রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালে দেশে সিমেন্ট বিক্রি কমেছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি প্রকল্প বন্ধ থাকায় গত বছর দেশে সিমেন্ট বিক্রি কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, এসব কারণে নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বড় প্রকল্পগুলো বন্ধ থাকায় সিমেন্টশিল্পে মন্দা বেড়েছে।
প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সিমেন্টশিল্প আগেও সংকট মোকাবিলা করেছে। আশা করছি, আগামীতে এই শিল্পের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আছে।’
তার মতে, একদিকে সিমেন্টের চাহিদা কমছে। অন্যদিকে, এর উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের হেড অব বিজনেস মো. মশিউর রহমান ডালিম বলেন, সাধারণত দেশের সিমেন্টের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যক্তি পর্যায়ে ও বাকি ৪০ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয় ব্যবহার করা হয়।
তবে, পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন তা হতাশাজনক। এখন ব্যক্তিপর্যায়ে সিমেন্টের ব্যবহার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
তিনি মনে করেন, মূলত সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প অনুমোদনে দেরি হওয়ায় সিমেন্টশিল্পের এই করুণ অবস্থা।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রকল্পগুলো প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাচ্ছে না। এতে অনেকের সমস্যা হচ্ছে। ব্যক্তিপর্যায়ে নির্মাণ প্রকল্পগুলোও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, দেশের ৪২ সিমেন্ট কারখানায় মোট ৮৪ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদিত হয়।
মশিউর রহমান ডালিম জানান, প্রতি মাসে সিমেন্ট বিক্রি ৩৪ লাখ টনে নেমে এসেছে। ফলে সক্ষমতার মাত্র ৪৫ শতাংশ নিয়ে এ শিল্প চালু আছে।
সিমেন্ট বিক্রির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সাধারণত নয় থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে। গত বছর প্রায় এক দশমিক দুই শতাংশ বিক্রি কমেছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সিমেন্টের উৎপাদন খরচ বেড়েছে- উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন কঠিন পরিস্থিতিতে আছি। প্রায় ১০ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদনে নিয়োজিত মানুষ এখন মাত্র এক লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদন করছেন। মন্দা সত্ত্বেও কর্মী ছাঁটাই করিনি।’
কাঁচামাল আমদানি শুল্কের অসামঞ্জস্যতা এই শিল্পের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মশিউর রহমান ডালিম আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকারের দাম টনপ্রতি ৪৪ ডলার হলেও সরকার প্রতি টন ৬২ ডলারের ভিত্তিতে আমদানি শুল্ক হিসাব করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই বৈষম্যের ফলে টনপ্রতি অতিরিক্ত খরচ হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। চুনাপাথরের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় খরচ আরও বেড়েছে।’
সাধারণত শীতে সিমেন্ট বিক্রি বেড়ে গেলেও চলতি শীতে তা হয়নি।
সিমেন্টের চাহিদা কমে যাওয়া ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক নির্মাণ খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্রেশ সিমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশেদ আলম সিমেন্টের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই খাতে মারাত্মক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদনকারীরা সিমেন্টের দাম কমপক্ষে ১৫ শতাংশ কমাতে বাধ্য হয়েছেন।’
তিনি মনে করেন, উৎপাদকরা সিমেন্ট বিক্রিতে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু করায় এর দাম কমেছে। ২০১০ সাল থেকে গড়ে আট শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২২ সাল থেকে তা কমছে।
এই খাতের চলমান অনিশ্চয়তার জন্য নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিকে দায়ী করেন তিনি। এ কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তার মতে, 'বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ টাকা খরচ বা নতুন প্রকল্প শুরু করতে দ্বিধাগ্রস্তে আছেন।’
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ও বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করেন।
যখন উন্নয়ন প্রকল্প চালু হবে এবং মানুষ ভবন নির্মাণে আস্থা ফিরে পাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই সিমেন্টের চাহিদা বাড়বে। তত দিন পর্যন্ত সিমেন্ট ও নির্মাণ খাত স্থবির থাকার আশঙ্কা আছে।
ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ স্টিফান লিল্যার জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি একই সঙ্গে ট্রেড নেগোসিয়েশন দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছেন।
আজ সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে স্টিফান লিল্যার এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রেড নেগোসিয়েশন দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, "বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দক্ষ ট্রেড নেগোসিয়েটর তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও আলোচনায় কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ইউএনডিপির সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।"
স্টিফান লিল্যার বলেন, "বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কর্মশালা এবং জ্ঞান বিনিময় কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ট্রেড নেগোসিয়েশন দক্ষতা বাড়াতে ইউএনডিপি কাজ করতে প্রস্তুত।"
বৈঠকে উভয়পক্ষ বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রপ্তানি মো. আবদুর রহিম খান এবং ইউএনডিপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সোমবার (৯ মার্চ) শেয়ার ও ইউনিটের দাম বড় পরিসরে বেড়েছে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দরপতনের পর দ্বিতীয় কার্যদিবসের লেনদেনে প্রধান সূচকসহ সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়। তবে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে।
গত সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনে দরপতন ঘটে। এক সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৫৯ পয়েন্ট কমে এবং বাজার মূলধন ২০,৪১৩ কোটি টাকার পতন দেখায়। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেও ডিএসইর সূচক একদিনে ২৩১ পয়েন্ট কমে।
সোমবার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার মাধ্যমে। দিনের সময় দাম বৃদ্ধি আরও ব্যাপক হয়ে সূচকের বড় উত্থান প্রদর্শন করে।
দিন শেষে ডিএসইতে ৩৫১টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, ১৭টির দাম কমেছে এবং ২০টির দাম অপরিবর্তিত থাকে।
ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ১৭৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বেড়েছে, ১৩টির দাম কমেছে এবং ১১টির অপরিবর্তিত। মাঝারি মানের ৭৪টির শেয়ার বেড়েছে, ২টির দাম কমেছে, ১টির অপরিবর্তিত। লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের ১০১টির শেয়ার বেড়েছে, ২টির দাম কমেছে, ৬টির অপরিবর্তিত। মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৪টির দাম বেড়েছে, ৪টির কমেছে এবং ৬টির অপরিবর্তিত।
ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৩২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫,১৪১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২১ পয়েন্ট বেড়ে ১,০৩৫ পয়েন্টে, ডিএসই-৩০ সূচক ৫৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১,৯৭৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কমে ৪১৬ কোটি ৯ টাকা হয়েছে, আগের কার্যদিবসে লেনদেন ছিল ৫৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
সবচেয়ে বড় লেনদেন হয়েছে ওরিয়ন ইনফিউশনের শেয়ার দিয়ে, ২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এরপর সিটি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং খান ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রবি, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরি, ইস্টার্ন ব্যাংক, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট এবং ফাইন ফুডসও রয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৮২ পয়েন্ট বেড়ে ১৩৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৩টির দাম বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে ৬২টির দাম কমেছে এবং ১৩টির অপরিবর্তিত। লেনদেন হয়েছে ৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, আগের কার্যদিবসে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল।
বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন প্রকল্পেও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। একই সঙ্গে তিস্তা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পেও অংশগ্রহণের আগ্রহের কথা জানিয়েছে দেশটি।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়ান।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, “চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চীন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।” তিনি আরও জানান, বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়—এমন প্রকল্পগুলোতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
বৈঠকে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।
তিস্তা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তিস্তা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এটি নতুন সরকার ও চীনের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর একটি।” খুব দ্রুত এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তার মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও চীন যৌথভাবে কাজ করবে। এ সময় নতুন ঋণ সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন সপ্তাহে অন্তত চারটি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।” এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ প্রবণতা আরও জোরদার হবে।”
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সংঘাত শুরুর আগে প্রায় আড়াই লাখ টন এলএনজিসহ মোট ১৫টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল রয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। সে সময় ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলেও সংঘাত শুরুর আগেই তারা হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে জাহাজগুলো ধাপে ধাপে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে এবং পণ্য খালাসের কাজ চলছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এসব জাহাজের মধ্যে অন্তত চারটিতে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রয়েছে। এই গ্যাস মূলত কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে আনা হয়েছে, যা দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার গ্যাসের চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া একটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এসেছে, যা গৃহস্থালি সিলিন্ডার গ্যাস, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ছোট শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হবে। কয়েকটি জাহাজে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েল, শিল্পখাতে ব্যবহৃত ডিজেলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যও রয়েছে।
অন্যদিকে কয়েকটি কার্গো জাহাজে বিভিন্ন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আনা হয়েছে। এর মধ্যে রাসায়নিক পদার্থ, পেট্রোকেমিক্যাল উপকরণ এবং প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে, যা দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যবহৃত হবে।
বন্দর কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালি বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংঘাত শুরুর আগেই জাহাজগুলো নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছানো দেশের জ্বালানি ও আমদানি সরবরাহের জন্য স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সংঘাত শুরুর আগেই হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে এলএনজি, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প কাঁচামাল রয়েছে।”
তিনি জানান, বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো, পণ্য খালাস এবং সরবরাহ কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। জাহাজগুলোর মধ্যে ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামের এলএনজি ট্যাংকার রয়েছে। এছাড়া সামুদ্রিক জাহাজের জ্বালানি এবং কয়েকটি কার্গো জাহাজে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালও এসেছে। এসব পণ্য দেশের গার্মেন্টস, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যবহৃত হবে।
এ বিষয়ে শনিবার এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম বলেন, “চারটি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো প্রায় নিশ্চিত। তবে ‘লিবারেল’ নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে রয়েছে। জাহাজটিতে এলএনজি বোঝাই করা হয়েছে এবং এটি প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় আছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহাজগুলো সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কার আগেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে নিরাপদে আরব সাগরে প্রবেশ করে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে এসব জাহাজের নিরাপদ আগমন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও আমদানি কার্যক্রমের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির সময় গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এটিএম বুথে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার (৯ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঈদের ছুটির সময় গ্রাহকদের যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে না হয়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে আগাম প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। এটিএম বুথে সার্বক্ষণিক সেবা চালু রাখা, কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত সমাধান করা এবং পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বুথগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহারাদারের সতর্ক অবস্থান রাখার কথাও বলা হয়েছে।
পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) সেবার ক্ষেত্রেও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জালিয়াতি প্রতিরোধে মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের সচেতন করতে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
ই-পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে কার্ডভিত্তিক ‘কার্ড নট প্রেজেন্ট’ লেনদেনের ক্ষেত্রে টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী ব্যাংক ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছুটির পুরো সময়জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঈদের ছুটির সময় যেকোনো অঙ্কের লেনদেনের তথ্য এসএমএস অ্যালার্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের জানাতে হবে। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে পরিশোধ সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সতর্ক করতে প্রচার কার্যক্রম চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের জন্য সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন সেবা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আগে জারি করা নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পূর্বঘোষিত ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত একদিন ছুটি যুক্ত করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি অফিসে আগামী ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিনের ছুটি থাকবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ মার্চ দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাংলাদেশ এলপি গ্যাস লিমিটেড সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। নতুন প্রস্তাবে প্রতি সিলিন্ডারের মূল্য ৪১০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা নির্ধারণের আবেদন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বেসরকারি খাতের এলপিজির তুলনায় রাষ্ট্রীয় কোম্পানির গ্যাসের দাম কম থাকায় বাজারে ক্রসফিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে। এই সমস্যা মোকাবিলা এবং উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভুঁইয়া গণমাধ্যমে বলেন, “বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মূল্য নির্ধারণ কমিটির প্রস্তাবনার ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে।”
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। সে সময় ক্রসফিলিং বন্ধ করা, ডিলার পর্যায়ে স্থানীয় পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি, অপারেশন খরচ এবং বিভিন্ন চার্জ বাড়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে সে সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়নি। ফলে দাম বাড়ানোর আবেদন নাকচ হওয়ায় আগের মূল্যই বহাল থাকে।
নতুন করে দেওয়া প্রস্তাবটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী সময়ে তা কার্যকর করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর এবং শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বা রিপ্যাট্রিয়েশন প্রক্রিয়া সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে নতুন একটি মাস্টার সার্কুলার জারি করা হয়েছে, যাতে অ-নিবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা হয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার মন্ডল এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৮ মার্চ ইআইডি সার্কুলার নং ০১ জারি করে নতুন মাস্টার সার্কুলার প্রকাশ করেছে। এতে ২০১৮ ও ২০২০ সালে জারি করা আগের নির্দেশনাগুলো একত্র করে হালনাগাদ করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও পূর্বানুমানযোগ্য, কার্যকর ও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সুরক্ষাও বজায় রাখা হয়েছে।
নতুন সার্কুলারে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে লেনদেনের সীমা বৃদ্ধি, মূল্যায়ন ও প্রতিবেদন পদ্ধতি সহজ করা এবং দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের ভেতরে মূল্যায়ন ও অর্থ প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রয়লব্ধ অর্থ দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে বিডা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের ক্যাপিটাল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটি গঠন করা হয়। বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি’র নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি গত বছরের ১৯ নভেম্বর সংস্কার প্যাকেজটি চূড়ান্ত করে।
এ প্রসঙ্গে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ভালো পরিবেশ তখনই তৈরি হয়, যখন বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের প্রতিটি ধাপে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগোতে পারেন। অনুমোদনের জটিলতা কমিয়ে আনা, বিক্রয়লব্ধ অর্থ সহজে দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া, মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের প্রক্রিয়া সরল করা এবং বিনিয়োগ থেকে প্রস্থানের ধাপগুলো সহজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি ভালো ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার মূল ভিত্তি।”
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন ছাড়াই অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো শেয়ার হস্তান্তর ও অর্থ প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। এক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়াই ক্রেতা ও বিক্রেতার যৌথ ঘোষণার ভিত্তিতে লেনদেন সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে এডি ব্যাংকগুলো ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অডিট করা আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) অনুযায়ী চুক্তির মূল্য নির্ধারণ করা হলে অনেক ক্ষেত্রেই এডি ব্যাংক সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নেট এসেট ভ্যালু (এনএভি), বাজারমূল্য বা ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (ডিসিএফ) পদ্ধতি বহাল রাখা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে নির্দেশনাগুলো আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
নতুন সার্কুলারে প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পূর্ণ থাকলে শেয়ার হস্তান্তর ৪৫ দিনের মধ্যে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ প্রত্যাবর্তন পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি এডি ব্যাংককে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বে একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে এসব আবেদন পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এডি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি লেনদেনের বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
দেশীয় ইস্পাত শিল্পের সুরক্ষা জোরদার করা, মানসম্মত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো এবং নিম্নআয়ের মানুষের বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ঢেউটিন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সিআর কয়েল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিআরসিএমইএ)।
সোমবার (৯ মার্চ) সংগঠনটির সভাপতি খলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়ে নীতিগত সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে মৌলিক কাঁচামালনির্ভর শিল্পের বিকাশের ফলে আমদানিকৃত হট রোল্ড (এইচআর) কয়েল থেকে উন্নতমানের বিভিন্ন ইস্পাত পণ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কোল্ড রোল্ড কয়েল ও শিট, জিঙ্ক কোটেড কয়েল ও শিট, অ্যালুমিনিয়াম কোটেড কয়েল ও শিট এবং কালার কোটেড কয়েল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এসব পণ্য উৎপাদনে দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব বিশ্বমানের ইস্পাত পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কালার কোটেড শিটের চাহিদা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে এবং এই খাতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
সংগঠনটি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার বাড়ার কারণে ঢেউটিন উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে দরিদ্র মানুষের ব্যবহৃত এ পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ঢেউটিন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল—এইচআর কয়েল, জিঙ্ক এবং অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক ০ শতাংশ, সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ১ হাজার টাকা, এটিএ ০ শতাংশ এবং এআইটি ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট মূসক ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, ধনী মানুষের ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত রড উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে প্রতি টনে মোট শুল্ক-কর প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের জন্য ব্যবহৃত ঢেউটিন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল এইচআর কয়েল আমদানিতে প্রতি টনে প্রায় ১৬ হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়, যা বৈষম্যমূলক।
বিসিআরসিএমইএ জানিয়েছে, আগামী বাজেটে তাদের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হলে দেশীয় ইস্পাত শিল্প আরও বিকশিত হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত পণ্যের উৎপাদন বাড়বে এবং ঢেউটিনের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সহজ হবে।
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি উচ্চমানের পোশাক কারখানা স্থাপনে ১৫ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে চীনা প্রতিষ্ঠান ফ্লারিশ গার্মেন্টস বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড।
রোববার ঢাকার বেপজা কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং ফ্লারিশ গার্মেন্টস বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বেপজার পক্ষে নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন এবং ফ্লারিশ গার্মেন্টস বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হ্যান জানজিয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন।
প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৪০ লাখ পিস বিভিন্ন ধরনের পোশাক উৎপাদন করবে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফ্লিজ জ্যাকেট, সফট শেল জ্যাকেট, ডাউন জ্যাকেট, কটন কোট, লেদার জ্যাকেট, আন্ডারওয়্যার, টি-শার্ট, পলো শার্ট, শর্টস, পার্কা, কোট, লং প্যান্ট, স্কি স্যুট, স্কি প্যান্ট, উইন্ডপ্রুফ জ্যাকেট, ফিশিং স্যুট, হাইকিং স্যুট, ইয়োগা স্যুট, রানিং স্যুট, জিন্স, নিটেড স্যুট, ফক্স লেদার ক্লদিং, ডিয়ার স্কিন ভেলভেট ক্লদিং, গলফ ক্লদিং ও ক্যাজুয়াল শার্ট।
প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১ হাজার ৯৮৮ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান ফ্লারিশ গার্মেন্টস বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডকে বেপজা পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবে স্বাগত জানান এবং নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে বেপজা অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন নতুন জোন স্থাপন করছে, যা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।”
তিনি নতুন বিনিয়োগকারীকে বেপজার বিভিন্ন জোনে আরো মানসম্পন্ন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করতে আহ্বান জানান, যাতে বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ আরো গতিশীল হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (প্রকৌশল) আবদুল্লাহ আল মামুন, সদস্য (অর্থ) আ ন ম ফয়জুল হক, নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) সমীর বিশ্বাস, নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) এ. এস. এম. আনোয়ার পারভেজসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিও নতুন করে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সোমবার (৯ মার্চ) জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ আশঙ্কার কথা জানান আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
তিনি বলেন, “যদি জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং তা বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে বজায় থাকে, তাহলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।”
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত উল্লেখ করে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আইএমএফ প্রধান। তিনি বলেন, “এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিবেশে অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলো নিয়েও ভাবা এবং সেভাবেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।”
জর্জিয়েভা আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতাকে আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপরও পড়ে।
আইএমএফের এই সতর্কবার্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও মন্দা কিংবা উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
সূত্র: রয়টার্স।
উচ্চ সুদহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও, যা নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চুক্তিও রপ্তানি খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা তুলে ধরা হয়। ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ সেমিনারে লিখিত বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
জোনায়েদ সাকি বলেন, “অর্থনীতি খাতের কিনারে গেছিলো। এর মধ্যে একটা বৈরী অবস্থা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিকে একটা শক্তিশালী অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কর-জিডিপি বাড়াতে লিকেজ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
সেমিনারে তাসকীন আহমেদ বলেন, রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা এবং বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি জানান, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জিত হয়নি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.২৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৪.১ শতাংশ। যদিও প্রাথমিকভাবে এই ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকা।
তিনি আরও বলেন, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমে ৬.৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৭.২ শতাংশ। তার মতে, এই প্রবণতা রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।
কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন না থাকায় কর আদায়ে বিলম্ব এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এজন্য প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আন্ডার-রিপোর্টেড খাতকে করের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমসকে সংযুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
তাসকীন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রাখার ফলে ঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি উঠেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম মন্থর হয়ে গেছে।”
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমে ৭.১ শতাংশে এলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৯.১৩ শতাংশ।
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন।” তার মতে, বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
তিনি আরও বলেন, “বাজার নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং মজুতবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।” পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃষি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তার মতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং অপচয়ও কমবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করেন, যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
এ জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি এবং জামানতবিহীন স্বল্পসুদের ঋণের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তৈরি পোশাক খাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই খাতে রপ্তানি ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলার হলেও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এ অবস্থায় নতুন বাজার খুঁজে বের করা জরুরি। তিনি ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, মারকোসুর এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন।
চামড়া খাতের প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পরিবেশগত মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সাভারের সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা ১৪ হাজার কিউবিক মিটার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ হাজার কিউবিক মিটারে উন্নীত করার প্রয়োজন রয়েছে।
কোরবানির সময় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে প্রতিবছর বড় ধরনের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদ কর্তৃপক্ষকে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে লবণ ও বরফ সরবরাহের ব্যবস্থার সুপারিশ করেন তিনি।
দেশের বাজারে আরেক দফা স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (৯ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হবে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য কমায় নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৭৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৩ টাকা।
এর আগে, ৪ মার্চ বাজুস ভরিতে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ৯ হাজার ২১৪ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২১৪ টাকা নির্ধারণ করেছিল। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ৩৮ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৪ বার দাম বৃদ্ধি ও ১৪ বার কমানো হয়েছে।
রূপার দামেও সমন্বয় করা হয়েছে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৬ হাজার ৩৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৬ হাজার ৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ১৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৯০৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে ৩৮ বার সমন্বয় করা হয়েছে স্বর্ণের দাম। যেখানে দাম ২৪ দফা বাড়ানো হয়েছে; কমানো হয়েছে ১৪ দফা। আর গত ২০২৫ সালে দেশের বাজারে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল; যেখানে ৬৪ বার দাম বাড়ানো হয়েছিল, আর কমানো হয়েছিল ২৯ বার
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। এখন রিজার্ভ আছে ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, এই রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। আজ রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত দুই মাসের (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) আকুর বিল ১৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এতে আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে দেশে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৩৮ কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে দেশের মোট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪১০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার ডলার।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে মোট রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৫৪৮ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আর আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ৭৬ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার।