দুই প্রকল্পে বাংলাদেশকে ৮৫ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১০ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)। চাকরি সৃষ্টি, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে এ ঋণ দেওয়া হবে।
গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে একটি আর্থিক চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরে বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার সিদ্দিকী এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর ফর বাংলাদেশ গেইল। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজারও উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বব্যাংক জানায়, বাংলাদেশকে দেওয়া আর্থিক প্যাকেজের মধ্যে দুটি প্রধান প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ‘স্ট্রেন্থেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইম্প্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন, অ্যান্ড টার্গেটিং (এসএসপিআইআরআইটি)’ প্রকল্পের আওতায় ২০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ সরাসরি নগদ অর্থ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে। এই প্রকল্পে যুব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, ক্ষুদ্রঋণ এবং পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা যায়।
অপর প্রকল্পটি হলো- বে-টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট। এই প্রকল্পে ৬৫ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বে-টার্মিনাল গভীর সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে। এর ফলে বন্দরের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষমতা বাড়বে এবং পরিবহন খরচ ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই বন্দরের উন্নয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং প্রতিদিন প্রায় এক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। মাদার ভ্যাসেলের মতো বড় জাহাজ আসতে সুবিধা তৈরি হওয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হবে। এ ছাড়াও প্রকল্পটি নারী উদ্যোক্তা এবং বন্দর পরিচালনায় নারী কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর ফর বাংলাদেশ গেইল মার্টিন বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে থাকতে হলে বাংলাদেশকে তার জনসংখ্যার জন্য, বিশেষ করে প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশকারী প্রায় ২০ লাখ যুবকের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এই আর্থিক প্যাকেজটি বাণিজ্য ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে দুর্বলদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে উত্তরণে ও চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একটি গেম-চেঞ্জার হবে।
ইআরডি শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা অর্জনে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো দেশের জলবায়ু স্থিতিশীলতা এবং একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গত সপ্তাহে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের গতি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার মূলধন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন দিনই মূল্য সূচক বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সপ্তাহ পার করেছে বাজার। এর ফলে ডিএসইর বাজার মূলধন আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বৃদ্ধি পেলেও প্রধান মূল্য সূচকের ক্ষেত্রে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে। ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে ১৭৯টির দর কমেছে এবং ২২টি প্রতিষ্ঠানের দর অপরিবর্তিত ছিল।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের হিসাব অনুযায়ী ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৯১৪ কোটি টাকায়, যা পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় ২ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বেশি। এর আগে গত সপ্তাহেও বাজার মূলধন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল, ফলে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মোট মূলধন বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। তবে মূলধন বাড়লেও ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৩৪ দশমিক ৬২ পয়েন্ট বা দশমিক ৫৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে শরিয়াহ্ সূচক ও ডিএসই-৩০ সূচকেও গত সপ্তাহজুড়ে কিছুটা পতন দেখা গেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতিতে বেশ চাঞ্চল্য দেখা গেছে। ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, মালেক স্পিনিং এবং সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট। এছাড়া একমি পেস্টিসাইড, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল।
বাংলাদেশ থেকে তাজা আনারস আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে পাকিস্তান সরকার। শুক্রবার এক আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে ইসলামাবাদে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সফল পরিণতি হিসেবে এই বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই রপ্তানি অনুমতি লাভের পেছনে ইসলামাবাদস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন, করাচির উপ-হাইকমিশন, বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরলস প্রচেষ্টা কাজ করেছে। পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের সাথে কয়েক বছর ধরে চলমান যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমেই আজকের এই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত হয়েছে।
বিপুল চাহিদাপূর্ণ এই বাজারে বাংলাদেশি আনারস প্রবেশের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ হলো। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই অনুমোদনের ফলে কেবল আনারস নয়, বরং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য ও ফলমূল আদান-প্রদানের পথও প্রশস্ত হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অষ্টম সভায় সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং থেকে এক কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী। সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি প্রক্রিয়ায় এই জ্বালানি সংগ্রহের প্রস্তাবটি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অনুমোদিত এই চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ ও ১২ আগস্টের মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি দেশে এসে পৌঁছাবে। দরপত্রের শর্তানুসারে, প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের জন্য ব্যয় হবে "২১.৫৫ মার্কিন ডলার"। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক বার্তার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে গণমাধ্যম।
সভায় আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই এলএনজি সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। নির্ধারিত দাম ও সময়সীমা বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে এই জ্বালানি সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদী এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
অপরপক্ষে, গানভর ইউএসএ এলএলসি-এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি ক্রয়ের একটি প্রস্তাবও উক্ত সভায় পর্যালোচনার জন্য আনা হয়েছিল। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই প্রস্তাবটি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর বিবেচিত হয়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এই প্রস্তাবটি আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে নেওয়ায় কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
দেশের স্বর্ণ খাতকে একটি আধুনিক, সুসংগঠিত এবং জবাবদিহিমূলক শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘জাতীয় স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই বিশেষ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বর্ণ ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনয়ন, বৈধ বাণিজ্যের প্রসার এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণ আরও শক্তিশালী করা। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নীতিমালার খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। উক্ত সভায় বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আগামী রোববারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ ও অংশীজনদের এই খসড়ার ওপর লিখিত মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দেশের স্বর্ণ শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাবে দেশের স্বর্ণ খাত একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বর্ণ খাতকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মন্ত্রী বলেন, "সরকারের লক্ষ্য হলো স্বর্ণ ব্যবসাকে অন্যান্য শিল্প খাতের মতো পূর্ণাঙ্গ আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এনে একটি স্বীকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ জোরদার এবং স্বর্ণের লেনদেন ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।" নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে স্বর্ণের আমদানি থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বর্ণের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, "বৈধভাবে আমদানি করা এবং দেশে সংরক্ষিত স্বর্ণ জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতোই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করে।" চোরাচালান বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দামের সামঞ্জস্য না থাকলে পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। এ ক্ষেত্রে দুবাইয়ের মতো বৈশ্বিক স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর কর ও শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
খসড়া নীতিমালায় স্থানীয় কারিগরদের তৈরি স্বর্ণালংকার রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়টিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর জন্য সুলভ মূল্যে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, "বাংলাদেশে বিশেষ করে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। একটি যুগোপযোগী ও সুসংগঠিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভোক্তারা ন্যায্য মূল্যে স্বর্ণ কেনার সুযোগ পাবেন।" ভারতসহ বিশ্বের প্রধান স্বর্ণ রপ্তানিকারক দেশগুলোর নীতিমালা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করা হবে বলে জানানো হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রী অংশীজনদের আশ্বস্ত করে বলেন, "সরকারের উদ্দেশ্য নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি করা নয়; বরং একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতিগত কাঠামো গড়ে তোলা।" সকল পক্ষের সুপারিশ ও মতামত যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজনে আরও আলোচনার মাধ্যমে এই নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
দেশের শেয়ারবাজারে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বড় ধরনের দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিন ভালো মানের মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির পাশাপাশি দুর্বল খাতের প্রতিষ্ঠান এবং অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের দাম কমেছে। এই ঢালাও দরপতনের ফলে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) মূল্য সূচকের অবনতি ঘটেছে। তবে সূচক কমলেও উভয় বাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেনের শুরুর দিকে মিউচুয়াল ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতের শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে লেনদেনের শেষ আড়াই ঘণ্টায় বাজারের চিত্র বদলে যায় এবং ব্যাপক বিক্রয় চাপের মুখে দরপতনের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। দিন শেষে ডিএসইতে মাত্র ৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে ২৬৩টির দাম কমেছে এবং ৪১টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে মাত্র ২টির দাম বাড়লেও ৩০টির দাম কমেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভালো কোম্পানি বা যারা ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ প্রদান করে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৯টির শেয়ার দর কমেছে এবং মাত্র ৪৫টির বেড়েছে। মাঝারি মানের কোম্পানির ক্ষেত্রে ৫২টির দাম কমেছে এবং ১৮টির বেড়েছে। অন্যদিকে, লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৭২টির দাম কমেছে এবং ২৫টির দাম বেড়েছে। ব্যাপক দরপতনের কারণে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৮৬০ পয়েন্টে নেমেছে। একইভাবে ডিএসই-৩০ সূচক ৯ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।
সূচক কমলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বেড়ে ১ হাজার ১৪৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, যাদের প্রায় ৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল যথাক্রমে সেনা ইন্স্যুরেন্স এবং একমি পেস্টিসাইড। এছাড়া শীর্ষ তালিকায় সামিট এলায়েন্স পোর্ট, মালেক স্পিনিং, বেক্সিমকো ও মুন্নু ফেব্রিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থান করে নিয়েছে।
দেশের অন্য শেয়ারবাজার সিএসইতে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬৪ পয়েন্ট কমেছে। সেখানে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২৭টির দাম কমেছে এবং ৮৭টির দাম বেড়েছে। সূচক কমলেও সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে ২৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ১৮ কোটি ৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে সপ্তাহের শেষ দিনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কাবস্থা ও বিক্রয় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের গতিতে নজিরবিহীন ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এর আগে ১৯৯৩ সালে ঋণের প্রবৃদ্ধি এতটা নিচে নেমেছিল।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়া, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের পাহাড়সম চাপ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে ঋণপ্রবাহে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত বছরের জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এমনকি করোনা মহামারির চরম বিপর্যয়ের সময়ও এই প্রবৃদ্ধি কখনও সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার সরাসরি অর্থ হলো দেশে নতুন বিনিয়োগের গতি মন্থর হওয়া। যেহেতু দেশের কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তাই বিনিয়োগ কমলে তার নেতিবাচক প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দেওয়ার চেয়ে পুরনো ঋণ আদায়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অনেক ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক অবস্থা ও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে বড় অংকের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল উচ্চ সুদহার নয়, বরং অবকাঠামোগত নানা সংকট বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার অনেক নতুন প্রকল্প চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এর সাথে ডলারের বাজারের অস্থিরতা, কাঁচামাল আমদানিতে অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্থিতিশীলতা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার হারও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোকে আরও রক্ষণশীল করে তুলেছে। গত মার্চ পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো বড় শিল্পঋণের ঝুঁকি না নিয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে অধিক নিরাপদ মনে করছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তাদের মতে, অতীতে প্রভাবশালী গ্রাহকরা যেভাবে ঋণ নিয়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন বা অর্থ পাচার করেছেন, সেই তুলনায় বর্তমানের এই সতর্ক ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দিতে পারে।
অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নীতিসুদ বা রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে প্রথম কমানোর সিদ্ধান্ত। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ সহজ হবে এবং ঋণের সুদহারও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া উৎপাদনমুখী খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল এবং সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা শিথিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত হলো, শুধুমাত্র সুদহার কমিয়ে বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বিনিয়োগে জোয়ার আনা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে সবার আগে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বর্তমান সরকার আগামী দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নিয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত না হলে তা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অর্থবছর শেষে ৮ শতাংশে পৌঁছাবে।
ইউরোপীয় অঞ্চলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রসারের অংশ হিসেবে পর্তুগালে প্রথমবারের মতো ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান রেনাটা পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে দেশটিতে তাদের ওষুধের প্রথম চালানটি সফলভাবে প্রেরণ করেছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে এই বাণিজ্যিক অগ্রগতির তথ্য নিশ্চিত করেছে ওষুধ ও রসায়ন খাতের এই শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিটি।
রেনাটার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম চালানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (ইইউ-জিএমপি) অনুমোদিত রাজেন্দ্রপুর ও মিরপুর কারখানা থেকে উৎপাদিত অ্যামান্টাডিন ক্যাপসুল, ফ্লুড্রোকর্টিসোন এবং ক্যাবারগোলিন ট্যাবলেট পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, পর্তুগালের বাজারে এই প্রবেশ তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ কৌশলের একটি বিশেষ মাইলফলক, যা সমগ্র ইউরোপে রেনাটার বাণিজ্যিক উপস্থিতিকে আরও সুসংহত করবে।
এর আগে গত ৩ জুলাই রেনাটা পিএলসি আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও মাল্টাসহ ইউরোপের ছয়টি দেশে থাইরয়েড চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লেভোথাইরক্সিন সোডিয়াম ট্যাবলেট বাজারজাতকরণের অনুমতি লাভ করে। বিকেন্দ্রীকৃত অনুমোদন প্রক্রিয়ার অধীনে পাওয়া এই স্বীকৃতির মাধ্যমে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইইউ-জিএমপি অনুমোদিত রেনাটার সর্বাধুনিক প্ল্যান্টে এই ওষুধগুলো উৎপাদিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে দেশের শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত রেনাটা পিএলসির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকারও বেশি। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের একটি বড় অংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকলেও এতে বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। পর্তুগালে এই নতুন যাত্রা কোম্পানির বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে টানা পাঁচ মাস ধরে চলা অস্থিরতা বৈশ্বিক এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এতদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না। এখন জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আরও বড় একটি পরিবর্তন সামনে এসেছে। সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার কাঠামোও ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে।
এখনও অনিশ্চয়তায় হরমুজ প্রণালি
পাঁচ মাস পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজিবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে কি না।
গত মার্চে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি 'ফোর্স ম্যাজিউর' ঘোষণা করার পর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সম্প্রতি উত্তেজনা কিছুটা কমলেও বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
২৯ জুলাই কাতারএনার্জির এলএনজিবাহী জাহাজ আল আরিশ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। ১১ জুলাইয়ের পর এটিই ছিল প্রণালি ত্যাগ করা প্রথম নিবন্ধিত এলএনজি জাহাজ। একই সময়ে কাতারএনার্জি তাদের 'ফোর্স ম্যাজিউর' অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দেয়। এর ফলে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
শুধু সরবরাহ নয়, বদলে যাচ্ছে পুরো বাজার
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, এলএনজি শিল্প এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সরবরাহ ও চাহিদা, উভয় দিক থেকেই ঝুঁকি বাড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি হলে এলএনজি সহজেই বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে এবং বৈশ্বিক চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে। বর্তমান সংকট সেই দুই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আংশিকভাবে সামাল মিললেও ঝুঁকি রয়ে গেছে
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন উৎপাদন এবং অন্যান্য উৎস থেকে বাড়তি সরবরাহের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হারানো এলএনজির প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে বাকি ২৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণের মতো বিকল্প উৎস এখনো নেই। অর্থাৎ বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ বজায় থাকলেও প্রতিবার উত্তেজনা বাড়লে জাহাজ ভাড়া, বিমা ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়।
এর প্রভাব মূল্যেও স্পষ্ট। জানুয়ারিতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার। জুলাইয়ে তা বেড়ে ২০ থেকে ২২ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে যুদ্ধসংক্রান্ত যেকোনো খবরেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামে তাৎক্ষণিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
চাহিদার কাঠামোও বদলাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটছে চাহিদার ক্ষেত্রে।
প্রতিটি ভূরাজনৈতিক সংকট দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে আরও উৎসাহিত করছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুতায়ন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কিছু দেশ জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে কয়লার ব্যবহারও দীর্ঘায়িত করছে।
শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা হঠাৎ কমে না, তবে বড় ভূরাজনৈতিক সংকট এই পরিবর্তনের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
সামনে চাহিদা কমার আশঙ্কা
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাস স্ট্র্যাটেজিসের সম্ভাব্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে আরব উপসাগর থেকে এলএনজি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত থাকলে ২০২৫-২০২৬ সময়ে বৈশ্বিক চাহিদা প্রায় ৮ শতাংশ কমতে পারে।
অন্যদিকে, শেলের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলতি মৌসুমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি থেমে যেতে পারে, এমনকি সংকোচনও দেখা দিতে পারে। তাদের মতে, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলেও রপ্তানি টার্মিনালগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগবে।
উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা মিলবে তো?
বর্তমানে যেসব নতুন এলএনজি প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলো চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে আরও প্রায় ২০ কোটি ৭০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে। অথচ গত বছর বিশ্বে মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ কোটি ২০ লাখ টন।
ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে সংকট কি উৎপাদনের হবে, নাকি পর্যাপ্ত ক্রেতা খুঁজে পাওয়ার?
আস্থাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হবে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে নয়। বরং সফল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, উন্নত লজিস্টিকস, বহুমুখী উৎস, সংরক্ষণ সুবিধা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে।
হরমুজ প্রণালির সংকট শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক এলএনজি শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে, যখন গ্যাসের চেয়ে আস্থার মূল্য আরও বেশি, তখন ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি।
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম পুনরায় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ভরিপ্রতি ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা। আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে বাজুসের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আজ সকাল ১০টা থেকেই নতুন এই দর কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এটি বহাল থাকবে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা এই সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকায় বিক্রি হবে। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা। এর আগে গত ৩১ জুলাই বাজুস শেষবারের মতো স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ভরিপ্রতি ২৯২ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম এখন ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা। একইভাবে ভ্যাটসহ ২১ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৩৩ টাকায় পাওয়া যাবে। মূলত বিশ্ববাজার ও স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহের অস্থিতিশীলতার কারণেই জুয়েলারি খাতে এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সোনার এই উচ্চমূল্যের ফলে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুতই কোনো চুক্তি হতে পারে—এমন সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। এই ইতিবাচক খবরের প্রভাবে মঙ্গলবার বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি সচল করার ব্যাপারে ‘আজ অথবা আগামীকাল’ একটি চুক্তি হতে পারে। তার এই বক্তব্যের পরপরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দেয়। বার্তা সংস্থা এএফপি এই খবর নিশ্চিত করেছে।
বিগত পাঁচ মাস ধরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস বহনকারী ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। তবে নতুন করে সমঝোতার পথ প্রশস্ত হওয়ায় বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও; ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান দুটি সূচক নতুন রেকর্ড গড়েছে। পাশাপাশি ইউরোপের প্যারিস ও মিলানের শেয়ার সূচক ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মাদ্রিদের বাজারও আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশাতীত মুনাফা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। প্যালান্টির ও ক্যাটারপিলারের মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল বাজারের গতি বৃদ্ধি করেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝেও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।
বি. রাইলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট-এর বাজার বিশ্লেষক আর্ট হোগান বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী নিয়ে এই প্রশাসনের কেউ ইতিবাচক কিছু বললেই বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, আজকের লেনদেন তারই বড় উদাহরণ।’ তিনি মনে করেন, চলতি মৌসুমে কোম্পানিগুলোর অসাধারণ মুনাফাও বাজারকে চাঙ্গা রেখেছে।
তবে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ এর আগেও সমঝোতার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। পরিস্থিতির জটিলতা বজায় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে মঙ্গলবারও, যখন হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে।
টিকমিল গ্রুপের বাজার কৌশলবিদ প্যাট্রিক মানেলি বলেন, ‘বাজার এখন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করছে। তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক সংঘাত আরও বাড়ার ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত কয়েক মাসে তেল কোম্পানিগুলো ব্যাপক মুনাফা করেছে। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বিপি-র মুনাফা কয়েকগুণ বাড়লেও মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে তাদের দরপতন হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরামকো জানিয়েছে তাদের নিট মুনাফা ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ জ্বালানি জায়ান্ট এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার মুনাফা অর্জন করেছে। তবে জ্বালানি তেলের দামের এই অস্থিরতা জার্মানির লুফথানসার মতো বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দেশের বাজারে কাঁচামরিচের তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে ভারত থেকে আমদানি জোরদার করা হয়েছে। গত দুই দিনে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৩৮ হাজার ৪২০ কেজি ভারতীয় কাঁচামরিচ দেশে প্রবেশ করেছে। সোমবার ৯ হাজার ২০০ কেজি এবং মঙ্গলবার ২৯ হাজার ২২০ কেজি মরিচের চালান বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এই বিপুল পরিমাণ আমদানির প্রভাবে ইতোমধ্যে স্থানীয় বাজারে মরিচের দাম কমতে শুরু করেছে।
আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে প্রতি কেজি মরিচ ২৫ থেকে ৪০ টাকা দরে কেনা হলেও দেশের বাজারে পৌঁছাতে খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আমদানিকারকরা দাবি করেছেন যে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যদি প্রকৃত ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক নির্ধারণ করত, তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে আরও কম মূল্যে মরিচ সরবরাহ করা সম্ভব হতো।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৯ জন ব্যবসায়ীকে প্রায় ৩০ হাজার টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়া হয়েছে। আমদানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজারে সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তের ওপারে আরও বেশ কিছু ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বৃহস্পতিবার নাগাদ বন্দরে পৌঁছাতে পারে। আমদানিকারকরা স্বল্প লাভে বাজারে পণ্য ছাড়ছেন উল্লেখ করে জানান যে, কাস্টমস ও বন্দরের আনুষঙ্গিক খরচই মূলত প্রকৃত বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের জেরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ২০ শতাংশ কারখানায় চার দিনের টানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার শুরু হওয়া এই সরকারি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি সমন্বয় করে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সীমিত সরবরাহের কারণে গাজীপুরের পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে শত শত পোশাক শ্রমিক তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন, যার ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের ভিড় ও যানবাহনের প্রবল চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
শিল্পাঞ্চল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের তীব্র সংকটের মুখে উৎপাদন সচল রাখতে মালিকেরা ইতিপূর্বে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। কোথাও উৎপাদন লাইন কমিয়ে আনা হয়েছিল, আবার কোথাও শুধুমাত্র রাতের শিফটে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে লম্বা ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে অনেক কারখানা। বিশেষ করে কালিয়াকৈর, টঙ্গী বিসিক ও শ্রীপুর অঞ্চলের কারখানাগুলো গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও ভোগড়া এলাকায় ভিড় জমাচ্ছেন, যার ফলে ভোর থেকেই মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি দেখা গেছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, জেলায় মোট কারখানার প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে ছুটিতে রয়েছে। যার অধিকাংশ তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং ও ডাইং খাতের। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, যানবাহনের বাড়তি চাপের কারণে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিল্প মালিকদের মতে, অব্যাহত গ্যাস সংকটের ফলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার এবং পুরো শিল্প খাত ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাজীপুর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেলায় দৈনিক ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলমান থাকলেও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা পুরোপুরি মিটবে না। রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে শিল্প মালিকেরা দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিউক এনার্জি চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ওয়াল স্ট্রিটের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। এলএসজিই (LSEG) সংকলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৩০ জুন সমাপ্ত তিন মাসে উত্তর ক্যারোলাইনাভিত্তিক এই কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ১ দশমিক ৪৩ ডলার সমন্বিত মুনাফা অর্জন করেছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশিত ১ দশমিক ৩০ ডলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মূলত বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান ব্যয় সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি এই শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর ওপর চরম আবহাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুতায়নের যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় ডিউক এনার্জি ২০২৬ সাল নাগাদ গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মাশুল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। অবকাঠামোগত মানোন্নয়নের ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা ‘রেট কেস’ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়। ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমেই মূলত এই মুনাফার ধারা বজায় রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যবসায়িক খাতের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিউক এনার্জির ইলেকট্রিক ইউটিলিটি বিভাগ থেকে আলোচ্য প্রান্তিকে মুনাফা অর্জিত হয়েছে ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ফ্লোরিডা, ইন্ডিয়ানা, ওহাইও এবং কেনটাকির প্রায় ৭৯ লাখ গ্রাহককে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করছে এই সংস্থাটি, যাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫১ হাজার মেগাওয়াট। তবে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি থাকলেও ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের খরচ ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সার্বিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ডিউক এনার্জি তাদের পুরো বছরের জন্য সমন্বিত মুনাফার পূর্বাভাস শেয়ারপ্রতি ৬ দশমিক ৫৫ থেকে ৬ দশমিক ৮০ ডলারে অপরিবর্তিত রেখেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের উচ্চ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সম্ভব হবে।