২৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ-২০২৫) শুরু হচ্ছে আজ বুধবার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সকাল ১০টায় এ মেলার উদ্বোধন করবেন। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে এই মেলা হতে যাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ মেলার যৌথ আয়োজক। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি ৭ দেশের ১১ প্রতিষ্ঠান এবারের মেলায় অংশ নেবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, হংকং ও মালয়েশিয়া।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এ তথ্য জানান। বাণিজ্যসচিব মোহা. সেলিম উদ্দিন, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টার উপস্থিতিতে বাণিজ্য মেলায় যাত্রী পরিবহনে বিশেষ ছাড় দিতে ইপিবি ও অ্যাপসভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান উবারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর বাণিজ্য উপদেষ্টা ডিআইটিএফে প্রবেশের ই টিকেটিং অ্যাপসের উদ্বোধন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারের বাণিজ্য মেলায় এই প্রথম অনলাইনে বিভিন্ন ক্যাটাগরির স্টল/প্যাভিলিয়ন স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রথম ই-টিকেটিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এবার। মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিআরটিসির নির্ধারিত বাসসেবা থাকবে। পাশাপাশি থাকছে বিশেষ ছাড়ে উবার সেবা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের সম্মানার্থে মেলায় তৈরি করা হয়েছে জুলাই চত্বর ও ছত্রিশ চত্বর। তরুণসমাজকে রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্বুদ্ধ করতে তৈরি করা হয়েছে ইয়ুথ প্যাভিলিয়ন।
মেলায় এ বছরই প্রথম সম্ভাবনাময় খাত/পণ্যভিত্তিক সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে থাকছে স্বতন্ত্র সোর্সিং কর্নার, ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার জোন। বয়সভিত্তিক দর্শনার্থীদের সুবিধায় তৈরি করা হয়েছে প্রযুক্তি কর্নার, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য সিটিং কর্নার। শিশুদের নির্মল চিত্তবিনোদনের জন্য মেলায় থাকছে শিশুপার্ক। মা ও শিশুদের জন্য মেলায় থাকবে মা ও শিশুকেন্দ্র। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য আরামদায়ক এবং শোভন চেয়ার ও বেঞ্চ রয়েছে।
জানানো হয়, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৩৬১টি প্যাভিলিয়ন, স্টল ও রেস্তোরাঁ থাকছে এবারের মেলায়। দেশীয় উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে শত ভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এসব বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশীয় বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, কার্পেট, প্রসাধনসামগ্রী, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, আসবাব, পাট ও পাটজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, চামড়া, আর্টিফিশিয়াল চামড়া, জুতাসহ চামড়াজাত পণ্য, খেলার সামগ্রী, স্যানিটারিওয়্যার, খেলনা, স্টেশনারি, ক্রোকারিজ, প্লাস্টিক, মেলামিন, পলিমার, হারবাল, টয়লেট্রিজ, ইমিটেশন জুয়েলারি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, ফাস্ট ফুড, হস্তশিল্পজাত পণ্য, গৃহসজ্জার উপকরণ ইত্যাদি মেলায় প্রদর্শন ও বিক্রয় হবে।
এক্সিবিশন সেন্টারের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে জুলাই চত্বর, দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে কালচারাল সেন্টার, প্রযুক্তি কর্নার ও বিনোদন কর্নার রয়েছে। সেন্টারের উত্তর-পূর্ব পাশে শিশুপার্ক এবং উত্তর-পশ্চিম পাশে ছত্রিশ চত্বর ও নামাজঘর স্থাপন করা হয়েছে।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মেলা প্রাঙ্গণে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। প্রাঙ্গণের বাইরেও নিয়মিত টহল দল থাকবে। নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বিবেচনায় মেলা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, প্রবেশপথ, পার্কিং এরিয়া ও সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় প্রয়োজনীয়–সংখ্যক সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে।
এবারের মেলায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এক্সিবিশন হলে পুরুষ ও নারীদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক আলাদা টয়লেটের পাশাপাশি এক্সিবিশন হলের বাইরেও পর্যাপ্তসংখ্যক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলায় খাদ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ গঠিত টিম মেলা চলাকালীন প্রতিদিন ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন।
মেলায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিত থেকে বিনা মূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও চিকিৎসা পরামর্শ দেবেন। মেলায় পাঁচ শতাধিক গাড়ি পার্কিং সুবিধাসংবলিত দ্বিতল কার পার্কিং ভবন রয়েছে। এ ছাড়া মেলা কেন্দ্রের বাইরে আছে ছয় একর জমিতে পার্কিংয়ের আলাদা ব্যবস্থা।
মেলার সার্বিক কার্যক্রম তদারকির জন্য মেলায় স্থাপন করা হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও দর্শনার্থীদের সব ধরনের তথ্য দেওয়ার জন্য রয়েছে তথ্যকেন্দ্র। ব্যাংকিং সেবার জন্য মেলায় অনেক ব্যাংক বুথ স্থাপন করেছে। জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাসব্যাপী এ মেলা সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন খোলা থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সৌদি আরবের কৌশলগত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে পুনরায় তেল সরবরাহ শুরু হওয়া এবং চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতে বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এর প্রভাবে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় ধরনের তেলের দামেই পতন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ১৮ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৫ সেন্ট হ্রাস পেয়ে ৯০ ডলার ১৭ সেন্টে লেনদেন হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়টি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও মঙ্গলবার তা আবার চালু করা হয়। লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা যায়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। তবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পিং স্টেশনগুলোর মেরামত সম্পন্ন করে পাইপলাইনটির শতভাগ সক্ষমতায় পৌঁছাতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও জ্বালানি বাজারে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ হ্রাস করে বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব। এর আগে মঙ্গলবারই গত ৮ সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন দরে পৌঁছেছিল।
যদিও যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা আসেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থানের কারণে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনায় বাজার থেকে অতিরিক্ত ঝুঁকির চাপ অনেকটাই কমছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিপথই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে।
ভারতীয় রুপির বিপরীতে বিগত দুই বছরে দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে বাংলাদেশি টাকা। এই দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় মুদ্রার বিপরীতে টাকার মূল্য বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যার মধ্যে কেবল গেল এক বছরেই টাকার মান বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রতি এক টাকার বিপরীতে মিলছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭৮ ভারতীয় রুপি। এর আগে ২০২৫ সালের একই দিনে এক টাকায় পাওয়া যেত প্রায় শূন্য দশমিক ৭২ রুপি এবং ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এর পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৭০ রুপি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রুপির বিপরীতে টাকার মান ৫ দশমিক ৫ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতীয় মুদ্রায় টাকার সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিপরীত হিসাবেও রুপির তুলনায় টাকার শক্তিশালী অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। বর্তমানে এক ভারতীয় রুপি কিনতে যেখানে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ২৮ টাকা, সেখানে গত বছরের একই সময়ে প্রয়োজন হতো প্রায় ১ দশমিক ৩৮ টাকা। অর্থাৎ এক রুপির জন্য এখন আগের চেয়ে ৯ দশমিক ৭২ পয়সা বা ৭ দশমিক ১ শতাংশ কম টাকা লাগছে। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি এক রুপির বিনিময় মূল্য ছিল ১ দশমিক ৪৩ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানেও টাকার এই ইতিবাচক ধারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রুপির বিপরীতে টাকার ক্রস রেট ছিল ১ দশমিক ২৭৮৯ টাকা থেকে ১ দশমিক ২৭৯৬ টাকা, যার ফলে প্রতি টাকার বিপরীতে শূন্য দশমিক ৭৮১ থেকে শূন্য দশমিক ৭৮২ রুপি মিলেছে।
টাকার এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে জানান, রুপির বিপরীতে টাকার শক্ত অবস্থান দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে ইতিবাচক গতি আনবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর ও পণ্য পরিবহন খরচ অপরিবর্তিত থাকলে ভারত থেকে কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। ফলে ভারতীয় পণ্য ও সেবা আমদানির ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাবেন।
বাণিজ্যের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়া সাধারণ বাংলাদেশিরাও এর সরাসরি সুফল পাবেন বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। তাঁর মতে, রুপির মান কমে যাওয়ায় ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের হোটেল ভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ টাকার হিসাবে আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হবে। তবে আমদানি পণ্যের চূড়ান্ত বাজারদর কেবল মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারদর, শুল্ক কাঠামো এবং লজিস্টিক ব্যয়ের ওপরও নির্ভর করে। মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার বিনিময় হারের গতিবিধি সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সদ্য প্রকাশিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’-এ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪ শতাংশের ঘরে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ায় বিদায়ী অর্থবছরের শেষভাগে অর্থনৈতিক গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছিল, তবে সার্বিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত ছিল। বিশেষ করে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চার হওয়া প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এডিবির বাংলাদেশ প্রধান চিংফেং ঝাং জানান, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই অগ্রযাত্রা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। তিনি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিবেশের সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেন।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। এডিবির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশে থাকা সাধারণ মূল্যস্ফীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে খাদ্যপণ্যের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া রপ্তানির তুলনায় আমদানির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ বজায় থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও ডলারের মজুত সুরক্ষায় তা বড় ভূমিকা রাখবে।
অর্থনীতির খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় এডিবি জানিয়েছে, আগামী দিনে কৃষি ও সেবা খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান খুঁটি হিসেবে অবদান রাখবে। তবে ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি স্বল্পতা এবং বহির্বিশ্বে চাহিদা হ্রাসের কারণে শিল্প ও বৃহৎ বিনিয়োগ খাতে কিছু চাপ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম, বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ, টাকার ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্কারের ধীরগতিকে প্রধান অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে সতর্ক করেছে এডিবি।
রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড করেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৪৭৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৯ কোটি ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় করার পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০৮ কোটি ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বা ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
মঙ্গলবার মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিটোরিয়ামে বাগেরহাট ও মোংলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বন্দরের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও আর্থিক সাফল্যের এসব তথ্য তুলে ধরেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। বন্দর কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৮১৫টি জাহাজ এসেছে। এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও বেড়েছে বন্দরের কার্যক্রম। অর্থবছরটিতে ২৫ হাজার টিইইউজের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউজ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৮ হাজার ২৫৮ টিইইউজ বা ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে মোংলা বন্দর দিয়ে ১২ হাজার ৭৫টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বন্দর ব্যবহারকারী, শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্ট, স্টিভেডর ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা হচ্ছে। জাহাজ আগমন বাড়াতে ‘ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি’র মাধ্যমেও কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি, কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউজ এবং গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট। ভবিষ্যতে এ সক্ষমতা আরও বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের আপগ্রেডেশন এবং কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণ।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলে শিপিং, সিএন্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরকে আরও কার্যকর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া এ প্রকল্পের ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধের পাশাপাশি পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমানো এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বন্দরের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে ১৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও তা ধরে রাখা। পাশাপাশি নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি করে মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো এবং সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের সঙ্গে সরাসরি ফিডার জাহাজ চলাচল বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। উন্নয়ন প্রকল্প ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরটির কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ফলে গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) জ্বালানি তেল আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।
বিপিসি’র চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও সরকার জনগণের কথা বিবেচনা করে এতদিন জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। এতে গত প্রায় ছয় মাসে বিপিসিকে অতিরিক্ত ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এবং ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি’র অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ছয় মাসের এই অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবে মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা করে বিপিসির ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ও বিপুল হারে বেড়েছে। আগে যেখানে জাহাজ ভাড়া ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ থেকে ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ ভাড়ার ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিপিসিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসি’র লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৭০ টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা সমন্বয় করা হলে বিপিসির বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ঘোষিত ৩৫০ বিলিয়ন (৩৫ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় প্রথম প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। মঙ্গলবার দেশটির সরকার জানিয়েছে, প্রথম প্রকল্প হিসেবে টেক্সাসে একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক মুনাফা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের মধ্যেই আরও দুটি বড় প্রকল্প বিবেচনায় রাখছে সিউল। রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ানের একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের পর সংসদ সদস্য চুং চিন-উক সাংবাদিকদের জানান, টেক্সাসের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি পারমাণবিক চুল্লিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে সরকার। গত বছরের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার যে সমঝোতা হয়েছিল, তা চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আইনপ্রণেতাদের এই ব্রিফিং দেওয়া হয়।
শিল্পমন্ত্রী কিম রয়টার্সকে জানান, বিনিয়োগের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারি বিনিয়োগ কমিটির অনুমোদন এবং দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের সঙ্গে আরও আলোচনার প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইউনহাপ জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
টেক্সাস বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পারমাণবিক প্রকল্প
তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের এনসিনালে ৬.৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারেরও বেশি। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূলত এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ডেটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। ইউনহাপ জানায়, প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন দক্ষিণ কোরিয়া করলেও এর মালিকানা মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে সমানভাবে (৫০:৫০) ভাগাভাগি করা হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বড় অঙ্কের তহবিল ছাড়ের প্রয়োজন হতে পারে।
চুং চিন-উক আরও জানান, সিউল মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েস্টিংহাউস’-এর ৫ থেকে ১০ শতাংশ শেয়ার কেনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ‘আলাস্কা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’ (এলএনজি) প্রকল্পে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্রে মোট আটটি বড় পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে দুটি নির্মিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব ‘এপিআর১৪০০’ মডেলে এবং বাকি ছয়টিতে ব্যবহার করা হবে ওয়েস্টিংহাউসের ‘এপি১০০০’ ডিজাইন। এছাড়া নিজস্ব মুদ্রা ‘ওন’-এর বিনিময় হারে সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করতে চাইছে।
ট্রাম্পের চাপ ও বাণিজ্যিক মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ
জাপানের মতো অন্যান্য দেশের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া বিনিয়োগ বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাচ্ছে অভিযোগ করে মার্কিন কর্মকর্তারা সমালোচনা করে আসছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন এ নিয়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছিল। এছাড়া ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে পর্যাপ্ত সহায়তা না দেওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘কুপাং’-এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সিউলের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে বিনিয়োগ দ্রুত এগিয়ে নিতে চাইছে সিউল।
এর আগে গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জানান, প্রকল্পভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনায় বাণিজ্যিক উপযোগিতা বা মুনাফার প্রশ্নটি একটি বড় জটিলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং সিউল বিনিয়োগকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক পলিসি গ্রুপ ‘কোরিয়া ইকোনমিক ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা’র জ্যেষ্ঠ গবেষক হিউন জুং জে বলেন, "প্রথম প্রকল্পের ঘোষণা একটি অর্থপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে উভয় দেশ একটি বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করতে পেরেছে, যা উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি প্রতিশ্রুতির চেয়ে এর বাস্তবায়ন ও ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে।"
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সোগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম ইয়ং-জিন বলেন, টেক্সাস বিদ্যুৎ প্রকল্প কোরিয়ান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মার্কিন বাজারে প্রবেশের পথ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ওয়েস্টিংহাউসের অংশীদারিত্ব দক্ষিণ কোরিয়ার মেধা সম্পত্তি রক্ষায় সহায়তা করবে এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা এই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মুনাফা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০ বছরের মুনাফা ফেরত কাঠামোর আওতায় টেক্সাস প্রকল্পটি লাভজনক হবে। দেশটির কৌশলগত বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উপযোগিতাহীন কোনো প্রকল্প যদি জাতীয় নিরাপত্তা বা সরবরাহ শৃঙ্খল রক্ষার স্বার্থে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) মাধ্যমে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি ভালো ও মানসম্মত সরকারি, বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। একই সাথে নতুন তালিকাভুক্তির স্থবিরতা কাটাতে প্রণীত বিধিমালার পাশাপাশি পাঁচটি খেলাপি ব্রোকারেজ হাউজের প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সম্পূর্ণ পাওনা অর্থ আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পরিশোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসইর কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।
ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাজারে ভালো কোনো নতুন আইপিও বা তালিকাভুক্তি না হওয়ায় ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের নতুন খসড়া বিধিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে প্রস্তুতকৃত আরেকটি বিধিমালা আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে জনমত যাচাইয়ের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করতে বন্ডের লিস্টিং ফি কমানোর পাশাপাশি ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ডাইরেক্ট লিস্টিং বা আইপিওর আবেদনকারীদের জন্য লিস্টিং ফিতে ৫০ শতাংশ বিশেষ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে খেলাপি ব্রোকারেজ হাউজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করা হয়। চেয়ারম্যান জানান, মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, বানকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ এবং সালতা সিকিউরিটিজে ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনাদারদের শতভাগ অর্থ ডিএসইর ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে পরিশোধ করা হবে। এর ফলে প্রায় ৯৭ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারী আগামী দুই মাসের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি মাইলফলক নয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।’
বাকি থাকা ৫৯৩ জন বড় অঙ্কের পাওনাদারের অর্থ আদায়ের জন্য দায়ী ব্রোকারেজ হাউজগুলোর শেয়ার ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রিসহ কঠোর আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে বলে জানান ডিএসই চেয়ারম্যান। ব্রোকারেজগুলোর কমিশন ও তহবিলের সুদের অর্থ দিয়ে গঠিত আইপিএফ ফান্ডের এ কার্যক্রমে ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ইতিমধ্যে দোষী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আদালতে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাজারের সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলোকে দেশে আকৃষ্ট করতে পারলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে আসার পথ সুগম হবে। এছাড়া ডিএসই, সিডিবিএল এবং সিসিবি-র সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অনিয়ম রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরতে গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত ত্রৈমাসিক বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং বক্তব্য রাখেন ডিএসইর বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগম।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় আগের কার্যদিবসের ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবারও (২২ সেপ্টেম্বর) দেশের পুঁজিবাজারে দরপতন অব্যাহত ছিল। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর কমায় প্রধান মূল্যসূচক নিম্নমুখী হয়েছে। তবে সূচক কমলেও ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মূলত রবিবার রাতে সরকারের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর সোমবার যে তীব্র দরপতন শুরু হয়েছিল, মঙ্গলবারও বাজারে সেই বিক্রয়চাপের প্রভাব বজায় থাকে।
মঙ্গলবার লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইতে অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দাম কমতে থাকে। লেনদেনের মাঝামাঝি সময়ে সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষভাগে অতিরিক্ত বিক্রয়চাপের কারণে তা স্থায়ী হয়নি। দিনশেষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১০৩টির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দাম বাড়ার বিপরীতে ২২৭টির দর কমেছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৫টির দর। অধিকাংশ শেয়ারের মূল্যহ্রাসের প্রভাবে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের চেয়ে ১০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৪০ পয়েন্টে নেমে আসে। তবে ব্লু-চিপ ৩০ কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক শূন্য দশমিক ২৫ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১০৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০৮ পয়েন্টে স্থিতি পায়।
কোম্পানিগুলোর শ্রেণিভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২টির শেয়ারদর বাড়লেও কমেছে ১১৭টির এবং ১৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের ২০টি কোম্পানির দর বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ৪৭টির দাম। এছাড়া লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২১টির দর বাড়ার বিপরীতে ৬৩টির পতন হয়েছে এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৪টির দাম। লেনদেন হওয়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৯টির দাম বাড়লেও ৭টির কমেছে এবং ৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
প্রধান সূচক হ্রাস পেলেও ডিএসইতে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে মোট ৭৯১ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বেশি। গত ১৮ আগস্টের পর এটিই ডিএসইতে একদিনের সর্বোচ্চ লেনদেন। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ ৩৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন করে শীর্ষে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং। এছাড়া লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় পর্যায়ক্রমে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সায়হাম টেক্সটাইল, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভেলো আইসক্রিম, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, এনভয় টেক্সটাইল এবং একমি পেস্টিসাইড।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮১টির দর বাড়লেও কমেছে ৮৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২৪টির দর। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬ পয়েন্ট কমেছে। পাশাপাশি বাজারটিতে মোট লেনদেনের পরিমাণও কিছুটা কমে ১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ২১ কোটি ২ লাখ টাকা।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ পাইপলাইনে রয়েছে, যার মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে ১৮০ দিনের বিনিয়োগ উন্নয়ন পরিকল্পনার সফল পরিসমাপ্তি শেষে এই অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে নবগঠিত জাতীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’। চলতি বছরের ১৬ মার্চ ঘোষিত এই পরিকল্পনায় তিনটি প্রধান স্তম্ভের অধীনে ১৬টি কর্মধারা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার আওতায় গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিনিয়োগের উৎসের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন, যেখান থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০০ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ মিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে রয়েছে। খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও তৈরি পোশাক খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার করে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের রূপরেখা বিভিন্ন ধাপে রয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উল্লেখ করেন, সরকারকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই ১৮০ দিনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। বিনিয়োগের টেকসই পরিবেশ তৈরি করতে উন্নত ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক সেবা প্রদান এবং উচ্চ সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ পাইপলাইন গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হলেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অর্জিত অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে।
অবকাঠামো খাতের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সাত শতাধিক কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হবে। এছাড়া নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মোংলায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন করপোরেশনের সহায়তায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা শুল্কায়ন ও ব্যাংকিং সেবা চালু এবং ঢাকার তৃতীয় টার্মিনালের আধুনিক কার্গো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বার্ষিক পণ্য পরিবহন সক্ষমতা পাঁচ লাখ টনে উন্নীত করার কাজ চলছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহেশখালীর কুতুবজোমে দৈনিক সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রূপান্তর ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ২০২৮ সালের মধ্যে চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি সোনাগাজীতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে এক ছাতার নিচে ইনভেস্ট বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে, যার মধ্যে ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্যে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরাসরি বিদেশি ইকুইটি আনার ক্ষেত্রে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার চূড়ান্ত নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে, যার জন্য নির্মিত ডিজিটাল পোর্টালটি আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজতর করতে ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্মে দ্রুত লাইসেন্স ও অনুমোদন নিশ্চিতে বিশেষ বিজনেস প্যাকেজ চালু এবং চীনের গুয়াংজুতে সরাসরি লিয়াজোঁ কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটন খাতে পিপিপি মডেলে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী হোটেল শৈবালকে আধুনিকায়নের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা সফল হলে আরও ৫০টির বেশি পর্যটন স্থাপনা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে আধুনিক মৎস্য আহরণ, মহেশখালীতে অ্যাকুয়াকালচার জোন প্রতিষ্ঠা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও সানেমের যৌথ সহযোগিতায় দেশব্যাপী আটটি বিভাগে সমন্বিত বিনিয়োগ মানচিত্রায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে বাংলাদেশের সিংহভাগ তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও ব্যতিক্রম হিসেবে এখনো উৎপাদন সচল রাখতে পেরেছে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘৪এ ইয়ার্ন ডাইং’।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশে ২০১৯ সাল থেকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে আসছে ৪এ ইয়ার্ন ডাইং। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল-নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নতুন করে জ্বালানি ঘাটতি তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ১৩৪টি নিটওয়্যার কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। গত আগস্টের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জেরে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করেছেন কিংবা কমিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ৭৮ শতাংশ কারখানাকে বাধ্য হয়ে আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি কারখানামালিকরা সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারা এবং লোকসান এড়াতে ছাড় দিয়ে কম মূল্যে অর্ডার নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
তবে ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত ৪এ কারখানায় এখনো স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রয়েছে। প্রায় ৭ হাজার ৫০০ শ্রমিকের এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ মেটায় নিজস্ব সৌর প্যানেল থেকে। বাকি চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হয় নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম স্বত্বাধিকারী আবদুল্লাহিল নাকিব বলেন, "আমরা কখনোই একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকিনি। সবকিছুর জন্যই আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা ছিল। আমাদের একধরনের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তবে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে গেছে। প্রথমে তেলের সংকট ছিল, এরপর গ্যাসের সংকট।" তিনি জানান, ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে তাদের উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যার ফলে মাসে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা (৪০ হাজার ৯৫০ ডলার)।
এদিকে, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে গত সোমবার জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের এই পদক্ষেপে পোশাক কারখানাগুলোর ওপর খরচের চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহজনিত ঝুঁকি এড়াতে ৪এ এখন শিল্পমানের একটি বড় ব্যাটারি ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন অব্যাহত রাখা যায়। কারখানার প্রায় পুরো ছাদ সৌর প্যানেলে ঢেকে রাখা নাকিব বলেন, "আমরা এই অতিরিক্ত খরচ সামাল দিতে পেরেছি, কিন্তু প্রতিটি কারখানার পক্ষে তা করা সম্ভব নয়।"
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী গত সপ্তাহে উল্লেখ করেন, গ্যাস আমদানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে শিল্প প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হচ্ছে, লোডশেডিং বাড়ছে এবং গ্যাসে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় বরাদ্দ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান অপরিসীম। জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের কারণে যথাসময়ে ক্রেতাদের পণ্য পৌঁছে দিতে অনেক প্রস্তুতকারককে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিমানে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, আবার অনেককে দিতে হচ্ছে বিশেষ মূল্যছাড়। পোশাক রপ্তানিকারক শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, "আমাদের মুনাফার হার এমনিতেই খুব কম, আর জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে তা আরও সংকুচিত হবে। প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখে একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার চাপ সামলানো আমাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।"
আজিম আরও জানান, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ায় কানাডার একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার দেওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত তারা মাত্র ৮ হাজার পিসের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দিয়েছে।
এইচঅ্যান্ডএমসহ বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কোম্পানিগুলো হয়তো বর্ধিত জ্বালানি ব্যয় কোনোভাবে বহন করতে পারবে; কিন্তু অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ও লোডশেডিং বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারতে এ ধরনের সংকট এতটা তীব্র নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা অন্য সোর্সিং দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারব, নাকি তাদের কাছে অবস্থান হারাব, তা নির্ভর করবে আমরা পরিস্থিতিটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারি তার ওপর।"
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে নীতিমালায় বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সুতা ও কাপড় আমদানির জন্য পোশাক রপ্তানিকারকদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আলাদা কোনো পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না। মাত্র এক মাস আগে জারি করা আমদানি নীতি আদেশে এ শর্তটি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও উদ্যোক্তাদের আপত্তির প্রেক্ষিতে তা বাতিল করে গত রবিবার সংশোধিত আদেশ জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে পোশাকশিল্পের প্রধান এই দুই কাঁচামাল সংগ্রহের প্রশাসনিক জটিলতা দূর হওয়ার পাশাপাশি সময় সাশ্রয় হবে।
আমদানি নীতি আদেশের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন করে শিল্প স্থাপনের পথও সহজ করা হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ছাড়াই কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থাপিত কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক ও সচল রাখতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রেও আলাদাভাবে আইআরসি থাকার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
আমদানিকৃত পণ্যের বিমা পলিসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও আধুনিকায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী, সাধারণ বীমা করপোরেশন, দেশীয় কোনো বাণিজ্যিক বিমা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ইস্যুকৃত কভার নোট ও বিমা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র পণ্য খালাসের সময় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে অনলাইনে জমা দিতে হবে।
এর পাশাপাশি শিল্প খাতে লবণ আমদানির নিয়মেও পরিবর্তন এনেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন বিধিমালার আলোকে বড় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো কী পরিমাণ অপরিশোধিত লবণ আমদানি করতে পারবে, তা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত বার্ষিক চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী প্রকৃত ব্যবহারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। এর ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদার অতিরিক্ত লবণ আমদানি করে বাজারে কৃত্রিম পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হবে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পরও তিন বছরের রূপান্তরকালীন সময়ে যুক্তরাজ্যের বাজারে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান। রূপান্তরকালীন এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটির বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য দীর্ঘমেয়াদে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকের সঙ্গে চেম্বার কার্যালয়ে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ তথ্য জানান।
জেমস গোল্ডম্যান জানান, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তির ব্যবহারকারী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অর্থায়নে ব্রিটিশ সরকার দুই বিলিয়ন পাউন্ডের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এই তহবিলের সহায়তায় দেশীয় রপ্তানিকারকরা ব্রিটিশ বাজারে নিজেদের উপস্থিতি ও পণ্যের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশের আইনি প্রক্রিয়া, বাণিজ্য নীতি ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিশদভাবে অবহিত করতে খুব শিগগিরই চিটাগাং চেম্বারে একটি নির্দেশনামূলক কর্মশালার আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক চট্টগ্রামকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক হাব হিসেবে রূপান্তরের ভূকৌশলগত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বন্দর অবকাঠামো ও আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্রিটিশ বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন। বিশেষ করে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ওষুধ শিল্প, টেক্সটাইল, ইস্পাত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো সম্ভাবনাময় বৃহৎ খাতে সরাসরি ব্রিটিশ বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করার অনুরোধ করেন চেম্বার সভাপতি।
উক্ত আলোচনা সভায় চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী আলী আহমেদ ও আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর সাকিব এরশাদসহ চেম্বারের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে যে ডিজেল সংকট তৈরি হয়েছে, তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষকেরা। এর ফলে জ্বালানি তেলের চড়া দাম বিশ্ব অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য এবং রাশিয়া থেকে বিশ্ববাজারে ডিজেল পরিবহনে ব্যাপক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশে জ্বালানিটির মজুত নজিরবিহীনভাবে তলানিতে নেমে এসেছে। মজুত ঘাটতির কারণে ডিজেলের মূল্য ইতোমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল জ্বালানি খাতেই নয়, বরং কৃষি, ভারী যানবাহন এবং উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাত ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এই সংকটের বিরূপ প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ছড়িয়ে পড়ছে।
এই জ্বালানি সংকটের তীব্রতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে চলতি মাসেই খুচরা পর্যায়ে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ছয় ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানির এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির ফলে দেশটির কৃষক ও পরিবহনকর্মীদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা সার্বিক মার্কিন অর্থনীতিতে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে জ্বালানির এমন মূল্যবৃদ্ধি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে রয়টার্সের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিজেল সংকট সহসাই প্রশমিত না হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে জ্বালানি সংরক্ষণ সংক্রান্ত বাজারেও। জ্বালানি স্টোরেজ ব্রোকার সংস্থা দ্য ট্যাংক টাইগারের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উত্তর আমেরিকার তেল পরিশোধনাগার এবং জ্বালানি খাতের ব্যবসায়ীরা তেল মজুতের জন্য ভাড়া নেওয়া গুদাম বা স্টোরেজের চুক্তি আর নবায়ন করছেন না। বাজারে সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত ডিজেল না থাকাই এর মূল কারণ। অর্থাৎ, বর্তমান সরবরাহ সংকট সামাল দিতে গিয়ে কোম্পানিগুলো নতুন করে জ্বালানি মজুত করার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিদ্যমান মজুত পরিস্থিতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যেও ডিজেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইরান ও ইউক্রেনের সংঘাত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতায় বাজারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উচ্চমূল্যের ডিজেল বিশ্বব্যাপী কৃষি, পণ্য পরিবহন ও শিল্প কারখানার ব্যয় বাড়াতে থাকবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচে। সার্বিকভাবে এই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিরাট চাপ হিসেবে রয়ে যাবে।