আম উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিতে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, এর প্রধান কারণ আকাশপথে পণ্য পরিবহনের অস্বাভাবিক উচ্চ ব্যয়—যা প্রতিযোগীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই চড়া ব্যয়ই ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো থেকে ছিটকে দিচ্ছে।
তবে সম্প্রতি আম রপ্তানি নিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দেশের রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুণগত মান ঠিক রেখে আম উৎপাদন করতে পারলে কম পরিবহন ব্যয়ের সুবাদে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার হয়ে উঠতে পারে চীন।
রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি ফল পাঠাতে ইউরোপে ৩৫০-৩৮০ টাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ২০০-২২০ টাকা ভাড়া দিতে হয়।
অন্যদিকে চীনে ফল পাঠাতে ভাড়া দিতে হয় আরও কম, কেজিতে ৭০-৮৫ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মনে করেন, আম রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ ‘প্রস্তুত’।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আম অন্যান্য দেশের তুলনায় গুণগত মানে ও স্বাদে ভালো। চীনের বাজারে এটা আমাদের এগিয়ে রাখবে।’
আরিফুর আরও বলেন, চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে আমের জন্য স্পেশাল কার্গো দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি চীনে আম রপ্তানি নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করবে।
‘চীনের প্রতিনিধিদল কয়েক দফায় আমাদের দেশে এসেছে। তারা অনেক ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। এর সঙ্গে তারা কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলেছে। আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি চীনে আম রপ্তানি নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করবে,’ বলেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩২১ টন। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছরই রপ্তানি কমছে।
বাংলাদেশ থেকে গত বছর ২১টি দেশে আম রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইতালি ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ রয়েছে। যদিও এর আগের অর্থবছরে ৩৬টি দেশে আম রপ্তানি হয়।
এনএইচবি কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী ও আম রপ্তানিকারক নাজমুল হোসেন ভূঁইয়া ১৯৯১ সাল থেকে আম রপ্তানি করছেন। গত বছর তিনি সুইডেন ও ইউরোপে আম পাঠিয়েছেন। তিনি টিবিএসকে বলেন, গত বছর প্যাকেজিং ও বিমান ভাড়া মিলে কেজিতে প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। গতবার অস্বাভাবিক ভাড়ার কারণে রপ্তানিকারক ও যারা কিনেছিলেন, সবাই লোকসান দিয়েছেন।
নাজমুল বলেন, ‘আম রপ্তানি নিয়ে আমাদের কোনো সমন্বিত কৌশল নেই। প্যাকিং হাউস করা হয়েছে শ্যামপুরে, পণ্য পাঠাতে হয় বিমানবন্দর থেকে। অথচ দুটো একই জায়গায় হওয়া প্রয়োজন ছিল। এতে খরচ কমত। আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে। আমাদের প্রণোদনা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা হয়েছে।’
আম রপ্তানিকারক ও গ্লোবাল ট্রেড লিংকের স্বত্বাধিকারী রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘ভারত, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো আম রপ্তানিতে আলাদা কার্গো ফ্লাইট ব্যবহার করে, অথচ বাংলাদেশ নির্ভর করে যাত্রীবাহী বিমানের ওপর।
ফলে ইউরোপে প্রতি কেজিতে আমাদের প্রায় ১.৫০ ডলার পরিবহন খরচ বেশি পড়ে। জিএসপি থেকে কিছুটা সুবিধা পেলেও আমাদের স্থানীয় আমের দাম তুলনামূলক বেশি। স্বাদে হয়তো আমরা এগিয়ে, কিন্তু গুণমানের ধারাবাহিকতায় ওরা আমাদের থেকে অনেকটা সুশৃঙ্খল। এখানেই আমরা পিছিয়ে আছি।’
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরে আম রপ্তানি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে ঢাকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে চীনও।
রপ্তানিকারক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন বছরে প্রায় ৪ লাখ টন আম আমদানি করে। মূলত থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন থেকে বেশি আম আমদানি করে চীন। তারা বলছেন, চীনে আম রপ্তানি করলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের তুলনায় খরচ কম পড়বে। তবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আম রপ্তানিতে টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
২০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘চীনের মানুষ বাংলাদেশি আম পছন্দ করে’ বলে বৃহৎ পরিসরে আম রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীন বছরে প্রায় ৪ লাখ টন আম আমদানি করে। মূলত থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন থেকে বেশি আম আমদানি করে দেশটি। রপ্তানিকারক ও কর্মকর্তারা মনে করেন, গুণগত মান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
নাজমুল ভূঁইয়া বলেন, ‘চীনে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, এটা নিয়ে আমি আশাবাদী। তবে টিকে থাকতে হলে আমাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কারণ আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করব, তারা আমাদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।’
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, চীন থেকে যেসব কার্গো বিমান পণ্য নিয়ে আসে, সেগুলো অনেক সময় খালি ফেরত যায়। এ কারণে চীনে রপ্তানিতে বিমান ভাড়া কম পড়বে।
‘এসব রিটার্ন ফ্লাইট পুরোটা ব্লক করা গেলে খরচ আরও কমে আসবে। হয়তো কেজিতে ৫০-৬০ টাকায় নেমে আসবে,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটে চীন-বাংলাদেশ পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের মহাসচিব অ্যালেক্স ওয়াং বাংলাদেশি আমের প্রতি চীনের আগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ম্যাঙ্গো হারভেস্টিংয়ের সময় চীনের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাগান ও প্যাকেজিং কার্যক্রম পরিদর্শন করবে। ইতোমধ্যে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।’
শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং গ্লোবাল এপি প্রশিক্ষক অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের গাইডলাইন অনুযায়ী আম রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে ৩০টি শর্ত পূরণ করতে হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আমে চীনের জন্য ২১টি কোয়ারেন্টিইন পেস্ট শনাক্ত করা হয়েছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে আমকে এসব থেকে মুক্ত থাকতে হবে। ‘পরিবহন-পূর্ব পরিদর্শনে প্রতি ব্যাচের ২ শতাংশ বা ৬০০টি আম—যেটি বেশি হয়—টেস্ট করতে হবে, এবং এর মধ্যে সন্দেহজনক ৬০টি আম কেটে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো কোয়ারেন্টিন পেস্ট পাওয়া গেলে পুরো ব্যাচ বাতিল করা হবে।’
অধ্যাপক ফারুক বলেন, শুধু চীনের ক্ষেত্রে নয়, বরং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্যই গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) কমপ্লায়েন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘গ্যাপ অনুসরণ করে রপ্তানির জন্য আম উৎপাদন করলে বা গ্যাপ সার্টিফিকেট থাকলে চীনের শর্ত মানা কঠিন হবে না।’
তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাড়তি সুবিধা দেয়। যেমন, থাইল্যান্ডের সঙ্গে চীনের ডুরিয়ান চুক্তি কিংবা আমের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে থাইল্যান্ডের চুক্তি বাংলাদেশের জন্য মডেল হতে পারে। ‘চীনের সঙ্গে রপ্তানি চুক্তি করলে বাজারে প্রবেশ অনেকটাই সহজ হবে।’
বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নগত জটিলতা সত্ত্বেও এগিয়ে চলছে চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘ইআরএল ইউনিট-টু’ চালু হলে দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানের তিন গুণ হবে। একই সঙ্গে পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় সরবরাহ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটির জন্য সরকার প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়ন ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে সরকার, বাকি ৪০ শতাংশ আসবে বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষ করে ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যেই ইআরএল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রিফাইনারিটির বার্ষিক তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। নতুন ইউনিট চালু হলে তা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক মৌলিক প্রকৌশল নকশা বা ফ্রন্ট-এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (ফিড) ডকুমেন্ট তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ। ১৯৬৮ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রথম ইউনিট নির্মাণেও প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত ছিল। বর্তমানে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি কারিগরি নকশা, ক্রয় ও নির্মাণকাজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের মাঝামাঝি নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একাধিক বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকায় কারিগরি সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পে পাঁচটি বিদেশি লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের পর প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।
আধুনিকায়ন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো জ্বালানির গুণগত মান উন্নত করা। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ইউরো-৪ মানের জ্বালানি পরিশোধন করা হয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় নতুন ইউনিটের পাশাপাশি বিদ্যমান রিফাইনারিকেও ইউরো-৬ মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জ্বালানিতে সালফারের পরিমাণ কমে প্রতি মিলিয়নে দুই অংশে (২ পিপিএম) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিদ্যমান প্ল্যান্টের মান উন্নয়নের ফলে কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নতুন ইউনিটে প্রচলিত জ্বালানি তেলের পাশাপাশি লুব অয়েল, সালফার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও জেট ফুয়েল উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। বর্তমানে এসব পণ্যের কিছু অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নতুন প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হলে লুব অয়েল ও সালফারের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে তেল পরিশোধনের উপজাত হিসেবে এলপিজি উৎপাদন এবং দেশের জেট ফুয়েলের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি চালু হলে একদিকে দেশের তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পথ সুগম হবে।
সার্বিক আমদানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা দৃশ্যমান হলেও দেশের শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন শিল্পায়নের প্রধান নিয়ামক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) মোট পণ্য আমদানির পরিমাণ ১২ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও এই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির হার কমেছে ৩২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সামগ্রিক আমদানির ভেতরে ভারী ও উৎপাদনমুখী যন্ত্রপাতির এমন অস্বাভাবিক পতন বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশে মোট ১ হাজার ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি সম্পন্ন হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলার বেশি। তবে সামগ্রিক আমদানির এই ঊর্ধ্বগতিতে শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো প্রতিফলন নেই। এ সময়ে সার্বিক মূলধনি পণ্যের আমদানি প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৬০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কলকারখানা স্থাপন ও আধুনিকায়নের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ৭৫ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সার্বিক আমদানির এই বিস্তার মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ এবং কিছু অন্তর্বর্তী কাঁচামাল আমদানির ওপর ভর করে হয়েছে। এ সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে বস্ত্র খাতের মৌলিক কাঁচামাল তুলার আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে যে শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন কারখানা নির্মাণ বা সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে কেবল বিদ্যমান উৎপাদন সচল রাখতেই ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখছেন।
মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এই মারাত্মক সংকোচনের পেছনে চড়া সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং অর্থায়নের চরম অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকগুলোতে ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা এবং কয়েক বছর ধরে ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটায় উদ্যোক্তাদের কার্যকরী মূলধন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণে; গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ঘোষিত প্রণোদনা তহবিল থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্থায়ন না পাওয়ায় শিল্প সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দীর্ঘস্থায়ী তীব্র সংকট নতুন শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কারখানা চালানো অসম্ভব হওয়ায় এবং নিকট ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিস্থিতির টেকসই সমাধানের পথ দৃশ্যমান না থাকায় নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূলধনি যন্ত্রপাতির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার অর্থ হলো সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা নেমে আসা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত করবে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ সংকট, ভারতীয় রুপির বিনিময় হার বৃদ্ধি, উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ এবং চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশায় এশিয়ার বাজারে চালের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খবর বিজনেস রেকর্ডার।
ভারতে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চালের দাম বাড়ছে। গত সপ্তাহে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত সেদ্ধ চালের দাম প্রতি টন ৩৮৭ থেকে ৩৯২ ডলারে লেনদেন হয়েছে। এর আগের সপ্তাহে একই মানের চালের দাম ছিল ৩৮৪ থেকে ৩৮৯ ডলার। এদিকে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত আতপ চালের দাম বেড়ে টনপ্রতি ৩৮৯ থেকে ৩৯৪ ডলারে উঠেছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৩৮৫ থেকে ৩৯০ ডলার।
ভারতের বাজারে চালের দাম বাড়ার পেছনে রুপির শক্তিশালী অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কলকাতাভিত্তিক এক রপ্তানিকারকের মতে, বাজারে ধানের সরবরাহ কম থাকায় চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। পাশাপাশি স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে কয়েকটি রাজ্যে উৎপাদন কমেছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, প্রায় এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম ভারতের চালের উৎপাদন কমতে পারে। উৎপাদন হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হতে পারে। ফসল পাকার সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভিয়েতনামেও চালের দাম বেড়ে প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চাল টনপ্রতি ৪৪০ থেকে ৪৫০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৪২০ থেকে ৪৩০ ডলার। গত ২১ আগস্টের পর এটিই সর্বোচ্চ দাম। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী নভেম্বর থেকে ফিলিপাইন আবার ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি শুরু করতে পারে। এতে দেশটির রপ্তানি বাজারে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভিয়েতনামের কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বছরের বাকি সময়ে দেশটির চাল রপ্তানিতে চাপ থাকবে। তবে চলতি বছর ৮০ লাখ টন চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথমার্ধে দেশটি ২ লাখ ২৮ হাজার ৮৭১ টন চাল রপ্তানি করেছে। এতে চলতি বছরে ভিয়েতনামের মোট চাল রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ৬৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
থাইল্যান্ডেও চালের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। দেশটিতে ৫ শতাংশ খুদযুক্ত চালের দাম বেড়ে টনপ্রতি ৪৮০ ডলারে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ৪৬৫ থেকে ৪৬৮ ডলার। চাল বোঝাইয়ের জন্য বন্দরে জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিকারকদের বাড়তি কেনাকাটায় দাম বেড়েছে। অফ-সিজন ফসল কাটার মৌসুম শেষের দিকে থাকায় ব্যবসায়ীরা মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে বন্যার কারণে ধান কাটা ও চাল সংগ্রহের কাজে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রধান ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় চলতি বছর থাইল্যান্ডের চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে। দেশটির চাল রপ্তানিকারক সমিতির আশঙ্কা, এ বছর ৭০ লাখ টন চাল রপ্তানির লক্ষ্য অর্জন নাও হতে পারে। ফলে ভারতের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ, ভিয়েতনামের সম্ভাব্য রপ্তানি চাহিদা এবং থাইল্যান্ডে সরবরাহসংকট—সব মিলিয়ে এশিয়ার চালের বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে আন্তর্জাতিক তিনটি শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির নীতিগত ও ক্রয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় সিঙ্গাপুরের বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড, কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি এবং জাপানের জেরা গ্লোবাল মার্কেটস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে জ্বালানি গ্যাস সংগ্রহ করা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ এবং ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র পৃথক বৈঠকে এসব প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র ২০২৬ সালের ৫১তম সভায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব পাস হয়। উভয় পক্ষের পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত গ্যাস আমদানির সুযোগও এতে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) দরের চেয়ে শূন্য দশমিক ১৭ মার্কিন ডলার কমে। সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯৯(২) বিধির আলোকে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং বিপি সিঙ্গাপুরকে প্রস্তাবিত দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
একই সভায় চলমান দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) চুক্তির ধারাবাহিকতায় কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি থেকে অতিরিক্ত এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেয় কমিটি। ২০২৬ সালের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহযোগ্য এই কার্গোর দাম ধরা হয়েছে জেকেএম দরের চেয়ে শূন্য দশমিক ১০ মার্কিন ডলার কম। বিদ্যমান চুক্তির বাইরে ভিন্ন মূল্যে এই অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহের জন্য কাতার এনার্জিকে সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপস্থাপনায় ‘অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র বৈঠকে জাপানের জেরা গ্লোবাল মার্কেটস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়। এই অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং জেরা গ্লোবাল মার্কেটসের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদি বিক্রয়-ক্রয় চুক্তি ও শর্তপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করে তা স্বাক্ষরের পথ উন্মুক্ত হলো।
সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে জনতা ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সাইটগুলোতে প্রবেশাধিকার না থাকায় সাধারণ গ্রাহকরা কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ কিংবা ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে পারছেন না। আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওয়েবসাইট দুটিতে ঢোকার চেষ্টা করা হলে সেখানে সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত নোটিশ দেখা যায়। দ্রুত সেবা চালুর প্রত্যয় ব্যক্ত করে সাময়িক এই অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে দফায় দফায় চেষ্টা করেও পোর্টালগুলোতে প্রবেশ করা যায়নি।
কয়েক দিন ধরেই দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা চলছে। এই ঝুঁকির কারণে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ওয়েবসাইটও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল, যা টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর আজ সকাল আটটা থেকে পুনরায় সচল হয়েছে। একই প্রেক্ষাপটে অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংকের সাইট বন্ধ করা হলেও বর্তমানে সেগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার সময়েও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন থাকায় গ্রাহকপর্যায়ে লেনদেনে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ওয়েবসাইটে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। বিশ্বব্যাপী হামলার আশঙ্কায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় ওয়েবসাইটটি আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।’
বর্তমানে ব্যাংকিংসহ সরকারি সেবা, ই-কমার্স এবং নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের অবকাঠামো ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সফটওয়্যারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব ডিজিটাল কাঠামোর বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় পিএইচপি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। সম্প্রতি পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটির সন্ধান মেলার পর থেকেই মূলত বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিন দিন বন্ধ থাকার পর আজ সকাল ৮টায় আবার সচল হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট|
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ওয়েবসাইটটি সচল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন|
বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশঙ্কায় গত ২২ অক্টোবর ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক| ওয়েবসাইট ˆতরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির নিরাপত্তাগত দুর্বলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা থেকে এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়|
পরবর্তী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে| এ সময় ওয়েবসাইটটি বন্ধ ছিল|
বিশ্ববাজারে পণ্যের বহুমুখীকরণ ও বাংলাদেশি পণ্যের আধিপত্য বাড়াতে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব বাজারের সামগ্রিক চাহিদা, বাণিজ্যসংক্রান্ত জটিলতা ও বাধা, প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকা তৈরি করে দেশভিত্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারের পাশাপাশি রয়েছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এশীয় অর্থনীতিগুলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং প্রধান পশ্চিমা বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ধাক্কা লাগার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্যমতে, তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি কাটিয়ে নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে প্রবেশ এবং আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং মার্কিন বাজারে সাড়ে ৬ শতাংশ পতন লক্ষ্য করা গেছে। ফলে নতুন বাজার ও বিকল্প পণ্যের সন্ধান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারিত হলেও দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি এখনো সীমিত পরিসরে আটকে রয়েছে এবং রয়েছে বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি। তবে আশার বিষয় হলো, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ভারতে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনৈতিক এই পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান অভিমত দেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ামুখী হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে এবং এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হলে আঞ্চলিক বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় দেশের উপস্থিতি জোরদার করতে হবে। অপরদিকে ব্যবসায়ীদের পর্যবেক্ষণ, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে উচ্চ শুল্কহার ও বাণিজ্যচুক্তির ঘাটতি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে; তাই সক্ষমতা বাড়াতে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, মানোন্নয়ন ও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রচলিত পণ্যের বাইরে তথ্যপ্রযুক্তি, মেধাভিত্তিক সেবা এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের রপ্তানি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশভিত্তিক কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাধা দূর ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বৈশ্বিক বাজারে দেশের রপ্তানি পরিধি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বৃহৎ বিনিয়োগে একটি নতুন অটোমোবাইল কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে জার্মানির বিলাসবহুল গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অডি। জর্জিয়ার পেরি শহরে আয়োজিত এক জনসমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং এ তথ্য জানান। প্রস্তাবিত এই কারখানায় বার্ষিক প্রায় দুই লাখ ক্রীড়াধর্মী বহুমুখী যান (এসইউভি) তৈরি হবে এবং এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
অডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গেরনট ডয়েলনার জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির উন্নত ও বড় আকারের বহুমুখী গাড়িগুলো জর্জিয়ার ম্যাকন এলাকায় উৎপাদনের রূপরেখা নেওয়া হয়েছে। মার্কিন ভোক্তাবাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা থেকেই এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এসেছে। আগামী বছর থেকেই কারখানাটির অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ২০৩০-এর দশকের প্রথমার্ধেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কারখানাটিতে মূলত অডির কিউ৭, কিউ৮ এবং কিউ৯ মডেলের গাড়িগুলো তৈরি হতে পারে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর যে নীতি ট্রাম্প প্রশাসন গ্রহণ করেছিল, এ পদক্ষেপকে তারই সুফল হিসেবে দেখছেন রিপাবলিকান নেতারা। ওহাইওর সিনেটর বার্নি মোরেনো জানান, ট্রাম্পের শুল্কনীতি, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং জ্বালানি সংক্রান্ত নীতিমালার পরিবর্তনের কারণেই অডির এই মেগা বিনিয়োগ সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে অডির সমস্ত স্পোর্টস ইউটিলিটি গাড়ি দেশেই তৈরি হবে। তবে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশের দাবি, এ ধরনের শুল্কনীতির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির বাজারমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, পূর্বে আরোপিত শুল্কের কারণে গত বছরই অডিকে প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিক্রিত গাড়িগুলো মূলত ইউরোপ ও মেক্সিকো থেকে আমদানি করতে হতো।
চলতি সময়ে বৈশ্বিক বাজারে যখন বিক্রি নিম্নমুখী, তখন এই সম্প্রসারণে যাচ্ছে অডি। টানা দুই বছরের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক বিক্রি ৭ শতাংশ এবং মার্কিন বাজারে তা ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর বাইরেও সাউথ ক্যারোলাইনায় ভক্সওয়াগেনের মালিকানাধীন স্কাউট মোটরসের কারখানাকে কাজে লাগিয়ে বছরে আরও ২৫ হাজার গাড়ি উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে তাদের, যার একাংশ বিদেশেও রপ্তানি করা হতে পারে।
শুধু অডি নয়, সুরক্ষাবাদী নীতির চাপে টয়োটা টেক্সাসে ৩৬০ কোটি ডলারের নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং হোন্ডা ও হুন্দাইয়ের মতো এশীয় নির্মাতারাও দেশটিতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি নির্মাতাদের এই কারখানা স্থানান্তরের বিপরীতে নিজ দেশ জার্মানিতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ভক্সওয়াগেন গোষ্ঠী; নেকারজুলমের প্লান্টসহ তাদের চারটি জার্মান কারখানা ২০৩০ সালের পর বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তির পর প্রথম রুশ ডিজেলবাহী ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ট্যাংকারটি নিউইয়র্কের দিকে যাচ্ছে এবং আগামী ৭ নভেম্বর সেখানে পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের উচ্চমূল্য কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি মাসে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা তাঁর প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, মাল্টার পতাকাবাহী মাঝারি আকারের ট্যাংকার ‘আজিওই ফানেন্দেস’ গত ২২ অক্টোবর রাশিয়ার বাল্টিক সাগর তীরবর্তী প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন অতি-স্বল্প সালফারযুক্ত ডিজেল বোঝাই করে। তবে এ চালানের ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম রুশ জ্বালানি পণ্য আমদানির ঘটনা হতে পারে।
ট্রাম্প গত ৯ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে তিন লাখ মেট্রিক টন বা ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ১০ লাখ টন রপ্তানির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, চুক্তির আওতায় প্রথম জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছে। তবে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য কি না, তা তিনি নিশ্চিত করেননি। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম ট্যাংকারের যাত্রার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী চালানগুলোও নিয়মিত পাঠানো হবে। চুক্তির আওতায় রাশিয়া ডিজেল রপ্তানিতে নিজেদের আরোপ করা স্বেচ্ছামূলক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে রাশিয়া মূলত তুরস্ক, ব্রাজিল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডিজেল রপ্তানি করে আসছে। রেলপথে মধ্য এশিয়াতেও জ্বালানি সরবরাহ করে দেশটি। এলএসইজি ও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর রুশ ডিজেলবাহী জাহাজগুলো পুরোনো গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে। অন্তত দুটি ট্যাংকারের তুরস্ক ও ব্রাজিলের দিকে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্রে আরও জ্বালানি পাঠানো হবে। তাঁর মতে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বাড়িয়ে প্রতি মাসে স্বাভাবিক তিন থেকে সাড়ে তিন মিলিয়ন টনে উন্নীত করতে পারবে।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ দাবি করেছেন, ডিজেল চুক্তির অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের সহযোগিতা চেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেনিম বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইউরোপের এই বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। যদিও আগস্টে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ফিরে এসেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ৮০ হাজার ইউরোতে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফলে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশও আগের বছরের আগস্টের তুলনায় বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশগুলো মোট ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ১০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ইউরো। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে আমদানির মূল্য কমেছে ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে আগস্টে আমদানি বেড়ে ৪৩ কোটি ১৬ লাখ ১৬ হাজার ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। টানা আট মাসের হিসাবের মধ্যে আগস্টের এই প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বাজারে ডেনিমের চাহিদা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরছে।
ইইউর ডেনিম সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বছরের প্রথম আট মাসে দেশটি বাংলাদেশ থেকে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম আমদানি করেছে। এ সময়ে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান থেকে আমদানি হয়েছে ৫২ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ইউরো এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা তুরস্ক থেকে ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো মূল্যের ডেনিম।
শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও রপ্তানি আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই পতন ইউরোপের সামগ্রিক ডেনিম আমদানি হ্রাসের হার ৪ দশমিক ৪০ শতাংশের চেয়েও বেশি। একই সঙ্গে বাজারটিতে বাংলাদেশের অংশ গত বছরের ২৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে। তবে আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই মাসে ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ৩১ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ৩০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মাসটিতে ইইউর ডেনিম আমদানিতে মোট যে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বৃদ্ধির কারণে।
আগস্টের এই অগ্রগতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হারও কিছুটা কমেছে। জুলাই শেষে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম ছিল। আগস্টের প্রবৃদ্ধির পর আট মাস শেষে সেই পতন নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ, এক মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির অবনতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
ইইউর ডেনিম বাজারে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের অবস্থান দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিক আমদানিতেও প্রভাব পড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তুরস্ক থেকে ডেনিম আমদানির মূল্য কমেছে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। ইউরোপের বাজারে ডেনিম আমদানি কমার ক্ষেত্রে তুরস্কের এই পতন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া মরক্কো থেকে আমদানি ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, পাকিস্তান থেকে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, কম্বোডিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং তিউনিসিয়া থেকে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে কয়েকটি দেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এ সময়ে মিসর থেকে ডেনিম আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। চীন থেকে আমদানি বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ইউরো। আর ভিয়েতনাম থেকে আমদানি বৃদ্ধির হার ছিল ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো। তুরস্কের সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও বাংলাদেশ সেই সুযোগের পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। বরং মিসর, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে নিজেদের সরবরাহ বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজারে অংশ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম দামের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত পণ্য সরবরাহ, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নকশা ও উৎপাদনে নমনীয়তা এবং নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি দেশগুলো দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা পেতে পারে। তাই ইউরোপীয় ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারলে নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বাংলাদেশের।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইইউর ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য কমলেও শীর্ষ সরবরাহকারীর অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে। আগস্টের প্রবৃদ্ধি বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখালেও প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখে বাজারে নিজেদের অংশ বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানিকারকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা আট দিন বন্ধ থাকার পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরায় চালু হয়েছে। শনিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পণ্যবাহী একটি ট্রাক দেশে প্রবেশের মাধ্যমে এ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল হয়।
এর আগে দুর্গাপূজার অবকাশ উপলক্ষে গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সব ধরনের পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এই পুরো সময়ে হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে বৈধ পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন ছিল।
বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরায় শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করে হিলি স্থলবন্দর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী জানান, দীর্ঘ আট দিনের ছুটি শেষে শনিবার দুপুর থেকে বন্দরে পুরোদমে পণ্য খালাস ও আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। অপরদিকে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন জানান, পণ্যবাহী যান চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে পাসপোর্টধারী ভ্রমণকারীদের পারাপার প্রক্রিয়া সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গতকাল শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বা ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার ২৭ সেন্ট হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিলের পর ব্রেন্টের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা। এসব হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর এবং হরমুজ প্রণালিসহ আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এলপিএল ফিন্যান্সিয়ালের প্রধান ক্রস-অ্যাসেট কৌশলবিদ অ্যাডাম টার্নকুইস্ট বলেন, সৌদি আরবে জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থানে হুতিদের হামলার পর সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো দেশটির ধাহরানে অবস্থিত প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্ম আল কুয়াইন উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর জানিয়েছে দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তবে এ ঘটনার কারণ কিংবা সংশ্লিষ্ট জাহাজের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। গত ৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার পশ্চিমে ‘জেম নম্বর ২’ নামের একটি সুপারট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে সামুদ্রিক পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাতের ঝুঁকি। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো বলেন, গত সপ্তাহে তেলবাহী জাহাজে হামলার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়লেও পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা সম্ভব, তবে সংঘাত ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সরবরাহসংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের অনুমোদন দিয়েছে। লুইজিয়ানার লেক চার্লস শোধনাগারে সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব মোকাবিলায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় দেশটির কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে জার্মানিও কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে জি-৭ দেশগুলোর মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তের পর এটিই জার্মানির প্রথম এমন পদক্ষেপ।
অন্যদিকে লিবিয়ার হামাদা ও তাহারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল পরিবহনের একটি পাইপলাইনের ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির জাতীয় তেল করপোরেশনের প্রধান রয়টার্সকে জানিয়েছেন। এতে ওই দুই তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র পক্ষকাল আগে কানাডা থেকে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্য মেইনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের মুখে থাকা রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের তৎপরতার পরই মূলত হোয়াইট হাউস এই শুল্ক ছাড়ের পদক্ষেপ নেয়।
হোয়াইট হাউসের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ছাড়ের তালিকায় প্লাইউডের শিট, কিছু বিশেষ কাগজজাত সামগ্রী, শীতলীকরণ সরঞ্জাম ও সুনির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে কয়েকটি পণ্যে স্বস্তি দেওয়া হলেও কার্পেট, নির্দিষ্ট ধরনের ভালভ ও বর্জ্যজাত সামগ্রীর ওপর নতুন শুল্ক আরোপেরও ঘোষণা রয়েছে, যা আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে মরিয়া ডেমোক্র্যাটরা মেইনের সিনেট আসনটিকে বিশেষ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্য সংঘাতের বিরূপ প্রভাবে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলিন্স জানান, ব্লুবেরি, আলু, আপেল এবং সামুদ্রিক শৈবাল চাষে ব্যবহৃত উপকরণের মতো মেইনের কৃষিশিল্পের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যগুলোতে তিনি এই শুল্ক ছাড় নিশ্চিত করেছেন। তিনি তুলে ধরেন যে স্থানীয় কৃষকেরা এমন সব বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও প্যাকেজিং উপকরণের জন্য কানাডার ওপর নির্ভরশীল, যা যুক্তরাষ্ট্রে সহজলভ্য নয় কিংবা তার বিকল্প ব্যবহার অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
কানাডার মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। কিন্তু গত আগস্টে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে অটোয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প, যা হকিস্টিক থেকে সিমেন্ট পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার মূল্যের পণ্যকে প্রভাবিত করেছে। এর আগে অটোমোবাইল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের ওপর আরোপিত মার্কিন শুল্কের জেরে দেশটিতে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং টানা দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে কানাডা প্রযুক্তিগত মন্দার কবলে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কানাডার মন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান যে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি অটোয়া অবগত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এসব পদক্ষেপ পর্যালোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গঠনমূলক ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে কানাডা প্রস্তুত রয়েছে।’ বৈশ্বিক বাণিজ্যে দীর্ঘকাল ধরে অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে—এমন দাবি তুলে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প বন্ধু ও প্রতিপক্ষ উভয় পক্ষের ওপরই ব্যাপক হারে শুল্ক চাপিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন।