চালের সংকট না থাকলেও বাজারে চালের দামে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বাড়ছে দাম। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ২০০-২৫০ টাকা বেড়েছে। গত এক মাসে সব ধরনের চালের দাম গড়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে মিলার, ধান-চালের মজুদদার, পাইকার ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’। মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চালের মজুদ গড়ে তুলেছে। এরাই চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। এ কারণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকারের ইতিবাচক সব উদ্যোগ। যদিও সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা মাঝারি আকারের বিআর-২৮ ও পাইজাম জাতের চালের। এ ধরনের চালের ভোক্তা সাধারণত মধ্যবিত্ত। গতকাল শনিবার ঢাকার বাজারে খুচরা পর্যায়ে এ দুই জাতের চালের কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬৪ টাকায়। এ ছাড়া মোটা চালের (গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরি) কেজি ৫২-৫৫ টাকা ও চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হয়েছে কেজি ৭০-৮০ টাকা দরে। মাস তিনেক আগে মোটা চালের কেজি ৪৮-৫০, মাঝারি চাল ৫৪-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৮-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে, গত এক মাসে সরু চালের দর প্রায় ৪ শতাংশ, মাঝারি চালের ৮ ও মোটা চালের দর ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে দাম বৃদ্ধির এই হার আরও বেশি। এ সময় সব ধরনের চালের দর বেড়েছে গড়ে ১২ শতাংশ।
সূত্র মতে, বাজারে চালের অভাব নেই। তবে মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তারা এখন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মিল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত এই চক্র জাল বিছিয়েছে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এ কারণে চাল উৎপাদন বেশি। বাজারে চালের সংকট সৃষ্টির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক।
ঢাকায় চালের বড় পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্র মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দুটি কারণের কথা বলেছেন- এক. ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলে মিল মালিকরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। দুই. আমনে যে উৎপাদন কম হবে, সে খবর বাজারে আছে। এ কারণে দাম বাড়ছে।
ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্সের গোলাম হাফিজ মানিক বলেন, মিলার, মজুদদার ও পাইকার এবং বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি চালের দামে ফায়দা লুটছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান-চাল কিনে গুদামজাত করে। পরে সুবিধামতো সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে ধানের দাম বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বড় বড় মিলার গোডাউনে হাজার হাজার টন পুরোনো চাল ও ধান মজুদ করে রেখেছে। তাদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গোলাম হাফিজ মানিক আরও বলেন, কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
শুল্ক প্রত্যাহারের পরও আমদানি বাড়ছে না
চালের সরবরাহ বাড়াতে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামানো হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলতি সপ্তাহে বলা হয়, বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ও সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু শুল্ক প্রত্যাহার হলেও চক্রটি মজুদ চাল বেশি দামে বিক্রির জন্য আমদানি করছে না। আমদানিতে নিরুৎসাহিত করছে অন্যদেরও। তাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ টন। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩৪ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৩৭ হাজার ১৬৮ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে শুধু ৪৮ টন চাল আমদানি হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে সরকারের নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সাধারণত ১১ লাখ টন চাল রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য আরও ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ লাগবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ রিসোর্সেসের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আকিজ এসেনসিয়ালসের কর্মকর্তা এস এম রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, যে বছরই হাওরে বন্যা হয় অথবা আগাম বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়, ওই বছরই ধান-চালের সংকট সৃষ্টি হয়। গত সরকারের সময় আমরা দেখেছি ১০ থেকে ১৮ লাখ মেট্ৰিক টন পর্যন্ত চাল আমদানি করতে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত এক কেজি চালও আমদানি করতে পারেনি। শুল্ক কমানোর পরও ব্যবসায়ীরা আমদানি করেনি। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে এখন চালের দর অনেক বেশি। ভারত থেকে আমদানি করলে চালের দর বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পড়বে। এ জন্য আমদানিতে আগ্রহ কম।
তিনি আরও বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভারত থেকে আমদানির জন্য এলসি করলে এখনও খরচ বেশি পড়ে। ভারত থেকে যদি সাশ্রয়ী মূল্যে সরু চাল আমদানি করা যায় তাহলে দেশের বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। মিয়ানমার বা ফিলিপাইনের চাল আমাদের দেশের মানুষ খেতে অভ্যস্ত নয়। সরকার আজ যদি ভারত থেকে এক লাখ মেট্ৰিক টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়, কাল প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা কমে যাবে। চালের দাম পুরোপুরি মজুতের ওপর নির্ভর করে। মজুদ থাকলে চালের দাম কমবে, না থাকলে রাতারাতি বেড়ে যাবে।
যেভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়
রাহাদুজ্জামান রাজীব বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে একটা চেইন অব কমান্ড কাজ করে তৃণমূল থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য এককভাবে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। চালের দাম প্রোডাক্ট চেইন ও পর্যাপ্ত মজুতের ওপর নির্ভর করে। যেমন- মিনিকেটের দাম অক্টোবর মাসে প্রতি বস্তা ছিল ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ টাকা। চলতি মাসে সেটার দাম হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এটার কারণ মিনিকেট চাল যে ধান থেকে হয় সেটার দাম বেড়ে গেছে। প্রতি মণের দাম ছিল (৩৭ কেজি) ১ হাজার ৫৬০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা। এ কারণে ধানের দাম বেড়ে গেলে চালের দাম বাড়ে।
তিনি বলেন, মিলার ও আড়তদারদের দোষ হচ্ছে আজকে ধানের দাম বাড়লে তারা আজকে থেকেই চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা ১৫ বা ২০ দিন পরে বাড়াতে পারত। তারা মজুতের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত যশোর, নওগাঁ ও বগুড়া থেকে। মোটা চালের নিয়ন্ত্রণ হয় ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও হাওর এলাকা থেকে। চালের বাজার থেকে ধানের বাজারের সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ৫০ জন ব্যবসায়ী। সারা দেশে চালের পাইকার আছে এক হাজার ৭০০ জন, যারা সরাসরি মিল থেকে চাল কিনে।
রাহাদুজ্জামান রাজীব আরও বলেন, ধানের সাপ্লাই চেইন হচ্ছে- কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করে। ফড়িয়ারা বিভিন্ন সাপ্লাইয়ারের কাছে বিক্রি করে, আর সাপ্লাইয়ররা বিভিন্ন মিলারের কাছে ধান বিক্রি করে। স্থানীয় কিছু ফড়িয়া ও সাপ্লাইয়ার ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা সিসি লোন নিয়ে ধান কিনে বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখে। দাম বাড়লে ধান বিক্রি করে দেয়। মুজুদদাররা যে দামে ধান বিক্রি করে মিলাররা সে হিসাবে চালের দাম নির্ধারণ করে।
তিনি বলেন, সরকার সব সময় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিলার ও আড়তদারদের ওপর দোষ চাপায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ায় ধানের ব্যবসায়ীরা। এদের সঙ্গে মিলারদেরও কিছু যোগসাজশ থাকে। এজন্য চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। পাশাপাশি মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। তাহলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সরু চালের দাম আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিনিকেট ও কাটারি চালের ধানটা পর্যাপ্ত নেই, এগুলো বোরো মৌসুমে হয়। চলতি আমন মৌসুমে মোটা ও মাজারি মানের চালের ধান উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মোটা ও মাঝারি মানের চালের দাম কমবে। যদি সরকার আমদানি করতে না পারে, মে মাসের আগে সরু চালের দাম কমবে না।
তিনি বলেন, ঢাকায় চালের বড় আড়তের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজার, যাত্রাবাড়ী কলাপট্টি, জুরাইন, কচুক্ষেত, মিরপুর-১, ১০, ১১, গাজীপুরের টঙ্গী বাজার, সাভারের নামা বাজার, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ, চিটাগাং রোড। এ ছাড়া চট্টগ্রামে চাকতাই ও পাহাড়তলী থেকে চাল সরবরাহ হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটা বদ অভ্যাস হলো, আন্তর্জাতিক বাজার এ পণ্যের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে তাদের মজুদ থেকে বাড়তি দাম কার্যকর করে। কিন্তু তা এক মাস পরে কার্যকর করা যেত। ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগ সবসময় নেই। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে এক বস্তা (৫০ বস্তা) চালের দামে পার্থক্য হয়ে যায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে চালের দামের অস্থিরতার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মাহবুবুর রহমান সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে চালের বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসার পর দাম অস্থিতিশীল হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার পর মাঝারি মানের মিলাররা তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। বড় কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ড ইমেজ কাজে লাগিয়ে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। আগে চালের দাম প্রতি বস্তায় বাড়তো ১০ থেকে ২০ পয়সা, এখন বাড়ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এটা হচ্ছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যের কারণে। এ ছাড়া দামের অস্থিরতার পেছেনে ধান মজুদদারদেরও দায় আছে। তারা সুযোগ সন্ধানে থাকে। তারা জানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে দামেই হোক ধান ক্রয় করবে।
মজুদ কমছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এক চিঠি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, জরুরিভিত্তিতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। অর্থবছরের বাকি সময়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এ বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা কঠিন হতে পারে। তাই উন্মুক্ত দরপত্রের পাশাপাশি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি) সম্প্রতি চালের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়, থাইল্যান্ডের তুলনায় ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম। মুনাফাসহ সব খরচ যোগ করার পর ভারতীয় চালের দাম পড়ে কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। আর থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়ে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি।
সরকারি হিসাবে, নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ১১ লাখ টন চালের কথা বলা হয়ে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বাড়তি ৭ লাখ ৫০ হাজার টনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ লাগবে।
ধান ও চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
মজুদ বাড়াতে সরকার বাজার থেকে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা ও ধান ৩৩ টাকা দরে কিনবে। এ ছাড়া ৪৬ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কিনবে সরকার। গত বুধবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠকের পর উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, চাল ও গমের যতটুকু মজুদ আছে ও যতটুকু আমদানি দরকার, তারচেয়ে কিছুটা বেশি আমদানি ও সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা ধান ও চাল সংগ্রহের দাম ঠিক করে দিয়েছি। সেটা যেন ভোক্তা ও কৃষকদের জন্য যৌক্তিক হয়। আমরা একটা দাম ঠিক করব আর বাজারে এর থেকে বেশি ব্যবধানে বিক্রি হবে- এমন যেন না হয়। এমনটা হলে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানোরও তাগিদ দেন অর্থ উপদেষ্টা। সরকার আসন্ন আমন মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, সাড়ে ৫ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও ১ লাখ টন আতপ চাল কিনবে। সেদ্ধ চাল ও ধান কেনা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৭ নভেম্বর থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত।
এদিকে বুধবার সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ভারত থেকে ৫০ হাজার টন বাসমতি সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৬৭ কোটি টাকা।
বিশ্ববাজার পরিস্থিতি
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছর আগের তুলনায় এখন চালের দাম ১১ শতাংশ কম। বিগত এক মাসে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তারপরও আমদানি করতে গেলে খরচ অনেক পড়বে। কমিশন বলছে, থাইল্যান্ডের চালের দাম পড়বে ৬৬ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে দেশে দাম পড়বে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। ভারত থেকে আমদানি করতে গেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৫৪ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করে দাম পড়বে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চাল খুবই সংবেদনশীল পণ্য। সরকার চাইলেও অনেক সময় হুট করে আমদানি সম্ভব হয় না। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও কারসাজি ঠেকাতে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এখন দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ব্যাপকভাবে চাল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এ জন্য টাকার প্রয়োজন হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হবে।
চালসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আরও বলেন, আগামী বোরো মৌসুমে যাতে ধান আবাদ বেশি হয়, সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মুদি দোকানসহ মোট ১৬টি নতুন ব্যবসায়ী খাতকে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে সরকার। বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এই নতুন রাজস্ব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি ভ্যাট বাবদ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। রাজস্ব আয়ের এই গতিধারা অব্যাহত রাখতে এবং পরিধি বাড়াতে নতুন নতুন উৎস ও প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত এই তালিকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগে সরাসরি সুনির্দিষ্ট করের কাঠামোর বাইরে ছিল।
ভ্যাটের আওতায় আসতে যাওয়া এই ১৬টি খাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— মুদির দোকান, তৈরি পোশাক ও কাপড়ের দোকান, কনফেকশনারি, কসমেটিক্সের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র এবং জুতার দোকান। তালিকায় আরও রয়েছে হার্ডওয়্যার, ডেকোরেটরস, এবং মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ ও ওভেনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান। এছাড়া পেইন্ট, স্যানিটারি ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্টের দোকানগুলোকেও এই করের অধীনে আনা হচ্ছে। ফার্নিচার শোরুম, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং রেস্টুরেন্টগুলোকেও সুনির্দিষ্ট ভ্যাট প্রদানের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ব্যয় নির্বাহের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো অপরিহার্য। ব্যবসায়িক এই খাতগুলোকে সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের কাঠামোর আওতায় আনা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়িক লেনদেনে আরও স্বচ্ছতা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য ব্যবহৃত মেমোরি চিপ বিক্রিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে দক্ষিণ কোরিয়ার টেক জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। বাজারে আসার মাত্র চার মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির ষষ্ঠ প্রজন্মের ‘হাই ব্যান্ডউইডথ মেমোরি’ (এইচবিএম৪) চিপের বিক্রি ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্যামসাং বাণিজ্যিকভাবে এই অত্যাধুনিক এইচবিএম৪ চিপের উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু করে। বাজার বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী জুনের শেষ নাগাদ কেবল এই চিপ থেকেই স্যামসাংয়ের মোট আয় ১২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। মূলত এআই সিস্টেমের জটিল কম্পিউটিং কাজ দ্রুততর করতে এবং বিশাল পরিমাণ ডেটা প্রসেসিংয়ের গতি বাড়াতে এই এইচবিএম চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যামসাংয়ের এই বিশেষ চিপগুলো মূলত পরবর্তী প্রজন্মের এআই এক্সিলারেটরের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার আসন্ন ‘ভেরা রুবিন’ প্ল্যাটফর্মটি অন্যতম।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে পঞ্চম প্রজন্মের এইচবিএম৩ই চিপের আধিপত্য থাকলেও, আধুনিক এআই অ্যাপ্লিকেশনের চাহিদার কারণে এইচবিএম৪ চিপই আগামী দিনে ব্যবসার প্রধান উৎস হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। স্যামসাং কর্তৃপক্ষ বছরের দ্বিতীয় ভাগে (জুলাই-ডিসেম্বর) এই চিপের উৎপাদন ও সরবরাহ আরও ব্যাপক আকারে বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাজারে আসার প্রথম বছর শেষ হওয়ার আগেই এই নতুন চিপ থেকে স্যামসাংয়ের বার্ষিক আয় ১ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
শিল্প খাতের সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী এইচবিএম চিপের বাজার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে এই খাতের মোট বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৫ হাজার ৪৬০ কোটি মার্কিন ডলারে। এআই প্রযুক্তির এই ক্রমবর্ধমান জয়যাত্রা স্যামসাংয়ের জন্য নতুন এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছে।
স্বর্ণ ও রুপার দাম পুনরায় নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্বর্ণালংকারের দাম প্রতি ভরিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৮২ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাজুস সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে। বুধবার সকালে বাজুসের ‘প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং’ স্থায়ী কমিটির এক জরুরি বৈঠকে এই দর কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণালংকারের বর্তমান দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও কমানো হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, ২১ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি স্বর্ণালংকার ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪২ টাকা, ১৮ ক্যারেট মানের স্বর্ণ ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণালংকার ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৩২ টাকায় বিক্রি হবে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস।
স্বর্ণের ধারাবাহিকতায় কমানো হয়েছে রুপার দামও। নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৮৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি রুপা ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট মানের ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ২ হাজার ৯৭৪ টাকায় নেমে এসেছে। স্বর্ণ ও রুপার বাজারে এই আকস্মিক দরপতন সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলার লড়াইয়ে এক নতুন গতি এনেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড সরাসরি অপসারণের আধুনিক প্রযুক্তিতে আরও ৯১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে গুগল, অ্যানথ্রোপিক, সেলসফোর্স এবং স্ট্রাইপ-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রন্টিয়ার’। এর আগে এই খাতের উন্নয়নে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানো বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং বায়ুমণ্ডলে জমা থাকা কার্বন সরাসরি শুষে নেওয়া এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ‘ফ্রন্টিয়ার’ একটি বিশেষ অগ্রিম ক্রয় প্রতিশ্রুতি বা ‘অ্যাডভান্সড মার্কেট কমিটমেন্ট’ মডেলের মাধ্যমে নতুন কার্বন অপসারণ স্টার্টআপগুলোকে আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভরসায় ‘ডিরেক্ট এয়ার ক্যাপচার’ এবং খনিজ শিলার মাধ্যমে কার্বন শোষণের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিকাশে কাজ করতে পারছেন। লক্ষ্য হলো সংগৃহীত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাটির গভীরে বা নিরাপদ স্থানে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা।
ভারী শিল্প, বিমান ও জাহাজ চলাচলের মতো কিছু খাতে কার্বন নিঃসরণ পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই অবশিষ্ট নিঃসরণ সামাল দিতে কার্বন অপসারণ প্রযুক্তিই হবে ভবিষ্যতের কার্যকর সমাধান। যদিও এই প্রযুক্তির ব্যয় এখনও অনেক বেশি, তবে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলোও ইতোমধ্যে এই খাতের অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
বর্তমান বিশ্ববাজারে কার্বন অপসারণের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার মূল্যের কার্বন ক্রেডিট বিক্রি হয়েছে। তবে এই খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আরও ব্যাপক বিনিয়োগ এবং সরকারি নীতিসহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবর্তিত জলবায়ু নীতিমালা এই বাজারকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিপুল বিনিয়োগ মূলত ২০৩৫ সালের ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ‘এসইএমএল লেকচার ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ড’ মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) থেকে বে-মেয়াদি (ওপেন-এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) থেকে ফান্ডটি নতুন এই ফরম্যাটে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন এই পরিবর্তনের ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঘোষিত নির্ধারিত মূল্যের ভিত্তিতে ফান্ডের ইউনিট ক্রয় ও বিক্রয় করতে পারবেন। ফান্ডটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ইউনিটের মূল্য নির্ধারণ এবং লেনদেন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হবে। এই লেনদেন প্রক্রিয়া ফান্ডের প্রস্পেক্টাস এবং প্রচলিত আইন ও বিধিমালা মেনেই পরিচালিত হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্লোজড-এন্ড থেকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরিত হওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি লাভজনক ও নমনীয় সুযোগ তৈরি করবে। এখন থেকে যেকোনো কার্যদিবসে ইউনিট কেনা-বেচার সুবিধা থাকায় বিনিয়োগের তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের পোর্টফোলিও পরিচালনা করতে পারবেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত আয়কে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ দিতে ‘অনাবাসী বিনিময়যোগ্য টাকা হিসাব’ নামে একটি নতুন ব্যাংকিং সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের আয়ের সঙ্গে দেশের বিনিয়োগের সরাসরি সংযোগ ঘটানো এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
নতুন এই নীতিমালার আওতায়, ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে প্রবাসীরা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বিশেষ এই হিসাব খুলতে পারবেন। প্রবাসীরা চাইলে সঞ্চয়ী (সেভিংস), চলতি (কারেন্ট) বা স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট)—যেকোনো ধরনের হিসাব পরিচালনার সুবিধা পাবেন। এই হিসাবে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের পাশাপাশি অনুমোদিত বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফা, সুদ এবং শেয়ার সংক্রান্ত লেনদেনের অর্থ জমা রাখা যাবে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই হিসাবে জমা রাখা মূল অর্থ এবং এর ওপর অর্জিত মুনাফা যেকোনো সময় প্রবাসীরা চাইলে সম্পূর্ণভাবে বিদেশে নিয়ে যেতে (প্রত্যাবাসনযোগ্য) পারবেন।
নতুন এই হিসাবের অর্থ দেশের ভেতরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীরা এই অর্থ দিয়ে স্থানীয় খরচ মেটাতে পারবেন, অন্য অনাবাসী হিসাবে স্থানান্তর করতে পারবেন কিংবা সরাসরি বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারবেন। এছাড়া বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও বিনিয়োগেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলো এই হিসাবের অর্থ ব্যবহার করে বিশেষায়িত অঞ্চলের টাইপ-এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেতন, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য টাকায় ঋণ দিতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, এই ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় থেকে পরিশোধ করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, এই হিসাবে জমা থাকা অর্থ জামানত হিসেবে রেখে প্রবাসী বাংলাদেশি বা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারবেন। এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য আবাসিক সম্পত্তিও কেনা যাবে। তবে কৃষি, প্ল্যান্টেশন বা বাণিজ্যিক আবাসন খাতে এই ঋণের অর্থ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন ব্যবস্থা প্রবাসী আয়ের আর্থিক মধ্যস্থতাকে আরও নিবিড় করবে এবং প্রবাসীদের জন্য দেশের বিনিয়োগ বাজারে অংশগ্রহণ করা অনেক সহজ হবে।
কাঁচামালের তীব্র সংকটে ভুগছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত খুলনার চিংড়ি শিল্প। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। হুমকির মুখে পড়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান। তবে এই সংকট কাটাতে আশার আলো দেখাচ্ছে ক্লাস্টার পদ্ধতি বা উচ্চ উৎপাদনশীল পোনা চাষ।
খুলনার চিংড়ি শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছেন দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যজীবীরা। মৎস্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ক্লাস্টার পদ্ধতি, অর্থাৎ একই এলাকার একটি বড় অংশের মৎস্যজীবীদের একসঙ্গে কিছু নিয়ম মেনে চাষ করা পদ্ধতিতে চিংড়ির উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ।
চিংড়ি চাষিরা বলেন, গভীরতা কম থাকার কারণে আমরা শতকে ১০০-র উপরে পোনা দিতে পারতাম না, ৮০ থেকে ১০০। আর এখন আমরা শতকে কমপক্ষে ২০০ পোনা দিতে পারি। প্রথম বছরেই দুই থেকে তিন ডবল হয়ে গেছে। এখন দুই থেকে তিন কেজি, তো সেখানে পাঁচ থেকে ছয় কেজি, কারো কারো সাত-আট কেজি উৎপাদন হচ্ছে।
জেলা মৎস্য অফিস বলছে, পরীক্ষামূলক ক্লাস্টার পদ্ধতি সফল হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে রপ্তানি বেড়ে সুদিন ফিরবে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, আমরা চাচ্ছি এটা অন্য চাষীদের ভিতরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। সেটা অ্যাওয়ারনেসের মাধ্যমেও হচ্ছে এবং আমরা অন্য জায়গার চাষিদেরকেও কিন্তু এই ক্লাস্টার ফার্মে যেখানে তিন থেকে চার গুণ বেশি উৎপাদন হয়েছে খামারগুলো কিন্তু আমরা চাষিদেরকে ভিজিট করাচ্ছি এবং তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করছি।
এদিকে উৎপাদন বাড়াতে নতুন এই পদ্ধতির পাশাপাশি উচ্চ উৎপাদনশীল ভেনামি চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন রপ্তানিকারকরা।
ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. তরিকুল ইসলাম জহির বলেন, স্বল্প জায়গায় কম খরচ এবং ঝুঁকি কম, এই ধরনের চিংড়ি চাষ হচ্ছে পৃথিবীতে। এখন ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে ভেনামি। সেখানে আমাদের এখানে গভর্নমেন্টের যারা পলিসিতে আছে এবং এর পেছনে বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন অন্য দেশের কেউ কাজ করছে কিনা আমরা জানি না; তারা কোনোমতেই এই ভেনামি চিংড়িকে উৎসাহিত করছে না।
সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারি সহায়তা জোরদার করা গেলে খুলনার চিংড়ি শিল্প আবারো হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে আশা ব্যবসায়ীদের।
দেশের অর্থনীতিতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনা, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সুফল প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR) ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় সহায়তা কামনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সোমবার (২২ জুন) বিকেলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার সম্প্রসারণে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির প্রথম বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে গভর্নর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি, চার্জ এবং অন্যান্য নিয়মিত পাওনা বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তিনি মনে করেন, দেশে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটাতে এবং বাংলা কিউআরকে সর্বজনীন ও জনপ্রিয় করতে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গভর্নর তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, “বাংলা কিউআরের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে। লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হবে।” তিনি মনে করেন, এটি কেবল গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাবে না, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে, ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বাংলা কিউআরের এই মহতী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এর সফল বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার পূর্ণ আশ্বাস প্রদান করেন। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন যে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বাংলা কিউআরকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও জনপ্রিয় করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনে এক নতুন বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হবে।
ইউক্রেনের ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার বাজারে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তারে মনোযোগ দিচ্ছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে এশিয়া অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের সামরিক বাজেট বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতারা এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর কাছে ড্রোন বিক্রির পাশাপাশি যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের অন্যতম শীর্ষ ড্রোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ইউফোর্স’-এর প্রধান নির্বাহী ওলেগ রোগিনস্কি গত এপ্রিলে টোকিও সফর করেন। সফরকালে তিনি জাপানি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন এবং জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিপুল সংখ্যক ড্রোন তৈরির প্রস্তাব দেন। জাপানের পাশাপাশি বর্তমানে আকাশ ও সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় এই আধুনিক প্রযুক্তির গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। ইউফোর্স ছাড়াও ইউক্রেনের আরও বেশ কিছু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান যেমন স্কাইটন, জেনারেল চেরি এবং সোয়ার্মার বর্তমানে জাপানে ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপান সম্প্রতি তাদের অস্ত্র রপ্তানির দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সেখানে যৌথ উৎপাদনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তিতে যে অসাধারণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইউফোর্সের তৈরি ‘মাগুরা’ নামক সামুদ্রিক ড্রোন কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবাহিনীর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ওলেগ রোগিনস্কি বিশ্বাস করেন যে, পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক পরিবেশ ভিন্ন হলেও ড্রোনের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা অপরিবর্তিত থাকবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কিও জাপানের সাথে এই উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়ের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুঁজিবাজারে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় পর দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির তকমা হারিয়েছে টেক জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। স্যামসাংকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উত্থানই কোম্পানিটির এই ব্যবসায়িক সাফল্যের মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
বর্তমানে এসকে হাইনিক্স এআই সিস্টেমে ব্যবহৃত বিশেষায়িত ‘হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ (এইচবিএম) চিপের প্রধান বৈশ্বিক সরবরাহকারী। এনভিডিয়া ও গুগলের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রধান গ্রাহক। গত কয়েকদিনে এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানির মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মেমোরি চিপ নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, স্যামসাংয়ের শেয়ারদর সামান্য হ্রাস পাওয়ায় তারা শীর্ষস্থান হারায়। ২০০০ সালের পর এই প্রথম স্যামসাং ঘরোয়া বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে এলো। তবে স্যামসাং দাবি করেছে যে, তাদের অগ্রাধিকারমূলক শেয়ারগুলো হিসেবে আনলে তারা এখনও এগিয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির বিপ্লব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বর্তমানে চ্যাটজিপিটির মতো উন্নত এআই মডেল পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত মেমোরি চিপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যার সদ্ব্যবহার করেছে এসকে হাইনিক্স। ২০০২ সালের দিকে প্রায় দেউলিয়া হতে বসা একটি কোম্পানির জন্য এই অর্জনকে করপোরেট ইতিহাসের অন্যতম বড় সফলতার গল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় তীব্র ঋণের দায়ে আমেরিকান কোম্পানি মাইক্রনের কাছে বিক্রি হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশ্ব বাজারে রাজত্ব করছে।
২০২৩ সালেও চিপের বাজারে মন্দার কারণে বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিল এসকে হাইনিক্স। তবে ২০২৪ সাল থেকে মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করায় চিপের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ফলে লোকসান কাটিয়ে কোম্পানিটি বিপুল মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। চলতি বছর এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর ৩৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের শীর্ষস্থানে আরোহণের পথ প্রশস্ত করেছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দীর্ঘমেয়াদী মূল্যের পূর্বাভাস হ্রাস করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস। ২০২৭ সালের জন্য অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলে ৮০ ডলার নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কম। বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়াকেই এই দর হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওপেক জোটের বাইরে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, গায়ানা, ভেনিজুয়েলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে তেল উত্তোলনের হার আশাতীতভাবে বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও সে তুলনায় বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে না। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষ তেল আমদানিকারক দেশ চীনে জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) দ্রুত প্রসার তেলের চাহিদাকে চিরতরে সংকুচিত করে দিচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্ববাজারে দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে করছে ব্যাংকটি।
তবে দীর্ঘমেয়াদী দাম কমালেও চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারের আগের পূর্বাভাসই বজায় রেখেছে সংস্থাটি। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও গোল্ডম্যান স্যাকস মনে করছে, আগস্টের শেষের দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে বলেছে যে, যদি মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে ২০২৭ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। আবার সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হলে এই দাম ৬০ ডলারে নেমে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য গোল্ডম্যান স্যাকসের এই নতুন পূর্বাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে এবং আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হবে। তবে যেকোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিদেশি দূতাবাসগুলোর অনুমোদিত স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে সংগৃহীত ভিসা ও কনস্যুলার ফি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সকল অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংককে এই নির্দেশনা প্রদান করেছে। এর ফলে ভিসা সংক্রান্ত অর্থ লেনদেন প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল, দ্রুত এবং স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় ভিসা প্রসেসিং এজেন্টরা বাংলাদেশি মুদ্রায় সংগৃহীত ফি সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, তাদের বিদেশের কার্যালয় অথবা নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবের অনুকূলে সরাসরি বিদেশে পাঠাতে পারবে। এতদিন এই ধরনের অর্থ প্রেরণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যাংক এবং এজেন্টদের বিভিন্ন আইনি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার সম্মুখীন হতে হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হলো।
তবে এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভিসা ফি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দূতাবাস কর্তৃক নির্ধারিত হারে সংগ্রহ করতে হবে। অর্থ প্রেরণের আগে দূতাবাস বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইস্যু করা ইনভয়েস সংগ্রহ করতে হবে, যেখানে প্রতিটি আবেদনকারীর ফি আদায়ের বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হবে। এছাড়া, বিদেশে অর্থ প্রেরণের আগে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য সকল প্রকার কর (ট্যাক্স) যথাযথভাবে কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভিসা ফি সংগ্রহ ও প্রেরণ প্রক্রিয়ায় যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমনি ব্যাংকগুলোর কাজের গতিও বৃদ্ধি পাবে। যদিও সাধারণ ভিসা আবেদনকারীদের জন্য ফি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও ঝামেলামুক্ত হওয়ার ফলে সেবার মান উন্নত হতে পারে।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান সরকার। ইয়েনের এই ধারাবাহিক দরপতন রুখতে এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন হলে যেকোনো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা। বার্তাসংস্থা এএফপি-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইয়েনের মান কমলেও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যকার সুদের হারের বিশাল ব্যবধান মুদ্রাটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর কাটায়ামা গণমাধ্যমকে জানান, “প্রয়োজন হলে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্পষ্ট সমঝোতা রয়েছে, যা উভয় দেশের সরকারই নিশ্চিত করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইয়েনকে শক্তিশালী করতে জাপান আবারও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে। উল্লেখ্য যে, গত মাসেই এই উদ্দেশ্যে দেশটি ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। সোমবারের আলোচনার খবর প্রকাশের পর ইয়েন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও এটি প্রতি ডলারে ১৬১.৯৩ ইয়েনে নেমে গিয়েছিল, যা ১৯৯৬ সালের পর রেকর্ড সর্বনিম্ন দরের কাছাকাছি। মঙ্গলবার টোকিওতে লেনদেনের সময় ডলার প্রতি ইয়েনের দাম ১৬১.৬০-এ অবস্থান করছিল।
জাপানি ইয়েনের এই দুর্বল অবস্থার ফলে দেশটি এক দ্বিমুখী পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। একদিকে আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় তেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, দুর্বল ইয়েনের কারণে বিদেশি পর্যটকদের কাছে কেনাকাটা ও ভ্রমণ সস্তা হওয়ায় জাপানের পর্যটন খাতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকার ইয়েনকে শক্তিশালী করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।