাকার মধ্যে থাকছে।
বেবিচক ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত নজরদারির ফলে আগে শনাক্ত করা কঠিন ছিল এমন কিছু ফ্লাইটের তথ্য এখন আরও কার্যকরভাবে পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রযোজ্য ফি আদায়ের সুযোগ বেড়েছে। তবে রাজস্ব বৃদ্ধির পেছনে শুধু রাডারই ভূমিকা রাখেনি। বাংলাদেশে নতুন বিদেশি এয়ারলাইনসের কার্যক্রম শুরু হওয়া এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বৃদ্ধিও আয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির পুরো কৃতিত্ব একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে দেখা ঠিক হবে না।
পুরো সক্ষমতা কাজে লাগাতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন
নতুন প্রযুক্তি চালুর পরও বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনার সব সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি বলে মনে করছেন এভিয়েশন খাতের বিশেষজ্ঞরা। আঞ্চলিক আকাশপথ ব্যবস্থাপনা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সমন্বয় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে আরও বেশি উড়োজাহাজের চলাচল নিরাপদভাবে পরিচালনা এবং রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আধুনিক রাডার স্থাপন করলেই বাংলাদেশ আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে না। দক্ষ জনবল তৈরি, নিয়মিত প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করাও জরুরি। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও সেবার মান বজায় রেখে আকাশপথের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে নতুন রাডার ও স্বয়ংক্রিয় এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ওভারফ্লাই ফি থেকে বছরে ৮০৫ কোটি টাকার বেশি আয় এ ব্যবস্থার অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরছে। তবে ভবিষ্যতে এই আয় আরও বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দেশের পুঁজিবাজারের প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা সুসংহত করতে প্রথমবারের মতো অক্টোবর মাসজুড়ে বহুমুখী সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ট্রেকহোল্ডারদের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে অনলাইন প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক প্রচার, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং কৃতিত্ব অর্জনকারীদের স্বীকৃতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো ডিজিটাল জালিয়াতি ও অনলাইন প্রতারণা সম্পর্কে অংশীজনদের সতর্ক করা এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এর অংশ হিসেবে ডিএসই কার্যালয়ে সচেতনতামূলক ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শনের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কম্পিউটারে সতর্কতামূলক ওয়ালপেপার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা ক্ষতিকর ওয়েব লিংক ও সন্দেহজনক ই-মেইল শনাক্তে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে বাস্তবভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি ও অর্জিত জ্ঞান মূল্যায়নের জন্য অনলাইনভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সেরাদের বাছাই করা হবে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা চর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা ট্রেকহোল্ডারদের ডিএসইর নিয়মিত ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সনদপত্র প্রদান করা হবে। কর্মসূচিটি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নে ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা বিভাগ মূল ভূমিকা রাখছে এবং এতে প্রযুক্তি অবকাঠামো, নেটওয়ার্ক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয় সার্বিক সহযোগিতা করছে।
ডিএসই মনে করছে, পুঁজিবাজারের সংবেদনশীল প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম সুরক্ষিত রাখতে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি সুরক্ষাব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক লেনদেন ও ডিজিটাল হুমকি এড়িয়ে চলার এই সংস্কৃতি ডিএসই এবং এর অংশীজনদের সাইবার প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করবে, যা পুঁজিবাজারের প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমকে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হবে।
তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে কিংবা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানির কদর রয়েছে। ভেজাল ও কৃত্রিম কোমল পানীয়ের বিকল্প হিসেবে অনেকেই এখন ডাবের পানির প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে বাজারে ডাবের চাহিদাও বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলের পলিগঠিত উর্বর মাটি নারিকেল ও ডাব উৎপাদনের জন্য উপযোগী হওয়ায় ভোলার উপকূলীয় উপজেলা চরফ্যাশনে এ খাত ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। শুধু ডাব বিক্রি থেকেই এ উপজেলায় বছরে প্রায় শতকোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এতে চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
ডাবের বাড়তি চাহিদা উপকূলীয় এলাকার হাজারো মানুষের জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে। গৃহস্থ, মহাজন, আড়তদার ও ফড়িয়া থেকে শুরু করে পরিবহনচালক ও শ্রমিক, অনেকেরই আয়ের উৎস এখন এই ব্যবসা। ডাব উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশনের শহর ও গ্রাম মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেলগাছ রয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১২০ থেকে ১৫০টি গাছ থাকে। সঠিক পরিচর্যা পেলে প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০টি ডাব পাওয়া যায়। বাজারে ভালো দাম ও চাহিদা থাকায় স্থানীয় গৃহস্থরা এখন গাছের পরিচর্যায় বেশি মনোযোগী হয়েছেন। এতে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি অনেক পরিবার বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছে।
ডাব চাষ ও ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে চরফ্যাশনের বিভিন্ন ইউনিয়নে। দুলারহাটের নীলকমল ইউনিয়নের আলাউদ্দিন মাস্টার কয়েক বছর আগেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাঁর বাগানের পাঁচ শতাধিক নারিকেলগাছের যথাযথ পরিচর্যা করতেন না। এতে পোকামাকড় ও ইঁদুরের আক্রমণে অনেক ডাব নষ্ট হতো। তবে বর্তমানে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় তিনি নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছেন। এখন বছরে শুধু ডাব বিক্রি করেই তাঁর অতিরিক্ত আয় হচ্ছে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা।
একইভাবে চর মানিকা এলাকার রফিজল মোল্লা বাড়ির আশপাশের দুই শতাধিক নারিকেলগাছের ডাব বিক্রি করে বছরে কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন। সেই আয় থেকে তিনি ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ জমি কিনেছেন। ভবিষ্যতে আরও জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
চরফ্যাশনের ডাব স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেও সরবরাহ করা হচ্ছে। উপজেলার কলমির মোড় এলাকার আড়তদার মো. কবির হোসেন জানান, ফড়িয়ারা গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রতি জোড়া ডাব ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো আড়তদারদের কাছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি নিজেই প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকার ডাব বিভিন্ন মোকামে পাঠান।
কবির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশনে তাঁর মতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন আড়তদার রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকে মাসে গড়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার ডাব ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের বাজারে পাঠান। এই বিপুল বাণিজ্যের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও অর্থের প্রবাহ তৈরি হচ্ছে।
প্রচলিত বাজারব্যবস্থার পাশাপাশি এ ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারাও। ডাবের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা শুরু করেছেন। তাঁরা সরাসরি বাগান থেকে তাজা ডাব সংগ্রহ করে অনলাইনে পাওয়া অর্ডারের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করছেন। এতে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চরফ্যাশনের ডাবের চাহিদা বাড়ার পেছনে এর গুণগত মানও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা জানান, এখানকার ডাব আকারে বড়, পানির পরিমাণ বেশি এবং স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে উন্নত জাতের নারিকেলের চারা বিতরণ, বালাই ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, নারিকেলগাছের যথাযথ পরিচর্যা, উন্নত জাতের চারা ব্যবহার এবং উৎপাদন ও বাজারজাতকরণব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে চরফ্যাশনে ডাবের উৎপাদন ও বাণিজ্য আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক দরপতনের মধ্যেও স্বর্ণ কেনার ধারা বজায় রেখেছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’। বুধবার প্রকাশিত দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসেও বড় অঙ্কের স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যার মধ্য দিয়ে টানা ২৩তম মাসের মতো মূল্যবান এই ধাতুর মজুত বৃদ্ধির নজির গড়ল বেইজিং।
প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, সেপ্টেম্বর মাস শেষে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট স্বর্ণের মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৭০ হাজার ট্রয় আউন্সে। এর আগের মাসে এই মজুতের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার আউন্স। চলতি বছর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের মূল্যে বড় ধরনের অস্থিরতা ও ওঠানামা দেখা গেলেও নিজেদের কেন্দ্রীয় রিজার্ভে ধাতুটির সঞ্চয় বাড়িয়ে নেওয়ার ধারাবাহিক কৌশল অব্যাহত রেখেছে চীন।
তবে মোট মজুতের পরিমাণ বাড়লেও বিশ্ববাজারে দাম কমে যাওয়ার কারণে সেপ্টেম্বরের শেষে চীনের স্বর্ণ রিজার্ভের সামগ্রিক আর্থিক মূল্য হ্রাস পেয়েছে। তথ্যানুযায়ী, আগস্টের শেষে যেখানে দেশটির স্বর্ণের রিজার্ভের আর্থিক মূল্য ছিল ৩৫০ দশমিক ০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে সেপ্টেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে। মূলত সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৬ শতাংশেরও বেশি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে এই আর্থিক মূল্যায়নে। সর্বশেষ বুধবার গ্রিনিচ মান সময় ০২৪৪ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণ প্রায় ৪ হাজার ১৪৭ দশমিক ৪৭ মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হচ্ছিল।