পতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের শেয়ারবাজার। আগের কার্যদিবসের ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। তবে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বেশির ভাগ বস্ত্র ও বিমা কোম্পানি। ফলে দাম বাড়ার তালিকা বড় হয়েছে। ফলে বড় পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে মূল্যসূচক। সেই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ।
এর আগের সপ্তাহের প্রথম দুই কার্যদিবস শেয়ারবাজারে বড় ধরনের লেনদেন খরা দেখা দেয়। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস গত রোববার ডিএসইতে লেনদেন কমে ৩০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসে। পরের কার্যদিবস সোমবার তা আরও কমে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পর প্রথমবার টানা দুই কার্যদিবস ৩০০ কোটি টাকার কম লেনদেন হয়।
আওয়ামী লীগ তথা হাসিনা সরকার পতনের আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট শেয়ারবাজারে ৩০০ কোটি টাকার কম লেনদেন হয়েছিল। এরপর চলতি সপ্তাহের প্রথম দুই কার্যদিবস ৩০০ কোটি টাকার কম লেনদেন হয়। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস গতকাল লেনদেনের গতি কিছুটা বেড়ে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বেশি প্রতিষ্ঠান।
শেয়ারবাজারের এই দাম বাড়ার তালিকা বড় করতে ও লেনদেন খরা কাটাতে বড় ভূমিকা রেখেছে বিমা ও বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো। সব খাত মিলে এদিন ডিএসইতে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৮৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৪৭টির এবং ৭৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে বিমা খাতের ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯টির। আর বস্ত্র খাতের ৩৫টির শেয়ার দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে ১৪টির। এই দুটি খাতের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ালেও মূল্যসূচকে বড় ভূমিকা রাখা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্য খাতের বেশির ভাগের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। ফলে কমেছে মূল্যসূচক।
দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় দশমিক ১৪ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১৬৬ পয়েন্টে নেমে গেছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ৪৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯০৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। তবে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ৪২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৫৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এদিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩৮৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ২৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ১০৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান সায়হাম কটনের শেয়ার। টাকার অঙ্কে কোম্পানিটির ১৩ কোটি ২১ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বেক্সিমকো ফার্মার ১০ কোটি ৩৩ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১০ কোটি ২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ওরিয়ন ইনফিউশন।
এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- লাভেলো আইসক্রিম, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ড্রাগোন সোয়েটার, নিউ লাইফ ক্লোথিং, এনআরবি ব্যাংক, আইসিবি এবং ব্র্যাক ব্যাংক।
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৩১ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২০৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯৭টির এবং ৩৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করা গেলে দেশটির বড় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়বে। তবে চুক্তির সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে এর শর্ত সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকায় জাপান দূতাবাস।
দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের মতে, চুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে শুল্কসুবিধা ও পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) মধ্যে চুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর আওতায় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি সেবা, ই-কমার্স, শুল্কপ্রক্রিয়া ও মেধাস্বত্বের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে।
দূতাবাস জানিয়েছে, চুক্তি কার্যকর হলে নির্ধারিত শুল্ককাঠামোর আওতায় অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাওয়া যাবে। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
দূতাবাসের ভাষ্য, ‘তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করা এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।’ এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের (আরএমজি) পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার কথা উল্লেখ করেছে জাপান দূতাবাস।
তবে এসব খাতে রপ্তানি বাড়াতে জাপানের বাজারের চাহিদা, পণ্যের মান এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের ভালো ধারণা থাকতে হবে। পণ্যের মান ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ ও শ্রমসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে জাপানের অনুমোদনপ্রক্রিয়া ও উৎপাদনমান-সংক্রান্ত কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার জন্য শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ ও গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মতো পশ্চাৎমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভোগ্যপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, সরবরাহ ও পরিবহনসেবা এবং জ্বালানির কথা উল্লেখ করেছে দূতাবাস।
এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন (বিএসইজেড) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়লে সেখানে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে নতুন জাপানি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে উৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও বাড়তে পারে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে বাংলাদেশের জন্য ইপিএ বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার সুবিধা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে চুক্তিটি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো দিতে পারে।
এ জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে চুক্তির শর্ত, শুল্কসুবিধা এবং পণ্যের উৎপত্তি নির্ধারণের নিয়ম নিয়ে প্রচার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান চুক্তির আওতায় পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে।
দূতাবাসের মতে, ইপিএর সুফল পেতে বাংলাদেশ ও জাপানের সরকার এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। চুক্তি কার্যকরের পর বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে যৌথ কমিটিসহ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, জাপানের সঙ্গে ইপিএ দ্রুত কার্যকর করা, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সম্ভাবনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাক তৈরির কার্যাদেশ বাড়ছে বাংলাদেশে। মৌলিক পোশাকের পাশাপাশি দেশীয় কারখানাগুলো এখন জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক ও টেকনিক্যাল অ্যাপারেল উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জার্মানির হারকো এবং ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কারখানায় উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করছে। এ ছাড়া এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও সরাসরি অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে।
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তৈরি কিছু বিশেষায়িত ব্লেজার ও বিয়ের পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে এক হাজার ডলারেরও বেশি খুচরামূল্যে বিক্রি হচ্ছে। টিম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলারের জ্যাকেট ও আউটারওয়্যার রপ্তানি করে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ উচ্চমূল্যের পণ্য। অন্যদিকে, এনার্জি প্যাক ফ্যাশনসের রপ্তানি করা পোশাকের প্রায় ৯০ শতাংশই স্যুট ও ব্লেজারের মতো প্রিমিয়াম পণ্য।
১৯৮০-এর দশকে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন কম দামের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে ২০১০ সালের পর থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়তে থাকে। উদ্যোক্তাদের ধারণা, বর্তমানে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পণ্য। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত পোশাক বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। একই সময়ে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পণ্য থেকে এলে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ৮৭ থেকে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৌলিক পোশাকের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। সাধারণ পোশাকে মুনাফার হার কমে এলেও বিশেষায়িত পোশাকে তুলনামূলক বেশি মুনাফার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি উন্নত ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রেতা পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় ব্র্যান্ডগুলো বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজারে অংশ বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ রয়েছে, কিন্তু এই বাজারের প্রকৃত আকার ও অগ্রগতি নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। শুধু বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ পাওয়া নয়, দেশীয়ভাবে দক্ষতা তৈরি, উন্নত উপকরণ ব্যবহারের সক্ষমতা, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোই হবে পরবর্তী ধাপ। সাধারণ পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ধরে রেখেই প্রিমিয়াম পণ্যের অংশ বাড়াতে পারলে রপ্তানি আয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উভয়ই জোরদার হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তব করতে হলে বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্যের বাইরে গিয়ে পুরো শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির অনুমতি সংক্রান্ত নির্দেশনায় আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বৃহস্পতিবার জারি করা এক আদেশে রাজস্ব প্রশাসন জানিয়েছে, পূর্বে প্রকাশিত দুটি আদেশে বর্ণিত ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা বলতে মূলত ১০-৩০ সিঙ্গেল কাউন্টের কটন সুতাকে বোঝানো হবে।
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস: রপ্তানি ও বন্ড) কাজী রায়হানুজ্জামান স্বাক্ষরিত আদেশে উল্লেখ করা হয়, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পের স্বার্থরক্ষা এবং প্রকৃত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাঁচামালের জোগান নিশ্চিতের অংশ হিসেবে গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হয়েছিল। ওই নির্দেশনায় ১০-৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিলের মাধ্যমে পণ্য ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে গত ৮ অক্টোবর উক্ত আদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছিল।
রাজস্ব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টেক্সটাইল খাতের নানাবিধ সমস্যা পর্যালোচনা ও টেকসই সমাধানের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভার সিদ্ধান্তের আলোকেই এই স্পষ্টীকরণ আদেশ দেওয়া হয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এনবিআর এই নির্দেশনা জারি করেছে এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদার ওপর ভর করে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে চিপ ব্যবসায় প্রায় ১৫ গুণ পরিচালন মুনাফার চমক দেখিয়েছে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স। তবে অভাবনীয় এই মুনাফা অর্জন সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো আর্থিক সুবিধার ঘোষণা না দেওয়া এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের তুলনায় সরবরাহ সংকট নিয়ে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল পূর্বাভাস দেওয়ায় পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারদরে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের সার্বিক পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১০৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন উওনে (প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলার), যা আগের বছরের একই সময়ের ১২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন উওনের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। এর সিংহভাগই এসেছে সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ থেকে, যেখানে মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১০৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন উওনে। নজরকাড়া এই ফলাফল সত্ত্বেও শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ না হওয়ায় লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দর ৬ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। অথচ এর বিপরীতে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
এর আগে এসকে হাইনিক্স তাদের উচ্চগতির ড্র্যাম ও এইচবিএম চিপ ২০২৯ সাল পর্যন্ত পুরোপুরি নিঃশেষ (সোল্ড আউট) হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি ডলার ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু স্যামসাং শুধু আগামী বছরের জন্য তাদের চিপের মজুদ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে এবং সরবরাহ ঘাটতি ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে তুলনামূলক সংযত বার্তা দেয়। এ প্রসঙ্গে বিএনকে ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক লি মিন-হি বলেন, “গতকাল এসকে হাইনিক্স প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি অর্জন দেখিয়েছে এবং তা বাজারের ধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স তাদের আগের দেওয়া পূর্বাভাসের কোনো বিশেষ পরিবর্তন করেনি।” একই বিষয়ে মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক জিং জি ইউ বলেন, “স্যামসাংয়ের এই দরপতনের পেছনে মূল কারণ ছিল মেমোরি সংকট কতদিন চলবে সে সংক্রান্ত তাদের পূর্বাভাস, যা গতকাল দেওয়া এসকে হাইনিক্সের বক্তব্যের চেয়ে কিছুটা কম ইতিবাচক মনে হয়েছে।”
চিপ কারখানা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চলতি বছর ব্যয় ৬২ শতাংশ বাড়িয়ে ৭৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন উওন করেছে স্যামসাং এবং আগামী বছরও বড় অঙ্কের মূলধনী ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্যামসাং জানায়, “এআই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটার সাথে সাথে ২০২৭ সালে মেমোরি ব্যবসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোগত মূলধনী ব্যয় ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের তুলনায় এআই-চালিত বাড়তি চাহিদা চিপ খাতের সরবরাহকে বহুগুণে ছাড়িয়ে যাবে।” তবে শেয়ারহোল্ডারদের বাড়তি প্রাপ্তির সিদ্ধান্তটি আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ায় বাজারে হতাশা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সিএলএসএ-র জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সঞ্জীব রানা বলেন, “বাজার হয়তো অতিরিক্ত শেয়ার পুনর্ক্রয় বা লভ্যাংশ ঘোষণার আশা করছিল, কিন্তু কোম্পানি সিদ্ধান্তটি জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত স্থগিত করায় স্বল্পমেয়াদি প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।”
বাজারের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য ধরে রাখতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ান এই টেক জায়ান্ট। এরই মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে নিজেদের মোট সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নিশ্চিত সরবরাহের আওতায় নিয়ে আসা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তিভিত্তিক চিপ তৈরির বা ফাউন্ড্রি বিভাগ লোকসানে থাকলেও আধুনিক ২-ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপের নতুন ক্রয়াদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস কারখানায় আগামী বছর থেকে টেসলার চিপ উৎপাদনের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতির আভাস পাওয়া গেছে। তবে চিপের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিজস্ব মোবাইল ফোন বিভাগে মার্জিন সংকুচিত হয়ে এ প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের মোবাইল ব্যবসা প্রায় ৮০০ বিলিয়ন উওন ক্ষতির মুখে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা ও অবমূল্যায়নের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ১০টি কনটেইনারে থাকা প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন অপ্রক্রিয়াজাত কাঁচা তামাকের একটি বড় চালান জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। বন্ড সুবিধায় ছাড়ের অপেক্ষায় থাকা এসব তামাক দিয়ে প্রায় ৪৯৪ কোটি টাকা মূল্যের প্রিমিয়াম সিগারেট উৎপাদন সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জব্দকৃত এই কাঁচামাল দিয়ে আনুমানিক ২১ কোটি ৪৩ লাখ শলাকা উন্নতমানের সিগারেট তৈরি করা যেত, যার খুচরা বাজারমূল্য দাঁড়াত প্রায় ৪৯৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ‘গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের আনা এই চালানের নথিপত্র পর্যালোচনায় মূল্যের মারাত্মক গরমিল শনাক্ত করা হয়েছে। একই এইচএস কোডের কাঁচা তামাক প্রতি কেজি ৫ দশমিক ১০ মার্কিন ডলার দরে শুল্কায়ন হওয়ার নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১ দশমিক ৪৫ ডলার দর ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে কেবল আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রেই সরকারের প্রায় ২১ কোটি ১২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধার আওতায় আনা তামাকের সঠিক ব্যবহার এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তদারকি নিশ্চিত না হলে আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। পুরো চালানের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও পরিশোধনে নজিরবিহীন মার্জিনের ওপর ভর করে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফা অর্জন করেছে বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেল। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার থেকে শেয়ার পুনর্ক্রয়ের আকারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে কোম্পানিটি। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জ্বালানি জায়ান্টটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১ কোটি ডলারে (১০ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার), যা বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ১০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে এবং গত বছরের একই সময়ের ৫ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নবম মাসে পৌঁছানোয় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই সরবরাহ সংকটের কারণে শেলের তেল পরিশোধন মার্জিন প্রতি ব্যারেলে রেকর্ড ৪২ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগের একই সময়ে ছিল মাত্র ১১ দশমিক ৬ ডলার এবং আগের প্রান্তিকে ছিল ২৪ ডলার। অভাবনীয় এই আর্থিক সাফল্যের পর শেল তাদের ত্রৈমাসিক শেয়ার পুনর্ক্রয়ের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ ঘোষণার পরপরই ইউরোপের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের শেয়ারদর বৃদ্ধির গতিকে ছাড়িয়ে শেলের শেয়ারের দাম শুরুতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যায়।
ব্যবসায়িক খাতভিত্তিক আয়ে শেলের সমন্বিত গ্যাস বিভাগ থেকে ৩০৪ কোটি ডলার এবং জ্বালানি উত্তোলন বিভাগ থেকে ৩১৯ কোটি ডলার অর্জিত হয়েছে, যা উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে কার্যকরী মূলধন ছাড়া পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহের পরিমাণ ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে, যা গত বছরের একই প্রান্তিকে ছিল ১২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে বিপুল মুনাফার মধ্যেও সামগ্রিক তেল ও গ্যাস উৎপাদনে যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে শেলের মোট জ্বালানি উত্তোলন আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে গত মার্চে রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে হামলার পর কাতারে শেলের পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইডস কারখানার একটি ইউনিটের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কারখানাটি বর্তমানে আংশিক চালু থাকলেও এটি পুরোপুরি সংস্কার করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে কানাডার এলএনজি প্রকল্পের উৎপাদন পুরোদমে শুরু হওয়ায় কাতারের এই ক্ষতি আংশিক পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, যার ফলে সামগ্রিক এলএনজি উৎপাদন ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ইউরোপীয় বায়োগ্যাস সম্পদের দুর্বল প্রত্যাশার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-কর আড়াই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবচয় বা লোকসান নথিভুক্ত করতে হয়েছে, যা কানাডা প্রকল্পের ইতিবাচক অগ্রগতির সূত্রে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে আসে। ২০২২ সালের শেষ ভাগ থেকে হিসাব করলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের অন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিপি, টোটালএনার্জিস কিংবা শেভরনকে পেছনে ফেলে শেল তাদের শেয়ারহোল্ডারদের ১২০ শতাংশ মুনাফা দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বজুড়ে চরম অস্থিতিশীলতার সময়ে জ্বালানি জায়ান্টগুলো এই অপ্রত্যাশিত মুনাফা কীভাবে ব্যয় করে এবং মূলধনী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে কি না, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে নিজস্ব রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বুধবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এ অর্থ সরবরাহ করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে গত ২০ অক্টোবর তুলনামূলক কম, অর্থাৎ প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা মূল্যে বিক্রি করেছিল সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এদিন বাজারে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সমন্বিত চাহিদা ছিল প্রায় ৮০ কোটি ডলার, যার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১২ কোটি ২০ লাখ ডলারের জোগান দেয়। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বুধবার দিনের শুরুতে রেমিট্যান্স হাউসগুলো থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দরে ক্রয়ের প্রস্তাব আসে এবং কয়েকটি ব্যাংক তা ১২৪ টাকা ৩০ পয়সায় কেনেও। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেমিট্যান্স হাউসগুলো দর কমিয়ে পুনরায় ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিতে শুরু করে।
বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, বুধবার ৩০ কোটি ডলারের বেশি অঙ্কের বৈদেশিক দায় বা পেমেন্ট মেটানোর বাধ্যবাধকতা থাকায় ডলারের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে মাসের শেষ প্রান্তে প্রবাসী আয়ের গতি কিছুটা ধীর হয়ে আসায় মুদ্রা বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে একধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এর আগে মঙ্গলবার ডলার বিক্রির নোটিশ জারি করেও শেষ মুহূর্তে রিজার্ভ থেকে কোনো অর্থ ছাড় করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এ নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করা হলো। অবশ্য রেমিট্যান্স প্রবাহের সামগ্রিক চিত্রে দেখা গেছে, চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২৭ দিনেই দেশে ২৫৪ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
তৈরি পোশাকের (আরএমজি) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান ও বিধিবিধান পরিপালনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন পণ্য ও সেবাখাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলছে।
রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল সোর্সিং ডায়ালগে’ এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চেম্বার, ক্রেতা ফোরাম এবং বিদেশি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের উন্নয়নবিষয়ক কাউন্সেলর ও উপ-উন্নয়ন পরিচালক মার্টিন ডসন যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস)-এর আওতায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুযোগগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলো এ স্কিমের আওতায় বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এখনো করতে পারেনি।”
বাংলাদেশি উৎপাদকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও সোর্সিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন রপ্তানি আদেশ অর্জনের সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিসিটিএস সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের সচেতনতা বাড়াতে ইপিবি ও ব্রিটিশ হাইকমিশন যৌথভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে স্কিমটির আওতায় সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং তা পরিপালনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুল্কবহির্ভূত বাধা মোকাবিলা ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামে এবং তৈরি পোশাক খাতের জন্য আরও কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারের অংশ হিসেবে এ বছর ইপিবি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি খাতের সংখ্যা আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করেছে। পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনাময় শিল্প ও সেবাখাতকে রপ্তানি কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, “শিল্প খাতের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের কাঠামোয় স্বাস্থ্যসেবার মতো সেবাখাত অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।”
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগকে কার্যকর রপ্তানি আদেশে রূপ দিতে ব্র্যান্ডিং, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বাণিজ্য মেলা, ব্যবসায়িক সংযোগ কার্যক্রম এবং প্রচারমূলক উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাট ও নতুন পণ্যে রপ্তানির সম্ভাবনা
প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি অপ্রচলিত ও উদীয়মান পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে। পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল প্যাকেজিং সামগ্রীর আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব বাজারে প্রবেশ বাড়াতে পণ্যের মান, ক্রেতাদের চাহিদা এবং আমদানিসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
ইন্দোনেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার বাজারে পাটের সুতা, পাটের বস্তা, তামাক, তৈরি পোশাক ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উচ্চমূল্যের খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রতিনিধি এসব খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহন ও আতিথেয়তা শিল্পের প্রতিও অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ
রপ্তানি সম্প্রসারণে উৎপাদক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা। মোহাম্মদ হাসান আরিফ ২০১৫ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্য মেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “বিদেশি ক্রেতাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।”
বিদেশি সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের কাছে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরতে স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রচারচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট এবং বাণিজ্য মেলার সরাসরি ভিডিও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বাজারেও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্রাজিল-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রতিনিধি জানান, রিও ডি জেনেইরোতে বাণিজ্য প্রচার কার্যক্রমের পর আগামী ২২ থেকে ২৫ মার্চ সাও পাওলোতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ এক্সপো’ আয়োজন করা হবে।
ইতালিয়ান ট্রেড এজেন্সির একজন প্রতিনিধি সম্প্রতি বাংলাদেশের ১৪টি কোম্পানির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফরের কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া ইউরোপের বৃহত্তর বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশের সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে কসোভোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট বাইং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো ঢাকা ২০২৬’-এর সফল আয়োজনে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অডিওভিজ্যুয়াল প্রামাণ্যচিত্র তৈরি এবং অনুষ্ঠানের সরাসরি ভিডিও প্রচারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যানের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষ হয়। পরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় উঠে আসে, যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার কার্যকর ব্যবহার, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের রপ্তানি ভিত্তি আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও চিনিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ এবং আসন্ন রমজানের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। আমাদের পাইপলাইনে যে পরিমাণ পণ্য রয়েছে, তা বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য যথেষ্ট। রমজান কিংবা তার আগে-পরে বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি তৈরি হবে না।
মুক্তাদির বলেন, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য এবং জাহাজ ভাড়ার ওঠানামা আমদানি ব্যয় ও দেশের বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের কোনো প্রস্তাব আছে কি না এবং রমজানের আগে তেলের দাম বাড়ানো হবে কি না জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার সতর্ক রয়েছে।
পণ্য আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা এলসির মার্জিন কিংবা অন্য কোনো ব্যাংকিং জটিলতায় পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আলোচনা এগিয়ে নিয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গেও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সপ্তাহের প্রথম তিন কার্যদিবসের ধারাবাহিক মন্দাভাব কাটিয়ে চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ধারার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। এদিন দেশের প্রধান দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সার্বিক মূল্যসূচক ও লেনদেনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহের টানা দরপতনের প্রেক্ষাপটে বুধবার সকাল থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে লেনদেনের ইতিবাচক সূচনা হয়। কার্যদিবসের শেষ পর্যন্ত এই ধারা বজায় ছিল এবং শেষ প্রহরে ক্রেতাদের বাড়তি সক্রিয়তার ফলে সূচকের বড় উত্থান নিয়ে দিনের কার্যক্রম সমাপ্ত হয়।
দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৬৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। এর বিপরীতে দর হারিয়েছে ৭৬টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫২টি কোম্পানির শেয়ারদর। লভ্যাংশ প্রদানকারী ‘এ’ ক্যাটাগরি বা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৩০টির দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ৪৪টির এবং ২৪টির দাম ছিল অপরিবর্তিত। মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬১টির দর বাড়লেও কমেছে ৯টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১টির দর। এ ছাড়া লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ হয়ে ‘জেড’ গ্রুপে থাকা দুর্বল কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭২টির দাম বেড়েছে, কমেছে ২২টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৭টির দর। মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ১২টির দাম বাড়ার বিপরীতে দরপতন হয়েছে ৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৭টির দাম।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধির ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৩৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। শীর্ষ ৩০ প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৯৬ পয়েন্টে এবং শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৭ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৫৪ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। সূচকের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকায়, যা আগের কার্যদিবসের ৪০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার চেয়ে ৩৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বেশি।
ডিএসইতে একক লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে সিটি ব্যাংক, যার মোট ১৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকার এবং ১৫ কোটি ৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে তৃতীয় ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এনভয় টেক্সটাইল, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম ব্যাংক, মতিন টেক্সটাইল, সায়হাম টেক্সটাইল, অ্যাপেক্স স্পিনিং এবং সোনালী আঁশ।
অপর শেয়ারবাজার সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৪টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৭০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৮টির দর। বিশেষ করে সিএসইতে লেনদেনের চিত্রে বড় অগ্রগতি দেখা গেছে; দিনশেষে বাজারটিতে ৫৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার সিকিউরিটিজ হাতবদল হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের ১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক সুবিধা বিতরণ কিংবা দলীয় প্রভাব বিস্তারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করার জন্য সরকারের প্রতি কড়া আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি উল্লেখ করেন, গোটা অর্থনীতির ‘হৃদপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত আর্থিক খাত অতীতে ঋণখেলাপির দুষ্টচক্র এবং পরবর্তীতে ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি’র শিকার হয়ে আজকের এই চরম সংকটে এসে দাঁড়িয়েছে। বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন (এবিসি) ২০২৬-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংকিং খাত সংস্কারে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক কষ্টে নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়, সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধিবিধান বানিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর শুরু হয় ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি। এটা আরও মারাত্মক। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।’
অতীতের ভুল নীতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এত বছরের ব্যাংকিং খাতের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমরা নতুন করে আবার শিখতে যাব কেন? অনেক বিতর্ক আমরা বহু আগেই করেছি। অতীতে আমরা উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো না বানিয়েই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলাম। এর পরিণতি কী হয়েছিল? সেই সময় আমরা দেখেছি যে উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৫ শতাংশের সমান) ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন।’ পরিবারতান্ত্রিক আধিপত্য রোধে আইনি কাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী বা পরিবার একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে নিয়ম থাকা দরকার ছিল, যা ‘অ্যান্টি-ট্রাস্ট’ (একাধিপত্য–বিরোধী) আইনের আওতায় আসা উচিত। আমাদের এখনো কোনো অ্যান্টিট্রাস্ট বা অ্যান্টিমনোপলি আইন নেই।’
২০১০ সালের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘দলে দলে’ নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি জানান, অপরিকল্পিতভাবে অনুমোদন পাওয়া একাধিক দেউলিয়া ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষক ও নিম্নবিত্ত কর্মচারীদের কল্যাণ ও পেনশন তহবিলের কোটি কোটি টাকার আমানত আটকে রয়েছে, যা এখনও ফেরত পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রসঙ্গে ড. মাহমুদ মন্তব্য করেন, বেসরকারি খাতে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সরকারি ব্যাংকগুলোকে বছরের পর বছর রাজনৈতিক সুবিধা বিতরণের ক্ষেত্র হিসেবে অপব্যবহার করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক কারণে কোনো সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন হলে অর্থনীতির ক্ষতি না করে অন্য খাত বেছে নেওয়া উচিত; কিন্তু আর্থিক খাতের ওপর রাজনৈতিক চাপ চাপানো আত্মঘাতী। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সাধারণ ব্যাংকারদের একক কিছু করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্থিক খাতকে প্রভাবমুক্ত রাখার এই মৌলিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে।
বিগত সরকারের আমলে বিধিবিধান অতিমাত্রায় শিথিল করার ফলেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন দুর্বল ব্যাংককে উদ্ধার করতে হলে নিয়মকানুন আবার কিছুটা শিথিল করতেই হবে। কিন্তু অতীতে যেভাবে নিয়মকানুন শিথিল করেও আমরা আজকের এই খারাপ অবস্থায় এসে পৌঁছালাম, আবার সেটার পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই গ্যারান্টি কোথায়?’ বর্তমান অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমাদের পর্যাপ্ত সেফগার্ড (সুরক্ষা কবচ) রাখতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্র আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যেন সৎ, প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা পৌঁছায়। এই ব্যবস্থা যদি আমরা সুনিশ্চিত করতে না পারি, তবে আমরা আবার আগের পুরোনো গর্তেই পতিত হব।’ একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শুধু নীতিমালার কড়াকড়ি দিয়ে সুশাসন আনা অসম্ভব; সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের পেশাগত নৈতিকতার অভাব থাকলে যেকোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনাই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাই সরকার এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটাতে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির ব্যয় নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দের আড়াই গুণ ছাড়িয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে কাতার থেকে নির্ধারিত গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে কাতারের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোবাংলাকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সাধারণত তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কিনতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি আমদানি ব্যয়ে পড়ে। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ২০ ডলারের বেশি দামে কিনতে হয়েছে; কিছু জরুরি ক্রয়ের দর ২৬ থেকে ৩০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছেছে। বিপরীতে, সংঘাতের আগে কিছু কার্গো তুলনামূলক কম দামে কেনা হয়েছিল। টাকার বিনিময়মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারদরের পরিবর্তনও আমদানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। ফলে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। দেশীয় বাজারে গ্যাস বিক্রির মূল্য আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় এই ব্যবধানের বড় অংশ সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার কার্গো সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত হিসাবের ভিত্তিতে কয়েকটি প্রতিবেদনে এলএনজি আমদানিতে সম্ভাব্য বাড়তি ব্যয় প্রায় ৪১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কেনা এবং স্পট মার্কেটের বাড়তি দামের প্রভাব ধরে করা হয়েছে। তবে এই অঙ্ককে সরকারের চূড়ান্ত ভর্তুকি ব্যয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কার্গোর প্রকৃত সংখ্যা, ক্রয়মূল্য, সরবরাহ পরিস্থিতি, বিনিময় হার এবং পরবর্তী সময়ে বাজারদরের পরিবর্তনের ওপর চূড়ান্ত ব্যয় নির্ভর করবে। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে প্রকৃত মোট ব্যয় নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরবরাহ বজায় রাখতে আমদানি করা এলএনজির প্রয়োজন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন উচ্চমূল্য বজায় থাকলে সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাড়তি ডলার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি করবে।
এ পরিস্থিতিতে আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, জ্বালানির অপচয় কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, উৎসের বৈচিত্র্য এবং আগাম ক্রয় পরিকল্পনা শক্তিশালী করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব। এলএনজি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি সরকারি বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার সঙ্গেও যুক্ত।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আলোচ্য তিন মাসে পোশাক খাত থেকে মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খাতভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রপ্তানি আয়ের এই ইতিবাচক ধারায় প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে মূলত তিনটি মৌলিক পণ্য—বটমওয়্যার, সোয়েটার ও কার্ডিগান এবং টি-শার্ট ও ভেস্ট। এই তিন শ্রেণির সামগ্রী থেকে সম্মিলিতভাবে আয় বেড়েছে ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা প্রান্তিকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশ। পণ্যভিত্তিক হিসাবে বটমওয়্যার থেকে অতিরিক্ত আয় এসেছে ২০ কোটি ১০ লাখ ডলার, সোয়েটার ও কার্ডিগানে ১৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং টি-শার্ট ও ভেস্টে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ ছাড়া শতকরা প্রবৃদ্ধির হারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল শিশুদের পোশাক, যেখানে আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক পোশাক রপ্তানি ক্রমেই মৌলিক বা সাধারণ পণ্যের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রথম প্রান্তিকে সাধারণ পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৮২৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। এর ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে মৌলিক পণ্যের অংশ বেড়ে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যদিকে শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানিতে ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে আয় ৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে পৌঁছালেও মোট রপ্তানিতে এই পণ্যের অংশীদারত্ব কমে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
মৌলিক পোশাকের তুলনায় উচ্চমূল্য সংযোজনকারী বা আধুনিক ফ্যাশনের পোশাক রপ্তানিতে মারাত্মক শ্লথগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে এ জাতীয় উন্নত পণ্যের রপ্তানি আয় মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৮ কোটি ডলারে স্থবির রয়েছে। এর মধ্যে নারীদের ড্রেস রপ্তানি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যার ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং স্যুট ও এনসেম্বলসের রপ্তানি ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে উন্নত পণ্যের হিস্যা ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে সংকুচিত হয়ে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সার্বিক পোশাক রপ্তানি আপাতদৃষ্টিতে বাড়লেও তা মূলত কম দামের সাধারণ পণ্যের ওপর ভর করে এগোচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে হলে স্বল্পমূল্যের পণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বৈচিত্র্যময় ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পোশাকের আন্তর্জাতিক বাজার ধরাকেই দেশীয় পোশাক খাতের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।