চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) অভাবনীয় মুনাফা অর্জন করেছে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান শেল। বিদেশী গণমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮৪ কোটি ডলারে। এটি বাজার বিশ্লেষকদের করা ৮৯২ কোটি ডলারের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি। গত বছরের একই সময়ে শেলের মুনাফা ছিল ৪২৬ কোটি ডলার। মূলত ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটিই কোম্পানিটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফার রেকর্ড।
শেলের এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং রাসায়নিক পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববাজারে জেট ফুয়েলের বাড়তি চাহিদা মেটাতে শেল তাদের শোধনাগারগুলোকে ১০২ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালনা করেছে, যার ফলে বিমান জ্বালানির উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এই ইতিবাচক খবরের প্রভাবে পুঁজিবাজারে শেলের শেয়ারের দাম দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভাগীয় আয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শেলের সমন্বিত গ্যাস বিভাগ থেকে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রায় ২৭০ কোটি ডলার মুনাফা এসেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে চমকপ্রদ সাফল্য এসেছে রাসায়নিক ও তেলজাত পণ্য বিভাগ থেকে, যেখানে আয় মাত্র ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে ২০২২ সালের পর কোম্পানিটি এবারই সর্বোচ্চ পরিচালন নগদ প্রবাহ বা অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই শক্তিশালী আয়ের সুবাদে শেল তাদের নিট ঋণ ৫ হাজার ২৬০ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ডলারে নামিয়ে এনেছে।
তবে মুনাফায় উল্লম্ব গতি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস উত্তোলনের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়ে গেছে। বিশেষ করে গত মার্চে কাতারে শেলের একটি গ্যাস প্লান্টে হামলার পর সেটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, যা মেরামত করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। উল্লেখ্য, শেলের বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারের কাছাকাছি থাকায় শেল এবং অন্যান্য জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য আয়ের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে কারখানা সংস্কারের কারণে উৎপাদনে সামান্য ধীরগতি আসার পূর্বাভাসও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের প্রসার এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমুদ্রগামী জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের (বাঙ্কারিং) বিদ্যমান নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘বাঙ্কারিং নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়ায় বেসরকারি খাতের জন্য মেরিন ফুয়েল আমদানির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, পরিবেশ সুরক্ষা, ডিজিটাল নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্বালানি নিশ্চিতকরণে একাধিক নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বাঙ্কারিং হাবে রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এই নতুন রূপরেখা প্রণয়ন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
বর্তমান ব্যবস্থায় সমুদ্রগামী জাহাজে লো-সালফার মেরিন ফুয়েল (এলএসএফও) আমদানির একক এখতিয়ার শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। বিপিসি আমদানিকৃত এই জ্বালানি তাদের তিনটি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মাধ্যমে ডিলারদের কাছে হস্তান্তর করে, যারা বার্জের মাধ্যমে জাহাজে সরবরাহ করে। তবে নতুন নীতিমালায় বিপিসির পাশাপাশি নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী দেশী-বিদেশী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও পৃথক অনুমতি সাপেক্ষে সরাসরি জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সালফার কনটেন্টযুক্ত ফার্নেস অয়েলের মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় জ্বালানি তেলের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের ‘ফুয়েল কোয়ালিটি সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানির ঘনত্ব, ফ্ল্যাশ পয়েন্ট এবং সালফারের পরিমাণসহ যাবতীয় তথ্য ডিজিটাল রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া বাঙ্কারিং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত থাকবে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পাঁচ বছরের যাবতীয় লেনদেন ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সরকারি প্ল্যাটফর্মে জমা দিতে হবে।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি এই নীতিমালায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। বাঙ্কারিং করার সময় জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়া বা কোনো দূষণ ঘটলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তাবে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘পলিউশন লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ বা দূষণ দায়বদ্ধতা বীমা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া বাঙ্কারিংয়ে ব্যবহৃত বার্জ ও ট্যাংকারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং ফায়ার সেফটি প্রটোকল অনুসরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে খসড়া নীতিমালায়।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী উচ্চ সালফারযুক্ত তেলের পরিবর্তে ভেরি লো সালফার ফুয়েল অয়েল (ভিএলএসএফও) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাঙ্কারিং খাতে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমদানির সুযোগ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত নিয়ে বাঙ্কার সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দ্বিমত প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, অবকাঠামোগত ও আর্থিক শর্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যাতে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের বদলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিমালার এই খসড়াটি বর্তমানে বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করাই এই নতুন নীতিমালার মূল লক্ষ্য।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নতুন মহাসচিব (সেক্রেটারি জেনারেল) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মেজর জেনারেল মো. সাহেদুল ইসলাম (অব.)। সামরিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ৩৫ বছরেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব এখন থেকে বিজিএমইএর প্রশাসনিক ও কৌশলগত নেতৃত্বে আসীন হলেন।
মেজর জেনারেল ড. মো. সাহেদুল ইসলাম (অব.) তার দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে ডিফেন্স অ্যাটাচে হিসেবে দায়িত্বরত থাকাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত সম্মানজনক ‘লিজিওন অব মেরিট’ পদকে ভূষিত হন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ; তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘শ্রমিকদের দক্ষতা পর্যালোচনা ও উন্নয়ন’ বিষয়ে পিএইচডি ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি এমবিএ এবং ভারতের ওসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইন ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ডিগ্রি লাভ করেছেন। কর্মজীবনে তিনি বিইউপি’তে ডিন এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ট্রেজারার ও অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, তার এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী নেতৃত্ব দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সহায়ক হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর মেজর জেনারেল সাহেদুল ইসলাম (অব.) বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই পোশাক খাতের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে তিনি গর্বিত। তিনি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও সুদৃঢ় করতে বিজিএমইএ পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট সকল উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।
জাপানি মুদ্রার রেকর্ড দরপতন রোধে গত শুক্রবার বাজারে সরাসরি ইয়েন ক্রয়ে অংশ নিয়েছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা ইয়েনের মান বৃদ্ধিতে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ওয়াশিংটনের প্রথম বড় ধরনের হস্তক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গোল্ডম্যান স্যাকস এবং মরগান স্ট্যানলির মাধ্যমে ইউরো বিক্রি করে ইয়েন ক্রয় করেছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ঠিক কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি ব্যাংককে ইয়েন বাজারে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়ে অবহিত করে এবং তাদের "ভবিষ্যতের পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকুন" বলে নির্দেশনা দেয় বলে রয়টার্স-কে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্টের হাতে থাকা একটি নোটপ্যাডের ছবিতে দেখা যায় সেখানে "করণীয়" তালিকার নিচে লেখা ছিল "জাপানি ইয়েন ক্রয় ৫-১০ বিলিয়ন ডলার"। তবে এই নোটপ্যাড এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন নিয়ে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়, নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ বা মরগান স্ট্যানলি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি এবং গোল্ডম্যান স্যাকসও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।
কিয়োদো নিউজ শনিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইয়েনের দুর্বলতা কাটিয়ে বাজার স্থিতিশীল করতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী সপ্তাহেই একটি বিশেষ নীতিমালা ঘোষণা করতে পারে। মূলত মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টিকারী ফটকা কারবারিদের সতর্ক করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামির পরবর্তী বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশ্বের প্রধান সাতটি শিল্পোন্নত দেশের গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েনকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের খবরে বাজারে ইয়েনের মান দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এলএসইজি-র উপাত্ত অনুযায়ী, শুক্রবার শেষ বিকেলের লেনদেনে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৫৮.৯ থেকে লাফিয়ে ১৫৭.৬-এ চলে আসে। এর আগে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন মুদ্রার মান ১৬৪ ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা ১৯৮৬ সালের পর সর্বোচ্চ। জাপানি মুদ্রার মান ধরে রাখতে টোকিও নিজেও বড় অংকের অর্থ ব্যয় করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ইয়েন শক্তিশালী করতে গত বৃহস্পতিবারই জাপান সম্ভবত ৫৮.৯৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। নিক্কেই শনিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শুক্রবার নিউইয়র্কের লেনদেনের সময়ও টোকিও বাজারে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য না করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, বাজারের তারল্য চাহিদা মেটাতে তাদের কাছে "বিস্তৃত পরিসরের হাতিয়ার" রয়েছে। তারা আরও যোগ করেছে, "সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা বজায় রাখতে আমরা প্রয়োজনীয় সব হাতিয়ার ব্যবহারে প্রস্তুত রয়েছি"। এর মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের ফিমা রেপো সুবিধার ব্যবহারের সুযোগও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে জাপান সরাসরি মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বিক্রি না করেই প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করতে পারবে, যা জাপানের জন্য ইয়েন ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করে তুলবে।
জ্বালানি তেলের বাজারে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং ডিজেলসহ অন্যান্য পরিশোধিত পণ্যের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকার প্রবল পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দুই তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এক্সন মবিল ও শেভরন। রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বছরের দ্বিতীয়ার্ধেও বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে উভয় কোম্পানিই দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের শোধন ব্যবসায় বড় ধরনের মুনাফার কথা জানিয়েছে। মূলত জ্বালানি মজুত কমে যাওয়া, চীন থেকে রপ্তানি হ্রাস এবং রাশিয়ায় শোধনাগার অচল থাকার ফলে প্রতিষ্ঠান দুটির মুনাফার মার্জিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পণ্যমূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থ এক আয়ের সভায় বলেন, "আমরা পণ্যের মূল্যের ওপর কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখতে যাচ্ছি... যা তৃতীয় প্রান্তিক এবং সম্ভবত তার পরেও স্থায়ী হতে পারে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, ডিজেল ও হিটিং অয়েলের মতো পণ্যের দীর্ঘমেয়াদী চাহিদা কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম আবারো গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি, যারা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাখার দাবি করেছে তেল জায়ান্টগুলো।
উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে এক্সন মবিল জানিয়েছে, তারা তাদের মার্কিন শোধনাগারগুলোকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পরিচালনা করছে এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে রেকর্ড পরিমাণ ডিজেল উৎপাদন করেছে। অন্যদিকে শেভরন জানিয়েছে, তাদের মার্কিন শোধনাগারগুলোতে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে যা একটি নতুন রেকর্ড। তবে বর্তমানের এই উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছেন এক্সন মবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস। সিএনবিসি-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়াতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি মন্তব্য করেন, "আমরা যে ব্যবহার হার দেখছি তা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাই আমার মনে হয় শোধন খাতের এই চ্যালেঞ্জ বিশ্বকে আরও কিছুকাল মোকাবিলা করতে হবে।" উডস আরও জানান, চীনের বাইরে এক্সন মবিলেরই বিশ্বের বৃহত্তম শোধন সক্ষমতা রয়েছে, তবে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে জটিলতা বাড়ছে।
শোধনাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ফলে আগামীতে আয়ের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শেভরনের মতে, তৃতীয় প্রান্তিকে শোধনাগার সাময়িক বন্ধ থাকায় ডাউনস্ট্রিম আয় ১৭ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত কমতে পারে। যদিও দ্বিতীয় প্রান্তিকে এক্সন মবিলের সমন্বিত ডাউনস্ট্রিম আয় ৪১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, তবে আরিবসি ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর বিশ্লেষক বিরাজ বোরখাতারিয়া মনে করেন, বিশাল শোধন সক্ষমতা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকের আয়ে এক্সন মবিল লক্ষ্যমাত্রা থেকে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও শেভরন প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে শেয়ার বাজারে এক্সনের দর ১ শতাংশ কমলেও শেভরনের শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুজ্জীবিত করতে হিমশিম খাওয়ায় জুলাইয়ে চীনের কারখানা খাতের কার্যক্রম হ্রাস পেয়েছে বলে শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিল্প খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) এ মাসে ৪৯ দশমিক ২-এ নেমে এসেছে, যা মূলত খাতটির সংকোচনের চিত্র তুলে ধরে।
বেইজিং থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, পিএমআই সূচকের এই অবস্থান ব্লুমবার্গের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদদের ৫০ দশমিক ১ শতাংশ সম্প্রসারণের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক নিচে। এর আগে জুন মাসে এই সূচকটি ছিল ৫০ দশমিক ৩-এ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় চীনের শিল্পোৎপাদন খাত গভীর অনিশ্চয়তার কবলে পড়েছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোক্তাদের খরচ করার প্রবণতা দুর্বল থাকলেও ইলেকট্রনিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চাহিদার কারণে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি দেশটির উৎপাদন খাতকে কিছুটা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংকটের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; সরকারি অ-উৎপাদন খাতের পিএমআই জুলাইয়ে দ্রুত কমে ৪৯ দশমিক ০-এ দাঁড়িয়েছে। সেবা ও নির্মাণ খাতের এই অবনমন গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকোচন।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এনবিএসের পরিসংখ্যানবিদ হুয়ো লিহুই এক বিবৃতিতে বলেন, এই সূচক জুলাইয়ে ‘অ-উৎপাদন খাতের সমৃদ্ধির স্তর কমে যাওয়ার’ ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই নেতিবাচক পরিসংখ্যান সামনে আসার ঠিক একদিন আগেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখে থাকা ‘কঠিন পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের’ কথা স্বীকার করেন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে শি জিনপিং গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ‘অভ্যন্তরীণ চাহিদার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে।’
দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারে এই বিশেষ তহবিল গঠনের কথা জানানো হয়। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
এই তহবিলের আওতায় ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থায়ন পাবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৭ শতাংশ। ফলে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো ৩ শতাংশ মার্জিন ভোগ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে সব তফসিলি ব্যাংক এই স্কিমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। চামড়া শিল্পের পুরো মূল্যশৃঙ্খলে মূলধনী বিনিয়োগ এবং কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে এ ঋণ প্রদান করা হবে। এর মধ্যে ট্যানারি ও চামড়াজাত পণ্য কারখানার অবকাঠামো উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পরিবেশ রক্ষায় আধুনিক ইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ ৭০:৩০ ঋণ-ইকুইটি অনুপাত নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন ট্যানারি বা বর্জ্য শোধন অবকাঠামো নির্মাণে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা এবং নতুন উৎপাদন ইউনিটের জন্য ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। বিদ্যমান স্থাপনার আধুনিকায়নের জন্য ১০ কোটি টাকা এবং কার্যকরী মূলধনের ক্ষেত্রে বার্ষিক লেনদেনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মেয়াদি ঋণের জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট সাত বছর সময় পাওয়া যাবে। এছাড়া কার্যকরী মূলধনের ঋণ প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য দেওয়া হলেও ব্যবসায়িক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে তা তিন বছর পর্যন্ত নবায়নযোগ্য হবে।
তবে এই ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর কিছু শর্তারোপ করেছে। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জনের প্রমাণ দাখিল করতে হবে। পাশাপাশি কারখানায় ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের অন্তত ১০ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে নিশ্চিত করতে হবে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) টাইপ-বি ও টাইপ-সি ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ঋণ সুবিধা গ্রহণের যোগ্য হবে। তবে কোনো ঋণখেলাপি কিংবা যারা ইতোমধ্যেই সরকারের অন্যান্য বিশেষ তহবিলের সুবিধা নিচ্ছেন, তারা এই স্কিমের আওতায় বিবেচিত হবেন না।
চলতি বছরেই পাকিস্তান থেকে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত এমজি ব্র্যান্ডের ১০০টি গাড়ি বাংলাদেশে আসছে। পাকিস্তানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমজি জে-ডব্লিউ অটোমোবাইল পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের র্যানকন গ্রুপের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম বিজনেস রেকর্ডারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী চার বছরে বাংলাদেশে মোট ৫ হাজার ৮০০টি গাড়ি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে পাকিস্তানি এই প্রতিষ্ঠানটি। গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও উৎপাদনবিষয়ক বিশেষ সহকারী হারুন আখতার খানের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তিকে পাকিস্তানের অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে হারুন আখতার খান বলেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান লাখ লাখ ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে। একই সঙ্গে এটি সরকারের রপ্তানিনির্ভর শিল্প প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি আরও জানান, গাড়ি রপ্তানি বাড়ানো, স্থানীয় উৎপাদন ও যন্ত্রাংশের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দেশের গাড়ি উৎপাদন সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পাকিস্তান সরকার একটি সমন্বিত অটোমোবাইল নীতি চূড়ান্ত করতে কাজ করছে।
চুক্তির বিষয়ে র্যানকন গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রশিদ ভূঁইয়া আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের গ্রাহকরা পাকিস্তান থেকে আমদানি করা গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাকিস্তানের গাড়ি উৎপাদন শিল্প আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে এবং এ খাতে রপ্তানির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।’ তার মতে, এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের গ্রাহকরা সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্রযুক্তির এসইউভি এবং সেডান গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
এই রপ্তানি উদ্যোগ পাকিস্তানের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির সরকার মনে করছে, স্থানীয়ভাবে তৈরি এমজি গাড়িগুলো গুণমান ও প্রযুক্তির দিক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। এই রপ্তানি কার্যক্রম কেবল দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই সুদৃঢ় করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় অটোমোবাইল বাণিজ্যের এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও এর বিপক্ষ অবস্থান নেওয়া তিন নীতিনির্ধারক শুক্রবার সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সুদের হার বাড়ানো আবশ্যক। গত বুধবার সম্পন্ন হওয়া টানা পঞ্চম সভায় ফেড সুদের হার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের ঘরেই অপরিবর্তিত রেখেছে। যদিও নীতিনির্ধারণী পর্ষদের ১২ সদস্যের মধ্যে তিনজন ০.২৫ শতাংশ সুদহার বৃদ্ধির সপক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেন। সংবাদমাধ্যম এএফপি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে একসঙ্গে তিনজন সদস্যের ভিন্নমত পোষণের বিষয়টি বেশ বিরল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিকে নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, এই ঘটনা মূলত তারই প্রতিফলন। উল্লেখ্য, বিগত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা আঞ্চলিক ক্লিভল্যান্ড ফেডের প্রেসিডেন্ট বেথ হ্যামাক বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরেই অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি যত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে, সেটিকে আবার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা তত বেশি কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।’ অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মার্কিন পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। গত মার্চ থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান সংশ্লিষ্ট সামরিক উত্তজেনার জেরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব পরে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার মূল্যেও পরিলক্ষিত হয়।
এছাড়া বৈশ্বিক অতিমারি কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক ব্যবস্থা এবং অতি সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে সৃষ্ট চাপও মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। হ্যামাকের সুরে সুর মিলিয়ে মিনিয়াপোলিস ফেডের প্রেসিডেন্ট নীল কাশকারি শুক্রবার এক বিবৃতিতে অভিমত দেন যে, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রানীতি ধাপে ধাপে আরও কঠোর করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, মূল্যস্ফীতি যদি উচ্চ পর্যায়েই থাকে, তাহলে পরে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হওয়ার চেয়ে এখন ছোট ছোট ধাপে নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়াই ভালো।’
তৃতীয় ভিন্নমত পোষণকারী সদস্য তথা ডালাস ফেডের প্রেসিডেন্ট লরি লোগানও শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানান যে, ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে এখনই সীমিত আকারে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, বিদ্যমান সুদের হার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি রোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বড় ধরনের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটলে মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত লক্ষ্যের ওপরেই থেকে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
লোগান বলেন, ‘ফেড তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য অপ্রত্যাশিত ঘটনার ওপর নির্ভর করতে পারে না। তবে, এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি সমন্বয় করা সম্ভব।’
ফেডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে সুদের হার কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেছিলেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যিনি নিজেই ওয়ার্শকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনীত করেছেন।
গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে (২৬-৩০ জুলাই) দেশের উভয় শেয়ারবাজারেই সূচক এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্সচেঞ্জটির অন্যান্য সূচকেও ঊর্ধ্বমুখী ভাব বজায় ছিল এবং সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই ধরণের ইতিবাচক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই)।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। পাশাপাশি নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ এবং শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস—উভয়ই আগের সপ্তাহের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৮টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৬৪টির দর বেড়েছে এবং ৮৯টির দর কমেছে। সূচকের এই উত্থানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, পূবালী ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা এবং ওয়ালটনের মতো বড় কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
লেনদেনের চিত্রে দেখা গেছে, ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন ১০৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। খাতভিত্তিক লেনদেনে বস্ত্র খাতের আধিপত্য ছিল সবচেয়ে বেশি, যা মোট লেনদেনের ২২.৫ শতাংশ দখল করেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল যথাক্রমে ওষুধ ও রসায়ন এবং প্রকৌশল খাত। সাধারণ বিমা খাতে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। তবে সিমেন্ট এবং কাগজ খাতে সামান্য নেতিবাচক রিটার্ন পরিলক্ষিত হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। গত সপ্তাহে সিএসইতে মোট ১৭০ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। লেনদেন হওয়া ৩২৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮৮টির দাম বেড়েছে এবং ১১৩টির দাম কমেছে। সামগ্রিকভাবে, গত এক সপ্তাহে দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আকাশপথে ভ্রমণসেবাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে টিকিট কেনার সুবিধা চালু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক স্বনামধন্য উড়োজাহাজ সংস্থা এমিরেটস। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম কোনো বৃহৎ ও শীর্ষস্থানীয় উড়োজাহাজ সংস্থা হিসেবে এমিরেটস এই যুগান্তকারী সেবাটি চালু করল। গত মঙ্গলবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এমিরেটস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের জন্য এই নতুন পেমেন্ট সুবিধা যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই এয়ারলাইনসের এমন পদক্ষেপ ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন শিল্পে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক পর্যায়ে এমিরেটসের এই নতুন সুবিধাটি শুধুমাত্র তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। টিকিট কাটার সময় পেমেন্ট অপশনে গ্রাহকরা ‘ক্রিপ্টো ডটকম পে’ সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করার সুযোগ পাবেন। এক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে প্রথমে টিকিটের মূল্য স্থানীয় মুদ্রা দিরহামে উল্লেখ করা থাকবে এবং পরবর্তীতে পেমেন্ট গেটওয়েতে গিয়ে বিটকয়েন বা অন্য কোনো ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে সেই দিরহামের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এমিরেটস কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণ করবে তা স্পষ্ট না করলেও, লেনদেনকারী প্ল্যাটফর্ম ক্রিপ্টো ডটকমে বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, সোলানা, স্টেবলকয়েন টেদার, ইউএসডি কয়েন এবং তাদের নিজস্ব টোকেন ক্রোনোসসহ প্রায় ৪০০টিরও বেশি ডিজিটাল সম্পদ লেনদেনের সুবিধা রয়েছে।
গ্রাহকসেবা আধুনিকায়নের এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে এমিরেটসের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ও প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আদনান কাজিম জানিয়েছেন যে, প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন প্রজন্ম এবং গ্রাহকদের সহজ ও নিরাপদ লেনদেনের সুবিধা দিতেই তারা এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার মতে, আধুনিক গ্রাহকরা এখন তাদের ভ্রমণের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিজেদের মুঠোফোনের মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাই উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোরও গ্রাহকদের এই পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা উচিত। মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দুবাইকে ফিনটেক বা আর্থিক প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে বৃহত্তর লক্ষ্য রয়েছে, এমিরেটসের এই উদ্যোগ তারই একটি ধারাবাহিক অংশ। ডিজিটাল বাজার সম্প্রসারণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আরব আমিরাত সরকার ইতোমধ্যেই ভার্চুয়াল অ্যাসেটস রেগুলেটরি অথরিটি (ভারা) গঠন করেছে এবং অন্যান্য আর্থিক কেন্দ্রগুলোও বিনিয়োগকারীদের এই সম্ভাবনাময় বাজারে যুক্ত হতে উৎসাহিত করছে।
এমিরেটসের এই পেমেন্ট সেবার অংশীদার সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টো ডটকমের বিশ্বব্যাপী ৯০টি দেশে প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে তারা সফলভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে উড়োজাহাজের টিকিটের মূল্য পরিশোধে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়; এর আগে গত বছরের মে মাসে শারজাহর বাজেট এয়ারলাইন ‘এয়ার এরাবিয়া’ প্রথম এই ধরনের সুবিধা প্রদান শুরু করেছিল। পরবর্তীতে জুলাই মাসে এমিরেটস ও দুবাই ডিউটি ফ্রি যৌথভাবে ক্রিপ্টো ডটকমের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার সফল বাস্তবায়ন হলো বর্তমানের এই টিকিট কাটার সুবিধা। এমিরেটসের সঙ্গে এই যুগান্তকারী চুক্তির বিষয়ে ক্রিপ্টো ডটকমের প্রেসিডেন্ট ও চিফ অপারেটিং অফিসার এরিক আনজিয়ানি বলেন, এই উদ্যোগটি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় ও বাস্তব প্রমাণ।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি বিমা কোম্পানির চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) বেড়েছে। বিপরীতে একটি কোম্পানির ইপিএস কমেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে পৃথকভাবে প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ২০০ শতাংশ ইপিএস বেড়েছে সিকদার ইন্স্যুরেন্সের। বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ১ টাকা ৫ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৫ পয়সা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্সের। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ১৬৯ শতাংশ বেড়ে ৯৪ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৫ পয়সা।
এদিকে আলোচ্য সময়ে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের ইপিএস ১০২ শতাংশ বেড়ে ৮৭ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৪৩ পয়সা।
আর ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের ইপিএস ৪০ শতাংশ বেড়ে ১ টাকা ১ পয়সায় উঠেছে। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে যা ছিল ৭২ পয়সা।
এ ছাড়া, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্সের ইপিএস ১৬ শতাংশ বেড়ে ২ টাকা ১৯ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ টাকা ৮৯ পয়সা।
অন্যদিকে ছয় কোম্পানির মধ্যে শুধুমাত্র নর্দার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুনাফা কমেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির ইপিএস ৯ শতাংশ কমে ৮৯ পয়সায় নেমে এসেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৮ পয়সা।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়েছে। সকাল থেকে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যায়। ডিএসই ও সিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরুর প্রথম আধা ঘণ্টা পর অর্থাৎ সকাল সাড়ে ১০টায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৮৪ পয়েন্টে অবস্থান করে। সূচকের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে।
প্রধান সূচকের পাশাপাশি ডিএসইর অপর দুটি সূচকেও ইতিবাচক অবস্থান দেখা গেছে। এ সময়ে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৯১ পয়েন্টে এবং বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ২১১ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ডিএসইতে মোট ১৭০ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ২১৯টির, কমেছে ১১১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৪টি কোম্পানির শেয়ারের দর। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ১০টি কোম্পানির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড, সায়হাম টেক্সটাইল, টেকনো ড্রাগস, সায়হাম কটন, অরগান ডেনিম, আইটি কনসালটেন্ট, ডোমিনেজ স্টিল, ইন্দো বাংলা ফার্মা, এমএল ডাইং ও বিএটিবিসি।
বৃহস্পতিবার সকালে লেনদেন শুরুর প্রথম থেকেই সূচকের কিছুটা ওঠানামা পরিলক্ষিত হয়। লেনদেন শুরুর প্রথম ৫ মিনিটেই ডিএসইএক্স সূচক ৯ পয়েন্ট বেড়ে যায়, যা বাজারের ইতিবাচক সূচনার ইঙ্গিত দেয়। তবে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে সূচক আগের অবস্থান থেকে ৭ পয়েন্ট কমে গিয়ে কিছুটা সংশোধন হয়। এরপর সূচকের গতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়। লেনদেন শুরুর ২০ মিনিট পর অর্থাৎ সকাল ১০টা ২০ মিনিটে সূচক আগের দিনের চেয়ে ৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৮১ পয়েন্টে অবস্থান করে এবং এরপর থেকে বাজারে স্থিতিশীল বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে।
অন্যদিকে, দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টা পর অর্থাৎ সকাল সাড়ে ১০টায় ২০ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৭৩৩ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। সূচকের ইতিবাচক এই ধারার পাশাপাশি এদিন সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সিএসইতে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, কমেছে ১২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৮টি কোম্পানির শেয়ারের দর।