রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালে দেশে সিমেন্ট বিক্রি কমেছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি প্রকল্প বন্ধ থাকায় গত বছর দেশে সিমেন্ট বিক্রি কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, এসব কারণে নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বড় প্রকল্পগুলো বন্ধ থাকায় সিমেন্টশিল্পে মন্দা বেড়েছে।
প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সিমেন্টশিল্প আগেও সংকট মোকাবিলা করেছে। আশা করছি, আগামীতে এই শিল্পের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আছে।’
তার মতে, একদিকে সিমেন্টের চাহিদা কমছে। অন্যদিকে, এর উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের হেড অব বিজনেস মো. মশিউর রহমান ডালিম বলেন, সাধারণত দেশের সিমেন্টের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যক্তি পর্যায়ে ও বাকি ৪০ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোয় ব্যবহার করা হয়।
তবে, পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন তা হতাশাজনক। এখন ব্যক্তিপর্যায়ে সিমেন্টের ব্যবহার ৯০ শতাংশেরও বেশি।
তিনি মনে করেন, মূলত সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প অনুমোদনে দেরি হওয়ায় সিমেন্টশিল্পের এই করুণ অবস্থা।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রকল্পগুলো প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাচ্ছে না। এতে অনেকের সমস্যা হচ্ছে। ব্যক্তিপর্যায়ে নির্মাণ প্রকল্পগুলোও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, দেশের ৪২ সিমেন্ট কারখানায় মোট ৮৪ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদিত হয়।
মশিউর রহমান ডালিম জানান, প্রতি মাসে সিমেন্ট বিক্রি ৩৪ লাখ টনে নেমে এসেছে। ফলে সক্ষমতার মাত্র ৪৫ শতাংশ নিয়ে এ শিল্প চালু আছে।
সিমেন্ট বিক্রির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সাধারণত নয় থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে। গত বছর প্রায় এক দশমিক দুই শতাংশ বিক্রি কমেছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সিমেন্টের উৎপাদন খরচ বেড়েছে- উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন কঠিন পরিস্থিতিতে আছি। প্রায় ১০ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদনে নিয়োজিত মানুষ এখন মাত্র এক লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদন করছেন। মন্দা সত্ত্বেও কর্মী ছাঁটাই করিনি।’
কাঁচামাল আমদানি শুল্কের অসামঞ্জস্যতা এই শিল্পের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মশিউর রহমান ডালিম আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকারের দাম টনপ্রতি ৪৪ ডলার হলেও সরকার প্রতি টন ৬২ ডলারের ভিত্তিতে আমদানি শুল্ক হিসাব করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই বৈষম্যের ফলে টনপ্রতি অতিরিক্ত খরচ হয় প্রায় দুই হাজার টাকা। চুনাপাথরের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় খরচ আরও বেড়েছে।’
সাধারণত শীতে সিমেন্ট বিক্রি বেড়ে গেলেও চলতি শীতে তা হয়নি।
সিমেন্টের চাহিদা কমে যাওয়া ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক নির্মাণ খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্রেশ সিমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশেদ আলম সিমেন্টের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই খাতে মারাত্মক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদনকারীরা সিমেন্টের দাম কমপক্ষে ১৫ শতাংশ কমাতে বাধ্য হয়েছেন।’
তিনি মনে করেন, উৎপাদকরা সিমেন্ট বিক্রিতে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু করায় এর দাম কমেছে। ২০১০ সাল থেকে গড়ে আট শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২২ সাল থেকে তা কমছে।
এই খাতের চলমান অনিশ্চয়তার জন্য নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিকে দায়ী করেন তিনি। এ কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তার মতে, 'বিদ্যমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ টাকা খরচ বা নতুন প্রকল্প শুরু করতে দ্বিধাগ্রস্তে আছেন।’
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ও বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করেন।
যখন উন্নয়ন প্রকল্প চালু হবে এবং মানুষ ভবন নির্মাণে আস্থা ফিরে পাবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই সিমেন্টের চাহিদা বাড়বে। তত দিন পর্যন্ত সিমেন্ট ও নির্মাণ খাত স্থবির থাকার আশঙ্কা আছে।
দেশের ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদী বন্ড বা সুকুক বাজারে আনছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের লক্ষ্যে ২৭৩ দিন মেয়াদী এই ‘স্বল্পমেয়াদি বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ইস্যু করা হচ্ছে। সাধারণ প্রবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি এই স্কিমে মাত্র ১০ হাজার টাকা থেকে বিনিয়োগ শুরু করা যাবে।
এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে চালু থাকা সরকারি সুকুকগুলো ছিল মূলত ৫ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী। তবে আগামীকাল রবিবার প্রথমবারের মতো এই স্বল্পমেয়াদী সুকুকের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই আবেদন প্রক্রিয়া চলবে। এই বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে এককালীন মুনাফা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এটি মূলত একটি ‘ইজারা সুকুক’ পদ্ধতি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল অর্থ এবং এর ওপর অর্জিত মুনাফা একসাথে বুঝে পাবেন। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান—সবার জন্যই বিনিয়োগের এই সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
আবেদনের নিয়মাবলী:
আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সহজেই এই নিলামে অংশ নিতে পারবেন। পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউল’ (এসএসএম) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যারা প্রথমবারের মতো এই খাতে বিনিয়োগ করবেন, তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর’ (এসআই) আইডি খুলে নিতে হবে। তবে আগে থেকে সুকুক বিনিয়োগকারী হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে নতুন করে আইডির প্রয়োজন হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগ শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরাপদ সরকারি গন্তব্য নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি সরকারও স্বল্প সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের সংস্থান করতে পারবে। এই সুকুকের বিপরীতে অন্য সব সরকারি সিকিউরিটিজের মতোই ‘রেপো’ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন বিনিয়োগকারীরা।
সুকুক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট:
শরিয়াহভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের বিপরীতে সম্পদ বা নির্দিষ্ট প্রকল্পের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যে আইনি দলিল ইস্যু করা হয়, তাকেই সুকুক বলা হয়। বন্ডে বিনিয়োগকারীরা সুদ পেলেও সুকুকধারীরা নির্দিষ্ট সম্পদের আয় থেকে মুনাফার অংশ লাভ করেন। সুকুক শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো এমন একটি দলিল যা কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির ওপর মালিকানার প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে ৮ হাজার কোটি টাকার ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম সুকুকের যাত্রা শুরু হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ সরকার বিভিন্ন মেয়াদী সুকুকের মাধ্যমে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ কোটি টাকাই এসেছে সরকারি নিলামের মাধ্যমে।
বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সুকুক একটি স্বীকৃত শক্তিশালী অর্থায়ন পদ্ধতি। মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে শীর্ষস্থানে থাকলেও ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কাতার এমনকি অমুসলিম দেশ যেমন সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রেও এটি বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় সুকুক বাজারের মোট মূলধন ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রির প্রবল চাপে শুক্রবার এশিয়ার প্রধান পুঁজিবাজারগুলোতে ভয়াবহ দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রযুক্তি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রি শুরু করলে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এদিন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক ‘কোসপি’ লেনদেনের একপর্যায়ে ৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেলে বাজারে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে ‘সার্কিট ব্রেকার’ কার্যকর করে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন বন্ধ রাখা হয়। চলতি সপ্তাহে তৃতীয়বার এবং এ বছরে পঞ্চমবারের মতো দেশটিতে এই পদক্ষেপ নিতে হলো। দিন শেষে কোসপি সূচক ৫ দশমিক ৮ শতাংশ পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত বেড়ে গেছে—বিনিয়োগকারীদের এমন ধারণাই এই দরপতনের মূল কারণ। এর ওপর গত বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠে। চিপ বা যন্ত্রাংশের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অ্যাপল তাদের আইপ্যাড ও ম্যাকবুকের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের বড় দরপতন ঘটে। অন্যদিকে মাইক্রোসফটও তাদের এক্সবক্স গেমিং কনসোলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এ বিষয়ে আলফা প্যাসিফিক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ডেভিড মাকারিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে যে উল্লম্ফন হয়েছিল, অনেক বিনিয়োগকারী এখন সেখান থেকে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য বাস্তবসম্মত কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করছেন তারা। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, তবে বাজার এখন অনেক বেশি বাছ-বিচার করছে।
জাপানের শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশটির প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ এদিন ৪ শতাংশের বেশি পয়েন্ট হারিয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংকের শেয়ারের দাম একদিনেই ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে গেছে। এ ছাড়া তাইওয়ান ও চীনের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের সূচক পতন পরিলক্ষিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনার উচ্চ ব্যয় এখন সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। কিয়োটো ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন ক্যাপিটালের বিশ্লেষক রেমন্ড উ বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণে শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, সেই বিনিয়োগের তুলনায় এসব প্রযুক্তির চাহিদা কতটা দ্রুত বাড়বে এবং পণ্যের দাম বাড়লে ডিভাইসের বিক্রি কমে যাবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে অ্যাপলের শেয়ার একদিনে ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি খাতে অতি-বিনিয়োগের আশঙ্কায় শেয়ারবাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের খুচরা বা খুচরা ঋণ বাজারকে আরও গতিশীল করতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণপ্রাপ্তি সহজতর করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বা পার্সোনাল ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সময়সীমা বর্তমানের পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করা হয়েছে। একই সাথে ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit) বৃদ্ধির ওপর দীর্ঘদিনের যে কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, তাও পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি সার্কুলার পাঠানো হয়েছে।
সংশোধিত এই নীতিমালার ফলে ব্যাংকগুলো এখন তাদের মোট ঋণ প্রবৃদ্ধির হারের চেয়েও বেশি হারে ভোক্তা ঋণের পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ করতে পারবে। এর আগে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল যে, একটি ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না তাদের ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি। এই ‘ক্যাপ’ বা সীমা তুলে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন আরও স্বাধীনভাবে ব্যক্তিগত ঋণ বিতরণে উৎসাহিত হবে। এতে বাজারে ঋণের প্রবাহ যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদাও দ্রুত মেটানো সম্ভব হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ এক ধাক্কায় তিন বছর বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির (EMI) পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এর ফলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শ্রেণির মানুষের জন্য ঋণের বোঝা বহন করা সহজ হবে এবং ব্যাংক থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী এই ঋণের পোর্টফোলিও সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত মে মাসে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত ঋণের সীমা ২০ লাখ টাকা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান এই নতুন উদ্যোগটি মূলত দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘ ছয় মাস বিরতির পর গত শুক্রবার (২৬ জুন) থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের (এলএসই) অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) পুনরায় লেনদেন শুরু হয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের। কোম্পানিটির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্টসের (জিডিআর) ওপর আরোপিত ট্রেডিং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর এই কার্যক্রম শুরু হয়। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের শেয়ারবাজারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি হবে।
শনিবার (২৭ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ডিবিএ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং পরবর্তী সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন যথাসময়ে প্রকাশ না করায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে বেক্সিমকো ফার্মার জিডিআর লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বিধিমালা অনুযায়ী, স্থগিতাদেশের মেয়াদ ছয় মাসের বেশি দীর্ঘায়িত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তালিকাচ্যুত বা ডি-লিস্টিং হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা তালিকাচ্যুতি ঠেকাতে ডিবিএ-র মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
ডিবিএ জানায়, সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএসইসি ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর সমন্বয় করা হয়। পরবর্তীতে বিএসইসির বিশেষ অনুমতিক্রমে আয়োজিত বোর্ড সভায় কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন ও প্রকাশ করে। আর্থিক প্রতিবেদন দাখিল সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হওয়ায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ তাদের স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ডিবিএ মনে করে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত হবে। একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সময়োপযোগী সংস্কার এবং বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ সহযোগিতার জন্য ডিবিএ-র পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান, সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ এবং গণমাধ্যমের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১১০ কোটি ডলারের একটি বড় অংকের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। গত ২৬ জুন বৈশ্বিক এই দাতা সংস্থাটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঋণ সহায়তার কথা জানানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে সার ও জ্বালানির দাম এবং সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতেই এই উদ্যোগ। এর পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের পরিচালক জঁ পেম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে খাদ্য, সার ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র কৃষক এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।’
এই বিশাল অর্থায়নের একটি অংশ অর্থাৎ ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে ‘ইমার্জেন্সি সাপোর্ট ফর ফুড সিকিউরিটি’ বা খাদ্যনিরাপত্তায় জরুরি সহায়তা প্রকল্পের অধীনে। এই তহবিলের মাধ্যমে চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমন মৌসুম এবং ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানি করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি অংশ আমদানি করতে হয়। এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৬ লাখ মেট্রিক টন সার আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার অর্ধেকই হবে ইউরিয়া। এর ফলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ও এই প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার সোলেমান কুলিবালি বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে আমন ও বোরো মৌসুম থেকে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাই সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শুধু খাদ্যনিরাপত্তাই হুমকিতে পড়বে না, সেই সঙ্গে দারিদ্র্য বাড়বে, প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও।’
এদিকে, ঋণের বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে ‘কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স’ বা আপৎকালীন দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মসূচির আওতায়। এই অর্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নগদ সহায়তা প্রদান ও জীবিকা পুনর্বাসনে খরচ করা হবে। এর লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখা।
পাশাপাশি, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও এই অর্থ ব্যবহার করা হবে, যাতে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও পানির মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। এই প্রকল্পের অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যেই ছাড় করার কথা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ লেসলি জিন ইউ করদেরো এ প্রসঙ্গে জানান, ‘বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাস করে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে বড় ধরনের সংকট থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হবে।’
বিশ্বজুড়ে ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে মৎস্য ও জলজ কৃষির বিশাল বাজার। বাংলাদেশের মৎস্যখাত বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক মৎস্য খাতে মোট প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে। বিশাল এই বাণিজ্যিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের উৎপাদন তথ্যের ভিত্তিতে মৎস্যচাষে (অ্যাকুয়াকালচার) বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণেও বিশ্বে নিজেদের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
রেকর্ড উৎপাদন ও বিশাল বাজারমূল্য
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৎস্য খাত এখন বিশ্বে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। ২০২৪ সালে মৎস্য ও মৎস্যচাষ মিলিয়ে বিশ্বে রেকর্ড ২৩ কোটি ৫০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৫.২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন এবং শৈবালের উৎপাদন ৪ কোটি টন।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো মৎস্যচাষ বা অ্যাকুয়াকালচার। শুধুমাত্র এই খাতেই ১৪ কোটি ২০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টন জলজ প্রাণীর মূল্য ৩৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং ৩ কোটি ৯০ লাখ টন শৈবালের মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার।
বিশ্ববাজারের নিয়ন্ত্রক এশিয়া ও শীর্ষ পাঁচ দেশ
বিশ্বের মৎস্য বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ এখন এশিয়ার হাতে। বৈশ্বিক মোট মৎস্য উৎপাদনের ৭৬ শতাংশ এবং মৎস্যচাষের ৯২ শতাংশই আসে এশিয়া থেকে।
মৎস্যচাষে উৎপাদিত জলজ প্রাণীর বৈশ্বিক বাজারে একক আধিপত্য দেখাচ্ছে ৫টি দেশ। মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮২ শতাংশই জোগান দিচ্ছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে চীনের অংশীদারত্ব সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে ভারত (১২%), ইন্দোনেশিয়া (৬%), ভিয়েতনাম (৫%) এবং বাংলাদেশ (৩%)।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে ২২ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত এবং ১৪ লাখ টন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য ‘মৎস্যচাষ’
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ ধরার চেয়ে এখন বাণিজ্যিকভাবে মৎস্যচাষ বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন জলজ প্রাণী উৎপাদিত হয়েছে, যার ৫৩ শতাংশই এসেছে মৎস্যচাষ থেকে এবং ৪৭ শতাংশ এসেছে উন্মুক্ত জলাশয় থেকে। এই জলজ প্রাণীগুলোর প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
বাণিজ্যিক মৎস্য খামারিদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো পাখনাযুক্ত মাছ (Finfish), যা অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদিত মোট মাছের ৮৯ শতাংশ। এছাড়া সামুদ্রিক ও উপকূলীয় মৎস্যচাষেও বৈচিত্র্য এসেছে, যেখানে মোলাস্ক, খোলসযুক্ত প্রাণী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর চাষ বাণিজ্যিকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই ৫৬৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের ৩ শতাংশ অংশীদারত্ব প্রমাণ করে যে মৎস্য খাত দেশের অর্থনীতিতে একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার এবং রপ্তানিমুখী মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বিলিয়ন ডলারের মৎস্য রপ্তানি বাণিজ্য গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যকে অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তার মান নিশ্চিতকরণ এবং নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে মূল্য সংযোজিত মৎস্যপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্যখাত আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
তাদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ এখনও সীমিত। তাই সরকারি নীতিসহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের মৎস্যশিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং এটি রপ্তানিমুখী অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ফলগুলোর মুকুটে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক নতুন পালক। বর্তমানে দেশে মোট ৬৪টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication) সনদ লাভ করেছে, যার মধ্যে একক ক্যাটাগরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখাচ্ছে ফল। আম, লিচু, কাঁঠাল ও কলার মতো সুপরিচিত ফলসহ বর্তমানে জিআই স্বীকৃত দেশীয় ফলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪টিতে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইনি স্বীকৃতির ফলে ফলগুলোর গুণগত মান যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী ‘অরিজিন-বেজড’ বা উৎস ভিত্তিক ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ। এর সরাসরি সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা, যারা এখন বাজারে তাদের উৎপাদিত ফলের ন্যায্য ও প্রিমিয়াম মূল্য নিশ্চিত করতে পারছেন।
কেন এই জিআই স্বীকৃতি?
জিআই মূলত একটি আইনি সুরক্ষা, যা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা উৎপাদন পদ্ধতির কারণে কোনো পণ্যের অনন্য স্বাদ ও ঘ্রাণকে স্বীকৃতি দেয়। কোনো একটি ফলের জাত অন্য এলাকায় চাষ হলেও, জিআইভুক্ত অঞ্চলের ফলের স্বকীয়তা ও সংরক্ষণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা হয়, যা একে বিশ্ববাজারে একটি বিশেষ ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করায়।
তালিকায় স্থান পাওয়া ১৪টি ফল:
বর্তমানে বাংলাদেশের জিআই তালিকায় আমের জয়জয়কার লক্ষ্য করা গেছে। এ তালিকায় রয়েছে:
তৈরি হচ্ছে ‘জিআই আম বেল্ট’
আমের একের পর এক জাত জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে একটি শক্তিশালী ‘জিআই আম বেল্ট’ বা বিশেষ আম বলয় গড়ে উঠছে। এর ফলে সিজনজুড়ে বিভিন্ন সময়ে উন্নত মানের আম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বাজারজাত করার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিগন্ত ও কৃষি-পর্যটন:
ফলের এই ভৌগোলিক স্বীকৃতি শুধু রপ্তানি সম্ভাবনাকেই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ বা কৃষি-পর্যটন বিকাশেও নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। লটকন, লিচু বা কাঁঠালের মতো ফলগুলোর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, জিআই স্বীকৃতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ফলগুলো ‘প্রিমিয়াম পণ্য’ হিসেবে নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হবে।
সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহে (২১-২৫ জুন) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতায় লেনদেন শেষ হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি কমেছে লেনদেনের গতিও। দরপতনের প্রভাবে এ সময়ে বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৯১৪ কোটি টাকা।
ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। বিদায়ী সপ্তাহের শেষ দিনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসই বাজার মূলধন হারিয়েছে ৯১৪ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।
লেনদেনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমাপ্ত সপ্তাহে মোট লেনদেন ১ হাজার ৬৬১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা কমে ৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকায় ঠেকেছে। এর আগের সপ্তাহে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।
সূচকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ডিএসইর প্রধান সূচক ‘ডিএসইএক্স’ ৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৫২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। পাশাপাশি শরিয়াহ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৪৩ এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট হ্রাস পেয়ে ২ হাজার ১৩১ পয়েন্টে স্থির হয়েছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৪৫টি প্রতিষ্ঠানের, বিপরীতে দর হারিয়েছে ২২২টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম।
দেশের বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী স্বর্ণের দাম। সব চেয়ে উন্নত মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম একলাফে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে ভ্যাটসহ ভালো মানের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে এখন ক্রেতাদের গুনতে হবে ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
মূলত দেশীয় বাজারে তেজাবী বা পাকা স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার (২৭ জুন) সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই দর কার্যকর করা হয়েছে।
বাজুসের নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ এখন ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকায় বিক্রি হবে। এছাড়া ২১ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৮ হাজার ২৯১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যারা সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ কিনতে চান, তাদের জন্য প্রতি ভরির দাম পড়বে ১ লাখ ৩ হাজার ১৮০ টাকা।
বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস স্পষ্ট করেছে যে, নির্ধারিত এই দামের মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে অলংকারের নকশা ও কারুকাজের ওপর নির্ভর করে মজুরি খরচ এর সাথে আলাদাভাবে যুক্ত হবে। এদিকে রুপার অলংকারের ওপর ভ্যাটের বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
স্বর্ণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রুপার দামও। নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৪ হাজার ৬৬৫ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট রুপা ৪ হাজার ৪৩২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩ হাজার ৭৯০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ২ হাজার ৮৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দামে কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশিরভাগ সবজির দাম কমলেও গাজর, টমেটো এবং কাঁচা মরিচের বাজারে এখনও অস্থিরতা বিরাজ করছে। সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে নিত্যপণ্যের ওপর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ায় এবং ডিমসহ কিছু পণ্যের দাম কমায় ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পটলের দাম কমে এখন প্রতি কেজি ৪০ টাকায় এবং ঢেঁড়স ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও কাঁকরোল ৫০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে মিলছে। দেশি শসার বাজার এখনও কিছুটা চড়া থাকলেও হাইব্রিড শসা ৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেগুনের দাম; কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে লম্বা ও গোল বেগুন প্রকারভেদে ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টমেটো ও গাজরের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যথাক্রমে ১৬০ ও ১৪০ টাকায় পৌঁছেছে। কাঁচা মরিচের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়ে এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় মশলা ও অন্যান্য পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল রয়েছে। আলু প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা রসুনের দাম ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হলেও দেশি রসুন মিলছে ১০০ টাকার মধ্যে। ডিমের বাজারে উল্লেখযোগ্য দরপতন ঘটেছে; ডজন প্রতি ১০ টাকা কমে লাল ডিম ১২০ টাকা এবং সাদা ডিম ১১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে থাকলেও সোনালী মুরগির জন্য ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত।
অন্যদিকে, মাছ ও মাংসের বাজারে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ ২০০ টাকার আশেপাশে থাকলেও বড় ও মাঝারি রুই মাছের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে ইলিশের বাজারে চড়া ভাব এখনও অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাজারের এই মিশ্র পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের মাঝে এক ধরনের দোলাচল কাজ করছে।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এদিন প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)—উভয় স্থানেই মূল্যসূচক বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৬৫২ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। একই সাথে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ৩ পয়েন্ট বেড়ে যথাক্রমে ১ হাজার ১৪৩ ও ২ হাজার ১৩১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন ডিএসইতে মোট ১ হাজার ১১০ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৭০ কোটি টাকা বেশি। বুধবার ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯৪০ কোটি ২১ লাখ টাকা।
ডিএসইতে এদিন মোট ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের হাতবদল হয়েছে, যার মধ্যে ২৭৩টির দাম বেড়েছে, বিপরীতে দর হারিয়েছে ৬৮টি এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের বাজারদর। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা, আইপিডিসি, ন্যাশনাল ফিড, ব্র্যাক ব্যাংক ও সামিট পোর্টের মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলো। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ২৯ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ১৪৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৩টির দাম বেড়েছে এবং ৬৯টির দাম কমেছে। বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যা আগের দিনের ৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার তুলনায় ৪০ কোটি টাকা বেশি। সপ্তাহের শেষ দিকে বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং জাপানের সর্ববৃহৎ ব্যাংকিং গ্রুপ ‘এমইউএফজি’ (Mitsubishi UFJ Financial Group) বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক শাখা স্থাপনের প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ১৯৯০ সাল থেকে ঢাকায় শুধুমাত্র প্রতিনিধি অফিস পরিচালনা করে আসা এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম বিস্তৃত করতে চায়। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে ব্যাংকটির এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে।
এমইউএফজি ব্যাংক মূলত ‘করিডোর ব্যাংকিং’ মডেলে বাংলাদেশে কাজ করতে আগ্রহী, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী আর্থিক সেতু হিসেবে কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এমইউএফজি’র পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপিত হলে বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজতর হবে, যা দেশে জাপানি বিনিয়োগের নতুন জোয়ার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জাইকা’র (JICA) মতো বড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এই ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় পরিচালনাগত জটিলতা ও খরচ উভয়ই হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য থাকলেও উন্নত ব্যাংকিং সুবিধার মাধ্যমে তা আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
তবে আগ্রহের সমান্তরালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমইউএফজি ব্যাংক। প্রতিনিধি দলটি জানতে চেয়েছে, খেলাপি ঋণের বর্তমান চাপে জর্জরিত বাজারে বিনিয়োগ ও শাখা সম্প্রসারণের জন্য এটি উপযুক্ত সময় কি না। তারা বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে। বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল আর্থিক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করে জানান যে, খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য এখন স্বচ্ছতার সাথে তুলে ধরা হচ্ছে এবং ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’র মাধ্যমে পুরো খাতটি সংস্কার করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে কার্যরত অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত কম এবং সন্তোষজনক মুনাফায় রয়েছে। গভর্নর ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ কমে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরেন। পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সকল নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানা গেছে।
তফসিলি ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে গ্রাহকদের অসহযোগিতা করছে এবং বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে কঠোর অবস্থানে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (২৪ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে দেশের সকল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি অব্যাহত রাখা এবং গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে যে, অনেক ব্যাংক সঞ্চয়পত্র বিক্রির তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও গ্রাহকদের সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে বাধা দিচ্ছে বা বিনিয়োগ করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ‘সঞ্চয়পত্র রুলস, ১৯৭৭’-এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্রের ইস্যু অফিস হিসেবে বিনিয়োগকারীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে বাধ্য।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায়ে সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করতে হবে এবং গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণের বিষয়টি সহজতর করতে হবে। অভিযোগ কেন্দ্র বা অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়া শাখার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের জন্য এমডিদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধানের নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র—এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে। সঞ্চয়পত্রের ধরন অনুযায়ী বিনিয়োগের ওপর ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত আকর্ষণীয় সুদ প্রদান করা হয়। সাধারণ মানুষ যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে এই বিনিয়োগ সুবিধা ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।