চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সক্ষমতা দেখালেও সময়মতো সেই অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে এখনো বেশ দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সোমবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত সোনালী ব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। গভর্নর উল্লেখ করেন যে, ঋণ প্রদানের প্রাথমিক পর্যায়েই যদি সঠিকভাবে গ্রাহক নির্বাচন করা যায়, তবে সেই অর্থ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস পায়। দীর্ঘদিন ধরে নানা বিধিনিষেধের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ বিতরণে যে অতিরিক্ত সতর্কতা কাজ করছে, তার ফলে আদায়ের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না এবং অতীতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত রাখার প্রয়োজন হয়েছিল।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ২০০০ সালের আগের সীমিত ঋণ প্রবাহের মডেলটি কোনোভাবেই টেকসই ছিল না। তার মতে, ব্যাংক কেবল আমানত সংগ্রহ করলেই হবে না, যদি সেই অর্থ বৃহৎ অর্থনীতিতে কার্যকর অবদান রাখতে না পারে, তবে ব্যাংকিং খাতের অর্জন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সোনালী ব্যাংকের বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংক বর্তমানে সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে, তবে এখন সময় এসেছে আরও সাহসীভাবে ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের।’ সোনালী ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান যে, ব্যাংকটিকে বর্তমানে প্রচলিত আংশিক কমার্শিয়াল ব্যাংকিং নীতি থেকে সরিয়ে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনায় গভর্নর জানান, গত বছরের মুনাফা ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণে বিশেষ সহায়ক হবে এবং ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক লভ্যাংশ প্রদানেও সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদী। সরকার সোনালী ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক নীতিতে পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করবে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে ব্যাংকটিকে আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। খেলাপি ঋণ বা এনপিএল পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন যে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ইতোমধ্যে ১৮ শতাংশ থেকে নিচে নেমেছে এবং ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা গেলে এই হার আরও কমানো সম্ভব হবে। পরিশেষে মাঠপর্যায়ের সক্ষম উদ্যোক্তা ও দক্ষ এসএমই গ্রাহকদের চিহ্নিত করে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে সোনালী ব্যাংকের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন গভর্নর।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ সেবাকে একটি একীভূত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের লক্ষ্যে সোমবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাবিজ ২.০’ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই নতুন সংস্করণটি উন্মোধন করা হয় যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি একক ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার পথে বড় ধরনের অগ্রগতি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তথ্যভিত্তিক পোর্টাল হিসেবে এর প্রথম সংস্করণ চালু হলেও এবারের সংস্করণে যুক্ত হয়েছে ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’, যার মাধ্যমে নাম ক্লিয়ারেন্স থেকে শুরু করে ট্রেড লাইসেন্স পর্যন্ত পাঁচটি প্রধান অনুমোদন একটি মাত্র আবেদনের মাধ্যমে মাত্র তিন কার্যদিবসে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র ও ভ্যাট নিবন্ধনসহ ২০টিরও বেশি ব্যবসায়িক অনুমোদন এখন এই এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই পাওয়া যাবে।
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে এই প্ল্যাটফর্মে ‘নো ইওর অ্যাপ্রুভালস’ এবং ‘বাংলাবিজ আইডি’ নামক নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়েছে যা ব্যবসায়িক প্রোফাইল ব্যবস্থাপনা ও আবেদনের অগ্রগতি ট্র্যাকিং সহজতর করবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকারি সেবা ডিজিটাল করতে হলে তা ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক ও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডিজিটাল হতে হবে।’ একই অনুষ্ঠানে জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রধান তোমোহিদে ইচিগুচি বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছ, দ্রুত ও পূর্বানুমেয় সরকারি সেবার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিলেন, বাংলাবিজ সেই দাবির একটি বাস্তব ও কার্যকর সমাধান।’ বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় জানানো হয় যে শিগগিরই বাংলাবিজকে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সব সরকারি সেবার একক প্রবেশদ্বার হিসেবে নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সভাপতির বক্তব্যে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বচ্ছ কার্যপ্রবাহ এবং কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম।’ ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ অনুযায়ী এই প্ল্যাটফর্মটি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে অনুষ্ঠানে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উপপরিচালক আবু মোহাম্মদ নূরুল হায়াত টোটুল এবং বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের (বিসিজি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পার্টনার তৌসিফ ইশতিয়াক।
নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিতে যাওয়া পরবর্তী সরকারের জন্য অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেন যে অন্তবর্তী সরকার অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে মোটামুটি একটি অবস্থানে আনার চেষ্টা করেছে, তবে আগামী দিনের সংকট আরও প্রবল হতে পারে। চলমান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সংস্কার আমরা যা করেছি, তা এনাফ না; তবে সামনের সরকারের জন্য তা সহায়ক হবে। আরও ট্যাক্টফুলি হ্যান্ডেল করতে হবে চ্যালেঞ্জগুলো।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আরও দক্ষ ও কৌশলী হওয়ার পরামর্শ দেন অর্থ উপদেষ্টা। বিশেষ করে রাজনৈতিক চাপের মুখে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকারের সময়ে চাপ আসবে; তাদের সরাসরি ‘না’ বলা যাবে না। নেগোশিয়েট করার ক্ষমতায় যেতে হবে; তাদের অর্থনীতির নীতি বোঝাতে হবে, ব্যাংকিং আইন, অডিটের নর্মস দেখাতে হবে।’ এছাড়া দেশের সার্বিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বড় ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান তৈরিতে এই শ্রেণিটিই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে গত রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। এলডিসি পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে ও দুই দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য এলাকা তৈরির লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ চুক্তির ফলে জাপানে ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এবং এর বিপরীতে জাপান বাংলাদেশে ১ হাজার ৩৯টি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য ৯৭টি উপ-খাত উন্মুক্ত করা হবে। এলডিসি উত্তরণের পর সুযোগ-সুবিধা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘হ্যাঁ আমরা অনেকগুলো দেশের সঙ্গে এফটিএ করছি। আমরা জাপানের সঙ্গে ইপিএ’র টোটাল নেগোসিয়েশন শেষ করেছি। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর করব।’ জাপানের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) নিয়ে গত বৃহস্পতিবারে আমাদের সাউথ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা নেগোসিয়েশন সম্পন্ন হয়েছে। আশা করি এ বছরের মধ্যে তাদের সঙ্গেও স্বাক্ষর হবে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি এটাই প্রথম, যা জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে সচিব বলেন, ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছে আমরা এফটিএ’র জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি এবং অন্যান্য যে সমস্ত মার্কেটে আমরা এখন শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাই সবগুলোর কাছেই আমাদের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমরা সেখানে আলোচনা সহসাই শুরু করব।’ বৈশ্বিক বাণিজ্যের মন্দা পরিস্থিতি ও রপ্তানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা পর্যালোচনা করেছি বিশ্ববাণিজ্যে আপনার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানে ডেফিসিট হয়েছে। আমরা তো পৃথিবীর বাইরে না, ওই হিসেবেই আমাদের উপরেও তবে আমাদের ৩ শতাংশ নেগেটিভ নেই। আমাদের ১ দশমিক ৬ শতাংশ লাইক দ্যাট। তবে আমাদের গ্লোবাল এভারেজের চেয়েও আমরা একটু ভালো অবস্থায় আছি।’ এছাড়া আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজার ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, ‘রমজানের বাজার নিয়ে এবং মূল্য নিত্যপণ্য এবং রমজান মাসভিত্তিক স্পেসিফিক যে সমস্ত পণ্যের বাজার ওঠানামা করে সেগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। এ বছরের অবস্থা ভালো।’ মূলত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাণিজ্যিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতেই প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে সরকার এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।
দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পের আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদিত পণ্যের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডের শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো’ শুরু হয়েছে। এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফোরজে) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ইসিফোরজের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিইআইওএ) দ্বিতীয়বারের মতো এই বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. আবদুর রহিম খান বলেন, “আমরা স্বাধীনতা পরবর্তীতে বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের কথা বলতে বলতে এখন ক্লান্ত। স্বাধীনতার পর আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করতে পারিনি। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেটিকে কাজে লাগাতে পারিনি। এলডিসির সুযোগকেও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। তবে, এলডিসি উত্তরণ হলেও এই খাতের অনেক সম্ভাবনা থাকবে, যেটিকে কাজে লাগাতে সঠিক পরিকল্পনা দরকার।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশীয় বাজারে এই খাতের প্রায় ১৮-১৯ বিলিয়ন ডলারের বিশাল চাহিদা রয়েছে, যা ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। ফলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাকে লক্ষ্য রেখে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট হোসনা ফেরদৌস সুমি। তিনি বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “বিশ্বব্যাপী লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত দ্রুতই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমাদের টেকনোলজিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। গ্লোবাল মার্কেট যদি ১০ গতিতে এগিয়ে চলে, সেখানে আমরা ১ গতিতে এগোচ্ছি। আমাদের কাজের গতি বাড়াতে হবে। এখানে আমাদের অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি উৎপাদকদেরও নিজস্ব উদ্যোগে এই খাতের অগ্রসরে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।” বর্তমানে দেশে এই সেক্টরে ৮ বিলিয়ন ডলারের যে বাজার রয়েছে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে তা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উদ্বোধনী সভার সভাপতি ও বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান যে, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং এই এক্সপো উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগের সুযোগ তৈরি করবে। এবারের মেলায় হালকা প্রকৌশল খাতের মোট ২৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও আধুনিক প্রযুক্তিপণ্য প্রদর্শন করছে। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং মেলার শেষ দুই দিনে দুটি পৃথক কারিগরি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকেরা প্রত্যাশা করছেন যে, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
বিশ্ব বাজারে সোমবার স্বর্ণ, তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে বড় পতন ঘটেছে। সোমবার বিশ্ববাজারে স্বর্ণ, জ্বালানি তেল এবং শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতনে গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত সপ্তাহে রেকর্ড গড়া স্বর্ণ ও রুপার দামে গত শুক্রবার ধস শুরু হলে এক পর্যায়ে সোনার দাম ১২ শতাংশ এবং রুপার দাম ৩০ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। পতনের এই ধারা সোমবারও অব্যাহত ছিল এবং স্বর্ণের দাম এদিন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে ৪ হাজার ৪০৩ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং রুপার দাম সাময়িকভাবে প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৭৫ ডলারে দাঁড়ায়। বাজার পরিস্থিতির এই দ্রুত পরিবর্তন সম্পর্কে পেপারস্টোনের মাইকেল ব্রাউন বলেছেন, “গত কয়েক সপ্তাহে বাজার খুব দ্রুত চাঙ্গা হয়েছিল। একইভাবে পতনও দ্রুত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এখন জানতে চাইছেন, এরপর কী হবে।”
এই নজিরবিহীন পতনের পেছনে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রযুক্তি খাতের অতি-মূল্যায়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বড় ভূমিকা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করায় এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনের খবরে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুটি চুক্তির মূল্য এক পর্যায়ে পাঁচ শতাংশের বেশি কমেছে। পাশাপাশি ট্রাম্প মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে মনোনীত করার ঘোষণা দেওয়ায় ডলার শক্তি সঞ্চয় করছে যা তেলের দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইনভেসকোর ব্রায়ান লেভিট মনে করেন, “ওয়ারশ সুদের হার কমানোর পক্ষে। কারণ তাঁর দর্শন হলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি না বাড়িয়েই মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।”
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা আসার সময়কাল নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে মাইক্রোসফট এআই অবকাঠামোতে ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা দিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে শেয়ার ছাড়ার হিড়িক দেখা দেয়। এর প্রভাবে সোমবার সিউল স্টক এক্সচেঞ্জ পাঁচ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে এবং চিপ উৎপাদনকারী এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের শেয়ারের বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। এশীয় বাজারের পাশাপাশি লন্ডন, প্যারিস ও ফ্রাঙ্কফুর্টের মতো ইউরোপীয় শেয়ারবাজারগুলোতেও সোমবার বড় ধরনের ধস লক্ষ্য করা গেছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট ২ হাজার ২৯৮ কোটি ২ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩৫৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই খাতের নিটওয়্যার পণ্য থেকে প্রাপ্ত আয় ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২৮ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে এবং ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬৯ কোটি ২ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। শুধু বিদায়ী জানুয়ারি মাসেই তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৬১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম।
সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়াসহ মোট ২৭ ধরনের পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে বাংলাদেশ ২ হাজার ৮৪১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। এই সময়ে তৈরি পোশাক ও কৃষি পণ্যের রপ্তানি কমলেও হোম টেক্সটাইল এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। হোম টেক্সটাইল খাতের আয় ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ৫০ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ৭২ লাখ ডলারে। তবে আশঙ্কাজনকভাবে কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬০ কোটি ৭২ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। সামগ্রিকভাবে গত জানুয়ারি মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৪১ কোটি ৩৬ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কম।
২০২৬ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সামান্য হ্রাস পেয়ে ৪ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ের ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের তুলনায় জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
সোমবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে রপ্তানি খাতের এই নিম্নমুখী চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৪১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আগে চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরেও রপ্তানি আয় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছিল। বিগত কয়েক মাস ধরেই দেশের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার দেশের উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স এদিন ৫৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৪৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সূচকের এই ইতিবাচক ধারার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের গতিও বেড়েছে; এদিন মোট ৭৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১২০ কোটি টাকা বেশি। ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৯০টি কোম্পানির মধ্যে ২১৫টির দর বেড়েছে, ১০৭টির কমেছে এবং বাকি ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়া ডিএসইর শরিয়াহ সূচক ১২ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ২০ পয়েন্ট বেড়ে যথাক্রমে ১ হাজার ৫৫ ও ২ হাজার ১৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
একই দিনে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বাজার পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১১১ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৬৯১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন সিএসইতে ১৮৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ৯৮টির দাম বেড়েছে এবং ৬০টির দাম কমেছে, বাকি ২৫টি প্রতিষ্ঠানের দর ছিল অপরিবর্তিত। সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ২ কোটি টাকা বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার উভয় বাজারেই বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও শেয়ার কেনার প্রবণতা বাড়ায় সূচক ও লেনদেন—উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতির ছাপ স্পষ্ট হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে আবারও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অটোগ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে যে সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে বলেন, “ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।” এর আগে জানুয়ারিতে এলপিজির দাম সর্বশেষ সমন্বয়ের সময় ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এলপিজির পাশাপাশি অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ২ টাকা ৩৪ পয়সা বাড়িয়ে মূসকসহ ৬২ টাকা ১৪ পয়সা করা হয়েছে। অটোগ্যাসের দাম এর আগে জানুয়ারিতে সর্বশেষ সমন্বয়ের সময় লিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে মূসকসহ ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ডের ১২২তম ড্র রোববার ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার অফিসের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ড্র-তে ছয় লাখ টাকার প্রথম পুরস্কার বিজয়ী সিরিজের নম্বর হিসেবে ০MDE১৭৭৭৭ ঘোষিত হয়েছে। এ ছাড়া তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে ০৪৮০১৩৩ নম্বরটি।
একক সাধারণ পদ্ধতিতে পরিচালিত এই ড্র-তে তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকা করে বিজয়ী নম্বর দুটি হলো ০৭৬৬৩৩৮ ও ০৯৩৯৯৩০ এবং চতুর্থ পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা করে জয়ী হয়েছে যথাক্রমে ০১০০০০১ ও ০৩৯৫৪০৮ নম্বর। এবারের ড্র-তে প্রচলনযোগ্য ১০০ টাকা মূল্যমানের মোট ৮৪টি সিরিজের ৪৬টি সাধারণ সংখ্যা পুরস্কারের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। কক থেকে শুরু করে ঘচ পর্যন্ত প্রতিটি সিরিজের একই নম্বরে এই পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে।
পঞ্চম পুরস্কার হিসেবে ১০ হাজার টাকা করে বিজয়ী ৪০টি নম্বর হলো-০০১৫৯৩৭, ০১৭৫৯৪৯, ০৩২৩৮১৪, ০৫৭৬২১৪, ০৮৩৯৬৯১, ০০২৩১৩৯, ০২১২০৩০, ০৩৭৩০৬৮, ০৫৯৭১০৯, ০৮৬৮০৭৮, ০০৪১৮৭০, ০২১২৯৫৫, ০৩৭৮৪৪৯, ০৬৭৮৬১৪, ০৮৯১৫৮০, ০০৭৪৬৮৭, ০২৬৮২৯৩, ০৩৯৮১৪০, ০৭০২২৪২, ০৯৩১১৪৪, ০০৯৯১৮৪, ০২৯২৬৪১, ০৪০১৭৬৫, ০৭০৩২৯৯, ০৯৩২৪৭২, ০১১১০৭০, ০২৯৯৪৮৪, ০৪০৬২৭৭, ০৭২০৩৮১, ০৯৫৫৮৬১, ০১৪৫২০৪, ০৩১২৩৭৬, ০৪৮৪৬৯৭, ০৭২১৩০৮, ০৯৯০১৫৫, ০১৬৫৩৯২, ০৩২৩৭৮২, ০৫৫৯২৮৫, ০৮১২৪৯০ এবং ০৯৯৫২৭৩।
রপ্তানি বাজার সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বজায় রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সচিবালয়ে রোববার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হওয়ায় এই চুক্তিটি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে লাভবান হবে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেই প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে এভরিথিং বাট আর্মস সুবিধার আওতায় সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেলেও এলডিসি থেকে উত্তরণের তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৯ সালে এই সুবিধা শেষ হবে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস কাঠামোর যোগ্য হতে পারে বলে মনে করা হলেও সেখানে তৈরি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেননা জিএসপি প্লাস নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের একটি নির্দিষ্ট পণ্য ইউরোপের মোট আমদানির ৯ শতাংশ ছাড়ালে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকে না, যেখানে বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট তৈরি পোশাক আমদানির প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশই বাংলাদেশ থেকে যায়। এই সুবিধা না থাকলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তবে ভারতের সঙ্গে ইইউর সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন নয় বলে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, “তৈরি পোশাক খাতে সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।”
বাণিজ্য সচিব আরও জানান, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। জাপানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি বছরের মধ্যেই চুক্তি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের সঙ্গে এক বৈঠকে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, “বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন বাংলাদেশের রপ্তানি বিশেষ করে তৈরি পোশাক যাতে ইউরোপীয় বাজারে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।” অধ্যাপক ইউনূস আরও উল্লেখ করেন যে, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সাত হাজারের বেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে এবং সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি ৯ ফেব্রুয়ারি
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক বিষয়ে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাণিজ্য সচিব জানান, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সইয়ের সম্ভাব্য তারিখ পাওয়া গেছে। বর্তমানে পাল্টা শুল্কের হার ২০ শতাংশ থাকলেও তা কিছুটা কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চুক্তি সইয়ের উদ্দেশ্যে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকা ছাড়বেন। তারা প্রথমে জাপান যাবেন এবং সেখানে চুক্তি সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের হাত ধরে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি মাসেও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। গত ডিসেম্বর মাসের ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩১৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি ছিল তৃতীয় কোনো মাস, যেখানে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করল। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে ৩২২ কোটি ডলার এবং গত বছরের রমজান ও ঈদের মাস মার্চে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। শতাংশের হিসেবে গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধি অবিশ্বাস্য। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা ২১৮ কোটি ডলার পাঠিয়েছিলেন, সেই তুলনায় এ বছর একই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের সামগ্রিক চিত্রও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১ হাজার ৯৪৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে জোয়ার শুরু হয়েছিল, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও তা সমানতালে বজায় রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে সুসংহত করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন। সাধারণত রমজান ও ঈদুল ফিতরের আগে রেমিট্যান্সের হার বাড়ে, তবে এবার জাতীয় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আগেভাগেই এই গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকির ফলে অর্থ পাচার এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহকেও এই সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেমিট্যান্সের এই বিশাল প্রবাহের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। গত ২৯ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী যা বর্তমানে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে রয়েছে। আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও রেমিট্যান্সের প্রাচুর্যের কারণে দেশে বর্তমানে ডলারের কোনো সংকট নেই। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। প্রবাসীদের এই অব্যাহত অবদানের ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।