কৃষি খাতের ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আগামী দুটি মাস যদি আমরা সাবধানে পা ফেলি, তাহলে এরই মধ্যে আমাদের আইএমএফের টাকা যখন আসতে শুরু করবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবির টাকা আসতে শুরু করবে। তখন আমরা একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির দিকে যেতে শুরু করব। আমার বিশ্বাস, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা এলে, বিভিন্ন দেশে সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশের খুব একটি সমস্যা হবে না।’
গত বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই আশার কথা শুনিয়েছেন আতিউর রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
আড়াই বছরের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় কেমন চলছে বাংলাদেশের অর্থনীতি? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, বাংলাদেশে অর্থনীতি এখনো মজবুত ভিত্তির ওপর আছে; খাদ্যসংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। আপনার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
আমাদের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন, আমাদের যে খাদ্য পরিস্থিতি, আমাদের যে নীতি সমর্থন, আমাদের কৃষিতে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে ও আগামীতে যে আরও বিনিয়োগ হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খাদ্যসংকট নিয়ে দুর্ভাবনা করার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। এ কথা ঠিক, সবাই ২০২৩ সালকে মন্দার বছর বলছেন। আর সেই সময় খাদ্য পরিস্থিতি খারাপ হবে বলছেন। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। এর বড় কারণ বাংলাদেশের কৃষির জন্য আমরা অনেক দিন ধরে কাজ করছি। শুধু সরকার নয়, আমাদের ব্যক্তি খাত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবাই কাজ করছে। সবাই এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর জোর দিচ্ছে।
যদিও আমরা এক্সপোর্ট নিয়ে অনেক কথা বলি। রেমিট্যান্স নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু আমাদের দেশীয় অর্থনীতি সেটি কিন্তু ভোগনির্ভর। সেটি আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর। সেখানেই আমরা অনেক বেশি জোর দিয়েছি। বঙ্গবন্ধু কৃষিতে গুরুত্ব দিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন। মন্দা যদি চলে আসে। তখন হয়তো আমদানি করা খাদ্য আমাদের জন্য আনতে হবে। সেগুলোর তো দাম অনেক বেশি হবে। সেটি আনতে গিয়ে হয়তো চাপ পড়বে। নিজেরা যদি আমরা আমাদের নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করতে পারি। আমাদের ভোগটা যদি আমরা সামলাতে পারি। তাহলে আমাদের বেশি ডলার খরচ করতে হবে না। সেই অর্থে কৃষি একটি ফুড সাবস্টিটিউট ইন্ডাস্ট্রি। যদি আমাদের অনেক আমদানি করতে হতো। সেই আমদানির যে মূল্য সেটি কিন্তু বর্তমান রিজার্ভের ওপর আরও চাপ তৈরি করত।
বাংলাদেশ কৃষির উন্নয়নের জন্য যে নীতিমালা গ্রহণ করেছে সেটি যথার্থ। এ জন্যই বলছি, আমি দুই-তিন দিন আগেই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ করে এলাম। তেঁতুলিয়ায় গিয়েছিলাম, ঠাকুরগাঁও গিয়েছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দেখলাম যে এবার আমন উৎপাদন বাম্পার হয়েছে। কৃষকের মুখে হাসি। কারণ তারা অনেক বেশি উৎপাদন করতে পেরেছে। এখন আমাদের জন্য যেটি চ্যালেঞ্জ, সেটি হচ্ছে বোরো। আমাদের বোরো উৎপাদন ঠিকমতো করতে হবে। সে জন্য সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা আশা করছি, বিদ্যুৎ সব সময় থাকবে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। ডিসেম্বরে আরও ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। সব মিলিয়ে মনে হয় কৃষকরা সেচের বিদ্যুৎ পাবেন। আমাদের জন্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ সেটি হচ্ছে ফার্টিলাইজার। আমরা যেন কৃষককে সময়মতো সার দিতে পারি। আমাদের খেয়ার রাখতে হবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের যে সার বিতরণব্যবস্থা তার ওপর নজর রাখতে হবে। যাতে আমাদের ডিলাররা কৃষকদের সার সময়মতো দিতে পারে। এটি নিয়ে যেন কোনো রকমের সমস্য না তৈরি হয়; সেদিকে খেয়াল করতে হবে। আরেকটি জিনিস করতে হবে আমন উৎপাদনের পর। আমাদের প্রকিউরমেন্ট শুরু হবে। আমরা যেন কৃষকদের যথার্থ মূল্য দিই।
আমি যদি ৫৫ টাকা করে চাল আমদানি করি। আমার কৃষককে যদি আমি ৫০ টাকাও না দিতে পারি, তাহলে কিন্তু কৃষকের প্রতি সুবিচার হচ্ছে না। এই জায়গাটিতে আমাদের খেয়াল করতে হবে। আমাদের যে মজুত সেটি বাড়িয়ে যেতে হবে। মজুত যদি আমাদের বেশি থাকে, তাহলে আমাদের বিশ্ব সংকট হলেও আমরা সামাল দিতে পারব। গ্রাম নিয়ে আমি চিন্তিত না। খাদ্য নিয়ে যদি কিছু টানাপোড়েন থেকে থাকে সেটি শহরে। শহরের যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তাদের আয়-রোজগার কিছুটা কমেছে। খাদ্য কিনতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে। গ্রামে যে রকম সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে, শহরে কিন্তু ততটা নেই। সুতরাং আমাদের শহরের খাদ্য নিয়ে আরও ভাবতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিরও উদ্বেগজনক সূচক এখন মূল্যস্ফীতি। সরকারি হিসাবেই অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। আগস্টে এই সূচক ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে উঠেছিল। মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে সরকারের কী করা উচিত?
সরকারের জন্য খুব অসুবিধা এই কারণে যে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নেই। আমাদের আছে টিসিবি। টিসিবির গলিতে গলিতে দোকানপাট নেই। সুতরাং মধ্যবিত্ত চাইলেও কিনতে পারে না। এখন ডিজিটাল যুগ। এই ডিজিটাল যুগে ডিজিটালভাবে সব রকম ব্যবস্থা করা যেত। মধ্যবিত্ত যদি একটি জায়গায় অনলাইনে ঢুকতে পারে। আমার পাঁচ কেজি চাল লাগবে, সেটি সরকার সহনীয় মূল্যে সরবরাহ করবে। এটি কিন্তু করা যায়। মধ্যবিত্ত সহজেই এনআইডি ব্যবহার করবে। একজন একবারের বেশি ব্যবহার করবে না। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে টাকাটি দিয়ে দেবে। যাদের দরকার তাদের এভাবে দেয়া যেতে পারে। এ রকম কিছু ইনোভেটিভ মেজার নেয়া যেতে পারে।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় গরিব মানুষ নানাভাবে সহায়তা পাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি পরিবারকে কম দামে খাদ্য দেয়া হচ্ছে। এগুলো খুবই ভালো উদ্যোগ বলে আমি মনে করি। অসহায় গরিব মানুষের খুব উপকার হচ্ছে। কিন্তু এখন আমাদের মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে ভাবতে হবে। আড়াই বছরের করোনা মহামারি এবং যুদ্ধের কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া কারও বেতনই কিন্তু বাড়েনি। বরং অনেকে চাকরি হারিয়েছেন; কম বেতন পাচ্ছেন। এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে চলা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই আমি মনে করি, সরকারকে এখন মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এতে যদি সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যায়, সেটি মেনে নিয়েই এই কাজটি করতে হবে।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপে আমদানি ব্যয় অনেক কমেছে। গত মার্চে পণ্য আমদানির জন্য যেখানে সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছিল, সেটি এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে শিল্প উৎপাদন বা সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?
এখনই এতটা অস্বস্তির কথাটা না ভাবাই ভালো। আমরা কৃষিতে যেহেতু ভালো করছি। আমাদের দেখতে হবে আমাদের আমদানি যেন বন্ধ না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমদানিতে আছে খাদ্য, কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি- এগুলোই মোট আমদানির ৮৫ শতাংশ। আমাদের রপ্তানি বাড়বে না যদি আমদানি না বাড়ে। সুতরাং আমদানিটা কিন্তু অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বাঁচানোর জন্য আমদানি বন্ধ করেছে। সেটির একটি সুফল আমরা পাচ্ছি। যাতে করে ছোট ছোট আমদানি যেমন গরুর জন্য ওষুধ, মুরগির জন্য খাদ্য- এগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ব্যাংকগুলো যেন এসব ছোটখাটো আমদানিতে ডলার জোগান দিতে পারে; এলসি খুলতে পারে- সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে সহায়তা করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের জন্য এখন খুবই ক্রিটিক্যাল সময়। এই সময় যাতে আমাদের জরুরি আমদানি বন্ধ না হয়, আমাদের যাতে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমাদের এক্সপোর্ট ও রেমিট্যান্স কিন্তু আবার বাড়ছে। আরও বাড়বে আমরা আশা করি। একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল এক্সচেঞ্জ রেট। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা চেষ্টা করছে। এক্সচেঞ্জ রেট একাধিক হওয়ার কারণে কিছু সংকট দেখা দিয়েছিল, ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছিল। এর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যেমন ওয়ার ট্রান্সফার এবং রেমিট্যান্সে জন্য একটি ডলার রেট হয়েছে।
কিন্তু এক্সপোর্ট এবং রেমিট্যান্সের মধ্যে পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। আমাদের ইন্টার ব্যাংক ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট এখন খুবই স্যালো। এটির একটি রেটেই থাকা উচিত। সেই রেট দেখে দেশের মানুষ এবং বিদেশি যারা আমাদের এখানে বিনিয়োগ করছেন তারা বুঝতে পারবেন যে টাকা এবং ডলারের রেশিওটি কত। এটি অনেক সময় বোঝা যায় না। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম থাকায় আমাদের সমস্যা হচ্ছে।
প্রাইভেট (বেসরকারি খাত) অনেক ফরেন ঋণ যারা নিয়েছেন, তারা একটু চাপের মধ্যে পড়ছেন। সেটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং যারা এই ঋণগুলো নিয়েছে তাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া হওয়া উচিত। এগুলোর জন্য সময় বাড়িয়ে নেয়া যায় কি না বা এগুলোর জন্য বিদেশি অন্যান্য ব্যাংক থেকে রিফাইন্যান্স করা যায় কি না- এসব নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি।
ছোট ব্যাংকগুলো যারা এক্সপোর্ট বেশি করে না, রেমিট্যান্স বেশি আনে না, তারা যাতে এসেনসিয়াল পণ্য আমদানি করতে ইন্টার ব্যাংক থেকে তাদের যেটি প্রাপ্য এক টাকা বেশি দিয়ে ডলার পায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আর তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মাসে ৫০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখতে পারে। এটি কিন্তু ছোট ইম্পোর্টের জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাতে কী হবে? হয়তো দেড় বিলিয়ন ডলার বাড়তি ড্র-ডাউন হবে। তাতে কিচ্ছু আসে যায় না, মার্কেট যদি আমাদের সুস্থির থাকে, এর চার গুণ আমাদের ফিরে আসবে। ইম্পোর্ট যদি চালু থাকে আমাদের যেই পরিমাণ কর্মসংস্থান হবে। বাংলাদেশ এখন অত্যন্ত একটি শক্তিশালী অবস্থানের ওপর আছে। আমার সবার কাছে অনুরোধ থাকবে অযথা গুজব ছড়াবেন না। বরং আমরা সবাই মিলে কিছু শক্তিশালী নীতিমালা গ্রহণ করে এই যে টানাপোড়েন ফরেন এক্সচেঞ্জের, সেটি হয়তো পূরণ করতে পারব। আর আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি যে সেটি তো অনেক শক্তিশালী। গ্রাম ভালো আছে। শহরে কিছু সামাজিক নিরাপত্তা দরকার। সরকার এরই মধ্যে এক কোটি কার্ড করেছে। তারা নানাভাবে চেষ্টা করছে। মধ্যবিত্তের জন্য যতটুকু পারা যায় চেষ্টা করতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় আমি বলতে চাই, আমাদের কথাবার্তায় আমরা যাতে খুব সাবধানে কথা বলি। যাতে কোনো রকম গুজব না তৈরি হয়। এ বিষয়গুলোর ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আগামী দুটি মাস যদি আমরা সাবধানে পা ফেলি, তাহলে আমাদের আইএমএফের টাকা যখন আসতে শুরু করবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবির টাকা আসতে শুরু করবে। আমাদের রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করেছে। একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির দিকে কিন্তু আমরা যাচ্ছি। আমার বিশ্বাস, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা এলে, বিভিন্ন দেশে সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশের খুব একটি সমস্যা হবে না। কেননা আমাদের সরকারি গুদামগুলোতে ২০ লাখ টনের মতো খাদ্য মজুত আছে। বেসরকারি পর্যায়েও প্রচুর খাদ্য আছে। আমনটা ভালো হয়েছে। বেরোটা যদি আমরা ভালোভাবে ঘরে তুলতে পারি, তাহলে খাদ্য নিয়ে আর আমাদের কোনো চিন্তা থাকবে না। আর পেটে ভাত থাকলে অন্য সব বাধাবিপত্তি মোবাবিলা করা খুব একটা কঠিন হবে না বলে আমি মনে করি।
আপনি বলছিলেন যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে যারা বিপদে পড়েছে। এদের কীভাবে সহায়তা করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি যে বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি, সেটি হলো জরুরি আমদানি বন্ধ করা যাবে না। নতুন পদ্ধতি আমাদের তৈরি করতে হবে। বাইরে থেকে বেশি ডলার আনার উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে। যারা বাইরে থেকে ডলারে ঋণ নিয়েছে। আর এখন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সংকটে পড়েছে। তাদের কিন্তু সাহায্য করার কথা সরকারকে চিন্তা করতে হবে। যারা সঠিক উদ্যোক্তা। তাদের উতরে নেয়ার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা এরা যদি বিপদে পড়ে, উৎপাদন কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু অর্থনীতিতে আরেক ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে; যারা এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন বা কাজ করছেন, তারা বেকার হয়ে যাবেন। তাই এ বিষয়টি এখন সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডি বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
হুন্ডি তখনই বাড়ে, যখনই কার্ব মার্কেটে ডলার রেটের সঙ্গে অফিশিয়াল রেটের পার্থক্য অনেক বেশি হয়। মার্কেট রেটে আমাদের এক্সচেঞ্জ রেটটি হওয়া উচিত। এক্সচেঞ্জ রেট আমরা এত দিন ফ্লোটিং ম্যানেজেমেন্ট করতাম। অর্থাৎ মার্কেট রেটের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, এখনো করছি। কিন্তু রেটের অ্যাভারেজ (গড়) করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এটিকে ছেড়ে দেয়া উচিত। কার্ব মার্কেট ও অফিশিয়াল রেটের পার্থক্য যদি ১ বা ২ টাকার হয়, তাহলে কিন্তু মানুষ অফিশিয়াল চ্যানেলেই টাকা পাঠাবে।
যারা অফিশিয়ালি টাকা পাঠাবে তাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আসা যায় কি না তা ভাবা দরকার। যেমন- এনআইডি ফিক্স করে তাদের ইনভার্সাল পেনশন স্কিমে যুক্ত করা, তাদের সন্তানদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা। এ রকম লং টার্ম ইনসেনটিভ প্যাকেজের সঙ্গে রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের যুক্ত করে দিলে দেশের স্বার্থে, পরিবারের স্বার্থে তারা অফিশিয়াল চ্যানেলে টাকা পাঠাবেন।
আরেকটি কাজ করতে হবে, আর সেটি হলো ক্যাম্পেইন করতে হবে। প্রবাসী ভাইবোনদের বলতে হবে, আপনারা যে আন-অফিশিয়াল চ্যানেলে (হুন্ডি) টাকা পাঠাচ্ছেন, এটি দিয়ে কী হয়? এই টাকা দিয়ে কেউ জঙ্গিপনা করে, অস্ত্র কেনে, সন্ত্রাস করে। তার চেয়ে টাকা অফিশিয়াল চ্যানেলে পাঠান, যেটি দিয়ে আমরা মেশিন কিনতে পারব রপ্তানির জন্য, শিশুখাদ্য কিনতে পারব। তখন তারা বুঝবেন, দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বৈধ পথে টাকা পাঠাবেন।
আমরা এই পারে (দেশে) যেমন ওয়ার্ল্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স যেমন আমরা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি, ওই পারেও অর্থাৎ উৎসেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, এক্সচেঞ্জ বা ব্যাংকগুলোকে অ্যাপস খুলতে বলতে পারি। ধরুন, ওইখানে একটি ফেইক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আছে, যেটি তারা বলে, সেটি কিন্তু সত্যি না, ফেইক।
কিন্তু একটি রিয়েল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস যদি করতে পারে এবং তারা যদি একটি অ্যাপস তৈরি করে, যেমন অগ্রণী ব্যাংক করেছে মালয়েশিয়ায়। তাহলে মরুভূমিতে বসেই আমাদের ভাইগুলো টাকা পাঠাবেন, যেটি আমাদের ব্যাংক হয়ে আবার তার বাড়িতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যাবে। এই রকম একটি ব্যবস্থা আমরা করতেই পারি। আমাদের রেগুলেটর ও তাদের রেগুলেটররা আলাপ করতে পারেন।
আমি যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন আমরা এই ধরনের একটি এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম মালয়েশিয়ায়, একটি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও বিকাশের সঙ্গে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম। এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট আরও বেশি করা উচিত। তাতে মানুষ কনফিডেন্স পাবে। আনুষ্ঠানিকভাবেই আমরা টাকাগুলো আনতে সক্রিয় আছি।
মূল্যস্ফীতি কমাতে ব্যাংকঋণ ও আমানতের সুদের হার বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
রেট অব ইন্টারেস্ট (সুদের হার) নিয়ে উভয় দিকের কনসার্নেই সত্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুদের হার বাড়ালে দেশের জন্য ভালোই হয়, তাতে অনুৎপাদনশীল খাতে খরচটা কম হয়। আবার কোনো ক্ষেত্রে, যেমন উৎপাদনশীল খাতে রেট অব ইন্টারেস্ট কম থাকলে উৎপাদন বাড়ে, বিনিয়োগ বাড়ে। সুতরাং এটি একটি ব্যালান্সিং অ্যাক্ট, এই কাজটি করতে হবে। তবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে যদি ডিপোজিট রেট দিই, তাহলে তো একজন মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে, সে তো টাকা দিন দিন হারিয়ে ফেলবে।
ব্যাংক যদি সেই হারের বেশি হারে ডিপোজিট দেয়, কম হারে যদি লোন দেয়, তার ওপরে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। তাহলে তো ব্যাংকের ব্যবসা হবে না। এই রকম জিনিসগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট রেট কম দেব, সে ক্ষেত্রে তাকে ফিসক্যাল সাপোর্টে দেয়া যেতে পারে। যেমন আমি গভর্নর থাকার সময় কৃষিতে ইন্টারেস্ট রেট কম রেখেছি, খুবই কম হারে পিঁয়াজের জন্য লোন দিয়েছিলাম, সেটি কেমন করে, কারণ আমরা ৬ শতাংশ ভর্তুকি ফিসক্যাল পলিসিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছিলাম।
সুতরাং কোনো কোনো জায়গায় এ রকম ইনোভেটিভ আইডিয়া করাই যেতে পারে। তবে বাকিটা বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত, ট্রাস্ট করা উচিত। বাজার যেভাবে আমাদের গাইড করবে, কিছুটা সামাজিক দায়বোধ থাকতে হবে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিলেও সার্বিক ক্ষেত্রে বাজারের ধর্মমতে চলতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাত যদি খানিকটা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাতে ক্ষতি নেই।
কোরিয়ায় একসময় ২০ শতাংশ হারেও লোন দেয়া হতো। সেখানে প্রবৃদ্ধি কিন্তু কমেনি। সুতরাং আমি মনে করি, টাকাটা ঠিক জায়গামতো যাচ্ছে কি না, আমার রিয়েল ইকোনমি উপকৃত হচ্ছে কি না, এটি যদি হয় এবং সময়মতো মানুষ যাতে টাকা পায় সেটির ব্যবস্থা করতে হবে। ধরা যাক, কম রেটে কৃষিঋণ দেয়া হলো। কৃষক গেলেন ব্যাংকে, টাকা নেয়ার সময় তার কাছ থেকে কিছু টাকা ব্যাংকাররা রেখে দিলেন। কৃষক কিন্তু হিসাব করবেন তার রেট অব ইন্টারেস্ট বা খরচ বেশি হিসাব করবেন। সুতরাং স্বচ্ছতার খাতিরে রেট অব ইন্টারেস্ট নিয়ে বাস্তববাদী ভাবনার সুযোগ রয়েছে।
ব্যাংকে টাকা নেই বলে গুজব ছড়াচ্ছে একটি মহল। আসলে বাস্তব অবস্থা কী। সাবেক গভর্নর হিসেবে এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি নিরাপদ। কয়েক দিন আগে যে গুজব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু মানুষ ছড়িয়েছিল, তা কিন্তু নেই। তাহলে তো এখনো থাকত তাই না? এটি যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল সেটি বোঝা যায়। আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমে টাকা রাখা, বালিশের নিচে টাকা রাখার চেয়েও বেশি নিরাপদ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে অনেক ইনস্ট্রুমেন্ট আছে। কোনো ব্যাংকের সত্যিই যদি লিকুইডিটি ক্রাইসিস থাকে, তাহলে সে তার রেপো ব্যবহার করতে পারে, সরকারের কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট বা সিকিউরিটি থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে পারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ওই ব্যাংকটিকে লং টার্ম লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে পারে। এখন ফরেন এক্সচেঞ্জেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সময় এসেছে সাপোর্ট দেয়ার। দরকার হলে ওডি দেবে, সোয়াপ করবে। নানা রকম ইনস্ট্রুমেন্ট আছে, যাতে মার্কেটটিকে লিকুইড এবং স্বস্তিকর করে দেয়া যায়। এটি ফরেন এক্সচেঞ্জের জন্য ও লোকাল মার্কেটের জন্যও দরকার। আমাদের কাছে সেই ইনস্ট্রুমেন্ট আছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি কথা বলেছেন, ‘টাকার অভাবটা আসল অভাব না, আসল অভাব ভরসা।’ সুতরাং আমরা ভরসার পরিবেশ করি।
অর্থনীতিতে চাপ সামাল দিতে সরকার ব্যয় সংকোচনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। আর কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
সরকার এখন পর্যন্ত যথার্থ পথেই এগোচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিতে তারা যে গুরুত্বটা দিয়েছে, সেটা অত্যন্ত স্ট্র্যাটেজিক হয়েছে। এখন যেটি করতে হবে। আমাদের দরকার হলে আগামী দুই মাসের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ থেকে ছেড়ে দেব, ছেড়ে দিয়ে হলেও এই জায়গাটায় স্টেবলাইজড করব। বিশেষ করে এসেনসিয়াল ইমপোর্টে যেন কোনো ব্যাংকই কোনো সমস্যা তৈরি না করে। সে জন্য দরকার হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হটলাইন খুলতে হবে, কোন ব্যাংক কী সমস্যা করছে, তা জানবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন দিতে হবে।
পাইপলাইনে যেসব ফরেন এক্সচেঞ্জ আসার কথা সেটি ত্বরান্বিত করতে হবে। আইএমএফ, এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যে নেগোসিয়েশন করেছি, সেগুলোর প্রথম কিস্তি তাড়াতাড়ি চলে আসবে সেই কাজটি করতে হবে। আরেকটি কথা হলো, ফরেন এক্সচেঞ্জ বা রিজার্ভের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সবাই কথা বললে হবে না। কথা বলবেন সেন্ট্রাল ব্যাংক, গভর্নর বা মুখপাত্র এবং তথ্য দিয়ে ক্রেডিবল মেসেজ দেবেন, এটি সম্ভব, তাহলে সবকিছু ঠান্ডা হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয়।
ব্যাংক কোম্পানিতে ব্যক্তি, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের ওপর কঠোর সীমা আরোপের একটি আইনি উদ্যোগ মালিকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে অস্থিতিশীলতা ও স্বার্থান্বেষী মহলের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন সংশোধনের খসড়ায় প্রস্তাব করেছে যে, ‘ব্যক্তি, পরিবারের সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একাধিক ব্যাংকে একযোগে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না।’ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যাংক কোম্পানি আইন-২০২৫-এর ১৪(খ) ধারায় নতুন তিনটি উপধারা যোগ করার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২ শতাংশ বা তার বেশি ধারণ করে, তবে একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংকে ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রাখতে পারবে না। এ ছাড়া সরকার ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোনো বিনিয়োগকারী যদি ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারও রাখে, তবুও তার ভোটাধিকার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কঠোর প্রস্তাবের বিপক্ষে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। তাদের মতে, পরিচালনা পর্ষদই মূলত ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে এবং যেহেতু পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে, তাই শেয়ার ধারণের ওপর আলাদা সীমার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। বিএবি প্রস্তাব দিয়েছে যেন ‘পরিবার বলতে স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীল সদস্যদের’ বোঝানো হয় এবং একই পরিবারের শেয়ার ধারণের সীমা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সভায় জানান যে, একটি বৃহৎ গ্রুপ একসঙ্গে একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, যার ফলে সাধারণ আমানতকারীরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং সরকারকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন যে, ‘প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনী চূড়ান্ত করতে আরও সময় প্রয়োজন’ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএবির প্রতিনিধিদের পরবর্তী সভায় একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (১৮ জানুয়ারি) দেশের উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান ও লেনদেনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই গত দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রধান সূচকগুলোও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৭৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৩৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যেখানে শরিয়াহ ও ডিএসই-৩০ সূচক যথাক্রমে ১৩ ও ২৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১০০৯ ও ১৯৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন ডিএসইতে মোট ৪৭৪ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেন হয়েছে, যা গত কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা বেশি; যেখানে আগের দিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭৪টির দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ১৩৪টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর।
একইভাবে অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক চিত্রও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এদিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৬৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৮৭ পয়েন্টে স্থিতি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ১৬৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে ৯৭টির এবং দর কমেছে ৪৭টির, আর অপরিবর্তিত ছিল ১৯টি কোম্পানির শেয়ার দর। লেনদেনের পরিমাণেও সিএসইতে প্রায় ১ কোটি টাকার প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যেখানে গতকাল রোববার মোট ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের দিন ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। উভয় বাজারের এই ইতিবাচক ধারা ও সূচকের চাঙাভাব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৭ দিনে প্রবাসীরা মোট ১৮৬ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার বা ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রোববার (১৮ জানুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, এর মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন দেশে এসেছে প্রায় ১০ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে এবার বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে, কারণ ২০২৫ সালের প্রথম ১৭ দিনে দেশে এসেছিল ১১৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিশেষ করে গত ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি—এই তিন দিনেই প্রবাসীরা ১৬ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন।
রেমিট্যান্সের এই উর্ধ্বমুখী ধারা চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্রকেও শক্তিশালী করেছে। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৮১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা বছর ব্যবধানে প্রায় ২১ দশমিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে দেশে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং বর্তমান অর্থবছরের সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাসী আয় হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লাইটারেজ জাহাজ সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী মাদার ভেসেল থেকে খালাস প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন আমদানিকারকরা। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২০টি লাইটারেজ জাহাজের মধ্যে যদি ৬৩০টির বেশি আটকে থাকে, তাহলে সংকট হওয়াই স্বাভাবিক। এর ওপর আবার ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ সারাদেশে পণ্য পৌঁছে দিতে বাইরে রয়েছে।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং বা আইভোয়াক
এই তিন সংগঠনের সমন্বয়হীনতা ও জাহাজ মালিকদের অতিমুনাফার আশা এই সংকটের জন্য দায়ী বলছেন কেউ কেউ। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে এ সংকট আরো ঘনীভূত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক)–এর সমন্বয়ে বিডব্লিউটিসিসি গঠিত। মূলত এই তিন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিরিয়াল প্রথা না মানা ও চট্টগ্রামে বরাদ্দকৃত ৯০০ লাইটার জাহাজ মোংলাসহ দেশের অন্য রুটে চলাচলের কারণে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মোহাম্মদ নবী আলম জানান, বিসিভোয়া, কোয়াব ও আইভোয়াক এ তিনটি সংগঠনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল গঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এছাড়া অতি মুনাফার আশায় সিরিয়াল না মেনে এবং চট্টগ্রামে না চালিয়ে লাইটার জাহাজ মোংলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করছে। এ কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ জন্য সবার আগে বিসিভোয়া, কোয়াব এবং আইভোয়াক- এই তিন সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
এদিকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেল বলছে, ৫০ হাজার টনের একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে দৈনিক গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার হয়। সে হিসেবে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় দুইশ থেকে আড়াইশ লাইটারেজ জাহাজ।
বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ তাদের নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ দিয়ে পণ্য খালাস করলেও বাকী আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেল থেকে জাহাজ বুকিং নেন। দৈনিক ৮০টি লাইটারেজ বরাদ্দ দেয়া হলেও তিনদিন সেল থেকে কোনো জাহাজ দেয়া হয়নি। যে কারণে প্রায় শতাধিক জাহাজের পণ্য খালাস বন্ধ আছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে যেখানে একটা জাহাজ ৮ থেকে ১০ দিনে খালাস হতো সেখানে এখন একটা জাহাজ প্রায় ২০ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত লাগছে। সে হিসেবে জাহাজ প্রতিদিন যে পরিমাণ ড্যামারেজ খাচ্ছে তা হিসেব করলে প্রতিদিন ৮০টা জাহাজে ১৬ লাখ করে ড্যামারেজ খাচ্ছে।’
আকিজ শিপিং লাইনের এজিএম মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি মাসে কিন্তু আমাদের ৮ থেকে ১০টা জাহাজ থাকে। এখন এই মুহূর্তে আমাদের পোর্টে আছে ৪টা। গত চারদিন থেকে কোনো কাজই হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আহ্বায়ক হাজী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আগে যেটা ১৮ ঘণ্টায় ঢাকায় যেতো এখন সেটা তিনদিন লাগছে। বিভিন্ন জায়গায় জাহাজগুলো কুয়াশার জন্য চালাতে পারছে না। অনেকগুলো চিটাগাং পোর্টের জাহাজ মংলা পোর্টে চলে গেছে যেহেতু মংলা পোর্টে এখন যথেষ্ট মাদার জাহাজ আছে।’
বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারওয়ার হোসেন সাগর বলেন, আনলোডিং অপারেশন (খালাস কার্যক্রম) প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যে জাহাজ ১০ দিনে বন্দর ছাড়ার কথা, সেটি এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষা করছে। প্রতিটি জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের দৈনিক ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে মোট ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল। এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজানসংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য—গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেল আছে। আরও পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি রয়েছে। সাতটি জাহাজে সার এবং ২৫টি জাহাজে সিমেন্টের ক্লিংকার বহন করা হচ্ছে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল লাইটার জাহাজের মাধ্যমে নদীবন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পরিবহন করে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে অপেক্ষার সময় বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। কিছু জাহাজ দিনের পর দিন কোনো পণ্যই খালাস করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ৩০-৩৫টি বড় জাহাজ বন্দরে থাকে, কিন্তু গত কয়েক দিনে ৭০-৮০টি জাহাজ অপেক্ষমাণ হয়েছে। লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে দৈনিক খালাস ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
অপরদিকে লাইটার জাহাজের সংকট নিরসনে কঠোর অবস্থানে সরকার। লাইটার জাহাজের সংকট মোকাবিলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্যশস্য, সার এবং শিল্পের কাঁচামালসহ প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে ৮৫টিরও বেশি জাহাজ। পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় লাইটার বা ছোট জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন বিশাল অঙ্কের মাশুল বা জরিমানা গুনতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, এই সংকটের মূল কারণ কেবল লাইটারেজ জাহাজের অভাব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা এবং জাহাজের অপব্যবহার। জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে খাদ্যশস্য পরিবহনকারী বেশ কিছু লাইটারেজ জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও পণ্য খালাস করছে না। আমদানিকারকরা এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে পণ্যবাহী এই জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আটকে আছে এবং পুনরায় পণ্য পরিবহনের জন্য ফিরে আসতে পারছে না। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, এটি একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সংকট যা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
সাধারণত বড় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের নিজস্ব লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য খালাস করে থাকে। তবে সাধারণ আমদানিকারকরা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে জাহাজের বুকিং নেন। বর্তমানে বিডব্লিউটিসিসি চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ লাইটারেজ জাহাজের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি। ফলে অর্ধশতাধিক জাহাজের পণ্য খালাস কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে ৫০ হাজার টন পণ্য নিয়ে আসা একটি মাদার ভেসেল ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে বন্দর ত্যাগ করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকটের কারণে এই সময়সীমা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অনেক জাহাজকে ২০ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বহির্নোঙরে অলস বসে থাকতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো জাহাজ দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও এক টন পণ্যও খালাস করতে পারছে না। এই বিলম্বের কারণে শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বহির্নোঙরে অবস্থান করা প্রতিটি মাদার ভেসেলকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা করে ড্যামারেজ বা জরিমানা দিতে হচ্ছে।
বিডব্লিউটিসিসি এই সংকটের জন্য ঘন কুয়াশা এবং বিএডিসির সারের কাজে ১৪০টি জাহাজ আটকে থাকাকে দায়ী করেছে। তবে ব্যবসায়ী ও জাহাজ মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের মতে, বিডব্লিউটিসিসির অধীনে থাকা ১ হাজার ২০০ জাহাজের মধ্যে প্রায় ৩০০টি মোংলা বন্দরে চলে গেছে। এছাড়া ৬৮৭টি জাহাজ পণ্য বোঝাই করে গন্তব্যে যাওয়ার পর খালাস না করে এক থেকে দেড় মাস ধরে আটকে আছে। অপারেটররা এই সংকট নিরসনে জাহাজের সিরিয়াল প্রথা বাতিল করে উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছেন, যাতে দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস করে অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব হয়।
চলমান আন্দোলন ও দোকানপাট বন্ধ কর্মসূচি চলাকালীন সকল প্রকার ব্যাংক ঋণের বিপরীতে কিস্তি পরিশোধ বন্ধ রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের মোবাইল ফোন বিক্রেতাদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটি এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে স্পষ্ট করেছে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং ব্যবসা সচল থাকাকালীন ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিস্তি পরিশোধ করে আসছিলেন। তবে বর্তমানে দেশজুড়ে দোকানপাট বন্ধ থাকায় ব্যবসা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং আয়-লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিস্তি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, "চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।" তাদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে যৌক্তিক দাবিগুলোর কোনো সমাধান না আসায় "এই বাস্তবতায় আমাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব নয়।"
নিজেদের ব্যবসার বৈধতা ও সক্ষমতা প্রসঙ্গে সংগঠনটি জানায় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনেই তারা ব্যাংক ঋণ পেয়েছে, যা তাদের আনুষ্ঠানিক ও বৈধ অর্থনীতির অংশ হওয়ার প্রমাণ দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে জোর দিয়ে বলা হয়, "এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসার বৈধতা, স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করে।" যারা এই শিল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে সংগঠনটি জানায়, "আজ যারা আমাদের অবৈধ বা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে, তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই, এই শিল্পে ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগই আমাদের বৈধতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।" পরিশেষে ব্যবসায়ীরা এই সংকট নিরসনে দ্রুত সমাধান দাবি করে আল্টিমেটাম দিয়েছেন যে, "আমাদের দাবি খুব স্পষ্ট, ন্যায্য সমাধান চাই। সমাধান এলেই ব্যবসা চলবে, ব্যবসা চললেই ব্যাংক কিস্তি চলবে।"
অংশীজনদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকা অনুমোদন ও মূল্য নির্ধারণের একতরফা সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) গাজীপুরের একটি রিসোর্টে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি: প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় এই অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। বাপির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন যে, "অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ অত্যন্ত কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত।" তিনি দাবি করেন, দেশের ওষুধ শিল্পের প্রধান অংশীজন হওয়া সত্ত্বেও বাপিকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জানিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নতুন ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করে মোট সংখ্যা ২৯৫-এ উন্নীত করা হয়েছে। এই নির্দেশনার ফলে সরকার নির্ধারিত দামে ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি প্রতিটি কোম্পানিকে তাদের মোট উৎপাদনের ২৫ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে এই তালিকার ওষুধগুলো তৈরি করতে হবে। সরকারের এমন অবস্থানের প্রেক্ষিতে ডা. জাকির হোসেন বলেন, "অর্তবর্তীকালীন রুটিন কাজের বাইরে এসে অনেক কিছু করতে চাইছে।" তিনি নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর বিষয়ে সরকারকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আপনাদের সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন।" উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজার ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যয় বিবেচনা না করে দাম নির্ধারণ করা হলে তা শিল্পের জন্য টেকসই হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বাপির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান যে, গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠান বাদে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ কোম্পানি বর্তমানে রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ১৯৯০ সালের মূল্য কাঠামোতে ২০২৫-২৬ সালেও ওষুধ বিক্রির বাধ্যবাধকতাকে তিনি অবাস্তব বলে অভিহিত করেন। ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতিকে শিল্পের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান যে, ২০১৬ সালের পর থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় স্বাস্থ্যনিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনুষ্ঠানে সমিতির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিক প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থেকে শিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সংকট উত্তরণের উপায় নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানান।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে (১১ থেকে ১৫ জানুয়ারি) সব ধরনের সূচকের পতন ও লেনদেনের উল্লেখযোগ্য হ্রাসের মধ্য দিয়ে বাজার পরিস্থিতি নেতিবাচক ছিল।
গত সপ্তাহের তুলনায় ডিএসইতে লেনদেন ১৯.৯০ শতাংশ কমেছে এবং তালিকাভুক্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারের দরপতন ঘটেছে, যদিও এই পরিস্থিতির মধ্যেও বাজার মূলধন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪ থেকে ৮ জানুয়ারির তুলনায় গত সপ্তাহে লেনদেন কমেছে ৪৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, তবে বাজার মূলধন এক হাজার ২৬০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেড়ে সপ্তাহ শেষে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮৪ হাজার ৪৪০ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট এক হাজার ৯০০ কোটি ৬০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৮০ কোটি ১২ লাখ টাকা; যা আগের সপ্তাহের ৪৭৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকার গড় লেনদেনের তুলনায় বেশ কম।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে ৪১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হলেও মাত্র ৯৩টির দর বেড়েছে এবং ২৬৮টির দাম কমেছে, যেখানে ২৫টি কোম্পানির দর অপরিবর্তিত ছিল। এই নিম্নমুখী প্রবণতায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৯.৫৬ পয়েন্ট হারিয়ে ৪,৯৫৮.৯৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
একইভাবে ডিএসই-৩০ সূচক ২.২২ পয়েন্ট কমে ১,৯১২.৭২ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১৪.৮৭ পয়েন্ট কমে ৯৫২.৯৩ পয়েন্টে এবং ডিএসএমইএক্স সূচক ৫.১৫ পয়েন্ট কমে ৯৫২.২২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের এমন ধারাবাহিক পতন ও লেনদেনের নিম্নগতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও বাজার মূলধনের ইতিবাচক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৫ সালে চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য মূল্য ৪৫ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছে এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে, যা গত পাঁচ বছরে ৪০ ও ৪৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের গণ্ডি অতিক্রমের ধারাবাহিকতায় অর্জিত হয়েছে।
টানা নয় বছর ধরে বজায় থাকা এই প্রবৃদ্ধি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক সাফল্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। দেশটির রফতানি কৌশল বর্তমানে শুধু পণ্য বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ‘উইন-উইন’ সহযোগিতার একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হয়েছে। এরই প্রতিফলন দেখা যায় বিদেশি বিনিয়োগপুষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৩ দশমিক ২৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বাণিজ্য মূল্যে, যেখানে ইন্টেলের ছেংতু চিপ কারখানা কিংবা টেসলার শাংহাই গিগাফ্যাক্টরির মতো হাইটেক উদ্যোগগুলো চীনে উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে প্রযুক্তি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করছে বিশ্ববাজারের সাধারণ ক্রেতারা, কারণ ‘মেড ইন চায়না’ সোলার প্যানেল, নতুন জ্বালানির গাড়ি ও গৃহস্থালি সামগ্রী সাশ্রয়ী মূল্যে ও দ্রুততায় সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, চীনা পণ্যের অনুপস্থিতিতে দেশটির পরিবারগুলোর গড় জীবনযাত্রার ব্যয় ৪ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেত। একই সঙ্গে চীনের উন্নত সৌর ও বায়ুশক্তি প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সুলভ করে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক সবুজ রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করেছে, যা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ কর্তৃক সাম্প্রতিক সময়ের বড় অগ্রগতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। রফতানির পাশাপাশি চীন আমদানিতেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে, যার প্রমাণ ২০২৫ সালের রেকর্ড ১৮ দশমিক ৪৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের আমদানি চিত্র এবং গড় শুল্কহার ৭ দশমিক ৩ শতাংশে কমিয়ে আনা। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি হাইনান ফ্রি ট্রেড পোর্টের মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো সিমেন্স এনার্জির মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প-শৃঙ্খল সুবিধা ব্যবহার করে বিদেশি কোম্পানিগুলো বর্তমানে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। ২০২৫ সালের কেপিএমজি রিপোর্টেও এর প্রতিফলন ঘটেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ৬৪ শতাংশ বহুজাতিক উদ্যোগ উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়ন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চীনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও জানিয়েছেন, ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়কালে (২০২৬-২০৩০) চীন আমদানি ও রফতানির সুষম উন্নয়ন, উদ্ভাবনী বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সঞ্চালন মসৃণ করার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে চীন একটি আন্তর্জাতিকীকরণকৃত ভোগ পরিবেশ গড়ে তুলবে, ‘চায়নায় দোকান’ ব্র্যান্ড তৈরি করবে, পর্যটকদের জন্য কর ফেরত নীতি আরও উন্নত করবে এবং আন্তর্জাতিক ভোগ কেন্দ্র শহরগুলোর উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে। বিশ্ব অর্থনীতির এই অস্থির সময়ে বিশ্লেষকরা চীনের এই উন্মুক্ততা ও সহযোগিতার নীতিকে বৈশ্বিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছেন।
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিল্প মেলা ‘গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং এক্সপো (গ্যাপেক্সপো)-২০২৬’ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) জমকালো সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হয়েছে।
বিজিএপিএমইএ আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে ভারত, চীন, পাকিস্তান ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের ৩৫০টি প্রতিষ্ঠান ১৫০০টি স্টলে তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, কাঁচামাল ও পণ্য প্রদর্শন করে। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং সভাপতিত্ব করেন বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার। লক্ষাধিক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখরিত এই মেলায় গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সংশ্লিষ্ট খাতের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান অতিথি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, “দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে গত অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ছিল ৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সঠিক সুযোগ পেলে এটি পোশাক খাতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে এই খাতের সমস্যা সমাধানে কাজ করবো।” অন্যদিকে, দেশের প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে বিজিএপিএমইএ সভাপতি মো. শাহরিয়ার মন্তব্য করেন, “অর্থ পাচারকারী দুর্নীতিবাজরা ব্যবসায়ী সেজে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কখনো দেশের টাকা লুট করতে পারে না।”
ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “এই সেক্টরটি বাংলাদেশের অন্যতম ‘আন্ডাররেটেড’ সেক্টর হলেও এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানির খাত। কাঁচামাল আমদানি করে উল্টো রপ্তানি করা আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ করে। আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য গত একবছর খারাপ অবস্থায় গেছে। আমাদের আগামীতে একটি স্থিতিশীল ও বিদেশিদের কাছে আস্থাভাজন গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন, যাতে অর্থনীতি ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হয়।” দেশীয় শিল্পের বিকাশে নীতিমালার প্রভাব সম্পর্কে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “‘আমরা এখন প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু কিছু পলিসি আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। ‘ফ্রি অফ কস্ট’ আমদানির সুবিধা ১০০ শতাংশ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আলোচনা করে সেটা কমিয়েছি। সব যদি দেশের বাইরে থেকেই আসে, তবে আমাদের কারখানা তো চলবে না। আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়াতে হবে।” রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক মেলার সমাপনী দিনে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে ৮টি শ্রেষ্ঠ স্টলকে ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে বিশেষ স্বীকৃতি জানানো হয়।
স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারে পুনরায় মূল্যবান এই ধাতুর দাম বাড়ানো হয়েছে, যা গত বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক নির্ধারিত নতুন মূল্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিতে ২ হাজার ৬২৫ টাকা বাড়িয়ে ২ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বাজুস বলেছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বাড়ায় স্বর্ণের দামে এই সমন্বয় করা হয়েছে।” শনিবারও সারাদেশে এই পরিবর্তিত উচ্চমূল্যেই স্বর্ণ বেচাকেনা চলছে।
স্বর্ণের নতুন এই দর অনুযায়ী, প্রতি ভরি ২১ ক্যারেট স্বর্ণ এখন ২ লক্ষ ২৪ হাজার ৭ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৯৮৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের জন্য ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ২৩১ টাকা। নির্ধারিত এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ৫ শতাংশ সরকারি ভ্যাট এবং বাজুস কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত করে চূড়ান্ত দাম পরিশোধ করতে হবে, যদিও গয়নার অলংকরণ ও মানভেদে মজুরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।
এদিকে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে; ফলে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট রুপা ৫ হাজার ৯৪৯ টাকা, ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৭১৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা দরেই স্থির রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্তে গত পাঁচ বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সব খরচ বাদ দিয়ে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা লাভ করেছে; যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে সরকারের কোষাগারে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫- এই পাঁচ বছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ১৩.০৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তের প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ১৮.৪২ শতাংশ। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে সংস্থাটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার মাধ্যমে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চবক সূত্র জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭.৫৯ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ভ্যাট, ট্যাক্স ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর গত পাঁচ বছরে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আয় করেছে পাঁচ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। একই সময়ে রাজস্ব ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরটিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্বৃত্ত রাজস্বের পরিমাণ ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, গত পাঁচ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
সূত্রমতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার ফলে ২০২৪ সালেও বড় অঙ্কের অর্থাৎ ২ হাজার ৯২৩.১৭ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। বছরটিতে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। তার আগের বছরগুলোতে অর্থাৎ ২০২৩, ২০২২ ও ২০২১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ, ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ ও ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ২০২৪ সাল। বছরটিতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ এ বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় আগের বছরের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে রাজস্ব আয়ে ১৬.৬৯ এবং ২০২২ সালে ৬.১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধের নীতি কঠোরভাবে পরিপালন করায় গত দুই বছর ধরে রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে সংস্থাটির রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬১ শতাংশ। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ব্যয় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫০ শতাংশে সীমিত রাখতে পেরেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ।
যদিও ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল এবং বছরটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব ব্যয় হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০.১৮ শতাংশ বেশি ছিল। এর আগে ২০২২ সালে বন্দরের রাজস্ব ব্যয়ের এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১৭ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ভ্যাট, ট্যাক্স ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে এই অর্থ জমা দেয় তারা। গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে মোট ৭৫৮০.২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা দিয়েছে কর হিসেবে, যার পরিমাণ ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ জমা দিয়েছে তিন হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর বাইরে কর-বহির্ভূত আয় (এনটিআর) হিসেবে গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে মোট ৬০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের পরিমাণও প্রতি বছর বাড়ছে। সর্বশেষ ২০২৫ এ কর, ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে সরকারের কোষাগারে ১৮০৪.৪৭ কোটি টাকা জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় যা ৫.৪১ শতাংশ বেশি। ২০২৪ পঞ্জিকাবর্ষে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ১,৭১১.৭৫ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছিল। পূর্ববর্তী বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে ১,৫১৯.৩৫ কোটি, ২০২২ সালে ১,৩৫৯.৫৯ কোটি এবং ২০২১ সালে ১,১৮৫.০৪ কোটি টাকা সরকারের কোষগারে জোগান দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্ত দুই ক্ষেত্রে এই সাফল্য অর্জন করেছে। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রে তিন দিনের দীর্ঘ সাপ্তাহিক ছুটির প্রাক্কালে এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান আক্রমণের সম্ভাবনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হওয়ায় বৃহস্পতিবার দাম কমলেও পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরির উপস্থিতি এবং সরবরাহে সম্ভাব্য ঘাটতির ভয়ে বাজার পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৭ সেন্ট বেড়ে ৬৪ ডলার ১৩ সেন্ট হয়েছে এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৯ ডলার ৪৪ সেন্টে। ভেনেজুয়েলা থেকে তেলের সরবরাহ আশানুরূপ শুরু না হওয়াকে দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন। তাঁর মতে, ‘ভেনেজুয়েলা থেকে যে পরিমাণ সরবরাহ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তা এখনো ওভাবে শুরু হয়নি। শুক্রবার যারা তেল কিনেছে, তারা মূলত তিন দিনের ছুটির সময় ঘাটতিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।’
যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে, তবুও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমজ প্রণালি অবরোধের আশঙ্কা বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলছে। দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে দামের ওপর একটি বাড়তি চাপ বজায় থাকতে পারে।
তবে সামগ্রিক বাজার ভারসাম্য নিয়ে বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সচদেবা বলেন, “ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে জল্পনাকল্পনার ধারাবাহিক চাপ থাকলেও বাণিজ্যের যে মৌলিক ভারসাম্য, তাতে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, “চীনের চাহিদায় হঠাৎই বেড়ে না গেলে কিংবা তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হলে তেলের দাম সীমার মধ্যেই ঘোরাফেরা করবে।” মূলত চীনসহ বিশ্ব অর্থনীতির মন্থর গতির কারণেই ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকালীন রেকর্ড দামের তুলনায় বর্তমানে তেলের বাজার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।