ভোক্তাদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, নয়-ছয় সুদহারের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। শুধু তাই নয়, এর ফলে বিদেশে টাকা পাচার বেড়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা নিয়ে মানুষ জমি কিনছে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে। এখান থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার দৈনিক বাংলাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করা দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক বাংলার বিজনেস এডিটর আবদুর রহিম হারমাছি।
বাজারে সব জিনিসের দামই চড়া। শীতের সবজি বাজারে এলেও দাম কমছে না। চাল-আটার দাম বেড়েই চলেছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও) বলছে, জ্বালানি ও খাদ্য এক বছর আগের দামে ফিরেছে। জ্বালানি তেলের দাম ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে কমছে না কেন?
আসলে বাজারে সব খাদ্যসহ সব পণ্যের দাম খুবই বেশি। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে মানুষের খুবই কষ্ট হচ্ছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় কম দামে পণ্য পেয়ে অসহায় গরিব মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। আড়াই বছরের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় তাদের আয়-উপার্জন বাড়েনি; বাড়েনি ক্রয়ক্ষমতা। অথচ খরচ বেড়েই চলেছে। তাদের সংসার চালানো সত্যিই কঠিন হয়েছে পড়েছে।
এই যে শীতের সবজিতে বাজার ভরে গেছে। কিন্তু দাম কমছে না। চাল-আটার দাম বেড়েই চলেছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবেই এক মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক শূন্য চার শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মাঝারি মানের চালের দাম এক মাসে বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ; এক বছরে বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। এক মাসে সরু (নাজিরশাইল ও মিনিকেট) চালের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ; এক বছরে বেড়েছে ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আটা-ময়দার দাম বেড়েছে আরও বেশি, এক বছরে খোলা আটার দাম বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশ্ববাজারে যা ঘটে তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ে। এটা হচ্ছে বিশ্বায়নের কুফল বা সুফল, যাই বলেন না কেন। আমাদের দেশে নানা রকম সংকট আছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম যে বেশি, সেই সংকট তো আছেই। পাশাপাশি বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় আমাদের রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে বেশি। ফলে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স ঋণাত্বক হচ্ছে। যার কারণে দিন দিন টাকা তার মূল্য হারাচ্ছে। ডলারের দাম বাড়ছে। ৯ মাস, এক বছর আগে এক ডলার কিনতে ৮৫ টাকা লাগত। এখন এক ডলার কিনতে ১১০ টাকা লাগে। আগে একটি ১০ ডলারের পণ্য যদি ৮৫০ টাকায় যাওয়া যেত সেটার এখন দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। পাশাপাশি কর বাড়ছে। এটা দাম বাড়ার একটি কারণ।
এটা তো গেল বিশ্ব পেক্ষাপট। পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই?
আমাদের এখানে পণ্যের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে এক্সপেকটেশন, ব্যবসার ক্ষেত্রে যেটাকে বলা হয়ে থাকে অতি মুনাফা বা আশা। আমাদের এখানে প্রফিট এক্সপেকটেশন মনে হয় বেড়ে গেছে। আমাদের অনেক পণ্যের আমদানিকারকের সংখ্যা অনেক সীমিত। মাত্র ৫ থেকে ৭ জন। এরাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের লাভ করার মানসিকতা বেড়েছে। এরাই সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
এ ছাড়া যারা পাইকার বা খুচরা বিক্রেতা তাদের লাভ করার ইচ্ছাও বেড়ে গেছে। আগে তারা ১০০ টাকায় ২ টাকা লাভ করে সন্তুষ্ট থাকতেন। এখন তারা ১০০ টাকায় ৫ টাকা লাভ করার চেষ্টা করছেন। ভোক্তারা সেটা মেনে নিচ্ছেন বলে আমার ধারণা। এর ফলে পণ্যমূল্য যে পরিমাণ বাড়ার কথা তার চেয়ে বেশি বাড়ছে। আমাদের দেশে আরেকটা জিনিস হয়, হঠাৎ করে একটি ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। কখনো চিনি বা তেল বা পেঁয়াজ-রসুন। এখানে সরবরাহ বিঘ্নিত করে দাম বাড়ানো হয়। আমাদের ভোক্তা অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা কখনো বড় ব্যবসায়ীরা করেন। কখনো মজুতদাররা করেন। আবার পাইকাররা বা খুচরা ব্যবসায়ীরা করেন। এটাও পণ্যমূল্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার একটি অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে মানুষের মুনাফা করার মানসিকতায় একটি স্ফীতি ঘটছে।
সরকার কী সঠিকভাবে বাজার মনিটর বা তদারক করছে?
কিছুদিন আগে আমাদের দেশের প্রতিযোগিতা কমিশন একটি কাজ করেছে। আমাদের একটি প্রতিযোগিতা কমিশন ছিল; তাদের কোনো কাজ আমরা এতদিন দেখতে পাইনি। কিন্তু কিছুদিন আগে তারা একটি কাজ করেছে। বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগে দেশের কয়েকটি বড় বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমিশন মামলা করেছিল; তারা ভয়ও পেয়ে গিয়েছিল। দেশের মানুষ কমিশনকে বাহাবা দিয়েছিল। আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এবার বোধহয় কিছু একটা হবে। কিন্তু সেটা কেন জানি আবার ঝিমিয়ে পড়েছে। এ কাজগুলো হয়েছিল কমিশনের আগের চেয়ারম্যানের সময়ে। তিনি সম্প্রতি অবসরে গেছেন। এখন নতুন চেয়ারম্যান এসেছেন, তার কাছ থেকে আমরা আগের মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি চাই। তাহলেই একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ব্যবসায়ীদের দেশের মানুষকে জিম্মি করে অতিমুনাফা করার মানসিকতা কমবে।
প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরে যাওয়ার আগে বেশ কিছু মামলা করেছেন। মামলার নেচার কনক্লুশন হয়নি। মামলা করা তো যথেষ্ট নয়। শুধু মামলা হলে হবে না। দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, তাহলে প্রভাব পড়বে। ব্যবস্থার কথা আমরা জানতে পারিনি। এ ব্যাপারে কমিশন আরও তৎপর হবে- এটা প্রত্যাশা করি।
বাজারে পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই কী সঠিক দায়িত্ব পালন করছে?
এফবিসিসিআইর তো কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। ব্যক্তি যখন মুনাফা করার জন্য নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, তখন এফবিসিসিআই বা অন্য কোনো সংস্থা যাদের কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই, তারা যে খুব একটা কাজ করতে পারে তা আমার মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে দেশের আইন আর যেসব সংস্থা দেশের এই আইন প্রয়োগ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ধরপাকড় করে, ভয় দেখিয়ে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে কিন্তু অনেক সময় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, ধরপাকড় করলে পণ্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়, তখন ভোক্তা-ক্রেতারা আরও বেশি সংকটে পড়েন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার তাদের কাজ করছে। তবে আমি মনে করি পণ্যমূল্য কমাতে হলে মানিটারি পলিসি (মুদ্রানীতি) ও ফিসক্যাল পলিসিতে (রাজস্ব নীতি) পরিবর্তন আনতে হবে। যাতে অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ে।
পৃথিবীর অনেক দেশ মূল্যস্ফীতির পারদ নিচের দিকে নামাতে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতিতে নানা ধরনের পরিবর্তন আনছে। আমাদেরও সেই পথে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে। আজ এই সমস্যা তো কাল ওই সমস্যা। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে তো নানা ঝামেলা আছে। সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে, বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
এই সংকটকালে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে অর্থনীতিবিদরা ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়ানোর কথা বলছেন। সরকারের দু-একজন মন্ত্রীও একই কথা বলছেন। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ কমে যাবে। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আপনি কী মনে করেন?
সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, চীনসহ প্রায় সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই একই কাজ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা ৬ শতাংশ আর ৯ শতাংশের মধ্যে আটকে গেছি। আমরা ডিপজিটরকে ৬ শতাংশ দিই। আর ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের ৯ শতাংশ হারে ঋণ দিই। এর ফলে বড় ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা টাকা জমা রেখেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমার মনে হয় বিষয়টি আবার ভেবে দেখা উচিত।
এখানে বলা হচ্ছে, সুদের হার বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে। সেখানে একটি ফারাক আছে। কারণ যদি উৎপাদন খরচ বাড়ে সেটা বেড়ে আবার কমতে পারে। তখন মূল্যস্ফীতিও কমবে। তাই আমি মনে করি, নয়-ছয় সুদের হার থেকে আমাদের দ্রুত বেড়িয়ে আসা উচিত। ছয় মাস-এক বছরের জন্য হলেও এটা করা উচিত। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, ২০২৩ সাল খুবই কঠিন সময় যাবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কাও করছে তারা। দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাসও দেয়া হচ্ছে। এই তো আর ১০-১২ দিন পরই ২০২৩ সাল শুরু হবে। তাই এই কয়টা দিন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নানান কিছু চিন্তা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। মনে রাখতে হবে, ২০২৩ সালকে যদি আমরা করোনা মহামারির মতো মোটামুটি ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকে আর পেছনে তাকাতে হবে না।
ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তার আগে শিল্প খাতে ঋণের সুদের হার ১৫, ১৬, এমনকি ২০ শতাংশ পর্যন্তও ছিল। সুদের হার কমলেও খেলাপি ঋণ বাড়ছে কেন?
এখানেই তো বড় প্রশ্ন। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বলেছিলেন, সুদের হার কমলে, দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, খেলাপি ঋণ কমবে। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টোটা, দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। এখানে তারা করোনা মহামারি ও যুদ্ধের অজুহাত দেখাচ্ছেন। কিন্তু খেলাপি ঋণ বাড়ছে কেন? ছয় মাস আগে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটাকে কিন্তু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
দেশে সুদের হার কমলেও খেলাপি ঋণ কমছে না; আড়াই বছরের বেশি সময় এরপর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে মেয়াদি আমানতের সুদহার বেঁধে দেয়া হয়। তবে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ হলেও ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ রয়ে গেছে। আমি মনে করি, নয়-ছয় সুদহারের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, এর ফলে বিদেশে টাকা পাচার বেড়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা নিয়ে মানুষ জমি কিনছে। আমাদের নীতিনির্ধারকরা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে। এখান থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের অনেকের মধ্যে এ রকম একটি প্রবণতা আছে, ‘আমার এই চিন্তাধারা বিশ্বকে দিবে নাড়া’। বিশ্ব যেভাবে উপকার পেয়েছে সেটা না করে আমরা নিজেরা আমাদের মতো কাজ করতে চাই। আমাদের এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই প্রবণতা সংকটকে ঘনীভূত করে। সারা বিশ্ব যা করছে আমাদের উচিত সেটা অনুসরণ করা।
এমনিতেই বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি। সবাই আতঙ্কে আছেন, রমজান মাসকে সামনে রেখে আরও বাড়বে। আপনি কি মনে করেন?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখানে বলির পাঁঠা। কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করা হয়। কিন্তু এখানে মূল্যস্ফীতি কমাতে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয় আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। আর উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে যেসব মন্ত্রণালয় জড়িত তাদের যেমন-কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়।
আমরা কিছু ভালো নীতি দেখতে পাচ্ছি। ব্যালেন্স অব পেমেন্টের সমস্যা সমাধানের জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলা কঠিন করা হয়েছিল। রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানির এলসি সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেজুরসহ অতিপ্রয়োজনীয় ৮ পণ্য বাকিতে আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে। পণ্যগুলো হলো খেজুর, ছোলা, ভোজ্যতেল, ডাল, মটর, পেঁয়াজ, মসলা ও চিনি। রোজার সময় যাতে কোনো ঘাটতি না পড়ে, দাম সহনীয় থাকে- সে জন্য এই ৮ পণ্য বাকিতে আমদানির সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকে সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ৯০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধের চুক্তিতে এসব পণ্য আনা যাবে।
এটাকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। সরবরাহ পরিস্থিতির যদি উন্নতি হয় তাহলে কিন্তু মূল্য কমবে না। সে ক্ষেত্রে দেখতে হবে কোনো একটি বিশেষ পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহে সমস্যা তৈরি করে কেউ অতি মুনাফা করার চেষ্টা করছে কি না। সে ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনকে দৃষ্টি রাখতে হবে। কিন্তু সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির ব্যবহার আরও নিবিড় করতে হবে। আরও যুক্তিসংগত এবং সময় উপযোগী করতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বলছে, ২০২৩ সালে অনেক দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থা কেমন?
খাদ্যের দিক দিয়ে আমি বলব, বাংলাদেশ এক ধরনের স্বস্তির মধ্যেই আছে। সরকারি গুদামগুলোতে ১৭ লাখ টনের মতো খাদ্য মজুত আছে। বেসরকারি পর্যায়েও প্রচুর খাদ মজুত আছে। সরকার ও বেসরকারিভাবে প্রচুর চাল ও গম আমদানি হচ্ছে। আমনের ফলন ভালো হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় আগামী দুই-এক বছর খাদ্য নিয়ে খুব একটা চিন্তার কারণ আমি দেখছি না।
আমি মনে করি, বাংলাদেশে খাদ্যের সরবরাহে সমস্যা হবে না। কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ কিন্তু সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক হলেই হয় না। মানুষের যদি ক্রয়ক্ষমতা না থাকে তখন দুর্ভিক্ষ হয়। তাই সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হবে, পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ঠিক রাখতে হবে। এর মধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে সরকার এক কোটি পরিবারকে খাদ্য দিচ্ছে। এগুলো আরও বাড়াতে হবে। আমি আশা করি, বিশ্বাস করি, প্রার্থনা করি, বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হবে না।
আপনি বলছিলেন, মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তরা কষ্টে আছেন। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় সরকারের কিছু করা উচিত কি না?
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য কিনে গরিব মানুষের কাছে কম দামে বিক্রি করছে স্থানীয় বাজারে। এর অর্থ সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে না। টিসিবি যদি দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ না করে দেশের বাইরে থেকে পণ্য সংগ্রহ করত তাহলে ভালো হতো। মূল্যস্ফীতিতে সেটার একটি ভালো প্রভাব পড়ত।
সার্বিকভাবে নিম্ন মধ্যবিত্তরা যাতে ভালো থাকেন, সেটা নিয়ে সরকারকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সংকট তৈরি করেছে নয়ছয় সুদের হারের বাঁধন। এর ফলে যারা ফিক্সড ইনকাম গ্রুপের লোক, যারা পেনশনভোগী, যাদের সঞ্চয় থেকে আয় দিয়ে সংসার চালান আমানতের সুদের হার কমায় তারা কিন্তু আরও সংকটাপন্ন হচ্ছেন। তাদের জন্য সরকারের অবশ্যই কিছু ভাবতে হবে, করতে হবে।
পণ্য মূল্য সহনীয় রাখতে সরকারের তৎপরতাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
সরকার সচেতন। বিশেষ করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুব সচেতন। তিনি সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন বলে আমাদের ধারণা। সরকারকে অনেক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। যাদের লবিং ক্ষমতা যত বেশি তাদের পক্ষে সিদ্ধান্তগুলো যায়। এখন বিত্তবানদের লবিং ক্ষমতা বেশি। সাধারণ মানুষের খুব কম। তবুও আশা করব রমজান মাস আসছে, দ্রব্যমূল্য যাতে সহনীয় থাকে, সন্তোষজনক থাকে, সাধারণ মানুষ যাতে কষ্ট না পান, এর জন্য সরবরাহ পরিস্থিতি যাতে ঠিক থাকে, মানুষের আয় যাতে ঠিক থাকে, বাড়ে। আর কেউ যাতে সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়িয়ে না দেন, সেদিকে সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ব্যাপক ইতিবাচক গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকার সমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, "এপ্রিলের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার।" পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ কোটি ১৯ লাখ ডলার করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ হাজার ৮৬২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এর আগে মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় আসার মাধ্যমে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও যথাক্রমে ৩০২ কোটি ৭ লাখ এবং ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের নজির। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার আগমন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চলতি মাসের তৃতীয় চালানে আরও সাত হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোর ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের টার্মিনালে এই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন্স) কাজী রবিউল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, গত ২০ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাম্পিং শুরু হওয়ার প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর এই ডিজেল গন্তব্যে এসে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, এর আগে চলতি মাসের ১১ ও ১৯ এপ্রিল আরও দুটি পৃথক চালানে মোট ১৩ হাজার টন জ্বালানি এসেছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৩৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে মোট চারটি চালানে ভারত থেকে ২৫ হাজার টন জ্বালানি আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বছরজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এই ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৩১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগে রেল ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহনের দীর্ঘ সময় ও জটিলতা অনেকাংশে কমেছে। গত ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই আমদানি কার্যক্রমের চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর ভারত থেকে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিপিসির তথ্যমতে, এই পাইপলাইন ব্যবহার করে বছরে ১০ লাখ টন পর্যন্ত তেল আমদানি করা সম্ভব, যা কৃষি ও পরিবহন খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলো পার্বতীপুর ডিপো থেকে এই ডিজেল সংগ্রহ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সারাদেশের টিসিবি কার্ডধারী নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মাঝে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ ৩২ হাজার লিটার পরিশোধিত পাম তেল ও ২ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সংগ্রহে সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় হবে মোট ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩২ টাকা। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে আমেরিকার পাওয়ার হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি থেকে ১৮১ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয়ে পাম তেল কেনা হবে। অন্যদিকে, স্থানীয় উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঢাকার গুলশানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইজ সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ২ হাজার টন মসুর ডাল সংগ্রহের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে এদিনের সভায় নির্ধারিত আলোচ্যসূচির বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়নি। এর মধ্যে বাপেক্স কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘৩টি অনুসন্ধান কুকূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খনন’ প্রকল্পের আওতায় দুটি কূপ খননের প্রস্তাবটি আলোচনার বাইরে ছিল। একইভাবে ‘সিলেট-১২ নম্বর কূপ খনন (তেল কূপ)’ এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি সংগ্রহের প্রস্তাবগুলোও বৈঠকে উত্থাপন করা হয়নি। এছাড়া নেসকো ও বাপবিবোর বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন সংক্রান্ত একাধিক প্যাকেজ এবং সিরাজগঞ্জ ও ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুনর্নির্ধারিত লেভেলাইজড ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাবগুলোও এদিনের সভায় উপস্থাপন করা হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টিসিবির মাধ্যমে নিত্যপণ্যের এই বড় মজুত সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আগামী জুলাই মাসে ইতালি থেকে একটি বিশেষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও যৌথ বিজনেস প্ল্যাটফর্ম তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলাসান্দ্রোর এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা উল্লেখ করে বলেন, “ইতালি ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী।”
সাক্ষাৎকালে বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, “বাংলাদেশ ও ইতালির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিকভাবে দৃঢ়। ইতালি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” মন্ত্রী ইতালীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে ইতালির বিনিয়োগ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফার্নিচার, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বন্ধ জুটমিল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে। দেশের তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সুবিধা।”
বৈঠকে ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং পোশাক শিল্পের বাইরেও চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হন। এই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহিম খানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত পেট্রোকেমিক্যাল মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সংগৃহীত হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে শুরু করে লিপস্টিক, চুইংগাম, জুতা এমনকি মানুষের দাঁতের নকল পাটিও তৈরিতে পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে।
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর প্রধান রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?” পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের মোট তেলের ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো উপাদানগুলো প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইল প্রতি কেজি ৯০ সেন্টে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১ ডলার ৩৩ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাক তৈরিতে অন্তত ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ গুণতে হচ্ছে। এফডিআরএ-এর বিশ্লেষণ মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এক জোড়া জুতার দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, আঠাজাতীয় পণ্যের কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ বাড়ায় তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, “অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।”
শিল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে সরবরাহ চেইনের এই চাপ আরও প্রকট হবে। ইতিমধ্যে রিনসেরু-এর মতো পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের প্রতিটি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না ব্যবসায়ীরা। তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন অনেক সাধারণ পণ্যের দামও এখন পরোক্ষভাবে পেট্রোকেমিক্যালের কারণে আকাশচুম্বী হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের মধ্যেও পারস্য উপসাগর থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল রফতানির তথ্য পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন খাত বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ জারির পরবর্তী সপ্তাহেই এই রফতানি সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সা জানায়, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপের পর ১৩ এপ্রিল থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সময়ে তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কারগুলোর ৩৪টি যাতায়াত শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৯টি জাহাজ পারস্য উপসাগর ছেড়ে গেছে এবং ১৫টি জাহাজ সেখানে প্রবেশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-কে (এপি) পাঠানো এক ইমেইলে জানিয়েছে, উপসাগর ত্যাগ করা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টি ইরানি অপরিশোধিত তেলে পূর্ণ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ছয়টি জাহাজে মোট প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা হচ্ছিল।
তবে এই তেলের চালান শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সূত্র: এপি
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমলেও সূচক ছিল ইতিবাচক। ডিএসইতে দিনের শুরুতে চাঙ্গাভাব থাকলেও আধা ঘণ্টার ব্যবধানে বিক্রেতাদের চাপে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দরপতন ঘটে। তবে লেনদেনের শেষভাগে বড় মূলধনি কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচক সামান্য বেড়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স মাত্র ০.০০৪ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনশেষে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়লেও ১৯৯টির দর কমেছে এবং ৫৮টির দাম স্থিতিশীল ছিল। বাজারটিতে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় ১৭১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা কমে ৮৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং।
অন্যদিকে, সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৪টির দাম বেড়েছে এবং ১০৩টির দাম কমেছে। সিএসইতে ২১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা গত দিনের তুলনায় প্রায় ৪ কোটি টাকা বেশি। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতন হলেও বাছাই করা কিছু বড় কোম্পানির ভালো পারফরম্যান্সের কারণে সূচক শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান বহুমুখী প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধির জোরালো আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিজিএমইএ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সংগঠনটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই দাবি উত্থাপন করে। বৈঠকে বিআরপিডি সার্কুলার-০৭/২০২৫-এর আওতায় আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি রুগ্ন শিল্পগুলোর পুনর্বাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। বিজিএমইএ-র পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, খেলাপি হিসাবের সময়সীমা নভেম্বর ২০২৫-এর পরিবর্তে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে অনেক সংকটাপন্ন কারখানা নীতি সহায়তার আওতায় আসার সুযোগ পাবে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নীতি সহায়তাগুলো অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক সময়মতো কার্যকর না করায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার হয়।
বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও সভায় তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ মনে করে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক তথ্য যাচাই ও নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন, যা কার্যকর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে। ডেপুটি গভর্নর বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম কনডম উৎপাদনকারী মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান কারেক্স সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তারা পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে মূল্যবৃদ্ধির এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ায় এই শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোহ মিয়া কিয়াত এক সাক্ষাৎকারে জানান, জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পরিবেশক পর্যায়ে পণ্যের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে খুবই নাজুক, দাম বাড়ছে। এ মুহূর্তে আমাদের আর কোনো উপায় নেই। খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতেই হচ্ছে।” কারেক্স প্রতি বছর ৫০০ কোটির বেশি কনডম তৈরি করে এবং তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোতে প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে কনডম তৈরির প্রধান উপকরণ সিন্থেটিক রাবার ও নাইট্রাইল থেকে শুরু করে প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও সিলিকন লুব্রিকেন্টের দাম হু হু করে বাড়ছে। কারেক্সের প্রধান নির্বাহী জানান, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আগের তুলনায় দ্বিগুণ সময় লাগছে; যেখানে আগে এক মাস সময় লাগত, এখন সেখানে দুই মাস সময় ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, “অনেক কনডম এখন জাহাজেই পড়ে আছে, এখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি। কিন্তু সেগুলোর চাহিদা খুব বেশি।” এর ফলে অনেক উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় মজুত শেষ হয়ে আসছে, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিবহণ ও কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামই এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ বা তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় স্বর্ণ ও রুপার মূল্য নতুন করে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা হ্রাস পেয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে দাম কমার কারণ ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, “স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য কমেছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।”
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭১ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দর ২ লাখ ২ হাজার ২০ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫২১ টাকায় ক্রয় করা যাবে। ইতিপূর্বে গত ১৫ এপ্রিল স্বর্ণের মূল্য সর্বশেষ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যেখানে ২২ ক্যারেটের ভরি ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৩ টাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট ৫৬ বার স্বর্ণের বাজারমূল্য পরিবর্তন করা হলো, যার মধ্যে ৩২ বার দাম বেড়েছে এবং ২৪ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ৯৩ বার স্বর্ণের দর সমন্বয় করা হয়েছিল।
স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও উল্লেখযোগ্য মূল্য কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৩৫০ টাকা কমে এখন ৫ হাজার ৭১৫ টাকায় নেমেছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার ভরি ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৩৫ বার রুপার মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যেখানে ১৯ বার দাম বৃদ্ধি ও ১৬ বার হ্রাসের ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২৫ সালে রুপার দাম ১৩ বার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ও বিদেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশিদের বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় কমেছে ৮৬ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে বিদেশে ৪৬৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৩৭৭ কোটি টাকায়। বিদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এরপরই রয়েছে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান।
একইভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও নিম্নমুখী। জানুয়ারিতে তারা ৩৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ২৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রেও ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
দেশের অভ্যন্তরেও কার্ডের ব্যবহার হ্রাসের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩,৭২০ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে ২৯৮ কোটি টাকা কমে ৩,৪২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সামগ্রিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে একটি স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণার পর বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা কিছুটা লাঘব হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে। রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৮৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জুন মাসে সরবরাহযোগ্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দর ১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে।
এর আগে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পূর্বেই ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ সুগম করতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে একতরফা এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইরান বা ইসরায়েল আদৌ চূড়ান্তভাবে সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাজার বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড মেয়ার মন্তব্য করেন, “যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ফলে বাজারে সংকট কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে ডলারের মান বাড়বে, তেল ও সুদের হার বাড়বে এবং স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হবে।”
এই ঘোষণার প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যার ফলে মার্কিন ডলারের মান কিছুটা কমেছে এবং তেলের দামও নিম্নমুখী হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদাকে প্রভাবিত করে। ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এক বার্তায় জানিয়েছে যে, স্বর্ণের বর্তমান এই দরবৃদ্ধি বেশ নাজুক এবং স্বল্পমেয়াদে তা হ্রাসের ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই মূল্যবান ধাতু পুনরায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী প্রধান হিসেবে মনোনীত কেভিন ওয়ার্শ জানিয়েছেন যে, সুদের হার কমানোর বিষয়ে তিনি ট্রাম্পকে কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দেননি এবং তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবেন। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও তেজি ভাব দেখা গেছে; যেখানে রুপার দাম ১.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৭.৯৭ ডলার হয়েছে এবং প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরই আগামী দিনগুলোতে এই বাজারগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।
সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাহাজটি আগামী ৪ বা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করা ট্যাংকারটি লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে আসছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলেছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চালানটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অন্যদিকে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের আরেকটি জাহাজ ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে এখনো হরমুজ প্রণালিতে আটকে রয়েছে। ইরানের বিশেষ অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টনের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ—৬৩ শতাংশের বেশি। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ, গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্বালানির ধরন বিবেচনায় ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, পেট্রল ও অকটেন।