চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কাঞ্চন পেয়ারা’ এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। অতুলনীয় স্বাদ, আকর্ষণীয় রঙ এবং দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার বিশেষ গুণের কারণে এই ফলটি এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঞ্চন পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এর ফলে যেমন প্রান্তিক কৃষকের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বাড়ছে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।
জুলাই মাস থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে পুরোদমে আসতে শুরু করেছে কাঞ্চন পেয়ারা। বাগান থেকে ফল সংগ্রহ এবং তা পাইকারদের কাছে বিক্রির কাজে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন চন্দনাইশ ও পটিয়া উপজেলার পেয়ারা চাষিরা। বিশেষ করে চন্দনাইশের হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, ধোপাছড়ি ও দোহাজারীসহ পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় এই পেয়ারার ব্যাপক ফলন হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে হওয়ায় উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই ফল সংগ্রহ করছেন। প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় বাজারগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে কেনাবেচা জমে ওঠে এবং ট্রাক-পিকআপে করে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চন্দনাইশের প্রায় ৭২০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা বাগান রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর প্রায় ১১ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় চাষিরা জানান, অন্যান্য ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম, কিন্তু বাজারমূল্য বেশ সন্তোষজনক। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে অল্প সময়েই ভালো ফলন পাওয়া যায়, যা বহু গ্রামীণ পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, গত ১০-১৫ বছর ধরে কাঞ্চন পেয়ারা বিদেশের বাজারে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার পেয়ারা রপ্তানি হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা আরও বেশি থাকলেও কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবস্থা, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানসম্পন্ন ফলমূল রপ্তানির জন্য একটি বিশেষায়িত ‘প্যাকিং হাউস’ নির্মাণ করা গেলে রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
কৃষি ও অর্থনীতিবিদদের মতে, চন্দনাইশের এই কাঞ্চন পেয়ারা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। কৃষিপণ্যের এই রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয় বাড়ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে চন্দনাইশ অদূর ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে যাতে ফলনের গুণগত মান বিশ্বমানের হয়।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিলি স্থলবন্দরে বিদায়ী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বড় অংকের রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক নির্ধারিত ১ হাজার ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৯৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আমদানিকারকরা এই পরিস্থিতির জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হয়রানি ও অবকাঠামোগত সমস্যাকে দায়ী করলেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাবি, শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি কমে যাওয়াই এই ঘাটতির মূল কারণ।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রতিটি মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার ছিল হতাশাজনক। জুলাই মাসে ৫৬ কোটি ২১ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। একইভাবে অক্টোবর, জানুয়ারি ও মার্চ মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোতেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। মে মাসে ২০৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ৫৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বছরের শেষ মাস জুনেও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মতে, হিলি স্থলবন্দরের প্রতি কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নীতিগত বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতাই প্রধান অন্তরায়। তাঁদের অভিযোগ, অন্যান্য বন্দরের তুলনায় হিলিতে শুল্কায়নের হার অনেক বেশি এবং পণ্য পরীক্ষার নামে আমদানিকারকদের অহেতুক হয়রানি করা হয়। ক্ষুদ্র বিষয়েও ফাইল রংপুরে পাঠিয়ে দেওয়া এবং ইচ্ছামতো মালামাল ল্যাব টেস্টে পাঠানোর ফলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের অন্যান্য বন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও হিলিতে কঠোর ও মনগড়া অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে, যা আমদানিকারকদের এই বন্দর থেকে বিমুখ করে দিচ্ছে।
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে এই বন্দর দিয়ে দিনে মাত্র ৫ থেকে ১৫টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করছে। সড়কের বেহাল দশা, বর্ষাকালে পণ্য লোড-আনলোডের পর্যাপ্ত শেড না থাকা এবং জায়গার সংকটের কারণে বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ভারতীয় ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও আমদানিকারকরা এলসি খুলতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন যে, অন্যান্য বন্দরের মতো পাথর, কয়লা ও ছাইয়ের মতো বাল্ক পণ্য সরাসরি নিজস্ব ইয়ার্ডে নিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হলে রাজস্ব আদায়ের হার পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।
তবে হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের গাফিলতি নেই। তাঁদের মতে, এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার কমে যাওয়া এবং চাল, গম ও ভুট্টার মতো শুল্কমুক্ত বা জিরো পয়েন্ট পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়াই রাজস্ব ঘাটতির নেপথ্যে কাজ করছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা একই দিনে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা ও শুল্কায়ন সম্পন্ন করে দ্রুত ছাড়করণের সেবা দিচ্ছে। শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেলেই কেবল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন। হিলি স্থলবন্দরের এই অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী অর্থবছরেও বড় ধরণের রাজস্ব সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশের বেশি। টাকার হিসাবে বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পণ্য আমদানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট বা পিওএল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, পুরো আমদানি ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই গেছে জ্বালানি তেল আমদানিতে। এর আগে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ওই বছর এ খাতে ৮ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। নতুন রেকর্ডে সেই ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পিওএল আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ৯২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পিওএল আমদানিতে ব্যয় ১০৯ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে গত অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
কোভিড মহামারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় জ্বালানি তেলের চাহিদা ও দাম ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। পরে অর্থনীতি ও শিল্পকারখানা সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯০ ডলারে উঠে যায়। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। ওই বছরের মার্চে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৩৯ ডলারের বেশি হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দাম কমলেও বিভিন্ন সময় যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে তা কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৫ ডলারের কাছাকাছিও নেমেছিল। ১০ আগস্ট বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার হিসাবে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৮৬ দশমিক ৭২ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ছিল ৮১ ডলার।
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে নয়, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন। নয় মাসের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করলেও চাহিদা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫ হাজার টন। আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের মধ্যে রয়েছে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছিল। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল অপরিশোধিত তেল। বাকি ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী।
এদিকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দামও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১ জুন ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। পরবর্তী জুলাই ও আগস্ট মাসেও এসব দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি তেল আমদানিতে এক বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের মোট পণ্য আমদানির প্রায় এক-সপ্তমাংশ অর্থ জ্বালানি তেলের পেছনে ব্যয় হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। পাবনার ওয়ার্কশপ, ধামরাইয়ের জুতার কারখানা কিংবা কেরানীগঞ্জের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণে নিজেদের উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বড় কারখানা বা রপ্তানিকারকদের মতো জেনারেটর চালিয়ে মেশিন সচল রাখার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা যেমন কমছে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
দেশের অর্থনীতিতে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং থাকায় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত এই খাতের উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কাঁচামালের বাড়তি দামের পাশাপাশি বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় লোকসান বাড়ছে এবং অনেক উদ্যোক্তাকে বাধ্য হয়ে নিজেদের জমানো সঞ্চয় ভেঙে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মূলত দেশে প্রকট হওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি কক্সবাজারে একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে এবং গত ১১ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস এবং কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দামের মতো নানামুখী অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বিদ্যুতের এই তীব্র সংকট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই খাতের ব্যবসায়ীরা এক বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হলে তারা পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন না, যার ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য আর্থিক দায় মেটানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং এর একটি নেতিবাচক ধারাবাহিক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ ও লোকসানি কলকারখানায় বিনিয়োগে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে দেশের ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে ইতোমধ্যে ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যাচাই-বাছাই করছে। কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ডেটা সেন্টার, হালকা প্রকৌশল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে তারা এই বিনিয়োগ করতে চায়। এর আগে গত জুন মাসে সরকার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা এমন ৪৪টি বন্ধ কলকারখানার তালিকা করে, যার মধ্যে চিনি, বস্ত্র, কেমিক্যাল, পাট এবং স্টিল ও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একাধিক শিল্পগোষ্ঠী একই কারখানায় বিনিয়োগ করতে চেয়েছে। যেমন ঠাকুরগাঁও ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে যথাক্রমে প্যারাগন, কাজী ফার্মস, নাবিল গ্রুপ, ব্র্যাক ও মিল্ক ভিটা। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ একাই ১৬টি কারখানার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩৫টি প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া আকিজ রিসোর্স ১২টি, টি কে গ্রুপ ১০টি, কাজী ফার্মস ৪টি এবং ট্রান্সকম গ্রুপ ৩টি বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছে। পাশাপাশি স্কয়ার ফুড, বেঙ্গল মিট, এক্সিলেন্ট সিরামিকস এবং গ্রাম উন্নয়ন কর্মের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ আগ্রহের কথা সরকারকে জানিয়েছে।
সরকারি এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অলাভজনক ও বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন। এরপর ৮ জুলাই শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রস্তাবগুলো যাচাই করে বিনিয়োগকাঠামো নির্ধারণের জন্য একটি কার্যকর কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, গত মাসে পাস হওয়া ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬’ অনুযায়ী নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই কারখানাগুলো কোন মডেলে বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। বিডার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই খসড়া নীতিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সরকারি বন্ধ কলকারখানাগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার এই সরকারি সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এর ফলে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পর সেগুলো যেন শুধু শিল্পকারখানা হিসেবেই ব্যবহৃত হয় এবং কোনোভাবেই আবাসন বা অন্য প্রকল্পে পরিণত না হয়, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল দক্ষতা ও সুনাম আছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ইজারা বা পরিচালনার জন্য বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাজারে গিয়ে এর কোনো প্রভাব বা স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আগের মতোই চড়া থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। সাধারণ ক্রেতাদের মতে, গত এক বছরে চাল ছাড়া প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে নির্দিষ্ট আয়ের সঙ্গে বাজারের বাড়তি ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই মেলাতে পারছেন না তারা।
মূল্যস্ফীতি কমার কারণ হিসেবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, জুলাই মাসে চাল ও মাংসের দাম কমার কারণেই মূলত সূচকে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সরকারি এই হিসাবের সঙ্গে বাজারের বাস্তব চিত্রের ব্যাপক অসংগতি দেখছেন। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, পরিসংখ্যানে যা দেখানো হচ্ছে, বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। তার মতে, মূল্যস্ফীতি গণনার পদ্ধতিতে কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে, যার ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না এর যথাযথ সংস্কার হচ্ছে, ততক্ষণ এমন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য এবং বাজারের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণেও মূল্যবৃদ্ধির এই সত্যতা পাওয়া যায়। গত এক বছরে চাল ছাড়া সয়াবিন তেল, চিনি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, মাছ, আলু, পেঁয়াজ, আটা ও সবজিসহ প্রায় সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা, অতিরিক্ত গরম এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূলত জিনিসপত্রের এই দাম বেড়েছে। বাজারে খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেল, আটা, ডাল থেকে শুরু করে রুই, পাঙাশ বা তেলাপিয়ার মতো মাছ এবং ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি। সরবরাহ সংকটে কাঁচামরিচ ও শাকসবজির দামও মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জিনিসপত্রের এই লাগামহীন দামের বিপরীতে মানুষের আয় আনুপাতিক হারে না বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষেরা। বিবিএসের হিসাবে, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে দেশে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। টানা ৫৩ মাস ধরে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকছে। আয় না বেড়ে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে জমানো সঞ্চয় ভাঙছেন অথবা সংসার চালাতে ধারদেনা করছেন। আবার পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরুপায় হয়ে অনেক মানুষ তাদের দৈনন্দিন খাবার, পোশাক বা যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতের অপরিহার্য খরচও কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সহায়তা নিচ্ছে। এশিয়া মহাদেশের চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো বহু আগে থেকেই সফলভাবে এই মডেল অনুসরণ করে আসছে। এসব দেশে বেসরকারি উদ্যোক্তারা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধন শেষে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করছে। স্থানীয় পরিস্থিতি ও পরিচালন ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে তারা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে জ্বালানি বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার একটি বড় উদাহরণ হলো ভারতের বেসরকারি কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। তারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে নিজেদের জামনগর রিফাইনারি কমপ্লেক্সে পরিশোধন করে এবং দেশজুড়ে তাদের নিজস্ব পাম্প ও শিল্প গ্রাহকদের কাছে তা বিক্রি করে। অন্যদিকে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীনেও সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত রাশিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। পরিশোধন শেষে এসব তেল তারা নিজস্ব বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির পাশাপাশি সরকারি কোটা অনুযায়ী সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের মতো দেশে রপ্তানিও করছে।
নিজস্ব কোনো জ্বালানি মজুত না থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে বড় বড় শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামুদ্রিক বাংকারিং বন্দর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এক্সনমোবিল ও শেলের মতো কোম্পানিগুলো সেখানে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি তেলের বাজার মূলত এসকে এনার্জি ও জিএস ক্যালটেক্সের মতো বড় চারটি বেসরকারি শোধনাগার কোম্পানির হাতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজার থেকে তেল আমদানি করে তা শোধন শেষে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করে দেশটির সার্বিক জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে।
বৈশ্বিক এই সফলতার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করছে, যা বর্তমানে যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একার পক্ষে দেশের বিশাল চাহিদা মেটানো কঠিন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতি ও সিস্টেম লসের অভিযোগের কারণে বেসরকারি খাতকে এই সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি বাস্তবায়িত হলে বাজারে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৫১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয়ে চিনি, পরিশোধিত সয়াবিন তেল ও মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে সর্বমোট ২৫ হাজার টন চিনি কেনার একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। নির্ধারিত চুক্তিমূল্য অনুযায়ী প্রতি টন চিনির দাম পড়বে ৫১৪ মার্কিন ডলার। ফলে এই বিপুল পরিমাণ চিনি ক্রয় করতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১৫৭ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা, যা সরবরাহের জন্য ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান পিটি ট্রিনিটি চাহয়া এনার্জিকে দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
একই বৈঠকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ২ কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১ দশমিক ১৫০ মার্কিন ডলার ধরে এই ক্রয়ে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮২ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা সরবরাহের দায়িত্বও পেয়েছে ইন্দোনেশিয়ার একই প্রতিষ্ঠান। এদিকে স্থানীয়ভাবে ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন কেনার আরেকটি প্রস্তাব বৈঠকে তোলা হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তা আলোচনা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
চিনি ও সয়াবিন তেলের পাশাপাশি দেশীয় বাজার থেকে মসুর ডাল কেনার একটি প্রস্তাবও এই বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্রের জাতীয় পদ্ধতিতে ৫০ কেজির বস্তায় মোট ১০ হাজার টন মসুর ডাল কেনা হবে। প্রতি কেজি মসুর ডালের দর ৭৮ টাকা ৯৬ পয়সা হিসেবে এই বিশাল চালানে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৭৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ১১ দিনেই দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা মোট ১৩৮ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের আগস্ট মাসের ঠিক একই সময়ে এই প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৯৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ফলে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেমিট্যান্স আসার এই ইতিবাচক ধারা প্রতিদিনই অব্যাহত থাকতে দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, শুধু ১১ আগস্ট একদিনেই প্রবাসীরা দেশে ১২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। একক দিন হিসেবে প্রবাসী আয় আসার এই হারকে দেশের বর্তমান অর্থনীতির জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স আসার সার্বিক চিত্রে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে শুরু করে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে সর্বমোট ৪২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অথচ গত অর্থবছরের ঠিক একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৪৩ কোটি ২০ লাখ ডলার।
হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে তুলনা করলেও এক বছরের ব্যবধানে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে প্রবাসী আয়ের এই শক্তিশালী প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ডলারের বাজারেও অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে আবারও সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। স্থানীয় বাজারে পাকা সোনা বা তেজাবী সোনার মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাজুসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৬৩৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে ভালো মানের এক ভরি সোনার নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭৯ টাকা, যা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকেই দেশজুড়ে কার্যকর হয়েছে।
বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী অন্য সব মানের সোনার দামও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৫৭৫ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৯৪ হাজার ২০৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ১০৮ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩০ টাকা করা হয়েছে।
এর আগে মাত্র দুই দিন আগে, অর্থাৎ গত ১১ আগস্টও দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেদিন ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ১ হাজার ১০৮ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ টাকা। সে সময় ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনায় ১ হাজার ৫০ টাকা, ১৮ ক্যারেটে ৯১৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনায় ৭০০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু দুই দিনের ব্যবধানে আবারও তেজাবী সোনার দাম বাড়ায় নতুন করে দাম বাড়াতে বাধ্য হয় বাজুস।
তবে বাজারে সোনার দাম পর পর দুবার বাড়ানো হলেও রুপার দাম সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাজুসের নির্ধারিত আগের দাম অনুযায়ী ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৫ হাজার ৭৪ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪ হাজার ৮৪০ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ১৯৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা ৩ হাজার ১৪৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজুস স্পষ্ট জানিয়েছে, পরবর্তী নতুন সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে সোনা ও রুপার এই দর বহাল থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন-ইরান আলোচনার অচলাবস্থা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এবং তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক একযোগে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক তেলের চাহিদার পূর্বাভাস হ্রাস করার কারণেই মূলত এই নিম্নমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার এশিয়ার ট্রেডিং সেশনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার এই চিত্র দেখা যায়। এদিন ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৫৬ ডলারে নেমে এসেছে। একই সাথে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ৭৭ ডলারে অবস্থান করছে।
হরমুজ প্রণালি টানা বন্ধ থাকা এবং সেখানে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। আইইএ তাদের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অতিরিক্ত উচ্চমূল্যের কারণে মূল চাহিদা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ বছর দৈনিক তেলের চাহিদা রেকর্ড ১৬ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমতে পারে। অন্যদিকে ওপেকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক চাহিদা কিছুটা বাড়লেও তারা পূর্বনির্ধারিত প্রত্যাশা থেকে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে দৈনিক ৫ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেলে নামিয়ে এনেছে।
চাহিদার এই পতনের পাশাপাশি তেলের বাজারে নতুন করে মন্দা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। গত সপ্তাহে মার্কিন বাণিজ্যিক তেলের মজুত এক লাফে এক কোটি ৭৪ লাখ ব্যারেল বেড়ে যাওয়ায় দেশটির সামগ্রিক মজুত ৪২ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া এবং রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির জোগান উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের ওঠানামার মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়েছে। লেনদেনের প্রথম থেকেই সূচকে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এদিন লেনদেন শুরুর প্রথম পাঁচ মিনিটে ডিএসইএক্স সূচক ৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। তবে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে সূচক আগের অবস্থান থেকে ৯ পয়েন্ট কমে যায় এবং এরপর আবার ঊর্ধ্বমুখী গতি দেখা যায়। লেনদেন শুরুর ২০ মিনিট পর অর্থাৎ সকাল ১০টা ২০ মিনিটে সূচক আগের দিনের চেয়ে ১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৮৯৮ পয়েন্টে অবস্থান করে।
পরবর্তীতে লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টা পর অর্থাৎ সকাল সাড়ে ১০টায় ডিএসইর প্রধান বা সাধারণ সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯০৫ পয়েন্টে অবস্থান করে। একই সময়ে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৮১ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৯৭ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিএসইতে মোট ১৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই শেয়ারের দাম বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২২৫টির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে দাম কমেছে ৭০টি কোম্পানির শেয়ারের এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৭৯টি কোম্পানির শেয়ারের দর। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিএসইতে প্রথম আধা ঘণ্টায় মিশ্র হলেও ইতিবাচক ধারার আভাস পাওয়া গেছে।
অপরদিকে দেশের আরেক শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সকাল থেকে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী গতি লক্ষ করা গেছে। লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টা পর অর্থাৎ সকাল সাড়ে ১০টায় সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ২৩ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৮৫২ পয়েন্টে অবস্থান করে এবং এরপর সূচকটিকে ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়। এদিন সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সিএসইতে মোট ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩২টির দাম বেড়েছে, কমেছে ১০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২টি কোম্পানির শেয়ারের দর।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সাম্প্রতিক মাসিক বাজেট পর্যালোচনায় জানানো হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে এই ঘাটতির পরিমাণ ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বাজেট ঘাটতির এই পূর্বাভাস ২০ হাজার কোটি ডলার বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ হিসেবে সরকারের ব্যয় নয়, বরং সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাজস্ব কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে শুল্ক ও কাস্টমস খাত থেকে প্রত্যাশার তুলনায় কম আয়। সিবিওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই খাতটি থেকে রাজস্ব আয় আগের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলার কম হতে পারে। মূলত গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) আওতায় শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো আইনি ক্ষমতা ছিল না। যদিও আয়কর ও বেতনভিত্তিক কর থেকে প্রত্যাশার চেয়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বেশি রাজস্ব এসেছে, তবে অন্যান্য খাত থেকে আয় পূর্বাভাসের চেয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার কম হওয়ায় সার্বিকভাবে রাজস্বে প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারের বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দেশের এমন নাজুক বাজেট পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিস। তার দেওয়া তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে এবং শুধু জুলাই মাসেই ৪৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার অর্থ হলো সরকারকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ধার করতে হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, অর্থনীতি কোনো গভীর মন্দার মধ্যে না থাকা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক নয়। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, শুল্ক থেকে রাজস্ব কমে যাওয়ার এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের অভ্যন্তরীণ দুর্বল অবস্থাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
রাজস্ব কমার পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ের দিক থেকেও কয়েকটি বড় খাতে ব্যাপক চাপ বেড়েছে বলে সিবিও জানিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাজেট ঘাটতি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বেশি। এ সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৭ হাজার কোটি ডলার, মেডিকেয়ারে ৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলার এবং মেডিকেইডে ৪৫ কোটি ডলার মিলিয়ে মোট ১৮ হাজার ১০০ কোটি ডলার ব্যয় বেড়েছে। এর পাশাপাশি সরকারের বাড়তে থাকা ঋণের পরিমাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সুদহার বৃদ্ধির কারণে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও আগের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বা ১১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় রিজার্ভের এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১২ আগস্ট) দিন শেষে দেশের মোট বা গ্রোস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী এই রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি মাসের শুরুর দিকের (৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য না হলেও দেশের বর্তমান ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে আইএমএফের এসডিআর, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং আকুর বিলের মতো কিছু খাত বাদ দিয়ে এই ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে থাকে। প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরা হলে, বর্তমানের এই ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে আগামী সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে, যেখানে সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে দেশের রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে ঋণ অনিয়ম এবং অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অর্থ পাচার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতির কারণে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ একপর্যায়ে ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ওই সরকারের পতনের সময় দেশের মোট রিজার্ভ কমে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে এবং আইএমএফের হিসাবে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যার ফলে সে সময় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমদানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে ধীরে ধীরে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয় এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধগুলোও ধাপে ধাপে শিথিল করা হতে থাকে। এসব তুলনামূলক উদার বাণিজ্য নীতির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করে এবং রিজার্ভ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটে। পরবর্তীতে বর্তমান বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী এর পরিমাণ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাচ্ছে।