সদ্য সমাপ্ত ২০২৪ সালে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে ডিএসইতে লেনদেন হয় ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এই লেনদেন তার আগের বছরের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম ছিল। ২০২৪ সালে একদিনে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১০ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালে এক দিনে সর্বোচ্চ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। ডিএসইর বার্ষিক বাজার পর্যালোচনা প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৩৫ কার্যদিবস। আগের বছরে যেখানে লেনদেন হয়েছিল ২৪৪ কার্যদিবস। অথাৎ সর্বশেষ বছরে ডিএসইতে লেনদেন কম হয়েছে ৯ কার্যদিবস। কার্যদিবস কমা সত্বেও টাকার অংকে ২০২৪ সালে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি। তবে আলোচ্য বছরে ডিএসইর ব্লোক মার্কেটে লেনদেন কমেছে। এ বছরে মাত্র ৯ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৪০ শতাংশ কম। আগের বছরে ব্লক মার্কেটে লেনদন হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ। ওই লেনদেন তার আগের বছরের লেনদেনের তুলনায় দশমিক ৫৩ শতাংশ কম ছিল।
এসএমই মার্কেটে লেনদেন বেড়েছে ৮৮%
ডিএসইর এসএমই মার্কেটে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি। আগের বছরে এ মার্কেটে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ। এই লেনদেন তার আগের বছরের চেয়ে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম ছিলো।
বেড়েছে মোবাইল অ্যাপে লেনদেনও
এদিকে ডিএসইতে সর্বশেষ বছরে মোবাইল অ্যাপে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। তবে কমেছে অ্যাপ ব্যবহার করে লেনদেনকারীর সংখ্যা। এক্সচেঞ্জটিতে আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ।
তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ডিএসইতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ২১ হাজার ২৯৯ কোটি ৮৮ লাখ ৩০ হাজার টাকার শেয়ার, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট, যা মোট লেনদেনের ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার টাকার, যা সেই বছরের মোট লেনদেনের ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে ডিএসইতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৪ হাজার ৪৫১ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা বা ২৬ দশমিক ৪২ শতাংশ।
২০২৪ সাল শেষে মোবাইল ফোনে লেনদেনকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৪৩৩ জনে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৩২ হাজার ৬৮৮ জন। সে হিসাবে বছরের ব্যবধানে ডিএসইতে মোবাইল ফোনে লেনদেনকারীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ২৫৫ জন বা ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০২৪ সালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচার জন্য মোট ১ কোটি ৬ লাখ আদেশ পাঠানো হয়৷ এর মধ্যে ১ কোটি ৪ হাজার আদেশ কার্যকর হয়েছে ৷
বাজার মূলধন কমেছে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি
২০২৪ সালে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দরপতন হওয়া বাজার মূলধনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আলোচ্য বছর শেষে এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। বছরের শুরুতে যা ছিল ৭ লাখ ৮০ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসেবে ২০২৪ সালে বাজার মূলধন কমেছে ১৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। আলোচ্য বছরে ডিএসইর বাজার মূলধন সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকায় উন্নিত হয়েছিল। আর বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩৪৯ কোটিতে নেমেছিল এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন।
আইপিও তালিকাভুক্তিতে ধস
দেশের পুঁজিবাজারে টানা দুই বছরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) বড় খরা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে মাত্র চারটি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আগের বছরও চারটি কোম্পানি আইপিওতে অর্থ উত্তোলন করেছিল। পরপর দুই বছরে এত কম আইপিও স্মরণকালের মধ্যে আর দেখা যায়নি। মূলত ২০২৩ সালে আইপিওতে রীতিমতো ধস নামে, যা অব্যাহত থাকে ২০২৪ সালেও। ২০২৪ সালে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করা চার কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস। এ চার কোম্পানির মধ্যে এনআরবি ব্যাংক স্থির-মূল্য পদ্ধতিতে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে। বাকি তিনটি কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে এসেছে। এনআরবি ব্যাংক আইপিওতে শেয়ার ছেড়ে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। বাকি তিন কোম্পানির মধ্যে বেস্ট হোল্ডিং ৩৫০ কোটি টাকা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ৯৫ কোটি এবং টেকনো ড্রাগস ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। অর্থাৎ চারটি কোম্পানি আইপিওতে শেয়ার ছেড়ে মোট ৬৪৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে।
এর আগে ২০২৩ সালে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শিকদার ইন্স্যুরেন্স এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড আইপিওতে আসে। অর্থাৎ ২০২৩ সালে তিনটি কোম্পানি এবং একটি মিউচুয়াল ফান্ড আইপিওতে আসে। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংক ৭০ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১৬ কোটি টাকা, শিকদার ইন্স্যুরেন্স ১৬ কোটি এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। অর্থাৎ চারটি প্রতিষ্ঠানের উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণ ছিল ২০২ কোটি টাকা।
বন্ড তালিকাভুক্তিও নিম্নমুখী
২০২৪ সালে মাত্র দুটি পার্পিচুয়াল বন্ড ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক ফাস্ট পার্পিচুয়াল বন্ড ৫০০ কোটি এবং ইউসিবি ব্যাংক সেকেন্ড পার্পিচুয়াল বন্ড ইস্যু করে ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে ৪টি পার্পিচুয়াল বন্ড ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়ে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল। এর মধ্যে এবি ব্যাংক পার্পিচুয়াল বন্ড ৬০০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক পার্পিচুয়াল বন্ড ২০০ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পার্পিচুয়াল বন্ড ৫০০ কোটি এবং ব্যাংক এশিয়া ফার্স্ট পার্পিচুয়াল বন্ড ইস্যু করে ৯৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ট্রানজিট ফি নিজস্ব মুদ্রা ‘রিয়াল’-এ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের দিকে নতুন বার্তা দিচ্ছে দেশটি।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) মুম্বাইয়ে অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেট জেনারেলের সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
পোস্টটিতে ইরানের পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশনের প্রধানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, সংসদীয় এক প্রস্তাবের অধীনে এই ফি এখন থেকে ইরানের জাতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের প্রভাব কমাতে ইরান ও চীন দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প পথ খুঁজছে, যা এই উদ্যোগে নতুন মাত্রা পেল।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপের সময় ইরান ‘ডি ফ্যাক্টো টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছিল। তখন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ট্রানজিট ফি হিসেবে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’ গ্রহণ করা হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক শিপিংবিষয়ক গণমাধ্যম লয়েড’স লিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধ চলাকালে কতটি জাহাজ ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে তা স্পষ্ট না হলেও, ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ এই পদ্ধতিতে ফি দিয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা ও অস্থির চাপের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি পণ্য রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি। রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেশি হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির অস্থিতিশীল বাজার এই বিশাল ঘাটতির প্রধান কারণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় বাংলাদেশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
রপ্তানি আয়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মার্চ মাসে রপ্তানিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে মার্চে রপ্তানি হয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছরের এই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৫ কোটি ডলার। এই পতনের পেছনে প্রধান পাঁচটি খাত—তৈরি পোশাক, চামড়া, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাটজাত পণ্যের দুর্বল পারফরম্যান্সকে দায়ী করা হচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এরপর টানা সাত মাস রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা ও ডালের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক আমদানি ব্যয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে রপ্তানি আয় হয়েছে মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যে ভোগ্যপণ্য আমদানির কারণে বাণিজ্য ঘাটতির এই ব্যবধান গত এক বছরের ব্যবধানে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। রপ্তানি আয়ের শ্লথগতি এবং আমদানির উচ্চমূল্য মূলত এই দ্বিমুখী সংকটের মূল কারণ।
বাণিজ্যিক এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে প্রায় সাড়ে ২২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। এমনকি এপ্রিলের প্রথম আট দিনেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় দেশে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। শক্তিশালী এই প্রবাহ না থাকলে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারত। পাশাপাশি আর্থিক হিসাবেও ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত থাকায় এবং রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে ফিরে আসায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজার বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে অবস্থান করছে এবং আইএমএফ-এর বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে। যদিও রেমিট্যান্সের কল্যাণে রিজার্ভ এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এই স্বস্তি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর ভরসা না করে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং জ্বালানি আমদানিতে বিকল্প ও সাশ্রয়ী উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় আমদানির ক্রমবর্ধমান চাপ ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ এক মাসের স্থবিরতা ও দরপতন কাটিয়ে অবশেষে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে ব্যাংক খাত। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে সংশয় ও নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, বিদায়ী সপ্তাহে তার বিপরীতে ব্যাংক খাতের শেয়ারে উল্লেখযোহ্য উর্ধ্বমুখিতা দেখা গেছে। মূলত শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)—উভয় বাজারেই সূচক ও লেনদেনের পরিমাণে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩৮ পয়েন্ট বা দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ২৫৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে ডিএস-৩০ সূচক এবং শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস-ও গত সপ্তাহে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। পুরো সপ্তাহে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোম্পানির দরপতন ঘটলেও বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর দরবৃদ্ধি সূচককে টেনে তুলতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার দর বৃদ্ধি সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
পুঁজিবাজারের এই পরিবর্তনের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সপ্তাহের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল, যার ফলে শুরুর কার্যদিবসগুলোতে বড় ধরণের বিক্রয় চাপ দেখা দেয়। তবে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়লে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয় এবং বাজারে বড় ধরণের উত্থান ঘটে। যদিও যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার কারণে শেষ কার্যদিবসে সূচক কিছুটা পয়েন্ট হারিয়েছে, তবুও সপ্তাহ শেষে সামগ্রিক ফলাফল ছিল ইতিবাচক।
খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্রে দেখা গেছে, বরাবরের মতো ওষুধ ও রসায়ন খাতের আধিপত্য বজায় ছিল। ডিএসইর মোট লেনদেনের প্রায় ১৬ শতাংশ দখল করে এই খাতটি শীর্ষে অবস্থান করছে। এর পরেই রয়েছে প্রকৌশল এবং ব্যাংক খাত। বিদায়ী সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি মুনাফা বা রিটার্ন এসেছে চামড়া খাত থেকে, যার পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ব্যাংক এবং কাগজ ও মুদ্রণ খাতও বিনিয়োগকারীদের ১ দশমিক ৭ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে। বিপরীতে, মিউচুয়াল ফান্ড এবং জীবন বীমা খাতের বিনিয়োগকারীরা গত সপ্তাহে কিছুটা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন।
দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ১৪ হাজার ৭৭৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের পাশাপাশি সিএসইতে লেনদেনের গতিও ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। আগের সপ্তাহের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ ১৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে এবং ব্যাংক খাতের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকে, তবে আগামী সপ্তাহগুলোতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বাজার শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের প্রতি সচেতন থেকে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে গত কয়েকদিনের তুলনায় সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি সবজির দামই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিক্রেতাদের মতে, দেশে চলমান জ্বালানি তেলের অপ্রতুলতার কারণে পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া এবং শীতকালীন অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়ে আসাই এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ। সরবরাহ সংকটের প্রভাবে খুচরা বাজারে সবজিভেদে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর শান্তিনগর, মালিবাগ ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ সবজিই এখন কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকার ঘরে অবস্থান করছে। গোল বেগুন ও ঝিঙ্গা প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বরবটি, চিচিঙ্গা, করলা এবং পটল কেজিপ্রতি ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। পেঁপে ও শসা প্রতি কেজি ৬০ টাকা এবং টমেটো ও মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কাঁচা মরিচের বাজারেও ঝাল বেড়েছে বেশখানিকটা, মানভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ এখন ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
বাজারে আসা ক্রেতারা এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শান্তিনগর বাজারে বাজার করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় সব ধরনের সবজির দামই বাড়তি। পকেটে বাড়তি টাকা নিয়ে না আসলে ব্যাগ ভর্তি করে বাজার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা ঠিক রাখা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতির জন্য মূলত লজিস্টিক সমস্যা ও মৌসুম পরিবর্তনকে দায়ী করছেন। মালিবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা আফজাল হোসেন মৃধা জানান, পাইকারি বাজারে সবজির সরবরাহ আগের চেয়ে অনেক কমেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গ্রাম থেকে সবজি নিয়ে আসা ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়েও দাম চড়া। এর ওপর শীতকালীন সবজি এখন শেষের পথে, আর গ্রীষ্মকালীন সবজি পুরোপুরি বাজারে আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সরবরাহের ঘাটতি থাকায় দাম কিছুটা বেশি যাচ্ছে। তবে নতুন মৌসুমি সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে আসা শুরু করলে বাজারের এই অস্থিরতা কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শাক-সবজির পাশাপাশি অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও কিছুটা উর্ধ্বমুখী। লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং সজিনা প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো সবজিগুলোও প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজার তদারকি জোরদার করা না হলে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বর্তমানে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রাত্যহিক খাবারের খরচ মেটানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক প্রবণতা বজায় রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। সর্বশেষ হিসাবে মোট (গ্রস) রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪,৬৪৫.০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৪.৬৫ বিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯,৯৫২.৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৯.৯৫ বিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, প্রবাসী আয় এবং আমদানি ব্যয়ের ওঠানামার ওপর নির্ভর করেই রিজার্ভের এই অবস্থান নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ধারা রিজার্ভকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমান রিজার্ভ দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় নির্বাহ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ব্যবহারযোগ্য মজুদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত চামড়া শিল্পের টিকে থাকার স্বার্থে কর ও ভ্যাট ছাড়ের দাবি তুলেছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ট্যানারি শিল্পে ব্যবহৃত ৪৩ ধরনের কেমিক্যাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানোর বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদন ব্যয় কমানো জরুরি। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলে রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের মতে, শতভাগ রফতানিমুখী ট্যানারি কারখানার জন্য কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত কেমিক্যাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে উৎস কর ও ভ্যাট পুরোপুরি তুলে দেওয়া প্রয়োজন।
উদ্যোক্তারা আরও বলেন, কাঁচা চামড়া একটি পচনশীল কৃষিপণ্য হওয়া সত্ত্বেও এর ওপর ৩ শতাংশ উৎস কর আরোপ করা হয়েছে, যা শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তারা এ কর বাতিল করে কাঁচা চামড়াকে আবার করমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
শিল্প মালিকরা জানান, বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানির ওপর ভ্যাটমুক্ত সুবিধা কার্যকর করতে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি, কারণ এসব খাতে বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
বর্তমানে ট্যানারি খাতে ব্যবহৃত কেমিক্যাল, যন্ত্রপাতি ও এক্সেসরিজের বেশিরভাগই আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট করের বোঝা ৩০ শতাংশের বেশি, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমান নীতিমালায় শর্তসাপেক্ষে কিছু শুল্ক ছাড় থাকলেও কেমিক্যাল আমদানিতে ভ্যাট এখনও ১৫ শতাংশ রয়েছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, মূল্যভিত্তিক শুল্কের ৩ শতাংশের বেশি অংশ অব্যাহতি এবং ভ্যাট কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হোক।
তাদের মতে, এসব সুবিধা দেওয়া হলে ট্যানারি শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, অনিয়মিত আমদানি কমবে এবং উৎপাদন ও রফতানি বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বিজনেস কন্টিনিউটি ইন্সটিটিউট কর্পোরেট ইউকে-এর সদস্যপদ অর্জন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স এন্ড পাবলিকেশন্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে নতুন মাইলফলক বিজনেস কন্টিনিউটি ইন্সটিটিউট কর্পোরেট ইউকে-এর সদস্যপদ অর্জন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি-সহনশীলতা আরো জোরদার করার লক্ষ্যে বিদ্যমান বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান ২০১৫-এর উন্নত সংস্করণ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত পেশাগত সংস্থা বিজনেস কন্টিনিউটি ইন্সটিটিউটের সদস্যপদ অর্জন করেছে। এই অর্জন বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা ব্যাংকের বিজনেস কনটিনিউটি ম্যানেজমেন্ট অপারেশনাল রেসিলিয়েন্স সংক্রান্ত কার্যক্রমকে আরো সুসংহত ও আধুনিক করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিসিআই একটি বিশ্বস্বীকৃত সংস্থা, যা বিজনেস কন্টিনিউটি ম্যানেজমেন্ট অপারেশনাল রেসিলিয়েন্স বিষয়ে বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ, গবেষণা পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে।
অর্গানাইজেশনাল বিসিআই-এর সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বিজনেস কন্টিনিটি ম্যানেজমেন্ট রেসলিয়েন্স সংক্রান্ত সর্বাধুনিক জ্ঞান, গাইডলাইন, টুলস এবং আন্তর্জাতিক বেস্ট প্র্যাকটিসসমূহে সরাসরি প্রবেশাধিকার লাভ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন, সেমিনার, গবেষণা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাবেন, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সুপরিচিত আর্থিক ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার পেশাজীবী বিসিআই-এর সাথে সম্পৃক্ত এবং এর বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে থাকে, যা এটিকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই সদস্যপদ বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, যা শুধু অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরো সুদৃঢ় করবে।
দেশের বাজারে একদিনের ব্যবধানে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের সংশোধন এসেছে। দাম বাড়ানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভরিতে ৪ হাজার ৪৩২ টাকা কমানো হয়েছে, যা বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন এ দর ঘোষণা করে, যা সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন নির্ধারণ অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকা। আগের দিন বুধবার (৮ এপ্রিল) একই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৪০৯ টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন দামে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ভরি ২ লাখ ২ হাজার ৮৯৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৯ টাকা।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও কমানো হয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৭১৫ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের রুপা ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হবে।
বিশ্ববাজারের ওঠানামার প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ছে। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় দেশে ভালো মানের স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছিল। তবে বৈশ্বিক দর কমার সঙ্গে সঙ্গে এখন দেশেও বড় ধরনের সমন্বয় দেখা যাচ্ছে।
করোনার পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে সোনার দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। দেশে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা অতিক্রম করে।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সহজ করতে জেটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যৌথভাবে কাজ করবে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এ দুই সংস্থার মধ্যে জেটি নির্মাণসংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
বেজার নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, প্রকল্পে বেজা জমি দেবে এবং জেটি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে বিআইডব্লিউটিএ। তিনি বলেন, নতুন জেটিটি মীরসরাইয়ের পশ্চিম পাশে সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হবে, যেখানে ছোট জাহাজে পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং বিনিয়োগকারীরা সরাসরি পণ্য ওঠানামার সুবিধা পাবেন।
তিনি আরও বলেন, "প্রকল্পে প্রফিট শেয়ারিং মডেল প্রয়োগ করা হবে এবং এর বিস্তারিত চুক্তি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। জেটি স্থাপন ও পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় করা হবে, যা শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের লজিস্টিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।"
বেজা জানায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই এবং ফেনির সোনাগাজী উপকূলজুড়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল এনএসইজেড। এখানে শিল্পকারখানার পাশাপাশি নগর সুবিধাও সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
এ অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে এবং আরও অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠান নির্মাণাধীন। জেটি চালু হলে এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহন দ্রুত ও নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং নৌপরিবহন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুননাহার চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, জেটি নির্মাণে বেজার সঙ্গে চুক্তি আজই সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, "প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে এগিয়ে চলছে; জমি নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।"
জেটিটি মূলত শিল্পপণ্যের পরিবহনে ব্যবহৃত হলেও পর্যটন ও অন্যান্য নৌপরিবহন কার্যক্রমও এখানে সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ ও বেজা যৌথভাবে নির্মাণ, নিরাপত্তা ও পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ করছে।
প্রাথমিকভাবে তিনটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার একটি পরিচালনা করবে বিআইডব্লিউটিএ এবং বাকি দুটি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত এলাকায় কন্টেইনার টার্মিনালসহ রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে টেকসই সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি স্থল, নৌ ও সমুদ্রবন্দর এবং রেল সংযোগের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও দক্ষ লজিস্টিক অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় লজিস্টিক নীতির আওতায় উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর, সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর সৃষ্ট ইতিবাচক প্রবণতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি দেশের শেয়ারবাজারে। একদিনের বড় উত্থানের পরপরই অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে আবারও তীব্র দরপতন দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বাজারে বড় উত্থান হলেও, পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সেই ধারা উল্টে যায়। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের বড় পতনের পাশাপাশি লেনদেনও কমে যায়।
এর আগে যুদ্ধবিরতির খবরে ডিএসইর প্রধান সূচক একদিনেই ১৬১ পয়েন্ট বেড়েছিল এবং লেনদেনও প্রায় হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছায়। তবে যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননে ইসরায়েলের হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমতে থাকে এবং পুরো সময়জুড়েই এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে। ফলে দিনের শেষে সবকটি সূচকই বড় পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে।
দিন শেষে ডিএসইতে দাম বাড়ে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের, বিপরীতে কমে ৩০৬টির এবং অপরিবর্তিত থাকে ১৪টির শেয়ার ও ইউনিট। ভালো লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতনের চাপ বেশি ছিল। একই চিত্র দেখা যায় মাঝারি ও দুর্বল কোম্পানির ক্ষেত্রেও, যেখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর কমেছে।
মিউচুয়াল ফান্ড ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও বড় অংশের দরপতন হয়েছে, যা সামগ্রিক বাজারে নেতিবাচক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের প্রভাবে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৬০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৫৭ পয়েন্টে নেমে আসে। ডিএসই-৩০ সূচক ২৩ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ২ পয়েন্টে দাঁড়ায় এবং শরিয়াহ সূচক ১২ পয়েন্ট হারিয়ে ১ হাজার ৬৩ পয়েন্টে অবস্থান করে।
লেনদেনও কমে ৭৭৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় নেমে আসে, যা আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
লেনদেনে এগিয়ে ছিল খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, একমি পেস্টিসাইড এবং লাভেলো আইসক্রিম। এছাড়া ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, সিটি ব্যাংক, কেডিএস এক্সসরিজ, মনোস্পুল বাংলাদেশ, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, ওরিয়ন ইনফিউশন ও বিডি অটোকার লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সিএএসপিআই সূচক কমে ৪৪ পয়েন্টে নেমে আসে। সেখানে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম কমার সংখ্যা ছিল বেশি এবং লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
দেশের চিনিকলগুলোকে সচল ও আধুনিক করতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘গতকালও একটা ইনভেস্টর আমরা চিনিকলের জন্য পেয়েছি। তারা ইউকেভিত্তিক। তারা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ইনভেস্ট করবে।’
বিনিয়োগকারীরা শুধু চিনি পরিশোধন নয়, আখের উপজাত ব্যবহারের দিকেও নজর দিচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তারা সুগার রিফাইনসহ আমাদের আখের যে ছোবড়া (আখ) এটাকে কাজে লাগাতে চায়। আমরা তাদের বলেছি—এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা করবো, যাতে আমরা খুব দ্রুত এমওইউ দিতে পারি।’
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খানসহ অন্যরা।
শিল্প সচিব বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে, সেগুলোকে সচল রাখতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের খোঁজা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, আমাদের সেগুলো যাতে সক্রিয় হয়। আমাদের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪টা প্রতিষ্ঠান, তার অধীনে প্রায় দেড়শ’র মতো আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু বেশিরভাগই লোকসান হয়। এগুলো বাঁচানোর জন্য আমরা বিভিন্ন ইনভেস্টর খুঁজছি। দেশি-বিদেশি ইনভেস্টর খুঁজছি।
সরকারি কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, আমরা বর্তমান সরকার এগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমাদের সরকারের যে সমস্ত কার্যক্রম আছে, আমাদের ৬ মাসের একটা টার্গেট দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয় থেকে। আমরাও সেটা দিয়েছি যে কী কী করবো। এগুলো করার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত এই যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার চেষ্টা করছি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঘিরে বৈশ্বিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বাংলাদেশ এখন বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানিতে জোর দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া থেকে পরিশোধিত অকটেন ও ফার্নেস অয়েল বহনকারী দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে।
বুধবার রাতে ‘এমটি সেন্ট্রাল স্টার’ নামের একটি জাহাজ ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে বন্দরের বহির্নোঙরের ব্রাভো অ্যাংকরেজে নোঙর করে। একই সময়ে ‘এমটি ইস্টার্ন কুইন্স’ ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে চার্লি অ্যাংকরেজে অবস্থান নেয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সচিব সৈয়দ রেফাত হামিম।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বিঘ্নের সম্ভাবনা থাকায় এখন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, আর অবশিষ্ট অংশ সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়।
চলতি এপ্রিল মাসে দেশের ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন ধরা হয়েছে। এই চাহিদা পূরণে আমদানি কার্যক্রম ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে এবং এ মাসে আরও সোয়া ৩ লাখ টন ডিজেল আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে সরবরাহ উৎস বহুমুখী করাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সিমেন্ট শিল্পে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি সিমেন্ট শিল্পের উদ্যোক্তাদের, কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় লোকসান গুনেও কর দিতে হচ্ছে অনেক উৎপাদনকারীকে। উদ্যোক্তাদের মতে, এআইটিকে ন্যূনতম কর হিসেবে ধরার কারণে অতীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা শিল্পের জন্য চাপ বাড়িয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়, কিছুদিন আগেও এআইটিকে নূন্যতম কর হিসেবে গণ্য করায় লোকসান করার পরেও অনেক সিমেন্ট উৎপাদনকারীকে আয়কর দিতে হয়েছে। আইনে অতিরিক্ত অগ্রিম আয়করকে পরবর্তী বছরের জন্য জের টানা বা ক্যারি ফরোয়ার্ডের সুযোগ দেয়া হয়। যদিও এতে সিমেন্ট শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য মালিকদের তেমন কোনো উপকার হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে কাঁচামাল আমদানিতে পণ্যভেদে ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে এআইটি দিতে হয়, পাশাপাশি বিক্রির সময়ও ২ শতাংশ এআইটি পরিশোধ করতে হয়। এ হার কমিয়ে উভয় ক্ষেত্রেই দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে গতকাল সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাতের মোট ১২টি সংগঠনকে নিয়ে এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
আলোচনায় বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবে বলা হয়, কিছুদিন আগেও এআইটিকে নূন্যতম কর হিসেবে গণ্য করায় লোকসান করার পরেও অনেক সিমেন্ট উৎপাদনকারীকে আয়কর দিতে হয়েছে। আইনে অতিরিক্ত অগ্রিম আয়করকে পরবর্তী বছরের জন্য জের টানা বা ক্যারি ফরোয়ার্ডের সুযোগ দেয়া হয়। যদিও এতে সিমেন্ট শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য মালিকদের তেমন কোনো উপকার হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্রিম আয়করের হার এতই বেশি যে প্রতি বছরই তা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মুনাফার পরিমাণ অনেত কম হওয়ায় প্রকৃত আয়করও কম হয়। এজন্য আমদানি ও বিক্রয় পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর সর্বোচ্চ দশমিক ৫ শতাংশ করা হোক।
এছাড়া উদ্যোক্তারা বলেন, প্রকৃত আয়করের তুলনায় এআইটি বেশি হলে তা প্রতিবছর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
সভায় আরও তুলে ধরা হয়, সিমেন্টের প্রধান পাঁচটি কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানি মূল্যের চেয়ে বেশি অ্যাসেসেবল ভ্যালু নির্ধারণ করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে লাইমস্টোনের ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ভ্যাট নির্ধারণে ট্যারিফ পদ্ধতি চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।