২৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ-২০২৫) শুরু হচ্ছে আজ বুধবার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সকাল ১০টায় এ মেলার উদ্বোধন করবেন। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে এই মেলা হতে যাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ মেলার যৌথ আয়োজক। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি ৭ দেশের ১১ প্রতিষ্ঠান এবারের মেলায় অংশ নেবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়া।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এ তথ্য জানান। বাণিজ্যসচিব মোহা. সেলিম উদ্দিন, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টার উপস্থিতিতে বাণিজ্য মেলায় যাত্রী পরিবহনে বিশেষ ছাড় দিতে ইপিবি ও অ্যাপসভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান উবারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর বাণিজ্য উপদেষ্টা ডিআইটিএফে প্রবেশের ই টিকেটিং অ্যাপসের উদ্বোধন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারের বাণিজ্য মেলায় এই প্রথম অনলাইনে বিভিন্ন ক্যাটাগরির স্টল/প্যাভিলিয়ন স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রথম ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এবার। মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিআরটিসির নির্ধারিত বাসসেবা থাকবে। পাশাপাশি থাকছে বিশেষ ছাড়ে উবার সেবা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের সম্মানার্থে মেলায় তৈরি করা হয়েছে জুলাই চত্বর ও ছত্রিশ চত্বর। তরুণসমাজকে রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্বুদ্ধ করতে তৈরি করা হয়েছে ইয়ুথ প্যাভিলিয়ন।
মেলায় এ বছরই প্রথম সম্ভাবনাময় খাত/পণ্যভিত্তিক সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে থাকছে স্বতন্ত্র সোর্সিং কর্নার, ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার জোন। বয়সভিত্তিক দর্শনার্থীদের সুবিধায় তৈরি করা হয়েছে প্রযুক্তি কর্নার, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য সিটিং কর্নার। শিশুদের নির্মল চিত্তবিনোদনের জন্য মেলায় থাকছে শিশুপার্ক। মা ও শিশুদের জন্য মেলায় থাকবে মা ও শিশুকেন্দ্র। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য আরামদায়ক এবং শোভন চেয়ার ও বেঞ্চ রয়েছে।
জানানো হয়, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৩৬১টি প্যাভিলিয়ন, স্টল ও রেস্তোরাঁ থাকছে এবারের মেলায়। দেশীয় উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে শত ভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশীয় বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, কার্পেট, প্রসাধনসামগ্রী, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, আসবাব, পাট ও পাটজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, চামড়া, আর্টিফিশিয়াল চামড়া, জুতাসহ চামড়াজাত পণ্য, খেলার সামগ্রী, স্যানিটারিওয়্যার, খেলনা, স্টেশনারি, ক্রোকারিজ, প্লাস্টিক, মেলামিন, পলিমার, হারবাল, টয়লেট্রিজ, ইমিটেশন জুয়েলারি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, ফাস্ট ফুড, হস্তশিল্পজাত পণ্য, গৃহসজ্জার উপকরণ ইত্যাদি মেলায় প্রদর্শন ও বিক্রয় হবে।
এক্সিবিশন সেন্টারের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে জুলাই চত্বর, দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে কালচারাল সেন্টার, প্রযুক্তি কর্নার ও বিনোদন কর্নার রয়েছে। সেন্টারের উত্তর-পূর্ব পাশে শিশুপার্ক এবং উত্তর-পশ্চিম পাশে ছত্রিশ চত্বর ও নামাজঘর স্থাপন করা হয়েছে।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। প্রাঙ্গণের বাইরেও নিয়মিত টহল দল থাকবে। নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বিবেচনায় মেলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, প্রবেশপথ, পার্কিং এরিয়া ও সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় প্রয়োজনীয়–সংখ্যক সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে।
এবারের মেলায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এক্সিবিশন হলে পুরুষ ও নারীদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক আলাদা টয়লেটের পাশাপাশি এক্সিবিশন হলের বাইরেও পর্যাপ্তসংখ্যক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলায় খাদ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ গঠিত টিম মেলা চলাকালীন প্রতিদিন ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন।
মেলায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিত থেকে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও চিকিৎসা পরামর্শ দেবেন। মেলায় পাঁচ শতাধিক গাড়ি পার্কিং সুবিধাসংবলিত দ্বিতল কার পার্কিং ভবন রয়েছে। এ ছাড়া মেলা কেন্দ্রের বাইরে আছে ছয় একর জমিতে পার্কিংয়ের আলাদা ব্যবস্থা।
মেলার সার্বিক কার্যক্রম তদারকির জন্য মেলায় স্থাপন করা হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও দর্শনার্থীদের সব ধরনের তথ্য দেওয়ার জন্য রয়েছে তথ্যকেন্দ্র। ব্যাংকিং সেবার জন্য মেলায় অনেক ব্যাংক বুথ স্থাপন করেছে। জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাসব্যাপী এ মেলা সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন খোলা থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত।
ভবন ও শিল্পকারখানার ছাদে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ নীতিগত ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে উন্মুক্ত দরপত্রের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্রে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে এবং প্রজ্ঞাপন প্রকাশের দিন থেকেই তা আইনগতভাবে কার্যকর হয়েছে।
নতুন এই আইনের আওতায় আবাসিক ভবনের পাশাপাশি সমস্ত সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার কাঠামো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির আঙিনা, ছাদ, সংলগ্ন অনাবাদি জমি, উন্মুক্ত জলাশয় কিংবা চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব সেচযন্ত্র, কৃষিভিত্তিক হিমাগার, বৈদ্যুতিক যানের চার্জিং পয়েন্ট, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষির সঙ্গে সমন্বিত দ্বৈত সৌর ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। প্রতিটি প্রকল্পের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ মেগাওয়াট। তবে প্রথাগত বৃহৎ আকারের ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে এই বিশেষ অধ্যাদেশের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
বিনিয়োগের সুবিধার্থে অধ্যাদেশে দুটি সুনির্দিষ্ট মডেল রাখা হয়েছে। প্রথম মডেলে গ্রাহককে কোনো প্রাথমিক ব্যয় বহন করতে হবে না; বেসরকারি উদ্যোক্তা নিজ খরচে সিস্টেম স্থাপন, নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য ও বণ্টন নির্ধারিত হবে। দ্বিতীয় মডেলে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে সৌর প্যানেল স্থাপন করে মালিকানা নিজেদের অধীনে রাখতে পারবে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টির জন্য জেলাভিত্তিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করা হবে, যার মধ্য থেকে কিংবা উন্মুক্ত যাচাই প্রক্রিয়ায় সেবাদাতা বাছাই করা যাবে। পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ই-জিপি পোর্টাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে বিদ্যুতের সর্বনিম্ন প্রাপ্যতা, উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের দাম, বিল পরিশোধ, যন্ত্রাংশের মান, নিরাপত্তা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রাংশ বা ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণের সুস্পষ্ট শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সৌরবিদ্যুতের সামগ্রিক প্রসার ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকির সুবিধার্থে উপজেলা ও জেলা স্তরে কারিগরি কমিটি গঠিত হবে এবং তারা নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় পরিষদে পাঠাবে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এসব প্রকল্পের সার্বিক তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ ও কার্যকারিতা তদারকি করবে। এ ছাড়া সৌর প্যানেল বা যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও হেফাজতে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধন করলে পাঁচ বছরের জেল বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনুমোদন ছাড়া সংযোগ প্রদান বা সরকারি তদারকিতে বাধা দিলে তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। এসব অপরাধ মহানগর বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতেও বিচারযোগ্য হবে।
স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সৌরবিদ্যুতের সার্বিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮৫২ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ১ হাজার ৪৭৪ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১৮ মেগাওয়াটে। সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট মিলিয়ে মোট ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই রূপান্তরকে গতিশীল করতে বিশেষ প্রণোদনার আওতায় ব্যাটারিসহ সৌর ব্যবস্থা থেকে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য প্রাপ্তির সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা পেতে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিস্টেম চালু করতে হবে, যা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক সাইবার হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জাপানের একাধিক শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর ফলে অনলাইন পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশটির সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের শিকার গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো।
অনলাইন আর্থিক সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান জিএমও ইন্টারনেট গ্রুপ জানিয়েছে, তাদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন (ফরেক্স) পরিষেবায় সাইবার হামলার মাধ্যমে অননুমোদিত প্রবেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হবে। এক ব্লগ বার্তায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসাতোশি কুমাগাই জানান, সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে সব গ্রাহককে ৫ হাজার ইয়েন (প্রায় ৩২ ডলার) করে দেওয়ার পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের জন্য বিনামূল্যে বিকল্প সেবা দেওয়া হবে। হ্যাকার চক্রটি গ্রাহকদের গোপন তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দাবি করলেও জিএমও সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
সাইবার নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে মাসাতোশি কুমাগাই বলেন, “ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিজেই এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।” তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিকর গোষ্ঠীগুলো সাধারণ মানুষকে হুমকি দেওয়া ও অর্থ লুটে নেওয়ার কাজে ইন্টারনেটকে ক্রমশ একটি হাতিয়ারে পরিণত করছে।” উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “জাপানকে সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের এখন একযোগে কাজ করার উপযুক্ত সময়।” এদিকে সাইবার হামলার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও; সোমবার টোকিওর পুঁজিবাজারের মূল সূচক সামান্য বাড়লেও জিএমও-এর শেয়ারদর প্রায় ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।
সাইবার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী সপ্তাহের মধ্যে একটি জরুরি নীতিগত প্যাকেজ ঘোষণার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বহুল ব্যবহৃত পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলা বেড়ে যাওয়ায় জাপানি কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রযুক্তিগত দুর্বলতাগুলো শনাক্তের উদ্যোগ নিচ্ছে।
অপরদিকে ব্যক্তিগত তথ্য চুরির শিকার হওয়া গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩ হাজার ইয়েন করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে টাইমস কার-শেয়ারিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পার্ক২৪। পরিচয় যাচাইয়ের পর গ্রাহকদের নথির অনুলিপি আর সংরক্ষণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ও ব্যবস্থাপনা বাবদ কোম্পানিটির প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ইয়েন বিশেষ লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইওয়াইকোসমো সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক শোইচি আরিসাওয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতোমধ্যে মানসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে; ফলে সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে গেলে অতিরিক্ত খরচের বোঝা বেশ ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত জাপানে ৭২৩টি সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক মোট সংখ্যাকেও অতিক্রম করেছে। সার্বিক বিষয়ে ইএসইটি জাপানের প্রেসিডেন্ট সাতোশি নাগানো বলেন, “প্রতিবেদনগুলোতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখোমুখি হওয়া ঝুঁকির পাশাপাশি এমন ঘটনাগুলোর দৃশ্যমানতা প্রতিফলিত হতে পারে, যা আগে হয়তো শনাক্ত হয়নি, কম তদন্ত করা হয়েছে অথবা অপ্রকাশিত থেকে গেছে।”
শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ অবকাশ শেষে দেশের পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার বেশিরভাগ সিকিউরিটিজের মূল্যহ্রাসের সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে সার্বিক লেনদেনের পরিমাণ। এর ফলে ছুটি পরবর্তী লেনদেনের উভয় কর্মদিবসেই বড় ধরনের অবনমনের মুখে পড়ল শেয়ারবাজার।
এর আগে গত ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার কারণে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন স্থগিত ছিল। বিরতি শেষে রবিবার বাজার সচল হলে বড় দরপতনের মধ্যেও ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের ইতিবাচক প্রবণতায় প্রধান সূচক বড় ধস থেকে রক্ষা পায়। তবে সোমবার লেনদেনের শুরু থেকেই বাজারে তীব্র বিক্রয়চাপ দেখা দেয়। সকাল থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দর কমতে থাকায় মূল্যসূচক দ্রুত নিম্নমুখী হয়ে পড়ে এবং দিনের শেষভাগে দরপতনের মাত্রা আরও ঘনীভূত হয়।
দিনশেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৭৪টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দর হারিয়েছে ২৫২টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের বাজারদর। লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো বা ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট; ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩১টির দাম বাড়লেও দর কমেছে ১৩৯টির। মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১৩টির দরবৃদ্ধির বিপরীতে ৫২টির দাম কমেছে। লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থ হয়ে ‘জেড’ গ্রুপে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩০টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে ৬০টির কমেছে এবং ৩০টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মাত্র দুটির দাম বাড়লেও দর হারিয়েছে ১৮টি ফান্ড।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের কারণে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৩ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৩৯৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। বাছাই করা শীর্ষ ৩০ প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯০ পয়েন্টে এবং ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৭ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ১ হাজার ৫৩ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের অংকও নেমে এসেছে ৪১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়, যা পূর্ববর্তী কার্যদিবসের ৪৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকার তুলনায় ২০ কোটি ১৫ লাখ টাকা কম।
ডিএসইতে একক লেনদেনে আধিপত্য বজায় রেখে শীর্ষে উঠে এসেছে প্রাইম ব্যাংক, যার মোট ১৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে ১৮ কোটি ৩ লাখ টাকার লেনদেন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক এবং ১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল সায়হাম টেক্সটাইল। এ ছাড়া লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয় সিটি ব্যাংক, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, মতিন স্পিনিং, ওরিয়ন ফার্মা, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং মালেক স্পিনিং।
এদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সূচকের পতন হয়েছে। দিনশেষে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ১৬৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫০টির দাম বাড়লেও কমেছে ৯৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২২টির দর। তবে সূচকের অবনমন ঘটলেও বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ সামান্য বেড়ে ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ জিনোম বিশ্লেষণ এবং প্রান্তিক নারী কারিগরদের অসামান্য দক্ষতায় রূপকথার ইতিহাস ভেদ করে বাস্তবে ফিরে এসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। কাঁচামাল ও আদি প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর কিংবদন্তির ‘বোনা বাতাস’ বা ‘হাওয়াই কাপড়’ হিসেবে খ্যাত এই শিল্প এখন বিশ্ববাজারে বাণিজ্যিক বিস্তারের দ্বারপ্রান্তে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকেই রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্যে ঢাকাই মসলিন প্রথম সারির আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হতো। মুঘল শাসনামলে এর খ্যাতি এমন শিখরে পৌঁছায় যে এর শ্রেষ্ঠ সংস্করণ ‘মলমল খাস’ কেবল সম্রাটদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এছাড়া বিভিন্ন নকশা ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে আবে-রওয়ান কিংবা শবনমের মতো কাব্যিক নামে পরিচিত ছিল এই মসলিন। একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি দিয়াশলাইয়ের খোলে এঁটে যাওয়া কিংবা আংটির ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে টেনে নেওয়ার প্রচলিত গল্পগুলো এই কাপড়ের অকল্পনীয় সূক্ষ্মতারই ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।
তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ম্যানচেস্টারের সস্তা কাপড়ের আগ্রাসন, তাঁতিদের ওপর নির্মম নিপীড়ন ও শাস্তিমূলক শুল্কের বোঝায় এই শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে মেঘনা অববাহিকার বিশেষ তুলা ‘ফুটি কার্পাস’ প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হলে ১৮৫০ সালে লন্ডনের মহাপ্রদর্শনীতে শেষ প্রদর্শনের পর মসলিন কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি হয়ে যায়। বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী আর্দ্র পরিবেশ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল এই লোকজ বিজ্ঞানে তুলা প্রস্তুত থেকে শুরু করে বোয়ালের চোয়ালের হাড় দিয়ে আঁশ পরিষ্কার এবং তকলিতে সুতা কাটাসহ ১৬টি সুনির্দিষ্ট ধাপ অতিক্রম করে একটি আসল মসলিন তৈরি করা হতো।
দীর্ঘকাল পর ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ গবেষক দল মসলিন পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের ১৭৮৮ সালের প্রকাশনার সূত্র ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্য তুলার ৩৯টি জাত সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আদি মসলিনের সুতার নমুনার সাথে ডিএনএ ও জিনোম ম্যাচিং সম্পন্ন করে নিখুঁত ‘ফুটি কার্পাস’ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই কাজের জন্য মসলিনের আদি ৫০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রপাতি নতুন করে তৈরি করা হয়। সাধারণ কাপড়ের কাউন্ট যেখানে ৪০ থেকে ৮০ হয়ে থাকে, সেখানে পুনরুজ্জীবিত মসলিনের সুতার কাউন্ট দাঁড়িয়েছে ৭৩১ থেকে ৭৫০ পর্যন্ত। এর স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা পায়।
বর্তমানে গবেষণাগার ছাড়িয়ে মসলিনের বাণিজ্যিক রূপ দিতে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিন শতাধিক প্রান্তিক নারীকে নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ স্পিনারে রূপান্তর করা হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পাওয়া ৫০০ গজ কাপড়ের একটি বড় রপ্তানি আদেশ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশগুলোর বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এই কাপড়ের ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে নির্মিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’-এর মাধ্যমে প্রযুক্তিটি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। কাঁচামালের জোগান অব্যাহত রাখতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার কৃষকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। একটি শাড়ি তৈরিতে একাধিক তাঁতির কয়েক মাসের শ্রম প্রয়োজন হওয়ায় বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ভবিষ্যতে তা এক থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রচলিত তৈরি পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে অতি-উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম লাক্সারি ফ্যাশন পণ্যের রপ্তানিকারক হিসেবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এই পুনরুজ্জীবিত ঢাকাই মসলিন।
ইরানের বাধা ও হুমকি সত্ত্বেও গত জুন থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো ১৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানি করেছে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের সহায়তায় ৩ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরানের হুমকি থাকা সত্ত্বেও এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী ৯৫ শতাংশের বেশি জাহাজ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছে। আল জাজিরা-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
সেন্টকমের দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ভূমিকা রাখছে। সংস্থাটি বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচলের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের হাতে রয়েছে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের অঞ্চলটি সফরকালে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। গতকাল মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তিনি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেন। এক বিবৃতিতে কুপার বলেন, ‘আমরা উপসাগরীয় অংশীদার ও নৌপরিবহন শিল্পের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই সফর।’ কুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইন অপসারণে নিয়োজিত কর্মীদের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টার’ কারণে প্রণালির জাহাজ চলাচলের প্রধান পথগুলো ইরানের পেতে রাখা মাইনমুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল রাখতে আমরা নিবিড়ভাবে কাজ করছি। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) এবং নৌপরিবহন শিল্পের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তেহরান এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরে এসেছে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়েছে। ইরানের রপ্তানি বাদ দিলে এ পরিমাণ যুদ্ধের আগের গড় সরবরাহের সমান। বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা পাহারা এবং তেল পরিবহনে পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়ানোর সম্মিলিত প্রভাবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
তবে তেল সরবরাহ আগের পর্যায়ে ফিরতে শুরু করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিটির দাম এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি। গতকাল ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৪ ডলার ৫০ সেন্টে দাঁড়ায়। গত সপ্তাহে প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দামটি প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ৪৮ সেন্টে স্থির হয়েছিল। এর পরদিনই ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি বাড়লেও সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করছে জাপান। বিগত চার বছর ধরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানিতে জাপানের অবদান গড়ে ৩ শতাংশের বৃত্তে আটকে থাকলেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আলোচ্য তিন মাসে দেশটিতে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত চার বছরের মধ্যে দেশটির বাজারে সর্বোচ্চ হিস্যা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে মোট ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার সমমূল্যের তৈরি পোশাক রফতানি সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে জাপানের বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। জাপানের অভ্যন্তরীণ আমদানিবাজার সম্প্রতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসায় দেশীয় পোশাক উদ্যোক্তাদের জন্য সেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
বিগত কয়েক বছরের রফতানি চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাপানের বাজারে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উল্লম্ফন না ঘটলেও লেনদেনের পরিমাণে ধারাবাহিক ওঠানামা ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাপানে পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ১১৫ কোটি ডলার। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১০৯ কোটি ডলারে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কল্যাণে রফতানি বেড়ে ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আবারও ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১১৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। একই অর্থবছরে বৈশ্বিক বাজারেও দেশের সার্বিক পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে ঠেকেছিল, যার ফলে মোট রফতানিতে জাপানের অবদান সংকুচিত হয়ে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছিল।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্বাগতিক জাপানের নিজস্ব পোশাক আমদানির বাজারেও ইতিবাচক গতি সঞ্চার হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে দেশটি যেখানে ২ হাজার ৪৯৬ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল, পরের বছর তা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ডলারে নেমেছিল। তবে মন্দা কাটিয়ে ২০২৪-২৫ সময়ে জাপানের পোশাক আমদানি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলারে এবং ২০২৫-২৬ সময়ে আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪১৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। এমনকি চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) দেশটি বিশ্ববাজার থেকে ৪০৫ কোটি ডলারের পোশাক সংগ্রহ করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের বাজারে পোশাক রফতানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করলেও তা এখনো স্থিতিশীল রূপ পায়নি। ফলে কেবল এক প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ হিস্যা অর্জন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক লক্ষণ। জাপানি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রেখে আগামী মাসগুলোতে এই সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হলে পূর্ব এশিয়ার এই পরাশক্তির বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অবস্থান আরও মজবুত হবে।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে জাপান। দেশটির শীর্ষ সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার সকালে টোকিও পৌঁছেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এ সফরে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব সুসংহত করা এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। বৈঠক শেষে উভয় দেশের যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পাশাপাশি তিনি জাপানি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগ মূলত মোটরযান নির্মাণ, ভারী উৎপাদনমুখী কারখানা স্থাপন এবং বৃহৎ জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্যান্য অংশীদারদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি এই রূপরেখায় স্থান পেতে পারে। এর মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগের এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে টোকিওতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সূচি রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর। তিনি জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং বাণিজ্য সংস্থা জেট্রোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এ ছাড়া মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরার মতো শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি আলোচনার কথা রয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন, যেখানে উভয় দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তারা অংশ নেবেন। এরপর বুধবার তিনি বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করবেন এবং সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে অবস্থিত টয়োটা মোটর করপোরেশনের বিখ্যাত মোটোমাচি শিল্প কারখানা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করবেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ও টোকিওর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা সফল হলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও শিল্প খাতে রূপান্তরের পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশের পথ আরও সুগম হবে।
বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নগত জটিলতা সত্ত্বেও এগিয়ে চলছে চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘ইআরএল ইউনিট-টু’ চালু হলে দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানের তিন গুণ হবে। একই সঙ্গে পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় সরবরাহ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটির জন্য সরকার প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়ন ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে সরকার, বাকি ৪০ শতাংশ আসবে বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষ করে ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যেই ইআরএল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রিফাইনারিটির বার্ষিক তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। নতুন ইউনিট চালু হলে তা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক মৌলিক প্রকৌশল নকশা বা ফ্রন্ট-এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (ফিড) ডকুমেন্ট তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ। ১৯৬৮ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রথম ইউনিট নির্মাণেও প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত ছিল। বর্তমানে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি কারিগরি নকশা, ক্রয় ও নির্মাণকাজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের মাঝামাঝি নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একাধিক বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকায় কারিগরি সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পে পাঁচটি বিদেশি লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের পর প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।
আধুনিকায়ন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো জ্বালানির গুণগত মান উন্নত করা। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ইউরো-৪ মানের জ্বালানি পরিশোধন করা হয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় নতুন ইউনিটের পাশাপাশি বিদ্যমান রিফাইনারিকেও ইউরো-৬ মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জ্বালানিতে সালফারের পরিমাণ কমে প্রতি মিলিয়নে দুই অংশে (২ পিপিএম) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিদ্যমান প্ল্যান্টের মান উন্নয়নের ফলে কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নতুন ইউনিটে প্রচলিত জ্বালানি তেলের পাশাপাশি লুব অয়েল, সালফার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও জেট ফুয়েল উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। বর্তমানে এসব পণ্যের কিছু অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নতুন প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হলে লুব অয়েল ও সালফারের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে তেল পরিশোধনের উপজাত হিসেবে এলপিজি উৎপাদন এবং দেশের জেট ফুয়েলের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি চালু হলে একদিকে দেশের তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পথ সুগম হবে।
সার্বিক আমদানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা দৃশ্যমান হলেও দেশের শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন শিল্পায়নের প্রধান নিয়ামক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) মোট পণ্য আমদানির পরিমাণ ১২ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও এই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির হার কমেছে ৩২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সামগ্রিক আমদানির ভেতরে ভারী ও উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতির এমন অস্বাভাবিক পতন বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশে মোট ১ হাজার ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি সম্পন্ন হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেশি। তবে সামগ্রিক আমদানির এই ঊর্ধ্বগতিতে শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো প্রতিফলন নেই। এ সময়ে সার্বিক মূলধনি পণ্যের আমদানি প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কলকারখানা স্থাপন ও আধুনিকায়নের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৭৫ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সার্বিক আমদানির এই বিস্তার মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ এবং কিছু অন্তর্বর্তী কাঁচামাল আমদানির ওপর ভর করে হয়েছে। এ সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে বস্ত্র খাতের মৌলিক কাঁচামাল তুলার আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে যে শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন কারখানা নির্মাণ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে কেবল বিদ্যমান উৎপাদন সচল রাখতেই ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখছেন।
মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এই মারাত্মক সংকোচনের পেছনে চড়া সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং অর্থায়নের চরম অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকগুলোতে ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা এবং কয়েক বছর ধরে ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটায় উদ্যোক্তাদের কার্যকরী মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণে; গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ঘোষিত প্রণোদনা তহবিল থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্থায়ন না পাওয়ায় শিল্প সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দীর্ঘস্থায়ী তীব্র সংকট নতুন শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কারখানা চালানো অসম্ভব হওয়ায় এবং নিকট ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিস্থিতির টেকসই সমাধানের পথ দৃশ্যমান না থাকায় নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূলধনি যন্ত্রপাতির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার অর্থ হলো সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা নেমে আসা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত করবে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ সংকট, ভারতীয় রুপির বিনিময় হার বৃদ্ধি, উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ এবং চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশায় এশিয়ার বাজারে চালের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খবর বিজনেস রেকর্ডার।
ভারতে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চালের দাম বাড়ছে। গত সপ্তাহে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত সেদ্ধ চালের দাম প্রতি টন ৩৮৭ থেকে ৩৯২ ডলারে লেনদেন হয়েছে। এর আগের সপ্তাহে একই মানের চালের দাম ছিল ৩৮৪ থেকে ৩৮৯ ডলার। এদিকে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত আতপ চালের দাম বেড়ে টনপ্রতি ৩৮৯ থেকে ৩৯৪ ডলারে উঠেছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৩৮৫ থেকে ৩৯০ ডলার।
ভারতের বাজারে চালের দাম বাড়ার পেছনে রুপির শক্তিশালী অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কলকাতাভিত্তিক এক রপ্তানিকারকের মতে, বাজারে ধানের সরবরাহ কম থাকায় চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। পাশাপাশি স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে কয়েকটি রাজ্যে উৎপাদন কমেছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, প্রায় এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম ভারতের চালের উৎপাদন কমতে পারে। উৎপাদন হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হতে পারে। ফসল পাকার সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভিয়েতনামেও চালের দাম বেড়ে প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চাল টনপ্রতি ৪৪০ থেকে ৪৫০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৪২০ থেকে ৪৩০ ডলার। গত ২১ আগস্টের পর এটিই সর্বোচ্চ দাম। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী নভেম্বর থেকে ফিলিপাইন আবার ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি শুরু করতে পারে। এতে দেশটির রপ্তানি বাজারে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভিয়েতনামের কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বছরের বাকি সময়ে দেশটির চাল রপ্তানিতে চাপ থাকবে। তবে চলতি বছর ৮০ লাখ টন চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথমার্ধে দেশটি ২ লাখ ২৮ হাজার ৮৭১ টন চাল রপ্তানি করেছে। এতে চলতি বছরে ভিয়েতনামের মোট চাল রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ৬৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
থাইল্যান্ডেও চালের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চালের দাম বেড়ে টনপ্রতি ৪৮০ ডলারে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৪৬৫ থেকে ৪৬৮ ডলার। চাল বোঝাইয়ের জন্য বন্দরে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিকারকদের বাড়তি কেনাকাটায় দাম বেড়েছে। অফ-সিজন ফসল কাটার মৌসুম শেষের দিকে থাকায় ব্যবসায়ীরা মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে বন্যার কারণে ধান কাটা ও চাল সংগ্রহের কাজে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রধান ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় চলতি বছর থাইল্যান্ডের চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে। দেশটির চাল রপ্তানিকারক সমিতির আশঙ্কা, এ বছর ৭০ লাখ টন চাল রপ্তানির লক্ষ্য অর্জন নাও হতে পারে। ফলে ভারতের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ, ভিয়েতনামের সম্ভাব্য রপ্তানি চাহিদা এবং থাইল্যান্ডে সরবরাহসংকট—সব মিলিয়ে এশিয়ার চালের বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে আন্তর্জাতিক তিনটি শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির নীতিগত ও ক্রয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় সিঙ্গাপুরের বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড, কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি এবং জাপানের জেরা গ্লোবাল মার্কেটস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে জ্বালানি গ্যাস সংগ্রহ করা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ এবং ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র পৃথক বৈঠকে এসব প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র ২০২৬ সালের ৫১তম সভায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব পাস হয়। উভয় পক্ষের পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির সুযোগও এতে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) দরের চেয়ে শূন্য দশমিক ১৭ মার্কিন ডলার কমে। সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯৯(২) বিধির আলোকে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং বিপি সিঙ্গাপুরকে প্রস্তাবিত দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
একই সভায় চলমান দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) চুক্তির ধারাবাহিকতায় কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয় কমিটি। ২০২৬ সালের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহযোগ্য এই কার্গোর দাম ধরা হয়েছে জেকেএম দরের চেয়ে শূন্য দশমিক ১০ মার্কিন ডলার কম। বিদ্যমান চুক্তির বাইরে ভিন্ন মূল্যে এই অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহের জন্য কাতার এনার্জিকে সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপস্থাপনায় ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকে জাপানের জেরা গ্লোবাল মার্কেটস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়। এই অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং জেরা গ্লোবাল মার্কেটসের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদি বিক্রয়-ক্রয় চুক্তি ও শর্তপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করে তা স্বাক্ষরের পথ উন্মুক্ত হলো।
সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে জনতা ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সাইটগুলোতে প্রবেশাধিকার না থাকায় সাধারণ গ্রাহকরা কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে পারছেন না। আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওয়েবসাইট দুটিতে ঢোকার চেষ্টা করা হলে সেখানে সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত নোটিশ দেখা যায়। দ্রুত সেবা চালুর প্রত্যয় ব্যক্ত করে সাময়িক এই অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে দফায় দফায় চেষ্টা করেও পোর্টালগুলোতে প্রবেশ করা যায়নি।
কয়েক দিন ধরেই দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা চলছে। এই ঝুঁকির কারণে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ওয়েবসাইটও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল, যা টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর আজ সকাল আটটা থেকে পুনরায় সচল হয়েছে। একই প্রেক্ষাপটে অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংকের সাইট বন্ধ করা হলেও বর্তমানে সেগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার সময়েও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন থাকায় গ্রাহকপর্যায়ে লেনদেনে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ওয়েবসাইটে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। বিশ্বব্যাপী হামলার আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় ওয়েবসাইটটি আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।’
বর্তমানে ব্যাংকিংসহ সরকারি সেবা, ই-কমার্স এবং নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অবকাঠামো ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সফটওয়্যারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব ডিজিটাল কাঠামোর বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় পিএইচপি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। সম্প্রতি পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটির সন্ধান মেলার পর থেকেই মূলত বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিন দিন বন্ধ থাকার পর আজ সকাল ৮টায় আবার সচল হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট|
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ওয়েবসাইটটি সচল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন|
বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশঙ্কায় গত ২২ অক্টোবর ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক| ওয়েবসাইট ˆতরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির নিরাপত্তাগত দুর্বলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা থেকে এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়|
পরবর্তী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে| এ সময় ওয়েবসাইটটি বন্ধ ছিল|