দিন যত যাচ্ছে দেশের শেয়ারবাজারে দরপতনের মাত্রা ততো বাড়ছে। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে লেনদেন খরা। লেনদেনের গতি ধারাবাকিভাবে কমে প্রায় দেড় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। টানা পতন হচ্ছে মূল্যসূচকেরও। ফলে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারীই হচ্ছে। গত কয়েকটি কার্যদিবসের মতো চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববারও (২৪ নভেম্বর) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। কমেছে সবকটি মূল্যসূচকও। বাজারটিতে গত ২৭ কার্যদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দাম কমার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। ফলে এ বাজারটিতেও সবকটি মূল্যসূচক কমেছে। এর মাধ্যমে টানা ছয় কার্যদিবসেই উভয় শেয়ারবাজারে দাম কমার তালিকায় নামে লিখিয়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। এর আগে গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের প্রতিটিতেই লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমে। এতে সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। আর প্রধান মূল্যসূচক কমে ১৫৭ পয়েন্ট।
এ পরিস্থিতিতে রোববার শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতেই ডিএসইর প্রধান সূচক ৩০ পয়েন্ট কমে যায়। শুরুর এই পতনের ধারা লেনদেনের পুরো সময়জুড়েই অব্যাহত থাকে। এমনকি শেষ দিকে পতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এতে দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে ১১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের স্থান হয়েছে দাম বাড়ার তালিকায়। বিপরীতে দাম কমেছে ২২৮টির আর ৫৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৫১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১৪৬ পয়েন্টে নেমে গেছে।
অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় ২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৪৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৯ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৯৯ পয়েন্টে নেমে গেছে। সবকটি মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৩০২ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩৬৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে লেনদেন কমেছে ৬১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে গত ১৬ অক্টোবরের পর ডিএসইতে সবচেয়ে কম লেনদেন হলো। এই লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এনআরবি ব্যাংকের শেয়ার। টাকার অঙ্কে কোম্পানিটির ১৪ কোটি ৯৯ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা লাভেলো আইসক্রিমের ১২ কোটি ২১ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ৯ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফাইন ফুডস।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- জেনেক্স ইনফোসিস, বিচ হ্যাচারি, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, অগ্নি সিস্টেম এবং সোনালি আঁশ। অপর শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৬৫ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৬টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৩৩টির এবং ৩১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বাড়ছে। মঙ্গলবার তেলের মূল্য প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা ২০২০ সালের মে মাসের পর এক দিনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় ১২টা ৫১ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য।
মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে সমঝোতা স্মারকটিকে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে পুনরায় যুদ্ধ ও অবরোধের পথে হাঁটায় বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোমবার ওমানের আঞ্চলিক জলসীমায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। ওই হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং প্রণালিতে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছ থেকে ব্যয় আদায়ের ইঙ্গিত দেন।
বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানের বন্দর আব্বাস এবং কিশ দ্বীপে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে দাবি করেছে স্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো।
সংকট কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, হুতিরা যদি লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকারে আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। গ্যাবেলি ফান্ডসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সাইমন ওয়ং মনে করেন, এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত জুন মাসে প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বিশেষ করে শস্যজাতীয় খাদ্যের মূল্যে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের ফলে বৈশ্বিক খাদ্য বাজারে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সংস্থাটির মতে, মে মাসের সংশোধিত সূচকের চেয়ে জুনে এফএওর খাদ্য মূল্যসূচক গড়ে ১৩০ দশমিক ৩ পয়েন্টে নেমেছে, যা দশমিক ৪ শতাংশ কম। খবর ওয়ার্ল্ড-গ্রেইন ডটকম।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত মাসে সামগ্রিক খাদ্যমূল্য হ্রাসের পেছনে প্রধান কারণ ছিল শস্যের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়া। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের দেশগুলোতে দ্রুত ফসল কাটার সম্ভাবনা ও উন্নত সরবরাহের ফলে বিশ্ববাজারে গমের দাম ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কাকে অনেকাংশে প্রশমিত করেছে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারক দেশগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত এবং জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রভাবে ভুট্টার দাম এক লাফে ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বার্লি ও যবের দামেও যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪ এবং ৮ শতাংশ পতন লক্ষ্য করা গেছে।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, মাংস ও উদ্ভিজ্জ তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও শস্যের ব্যাপক দরপতনের কারণে সামগ্রিক মূল্যসূচক শেষ পর্যন্ত নিম্নমুখী ছিল। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, জুনে উদ্ভিজ্জ তেলের মূল্যসূচক মে মাসের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৯২৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মূলত অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় প্রতিকূল আবহাওয়ায় সরিষার তেল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং জৈব জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে পাম অয়েল ও সরিষার তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে দক্ষিণ আমেরিকায় সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে, অন্যান্য শস্যের দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দর ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এশিয়ায় ভারতের চালের ব্যাপক চাহিদা এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় জুনে এফএও চালের মূল্যসূচক ৩ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান সামগ্রিক সূচকটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি হলেও ২০২২ সালের মার্চের ঐতিহাসিক রেকর্ড সর্বোচ্চের চেয়ে এখনো ১৯ শতাংশ কম রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও রাশিয়ার প্রধান জ্বালানি প্রকল্প ইয়ামাল এলএনজি থেকে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার ঠিক কয়েক মাস আগে সাইবেরিয়ার এই বিশাল প্রকল্পের প্রায় পুরো উৎপাদনই ইউরোপীয় দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের দেওয়া তথ্যমতে, বছরের প্রথমার্ধে ইয়ামাল এলএনজি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রায় ৯৮ লাখ ৯০ হাজার টন গ্যাস সংগ্রহ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসেও রাশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাত সচল রাখতে ইউরোপের অর্থ ও বাজারের বড় ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি সংস্থা উরগেভাল্ডের একটি হিসাব অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ এলএনজি কেনার বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়াকে প্রায় ৬০০ কোটি ইউরো পরিশোধ করেছে।
গ্যাস আমদানির দেশভিত্তিক তালিকায় দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ফ্রান্স সর্বোচ্চ ৩৬ লাখ টন গ্যাস আমদানি করেছে। এর পরেই রয়েছে বেলজিয়াম (২৯ লাখ টন) এবং স্পেন (২৭ লাখ টন)। উরগেভাল্ডের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক প্রচারক সেবাস্টিয়ান রোটার্স এই পরিসংখ্যানকে 'উদ্বেগজনক' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় রাশিয়ার হামলা তীব্র হওয়ার পরও ইউরোপের এই আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে ইইউর বিধিমালা অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে রাশিয়ার এলএনজি কেনা নিষিদ্ধ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। ইয়ামাল এলএনজি থেকে আসা প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে দেশগুলোকে নিশ্চিত করতে হয় যে, তা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ। তবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাশিয়ার এলএনজি আমদানির ওপর ইউরোপের পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে, যার ফলে রাশিয়াকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে।
প্রকল্পটির সফলতার পেছনে বিশেষ ধরনের 'আর্ক৭ আইস-ক্লাস' ট্যাংকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। এই বিশেষায়িত জাহাজগুলো দ্রুত ইউরোপীয় বন্দরে যাতায়াত করতে পারে, যা রাশিয়ার রপ্তানি কার্যক্রমকে সহজতর করেছে। এর বিপরীতে এশিয়ায় পৌঁছাতে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয় বলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ওই অঞ্চলে ইয়ামালের রপ্তানি প্রায় ৭৪ শতাংশ কমে মাত্র ৫ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে। এমনকি এই আইস-ক্লাস জাহাজগুলো মেরামতের জন্য এখনো ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মতো ইউরোপীয় শিপইয়ার্ডের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
উরগেভাল্ডের সেবাস্টিয়ান রোটার্স মনে করেন, 'ইয়ামাল এলএনজি একটি ছোট বিশেষায়িত জাহাজ বহর, ইউরোপীয় বন্দর ও ইউরোপীয় সেবার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালায়। ইউরোপ এখনো এই তিনটি সুবিধাই দিয়ে যাচ্ছে।' ২০১৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইয়ামাল এলএনজি প্রকল্পের যাত্রা শুরু করেন, যা বর্তমানে রাশিয়ার বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। নোভাটেকের প্রধান মালিকানাধীন এই প্রকল্পে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস এবং চীনের সিএনপিসি অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে টোটালএনার্জিসের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক পুয়ানে গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, ইইউর নিষেধাজ্ঞার বিধানে কিছু 'অস্পষ্টতা' থাকায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু ইউরোপে নয়, প্রয়োজনে ইয়ামাল প্রকল্প থেকেই গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। এতে করে বাজারটির প্রধান মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই ইতিবাচক ধারার পেছনে মূলত ব্যাংক ও বিমা খাতের কোম্পানিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই), যেখানে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠান। তবে সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও ডিএসইতে তা আগের কার্যদিবসের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেনের শুরু থেকেই ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দিনের সমাপ্তিতে ১৮১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৬৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৮টির দর। খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৬টি ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে এবং ৪টির দাম কমেছে। বিমা খাতে ৩৫টি কোম্পানির দরবৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ২২টির। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৬৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এছাড়া বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডিএসইতে এদিন ১ হাজার ৪১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২৫০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা কম। লেনদেনের শীর্ষে ছিল মালেক স্পিনিং, যার ৫৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক এবং ২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইস্টার্ন হাউজিং। শীর্ষ দশের অন্য তালিকায় ছিল লাভেলো আইসক্রিম, সার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ফারইস্ট নিটিং ও লাফার্জহোলসিমের মতো প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপের শেয়ারে মিশ্র প্রবণতা ছিল। ‘জেড’ গ্রুপ বা লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৬৪টির দাম বেড়েছে এবং ৩৩টির দাম কমেছে। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো মানের ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, যদিও ১০১টির দাম কমেছে। সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১১৮ পয়েন্ট বেড়েছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২২টির দাম বেড়েছে এবং ৯১টির দাম কমেছে। সিএসইতে এদিন লেনদেন হয়েছে ৩০ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগের দিনের ১০ কোটি ১১ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের টানা ভারী বর্ষণ ও এর ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কেবল জনদুর্ভোগের কারণ নয়, বরং দেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট এই কৃত্রিম বন্যা এখন শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা
দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় বন্দরনগরী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে বর্হিনোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহনও ধীর হয়ে পড়েছে। সড়ক ও মহাসড়ক তলিয়ে যাওয়ায় রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক সময়মতো বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না, যার ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত শিপমেন্ট মিস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও বৃষ্টির পানি ঢুকে বিভিন্ন শেডে রাখা কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য ও শিল্প কাঁচামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপদ সংরক্ষণাগার না থাকায় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ায় প্রায় প্রতি বছরই এই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
শিল্প ও ব্যবসা খাতে সংকট
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত জলাবদ্ধতার কারণে চরম সংকটে পড়েছে। কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব এবং বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বাড়তি পরিবহন ব্যয়, গুদাম খরচ ও ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। অনেক শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকরা জলাবদ্ধতার কারণে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এর বাইরে শিল্প কারখানার পরিবেশগত মান রক্ষায় যে বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আসাদগঞ্জে জলাবদ্ধতা গত এক দশকে হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি করেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতেও এসব এলাকার আড়তে পানি ঢুকে বিপুল পরিমাণ চাল, ডাল, চিনি ও মসলাসহ ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়েছে। বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজধানীর ভাসমান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্রেতা উপস্থিতি কমে যাওয়ায় এবং অনেক দোকান বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজি নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকাকে সংকটে ফেলছে।
বাজারমূল্য ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি
টানা বৃষ্টির প্রভাবে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। পণ্যবাহী ট্রাক পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় এবং অনেক ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবজি ও মাছের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুদিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পটল, বেগুন, করলাসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে মাছ ও ব্রয়লার মুরগির দামও ঊর্ধ্বমুখী, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর নিউমার্কেটের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক লেনদেনও স্থবির হয়ে পড়েছে।
কৃষি, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি
শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও জলাবদ্ধতা বড় আঘাত হেনেছে। শাকসবজি ও ফসলের খেত তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় কৃষকরা নিঃস্ব হচ্ছেন। অন্যদিকে, জলাবদ্ধতার ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অবকাঠামোগত দিক থেকে সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় সংস্কার কাজে সরকারের বিপুল পরিমাণ বাজেট ব্যয় হচ্ছে, যা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান। এর মধ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলাবদ্ধতা নতুন করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলো কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমন্বিত ও আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার না হলে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতি বছরই জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে শহরের প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল দখল। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিক না হলেও পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তারা মনে করেন, যান্ত্রিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার চেয়ে প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অন্যথায় প্রতি বছর বৃষ্টির কারণে জাতীয় অর্থনীতির যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থমকে দিতে পারে। এখন কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলাই সময়ের প্রধান দাবি।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির শেয়ারের দাম ও লেনদেনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় কোম্পানি দুটির লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই-সিএসই) কর্তৃপক্ষ এই স্থগিতাদেশ প্রদান করে।
সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়িক কোনো অগ্রগতি বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের (পিএসআই) ঘোষণা ছাড়াই সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাজার পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় সোমবার সকালে দিনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য কোম্পানি দুটির শেয়ার কেনাবেচা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাজারের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক মাসে উভয় কোম্পানির শেয়ারের দাম দ্রুতগতিতে বেড়েছে। গত ১৪ জুন ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১৪৬ দশমিক ৩০ টাকা, যা ৯ জুলাই বৃদ্ধি পেয়ে ১৭০ দশমিক ৬০ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ কয়েক কার্যদিবসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারের দর বৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি। গত ২২ জুন এই শেয়ারের দাম ছিল ৩৭ দশমিক ৩০ টাকা, যা ৯ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ দশমিক ২০ টাকায়। মাত্র কয়েক দিনে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৩২ দশমিক ৯০ টাকা বা ৮৮ দশমিক ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ হিসেবে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর আগে ডিএসই ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স ও উসমানিয়া গ্লাসের কাছে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে চিঠি পাঠালেও কোম্পানি দুটির পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। জবাবে তারা জানিয়েছে যে, "বর্তমানে তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত তথ্য নেই যা শেয়ারের দাম বা লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পারে।"
ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই শেয়ারের দাম ও লেনদেনের এই ব্যাপক উত্থানের পেছনে কোনো বিশেষ চক্রের কারসাজি বা গোপন তথ্য পাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা বর্তমানে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তের অংশ হিসেবে কোম্পানি দুটির কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অতিরিক্ত তথ্য তলব করা হয়েছে।
দেশের নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে, যেখানে সুদের হার হবে অনধিক ৭ শতাংশ। এর পাশাপাশি স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের বিকাশে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (প্রথম বাজেট) অধিবেশনের ২৩তম দিনে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান যে, তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িকভাবে উৎসাহিত করতে কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র (সিএমএসএমই) খাতের নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই বিশেষ তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং প্রয়োজনীয় জামানত প্রদান সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণের সুবিধা পাবেন।
স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি আরও সহজ করার লক্ষে অর্থমন্ত্রী জানান যে, ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পৃথক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের পাশাপাশি স্টার্টআপগুলোতে ইক্যুইটি বা সরাসরি মূলধনী বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্তাবধানে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশগ্রহণে ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, পিএলসি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো সরাসরি মূলধনী সহায়তা লাভ করতে পারবে।
দেশের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকারদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল পরিচালিত হচ্ছিল, যা ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার আরও একটি বৃহৎ তহবিল গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম কমানোর বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভ্যাটসহ প্রতি ভরি স্বর্ণালঙ্কারের দাম সর্বোচ্চ দুই হাজার ২১৬ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টা থেকেই এই নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানিয়েছে, আজ সকাল ৯টায় বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এই নতুন দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বর্ণের মূল্য হ্রাসের পাশাপাশি রুপার দামও কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সংশোধিত মূল্য তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাটসহ সবচেয়ে উন্নত মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণালঙ্কারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। গতকাল পর্যন্ত এই মানের স্বর্ণের বাজারমূল্য ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা। এখন থেকে ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকায় কেনা যাবে।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। নতুন দরে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা। এ ছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৮৫৮ টাকা।
সপ্তাহের শুরুতেই বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। সোমবার সকালে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারসূচক নিম্নমুখী হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা মুদ্রা ও বন্ড বাজারেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগের আশায় ডলারের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে মার্কিন মুদ্রার মান এবং সরকারি বন্ডের সুদহার উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেবেন, যার দিকে এখন পুরো বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা তাকিয়ে আছেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের কথা রয়েছে। যদিও জ্বালানির দাম আগের কয়েক সপ্তাহে কিছুটা কম ছিল, তবে বর্তমান উত্তেজনায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড তেলের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় তেলের দাম আগের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করানো হয়েছে, তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী এই নৌপথে চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা এখন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের দিকে নজর রাখছেন। মঙ্গলবার থেকে বড় মার্কিন ব্যাংকসহ নেটফ্লিক্স ও জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো প্রতিষ্ঠানের আয়ের তথ্য প্রকাশিত হবে। যদিও সিটি ব্যাংকের বিশ্লেষকরা প্রযুক্তি খাত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এখনো আশাবাদী, তবে সপ্তাহের শুরুতে শেয়ারবাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। জাপানের নিক্কেই সূচকসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকেও বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে।
তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেব মনে করেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকবে। গত শনিবার গ্রাহকদের উদ্দেশে দেওয়া এক নোটে সহদেব বলেন, ‘এ সময়ের মধ্যে তেলের দামে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে, তবে তা এই সীমার মধ্যেই থাকবে।’ অন্যদিকে, আইজির বাজার–বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ মনে করেন, তেলের দাম আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘জুন মাসে তেলের দাম যে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গেল, তার পেছনে বাজারের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা যতই নাজুক হোক, তা টিকে থাকবে। তবে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় প্রমাণিত হয়েছে, সে ধারণার ভিত্তি কতটা ভঙ্গুর ছিল।’ এদিকে মার্কিন বন্ডের সুদহার বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সোনার আকর্ষণ কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমেছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার সকালেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারবাজার কোসপি (KOSPI) সূচকে ভয়াবহ বিপর্যয় লক্ষ্য করা গেছে। প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আকস্মিক বিক্রয় চাপের কারণে বাজার খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই সূচকটি ৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৫৮ দশমিক ৮২ পয়েন্টে নেমে আসে। এই পতনের নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা রেখেছে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার দরে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রবণতা। বিশেষ করে দেশটির অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা সংস্থা ‘এসকে হাইনিক্স’-এর শেয়ারের দাম এক ধাক্কায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমে গেছে। অথচ এর ঠিক আগেই গত শুক্রবার নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিষ্ঠানটির মার্কিন শেয়ারের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশ্ববাজারের এই অনিশ্চয়তা ও প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে
জুন মাসে চিনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমলেও তা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। রয়টার্সের এক জরিপে ২০ জন অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডলারে হিসাব করলে গত মাসে বার্ষিক রপ্তানি ১৮.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা মে মাসের ১৯.৪ শতাংশের তুলনায় সামান্য কম। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আগেভাগেই পণ্য পাঠানো নিশ্চিত করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিপ্লবের কারণে চিনা প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রির কৌশল চিনের ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি জোগাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী এআই খাতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ চিনা উৎপাদনকারীদের জন্য একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদী মন্দার চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হচ্ছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার মে মাসের ২৭.৪ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি চিত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, চিনের এই আমদানি মূলত সেমিকন্ডাক্টর ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ কেন্দ্রিক, যা পুনরায় রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের তথ্যে দেখা গেছে যে বিদেশের বাজারে চাহিদা ফিরতে শুরু করলেও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং জ্বালানি সংকটের কারণে চিনা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতা টানতে পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। এদিকে মার্কিন খুচরা বিক্রেতারা আসন্ন ব্ল্যাক ফ্রাইডে এবং বড়দিনের কেনাকাটার প্রস্তুতি হিসেবে স্বাভাবিক সময়ের অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগেই পণ্য মজুত শুরু করেছেন। মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেজিং সফর বড় কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রপ্তানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চিনের রপ্তানি পারফরম্যান্স নিয়ে ভিন্নমত লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপি পারিবাস এবং মিজুহো সিকিউরিটিজ ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও চিনা গবেষণা সংস্থাগুলো কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের মতে এটি ১২ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানির হাত ধরে চিনের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করলেও বর্তমানে সেই গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের দুর্বলতা চিনের প্রবৃদ্ধিকে বিদেশের বাজারের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে, যা নতুন করে নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকার চলতি বছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে, যার আনুষ্ঠানিক তথ্য আগামী বুধবার প্রকাশিত হবে। তবে গত মাসের বাণিজ্য তথ্যে একটি বড় দুর্বলতা ফুটে উঠেছে; সেমিকন্ডাক্টর ও ডাটা প্রসেসিং যন্ত্রপাতির রপ্তানি ৬০ শতাংশের মতো বাড়লেও আসবাবপত্রের মতো সাধারণ পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১.৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে জুন মাসে চিনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে ১২০.৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা আগের মাসে ছিল ১০৫.৪৩ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানি খাতের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক জোট ওপেকের সুদীর্ঘকালের নিয়ন্ত্রণ হতে বেরিয়ে আসার পর খনিজ তেল উৎপাদনে নতুন এক ইতিহাস গড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। জোটের প্রধান শক্তি সৌদি আরবের সাথে গভীর নীতিগত বিরোধের জেরে গত মে মাসে আবুধাবি এই জোট ত্যাগ করে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওপেকের বাধ্যবাধকতা ছিন্ন করার পর গত জুন মাসে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ৪১ লক্ষ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে, যা আমিরাতের ইতিহাসে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৪০ লক্ষ ব্যারেল।
বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরেই মনে করত যে সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক তাদের বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আমিরাত এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করলেও বাজারের দর ধরে রাখার স্বার্থে রিয়াদ তাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিরন্তর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। শেষ পর্যন্ত ইয়েমেন, সুদান ও ইসরায়েল ইস্যুতে সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হলে তারা জোট ত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসন আমিরাতের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে, কারণ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ওয়াশিংটন চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও পশ্চিমা দেশগুলোর জরুরি মজুত উন্মুক্তকরণ এবং চীনের পক্ষ হতে আমদানি হ্রাসের ফলে বড় ধরণের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। তবে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণকে ফাঁকি দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ক্ষেত্রে তারা ওমান উপসাগরে অবস্থিত ফুজিরাহ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশেষ পাইপলাইন ব্যবহার করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ইরানের হামলা এড়াতে আমিরাত একদিকে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সাথে থাকলেও অন্যদিকে তেহরানের সাথে এক ধরণের গোপন আর্থিক সমঝোতাও করেছে। পাশাপাশি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে ছদ্মবেশী ট্যাংকারের মাধ্যমে তারা গোপনে পণ্য সরবরাহ বজায় রেখেছে বলে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
আইএইএ তাদের পর্যবেক্ষণে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের যোগান বাড়লেও ডিজেল, এলপিজি বা জেট ফুয়েলের মতো শোধিত জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকেরও কম। এর ফলে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোকে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক চড়া মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতেও নিজস্ব বিশাল জাহাজ বহর এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নৌ-পথ ব্যবহারের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য আরও সুসংহত করে তুলছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আগামী বছর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই উদ্বৃত্ত এখন হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গতকাল প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে। রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, যদিও গত জুন মাসে তেলের সরবরাহ দৈনিক ৪১ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এটি যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখনও দৈনিক ৯৪ লাখ ব্যারেল কম।
আইইএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দৈনিক সরবরাহ প্রায় ৩৭ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেতে পারে। তবে আগামী বছর সরবরাহ দৈনিক ৭৫ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এই প্রবৃদ্ধি এবং তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকার ওপর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় তেলের সরবরাহ উদ্বৃত্ত নিয়ে যে ইতিবাচক চিত্র আশা করা হয়েছিল, তাতে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যদি জ্বালানি ক্ষেত্রগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল উত্তোলন চালিয়ে যেতে পারে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকে, তবে আগামী বছর চাহিদার তুলনায় দৈনিক ৪৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল বাজারে থাকতে পারে। চলতি বছর বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল কমলেও ২০২৭ সাল নাগাদ তা ২০ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে বলে আইইএ প্রাক্কলন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।